মানুষ থুইয়া খোদা ভজো, এই মন্ত্রণা কে দিয়াছে – সুমনকুমার দাশ
মানুষ থুইয়া খোদা ভজো, এই মন্ত্রণা কে দিয়াছে
৬০নং পাতলা খাঁ লেন,
ঢাকা
১৯-৩-৪৯
জনাব কবি সাহেব,
আচ্ছালামো আলায়কুম। আপনার প্রেরিত জালালগীতিকা পাইয়াছি। একবার দুইবার পড়িয়াছি। মুগ্ধ হইয়াছি, বিস্মিত হইয়াছি। কোন অজ্ঞাতনামা গ্রামে ফুটিয়া আপন সৌরভে আপনি মাতোয়ারা হইয়া রহিয়াছেন। আপনাকে লোক-চক্ষুর অন্তরাল হইতে টানিয়া রেডিওর বুকে ছড়াইয়া দিতে চাই। গ্রামোফোনের প্লেটে বাঁধিয়া ঘর ঘর বিলাইয়া দিতে চাই। ইতিমধ্যে রেডিওতে আপনার গান গাইয়াছি। দু’চার খান গান রেকর্ড করিতেছি। আপনি নিম্নলিখিত উপায়ে একখানা বইসহ রেডিও অফিসে দরখাস্ত করিবেন।
স্টেশন ডিরেক্টর
রেডিও পাকিস্তান, ঢাকা
জনাব,
মৎপ্রণীত একখানি বই পাঠাইলাম। রেডিওতে আমার লেখা গানগুলি বিভিন্ন শিল্পীদ্বারা গীত হইলে বাধিত হইব। ইতি-
এইভাবে একখানা দরখাস্তসহ বই পাঠাইবেন।-গানগুলির সুর তো আমার জানা নাই। যদি কখনো ঢাকায় আসেন, মেহেরবাণী করিয়া উপরের ঠিকানায় ঢাকা সদরঘাট ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে ৬০নং পাতলা খাঁর গলিতে এই গরীবের সাথে দেখা করিবেন। এপ্রিল মাসে আসিবেন। আসিবার আগে পত্র দিবেন।
আপনার আধ্যাত্মিক গান পড়িয়া সত্যই বুঝিয়াছি আপনি উঁচুদরের সাধক কবি। দূর হইতে আপনাকে সহস্র তছলিম জানাইতেছি। দোয়া করিবেন।
গুণমুগ্ধ গায়ক
আব্বাসউদ্দীন আহমদ
১
৯৪৯ সালে ১৯ মার্চ শিল্পী আব্বাসউদ্দীন জালাল উদ্দীন খাঁর একটি গানের সংকলন পড়ে এই চিঠি লিখেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি বিভিন্ন সময় জালালের গানের সুরারোপ করে রেডিওতে গেয়েছেন। আব্বাসউদ্দীন ছাড়াও ঢাকা ও কলকাতায় জালালের বেশ কয়েকজন সুহৃদ ও অনুরাগী ছিলেন। সেই সুবাদে তাঁরা জালালের গান বিভিন্ন মাধ্যমে শহুরে মানুষদের কাছে পৌঁছানোর যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেছেন। এঁরা হচ্ছেন : লেখক ধরণীকান্ত লাহিড়ী, যতীন্দ্রপ্রসাদ ভট্টাচার্য, পূর্ণেন্দুপ্রসাদ ভট্টাচার্য, গুরুসদয় দত্ত, মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন, মুহম্মদ আবু তালিব প্রমুখ। শহুরে সংস্কৃতির সঙ্গে জালালের গানকে ব্যাপক পরিচিতি করিয়ে দেওয়ার কারিগর যেমন তাঁদের প্রায় প্রত্যেকেই কোনও না কোনওভাবে ছিলেন, তেমনই জালাল নিজে তাঁর গানকে গ্রাম্য সাধারণের কাছে পরিচিত করে তুলেছিলেন। তাঁর অগণিত শিষ্যের মুখে মুখেও ছড়িয়ে পড়েছিল জালালগীতিকার পদগুলো। ফলে মধ্য বয়সেই জালাল উদ্দীন খাঁর গানের সুনাম তাঁর নিজ জেলা নেত্রকোনার সীমানা ছাড়িয়ে ঢাকা, সিলেট, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহসহ দেশের নানা প্রান্তে বিস্তৃত হয়।
বাউল-গবেষক সুধীর চক্রবর্তী তাঁর সম্পাদিত জনপদাবলি বইয়ে লিখেছিলেন :
জালাল অত্যন্ত জনপ্রিয় গীতিকার এবং বলিষ্ঠ মতবাদের মানুষ। তাঁর যুক্তিবাদী আধুনিক মনস্কতা বিশেষভাবে তাঁর গানকে আকর্ষণীয় করেছে।
জালালের গান আমাদের দেশের পরম্পরায় খুব গুরুত্বপূর্ণ। […] তাঁর কয়েকটি বিশিষ্ট উক্তি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ‘আমিময় অনন্তবিশ্ব’ ঘোষণা তাঁর সাহসী সত্তার পরিচয়। ‘আমি বাতিন আমি দৃশ্য’ কথাকটি বলিষ্ঠভাবের ইঙ্গিত-বাতিন মানে গোপন বা অপ্রকাশ্য। ‘আমার বান্ধা কারাগারে আমিই বন্ধ অন্ধকার’ অনবদ্য পঙ্ক্তি।
জালালের কিছু কিছু উক্তি প্রত্যক্ষত অনৈস্লামিক-তার কারণ তিনি ফকিরি তন্ত্রের মানুষ-যাঁদের সঙ্গে শরিয়তবাদী মুসলিমদের বরাবরের কাজিয়া ও মনান্তর। ‘আমি না থাকিলে খোদা তোমার জায়গা ভবে নাই। স্থান না পেয়ে অন্য কোথাও আমাতে লয়েছ ঠাঁই’ এমন বক্তব্য মৌলবাদীদের রোচক নয়। ‘তুমি সে অনন্ত অসীম আমাতে হয়েছ সসীম। কালীকৃষ্ণ করিম মহিম কত নামে ডাকছি তাই’ প্রকাশভঙ্গির দ্যোতনা অপূর্ব। এ ধরনের কাব্যিক উচ্চারণ করবার পর জালাল বলে বসেন এক সাংঘাতিক বিস্ফোরক বক্তব্য :
খোদার ঘর হয় মক্কা শরিফ এই কথা পাগলে বলে।
প্রতি ঘটেই আছে খোদা এ বিশ্ব ব্রহ্মান্ডময়
সে তো পাখির মতো খাঁচায় পুরে একস্থানেতে রাখার নয়।
সেজদা (প্রণাম) দিলে চৌদিকে দাও মনের মাঠে গিয়া।
এসব মন্তব্য হাজি মোল্লাদের পক্ষে মর্মান্তিক। কিন্তু এর চেয়েও মারাত্মক ঘোষণা :
জালাল তুমি ভাবের দেশে চলো
আল্লাকে দেখবে যদি
আগে চর্মচোখের পর্দা খোলো।
গিয়া তুমি ভাবনগরে চেয়ে থাকো রূপ নেহারে
সজল নয়নে তারে ফটোগ্রাফে তোলো।
স্রোতের বিপক্ষে সর্বাধুনিক ভাবনা ছিল জালালের-ছিল সর্বাধুনিক ভাষা। ‘সোহহং’ মন্ত্রের মতো সবশেষে জালাল বলে বসেন :
দেখবে আল্লার রং সুরত অবিকল তুই জালালের মতো
তোর সঙ্গে অবিরত চলে চলাচল।
জালাল তাঁর গানে সর্বধর্মসমন্বয়ের কথা বলেছেন। বিশ্বাস থেকে লিখেছেন :
হিন্দু কিবা মুসলমান শাক্ত বৌদ্ধ খ্রিশ্চিয়ান
বিধির কাছে সবাই সমান পাপপুণ্যের বিচারে।
জালাল শেষপর্যন্ত মানবপন্থি, তাই বলতে পেরেছেন আরবে মক্কার ঘর, মদিনায় রসুলের কবর এবং বয়তুল্লায় শূন্যের পাথর সবই মানুষের হাতের সৃষ্টি। এমনকী ফেরেশতা যেখানে যেতে পারে না মানুষ সেখানেও গেছে।
সুধীর চক্রবর্তী উপরোক্ত লেখায় ‘জালাল তুমি ভাবের দেশে চলো’ গানটি জালাল উদ্দীন খাঁর বলে উল্লেখ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এটি নেত্রকোনারই আরেক সাধক কবি রশিদ উদ্দিনের লেখা। ১৯৪৯ সালে আটপাড়া থানার বাসাটা গ্রামের আবদুর রব মাস্টারের বাড়িতে এক গানের আসরের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে রশিদ উদ্দিন ছাড়াও জালাল উদ্দীন খাঁ, ইদ্রিস মিয়া, তৈয়ব আলী, মিরাজ আলীসহ অনেক বাউল উপস্থিত ছিলেন। ওই আসরে জালাল উদ্দীন খাঁ আল্লাহকে সরাসরি অস্বীকার করে একটি গান পরিবেশন করেছিলেন। সেই গানের জবাবে আসরে উপস্থিত অন্যান্য বাউল রশিদ উদ্দিনকে একটি লেখার অনুরোধ জানালে তিনি উপরোক্ত গানটি লিখে দেন। পরে বাউলশিল্পী ইদ্রিস মিয়া রশিদ উদ্দিনের লেখা ওই গানটি পরিবেশন করেন।
তবে জালাল উদ্দীন খাঁর অসংখ্য গানের পরতে পরতে ‘মানবপন্থি’ মনোভাবের বিষয়টি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। তাঁর গানের মূল বক্তব্যই হচ্ছে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। নেত্রকোনা অঞ্চলের প্রখ্যাত বাউলসাধক ‘মানবপন্থি’ রশিদ উদ্দিনের হাত ধরে জালালের বাউলগানের জগতে যাত্রা শুরু হয়েছিল। গুরুর মত ও পথের আদর্শে সমুন্নত হয়ে আজীবন সেই সাধনায় অবিচল থেকেছেন। এ-কারণে একমাত্র তাঁর পক্ষেই বলিষ্ঠ ও দৃঢ়ভাবে উচ্চারণ করা সম্ভব :
মানুষ থুইয়া খোদা ভজো, এই মন্ত্রণা কে দিয়াছে
মানুষ ভজো কোরান খোঁজো, পাতায় পাতায় সাক্ষী আছে।
খোদার নাহি ছায়া কায়া স্বরূপে ধরেছে মায়া
রূপে মিশে রূপের ছায়া, ফুল কলি ছয় প্রেমের গাছে।
আরব দেশে মক্কার ঘর, মদিনায় রসুলের কবর
বয়তুল্লায় শূন্যের পাথর, মানুষে সব করিয়াছে।
মানুষে করিছে কর্ম, কত পাপ কত ধর্ম
বুঝিতে সেই নিগূঢ় মর্ম, মন-মহাজন মধ্যে আছে।
দ্বিলের যখন খুলবে কপাট, দেখবে তবে প্রেমের হাট
মারিফত সিদ্ধের ঘাট, সকলই মানুষের কাছে।
সৃষ্টির আগে পরোয়ারে, মানুষেরই রূপ নেহারে
ফেরশতা যাইতে নারে, মানুষ তথায় গিয়াছে।
মানুষের সঙ্গ লইয়া, পৃথিবীতে জন্ম হইয়া
খেলতে হইল মানুষ লইয়া, জাত বিনে কি জাতি বাঁচে?।
মানুষের ছবি আঁকো, পায়ের ধূলি গায়ে মাখো
শরিয়ত সঙ্গে রাখো, তত্ত্ব-বিষয় গোপন আছে।
জালালে কয় মন রে পাজি, করলে কত বে-লেহাজি
মানুষ তোমার নায়ের মাঝি, একদিন গিয়া হবে পাছে।
অধ্যাপক যতীন সরকার বলেছিলেন, ‘সারা জীবন অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জালাল খাঁ যে-ভাবাদর্শকে ধারণ করেছেন, সে-ভাবাদর্শটির অনেকটাই তিনি তাঁর পরিবেশ-পরিপার্শ্ব থেকে শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো একান্ত স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেছেন।’ নেত্রকোনা অঞ্চলের তখনকার পরিবেশও ছিল উল্লেখ করার মতো। সে সময়টাতে আগে-পরে ওই অঞ্চলে এক ঝাঁক কৃতী বাউল-গীতিকার ও শিল্পীর আবির্ভাব ঘটেছিল। রশিদ উদ্দিন, উকিল মুনশি, চান খাঁ পাঠান, তৈয়ব আলী, মিরাজ আলী, দুলু খাঁ, আবেদ আলী, উমেদ আলী, আবদুল মজিদ তালুকদার, আবদুস সাত্তার, খেলু মিয়া, ইদ্রিস মিয়া, আলী হোসেন সরকার, চান মিয়া, জমশেদ উদ্দিন এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
সেই পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন জালাল উদ্দীন খাঁ। পুরোদস্তর গৃহী হলেও জীবন-যাপনে ছিল বাউলিয়ানার ছাপ। এ-রকম একটা বর্ণনা যতীন সরকারের কথায় পাই, ‘তাঁর (জালাল উদ্দীন খাঁ) বসার ঘরটি তিনি তৈরি করেছিলেন বাউলসাধকদের দেহতত্ত্বের বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে। সেই-যে লালনের গানে আছে ‘আট কুঠুরি নয় দরোজা আঁটা, মধ্যে মধ্যে ঝল্কা কাটা। তার ভিতরে সদর কোঠা, আয়নামহল তায়’-এই নকশার অনুসরণেই যেন জালালের গোলাকৃতি ঘরটি ছিল আট কোনাবিশিষ্ট, এর ছিল আটটি চাল আর নয়টি দরজা-জানালা। […] জালাল খাঁ-র যাপিত জীবন ও জীবনদর্শন-এই দুয়ের মধ্যে কোনো অনৈক্য বা বৈপরীত্য ছিল না। তাঁর কবিতাচর্চা তথা সংগীত-সাধনাও ছিল তাঁর যাপিত জীবন ও জীবনদর্শনের সঙ্গে একইসূত্রে গাঁথা। আর এ-সবের সঙ্গেই জড়িত-মিশ্রিত ছিল লোকায়ত ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার।’
জালাল উদ্দীন খাঁর গানগুলো এখনও নেত্রকোনা-সিলেটে অঞ্চলের বাউল-গায়কেরা গেয়ে থাকেন। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের শিল্পীরাও কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন তাঁর গান। বেশ কয়েক বছর আগে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে বাউল গীতিকার বশিরউদ্দিন সরকারের একটি গানের সংকলনের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে সেদিন এক তরুণ বাউলশিল্পী গাইছিলেন জালাল উদ্দীন খাঁর সেই বহুল প্রচলিত গানটি :
দেহ জমি পতিত রইল আবাদ করিল না
খাসমহালের খাজনা বাকি জীবনে আর শোধ হলো না।
পঞ্চ তত্ত্ব চিনো রে মন মাটির নিচে আছে রতন
যার ধন তারে দিয়ে ওয়াশিল করো বাকি দেনা।
ভক্তি আর বিশ্বাসের বলে এই ভূমিতে বীজ বুনিলে
গুরু গোঁসাইর কৃপা হলে সহজেতেই ফলবে সোনা।
আসিলে সদরের আমিন শ্রীগুরু হইবে জামিন
না হলে আর শেষের দিন উপায় কিছুই দেখি না।
ছোটা খাইয়া মোটা হইয়া বলদ গেছে জোয়াল ভাঙিয়া
ডাকলে নাহি চায় ফিরিয়া দৌঁড়াইলেও আর ধরা দেয় না।
গানটি শুনতে শুনতে আমি অন্য এক জগতে আবিষ্ট হই। আহা, কী উচ্চারণ : ‘দেহ জমি পতিত রইল আবাদ করিল না। খাসমহালের খাজনা বাকি জীবনে আর শোধ হলো না।’
