আপন চিনিলে দেখো খোদা চিনা যায় – সুমনকুমার দাশ
আপন চিনিলে দেখো খোদা চিনা যায়
It is a village poet of East Bengal who in his songs preaches the Philosophical Doctrine that the universe has its reality in its relation to the person. He sings,
The sky and the earth are born of my own eyes
The hardness and softness, the cold and the heat
Are the products of mine own body;
The sweet smell and the bad are of my own nose.
The poet sings of the Eternal person within him coming out and apearing before his eyes just as the vedic Rishi speaks of the person, who in him, dwelling also in the heart of the Sun.
I have seen the vision
The vision of mine own revealing itself,
coming out from within me.
The significant fact about these philosophical poems is that they are of rude construction, written in a popular dialect and disclaimed by the academic literature; they are sung to the people.
হাসন রাজার গানের দার্শনিকতা নিয়ে উপর্যুক্ত মন্তব্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। ১৯২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর Indian Philosophical Congress-এর একটি অধিবেশনে সভাপতির অভিভাষণে তিনি এ মন্তব্য করেছিলেন। পরের বছরের জানুয়ারি মাসে ভাষণটি Modern Review পত্রিকায় ‘The Philosophy of Our People’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়।
এরপর কবিগুরু ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ডের ম্যানচেস্টার কলেজে ‘হিবার্ট লেকচারে’ ‘The Religion of Man’। সেই বক্তৃতায় তিনি হাসন রাজার গানের দর্শন বিশ্লেষণ করে তাঁকে সুপরিচিত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিশিষ্ট রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ অভিতাভ চৌধুরীর একটি মন্তব্য উল্লেখ করছি :
[…] রবীন্দ্রনাথ হাসন রাজার গান সম্পর্কে অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। বিশের দশকের গোড়ায় তিনি হাসন রাজা সম্পর্কে পরিচিত হন এবং তাঁর বহু রচনা তিনি পাঠ করেন। […] একটি কবিতা বা গান সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথকে আলোড়িত করে। সেটি হল-‘মম আঁখি হইতে পয়দা আসমান জমিন,। কর্ণ হইতে পয়দা হৈছে মুসলমানি দিন,। আর পয়দা করিল যে শুনিবারে যত,। শব্দ সাজ আওয়াজ ইত্যাদি যে কত।। শরীরে করিল পয়দা শক্ত আর নরম। আর পয়দা করিয়াছে ঠান্ডা আর গরম।। নাকে করিয়াছে পয়দা খুসবয় বদবয়। …’। এই কবিতাটির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ পরে লেখেন শ্যামলী কাব্যগ্রন্থের ‘আমি’ নামক বিখ্যাত সেই কবিতা-‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ, চুনি উঠল রাঙা হয়ে’। আরও বেশ কিছু কবিতায় হাসন রাজার ভাবের প্রকাশ আছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাসন রাজার যে গানটি পাঠ করে মুগ্ধ হয়ে সেটার অনুকরণে কবিতা পর্যন্ত লিখে ফেলেছিলেন, সেই গানটি প্রসঙ্গে কবিগুরু আরও বলেছিলেন, ‘শাশ্বত পুরুষ তাঁহারই (হাসন রাজা) ভিতর হইতে বাহির হইয়া তাঁহার নয়নপথে আবির্ভূত হইলেন।’
হাসন রাজার এ গানটি ছাড়া আরও কয়েকটি গানে অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ বেশ কয়েকটি কবিতা রচনা করেছিলেন। লেখক পান্নালাল রায় গোমতি পত্রিকায় প্রকাশিত ১৪১১ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ-আশ্বিন সংখ্যার মুকুলকুমার ঘোষের প্রবন্ধের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন :
হাসন রাজা গেয়েছেন-
আপন চিনিলে দেখ খোদা চিনা যায়,
হাসন রাজা আপন চিনিয়ে এই গান গায়।
আবার রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-
আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না,
এই জানারই সঙ্গে সঙ্গে তোমায় চেনা।
অনুরূপভাবে গান রাজার গান রয়েছে-
রূপ দেখিলাম রে নয়নে
আপনার রূপ দেখিলাম রে,
আমার মাঝত বাহির হইয়া দেখা দিলো আমারে।
রবীন্দ্রনাথের কবিতাতেও ঘটেছে এই ভাবের প্রকাশ-
আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া
বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।
এইভাবে রবীন্দ্রনাথের কিছু কবিতার সঙ্গে হাসন রাজার দর্শনতত্ত্বের গানের ভাবগত এক সাদৃশ্য লক্ষ করেছেন গবেষকগণ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই হাসন-প্রীতির কারণেই হাসন রাজা অতি সহজে বাংলাভাষী বোদ্ধা ও গবেষকদের নজরে আসেন-এটা অন্তত এক বাক্যে বলা যায়। তবে সিলেট অঞ্চলের মানুষের কাছে তাঁর গানের মাধুর্য ছড়িয়ে পড়েছিল এরও অনেক আগে থেকে। সৈয়দ মুর্তাজা আলী বলেছিলেন, ‘হাসন রাজার গান শুধু সরল পল্লিবাসীদের মোহিত করেনি, রবীন্দ্রনাথ এই অজ্ঞাত পল্লিকবির একটি গান বারানসীতে অনুষ্ঠিত ভারতীয় দর্শন কংগ্রেসের সভাপতির ভাষণে প্রশংসার সহিত উদ্ধৃত করেন। পরে বিলাতে হিবার্ট লেকচারেও এই গানটির উল্লেখ করেন।’
মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন এক লেখায় লিখেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ হাসন রাজাকে জগদ্বিখ্যাত করিয়াছেন। […] তিনি যেমন লালন শাহকে আবিষ্কার করিয়াছেন এবং প্রচার করিয়াছেন, তেমনই হাসন রাজাকেও করিয়াছেন।’ তবে মনসুরউদ্দীন এও জানিয়েছিলেন, ‘তাঁহার (হাসন রাজা) গান সিলেটী গ্রাম্যগান পর্যায়ভুক্ত হইয়া গিয়াছে; লোকমুখে এবং একতারার সুরে হাটে-মাঠে-ঘাটে সর্বত্র গীত হয়।’
প্রভাতচন্দ্র গুপ্তের মতে, ‘লালন ফকির গেয়েছেন অচিন পাখির কথা, আর হাসন রাজা গেয়েছেন তাঁর মনের মুনিয়া পাখির কথা। […] রবীন্দ্রনাথ হাসন রাজার গানের ভিতরে ভারতীয় দর্শনের একটি বড় তত্ত্ব পেয়েছেন। আবার অনেকে এতে সুফী মতবাদের সন্ধানও পেয়েছেন। সুফীরা জীবাত্মাকে পরমাত্মার সাথে অভিন্ন জ্ঞান করে। আর তাঁদের মাধ্যমেই ঐ ভাব ইউরোপে এসেছে। তারা বলে আন্ আল্ হক অর্থাৎ আমিই সেই সত্যস্বরূপ।’ তিনি ওই লেখায় লিখেছিলেন, ‘১৯২৫ সালে হাসন রাজার কবিতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ যখন প্রথম উল্লেখ করলেন তাঁর ভাষণে তখনই সুধী সমাজের দৃষ্টি পড়ল তাঁর দিকে এবং লোকের আগ্রহ বাড়ল তাঁর গান সম্পর্কে।’
হাসন রাজার গান সম্পর্কে একেক জন একেক কথা বলেছেন, তবে অধিকাংশই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন, এই অজ্ঞাত পল্লিকবির গানকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপস্থাপন করেছেন বলেই হাসন রাজা বিপুল পরিচিতি পেয়েছেন এবং এই কথা আমাদের বোদ্ধামহলে দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত রয়েছে। তবে এটাও প্রচলিত রয়েছে যে-হাসন রাজার গান বাঙালির দর্শনচেতনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর গানের দর্শন প্রসঙ্গে প্রভাতচন্দ্র গুপ্তের উক্তিই প্রাণিধানযোগ্য :
হাসন রাজাও ভারতবর্ষের মানসতীর্থ রচনার সাধক। আল্লা আর কানাইর মধ্যে তাঁর কাছে কোনো ভেদাভেদ জ্ঞান ছিল না। কখনও করেন তিনি আল্লার সঙ্গ কামনা-
আমি যাইমু রে যাইমু রে
আল্লার সঙ্গে।
ও আমি যাইমু রে যাইমু রে
আল্লার সঙ্গে।
আবার কখনও তিনি আকুল হয়ে ডাকছেন কানাইকে-
দয়াল কানাই, দয়াল কানাই রে
পার করিয়া দাও কাঙালি রে।
ভবসিন্ধু পার হইবার
পয়সাকড়ি নাই।
দয়া করিয়া পার করিয়া দাও
বাড়ি চলে যাই।
মুসলমানের ‘আল্লা’ ও হিন্দুর ‘কানাই’র মধ্যে কোনো তফাৎ তাঁর কাছে ছিল না, একই উপাস্য দেবতার দুই বিভিন্ন রূপ যেন তিনি তাঁদের মধ্যে দেখেছেন।
বস্তুত নিখিল মানুষের যে জাত, হাসন রাজা সেই জাতের মানুষ। কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের বিশেষ জাতিতে, বিশেষ বংশে জন্মগ্রহণ করলেও সেই ক্ষুদ্র গন্ডি কখনও তাঁদের সংকীর্ণ পরিধিতে আবদ্ধ রাখতে পারে না, মানুষমাত্রের সঙ্গেই থাকে তাঁদের সহজসরল স্বজাত্যবোধ।
[…] রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার মধ্যে যে শাশ্বত প্রেমের আকুতি প্রকাশ পেয়েছে, হাসন রাজাকে তা মুগ্ধ করেছিল, হোক না সে হিন্দুর ধ্যান-ধারণা। এই সাম্প্রদায়িকতাবোধ তাঁকে স্পর্শ করত না, এ কথা আমরা আগেই বলেছি। আবার কেউ কেউ বলেছেন-‘তাঁর হিন্দু পূর্বপুরুষের ধ্যান-ধারণা হাসন রাজার কাব্যে পাওয়া যায়।’ অন্য এক দল ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাঁরা বলেন, সিলেটের রাধারমণ দত্ত ছিলেন একজন বৈষ্ণব সাধক ও কবি এবং হাসন রাজার অন্তরঙ্গ বন্ধু। হাসন রাজার গানে রাধারমণের প্রভাব কিছুটা ছায়াপাত করা অস্বাভাবিক নয়।
[…] হাসন রাজার পল্লিগীতি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা ইতিমধ্যে পাঠকের জন্মে থাকতে পারে। তাঁর গানের মূল সুর হল ভগবৎপ্রেম ও সেই প্রেমাস্পদ পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের তীব্র আকাক্সক্ষা। তাঁর জীবন ছিল গৃহীর জীবন, গার্হস্থ্যধর্মকে এড়িয়ে বৈরাগী, ব্রহ্মচারী হয়ে মঠে-মসজিদে ফকির-দরবেশের জীবনকে তিনি বরণ করেন নি। পাঁকের ভিতরে থাকলেও পাঁকাল মাছের পাঁক লাগে না, জলে ডুবে ডুবে হাঁসের গায়ে যে ছিটেফোঁটা জল লেগে থাকে, ডানা ঝাপটিয়ে অনায়াসে সেই জলের স্পর্শকে সে ঝেড়ে ফেলে দিতে পারে গা থেকে। হাসন রাজাও তেমনই সংসারের ভোগ-বিলাসের মধ্যে বাস করেও ভোগবিলাসের বাসনা কামনা থেকে নিজের মনকে মুক্ত রাখতে চেয়েছেন। কঠিন দুশ্চর এই সাধনা, অতন্ত্র প্রহরীর মতো এই নির্লিপ্ত, এই নিরাসক্তির সাধনাকে তিনি যে অন্তরে সদাজাগ্রত রাখতে নিরত ছিলেন তারই নিদর্শন তাঁর গানে। […]
[…] তাঁর গানে আছে হতাশ্বাসের রোদন, কিন্তু কখনও কখনও আবার তিনি ভগবৎপ্রেমে বিভোর হয়ে পড়েন। তখন তিনি পরমেশ্বরকে ভজনা করেন নানাভাবে-তাঁকে ডাকেন পিয়ারী, প্রাণ, জান, প্রিয়া বা মনমোহিনী বলে, কখনও তাঁকে দেখেন বন্ধুরূপে, আবার কখনও তাঁকে ডাকেন মা বলে। যেভাবেই দেখুন, পরমেশ্বরকে তিনি কখনও পর বলে ভাবেন নি, হৃদয়ের উত্তাপ দিয়ে তাঁর সঙ্গে তিনি প্রেমের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। আশেক বা প্রেমিকরূপেই তিনি ভগবানের ভজনা করেছেন প্রধানত এবং পূর্বরাগ, অভিসার, বিরহ, মিলন প্রভৃতি প্রেমের বিভিন্ন ও বিচিত্র অনুভূতিকে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর গানে। […]
.পন্ডিত ক্ষিতিমোহন সেন তাঁর বাংলার বাউল গ্রন্থে লিখেছিলেন, ‘এই গানে ব্যক্ত মনোভাবই হচ্ছে বাউলদের মূলমন্ত্র। সেই মতে আমার সর্বচরাচর এসেছে আমার “আমি” থেকে, আমার মনের মানুষ বা পুরুষ থেকে। ঋক্বেদেও এই ভাবের প্রকাশ আছে। তাকে বলা হয়েছে পুরুষ-মুক্ত। মরমিয়া বাউলকবিদের-যেমন হাসন রাজা-অনেক গানে একই ভাবের রূপ দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন রূপকের মাধ্যমে।’ এভাবে হাসন রাজাকে নিজেদের মতো করে প্রাজ্ঞজনেরা মূল্যায়ন করেছেন। তাঁর গান আমাদের হৃদয়ের গভীরে চিন্তার খোরাক জোগায়, অন্যরকম ভাবনার দ্যোতনা সৃষ্টি করে। হাসনের প্রায় গান পাঠে আমাদের মরমি-ভাবনা উচকে উঠে। তাঁর অসংখ্য গানের মধ্যে এ-রকম একটি গান আমাকে প্রায়শই আচ্ছন্ন করে রাখে :
একদিন তোর হইবে রে মরণ রে হাসন রাজা
একদিন তোর হইবে রে মরণ।
মায়াজালে বেড়িয়ে মরণ, না হইলে স্মরণ রে, হাসন রাজা।
একদিন তোর হইবে রে মরণ।
যখন আসবে যমের দূত, হাতে দিবে দড়ি।
টানিয়া টানিয়া লইয়া যাবে, যমেরও পুরি রে।
কোথায় গিয়া রইব (তোমার) সুন্দর সুন্দর স্ত্রীরি।
কোথায় রইব রামপাশা আর কোথায় লক্ষণছিরি রে।
করবায়নি রে হাসন রাজা রামপাশায় জমিদারি।
করবায়নি রে কাপ্না নদীরে পাড়ে ঘুরাঘুরি রে।
(আর) যাইবায়নি রে হাসন রাজা, রাজাগঞ্জ দিয়া।
করবায়নি রে হাসন রাজা দেশে দেশে বিয়া রে।
ছাড়ো ছাড়ো হাসন রাজা, এই ভবের আশা।
প্রাণবন্ধের চরণ তলে, করো গিয়া বাসা রে।
গুরুর উপদেশ শুনিয়া, হাসন রাজা কয়।
সব তেয়াগিলাম আমি, দেও পদাশ্রয় রে।
এই গান মনের গভীরে দ্যোতনা তোলে, নিমিষেই মৃত্যুচিন্তা প্রকট হয়ে ওঠে। নৃপেন্দ্রলাল দাশ এ গান প্রসঙ্গে তাঁর হাসন রাজা শব্দ নৈঃশব্দ বইয়ে লিখেছিলেন, ‘মৃত্যু নামক বর্বর লক্ষ্মীশ্রী থেকে নিয়ে যাবে-এই সমূহ বিচ্ছেদ ভয় কবিকে সবচেয়ে উতলা করে। এখানে মৃত্যুর ভয়াবহতা মুখ্য নয়; মুখ্য হচ্ছে তাঁর লক্ষ্মীশ্রীর নিড়ভাঙা বেদনার নিবিড়তা।’ শুধু কী হাসন রাজারই এমন চিন্তা? এটা কী সামষ্টিক অর্থ বহন করছে না? একদিন তোর হইবে রে মরণ-এ পঙ্ক্তি কী আমাদের সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়?
হাসন রাজার গানে এ ধরনের অসংখ্য সহজসরল উক্তি আমাদের মনের গভীরে দাগ কাটে। সময়ে-অসময়ে তাই গুনগুন করে বেরিয়ে আসে-‘মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়া রে’, ‘লোকে বলে, লোকে বলে রে, ঘরবাড়ি ভালা নায় আমার’, ‘আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে’, ‘ছাড়িলাম হাসনের নাও রে’, ‘সোনা বন্ধে আমারে দেওয়ানা বানাইল’, ‘আগুন লাগাইয়া দিলো কোনে, হাসন রাজার মনে’, ‘নিশা লাগিল রে, বাঁকা দুই নয়নে নিশা লাগিল রে’, ‘বাউলা কে বানাইল রে হাসন রাজারে। বাউলা কে বানাইল রে’ প্রভৃতি। উল্লিখিত গানগুলোর মধ্যে ‘মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়া রে’ গানটি নিয়ে লালনের একটি গানের সঙ্গে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন লালন গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী। তিনি লালন ও হাসন রাজার দুটি গানের ভাবার্থ নিয়ে আলোচনার সূত্রে লিখেছিলেন :
লালন সাঁইয়ের মতো হাসন রাজাকে নিয়েও ভিন্নমত আছে-আছে নানা কিংবদন্তি। হাসন রাজার মত ও পথ নিয়েও বিতর্ক আছে। তিনি বাউল না সুফী, নিরীশ্বরবাদী না সর্বেশ্বরবাদী-এসব কূটতর্কের মীমাংসা সহজ নয়। তবে এসব তর্ক ছাপিয়ে হাসনের বড়ো পরিচয় সঙ্গীতকার হিসেবে-মরমি কবি হিসেবে। সংগীতই ছিল তাঁর জীবনবেদ।
[…] সকল মরমি গানের মধ্যেই একটি অভিন্ন সুর ধ্বনিত হয়। পথ যাই হোক, লক্ষ্য এক; চেতনাও তাই একসূত্রে বাঁধা। লালনের ‘অচিন পাখি’-ই হাসনের ‘ময়না পাখি’। এই রূপকের আড়ালে সাধনার গূঢ় তত্ত্বই প্রকাশ পেয়েছে। লালন বলেছেন :
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়।
ধরতে পারলে মন-বেড়ি দিতাম তাহার পায়।
প্রেমিক হাসনও বলেছেন :
মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়া রে
কান্দে হাসন রাজার মন-মনিয়া রে।
বিত্ত কই হাসনের যে মুক্তি-পণ দেবে! ভব-কারাগারে বন্দি হাসন রাজা তাই ব্যাকুল সুরে বলে :
মায়ে বাপে বন্দি কইলা খুশীর মাঝারে
লালে ধলায় বন্দি হইলাম পিঞ্জিরার মাঝারে।
এই ‘পিঞ্জিরা’ ভাঙার প্রয়াস ও আকুতিই মরমি সাধনা ও সংগীতের মূল বিষয়; তার প্রাণের কথা।
হাসন রাজার গানে ‘মাটির পিঞ্জিরা’, ‘মন-মনিয়া’, ‘লাল’, ‘ধলা’, ‘বন্দি’ শব্দগুলো রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলোর নিগূঢ় অর্থ ভিন্ন। তিনি তাঁর পূর্বসূরি লালনের মতোই সাধনার নিগূঢ়তত্ত্বগুলো রূপকতার আশ্রয় নিয়ে সার্থকভাবে উপস্থাপন করেছেন। ফলে সাধারণভাবে হাসন রাজার গানগুলো লক্ষ্য করলে ওই ব্যাপারটা তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। আর এখানেই তাঁর সফলতা। ‘ভাষার সরলতায়, ভাবের গভীরতায় ও সুরের দরদে’ হাসন রাজার গান সকলকে মুগ্ধ করে।
হাসন রাজার গান প্রসঙ্গে রনজিৎকুমার সেন লিখেছিলেন, ‘বৌদ্ধ সিদ্ধাগণের উত্তর-পুরুষ হচ্ছেন বাংলার বাউল সম্প্রদায়। দেওয়ান হাসন রাজা এই বাউল সম্প্রদায়েরই একজন অন্যতম সাধক। বাউলেরা এই গীতিমার্গের মধ্য দিয়েই আত্মমুক্তির সহজ পথ সন্ধান করে থাকেন। এঁদের মধ্যে লালন শাহ, ঈলাল শাহ, ভানু শাহ, ভোলা শাহ, শেখ মদন, তিনু ফকির, পাগলা কানাই, শিতালং শাহ, ইব্রাহিম তশ্না প্রভৃতির নামও এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। দেওয়ান হাসন রাজা ছিলেন এঁদেরই সমগোত্র। কিন্তু সমগোত্র হয়েও যে বিশেষগুণে তিনি এঁদের থেকে স্বতন্ত্র ছিলেন, তা হচ্ছে তাঁর বাউলরীতির মধ্যেও আত্মদর্শনের শ্রেয়তা।’ একই লেখায় রনজিৎকুমার সেন লিখেছিলেন :
যে গীতিকাব্যে হাসন রাজা বলেছেন-
আমি হইতে আল্লাহ রসুল, আমি হইতে কুল।
পাগলা হাসন রাজা বলে, তাতে নাই রে ভুল।
তার মধ্যে দেওয়ানের সেই আত্মদর্শনের পরিচয়টি আমরা বড় করে পাই। মদন বাউল বা পাগলা কানাই কিন্তু এ স্তর পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছাতে পারেননি। মদন বাউলের ‘নিঠুর গরজী তুই, মানস-মুকুল ভাজবি আগুনে’, অথবা-
তোমার পথ ঢাক্যাছে মন্দিরে মসজিদে।
ও তোর ডাক শুনে সাঁই চলতে না পাই,
আমার রুখে দাঁড়ায় গুরুতে মুরশেদে। […]
এই পদগুলো ভক্তিমূলক আইডিয়ার দিক থেকে ভাব-বন্যায় পরিপ্লাবিত হয়ে গেলেও দেওয়ানের মতো নিজেকে বিশ্বনিয়ন্তা পরম পুরুষের সঙ্গে একীভূত করে নিতে পারেনি। এখানেই দেওয়ান হাসন রাজার বিশেষত্ব।
তাঁর গানের তাত্ত্বিকতার মতন হাসন রাজার ব্যক্তি চরিত্রও ছিল আকষর্ণীয়, বহুবর্ণিল। তার কিছু চিত্র আমরা পাই প্রভাতকুমার শর্মার ‘মরমি কবি হাসন রাজা’ শিরোনামের লেখায়। তিনি লিখেছেন, ‘উদারতা হাসন রাজা সাহেবের একটি বিশিষ্ট গুণ ছিল। মল্লিকপুরের জমিদার গোবিন্দবাবুর সঙ্গে জমিদারি লইয়া তাঁহার বিবাদের অন্ত ছিল না। কিন্তু উভয়ের মধ্যে সৌহার্দ্যরে অভাব ছিল না। আদালতে মোকদ্দমা হইতেছে, এদিকে দুইজনে বসিয়া খোশগল্প করিতেছেন-এই প্রকার কথা আমরা শুনিয়াছি। উত্তরকালে গোবিন্দবাবুর অবস্থা খারাপ হইয়া পড়িলে তিনি তাঁহাকে সাহায্যও করিয়াছিলেন। মহাভারতে পড়িয়াছি দিনে যুদ্ধ হইত রাত্রে একদল গিয়া অপর দলের নিকট মন্ত্রণা চাহিতেন। এখানেও আমরা সেই জাতীয় একটি জিনিস দেখিতে পাই।’ ওই লেখক আলোচ্য লেখায় আরেকটি ঘটনার বিবরণ এভাবেই দিয়েছেন :
তাঁহার সম্বন্ধে অন্য যে একটি গল্প আছে তাহা আরও উদারতার পরিচায়ক। আয়াতউল্লা নামীয় জনৈক লোক মিথ্যা মোকদ্দমা করিয়া তাঁহাকে বিপন্ন করে, কিন্তু ভগবানের কৃপায় তিনি পরে মুক্তিলাভ করেন। অবশেষে একসময় আসে যখন আয়াতের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হইয়া পড়ে। দিনান্তে দুইটি অন্ন মুখে দিবার সংস্থানও তাহার ছিল না। এই সংবাদ পাইয়া হাসন রাজা সাহেব তৎক্ষণাৎ তাহাকে প্রচুর অর্থ দান করেন। শুধু তাহাই নহে, আয়াতের মৃত্যু পর্যন্ত তিনি তাহাকে নিজ ব্যয়ে প্রতিপালন করিয়াছিলেন। ইহা কোন উষ্ণ মস্তিষ্কের খেয়াল নহে, এবং এই উদারতা নীতিশাস্ত্র পড়িয়া অর্জিত হয় নাই। যে স্থলে তিনি গলা টিপিয়া মারিয়া প্রতিশোধ নিতে পারিতেন সে স্থলে ক্ষমা প্রদর্শনই তাঁহার বাস্তবিক ক্ষমাগুণের পরিচায়ক।
নিজে যেহেতু জমিদারবংশের সন্তান ছিলেন, স্বাভাবিকভাবেই পূর্বপুরুষদের রীতি তিনিও পরিত্যাগ করতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে লেখক নৃপেন্দ্রলাল দাশ লিখেছিলেন :
সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন বলেই হয়ত হাসন রাজা কোড়া শিকার করাকে অন্যতম সৌখিন কাজ রূপে বেছে নিয়েছিলেন। ভাটিঅঞ্চলে এই পাখিটিও সহজলভ্য। কোড়া শিকার একটি সুপ্রাচীন প্রথাও। রাজা-বাদশাহ্রা পুরাকালে মৃগয়ায় যেতেন। এখানে ‘মৃগয়া’ অর্থে যাবতীয় বন্যপ্রাণী বোঝাচ্ছে কেবলমাত্র হরিণ নয়। হাসন রাজার কোড়া শিকারও তাই একটি সামন্তরীতি বলে ধরে নেয়া যায়। তার উত্তর জীবনের সাথে যদিও এই ধরনের কাজের কোনো সঙ্গতি নেই। যিনি একজন মরমী কবি হিসেবে সর্বত্র নন্দিত তাঁর এই স্থুলতর শিকারি অভিজ্ঞতা যেন অংকে মেলে না। তবু এটি কৌতুকাবহ সংবাদ।
হাসন রাজার কোড়া পাখি শিকার কিংবা নারীদের প্রতি ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। কিন্তু তাঁর গান নিয়ে কোনও মতবিরোধ কিংবা সমালোচনা নেই বললেই চলে। এটা অন্তত প্রত্যেকেই এক বাক্যে স্বীকার করেন যে, তাঁর গান বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধারণ করে আছে। এসব গান আমাদের সত্তাকে নাড়া দেয়, অনুপ্রাণিত করে। জমিদার বংশের চাকচিক্যময় জীবনযাপনের মোহ ত্যাগ করে যেভাবে হাসন রাজা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে জীবনকে উপলব্ধি করেছেন-সেটা নিয়ে স্তুতিবাক্যও তো কম লেখা হয়নি!
হাসন রাজার গান নিয়ে স্তুতিবাক্য কিংবা উচ্ছ্বাসিত মূল্যায়ন অবশ্যই প্রাপ্য। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর গানের প্রেমে পড়ি সেই ছোটোবেলা থেকে। তখন সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার শাহীদ আলী পাবলিক পাইলট দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ে পড়তাম। কালীপদ রায় নামে আমাদের এক বড়ো ভাই বিভিন্ন গানের অনুষ্ঠানে একটা গান বার বার গাইতেন। এই গানটি তখন এত বেশি শুনেছি যে-আমি ও আমার বন্ধুবান্ধবেরা প্রায় সবাই ওই গানটি মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। হাঁটতে, বসতে, খেলতে প্রায়সময় আমরা হাসন রাজার লেখা এই গানটি গুনগুন করে গাইতাম :
আঁখি মুঞ্জিয়া দেখো রূপ রে, আঁখি মুঞ্জিয়া দেখো রূপ রে।
আরে দিলের চক্ষে চাহিয়া দেখো বন্ধুয়ার স্বরূপ রে।
কাজল কোঠা ঘরের মাঝে, বসিয়াছে কালিয়া।
দেখিয়া প্রেমের আগুন উঠিল জ্বালিয়া।
কিবা শোভা ধরে (ওরে) রূপে দেখতে চমৎকার।
(আরে) বলা নাহি যায় বন্ধের রূপের বাহার।
ঝলমল ঝলমল করে (ওরে) রূপে বিজলির আকার।
মনুষ্যের কি শক্তি আছে, চক্ষু ধরিবার।
হাসন রাজায় রূপ দেখিলা, হইয়া ফানাফিল্লা।
হু হু হু হু ইয়াহু, ইয়াহু, বল আল্লা আল্লা।
পরবর্তীকালে যখন কলেজে ভর্তি হই তখন বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাসহ নানা অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শিল্পীর মুখে হাসন রাজার একাধিক গান শুনেছি। আরও পরে বাউল-ফকিরদের সঙ্গে সম্পর্কের সূত্র ধরে হাসন রাজার গান শুনে কত যে রাত কাটিয়েছি, তার সঠিক হিসেব নেই। আমার শোনা অসংখ্য গানের মধ্যে আরও একটি গানের কথা উল্লেখ করতেই হচ্ছে। অন্য অনেকের মতো এই গানটি আমি যতবার শুনেছি, ততবারই মুগ্ধ হয়েছি। সুর আর কথার কী অপূর্ব সম্মিলন! শুনলেই মন আনচান করে:
লোকে বলে, লোকে বলে রে, ঘরবাড়ি ভালা নায় আমার।
কি ঘর বানাইব আমি শুন্যের মাঝার।
ভালা করি ঘর বানাইয়া কয়দিন থাকব আর।
আয়না দিয়া চাইয়া দেখি পাকনা চুল আমার।
এই ভাবিয়া হাসন রাজায় ঘরদুয়ার না বান্ধে।
কোথায় নিয়া রাখবা আল্লায় এর লাগিয়া কান্দে।
হাসন রাজায় বুঝতো যদি বাঁচব কতদিন।
দালানকোঠা বানাইত করিয়া রঙিন।
‘লোকে বলে, লোকে বলে রে, ঘরবাড়ি ভালা নায় আমার’ গানটি প্রসঙ্গে প্রভাতকুমার শর্মা লিখেছিলেন, ‘বিদেশে দালানকোঠা তৈরি করিয়া কি হইবে? শূন্যের মধ্যে রাজপ্রসাদ নির্মাণ করিয়া কি লাভ? হঠাৎ কোনদিন এই দেশ ছাড়িয়া চলিয়া যাইব কে জানে? যদি জানিতাম এখানে কয়দিন থাকিব, তবে সুন্দর প্রাসাদ তৈরি করিতাম। কিন্তু হায়! জীবন যে অনিশ্চিত! তাসের ঘরের মতো কখন যে ভূমিসাৎ হইবে কে জানে? আয়নায় চাহিয়া যে দেখি আমার চুল পাকিয়া গিয়াছে! কানের কাছে যে ঘণ্টা বাজিয়াছে, আর ত দেরি নাই!’
প্রয়াত জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ একই গান প্রসঙ্গে ২০১১ সালের ১৪ এপ্রিল প্রথম আলোয় ‘বাউলা কে বানাইলো রে’ শিরোনামে এক লেখায় লিখেছিলেন : ‘হাসন রাজার বিখ্যাত গান লোকে বলে, বলে রে, ঘরবাড়ি ভালা নায় আমার শুনলে কারো কারো তাঁর ঘরবাড়ি দেখার ইচ্ছা হতে পারে। এমন কিছু মানুষ গেলেন হাসন রাজার ঘরবাড়ি দেখতে। হাসন রাজা নিজেই আগ্রহী হয়ে তাদের ঘরবাড়ি দেখাতে নিয়ে গেলেন। নিজের কবরের জায়গা দেখিয়ে বললেন, এই দেখুন আমার বাড়ি। ঘটনা কতটুকু সত্যি জানি না। প্রভাতকুমার শর্মার লেখা “মরমি কবি হাসন রাজা”য় এ রকম পড়েছি। সুনামগঞ্জে গিয়ে সেই বিখ্যাত ‘ঘর’ দেখেও এসেছি।’ একই লেখায় হুমায়ূন লিখেছিলেন :
হাসন রাজার প্রতি আমার প্রবল আগ্রহের শুরুটা তেরো-চোদ্দো বছরের এক কিশোরী। আমি গিয়েছি হবিগঞ্জে কী একটা অনুষ্ঠানে। শেষ রাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে ঘুমুতে গেছি। ঠিক করে রেখেছি দুপুর পর্যন্ত ঘুমুব। ভোর ছয়টায় এসে এই মেয়েটা ঘুম ভাঙাল। সে একটা হারমোনিয়াম নিয়ে এসেছে। হারমোনিয়াম বাজিয়ে আমাকে গান শোনাবে। কাঁচা ঘুম ভাঙানোর জন্য তাকে ধমক দিতে গিয়েও পারলাম না। মেয়েটার চোখ করুণ, চেহারায় গাঢ় বিষন্নতা। আমি বললাম, শোনাও তোমার গান। একটা শোনাবে, এর বেশি না।
সে গাইলো, ‘নিশা লাগিলো রে, বাঁকা দুই নয়নে নিশা লাগিলো রে।’ কী সুন্দর বাণী! কী সরল সুর। আমি বললাম এই গানটা কার লেখা?
হাসন রাজার।
উনার আর কোনো গান তুমি জানো? জানলে গাও।
আর জানি না।
আমি ঢাকায় ফিরলাম। অচিনবৃক্ষ নাটকে গানটি ব্যবহার করলাম।
তারপর ডেকে পাঠালাম সেলিম চৌধুরীকে। সে মহসিন হলের ছাত্র। আমি তার হলের হাউস টিউটর। সেলিমকে বললাম, তোমার দায়িত্ব হচ্ছে হাসন রাজার গান সংগ্রহ করে আমাকে শোনানো।
সপ্তাহে দুদিন আমার বাসায় গানের আসর বসে। সেলিম চৌধুরী হাসন রাজার গান গায়। সে তখনো বিখ্যাত হয়নি। তাকে ডাকলেই পাওয়া যায়। প্রতি জোসনায় নুহাশপল্লিতে জোসনা উৎসব করি। সেখানেও হাসন রাজার একটি বিশেষ গান দিয়ে উৎসবের শুরু হয়। […]
একদিন হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় হাসন রাজার গানের সিডি বের করার সিদ্ধান্ত নিই। তাঁর চমৎকার সব গান একবারেই গীত হয় না। আমাদের বের করা সিডির কারণে গানগুলো সবাই শুনবে এ রকম আশা। সেই গান রেকর্ড করা, সিডি বের করা মানেই প্রচুর অর্থ ব্যয়। আমাকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করলেন আমার দুই বন্ধু প্রকাশক আলমগীর রহমান, আর্কিটেক্ট ফজলুল করিম। সেলিম চৌধুরীর গলায় রেকর্ড করা হলো। সিডি করা হলো ইংল্যান্ডে। দুঃখের ব্যাপার, সিডি খুব কম মানুষই কিনল। আমার তখন রোগ চেপে গেছে দেশের মানুষকে হাসন রাজার গান শুনতেই হবে। হাসির ধারাবাহিক নাটক লিখলাম, নাম ‘আজ রবিবার’। প্রতিটি পর্ব শেষ হলো হাসন রাজার বিভিন্ন গান দিয়ে। যেদিন এই নাটক শেষ হলো, আমার কাছে মনে হলো, এই দরদি কবির প্রতি আমার যে ঋণ, তা খানিকটা শোধ হয়েছে।
সৈয়দ মুর্তাজা আলী হাসন রাজাকে স্বচক্ষে দেখেছেন, তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি এক লেখায় লিখেছিলেন : ‘আমার ছেলেবেলায়-এই শতাব্দীর প্রথম দশকে-পিতার সঙ্গে হাসন রাজার বাড়ি গিয়েছি। তাঁর ঘরবাড়ি তাঁর সঙ্গতি অনুযায়ী সুগঠিত বা সুদৃশ্য ছিল না। আমার স্পষ্ট মনে আছে তাঁর বৈঠকখানার সংলগ্ন ছিল ঘোড়ার আস্তাবল। বৈঠকখানায় আসবাবপত্রের বাহুল্য ছিল না। এই কারণে কেউ কেউ তাঁর বাসগৃহ তাঁর বিত্তবৈভবের যোগ্য নয় বলে অনুযোগ করলে তিনি তাঁর সরল অনবদ্য ভাষায় বলেন-লোকে বলে, বলে রে, ঘরবাড়ি ভালা নায় আমার…।’ তিনি আরও লিখেছিলেন :
আমি তাঁকে (হাসন রাজা) দেখেছি সুনামগঞ্জ বাজারে। তিনি জমকালো জরি ও মখমলের পোষাক পরে ভ্রমণে বের হতেন। তাঁর বর্ণ ছিল তপ্ত কাঞ্চনসদৃশ। দীর্ঘ আয়ত চক্ষু, উন্নত নাসিকা ও প্রশস্ত ললাট তাঁর বদনমন্ডলের শোভা বর্ধন করত।
তাঁকে শেষবার দেখি ১৯২০ সালে তাঁর পুত্র একলিমুর রেজার শেখঘাটের বাসায়। তখন তাঁর বয়স ৬৬ বছর। এর দুবছর পরে-১৯২২ সালের নভেম্বর মাসে-তিনি মারা যান। আমি ও মরহুম আলতাফ হোসেন গিয়েছিলাম তাঁর কাছে আমাদের পাঠাগারের জন্য অর্থ সাহায্য প্রার্থনা করতে। তিনি তখন চিকিৎসার জন্য সিলেটে এসেছেন। তাঁকে শায়িত দেখলাম বিছানায়। সামান্য বাক্যালাপ হয়।
[…] ভাবের আবেগে সহজসরল ভাষায় রচিত তাঁর গান বাংলাদেশের পল্লিবাসীর হৃদয় আকর্ষণ করে। তারা হাসন রাজার গানে খোদার প্রেম ও বৈরাগ্যের সন্ধান পায়। আজও সিলেট জেলার অনেক সরল গ্রাম্য কৃষক তাঁর গান গেয়ে শ্রান্ত মনকে শান্ত করে। প্রায় দশ বছর আগে আমি হাসন রাজার স্মৃতি উৎসব উপলক্ষে সুনামগঞ্জ শহরে গিয়েছিলাম। তখন দেখেছি হাজার হাজার বিমুগ্ধ শ্রোতা সারারাত জেগে এই মরমি কবির বাউলগান শুনে তৃপ্তিলাভ করে। হাসন রাজা মারা গেছেন পঞ্চান্ন বছর আগে। কিন্তু তাঁর গান আজও অসংখ্য ভক্তগায়কের হৃদয়-মুকুরে উদ্ভাসিত।
এই লেখা সৈয়দ মুর্তাজা আলী সম্ভবত ১৯৭৭ সালে লিখেছিলেন। সেটা বেশ আগের লেখা। কিন্তু তাতে কী? এখনও সেই চিত্র গ্রামাঞ্চলে দেখা যায় কিংবা কোনও কোনও অঞ্চলে তারচেয়েও বেশি। এখনো পল্লিগ্রামের মানুষ রাত জেগে নতুন প্রজন্মের বাউল-গায়কদের কণ্ঠে হাসন রাজার গান শুনে বিমুগ্ধ হচ্ছেন। এই তো সেদিন, ২০১২ সালের ৫ থেকে ৭ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ শহরের বালুর মাঠে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো হাসন রাজা লোক উৎসব। সেই উৎসবে দেশ-বিদেশের অসংখ্য সংগীতশিল্পী ও অনুরাগীরা জড়ো হয়েছিলেন। আর হাজারো মানুষ টানা তিন দিন উপভোগ করেন হাসন রাজার গান।
হাসন রাজার গানের প্রেমে পড়েই কলকাতার জনপ্রিয় লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁকে নিয়ে একটি উপন্যাস লেখার পরিকল্পনার কথা বিভিন্ন সময় সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন। ‘হাসন রাজার বাড়ি’ শিরোনামে লিখেছেন একটি কবিতাও :
গাঁয়েতে এসেছে এক কেরামতি সাহেব কোম্পানি
কত তার ঢ্যাঁড়াক্যাড়া-মানুষ না পিপীলিকা, যা রে ছুটে যা
যা রে যা দ্যাখ গা খেলা হুরীর নাচন আর
ভাঁড়ের কেরদানি
এখানে এখন শুধু মুখোমুখি বসে রবো আমি আর হাসন রাজা।
আলাভোলা হাওয়া ঘোরে, তিলফুলে বসেছে ভোমর
উদলা নদীটি আজ বড়ই ছেনালি
বিষয় বুঝলে দাদা, ভুলাতে এয়েছে ও যে দুলায়ে কোমর
যা বেটী হারামজাদী, ফাঁকা মাঠে দিব তোর মুখে চুনকালি।
কও তো হাসন রাজা, কি বৃত্তান্তে বানাইলে হে মনোহর বাড়ি?
শিয়রে শমন, তুমি ছয় ঘরে বসাইলে জানালা-
চৌখুপ্পি বাগানে এত বাঞ্ছাকল্পতরুর কেয়ারি
দুনিয়া আন্ধার তবু তোমার নিবাসে কত পিদ্দিমের মালা।
জানুতে ঠেকায়ে থুতনি হাসন চিন্তায় বসে
মুখে তার মিটিমিটি হাসি
কড়ি কড়ি চক্ষু দুটি ঘুরায়ে ঘুরায়ে দেখে জমিন আশমান
ফিসফিসায়ে কয়, বড় আমোদে আছি রে ভাই, ছয়টি ঘরেতে ঐ যে
ছয় দাসদাসী
শমন আসিলে বলে, তিলেক দাঁড়াও, আগে দেখে লই
পঙ্খের নকশায় পইড়লো কিনা শেষ টান।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হাসন রাজার উদ্দেশে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কও তো হাসন রাজা, কি বৃত্তান্তে বানাইলে হে মনোহর বাড়ি?’ কিন্তু আমি বলি-একজন জমিদার হয়েও তাঁর এত পরিবর্তন হয়েছিল কেন?-সেটাই বরং ভাবনার বিষয়। আর এ প্রশ্নের উত্তরের হদিস খানিকটা পাওয়া যায় মোবারক হোসেন খানের লেখায়। ‘হাসন রাজা’ শিরোনামে তাঁর এক লেখা থেকে দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে :
সুরমার কাজল-কালো স্রোত বয়ে চলেছে সুনামগঞ্জের বুকের উপর দিয়ে। সুনামগঞ্জ থেকে দুমাইল দূরে লক্ষ্মীশ্রী গ্রাম। রামায়ণের লক্ষ্মণ নামে এই গ্রামের নাম রাখা হয়েছিলো কিনা জানা নেই। লক্ষ্মণেের ছিল রামের কনিষ্ঠ ভাই। লক্ষ্মণেের দেখতে ছিল সুন্দর। সুশ্রী। হয়তো লক্ষ্মণ সেই সৌন্দর্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে ‘শ্রী’ যোগ করে এই গ্রামের নাম রাখা হয়েছিলো লক্ষ্মীশ্রী। অর্থাৎ লক্ষ্মণ মতোই সুন্দর গ্রাম।
কাজলশ্রী সুরমা নদী কলকলধ্বনিতে ছুটে চলেছে। বয়ে চলেছে লক্ষ্মীশ্রী গ্রামের পাশ ঘেঁষে। নদীর ঢেউয়ের কুলকুল সঙ্গীত সারা লক্ষ্মীশ্রী গ্রাম মুখরিত করে রাখে। দিন-রাত সেই সুর শোনা যায়। নদীর এই সুরে লক্ষ্মীশ্রী মানুষের নিত্যসহচর।
সুরমার তীরে দাঁড়িয়েছিলো এক বাউল। গায়ে গেরুয়া বসন। হাতে একতারা। কাঁধে ঝুলি। সুরমার সুর শুনলো অনেকক্ষণ ধরে। তারপর নিজের হাতের একতারার সুরটা মিলিয়ে নিলো সুরমার সুরের সঙ্গে। এবার সে নিজে গান ধরলো। বাউল গান। নদীর সুরের সঙ্গে এক হয়ে মিলে গেলো তাঁর কণ্ঠের সেই গান।
বাউল গান গাইতে গাইতে লক্ষ্মীশ্রী গ্রামের ভিতর ঢুকলো। খানিক পরে থমকে দাঁড়ালো। সামনে রাজার বাড়ি।
সুরমার তীরেই লক্ষ্মীশ্রী গ্রামের রাজার বাড়ি। নদীর পানি যেন টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে। রাজার বাড়ির ছায়া। রাজা সাহেব ছিলেন উড়ণচন্ডীী। তিনি ছিলেন এক দাপটে জমিদার। বাউল রাজা সাহেবকে দেখেই থমকে দাঁড়ালো। মনে হলো রাজা সাহেব তার দিকে এগিয়ে আসছেন। রাজা সাহেব বাউলের গান শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর মনে কৌতূহল। কার কণ্ঠ থেকে অমন সুন্দর সুর বইছে। তিনি তাঁকে দেখতে চাইলেন। এগিয়ে গেলেন রাজা সাহেব। বাউলের মুখোমুখি হলেন। বাউলগান থামিয়ে রাজা সাহেবের সামনে দাঁড়ালো। রাজা সাহেব মুগ্ধবিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন বাউলের মুখের পানে। কথা বলতে চাইলেন। কিন্তু স্বর বেরুলো না। তিনি যেন বাক্হারা। বাউল একতারার তারাটিতে একটা টুং শব্দ তুলে রাজা সাহেবকে হঠাৎ একটা প্রশ্ন করলো। প্রশ্নটা কেমন যেন অব্যন্তর। কিন্তু প্রশ্ন শুনে রাজা সাহেব চমকে উঠলেন। তাঁর কণ্ঠ এবার স্বর পেলো। জিগ্যেস করলেন,
: বাউল, তুমি কি বলছিলে আবার বলো।
: রাজা সাহেব আপনি রাজা, আপনি জমিদার, আপনার অনেক আছে। আপনি অনেক জানেন। আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন রাজা সাহেব?
: বলো, তোমার প্রশ্ন কি?
: রাজা সাহেব, এ দেখুন সুরমা বয়ে যাচ্ছে। আমরা এখানে দাঁড়িয়ে আছি। আচ্ছা বলুন তো আপনি সাগরে আছেন, না মাটিতে?
রাজা সাহেব বিস্মিত হলেন। কি অদ্ভুত প্রশ্ন! বাউলের এই প্রশ্নের উদ্দেশ্য কি! ঠাট্টা নয়তো! কিন্তু তিনি তো রাজা সাহেব। এ তল্লাটের জমিদার। তাঁর সঙ্গে বাউল ঠাট্টাই বা করবে কোন দুঃখে? তিনি ভাবনায় পড়লেন। বাউলের প্রশ্নের উত্তর ভাবতে লাগলেন খানিকটা সময় পেরিয়ে গেলো। তিনি জবাব দিলেন,
: আমি তো মাটিতেই আছি।
বাউল হাসলেন। রাজা সাহেব ভাবলেন বাউল বুঝি তাঁকে কটাক্ষ করছে। তিনি মনে মনে রাগ করলেন। তবে মুখ ফুটে কিছু বললেন না। কিন্তু মুখ ফুটে কথা বললো বাউল।
: রাজা সাহেব, একটা গল্প বলি শুনুন।
বিস্মিত রাজা সাহেব চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। বাউলের গল্পটা শোনবার জন্য মনটা উদগ্রীব হয়ে উঠলো। বাউল বললো,
: গল্পটা বাইবেলের। একবার প্রভু যিশুর শিষ্যের দল বলছিলেন, ‘প্রভু বয়েস তো হলো, এবার ঘর বাঁধুন। নইলে সারাজনম যে ঘর না বেঁধেই কেটে যাবে।’ যিশু শিষ্যদের নিয়ে সাগরপারে গেলেন। বললেন, ‘আমাকে তোমরা এখানে একটা ঘর বেঁধে দাও।’ শিষ্যের দল বিস্ময়ে হতবাক! তারা বললেন, ‘প্রভু, তা-ও কি সম্ভব? এটা যে সাগর!’
রাজা সাহেব একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন বাউলের দিকে। বাউল এবার তাকালো রাজা সাহেবের দিকে। দুজনের চোখে চোখ পড়লো। কিছুক্ষণ নীরবে কাটলো। বাউল তার গল্পের শেষ কথা বললো,
: জগৎটাও কি তা-ই নয়, রাজা সাহেব? তারপরও কি বলবেন আপনি এখনো মাটিতে আছেন!
রাজা সাহেব বিমূঢ়। নিশ্চল। নির্বাক। মুখে কোনো কথা নেই। চোখের সামনে পৃথিবীর রূপ বদলে যেতে লাগলো। নিমিষের মধ্যে তিনি এতোদিন যে জগৎকে চিনতেন তা অদৃশ্য হয়ে গেলো। এতোদিন যে জীবন তিনি ভোগ করেছেন একরাশ লজ্জা এসে যেন তাঁকে ঘিরে ফেললো।
রাজা সাহেব চোখ তুললেন। সামনে কেউ নেই! বাউল অদৃশ্য হয়ে গেছে। রাজা সাহেবের জীবনের এক নতুন দিগদর্শন দিয়ে গেলো বাউল। রাজা সাহেব বুকের ভিতর এক নতুন ধ্বনি শুনতে পেলেন। আর সেই ধ্বনিই রাজা সাহেবকে সুরের বাউল করে তুললো।
সুরের বাউল এই রাজা সাহেবই হলেন ‘হাসন রাজা’। কেউ বলেন ‘হাসন রাজা’। আবার কেউ বলেন ‘হাছন রাজা’। আর রাজা সাহেব তাঁর গানে নিজের পরিচয় দিয়েছেন-‘হাসন রাজা’। অজানা অচেনা এক বাউল হাসন রাজার জীবনের গতি আমূল পরিবর্তন করে দিলো। হাসন ছিলেন রাজা। তিনি হলেন বাউল। তাঁর কণ্ঠেই উচ্চারিত হলো : ‘হাসন রাজা হইয়াছে বাউলা।’ বাউল হাসন রাজা বলেন, ‘মাবুদ আল্লাহর লাগি হাসন রাজা যে আউলা।’
হাসন রাজা আর রাজা রইলেন না। সারাক্ষণ চিন্তায় ডুবে থাকেন। মনের ভিতর নানা প্রশ্ন। এতোদিনের চেনা পৃথিবী তাঁর কাছে অচেনা হয়ে গেলো। মনের ভিতর এক নতুন অনুভূতি। সব সময় ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। খোদার ধ্যানে দিন-রাত্রি নিমগ্ন থাকার বাসনা জাগে। মানুষের সেবার ভিতর দিয়েই যেন আল্লাহকে লাভ করতে চাইলেন হাসন রাজা।
সুরের পাগল হয়ে উঠলেন হাসন রাজা। অধরাকে সুরের মধ্যে ধরতে চাইলেন। জমিদার রাজা সাহেব খোদার মাহাত্ম্যে দেওয়ানা হয়ে উঠলেন। ডাকসাইটে রাজা সাহেব খোদার প্রেমে মগ্ন হয়ে গেলেন। সব ভোগ-লালসা জীবন থেকে বিদায় নিলো। জীবনের পার্থিব চাওয়া আর রইলো না। তাঁর বাড়ির সামনে দেখা গেলো এক ধবধবে সাদা-কবর। এটাই যে তাঁর নিজস্ব বাড়ি। মানুষ তো কদিনের জন্য মাত্র দুনিয়াতে বেড়াতে আসে। তারপর জীবনের ওপারে পাড়ি দেয়ার পালা। জায়গা-জমি, ঘর-বাড়ির প্রতি হাসন রাজার মোহ কেটে গেলো। তাই তো হাসন রাজা গেয়ে উঠলেন, ‘লোকে বলে, বলে রে, ঘর বাড়ি ভালা নায় আমার…’।
হাসন রাজার এক নতুন জীবন শুরু হলো। এ-জীবন সুরের জীবন। এ-জীবন বাউলের জীবন। কিন্তু তার আগে হাসন রাজার ছিল আরেক জীবন।
