অচেনা এক জংলা পাখি থাকে মাটির পিঞ্জিরায় – সুমনকুমার দাশ
অচেনা এক জংলা পাখি থাকে মাটির পিঞ্জিরায়
‘আমি জন্মে জন্মে অপরাধী তোমারই চরণে রে। হায় রে আমারে নি আছে তোমার মনে’-এ গান শুনেই শৈশবকালে প্রেমে পড়েছিলাম গণমনজয়ী বাউল-গায়ক দুর্বিন শাহের। এরপর তাঁর গানের সন্ধানে ছুটে চলা। নানা জায়গার নানা গায়কদের কাছে শুনে শুনে একে একে মুখস্থ হয়ে যায় তাঁর ‘নির্জন যমুনার ক
‚লে, বসিয়া কদম্বতলে। বাজায় বাঁশি বন্ধু শ্যামরায়’, ‘বন্ধু যদি হইত নদীর জল। পিপাসাতে পান করিয়া পোড়া প্রাণ করতাম শীতল’, ‘অচেনা এক জংলা পাখি থাকে মাটির পিঞ্জিরায়। ধরা দেয় না, ঘরে বাইরে আসা যাওয়া সর্বদায়’-সহ অসংখ্য গান। শৈশব পেরিয়ে ভর যৌবন। মন তখন দুর্বিন প্রেমে দেওয়ানা। আর তখনই জানতে পারি-সেই ১৯৭৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ‘জ্ঞানের সাগর’ অভিধায় অভিহিত অসংখ্য জনপ্রিয় গানের রচয়িতা দুর্বিন শাহ দেহত্যাগ করেছেন। মনেতে বিরহ আসে। অনেকটাই যেন ‘আমি তোমায় হারা হইয়া বাঁচিব কেমনে’। এ ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে বহুদিন সময় লাগে। তারপর আবার মিশে যাই নগরের যান্ত্রিকতার চলমান স্রোতে। আর সকলের মতো আমিও হয়ে উঠি রোবটপ্রতিম পরিপূর্ণ এক যন্ত্রমানব। নিজের পেশা আর টুকটাক লেখার বাইরে কিছুই ভাবতে পারি না। অথচ অনেকটা হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি প্রখ্যাত সাধক দুর্বিন শাহের জন্মভিটায় যাওয়ার। যেই কথা সেই কাজ।
৬ আগস্ট ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ। সকাল ১০টার দিকে সিলেটের বন্দরবাজার এলাকায় পৌঁছে দেখি সকলের আগে অন্যতম সফরসঙ্গী আনিস মাহমুদ উপস্থিত। সামান্য সময়ের ব্যবধানে আসেন সিলেটের সাম্প্রতিক সময়ের জনপ্রিয় দুই বাউলশিল্পী আবদুর রহমান ও বশিরউদ্দিন সরকার। আমরা পার্শ্ববর্তী একটি রেস্তোরাঁয় নাস্তা সেরে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতকগামী একটি অটোরিকশা ভাড়া নিই। শুরু হলো দুর্বিন শাহের বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা। রাস্তায় চলল একের পর এক গান। রহমানভাই গানের পাশাপাশি দুর্বিন শাহের গানের তত্ত্ব ও ভাবের ব্যাখা দিতে লাগলেন আর বশিরভাই দুর্বিন পরিবারকে কাছে থেকে দেখার স্মৃতিগুলো শুনালেন। এসব শুনতে শুনতেই পৌঁছে যাই ছাতকের মধ্যবর্তী স্থান গোবিন্দগঞ্জ বাজারে। ওই বাজার থেকে স্থানীয় সাংবাদিক রাজুকে গাড়িতে তুলে নিই। প্রায় পৌণে এক ঘণ্টার মধ্যে ছাতক পৌর শহরে প্রবেশ করি। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন সংগীতশিল্পী অতীন্দ্র দেবনাথ টুটুল। তাঁকে নিয়ে আমরা অপর পাঁচজন পৌর শহরের অদূরে দুর্বিন শাহের বাড়িতে রওয়ানা দিলাম।
ছাতকের সুরমা নদী। দুক‚ল ছাপিয়ে বর্ষার প্রমত্ত রূপ। ঢেউয়ের পিঠে ঢেউ। আমরা সেই ঢেউয়ে ডিঙি মতন বজরা ভাসিয়ে এগিয়ে চলছি। মধ্য নদীতে আচমকাই মাথায় পাগলামি ভর করলো। দুই হাত দিয়ে কিছুক্ষণ সুরমা নদীর ভরা যৌবন আঁচ করার চেষ্টা করলাম। আহা! প্রাণ উজাড় করা ভালোবাসা আর সমস্ত যৌবনটুকু যেন সুরমা নদী আমাকে দিয়ে দিতে চাইল। ইচ্ছে হলো ঝাঁপিয়ে পড়ি সুরমার বুকে। ঘোর কাটতে না কাটতেই তীরে পৌঁছি। সামান্য একটু হাঁটার পর দুর্বিন টিলা। সুবিশাল টিলাটির আশপাশ অনেকটাই কেটে ফেলা হয়েছে। টিলার চারপাশে ছনখেত আর গাছগাছালি। এই কড়কড়ে রোদেও হালকা বাতাসে গাছের পাতাগুলো দুলছে। চেনা-অচেনা গাছগুলোতে নানাজাতের ও রঙের পাখিরা খাবারের খোঁজে ব্যস্ত আর সেই ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে সব পাখিরা যেন মনের আনন্দে নানান সুরে গান গাইছে। হঠাৎ করেই অপূর্ব এই সুর ছাপিয়ে রহমানভাই গাইলেন-‘কাজলবরন পাখি, নিলো হরে আঁখি…’। দুর্বিন পুত্র আলম শাহসহ উপস্থিত সংগীতশিল্পী টুটুলকাকু ও বশিরভাই সুর মেলালেন। এভাবে চলল একের পর এক গান। উপস্থিত সকলেই পুরো টিলা মুখরিত করে গাইছেন দুর্বিন শাহের গান। দরদর করে প্রত্যেকের শরীর হতে ঘাম ঝরছে। অথচ কোনও ক্লান্তি নেই। কখনও বিরহ, কখনও আনন্দ কিংবা কখনও প্রতিবাদের ভাষায় প্রায় এক ঘণ্টা সুরের মায়াজালে শিল্পীরা বন্দি করে রাখলেন আমাদের।
এরপর ফিরে আসার পালা। দুর্বিন শাহের ছেলে আলম শাহ আবার যেন আসি-এ কথা এক নাগাড়ে বলে চলেছেন। সামান্য সময়ের ভেতরে প্রথম দেখাতেই একজন মানুষ কীভাবে অপরকে আপন করে নিতে পারেন-সেটা এই প্রথম টের পেলাম। মাঝে মাঝে মনে হয় বাউলধারাটা বোধহয় এমনই! এসব ভাবতে ভাবতেই আলম শাহের আধাপাকা ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। ঘর থেকে বের হওয়ার ঠিক আগ মুহুর্তে ফিরে তাকালাম দুর্বিন শাহের সহধর্মিণী স্বরূপা বেগমের দিকে। এই বৃদ্ধ বয়সেও অসাধারণ রূপ-লাবণ্য ধরে রেখেছেন। তাঁকে দেখে নিজের অজান্তেই ঠোঁটে চলে এলো দুর্বিন শাহের জনপ্রিয় সেই গান ‘হলুদবরন রূপের কন্যা লো, মেঘবরণ তার চুল’।
আবার ঘরে ফেরা। আবার নগরের একঘেয়ে যান্ত্রিক জীবন। তবু জীবনের ফাঁকে ফাঁকে গল্প করার মতো টুকরো টুকরো কিছু স্মৃতি থাকে। এসব স্মৃতির রাজ্যে প্রতিনিয়ত চোখে ভাসছে এক দুপুরে দুর্বিন শাহের বাড়িতে কাটানো কিছু সময়। আমার কাছে চিরদিন দ্যুতিময় হয়ে থাকবে একটি দিন, একটি দুপুর।
সেই দুপুরে দুর্বিন শাহের বাড়ি থেকে আসার পর সিদ্ধান্ত নিই দুর্বিন শাহ রচনাসমগ্র প্রকাশের। আলম শাহের সঙ্গে কথা বলে কাজ শুরু করে দিই। ২০০৯ সালে এ বইটি বেরও হয়। সম্পাদনার সূত্রে দুর্বিন শাহের গানগুলো বারবার আমাকে পড়তে হয়েছিল। তখন মনে হয়েছে তিনি আমাদের বাউলগানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার। এ সাধকের রচিত প্রায় গান অসামান্য। তবে লালন, রাধারমণ, হাসন রাজা কিংবা শাহ আবদুল করিমের গান যেভাবে এপার-ওপার দুই বাংলার বাঙালিদের কাছে পৌঁছেছে সে তুলনায় দুর্বিন শাহর গান এতটা পৌঁছেনি। অথচ তাঁর গানের ভাষার বিশেষত্ব ও স্বতঃস্ফ‚র্ত উপস্থাপন শ্রোতাদের গভীর আনন্দের খোরাক জোগায়। তিনি যেমন একদিকে গানের রচয়িতা ও গায়ক ছিলেন এবং অন্যদিকে নিজের গানের সুরারোপও করেছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে তাঁর গান চিত্তবিনোদনের খোরাক হলেও এসব গানের মর্মকথা স্বতন্ত্র দর্শন হিসেবে মূল্যবান।
দুর্বিন শাহের গানে বাঙালির বৃহত্তম অংশের মানুষের আচার-সংস্কৃতি ও সুখদুঃখের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্কের অন্যরকম প্রাণসঞ্চারি চেতনা এবং আদর্শ রয়েছে। আর এটি হচ্ছে মানবপ্রেম। মানুষে-মানুষে ভালোবাসার সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাঁর অধিকাংশ গানে। তিনি যে গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেটি উপজেলা শহর থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে। নোয়ারাই গ্রামের তারামন টিলা। তবে বর্তমানে টিলাটি দুর্বিন টিলা নামে পরিচিত। আর সেখানেই এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন দুর্বিন শাহ। তাঁর জন্ম ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর পিতা সফাত আলী আর মায়ের নাম হাসিনা বানু। পিতা ছিলেন মরমিসাধক ও ফকির, মা ‘পিরানি’ হিসেবে শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন সকলের কাছে। ফলে সংগীতচর্চার একটা পারিবারিক ঐতিহ্যেই তিনি বেড়ে উঠেছেন। মাত্র সাত বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে মা-ই ছিলেন তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। মা ছিলেন তাঁর ভাবজগতের কান্ডারি।
দুর্বিন শাহ ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে বিলেত সফরকালে সুরের মূর্ছনায় প্রবাসী বাঙালিদের বিমোহিত করেছিলেন। প্রতিদানস্বরূপ প্রবাসীরা তাঁকে ‘জ্ঞানের সাগর’ অভিধায় অভিহিত করেছিলেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি সংগীত পরিবেশন করে কুড়িয়েছেন জনমানুষের ভালোবাসা। তিনি বিয়ে করেছিলেন একই উপজেলার জোড়াপানি গ্রামের সৈয়দ আলীর মেয়ে স্বরূপা বেগমকে। তাঁদের ছিল তিন ছেলে। তবে বড়ো দুই ছেলে জাহান শরিফ ও আজম শরিফ ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। স্ত্রী স্বরূপা বেগমও কয়েক বছর আগে মৃত্যুবরণ করেন। ছোটো ছেলে আলম শরিফ ওরফে আলম শাহ পিতার পথ ধরে সংগীতসাধনায় মগ্ন রয়েছেন।
দুর্বিন শাহর গানগুলোকে বিভিন্ন ভাগে চিহ্নিত করা যায়। তাঁর অধিকাংশ গানে সুফি ও মরমিবাদ যথেষ্টভাবে ফুটে উঠলেও এসবের বাইরে নানা পর্যায়ের অসংখ্য গান লিখেছেন। শ্রেণি বিভাজন করলে এসব গানগুলোকে বাউল, বিচ্ছেদ, আঞ্চলিক, গণসংগীত, মালজোড়া, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, গোষ্ঠ, মিলন, রাধা-কৃষ্ণবিষয়ক পদাবলি, মারফতি, পির-মুর্শিদ স্মরণ, আল্লা স্মরণ, নবি স্মরণ, ওলি স্মরণ, ভক্তিগীতি, মনঃশিক্ষা, সুফিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, কামতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব, পারঘাটাতত্ত্ব, দেশের গানসহ বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। এছাড়া বিবিধ শিরোনামে তাঁর রচিত আরও বিভিন্ন পদাবলিকে চিহ্নিত করা যেতে পারে।
কিন্তু কেমন ছিল তাঁর কণ্ঠ? এ প্রশ্ন মনে আসতেই পারে। প্রাসঙ্গিক হওয়ায় টি এম আহমেদ কায়সারের একটি লেখা উদ্ধৃত করা যায় :
এমনকী উচ্চারণও স্পষ্ট হতো না সবসময়; গাইতেন কাশযুক্ত ভাঙা ফ্যাসফ্যাসে গলায়, কিন্তু তাতে কি হবে, ভক্তেরা কয়, আসরে আসরে কতো নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি দুর্বিন শাহ’র এই গান শুধু তাঁর স্বকণ্ঠে শোনার জন্যে। এক অন্তর্মগ্ন মিনতি, আহা! কী যে এক বিষাদঘন মাধুর্য; যেন কান্না ঝরে পড়তো গানের ছত্রে ছত্রে। গানের বিশাল আসর বসতো তখোন মাজারে, আখড়ায়, প্রত্যন্ত গ্রামে আবার কোনো কোনো গঞ্জেও। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ হন্য হয়ে ছুটে আসতো গান শোনার জন্যে। দুর্বিন শাহর কিছু গান একদা সারা বাংলাদেশ মাতিয়েছিল, অবশ্য তখনো বাউলাগানের কদর ছিল বেশ; বাউলরাও উপেক্ষিত ছিল না খুব একটা। […] পুরোদস্তর সংসারী হয়েও দুর্বিন শাহ শেষপর্যন্ত একজন ঘরছাড়া বাউল; আপাদশির বোহেমিয়ান। ঘর ছিল, ঘরে স্ত্রী ছিল, সন্তান-সন্ততিও ছিল একাধিক, তারপরও কী এক মোহ, কী এক তৃষ্ণা, কী এক অতৃপ্তি তাঁকে ঘরের ভেতরও এক অর্থে পরবাসী করে রেখেছিল জীবনভর! আজ জিন্দাপিরের মোকাম তো পরদিন কোন আখড়ায় নতুন নতুন গান, নতুন নতুন চিন্তা নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সংসারের বেড়াজালে কোমর বেঁধে যুক্ত হয়েও বলেছেন ঘরবাড়ি মিছে, সংসার হলো মায়া…।
উপর্যুক্ত বক্তব্যের অবশ্য সত্যতাও পাওয়া যায় দুর্বিন শাহের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন সুনামগঞ্জের আরেক প্রখ্যাত বাউল-গীতিকার শাহ আবদুল করিমের বিভিন্ন মন্তব্য ও আলাপচারিতায়। বিভিন্নজনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে করিমকে আমরা বলতে শুনি ‘দুর্বিন শাহের গলা খুব একটা ভালো ছিল না’। তবে সেই ‘ভালো না-থাকা’ গলায়-ই তিনি আসরের শ্রোতাদের মাতিয়েছেন। শাহ আবদুল করিমের স্মৃতিচারণা, ‘দুর্বিন শাহ আর আমি মিলে কত আসর, মাজার আর আখড়ায় গান করেছি; এ-সবের কোনও ঠিকঠিকানা নেই। সে আর আমি পাল্লা দিয়ে গান গাইতাম। একই গানের ব্যাখ্যা আমরা দুইজন দুইভাবে দিতাম।’ আরেক সাক্ষাৎকারে করিম জানিয়েছিলেন, ‘দুর্বিন শাহ তুলনামূলকভাবে তত্ত্বগানের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন।’
দুর্বিন শাহের অসংখ্য তত্ত্বগানের কয়েকটি শুনেছিলাম তাঁর ছেলে আলম শাহের কণ্ঠে। সুর করে গাওয়াটাকে আমরা যেভাবে গান হিসেবে চিহ্নিত করি, ঠিক সেভাবে নয়। অনেকটা আবৃত্তি করার মতো, তবু সেই রেশ এখনও আমার কানে সজীব ও প্রাণবন্ত হয়ে রয়েছে। প্রায় চার শ ফুট উঁচুতে টিলার উপর যে জায়গাটায় দুর্বিন শাহের মাজার, সেখানে দাঁড়িয়ে তাঁর ছেলে আলম শাহ চোখ বন্ধ করে টলছিলেন। আমার কাছে মনে হয়েছিল-এই বুঝি পড়ে যাবেন। একবার তো আমি ধরার জন্য হাত-ই বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। তবে আমার পাশে থাকা বশিরউদ্দিন সরকার অভয় দিয়েছিলেন, ‘দাদা, চিন্তা কইরেন না। বুঝছেন কিছু? উনি ভাবের রাজ্যে আছেন, পড়ি পড়ি ভাব তবু পড়বেন না।’ আলম শাহ ‘ভাবরাজ্য’ থেকেই বলছিলেন :
আমায় আমি চিনতে গেলে বাজে গন্ডগোল
আমি কে হই আমা থেকে স্মরণ হলে পড়ে ভুল।
দেখলে মানুষ সবকে চিনি আমায় চিনতে টানাটানি
আমায় চিনতে সাধু জ্ঞানী কূল না পেয়ে হয় আকূল।
যোগী ঋষি যুগ ধ্যানে ভাবিতেছে নিশিদিনে
তারাও না আমায় চিনে কিসেতে হয় আমার মূল।
আমি বলি আমি একা মানুষে কয় তুমি বোকা
তাল্লাশ করলে হাদিস ফেকাহ্ খোদামাত্র আছে স্থুল।
কুদররে মূল খোদার নাম জগতে সব আমার কাম
নইলে পিতা ছাড়া পুত্র হইতাম বৃক্ষ ছাড়া ফুটত ফুল।
আমি গেলে সবই যাবে খোদা বলে কে ডাকিবে
দুর্বিন শাহ কয় আমার ভাবে আমি তার চরণধূল।
আলম শাহ গান শেষে মাটিতে বসে পড়লেন। বিড়বিড় করে কী যেন বললেন! একসময় গা এলিয়ে দেন মাটিতে। মিনিট পাঁচেক পর উঠে দাঁড়িয়ে পাশে থাকা আবদুর রহমানকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘রহমানভাই, আপনি আমার বাড়িতে আইছেন। আমি খুউব খুশি হইছি।’ কথা শেষ করে কোনও বিরতি না দিয়েই আলম শাহ আবার ধরলেন :
আমায় রাখিও চরণ তলে দয়াল মুর্শিদও
আমায় রাখিও চরণ তলে
মানবজনম ধন্য হবে তোমারে পাইলে-দয়াল মুর্শিদও আমার।
মুর্শিদও সয়ালের দয়াল তুমি নির্ধনিয়ার ধন
অকূলিয়ার কূল তুমি অন্ধেরই নয়ন
দিয়া চরণ রাখো জীবন পড়েছি অকূলে
ও আমার রাখিও চরণ তলে-দয়াল মুর্শিদও আমার।
মুর্শিদও অনাথের নাথ বলি রাখি কত আশা
দয়া করে চরণ তলে আমারে দিও বাসা
মিটাইও মনের পিপাসা, বসো আমার কোলে
ও আমার রাখিও চরণ তলে-দয়াল মুর্শিদও আমার।
মুর্শিদও তুমি হও আশিকে খোদা সুরতে ইনসান
নুরেরই পুতুলা তুমি হাবিবে দেওয়ান
দুর্বিন শাহ কয় তোমার সমান দরদি নাই ভূতলে
ও আমার রাখিও চরণ তলে-দয়াল মুর্শিদও আমার।
গান শেষ করেই আবার বিড়বিড় করে বলতে শুরু করলেন : ‘ঘর বানাইল রে মালিক মেস্তরি। ঘরের ভিতরে রইয়া করে লুকোচুরি।’ এবার রহমানভাই তাঁকে থামালেন। থামিয়ে তিনি আমার উদ্দেশে বললেন, ‘দাদা, দুর্বিন শাহের গানে তত্ত্বের ছড়াছড়ি বেশি। আমাদের পূর্বসূরিদের মধ্যে উনার গানে গভীরতা মারাত্মক। লোকে এর লাগি উনারে জ্ঞানের সাগরও কইতো। আমি তো উনার সঙ্গে একমঞ্চে গান গাইছি। তাঁর কথায়ও ভারী ভারী ভাব ছিল।’ আবদুর রহমান কথা শেষ করে গেয়ে শোনান :
জন্মে জন্মে অপরাধী তোমারই চরণে রে
হায় রে আমারে নি আছে তোমার মনে।
বন্ধুয়া রে, শুনিয়াছি নামটি তোমার পতিত পাবন
দয়াময় দয়াল তুমি পাতকি তারণ
কিঞ্চিৎ দয়া করো যারে ও তার ভয় নাই ঘোর নিদানে রে।
বন্ধুয়া রে, মনপ্রাণ যৌবন দিলাম চরণে তোমার
পদছায়া দিয়া রাখো জেনে দুরাচার
আশাতে নিরাশ কইর না আমি দীনহীন রে।
বন্ধুয়া রে, কৃপাসিন্ধু ভক্তের অধীন
নিজ গুণে করো দয়া বাসিও না ভিন
দুর্বিন শাহ তোর চিরদাসী জিয়নে মরণে রে।
গান শেষ করে আবদুর রহমান রহস্যের হাসি হাসলেন। এই গান শুনে তাঁর হাসির প্রকৃত কারণ বুঝতে পারলাম না। শুধু জিজ্ঞাসু চোখে রহমানভাইয়ের চোখে তাকিয়ে রইলাম।
