হাসন রাজা ও জসীমউদ্দীন : মিল-অমিল
হাসন রাজা ও জসীমউদ্দীন : মিল-অমিল
সেই ছোটোবেলায় বেদে-বেদেনীর মুখে প্রায়ই শুনতাম, সাপের খেলা দেখানোর সময় তারা সুর তুলে গাইতেন-‘ও বাবু সেলাম বারে বার। আমার নাম […] বাইদ্যা। বাড়ি পদ্মাপার’। পরে, আরও বেশ পরে বেদের মেয়ে জোছনা চলচ্চিত্রে একই রকম গান ছিল, যেটি ওইসময় বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। মানুষের মুখে মুখে ফিরত এ গান। এ তো ছোটোবেলার কথা, যখন একটু-আধটু বুঝতে শিখেছি, সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি, তখনই হাতে পাই জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬) প্রণীত পদ্মাপার বইটি। এটি ১৯৫০ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল, তবে আমি দেখেছিলাম সম্ভবত তৃতীয় সংস্করণের একটি বই। সে বইয়েই পেয়েছিলাম পুরো গানটি।
ছোটোবেলায় বেদে-বেদেনীদের মুখে সরাসরি শোনা গান এবং বেদের মেয়ে জোছনা চলচ্চিত্রের গানের চেয়ে এটি ঈষৎ পরিবর্তিত। গানটি এ-রকম :
ও বাবু সেলাম বারে বার,
আমার নাম গয়া বাইদ্যা বাবু
বাড়ি পদ্মাপার।
মোরা পঙ্খী মারি পঙ্খী ধরি
মোরা পঙ্খী বেইচা খাই-
মোদের সুখের সীমা নাই;
সাপের মাথায় মণি কেড়ে মোরা
করি যে কারবার।
এক ঘাটেতে রান্দিবাড়ি মোরা
আরেক ঘাটে খাই,
মোদের ঘর বাড়ি নাই;
সব দুনিয়া বাড়ি মোদের,
সকল মানুষ ভাই;
মোরা, সেই ভায়েরে তালাস করি আজি
ফিরি দ্বারে দ্বার;
বাবু সেলাম বারে বার।
বেশ বুঝতে পারি-এ গানটি থেকেই পরিমার্জিত রূপে পরবর্তীকালে আমাদের কাছে গানটির বিস্তৃতি পেয়েছিল। ভেবে অবাক হই-একটি নিম্মবর্গীয় শ্রেণির জীবনচিত্র কত সরল, সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষায় জসীমউদ্দীন উপস্থাপন করেছেন। এটি ‘পল্লিগীতি’ পর্যায়ভুক্ত গান হলেও শেষ দুটি অনুচ্ছেদে মানুষবন্দনার চিত্র পরিস্ফুট হয়েছে-‘মোদের ঘর বাড়ি নাই;। সব দুনিয়া বাড়ি মোদের,। সকল মানুষ ভাই;। মোরা, সেই ভায়েরে তালাস করি আজি। ফিরি দ্বারে দ্বার’। সেই মানুষবন্দনার কথা আমরা লালন (১৭৭৪-১৮৯০), কুবির গোঁসাই (১১৯৪ বঙ্গাব্দ-১২৮৬ বঙ্গাব্দ), দুদ্দু শাহ (১৮৪১-১৯১১), পাঞ্জু শাহ (১৮৫১-১৯১৪), হাসন রাজা (১৮৫৪-১৯২২), ভবা পাগলা (১৯০৩-১৯৮৪) থেকে হাল আমলের জনপ্রিয় শাহ আবদুল করিমের (১৯১৬-২০০৯) গানে পর্যন্ত অজস্র উদাহরণ পেয়েছি।
মানুষবন্দনার পাশাপাশি জসীমউদ্দীনের প্রায় গানে নিগূঢ়তত্ত্বকেন্দ্রিক পঙ্ক্তিও রয়েছে। সেসব গানে দেহতত্ত্বের জটিল দিকগুলো রূপক অর্থে গীতিকার ব্যবহার করেছেন। এ-রকম রূপকতার আশ্রয়ে লালন, হাসন রাজা, জালাল উদ্দীন খাঁ (১৮৯৪-১৯৭২) প্রমুখ অসংখ্য পদ রচনা করেছেন। হাসন রাজা এক গানে লিখেছিলেন :
আল্লা ভব সম্দুরে তরাইয়া লও মোরে।
পড়িয়া দরিয়ার পাকে ডাকি হে তোমারে।
এমন অকূল দরিয়া কুল নাই তার।
আমি অভাগিয়া আর জানি না সাঁতার।
কৃপা করো দয়ালবন্ধু অনাথ জানিয়া।
রক্ষা করো তব দাসে নিজ তরি দিয়া।
হাসন রাজা বলে প্রভু দয়াল নাম তর।
মরণকাল সাক্ষাৎ আইল লও রে খবর।
এই বলিয়া হাসন রাজায় ডাকে উচ্চস্বরে।
হাসন রাজা ভয় করিস না, তরাইব তোরে।
প্রভুর বাক্য শুনিয়া হাসন নাচে তরে তরে।
দরিয়ার মাঝে হাসন রাজা ঝামুর ঝামুর করে।
এ গানে আল্লার প্রতি হাসন রাজার আর্তি-ভব সমুদ্র থেকে তাঁকে ত্বরানোর জন্য। এই ‘আল্লা’ হচ্ছেন মুর্শিদ, আর ‘ভব সম্দুর’ হচ্ছে কামনদী। সেই মুর্শিদের কাছে তাঁর আকুল আবেদন-দরিয়ার পাক অর্থাৎ কামভাব থেকে উদ্ধার করার জন্য। এবং ‘জানি না সাঁতার’ মানে দমসাধনা সঠিকভাবে না করতে পারাকে চিহ্নিত করেছেন। বাউলের গুহ্যতত্ত্বগুলো গানটির বিভিন্ন পঙ্ক্তিতে বিধৃত হয়েছে। একই ধরনের তত্ত্ব আমরা জসীমউদ্দীনের গানেও পাই :
ও নাও বাইও বাইও ভাই মাঝিয়ারে।
ছল ছল কল কল, সুষায় নদীর জল,
কি করবে শাঙইনা ঢল
বাও বাও হেইয়া হেইয়ারে।
মেঘে মেঘে বাড়ি লাগে, বিজলি অশনি হাঁকে,
হন্যা ঢেউ আগে আগে, নাচে সাই সাইয়ারে।
তুফানে ছাইড়াছি তরি, কি করবে ওই খ্যাপা ঝড়ি,
আগে চল ধাইয়ারে;
সর্বনাশা এই তরি, মৃত্যুরে হাতে ধরি,
আমার এ ভাঙা নাও বাইওরে।
যত জোরে হাঁকে ঢল তত বুকে বাড়ে বল;
ঝড়ের নায়ে চইড়া চল,
ও পারে সোনার চর ওই দেখ চাইয়ারে।
এ গানের নানা অর্থ দাঁড়ায়। অনেকে অবশ্য এসব গানকে আক্ষরিক ও প্রচলিত অর্থে বিবেচনা করতে পারেন-সেটি একান্তই দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়। তবে আগেকার দিনের গ্রামীণ নিম্নবর্গীয় শ্রেণি কিংবা বাউল-ফকিররা নিজেদের গুহ্য ও দেহকেন্দ্রিক সাধনার কথাগুলো রূপকতার আশ্রয় নিয়ে লিখতেন ও বলতেন। যাঁরা বোঝার তাঁরা সেটা ঠিকই বুঝে নিতেন। অভিজাত শ্রেণির কাছে ‘অচ্যুৎ’ অভিধায় পরিচিত এসব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে জসীমউদ্দীনের মেলামেশা ছিল দীর্ঘদিনের। তাই তিনি এদের আচার-সংস্কৃতি-জীবনধারা সবকিছু আয়ত্তে নিতে পেরেছিলেন। এ পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি তাঁর রচিত পল্লিগীতিগুলোতে বাউলতত্ত্বের ভেদ অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এগুলো শুনতে এক ধরনের, আবার অর্থ বহন করে অন্য ধরনের। আর সেটাই হচ্ছে মূল রহস্য এবং গোপনীয়তা। একই কথা বলা যায় জসীমউদ্দীনের এ গানটির ক্ষেত্রেও :
তুমি সাবধানে চালাইও মাঝি আমার ভাঙা তরিরে।
ঢেউয়ের উপর ঢেউ ছুটেছে ঢেউয়ে করি ভর,
গগন নামিয়া নাচে সেই না ঢেউয়ের পররে।
আসমান চাইয়া দইরার পানে দইরা আসমান পানে,
লক্ষ বছর পার হইল কেউ না কারে জানেরে।
উপরে আসমান নীচে দইরা কারো নাইরে কূল,
এ ওর কূলের লাইগা কান্দিয়া আকুলরে।
আমি দেশ হারা কূল হারা হইয়া পরবাসে,
অকূল দরিয়ায় আমার ভাঙা তরি ভাসেরে।
জসীমউদ্দীনের এই যে অনুভূতি-‘অকূল দরিয়ায় আমার ভাঙা তরি ভাসেরে’ কিংবা ‘লক্ষ বছর পার হইল কেউ না কারে জানেরে’। এই ‘ভাঙা তরি’ নিজের দেহকে বুঝিয়েছেন, আর এ তরিরূপী দেহ ‘ঢেউয়ের উপর ঢেউ’ ভেঙে চলছে। অর্থাৎ কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য-এ ষড়রিপুকে পরিহার করে জীবনভর চলতে পারাকেই গীতিকার বুঝিয়েছেন। এভাবে চলতে পারলেই মুর্শিদ প্রদত্ত দীক্ষা অনুযায়ী ‘কূল’ পাওয়া সম্ভব। এ গানটিতে জসীমউদ্দীনের দেহকেন্দ্রিক ভাবনার নিগূঢ়তত্ত্ব সম্পর্কিত দর্শন ও চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
যে দেহ নিয়ে আমাদের মানবজনম, সেই দেহের ভেতরের ‘আত্মারূপী প্রাণপাখি’ একদিন দেহখাঁচা ছেড়ে চলে যাবে। শুধু প্রাণহীন শূন্য দেহ পড়ে রইবে। জসীমউদ্দীনকে সেটি নিয়েও ভাবায় :
তুমি কবে খুলিয়া নাও
আমি যেন জানিরে রঙিলা নার মাঝি!
ও রঙিলা নার মাঝি!
মেঘের পিঞ্জিরায় পুরে পুষলাম বিজলি পাখিরে
পুষলাম বিজলি পাখি,
আমি আর কতকাল রাখব অনল অঞ্চলেতে ঢাকি।
ও রঙিলা নায়ের মাঝি!
সুমুদ্দুরের ফেনার পরে বাঁধলাম সুখের বাসারে
কতই করে আশা,
রজনী প্রভাতের কালে পঙ্খী ছাড়বে বাসা।
ও রঙিলা নায়ের মাঝি!
সিন্তার সিন্দুর দিয়ে কিনলাম ঘর খানিরে
বাঁধলাম ঘরখানি,
আমার নিশ্বাসে সেথা লাগিল আগুনি।
ও রঙিলা নায়ের মাঝি!
সুমুদ্দুরের বালুর চরা রোদে চিকমিক করেরে
রোদে ঝিকমিক করে,
বাহাত্তুর বচ্ছরের পাঙ্খা নাহি ওড়ে
আমার পাঙ্খা নাহি ওড়ে,
রঙিলা নার মাঝি!
এটি পুরোপুরি দেহতত্ত্বের একটি গান। এ পর্যায়ভুক্ত গানগুলোই বাউল-ফকির এবং লোককবিরা প্রচুর পরিমাণে লিখেছেন। যেহেতু এ সম্প্রদায়ভুক্ত শ্রেণির দেহসাধনা এবং আত্মানুসন্ধান হচ্ছে মূল লক্ষ্য। তাই মানুষের শরীর আর জীবন-মৃত্যু নিয়ে তাঁদের নিজস্ব মতামতগুলো গানে অত্যধিক মাত্রায় উপস্থাপিত হয়েছে। সংগত কারণেই তাঁদের রচিত দেহতত্ত্বকেন্দ্রিক গানে ওই শ্রেণির মানব শরীর সম্পর্কিত দার্শনিক ব্যাখ্যাগুলোর বিশ্লেষণ জানা সম্ভব। শিতালং শাহ (১৮০০-১৮৮৯), রশিদ উদ্দিন (১৮৮৯-১৯৬৪)-দের প্রায় গানেই দেহতত্ত্বের নিগূঢ় বিষয়গুলো পরিস্ফুট হয়েছে। এসব দেখে-শুনে জসীমউদ্দীনও হয়তো এ ধরনের গান রচনায় মনোনিবেশ করেছিলেন। একই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ কিংবদন্তিতুল্য গীতিকার শাহ আবদুল করিমও একই বিষয়ে অসংখ্য পদাবলি রচনা করেছেন। যেগুলোর অধিকাংশই এখন তরুণ প্রজন্মের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে এ গানটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে :
মাটির পিঞ্জিরায় সোনার ময়না রে
তোমারে পুষিলাম কত আদরে।
তুমি আমার আমি তোমার এই আশা করে-
তোমারে পুষিলাম কত আদরে।
কেন এই পিঞ্জিরাতে তোমার বসতি
কেন পিঞ্জিরার সনে তোমার পিরিতি
আসা-যাওয়া দিবারাতি ঘরে বাহিরে-
তোমারে পুষিলাম কত আদরে।
তোমার ভাবনা আমি ভাবি নিশিদিন
দিনে দিনে পিঞ্জিরা মোর হইল মলিন
পিঞ্জিরা ছাড়িয়া একদিন যাইবে উড়ে-
তোমারে পুষিলাম কত আদরে।
আবদুল করিম বলে ময়না তোমারে বলি
তুমি গেলে হবে সাধের পিঞ্জিরা খালি
কে শুনাবে মধুর বুলি বল আমারে-
তোমারে পুষিলাম কত আদরে।
জসীমউদ্দীন বলছেন-‘মেঘের পিঞ্জিরায় পুরে পুষলাম বিজলি পাখিরে’ আর শাহ আবদুল করিম বলছেন-‘মাটির পিঞ্জিরায় সোনার ময়না রে। তোমারে পুষিলাম কত আদরে’। অন্যদিকে হাসন রাজা বলছেন-‘মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়া রে। কান্দে হাসন রাজার মন মনিয়া রে।’ এ ‘মাটির পিঞ্জিরা’ কিংবা ‘মেঘের পিঞ্জিরা’ এবং ‘বিজলি পাখি’, ‘সোনার ময়না’ কিংবা ‘মন মনিয়া’-এসব উপমার আক্ষরিক ভিন্নতা রয়েছে, তবে সবকটির অর্থ এক ও অভিন্ন। উপরে বর্ণিত জসীমউদ্দীন এবং শাহ আবদুল করিমের গানে যেমন কথার বৈচিত্র্য ছাড়া অর্থ ও আঙ্গিকগত কোনও পার্থক্য নেই, তেমনই তাঁদের পূর্বসূরি হাসন রাজার গানেও একই চিত্র পরিস্ফুট হয়েছে :
মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়া রে।
কান্দে হাসন রাজার মন মনিয়া রে।
মায়ে বাপে বন্দি কইলা, খুশির মাঝারে।
লালে ধলায় বন্দি হইলাম, পিঞ্জিরার মাঝারে।
উড়িয়া যায় রে ময়না পাখি, পিঞ্জিরায় হইল বন্দি।
মায়ে বাপে লাগাইলা, মায়াজালের আন্দি।
পিঞ্জিরায় সামাইয়া ময়নায় ছট্ফট্ করে।
মজবুত পিঞ্জিরা ময়নায়, ভাঙিতে না পারে।
উড়িয়া যাইব শুয়া পক্ষী, পড়িয়া রইব কায়া।
কিসের দেশ কিসের খেশ কিসের মায়াদয়া।
ময়নাকে পালিতে আছি দুধকলা দিয়া।
যাইবার কালে নিষ্ঠুর ময়নায় না চাইব ফিরিয়া।
হাসন রাজায় ডাকব তখন ময়না আয়রে আয়।
এমন নিষ্ঠুর ময়নায়, আর কি ফিরিয়া চায়।
উল্লিখিত গানে হাসন রাজার দৃষ্টিভঙ্গিতে অপর দুই গীতিকারের চেয়ে একটু ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়েছে। শাহ আবদুল করিম তাঁর গানটিতে শুধুমাত্র পিঞ্জিরা খালি হয়ে যাওয়ার আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন। আর জসীমউদ্দীন এই পিঞ্জিরায় কীভাবে বন্দি হলেন, সেটাও জানিয়েছিলেন-‘সিন্তার সিন্দুর দিয়ে কিনলাম ঘর খানি রে’। এ পঙ্ক্তিটির সঙ্গে হাসন রাজার গানটির দার্শনিকতার একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এই পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে আসা, যে বিষয়টিকে আলোচ্য তিন গীতিকার অভিহিত করেছেন ‘মাটির পিঞ্জিরায় বন্দি হওয়া’ হিসেবে। এ ‘মাটির পিঞ্জিরায়’ মানুষ কীভাবে বন্দি হয়ে থাকেন, সেটাই যেন হাসন রাজার গানে তাত্ত্বিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
হাসন রাজা তাঁর গানের এক পঙ্ক্তিতে উল্লেখ করেছেন-‘লালে ধলায় বন্দি হইলাম, পিঞ্জিরার মাঝারে’। সেই ‘লালে-ধলায়’ শব্দবন্ধটি দিয়ে তিনি সঙ্গমের বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। এসব গূহ্য বিষয়-আশয় বাউল-ফকির আর বাউল-গীতিকারেরা আকার।ইঙ্গিতে বলে আসছেন, এটি নতুন কোনও বিষয় নয়। জসীমউদ্দীনের বেশ কিছু গান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একই ধরনের তত্ত্ব তাঁর গানেও প্রতিভাত হয়েছে। এর মানে তিনি বাউল মতবাদ সম্পর্কে ধারণা নিয়েই এসব গান রচনা করেছিলেন। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত একজন আধুনিকমনস্ক নাগরিক ব্যক্তি বাউল-ফকিরদের বিচিত্র জীবনাচার উপলব্ধি করে তাঁদের মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষীণ চেষ্টাও চালিয়েছিলেন। এটাই বা কম কীসের?
বাউলতত্ত্বের গান ছাড়াও জসীমউদ্দীন বেশ কিছু পল্লিগীতি রচনা করেছেন। এসব গানের কাঠামোর আদল বাঙালির গ্রামীণ জীবনের চিরায়ত প্রেমকে উপজীব্য করে তৈরি হয়েছে। প্রেমিক।প্রেমিকার আশা-নিরাশা, আনন্দ-বেদনা, বিরহ-বিচ্ছেদ চরম আবেগময় বর্ণনায় পরিস্ফুট হয়েছে। শ্যাম কদম তলায় বসে রাধার প্রতীক্ষায় আকুল হয়ে বাঁশি বাজাচ্ছেন, অন্যদিকে অভাগিনী রাধা ঘরে অস্থির সময় কাটাচ্ছেন। কিংবা বন্ধুর আশায় চাতক পাখির মতো দীর্ঘদিন ধরে দিন গুনছেন যে রমণী-তার কথাও চমৎকার ভাষায় বিধৃত করেছেন জসীমউদ্দীন। তাঁর ভাষায় :
সোনার বরণী কন্যা সাজে নানা রঙে,
কালো মেঘ যেন সাজিলরে।
সিনান করিতে কন্যা হেলে দুলে যায়,
নদীর ঘাটেতে এসে ইতি উতি চায়।
বাতাসে উড়িছে শাড়ি, ঘুরাইয়া চোখ,
শাসাইল তারে করি কৃত্তিম রোখ।
হলুদ মাখিয়া নামে কন্যা যমুনায়,
অঙ্গ হলুদ হয়া জলে ভাইসা যায়।
ডুবাইয়া দেহ জলে থাকে চুপ করে,
জল ছুঁড়ে মারে কভু আকাশের পরে।
খাড়– জলে নাইমা কন্যা খাড়– মাঞ্জন করে,
আকাশের রামধনু হেলেদুলে পড়ে।
তারপরে বাহু দুটি মেলে জল পরে,
ঘুরাইল ফিরাইল কত লীলাভরে।
বাহু দুটি মাঝে কন্যা অতি কুতুহলে,
খসিয়া পড়িছে রূপ সোনালিয়া জলে।
অঞ্জলি পুরি জল ধরে ছুঁড়িছে,
জলন্ত অঙ্গার হতে ফুলকি উড়িছে
খুলিয়া কুন্তল ভার ছাড়িল জলে,
আকাশ নামিল যেন সুমুদ্দুরের কোলে।
দু হাত বিধাঁয়ে চুলে যত মাঞ্জন করে,
মেঘেতে বিজলি যেন ফেরে লীলা ভরে।
গলা জলে নেমে কন্যা গলা মাঞ্জন করে,
ঢেউগুলি টলমল মালার ফুলের তরে।
কর্ণফুলের ভূষণ লয়ে কোন ঢেউ ধায়,
খোঁপার কুসুম লোভে কেউ হাসে গায়।
সিনান করিয়া কন্যা উঠে জল হতে,
তরল লাবণি ধারা ঝরে অঙ্গ সোঁতে
জসীমউদ্দীন যে ‘সোনার বরণী কন্যা’র রূপে পাগলপ্রায়, সেই একই অনুভূতিতে হাসন রাজাও ‘প্যারী’র প্রেমে মজেছেন। তাই তো তাঁরও অভিন্ন উচ্চারণ-‘নিশা লাগিল রে, বাঁকা দুই নয়নে নিশা লাগিল রে।। হাসন রাজা প্যারীর প্রেমে মজিল রে। ছটফট করে হাসন দেখিয়া চান্দ মুখ।। হাসন জানের মুখ দেখি জন্মের গেল দুঃখ। হাসন জানের রূপটা দেখি, ফাল্দি ফাল্দি ওঠে।। চিড়াবারা হাসন রাজার বুকের মাঝে কুটে।’
জসীমউদ্দীনের সেই গানটির কথাও আমরা বলতে পারি-‘রাধা বিনে প্রাণ বাঁচে না রে। আইনা দে রে ও সুবল ভাই,। তুষের অনল জ্বালিয়ে বুকে রে। ও সুবল! রাই বলে বাঁশি বাজাই।। যমুনার কূলে যেয়ে, চরণে চরণ থুয়ে,। হলুদ মাখিয়া গায়ে সিনান করে রাই;। আমার মনে বলে হলুদ হয়া রে। যমুনাতে ভেসে বেড়াই।। কাঞ্চা সোনার অঙ্গখানি, বিজলি লইত টানি,। যদি নীলাম্বরী তারে না জড়াত ভাই;। চরণে নূপুর যদি, না বাজিত নিরবধি,। যমুনার দশা হতো আমার মতো ভাই!। ও যমুনার ঢেউয়ে ভেঙে চৌচির হতো রে,। যদি ওই চরণে বাদ্য না বাজিত সদাই।’ সেই প্রাণবন্ধুয়ার ‘রাঙা পায়’ নিজেকে সমপর্ণের ইচ্ছা হাসন রাজাও প্রকাশ করেছেন :
সোনা বন্ধের লাগিয়া, হাসন রাজার প্রাণ গেল রে।
বন্ধু নাহি আইল রে, সোনা বন্ধের লাগি হাসন রাজার
প্রাণ গেল রে।
প্রাণ গেল প্রাণ গেল হইল একি দায়।
দিনে রাইতে হাসন রাজায় করে হায় হায়।
প্রেমানলে জ্বলিয়া মরি, বন্ধু নাহি আয়।
আমি যে জ্বলিয়া মরি ফিরিয়া না চায়।
কাকুতি করি রে বন্ধু দেখা দেও আমায়।
তোমার লাগিয়া এখনই আমার প্রাণ যায়।
হাসন রাজায় বলে বন্ধু কর তার উপায়।
প্রেম জ্বালা ঘুচাইয়া রাখ রাঙা পায়।
হাসন রাজা ও জসীমউদ্দীন উভয়েই বন্ধুর প্রেমে পাগল হয়ে একই অনুভূতি ধারণ করে একই আঙ্গিকের পদাবলি রচনা করেছেন। শুধু শব্দের পার্থক্য ছাড়া তাঁদের লেখা গানের ভাব ও নিগূঢ়তত্ত্বে কোনও বৈচিত্র্যতা নেই। তবে একটি বিষয় বেশ লক্ষণীয়-সচরাচর বাউল-ফকির কিংবা গ্রাম্য গীতিকারদের গানে ভণিতার ব্যবহার দেখা গেলেও সেটা জসীমউদ্দীন এড়িয়ে গেছেন। বোঝা যায় যে, তিনি এটি সচেতনভাবেই করেছেন। সম্ভবত তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বাউল-ফকির-গ্রাম্যগীতিকারদের তত্ত্বকে ঠিক রেখে আধুনিকতার মিশেলে পল্লিগীতির পদগুলো রচনা করা।
জসীমউদ্দীন এ বিষয়টি চিন্তা করে যদি তাঁর গানে ভণিতার ব্যবহার না করে থাকেন, সে পর্যন্ত ঠিক আছে। তবে এতে করে একটা বিভ্রান্তিও জনমনে তৈরি হয়েছে। বিষয়টি একটু খোলাসা করেই বলা দরকার। যেহেতু তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে অসংখ্য লোককবিদের গান সংগ্রহ করেছিলেন, তাই অনেক ক্ষেত্রে সঠিকভাবে পান্ডুলিপি তৈরি করতে না পারায় তাঁর সংগৃহীত গানের সঙ্গে নিজের লেখা গানগুলোও মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এতে করে কোনটি তাঁর সংগ্রহ করা গান, আবার কোনটি নিজের লেখা গান-এ নিয়ে বেশ তর্ক-বিতর্ক এবং বিভ্রান্তি রয়েছে। এ কথার সপক্ষে খোদ জসীমউদ্দীনের প্রকাশিত গানের সংকলনগুলোও অন্যতম প্রমাণ বহন করে। এসব সংকলনের প্রায় গানের নিচে লেখা রয়েছে-‘প্রথম গানের কয়েকটি পঙ্ক্তি গ্রাম্যগান থেকে সংগৃহীত’ কিংবা ‘গ্রাম্যগানের পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত রূপ’।
জসীমউদ্দীনের সংগৃহিত গানগুলো নিয়ে পান্ডুলিপি সঠিকভাবে তৈরি করতে পারলে এ ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হতো না বলেও অনেক গবেষকেরা মনে করেন। প্রসঙ্গক্রমে ‘নিশিতে যাইও ফুলবনে’ গানটির কথা উল্লেখ করা যায়। এ গানের রচয়িতা সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার বামৈ ইউনিয়নের ভাদিকারা গ্রামের বাসিন্দা মরমিকবি শেখ ভানু (১৮৪৯-১৯১৯)। অথচ সেটি দিব্যি জসীমউদ্দীনের নামে প্রচারিত হচ্ছে। প্রখ্যাত শিল্পী শচীনদেব বর্মণও এ গানটি জসীমউদ্দীনের গান হিসেবে গেয়েছিলেন। অবশ্য এ গানটি একসময় রাধারমণের (১৮৩৩-১৯১৬) নামেও প্রচারিত হয়েছিল। শিল্পী শচীনদেব বর্মণ (১৯০৬-১৯৭৫) ছাড়াও কৃষ্ণচন্দ্র দে (১৮৯৩-১৯৬২), আব্বাসউদ্দীন (১৯০১-১৯৫৯) প্রমুখ সংগীতশিল্পী তাঁর লেখা ও সংগৃহীত গান গেয়েছিলেন।
‘নিশিতে যাইও ফুলবনে’ গানটির উল্লিখিত বিতর্ক ছাড়া আরও একটি জনশ্রুতি সিলেট অঞ্চলের গ্রামীণ গীতিকারদের মুখে শোনা যায়। জসীমউদ্দীন ছিলেন হাসন রাজার ছেলে দেওয়ান একলিমুর রাজার (১৮৮৯-১৯৬৪) ঘনিষ্ঠজন। ১৯৩৭ সালের ৩ অক্টোবর ‘পল্লিকবি’ জসীমউদ্দীন সুরমা উপত্যকায় মুসলিম ছাত্র সম্মেলনী উপলক্ষে সিলেটে এসেছিলেন। সে সময় দেওয়ান একলিমুর রাজার উদ্যোগে কবিকে মুসলিম সাহিত্য সংসদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল। আয়োজকদের পক্ষ থেকে কবিকে মানপত্র প্রদান করা হয়েছিল।
সংবর্ধনা শেষে দেওয়ান একলিমুর রাজা বিরচিত ‘পাখি কইও বন্ধুয়ার লাগ পাইলে’ শীর্ষক পল্লিগীতিটি পরিবেশন করা হয়। এ সময় দেওয়ান একলিমুর রাজা তাঁর কিছু গানসহ সিলেটের প্রচলিত বিভিন্ন লোকগান জসীমউদ্দীনের কাছে তুলে দেন। পরবর্তী সময়ে এসব গানের কিছু অংশ জসীমউদ্দীনের নামে প্রচারিত হয়েছে বলেও জনশ্রুতি রয়েছে। এ তো গেল দুটি উদাহরণ, এ-রকম আরও বেশ কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া সম্ভব। এ অবস্থায় এসব বিভ্রান্তি দূর করার জন্য শীঘ্রই তাঁর লেখা গানগুলো সুনির্দিষ্ট করা উচিত। তবে এটি আলোচ্য প্রবন্ধের মূল বিষয় নয়, এ প্রসঙ্গে তাই কথা না বাড়িয়ে জসীমউদ্দীনের গানের আঙ্গিকগত পার্থক্য নিয়ে আলোচনাটাই মুখ্য বিষয়।
১৯২২ সালে জসীমউদ্দীন যখন ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে আই.এ. ক্লাসের শিক্ষার্থী, তখন তিনি ৭০ টাকা মাসিক বেতনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একজন পল্লিগীতি সংগ্রাহক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। পরে ১৯৩৩ সালে ড. দীনেশচন্দ্র সেনের (১৮৬৬-১৯৩৯) অধীনে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রামতনু লাহিড়ী রিসার্চ অ্যাসিন্ট্যান্ট’ পদে যোগদান করেছিলেন। ১৯৩৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ওই পদে কর্মরত থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পল্লিগীতি, গাঁথাসহ বিভিন্ন লোকউপকরণ সংগ্রহ করেছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর এসব সংগ্রহ বিভিন্ন বই ও সংকলনে গ্রন্থভুক্ত হয়েছিল।
গ্রাম্যগীতি সংগ্রহকালীন জসীমউদ্দীন বিভিন্ন নিম্নবর্গীয় শ্রেণির সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন। এমনকী বিভিন্ন অঞ্চলের বাউল-ফকিরদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বাড়ে। এসব বাউলের দেহসাধনা ও তত্ত্ব সম্পর্কে তিনি হাতেকলমে জ্ঞান লাভ করেন। এ জ্ঞান কাজে লাগিয়েই তিনি বেশকিছু বাউলপদ রচনা করেছেন। এসব পদের অধিকাংশই তাঁর প্রকাশিত রঙিলা নায়ের মাঝি (১৯৩৫), পদ্মাপার (১৯৫০) গীতিসংকলন দুটিতে সংকলিত হয়েছে। এছাড়া তাঁর সংগৃহীত কিছু গান নিয়ে জারীগান (১৯৬৮) ও বাউল (১৯৯৯) নামে দুটি গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে।
জসীমউদ্দীনের বাউলপদগুলোতে বাউলের গুহ্য সাধনার ইঙ্গিত রয়েছে, তবে সেটি সাংকেতিক অর্থে। অনেকটা চন্ডীীদাসের (১৩৭০-১৪৩৩) লেখা গানের সেই পঙ্ক্তির মতোই-‘যাইতে উত্তরে বলিবে দক্ষিণে। দাঁড়ায়ে পূরব মুখে’। গানটি ছিল এ-রকম-‘ও মাঝি রে-। আজি ঝড় তুফানে চালাও তরি। হুঁশিয়ার,। হুঁশিয়ার হো।। ঝড় আসে তো আসুক আমার তুফানে কি ডর,। জিলকি ঠাটা সাথের সাথি পদ্মাতে যার ঘর’। গানের এ পঙ্ক্তিগুলো পদ্মাপার গীতিনাট্যে সুজন নামের এক চরিত্রের মাধ্যমে জসীমউদ্দীন বলিয়েছিলেন।
গানের পঙ্ক্তি বেশ চমকপ্রদ ও বাউলতত্ত্বে ভরপুর। কামনদীর মধ্যে পড়ে যাতে বীর্যক্ষয় না হয়, সেদিকে ইঙ্গিত করে গীতিকার সাবধান হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। আবার নিজের মধ্যে এও বিশ্বাস রয়েছে যে, শত ঝড়ঝঞ্ঝা এলেও তাঁর কোনও ভয় নেই। তাঁর মনে দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে-কামনদীর জোয়ারে পড়েও বস্তুসাধনে কোনও সমস্যা হবে না। এই ‘বস্তুসাধন’ করতে পারলেই কেবল বাউলেরা সন্তানধারণ হতে বিরত থাকতে পারবেন, তাই বীর্যক্ষয় কোনওভাবেই করা যাবে না। এ প্রসঙ্গেই দুদ্দু শাহ লিখেছিলেন :
আপন হাতে জন্ম মৃত্যু হয়
খোদার হাতে হায়াৎ মউৎ কে কয়?
বীর্যরস ধারণে জীবন
অন্যথায় প্রাপ্তি মরণ
আয়ুর্বেদ করে নিরূপণ করি নির্ণয়।
নিজে বীর্যক্ষয় করে
পশুর মত পথে পড়ে
কতজন যায় মরে খোদার দোষ দেয়।
যে কামসাধনা করতে না পেরে ‘কতজন যায় মরে’, সেখানে জসীমউদ্দীনের আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণ-‘ঝড় আসে তো আসুক আমার তুফানে কি ডর’। যদিও জসীমউদ্দীন নিজে বাউল ছিলেন না, কিন্তু বাউলতত্ত্ব অনুধাবণ করে তিনি এ ধরনের অসংখ্য পদ রচনা করেছিলেন। জসীমউদ্দীনের সংগৃহীত অসংখ্য বাউল পদের মধ্যে এ সাধনপদ্ধতির ইঙ্গিতবাহী বেশকিছু গান রয়েছে। এ-রকমই একটি গান ফরিদপুর জেলার চরভদ্রাসন গ্রামের এরন শাহ ফকিরের। তাঁর গানটি ছিল এ ধরনের :
বাজা তালে তালে,
মূলে আমি বাজাব না।
মূলে আমি বাজাব না,
ফুলবাগান আর সাজাব না।
বাজানে বড় মজা,
দশমাস বায় পাপের বোঝা
বাপ-দাদায় বইয়াছে বোঝা,
যন্ত্রণায় প্রাণ বাঁচে না;
যে ধন আমার গুরু দিচ্ছে-
ও তার একরত্তি আর কারে দিব না।
উপরে সরা বাজাব,
ভিতরে মানুষ মজাব,
দ্যাশের ব্যাসাত দ্যাশে রাখবো,
একবিন্দু কারে দিব না;
সঙ্গে সঙ্গে নামাজ পড়ব,
ভক্তিটা ছাইড়া দিব না।
এরন শাহ ফকির জানাচ্ছেন-‘যে ধন আমার গুরু দিচ্ছে-। ও তার একরত্তি আর কারে দিব না’। কারণ ওই ফকির জানেন সেই গুরু প্রদত্ত ধন দান করলেই ভবযন্ত্রণায় দিন কাটাতে হবে। তাই তাঁর সাবধানী পথচলা-‘দ্যাশের ব্যাসাত দ্যাশে রাখবো,। একবিন্দু কারে দিব না’। কারণ পতনের মূলে ওই ‘একবিন্দু’ই যথেষ্ট। সে বিষয়ে জসীমউদ্দীন একটি গানে লিখেছিলেন-‘ডুবিল ডুবিল রে নৌকা। ডুবিল রে।। আগা ডুবল, পাছারে ডুবল, ডুবল নায়ের গুরা,। আস্তে আস্তে ডুবলরে নৌকার মাস্তুলের চূড়া রে।। নৌকা ডুবিল রে!’। এই ‘নৌকা’ মানবজীবন। আর ‘বস্তুসাধন’ করতে না পারলে সেই জীবন ধীরে ধীরে অসারতা লাভ করবে।
মানবজীবনে যেন সে অসারতা এসে ভর না করতে পারে, এজন্য জসীমউদ্দীন একটা উপায়ও বের করেছেন। সেটা হচ্ছে মুর্শিদ প্রদত্ত বাণী ঠিকমতো অনুসরণ করা। তাই প্রত্যেককেই মুর্শিদের সন্ধান খুঁজে বের করতে হবে। জসীমউদ্দীন বলছেন-‘উনুর ঝুনুর বাজে নাও আমার। নিহাইলা বাতাসের মুরশীদ!’। রইলাম তোর আশে।। পচ্চিমে উঠিল ম্যাঘরে, দেয়াল দিলরে ডাক,। আমার ছিড়িল হাইলের দড়ি নৌকায় খাইল পাকরে,। মুরশীদ! রইলাম তোর আশে।’ কারণ তিনি জানেন, এ বিপদ থেকে মুর্শিদই পারেন একমাত্র পরিত্রাণকর্তা হতে। তিনিই ‘দমসাধনা’ শিখিয়ে কীভাবে ‘বস্তুনিয়ন্ত্রণ’ করতে হয় সেটির সঠিক পাঠ দিয়ে ‘নরকযন্ত্রণা’ থেকে মুক্তিলাভের উপায় বাতলে দিতে পারেন। তাই তিনি মুর্শিদের ‘আশে’ প্রতীক্ষারত।
জসীমউদ্দীনের বাউলতত্ত্ব আশ্রিত গানগুলো অবশ্যই ‘ভদ্র-শিক্ষিত’ কিংবা ‘উচ্চবর্গীয়’ নাগরিক মানুষের কাছে নতুন বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। আপাত-দৃষ্টিতে তাঁকে ‘শখের বাউল’দের পর্যায়ে ফেলা হলেও তাঁর গানগুলো শেষপর্যন্ত বাঙালির বাউলসংস্কৃতির চিরায়ত ধারাকেই বেগবান করেছে। বাউল-ফকিররা যে ‘মনের মানুষ’-এর সন্ধানে ব্যস্ত থাকেন জীবনভর, সেটাই তো জসীমউদ্দীনের বাউলআঙ্গিকের গানগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। যেমনটা প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর পূর্বসূরি হাসন রাজার গানগুলোতে।
বাংলাদেশের দুই প্রান্তের দুই বাসিন্দা ছিলেন হাসন রাজা ও জসীমউদ্দীন। তাঁদের জীবনাচার ও বৈরাগ্যপন্থার মধ্যে যোজন ব্যবধান এবং অমিল পরিলক্ষিত হলেও গানের বাণীগুলোর মধ্যে একটা চিরায়ত ধারাবাহিকতা ঠিকই রয়েছে। উভয়ের বিরচিত বাউলগান দর্শনগত বিচারে চিরউদ্ভাসিত ও সমুজ্জ্বল। সেই সমুজ্জ্বল ধারা বাংলা ভাষাভাষী নাগরিক মহলে বাউলসংস্কৃতি ও তাঁদের লোকাচারকে নতুনভাবে পরিচিত করেছে, সেটাই বা কম কীসে?
