ছেগেন শাহ : তাঁর গান তাঁর কথা
ছেগেন শাহ : তাঁর গান তাঁর কথা
৩২ পৃষ্ঠার সাদামাটা একটা বইয়ের দাম ১১৫ টাকা। শুনে চক্ষু চড়কগাছ! দোকানিকে বললাম, ‘ভাই, একটু কমে পারা যায় না?’ কিন্তু দোকানি যেন কথা বলতেও রাজি নন, শুধু মাথা নেড়ে না-সূচক উত্তর দেন। এরপর আবার বললাম, ‘আমার কাছে সর্বসাকুল্যে ১০০ টাকা আছে, ১৫ টাকা কম রাখেন।’ কিন্তু দোকানির নির্বিকার উত্তর, ‘বইয়ের গায়ে দাম যা লেখা আছে, তাই দিতে হবে। এক টাকাও কম হবে না। পুষালে নেন, না হলে ভাগেন।’
দোকানির উপর অনেকটা ক্ষুদ্ধ হয়েই সেদিন ফিরে আসি। এ ঘটনার কয়েকদিন পর ওই বইটি কেনার জন্য আবারও সেই দোকানে যাই। কিন্তু বইটি আর পাইনি। দোকানি জানান, এক সপ্তাহে তাঁর দোকানের সবকটি বই শেষ হয়ে গেছে। ছাপা না থাকায় ওই বই আর আনাও সম্ভব হচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে জানলাম-ওই দোকানি এক সপ্তাহে প্রায় ২৫০টি বই বিক্রি করেছেন। তথ্যটুকু জানার পর একটু চমকে উঠি। ভাবি-কেন তাঁর বইটির এত কাটতি? মনে একটা জেদ জাগে-যেভাবেই হোক বইটি আমার চাই-ই।
পরে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের বাসিন্দা বাউলশিল্পী বশিরউদ্দিন সরকার আমাকে একটি বই সংগ্রহ করে দেন। ছেগেন শাহ প্রণীত আশেক ভান্ডার-এর দ্বিতীয় সংস্করণ, যেটি ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ প্রকাশিত হয়েছিল। বইটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ১ জানুয়ারি। বইটিতে সর্বমোট ৬৬টি গান রয়েছে। আশেক ভান্ডার হাতে আসার মাস ছয়েক পরে ছেগেন শাহ প্রণীত রিয়াজুল জান্নাত শীর্ষক অপর বইটিও আরেক বাউলশিল্পী মারফত পেয়ে যাই। এটিতে সর্বমোট ৮৪টি গান রয়েছে। দ্বিতীয় বইটি ২০০৪ সালের ১৬ এপ্রিল প্রকাশিত হয়েছিল। এর বাইরে ছেগেন শাহর রচিত আরও বেশ কিছু গান অগ্রন্থিত অবস্থায় রয়েছে বলে জানতে পারি।
বই দুটির প্রচ্ছদ বেশ আকর্ষণীয় ও ব্যতিক্রম। সচরাচর গানের সংকলনের এ ধরনের প্রচ্ছদ খুব একটা চোখে পড়ে না। গীতিকারের সুঠাম উদোম শরীরের একটি আলোকচিত্র দিয়ে প্রচ্ছদ তৈরি করা হয়েছে। থুতনিতে দাড়ি এবং কালো চুলে মোহনীয় এক চেহারা। কাপড়বিহীন উদোম শরীরে সাদা লুঙ্গি পরে পদ্মাসনে বসে রয়েছেন গীতিকার। দুটি বইয়ে একই আলোকচিত্র ব্যবহার করা হয়েছে। আশেক ভান্ডার-এর প্রচ্ছদে নীল আকাশের সাদা মেঘের ওড়াউড়ি দৃশ্যের সঙ্গে এবং রিয়াজুল জান্নাত-এর প্রচ্ছদে অসংখ্য ফুলের মধ্যে গীতিকারের আলোকচিত্র বসিয়ে প্রচ্ছদ তৈরি করা হয়েছে। আসলে গীতিকারের বই ও অবয়বের বিশেষত্ব বোঝানোর জন্যই এতসব বলা।
বইটিতে সংকলিত গানগুলো পাঠের আগে পাঠকেরা গীতিকারের এমন ব্যতিক্রমী প্রচ্ছদ দেখে একটু ভিন্ন আকর্ষণ অনুভব করবেন-সেটাই স্বাভাবিক। তবে কি সেই কারণেই বইটির এত কাটতি। কিন্তু এটা যে আমার একেবারেই ভ্রমধারণা, সেটা বইটির গানগুলো পাঠেই টের পাই। দুটি বইয়ের ভূমিকা অভিন্ন। সে অংশে ছেগেন শাহ জানাচ্ছেন, ‘গান জীবনকে দেয় সান্ত্বনা। সহায় ও সম্বলহীন ব্যর্থ জীবনে চিরসাথি গান।’ আমি ঠিক জানি না, ছেগেন শাহ গানকে আকড়ে ধরে কতটুকুই বা সান্ত্বনা পেয়েছিলেন। তবে এটা বেশ বুঝতে পারি-আমৃত্যু গানকেই চিরসাথি করে রেখেছিলেন।
ছেগেন শাহর কাছে বাউল দর্শন যে খুব স্পষ্ট, এর সপক্ষে তাঁর গানে অজস্র উদাহরণ রয়েছে। বাউলেরা ইঙ্গিত-সর্বস্ব গান রচনা করেন। তিনিও ব্যতিক্রম নন। শরিয়তি শব্দ ব্যবহার করে মারিফতি ধ্যান-ধারণার প্রতিচ্ছবি ছেগেন শাহ এভাবেই এঁকেছেন :
কেমনে শিখিবে এলমে মারিফতি কৌশল
শুন রে মনপাগল, এক-এক কলিমায় আছে শত সহস্র কল।
মন রে, চার হাজার কল আছে, কলিমা তৈয়্যবে
আর চার হাজার ত্রিশটা কল কলিমা সাহাদতে পাবে
কলিমা তাওহিদে আরও চার হাজার ৭০টি কল করতেছে ঝলমল।
মন রে, চার হাজার দুইশত কল, কলিমা তামজিদে
আট হাজার তিনশত কল দুই আমানতুবিল্লাতে
এসব হয় তাওহিদ করিতে, তাওহিদ না করিয়া মরলে
মানব জনম যায় বিফল।
মন রে, চব্বিশ হাজার ছয়শত কল, ছয় কলিমায়
ওই কল আদমের দেহে ছয় লতিফায় দমের হিসাব না রাখলায়
দমের হিসাব যে রাইখাছে সে মানুষ আসল।
মন রে, চব্বিশ হাজার ছয়শত কল, খুলতে যদি চাও
কামিল পিরের কাছে শিখ তাহার ভাও
এলমে তাছাউফের পানে চাও, ছেগেন শায় কয়
চাইতে চাইতে জীবন যায় বিফল।
গানটিতে ছেগেন শাহ মারিফতি কথায় বাউলদের ‘দমসাধনা’ পদ্ধতির রীতিনীতি উল্লেখ করেছেন। এই ‘দমসাধনা’ বা ‘শ্বাসনিয়ন্ত্রণ’ বাউলদের চিরায়ত পদ্ধতি। ‘দমসাধনা’র মাধ্যমে বাউলেরা ‘গুরুবস্তু’ নিয়ন্ত্রণ রাখেন। কামনদীর উত্তাল ঢেউ থেকে নিজেদের অটল রাখেন। আর এটাই বাউলসাধনা। বাউলঘরানার মানুষ হলেও বাউলদের কাছে ছেগেন শাহর সাধনায় একাগ্র নন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ছেগেন শাহর সমসাময়িক এবং উত্তরসূরি বেশ কয়েকজন বাউলেরা তাঁর বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগ এনেছেন। তাঁদের ভাষায় এগুলো ‘গুরুতর অভিযোগ’। প্রথমত. গুরু।মুর্শিদের মেয়ে অনেকটা ‘গুরুবোন’ হিসেবেই আখ্যায়িত। তাঁদেরকে শ্রদ্ধার চোখে বিবেচনা করাই বাউলদের প্রচলিত রীতি। কিন্তু ছেগেন শাহ সেই রীতি থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। কারণ তিনি তাঁর গুরু মারফত শাহের (সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ধাইপুর গ্রামের প্রখ্যাত বাউল-গীতিকার কালা শাহের ছেলে) মেয়ে সূর্যভানকে বিয়ে করেছেন। এটি গর্হিত অপরাধ। দ্বিতীয়ত. সূর্যভানের সঙ্গে বিয়ের পর তাঁদের নয়টি সন্তানের জন্ম হয়েছে। সংগত কারণেই ছেগেন শাহ ‘বস্তুনিয়ন্ত্রণ’ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এটি বাউলসাধনার পুরোপুরি বিপরীত।
ছেগেন শাহর বিরুদ্ধে সুনামগঞ্জ অঞ্চলের কয়েকজন বাউল-গীতিকার অভিযোগ তুলেছেন, তিনি গান রচনা করতে পারতেন না। লাল শাহ (কালা শাহর শিষ্য) নামে এক বাউল-গীতিকারের গান তিনি ‘চুরি’ করেছেন। ছেগেন শাহর প্রকাশিত গানগুলো লাল শাহর গান। তবে এসব অভিযোগের সপক্ষে তেমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ তো গেল একটি দিক, অন্যদিকে তাঁর নাম নিয়েও বেশ লোকশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। গত বছর কয়েক আগে আবৃত্তিকার অম্বরীষ দত্ত তাঁর সিলেট নগরের সুরমা পয়েন্ট এলাকায় অবস্থিত তাঁর কর্মস্থলে বসে আমাকে একটি গল্প শুনিয়েছিলেন। সেটা ছিল ছেগেন শাহকে নিয়ে।
গল্পটি এ-রকম : সেকেন্ড শাহ, মানে দ্বিতীয় রাজা। গ্রামের অশিক্ষিত মানুষজন সেকেন্ড শব্দটা উচ্চারণ করতে পারত না, বলত-ছেগেন। এভাবেই ‘সেকেন্ড শাহ’ লোকমুখে ‘ছেগেন শাহ’ হিসেবে পরিচিতি পায়। তবে এই ‘সেকেন্ড শাহ’র প্রকৃত নাম কাওসার আহমদ চৌধুরী। অনেক আগে একবার তিনি আসরে গান গাইতে গিয়েছেন। সে আসরে প্রখ্যাত বাউলশিল্পী শাহ আবদুল করিমও এসেছিলেন। করিম তখন কাওসার আহমদ চৌধুরীর গান শুনে তাঁকে বললেন, ‘আমার পরে তো দেখছি তুমি-ই ভালো গাও।’ করিম শাহের এমন প্রশংসা পেয়ে উপস্থিত সকলে কাওসার আহমদ চৌধুরীকে বাহ্না দেন এবং ‘শাহ আবদুল করিমের পরেই তাঁর অবস্থান’-করিমের এ মন্তব্যের কারণে লোকজন তাঁকে ‘সেকেন্ড শাহ’ নামে ডাকা শুরু করে দেন। এরপর থেকেই লোকমুখে ‘ছেগেন শাহ’ নামটি পরিচিতি লাভ করে।
অম্বরীষ দত্ত সেদিন এ কথাও বলেছিলেন, ‘গল্পটির সত্য-মিথ্যা জানি না। আমিও কোনও এক বাউলশিল্পীর মুখে এটি শুনেছি। চমকপ্রদ হওয়ায় তোমাকে শুনালাম। তবে ইদানীং শাহ আবদুল করিমের প্রচার-প্রচারণা এত বেশি হয়েছে যে, তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আরেকটি ঐতিহাসিক কাহিনি সাজানোর চেষ্টাও হতে পারে এটি।’ এ গল্পটি সুনামগঞ্জ অঞ্চলের বেশ কয়েকজন বাউলশিল্পীকে জানালে তাঁরা সরাসরি এটিকে ‘জালগল্প’ বলে অভিহিত করেন। তাঁদের মতে, এ গল্পটির কাহিনি পুরোপুরি মিথ্যা। কারণ জীবিতাবস্থায় ছেগেন শাহ নিজের সম্পর্কে একাধিক গালগল্প চালু করেছেন। এসব গল্প বেশ রসালো হওয়ায় দ্রুত মানুষের মুখে ছড়িয়ে পড়েছে।
বাউল-গীতিকার সয়াল শাহ বলেন, ‘সেকেন্ড শাহ ভালো দোতারা বাজাতেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ এতটা ভালো ছিল না। তাই সে ভালো গান গায়-এ ধরনের কথা শাহ আবদুল করিম কখনওই বলতে পারেন না। এটি একটি বানানো গল্প। আমি নিজেই একদিন শুনেছি-বাবা (শাহ আবদুল করিম) সেকেন্ড শাহকে বলেছেন, “তোর নামই তো ছেগেন, পাস অইবে কেমনে? তর আগের নামটা-উ তো ভালা আছিল, ছেগেন শাহ রাখলে কেনে?” এ-কথায় বোঝা যায় এই নামটি শাহ আবদুল করিমের দেওয়া নয়।’
সয়াল শাহ আরও বলেছিলেন, ‘হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার স্নানঘাট এলাকায় সেকেন্ড শাহর প্রকৃত বাড়ি ছিল। তিনি পল্লি চিকিৎসক ছিলেন। সেখানে এক নারী-ঘটিত বিষয়ে জড়িয়ে তিনি বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন। এরপর দিরাইয়ের ধাইপুর গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করে মারফত শাহের শিষ্যত্ব নেন।’
বাউল-গায়ক বশিরউদ্দিন সরকার জানান, মোবারক শাহর পিতা ছিলেন প্রখ্যাত বাউল-গীতিকার কালা শাহ। হয়তো তাঁর ছেলের শিষ্য হিসেবে কাওসার আহমদ চৌধুরী নিজের নাম রেখেছিলেন সেকেন্ড শাহ। তবে উপর্যুক্ত তথ্যগুলোর সত্য-মিথ্য কোনওটাই নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু যে ব্যক্তিটিকে নিয়ে সুনামগঞ্জের খোদ বাউলশিল্পী ও গীতিকারদের মধ্যে এত লোকশ্রুতি এবং পক্ষে-বিপক্ষে এত মাতামাতি, তাঁর সম্পর্কে যে কারোরই কৌতুহল সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক।
সেই কৌতূহল থেকে ধীরে ধীরে ছেগেন শাহর পরিবারের সদস্যদের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা চালাই। সেই চেষ্টার বহুদিন পর জালাল মিয়ার সঙ্গে কথা হয়। তাঁর বাড়ি সুনামগঞ্জের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পাগলাবাজারের কান্দিগাঁও গ্রামে। তিনি ছেগেন শাহর জামাতা। তিনি জানালেন, তাঁর শ্বশুর (ছেগেন শাহ) ১৪১৩ বঙ্গাব্দের ১৪ আষাঢ় (২০০৭ খ্রিস্টাব্দ) বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় মৃত্যুবরণ করেছেন।
জালাল মিয়ার কাছ থেকে ছেগেন শাহের নয় সন্তানদের নামও জানতে পারি। তাঁরা হচ্ছেন : হেলেনা আক্তার, রিপন আক্তার, শামীম শাহ, লাকী আক্তার, নিশ্চপা আক্তার, পাভেল শাহ, জোসেফ শাহ, জুবায়েদ শাহ ও লক্ষী আক্তার। সত্যিকার অর্থে ছেগেন শাহর নয় সন্তানের কথা শুনে আমি নিজেও একটু অবাক হই। আমার অবাক হওয়ার পেছনে একটা যুক্তিযুক্ত কারণও রয়েছে। কারণ আমি তাঁর রচিত একটা বিখ্যাত গানের কথা জানি। নারীর রজঃ বিকাশকালীন সময়কে কেন্দ্র করে গানটির শরীর গঠিত। আর এটি হচ্ছে বাউলদের সাধনতত্ত্বের অতিগুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।
আমি বুঝে উঠতে পারি না-যে গীতিকার লিখতে পারেন ‘দলিল মতে নিষেধ জানি’, তাহলে দমসাধনায় প্রাজ্ঞ সেই ব্যক্তি কেনইবা নয় সন্তান জন্ম দেবেন? অথচ ‘বস্তুনিয়ন্ত্রণ’-এর পুরো কৌশল কত সহজেই না তিনি রপ্ত করেছেন এবং বর্ণনাও করেছেন :
হর রঙের রঙিলা বন্ধু, থাকইন রূপের ঘরে লো সজনী সই
সই লো আমার বন্ধে কতই না রং ধরে।
সই লো সই, স্বরূপ দেশে রূপের ঘর, সে দেশ হয় উজানি শহর
শুন খবর কই আমি তোমারে
সেই দেশের নদীর পানি বারো মাস চলে উজানি
বৎসরে ৩৬ দিন ভাটা পড়ে লো
সজনী সই আমার বন্ধে কতই না রং ধরে।
সই লো সই, প্রতি মাসে প্রতি চান্দে
তিন দিন আমার সোনা বন্ধে, ভাটার গাঙে লাই খেলা খেইর করে
এইদিন ফকির, দরবেশ, যোগী ঋষি, যারা সেই রূপের তাপসী
ওই দিবসে তারা যাত্রা করে লো সজনী সই।
সইলো সই, দলিল মতে নিষেধ জানি, এসব কথা হয় বাতুনী
কইলে সইরতের লাঠি ঘুরে, ভান্ড দেখে থাকিলে সই
মিলিবে না ছাক্কা দই, ডাকনি সরাও, পিপাসায় যার ধরে।
সই লো সই, চব্বিশ হাজার ছয়শত ফুল, তুলিতে যার হয় না ভুল
দমসুরতে সে মালা গাঁথতে পারে
নামের হলদি গায়ে মাখিয়া, সেই মালা গলে পড়িয়া
বন্ধু নিয়া খেলে প্রেমসাগরে লো সজনী সই।
সই লো সই, পির মুর্শিদের মুখের বাণী, শুইনা কত হইছে ধনী
মহাজনী করে এই সংসারে
এ ছেগেন শাহ প্রেমভিখারি, দুধের মাখন লইতে নারি
আমার হাতে মন্থন নাহি ঘুরে।
একইভাবে তিনি লিখেছিলেন-‘কোন সাহসে নাও বাইতেছ ভব দরিয়ায়। পাক পানিত পড়লে নাও বাঁচানো বিষম দায়’। কিংবা ‘প্রেম যমুনায় দুইটি নহর, ১৩ নদী সপ্ত সাগর কুল নাই অকুল। চন্দ্র সে তো নহরে যাত্রা, লগ্ন তিথি যেন হয় না ভুল। দমে দমে যোগ করিয়া, চন্দ্র ধরার জাল বুনিয়া। প্রেমের মস্তুলে বাদাম তোল। অনুরাগ বাতাসে নিবে, যেথায় সে ফুলেরই মুল। ফুলের মুলে একটি নারী, আছে নবরঙ্গের সাজ ধরি। রসিক পেলে হয়ে যায় আকুল। তারে করলে বাধ্য, সব হয় সাধ্য, অকুলেতে মিলে কুল।’
আবার আরেকটি গানে বলছেন-‘পূর্ণিমা অমাবস্যা তিথি অনুসারে। শুদ্ধ জন্ম যে জনার সুলগ্নে যাত্রা করে। মুর্শিদের কৃপা আছে যার, মন্ত্র জানে চন্দ্র ধরার। অঙ্গে মাখিয়া সে রং সঙ্গে ভাসে। এশ্ক জলে চন্দ্র উদয়, প্রতি বৎসর ৩৬ দিন। মণিপুর মহত্ত্ব বিধান, সাধকের শুভ দিন। কামে প্রেমে সংযুক্ত, নিত্য ধামে হয় নিত্য। মত্ত মত্ত সাধু প্রেমবিলাসে।’
ছেগেন শাহ বলছেন-‘দমের কারবার, কর দমের বিচার’। ‘দমের বিচার’ করতে হলে ‘চন্দ্র ধরার জাল’ বুনতে হবে। তবেই কেবল রসিক মানুষ লগ্ন-তিথি মেনে ‘প্রেম যমুনায়’ জাল ফেলতে পারবেন এবং তবেই ‘পঞ্চরসে’ যে ফুল ফোটে, সেটার সন্ধান পাবেন। তাই ছেগেন শাহর উক্তি :
প্রেম যমুনায় পঞ্চরসে ফুটে সেই ফুল
সে ফুলে হয় চন্দ্র উদয় দেখবে যদি পর্দা খোল
ফুটে সেই ফুল।
প্রেম যমুনায় দুইটি নহর, ১৩ নদী সপ্ত সাগর
কুল নাই অকুল, চন্দ্র সে তো নহরে যাত্রা
লগ্ন তিথি যেন হয় না ভুল।
দমে নামে যোগ করিয়া, চন্দ্র ধরার জাল বুনিয়া
প্রেমের মস্তুলে বাদাম তুল
অনুরাগে টেনে নিবে যেথায় সেই ফুলেরই মুল।
ফুলের মুলে একটি নারী, আছে নব রংয়ের সাজাও দরি
রসিক ফেলে হয়ে যায় আকুল, তারে করলে বাইন্ধ
সব হয় সাইন্ধ, অকুলেতে মিলে কুল।
অকুলেতে ফুল আছে যার, তার ললাটে চান্দের বাজার
হুরি নূরি তার প্রেমে মশগুল
ছেগেন শায় পর্দা তুলিয়ে, গলে তার কলংকের ঢুল।
এসব তত্ত্বকথা জেনেও কেন ছেগেন শাহ ‘বস্তুনিয়ন্ত্রণ’ করতে পারেননি, সেটাই অপরাপর বাউলশিল্পীদের জিজ্ঞাসা। আপাতদৃষ্টিতে যদিও এই জিজ্ঞাসার কোনও সদুত্তর নেই, তাই বলে ঠিক এ কারণে ছেগেন শাহকে বিচ্ছিন্ন করারও উপায় নেই। কারণ তত্ত্বগত বিচারে তাঁর রচিত গানগুলো বাউলতত্ত্বের এক উল্লেখযোগ্য আকর হিসেবে বিবেচ্য হতে বাধ্য। ‘কামসাগর’-এর ‘কামকুম্ভীর’ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য ছেগেন শাহর উক্তি :
পাগল মন, মন রে, কামসাগরে ধইরাছ পাড়ি
দিয়েছে ধন, মুল মহাজন হারাইবে ডুবলে তরি
কামসাগরে ধইরাছ পাড়ি।
কামসাগরে কামকুম্ভীরে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুরে-ফিরে রে
অসময় পাইলে নাইয়া রে নিয়া যায় ঘাড়ে ধরি।
সাগরের নাই কুলকিনারা, গহীনে তার বহে দাঁড়া রে
অমাবশ্যা পূর্নিমা ছাড়া, বেদিশা হয় বেপারি।
ছেগেন শায় কইন ও ভাই নাইয়া
কানালে যাও শুন ধরাইয়া রে
পাকপানি যাইবে কাটিয়া, পলকে ঝলক মারি।
ছেগেন শাহর গানগুলো বিভিন্ন পর্যায়ে বিভক্ত করা যায়। যেমন-নিগূঢ়তত্ত্ব, মুর্শিদি, কামতত্ত্ব, পারঘাটাতত্ত্ব ও বিচ্ছেদ। তাঁর অধিকাংশ গান বাউলতত্ত্বে ভরপুর। সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের বাউল-গীতিকারদের মধ্যে বিচ্ছেদ গান রচনার প্রবণতা একটু বেশি হলেও ছেগেন শাহ সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। বিচ্ছেদ গান যে একেবারেই লেখেননি, তা নয়। তবে সেসব পর্যায়ের গান তিনি পরিমাণে খুব অল্পই লিখেছেন।
এ মুহূর্তে তাঁর রচিত বহুল প্রচলিত একটি বিচ্ছেদ গানের কথা মনে পড়ছে। এটি হচ্ছে-‘আমি ফুল তুমি ভ্রমর, মধু করো পান। তোমারে বুকে লইয়া, জুড়াইব প্রাণ’। ছেগেন শাহ নিজে ফুল সেজে ভ্রমররূপী বন্ধুকে মনপ্রাণ-জীবনযৌবন সঁপে দিতে চাইছেন। এমন উদারতা কজনই বা দেখাতে পারেন? আরও একটি গানের প্রথম চারটি পঙ্ক্তি আমার আগে থেকেই জানা ছিল। কিন্তু এটি যে তাঁর রচিত-তা জানতাম না। পরে খোঁজ নিয়ে দেখি, গানটি আশেক ভান্ডার-এর ৩৯ নম্বর গান। পুরো গানটি নিচে উদ্ধৃত করছি :
আইলায় না পরানের বন্ধু রে আরেও বন্ধু দেখলায় না আসিয়া
কোন পরানে আছ তুমি, দাসী রে ভুলিয়া বন্ধু রে।
আসবে বলে কথা দিলা রে বন্ধু, না আসিলায় ফিরিয়া
আমায় পাসরিলায় তুমি, কোন রমনী পাইয়া বন্ধু রে।
তোমার কথা মনে হলে রে বন্ধু, বুক ভাসাই কান্দিয়া
তোমার আসার পথে চাইয়া থাকি, আমি অভাগিয়া বন্ধু রে।
তুমি যদি ভুলো আমায় রে, ওয়রে বন্ধু আমি না ভুলিব
দেশ বিদেশে পাগল বেশে তোমার প্রেমের গান গাইব বন্ধু রে।
এ ছেগেন শাহ ভবে আছি রে, ওয়রে বন্ধু জিতে মরা হইয়া
পরাণনি হইব বাহির, তোমার চান্দমুখ দেখিয়া বন্ধু রে।
ছেগেন শাহর বিচ্ছেদ পর্যায়ভুক্ত গানে তাঁর পূর্বসূরি বাউল-গীতিকারদের ব্যাপক প্রভাব লক্ষণীয়। তবে তাঁর বাউলতত্ত্বকেন্দ্রিক গানগুলো সে দোষে মোটেই দুষ্ট নয়, বরং এগুলো একেবারেই প্রভাবমুক্ত থেকে তিনি রচনা করেছেন। বাউলসাধনার দর্শন ঠিক রেখে তিনি নিজের মতো করে গানের পঙ্ক্তি রচনা করেছেন। ‘রসিক মানুষ’ই কেবল এসব গানের গূঢ়ার্থ ভেদ করতে পারবেন। ছেগেন শাহর গানগুলোকে ‘বিচিত্র’ উল্লেখ করে তাঁর দুটি বইয়ের সর্বশেষ সংস্করণের প্রকাশক শেষ প্রচ্ছদে গীতিকার সম্পর্কে কিছু বক্তব্য উল্লেখ করেছেন, যা এ-রকম:
সংগীত হচ্ছে প্রকৃতির মাতৃভাষা। যারা ভাবের ভাবিক, মনের মানুষের সন্ধানে যারা গৃহত্যাগী, শয়নে স্বপনে যাদের মন মানসিকতা সতত ভাবিত থাকে আমার শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব জনাব মো. কাওসার আহমদ ওরফে ছেগেন শাহ তাঁদেরই একজন। বিচিত্র ভাবধারার অশেষ গানের জনক জনাব ছেগেন শাহ দীর্ঘদিন যাবৎ মারফতি, আধ্যাত্মিক, দেহতত্ত্বসহ বিভিন্ন প্রকার গান রচনায় সক্রিয় রয়েছেন।
তিনি সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার স্নানঘাট গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত চৌধুরী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম মনিরউদ্দিন চৌধুরী ওরফে মনির মিয়া এবং মাতার নাম মরহুমা কুতুবুন নেছা চৌধুরী কলি। মাসুক প্রেমে বিভোর সাধক পুরুষ ছেগেন শাহর গান ভাবুক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করুক, পথহারা পথিক ঐসব গান থেকে সঠিক পথে আবর্তিত হোক।
উপর্যুক্ত লেখায় আশেক ভান্ডার ও রিয়াজুল জান্নাত গ্রন্থ দুটির প্রকাশক মো. আবদুল খালিক ছেগেন শাহর গানের পর্যায় সম্পর্কে প্রচ্ছন্ন একটা ধারণা দিয়েছেন। ওই লেখক জানিয়েছেন, মনের মানুষের সন্ধানে ছেগেন শাহ ছুটে চলেছেন। এ কথার সপক্ষে ছেগেন শাহর গানগুলোই যথেষ্ট। যদিও সুনামগঞ্জের অনেক বাউল-গীতিকার ও শিল্পী ছেগেন শাহর আচরণকে বাউলবাদী ধারার সঙ্গে তুলনা করতে নারাজ।
জানতে পারি, ছেগেন শাহর জীবদ্দশাতেই তাঁকে নিয়ে নানামুখী প্রচারণা ও লোকশ্রুতি প্রচলিত ছিল। কিন্তু তিনি নাকি সেসব ভ্রুক্ষেপই করতেন না। তাঁর চলাফেরা ছিল অনেকটা বেপেরোয়া। তবে এটা সব বাউল-গীতিকার এবং ফকিরেরা মানেন যে, নিজের ভেতরের যে সত্তা, তার অনুসন্ধানে ছেগেন শাহ সর্বদা নিরলস সাধনা করে গেছেন। অবশ্য তাঁর গানের মধ্যেও সে ধারণা পাওয়া যায়। তিনি এক গানে লিখেছিলেন-‘আমি আমাকে যদি নাহি চিনিলাম। আমাতে লুকিত আমি নাহি দেখিলাম। তোমাকে আমি কেন এত সঁপিলাম’।
এ জিজ্ঞাসা নিয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আত্মানুসন্ধানে অবিরত ছুটে চলা ছেগেন শাহর গানের পঙ্ক্তিগুলো এখনও সিলেট অঞ্চলে বেশ আলোচিত-সমালোচিত। তাঁর ব্যক্তিজীবন এবং গান-দুটোই ক্রমশ উত্তরসূরি বাউল-গীতিকার ও ফকির এবং বাউল-গবেষকদের কাছে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। শেষপর্যন্ত এ আগ্রহ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তাই এখন দেখার বিষয়।
