বীজেতে বীজ রোপণ করি, গঠন হইল মানবতরি – সুমনকুমার দাশ
বীজেতে বীজ রোপণ করি, গঠন হইল মানবতরি
এই যে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন, সংসার করছেন। আবার বাউলগান লিখছেন। এতে সবকিছু মিলিয়ে নিজের মধ্যে কি কোনও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে না?
-কিসের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব? ঘরসংসার করেই বাউলগান লিখছি। বেশভূষা ধরে বাউল হওয়ার কী আছে? মনের আনন্দে বাউলগান লিখি। বাউল দর্শনটা তো মনের মধ্যে লালন-পালন করি। মন যখন আনচান করে তখন দোকান-টোকান বন্ধ করে আখড়া বা বাড়ির পাশের শাহপরান মাজারে চলে যাই। সেখানে ফকির-সাধুদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করি। মন তৃপ্ত হলে আবার চলে আসি। ইচ্ছে হলেই গান লিখি। কখনও-সখনও মনের খেয়ালেই এক-দুইটা গানে সুরও দিই। এটাই আমার জীবন। আপনারা কে কী ভাবলেন, সেটা আমার যায় আসে না। কে কি বললো, না-বললো সে বির্তকে গিয়ে আমার লাভটা কী?
পরিচয়ের পর সামান্য কুশল বিনিময় শেষে প্রবীর দেবনাথের সঙ্গে এটাই ছিল প্রথম কথাবার্তা। তাঁর সম্পর্কে কিছু বলার আগে প্রবীর দেবনাথের কাছে কেনই বা এলাম, তা একটু খোলাসা করে বলি। আমার ঘনিষ্ঠজন কবি সঞ্জয় কুমার নাথ ২০০৫ সালের দিকে জানিয়েছিলেন, ‘সিলেট শহরতলির শাহপরান গেট এলাকায় প্রবীর দেবনাথ নামে এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে বাউলগান লিখছেন, চর্চা করছেন।’ এ কথার সূত্র ধরে তাঁর কাছ থেকে ঠিকানা সংগ্রহ করে শাহপরান গেট এলাকায় গিয়েছিলাম। কিন্তু ঠিকানামাফিক এসে তো রীতিমতো থ বনে গেলাম। যে লোকটির সঙ্গে পরিচয় হলো, তাঁকে দেখামাত্রই ভিমড়ি খেলাম! এখানে আসার আগে মনে মনে তাঁর সম্পর্কে একটা আদল তৈরি করে ফেলেছিলাম। কিন্তু এ ধরনের একজন লোকের সঙ্গে পরিচিত হব, সেটা আমার ধারণার বাইরে ছিল। মনে মনে আওড়ালাম-এ আবার কেমন বাউল-গীতিকার?
স্টেশনারি দোকানে প্রচুর জিনিসপত্রে ঠাসা। খোচা খোচা কাচা-পাকা দাড়িসমেত পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সের ব্যক্তি। রীতিমত নাগরিক জীবন-যাপন করছেন। ক্রেতা এলে জিনিসপত্র বিক্রি করছেন। যখন ক্রেতা থাকেন না, তখন ক্যাশবাক্সের উপর রাখা রোলটানা বাইন্ডিং খাতা বের করে গান লিখছেন। এই হলেন প্রবীর দেবনাথ। সেদিন ঘণ্টা ছয়েক আলাপ হয়েছিল। আলাপ-আলোচনায় মনে হলো-নাগরিক জীবনে তিনি বসবাস করছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মন পড়ে রয়েছে ভাবজগতে।
এই ‘ভাবজগতে’র ব্যাখ্যা শোনা যেতে পারে প্রবীর দেবনাথের কথাতেই। তাঁর মতে, ‘ভাবনার কী শেষ আছে? ভাবতে ভাবতে জীবনের প্রায় পুরো সময়টাই তো কাটিয়ে দিলাম। কিন্তু হলোটা কী? এখন পর্যন্ত তো আসল মানুষের সন্ধানই পেলাম না। হয়তো আরও আরও সাধনার প্রয়োজন।’ কথা শেষ করে তিনি গাইলেন :
বীজেতে বীজ রোপণ করি
গঠন হইল মানবতরি
কী আজব কারিগরি বাহারি তার নমুনা।
জল অনল মন্দ ভালো
আছে আঁধার আছে আলো
নিখুঁতভাবে যোগ করিল
পঞ্চ রথের স্থাপনা।
ছেড়ে দিলো আমার বলে
তিল মাত্র বাতাসে চলে
চলে না মন ভুলে গেলে
তামাদি কেউ রবে না।
হাড় মাংস জোড়া জোড়া
চতুর্দিকে দিয়া বেড়া
প্রবীর কয় রাখিল খাড়া
এ দেহ মন্দিরখানা।
গান শেষে প্রবীর দেবনাথ নিজে থেকেই তাঁর গানের ব্যাখ্যা জানালেন এভাবে : ‘নারী পুরুষের দৈহিক মিলনের ফলে দুই মহাশক্তি শুক্র মিলিত হয়ে মাতৃগর্ভে সন্তান জন্ম নেয়। আর তাই আমি বলেছি-বীজেতে বীজ রোপণ করি। গঠন হইল মানবতরি। একজন মানুষের দেহের গঠনপ্রাণালী খুঁজলে পৃথিবীর সকল কিছু এই ভান্ডে পাওয়া যাবে। ভালো-মন্দ, আঁধার-আলো সব এই দেহে আছে। দেহের নমুনাখানাও বাহারি। এক জোড়া নয়ন, নাক, কান, হাত, পা ও মাথা সবকিছুই দেখার মতো। এসব মিলেই আমাদের দেহের মধ্যে পঞ্চরথের স্থাপনা। অন্যদিকে এই সুন্দর দেহের ভেতর ছয় রিপুর বাস। কাম, ক্রোধ, লোভ, অহংকার, হিংসা ও বল। পঞ্চরথকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হলে ছয় রিপুকে বশে আনা দরকার। তবেই দেহ মন্দিরের পূর্ণতা পাবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না এই পৃথিবীতে কেউ থাকার জন্য আসিনি। সব ছেড়ে একদিন ঠিকই চলে যেতে হবে।’
এভাবেই প্রবীর দেবনাথ সেদিন আমাকে বেশ কয়েকটি গান শুনিয়ে সেগুলোর ব্যাখ্যা শুনিয়েছিলেন। আমি যতই শুনছিলাম ততই অবাক হচ্ছিলাম। দেহতত্ত্ব নিয়ে তাঁর জ্ঞানের পরিধি আমাকে মুগ্ধ করে। তিনি বলতে থাকেন, ‘আমি মনে করি মানব দেহ চার ভাগে বিভক্ত। সব উপরের তলায় “অফিস”, মানে মস্তিষ্ক। আর এখান থেকেই সমস্ত দেহ পরিচালনা করা হয়। পরের তলায় “মেশিন ঘড়ি হৃদপিন্ড”, সেখানে দিবারাত্রি কর্ম চলছে, তার সঙ্গে সব তলায় যোগাযোগ রয়েছে। এখানে বিদ্যুতের কোনও ঘাটতি নাই। দু তলায় বর্জ রাখা হয়, পাকস্থলিতে মলমূত্র জমা হয়, মাঝে মাঝে তা পরিষ্কারও করা হয়। এই ঘরের কর্মচারীরা নিজের দায়িত্বে নিজের কাজ করে তাই কোনও ঝামেলা হয় না। মাত্র দুটি স্পিংয়ের ওপর ভর করে মাটির ঘরখানা দাঁড়িয়ে আছে। আর এ নিয়ে আমার একটা গান রয়েছে।’ কথা শেষেই তিনি গান ধরেন :
মাটির একখান ঘর বানাইল দিয়া সেথায় চার তলা
তলায় তলায় কর্ম চলে কর্মচারীর কর্মশালা।
উপর তলায় অফিস কারী
পরের তলায় মেশিন ঘড়ি
সব তলায় যোগাযোগ করি বিদ্যুৎ যায় না এক বেলা।
দু তলায় তার বর্জ রাখে
সূচি করে ফাঁকে ফাঁকে
নিজের কর্ম নিজে দেখে নাই সেথায় ঝামেলা।
দুই স্পিংয়ে করি ভর
রইল খাড়া মাটির ঘর
প্রবীর বলে জুড়ায় অন্তর দেখে চূড়ান্ত শিল্পকলা।
এরপর তিনি আরেকটা গান ধরেন :
ঠাটার মেশিন পড়ল ঠাটা ধাক্কা দিলে চলে না
হাওয়ার গাড়ির গেলে বাতাস কারিগর আর মিলে না।
অঙ্গ হইল ঝরো ঝরো পড়িতে চায় খসিয়া
চালাতে গিয়ার লাগে সেও গেল ফাঁসিয়া
জোড়ায় জোড়ায় ক্ষয় ধরেছে চাকায় বাতাস ধরে না।
ফুরাইল মেয়াদের কাল শেষ হইল গণার সাল
প্রবীর কয় লাগিল তাল চোখ-কান হইলো কাল
চুল পাকিল গাল ভাঙিল বিদায় নেওয়ার ভাবনা।
গান শেষে বরাবরের মতো ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন : ‘মানুষ যখন বৃদ্ধ হয় তখন দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে পড়ে। বৃদ্ধ বয়সে চোখের জ্যোতি কমে যায়। শরীর হয়ে পড়ে দুর্বল, চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তখন দেহের মেয়াদ ফুরিয়ে যায়, জোড়ায় জোড়ায় ক্ষয় ধরে। শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এই গানের কথাগুলো বৃদ্ধ সময়ের ভাবনা থেকেই এসেছে। মানবদেহের চলাফেরার জন্য অক্সিজেন অতি প্রয়োজন। তাই দেহটাকে হাওয়ার গাড়ি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই গাড়ির কারিগর পাওয়া যায় না। ঠাটার ইঞ্জিন পড়ছে ঠাটা এই কথাটা আমার ক্ষুব্ধতার বহিঃপ্রকাশ।’
এই গানের ব্যাখা শেষে তিনি টেবিলের উপর রাখা একটি প্লাস্টিকের বোতল থেকে কয়েক ঢোক পানি পান করলেন। মুখ মুছে পুনরায় বলা শুরু করলেন : ‘আপন দেহ নিয়ে বাউলদের ভাবনার শেষ নেই। এই দেহের ভিতরে কত আজব র্মকান্ড চলছে। বাইরেও তার আজব র্মকান্ডের অভাব নাই। বলতে পারেন? কোথা হতে ভয় আসে, কোথা হতে গায়ে বল আসে? কেনই-বা কাঁদলে নয়নে জল আর লোমক‚প দিয়ে ঘাম আসে? ক্ষুধা লাগলে টের পাওয়া যায়, কান পাতলে শোনা যায়, চোখ দিয়ে দেখা যায়। এভাবে আরও কত আজব আজব র্মকান্ড এই দেহে আছে তা বলে শেষ করা যাবে না। তবু কেন জানি ভাবি-আরও ভাবার বিষয় আছে। কিন্তু ভাবতে ভাবতেই শেষ। হয়তো আত্মরসে ডুবে যাওয়া, নয়তো একেবারে শেষ হয়ে যাওয়া।’ তারপর তিনি বললেন, এসব ভেবেই লিখেছিলাম :
ভাবতে বড়ো অবাক লাগে
আপন দেহের ফলাফল
কোথা হতে জাগে ভয় কেমনে হয় দেহে বল।
রক্ত মাংসে দেহ গড়া
লোমে লোমে ছিদ্র করা
বারণ তবু লোদি ঝরা
কাঁদলে নয়ন ভরা জল।
ক্ষুধা পাইলে পাই তাড়া
আনন্দে হৃদয়ে নাড়া
কান পাতিলে পাই সাড়া
এ যেন এক আজব কল।
বিচারিয়া দেখি কত
আরও আজব অবিরত
প্রবীর বলে ভাবি যত
ভেবে ভেবে রসার তল।
এই গান শেষ করেই প্রবীর দেবনাথ আবার ধরলেন :
ও মন একবার ভাব নিরলে
কেন ভবে আসিয়াছ কী হবে মরিয়া গেলে।
কোথা হইতে আইলে তুমি কোথায় আবার যাবে জানি
দেহে কেমনে থাকে প্রাণি আবার কোথায় যায় চলে।
অল্প বাতাস আসে যায় দুই ছিদ্র রয় নাসিকায়
আবার মরলে বাতাস কোথায় যায়, মাথা ঘুরায় ভাবিলে।
পরিবর্তন দেহ দেশে শিশু কিশোর জোয়ান বেশে
বৃদ্ধ হলে মরণ আসে আশা নাই আর থাকব বলে।
প্রবীর বলে নয় কেউ স্বাধীন দেহে পাখি ভাসিলে ভিন
আসে না আর গেলে সেদিন তবু থাকি আশার ছলে।
গান শেষে পদের ব্যাখ্যাও শোনালেন। তিনি বললেন, ‘নিজের মনকে নিরিবিলি ভাবতে বলেছি। এ দেহে কোথা থেকে প্রাণ এলো, আবার কোথায় চলে যাবে? মরে গেলে পরে কি হবে এইসব। তারপর এই দেহের পরিবর্তন সম্বন্ধেও মনের নানান প্রশ্ন স্থান দিয়েছি। শিশু হতে কিশোর যুবক তারপর বৃদ্ধ, পরে মরণ, এসব কেমন করে হয়? আমরা কেহ নয় স্বাধীন, পরান পাখি ভাসিলে ভিন। সব জেনে শুনেও জড় জগতে বেঁচে থাকার সাধ ফুরায় না। আরও বেঁচে থাকতে মনে আশা থাকে। কিন্তু তারপরও হতাশা, আপন মন কি বলে দেবে এই প্রশ্নের উত্তর?’
আমাকে কথার কোনও সুযোগ না দিয়েই প্রবীর দেবনাথ গান ধরেন :
যে দিন পাখি যাবে ছাড়ি ভাঙিয়া তোর আপন বাড়ি
সজনে সকলে মিলে লইয়া বাসের পালকিতে
শ্মশানপুরে লইয়া যাবে আপন কর্ম সারিতে।
ভবের হাটে ঘুরি ফিরি খালি হাতে যাবে ফিরি
অকূলে ভাসাইলে তরি কেমন করে দিবে পাড়ি
রঙ্গে আছে দেখি কত সঙ্গে নাই কেউ যাইতে।
খাঁচায় পুরা আছে পাখি কোনদিন জানি দিবে ফাঁকি
বুঝবে যখন দুইটি আঁখি শুনবে না কেউর ডাকাডাকি
প্রবীর কয় দেহখানা পড়ে রইবে মাটিতে।
গান শেষে বরাবরের মতো আবার বিশ্লেষণ করলেন। এ গানের সারমর্ম বিষয়ে তাঁর ভাষ্য : ‘যে দিন পাখি যাবে ছাড়ি মানে দেহ থেকে যে দিন প্রাণবায়ু বাহির হয়ে যাবে, তখন আর ক্ষণিকের জন্য স্বজনরা রাখতে চাইবে না। যত তাড়াতাড়ি পারা যায় শ্মশানের দিকে নিয়ে যাবে শেষকৃত্যের জন্য। এই ভববাজারে কত লেনাদেনা, চেনাজানা হয়েছে, তার কোনও শেষ নেই। তবু যাবার বেলা খালি হাতে যেতে হয়। প্রাণপাখি দেহ ছেড়ে চলে গেলে ডাকিলেও কেউ শুনবে না। তাই বলা হয়েছে-রঙ্গে আছে দেখি কত সঙ্গে নাই কেউ যাইতে। দেহে প্রাণবায়ু থাকতে কত মায়া মমতা ছিল, কত রং আমেশ করেছি, এখনও আমি চলে গেলে কি হবে? কেউ কেউ রং আমেশ ঠিকই করছে। কিন্তু সঙ্গে যাবার কেউ নাই। দেহ ছেড়ে পাখি যখন উড়ে যাবে, সোনার দেহ পড়ে রবে মাটিতে। এইতো আমাদের মানবজীবন; ভবে একা আসা একা যাওয়া আবার খালি হাতে।’
প্রবীর দেবনাথের কাছে দেহতত্ত্বের গান শুনে দেহ নিয়ে তাঁর নিজস্ব অনুভূতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ আরও তীব্র হয়ে উঠল। দেহ নিয়ে তাঁর ভাবনাগুলো একটা কাগজে লিখে দিতে অনুরোধ জানিয়েছিলাম। প্রথমে রাজি না হলেও পরে আমার অনুরোধে রাজি হন। দিন দুয়েক পর তিনি সেই কথাগুলো একটি কাগজে লিখে আমার কাছে দিয়েছিলেন। কোনও ধরনের পরিবর্তন না করে সেটা হুবহু তুলে দিলাম:
‘যাহা আছে স্মান্ডে তাহা আছে কলেবরে।’ সাধনতত্ত্বের একজন মান্য ব্যক্তির এই কথা উচ্চারণ করলেই বুঝা যায়, তার মাহাত্ম্য। সাধক-সুফি-মুনি-ঋষি-গুরু-মুর্শিদরাও ভক্তদের দেহসাধনার উপদেশ দিয়ে থাকেন। সামান্য জ্ঞানে উপলব্ধি করলেই বোঝা যাবে-কলেবরে, মানে মানবদেহে সৃষ্টির সকল খুঁজতে জানলে এখানেই মিলিবে সকল। সাধনতত্ত্বে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও দেহ নিয়ে সকলেই এক কথা বলেছেন। কারও কোনও দ্বিমত নাই।
দেহমূলে স্থানগুলো বিচার করলে দেখা যায়, সমস্ত দেহ জুড়ে রয়েছে অসংখ্য নাড়ি আর রয়েছে নাভি, হৃদয়, কণ্ঠ ও মস্তক। এই অসংখ্য নাড়ির মধ্যে তিনটি প্রধান। সাধনতত্ত্বে এই তিন নাড়ির নামও রয়েছে। এই নাড়িগুলোকে বলা হয় বা তুলনা করা হয় নদীর সাথে। প্রধান তিন নাড়ি মহানদী আর সবগুলো উপনদী। প্রধান তিন নাড়ির নাম : গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতী অথবা ইরা, পিঙ্গলা ও সুষুম্ন বলা হয়। এই তিন নাড়ি পথে রক্ত, বায়ু, শুক্র, রজঃ, জল চালিত হয়। আবার শুক্র রজঃ রক্ত মিশ্রণে বিষামৃত হয় আর ইহাই জীবনীশক্তি। কাম, প্রেম, রস, রজঃ, রতি, ধ্বংস ও সৃষ্টি, জীবনীশক্তি হতে হয়ে থাকে। উপনদীগুলিতেও রক্ত, নীড়, ক্ষির প্রবাহমান।
বায়ু ও বায়ুর নিয়ন্ত্রণের শক্তি অর্জনের মাধ্যমে দেহের উপর কর্তৃত্ব জন্মায়। শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে নিয়ন্ত্রণের দ্বারা পবনকে নিয়ন্ত্রণ করলে গোটা দেহে বল আসে। আবার দেহ সুস্থ রাখার জন্য সাধনতত্ত্বে যোগ ব্যায়ামকেও প্রাধান্য দেওয়া হয়। যোগব্যায়ামের মাধ্যমেও কামশক্তিকে বশ করা সম্ভব।
যাই হোক সে কথায় পরে আসি। আমরা অনেক শুনেছি স্বামী বিবেকানন্দের বাণী-‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ তিনি সব কিছুকে তুচ্ছ করে একজন মানুষকে সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। তার কারণ হলো মানুষের কাছে মিলিবে সকল মানুষেতে সার। আর যত প্রবঞ্চনা খোঁজাও অসার। মানুষ জ্ঞান মানুষ বুদ্ধি, নিজে জানি জানায় যদি। আপনে খুঁজিব যবে, সৎজনের কাছে যাবে, যা পাবে সত্য পাবে অদ্য মধ্য আদি। তাহলে পাহাড় পর্বত ঘুরে না মরে একজন সৎ মানুষের সান্নিধ্য লাভ করতে পারলেই হয়, সেখানে সকল মিলায়।
আমাদের সকলেরই সাধনা করার দরকার। কারণ সাধনা ছাড়া সুফল ভোগ করা যায় না। আর দেহসাধনা সে তো বিশাল ব্যাপার। সকলের মঙ্গলের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা। দেহসাধনার ফলে কাম শক্তি লোপ পায়, জন্ম রোধ হয়, নিজেকে সৎ পথে পরিচালনা করা যায়। তাতে দেশ দশ নিজে উপকৃত হই। আয়ু বৃদ্ধি হয়, জগৎকে উপলব্ধি করা যায়। দেহে প্রেম থাকবেই, কারণ কাম হতে প্রেমের জন্ম। স্থাবর জঙ্গম যত দেহ রতি কামে দেহে শান্তি ভোগ করা যায় কিন্তু এই সব অস্থায়ী একদিন শেষ হয়ে যাবে। সাধনার ফলে ইরা পিঙ্গলা ও সুষুম্ন নাড়ি মথে শুক্র ইচ্ছা মতে চালনা করে স্থায়ী শিঙ্গার আনন্দ উপভোগ করা যায়। যার কারণে সাধকরা ওই কামশক্তিকে শিবশক্তি, কৃষ্ণশক্তি রূপে মান্য করেন। আর শক্তিই জীবন, তাই কাম বর্জন করে তাহার কায়া সাধনে হন ব্রত। শুক্র বিনা মহাসুখ সম্ভব নয় তাই তাহারা সাধনার ফলে ইহা দেহতেই শোধন করে রাখেন। গুরু গোঁসাইরা তাহার শিষ্যকে ছয় রিপুকে বশ করতে আদেশ করেন। তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে কাম। প্রেম থাকবে কামসাধনার বিষয়। তবে তো সাধনার মূল কপাট খুলে ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব।
দেহ নিয়ে জানতে বা ভাবতে কার না ইচ্ছা হয়! আর ইচ্ছা থাকলেই কি জানা যাবে? মোটেই না। তার জন্য দেহ শিক্ষকের প্রয়োজন। আর তিনি হচ্ছেন সাধন প্রণালির লোক। সুফি-সাধক-বাউল এঁরা। তারা হলেন একমাত্র দেহবিজ্ঞানী, দেহতত্ত্বের সাধনাকারী। এই লাইনটাই সম্পূর্ণ রূপে আলাদা। এই যে আমার দেহ কত সুন্দর করে সাজানো গুছানো, যেন আজব এক কল। দুটি চোখ আছে যা দিয়ে দূরের-কাছের বস্তু দেখতে পাই। দুটি কান বাইরের শব্দ শুনতে পাই। হাত দিয়ে নানা ধরনের কাজ এবং পা দিয়ে চলাফেরা করতে পারি। নাক দিয়ে বাতাস আসে, বাতাস বাহির হয়। ক্ষুধা লাগলে অনুভব করি।
তারপর দেহের ভেতরে লুকায়িত আছে মন, সে যেন আর এক আশ্চর্য ব্যাপার। মুহূর্তে লন্ডন, আমেরিকা, জাপান, স্বর্গ, নরক, গ্রহ, তারা অনুমান করা যায়। সময় সময় সুখবর কুখবর আগাম পৌঁছে দিতেও সেই মন সক্ষম। শুধু তাই নয়, আরও আছে, এই দেহঘরে যে প্রতিনিয়ত কী ঘটছে ক্ষুদ্র জ্ঞানে তা বোঝার সাধ্য নয়। মানবদেহে বুকে কান পাতলে শোনা যায় দেহঘড়ির শব্দ, টক টক করে চলছে। আর কত ভিন্ন শব্দও শোনা যায়। পেটে কান পাতলে মেঘের গর্জন এবং নিজের কানে দুই হাত চেপে ধরলে শোনা যায় আগ্নেয়গিরির শা শা শব্দ, যেন ঝড় তুফানের শব্দ। আপন দেহের ভেতর যতই তোলপাড় হোক না কেন, তাহা এমনি এমনি শোনা যায় না, এ সব ভাবতে বড়ো অবাক লাগে, চোখ বুজলে আঁধার, খুললে আলো। দুঃখ পেলে কান্না আসে-নয়ন জুড়ে ঝরে পড়ে নোনা জল। আবার চোখে লবন পড়লে সহ্য হয় না। মুখ দিয়ে লালা আসে কিন্তু সেই লালা আবার লবণাক্ত নয়। তারপর দেহ ভান্ডারে মলমূত্র আবর্জনা বহন করে চলেছি কোনও দুর্গন্ধবিহীন। কিন্তু আবার তাহা ত্যাগ করলে গন্ধ পাই যা দেখেও সহ্য হয় না। এই সব কথা বলে শেষ করার নয়। আর সামান্য সময়ে বিশাল বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডকে জানা বলা কি সম্ভব? মোটেও না। তবে সর্বশেষ কথা হলো তারও ধ্বংস আছে। তিল তিল করে যেমন গড়ে ওঠে, তেমন করে তিল তিল করে ক্ষয় হতে থাকে। এমন একটি সময় আসে এই দেহমেশিন আর বাতাস গ্রহণ করে না, প্রাণপাখি উড়ে যায়। এত আদরের দেহ হয়ে যায় মাটি।
প্রবীর দেবনাথের দেহবিষয়ক লিখিত কথাগুলো পড়ে তাঁর সম্পর্কে অন্তত একটা ধারণা স্পষ্ট হয়ে যায়। সেটা হচ্ছে-আপন দেহ নিয়ে তিনি অনেক ভেবেছেন, সেটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এবং উপরের কথাগুলো হচ্ছে প্রবীর দেবনাথের সেই ভাবনারই বহিঃপ্রকাশ। এরপর অনেক দিন তাঁর সঙ্গে দেহতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব আর বাউলদের সাধনার প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনা হয়েছে, এমনকী ধীরে ধীরে তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়েছে। বুঝতে পারি-প্রবীর দেবনাথ দোকানে বসে বসে মালামাল বিক্রি করলেও তিনি এক অনন্য জগতের মধ্যে বসবাস করছেন আর নিরবচ্ছিন্নভাবে সাধনা করে চলেছেন ‘আপন দেহের’।
