মেছের শাহ ও তাঁর গানের দর্শন
মেছের শাহের (১৮৪০-১৯১৭) কণ্ঠমাধুর্যের কথা সর্বজনবিদিত। এতদ্ব্যতীত তত্ত্বপূর্ণ পদাবলি রচনার কারণে বাউল-ফকির সম্প্রদায়ের কাছে একজন তাত্ত্বিক-পদকর্তা হিসেবে তাঁর পরিচিতি আরও ব্যাপক। নির্দিষ্ট এই সম্প্রদায়ের কাছে এ সাধকের নাম অনন্য শ্রদ্ধায় উচ্চারিত হলেও জনসাধারণের কাছে তিনি প্রায় অপরিচিতই রয়ে গেছেন।
মেছের শাহ রচিত গানগুলোতে বাউল ও ফকিরিপন্থার নিগূঢ়তত্ত্বের পাশাপাশি সুফি সাধনার নানা প্রসঙ্গও উত্থাপিত হয়েছে। সৃষ্টিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব, জীবতত্ত্ব, পরমতত্ত্ব, কামতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, শরিয়ত-মারিফত বিচার, গুরুতত্ত্ব, ভক্তিতত্ত্ব, মুর্শিদিসহ বাউলসাধনা-কেন্দ্রিক নানা তত্ত্বসমৃদ্ধ গানে ভরপুর তাঁর যাবতীয় সৃষ্টিসম্ভার। গুরু।মুর্শিদের প্রতি তাঁর রয়েছে প্রচন্ড আত্মনিবেদনবোধ, বিশ্বাস ও নির্ভরশীলতা।
মুর্শিদকে জ্ঞানদাতা মেনে তাঁর কাছে সঁপে দিতে চেয়েছেন পুরো সত্তা। মুর্শিদের কাছে তাঁর সুস্পষ্ট আত্মসমর্পণ : ‘মুর্শিদ ভজনা বিনে জীবের আর গতি নাই। মুর্শিদ হয় জ্ঞানদাতা। জ্ঞান বিনে ভজন বৃথা। কেন ঘুরো যথাতথা। ভজন গুরুর ভজন চাই’। তিনি এও জানান দেন, সঠিকভাবে মুর্শিদের রূপ ধ্যান করতে পারলে স্ট্রষ্টার রূপ অনুধাবন করা সম্ভব। তাই পথ-প্রদর্শকরূপী এই মুর্শিদ-বন্দনা মেছেরের গানের অনেক অংশ জুড়েই স্থান দখল করে রেখেছে।
মেছের শাহের মতে, মুর্শিদের মাধ্যমে স্রষ্টার রূপ উদ্ঘাটনের জন্য প্রথমেই ‘দিল কোরান’-এ অর্থাৎ নিজেকে চেনা-জানার প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করতে হবে। এ জ্ঞান যেমন দেহজবিদ্যা বোঝায়, তেমনই নারীর রজঃস্রাবের ঋতুগণনা, সঙ্গমকালীন বস্তু নিয়ন্ত্রণ, শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের ক্রিয়াকলাপ ইত্যাদিও বোঝায়। গুরু কর্তৃক দীক্ষিত হয়ে তাঁর নির্দেশিত আচার-শাস্ত্রপথে অধিকতর নির্ভরশীল থাকাকেই মেছের গুরুত্ব দিয়ে সাধনপথে এগোনোর পথ বাতলে দিয়েছেন।
সাধনপথে চলতে অনিবার্যভাবে নানা বাধা-বিপত্তি আসবে। ‘কাম সাগর’-এর প্রবল ঢেউয়ের তোড়ে সাধনার প্রতি পলে পলে বিচ্ছিন্নতা-বিঘ্নতা তৈরি হতে পারে। সেসব ঠেলেই বৈতরণী পার হতে হবে। তাতেই জুটবে সাধক-পরিচিতি। বিষয়টি মেছের শাহের বয়ানে স্পষ্ট হয় এভাবে : ‘রসিক ডুবারো যারা, ধার চিনে ডোবে তারা। যখন জোয়ারে পোরা ডুবতে নাউ। জোয়ার গেলে ভাটা এলে নবিন বহে ধার। ভাব জেনে নামো ঘাটে সামনের ভয় কি আর’। নারীপুরুষের সঙ্গমকালীন যখন সন্তান জন্মানোর সম্ভাবনা তীব্র তখন ‘গুরুবস্তু’-রূপী শুক্র নিয়ন্ত্রণে রাখাকেই ‘ভাব জেনে নামো ঘাটে’ বলে পরামর্শ দিয়েছেন মেছের। আর এ পরামর্শের মূল কথা হচ্ছে-বাউল-ফকিরেরা সৃষ্টির বিরুদ্ধে। সংগত কারণেই সন্তান জন্মানোর বিপক্ষে তাঁদের প্রবল অবস্থান। নারীতে শুক্র পতন মানেই সাধনায়ও পতন। এর ফলেই যুগে-যুগে কালে-কালে বাউল-ফকিরেরা কামের ঘরে ‘কপাট আটা’-র নির্দেশনা দিয়েছেন।
যাঁরা সঠিকভাবে কামের ঘরে ‘কপাট আট’-তে পারেননি, তাঁরা ‘ভাব শূন্য’-‘প্রেম শূন্য’ হিসেবে আখ্যায়িত হচ্ছেন। তাই তিনি ‘প্রেমের ভাব’ জেনে ‘প্রেমরসিক’ হওয়ার আহ্বান জানান : ‘ও সেই রসিক জানে রূপের মর্ম অরসিকের বুঝা ভার। ও সেই সহজ প্রেমের ভাব যে জানে কি করবে তার কাল’। ‘কপাট’ এঁটে যেসব সাধক সন্তান জন্মদান থেকে বিরত থাকেন, তাঁরাই ‘ভবজ্বালা’ থেকে মুক্তি পান। রসজ্ঞ এসব সাধকেরা প্রেমের মাধ্যমেই ‘সাধন সিদ্ধি’ ঘটান।
‘মদন’-জ্বালায় যেসব সাধকের অস্থিরতা তৈরি হয় কিংবা যাঁরা ‘প্রকৃতি’ অর্থাৎ নারী-সংশ্রবে ‘কামবাণ’-এ প্রতিনিয়ত বিদ্ধ থাকেন, তাঁরা ‘ভুলের চক্করে’ পড়বেই। একবার ‘ভুলের চক্করে’ পড়া মানেই ‘নীর-ক্ষীর’-এর মিশ্রণে ‘মানব কীট’ তৈরি হওয়া। অথচ এটির বিরুদ্ধেই সাধকদের সতত পথচলা। ফলে যাঁরা এই ‘ভুলের চক্করে’ পড়েন তাঁরা অসাধক হিসেবেই পরিগণিত হন।
বাউলেরা বিশ্বাস করেন-মাটি, পানি, আগুন ও বাতাসের সমন্বয়ে যে মানবদেহ তৈরি হয়েছে, সেটার নিয়ন্ত্রণ সাধনার বলে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা কঠিন ব্যাপার নয়। সাধনার মাধ্যমে ‘কামবাণ’ আর ‘মায়াজাল’-কে ছিন্ন করতে পারলেই ‘মুক্ত মানুষ’ হিসেবে বেঁচে থাকা সম্ভব। ‘কামবাণ’-কে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একজন সাধক সন্তান জন্মদান থেকে বিরত থাকেন।
সন্তান জন্ম না-দিয়ে সাধকের নিজের সত্তার অখন্ডভাব সঠিক থাকে। এর ফলে তাঁর মধ্যে সাংসারিক মায়ামোহও জন্ম নিতে পারে না। কাম-কামিনী-কাঞ্চনকে পাশ কাটিয়ে সাধনার উচ্চস্তরে পৌঁছতে পারলেই কেবল সাধকের মুক্তি ঘটে। আর এ-রকম একজন ‘মুক্ত মানুষ’-ই দক্ষ ও পরিপূর্ণ সাধকরূপে বাউল-সমাজে সম্মানিত ও গর্বিত হন। কেবল কামশক্তির প্রবৃত্তি যে একজন ব্যক্তিকে কোন অধঃপতনে নিয়ে যেতে পারে, সেটারও বর্ণনা রয়েছে মেছের শাহের গানে। তাই উচ্চস্তরের একজন সাধক হওয়ার জন্যই গুরু।মুর্শিদের প্রতি মেছের শাহের যত আকুতি :
ভক্তজনার বন্ধু তুমি ওহে নিরঞ্জন
নিজগুণে দয়া করো না জানি ভজন।
অকুল সংসার নদী কূল নাহি যার
পার করো দিনবন্ধু না জানি সাঁতার।
অকূলে পড়ে ডাকি ওহে করতার
ডুবে যদি মরি হবে কলঙ্ক তোমার
পরম দয়াল তুমি ওহে দয়াময়
কৃপাবিন্দু বরিষণে উদ্ধার আমায়।
দুই
বাউল-ফকির পদাবলিতে সৃষ্টিতত্ত্ব ও দেহতত্ত্ব প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বিশিষ্ট স্থান দখল করে রেখেছে। প্রত্যেক সাধক-মহাজন তাঁদের রচিত পদাবলিতে নানা কায়দা ও আঙ্গিকে জন্ম-সৃষ্টি-ধ্বংসের গভীরতর রহস্য-দর্শন এবং দেহের সীমাহীন বিচিত্র।অভিনব সত্তার প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। এসব সাধক-পুরুষদের দেহ ও সৃষ্টি নিয়ে নিরন্তর চিন্তাচর্চার বিষয়গুলোই সহজ-স্বাভাবিক-প্রাঞ্জল বয়ানে তাঁদের রচনায় পরিস্ফুস্ট হয়েছে। মেছেরও এর ব্যতিক্রম নন। তাঁর গানের পঙ্ক্তিতে দেহাত্মবাদী সাধনার নিগূঢ়তত্ত্ব সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছে।
একজন সাধকের সুকুমারবৃত্তি নষ্টের উদ্রেককারী কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য-এসব কুপ্রবৃত্তি পরিহারের আহ্বান রয়েছে মেছেরের গানে। অন্যদিকে দেহের রেচনপ্রক্রিয়া, কামভাব, শুক্র-রজঃ, জন্ম-প্রক্রিয়া-এগুলোও তাঁর গানে আলোচিত হয়েছে বাউল দর্শনগত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের নিরিখেই। এরই ফাঁকে ফাঁকে দেহ-সাধনায় গুপ্ততত্ত্ব প্রকাশের ধারাবাহিকতায় মেছের তাঁর গানে প্রেমকেন্দ্রিক সাধনার প্রসঙ্গও উত্থাপন করেছেন।
মেছের শাহের বেশকিছু গুরু-শিষ্য পর্যায়ের গান রয়েছে। শিষ্যের প্রতি গুরুর তত্ত্বমূলক নানা উপদেশ এসব গানের শরীরের বিষয়বস্তু। তবে এসব গানের ভিত্তি উপলব্ধির জন্য গুরু-সংশ্রব আবশ্যক। কোনও অসাধক ব্যক্তি কখনওই সঠিকভাবে তত্ত্ববহুল এসব গানের ভাবার্থ উদ্ধার করতে পারেন না।
বাউল-ফকিরি মতে, দীক্ষিত না-হলে সাধনতত্ত্বের রহস্যসংকুল জগতের শুলুক উদ্ঘাটন কোনওভাবেই সম্ভব নয়। বাংলার বাউল-ফকির পরম্পরায় এটিই প্রচলিত সত্য ও মতবাদ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। ফলে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় যে রীতি যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে, সেটাকেই আঁকড়ে ধরে গুরু-ভক্তির অনন্য নজির স্থাপন করে চলেছেন উত্তরসূরি বাউল-ফকির মতবাদ অনুসারী শিষ্য-প্রশিষ্যরা।
তিন
আগেই উল্লেখ করেছি, বাউলদের ভাবনা-চিন্তার বিশাল ক্ষেত্র জুড়ে রয়েছে সৃষ্টিরহস্য। তাবৎ বিশ্ব, মানুষ, প্রকৃতি সৃষ্টির পূর্বরূপ কেমন ছিল কিংবা কেনই-বা এসব সৃষ্টি-এ ভাবনা মেছের শাহেরও। তাঁর হস্তলিখিত একটি পান্ডুলিপির গানে ‘তিনু শাহ’ ভণিতায় সৃষ্টিরহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে এভাবেই :
সুরাগেতে ছিল মানুষ ছিল শূন্যকার
বিনা মেঘে ডিম বিন্দু হয় তৈয়ার।
যে আগুন খিরদে ছিল
সেই আগুন ব্রহ্মান্ডে এলো
রক্তবীর্য শক্ত হলো
সেই আগুনের পর
ডিম্ব লইয়া ভেসে ফেরে কত দিনের পরে
খোল নিরঞ্জনকে চেতন
রেখে দেখাইলো ছুরাত।
কুদরতি ফল তৈয়ার করে
খাওয়ায় তারে তোকিও পুরে
আত্মারে আত্মা মিশে ছুরাত
কেবা আদ্য কেবা সাধ্য
ফলে ফুলে কইরা বাধ্য
তিনু বলে গুরুতত্ত্ব শুনতে চমৎকার।
মানুষ-সৃষ্টির এই গূঢ়-রহস্যের অন্তর্ভেদ কেবল শিষ্যরাই নির্ণয় করতে পারেন। মানব-সৃষ্টির আদি-অবস্থার অনুপুঙ্খ বিবেচনা সাধক মহাজনদের গানের বিচার্য বিষয়। একই পথ অনুসরণ করে মেছের শাহও সেই সৃষ্টি-রহস্যের ভেদ নির্ণয়-সূচক একাধিক পদ রচনা করেছেন।
‘মানবদেহ’-কে ‘আদিমক্কা’ আর ‘মসজিদঘর’ অভিধায় চিহ্নিত করে আত্মানুসন্ধানের নির্দেশনা দিয়েছেন মেছের। এই আত্মানুসন্ধান মানে নিজেকে চেনা আর জানা। নিজেকে চেনা-জানা মানে সৃষ্টিকর্তাকে জানা। মানুষের ভেতরেই সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন-বাউলরা এটাই গভীরভাবে বিশ্বাস করেন। কারণ গুরুতত্ত্বে আপন দেহে সৃষ্টিকর্তার অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এজন্যই মানুষ ভজনার কথা বলে থাকেন বাউলসাধকেরা।
মানুষের স্বরূপসন্ধানের প্রসঙ্গ তাই বারেবারে উঠে এসেছে বাউলসাধকদের গানের পঙ্ক্তিতে এবং এঁদের আচারগত সংস্কৃতিতে। বাউলদের গোপন ক্রিয়াকরণেও মানুষ প্রসঙ্গ এসেছে। তবে সেটা ভিন্ন অর্থে, ভিন্ন মেজাজে। এসব গুপ্ত ও গুহ্য সাধনায় ‘মনের মানুষ’-এর কথা বলা হয়েছে। কোনও কোনও সাধক সেই ‘মনের মানুষ’-কে ‘অধর মানুষ’, ‘রসের মানুষ’, ‘অচিন মানুষ’ হিসেবেও পরিচয় দিয়ে থাকেন।
তবে সেটা যে-‘মানুষ’ হিসেবেই অভিহিত করা হোক না, সেই মানুষের অনুসন্ধান বাউলদের গোপন সাধনার অংশবিশেষ। এসব পরিভাষার অর্থ কেবল রসজ্ঞ সাধকেরা তাঁদের শিষ্যদেরই ধারণা দেন। সাধারণের কাছে দুর্বোধ্য এসব শব্দ অনেকটা ‘কঠিন’-ই বটে। ‘মনের মানুষ’-এর জন্য সাধকেরা যেসব সাধন-ভজন করে থাকেন, সেটাকে কট্টর ধর্মীয় অনুসারীরা ‘বিকৃত মানসিকতা ও অনৈতিক র্মকান্ড’ হিসেবে মনে করে থাকেন। এমনকী কোথাও কোথাও বাউলসাধকদের শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত এবং অপমানিত পর্যন্ত হতে হচ্ছে। এরপরও সাধকদের থেমে নেই ‘মনের মানুষ’ অনুসন্ধানের নিরলস প্রচেষ্টা। বরং অব্যাহতভাবে গুরুতত্ত্ব মেনে সাধনসঙ্গিনী সহযোগে ভজন ও ধ্যানে ঐকান্তিকভাবে গুরু-নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে চলেছেন তাঁরা।
চার
বাউল-ফকিরদের মতবাদে মারিফত-বন্দনার বিষয়টি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত। সন্দেহ নেই শরিয়তপন্থিরা এটির ঘোরবিরোধী। তাই মুসলিম ধর্ম-অনুসারী অনেকের সঙ্গে বাউল-ফকির মতবাদকেন্দ্রিক শরিয়ত-মারিফতবিষয়ক দ্ব›দ্ব দীর্ঘদিনের। অনেক সাধক বাউল এসব দ্ব›দ্ব-বিদ্বেষ এড়াতে শরিয়তের নানা শব্দ-উপকরণ ব্যবহার করে মূলত মারিফত-তত্ত্বেরই বন্দনা করেছেন।
পূর্বসূরিদের পথ অনুসরণ করে মেছেরও একইভাবে মারিফত ও শরিয়তের ভেদ অনুসন্ধান করতে চেয়েছেন। তাঁর নিজস্ব চিন্তা ও চর্চা থেকে মারিফত-শরিয়তের ব্যবধান এ-রকমটাই প্রকাশিত হয়েছে :
মারিফতের ভেদ এই যে কেহ পড়িবে
দু-জাহানে তার বড়ো মরতবা বাড়িবে
নয়নের মেক তার ঘুচিয়ে পড়িবে
জাহেরেতে আছে খোদা নজরে দেখিবে।
এরফানির ভেদ যা সিনার এলেম
বুঝতে না পারিবে খালি হইলে আলেম
ফকিরের কাছে যাহা হইলা মুবিদ
মারিফতের ভেদ তারা পাইলো নিশ্চিত।
মারিফত ফকিরধর্ম জানো সর্বজন
হাদিস কিতাবে তার না পাবা কারণ
সিনার এলেম সিনায় সিনায় সংসারে আইলো।
মুর্শিদের মুখে তাহা গোপন রহিল
মুর্শিদের বাক্য যারা করিল আমল
মারিফতের ভেদ তারা পাইলো সকল
মারিফতের মূল যাহা পুর্শিদা কালাম
মুর্শিদ বিহনে তার পাবা না সন্ধান
শরিয়তের ভেদ যাহা দলিলে লেখিলো
মারিফত সিনার এলেম বাতনে রহিল
সত্য কইতে সরয়ে বাদ্য মিথ্যা কইতে মানা
এইরূপে গোমরা হয়ে আছে অনেক জনা
মারিফত পুর্শিদা তত্ত্ব জানিবে নিশ্চয়
সকলের কাছে তাহা বলা নাহি যায়।
আল্লা যাকে ভক্তিজ্ঞান দিয়াছে জাহানে
মন মজাইয়া আছে মুর্শিদের চরণে
খেদমতে হইয়া রাজি মুর্শিদ সুজন
অকৈতুক কথা তারে করে বিতরণ।
মারিফত পুর্শিদাতত্ত্ব যে কেহ জানিল
একিন জানো দোজখ তার হারাম হইল।
খালি যারা শরিয়ত করিল আদায়
দোজখি হইবে তারা তত্ত্বে জানা যায়।
খালি যারা মারিফত করে দুনিয়াতে
এরফাতে যাইবে তারা জানিবে মনেতে।
শরিয়ত মারিফত দুই কাম করে যারা
ঠিক জানো জান্নাত পাবে তরা
মওলার তলব গুরুর সেজদা মূল মারিফত
অনুমানে সেজদা করো জানো শরিয়ত
অনুমান করে খালি বর্তমান ছাড়িয়া
জাহান্নামে যাবে তারা দেখিবে ভাবিয়া
মেছের শাহ ফকিরের কথা মারিফতের মূল
না-বুঝিলে আখেরে হইবে নামাক্কুল।
আরেকটি গানে মেছের শাহ চার তরিকার নিগূঢ়-বিষয়বস্তু উত্থাপন করতে গিয়ে লিখেছিলেন : ‘শরিয়ত কারে বলে জানো সে কারণ। পড়ে শুনে লাগাও ইবাদতে মন। শরিয়ত জাহেরা সত্য তত্ত্ব তরিকত। হকিকত হককথা গুপ্ত মারিফত।। শরিয়তে সত্য রাখা আপার মনে। তরিকতে ভক্তি করো পিরের চরণেতে। হকিকতে হক জানো পিরের বচন। মারিফতে করো মোমিন খোদার ভজন।। জিকির আর মুর্শিদের খেদমত মারিফতের কাজ। শরিয়তে কার্য জানো রোজা আর নামাজ। হাজার সাল করো যদি খালি শরিয়ত। মুর্শিদের খেদমত বিনে হবে বরবাদ।’
পাঁচ
মেছের শাহ জীবদ্দশায় দৈহিক সাধনার পাশাপাশি তত্ত্বগত গানের চর্চা করেছিলেন। তাঁর বিচিত্রমুখী গানের বদৌলতে বাউল-গবেষক ও শ্রোতাদের বাউল-ফকিরি ধারা সম্পর্কে নতুন ভাবনার উদ্রেক করবে। পূর্বসূরি বাউল-ফকিরদের রচিত গানের ধারাবাহিকতাই যেন তিনি টেনে নিয়ে গেছেন একজন সফল উত্তরাধিকারী হিসেবে। তাই তাঁর রচিত বাউল পদাবলি ভাবীকালের বাউল-মতবাদ অনুসারীদের কাছে অনন্য মর্যাদায় উদ্ভাসিত হতে বাধ্য; মেছের শাহের গানের সুরবাণী, তত্ত্ব এবং তার অন্তর্নিহিত শক্তিটাকে বিবেচনায় নিলে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
