‘নিশীথে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা’ – সুমনকুমার দাশ
‘নিশীথে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা’
বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার বামৈ গ্রামের সাধক শেখ ভানুর (১৮৪৯-১৯১৯) ‘নিশীথে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা’ শীর্ষক গানটির তিন-তিনটি পাঠান্তর পাওয়া যায়। যদিও শেখ ভানু, রাধারমণ দত্ত ও জসীমউদ্দীনের রচিত হিসেবে প্রচলিত এ তিনটি গানের পঙ্ক্তিতে বেশ পরিবর্তন রয়েছে। নানা মতানৈক্য সত্ত্বে ও গবেষকদের ধারণা, শেখ ভানু রচিত গানটিই আদিতম।
শেখ ভানু রচিত ‘নিশীথে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা’ গানটিতে বাউল মতবাদের গূহ্য সাধনতত্ত্ব নিপুণ দক্ষতায় পরিস্ফুট হয়েছে। নারীর রজঃস্রাবের সময় ডাল-পাতা-বৃক্ষ বিহীন যে ‘ফুল’ যৌনাঙ্গে ভেসে বেড়ায়-তারই ইঙ্গিত গানটিতে রয়েছে। অসাধক ব্যক্তি কখনওই এ ফুলের মর্ম বুঝতে পারে না। ‘নয় দরজা’ অর্থাৎ শরীরে বাতাস গ্রহণ-বর্জনের নয়টি ছিদ্র বন্ধ করে একজন সাধককে এই ফুলের নির্যাসটুকু গ্রহণ করতে হয়।
বাউল-দর্শনের অন্তর্নিহিত ও গূঢ় তাৎপর্য গানটির পরতে-পরতে লুকিয়ে রয়েছে। নারীসঙ্গকালে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ রাখাটা যে সাধনারই অংশবিশেষ সেটিও প্রকাশ পেয়েছে শেখ ভানুর গানে। পুরো গানটি এ-রকম :
নিশীথে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা,
নিশীথে যাইও ফুলবনে।
নয় দরজা করি বন্ধ লইও ফুলের গন্ধ রে
অন্তরে জপিও বন্ধের নাম রে ভ্রমরা
নিশীথে যাইও ফুলবনে।
জ্বালাইয়া দিলের বাত্তি, ফুটিবে ফুল নানা জাতি
কত রঙ্গে ধরব ফুলে কলি রে ভ্রমরা
নিশীথে যাইও ফুলবনে।
ডাল পাতা বৃক্ষ নাই, এমন ফুল ফুইটাছে সাঁই
ভাবুক ছাড়া বুঝবে না .পন্ডিতে রে ভ্রমরা
অধীন শেখ ভানু বলে, ঢেউ খেলাইও আপন দিলে
পদ্মা যেমন ভাসে গঙ্গার জলে রে ভ্রমরা
নিশীথে যাইও ফুলবনে।
শেখ ভানুর উপর্যুক্ত গানটি ছাড়াও সাধনতত্ত্ব-পর্যায়ের আরও বেশকিছু গান রয়েছে। সেসব গানেও একইভাবে বাউল-ফকিরি-চিন্তার প্রভাব সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। পূর্বসূরি সাধকদের মতই তাঁর অনুভব : ‘একে আমার ভাঙা তরি, কেমনে ধরিমু পাড়ি’। এই ‘ভাঙা তরি’ নিয়ে জাগতিক মায়া-মোহ-সংসার ছিন্ন করে কীভাবে ‘ভবসাগর’ পাড়ি দিবেন, এ নিয়ে ছিল তাঁর সতত চিন্তা।
একইভাবে ‘কামনদী’র উত্তাল স্রোতের আঘাতে সুদক্ষ মাঝির ন্যায় নিজ-তরি নিয়ন্ত্রণে রেখে পারে ওঠার জন্য মুর্শিদের সাহায্যের তীব্র আকুলতা ছিল তাঁর গানে। মুর্শিদ নির্দেশিত পথের সন্ধান লাভের ব্যাকুলতা তাঁর পুরো সত্তাজুড়ে প্রবাহিত ছিল। ‘চাতকিনী পাখির মতো’ তিনি মুর্শিদের পদধূলি পাওয়ার আশা ব্যক্ত করে জানিয়েছেন : ‘আমি তোমার চরণের অধীন, ও সোনার মুর্শিদ। মৌলাজি তোমার আশায় আশায় আমার গেল দিন’।
শেখ ভানুর পূর্বসূরি অপরাপর বাউল-ফকির সাধকদের দৃষ্টিভঙ্গির মতো তাঁরও বিশ্বাস, সাধনপথে মুর্শিদ-নাম ভরসা করে চলতে হয়। মুর্শিদ নির্দেশিত বাক্য স্মরণে রেখে পথ চললে ‘ভবযন্ত্রণা’ থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব। তাই ভানুর আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণ-‘মুর্শিদের টিকেট ছাড়া হবে রে তুই পন্থহারা’।
দুই
দেহতত্ত্ব পর্যায়ের একাধিক গান রচনা করেছেন শেখ ভানু। বিষয়-বৈচিত্র্যে অপরাপর বাউল-ফকিরের সঙ্গে তাঁর দেহতত্ত্ব পর্যায়ের গানের বিস্তর কোনও ফারাক নেই। সাধকেরা যে ‘মানব-তরি’র সৃষ্টি-বিন্যাস নিয়ে তাঁদের গানে তাত্ত্বিক পর্যালোচনা করে থাকেন, সেটার অনুকরণই শেখ ভানুর লেখনীতে দৃশ্যমান। তাঁর রচিত ‘বিনা কাষ্ঠে, বিনা লোহায়। নাও বানাইছে চোদ্দো পোয়া’, ‘বিনা তৈলের বাতি জ্বলে ওই নায়ে’ শীর্ষক পঙ্ক্তিগুলো মানব-সৃষ্টির রহস্যকেই প্রত্যক্ষভাবে ইঙ্গিত করেছে।
পিঞ্জিরারূপী যে মানব-শরীরের সৃষ্টি হয়েছে, একদিন সেই পিঞ্জিরাও খালি হবে। পিঞ্জিরা ছেড়ে আত্মারূপী ‘মনপাখি’ উড়ে গেলে প্রাণহীন খাঁচা অমূল্য হয়ে পড়বে। মানুষের জন্ম-মৃত্যুর এই চিরায়ত সত্যও ধারণ করে রেখেছে শেখ ভানুর গান : ‘মন কই যাও রে, কে নিলো ধরিয়া।সোনার পিঞ্জিরা রইল জমিনে পড়িয়া। ও মন কই যাও রে। যাইও না যাইও না মন রে নিষ্ঠুর হইয়া। তোর মা জননী কানবে পিঞ্জিরার পানে চাইয়া রে। ও মন কই যাও রে। […]। অধীন শেখ ভানু বলে আফসোস হাজার। খালি হাতে যাইতে হবে ছাড়িয়া সংসার। ও মন কই যাও রে।’
মৃত্যুর আগেও রয়েছে নানা ধরনের ভবযন্ত্রণা। সঠিকভাবে পথ চলতে না-পারলে সেই যন্ত্রণা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠে। তাই সুপথে চলতে একজন মুর্শিদ।গুরু ভজতে হয়। তিনিই সুপথের সন্ধান দেখান। নতুবা যে ‘মানব-তরি’ নিয়ে এই পৃথিবীতে আগমন, সেই তরিও বিপথে গেলে ডুবে যাওয়ার ভীতি রয়েছে। ষড়রিপু হিসেবে চিহ্নিত যে ‘ছয়জন ডাকাত’ রয়েছে তারা প্রচ্ছন্নভাবে তরি ডুবাতে সাহায্য করে।
শেখ ভানু সেই ‘ছয় ডাকাত’-এর একজন ‘কামভাব’-কে নির্দেশিত করে একটি গানে লিখেছিলেন :
মন আমার কামিনী ফুলের মধুতে মাতাল
নিশার ঝোঁকে আপনা বুকে মাইরো না রে শেল।
মৌলানা-মৌলবি কত, এমএ বিএ শতে শত
জেনে তত্ত্ব, অভিমত্ত নিতে যবে পরার মাল
মন আমার কামিনী ফুলের মধুতে মাতাল।
শতসহস্র লোকে সত্য পথে মাথা ঠুকে
কত ছেড়ে তখ্ত, হয়ে বখ্ত রাখে পরকাল
স্ত্রী-পুত্র, মাতা-পিতা, ভগ্নি-ভ্রাতা কেহ কাহারো নয়
মরলে পরে এক ঘরে রবে চিরকাল
মন আমার কামিনী ফুলের মধুতে মাতাল।
অধীন শেখ ভানু বলে, ওরে মন মাতাল
শীঘ্র হইয়ে গুরুর চেলা, শামা জ্বলে দেখ না জামাল
মন আমার কামিনী ফুলের মধুতে মাতাল।
এই ‘কামিনী ফুলের মধু’ থেকে দূরে থাকতে হলে ‘গুরুর চেলা’ অর্থাৎ শিষ্য হতে হবে। তবেই কামভাবসহ ষড়রিপু থেকে নিজেকে দূরে রাখা সম্ভব।
তিন
শেখ ভানু যেমন সাধনতত্ত্বের বিষয়াদি নিয়ে গান রচনা করেছেন তেমনই অসংখ্য বিচ্ছেদ গানও রচনা করেছেন। গানগুলোর রচনাশৈলী অসাধারণ হওয়া সত্ত্বে ও এগুলোর প্রচার তেমন নেই বললে চলে। তবে গানগুলো বিচ্ছেদ পর্যায়ের হলেও এর অধিকাংশই ‘মনের মানুষ’-এর দেখা না-পাওয়ার বিরহের কাতরতায় আচ্ছন্ন। বাউল-ফকিরেরা যে ‘মনের মানুষ’ কিংবা ‘অধর মানুষ’ খোঁজার চেষ্টায় পুরো জীবন উৎসর্গ করে দেন সাধনায়, সেই অভিলাষেরই বয়ান পাওয়া যায় শেখ ভানুর বিচ্ছেদ গানে। বিচ্ছেদে আবিষ্ট ভানুর আর্তনাদ : ‘মনের মানুষ খুঁইজ্যা বেড়াই, না পাইলাম অন্বেষণ। সেই জ্বালায় বাঁচে না মোর জীবন।’ তাঁর গানের মতোই পূর্বসূরিদের পথ অনুসরণ করে ‘মনের মানুষ’ অন্বেষণ করে শেখ ভানু আমৃত্যু সাধনপথে অটল ছিলেন।
