সাধক পাঞ্জু শাহ ও তাঁর গানের ভুবন
সাধক পাঞ্জু শাহ ও তাঁর গানের ভুবন
পাঞ্জু শাহ (১৮৫১-১৯১৪) ‘বাউল, ‘ফকির’ নাকি ‘দরবেশ’ ছিলেন-এ নিয়ে ‘নানা মুনির নানা মত’। কিন্তু তাঁর রচিত গানগুলো যে বাউল-ফকির পরম্পরায় মান্যতা পেয়েছে, সেটি প্রত্যেক গবেষক একবাক্যে মেনে নিয়েছেন। পাঞ্জুর গানের ভাব-বিশ্লেষণে বাউল-ফকিরিধারার প্রকৃত ভিত্তির সন্ধান পাওয়া যায়। তাঁর গানগুলো একজন উঁচুস্তরের চিন্তাশীল দার্শনিকের বয়ান হিসেবেই বাউলমহলে পরিগণিত হয়ে থাকে।
পাঞ্জু শাহের গানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লালনের প্রভাব লক্ষণীয়। লালনের মতাদর্শের কোনও ভিন্নতা তাঁর মধ্যে পাওয়া যায় না। সংগত কারণে পাঞ্জুকেও লালনধারার উল্লেখযোগ্য সাধক হিসেবেই অনেকে মনে করে থাকেন। কেউ কেউ আরেকটু আগ বাড়িয়ে বলে থাকেন, লালনের মৃত্যুর পর বাউল-ফকির মতানুসারীদের মধ্যে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেটি অনেকাংশেই পাঞ্জু শাহ পূরণ করতে পেরেছিলেন।
লালন-পাঞ্জুর পরম্পরাগত এই যে বন্ধন সেটিও ‘মনের মানুষ’ কিংবা ‘অধর মানুষ’ খোঁজার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। লালনের মতো পাঞ্জুও মানুষ-ভজনার বিষয়টি সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েছেন। এছাড়া দেহ ও সাধনতত্ত্বকেন্দ্রিক গানও তাঁর সমগ্র রচনার উজ্জ্বলতম ভান্ডার প্রথাগত রীতি অনুযায়ী ‘সাধুর বাজারে’ পাঞ্জুও নিজেকে বিকিয়ে দিয়েছেন। ‘সাধুর বাজারে’ গিয়ে যথাযথ সাধনার পরিবেশ তৈরি করতে পারলেই প্রকৃত ভাবুক হওয়া সম্ভব।
পাঞ্জু শাহ জানেন-ভাবুক হতে চাইলে প্রথমে নিজেকে জানতে হবে। অর্থাৎ আত্মোপলব্ধি ছাড়া কোনও সাধকের পরিপূর্ণতা কখনওই আসে না। নিজেকে চেনা-জানা শেষে মনসুর হাল্লাজ যেমন করে ঘোষণা দিয়েছিলেন-‘আনাল হক’ অর্থাৎ আমিই ঈশ্বর। ঠিক তেমনই করে পাঞ্জুও মানুষের ভেতরে ঈশ্বরের সন্ধান পেয়েছেন। এর কারণেই তাঁর উপদেশবাণী ছিল-মানুষের ভজনা করলেই ‘পরম সত্তা’রূপী ঈশ্বরের সান্নিধ্য পাওয়া যাবে। ঠিক যেন ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’ পঙ্ক্তির অবিকল অনুসরণ।
পাঞ্জু শাহের মুর্শিদ।গুরু ছিলেন হিরাজতুল্লাহ। তবে পাঞ্জু তাঁর গানে মুর্শিদকে ‘হিরুচাঁদ’ ভণিতায় উল্লেখ করেছেন। মুর্শিদের চরণেই তিনি আত্ম-নিবেদন করেছেন। তাঁকেই পথ-নির্দেশক মান্য করে জগৎ-সংসারের প্রতিবন্ধকতা ঠেলে সাধনপথে অগ্রসর হয়েছেন। পথ-চলতে যখন কোথাও আটকে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তখন মুর্শিদ নাম স্মরণ করে উতরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। মুর্শিদের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা-ভক্তি টের পাওয়া যায় তাঁর গানেও :
যাহার মুর্শিদ নাই দীন নাই তার।
এই তো হুকুম ভাই রাসুলউল্লার।
মুর্শিদ ছাড়া যেই আছে দুনিয়ায়।
শয়তান তার পির জানিবা নিশ্চয়।
[…]
মুর্শিদ বলেন যাহা হুকুম আল্লার।
হুকুমে চলিলে পাবে আল্লার দিদার।
মুর্শিদের হাতে হাত সে হাত আল্লার।
হাত ধরে তওবা যে করো দীনদার।
[…]
মুর্শিদ খেদমত করো দীনদার।
খেদমত হবে জানো মালেক আল্লার।
মুর্শিদের রূপ যাহা সে রূপ আল্লার।
মুর্শিদ আসনে হয় আসন খোদার।
মুর্শিদকে তিনি ‘আল্লা’ জ্ঞানে মান্য করতেন। ‘খোদার আসনে’ মুর্শিদকে ঠাঁই দিয়েছেন। তাই যার-তার কাছে মুরিদ না-হয়ে প্রকৃত সাধকরূপী মুর্শিদের কাছে আত্ম-নিবেদন করতে পারলেই কেবল ‘ভবপার’-এ যাওয়ার ভেদ-বিধান জানা সম্ভব হবে। কারণ একজন প্রকৃত সাধকই কেবল তাঁর শিষ্যকে সুপথে পরিচালিত হওয়ার নির্দেশনা দিতে পারেন। মুর্শিদ যদি নিজে সাধনায় অটল না-থাকতে পারেন তবে সেই মুর্শিদের কাছ থেকে সাধনপদ্ধতি জানার চেষ্টা নিতান্তই বিফলতায় পর্যবসিত হবে। যোগ্য মুর্শিদ না-ভজলে সাধনতত্ত্ব সম্পর্কে শিষ্যের জ্ঞান অজ্ঞতার মধ্যেই আবর্তিত হবে। পাঞ্জু সে ক্ষেত্রে যোগ্য মুর্শিদ ভজেছেন উল্লেখ করে গুরুর কাছে তাঁর নিবেদন : ‘গুরু তুমি ফেলো না অধমে।। বাঞ্ছা আছে গোলাম হবো তোমার কদমে। অযোগ্য হয়ে মুই,। কদমেতে ছায়া চাই, সাঁই গো।’
একজন প্রকৃত মুর্শিদ তাঁর শিষ্যকে সাধনার কলকৌশলের ধাপগুলো অতিক্রম করার মন্ত্র শেখান। হাতে-কলমে শিষ্যের শরীরের সৃষ্টিরহস্য এবং কায়া-সাধনার খুঁটিনাটি তথ্যগুলোর শরিয়তি ও মারফতিতত্ত্বের গূঢ়রহস্যের অন্তর্নিহিত ভেদ খোলসা করে বর্ণনা দেন। যখন শিষ্য সাধনতত্ত্বের এসব নিগূঢ় বিষয়াদি সম্পর্কে দক্ষ হয়ে ওঠেন তখন-‘ভবনদী পাড়ি দিতে চিন্তা নাহি তাই’।
একজন সাধক আমৃত্যু ‘ভবনদী’ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টায় নিমগ্ন থাকেন। কারণ নদীতে নেমে হাবুডুবু খাওয়া প্রকৃত সাধকের চারিত্র্যের সঙ্গে খাপ খায় না। ‘কামনদী’-তে যতই উত্তাল ঢেউ আসুক না কেন, সাধুকে সেখানে শান্ত-শিষ্ট-ধীর-স্থির হয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। যে সাধক তা করতে ব্যর্থ হবেন, তিনি নদীতেই ডুবে মরবেন।
নদীর অতল দেশে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে একমাত্র মুর্শিদই ত্রাণকর্তা হিসেবে আভির্ভূত হতে পারেন। তাই মুর্শিদ নাম ভরসা করে ‘কামনদী’ পাড়ি দিতে হয়। পাঞ্জুর তাই প্রত্যাশা : ‘আমারে দাও চরণ-তরি। তোমার নামের জোরে পাষাণ গলে,। অপারের হও কান্ডারি।’
পাঞ্জু শাহ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন গুরু।মুর্শিদ বিনা মুক্তি সম্ভব নয়। গুরুপদে প্রবল বিশ্বাস নিয়ে আত্ম-নিবেদন করলেই কেবল আকণ্ঠ পাপঠাসা এই জগৎ-সংসার থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা যাবে। এই চরম বিশ্বাস থেকেই পাঞ্জু গুরুর প্রতি নিজেকে সঁপে দিয়েছেন এভাবেই :
নিজ গুণে দয়া করো গুরু ভজন না জানি।
ভজনহীন হয়ে ডাকি দয়াল নাম শুনি।
তুমি দীনের ধনী
আমি হই দীনহীনী
চাতকিনী হয়ে ডাকি, পাব চরণ দু-খানি।
আমি নিগুণে এক দাসী হয়েছি,
তোমরা নামের জোরে ডঙ্কা মারতেছি,
নামে ভাসলাম তরি
যদি ডুবিয়ে মরি
তবে আমা হতে নামের গৌরব যাবে ও গুণমণি।
তোমার নামের জোরে অধম তরে যায়,
আমি চেয়ে আছি ওই নামের আশায়,
আমি বড়ো অভাগী
কোনও উপায় না দেখি
ভরসা করি তরে যাব নামে এ ঘোর তুফানে।
এবার যা করো এই দীনহীনে রে,
পড়ে রইলাম চরণের আশা করে,
অধীন পাঞ্জু কয় বাণী,
আমি এই ভিক্ষা মাগি,
তোমার রূপে নয়ন থাকে যেন এ দিনরজনী।
দুই
‘বস্তু নিয়ন্ত্রণ’ বাউল-ফকিরি সাধনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। জন্মের সঙ্গে পিতৃ-প্রদত্ত যে ‘ধন’ মানে ‘শুক্র’-প্রাপ্তি ঘটেছে সেটার যথাসাধ্য ব্যবহার সাধকদের দেহসাধনার বিশেষ অংশ। কোনও ধরনের কু-প্রবৃত্তি যেন সাধকদের সাধনপথ বিনষ্ট করতে না-পারে সে দিকেও সতর্ক নজরদারি থাকা উচিত। সাধকের সতর্কতায় ঘাটতি তৈরি হলেই বিপর্যয় নেমে আসবে। এ আশঙ্কায় দুদল্যমান ভক্তের আর্তি :
দয়া করো গো সাঁই।
এই ভবে আমার কেহ নাই।
পিতৃধন যতনে লয়ে
এসেছিলাম সাধ করিয়ে
এ ভবে জুয়াচোরে লুটে নিলো তাই।
ঘিরে নিলো মায়াজালে
ত্রিবেণী ধরিল কালে
সে কালে চুরাশি ঘুরালো আমায়।
মণি-হারা ফণী হয়ে
মলাম ভূতের বোঝা রয়ে
মন রে, সাধের জনম বিফলেতে যায়।
অধীন পাঞ্জু কেঁদে বলে
পতিত পাবন নাম ধরিলে
জানিব, অন্তিমকালে যদি চরণ পাই।
‘মায়াজালে’ আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ‘জুয়াচোর’-এর সব লুটপাট করে নেওয়ার যে কাহিনি পাঞ্জু বর্ণনা করেছেন সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাউল-ফকিরদের মুখোমুখি হতে হয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দেহসাধনার সময় সাধককে বুঝে-শুনে চলতে হয়। কোনওভাবেই নারীসঙ্গে শুক্রের পতন ঘটানো যাবে না। শুক্রের পতন ঘটলেই তা কীটে রূপান্তরিত হয়। সেই কীট কুড়ে কুড়ে জীবনভর সাধককে বিনাশ করে দেয়।
বাউল-ফকির মতবাদ অনুযায়ী, নারীসঙ্গে কোনও বিধিনিষেধ না-থাকলেও সন্তান জন্মানোয় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এর ফলে ‘কীট’রূপী শুক্রের পতন ঘটলেই সন্তান জন্মানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়। এতে করে সাধকের মধ্যে আপনা-আপনিই সংসার-বন্ধন এবং মায়া-মোহ তৈরি হয়। একবার ‘মায়াজালে’ বন্দি হলে ‘ভবজ্বালা’য় পড়তে হয়। তখন এ থেকে পরিত্রাণের আর কোনও পথ থাকে না। ফলে এভাবেই একজন সাধক তাঁর সাধনপথ থেকে চিরতরে বিচ্যুত হয়ে পড়েন। পাঞ্জু শাহের এ ধরনের সাধনসংক্রান্ত একটি গানের বহুল প্রচলন রয়েছে। গানটি নিম্নরূপ :
সাঁই রূপ গ’ঠে গ’ঠে কত লীলা করলে আল্লা সব ঘটে ঘটে।
সাঁইর লীলা খেলার কথা শুনলাম ঘাটে মাঠে হাটে।
বিষম লীলা দেখে এলাম রে, ত্রিবেণীর ঘাটে,
কত জোয়ার বুড়ো ডুবে মলো, বালক ভেসে ওঠে।
এক নীরে দুই ভাগ হয়ে রে, একটি জীবাত্মা লয় গ’ঠে,
সেই আত্মার ঘাড়ে কর্তা হয়ে সাঁতার খেলতে জোটে,
ত্রিবেণীতে সাঁতার খেলে রে, গেল শূন্যদার ওই মাঠে,
জীবাত্মারে বন্ধক থুয়ে গেল মায়ালাটে।
মায়ালাটে পড়ে আত্মা রে, বড়ো ত্রিতাপ-জ্বালা ঘটে,
আশি লক্ষ জনম ঘুরে মলে, জ্বালা নাহি মেটে,
গড়নদারের ভুলে আত্মা রে, বেড়ায় দেশ-বিদেশে ছুটে,
কর্তা চিনলে আত্মার জ্বালা মিটে যেত বটে।
আত্মা উদ্ধার করবো বলে রে, সাঁই গুরু রূপে এসে,
যুগল নামের মুক্তি দিয়ে ফিরছে দেশে দেশে,
যুগল নামের করণ জানলে রে, মায়াজাল তো যেত কেটে,
অধীন পাঞ্জু বলে গুরুর চরণ ধরো রে মন এঁটে।
বাউলদের বিশ্বাস-একবার মানব-জনম হলে ওই আত্মাকে আশি লক্ষ যোনী পরিভ্রমণ করতে হয়। তাই জেনে-শুনে আত্মাকে আশি লক্ষবারের ‘ভবজ্বালা’ থেকে মুক্তি দিতেই তাঁরা জন্ম-নিরোধের পক্ষে। এ কারণেই বাউল-ফকির-সাধুসন্তরা ‘গুরুপদে নিষ্ঠারতি’ রেখে ‘জন্মবীজ’ নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন।
‘জন্মবীজ’ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলেই সেটা সম্ভব নয়। এজন্য সাধনা ও একাগ্রতার প্রয়োজন। গুরুর মাধ্যমে শিখতে হবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের প্রাণায়াম-পদ্ধতি। যেসব সাধকেরা শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণে বেশি দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেন কেবল তাঁরাই যথার্থ সাধক অভিধা পেতে সক্ষম হন। তাই ‘ত্রিবেণীর তিরধারে তরি’ যাতে ডুবে না-যায় সেজন্য মনের কু-স্বভাব পরিহার করে সাধনপথে অটল থাকতে হয়। এটাই একজন সাধকের জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি। ‘গুরু বস্তু’ না-চিনে সাধনপথে অগ্রসর হলে পতন নিশ্চিত জানিয়ে পাঞ্জু লিখেছিলেন :
গুরু বস্তু না জেনে।
এমন সাধের জনম
যায় রে যমের ভুবনে।
স্বভাবের গুণে,
কু-পথে গমনে,
সে ধন সাধনে,
বঞ্চিত হলি মন।
সেবা অপরাধী,
নামে হলি বাদী,
ঘিরে এলো সমনে।
মন করিলি হেলা,
ডুবে এলো বেলা,
ভবপারের ভেলা,
শ্রীগুরুর চরণ।
ভজনবিহীন
হলি চিরদিন
চরণ পাবি কোন গুণে।
করে ভবের খেলা,
সুখে হলি ভোলা,
ঘটে এলো জ্বালা,
অন্তিম সামনে।
সাধনশূন্য দেহ,
সুধাবে না কেহ,
বোঝে না পাঞ্জুর মনে।
তিন
পাঞ্জু শাহ সাধনতত্ত্বের নানা গূঢ় ও গোপনীয় বিষয়-আশয় বিচার-বিশ্লেষণ করে তত্ত্বাশ্রয়ী অসংখ্য গান রচনা করেছেন। অসম্ভব প্রাণসঞ্চারী এসব সাধনতত্ত্বসম্বলিত গান গুরুবাদী বাউলসাধনায় উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে রেখেছে। তাঁর গানের সৃষ্টি-নৈপুণ্য এবং আঙ্গিক-স্বাতন্ত্র্য চিরভাস্বর হয়ে বাউলতত্ত্বের অনন্য ধারা তৈরি করেছে। সে ধারা অনুসরণ করে নীরবে-নিভৃতে শত-সহস্র সাধুসন্তরা এখনো নির্বিঘ্নে গুহ্য সাধনপথে নিরন্তর হেঁটে চলেছেন।
