শ্রীকান্ত প্রথম পর্ব এক (চলিত ভাষায়)
আমার এই ভবঘুরে জীবনের বিকেল বেলায় দাঁড়িয়ে এরই একটা অধ্যায় বলতে বসে আজ কত কথা মনে পড়ছে!
ছেলেবেলা থেকেই এমন করেই তো বুড়ো হয়ে গেলাম। আত্মীয়-অনাত্মীয় সবার মুখে শুধু একটানা ‘ছি ছি’ শুনতে শুনতে নিজেও নিজের জীবনটাকে একটা বড় ‘ছি ছি ছি’ ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারিনি। কিন্তু কী করে যে জীবনের সকালেই এই লম্বা ‘ছি ছি’র শুরু হয়ে গিয়েছিল, অনেকদিন পর আজ সেই সব মনে-পড়া আর ভুলে-যাওয়া গল্পের মালা গাঁথতে বসে হঠাৎ মনে হচ্ছে, এই ‘ছি ছি’টা যত বড় করে সবাই দেখিয়েছে, হয়তো ঠিক তত বড় ছিল না।
মনে হয়, ভগবান যাকে তাঁর বিচিত্র সৃষ্টির ঠিক মাঝখানে টেনে নেন, তাকে ভালো ছেলে হয়ে পরীক্ষায় পাশ করার সুবিধে দেননি। গাড়ি-পালকি চড়ে লোকজন নিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে ‘কাহিনি’ নাম দিয়ে ছাপানোর শখও দেননি। বুদ্ধি হয়তো দিয়েছেন, কিন্তু বিষয়ী লোকেরা সেটাকে সুবুদ্ধি বলে না। তাই তার প্রবৃত্তি এমন খাপছাড়া, অসঙ্গত, আর দেখার জিনিস আর তৃষ্ণাটা এতই বেয়াড়া যে, তার বর্ণনা করতে গেলে ভদ্র লোকেরা হয়তো হেসে মরবে।
তারপর সেই মন্দ ছেলেটা কেমন করে অনাদরে-অবহেলায়, মন্দের টানে মন্দ হয়ে, ধাক্কা খেয়ে, ঠোক্কর খেয়ে, একদিন অজান্তেই অপযশের ঝুলি কাঁধে নিয়ে কোথায় সরে পড়ে—অনেকদিন তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না।
থাক এসব কথা। যা বলতে বসেছি, তাই বলি। কিন্তু বললেই তো বলা হয় না। ঘুরে বেড়ানো এক, আর সেটা লিখে প্রকাশ করা আরেক। যার পা আছে সে ঘুরতে পারে, কিন্তু হাত থাকলেই তো লেখা যায় না! সেটা খুব শক্ত।
তার ওপর আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ভগবান আমার মধ্যে কল্পনা-কবিত্বের বাষ্পটুকুও দেননি। এই দুটো পোড়া চোখ দিয়ে আমি যা দেখি ঠিক তাই দেখি। গাছকে গাছই দেখি, পাহাড়কে পাহাড়ই দেখি। জলের দিকে তাকালে জল ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। আকাশে মেঘের দিকে ঘাড় তুলে তুলে ঘাড় ব্যথা করে ফেলেছি, কিন্তু মেঘ তো মেঘই! কারো এলো চুলের রাশি তো দূরের কথা, একগাছি চুলও কোনোদিন খুঁজে পাইনি। চাঁদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চোখ ঠিকরে গেছে, কিন্তু কারো মুখ তো কখনো নজরে পড়েনি।
যাকে ভগবান এমন করে বিড়ম্বিত করেছেন, তার দ্বারা কবিত্ব হয় না। শুধু সত্যি কথা সোজাসুজি বলা যায়। তাই আমি তাই করব।
কিন্তু কী করে ‘ভবঘুরে’ হয়ে পড়লাম, সে কথা বলতে গেলে, সকালের জীবনে এই নেশায় কে আমাকে মাতিয়েছিল, তার একটু পরিচয় দিতে হয়। তার নাম ইন্দ্রনাথ। আমাদের প্রথম আলাপ একটা ফুটবল ম্যাচে। আজ সে বেঁচে আছে কি না জানি না। কারণ অনেক বছর আগে একদিন ভোরে ঘরবাড়ি, বিষয়-আশয়, আত্মীয়-স্বজন সব ছেড়ে এক কাপড়ে সে সংসার ত্যাগ করে চলে গেল, আর ফিরে আসেনি। উঃ—সে দিনটা এখনো মনে পড়ে!
ইস্কুলের মাঠে বাঙালি আর মুসলমান ছাত্রদের ফুটবল ম্যাচ। সন্ধ্যা হয় হয়। মগ্ন হয়ে দেখছি। আনন্দের সীমা নেই। হঠাৎ—ওরে বাবা—এ কী রে! চটাপট শব্দ আর মারো শালাকে, ধরো শালাকে! কেমন যেন হতভম্ব হয়ে গেলাম। দু-তিন মিনিট। এর মধ্যে কে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল, বুঝতেই পারলাম না।
ভালো করে বুঝলাম যখন পিঠের ওপর একটা পুরো ছাতির বাঁট পটাশ করে ভাঙল আর আরও দু-তিনটে মাথায়-পিঠে উঠতে দেখলাম। পাঁচ-সাতজন মুসলমান ছোকরা তখন আমাকে ঘিরে ফেলেছে—পালানোর রাস্তা নেই।
আরেকটা ছাতির বাঁট—আরেকটা। ঠিক সেই মুহূর্তে যে ছেলেটা বাইরে থেকে বিদ্যুতের মতো ভিড় ভেদ করে এসে আমাকে আড়াল করে দাঁড়াল—সেই ইন্দ্রনাথ।
ছেলেটা কালো। তার বাঁশির মতো নাক, চওড়া সুন্দর কপাল, মুখে দু-চারটে বসন্তের দাগ। মাথায় আমার মতোই, তবে বয়সে একটু বড়। বলল, “ভয় কী! ঠিক আমার পিছনে পিছনে বেরিয়ে আয়।”
ছেলেটার বুকের ভেতর সাহস আর করুণা যা ছিল, তা দুর্লভ হলেও অসাধারণ হয়তো নয়। কিন্তু তার হাত দুটো যে সত্যিই অসাধারণ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শুধু জোরের জন্য বলছি না। হাত দুটো তার হাঁটুর নীচে পর্যন্ত নেমে যেত। এর বড় সুবিধে হলো, যে জানত না, তার মাথাতেই আসত না যে, ঝগড়ার সময় এই খাটো মানুষটা হঠাৎ তিন হাত লম্বা হাত বের করে তার নাকের ওপর এমন ঘুষি মারবে। সে কী ঘুষি! বাঘের থাবা বললেই হয়।
দু-মিনিটের মধ্যে তার পিঠ ঘেঁষে বাইরে বেরিয়ে পড়লাম। ইন্দ্র সাদাসিধে বলল, “পালা।”
ছুটতে শুরু করে বললাম, “তুমি?” সে রুক্ষ গলায় বলল, “তুই পালা না—গাধা কোথাকার!”
গাধাই হই আর যাই হই, আমার খুব মনে পড়ে, আমি হঠাৎ ফিরে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম,—“না।”
ছেলেবেলায় মারপিট কে না করেছে? কিন্তু আমরা পাড়াগাঁয়ের ছেলে—মাস দু-তিনেক আগে লেখাপড়ার জন্য শহরে পিসিমার বাড়ি এসেছি। এর আগে এভাবে দল বেঁধে মারামারি করিনি, আর এমন পুরো ছাতির বাঁটও পিঠে ভাঙেনি।
তবু একা পালাতে পারলাম না। ইন্দ্র একবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “না—তবে কী? দাঁড়িয়ে মার খাবি নাকি? ওই দিক থেকে ওরা আসছে—আচ্ছা, তবে খুব জোরে দৌড়ো—”
এই কাজটা আমি সবসময় ভালো পারি। বড় রাস্তায় পৌঁছে যখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। দোকানে দোকানে আলো জ্বলে উঠেছে, পথে মিউনিসিপ্যালিটির কেরোসিন ল্যাম্প লোহার খুঁটিতে এখানে-ওখানে জ্বলছে। চোখের জোর থাকলে একটার কাছে দাঁড়িয়ে আরেকটা দেখা যায় না, তা নয়। আর আততায়ীর ভয়ও নেই।
ইন্দ্র খুব স্বাভাবিক গলায় কথা বলল। আমার গলা শুকিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আশ্চর্য, সে একটুও হাঁপায়নি। যেন কিছুই হয়নি—মারেনি, মার খায়নি, ছোটেনি—কিছুই না। জিজ্ঞেস করল, “তোর নাম কী রে?”
“শ্রী—কা—ন্ত—”
“শ্রীকান্ত? আচ্ছা।” বলে সে জামার পকেট থেকে এক মুঠো শুকনো পাতা বের করল। কিছুটা নিজের মুখে পুরে দিয়ে বাকিটা আমার হাতে দিয়ে বলল, “ব্যাটাদের খুব ঠুকেছি—চিবো।”
“কী এটা?”
“সিদ্ধি।”
আমি খুব অবাক হয়ে বললাম, “সিদ্ধি? এ আমি খাই না।”
সে আরও অবাক হয়ে বলল, “খাস না? কোথাকার গাধা রে! বেশ নেশা হবে—চিবো! চিবিয়ে গিলে ফ্যাল।”
নেশার মজা তখন তো জানতাম না! তাই ঘাড় নেড়ে ফিরিয়ে দিলাম। সে সেটাও নিজের মুখে দিয়ে চিবিয়ে গিলে ফেলল।
“আচ্ছা, তাহলে সিগারেট খা।” বলে আরেক পকেট থেকে দুটো সিগারেট আর দেশলাই বের করে একটা আমাকে দিয়ে অন্যটা নিজে ধরাল। তারপর দুই হাত জড়ো করে সিগারেটটাকে কল্কের মতো করে টানতে লাগল। বাপ রে, কী টান! এক টানে সিগারেটের আগুন মাথা থেকে তলায় নেমে গেল।
চারদিকে লোকজন। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, “চুরুট খাওয়া কেউ দেখে ফেললে?”
“ফেললেই বা! সবাই জানে।” বলে স্বচ্ছন্দে টানতে টানতে রাস্তার মোড় ঘুরে আমার মনে গভীর ছাপ ফেলে অন্যদিকে চলে গেল।
আজ সেই দিনের অনেক কথাই মনে পড়ছে। শুধু এটাই মনে করতে পারছি না—সেদিন ওই অদ্ভুত ছেলেটাকে ভালোবেসেছিলাম, নাকি তার খোলাখুলি সিদ্ধি আর সিগারেট খাওয়ার জন্য মনে মনে ঘেন্না করেছিলাম।
তারপর এক মাস কেটে গেছে। সেদিনের রাতটা ছিল ভীষণ গরম আর অন্ধকার। কোথাও একটা পাতাও নড়ছে না। ছাদের ওপর সবাই শুয়ে ছিলাম। বারোটা বাজে, তবু কারো চোখে ঘুম নেই। হঠাৎ কী মিষ্টি বাঁশির সুর কানে এসে লাগল। সাধারণ রামপ্রসাদী সুর। অনেক শুনেছি, কিন্তু বাঁশিতে যে এত মুগ্ধ করে দিতে পারে, তা জানতাম না।
বাড়ির পূর্ব-দক্ষিণ কোণে একটা বিশাল আম-কাঁটালের বাগান। ভাগের বাগান, তাই কেউ খোঁজখবর নিত না। পুরোটা জঙ্গলে ভরে গিয়েছিল। শুধু গরু-বাছুরের চলাচলের জন্য সরু একটা পথ ছিল।
মনে হলো, যেন সেই বনের পথ ধরেই বাঁশির সুর ক্রমশ কাছে আসছে। পিসিমা উঠে বসে বড়ছেলেকে বললেন, “হ্যাঁ রে নবীন, বাঁশি বাজাচ্ছে কে—রায়েদের ইন্দ্র নাকি?” বুঝলাম, সবাই ওই বাঁশিওয়ালাকে চেনে।
বড়দা বলল, “সে হতভাগা ছাড়া আর কে এমন বাঁশি বাজাবে, আর ওই জঙ্গলের মধ্যেই বা ঢুকবে কে?”
পিসিমা ভয় পেয়ে বললেন, “বলিস কী রে? ও কি গোঁসাইবাগানের ভেতর দিয়ে আসছে নাকি?”
বড়দা বলল, “হুঁ।”
পিসিমা এই ঘন অন্ধকার আর জঙ্গলের কথা ভেবে শিউরে উঠলেন। ভয়ে ভয়ে বললেন, “ওর মা বারণ করে না? গোঁসাইবাগানে কত লোক সাপের কামড়ে মরেছে তার ঠিক নেই। এত রাতে ছেলেটা ওই জঙ্গলে কেন?”
বড়দা হেসে বলল, “আর কেন! ও-পাড়া থেকে এ-পাড়ায় আসার সোজা পথ এটাই। যার ভয় নেই, প্রাণের মায়া নেই, সে বড় রাস্তা ঘুরবে কেন? ওর তাড়া আছে। নদী-নালা থাকুক, সাপ-বাঘ থাকুক, কোনো বাধা নেই।”
পিসিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করলেন। বাঁশির সুর ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে আবার ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
এই সেই ইন্দ্রনাথ। সেদিন ভেবেছিলাম, যদি ওর মতো এত জোর আর মারামারি করতে পারতাম! আর সেই রাতে ঘুম না আসা পর্যন্ত শুধু কামনা করছিলাম—যদি ওর মতো বাঁশি বাজাতে পারতাম!
কিন্তু কেমন করে ভাব করব? সে তো আমার অনেক ওপরে। তখন সে ইস্কুলেও পড়ে না। শুনেছিলাম, হেডমাস্টার গাধার টুপি পরানোর চেষ্টা করায় সে রেগে হেডমাস্টারের পিঠে কী একটা করে রেলিং ডিঙিয়ে বাড়ি চলে এসেছিল, আর যায়নি। পরে তার মুখেই শুনেছি, অপরাধটা খুব ছোট। হিন্দুস্থানী পণ্ডিতের ক্লাসে ঘুম পেয়েছিল, তাই তার শিখা কেটে ছোট করে দিয়েছিল। পণ্ডিত বাড়ি গিয়ে নিজের শিখা নিজের পকেটেই পেয়েছিলেন। তবু রাগ পড়েনি। ইন্দ্র বুঝেছিল, একবার রেলিং ডিঙিয়ে বেরিয়ে গেলে আর ফেরার রাস্তা খোলা থাকে না। ফেরার শখও তার ছিল না।
দশ-বিশজন অভিভাবক থাকা সত্ত্বেও কেউ তাকে আর ইস্কুলমুখো করতে পারেনি। ইন্দ্র কলম ফেলে নৌকার দাঁড় তুলে নিল। সারাদিন গঙ্গায় নৌকায়। তার নিজের ছোট ডিঙি ছিল। জল-ঝড়-দিন-রাত কোনো বাধা নেই। হঠাৎ একদিন পশ্চিমের স্রোতে পানসি ভাসিয়ে দিয়ে দশ-পনেরো দিন উধাও। ঠিক সেই উদ্দেশ্যহীন ভাসার সময়েই তার সঙ্গে আমার গভীর বন্ধুত্বের শুরু।
যারা আমাকে চেনে তারা বলবে, “তোর তো এ সাজে না বাপু! গরিবের ছেলে, লেখাপড়া করতে পরের বাড়ি এসেছিস—তার সঙ্গে মিশবি কেন?” কিন্তু সব মিছে। কেন যে তার প্রতি আমার এত টান, কেন সেই মন্দ ছেলেটার সঙ্গেই মিশতে চাইতাম—এর উত্তর আমিও জানি না।
সেদিনটা খুব মনে পড়ে। সারাদিন অবিরাম বৃষ্টি। শ্রাবণের আকাশ ঘন মেঘে ঢাকা। সন্ধ্যার আগেই চারদিক অন্ধকার। সকাল সকাল খেয়ে আমরা ভাইয়েরা বাইরের বৈঠকখানায় রেড়ির তেলের সেজ জ্বেলে পড়তে বসেছি। পিসেমশাই একদিকে খাটে শুয়ে ঘুমোচ্ছেন, অন্যদিকে বৃদ্ধ রামকমল ভটচায আফিং খেয়ে হুঁকো টানছেন। দেউড়িতে হিন্দুস্থানী সিপাহিরা তুলসীদাস গাইছে। ভেতরে আমরা চার ভাই মেজদার কড়া নজরে পড়ছি।
মেজদা বার দুয়েক এন্ট্রান্স ফেল করে তৃতীয়বার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার শাসনে এক মুহূর্ত সময় নষ্টের উপায় নেই। পড়ার সময় সাড়ে সাতটা থেকে নয়টা। তিনি কাগজ কেটে টিকিট বানিয়েছেন—‘বাইরে’, ‘থুথু ফেলা’, ‘নাক ঝাড়া’, ‘তেষ্টা পাওয়া’ ইত্যাদি।
যতীনদা একটা ‘নাক ঝাড়া’ টিকিট নিয়ে মেজদার সামনে ধরে দিল। মেজদা সই করে লিখে দিলেন—হুঁ—আটটা তেত্রিশ থেকে আটটা সাড়ে চৌত্রিশ পর্যন্ত। অর্থাৎ এই সময়টুকুর জন্য সে নাক ঝাড়তে যেতে পারবে। ছুটি পেয়ে যতীনদা টিকিট হাতে উঠে যেতেই ছোড়দা ‘থুথু ফেলা’ টিকিট পেশ করল। মেজদা ‘না’ লিখে দিলেন। তাই ছোড়দা মুখ ভার করে দু-মিনিট বসে থেকে ‘তেষ্টা পাওয়া’ আবেদন জমা দিল। এবার মঞ্জুর হলো। মেজদা সই করে লিখলেন—হুঁ—আটটা একচল্লিশ থেকে আটটা সাতচল্লিশ পর্যন্ত। পরোয়ানা নিয়ে ছোড়দা হাসিমুখে বেরোতেই যতীনদা ফিরে এসে টিকিট জমা দিল। মেজদা ঘড়ি দেখে সময় মিলিয়ে একটা খাতা বের করে টিকিটটা গাঁদ দিয়ে আটকে রাখলেন। সব সরঞ্জাম তার হাতের কাছেই থাকত। সপ্তাহ পরে এই টিকিটগুলোর সময় ধরে হিসেব চাওয়া হতো।
এভাবে মেজদার অসম্ভব সতর্কতা আর শৃঙ্খলায় আমাদের বা তার নিজেরও এক মুহূর্ত সময় নষ্ট হতো না। প্রতিদিন এই দেড় ঘণ্টা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে রাত ন’টায় যখন আমরা ভেতরে শুতে যেতাম, তখন মা সরস্বতী নিশ্চয়ই ঘরের দরজা পর্যন্ত আমাদের এগিয়ে দিয়ে যেতেন। আর পরের দিন ইস্কুলে ক্লাসে যে সম্মান-সৌভাগ্য পেয়ে বাড়ি ফিরতাম, সেটা তো তোমরা নিজেরাই বুঝতে পারছ।
কিন্তু মেজদার দুর্ভাগ্য, তার নির্বোধ পরীক্ষকরা তাকে কোনোদিন চিনতেই পারল না। নিজের আর অন্যের পড়াশোনায় এত প্রবল আগ্রহ, সময়ের মূল্য নিয়ে এত সূক্ষ্ম দায়িত্ববোধ থাকা সত্ত্বেও তাকে বারবার ফেল করিয়ে দিত। এটাই অদৃষ্টের অন্ধ বিচার। যাক, এখন আর সে দুঃখ করে লাভ নেই।
সে রাতেও ঘরের বাইরে ঘন অন্ধকার আর বারান্দায় তন্দ্রায় ডুবে থাকা দুই বুড়ো। ভেতরে মৃদু আলোয় গভীর পড়াশোনায় মগ্ন আমরা চারজন।
ছোড়দা ফিরে আসায় আমার তেষ্টায় বুক ফেটে যাচ্ছিল। তাই আমিও টিকিট পেশ করে উন্মুখ হয়ে বসে রইলাম। মেজদা তার টিকিট-আঁটা খাতায় ঝুঁকে পড়ে পরীক্ষা করতে লাগলেন—আমার তেষ্টা পাওয়াটা আইনসম্মত কি না, অর্থাৎ কাল-পরশু কতটা জল খেয়েছিলাম।
হঠাৎ আমার ঠিক পিঠের কাছে ‘হুম্’ শব্দ আর সঙ্গে সঙ্গে ছোড়দা আর যতীনদার একসঙ্গে চিৎকার— “ওরে বাবা রে, খেয়ে ফেলেছে রে!” কীসে তাদের খেয়ে ফেলল, আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার আগেই মেজদা মুখ তুলে একটা বিকট শব্দ করে বিদ্যুতের বেগে দুই পা সামনে ছড়িয়ে সেজ উলটে দিলেন। তখন সেই অন্ধকারে যেন দক্ষযজ্ঞ লেগে গেল। মেজদার ফিটের ব্যামো ছিল। তিনি ‘অোঁ-অোঁ’ করে প্রদীপ উলটিয়ে চিত হয়ে পড়লেন, আর উঠলেনই না।
ঠেলাঠেলি করে বাইরে বেরোতেই দেখি, পিসেমশাই দুই ছেলেকে বগলে চেপে তাদের চেয়েও জোরে চেঁচিয়ে বাড়ি ফাটাচ্ছেন। যেন তিন বাপ-ব্যাটায় কে কত বড় করে হাঁ করতে পারে, তার প্রতিযোগিতা চলছে।
এই সুযোগে একটা চোর নাকি পালাচ্ছিল, দেউড়ির সিপাহিরা তাকে ধরে ফেলেছে। পিসেমশাই প্রচণ্ড চিৎকারে হুকুম দিচ্ছেন— “আউর মারো—শালাকো মার ডালো!”
মুহূর্তের মধ্যে আলো, চাকর-বাকর আর পাড়ার লোকে উঠোন ভরে গেল। দরোয়ানরা চোরকে মারতে মারতে আধমরা করে টেনে আলোর সামনে ফেলে দিল। তখন চোরের মুখ দেখে বাড়ির সবার মুখ শুকিয়ে গেল— “আরে, এ তো ভটচায্যিমশাই!”
তখন কেউ জল দিচ্ছে, কেউ পাখার বাতাস করছে, কেউ তার চোখে-মুখে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে ঘরের ভেতর মেজদাকে নিয়ে সেই একই কাণ্ড।
পাখার বাতাস আর জলের ঝাপটা খেয়ে রামকমল সুস্থ হয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। সবাই জিজ্ঞেস করতে লাগল, “আপনি অমন করে ছুটছিলেন কেন?” ভটচায্যিমশাই কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “বাবা, বাঘ নয়, একটা মস্ত ভালুক—লাফ মেরে বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে এলো।”
ছোড়দা আর যতীনদা বারবার বলছে, “ভালুক নয় বাবা, একটা নেকড়ে বাঘ। হুম্ করে ল্যাজ গুটিয়ে পাপোশের ওপর বসেছিল।”
মেজদার জ্ঞান ফিরলে তিনি চোখ বুজে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সংক্ষেপে বললেন, “দ্য রয়েল বেঙ্গল টাইগার।”
কিন্তু সেটা কোথায়? মেজদার ‘রয়েল বেঙ্গল’ হোক আর রামকমলের ‘মস্ত ভালুক’ হোক, সেটা এলোই বা কী করে, গেলই বা কোথায়? এতগুলো লোক যখন দেখেছে, তখন নিশ্চয়ই কিছু একটা বটে!
তখন কেউ বিশ্বাস করল, কেউ করল না। কিন্তু সবাই লন্ঠন নিয়ে ভয়ে ভয়ে চারদিক খুঁজতে লাগল।
হঠাৎ পালোয়ান কিশোরী সিং “উহ বয়ঠা” বলে এক লাফে বারান্দায় উঠল। তারপর শুরু হলো আরেক ঠেলাঠেলি। এত লোক, সবাই একসঙ্গে বারান্দায় উঠতে চায়, কারো এক মুহূর্ত দেরি সয় না। উঠোনের এক কোণে একটা ডালিম গাছ ছিল, দেখা গেল তার ঝোপের মধ্যে একটা বড় জানোয়ার বসে আছে। বাঘের মতোই দেখতে। পলকে বারান্দা খালি হয়ে বৈঠকখানা ভরে গেল—কেউ আর সেখানে নেই। ঘরের ভিড় থেকে পিসেমশাইয়ের উত্তেজিত গলা ভেসে আসতে লাগল— “সড়কি লাও—বন্দুক লাও।” পাশের বাড়ির গগনবাবুদের একটা মুঙ্গেরী গাদা বন্দুক ছিল, সেটার দিকেই নজর। ‘লাও’ তো বলা হলো, কিন্তু আনবে কে? ডালিম গাছটা তো দরজার একদম কাছে, আর তার মধ্যেই বাঘ বসে আছে! হিন্দুস্থানীরা সাড়া দিচ্ছে না, যারা তামাশা দেখতে ঢুকেছিল তারাও চুপ।
শ্রীকান্ত প্রথম পর্ব এক (চলিত ভাষায় – পরের অংশ)
এমন বিপদের মুহূর্তে হঠাৎ কোথা থেকে ইন্দ্র এসে হাজির। সে বোধ হয় সামনের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, হইচই শুনে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়েছে। নিমেষের মধ্যে শতকণ্ঠে চিৎকার উঠল— “ওরে বাঘ! বাঘ! পালিয়ে আয় রে ছোঁড়া, পালিয়ে আয়!”
প্রথমে সে একটু থতমত খেয়ে ভেতরে ছুটে এল। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সব শুনে নিয়ে একা নির্ভয়ে উঠোনে নেমে গেল এবং লন্ঠন তুলে বাঘ দেখতে লাগল।
দোতলার জানালা থেকে মেয়েরা দম বন্ধ করে এই ডাকাত ছেলেটার দিকে তাকিয়ে দুর্গানাম জপ করতে লাগল। পিসিমা তো ভয়ে কেঁদেই ফেললেন। নীচে ভিড়ের মধ্যে হিন্দুস্থানী সিপাহিরা গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে তাকে সাহস দিতে লাগল এবং একটা অস্ত্র পেলেই নেমে আসবে, এমন আভাসও দিল।
ভালো করে দেখে ইন্দ্র বলল, “দ্বারিকবাবু, এ তো বাঘ বলে মনে হচ্ছে না।” তার কথা শেষ হতে না হতেই সেই রয়েল বেঙ্গল টাইগার দুই থাবা জোড় করে মানুষের গলায় কেঁদে উঠল। পরিষ্কার বাংলায় বলল, “না বাবুমশাই, না। আমি বাঘ-ভালুক নই—ছিনাথ বউরূপী।”
ইন্দ্র হো হো করে হেসে উঠল। ভটচায্যিমশাই খড়ম হাতে সবার আগে ছুটে এলেন— “হারামজাদা! ভয় দেখানোর জায়গা পাস না?”
পিসেমশাই রেগে আগুন হয়ে হুকুম দিলেন, “শালার কান ধরে নিয়ে আয়!”
কিশোরী সিং তাকে প্রথম দেখেছিল, তাই তার দাবিই সবচেয়ে বেশি। সে গিয়ে ছিনাথের কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে আনল। ভটচায্যিমশাই তার পিঠে খড়মের এক ঘা বসিয়ে দিয়ে রাগের মাথায় হিন্দি বলতে লাগলেন, “এই হারামজাদা বজ্জাতের জন্য আমার গতর চূর্ণ হয়ে গেল। খোট্টা শালার ব্যাটারা আমাকে কিলিয়ে কাঁটাল পাকিয়ে দিল…”
ছিনাথের বাড়ি বারাসতে। সে প্রতি বছর এই সময়ে রোজগার করতে আসে। কালও এ বাড়িতে নারদ সেজে গান শুনিয়ে গিয়েছিল।
সে একবার ভটচায্যিমশায়ের পায়ে, একবার পিসেমশায়ের পায়ে পড়তে লাগল। বলল, ছেলেরা ভয় পেয়ে প্রদীপ উলটে যে মহামারী কাণ্ড বাধিয়েছে, তাতে সেও ভয় পেয়ে গাছের আড়ালে লুকিয়েছিল। ভেবেছিল একটু শান্ত হলে বেরিয়ে তার সাজ দেখিয়ে যাবে। কিন্তু ব্যাপারটা যত বাড়তে লাগল, তার আর সাহসে কুলাল না।
ছিনাথ কাকুতি-মিনতি করতে লাগল, কিন্তু পিসেমশায়ের রাগ আর পড়ে না। পিসিমা ওপর থেকে বললেন, “তোমাদের ভাগ্য ভালো যে সত্যিকারের বাঘ-ভালুক বের হয়নি। যে বীরপুরুষ তোমরা আর তোমাদের দরোয়ানরা! ছেড়ে দাও বেচারাকে, আর দেউড়ির ওই খোট্টাগুলোকে দূর করে দাও। একটা ছোট ছেলের যে সাহস, এক বাড়ি লোকের তা নেই।”
পিসেমশাই কোনো কথাই শুনলেন না। বরং পিসিমার কথায় চোখ পাকিয়ে এমন ভাব করলেন যে, ইচ্ছে করলে তিনি যথেষ্ট জবাব দিতে পারেন। কিন্তু স্ত্রীলোকের কথার উত্তর দেওয়া পুরুষের পক্ষে অপমানজনক, তাই আরও গরম হয়ে হুকুম দিলেন, “ওর ল্যাজ কেটে দাও।” তখন তার সেই রঙিন কাপড় জড়ানো লম্বা খড়ের ল্যাজ কেটে নিয়ে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। পিসিমা ওপর থেকে রাগ করে বললেন, “রেখে দাও। তোমার ওটা অনেক কাজে লাগবে।”
ইন্দ্র আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই বুঝি এই বাড়িতে থাকিস শ্রীকান্ত?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ। তুমি এত রাতে কোথায় যাচ্ছ?”
ইন্দ্র হেসে বলল, “রাত কোথায় রে, এই তো সন্ধ্যা। আমি আমার ডিঙিতে মাছ ধরতে যাচ্ছি। যাবি?”
আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “এত অন্ধকারে ডিঙিতে চড়বে?”
সে আবার হাসল। বলল, “ভয় কী রে! সেই তো মজা। আর অন্ধকার না হলে মাছ পাওয়া যায়? সাঁতার জানিস?”
“খুব জানি।”
“তবে আয় ভাই!” বলে সে আমার একটা হাত ধরল। “আমি একা এত স্রোতে উজিয়ে যেতে পারি না। একজন লাগবে যে ভয় পায় না।”
আমি আর কথা বললাম না। তার হাত ধরে নিঃশব্দে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমটায় নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না—আমি সত্যি এই রাতে নৌকায় চলেছি। কারণ যে আকর্ষণে এই নিশুতি রাতে বাড়ির সব শাসন তুচ্ছ করে একা বেরিয়ে এসেছি, সেটা তখন বুঝে দেখার মতো অবস্থা আমার ছিল না।
কিছুক্ষণ পর গোঁসাইবাগানের সেই ভয়ঙ্কর বনপথের সামনে পৌঁছলাম। ইন্দ্রকে অনুসরণ করে স্বপ্নের মতো সেটা পেরিয়ে গঙ্গার তীরে এসে দাঁড়ালাম।
খাড়া কাঁকরের পাড়। মাথার ওপর একটা প্রাচীন অশ্বত্থ গাছ মূর্তিমান অন্ধকারের মতো দাঁড়িয়ে আছে। আর তার প্রায় ত্রিশ হাত নীচে গভীর বর্ষার জলস্রোত আবর্ত তৈরি করে উদ্দাম হয়ে ছুটছে। দেখলাম, সেখানে ইন্দ্রের ছোট ডিঙি বাঁধা। ওপর থেকে মনে হলো, স্রোতের মুখে একটা ছোট মোচার খোলা যেন কেবলই আছাড় খেয়ে মরছে।
আমি নিজেও খুব ভীরু ছিলাম না। কিন্তু ইন্দ্র যখন ওপর থেকে একটা দড়ি দেখিয়ে বলল, “ডিঙির এই দড়ি ধরে পা টিপে টিপে নেমে যা। সাবধান, পিছলে পড়লে আর তোকে খুঁজে পাওয়া যাবে না”—তখন সত্যিই আমার বুক কেঁপে উঠল। মনে হলো, এটা অসম্ভব। তবু আমার তো দড়ি আছে, কিন্তু তুমি?
সে বলল, “তুই নেমে গেলে আমি দড়ি খুলে দিয়ে নামব। ভয় নেই, আমার নামার জন্য অনেক ঘাসের শিকড় ঝুলছে।”
আর কথা না বলে আমি দড়িতে ভর দিয়ে অনেক কষ্টে নীচে নেমে নৌকায় বসলাম। তখন দড়ি খুলে দিয়ে ইন্দ্র ঝুলে পড়ল। সে কীভাবে নামল, আজও আমি জানি না। ভয়ে বুকের ভেতরটা এত জোরে ধড়ফড় করছিল যে, তার দিকে তাকাতেই পারলাম না। মিনিট দুয়েক শুধু জলের প্রচণ্ড গর্জন। হঠাৎ ছোট্ট একটু হাসির শব্দে চমকে ফিরে দেখি—ইন্দ্র দুই হাতে নৌকা জোরে ঠেলে দিয়ে লাফিয়ে উঠে বসেছে। ছোট তরী তীব্র একটা পাক খেয়ে নক্ষত্রবেগে ভেসে চলল।
