১৬. একটি মানুষের চেহারা
না দেখলে ভাবতেই পারতেন না অমরনাথ। একটি মানুষের চেহারা কয়েক বছরে এত পালটে যেতে পারে? প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্যই অসুস্থ। কিন্তু তাঁর গলার স্বরও রুগ্ণ হয়ে গিয়েছে। গাল বসে গিয়েছে, চুলেও সাদা ছাপ পড়েছে।
হরদেব ঘোষাল দরজা থেকে ফিরে এলেন, ‘না। আমার আর এখানে বসে থাকা ঠিক হবে না। তোমরা দুই বেয়াই অনেকদিন বাদে একসঙ্গে বসেছ। তোমরা মনের কথা বলল। আমি থাকলে নিশ্চয়ই অসুবিধে হবে। আমে দুধে মিশে যাক, আমি আঁটি কেটে পড়ি।’
প্রতুলবাবু বললেন, ‘বড্ড বাজে কথা বলো। বয়স হয়েছে অথচ— !’ হাত তুললেন তিনি, ‘বসো। বসো ওখানে।’
হরদেব যেন এমনটাই চাইছিলেন, হুকুম হওয়ামাত্র চট করে বসে পড়লেন, ‘বাড়িটার কী অবস্থা! আহা, খাঁ খাঁ করছে।’
অমরনাথ চুপচাপ বসে ছিলেন। সকালের বাস ধরে তিনি এখানে পৌঁছেছেন সকাল দশটা নাগাদ। তাও প্রায় পনেরো মিনিট হয়ে গেল। হরদেব ঘোষাল আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন বাইরের গেটে। তাঁর মারফত যোগাযোগ হয়েছে। যে-বাড়িতে আর কখনও পা দেবেন না বলে তিনি স্থির করেছিলেন সেই বাড়িতে ঢোকার পর থেকেই একটা অস্বস্তি শুরু হয়ে গিয়েছিল। এখানে আসার ব্যাপারে তিনি কারও সঙ্গে কথা বলেননি। আসলে দীপার পাশের খবর পাওয়ার পর থেকে ক’দিন যা শুরু হয়েছে তাতে অঞ্জলির কাছেও ব্যাপারটা তোলা সম্ভব হয়নি। তিনি এসেছেন কৌতূহল নিয়ে। একটা মানুষের সবই যে খারাপ তা হতে পারে না। প্রতুলবাবু যদি নিজের ভুল বুঝতে পারেন তা হলে আখেরে দীপারই লাভ।
হরদেববাবু তাঁকে নিয়ে অফিসঘরে বসে খবর পাঠিয়েছিলেন নিজের নাম বলে। তারপর কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলেছিলেন, আপনি আসছেন সেটা কাল বলে গিয়েছি। এখন আপনার নাম বলে পাঠালাম না তার কারণ, খবরটা তো আগে দাসীরানি শুনবেন। অত্যন্ত ধড়িবাজ মেয়েছেলে। ঠিক বুঝতে পারবে আর তারপরেই প্যাঁচ কষতে শুরু করবে।’
অমরনাথ কিছু বললেন না। সেই দাসীটির নাম আনা। এতদিন মনে মনে তাঁদের সমস্ত পরিবার এই আনার কাছে কৃতজ্ঞ ছিল। ছিলই বা কেন, যা সে করেছে, যে-স্বার্থেই করে থাক, মেয়েটা তো বেঁচে গিয়েছে। তিনি যদি সেই ঘটনার পরেও আজ এ-বাড়িতে আসতে পারেন তা হলে আনাকে নিয়ে কোনও বিরূপ মন্তব্য করার অধিকার তাঁর নেই।
প্রতুলবাবু এসেছিলেন মিনিট পনেরো বাদে। হাতে লাঠি। অফিসঘরে ঢুকে দুটো হাত কপালে ঠেকিয়ে বলেছিলেন, ‘নমস্কার। আপনার মেয়ের খবর পেয়েছি। এত বড় একটা কৃতিত্বের অধিকারী আমাদের বাড়ির বউ হবে তা আমি কল্পনাও করিনি।’
হরদেব ঘোষাল বলেছিলেন, ‘তোমাদের বাড়ির বউ মানে? সে অমরনাথবাবুর মেয়ে।’
‘কিন্ত পরীক্ষার ফর্ম ভরতি করার সময় কী নাম লিখেছিল? মানে কোন উপাধি? বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেনি? যতক্ষণ ওই বিয়ের বাঁধনে থাকবে ততক্ষণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখতেই হবে। কী অমরনাথবাবু, ঠিক বলছি কিনা?’
অমরনাথ নীরবে মাথা নেড়ে জানিয়েছিলেন কথাটা সত্যি। আর তারপরেই হরদেব দরজার কাছে চলে গিয়ে ভান করেছিলেন চলে যাওয়ার।
প্রতুলবাবু মাটির দিকে তাকিয়েছিলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, ‘অমরনাথবাবু, আমার বিরুদ্ধে আপনাদের নিশ্চয়ই অনেক অভিযোগ আছে। থাকাটাই স্বাভাবিক। না, আগে আপনাদের কথা শুনি। তারপরে আমার কথা বলব।’
অমরনাথ বললেন, ‘আমাদের কোনও কথা নেই তো।’
‘কোনও অভিযোগ নেই?’
‘না। আমরা আমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছি।’
‘পাপ?’
‘হ্যাঁ। একটি বালিকাকে বড়লোকের বাড়িতে খোঁজখবর না নিয়ে বিয়ে দিয়েছি নিতান্তই লোভে পড়ে। নিজের মেয়ে হলেও অনেক সময় সেই লোভ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। লোভ তো পাপই।’ অমরনাথ এক নিশ্বাসে কথাগুলো বললেন।
‘আপনার কোনও অভিযোগ নেই?’
অমরনাথ প্রতুলবাবুর মুখের ওপর দৃষ্টি রাখলেন, ‘আপনি কেন মেয়েটার এই সর্বনাশ করলেন? আপনি জানতেন যে ওই ছেলের আয়ু বেশিদিন নেই। তবু তাকে দিয়েই বংশরক্ষার অবাস্তব পরিকল্পনা করেছিলেন আপনি। হরদেববাবুর কাছে শুনেছি আপনি তাকে ওষুধ ব্যবহার করতে দিয়েছেন। হয়তো সেটা খেয়েই তার মৃত্যু এগিয়ে এসেছিল। শুধু তাই নয়, আপনি সেই রাত্রে— ।’
‘ওটা বানানো গল্প। আর যাই হোক আমি উন্মাদ নই। ওটা আনা বানিয়ে বলেছিল যাতে বউমা আমার সম্পর্কে বেশি ভয় পায়।’ প্রথম প্রতিবাদ করলেন প্রতুলবাবু।
‘কিন্তু আপনি আমার বাড়িতে রাত কাটাতে চাননি পাছে ছেলের ব্যাপারটা ধরা পড়ে যায়। আমি মূর্খ, আমি লোভী, কিন্তু মেয়েটা তো কোনও দোষ করেনি!’
প্রতুলবাবু বললেন, ‘সত্যি কথা। এখন বলুন, এজন্যে আমি কী প্রায়শ্চিত্ত করব?’
‘মানে?’ অমরনাথের কপালে ভাঁজ পড়ল।
‘আমি যা করেছি তার জন্যে আপনার মেয়ে বিধবা হয়েছে। এখন ও ব্যাপারে তো কিছু করার নেই। আমরা শুধু পারি ওর ভবিষ্যৎ যাতে সমস্যামুক্ত হয় তার ব্যবস্থা করতে।’
হরদেব ঘোষাল এতক্ষণ চুপ করে বসে ছিলেন। এবার বললেন, ‘আরে সবচেয়ে ভাল হয় সসম্মানে ঘরের বউকে ঘরে ফিরিয়ে এনে সুখে ঘর করো।’
‘সুখে ঘর করা আর এ-জীবনে হবে না হবদেব। যৌবনের প্রাবল্যে সবকিছু নস্যাৎ করেছিলাম। এখন তার মাশুল দিতে হচ্ছে। এ-বাড়িতে বউমা ভাল থাকবে না। তাকে ভাল থাকতে দেওয়া হবে না।’
‘একথা ভাবছ কেন? তোমার বাড়িতে একটা ছোট্ট মেয়ে এসেছিল। সে আজ কত বড় হয়ে গেছে। ফার্স্ট ডিভিশনে স্কুল ফাইনাল পাশ করেছে। এ-বাড়িতে এসে সে নিজের সুখ নিজে তৈরি করে নিতে পারে। তুমি হয়তো অনর্থক ভয় পাচ্ছ।’ হরদেব খুব আন্তরিকভাবে কথাগুলো বললেন। নিঃশব্দে হাত নাড়লেন প্রতুলবাবু। তারপর হেসে বললেন, ‘ঈর্ষা, সন্দেহ, হিংসা মানুষকে যত ছোট করে দেয়, অধিকার পাওয়ার পর সেটা হাতছাড়া না করার চেষ্টায় মানুষ অনেক নীচে নামে। আমি আমার নিজের জালে জড়িয়েছি।’
অমরনাথ বললেন, ‘আপনার শরীরে কী হয়েছে?’
‘নানারকম। সুগার, ব্লাডপ্রেশার, বুকের ব্যামো কী নেই? মাথাটা এখনও ঠিক আছে এই রক্ষে। তিনমাস কোনও ব্যাবসার কাজকর্ম করিনি। আর হবেও না। যা আছে তাতে মৃত্যু পর্যন্ত এইভাবেই থাকতে পারব।’ প্রতুলবাবুর হাতের দশটা আঙুল পরস্পরকে আঁকড়ে ধরল।
‘তোমার পর?’ হরদেব সরাসরি জানতে চাইলেন।
‘হ্যাঁ। একটা কিছু ব্যবস্থা করে যাওয়া উচিত। নইলে পাঁচভূতে লুটেপুটে খাবে।’
‘পাঁচভূত না ওই এক পেতনিই যথেষ্ট।’ হরদেব বললেন, ‘সত্যি কথা বলো তো, আরে অমরনাথবাবু সব কথা জানেন, ও কি তোমার সঙ্গে এক বিছানায় শোয়?’
‘এসব কথা আলোচনা করতে ভাল লাগে না হরদেব। অমরনাথবাবু, বউমা অত ভাল পাশ করল, এ-জেলায় ছেলেদের মধ্যেও সে দ্বিতীয় হয়েছে, ওর উচ্চ শিক্ষার কী ব্যবস্থা করলেন? চা-বাগানে তো আর কলেজ নেই।’ প্রতুলবাবু ফিরে তাকালেন।
‘সমস্যা এখানেই। আমার অবস্থা তো জানেনই। দু’-দুটো ছেলে আছে, তাদের মানুষ করতে হবে। মাইনে যা পাই তাতে এখনও কোনওমতে চলে যায়। ওকে পড়াতে গেলে হয় জলপাইগুড়ি নয় কলকাতায় পাঠাতে হয়। কলকাতার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। শুনছি ও নাকি সরকার থেকে কিছু ভাতা পাবে। স্কলারশিপ। তার কী পরিমাণ তাও জানি না। হয়তো কলেজের বেতন লাগবে না। কিন্তু থাকা-খাওয়ার জন্যেও তো অনেক খরচ।’
‘এই খরচটা যদি আমি করি? আপনি কলকাতার বড় কলেজে ওকে ভরতি করুন। যা নম্বর পেয়েছে সব কলেজই ওকে ডেকে নেবে। সেখানকার ভাল হস্টেলে রেখে দিন। পড়ুক। যদ্দুর পড়তে চায় পড়তে দিন। তারপর একদিন হয়তো নিজের পথ খুঁজে পাবে। আর সেইটেই হবে আমাদের প্রায়শ্চিত্ত।’
অমরনাথ মাথা নাড়লেন, ‘তা সম্ভব নয়।’
‘কেন?’ প্রতুলবাবু অবাক হলেন।
‘আমার মেয়েকে আমি চিনি।’
‘মেয়েটি আপনার শালিকার।’
‘জন্মসূত্রে। কিন্তু আমার দুই ছেলের থেকে সে কম নয়। দীপা যদি জানতে পারে আপনার টাকায় সে পড়াশুনা করছে তা হলে সঙ্গে সঙ্গে বিদ্রোহ করবে। ক’বছর আমার মা ওকে জোর করে বিধবা সাজিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু এখন সে ওসব মানতে চাইছে না। রঙিন শাড়ি পরছে, যে-কোনওদিন মাছমাংস খাওয়া শুরু করবে।’
‘এটা ঠিক নয়।’ হরদেব ঘোষাল বলে উঠলেন, ‘আপনারা প্রতিরোধ করুন।’
‘এতদিন করেছি। কতদিন পারব জানি না। সে আপনাদের ঘেন্না করে।’
‘খুব স্বাভাবিক।’ প্রতুলবাবু চোখ বন্ধ করলেন। ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এল। একটু বাদে হরদেব ঘোষাল বললেন, ‘আমি বলি কী, তুমি একটা উইল করো। যদ্দিন জীবিত থাকবে তদ্দিন তুমি এসব সম্পত্তি ভোগ করবে। তোমার অবর্তমানে তোমার বউমা সব পাবে।’
প্রতুলবাবু বললেন, ‘তুমি শুনলে না, বউমা আমাকে ঘেন্না করে। শুনুন অমরনাথবাবু, টাকাটা যদি আমি আপনার নামে পাঠাই। মানে, আমি যে পাঠাচ্ছি তা যদি বউমা টের না পায় তা হলে তো আর কোনও ঝামেলা হবে না।’
‘তা হবে না।’
প্রতুলবাবু হাসলেন, ‘তা হলে এই তঞ্চকতাটুকু আমরা করি?’
‘কিন্তু একটা সমস্যা হবে।’
‘বলুন।’
‘দীপা আমার আর্থিক পরিস্থিতির কথা জানে। কলকাতায় পড়তে পাঠাতে যে-টাকা দরকার তা যে আমি দিতে পারব না এ-কথাও তার অজানা নয়। সে তাই নিজে শিলিগুড়িতে পড়তে চেয়েছে। সেখানে আমাদের পরিচিতা এক অধ্যাপিকার বাড়িতে থেকে সে পড়তে চায়। এই অবস্থায় কলকাতায় পড়তে পাঠালে সে সন্দেহ করবে। মেয়ে তো খুব বুদ্ধিমতী।’ অমরনাথ সব কথা খুলে বললেন।
‘আপনি আমার এখানে এসেছেন সে জানে?’
‘আজ্ঞে না।’
‘ভাল। না, শিলিগুড়িতে পড়তে পাঠানোর দরকার নেই। পাঁচভূতের শহর, কোনও ঐতিহ্য নেই। আপনি জলপাইগুড়ির কলেজেই ভরতি করুন। হস্টেলে রাখুন। আজ বাড়ি ফিরে বলবেন এস সি রায় মশাই ওর সব খরচ বহন করবেন।’
‘এস সি রায়?’
‘দুর মশাই। এস সি রায় হলেন ফাদার অফ টাউন।’
‘তা জানি। কিন্তু— ।’
‘কিন্তু টিন্তু না। আমরা যখন দু’হাতে পকেট ভরছি তখন রায়সাহেব ব্যাবসার সঙ্গে সঙ্গে এই শহরে নানান জনহিতকর কাজ করে গিয়েছেন। শুধু স্পোর্টস নয়, কত গরিব মেধাবী ছাত্রকে পড়ার সুযোগ দিয়েছেন, চাকরির ব্যবস্থা করেছেন তার ঠিক নেই। আপনি ওঁর নাম ব্যবহার করবেন।’
‘যদি কোনওদিন দীপা রায়সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যায়?’
‘ঘটনাটা আমি ওঁকে বলে রাখব।’
প্রস্তাব মনঃপূত হল অমরনাথের। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কি প্রতি মাসে ওর নামে মানি অর্ডার করবেন?’
‘না। আমি ব্যাঙ্কে আপনার নামে পঞ্চাশ হাজার টাকা রাখব। প্রতি মাসে দুশো টাকা সুদ ওরা বউমার কাছে পাঠিয়ে দেবে।’
‘দুশো টাকা মাসে? এত কী হবে?’ অমরনাথ চমকে উঠলেন।
‘অত লাগবে না বলছেন?’
‘না না। একশো টাকাতেই সব হয়ে যাবে ওর।’
‘বেশ। তাই হবে। টাকাটা থাকবে ওর নামে। কিন্তু অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলে ওর সই চাই। সেটা আপনি কোনওভাবে করিয়ে নেবেন।’
হরদেব ঘোষাল বললেন, ֹ‘আপনার মেয়ে কি আইনের চোখে সাবালিকা হয়েছে?’
অমবনাথ মাথা নাড়লেন, না। হরদেব হাসলেন, ‘তা হলে মেয়ের সঙ্গে নিজের নামটাও অ্যাকাউন্ট খোলার সময় দেবেন অমরনাথবাবু। নাবালিকার নামে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা যায় না। অভিভাবক চাই।’
কথাবার্তা পাকা হয়ে গেল। প্রতুলবাবু বললেন, ‘গ্লানি কিছুটা কমল মশাই। আপনি পাঁচটা টাকা দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে নম্বরটা আমাকে জানিয়ে দেবেন। চিঠি লিখলে ইংরেজিতে লিখবেন। তাতে অন্য কেউ মাথা গলাবে না।’
হরদেব ঘোষাল জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সম্পত্তির বিলিব্যবস্থা কী করছ?’
‘দেখি!’ প্রতুলবাবু আবার চোখ বন্ধ করলেন।
‘তুমি যদি ফট করে চিতায় ওঠো তা হলে আইনত সম্পত্তি কে পাবে জানো?’
‘যার কথা বলছ সে পেলে তো খুশিই হতাম। না অমরনাথবাবু, আপনি একটু অপেক্ষা করুন। আপনি ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলবেন, আমাকে জানাবেন, তাতে অনেক সময় লাগবে। আমি আর অপেক্ষা করতে চাইছি না। আজই একটা পঞ্চাশ হাজার টাকার চেক আপনাকে দিচ্ছি, আপনি এ-বাড়ি থেকে বেরিয়ে ব্যাঙ্কে গিয়ে একটা অ্যাকাউন্ট খুলে জমা দিয়ে দিন। ব্যাপারটা আজই চুকে যাক।’
‘কিন্তু অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলে দীপার সই লাগবে যে।’
‘তা অবশ্য।’ আবার চিন্তিত হলেন প্রতুলবাবু, ‘ঠিক আছে, ব্যাঙ্ক থেকে আজ কাগজপত্র নিয়ে যান, কাল মেয়েকে দিয়ে সই করিয়ে জমা দেবেন। একটু বসুন, আমি আসছি।’ লাঠিতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন প্রতুলবাবু। সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়ালেন হরদেব ঘোষাল, ‘হ্যান্ডশেক করুন মশাই।’
না বুঝেই করমর্দন করলেন অমরনাথ। হরদেব বললেন, ‘এককথায় পঞ্চাশ হাজার। এই তো সবে শুরু। আমার যা আন্দাজ তাতে প্রতুল অন্তত দশ-বিশ লক্ষ টাকার সম্পত্তি বানিয়েছে। হবে, সব হবে। জল যখন আপনার দিকে গড়াতে শুরু করেছে একসময় টাকার বন্যায় ভেসে যাবেন মশাই। আমার কমিশন শতকরা দশ টাকা। এটুকু দয়া করে খেয়ালে রাখবেন তা হলেই চলবে।’
‘কমিশন?’
‘ওই দালালি যাকে বলে। ব্যাবসার প্রথম নিয়ম হল একটা ভাল দালাল জোগাড় করো যে তোমার জন্যে ব্যাবসা আনবে, যার বিনিময়ে তুমি তাকে সন্তুষ্ট রাখবে। এ তো এক ধরনের ব্যাবসা। পঞ্চাশের পাঁচ আমার রইল। না না তাড়াহুড়ো কিছু নেই। ধীরেসুস্থেই দেবেন। তদ্দিনে আমি দেখি আরও কয়েক লাখ বের করতে পারি কিনা।’
‘প্রতুলবাবু যদি জানতে পারেন?’
‘দুর মশাই, টাকাপয়সা হল যতক্ষণ পকেটে থাকে ততক্ষণ আমার। পকেট বদল হলেই আমি কে? প্রতুলের খেয়েদেয়ে কাজ নেই যে খোঁজখবর করতে যাবে।’
এইসময় প্রতুলবাবু ফিরে এলেন। পাঞ্জাবির পকেট থেকে চেকবই বের করে অনেক সময় নিয়ে লিখে নিজের নাম সই করলেন। হরদেব বললেন, ‘আর একটা সই করে দাও প্রতুল, তোমার হাত কাঁপছে।’ প্রতুলবাবু মাথা নাড়লেন। তারপর দ্বিতীয় সইটি করলেন। চেকের পাতা ছিড়ে অমরনাথের দিকে এগিয়ে ধরে বললেন, ‘গ্রহণ করুন— ।’
অমরনাথ চেক নিলেন, পে টু দীপাবলী বন্দ্যোপাধ্যায় অ্যান্ড অমরনাথ মুখোপাধ্যায়। পঞ্চাশ হাজার টাকা। এ-জীবনে এত টাকা একসঙ্গে দ্যাখেননি অমরনাথ। তাঁর সমস্ত শরীরে কাঁপুনি এল। জিভ শুকিয়ে গেল। পাঁচ এবং তার পাশের চারটে শূন্য বিশাল হয়ে গেল আচমকা। অমরনাথের কপালে ঘাম জমল। তাঁর দশ বছরের মাইনে। এটা যদি হারিয়ে যায়? অবশ্য এককোণে অ্যাকাউন্ট পেয়ি কথাদুটো লিখে দিয়েছেন প্রতুলবাবু। যে-কেউ চট করে ব্যাঙ্কে গিয়ে ভাঙাতে পারবে না। তিনি সন্তর্পণে চেকটা পকেটে পুরলেন।
প্রতুলবাবু বললেন, ‘এ-বাড়িতে এসে কিছু না খেয়ে চলে যাবেন এটা আমার ভাল লাগল না। শরবত আসছে। সেটা খেয়ে যান।’
হরদেব বললেন, ‘শরবত? আমাকে তো তিনি কখনও শরবত খাওয়ান না।’
‘কুটুম এসেছেন বাড়িতে হরদেব। তাই না?’
‘তা হলে তো খবর পৌঁছেছে।’
দরজায় ছায়া পড়ল। একটু শব্দ। তারপর অল্প বয়সি একটি কাজের মেয়ে ট্রে নিয়ে ঢুকল। দু’জনের হাতে শরবতের গ্লাস তুলে দিয়ে মেয়েটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। প্রতুলবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী রে, কিছু বলবি?’
‘হুঁ। উনি কি দুপুরে ভাত খাবেন?’ মেয়েটা মুখ নামিয়েই জিজ্ঞাসা করল।
‘না না। আমাকে এখনই বেরুতে হবে।’ অমরনাথের কথা শেষ হওয়ামাত্র মেয়েটি বেরিয়ে গেল। হরদেব জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এটি আবার কবে আমদানি হল?’
‘দিন তিনেক। কাউকেও তো মাসখানেকের বেশি রাখে না।’
হরদেব হাসলেন, ‘কেন, জায়গা দখল হবার ভয়ে?’
‘আঃ, হরদেব। বড্ড বাজে কথা বলো তুমি। নিন, খেয়ে নিন অমরনাথবাবু। এখন তো আর তেমন বাধা রইল না। জলপাইগুড়িতে যখন মেয়ে থাকবে তখন শহরে আসতেই হবে আপনাকে। মাঝে মাঝে দর্শন দিলে ভাল লাগবে।’ প্রতুলবাবু বললেন।
পঞ্চাশ হাজার টাকার চেক বুকে নিয়ে হাকিমপাড়ার রাস্তায় যখন অমরনাথ হাঁটছিলেন তখন হরদেব ঘোষাল তাঁর পাশে ছিলেন। হরদেব বলছিলেন, ‘দোষগুণ মিশিয়েই তো মানুষ। প্রতুলের যদি ওই ব্যাপারটা না থাকত তা হলে এতদিনে মিনিস্টার হয়ে যেত।’
‘কোন ব্যাপার?’
‘ওই মেয়েছেলে সংক্রান্ত আকর্ষণ আর সন্দেহ। সেইসঙ্গে মানুষকে অবজ্ঞা করা।’ হরদেব হাসলেন, ‘নইলে আমরা জলপাইগুড়িতে আর একজন আলামোহন দাস পেয়ে যেতাম।’
অমরনাথ কথা বললেন না। আলামোহন বা চিত্তরঞ্জন, তাঁর কিছু এসে যায় না। কিন্তু ওই ব্যাপারটা বলে যে তিনটে কারণ দেখালেন তা একটি সাধারণ মানুষেরও থাকলে সে খুব নীচ হয়ে যায়। প্রতুলবাবু অবশ্য বললেন, তিনি কিছুটা গ্লানিমুক্ত হলেন পঞ্চাশ হাজার টাকার চেক দিয়ে। হয়তো যতটা নীচ ছিলেন ততটা আর রইলেন না। চেকটার কথা মাথায় আসতেই তাঁর খেয়াল হল হরদেব এখনও পাশাপাশি হেঁটে চলেছেন। এখন তাঁরা ঝুলনাপুলের কাছে এসে গেছেন। এখান থেকে সোজা রাস্তা ধরে টাউন ক্লাবের মাঠ বাঁদিকে রেখে কাছারির ঘাটে গিয়ে নৌকো ধরা যায়। তাঁকে দাঁড়াতে দেখে হরদেব জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হল? যাবেন না?’
‘কোথায়?’ অমরনাথের মনে হল লোকটাকে বিদায় করতে পারলে বাঁচেন।
‘ব্যাঙ্কে। সেখানে গিয়ে ফর্মটর্ম নিতে হবে। ফর্মে একজনের সুপারিশের প্রয়োজন হয়। এ নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমাদের পাড়ার একটা ছোকরা সেখানে কাজ করে। বললে সে সই করে দেবে। ব্যাঙ্ক থেকে আমাকে আবার শ্মশানকালী মন্দিরে যেতে হবে।’
‘কালী মন্দির?’
‘হ্যাঁ মশাই। মানত ছিল। যেদিন থেকে প্রতুলের সাম্রাজ্যের ইট খসাতে মা সাহায্য করবেন সেদিনই সোয়া পাঁচ আনার পুজো দেব। ওই যাঃ, তাড়াহুড়োতে পয়সা না নিয়েই বেরিয়ে এসেছি। সোয়া পাঁচ আনাটা দিন তো। আপনারই মঙ্গল হবে।’ হাত বাড়ালেন হরদেব। কেউ যখন মানত করে তখন পুজোর পয়সাটা আলাদা তুলে রাখে বলেই জানতেন অমরনাথ। কিন্তু আপাতত সোয়া পাঁচ আনা দিয়ে মুক্তি পেতে চাইলেন তিনি। পয়সাগুলো পকেটে পুরে ব্যস্ত হলেন হরদেব, ‘চলুন চলুন বেলা বাড়ছে।’
‘বাসুদেব’ বাসে বসে যখন আংরাভাসা নদী পেরিয়ে এলেন অমরনাথ তখন দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর সঙ্গে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার ফর্ম, তাতে হরদেবের পরিচিত ছেলেটির সই করানো হয়েছে, কলেজে ভরতি হবার ফর্ম এবং একটি পঞ্চাশ হাজার টাকার চেক। আচ্ছন্নের মতো বসে ছিলেন তিনি। কাজটা কীরকম হল সেটা আর মাথায় আসছিল না। হরদেব শ্মশানকালীর মন্দিরে যাওয়ার আগে পইপই করে বলে দিয়েছেন আগামীকালই যেন তিনি এসে অ্যাকাউন্ট খুলে চেকটা জমা দেন। বেলা এগারোটা নাগাদ হরদেব ব্যাঙ্কে থাকবেন। সেইসময় তিনি অমরনাথের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকার চেক নিয়ে নেবেন। তাঁর কমিশন। এ-কথাও বলেছেন, ‘পুরো সম্পত্তি আদায় করে আপনাকে দেব মশাই। ওই জাঁহাবাজ মেয়েছেলেটাকে রাস্তায় বসাব।’
হরদেবকে আর পছন্দ হচ্ছে না। তিনি না থাকলেও এই টাকাটা প্রতুলবাবু তাঁদের দিতেন বলে অমরনাথের ধারণা। মাঝখান থেকে শকুনের মতো উড়ে এসে জুড়ে বসেছে হরদেব। লোকটাকে কীভাবে কাটানো যায় তাও ঠাওর করতে পারছেন না। পুরো সম্পত্তি যদি দশ-বিশ লাখের হয়, হরদেব যদি পুরোটাই এনে দিতে পারেন — । বড় নিশ্বাস ফেললেন অমরনাথ। তিনি কি লোভী হয়ে যাচ্ছেন!
বাস থেকে নেমে এপাশ ওপাশে তাকাতেই গাড়িটাকে দেখতে পেলেন অমরনাথ। তাঁর কোয়ার্টার্সের সামনে গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িতে চেপে তাঁর কাছে আসার কোনও পরিচিত মানুষ নেই। সিঁড়ি পেরিয়ে মাঠে নামলেন তিনি। বারান্দায় উঠেই তিনি শুনতে পেলেন, ‘অনেক আগেই আমার আসা উচিত ছিল কিন্তু বয়স হচ্ছে তো! শরীরে একটা-না-একটা রোগ লেগেই থাকে। তা অমরনাথবাবুকে বোলো আমি এসেছিলাম। দীপাবলীর ব্যাপারে কোনও চিন্তা তোমাদের করতে হবে না। এত ভাল রেজাল্ট করেছে যে-মেয়ে— ।’
এইসময় অঞ্জলি বলল, ‘ওই তো উনি এসে গিয়েছেন!’
অমরনাথ তখন দরজায়। বসার ঘরে রমলা সেনকে ঘিরে অঞ্জলি আর দীপা বসে আছে। মনোরমা সেখানে নেই। ছেলেদুটোর স্কুল থেকে ফেরার সময় হয়নি।
রমলা সেন দুই হাত জোড় করে বললেন, ‘নমস্কার মশাই। মেয়ের গর্বে নিশ্চয়ই খুব গর্বিত। আরে, কী চেহারা হয়েছে আপনার? এত তাড়াতাড়ি চুলটুল পেকে গেল কেন? কী ভাই অঞ্জলি, যত্নআত্তি করছ না কেন?’
‘কী করব!’ অঞ্জলি হাসার চেষ্টা করল, ‘দিনরাত শুধু ভবিষ্যতের চিন্তা করে। আর ওই দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর থেকেই শরীর ভাঙছে।’
অমরনাথ চেয়ারে বসলেন, ‘তোমার কলেজে ভরতি হবার ফর্ম এনেছি।’
রমলা সেন মাথা নাড়লেন, ‘ওমা, আমরা তো এর মধ্যে ঠিক করে ফেলেছি দীপাবলী শিলিগুড়ি কলেজে পড়বে। আমার কাছে থাকবে। কলেজে বাড়িতে আমিই থাকব, কোনও চিন্তা নেই আপনাদের।’
হতভম্ব হয়ে গেলেন অমরনাথ। হয়তো আজ সকালে এই প্রস্তাব শুনলে তিনি খুব খুশি হতেন। কিন্তু দীপা কারও বাড়িতে থেকে কলেজে পড়ছে জানার পর প্রতুলবাবু কি—! তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘এত বড় ব্যাপারে তো এককথায় সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। আমি ভেবে দেখি।’
রমলা সেনের মুখ গম্ভীর হল। অঞ্জলি বলল, ‘এতে ভেবে দ্যাখার কী আছে। উনি দীপাকে মেয়ের মতো ভালবাসেন। এতদিন ধরে চিঠিতে উৎসাহ দিয়েছেন। ওঁর কাছে থাকলে মেয়ে আরও ঠিক থাকবে।’
রমলা বললেন, ‘না না। আমার কাছে না থাকলে দীপাবলী যে ঠিক থাকবে না এটা বললে ওকে অসম্মান করা হবে।’
অমরনাথ বললেন, ‘আমি যখন বলছি ভাবতে হবে তখন নিশ্চয়ই তার কোনও যুক্তিসংগত কারণ আছে। আপনারা গল্প করুন। আমার স্নান-খাওয়া কিছু হয়নি।’ অমরনাথ মাথা নেড়ে চেয়ার ছেড়ে ভেতরে চলে এলেন। তাঁর সামনে এখন মনোরমা। তিনি ভেতরের ঘরের খাটের ওপর বসে ছিলেন। ছেলেকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়েছেন, ‘বউমার কোনওদিন আক্কেল হবে না।’ চাপা গলায় বললেন মনোরমা, ‘তুই যে এককথায় রাজি হয়ে যাসনি এটা ভগবানের আশীর্বাদ। ওর কাছে থাকলে তো দীপা শ্লেচ্ছপনা শিখবে।’
অমরনাথ জবাব না দিয়ে আলমারির কাছে চলে গেলেন। যথারীতি পাল্লা খোলা। শুধু লকারে তালা বন্ধ করে চাবিটা পাশেই রাখা আছে। অমরনাথ লকার খুলে চেক এবং ব্যাঙ্কের ফর্ম রেখে দিলেন। তার পরেই কী ভেবে ব্যাঙ্কের ফর্ম বের করে নিয়ে কলেজের ফর্মের সঙ্গে রাখলেন। এইসময় অঞ্জলি ঘরে এল। তাকে দেখে মনোরমা ভেতরে চলে গেলেন। অঞ্জলি সেদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে?’
অমরনাথ জবাব দিলেন না। অঞ্জলি বলল, ‘তুমি ওভাবে চলে এলে কেন?’
অমরনাথ বললেন, ‘খুব খিদে পেয়েছে। স্নান করতে হবে।’
‘তা হলে লকার খুলে কী করছ।’
‘জরুরি কিছু রাখছি।’ অমরনাথ জামা খুলতে খুলতে বললেন, ‘তোমার সঙ্গে কথা আছে। প্রাইভেট। তুমি রান্নাঘরে খাবার দিয়েই চলে এসো না।’
‘উনি বাইরের ঘরে বসে কথা বলছেন।’
‘আশ্চর্য! প্রথম যেদিন এসেছিলেন সেদিন মুখ গোমড়া করে ছিলে।’ অমরনাথ বাথরুমের দিকে যেতে যেতে বললেন, ‘খাবার দাও।’
বাইরের ঘরে বসে রমলা সেন বললেন, ‘আমি তোমাকে কোনও সাজেশন দেব না। সায়েন্স নেবে কিনা তুমিই ঠিক করবে। তবে যাই নাও মনে রেখো ভবিষ্যতে ওই পড়াটা যেন কাজে লাগে।’
‘আমি ইংরেজি নিয়ে পড়তে চাই।’
‘সেটা তো ইন্টারমিডিয়েটে সম্ভব না। গ্র্যাজুয়েশনের সময় তুমি অনার্স নিতে পারো। চট করে ভেবে ফেলো না কী করবে। সময় আছে।’
‘আমি কলেজে পড়াতে চাই বড় হলে।’
‘পড়াবার মতো যোগ্য হলে বোলো। বড় তো হয়েই গিয়েছ। কিন্তু কেন পড়াতে চাও? এখন পর্যন্ত এই প্রফেশনেই মেয়েরা নিরাপদ বলে? ছেলেরা যেসব চাকরি করছে তা করতে চাইবে না কেন? আমাদের সময়ে সুযোগ ছিল না তেমন, স্বাধীন ভারতবর্ষে মেয়েরা শুধু মাস্টারি করার জন্যে পড়াশুনা করবে এই ব্যাপারটা আমি মানতে পারি না। অনেক দেরি হয়ে গেল। তোমার বাবা এখন নিশ্চয়ই স্নানখাওয়া করবেন। অঞ্জলিকে ডাকো, তাকে বলে যাই।’ রমলা সেন ঘড়ি দেখলেন।
‘তা হলে আপনাকে জানাব কী করে?’
‘কী ব্যাপারে?’
শিলিগুড়িতে গেলে— ।’
‘ও হো। সোজা চলে যাবে। ওতে আবার জানানোর কী আছে। হয় বাড়ি নয় কলেজে থাকব। বইগুলো তুলে রেখে দাও। রবীন্দ্রনাথের সব কবিতা ওতে আছে। পড়ে মনে রাখবে। সমস্ত জীবন।’ পাশেই ছোট ছোট কবিতার বইয়ের স্তূপের ওপর হাত রাখলেন রমলা সেন। মাথা নেড়ে ভেতরে এল দীপা। অমরনাথ তখনও বাথরুমে। রান্নাঘরে এসে সে বলল, ‘উনি চলে যাচ্ছেন। তোমাকে ডাকছেন।’
অঞ্জলি ভাতের হাঁড়িতে হাত দিয়েছিল। একটু অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘বুধুয়াকে দেখেছিস?’ দীপা মাথা নাড়ল, না। রান্নাঘরের দরজা টেনে বন্ধ করে দ্রুত চলে এল অঞ্জলি। যতটা শোভনভাবে বিদায় দেওয়া সম্ভব ততটাই শোভনতা বজায় রাখল সে। অস্টিন গাড়িটা বেরিয়ে যাওয়ামাত্র দীপা জিজ্ঞাসা করল, ‘বাবার কী হয়েছে মা? কেমন গম্ভীরভাবে কথা বলছিল।’
অঞ্জলি ঠোঁট ওলটাল। তারপর মনে পড়ে যাওয়ায় রান্নাঘরে ছুটল।
রাত তখন একটা। অঞ্জলি গালে হাত দিয়ে বসে ছিল। খাওয়াদাওয়া চুকে গেলে এগারোটা নাগাদ অমরনাথ কথা শুরু করেছিল। প্রায়-বিকেলে রান্নাঘরে কথা বলার সুযোগ হয়নি। অমরনাথ খেতে বসামাত্র মনোরমা এসে দাঁড়িয়েছিলেন।
অঞ্জলি শেষপর্যন্ত বলল, ‘টাকাটা তুমি নিলে?’
‘টাকা নয়, চেক। না ভাঙালে কোনও মূল্য নেই।’ অমরনাথ বললেন।
‘পঞ্চাশ হাজার?’ সে আড়চোখে চেকটাকে দেখল। লকার থেকে বের করে নিয়ে এসেছেন অমরনাথ অঞ্জলিকে দেখাতে। অঞ্জলি বলল, ‘আমার মাথা ঘুরছে গো। পঞ্চাশ হাজার টাকা একসঙ্গে দিয়ে দিল?’
‘বলছি তো টাকা নয়, চেক। না ভাঙালে কিস্যু দেয়নি। এখনও যদি ইচ্ছে করে ব্যাঙ্ককে নির্দেশ দিতে পারে টাকা দেওয়া বন্ধ করতে।’
‘ওমা! তা করবে কেন?’
‘মানুষের খেয়াল বলে কথা। তবে মনে হল লোকটা একদম পালটে গেছে।’
‘বউয়ের খোঁজ নেয় না?’
‘জিজ্ঞাসা করিনি। হরদেববাবু বললেন, পাগলের শেষ স্টেজে পৌঁছে গেছে। যে-কোনওদিন মরে যাবে। টাকা দিয়েই বোধহয় দায়িত্ব খালাস করেছেন।’
‘আর সেই ঝি-টা? তাকে দেখলে?’
‘না। সে বাইরে আসেনি। তবে প্রতুলবাবু সত্যি খুব অসুস্থ। কথাবার্তাও আগের মতো বলতে পারছিলেন না। তুমি চিন্তা করতে পারছ ওঁর বিশ লক্ষ টাকার সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী তোমার মেয়ে।’
‘বিশ লক্ষ?’
‘হরদেববাবু তাই বললেন। আরও বেশিও হতে পারে।’
‘ও মা গো!’
‘কিন্তু শোনো, দীপা যদি জলপাইগুড়ির কলেজে না ভরতি হয় তা হলে ওই পঞ্চাশ হাজারেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। প্রতুলবাবু যেই বুঝবেন ওঁর পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে আমরা দীপার জন্যে খরচ করছি না, নিজেরাই ভোগ করছি, সঙ্গে সঙ্গে হাত মুঠো করে ফেলবেন। আর একটা পয়সাও দেবেন না।’
‘কিন্তু ওঁর টাকা আমরা নেব কেন?’
‘কেন নেব না। যে-ন্যায় তিনি করেছেন, আমাদের মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলে ছুড়ে ফেলেছেন, তার দাম তাকে দিতে হবে না?’
‘টাকা দিয়ে সেই দাম শোধ করা যায়?’
‘যায় না। কিন্তু কিছু একটা তো দিতে হবে। এই টাকা দীপার ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করবে। ও অন্তত খেয়ে মরবে না।’
‘তা সেটা তো পঞ্চাশ হাজারেও হয়ে যায়।’
‘এই না হলে স্ত্রীবুদ্ধি! হাজার হোক দীপা তো ও-বাড়ির বউ। ওর সম্পত্তি ঝিয়ের ছেলেরা ভোগ করুক এটা তুমি চাও?’
‘ও। কিন্তু মেয়েকে তো জানি। যেই জানবে তুমি প্রতুলবাবুর টাকায় ওকে পড়াচ্ছ সঙ্গে সঙ্গে বেঁকে বসবে। হয়তো পড়াশুনাই ছেড়ে দেবে।’
‘হুম। ওই রমলা সেনই ওর বারোটা বাজিয়েছে। তা সে-ব্যবস্থাও হয়েছে। টাকা যাবে এস সি রায়ের নামে। এস সি রায় গো! যাঁর অনেক চা-বাগান আছে, খুব দানধ্যান করেন। জেলার মেধাবী ছেলেমেয়েকে পড়ার খরচ দেন। প্রতুলবাবু ওঁর সঙ্গে কথা বলে নেবেন। টাকা দীপার কাছে যাবে ওঁর নামে কিন্তু পাঠাবে ব্যাঙ্ক।’
‘তা হলে ওকে শিলিগুড়িতে পাঠাচ্ছ না?’
‘না। শোনো, আমরা দীপাকে ভালবাসি। ওর ভাল চাইছি। কিন্তু আজ আমি তেমন কিছু করতে পারি না যাতে আমার দুই ছেলের ক্ষতি হয়। তা ছাড়া, এ তো পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা, নেবই না বা কেন? যাক, এসব কথা যেন আর কেউ জানতে না পারে। ও পড়াশুনা শেষ করুক। তদ্দিন অবশ্য মূল টাকায় আমরাও হাত দেব না।’ অমরনাথ বিছানা থেকে নেমে চেকটা আবার লকারে তুলে রাখলেন।
সকালে দীপাকে ডাকলেন অমরনাথ, ‘শোনো, রমলা দেবী ভাল মানুষ। তোমাকে স্নেহ করেন। কিন্তু তাঁর কাছে তোমাকে রাখলে তিনি টাকাপয়সা নেবেন না। সেটা ভেবেছ?’
দীপা বলল, ‘আমি টিউশনি করব।’
অমরনাথ মাথা নাড়লেন, ‘না। পড়াশুনার সময় তোমাকে রোজগার করতে হবে না। জলপাইগুড়িতে একটা ফান্ড আছে। মেধাবী ছেলেমেয়ের পড়াশুনার খরচ সেই ফান্ড থেকেই দেওয়া হয়। তুমি এই ফর্মে সবকিছু লিখে সই করে দাও। আর সেইসঙ্গে এই ব্যাঙ্কের ফর্মেও। ওরা ব্যাঙ্ক থেকেই টাকাটা দেবে। এটা কারও দান নয়, নিজের যোগ্যতা দিয়ে যা উপার্জন করছ সেটা সবসময় গর্বের, কথাটা মনে রেখো। নাও, সই করো।’
