৩৬. ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্ৰচণ্ড অসহায়তাবোধ
অমরনাথের মৃত্যুর আশঙ্কায় এবং মৃত্যুর ঠিক পরে অঞ্জলি যেরকম আচরণ করছিল তা কাজ মিটে যাওয়ার পর পালটে গেল। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রচণ্ড অসহায়তাবোধ থেকে সে যেন কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েছিল। আর এর পুরো ঝাঝটা গিয়ে পড়েছিল দীপার ওপরে। মায়ের এমন আচরণে প্রভাবিত হয়েছিল ছেলেরা। অবশ্য তারা আর মুখের ওপর কিছু বলছিল না কিন্তু অবহেলা করতে তাদের বিন্দুমাত্র অসুবিধে হচ্ছিল না।
অমরনাথের কাজ মিটে যাওয়ার পর দেখা গেল অঞ্জলি নিজেকে দারুণভাবে গুটিয়ে নিয়েছে। বেশি কথা বলার বদলে অদ্ভুত এক গাম্ভীর্যে নিজেকে আড়াল করে ফেলল সে। বুধুয়া অমরনাথের মৃত্যুর খবর পেয়ে আবার এ-বাড়িতে চলে এসেছিল। তাকে ডেকে বলে দিল, ‘আমার এমন পয়সা নেই যে তোর মাইনে দেব। তুই এখানে সময় নষ্ট করিস না।’
অতএব বুধুয়া আবার ফিরে গেল লাইনে।
তিরিশ বছর আগে চা বাগান আর তার লাগোয়া বাজার, কাঠের মিল নিয়েই ছিল জনবসতি। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই সেটা বেড়ে যাচ্ছিল। বিশেষ করে বাজারের এলাকাটা। আংরাভাসা নদীর ধার দিয়ে কলোনি তৈরি হচ্ছিল। এক সকালে দুই ছেলেকে নিয়ে অঞ্জলি বীরপাড়ার রাস্তায় সেরকম একটা জমি দেখে এল। হাজার চারেকের মধ্যে সাত কাঠা জমি পাওয়া যাচ্ছে আসাম রোড থেকে এক মিনিটের দূরত্বে। এখনও কাঠ সস্তা এখানে। জমি কিনে দু-তিন ঘরের বাড়ি তৈরি করে নিলে আর রাস্তায় গিয়ে দাড়াতে হবে না। মাথার ওপরে একটা ছাদ থাকলে কে কী খাচ্ছে তা নিয়ে লোকে মাথা ঘামাবে না। কথাটা শুনে মনোরমা অবাক হবেন, ‘সেকী! ওদিকে তো শ্মশান!
‘এখন তো শ্মশানেই বাস করার সময় এসেছে আমাদের।’
মনোরমা অঞ্জলির দিকে অবাক হয়ে তাকালেন, ‘সাহেব তো এ-বাড়ি ছেড়ে দিতে বলেনি!’
‘আজ বলছে না। আগামীকাল যে বলবে না এমন তো কথা নেই। আর মানুষের কথায় আমি বিশ্বাস করি না। দু’বছর ধরে অপেক্ষা করার মতো বোকামি আমি করব না।’
‘ওখানে ফাঁকা মাঠ, মানুষজন নেই—!’
‘এখন নেই, হতে কতক্ষণ। যেমন অবস্থা তেমনভাবেই থাকতে হবে।’
‘বউমা।’
‘বলুন।’
‘তুমি আমার কথা কিছু ভেবেছ?’
‘আপনার কথা? মানে বুঝলাম না।’
‘আমি বুঝতে পারছি না আমার কী করা উচিত!’
‘আপনি একথা আপনার ছেলে থাকলে বলতে পারতেন। আমার যা অবস্থা হবে আপনারও তা না হবার কোনও কারণ নেই।’
মনোরমা আর কথা বাড়াননি। অমরনাথ চলে যাওয়ার পরে অঞ্জলি সম্পর্কে তাঁর ব্যবহারেও পরিবর্তন এসেছে। এখন তিনি ওকে অত্যন্ত সমীহ করে কথা বলেন। একদিন যে-অল্পবয়সি মেয়েকে বাড়ির বউ করে এনেছিলেন সে-ই এখন কর্ত্রী হয়ে গিয়েছে। বৈধব্যের পরে যেকাঠিন্য অঞ্জলি অর্জন করেছে নিজের জীবনে তাঁর সঙ্গে কোনও পরিচয় তার কখনও ঘটেনি। দীপারও মনে হয় মনোরমা পালটে গিয়েছেন। অধিকারবোধ থেকে যে-আচরণে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন তা রাতারাতি উধাও।
অঞ্জলির এই ব্যবহার দীপাকে মনস্থির করতে সাহায্য করল। প্রতি মুহূর্তে এবাড়িতে নিজেকে অবাঞ্ছিত লাগছে। অঞ্জলি তার সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন বোধ করছে না। অন্যান্য কোয়ার্টার্স থেকে মহিলারা এসে দীপার চাকরির কথা তুললে প্রকাশ্যে বলতে পারছে, বিধবা মেয়ের উপার্জনে জীবন যাপন করার কোনও বাসনা তার নেই। অঞ্জলির স্বভাব থেকে সবরকম নরম বোধই যেন উধাও হয়ে গিয়েছে। কলেজ খুললে দীপা কলকাতায় চলে গেলে যেন স্বস্তির আবহাওয়া ফিরে আসবে এমন মনে হচ্ছিল ক্রমশ।
অতএব এ-জন্মের মতো এ বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হতে চলেছে আগামীকাল। সকালবেলায় সে রওনা হবে জলপাইগুড়ি শহর থেকে ট্রেন ধরতে। এই ভাল হল। এখন একমাত্র মনোরমা ছাড়া এ বাড়ির কোনও মানুষ তাকে আর টানছে না। কিন্তু প্রকৃতি তাকে টানছে। এই চা-বাগান, দেবদারু গাছ, চাপা ফুলের মাঠ, আসাম রোড— আর কোনওদিন হয়তো সে এদের কাছে ফিরে আসবে না। হঠাৎ দীপার মনে হল এখনও তার মনে এদের সম্পর্কে স্মৃতি বেঁচে আছে বলেই এরা তাকে টানছে। কিন্তু এই টান তেমন সক্রিয় নয় যেমনটা ছিল সে যখন এখানেই দিনরাত কাটাত। হয়তো বছর গেলে, স্মৃতির ওপর অন্য স্মৃতি জমা হলে একদিন আসবে যখন কোনও টানই সে বোধ করবে না। সবরকম সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই কথাটা প্রযোজ্য। এবার প্রথমদিন এসে অমরনাথের পাশে বসে থেকে যে অনুভূতি হয়েছিল আজ তা এর মধ্যে কিছুটা ফিকে হয়ে কি যায়নি? এমন জীবনের গল্প সে অনেক পড়েছে যেখানে মানুষ সম্পূর্ণ একা হয়ে পৃথিবীর সমস্ত বাধার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে। তা হলে সে পারবে না কেন?
রাত্রে মনোরমার পাশে শুয়ে, কিন্তু তার মন কেমন করতে লাগল। মনোরমার চোখেও আজ ঘুম নেই। কেবল উসখুস করছেন। হঠাৎ দীপা চাপা স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ঠাকুমা, আমি চিঠি লিখলে তুমি জবাব দেবে তো?’
মনোরম নিশ্বাস ফেললেন, ‘যদ্দিন খাম পোস্টকার্ড কেনার সামর্থ্য থাকবে তদ্দিন দেব।’
দীপা আরও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘আমি চাকরি করলে তোমাকে যদি নিয়ে যেতে চাই তুমি আমার কাছে গিয়ে থাকবে তো?
আচমকা মনোরমা ডুকরে উঠলেন, ‘তুই আমাকে নিয়ে যাস, যত তাড়াতাড়ি পারিস নিয়ে যাস। আমার আর এখানে থাকতে একদম ইচ্ছে করছে না।’ দীপা পাশ ফিরে মনোরমাকে জড়িয়ে ধরল দু’হাতে। তার হাতের বাঁধনে মনোরমা থরথর করে কাঁপছিলেন।
অনেক অনেক সময় চলে গেলে, একমাত্র কুলি লাইনের মাদলের আওয়াজ ছাড়া পৃথিবী যখন নিস্তব্ধ, তখন মনোরমা উঠলেন। হ্যাঁরিকেনের টিমটিমে আলোটাকে বাড়িয়ে মিটসেফের মতো আলমাবিটাকে খুললেন। দীপা উঠে বসেছিল। সামান্য খোঁজাখুঁজি করে মনোরমা একটা খাতা বের করলেন, ‘এইটে তোর বাবার। কলকাতার হাসপাতালে শেষদিকে যখন ভাল হয়ে উঠেছিল তখন লিখত। এখানে এসে একদিন আমাকে বলল, তোমার কাছে রেখে দাও। কেন বলেছিল তখন বুঝতে পারিনি। তুই রাখ, তোর কাছে রেখে দে।’
দীপা হাত বাড়িয়ে বাঁধানো ঘোট খাতাটা নিল। মনোরমা ফিরে এলেন বিছানায়, ‘এককালে তোর বাবা খুব পড়তে ভালবাসত। অনেক পত্রিকা, কিনত। আনন্দবাজার, দীপালী, সচিত্র ভারত। বিয়ের আগে গল্প লেখার চেষ্টা করত। মনোরমা নিশ্বাস ফেললেন।
দীপা জিজ্ঞাসা করল, ‘কী লেখা আছে এতে?’
‘পড়ে দেখিস।’ মনোরমা পাশ ফিরে শুলেন।
‘মা জানেন খাতার কথা?’
মনোরমা জবাব দিলেন না। হ্যাঁরিকেনকে মাথার পাশে একটা টুলের ওপর তুলে দীপা খাতার পাতা ওলটাল। অমরনাথের হাতের লেখা প্রায় ছাপার মতো। কিন্তু এখানে যেন সামান্য কাঁপুনি এসেছে অক্ষরগুলোয়। প্রথম পাতায় লেখা, করুণাধারা কোথায়? কবির কাছে যা সহজে আসে তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে? কেন? বাকি পাতাটা একদম সাদা। দ্বিতীয় পাতায় লেখা, মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে এলাম। কিন্তু মনে এবং শরীরে মরণের গন্ধ লেগে গেছে। হাজার ওষুধেও সেই গন্ধ মুছবে বলে মনে হয় না। মাঝে মাঝে তাই নিজেকে জিজ্ঞাসা করি, আমি কেন বেঁচে আছি? উত্তর পাই না। বেঁচে থাকার জন্যেই বেঁচে থাকা— এ আর এখন ভাল লাগে না।’
তৃতীয় পাতায় নজর দিল দীপা, অকালে বিয়ে দিয়ে মেয়েটার যতটা সর্বনাশ করেছিলাম, ওর জন্যে টাকা নিয়ে নিজের সর্বনাশ ততটাই করলাম বলে একসময় মনে হয়েছিল। স্নেহের মানুষের কাছে অশ্রদ্ধা পাওয়া তো চরম সর্বনাশ। এই হয়, মানুষ করতে যায় এক ভেবে, হয়ে যায় উলটো। কিন্তু আমার বিশ্বাস আছে মেয়ে নিজের জীবনকে গড়ে নিতে পারবে। ওর মধ্যে একটা তেজ আছে যা আমার ছিল। না। অঞ্জলির সঙ্গেও ওর কোনও মিল নেই। অঞ্জলি সংসার ছাড়া অন্য কিছু বোঝে না। বরং মাঝে মাঝে মনে হয় মায়ের সঙ্গে ওর কিছু মিল আছে। বুকে দুঃখের আগুন যাদের নিরন্তর তাদের তো মিল থাকাই স্বাভাবিক।
সকালে বেরুবার আগে মনোরমাই জোর করে খাওয়ালেন দীপাকে। অঞ্জলি বসে ছিল বাইরের ঘরে। তাকে প্রণাম করল দীপা, বলল, ‘আসছি।’
অঞ্জলি কথা না বলে ঘাড় নাড়ল। এক পলক তার মুখের দিকে তাকিয়ে জিনিসপত্র নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল দীপা। বড় ভাই বারান্দায় ছিল, দিদিকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিল। মনোরমা তাকে জিনিসগুলো রাস্তায় বয়ে নিয়ে যেতে বললে দীপা বাধা দিল, ‘আমি একাই পারব। সারাটা পথ তো আমাকেই বইতে হবে ঠাকুমা।’
আসাম রোড পর্যন্ত মনোরমা সঙ্গে এলেন। দীপা ঘাড় ঘুরিয়ে জায়গাটাকে শেষবার দেখে নিল। মনোরমা বললেন, ‘সাবধানে থাকিস। শরীরের প্রতি যত্ন নিস।’
‘হ্যাঁ।’
‘তোকে খুব বড় হতে হবে।’ মনোরমার গলার যেন অমরনাথের আকুতি।
‘হুঁ!’
‘কখনও কোনও প্রলোভনে ভুলিস না। তোর বয়স কম যাচাই না করে কোনও পথে পা বাড়াস না। বাবার কথা সবসময় মনে রাখবি!
‘তোমার কথা?’ দীপা মুখ ফেরাল।
থতমত হয়ে গেলেন মনোরমা, ‘আমার কী আছে বল! সারাজীবন ধরে পরের দয়ায় বেঁচে আছি। মনে কোনও সাধ এলেও মুখ ফুটে চাইতে পারিনি। আমি তো তোর জন্যেও কিছুই করতে পারিনি। বরং একসময় খুব কষ্ট দিয়েছি।’ মনোরমা এইসব কথা বলছিলেন অদ্ভুত একটা সুরে। তাতে কান্না ছিল এবং দীপার মন খুব খারাপ করে দিল। এইসময় জলপাইগুড়ির বাস এল। নির্জন রাস্তায় হাত দেখালেই এই রুটের বাস দাড়িয়ে যায়। বাসটাকে হাত দেখাতে হল না আজ। মালপত্র কনডাক্টর তুলে নিল। সিড়ি ভেঙে ভেতরে উঠতে-না-উঠতেই বাস গড়াতে আরম্ভ করল। বসার জন্যে সিট খুঁজে নেওয়ার আগে দীপা নিচু হয়ে মনোরমাকে দেখতে চাইল। এক ঝলক, জানলার একটা ফ্রেমের মধ্যে মনোরমার মুখ। ডান হাতে আঁচল তুলে দাতে চেপে ধরেছেন। সেই মুখ মিলিয়ে গিয়ে দেবদারু আর পাইনের গাছগুলো ছুটে আসতে লাগল জানলায়। দীপার চোখ ঝাপসা। আর সেই ঝাপসা চোখের ভেতর মনোরমার ওই ভঙ্গিটি চিরকালের জন্যে গাঁথা হয়ে গেল।
কনডাক্টর তাকে সিট দেখিয়ে দেওয়ার পর নিজেকে সেখানে ছেড়ে দিল দীপা। এখন বাসের সমস্ত মানুষ তাকে লক্ষ করছে কিন্তু সে ভ্রূক্ষেপ করল না। সিটে বসে নিজের মুখ দু’হাতে ঢেকে শক্তি খুঁজতে চাইল প্রাণপণে। সে জানে বাস তার চেনা চৌহদ্দি ছাড়িয়ে চলেছে। চোখ থেকে হাত সরালেই সেটা দেখতে হবে। কিন্তু আজ একদম দেখতে ইচ্ছে করছিল না। তার মন জুড়ে এখন মনোরমা, এক নিঃসঙ্গিনী বৃদ্ধার মুখ।
কিছুদিন আগেও বুক কেঁপে উঠত, পাঁজরে ব্যথা হত। এত বড় পৃথিবীতে সে একদম একা। অসুস্থ হলেও কেউ এসে পাশে দাড়াবে না। বস্তুত, কলকাতা শহরে অসুস্থ না হলে তেমন করে একাকিত্ব বোঝা যায় না। আত্মীয়স্বজনহীন তার মতো মেয়ে নিশ্চয়ই একা পৃথিবীতে বেঁচে আছে। রোজ খবরের কাগজ খুললেই পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের গল্প পড়তে হয়। সেই গল্পে অল্পবয়সি মেয়ে আছে যারা জীবনের কাছে ধর্ষিতা। পালিয়ে আসার পথে মা-বাবা-ভাই-বোন-জমি এবং সতীত্বকে হারিয়ে এসেছে। আসতে বাধ্য হয়েছে। এসে এখানকার শরণার্থী ক্যাম্পে আরও অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে। এদের কথা ভাবলেই মনে সাহস আসে। নিজেকে অনেক স্বাধীন মনে হয়। কিন্তু একটা শব্দের অর্থ তার মাথায় কিছুতেই পরিষ্কার হয় না। মায়া এবং মায়ার মায়ের সঙ্গেও কথা বলেছে। তাদের ধারণা অনেকটা একরকমও। আবার গ্লোরিয়া সম্পূর্ণ উলটো ধারণা পোষণ করে। শব্দটা হল সতীত্ব। সতী মানে সাধ্বী, পতিব্রতা, সচ্চরিত্রা। আর সতীত্ব হল পতিব্রতা, সতী স্ত্রীর ধর্ম। যে-মেয়ে সৎ চরিত্রের তাকে যদি কোনও লোভীর দল গায়ের জোরে ধর্ষণ করে তা হলে সে অসহায় অবস্থায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। কিন্তু ওই কাজের জন্যে তার সতীত্ব চলে যাবে কেন? সে নিজে তো অসৎ নয়। দ্বিতীয়ত, পতিব্রতা নারী অথবা স্বামীর প্রতি আনুগত্য যদি সতীত্বের ব্যাখ্যা হয় তা হলে বলতে হবে বস্তুটি হল এক ধরনের প্রশ্নহীন আত্মনিবেদন। পতিদেবতার কাছে আত্মসমর্পণ। সেটা করতে আপত্তি নেই যদি পতিদেবতাও একই রকম ভূমিকা গ্রহণ করেন। কিন্তু যদি শব্দটাকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, দুই নারী পুরুষ পরস্পরের প্রতি ভালবাসায় নিবিড় হয়ে থাকে মন এবং শরীর নিয়ে—, দীপা মাথা নাড়ে, না, এটাও ঠিক হল না। এই শরীর এবং মন তার—যাকে আমার এক জন্মের ভালবাসা দিয়েছি। এটাই বোধহয় সতীত্বের ব্যাখ্যা হওয়া উচিত। অসীম এসব শুনে দীপার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, এসব নিয়ে এত ভাবো কেন?’
দীপা বলল, ‘বাঃ, কিছু কিছু শব্দ বা ভাবনা আদ্যিকাল থেকে চলে এসেছে যা মেয়েদের আচরণকে বেড়ি পরিয়ে রেখেছে পুরুষদের স্বার্থে। তা যে কী ফালতু সেটা বুঝিয়ে দেওয়া দরকার।’
‘সতীত্ব শব্দটি তা হলে ফালতু?’
‘নিশ্চয়ই, যদি সেটা পুরুষদের ক্ষেত্রেও ব্যবহার না করা হয়! দশজন মহিলার ওপর বলাৎকার করলে কি কেউ বলে ওই পুরুষটার সতীত্ব চলে গেছে?
‘তা বলে না। কিন্তু লম্পট বলতে দ্বিধা করে না।’
‘সেরকম শব্দ তো মেয়েদের সম্পর্কে বলা হয়। দুশ্চরিত্রা। কিন্তু মেয়েদের সম্পর্কে সতীত্ব ব্যবহার করা হয় খুব নিচু ভাবনা নিয়ে। সেক্স জড়িয়ে থাকে তাতে। একটি মেয়ে দশটি ছেলেকে নাচাচ্ছে, ঘুরছে, ঘর ভাঙছে, কিন্তু কাউকে শরীর পর্যন্ত পৌছাতে দিচ্ছে না। সেই মেয়ের যখন বিয়ে হল তখন স্বামীই একমাত্র পুরুষ যার সঙ্গে তার শারীরিক সম্পর্ক হল। এই মেয়েটিকে কি সতী বলবে?
অসীম স্বীকার করল, ‘সমাজ তাই বলবে।’
দীপা শব্দ করে হাসছিল। শ্যামবাজার থেকে সার্কুলার রোড ধরে ওরা হেঁটে আসছিল। তখন বিকেল শেষ হয়েছে। খান্না সিনেমার সামনে টিকিট প্রার্থীদের ভিড়। অনেকে মাথা ঘুরিয়ে সেই হাসির শব্দে তাকাল। দীপা সেটা উপেক্ষা করল। কিন্তু অসীমকে একটু আড়ষ্ট দেখাল। গ্রে স্ট্রিটের মোড় ছাড়াতে বাঁদিকের ফুটপাথে বেশ কিছু স্বৈরিণীকে দেখা গেল যে যার মতো সেজে খদ্দের ধরার জন্যে লাইন দিয়ে অপেক্ষা করছে। অসীম মনে মনে প্রার্থনা করছিল দীপার দৃষ্টি যেন ওদিকে না। পড়ে। জায়গাটা পেরিয়ে এসে যেই সে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে যাচ্ছে তখনই দীপা বলল, ‘আচ্ছা, ধরো, ওই যে মেয়েগুলো দাড়িয়ে আছে তাদের একজন প্রথমদিন থেকে আজ পর্যন্ত একই ভঙ্গিতে দাড়ায়, কেউ চাইলে তাকে ঘরে নিয়ে গিয়ে বসায়, গল্প করে, গান শোনায়, খায়দায়, কিন্তু তার বেশি। এগোতে দেয় না। শরীরের ব্যাপারে সে অত্যন্ত সচেতন। কোনও পুরুষ আজ পর্যন্ত তাকে ব্যবহার করতে পারেনি। তুমি কি এই মেয়েটিকে সতী বলবে? তার তথাকথিত সতীত্ব কিন্তু সম্পূর্ণ অক্ষুন্ন রয়েছে।
অসীম মাথা নাড়ল, ‘না। তা বলা যাবে না।’
‘বেশ। যদি উলটো হয়। একটি মেয়ে তার প্রিয়জনের জন্যে জীবন দিতে দ্বিধা করে না, সমস্তরকম ঝড় থেকে প্রিয় মানুষকে আগলে রাখে। কিন্তু শরীর সম্পর্কে সে বড়ই উদাসীন এবং সেটাকে ধর্তব্যের মধ্যে ভাবে না। তা হলে তাকে কি সতী বলবে?’
অসীম হেসে ফেলল, ‘বলা যাবে কি?’
দীপার খুব রাগ হয়ে গেল। হস্টেল পর্যন্ত এল চুপচাপ। ওর কথা বলতেই ইচ্ছে করছিল না। মুখ দেখে অসীমও সেটা বুঝতে পেরেছিল। গেট থেকে ফেরার আগে জিজ্ঞাসা করল, কাল তা হলে যাচ্ছ?’
‘কোথায়?’
‘বাঃ, আমাদের বাড়িতে। ভুলে গেলে?’
‘না।’
‘সেকী? মা তোমায় দেখতে চেয়েছেন।’
‘কিন্তু তার আগে তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।’
‘আচ্ছা, সতীত্ব অসতীত্ব নিয়ে তোমার মাথা ঘামানোর কী দরকার?’
‘কাল কলেজের পর কথা বলব।’ দীপা দাঁড়াল না। এবং অনেক পরে বিছানায় চুপচাপ শুয়ে নিজের ওপর রাগ হচ্ছিল তার। ওভাবে রেগে যাওয়ার কোনও মানে হয়? কিন্তু অসীম যদি প্রতিবাদ করত, যদি তর্ক চালাত, তা হলে তার ভাল লাগত। যুক্তিহীন অস্বীকার থেকেই তার মেজাজ গরম হয়েছিল। তা হলেও তার নিজেকে সংযত রাখা উচিত ছিল। অসীম ভাল ছেলে। এখন আর ব্যাপারটা চাপা নেই। কলেজের অনেক ছেলেমেয়ে এই নিয়ে কানাকানি করেছে। একসঙ্গে রাস্তায় হাঁটা, কখনও কফি হাউসে গিয়ে বসা, আর অনর্গল কথা বলে যাওয়া— এসবে মানুষের চোখ এখনও তেমন অভ্যস্ত নয়। গল্প তো হবেই। জলপাইগুড়ি শহর হলে হয়তো কলেজ থেকেই চাপ আসত, পোস্টার পড়ত দেওয়ালে। কলকাতার বাগবাজারে বৃষ্টি হলে শ্যামবাজারে টের পাওয়া যায় না। কিন্তু অসীম এখন তার বড় কাছের মানুষ। এই পৃথিবীতে সে একা এমন বোধ আর তীব্র হয়ে বুকের হাড়ে কাপুনি ধরায় না।
মাঝরাত্রে হস্টেলের গেটে খুব গোলমাল হল। চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে গেল দীপার। ঘরে সে একাই ছিল। গ্লোরিয়া সাতসকালে শান্তিনিকেতনে বেড়াতে গিয়েছে। জানলায় গিয়ে দাড়াতে দারোয়ানের গলা পেল। যে গেট খুলতে বলছে তাকে দারোয়ান ধমকাচ্ছে। এত রাত্রে গেট খোলা সম্ভব নয়। শেষপর্যন্ত সুপার বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। দারোয়ান তার কাছে নালিশ করল। বহিরাগতের সঙ্গে কথা বলে সুপার দারোয়ানকে গেট খুলতে আদেশ দিলেন। সাদা পোশাকের একজন পুলিশ অফিসার ভেতরে ঢুকে নিজের পরিচয় দিলেন। সুপারকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘গ্লোরিয়া নামে একটি আফ্রিকান নিগ্রো মেয়ে এখানে কি থাকত?’
‘হ্যাঁ। কেন বলুন তো?’
‘আপনি সুপারিনটেনডেন্ট?’
‘হ্যাঁ।’
‘তা হলে আপনাকে একবার আসতে হবে। ওকে খুন করা হয়েছে।’
‘খুন?’ চমকে উঠলেন সুপার। আর জানলায় দাড়িয়ে কেঁপে উঠল দীপা। পুলিশ অফিসার বললেন, ‘বর্ধমান পুলিশ ওর ডেডবডি পেয়েছে। বাস রাস্তার ধারে খেতের ওপর পড়ে ছিল। ব্যাগে যেসব কাগজপত্র পায় তা থেকেই আমাদের জানিয়েছে। ডেডবডি এখনও আছে বর্ধমানে।
‘আমাকে কি সেখানে যেতে হবে?’
‘হ্যাঁ।’
‘তা হলে আমার প্রিন্সিপ্যালের সঙ্গে আগে কথা বলা দরকার। তা ছাড়া মেয়েটি জাম্বিয়ার নাগরিক। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘মেয়েটি ওরকম জায়গায় গেল কী করে বলুন তো?’ অফিসার জানতে চাইলেন।
‘আমি বুঝতে পারছি না।’
‘কী আশ্চর্য! হস্টেলের একটা মেয়ে যে বাইরে আছে সেই খবর রাখেন না?
‘তা রাখব না কেন? ও তো আমার অনুমতি নিয়ে শান্তিনিকেতনে গিয়েছিল।’
‘কার সঙ্গে?’
‘তা আমি জানি না।’
অফিসার একটু ভাবলেন, ‘মুশকিল হল মেয়েটি ভারতবর্ষের নাগরিক নয়। এ নিয়ে অনেক ঝামেলা হবে। দিল্লি থেকে প্রশ্ন করবে। কাল সকালে এই খবর চিফ মিনিস্টারের কানে পৌঁছাবে। সাধ করে কি মাঝরাতে আপনাদের ঘুম ভাঙতে এলাম। মেয়েটি কোন ঘরে থাকত?’
‘ওপরে।’
‘চলুন। ঘরটাকে বন্ধ করে যেতে হবে। ওর জিনিসপত্রে কেউ যেন হাত না দেয়! এনকুয়ারি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওইরকম থাকবে।’
‘কিন্তু ওর রুমমেট আছে ও-ঘরে।’
‘জাম্বিয়ান?’
‘না বাঙালি।’
‘ওকে অন্য ঘরে শিফট করান। চলুন আমার সঙ্গে।’
জানলা থেকে সরে এল দীপা। গ্লোরিয়ার বিছানা জিনিসপত্র ঘরের একটা দিকে ছড়ানো। অথচ মেয়েটি আর বেঁচে নেই। কাল রাত্রে গ্লোরিয়া বলেছিল, ‘শরীর নিয়ে আমি মোটেই ভাবি না, মানুষের হৃদয়ই আমার কাছে বেশি মূল্যবান। দু’হাতে মুখ ঢেকে দীপা যখন দাড়িয়ে দাড়িয়ে কাঁদছে তখন সুপার পুলিশ অফিসারকে নিয়ে দরজায় এলেন। দরজা বন্ধ ছিল। ওপারে ওঁদের কথাবার্তা এবং কড়া নাড়ার শব্দ হল। দীপা দরজা খুলতেই সুপার বললেন, ‘শোনো, গ্লোরিয়ার একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। পুলিশ এই ঘব সিল করে দিতে চাইছে। তুমি আপাতত আমার গেস্টরুমে চলে এসো জিনিসপত্র নিয়ে।’ দীপা মাথা নাড়ল। হস্টেলের কাজের লোকদের তুলে দীপার জিনিসপত্র ঘর বদল করা হল। এবার পুলিশ অফিসার ঘরে তালা লাগিয়ে সেটা সিল করে দিলেন। এখন সমস্ত মেয়েরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। গ্লোয়িবার মৃত্যুসংবাদ শোনামাত্র সবাই স্তব্ধ। গ্লোরিয়ার বান্ধবী দুই জাম্বিয়ান ছাত্রীকে নিয়ে পুলিশ চলে গেল থানায় জিজ্ঞাসাবাদ করতে। হঠাৎ দীপার মনে পড়ল ভালবাসাহীন জীবন অর্থহীন, এমন কথা গ্লোরিয়া বলেছিল প্রেমে আঘাত পেয়ে। কিন্তু তারপর অনেকদিন চলে গিয়েছে। গতকালও তো মেয়েটা ছিল হাসিখুশি! ঘুম এল না, বাকি রাতটায় চুপচাপ জেগে থাকল দীপা পাথরের মতো। মৃত্যু কী সহজ, কী নিঃশব্দে আসে। অথচ মানুষ চিরকালই জীবন নিয়ে গর্ব করে যায়।
পরের দিন খবরের কাগজে ঘটনাটা ছাপা হল। বর্ধমানের কাছে একটা গ্রামের পাশে জাম্বিয়ার মেয়েটির মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে। সম্পূর্ণ নগ্ন ছিল সে। যদিও তার পোশাক, ব্যাগ প্রায় অটুট অবস্থায় মৃতদেহের কাছেই পড়ে ছিল। মেয়েটি জাম্বিয়া থেকে কলকাতায় পড়তে এসেছিল। তাকে ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছিল। মেয়েটি বাধা দিতে আততায়ীরা তাকে হত্যা করে। এমন একটি জায়গায় মেয়েটি কী করে পৌছাল তা বিস্ময়ের। গ্রামবাসীরা বলছে বিকেল নাগাদ মেয়েটি তিনটে ছেলের সঙ্গে নামে। বিদেশিনী বলে স্থানীয় লোকদের কৌতুহল ছিল। কিন্তু তারা গ্রামান্তরে চলে যায়। সেই তিনজনই সম্ভাব্য হত্যাকারী ধরে নিয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। সকালবেলায় হস্টেলে এই খবরে তোলপাড় হয়ে গেল। যদি বলাৎকারই হয় তা হলে ওর পোশাক পাশে অটুট অবস্থায় পড়ে থাকবে কী করে?
কলেজ ছুটি হয়ে গেল। দীপা কলেজে যায়নি। সাড়ে বারোটার সময় রাধা এল হস্টেলে। এসে দীপার পাশে চুপ করে বসল। দীপা বলল, আমি ভাবতে পারছি না রে। কালও সকালে আমার সঙ্গে কথা বলেছিল।’
রাধা বলল, ‘ব্যাটাছেলেগুলা এইরকমই। একদম বাচ্চা আর একেবারে থুথুড়া বুড়া ছাড়া ওদের বিশ্বাস করা যায় না।’
দীপা মাথা নাড়ল, ‘তা হবে কেন? তোমার আমার দাদা কাকা ভাইকে এই দলে ফেলা যায় কি?’
‘যখন আমার দাদা কাকা ভাই তখন ঠিক আছে। কিন্তু অন্য মেয়ের সঙ্গে তো একই সম্পর্ক না। পাকিস্তান থেকে আসার সময় যেসব পশু মেয়েদের ইজ্জত জোর করে নিয়েছে তারাও তো কোনও মেয়ের দাদা কাকা ভাই।’ বেশ উত্তেজিত দেখাচ্ছিল রাধাকে। দীপা জবাব দিল না। হঠাৎ রাধা বলল, আর দোষ দিবই বা কাকে? আজ কলেজে এসে শুনি ছুটি হয়ে গেছে ওর জন্যে। বাড়ি চলে যেতে হবে বলে কয়েকটা মেয়ের কী দুঃখ। একজন বলল, নিগ্রোরা খুব সেক্সি হয়। তাই ছেলেরা ঝাপিয়ে পড়েছে। একজন দু’জন হলে ওর কিছু হত না। তুমি ভাবো দীপা, মেয়ে হয়ে একটা মেয়ের সম্পর্কে এমন কথা এরা বলে গেল?’
দীপার মনে পড়ে গেল, ‘তুমি অসীমকে দেখেছ?’
‘হ্যাঁ। গেটে দাঁড়িয়ে ছিল।’
‘তোমাকে কিছু বলেছে?’
‘না তো! কেন?’
‘নাঃ, এমনি।’
আধঘণ্টা থেকে রাধা চলে গেলে দীপা পোশাক পালটাল। আজ সকাল থেকেই খাওয়াদাওয়ার ইচ্ছেটা একেবারে চলে গিয়েছে। মাথা এবং শরীরে একটা ভারী অনুভূতি যেন ঝুলে রয়েছে একভাবে। কিছু ভাল লাগছে না, কিচ্ছু না।
কলকাতায় নভেম্বরে শীত নামে না। কিন্তু বাতাসে টান এসে যায়। হস্টেল থেকে বেরিয়ে এই দুপুরবেলাতেও সেরকম বাতাসের স্পর্শ পেল দীপা, পেয়ে আরাম লাগল। কলেজের দিকে হাঁটছিল সে। এখন অসীমের সেখানে থাকার কথা নয়। ছুটি হয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ। অসীম কোথায় থাকতে পারে এমন স্পষ্ট ধারণা তার নেই। অথচ সকাল থেকে ওর কথা একবারও মনে আসেনি। অসীম কলেজে অপেক্ষা করবে ঠিক ছিল। কিন্তু হঠাৎ বন্ধ হয়ে গিয়ে সব এলোমেলো করে দিল। অথচ দীপার ক্রমশ মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে অসীমের দেখা পাওয়া তার খুব দরকার। কেন, কী জন্যে, তা জানা নেই, ওর পাশে একটু হাঁটলেই মনের ভার দ্রুত কমে যাবে এমন একটা বোধ হচ্ছিল। আচ্ছা, অসীম যদি গতকাল গ্লোরিয়ার সঙ্গে গ্রামের নির্জনে থাকত তা হলে একই কাণ্ড করতে পারত? রাধা তো অনাত্মীয় ছেলের চরিত্র সম্পর্কে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করে না। হেসে ফেলল দীপা। উদ্ভট ভাবনা। অসীম কখনও এমন কাজ করতে পারে না।
কলেজের গেট বন্ধ, সামনে কেউ নেই। কসমসের সামনে কিছু ছেলে আড্ডা মারছে। দীপা চুপচাপ পেরিয়ে এল। অসীমকে কোথায় পাওয়া যায়? খুব আফশোস হচ্ছিল তার। ঠিক সময়ে কলেজে গেলেই সে ওর দেখা পেত। এতবড় শহরে অসীমকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। হেদুয়ার মুখে ফিরে এসে দীপা যখন অন্যমনস্কভাবে দাড়িয়েছে ঠিক তখনই পেছন থেকে গলা ভেসে এলে, ‘কফি খাবে?’
চমকে ফিরে তাকাতেই অসীম হাসল।
দীপা বিস্ময় এবং খুশিতে একাকার হল, ‘তুমি?’
‘দাঁড়িয়েছিলাম।’
‘এতক্ষণ?’ দীপা কী বলবে স্থির করতে পারছিল না, তারপর মনে হতেই বলল, ‘যাঃ, হতেই পারে না। একটু আগে আমি এখান দিয়ে কলেজে গিয়েছি।’
‘দেখেছি।’ মিটিমিটি হাসছিল অসীম।’
‘দেখেছ? আর তুমি আমাকে ডাকোনি?’ হাঁ হয়ে গেল দীপা।
‘দেখছিলাম তুমি আমাকে খুঁজেছ কিনা?’
‘কী দেখলে?’
‘মুখটা যখন কালো হয়ে গেল তখন বুঝলাম যা বোঝার।’
‘তুমি তো খুব নিষ্ঠুর।’
‘আর তুমি? এতক্ষণ ধরে কেউ দাঁড়াবে যখন আদৌ আসবে কিনা তার ঠিক নেই। কলেজ তো অনেকক্ষণ ছুটি হয়ে গিয়েছে।’
‘তা হলে তুমি দাড়িয়ে আছ কেন?’
‘আমার মন বলছিল তুমি আসবেই।’
দীপার মনে হচ্ছিল তার শরীর একটু হালকা হয়ে গেল। সে বলল, ‘জানো, কাল রাত্রে যখন গ্লোরিয়ার খবর পেলাম তখন আমার সব সাদা হয়ে গিয়েছিল। ওরকম একটা মেয়ে দুম করে মরে গেল? মানুষ এত নৃশংস হয়?’
‘আমি তোমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি দীপা।’
‘মেয়েটার সঙ্গে আমার কোনও মিল নেই, প্রথম প্রথম ওর অনেক আচরণ আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারতাম না, পৃথিবীর দুটো আলাদা দেশের মানুষের আচরণ তো উলটো হবেই। কিন্তু ওর কথাবার্তায় আমি একসময় বিশ্বাস করতে আরম্ভ করেছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল এ-দেশের মেয়েরা অনেক বাড়তি অভ্যাস অকারণে বয়ে নিয়ে চলেছে। এ-দেশের মেয়েরা কেন করব এই প্রশ্নটা এখনও করতেই শেখেনি!’
‘সেকী! তুমি তো জ্ঞানদানন্দিনী ঠাকুরের ভক্ত। তিনি তো সত্তর-আশি বছর আগে দারুণ দারুণ কাণ্ড করেছেন।’
‘করেছেন। কিন্তু সেটা এ-দেশের মেয়েকে খুব একটা প্রভাবিত করতে পারেনি, উনি তার পরের প্রজন্মের ছেলেদের প্রশংসা পেয়েছেন। ছেলেরা যেন একটু অনুকম্পা দেখিয়ে বলে, উঃ, কী তেজি মেয়ে ছিলেন।’
অসীম জবাব দিল না। কসমসের সামনে থেকে রকবাজদের জমায়েতটা এবার এগিয়ে আসছে ট্রাম লাইনের দিকে। উলটো ফুটপাত থেকেই ওরা সিটি দিতে পারে, মন্তব্য ছুড়তে পারে। সে বলল, ‘এখানে না দাঁড়িয়ে থেকে হাঁটা যাক। তুমি খাওয়াদাওয়া করেছ?’
হাঁটা শুরু করে দীপা বলল, ‘না। ভাল লাগছিল না।’
‘সেকী! চলল, কিছু খাবে। এই ট্রামটায় ওঠো।’
‘ট্রামে? কোথায়?’
‘চলোই না।’
ওরা ট্রামে উঠল। দুপুরের এই সময়ে ট্রামে বেশি যাত্রী নেই। লেডিস সিট ছেড়ে দীপা এগিয়ে গিয়ে বসতেই এক প্রৌঢ় বললেন, ‘পেছনে লেডিস সিট খালি।’
দীপা মুখ ঘুরিয়ে বলল, ‘তাতে কী? এটার গায়ে কি জেন্টস সিট লেখা আছে।’
লোকটি থতমত হয়ে মুখ ফেরাল। অসীম দীপার পাশে বসে বলল, ‘চমৎকার।’
‘এত বাজে কথা গায়ে পড়ে বলতে ভালও লাগে লোকের।’ দীপা বলল।
‘চলো, কফি হাউসে গিয়ে কিছু খেয়ে সময় কাটিয়ে আমাদের বাড়িতে যাবে। ও হো, আজ যা তোমার মনের অবস্থা তাতে মায়ের সঙ্গে কথা বলা ঠিক হবে?
দীপা মাথা নাড়ল, ‘না। আমি আগে তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই।
‘আমার সঙ্গে?’ অসীম অবাক।
দীপা নিচু গলায় জবাব দিল, ‘আমার জীবন সম্পর্কে কিছুই জানো না তুমি?’
