১৭. জলপাইগুড়ি শহরে
জলপাইগুড়ি শহরে কেউ কখনও রাস্তা হারায় না। হস্টেল থেকে কলেজ মাত্র পনেরো মিনিটের পথ। তবু দীপাকে হস্টেলে পৌঁছে দেবার দিন অমরনাথ বারংবার সাবধান করে দিয়েছিলেন এ-ব্যাপারে। সেদিন দীপার একটুও ভয়ভয় করেনি। অমরনাথ তখন বলেছিলেন, ‘কখনও তো তুই একা থাকিনি আমাদের ছেড়ে, চিন্তা হচ্ছে সেই কারণে।’
‘না। আমি তোমাদের ছেড়ে এর আগে থেকেছি।’ মুখ নিচু করে বলেছিল দীপা।
কথা বলতে পারেননি আর অমরনাথ। যেন সপাটে চাবুক পড়েছিল মুখে। ওই অবস্থা কাটাতে দীপা বলেছিল, ‘তোমাকে আমার জন্যে বেশি চিন্তা করতে হবে না। আমি ঠিক থাকব।’
চলে যাওয়ার আগে অমরনাথ তবু বলতে পেরেছিলেন, ‘বাইরে বেশি ঘোরাফেরা করার দরকার নেই। কখনও কোনও প্রয়োজন হলে আমাকে জানাস। আমরা ছাড়া কেউ দেখা করতে এলে দেখা করিস না। তুই তোর ঘরে যা, তারপর আমি যাচ্ছি।’
নিজের ঘরে ফিরে এসে দৃশ্যটি দেখেছিল দীপা। খাটের ওপর উপুড় হয়ে হাউহাউ করে কাঁদছে মেয়েটা। গায়ের রং কালো, রোগা, শাড়িটি অবশ্য নিতান্ত কম দামি নয়। কী করা উচিত বুঝতে না পেরে তক্তাপোশের ওপর বসেছিল সে চুপচাপ। তখনও বিছানা খোলা হয়নি। ট্রাঙ্ক রয়েছে যেমন আনা হয়েছিল তেমনই। একটা তক্তাপোশ আর তার সঙ্গে টেবিল এই হল সম্বল। দেওয়ালে অবশ্য দু’দিকে দুটো দড়ি ঝোলানো রয়েছে। মেয়েটিকে কাঁদতে দিয়ে সে নিজের বিছানা করে নিল। বিকেল নামব নামব করছিল। ও-পাশের রাস্তায় রিকশা সাইকেলের ঘন্টি অনর্গল বেজে যাচ্ছে। এই হস্টেলটা তিনতলা। হস্টেলের বড়দি সব নিয়মকানুন শুনিয়েছেন। মহিলাকে দেখেই বোঝা যায় নিয়মের ব্যাপারে কড়াকড়ি করতে তাঁর খুব ভাল লাগে। নিয়মগুলো মানতে তার কোনও আপত্তি নেই কারণ কোনও অসুবিধা তো হবে না।
দরজায় শব্দ হয়েছিল। মুখ ফিরিয়ে দীপা দেখেছিল এক প্রৌঢ়া মহিলা দু’হাতে দুটো লুচির থালা নিয়ে ঘরে ঢুকে থমকে দাঁড়াল। যে-মেয়েটি কাঁদছিল তার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, ‘প্রতি বছর এক কাণ্ড দেখতে দেখতে চোখ পচে গেল। পাশ করে পড়তে আসা কেন বাপু যদি এত কান্না পায়।’ দু’জনের টেবিলে থালা নামিয়ে দীপাকে বলল সে, ‘জল শুকালে খেয়ে নিতে বোলো। তারপর ওই দরজার পাশে বারান্দায় থালা বের করে দেবে মনে করে। কুঁজো এনেছ? এ মা, দু’জনেই কুঁজো আনেনি! দেখি, একটা আধুলি দেখি।’
‘আধুলিতে কী হবে?’ দীপা অবাক।
‘তেষ্টা পেলে নীচে গিয়ে জল খাবে? রাতদুপুরে? একটা কুঁজো এনে দিচ্ছি। আমার নাম মেনকা। দরকার হলে ডাকবে। দেখি দাও। বাইরে খাবার রেখে এসেছি, আরও পাঁচটা ঘরে ঘুরতে হবে। দাঁড়াবার সময় নেই। একটা কুঁজোয় দু’জনের চলে যাবে। সিকিটা ওর কাছ থেকে নিয়ে নিয়ো।’ মেনকা হাত বাড়িয়েই ছিল।
বাড়ি থেকে বের হবার সময় অঞ্জলি তিরিশটি টাকা দিয়েছিল। বইপত্র কেনার টাকা নিয়ে অমরনাথ সামনের সপ্তাহে আসবেন। খাতাপত্র এবং টুকিটাকি হাতখরচ যেন সে ওই টাকা থেকেই করে নেয়। কিন্তু পুরো টাকা যেন সে খরচ না করে যদ্দিন না ব্যাঙ্ক থেকে টাকা আসে। দীপা সেই সঞ্চয় থেকে একটি টাকা দিয়েছিল মেনকার হাতে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই একটি জল-ভরতি কুঁজো আর আধুলি ফেরত দিয়ে গিয়েছিল সে।
লুচি গোটা চারেক আর আলুর তরকারি। দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল লুচি মিইয়ে রয়েছে। দীপা মেয়েটির দিকে তাকাল। এ-ঘরে মেনকা ঢুকে কথা বলার পর থেকে তার কান্নার আওয়াজ কমেছিল। এখন শুধু বড় বড় নিশ্বাসের সঙ্গে পিঠ কাঁপছে। শেষপর্যন্ত দীপা না ডেকে পারল না, ‘শোনো, এই যে!’ মেয়েটি মুখ তুলল না। তক্তাপোশ ছেড়ে দীপা উঠে এল কাছে, ‘তোমার খাবার দিয়েছে।’ হঠাৎ মেয়েটি ককিয়ে উঠল, ‘আমি খাব না, কিছু খাব না।’
দীপা কথা না বাড়িয়ে নিজের টেবিলের কাছে চলে এল। একটা কাঁসার গ্লাস দিয়েছে অঞ্জলি। সেটা রয়েছে ট্রাঙ্কে। চাবি দিয়ে তালা খুলে গ্লাসে জল ভরে লুচিতে হাত দিল সে। শক্ত হয়ে গেছে এর মধ্যে। ছিঁড়তে অসুবিধে হচ্ছিল। এমন স্বাদের তরকারি কখনও খায়নি সে। মনোরমা বারংবার বলে দিয়েছেন আজ সকালে, যতটুকু এড়ানো সম্ভব ততটুকু এড়িয়ে সে যেন নিরামিষ খায়। হস্টেলে যে তার জন্যে কেউ আলাদা করে নিরামিষ বেঁধে দেবে না এটা বুঝতে পারার পর কদিন থম ধরেছিলেন তিনি। নিজের মনেই বিড়বিড় করেছেন কাল রাত্রে, ‘পেঁয়াজ তো এড়ানো যাবে না, মাছ মাংস ডিম চোখে দেখা যায়, সেগুলো না খেলেই হল। হিন্দুর মেয়ে মরে গেলে ভগবানের কাছে কৈফিয়ত দিতে হয়।’
কোন ভগবান? কী নাম তাঁর? গতকাল এসব প্রশ্ন করেনি সে। করতে ইচ্ছে হয়নি শেষরাত বলে। যেদিন তেজেন্দ্রর সঙ্গে বাঘ না দেখে ফিরে এসেছিল সেদিন মনোরমার সঙ্গে খাওয়া নিয়ে একপ্রস্থ হয়ে গিয়েছিল তার। বিধবাদের মাছ মাংস ডিম কেন খেতে নিষেধ বলে মনে করেন মনোরমা। যে-মানুষটা মারা গেছে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ওসব যারা ত্যাগ করেছে তাদের তো সতী হওয়া উচিত। বেঁচে থাকাই অন্যায়। কোনও স্বামী যখন স্ত্রীর মৃত্যুর পরে নিরামিষ খায় না তখন নির্বোধ মেয়েরাই নিজেদের বঞ্চিত করে! মাছ মাংস ডিম খেলে শরীর যদি উত্তেজিত হয় তা হলে যে-কোনও কুমারী মেয়েরও তো তাই হয়। তাকে তো কেউ নিষেধ করে বলে না নিরামিষ খেতে। যে-লোকটাকে শুধু করুণা ছাড়া কিছু করা যায় না সে মারা যাওয়ার পর কোনও পাপ হবে না যদি আমিষ খাওয়া হয়। কিন্তু সে এই বাড়িতে নিরামিষ খাবে কারণ মনোরমা তাতে খুশি হবেন। যদিও এটা একটা অন্ধ সংস্কারকে প্রশ্রয় দেওয়া তবু সে মনোরমাকে দুঃখ দেবে না। এসব কয়েকমাস আগের কথা। তারপর এ-ব্যাপারে একদম চুপচাপ ছিলেন মনোরমা। কিন্তু গতরাতে নিজের মনে বিড়বিড় করতে ছাড়েননি যদি কথাগুলো তার কান দিয়ে মনে ঢুকে যায়। হেসে ফেলল দীপা। যতই বিশ্রী স্বাদ তোক তবু তো স্বাদবদল। কষ্ট করেই প্লেটটা শেষ করল সে।
জল খেয়ে নিজের তক্তাপোশে ফিরে দীপা দেখল মেয়েটা উঠে বসেছে। ঠোঁট কামড়ে চোখ বন্ধ করে রয়েছে। দীপা বলল, ‘তোমার খাবার পড়ে আছে।’
মেয়েটা চোখ খুলল। সঙ্গে সঙ্গে একটা জলের ধারা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল।
দীপা জিজ্ঞাসা না করে পারল না, ‘কী হয়েছে তোমার?’
মেয়েটি মুখ ফেরাল, ‘আমার এখানে থাকতে ভাল লাগছে না।’
‘কেন?’
‘আমি কখনও একা একা থাকিনি।’ মেয়েটি ঠোঁট কামড়াল।
‘সে তো সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।’
‘কিন্তু আমার বাবা জোর করে আমাকে পড়াতে পাঠিয়েছে।’
‘তোমার পড়ার ইচ্ছে ছিল না?’
‘না। কেন যে আমি সেকেন্ড ডিভিশন পেয়েছিলাম।’
‘কোথায় বাড়ি তোমার?’
‘আলিপুরদুয়ার।’
‘তোমার বাবা নিশ্চয়ই ভাল চান।’
‘মোটেই না। আমার চেহারা খারাপ, গ্র্যাজুয়েট না হই আই এ পাশ না হলে আমার বিয়ে হবে না। বাবা একটা ছেলে ঠিক করে রেখেছে। পনেরো হাজার টাকা নগদ, বিশভরি সোনা, একটা সাইকেল, আলমারি খাট আর একশোজন বরযাত্রী ছাড়া আমাকে অন্তত আই এ পাশ হতে হবে। বাবা তাই জোর করে এখানে পড়তে পাঠিয়েছে। আগে জানলে আমি স্কুল ফাইন্যালে ঠিক ফেল করতাম।’ মেয়েটির মুখ-চোখে এখন রাগ মিশছে। কান্নার ছায়া নেই।
‘তোমার বাবা কী করেন?’
‘ব্যাবসা। বাবা মুখে যতই বলুক আমাকে আই এ পাশ করাতে চায়, কিন্তু আমি জানি কেন আমাকে এত দূর হস্টেলে রাখা হল। কুচবিহার তো কাছে ছিল। সেখানকার কলেজে আমাকে ভরতি করল না কেন?’
‘কেন?’ দীপার এখন মজা লাগছিল ওর সঙ্গে কথা বলতে।
‘সেটা তোমাকে বলতে পারব না।’ মেয়েটি মুখ ফিরিয়ে নিল।
‘লুচিগুলো খেয়ে নাও।’
অত্যন্ত অনিচ্ছায় প্লেটের দিকে হাত বাড়াল মেয়েটি। লুচি ছিঁড়তে গিয়ে বলল, ‘এম্মা, এ তো একদম চামড়া। কী করে খাব? তুমি খেয়ে নিয়েছ?’
‘খিদে পেলে খেতে হবেই।’
‘তোমার বাড়ি কোথায়?’
‘চা -বাগানে।’
মেয়েটি অর্ধেকটা কোনওমতে খেল। তারপর প্লেটটা দরজার বাইরে বের করে দিয়ে এল। অর্থাৎ একটু আগের কথাবার্তা ওর কানে গিয়েছে। দীপা আশা করছিল নিজে থেকেই চার আনা পয়সা দিয়ে দেবে মেয়েটা। কিন্তু জল খাওয়ার পর মেয়েটি জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার নাম কী? আমার নাম মায়া মিত্র।’
‘দীপাবলী ব্যানার্জি।’
ওমা, তুমি ব্রাহ্মণ? আচ্ছা, মেয়েদের কি বামুন বলে? ব্যাটাছেলেরাই তো বামুন হয়।’
‘জানি না।’
‘ও। আচ্ছা, আমি শুয়ে পড়ি। আমার খুব মন কেমন করছে।’ বলে নিজের বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল মায়া। মাঝে মাঝেই তার ফোঁস ফোঁস শব্দ কানে আসছিল।
যে-কথাটা মায়া প্রথম আলাপে বলতে চায়নি সেটা দিন তিনেকের মধ্যে হস্টেলের সবাই জেনে গিয়েছিল। আলিপুরদুয়ার স্কুলের টিচার মায়াকে বাড়িতে এসে পড়াতেন। মায়া তার লভে পড়েছে। সেই টিচার ভদ্রলোক জাতে মাহিষ্য। এই কারণে মায়ার বাবা সেই লভ মেনে নিতে পারেননি। একদম জলপাইগুড়ির কলেজে মেয়েকে ভরতি করেছেন যাতে টিচারের সঙ্গে দেখাশোনা না হয়। যেদিন প্রথম ব্যাপারটা ধরা পড়ে সেদিন নাকি তিনি গৃহশিক্ষককে জুতোপেটা করেছিলেন। নেহাত হ্যামিলটনগঞ্জের পাত্র নিদেনপক্ষে আই এ পাশ মেয়ে চায় তাই মায়াকে কলেজে পড়ানো। ভদ্রলোকের ধারণা মাতুল বংশের রূপ পেয়েছে মায়া। শ্বশুরবাড়ির টাকায় তিনি ব্যাবসা শুরু করেছিলেন বলে যে কৃতজ্ঞতাবোধ অবশিষ্ট আছে তাই দিয়ে মেয়েকে পড়াচ্ছেন তিনি। মেয়ে তো বটেই, গৃহশিক্ষককেও সাবধান করে দিয়ে এসেছেন সে যেন জলপাইগুড়ি শহরে ওই দু’বছরে পা না দেয়। তিন দিনেই খবরটা চাউর হয়ে গেল। করল মায়া নিজেই। মেয়েটা খুব বোকা। নইলে কেউ বলে বেড়ায় যে তার বাবাও স্কুল ফাইন্যাল পাশ করেনি। দ্বিতীয় দিন দুপুরে মায়া কলেজ থেকে ফিরে প্রশ্ন করেছিল, ‘দীপাবলী, তুমি কখনও লভে পড়েছ?’
চমকে তাকিয়েছিল দীপা। তারপর হেসে বলেছিল, ‘হ্যাঁ।’
‘ওম্মা! তাই। কে গো? কোথায় থাকে?’
‘কার কথা বলছ?’
‘তুমি যার লভে পড়েছ!’
দীপা হেসে ফেলল, ‘আমি প্রথম লভে পড়ি আমার মায়ের। তারপর বাবার। তারপর ঠাকুমার। তারপর চা-বাগানের, গাছপালার, আংরাভাসা নদীর।’
‘দুর! এসব কে জিজ্ঞাসা করেছে। তুমি কোনও ছেলের লভে পড়োনি?’
দীপা মাথা নেড়ে না বলল। মায়া নিশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘আজ কলেজে গিয়ে আমি কোনও ছেলের দিকে তাকাইনি। একজন লাভার থাকতে অন্য কারও দিকে তাকাতে নেই। তুমি তো দেখতে ভাল, দেখবে এখানে তোমার লভে অনেকে পড়বে।’
মায়ার এই বোকামিতে সে অনেকের রসিকতার পাত্রী হয়ে উঠল। হস্টেলে যারা সেকেন্ড অথবা থার্ডইয়ারের ছাত্রী তাদের ক’জন ওকে দেখতে পেলেই মজা করার চেষ্টা করত। এই তো গতকালই তাদের ঘরে ভিড় জমেছিল। দারোয়ান এসে দীপার হাতে খামটা দিয়ে গিয়েছিল। নীলরঙের খাম। ওপরে মায়ার নাম লেখা।
সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী মেটেলির শীলা মুখার্জির মুখে কোনও কথা আটকায় না। সে দীপার হাত থেকে খামটা ছিনিয়ে নিয়ে নাকের নীচে ধরল, ‘উঃ, কী সুন্দর গন্ধ রে মায়া।’
মায়া খুব রেগে গেল, ‘আঃ, আমার চিঠি নিয়ে তোমরা ইয়ারকি করছ কেন? দাও, দাও বলছি।’ সে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ছিল, সবাই মিলে তাকে ধরে তক্তপোশে বসাল। শীলা বলল, ‘চিঠি দেব, আগে বল গন্ধটা কীসের?’
‘কান্তা সেন্টের।’
‘কী করে জানলি?’
‘না জানলে বলছি কী করে! দাও চিঠি।’
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ঘরে জমা হওয়া অন্য মেয়েরা চিৎকার করতে লাগল তারা চিঠির বিষয়বস্তু শুনবে। সবাই মিলে মায়াকে নানাভাবে বোঝাতে লাগল। দীপা চুপচাপ ব্যাপারটা দেখছিল। হঠাৎ ওর মনে হল মেয়েরা প্রেমে পড়লে কি বোকা হয়ে যায়? নাকি বোকা মেয়েরাই প্রেমে পড়ে? বিশু খোকন বা ওদের বন্ধুবান্ধবদের মুখ মনে পড়ল। সে তো কখনও কারও প্রেমে পড়েনি। দীপা শুনল, মায়া রাজি হয়েছে। কিন্তু সেইসঙ্গে শর্ত করিয়ে নিচ্ছে, এই প্রথম আর শেষবার। আর কখনও যেন শীলারা তার চিঠি পড়তে না চায়। সবাই এককথায় রাজি হয়ে গেল। শীলা চিঠিটা মায়ার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ‘তোর চিঠি তুই পড়, আমরা তোর মুখ থেকে শুনব।’
দীপা দেখল, খামটা হাতে নিয়ে মায়ার মুখ লজ্জায় ভরে উঠল। সযত্নে খামের মুখ খুলল সে। একটা কালো রোগা মেয়ের মুখে এত জ্যোতি জ্বলতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস করা যেত না। সন্তর্পণে ভেতর থেকে ভাঁজ করা কাগজটাকে বের করে আনল মায়া। সেটাকে টানটান করতে কী যেন খসে পড়ল কোলের ওপর। শীলা জিজ্ঞাসা করল, ‘ওটা কী রে?’
চট করে বস্তুটি তুলে ব্লাউজের ভেতর চালান করে দিয়ে মায়া বলল, ‘কিস্যু না।’
‘এম্মা, তুই আমাদের বলবি না? কী রে ওটা!’
চোখ ঘুরিয়ে ঠোঁট কামড়াল মায়া, ‘গোলাপফুলের পাপড়ি।’
সঙ্গে সঙ্গে একটা হাসির তুবড়ি যেন ছিটকে উঠল ঘরে। এবং দরজায় এসে দাঁড়াল মেনকা, ‘বড়দি চিৎকার করতে নিষেধ করছেন। আর তোমাদেরও বলি, একটা হাবাগোবা মেয়েকে নিয়ে মজা করছ। ওকে থাকতে দাও ওর মতন।
শীলা বলল, ‘হাবাগোবা! মেনকাদি, তোমার কোনও লাভার ছিল?’
মেনকা আর দাঁড়াল না। শীলা বলল, ‘নাও, আরম্ভ করো।’
মেনকাকে দেখার পর থেকেই মায়ার মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। সে বলল, ‘না বাবা, বড়দি যদি জানতে পারে তা হলে বাবাকে লিখে দেবে। আর বাবা যদি একবার খবর পায় তা হলে ওকে মেরে ফেলবে।’
শীলা আশ্বস্ত করল, কেউ জানবে না। পড় তো চিঠিটা। আমরা আর ধৈর্য রাখতে পারছি না।’
মায়া চিঠিটা পড়ল, ‘আমার প্রাণাধিকাসু, তোমার অদর্শনে আমি অসহায় হয়ে পড়ে আছি। তুমি অশোকবনে বন্দিনী সীতা। কিন্তু রামের একজন দূত ছিল, তার নাম হনুমান। আমার তো কেউ নেই। একমাত্র ডাকবিভাগ ছাড়া। অতএব অসীম সাহসে তারই শরণাপন্ন হলাম। জানি না এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছাবে কিনা। যদি পৌঁছায় তা হলে বুঝব ঈশ্বরের হৃদয়ে প্রাণ আছে। প্রথমে বলে রাখি, আমার চোখে ঘুম নাই, আহারে প্রবৃত্তি নাই, প্রাণ আছে বলেই রাখা। নইলে এই পোড়া জীবন কে বইত! যতদিন তুমি পৃথিবীতে কুমারী অবস্থায় থাকবে ততদিন এই প্রাণ শরীরে থাকবে।
‘মায়াবতী। তোমার বাবা একটি চিজ। তিনি আমাকে দু’চক্ষে দেখতে পারেন না। তোমাকে তিন মাস পড়িয়েও আমি মাইনে পাইনি তাঁর কাছ থেকে। অজুহাতটা তিনি কাজে লাগিয়েছেন। যে-লোকটির সঙ্গে তোমার সম্বন্ধ হয়েছে সে তোমাকে নিয়ে গিয়ে বাড়িতে যে-গৃহশিক্ষক আছেন তাঁকে ছাড়িয়ে দেবে। সেইজন্যে অন্তত আই এ পাশ চাইছে যাতে নাইন-টেনের ছেলেমেয়েকে পড়াতে পারো। বুঝতেই পারছ, তোমাকে নয় একজন বিনি পয়সার গৃহশিক্ষক চাইছে ওরা।
‘মায়াবতী। আমার শিরায় শিরায় শুধু তুমি। তোমাকে ছাড়া আমি আর কিছুই জানি না। তোমার বাবা, কিছু মনে কোরো না, খুব বদমায়েশ। তাঁর সঙ্গে লড়তে হলে সোজা পথে হবে না। আমাকেও বাঁকা পথ নিতে হবে। এখন তুমি বলো রাজি আছ কিনা? তোমাকে ঠিক করতে হবে কাকে চাও? আমাকে না তোমার বাবাকে? যদি আমাকে চাও, তা হলে আমার পরিকল্পনামতো কাজ করতে হবে। মনস্থির করে আমাকে জানাও। তুমি স্কুলের ঠিকানায় আমাকে চিঠি দেবে না। জগদীশ স্টোরসের ঠিকানায় দেবে। প্রাণাধিকা, তোমার চিঠির আশায় আমি বিরহী যক্ষের মতো পথ চেয়ে আছি। আসমুদ্র হিমাচল ভালবাসা বুকে নিয়ে, তোমারই জগন্নাথ।’
মায়া যখন চিঠিটা পড়া শুরু করেছিল তখন তার গলা কাঁপছিল। শেষে অনেকটা যান্ত্রিক হয়ে গিয়েছিল তার পড়ার ধরন। সেইভাবেই সে শেষ করল। যারা চিঠির বয়ান শুনছিল তারা আচমকা চুপ হয়ে গেল। শেষপর্যন্ত শীলা বলল, ‘বাবাঃ, কী ভালবাসা। লায়লামজনুকেও হার মানিয়ে দেয়। তোকে আমাদের হিংসে হচ্ছে মায়া।’
‘তোমার হলে হতে পারে, অন্য সবাইকে জড়াচ্ছ কেন?’ মায়া চিঠি ভাঁজ করল।
সঙ্গে সঙ্গে বাকি সবাই চেঁচিয়ে উঠল, তাদেরও হিংসে হচ্ছে। শীলা জিজ্ঞাসা করল, ‘কী করে তোর সঙ্গে এত জমল রে?’
‘প্রথমে আমার ভাইকে পড়াতে এসেছিল। তারপর আমাকে। দ্বিতীয় হপ্তায় বইয়ের ভাঁজে আমাকে চিঠি দিল, তারপর থেকেই।’ আবার বেগুনি হল মায়া।
‘কী লিখেছিল সেই চিঠিতে?’
‘রিক্ত আমি নিঃস্ব আমি কিছু আমার নাই, চাও যদি ভালবাসা দেব ঢেলে তাই।’
হাততালি বাজল। সবাই যতই ইয়ারকি করুক, দীপার মনে হচ্ছিল এই কালো মেয়েটাকে কেউ সত্যি ঈর্ষা করছে। হঠাৎই মায়া যেন সবার থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে।
মাঝরাতে হাতের ঠেলায় ঘুম ভেঙে গেল দীপার। মায়া তার ওপর ঝুঁকে আছে, ‘শোনো, তুমি একটু উঠবে? আমার একা জেগে থাকতে ভাল লাগছে না।’
‘জেগে আছ কেন? ঘুমিয়ে পড়ো ।’
‘ঘুম আসছে না।’ মায়া দ্রুত মাথা নাড়ল।
‘কেন?’
‘চিঠিটা লিখতে পারছি না। ওকে তো জবাব দিতে হবে। কিছুতেই ঠিকমতো কথা সাজাতে পারছি না। কী বলে সম্বোধন করব তাই মাথায় আসছে না।’
‘তুমি এর আগে ওঁকে কখনও চিঠি লেখোনি?’
‘না। ও তো এই আমাকে দ্বিতীয়বার লিখল।’
‘শীলাদির কাছে যাও।’
‘না বাবা। ওরা আমাকে নিয়ে শুধু ঠাট্টা করে। একমাত্র তুমি কিছু বলোনি।’
মায়া এমন মিনতি করতে লাগল যে উঠে বসতে হল দীপাকে। তার সামনে জগন্নাথবাবুর চিঠি। সেই চিঠির কাগজে কান্তা সেন্টের মৃদু গন্ধ। মায়া তাকে প্রায় বাধ্য করছে চিঠির উত্তর লিখে দিতে। মায়ার মূল বক্তব্য, জগন্নাথ যে-পরিকল্পনাই নিক তাতেই মায়ার সায় আছে। জগন্নাথকে না পেলে সে আত্মহত্যা করবে। দীপা বলেছিল, ‘এই কথাগুলোই তুমি লিখে দাও না।’ মায়া মাথা নেড়েছিল, ‘খুব রেগে যাবে ও। আমাকে বলেছে যে-চিঠি আমি লিখব তা যেন খুব বড় হয়। নইলে ও রেগে যাবে।’
অতএব দীপা মধ্যরাতে কাগজপত্র নিয়ে বসেছিল। জীবনে যে প্রেমে পড়েনি সে কী করে প্রেমপত্র লিখবে। তিন তিনটে মকশো করে ছিঁড়ে ফেলল দীপা। এবং তখনই দেখতে পেল বালিশে মাথা রেখে মায়া ঘুমিয়ে পড়েছে, অথচ ওই কালো মেয়েটার মুখে কীনরম প্রসন্নতার আলো জড়ানো। দীপা উঠল। তারপর রমলা সেনের দেওয়া রবীন্দ্রনাথের কবিতার বইগুলো নিয়ে এল। একটার পর একটা লাইন, কত তার অর্থ, কিন্তু কোনওটাই বোকাবোকা নয়। জগন্নাথের চিঠির উত্তর কি রবীন্দ্রনাথের লাইন সাজিয়ে দেবে? অনেক ভেবেচিন্তে সে নিজের মতো করে একটা চিঠি লিখল।
‘প্রিয় জগন্নাথ, তোমার চিঠি এল এক ঝলক হাওয়ার মতো আমার এই বদ্ধ জীবনে। গভীর জলে যে ডুবে থাকতে বাধ্য হচ্ছিল তাকে এক নিমেষে ওই চিঠি তুলে নিয়ে এল আলোর রাজ্যে। আমি কবিতা লিখতে পারি না। মিল মিলিয়ে দুরূহ ছন্দে লিখতে যে ক্ষমতা লাগে তা আমার নেই। আমি এক সাধারণ মেয়ে। ঈশ্বর আমাকে সৃষ্টি করেছিলেন নিতান্তই অবহেলায়। ঘাসের বুকে শিশিরের যে-সৌন্দর্য তাও তো আমার নেই। শুধু বঞ্চিত আর অবহেলিতদের দলে ভিড় বাড়াতেই আমার জন্ম হয়েছিল। এই অভাগীর জীবনে তুমি নিয়ে এসেছিলে অমৃত। তুমি আমাকে যা করতে বলবে আমি তাই করব।
‘এখন অনেক রাত। সমস্ত পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়েছে। আমার এই পোড়া চোখে শুধু জল। কবে সূর্য উঠবে? তোমার চিঠির আশায় আমি দিন গুনব। ইতি তোমার— ।’
এই পর্যন্ত লিখে থমকে গেল দীপা। কী লেখা যায়? প্রাণাধিকা? দুর! সেবিকা বা প্রণতা খুব আটপৌরে হয়ে যাবে। অথচ চিঠিটা শেষ করা যাচ্ছে না একটা জম্পেশ শব্দ না পেলে। সে উঠে বসল। এবং তখনই শরীরে জমে থাকা আলস্য মাথা তুলল। সারাটা রাত কেটে গেছে। পাশের বিছানায় মায়া এখন অঘোরে ঘুমোচ্ছে। জানলার বাইরের আকাশের রং ফিকে হয়ে আসছে। দীপা শেষ করল চিঠিটা, ইতি তোমার একেশ্বরী মায়াবতী। লেখামাত্র সে হেসে ফেলল। এই চিঠির ভাষায় প্রভাবতী দেবী সরস্বতীও গল্প লিখতেন না। বঙ্কিমচন্দ্রের নায়িকারা এই ভাষায় ভাবতে পারত। তা হলে সে কেন চিঠিটা এইভাবে লিখতে গেল! রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাকে যেখানে একা টেনে নিয়ে গিয়েছেন সেখান থেকেই তো তাদের লেখালেখি করা উচিত। যদি বঙ্কিমে ফিরে যেতে হয় তা হলে রবীন্দ্রনাথের কী দরকার ছিল! চিঠিটা ছিঁড়তে গিয়েও ছিঁড়ল না সে। দ্বিতীয় কাগজটার ওপর উপুড় হল—‘প্রিয় জগন্নাথ, তোমার চিঠি পেয়েছি। নীল রং এবং সুগন্ধ আরও অনেককেই আকর্ষণ করেছিল। নতুন বাসস্থানে ঠিকঠাক গুছিয়ে ওঠার সময় তোমার চিঠিতে খুব উৎসাহিত হলাম। তোমার সঙ্গে জীবন যোগ করেছি, অতএব আমাকে প্রশ্ন কেন? যা করার তুমি করবে আমি কখনও হাত সরাব না। ভাল থাকবে। তোমারই মায়াবতী।’
মায়া প্রথম চিঠিটাই পোস্ট করেছিল কলেজে যাওয়ার পথে। দ্বিতীয় চিঠিটা সম্পর্কে সে বলেছিল, ‘এরকম চিঠি তুমি কী করে লিখলে? যে-ছেলে পাবে সেই পালাবে। কী সুন্দর লাইন প্রথম চিঠিটায়। ও পড়ে খুব ভাববে, কী করে আমি এত সুন্দর চিঠি লিখলাম।’
‘তা হলে তুমি খুব অন্যায় করেছ মায়া। যাকে অত ভালবাসো তাকে তো এক ধরনের ঠকানো হচ্ছে। তাই না?’
‘ওমা, ঠকানো হবে কেন? আমার মনের কথা তুমি লিখে দিচ্ছ। তুমি কি বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা লিখছ ওকে। সত্যি যা তা সবসময় লেখা যায়।’
দীপা হকচকিয়ে গেল। সে যখন চিঠি লিখছিল তখন মায়া ঘুমিয়ে ছিল। অন্তর্যামী না হলে কারও মনের কথা জানা যায়? অথচ এ কারণে তার মোটেই গর্ব হচ্ছিল না। দীপা বলল ‘এর পরেরবার যখন উত্তর লিখবে— ।’
‘আমি লিখব নাকি? তোমাকে লিখে দিতে হবে। তুমি অপেক্ষা করো, এই চিঠির উত্তরে ও কী লেখে। সেই জবাব পড়ার পর তোমাকে আরও গভীর ভাষায় ওকে ডুবিয়ে দিতে হবে। পুরুষমানুষ বলে কথা, বিশ্বাস নেই তো।’
আজ কলেজ চত্বরে প্রচণ্ড মারপিট হল। ছাত্র ফেডারেশন ধর্মঘট ডেকেছিল। বিধান রায়ের পুলিশ কলকাতায় গুলি চালিয়ে কয়েকজনকে খুন করেছে। তারই প্রতিবাদে কলেজ গেটে বিক্ষোভ দেখানো হচ্ছিল। এইসময় কংগ্রেসের ছেলেরা জোর করে ঢুকতে যায়।
কলেজের উলটোদিকে বাগচী বাড়ির দোতলায় দাঁড়িয়ে ওরা দৃশ্যটা দেখছিল। আজ ধর্মঘট। অথচ হস্টেলের ঘরে ঘরে সার্কুলার দেওয়া হয়েছিল যারা ধর্মঘট করে ঘরে বসে থাকবে তাদের বিরুদ্ধে কলেজ কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে। একমাত্র গায়ত্রী ছাড়া সবাই কলেজে যাওয়ার নাম করে বেরিয়ে পড়েছে। গায়ত্রী মনে করে ছাত্রছাত্রীদের রাজনীতি করা উচিত। এম এ পাশ করতে গেলে অন্তত একুশ বাইশ বছর হয়ে যায়। ওই বয়স পর্যন্ত একটা মানুষ রাজনীতির ধারে কাছে থাকবে না, অথচ তার পরেই রাজনীতির পাকে জড়াতে হবে এ কেমন কথা! যেহেতু ছাত্ররাই দেশ গঠন করে তাই তাদের রাজনীতি করা উচিত। গায়ত্রী অনেককেই বোঝাতে চেষ্টা করেছিল আজ ক্লাস হতেই পারে না। সেক্ষেত্রে হস্টেল ছেড়ে বেরিয়ে কোনও লাভ নেই। কিন্তু এরকম একটা ছুটি পেলে কেউ ছাড়ে না। সিনেমা হলগুলোর ম্যাটিনি শো প্রায় ভরতি হয়ে গেল। কেউ কেউ দল বেঁধে অকারণে শহর ঘুরতে লাগল। দীপারা চলে এসেছিল কলেজের সামনে। সেখানে তখন আনন্দচন্দ্র কলেজের ছাত্রনেতারা মাথার ওপরে হাত ছুড়ে ইনকিলাব জিন্দাবাদ বলছে। এইসময় মায়ার নজরে পড়েছিল মিতা হাত নেড়ে ডাকছে। কলেজের উলটোদিকের বাগচীবাড়ির মেয়ে মিতা। একদিনই ওর সঙ্গে গিয়েছিল। দীপারা তিন-চারজন সঙ্গে সঙ্গে চলে এসেছিল মিতাদের বাড়িতে। মিতার মা অনুযোগ করেছিলেন, ‘আজ তো গোলমালের দিন, তোমরা বেরুলে কেন?’
‘হস্টেলে থাকলে তাড়িয়ে দেবে।’ দীপা হেসে বলেছিল।
‘তার মানে?’
দীপা ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে তিনি বলেছিলেন, ‘এ ভারী অন্যায় কথা।’
দোতলা থেকে বিক্ষোভ দেখতে দেখতে মায়া বলেছিল, ‘ঠিক যাত্রা দেখছি এরকম মনে হচ্ছে না তোদের?’
মিতা বলল, ‘আমার দেখতে দেখতে চোখ পচে গেছে। ওই যে ওই ছেলেটাকে দেখছিস, পাজামা পাঞ্জাবি পরা, ও না এককালে খুব নামকরা গুন্ডা ছিল। এখন একদম পালটে গিয়েছে।’
মায়া বলল, ‘এই দীপাবলী, ওই ছেলেটা কে রে?’
মিতা জানতে চাইল, ‘কোন ছেলেটা?’
মায়া আঙুল তুলতে গিয়ে সামলে নিল, ‘ওই যে বাঁদিকে। লাল জামা পরে এদিকে তাকিয়ে আছে। ইনকিলাব বলছে না।’
মিতা ঠোঁট ওলটাল, ‘ও পল্লব। দীপাবলীকে খুব দ্যাখে বুঝি? আমাকেও দেখত। আমি পাত্তা দিইনি। সমবয়সি ছেলের সঙ্গে বাবা প্রেম করা!
মায়া জিজ্ঞাসা করল, ‘তুই এর আগে প্রেম করেছিস?’
‘এর আগে মানে?’ মিতা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিল তার মা কাছাকাছি আছে কিনা।
‘পল্লব, মানে ওই ছেলেটার আগে?’
‘দুর। ওকে কে পাত্তা দেবে। দু’বছর থেকে তো দেখছি, একটু ভাল দেখতে মেয়ে এলেই ও ড্যাবড্যাব করে তাকায়। তবে আজ পর্যন্ত আমি ন’টা ছেলের সঙ্গে প্রেম করেছি। দু’বার ধরা পড়েছি।’ মিতা হাসল।
‘ন’টা? মায়া যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে বাঁহাতে দীপাকে আঁকড়ে ধরে জিজ্ঞাসা করল, ‘ন’বার প্রেমে পড়া যায় নাকি?’
‘কেন যায় না?’ মিতা যেন অপমানিত বোধ করছে।
‘বাঃ, প্রেম হল মন দেওয়া নেওয়া। একবার কাউকে মন দিয়ে দিলে নিজের কিছু থাকে নাকি?’ মায়ার বিস্ময় বাড়ছিল।
‘ঠিক আছে। কাউকে না হয় আমি মন দিলাম। সে কিছুদিন পরে আমাকে আমার মন ফেরত দিয়ে গেল। কিংবা আমি দেখলাম, সে এমন অযত্ন করছে যে তার কাছে আর মন রাখা যায় না। ফেরত নেবার পর আমার মনটাকে যদি সাফসুফ করে আবার কাউকে দিই তা হলে তোর আপত্তি কী?’ মিতা জানতে চাইল।
‘ওমা, সেটা তো বিধবা বিধবা ব্যাপার।’ মায়ার মুখ থেকে কথাগুলো বের হওয়ামাত্র দীপা প্রচণ্ড নাড়া খেল। ততক্ষণে মিতা এবং অন্য বন্ধুরা হেসে গড়িয়ে পড়ছে। আর তখনই কলেজের সামনে মারপিট শুরু হয়ে গেল। চিৎকার চেঁচামেচিতে স্লোগান বন্ধ হল। এর মধ্যে কোথা থেকে পুলিশ এসে লাঠি চালাতে লাগল। সেদিকে একটু নিস্পৃহ চোখে তাকিয়ে মিতা বলল, ‘হয়ে গেল। আর দশ মিনিট। তারপরেই নাটক শেষ। ওরকম হম্বিতম্বি হয় যেন কত কী না হবে, কিন্তু একটারও হাত পর্যন্ত ভাঙে না।’
দীপা জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি এখান থেকেই সব দ্যাখো, না?’
‘ক্লাস এইট থেকে দেখতাম। আজকাল দেখি না।’
‘কেন?’
‘বললাম না স্কুলকলেজের ছাত্রদের গায়ে মায়ের আঁচলের গন্ধ লেগে থাকে। দু’মিনিট পরে আর কথা বলার বিষয় খুঁজে পাওয়া যায় না। আমি যা ভাবি তা ওরা ভাবতে পারে না। ঠিক করেছিলাম এবার প্রেম করলে অন্তত দশ বছরের বড় লোকের সঙ্গে প্রেম করব।’
মায়া বলল, ‘ওম্মা, সে তো অনেক বড় হবে রে!’
মিতা মাথা নাড়ল, ‘কিন্তু কপাল খারাপ। বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে আমার। এ-জীবনে সম্ভবত আর প্রেম করা হবে না।’ মিতা কথা শেষ করামাত্র মায়া চিৎকার করে উঠল, ‘সেকী রে! কবে তোর বিয়ে? বর কোথাকার? প্রেম করে বিয়ে?’
‘আঃ আস্তে কথা বল। বর কলকাতায় থাকে। বড় অফিসার। আমার চেয়ে আট বছরের বড়। দেখিইনি তো প্রেম করব কী! যার সঙ্গে প্রেম করবি তাকে খবরদার বিয়ে করবি না। বিয়ে মানে প্রেমের মৃত্যু। প্রেম হল রোমান্টিক ব্যাপার, বিয়ে একটা প্র্যাকটিকাল প্রয়োজন। বুঝলি?’
এইসময় দীপা চিৎকার করে উঠল, ‘এই রে, পল্লবকে মারছে!’
ওরা সবাই হুমড়ি খেয়ে দেখল দুটো পুলিশ পল্লবকে লাঠিপেটা করছে। সে মাটিতে পড়ে যেতে ওরা অন্যদিকে ছুটল। এখন বিক্ষোভকারীরা কেউ নেই ধারে কাছে। শান্তি ফিরিয়ে এনে পুলিশের ভ্যান পাহারায় কয়েকজনকে রেখে চলে গেল থানায়। দীপারা দেখল পল্লব উপুড় হয়ে পড়ে আছে কলেজের গেটের সামনে। সে বলল, ‘মরে গেছে নাকি? চল, দেখবি গিয়ে?’
‘আমরা গিয়ে কী করব? ব্যাটাছেলেদের ব্যাপার।’
মায়ার কথার প্রতিবাদ করতে গিয়েই দীপা থমকে দাঁড়াল। কোথা থেকে চারটে ছেলে ছুটে এসে পল্লবকে তুলে নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। এখন সব চুপচাপ। আর আড্ডা জমছে না। ওরা হস্টেলে ফিরে যাওয়ার জন্যে নীচে নামল। আট-দশটি ছেলে বাগচী বাড়ির নীচে দাড়িয়ে স্লোগান দেওয়া শুরু করল, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ। অসহায় ছাত্রের ওপর পুলিশের লাঠি চালানোর প্রতিবাদে আগামীকাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ধর্মঘট।’
আট-দশজন মিছিল করে হাঁটতে শুরু করল। হঠাৎ ওদের দলের একজন এগিয়ে এল সামনে, ‘আপনারা তো আমাদের কলেজের ছাত্রী?’
দীপা মাথা নাড়ল। ছেলেটি জিজ্ঞাসা করল, ‘পুলিশ যে লাঠি চালিয়েছে তা দেখেছেন!’ দীপা নীরবে হ্যাঁ বলল। ছেলেটি বলল, ‘তা হলে আমাদের দলের সঙ্গে হাঁটুন। আসুন।’
দীপা বন্ধুদের দিকে তাকাল। মায়া বলল, ‘আমি যাব না।’ অন্যান্যরাও সেই মত জানাল। ছেলেটি মাথা নেড়ে ছুটে গেল ধ্বনি দিতে দিতে যাওয়া তার সতীর্থদের ধরতে। দীপার ইচ্ছে করছিল পল্লবের কথা জিজ্ঞাসা করতে। লাঠি তার ওপরেই পড়েছে কিন্তু তাকে তো আন্দোলনকারী বলে মনে হয়নি।
মাঝরাত্রে ঘুম ভেঙে গেল দীপার। মায়া কাঁদছে। সে প্রশ্ন করার আগে মায়া বলল, ‘মিতা ঠিকই বলেছে রে।’
‘কী বলেছে?’
‘প্রেম করলে বিয়ে করতে নেই। আমি একটু আগে স্বপ্ন দেখলাম বেশি তেল খরচ করেছি বলে ও আমাকে খুব বকছে। আমার প্রেম আমার বুকে থাক, বিয়ে করে তাকে পায়ে ঠেলব না। তুই তাই লিখে দে লক্ষ্মীটি!’ মায়া মিনতি করল।
দীপা হেসে ফেলল, দাঁড়া, আগে ওর উত্তরটা আসুক।’
