৩৪. দীপা অঞ্জলির দিকে তাকাল
দীপা অঞ্জলির দিকে তাকাল। কথাগুলো শেষ করে অঞ্জলি আবার রান্নাঘরে ঢুকে যাচ্ছিল। মেয়ের সঙ্গে চোখাচোখি করার বিন্দুমাত্র বাসনা তার ছিল না।
দীপা তার দিকে এগিয়ে যেতেই মনোরমা বললেন, ‘থাক। তুই আগে হাতমুখ ধুয়ে জামাকাপড় ছেড়ে নে।’
দীপা ঠাকুমার দিকে তাকাল। তার মনে হচ্ছিল সে এই বাড়ির কেউ না এই কথাটা অঞ্জলি বারংবার বুঝিয়ে দিচ্ছে। বারান্দার শেষ ধাপে বসে পড়ল সে সিড়িতে পা রেখে। মনোরমা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আহা, ওখানে বসলি কেন?’
দীপা জবাব দিল না। সে দু’হাতে মাথার দুটো পাশ চেপে ধরল। মনোরমা আর কথা না বাড়িয়ে ধীরে ধীরে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন। এখন বাড়ির বিভিন্ন গাছে বসা পাখিরা মহানন্দে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। গোয়ালঘর থেকে হাম্বা ডাক ভেসে এল। এই বাড়ি আর তার পরিবেশ, শব্দ, একই রকম রয়ে গেছে। এমনকী উঠোনে নেমে আসা কাঠাল গাছের ছায়াটাও সেইরকম গভীর। শুধু মানুষগুলোই আর এক নেই।
হঠাৎ একটা ঝাকুনি দিয়ে নিজেকে তুলে উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘরের দরজায় চলে এল দীপা। উনুনের খানিকটা দূরে মাটিতে বসে হাঁটুতে চিবুক রেখে কিছু ভাবছিল অঞ্জলি। পায়েব শব্দেও মুখ ফেরাল না। দরজায় হাত রেখে দীপা জিজ্ঞাসা করল, ‘মা, এখনই কি চলে যাব?’
অঞ্জলি জবাব দিল না। একই ভঙ্গিতে বসে রইল।
দীপা বলল, ‘মা, তুমি কথা বলো!’
‘তোমার যা ইচ্ছে!’ অঞ্জলি মুখ ফেরাল।
‘তোমার ইচ্ছেটা জানতে চাই।’
‘আমি তো দরজা খুলেই দিয়েছি।’
‘তা হলে এমন ব্যবহার করছ কেন?’
ঝট করে মুখ ফেরাল অঞ্জলি, ‘কীরকম ব্যবহার করব? তুমি এসেছ বলে আহ্লাদে গলে যাব? এসেছ ভাল, আমাকে জ্বালাতে এসো না।’
‘আচ্ছা, আমি কী করেছি যে তুমি এমন ব্যবহার করছ?’
‘যখন তুমি ছোট ছিলে, তোমার অভিভাবকের দরকার ছিল, তখন তোমাকে বোেঝালে বুঝতে। এখন ডানা গজিয়েছে, সাবালিকা হয়েছে, পুরুষ বন্ধু হয়েছে, নিজের স্বার্থ বুঝে নিতে শিখেছ, এখন তোমাকে বোঝাতে যাওয়ার মতো গাধা আমি নই।’
‘আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি না। আমি বড় হয়েছি এটাই আমার অপরাধ? আমি কি তোমাকে কখনও অসম্মান করেছি?’
‘করোনি?
‘না!’
‘ভাল। যদি তুমি মনে করো করোনি তা হলে তো চুকে গেল। আমাকে আর প্রশ্ন করার কী আছে! শুধু একটা কথা বলে দিচ্ছি, ওঁকে একদম বিরক্ত করবে না। সামান্য উত্তেজনা আমার জীবনের চূড়ান্ত সর্বনাশ এনে দিতে পারে। খুব ভাল হয় যদি উনি জানতে না পারেন যে তুমি এসেছ!’
‘সেকী?’ চমকে উঠল দীপা।
অঞ্জলি কিছু না বলে মুখ ঘুরিয়ে হাঁটুতে চিবুক রাখল। দীপা খুব অসহায়ভাবে দাড়িয়ে থাকল। কিছুক্ষণ, বাবার কী হয়েছে?’
‘বাঁদিকটা ভাল কাজ করছে না। তেমন শক্তি নেই। পাঁচ মিনিট দাঁড়ালে মাথা ঘোরে। একটু উত্তেজনা হলে বুকের ব্যথা বাড়ে? হঠাৎ হাউহাউ করে কেঁদে উঠল অঞ্জলি। তার সমস্ত শরীর কাঁপতে লাগল কান্নার দমকে। কথা জড়িয়ে গেল। দীপা আর পারল না, ছুটে রান্নাঘরে ঢুকে অঞ্জলিকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল, ‘মা, মাগো।‘
অঞ্জলি কাঠ হয়ে গেল মেয়ের আলিঙ্গনে। তার মাথাটা বুকের ওপর টেনে নিয়ে দীপা কেবলই বলতে লাগল, ‘মা, তুমি কেঁদো না। মাগো, তুমি আমাকে ভুল বুঝো না, আমি সেই আগের মতো আছি। মাগো, বাবা ভাল হয়ে যাবে। আমি এসেছি, দেখো, বাবা ভাল হয়ে যাবে।’
এবার একটু একটু করে কান্না থামল। কিছুক্ষণ বাদে অঞ্জলি অন্যরকম গলায় বলল, যা, জামাকাপড় ছেড়ে একেবারে স্নান করে নে। আমি ভাত বাড়ছি।’
দীপা উঠে দাঁড়াল। তার শরীরে বিন্দুমাত্র খিদে নেই। শরীর গোলাচ্ছে এখন। সেইসঙ্গে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ক্লান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। তবু সে রান্নাঘরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল। সূর্য মধ্যগগন ছাড়িয়ে গেছে অনেকক্ষণ। সেই পরিচিত আকাশ গাছপালার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একঝলক আরাম যেন মনে এসে লাগল। মনোরমার ঘরের দরজা খোলা কিন্তু তিনি চোখের সামনে নেই। সে ধীরে ধীরে বড় বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল।
স্নান সেরে পরিষ্কার কাপড় পরে বারান্দায় এসে দীপা দেখল মনোরমা উঠোনে মোড়া পেতে বসে আছেন। শেষবার যখন মনোরমা এখানে ছিলেন তখন সে তার কাছেই খেয়েছে। চোখাচোখি হতেই তিনি বললেন, যা, বিকেল হবার আগে কিছু খেয়ে নে। অঞ্জলিও খায়নি।’
‘কেন?’
‘ও তো আজকাল এরকম বেলা করে। বললেও শোনে না।’
খাওয়ার ঘরে ভাত বেড়ে বসে ছিল অঞ্জলি। দীপা সিঁড়িতে বসে বলল, ‘তোমারটা নিয়ে এসো। আমি একা খাব না।’
অঞ্জলি মেয়ের দিকে একবার তাকিয়ে নিজের থালাটা নিয়ে এল। ভাত ডাল ঢেঁকির শাকের চচ্চড়ি। আর আলু পটলের দম। মুখে দিয়ে তৃপ্তিতে মন ভরে গেল। কতকাল যেন এমন রান্না খায়নি সে। চেঁকির শাক বস্তুটি কলকাতায় পাওয়া যায় কিনা তাই বা কে জানে। হস্টেলের ঠাকুরের একঘেয়ে অপরিচিত রান্না খেতে খেতে পেটে যেন চড়া পড়ে গিয়েছিল! এমনকী আলু পটলের দম থেকেও যে চেনা মিষ্টি গন্ধটা ভেসে আসছে তা থেকে এতকাল বঞ্চিত ছিল সে। তারপরেই দ্বিতীয় চিন্তা মাথায় এল। চেঁকির শাক, সজনের ডাটা, এঁচোড়, ঘোড় অথবা মোচা এ-বাড়িতে কখনও কিনতে হয়নি। প্রায়। জঙ্গলের মতোই। চারপাশে ছড়িয়ে থাকে ওগুলো। ঢেঁকির শাক ছাড়া বাকিদের ঋতু অনুযায়ী পাওয়া যায়। আর শাকটা তো সারাবছর। তরকারি বলতে আলু পটল। পটলের দাম এখন কম হবার কথা। এই পদগুলো থেকে বাড়ির অর্থনৈতিক অবস্থাটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। মাছ আগেও রোজ হত না। রবিবারের হাট থেকে কেনা মাছে মঙ্গলবার পর্যন্ত চলত। তারপর বিকেলে আসাম রোড থেকে মাছ ধরে ফিরে। আসা মেছুয়াদের কাছ থেকে ছোট মাছ কেনা হত। কিন্তু দু’-এক দিন তাদের ঝুড়িতেও ভাল মাছ না। থাকায় নিরামিষ হত। স্কোয়াশের তরকারিটা ছিল তখন বাঁধা। কিন্তু খেতে বসলে বোঝা যেত মাছের। অভাব পূর্ণ করার একটা চেষ্টা হয়েছে।
খেতে খেতেই গা-গুলানি ভাবটা চলে গেল। হঠাৎ দীপা জিজ্ঞাসা করল, “মা, বুধুয়াকে দেখছি না কেন?
‘নেই বলে।’ নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল অঞ্জলি।
‘নেই মানে? বাগানে কাজ পেয়েছে?’
‘জানি না।’
‘তা হলে?’
‘ওকে রাখতে পারলাম না। মাইনে দেওয়া সম্ভব নয়।’
হাঁ হয়ে গেল দীপা। বুধুয়াকে সে কোনকাল থেকে দেখে এসেছে এই বাড়িতে। ওকে নিশ্চয়ই মাইনেপত্র দেওয়া হত কিন্তু সেসব কখনও মাথায় নেয়নি দীপা। এ-বাড়ির গাছপালা দরজা জানলা মেঝে এবং মানুষের মতো বুধুয়া এ-বাড়িরই একজন বলে বোধহয় ভেতরে গেঁথে গিয়েছিল। খাওয়ার। তৃপ্তিটা এক লহমায় উধাও হয়ে গেল যেন। সে থালা তুলে বাইরে বেরিয়ে এল।
এ-বাড়িতে আজ পর্যন্ত তাদের এঁটো বাসন মাজতে হয়নি। এমনকী পাত তুলতে দিত না অঞ্জলি। কিন্তু আজ বলে দিতে হল না এই কাজ নিজেকেই করতে হবে। বুধুয়া কত মাইনে পেত? খরচ কমানোর জন্যে অঞ্জলি নিজের কাঁধে কাজের বোঝা চাপিয়ে কতটা স্বস্তি পাবে? কিন্তু এসব প্রশ্ন করার অধিকার তার নেই। দীপার মনে হল সে যদি এই মুহূর্তে একটা চাকরি পেত তা হলে এ-বাড়ির আর্থিক অবস্থা আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যেত। যে যেমন ছিল সে তেমন থাকত। এতদিন জানা ছিল টাকাপয়সা অত্যন্ত মূল্যবান জিনিস। কিন্তু ওই বস্তুটি যে জীবনের কাঠামো, সম্পর্কের সূত্রগুলো ধরে এমন নির্দয় টানাটানি করে, তা তার জানা ছিল না। এইসময় অঞ্জলি বলল পেছন থেকে, ‘ভাল করে বোয়া হয়নি, থালাটা রেখে মুখহাত মুছে নে।’
সরে দাঁড়াল দীপা। কলতলায় বসতে বসতে অঞ্জলি বলল, ‘ডাকার দরকার নেই। যদি দ্যাখো জেগে আছেন তা হলে কথা বলতে পারো। এমন কিছু বোলো না যাতে উনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। যাও।’
হাত ধুয়ে মনোরমার দিকে তাকাল সে। রোদের তেজ নেই। ডুয়ার্সের এইসব অঞ্চলে পুজোর আগেই বাতাসে টান ধরে, রোদের উগ্রতা কমে যায়। এখনও বৃষ্টির দিন ফুরোতে অনেক দেরি। সেই ফাঁকে বৃষ্টিভেজা রাতগুলোতে শীত ঢুকে পড়ে চুপিসাড়ে। দীপা বারান্দা পেরিয়ে শোওয়ার ঘরে পা দিতেই স্থির হয়ে গেল। অমরনাথ তাকিয়ে আছেন তার দিকে। চোখে চশমা নেই, মুখ শুকনো, খোঁচা খোচা সাদা বাড়ি কদমফুলের মতো ছেয়ে রয়েছে দুই গাল, মুখ। চোখ যেন গর্তে ঢুকে গিয়েছে। সুন্দর চুল ছিল তাঁর। এখন যেন চৈত্রের বাগান। দীপা কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। অঞ্জলি জেগে থাকলে কথা বলার অনুমতি দিয়েছে এই মাত্র, কিন্তু এ কীরকম জেগে থাকা? দৃষ্টি সরছে না, মুখেও অভিব্যক্তি নেই।
‘বাবা!’ মৃদুস্বরে ডাকল দীপা।
ধীরে ধীরে দৃষ্টিতে যেন প্রাণ এল, চোখের পলক পড়ল। দীপা এগিয়ে গেল বিছানার পাশে। অমরনাথ মুখ ফিরিয়ে মেয়ের মুখ দেখার চেষ্টা করলেন। দীপা নিজেকে সংযত করে প্রশ্ন করল, তুমি কেমন আছ বাবা?
তুমি কখন এলে?’ শব্দগুলো ছাড়া ছাড়া, ঈষৎ জড়ানো।
‘এই তো একটু আগে।’ দীপা জবাব দিয়েই জানতে চাইল, ‘তুমি কেমন আছ?’
‘ভাল।’ দুই হাতে ভর দিয়ে উঠে বসতে চাইলেন অমরনাথ। দীপা বলে উঠল, ‘তুমি উঠছ কে? শুয়ে থাকাই তো ভাল।’
‘তোমার মায়ের মতো কথা বোলো না। আমাকে শুইয়ে রাখলে তার কী লাভ হয় বলতে পারো? তোমার তো পেটে বিদ্যে আছে, তুমি ওকে সমর্থন করছ?’ কথা বলতে অমরনাথের কষ্ট হচ্ছিল। শরীরে কাপুনি চলে এল এইটুকুতেই। দীপা ভয় পেয়ে বলে উঠল, ‘ঠিক আছে। তুমি আরাম করে বসো।’
‘গুড।’ মুখে হাসি ফুটল অমরনাথের, বসতে তো কোনও অসুবিধে হয় না। একটু বেশি যদি হাঁটাহাঁটি করি তা হলে মাথা ঘোরে। শরীরটা আর আমার নেই।’
‘তোমার নেই মানে?’ দীপা হাসবার চেষ্টা করল।
‘যখন শরীর মনের ইচ্ছায় চালিত হয় না তখন কি আর আমার বলে দাবি করা যায়? একটার পর একটা যন্ত্রপাতি বিদ্রোহ করছে। কলকাতায় গিয়ে একটা বিদ্রোহ দমন করামাত্রই আর এক দিকে বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেল। ছেড়ে দে আমার কথা! তুই কেমন আছিস বল? কদ্দিনের ছুটি?’ অমরনাথ সাগ্রহে তাকালেন।
‘লক্ষ্মীপুজোর পরেই খুলবে।’
‘পড়াশুনা কেমন হচ্ছে?’
‘ভালই।’
‘আমি ওই ভালই শব্দটার মানে বুঝি না। হয় বলবি ভাল, নয় খারাপ।’
‘খারাপ হতে যাবে কেন? আমি তো কলকাতায় পড়াশুনা করতেই গিয়েছি।’
‘এমন কোনও কথা বলবি না যার মধ্যে ইতস্তত ভাব আছে।’ অমরনাথ চোখ বন্ধ করলেন, ‘টাকাপয়সা ঠিকমতো যাচ্ছে তো? ব্যাঙ্ক খেয়াল রাখছে?’
‘হ্যাঁ।’ দীপা মাথা নিচু করল।
‘কী হল?’ অমরনাথের গলায় সন্দেহ।
‘কিছু না।’
‘শোন, ভাল রেজাল্ট করতেই হবে। সত্যসাধন মাস্টারকে চিরদিন মনে রেখো। এতদিন শুনেছি মানুষ ভাগ্য নিয়ে জন্মায়। ভাগ্য যেমন ফেরায় তেমনি ফেরে। কর্ণের মতো অতবড় বীর ভাগ্যের হাতে পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু এখন সময় পালটাচ্ছে। মানুষ যদি জেদি আর পরিশ্রমী হয় তা হলে নিজের ভাগ্য নিজেই তৈরি করে নিতে পারে। তোমাকে তার প্রমাণ দিতে হবে।’
অমরনাথ কথা শেষ করামাত্র অঞ্জলি ঘরে ঢুকল, ‘একদিনেই সব কথা শেষ না করলে নয়? ও তো কিছুদিন এখানে থাকবে। ডাক্তার তোমাকে কথা বলতে নিষেধ করেছেন এটা ভুলে যাও কেন?’
‘তোমরা বড় কথা বিকৃত করো। কথা বলতে নিষেধ করেননি, বেশি কথা বলতে নিষেধ করেছেন।’
‘আমি তো তখন থেকে শুনে যাচ্ছি তোমার গলা।’
অমরনাথ মাথা ঝাঁকালেন, ‘রোদ পড়ে গিয়েছে?’
‘হ্যাঁ।’ অঞ্জলি ভেতরের ঘরে চলে যাচ্ছিল।
‘আমি একটু বাইরে গিয়ে বসব?’
‘আবার মাথা ঘুরবে।’ অঞ্জলি দাঁড়াল।
অমরনাথ নিজেই বিছানা থেকে নামার চেষ্টা করলেন। দীপা তাঁকে ধরল, ‘আমাকে ধরো। আস্তে আস্তে চলো।’
অল্প হাটতে অমরনাথের এখনও অসুবিধে হয় না। বাইরের ঘরের বারান্দায় তিনি দীপার কাঁধে ভর রেখে চলে এলেন। পেছন পেছন আসছিল অঞ্জলি। সে বাইরের ঘর থেকে একটা চেয়ার টেনে বারান্দায় দিতেই অমরনাথ তাতে বসলেন, ‘আঃ। কী আরাম। এই মাঠটাকে না দেখতে পেলে বেঁচে থাকার কোনও মানেই হয় না। এমন সুন্দর চাপড়া বাঁধা ঘাস তুমি কোথাও পাবে না।’
দীপা অমরনাথের পায়ের কাছে সিঁড়িতে পা রেখে বসল। সমস্ত মাঠ শিউলি ফুলের গাছের ওপর নরম রোদ এখনও তিরতির করছে। চা-বাগানের বাচ্চারা বোধহয় সবাই বড় হয়ে গিয়েছে কারণ মাঠে মাঝে মাঝে চোরকাঁটা মাথা তুলছে। দেখলেই বোঝা যায় এই মাঠে নিয়মিত ফুটবল খেলা আর হয় না। আসাম রোড দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে হুসহাস।
হঠাৎ অমরনাথ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘গ্রাজুয়েশন করার পর কী করবে কিছু ভেবেছ?’
‘হ্যাঁ। আমি আই এ এস দেব।’
‘আই এ এস? মানে যা আগে আই সি এস ছিল?’
‘হ্যাঁ।’
‘মেয়েরা আই সি এস দিতে পারে?’
‘কেন পারবে না। আমি খবর নিয়েছি একজন বাঙালি মহিলা আই এ এস হয়েছেন। তিনি পারলে আমিই বা পারব না কেন?’
‘ওটা একদম পুরুষদের চাকরি। ডি এম, ডি সি তো ওদের মধ্যে থেকেই হয়। চব্বিশ ঘণ্টার চাকরি। কোথায় কী হল অমনি ছুটে যেতে হবে।’
‘আমার তাই ভাল লাগবে।’
অমরনাথ মাথা নাড়লেন, ‘হ্যাঁ, ওই চাকরিতে অবশ্য ক্ষমতা উপভোগ করতে পারবে। পাঁচজনে খুব মান্য করবে। আমাদের চা বাগানের বড় সাহেব একবার ডি এমের সঙ্গে দেখা করতে জলপাইগুড়ি গিয়েছিলেন। তিন ঘণ্টা বসে থেকেও দেখা পাননি। মিটিং করছিলেন ডি এমা’
অঞ্জলি পেছনে দাঁড়িয়েছিল। কথাগুলোর মানে বুঝতে চেষ্টা করছিল সে। এবার বলল, কীরকম মাইনে দেবে?
দীপা বলল, ‘ভালই।’
অমরনাথ বিরক্ত হলেন, ‘তুমি ফট করে মাইনের কথা জিজ্ঞাসা করলে। আরে চাকরিটা কী তা জানো? ভারতবর্ষের সেরা মেধাবী ছাত্ররা ওই পরীক্ষায় বসে। তারপর তাদের মধ্যে ওপরের দিকের কয়েকজনকে বেছে নিয়ে ইন্টারভিউ করে। তারও পরে অনেকদিন ধরে ট্রেনিং চলে। এত কাণ্ডের পর। যে-চাকরি দেওয়া হয় তাতে এই দেশটাকে শাসন করার ক্ষমতা পাওয়া যায়।’
‘ওদের খেয়েদেয়ে কাজ নেই তোমার মেয়েকে এমন চাকরি দেবে? ও কী জানে দেশের?’ অঞ্জলি কথা শেষ করে আর দাঁড়াল না।
অমরনাথ মুখ ঘুরিয়ে স্ত্রীর যাওয়া দেখলেন। তারপর বললেন, ‘তা এখনও তো অনেক দেরি আছে। ধীরে ধীরে তৈরি হও।’
দীপা বলল, ‘বাবা, তুমি অনেকক্ষণ কথা বলছ কিন্তু।’
অমরনাথ চুপ করে গেলেন। অনেকদিন এক নাগাড়ে এত কথা বলেননি তিনি। ফলে এর মধ্যে বেশ কাহিল লাগছিল যদিও মুখে কিছু বললেন না। চুপ করে যাওয়ার পর ঝিমুনি এল। এই মাঠ রাস্তা হঠাৎ হঠাৎ অস্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। তিনি তবু চুপ করে রইলেন। ধীরে ধীরে সবকিছু আবার ঠিক হয়ে গেল। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন তিনি। পায়ের কাছে বসে থেকেও দীপা এসবের কিছুই টের পেল না।
এইসময় অমরনাথের ছোট ছেলেকে আসাম রোড থেকে আসতে দেখা গেল। মাথায় বেশ লম্বা হয়ে গেছে। সিঁড়িতে দিদিকে বসে থাকতে দেখে রীতিমতো অবাক। দীপা চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘এখন ছুটি হল?’
সে হাঁটতে হাঁটতেই জবাব দিল, ‘হুঁ।’
‘দাদা কোথায়?’
‘জানি না।’ শব্দটা বলে ও ও-পাশ দিয়ে বাড়িতে ঢুকে গেল।
অমরনাথ দেখছিলেন, ছেলে চলে গেলে বললেন, এদের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে হয় না। মনে হয় দেওয়ালে ধাক্কা দিচ্ছি। আমার সঙ্গে মেলে না।’
দীপা চুপ করে গেল। ভাইদের সঙ্গে তারও কখনও গলায় গলায় ভাব জমেনি। কিন্তু একে দেখে মনে হল সে বাড়িতে আসায় একটুও খুশি হয়নি। বিকেল ফুরোচ্ছিল। আসাম রোডে সেজেগুজে কিছু মেয়ে দলবেঁধে বেড়াতে বেরিয়েছে। ললিতাদির কথা মনে পড়ল। ললিতাদি সেজেগুজে বারান্দায় বসে। থাকত। ললিতাদির বাড়িতে গেলে কেমন হয়? এখন তো শ্যামলদার বাড়ি মানে ললিতাদির বাড়ি।
হঠাৎ অমরনাথ বললেন, ‘আমার কয়েকটা ইচ্ছে আছে।’
দীপা বলল, ‘বলো।’
‘তুই যখন চাকরি করবি তখন তোর বাড়ির বারান্দায় এইভাবে বসে থাকব!’
‘একটা হল, আরগুলো?’
‘হুঁ। আমি মরলে কাউকে খাওয়াবি না।’
‘এটা আমার অধিকারে নেই।’ দীপা হাসল।
অমরনাথ আবার কথা বন্ধ করলেন। এইসময় মনোরমা এসে দাঁড়ালেন, ‘অমর, সন্ধে হয়ে আসছে। এবার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়। অনেকক্ষণ বসা হয়েছে।’
‘এখানে বসতে ভাল লাগছে মা।’
‘ওদিকে অঞ্জলি গজগজ করছে।’
দীপা বলল, ‘ঠাকুমা, তোমাকে একটা মোড়া এনে দেব?’
‘নাঃ। আমার খুব অম্বল হয়ে গিয়েছে। বসতে ভাল লাগছে না।’
মনোরমা আবার ঘরে ঢুকে গেলেন। এবার দীপা উঠে দাঁড়াল, ‘বাবা, তুমি আমার একটা কথা রাখবে? তুমি যদি রাজি হও তা হলে আমার খুব ভাল লাগবে।’
‘কথাটা কী?’
‘আগে কথা দাও।’
অমরনাথ হাসার চেষ্টা করলেন, ‘আচ্ছা, দিলাম।’
দীপা মুখ খুলতে গিয়েই থেমে গেল। বড় ভাই আসছে। এত অল্প বয়সেই গোঁফের রেখা গাঢ় হয়েছে। কাছে এসে দাড়িয়ে পড়ল, ‘কখন এলে?’
‘এই তো?’
‘হঠাৎ?’
‘হঠাৎ মানে?’
‘মা বলেছিল তুমি আর আমাদের বাড়িতে আসবে না।’
‘মা রেগে গিয়েছিল খুব।’ দীপা হাসার চেষ্টা করল।
‘কিন্তু বাবার অসুখ তোমার জন্যে হয়েছে।’ ছেলেটা কথা বলছিল খুব গম্ভীর গলায়। ভীষণ জেদি দেখাচ্ছিল ওকে।
এবার অমরনাথ জবাব দিলেন, ‘এই, ভেতরে যা। আমার সামনে দাঁড়িয়ে এসব কথা বলার স্পর্ধা হল কী করে তোর?’
‘যা সত্যি তাই বলছি।’
‘আবার কথা? চড়িয়ে তোর মুখ ভেঙে দেব হতভাগা। পড়াশুনার কোনও বালাই নেই, এই বয়সেই ট্যারাবাঁকা কথা বলছিস। দুর হ।’ অমরনাথ এত উত্তেজিত হয়ে উঠলেন যে তাঁর চোখ বিস্ফারিত হল। দীপা দ্রুত তাকে জড়িয়ে ধরল, ‘বাবা, কী করছ তুমি?শান্ত হও। এখন তোমার উত্তেজিত হওয়া একদম উচিত নয়।’ ছেলেটি চলে যাওয়ার পরেও অমরনাথ স্বাভাবিক হচ্ছিলেন না। তাঁর গলার স্বর ভেতরেও পৌঁছাচ্ছিল। মনোরমা এবং অঞ্জলি দৌড়ে বাইরে এলেন। মনোরমা জিজ্ঞাসা করলেন, কী হয়েছে? অমর ওভাবে চিৎকার করল কেন?’
অঞ্জলি বলল, ‘সর। আমাকে দে।’ প্রায় জোর করেই দীপাকে সরিয়ে দিয়ে সে অমরনাথের বুকে ম্যাসাজ করে দিতে লাগল। মনোরমা আবার প্রশ্নটা করলেন। জবাব দিতে একটুও ইচ্ছে করছিল না দীপার। সে ইশারায় মনোরমাকে বলল, ‘পরে বলব।’ মালিশ করে দেওয়ার পর অমরনাথ একটু শান্ত হলেন। অঞ্জলি বলল, বুকের শব্দ খুব বেড়ে গিয়েছে। মা, ওদের কাউকে বলুন তো ডাক্তারবাবুকে। ডেকে আনতে।
মনোরমা দ্রুত ভেতরে চলে গেলেন। আর তারপরেই ছোট ভাই মাঠের ভেতর দিয়ে ছুটে গেল। অঞ্জলি বলল, ‘ঘরে গিয়ে শুতে পারবে?’
অমরনাথ মাথা নাড়লেন, ‘না।’
এবার অঞ্জলি দীপার দিকে তাকাল, ‘তোকে বলেছিলাম ও যেন উত্তেজিত না হয়—!’
‘আমি কিছু করিনি মা।’
‘তা হলে এমন হল কেন?’
দীপা জবাব দিল না। দিলে যে কথাটা বলতে হয় তা অঞ্জলির ভাল লাগবে না।
অমরনাথ নিশ্বাস ফেললেন। তারপর দুর্বল গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কথাটা বল।’
অঞ্জলি ঝুঁকে দাড়াল, ‘কী কথা?’
অমরনাথ দীপার দিকে ইশারা করলেন। প্রথমে ধরতে পারেনি সে। তারপর খেয়াল হতে অস্বস্তিতে পড়ল। অঞ্জলি দীপাকে বলল, যা জিজ্ঞাসা করছেন তার জবাব দে। প্রশ্ন করে উত্তর না পেলে আবার উত্তেজিত হয়ে পড়বেন।’
দীপা দেখল অমরনাথ তার দিকে তাকিয়ে আছেন। সে এগিয়ে গিয়ে তাঁর হাত ধরল, ‘এমন কিছু ব্যাপার নয়। পরে বলব।’
‘পরে কেন? এরা আছে বলে সংকোচ কোরো না।’
মনোরমা বললেন, ‘বল না। কী এমন কথা যা আমাদের সামনে বলা যাবে না।’
দীপা বলল, ‘তুমি কিন্তু কথা দিয়েছ আমাকে।’
অমরনাথ হেসে ঘাড় নাড়লেন। দীপা বলল, দ্যাখো, আমার তো আর মোটে দুই-আড়াই বছর ব্যাঙ্কের টাকাটার ওপর নির্ভর করতে হবে। তার মধ্যে নিশ্চয়ই চাকরি পেয়ে যাব। এই কটা বছর চালাতে হাজার পাঁচ-ছয় টাকা হলেই চলবে। তাই আমার ইচ্ছে, ব্যাঙ্কে যে-টাকা রয়েছে তা থেকে ওই টাকাটা কলকাতার ওদের কোনও ব্রাঞ্চে ট্রান্সফার করে নিয়ে যাই। বাকি চল্লিশ হাজার তুলে মায়ের হাতে দিই যাতে তোমার পুরোপুরি সুস্থ হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসা বা সংসারের কোনও অসুবিধে না হয়।’
অমরনাথ কিছু বলার আগেই মনোরমা বললেন, ‘বাঃ, এ তো খুব ভাল কথা। অঞ্জলি পাথরের মতো দাড়িয়ে রইল মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে। অমরনাথ জিজ্ঞাসা করলেন, যদি ওই সময়ের মধ্যে চাকরি না পাও?
‘পাব।’
‘তখন কেউ তোমার দিকে সাহায্যের হাত বাড়াবে না।’
‘এ কী বলছ?’ অঞ্জলি প্রতিবাদ করল, আমরা থাকতে ও কি জলে ভেসে যাবে।’
‘আমার ভাল লাগছে না। তবে কথা আদায় করে নিয়েছ যখন তখন তাই হবে। ব্যাঙ্কের চেকবই আননা। আমি এখনই সই করে দিচ্ছি। তোমার ভাই আমি বেঁচে থাকতেই তোমাকে দায়ী করছে, মরে। গেলে কী হেনস্থা করবে কে জানে।’
সন্ধের পরে হ্যারিকেনের আলোয় জলপাইগুড়ির ব্যাঙ্ক ম্যানেজারকে নির্দেশ দিয়ে ইংরেজিতে একটা চিঠি লিখে অমরনাথকে পড়ে শোনাল দীপা। তিনি মাথা নাড়লেন। বিছানায় বসে চিঠিটাকে হাতে তুলে নিয়ে একবার দেখে সই করে দিলেন। চেকে আগেই সই করা ছিল। দীপাব মন এবার হালকা হল।
বিকেলবেলায় ডাক্তারবাবু এসে অমরনাথকে দেখে বলে গেছেন, ‘কোনও ভয় নেই। মেয়ে এসে। গিয়েছে, এবার ওষুধের চেয়ে বেশি কাজ হবে। রাত্রে যাতে ভাল ঘুম হয় তার ওষুধ অবশ্য দিয়ে গিয়েছেন। দীপা যখন এগিয়ে দিতে গিয়েছিল তখন বলেছিলেন, ‘প্রেশারটা আজ বেশি দেখলাম। হার্টবিটও নর্মাল নয়। একদম কথা বলতে দিয়ো না।’
‘একটা চিঠি সই করাতে পারি?’
‘তা পারো। কীসের চিঠি?’
‘ব্যাঙ্কের ম্যানেজারকে লিখতে হবে।’
‘শুধু সই করাবে, তার বেশি কিছু নয়। ডাক্তারবাবু জানিয়েছিলেন। চিঠিটা চেকের সঙ্গে ভাঁজ করে দীপা উঠে পড়ছিল, অমরনাথ ইশারা করলেন, দীপা দাড়াল। অমরনাথ বললেন, ‘তোমাকে একটা কথা বলি, পৃথিবীতে কোনও সম্পর্ক কখনই অটুট থাকে না। নিজেরটা বুঝে নেবে সবার আগে। তেমন ছেলে পেলে তুমি আবার সংসারী হবে, এ আমার আদেশ।’
অঞ্জলি বকুনি দিল, ‘থাক! এসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না!
সকালে ঘুম থেকে উঠে মনোরর পাশ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল দীপা। এখনও দিন ফোটেনি। খালি পায়ে উঠোনে হাঁটতে খুব ভাল লাগছিল। টিনের দরজা খুলে মাঠে পা দিতে চেনা গন্ধটা পেল।। ঘাস সাদা করে শিউলিফুল ঝরেছে পুজোর আগেই। সেই ছেলেবেলার মতো একছুটে গাছতলায় পৌছে গেল সে। তাজা শিশিরমাখা শিউলিগুলো কীরকম আদুরে। উবু হয়ে কয়েকটা তুলে নিতে গিয়েই ছবিটা ভেসে উঠল। মালবাবুর বাড়িতে আসা ছেলেটা এইরকম একটা সময়ে তাকে বলেছিল সুচিত্রা সেনের মতো দেখতে। খুব রাগ হয়ে গিয়েছিল সেদিন। আজ কিন্তু অসীমের কথা মনে পড়ল। সত্যি ভাল। নইলে তাকে পৌছে দিতে ও এত দূরে আসত না। শিলিগুড়িতে অসীম এখন কী করছে? হঠাৎ অসীমের জন্যে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। এমনকী শিউলির গন্ধ সেই খারাপ লাগাটাকে বাড়িয়ে দিল। আজ সকালে জলপাইগুড়িতে যাবে সে। ব্যাঙ্কের ম্যানেজারকে চিঠি দিয়ে টাকার ব্যবস্থা। করতে। জলপাইগুড়ি থেকে শিলিগুড়ি তো মাত্র একঘণ্টার রাস্তা। বুকের মধ্যে একটা ইচ্ছে টলটল। করতে লাগল দীপার।
গত রাত্রে কথা হয়েছিল অঞ্জলি দীপার সঙ্গে জলপাইগুড়িতে যাবে। অত টাকা একা নিয়ে আসা ঠিক হবে না। অঞ্জলির ইচ্ছে টাকাটা চা বাগানের পোস্টঅফিসে রেখে দেবে। তুলতে অসুবিধে হবে না। কিন্তু সকালে উঠে অঞ্জলি জানাল তার শরীর খারাপ। অতএব মনোরমা সঙ্গে এলেন। কলকাতা থেকে ঘুরে এসে মনোরমা এখন বেশ চটপটে হয়েছেন। মনোরমাকে নিয়ে শিলিগুড়িতে অসীমের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। ভাল লাগছিল না একটুও।
ব্যাঙ্কে যখন পৌছাল তখন এগারোটা। সেই ম্যানেজার এখনও বদলি হননি। চিঠিটা পড়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এত টাকা নিয়ে যেতে পারবেন?
দীপা জানতে চাইল, ‘আর কোনও উপায় আছে?’
‘কয়েকটা ইনস্টলমেন্টে নিতে পারেন।’
‘বারবার আসা সম্ভব হবে না।’
‘তা হলে দশ হাজার টাকা ক্যাশ দিচ্ছি, বাকিটা ভ্রাক্ট নিয়ে যান। পপাস্ট অফিসে অ্যাকাউন্ট খুলে জমা দিয়ে দেবেন। অবশ্য এর জন্যে আমাদের নোটিশ দেওয়া দরকার। দেখি, কী করতে পারি।’
দশ হাজার টাকা আর ড্রাফট নিয়ে ওরা যখন ব্যাঙ্ক থেকে বের হল তখন বেলা একটা। রিকশায় উঠতে উঠতে মনোরমা বললেন, ‘হ্যাঁরে, প্রতুলবাবুর বাড়িটা কোনদিকে?’
বিরক্ত হল দীপা, ‘কেন?’
‘তুই জানিস না?’
‘কী জানব?’
‘কোর্ট থেকে কীসব কাগজপত্র এসেছিল তোর নামে।’
‘কীসের কাগজ?’
‘জানি না বাবা। শুনছিলাম প্রতুলবাবুর বিষয়সম্পত্তি নিয়ে। আমাকে তো আজকাল তোর মা কিছু খুলে বলে না।’
মাথা গরম, কান ভোঁ ভোঁ করতে লাগল। অমরনাথ তো এসব কথা একবারও বলেননি। অঞ্জলিও না। অমরনাথ অসুস্থ কিন্তু এত কথার মধ্যে এটা বলতে অসুবিধে ছিল কোথায়? কীভাবে কথাটা তুলবে। ভেবে পাচ্ছিল না সে।
কোয়ার্টার্সের সামনে বাস থেকে নামতেই অবাক হয়ে গেল ওরা। বাড়ির সামনে অনেক লোক। মনোরমা শিউরে উঠলেন, ‘কী হল?’
কয়েক পা বাড়াতে উত্তরটা পেতে অসুবিধে হল না। অঞ্জলির বুক ফাটা বিলাপ কানে আসতেই মনোরমা টলতে লাগলেন। দু’হাতে তাকে জড়িয়ে ধরল দীপা।
