৩৭. তিনতলার ব্যালকনি
তিনতলার ব্যালকনির একেবারে শেষ টেবিলটা খালি পেয়ে গিয়েছিল অসীম। সরু একফালি প্যাসেজের মতো জায়গায় পরপর টেবিল পাতায় যে ফ্যানটির দরকার হয়েছে তার অবস্থান ওই টেবিলের শেষে। ফলে ঝড়ের মতো হাওয়ায় দীপার চুল উড়িয়ে দিচ্ছিল বারেবার। নাজেহাল হয়ে সে বলল, ‘আমি এদিকে মুখ করে বসব।’
ওরা চেয়ার বদল করল। টেবিলে টেবিলে ছেলেমেয়েদের কথা বলার শব্দ এক হয়ে সামদ্রিক গর্জনের মতো শোনাচ্ছে। বাঁদিকে তাকাতেই পুরো দোতলার মেঝে জুড়ে থাকা টেবিলগুলো এবং মানুষের মাথা দেখা যাচ্ছে। দীপা দেখল অনেকেই চোখ তুলে তাদের দিকে, তার দিকে তাকিয়ে আছে। খাবারের অর্ডার দিয়ে অসীম একটু ঝুঁকে এল। এখন হাওয়ার ঝাপটা সরাসরি লাগছে তার। মুখে, দীপার পেছন থেকে ওটা আসায় সে দু’হাতে কানের পাশের চুল চেপে রইল। একটু অসুবিধে হলেও আরাম লাগছে এভাবে বসতে। অসীম জিজ্ঞাসা করল, ‘তারপর?’
‘তুমি আমাকে তোমার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে ব্যস্ত হচ্ছ কেন?’
‘দেখাতে।’
‘মানে?’
‘আমার বন্ধু কীরকম স্বভাবের, তার চেহারা কীরকম—’
‘বি সিরিয়াস অসীম!’
‘আমি তো সিরিয়াস হয়েই আছি।’
‘দেখিয়ে কী লাভ হবে?’
অসীম সোজা হল, ‘কী ব্যাপার বলো তো? গ্লোরিয়ার মৃত্যু তোমাকে বদলে দিয়ে গেল নাকি? এবার তোমাকে বুঝতে পারছি না।’
‘তবে! দ্যাখো। এখনই বুঝতে পারছ না!’
‘বুঝতে চাই।’
দীপা চট করে সিদ্ধান্ত নিল। সে বলল, ‘অসীম, তোমাকে আমার খুব ভাল বন্ধু বলে মনে হয়। তুমি কখনও মুখে বললানি সরাসরি, তুমি আমাকে চাও?’
অসীম কোনও কথা না বলে মাথা দোলাল, সে চায়।
‘কীভাবে?’
‘আশ্চর্য! যেভাবে পুরুষ নারীকে চায়। স্ত্রী হিসেবে।’
‘কবে?’
‘আর বছর তিন-চার অপেক্ষা করতে হবে। আমাদের পড়াশুনা শেষ হলেই।’
‘শেষ হবার পর যদি আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল না হয়?’
‘বোকার মতো কথা বোলো না। এ-দেশে বেকারের সংখ্যা যতই বাড়ুক দু’জনে একসঙ্গে ভেসে বেড়াব না। তুমি কল্পনা করতে পারো আমি পড়াশুনা শেষ করে না খেয়ে মরছি!’
দীপা হাসল, ‘বালাই ষাট! তা কি ভাবতে পারি!’
‘তোমার ব্যাপারটা কী বলো তো?’
অসীমের প্রশ্নের জবাব দেবার আগেই বেয়াবা মোগলাই পরোটা নিয়ে এল। নুন মরিচ ছড়িয়ে তার একটা ছোট টুকরো মুখে ফেলে দীপা জবাব দেয়, খুব খিদে পেয়েছে। আগে খেয়ে নিই, তারপর বলছি। এই যে আমি তোমার সঙ্গে বসে খোলা রেস্টুরেন্টে মোগলাই পরোটা খাচ্ছি তা চা-বাগান দূরের কথা জলপাইগুড়ি শহরেও ভাবতে পারতাম না।
‘তুমি যখন ওখানে নেই ভাবার কী দরকার?’
দীপা জবাব দিল না। চুপচাপ খাওয়া শেষ করল। জল খেল। তারপর বলল, ‘অসীম, তুমি জানো, আমি আই এ এস-এ বসব।’
‘বসলেই যে তুমি সুযোগ পাবে তার কী স্থিরতা আছে? এখন পর্যন্ত ক’টা মেয়ে আই এ এস-এ সুযোগ পেয়েছে?’
‘পেয়েছে। তুমি খবরের কাগজ পড়োনি?’
‘হ্যাঁ একজন। নামটা ভুলে গিয়েছি।’
‘রমা মজুমদার।’
‘কিন্তু তুমি নিজে কী করে নিশ্চিত হলে যে পাবে।’
‘আমি আর হারতে রাজি নই।’
‘তার মানে?’
‘আমি জীবনের শুরুতে ভাগ্যের কাছে বড়রকম হেরে গিয়েছিলাম অসীম। সেই হারের পর আমার মাস্টারমশাইয়ের কথাই একমাত্র আদর্শ, আমাকে ভাগ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে জিততে হবে, কখ্খনও পেছন ফিরে তাকাব না।’
‘আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি না!’
‘তোমাকে কীভাবে বলি?’
‘সহজভাবে। যেভাবে মানুষ কথা বলে!’
দীপা চোখ তুলে তাকাল, ‘আমার মা মারা গিয়েছিলেন আমি জন্মানোমাত্র। মানুষ হয়েছি মাসি এবং মেসোমশাইয়ের কাছে। তাঁদেরই মা-বাবা বলতাম এতদিন। আমার নিজের বাবাকে আমি কখনও চোখে দেখিনি।’
‘হুঁ। তুমি কি এর জন্যে দুঃখিত?’
‘একদম না।’
‘তা হলে আমারও কিছু এসে যায় না।’
দীপা কিছুক্ষণ অসীমের দিকে তাকাল। অসীম চোখ সরাল না। দীপা খুব নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমাদের বাড়িতে কোনও বিধবা মহিলা আছেন?’
অসীম ঝুঁকে এল, ‘হাওয়ায় শুনতে পেলাম না, জোরে বলো।’
দীপা প্রশ্নটা আবার উচ্চারণ করল। অসীম মাথা নাড়ল, ‘আছেন! পিসিমা!’
‘তিনি কি মাছ মাংস ডিম খান? রঙিন শাড়ি পরেন?’
‘মাথা খারাপ!’
‘কার?’
‘মানে, এ-দেশের বিধবাদের ওসব বললে তারা পাগল হয়ে যাবে।’
‘আমি তোমার রহস্য বুঝতে পারছি না। এমন সব প্রশ্ন করছ কেন?’
‘তোমার পিসিমা যদি পাগল না হয়ে যান?’
‘দ্যাখো, ছেলেবেলা থেকেই আমি তাকে ওইভাবে দেখতে অভ্যস্ত। অন্য কোনও ছবি আমি ভাবিনি।’ অসীম বলল।
‘ভাবোনি কেন?’
‘স্রেফ অভ্যেস।’
‘ধরো, তিনি যদি ওইসব নিয়ম যা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল তা আর না মানেন? তুমি কি মানতে পারবে?’
‘পিসিমার ব্যাপারের সঙ্গে তুমি আমি কীভাবে জড়িত হচ্ছি?’
‘আমার প্রশ্নের জবাব দাও আগে, বলছি।’
অসীম চোখ বন্ধ করল, করে হেসে ফেলল, ‘সত্যি কথা হল, মানতে পারছি না বললে নিজের কাছে নিজে ছোট হয়ে যাব আবার উলটোটা ভাবতে স্বস্তি পাচ্ছি না।’
দীপা খুব খুশি হল। অসীম এভাবে সত্যি কথা বলবে সে আশা করেনি। সে ঠিক করে নিল, অকপট হওয়াই এ ক্ষেত্রে উচিত কাজ হবে। এইসময় কফি এল। বেয়ারা ব্যবহৃত প্লেটগুলো তুলে নিয়ে গেল। কফির গরম কাপ টেনে নিয়ে দীপা বলল, চা-বাগানের বাড়িতে আমরা কখনও কফি খাইনি।’
অসীম বলল, ‘কফি বাগানের লোকেরাও চা খেতে উৎসাহী নয়, হয়তো।’
দীপা হাসল, একটু মাথা ঝাঁকাল, তারপর বলল, ‘জানো অসীম, আমি যখন ছোট, সেই এগারো-বারো বছর বয়েসে, যাঁদের আমি মা-বাবা-ঠাকুমা বলতাম তাঁরা আমার ভালর জন্যে খুব বড়লোকের একমাত্র ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন।’ খুব সহজ গলায় কথাগুলো উচ্চারণ করল। সে।
অসীম কফিতে চুমুক দিতে গিয়ে যেন ছ্যাঁকা খেল। চট করে সোজা হয়ে বসল সে। তার দুই চোখে মুখে বিস্ময় ঠিকরে বেরুচ্ছে। কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না অসীম। যেন তার নিশ্বাসও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। দীপা দেখল টেবিলে রাখা হাত কাঁপছে। সে আবার কথা শুরু করল, ‘বিয়ে হয়েছিল। চা-বাগান থেকে আমায় নিয়ে আসা হল জলপাইগুড়ি শহরে। দুটো দিন একটা রাত কাটল কালরাত্রি আর নিয়মকানুন মেনে। ওই বয়সের আমার বোধ-বুদ্ধির কথা নিশ্চয়ই অনুমান করছ। তারপর এল ফুলশয্যা। যার সঙ্গে আমার বিয়ে দেওয়া হয়েছিল তার শরীরে অল্পবয়সেই মৃত্যু বাসা বেঁধেছিল। তাকে দিয়ে কোনওমতে একটি সন্তান উৎপাদন করে নিতে পারলেই বংশরক্ষা হয় এমন চিন্তা ছিল—।’
হঠাৎ কানে হাত দিয়ে চাপা গলায় চিৎকার করে উঠল অসীম, ‘আঃ, আর আমার শুনতে ভাল লাগছে না, প্লিজ!’
‘না। শুনতে তোমাকে হবেই।’ দীপা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল, ‘একটা বীভৎস রাতের স্মৃতি আমার জন্যে রেখে ছেলেটি সকালবেলায় হাসপাতালে গেল। না, তার শরীরে এমন শক্তি ছিল না যা দিয়ে সে তার বাবার ইচ্ছে পূর্ণ করে। এখনও চোখ বন্ধ করলে একটি ক্লীব পুরুষের গোঙানি শুনতে পাই, সমস্ত শরীর ঘিনঘিন করে ওঠে। আমি কুমারী অবস্থায় পালিয়ে এসেছিলাম চা বাগানে আর আমার স্বামী মারা গিয়েছিল সেই দিনই, হাসপাতালে। আমি বিধবা হলাম বিয়ের বাহাত্তর ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই। প্রথমদিকে বিধবার যা যা করণীয় তাই আমাকে করতে বাধ্য করা হয়েছিল। সে এক ভয়ংকর জীবন!’
‘কারা বাধ্য করেছিল?’
‘আমার হিতাকাঙক্ষীরা।’ দীপা হাসল, ‘মজার কথা হল, শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করেছিলাম আমি। কিন্তু এই সমাজ আমাকে বিধবা বলে যাবে আমৃত্যু। শ্বশুরবাড়ির কেউ আজ বেঁচে নেই, আমার কারও কাছে কোনও দায় নেই—।’ এই অবধি বলে থেমে গেল আচমকা দীপা।
‘থামলে যে?’
‘দায় নেই কথাটা সত্যি নয় অসীম। অন্তত একজন মহিলার কাছে আমি দায়গ্রস্ত। যাঁকে আমি ঠাকুমা বলি, যাঁর পাশে শুয়ে শৈশব, বাল্যকাল এবং কৈশোর কাটিয়েছি।’
অসীম কীভাবে বলবে প্রথম বুঝতে পারছিল না। শেষপর্যন্ত সে বলতে পারল, ‘দীপাবলী, তুমি চমৎকার একটা গল্প শোনালে!’
‘গল্প?’ হতভম্ব দীপা।
‘নয়তো কী? তোমার মতো স্মার্ট পরিষ্কার মনের মেয়ের জীবনে এমন ঘটনা ঘটতেই পারে না। যদি ঘটত তা হলে তুমি এখানে পৌঁছোতেই পারতে না। আসল কথা হল, এসব বলে তুমি আমায় পরীক্ষা করছ! তাই তো?’
দীপা অপলক তাকাল, ‘যদি করি?’
‘তা হলে জেনো আমি বিশ্বাস করছি না।’
দীপা বলল, ‘অসীম, কাউন্টারে গিয়ে এসবের বিল দেওয়া যায় না।’
অবাক হল অসীম, ‘কেন যাবে না? কিন্তু একথা বলছ কেন?’
‘আমি উঠব। আমার শরীর ভাল লাগছে না।’
‘কী হল তোমার?’
‘বললাম তো, শরীর ভাল লাগছে না।’
‘হঠাৎ?’
‘হঠাৎই।’
‘আমি কি কিছু খারাপ বললাম?’
‘না। তুমি যা স্বাভাবিক তাই বলেছ। চলো।’ দীপা উঠে দাড়াল। সে কফি স্পর্শ করেনি। অসীম আর একবার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে হাল ছাড়ল। প্যাসেজ পেরিয়ে দীপা সোজা চলে গেল কাউন্টারে। তার পেছনে জোরে পা ফেলে অসীম বলল, ‘তুমি দিচ্ছ কেন? প্লিজ!’
দীপা মাথা নাড়ল, ‘না, আজ আমাকে দিতে দাও।’
দাম মিটিয়ে সিঁড়ি ভেঙে নামার সময় অসীমের দিকে তাকিয়ে দীপা বলল, ‘জানো, আমি একটা বিরাট ঋণের বোঝা বয়ে চলেছি। এখন পর্যন্ত যা খরচ করছি তা ওই ঋণ থেকেই নেওয়া। এ সবই আমাকে শোধ করতে হবে।’
‘কীসের ঋণ? তুমি কার কাছ থেকে টাকা ধার করেছ?’
‘টাকা তো বটেই। আরও অনেক, অনেক ঋণ?’
‘কী হেঁয়ালি করছ বলো তো, আমি তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।’
জবাব না দিয়ে নীচে নেমে এল দীপা, তারপর ঘুরে দাঁড়াল, ‘অসীম, এবার আমি যাই। বন্ধু হিসেবে তুমি খুব ভাল, খুব।’
‘বেশ। চলে যেতে চাইলে তুমি যাবে। কিন্তু আমার ভুলটা বলে যাও।’
‘তোমার কোনও ভুল নেই।’
‘না। তুমি আমায় একটা গল্প বললে। আমি জানি নিজেকে তুমি অনেক বেশি মূল্যবান বলে মনে করো। আই এ এস দেবে, জীবনের অনেক সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠবে; আমার মতো একটি সাধারণ ছেলের ভালবাসায় আটকে থাকতে তুমি চাও না। কিন্তু এই ভাবনাটা মুখ ফুটে বলোনি কেন এতদিন? কেন আমাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্যে একটা মিথ্যে গল্প সাজাতে হল?’
অসীমের গলার স্বর এতটা উঁচুতে উঠেছিল যে পাশ দিয়ে যাওয়া কয়েকজন দাঁড়িয়ে পড়ল। দীপা কী করবে বুঝতে পারছিল না। অসীমকে খুব ক্ষিপ্ত দেখাচ্ছে। যে-কেউ বুঝবে খুব গোলমাল হয়েছে। সে শুধু বলতে পারল, ‘তুমি ভালভাবে কথা বলে অসীম। আমি কোনও গল্প শোনাইনি।’
‘আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না।’
‘হঠাৎ?’
‘এটা বানানো গল্প।’
‘খামোকা তোমাকে বলতে যাব কেন? আচ্ছা! তুমি আমার সঙ্গে হস্টেলে চলো। প্রমাণ পেয়ে যাবে সেখানে।’
‘কীসের প্রমাণ?’ অসীম নড়ছিল না। দীপা দেখল ভিড় বাড়ছে। এখানে দাঁড়িয়ে থাকা আর উচিত হবে না। সে কথা না বলে হাঁটতে শুরু করল। এইসময় পেছন থেকে হাসি ভেসে এল। যারা কৌতুহলী ছিল তারা হাসছে এখন। রাগ অপমান আচমকা অসহায় করে তুলল দীপাকে। ট্রামে ওঠার কথা খেয়ালে এল না। এবং তখন অসীম ওর পাশে চলে এল, ‘এভাবে চলে যাচ্ছ যে!’
‘তুমি আমাকে ছেড়ে দাও অসীম, প্লিজ লিভ মি। আমি একা থাকতে চাই।’
‘কেন?’
‘তুমি হাসিগুলো শোনোনি? এভাবে আমাকে অপমান নাই বা করলে।’
‘অদ্ভুত! আমি তোমাকে অপমান করলাম?’ অসীমের গলা ভাঙল, ‘তুমি আমাকে এড়িয়ে যেতে চাইছ না?’
‘এখন চাইছি। কারণ আমি বিধবা এটা তুমি মানতে পারছ না।’
অসীম খুব অসহায় হয়ে পড়ল। দীপার চেহারায় বিবাহিতা মেয়ের কোনও চিহ্ন নেই। বিবাহিতা মেয়েদের শরীরে যে পরিবর্তন আসে তা নিয়ে বন্ধুবান্ধবরা নানান গল্প করে থাকে। কলেজে যে-কোনও বিবাহিতা মেয়ের সঙ্গে কুমারী মেয়ের প্রভেদ সাদা চোখে বোঝা যায়। সে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি মানতে পারছি না। তোমার আচরণ কথাবার্তায় সেটা কখনও বোঝা যায়নি বলেই আচমকা শুনে মানা যে-কোনও মানুষের পক্ষেই অসম্ভব।’
‘বাঃ, আমি তোমাকে বানিয়ে গল্প বলব?’
অসীম জবাব দিল না। ওরা হাঁটছিল। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর অসীম জিজ্ঞাসা করল, ‘হস্টেলে গেলে তুমি আমাকে কী দেখাবে?’
‘হস্টেলের খাতায় আমার বাবার উপাধি মুখার্জি দেখতে পাবে।’
‘সেটা অসম্ভব নয়। তিনি তোমার নিজের বাবা ছিলেন না।’
হকচকিয়ে গেল দীপা। কখনও ব্যাপারটা তার মাথায় আসেনি।
অসীম হাসল, ‘তুমি বরং অন্য কোনও জোরদার কিছু প্রমাণ হিসেবে দাও যা আমি বিশ্বাস করতে পারি। ধরো, বিয়ের কার্ড, ওইসময় ভোলা ছবিটবি—।’
দীপা মাথা নাড়ল, ‘যে-ব্যাপারটা ভুলে যেতে চেয়েছি প্রাণপণে, তার স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে বেড়াব এমন ভাবছ কী করে? আর এরপর, বিশ্বাস করো অসীম, প্রমাণ দিয়ে সম্পর্ক জিইয়ে রাখার কোনও ইচ্ছে আমার নেই। দেখা হলে কথা বলব, বন্ধু না হোক পরিচিতের সঙ্গেও তো লোকে কথা বলে। চলি।’
দীপা পা চালাল। ওর কেবলই মনে হচ্ছিল অসীম তার পেছনে আসছে। দূরত্ব বাড়াবার জন্যে সে জোরে পা চালাল। না, সে কোনওভাবে অসীমকে দোষী করতে পারছে না। একটা ভাললাগা তৈরি হয়েছিল। অসীম সেটাকে ইতিমধ্যে ভালবাসায় নিয়ে গিয়েছিল, প্রায় নিঃশব্দে সে ব্যাপারটাকে মেনে নিতে বলেছিল। ওরা কখনও মুখ ফুটে উচ্চারণ করেনি ভালবাসি কিন্তু সেটা ব্যবহারে অপ্রকট তো ছিল না। এই অবস্থায় অসীমের ধারণা তো খুব স্বাভাবিকভাবে তৈরি হতে পারে সে আর পাঁচটা মেয়ের মতো স্বাভাবিক, অবিবাহিতা।
কিন্তু এই ভাল হল। বিদ্যাসাগর মশাইয়ের কথা ছেড়ে দেওয়া যাক, স্বয়ং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর চাননি তাঁর পরিবারের বিধবা বউয়ের পুনর্বিবাহ হোক। সেই মানসিকতা আজও অসীম ও অসীমদের মতো প্রগতিবানরা যদি বয়ে বেড়ায় তা হলে কিছু করার নেই। গত আশি বছরে কবে কে কোথায় বিধবা বিবাহ করেছিল বলে আজ দেশে সেটাই স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়াবে এমন আশা করা বোকামি। বরং একটা গভীর খাদের একদম কিনারা থেকে ফিরে আসতে পারল বলে অসীমকে ধন্যবাদ দেবে সে। নিজের সঙ্গে এইসব কথা বলতে বলতে সে হেদুয়ায় চলে এল। এখন বিছানা টানছে তাকে। নিজের বিছানায় উপুড় হয়ে অনেকক্ষণ শুয়ে থাকতে পারলে আর কিছু চায় না। না, সে পেছন ফিরে তাকাবে না, কিছুতেই না।
হস্টেলের গেটের কাছে পৌছে সে থমকে দাঁড়াল। উলটো ফুটপাথ থেকে কেউ তাকে চেঁচিয়ে ডাকছে। দীপা অনেক কষ্টে মুখ ফেরাল। তার কষ্ট হচ্ছে কেন, কেন শরীর এমন ভারী হয়ে যাচ্ছে, এই চিন্তায় ফেরার অবকাশ পেল না। সে দেখতে পেল সুভাষচন্দ্র তাকে হাত উঁচিয়ে দাঁড়াতে বলছেন।
সুভাষচন্দ্র ওখানে দাঁড়িয়ে কেন? ওঁর পাশে একজন মাঝবয়সি মহিলা। ইদানীং খোঁজখবর করা সুভাষচন্দ্র একদম ছেড়েই দিয়েছেন। ট্রাম-বাস দেখে রাস্তা পেরিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি, ‘অনেকক্ষণ এসেছি; কোথায় গিয়েছিলি, শুনলাম কে খুন হয়েছে বলে নাকি আজ কলেজ বন্ধ ছিল।’
‘হ্যাঁ। একটু দরকারে বেরিয়েছিলাম।’
‘হুটহাট কলকাতা শহরে বেরুনো ঠিক নয়। লোকে বাঙাল ভাববে।’
‘বাঙাল?’।
‘হ্যাঁ, পাকিস্তান থেকে আসা রিফিউজি। এ-দেশের মেয়েরা অমন হুটহাট বের হয় না?’
প্রচণ্ড রাগ হয়ে গেল দীপার। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই সুভাষচন্দ্র গলা নামিয়ে নিচু স্বরে বললেন, ‘তোর হস্টেলের গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে গিয়েছিল। পুলিশে পুলিশে থিকথিক করছে। দারোয়ান বলল যে মেয়েটা খুন হয়েছে সে নাকি তোর ঘরেই থাকত। দেখিস, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা।’
ভাবনাটা এক লহমায় ঘুরে গেল। পুলিশ হস্টেলে এসেছে তদন্ত করতে? কিন্তু বাইরে কোনও গাড়ি দেখতে পাচ্ছে না তো? ওরা নিশ্চয়ই জেরা করবে তাকে। করলে ক্ষতি কী! গ্লোবিয়ার সম্পর্কে সে যা জানে বলে দেবে। সুভাষচন্দ্র বললেন, ‘তোর সঙ্গে খুব জরুরি কিছু কথা ছিল। কোথায় বসে বলা যায় বল তো?’
‘গেস্টরুমে আসুন।’
‘দুর! পুলিশের সামনে কথা বলব কী করে?’ বলতে বলতে সুভাষচন্দ্র মুখ তুললেন, ‘কিছু চাই ভাই? অনেকক্ষণ থেকে দেখছি দাড়িয়ে আছ?’
দীপা মুখ ফেরাতেই অসীমকে দেখতে পেল। অসীম সেখানে দাঁড়িয়েই হাসল, ‘হ্যাঁ, দীপাবলীর সঙ্গে একটু কথা আছে!’
সুভাষচন্দ্র দীপাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘চিনিস নাকি?”
‘হ্যাঁ। কলেজে পড়ে।’
‘নে, কী কথা বলবে বলছে সেরে নে, তারপর আমরা বলব।’
দীপা কিছু বলার আগেই অসীম মাথা নাড়ল, ‘না না, আমার সময় লাগবে। আপনারাই বরং শেষ করে নিন।’
সুভাষচন্দ্র গম্ভীর হয়ে গেলেন, ‘দিস ইজ নট গুড। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলা তোর বাবাও, মানে অমরনাথ মুখুজ্যেও পছন্দ করত না।’
দীপা ঘুরে দাড়াল, ‘অসীম, আর কি কোনও জরুরি কথা থাকতে পারে?’
অসীম নির্দ্বিধায় মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ।’
দীপা কী করবে বুঝে উঠল না। সেইসময় দারোয়ান গেট থেকে বেরিয়ে এল। দীপাকে দেখতে পেয়ে সে তড়বড় করে বলে উঠল, ‘আরে দিদি, পুলিশ আপনাকে খুঁজতেছিল।’
দীপা সুভাষচন্দ্রকে বলল, ‘আপনারা গেস্টরুমে এসে বসুন। আমি আসছি।’
সে সোজা গেট পেরিয়ে ঢুকে পড়ল। থিকথিক করা পুলিশ নজরে এল না। সুপারের ঘরে দু’জন পুলিশ অফিসার বসে আছেন। তাকে দেখতে পেয়ে সুপার বললেন, ‘এই যে, তুমি এসে গিয়েছ! এঁরা তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চান। এর নাম দীপাবলী বন্দ্যোপাধ্যায়।’
দীপা তৃতীয় চেয়ারটিতে বসতেই একজন অফিসার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি আর গ্লোরিয়া একই ঘরে থাকতেন?’
‘হ্যাঁ।’ দীপা মাথা নাড়ল।
‘ও কেন বর্ধমানে গিয়েছিল জানেন?’
‘না। আমি জানতাম ও শান্তিনিকেতনে গিয়েছে।’
‘হুম! মেয়ে হিসেবে ও কেমন ছিল?’
‘ভাল।’
‘কীরকম ভাল। বাঙালিদের মতো স্বভাব ছিল না নিশ্চয়ই।’
‘বাঙালিদের স্বভাব বলতে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?’
প্রশ্নটা শশানামাত্র দুই অফিসার নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করে নিলেন। এবার দ্বিতীয়জন প্রশ্ন করলেন, ‘গ্লোরিয়াকে কেন খুন করা হল এ-ব্যাপারে কোনও সূত্র দিতে পারেন?’
‘আমি জানি না।’
‘ও মদ সিগারেট খেত? পুরুষবন্ধুদের সঙ্গে ঘুরত।’
‘মদ খেত না। সিগারেট খেতে দেখেছি। ওর দেশের কিছু ছেলের সঙ্গে নিশ্চয়ই ওর বন্ধুত্ব ছিল। তাদের কারও সঙ্গে ওর সম্পর্ক কিছুদিন আগে ভেঙে গিয়েছিল।’
কীরকম সম্পর্ক?
‘মনে হয় তাকে গ্লোরিয়া ভালবাসত।’
‘গুড। কী নাম তার?’
‘আমি জানি না।’
‘কেন?’
‘ও আমাকে বলেনি, আর কারও ব্যক্তিগত ব্যাপারে প্রশ্ন করতে চাইনি।’
‘হুম। মেয়ে হিসেবে সে কেমন ছিল?’
‘ভাল। প্রথম প্রথম ভাষা এবং অভ্যেসগুলো আলাদা বলে কিছু অসুবিধে হত আমার। কিন্তু পরে মনে হয়েছে ও খুব সোজা ধরনের মেয়ে।’
‘কোনও দুষ্টচক্রের সঙ্গে তার সংযোগ ছিল বলে মনে হয়?’
‘না। থাকলেও আমি জানি না।’
‘গ্লোরিয়াকে আপনি এখানে এসে প্রথম দ্যাখেন?’
‘হ্যাঁ। আমি জলপাইগুড়ির মেয়ে আর ও জাম্বিয়ার মেয়ে।’
‘ঠিক আছে। যদি প্রয়োজন হয় আপনাকে আবার বিরক্ত করব। এবার যেতে পারেন।’
মাথা নেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল দীপা। একজন অফিসার বলছেন, ‘খুব শক্ত মেয়ে তো, এই বয়সে এমন উত্তর আশা করা যায় না।’
সুপার বললেন, ‘হ্যাঁ, মেয়েটি একটু অন্যরকম।’
‘অন্যরকম মানে?’ অফিসারের গলায় কৌতূহল।
‘খুব সিরিয়াস টাইপের কোনও কোনও মেয়ে থাকে, ওই ধরনের।’
দীপা আর দাঁড়াল না।
গেস্টরুমে এসে দেখল সুভাষচন্দ্র আর সেই মহিলা পাশাপাশি বসে আছেন। সে পৌঁছানোমাত্র সুভাষচন্দ্র বললেন, ‘খুব বদ ছোকরা। কমিউনিস্ট নাকি?’
‘কার কথা বলছেন?’
‘আরে যে তোর সঙ্গে কথা বলার জন্যে দাঁড়িয়ে ছিল। কথা শুনে তো মনে হয় না ও-দেশের। মুখে মুখে তর্ক করছিল।’ খুব বিরক্ত দেখাচ্ছিল তাঁকে।
‘কোথায় গেল অসীম?’
‘অসীম? ওর নাম অসীম! ঘুরে আসতে বলেছি। এখানে হুটহাট ছেলেরা চলে এলে দেখা করতে দেয়? মেয়েদের হস্টেলে নিয়মকানুন নেই?’
‘এখন ভিজিটিং আওয়ার্স চলছে। কী ব্যাপার বলুন।’ দীপা বসল।
মুহূর্তেই পালটে গেলেন সুভাষচন্দ্র, ‘তুই তো আর এই বুড়ো মামার খোঁজখবর নিস না। মাসের কুড়ি দিনই অসুস্থ থাকি। হাই ব্লাডপ্রেশার, তার ওপর আমাশা লেগে আছে। অমরনাথ মুখুজ্যের চলে যাওয়ার সময় বিছানায় পড়ে ছিলাম। খুব বড় ধাক্কা পেয়েছিলাম খবরটা শুনে। তোর সঙ্গে যে এসে দেখা করব এমন মনের জোর ছিল না। কী অকালেই না চলে গেল লোকটা।’
দীপা জবাব দিল না। সে মহিলাকে দেখল। বোগা ছোটখাটো চেহারা। একদৃষ্টিতে তিনি দীপাকে দেখে যাচ্ছেন। সুভাষচন্দ্র মাথা নাড়লেন শোকার্ত ভঙ্গিতে, ‘তবে অঞ্জলির সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। চিঠিপত্র দেয়। এখনও ওদের কোয়ার্টার্স ছাড়তে হয়নি তবে ঘরবাড়ি তুলে ফেলেছে। কারও জন্যে তো কিছু আটকে থাকে না এই পৃথিবীতে, মাঝখান থেকে তুই একদম একা হয়ে গেলি। তোরা দু’জনেই ঠিক, আমি আর কাকে সমর্থন করব!’
‘আপনি বলছিলেন খুব জরুরি কথা আছে।’
‘হ্যাঁ, সেজন্যেই তো এলাম। কিন্তু এই পুলিশের ঝামেলা চুকেছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘বাঃ, চিন্তা হচ্ছিল খুব। এক ঘরে ছিলি, মেমসাহেব তার ওপর নিগ্রো, স্বভাবচরিত্র তো এদের খুব একটা ভাল হয় বলে শুনিনি।’
‘মামা, আমার শরীর ভাল নয়। আপনি কী বলতে এসেছেন বলুন।’
সুভাষচন্দ্র মহিলার দিকে তাকালেন। মহিলা বললেন, ‘হ্যাঁ, ওকে অনেকক্ষণ আটকে রেখেছি আমরা।’ তারপর দীপার দিকে তাকালেন, ‘তোমার নাম খুব মিষ্টি।’
‘আমি কিন্তু আপনাকে চিনতে পারছি না। মামা এখনও পরিচয় করিয়ে দেননি।’ কিছুটা বিস্ময় নিয়ে বলল দীপা।
সুভাষচন্দ্র একটু আড়ষ্ট হলেন, ‘মানে পরিচয় করিয়ে দেবার সুযোগ পাইনি এখনও। ইনি হচ্ছেন তোমার মা, এঁকে প্রণাম করো।’
হকচকিয়ে গেল দীপা। বিস্ময়ে সে কথা বলতে পারল না।
সুভাষচন্দ্র মাথা নাড়লেন, ‘শুনে নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছ। কিন্তু এটাই সত্যি। অঞ্জলি তোমার সম্পর্কে মাসি হয়। তাকে তুমি মা বলতে। আসলে তোমার গর্ভধারিণী গত হওয়ার পর তোমার জন্মদাতা বিবাগী হয়ে যান। পরে যখন সংসারী হন তখন এঁকেই বিবাহ করেন। তার মানে, ইনি যেহেতু তোমার জন্মদাতার স্ত্রী তাই এঁকেই মা বলে ডাকা উচিত। নাও, প্রণাম করো।’
