Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – সায়ক আমান

    March 23, 2026

    কালীগুণীন ও বজ্র-সিন্দুক রহস্য – সৌমিক দে

    March 23, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    প্রীতম বসু এক পাতা গল্প499 Mins Read0
    ⤷

    কপিলাবস্তুর কলস – ১

    প্রাককথন

    নতুন দিল্লী

    ১৫ জানুয়ারি, ২০১৫

    বুদ্ধের চিতার হাড়!

    দিল্লীর জানুয়ারির শীতত-কুয়াশা উপেক্ষা করে ন্যাশনাল মিউজিয়ামের প্রদর্শনীতে রোজ দর্শকের ভিড় উপছে পড়ছে। কাষায় বস্ত্রে শরীর আচ্ছাদন করে ভারতীয় বৌদ্ধরা তো দলে দলে আসছেই, তাছাড়াও সিংহল, থাইল্যাণ্ড, নেপাল, ভুটান, চিন, জাপান থেকেও অনেক বৌদ্ধ লামা আসছে শাক্যমুনির শরীরধাতু দর্শন করে পুণ্য অর্জন করতে। এছাড়াও আসছে অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদ, বিভিন্ন রাষ্ট্রের ডিপ্লোমেটিক লুমিনারিস, নানা ঐতিহাসিক, এবং পুরাতত্ত্বের ছাত্রছাত্রীরা। গত এক সপ্তাহ প্রদর্শনী ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু ঝামেলাটা আজ বাধল চিনের সরকারি প্রতিনিধিদলের আগমনে।

    গ্যালারিতে চিনের হাই পাওয়ার ডেলিগেশন, তাই মিউজিয়ামের কিউরেটার তো বটেই, এমনকি খোদ অ্যাডিশনাল ডাইরেক্টর জেনারেল এসে গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে। ঢিমেতালে এগোচ্ছে আজকের দর্শনার্থীরা। একদল লামা অস্থিকলসের দিকে ভক্তিতে মাথা নুইয়ে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাতে জানাতে এত ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল যে অধৈর্য এডিজি’র মনে হচ্ছিল যেন কাঁচের দেওয়ালের ওপাশে জীবিত বুদ্ধ বসে এবং তাকে ভক্তরা অ্যাটেণ্ডেন্স জানাচ্ছে। হাড় ছাড়াও বুদ্ধের ব্যবহৃত রক্তচন্দন কাঠের যষ্টি, সাঁচী থেকে আনা সারিপুত্র ও মৌদগল্যায়নের দেহধাতু, চীবর, পোড়ামাটির অর্ধভগ্ন মালসা, সিলমোহর, তিব্বতের পোটালা থেকে আনা দালাই লামার উপহার তাঞ্জুর ও কাঞ্জুর পুঁথির পাতা ইত্যাদি এনে গ্যালারিতে একটা প্রাচীনত্বের অ্যামবিয়েন্স ক্রিয়েট করার চেষ্টা করা হয়েছে। সামনের এপ্রিলে নিউ ইয়র্কে ইউনাইটেড নেশনসে চিনের সমর্থনপুষ্ট নেপালের সঙ্গে ভারতের কপিলাবস্তু সম্পর্কে যে তুমুল ডিবেট হবে তারই প্রস্তুতি এটা।

    গোটা গ্যালারিতে অখণ্ড নীরবতা, কখনো কেউ উত্তেজনায় ফিসফিস করে কথা বললে তা গ্যালারির অন্য কোণ থেকে শোনা যাচ্ছে। লামারা একে একে এগিয়ে চলেছে। এবার একজন বৃদ্ধ লামা এগিয়ে গেল কাঁচের শো-কেসের দিকে। প্রণাম করার জন্য ঝুঁকতেই লামার ভুরু যুগলে বিস্ময়ের কুঞ্চন।

    এক্সিবিটের পাশে দাঁড় করানো সেকশন লেবেলটা লামা আবার পড়ল, তারপর কাঁচের দেওয়ালের ভিতর রাখা প্রদর্শিত বস্তুটির দিকে ঝুঁকে এমনভাবে চোখ কুঁচকে নিরীক্ষণ করতে থাকল যেন ল্যাবে প্যাথোলজিস্ট মাইক্রোস্কোপে ক্যানসার সেল দেখছে। হঠাৎ লামা স্থান-কাল ভুলে ক্রোধে বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল—

    ‘এটা নকল!’

    লামার চিৎকারে সকলে হতবাক।

    বলে কী লোকটা!

    ‘এগুলো বুদ্ধের হাড়ই না!’ লামার দু’চোখে অগ্নিদৃষ্টি।

    লামার বিস্ময় সংক্রামক রোগের মত মিউজিয়াম গ্যালারিতে চিনা প্রতিনিধিদলের সকলের ভ্রূ-রেখায় ছড়িয়ে পড়ল। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য! চিনা প্রতিনিধিরা গ্যালারির মাঝে কাছাকাছি এসে দলবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল।

    ‘বুদ্ধের নামে মিথ্যাচার!’ লামা তারস্বরে চেঁচাতে লাগল। ‘ছিঃ ছিঃ!’

    সকলের কৌতূহলী দৃষ্টি নিবদ্ধ কাঁচের শো-কেসের ভিতরে সাজিমাটির কলসের পাশে রাখা হাড়গুলির দিকে। অস্বস্তি ছড়িয়ে গেল গ্যালারির প্রতি মানুষের মনে। ভিতরে গণ্ডগোলে বন্দুকধারী পাহারাদার তাড়াতাড়ি সংরক্ষিত বুদ্ধের দেহাস্থির পাশে এসে দাঁড়াল। দর্শকদের চোখের হতাশ দৃষ্টির নীরব ভাষা যেন বলছে তারা সকলে এক ষড়যন্ত্রের শিকার।

    কিউরেটারের সঙ্গে এডিজি হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলো। কোট-টাই দেখে তাকে উচ্চপদস্থ অফিসার মনে করে লামা এবার তার ওপর চড়াও হল— ‘বুদ্ধকে নিয়ে ছেলেখেলা! নকল হাড়! আমাদের বোকা পেয়েছ?’

    ‘কে বলেছে নকল হাড়?’ এডিজি’র মুখে সেঁটে থাকা ইমোজি স্মাইলিটা দুদে অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের শক্ত চোয়ালের ভিতর অস্ত গেল। এডিজি ঠিক আন্দাজ করেছিল এরকম কিছু একটা হবে, চিনারা আটঘাট বেঁধে তৈরি হচ্ছে UN ডিবেটে ভারতকে নাস্তানাবুদ করার জন্য।

    ‘আমার দৃষ্টিকে ঠকাবে?’ লামা রোষকষায়িত দৃষ্টি হানল— ‘এ নকল!’

    এবার চিনা প্রতিনিধিদের দলনেতা অপ্রস্তুত হয়ে এডিজিকে বলল, আমি দুঃখিত।’ কিন্তু দুঃখিত চিনা দলনেতার ঠোঁটের ব্যাম্বু কার্টেনের সামান্য ফাঁক দিয়ে এক খুশির ঝিলিক এডিজি’র নজর এড়াল না। কিন্তু, আমরা কি কয়েকটা ছবি তুলতে পারি?’

    ‘এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন,’ চিনাদের সামলাবার চেষ্টা করতে গিয়ে এডিজি টের পেল টেনশনে তার চুয়ান্ন বছরের হার্ট প্রায় বাতিল ডিজেল ইঞ্জিনের মত ধকধক করছে। হাত বাড়ালেই কনটপ্লেসে হিন্দুস্তান টাইমস হাউস। হাই অকটেন রিপোর্টারগুলো একটু গন্ধ পেলেই পিলপিল করে এসে ওর মাথার চারপাশে মড়াখেকো শকুনের মত হামলে পড়বে। এডিজি পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য বলল, ‘আমি আমাদের এক্সপার্টদের ডাকছি।’

    ‘আমার দরকার নেই কারোর সঙ্গে কথা বলার!’ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে লামা বেরিয়ে গেল, তাকে অনুসরণ করল চিনা প্রতিনিধি দল।

    ‘গ্যালারি বন্ধ করে দাও!’ উদ্বিগ্ন এডিজি হুকুম দিল গার্ডদের। ‘আমি পই পই করে বারণ করেছিলাম!’ গজগজ করতে করতে এডিজি কিউরেটারকে বলল, ‘সিদ্ধার্থ, আমার সঙ্গে এসো।’ এডিজি নিজের দপ্তরে ফিরে এসে ডেস্কে ঢাকা দেওয়া জলের গ্লাস তুলে ঢকঢক করে জল খেতে খেতে হঠাৎ থেমে গ্লাস থেকে চিন্তিত মুখ তুলে কিউরেটারকে বলল, ‘তোমার কী মনে হয় সিদ্ধার্থ? এটা কি বুদ্ধের হাড় না?’

    কিউরেটার ডঃ সিদ্ধার্থ বোস চিন্তিত মুখে বলল, ‘মনে আছে স্যার? নমপেন?’ এডিজি মাথা দ্রুত ঝাঁকাল ‘খুব মনে আছে। গোটা কম্বোডিয়া খেপে গেছিল। রাস্তায় রাস্তায় ধরনা, বিক্ষোভ, ফেসবুক, ট্যুইটারে গালাগালির বন্যা, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ পর্যন্ত দাবি করেছিল বিরোধীরা। বুদ্ধের হাড় চুরি

    ‘আমাদের এটা যদি নকল হাড় হয়, তবে স্যার পরিণাম কিন্তু আরও মারাত্মক হবে, এর মধ্যে ব্রিটিশ ইনভলভমেন্ট—’

    ‘ইমিডিয়েট গোপনে একটা ইনভেস্টিগেশন শুরু কর!’ এডিজির নার্ভাস গলা।

    ‘ইনভেস্টিগেশন? মানে বুদ্ধের হাড়ের DNA টেস্ট?’

    ‘নো DNA টেস্ট!’ এডিজি তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করল। তারপর কিছু চিন্তা করে বলল, ‘ঠিক আছে, কিন্তু কেউ যেন টেরটি না পায়।’ এডিজি গলার আওয়াজ নামিয়ে আনল— ‘রেজাল্ট ফেভারেবল না হলে চেপে যেতে হবে।’ সিদ্ধার্থ কিছু বলার আগেই এডিজির মস্তিষ্ক দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে— ‘আমাদের দেশের ল্যাবের রিপোর্টকে চিনারা বলবে ফেক রিপোর্ট। DNA টেস্ট বিদেশের কোনও রেপুটেড ল্যাব থেকে করাতে হবে।’

    ‘বিদেশে? গোপন টেস্ট?’ সিদ্ধার্থ বোস বলল।

    ‘এপ্রিলে UN ডিবেট। এই বুদ্ধের রেলিকস গোপনে নিউ ইয়র্ক যাবে। একটা প্ল্যান মাথায় এসেছে। এক্সিবিশন গ্যালারি আপাততঃ ওপেন করে দাও। বাইরে বিরাট লাইন অপেক্ষা করছে। পাবলিক সন্দেহ শুরু করবে।’

    আবার দর্শকের জন্য গ্যালারি খুলে দিতে বলা হল। কিউরেটার সিদ্ধার্থ বোস গ্যালারির দিকে ধীর পায়ে এগোল। মন বিমর্ষ। রেজাল্ট ফেভারেবল না হলে চেপে যেতে হবে— এই ব্যুরোক্র্যাটদের ইনফ্লেটেড ইগো হার্ট করলে এরা এক সেকেণ্ডে ওর কেরিয়ারের এক পা কেটে হাতে ক্রাচ ধরিয়ে দেবে। কিন্তু তাহলে সত্যানুসন্ধান? আর্কিওলজিস্টদের সৎভাবে ইতিহাসের রহস্যভেদ করার সঙ্কল্প?

    গ্যালারিতে ঢুকল সিদ্ধার্থ। দর্শকেরা আসতে শুরু করেছে। অন্যমনস্ক হয়ে বুদ্ধের চিতাস্থির দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল, লামাটা যা বলে গেল তা কি সত্যি? বুদ্ধের হাড় কি সত্যিই নকল? তাহলে তরাইয়ের জঙ্গল ঘেরা চিতওয়ানি, কোচিলা, ডাংগৌরা, মোরাঙ্গিয়া থারুদের গ্রামগুলোতে সাঁঝের হাওয়ায় ফিসফিস করে ঘুরে বেড়ানো দেবচরণ-তুলসী-রাজকুমারীর যে জনশ্রুতি শুনে সে লিপিবদ্ধ করেছে তা মিথ্যে নয়? কিন্তু তাহলে ব্রিটিশদের লেখা ভারতের ইতিহাস? কার স্পর্ধা হবে সেই ইতিহাসের দিকে আঙুল তুলে প্রশ্ন করে? ভারাক্রান্ত মনে কিউরেটার সিদ্ধার্থ বোস নিজের কামরায় ফিরে এল।

    ক্যাবিনেট খুলে ফাইলের স্তূপের নিচ থেকে বের করল পুরোনো ডায়েরিটা ঊর্ধ্বতন অফিসারদের প্রবল আপত্তিতে এই রিসার্চ সম্পূর্ণ হয় নি। অনেক বছর পর আবার খোলা হল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আর্কিওলজিক্যাল ফ্রডের এই অজানা গল্প। অন্যমনস্কভাবে পৃষ্ঠা উলটাতে লাগল সিদ্ধার্থ। ডায়েরি থেকে বেরিয়ে এল ব্রাহ্মী বাংলা তালিকা। এই ব্রাহ্মীলিপিই তার মনে জাগিয়েছিল কিছু অকাট্য প্রশ্ন। যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে সিদ্ধার্থের মনে সন্দেহ জেগেছিল যে ভারতের কিছু ইতিহাস হয়তো সততার বাইরে গিয়ে লেখা হয়েছে। সিদ্ধার্থ ভাবল কী সহজ এই ব্রাহ্মী শেখা, অথচ আমাদের ইতিহাসের শিক্ষকরা কেন এই লিপি শেখায় না ছাত্রদের? এটা শিখলে ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের বিচার বুদ্ধি দিয়ে কত অজানা ইতিহাস আবিষ্কার করতে পারে। ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই লিপি।

    অনেকদিন পর আবার ব্রাহ্মী-বাংলা তালিকাতে চোখ রাখল সিদ্ধার্থ—

    ব্রাহ্মী-বাংলা তালিকা

    কিন্তু ডায়েরির পাতায় দু’চোখ রেখে কিউরেটার সিদ্ধার্থ বোস কি কক্ষনো ভাবতে পেরেছে যে তার নিয়তিকে ডাকছে মৃত্যুর হাতছানি?

    চার বছর পরে

    .

    ৷৷ এক ৷৷

    উত্তর আমেরিকা

    ১৩ জানুয়ারি, ২০১৯

    শীতের শেষরাতে আটলান্টিক থেকে তেড়েফুঁড়ে জেগে উঠল দানবীয় এক সামুদ্রিক ঝড়। উদ্দাম জলবিন্দুপুঞ্জ তীব্রবেগে ছুটে চলল আমেরিকার পূর্ব উপকূলের দিকে। ভোরবেলা নিউ ইয়র্কের আকাশে তের হাজার মেগাটন জলকণা কামানের গোলার মত আঘাত করল নেমে আসা আর্কটিক ফ্রন্টের গর্ভে। জন্ম নিল এক বিধ্বংসী ‘বম্ব-সাইক্লোন’।

    সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল তুষারপাত, প্রবল ঝোড়ো হাওয়া তিরের গতিতে উড়িয়ে নিয়ে চলল অজস্র বরফকুচিকে। ওয়েদার চ্যানেলগুলোতে তুষারঝড়ের পূর্বাভাস দিয়ে উপকূলবর্তী এলাকার মানুষদের আগে থেকেই সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল, রোব্বারে অফিস-স্কুল-কলেজ ছুটি, তবু নিউ ইয়র্ক, নিউজার্সি, দক্ষিণ কানেকটিকাট, ইস্টার্ন পেন্সিলভেনিয়ায় যাদের একান্তই কাজে বেরোতে হয়েছিল তাদের এখন বাড়ি ফেরার অস্থিরতা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশের অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে লাগল এবং শীঘ্রই আমেরিকার ইউসেইন বোল্ট ট্রাফিককে অ্যাকিউট আর্থ্রাইটিস রুগীর স্পিডে নামিয়ে দিয়ে তুষারঝড় ঘন্টায় ষাট মাইল বেগে ছুটে চলল উত্তরে ক্যানাডার দিকে।

    এরপর দিনভর চলল দামাল ঝড়ের তাণ্ডব। মধ্যাহ্ন পেরোবার আগেই রাস্তাঘাট এক ফুট ঝুরো বরফের নিচে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলল, কিন্তু আবহাওয়ার এতটুকু উন্নতির সম্ভাবনা নজরে এল না। এমন অবস্থায় খুব ইমারজেন্সি না হলে অতি পাগলেও রাস্তায় গাড়ি বের করে না। কিন্তু এই দুর্যোগ মাথায় নিয়ে একজন মানুষ হাইওয়েতে মরিয়া হয়ে গাড়ি ছোটাচ্ছে।

    গাড়ির উইণ্ডশিল্ডে পিরানহার ঝাঁকের মত ঝাঁকে ঝাঁকে বরফকণা আছড়ে পড়ে দাঁত বসাতে চাইছে। ওয়াইপার দুটো অবিরাম থোকা থোকা বরফ সরিয়ে চলেছে, মানুষটার গাড়ি নিউ ইয়র্ক সিটি থেকে বের হয়ে এখন ইন্টারস্টেট হাইওয়েতে বস্টনের পথে। ভিজিবিলিটি খুব কম, পথ ঠিকমত দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না, বাইরে যেন রকি মাউন্টেনের জমাট কুয়াশা, হেডল্যাম্পের আলোগুলো যেন কুয়াশার ভুলভুলাইয়া ভেদ না করতে পেরে কোন দিক দিয়ে বেরাবে ভেবেই দিশেহারা। FM অন করে খবর শুনল মানুষটা— নিউজার্সি টার্নপাইকে ক্যাসকেডিং অ্যাক্সিডেন্টের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অ্যাম্বুলেন্স-পুলিশ-দমকল-স্টর্ম রিকভারি ট্রাক ছাড়া অন্য কোনও গাড়ির প্রবেশ নিষেধ ঘোষণা করা হল। মানুষটা বারবার ঘড়ি দেখছে। নিউ ইয়র্ক সিটির কুইনস থেকে হার্ভার্ড দুশো মাইলের একটু বেশি, পরিষ্কার আবহাওয়াতে সাড়ে তিন ঘন্টায় টেনে দেওয়া যায়, কিন্তু এখন কম করেও সাড়ে পাঁচ ঘন্টা তো লাগবেই। আর রাস্তায় যদি অ্যাক্সিডেন্ট থাকে তাহলে— মানুষটা খারাপ চিন্তা মন থেকে সরিয়ে দিল। দেড়টায় ফোনটা পেয়েই হুড়মুড় করে দৌড়িয়েছে সে, সময় হাতে এত কম! সামনে হাইওয়েতে ট্রাভেল অ্যাডভাইসরি ডিজিটাল ডিসপ্লে জ্বলছে নিভছে ‘হেভি স্টর্ম, অ্যাভয়েড ড্রাইভিং’। মানুষটা স্পীডোমিটারের দিকে বিরক্ত ভাবে এক নজর তাকাল। কাঁটা চল্লিশে। ট্রাভেল অ্যাডভাইসরি মেনে গাড়ি চালালে পৌঁছোতে পৌঁছোতে রাত নটা বেজে যাবে। মানুষটা গ্যাসে ডান পা’র চাপ বাড়াল। FM নিউজে অবিরাম খারাপ খবর বলে চলেছে – এয়ারপোর্টগুলোতে একের পর এক ফ্লাইট ক্যানসেল হতে হতে দেখতে দেখতে রেগান-লিবার্টিকেনেডি-লাগার্ডিয়াতে আটশ’র বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়ে গেছে, হাইওয়ের বিভিন্ন জায়গায় প্রাণঘাতক অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে – মানুষটা রেডিও বন্ধ করে পাশে কাপ-হোল্ডারে রাখা স্টেইনলেস স্টিলের ট্রাভেল মগটা হাতে তুলে চুমুক দিল। তেতো গরম ক্যাফিনও উত্তেজনায় এত টানটান নার্ভকে শৈথিল্য দিতে অক্ষম, এখনো অনেকটা পথ বাকি।

    রাস্তায় একদম ছোট গাড়ি নেই। কিন্তু মাঝে মাঝে বিশাল বিশাল এইটিন হুইলার কার্গো ট্রাকগুলো গাড়িটাকে কাদা বরফে চান করিয়ে দিয়ে পাশ দিয়ে গোঁ গোঁ করে ফুঁসতে ফুঁসতে বেরিয়ে যাচ্ছে। মানুষটার কপালে দুশ্চিন্তার রেখা স্পষ্ট, দু’হাতের আঙুল শিকার ধরা ঈগলের আঙুলের মত শক্তভাবে স্টিয়ারিং হুইল আঁকড়ে ধরে, একটু অসতর্ক হলেই গাড়ি পিছলে ছুটন্ত কার্গো ট্রাকের নিচে।

    মানুষটা সামনে উইণ্ডশিন্ডের দিকে ঝুঁকে গাড়ি চালাচ্ছে, যেন জকি রেসিং হর্সের স্যাডেলে। দুর্যোগে এক এক মিনিটও অনেক লম্বা হয়ে যায়। পূর্ব-উপকূল ধরে বেপরোয়া ছুটে তুষারঝড় কানেকটিকাট পেরিয়ে ম্যাসাচুসেটসে ঢুকে গেছে, আবার রেডিও অন করল অধৈর্য মানুষটা। রেডিও জকি রসিকতা করার চেষ্টায় জানাচ্ছে আজ ‘হ্যাপি আওয়ার’ শুরু হওয়ার আগেই মদ্য প্রেমিকদের আনহ্যাপি করে সবকটা বার-রেস্টুরেন্টে ‘ক্লোজড’ লেখা নিওন সাইন ঝুলতে – দেখা যাচ্ছে। তারপর আবার নানা খারাপ খারাপ সংবাদ বস্টন লোগানে আটকে পড়েছে হাজারখানেক যাত্রী। এয়ারপোর্ট টার্মিনালের রেস্টুরেন্টগুলোতে পা ফেলার জায়গা নেই, ওয়েটিং লাউঞ্জের সোফাগুলো সব ভরা, উদ্বিগ্ন হতাশ যাত্রীরা দেওয়াল ঘেঁষে মেঝেতে বসে। তাদের সেলফোন-আইপ্যাড-ল্যাপটপে ফেসবুক-ট্যুইটারে ছড়িয়ে পড়ছে চরম হতাশা। স্টারবাকস, ডানকিন ডোনাটস – সব সোল্ড আউট।

    কয়েক ঘন্টা কাটল, সূর্য আজ ফাঁকি মেরে অনেকক্ষণ আগেই ডুব দিয়েছে। অন্ধকার নেমে আসায় রাস্তার অবস্থা আরও খারাপ। ক্লান্ত চোখ রাস্তা থেকে সরিয়ে মানুষটা এক নজরে ঘড়ি দেখল। সাতটা বাজতে চলল। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গাড়ি ছোটাচ্ছে সে। গাড়ির রেডিও জানালো ম্যাসাচুসেটসে স্টেট ইমারজেন্সি ঘোষণা হয়ে গেছে। রাস্তায় একটাও গাড়ি নেই। অথচ আরও কিছুক্ষণ যেতে হবে। আবার গ্যাসে পায়ের চাপ বাড়াল মানুষটা।

    আর ঠিক সেই সময়ে গাড়ির নিচে যেন ভূমিকম্প হল!

    গাড়ি বেসামাল ভাবে দুলে উঠল!

    সামনের ডানদিকের চাকার টায়ার রাস্তায় ঘষটাতে লাগল। স্টিয়ারিং হুইলের শাসন অগ্রাহ্য করে গাড়ি ডানদিকে কাত হয়ে গেল, আর গাড়িটা রাস্তার বরফের চাদরে পিছলে ডান দিকের শোল্ডার ডিঙিয়ে জোরে ধাক্কা মারল স্টিলের ট্রাফিক ব্যারিয়ার ফেন্সিংয়ে। এয়ারব্যাগ ডিপ্লয় করল – আচমকা ধাক্কা – চমকে দু-চোখ বন্ধ হওয়ার সময় মানুষটা দেখল – ড্যাশবোর্ডের বালুঘড়িটা ভেঙে গেছে, বালি দ্রুত নিচের প্রকোষ্ঠে নেমে যাচ্ছে, সময় দ্রুত দৌড়োচ্ছে। যা করার খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে।

    ৷৷ দুই ৷৷

    হার্ভার্ড

    ১৩ জানুয়ারি, ২০১৯

    হার্ভার্ডে অনেকক্ষণ সন্ধ্যা নেমেছে। মেমোরিয়াল চার্চের ঘন্টার নিঃসঙ্গ আওয়াজ ঝোড়ো হাওয়ার শব্দের আধিপত্য ভেঙে সাতবার ঢং ঢং করে বাজল ৷ উইন্টার রিসেসের জন্য হার্ভার্ড প্রায় খালি, তারপর এই তুষারঝড়ের জন্য বাইরের পথে জনমানুষ একজনও নেই। গোটা হার্ভার্ড ইয়ার্ড সাদা চাদরের নিচে শীতল মৃতদেহের মত নিথর। ঠাণ্ডা কনকনে দমকা হাওয়ার দাপটে বরফকুচি ছুটে চলেছে। কিছুক্ষণ পর, প্লাউ ট্রাকটা ঘড়ঘড় শব্দ করে নুন ছড়ানো রাস্তার নোংরা বরফ চেঁচে কুইন্সি রোডের সাইডওয়াকে ছুড়তে ছুড়তে বেরিয়ে যাবার সময় ড্রাইভার বিস্মিত দৃষ্টিতে দেখল রোব্বার এই প্রচণ্ড দুর্যোগের রাতেও বাও স্ট্রীটের তিনতলায় আলো জ্বলছে। হার্ভার্ডের প্রফেসরগুলো উন্মাদ! বিড়বিড় করে বলল ড্রাইভার। প্লাউ ট্রাকটা দ্রুত বেরিয়ে যেতেই বিষণ্ণ হার্ভার্ড ক্যাম্পাস আবার অসাড় হয়ে গেল।

    এক নম্বর বাও স্ট্রীটের তিনতলায় হার্ভার্ডের সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের সেমিনার রুমে তিনজন মানুষ গভীর আলোচনারত। তিনজনের সামনেই টেবিলে খোলা ল্যাপটপ, পাশে সেলফোন, সামনে রাখা একটা করে খোলা ফাইল, তার ওপরের পাতায় লেখা আড়াইটি লাইন—

    ‘ইম্পসিবল ডেডলাইন!’ বিরক্ত ডিরেক্টর ডঃ হফম্যান কাগজ থেকে চোখ তুলে একটা দীর্ঘশ্বাস সিলিংয়ের দিকে ছুড়ে দিলেন।

    হাওয়ায় ভেসে থাকা ডঃ হফম্যানের দীর্ঘশ্বাসের হতাশা স্পষ্ট পড়তে পারছেন প্রফেসর স্টিফেন। তিনিও হতাশ— ‘এতবড় একটা গ্র্যান্ট হাতছাড়া হয়ে যাবে?’

    ‘গ্র্যান্ট যাবে আসবে, কিন্তু আমার ইন্টিগ্রিটি হার্ভার্ড ভেরাইটাসে, ‘হার্ভার্ড পিবডি মিউজিয়ামের ডিরেক্টর ডঃ উইকস দাঁতে দাঁত চেপে বললেন।

    আপনি কি শিওর যে এটা ঠিক হবে না?’ ডঃ হফম্যান ডঃ উইকসকে বললেন।

    ‘আমি বারবার বলেছি কনক্লুসিভ কিছু সার্টিফাই করার মত এভিডেন্সের যথেষ্ট অভাব। আয়্যাম আউট।’ ডঃ উইকস ল্যাপটপ বন্ধ করলেন।

    ‘তাহলে আমরা কি একমত?’ ডঃ হফম্যান প্রফেসর স্টিফেনের দিকে তাকালেন।

    ‘লেটস গো হোম,’ প্রফেসর স্টিফেন ল্যাপটপ বন্ধ করলেন। ‘রিধিমা ইণ্ডিয়া থেকে ওর PhD প্রসপেক্টাসটা পাঠিয়েছে। মেয়েটা খুঁজে বের করুক ধুলোয় ঢাকা ইতিহাস। আমাদের তাড়াহুড়ো করা উচিত হবে না।’

    ‘কিন্তু আমাদের কি পুলিশকে জানানো উচিত না?’ ডঃ হফম্যান বললেন । ‘বোগাস স্কেয়ার ট্যাকটিকস,’ ডঃ স্টিফেন অবজ্ঞার স্বরে বললেন। ফোন স্ক্যাম। আজকাল পুলিশও অ্যাডভাইস করে যে একদম এদের পাত্তা দিও না । আই উড ইগনোর।’

    টক-টক!

    দরজায় দু-বার টোকার আওয়াজ। তিনজনই বিস্মিত। এই অসময়ে এখানে কে?

    সেমিনার রুমের দরজা সজোরে খুলে গেল। দরজায় উপস্থিত একজন লম্বা মানুষ, মাথায় এস্কিমোদের মত লোমশ উলের টুপি, গায়ের কালো ভারি ওভারকোটে এমনভাবে পেঁজা বরফ কামড়ে আছে যে মনে হচ্ছে একটা ছ’ফুট কালো ইণ্ডিয়ান স্লথ একটা ফার্মে ঢুকে ময়দার বস্তা ফাটিয়ে সেখানে গড়াগড়ি দিয়ে এসেছে।

    মানুষটা কারোর অনুমতি ছাড়াই ভিতরে ঢুকল, তারপর গায়ের কোট থেকে বরফ ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, ‘সরি, আসতে একটু দেরি হয়ে গেল, এই দুর্যোগে ইন্টারস্টেটে গাড়ি চালানো এক বিশাল ঝক্কি।

    ‘কে আপনি?’ ডঃ হফম্যান বিরক্ত।

    আগন্তুকের পোকার ফেস। ‘আমার ক্লায়েন্ট আপনাদের যে অফার দিয়েছিল সেই অফারটা ফিফটি পার্সেন্ট বাড়ান হল— প্রত্যেকে পনের বিটকয়েন।’ জুয়ারিদের মত নিস্পলক ভাবলেশহীন মুখ, লোকটা পায়ের গোড়ালি দিয়ে ঠেলে পিছনে দরজাটা বন্ধ করল। ‘দ্য নিউ অফার এক্সপায়ারস ইন ফাইভ মিনিটস।’

    ডঃ উইকস সেলফোনে কিছু টেক্সট মেসেজ লিখতে শুরু করলেন। লোকটা এক নজরে চারদিক দেখে আর বাক্যব্যয় না করে কোটের ভিতরের পকেট থেকে একটা বাদামী খাম বের করল।

    ‘এটা আমার প্রশ্নের উত্তর হল না,’ ডঃ হফম্যান দাঁতে দাঁত চিপে বললেন। ‘কে আপনি? এখানে ঢুকলেন কীভাবে?’

    ‘হার্ভার্ডের লেটার হেডে টাইপ করা,’ লোকটা খাম খুলে একটা বণ্ড পেপার বের করল। ‘নিচে সাইন করে হার্ভার্ডের স্ট্যাম্প মারুন আর এখানে টাইম ওয়েস্ট না করে বাড়ি ফিরে রিল্যাক্স করে এগনগ-কাহলুয়ায় চুমুক মারতে মারতে হ্যাসেল ফ্রি ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেট খুলুন। আপনাদের রিমিউনারেশন পৌঁছে যাবে।

    ‘আর ইউ কিডিং?’ ডঃ স্টিফেন ঝুঁকে টেবিল থেকে ফাইলটা হাতে তুলে ঝাঁকিয়ে রেগেমেগে বললেন। ‘দ্যাটস ক্রাইম!’

    ‘হোল্ড অন, হোল্ড অন,’ ডঃ হফম্যান হেড অব ডিপার্টমেন্টের অথরিটি নিয়ে বললেন, ‘এই লোকটা এই বিল্ডিং অ্যাকসেস সিকিউরিটি পিন পেল কীভাবে?’

    ‘মনে হল বাইরে থেকে শুনলাম কেউ যেন ইতিহাসের ধুলো-টুলো সরাবার কথা বলছিলেন?’ লোকটার দু’চোখে কুটিল দৃষ্টি। ‘ডাস্ট এলার্জি খুব ভোগায় । এসব ধুলো-টুলো না ঘাঁটাই স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল।’

    ‘এনাফ!’ ডঃ হফম্যানের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল। ‘হার্ভার্ড পুলিশ টোয়েন্টি ফোর সেভেন অ্যাকটিভ। এক্ষুনি না বেরোলে—

    ‘তাহলে এটাই আপনাদের ফাইনাল ডিসিশন?’

    ‘গেট আউট! নাহলে আমি এক্ষুনি পুলিশ ডাকছি,’ ডঃ হফম্যানের হাত সেলফোনে।

    রবাহূত মানুষটা ডঃ হফম্যানের দিকে এমনভাবে তাকাল যেমনভাবে বিচারপতি মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করার আগে আসামীর দিকে তাকায় দৃষ্টিতে অপরাধবোধ-করুণা-ঘেন্না গভীরভাবে মাখামাখি। তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ফাইভ মিনিটস ওভার। অফার ইজ নো মোর ভ্যালিড।’

    ‘গেট আউট!’

    মানুষটা ওভারকোটের ভিতর থেকে একটা নয় মিলিমিটার গ্লক বের করল। ডঃ হফম্যান দেখলেন লোকটা গ্লকের ওপর সাইলেন্সার পাইপ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লাগাচ্ছে।

    ‘এটা কী?’ ডঃ হফম্যানের কণ্ঠস্বরে বিস্ময় আর অস্বস্তি।

    লোকটা কথা না বলে ডঃ হফম্যানের কপালের দিকে তাক করে ট্রিগার টিপল। ডঃ হফম্যানের কপালের মাঝামাঝি একটা গোল কালচে-লাল ছিদ্র হয়ে গেল। ডঃ হফম্যান সামনের খোলা ল্যাপটপের স্ক্রিনে মুখ থুবড়ে পড়লেন। এক ঝলক লাল গরম তরল ঠিকরে এসে স্ক্রিনে মাখামাখি হয়ে গেল। ডঃ স্টিফেন উঠতে যাচ্ছিলেন, পিস্তলের পরের গুলি ওর বুকে গিয়ে বিধল।

    ‘অ্যাসহোল!’ ডঃ স্টিফেন এক হাতে বুক চেপে ধরে রাগে হতাশায় বললেন। ‘ইউ সান অফ আ—’ লোকটা দ্রুত এগিয়ে এসে ডঃ স্টিফেনের হাঁ করা মুখের ভিতর সাইলেন্সার পাইপটা গুঁজে দিয়ে বলল- ‘বেশি এথিকস শুনলে আমার বমি পায়,’ লোকটা ট্রিগারে চাপ দিল। ডঃ স্টিফেন অর্ধসমাপ্ত গালিগালাজটা পরলোকে গিয়ে শেষ করলেন।

    খুনি এবার চকিতে তৃতীয় শিকারের দিকে তাকাল। তার তৃতীয় শিকারের চোখের দৃষ্টি এবং দু’হাত টেবিলের নিচে। সেলফোনে কিছু একটা লিখে চলেছে। ‘হ্যাং আপ!’ খুনি পিস্তলের নল ডঃ উইকসের দিকে তাক করল।

    ডঃ উইকস খুনির কথা না শুনে, এবার তর্জনী দিয়ে ফোনের কি-প্যাডে জোরে টোকা লাগালেন। খুনি এবার পিস্তলের ট্রিগারে চাপ দিল। ডঃ উইকস মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।

    খুনি তাড়াতাড়ি গ্লক থেকে সাইলেন্সার খুলতে খুলতে টেবিলের দিকে ভালভাবে দেখল। দুর্বোধ্য লিপি। কিছুই বুঝতে না পারলেও খুনি বুঝল লেখাগুলো পেটের অ্যাপেন্ডিক্সের মত, ওর কোনও কাজে আসবে না, কিন্তু ঝামেলা বাধালে কাটা-ছেঁড়া করিয়ে ছাড়বে। আগ্নেয়াস্ত্র জ্যাকেটের নিচে কোমরে গুঁজে খুনি ডেস্ক থেকে ফাইলগুলো তুলে দ্রুত ব্যাকপ্যাকে ঢুকিয়ে নিল। তারপর ডঃ উইকসের সেলফোনটা তুলে নিল। প্রফেসরদের রক্ত কার্পেটকে সিক্ত করে লালিমা বাড়িয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে।

    খুনি এবার জানলায় গিয়ে ভেনিশিয়ান ব্লাইওটা ফাঁক করে উঁকি মেরে বাইরের রাস্তার অবস্থা দেখে নিল। বাইরে বেন ওলকেন স্কোয়ারের চার মাথার মোড়ে হাওয়ায় বরফের লিণ্ডি হপ চলছে। লোকটা এবার পকেটের নীল রিবন বাঁধা ID কার্ডটা ঘরের কোণের শ্রেডারের নিচে ছুড়ে দিল। অনাথ ল্যাপটপ তিনটে কনফারেন্স টেবিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, খুনি তিনজনের ল্যাপটপ তুলে নিয়ে নিজের ব্যাকপ্যাকে ঢুকিয়ে নিল, তারপর সেমিনার রুমের আলো নিভিয়ে দরজা টেনে বেরিয়ে এল। উল্টোদিকেই এলিভেটর। লোকটা এলিভেটরের বোতামে আঙুল রাখল।

    বাইরের বাও স্ট্রীটের সাইডওয়াকে একহাঁটু বরফ। ঝঞ্ঝার প্রতিবাতে বরফকণা উড়ে তীব্র গতিতে চোখেমুখে বিধছে। প্রতিবার হত্যার পর লোকটা অনেক শান্তি বোধ করে। ভালুকের থাবার মত বিশাল হাতের তালু দিয়ে হাওয়া আড়াল করে সিগারেট ধরাল সে, আর অনেকটা ধোঁয়া ফুসফুসে টেনে নিল। ক্র্যাক কোকেনের ধুমকি মাথায় গিয়ে ধাক্কা মারল ব্রেন ডোপামিন রিলিজ করল, ইউফোরিয়া আবিষ্ট মস্তিষ্ক চনমন করে উঠল – এখন আরেকটা বড় কাজ বাকি।

    লোকটা ত্বরিতদৃষ্টিতে চারদিক দেখে লম্বা পা ফেলে রাস্তা পার হয়ে কুইন্সি রোডে উঠল। বাঁদিকে হার্ভার্ড ইয়ার্ড আফিমখোরের মত ঝিমোচ্ছে। লোকটা লোহার গেটের ভিতর দিয়ে ইয়ার্ডে ঢুকে বরফ ভেঙে ভেঙে হাঁটতে শুরু করল। আচমকা পিছনে যান্ত্রিক শব্দ। লোকটা পিছন ফিরে তাকাল – কেমব্রিজ পুলিশের সাদা গাড়ি কার্ব ঘেঁষে এসে দাঁড়াল।

    ‘স্যার্-র!’ পুলিশ সার্জেন্ট গাড়ির জানলার কাঁচ নামিয়ে মুখ বের করে হাওয়ার দাপটের জন্য চেঁচিয়ে ডাকল।

    লোকটা থেমে পিছন ফিরে তাকাল। ‘ওয়ান্ট আ রাইড?’

    ‘আয়্যাম গুড,’ মানুষটা আবার বরফ ঠেলে হাঁটা লাগাল হার্ভার্ড ইয়ার্ডের ভিতরে।

    পুলিশ অফিসার ভ্রূ কুঁচকে তাকাল। হার্ভার্ডের টোব্যাকো ফ্রি ক্যাম্পাসে হাতে জ্বলন্ত সিগারেট রেয়ার সিন! সার্জেন্ট সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থেকে নেমে অনুসরণ করে ইয়ার্ডে ঢুকল।

    ‘আপনি হার্ভার্ডের স্ট্যাফ?’ সার্জেন্টের হাত কোমরের পিস্তলের হোলস্টারে। ‘হ্যাঁ!’ লোকটা এক টোকায় জ্বলন্ত সিগারেটটা হাওয়ায় উড়িয়ে দিল। ‘আই-ডি প্লিজ?’

    মানুষটা হিপ পকেট থেকে ওয়ালেট বের করল। ওয়ালেটের খাপ থেকে আইডেন্টিটি কার্ডটা টেনে বের করার চেষ্টা করল। কার্ডটা জ্যাম হয়ে গেছে। ‘আই গিভ আপ!’ লোকটা বিরক্ত হয়ে গোটা ওয়ালেটটা পুলিশকে দিল। দু’হাতে ওয়ালেট খোলার পর সার্জেন্টের টর্চের আলো উড়ন্ত বরফকুচির মধ্য দিয়ে ID কার্ডে আছড়ে পড়ল। পুলিশ সার্জেন্ট বিরক্ত মুখে বলল, ‘এটা তো—’

    ততক্ষণে লোকটার হাতে দ্রুত গ্লক উঠে এসেছে। পুলিশ সার্জেন্ট নিজের পিস্তল টেনে বের করার আগেই বুঝল দেরি হয়ে গেছে। একটা বুলেট পুলিশের দুই ভ্রূর মধ্যে দিয়ে মাথায় গিয়ে বিধল। পুলিশ সার্জেন্ট হাতের মুঠোতে ওয়ালেটটা আঁকড়ে ধরে বরফের ভিতর হুমড়ি খেয়ে পড়ার সময় দেখল সামনে অ্যাসিস্টেন্স পোস্ট। টলতে টলতে সার্জেন্ট পোস্টের লাল ইমারজেন্সি বাটনের দিকে এগিয়ে গেল। সুইচটা টিপলেই… কিন্তু তার আগে আরেকটা বুলেট কপালে এসে ধাক্কা মারল আর সার্জেন্ট বরফে মাথা গুঁজে পড়ল৷

    খুনি পুলিশ সার্জেন্টের হাতের মুঠো আলগা করে ওয়ালেটটা তুলে তার গায়ে লেগে থাকা বরফের টুকরো ঝেড়ে কোটের পকেটে ভরল। তারপর নিচু হয়ে বসে ক্ষিপ্রহস্তে পুলিশের ওয়ালেটটা পুলিশের পকেট থেকে তুলে নিল আর পুলিশের স্মিথ অ্যাণ্ড ওয়েসসনটা। তারপর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে দ্রুতপদে বরফের ঝড়ের মধ্য দিয়ে সামনের আবছায়ায় হারিয়ে গেল।

    সামনে মেমোরিয়াল চার্চে রাত আটটার ঘন্টা বাজল। হার্ভার্ড ইয়ার্ডে বরফের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকা মৃত পুলিশের শরীর থেকে নির্গত রক্তের উষ্ণতা বাইরের বরফের শীতলতার সঙ্গে লড়াই করে হার মেনে নরম বরফে ছড়িয়ে জমে বিরাটাকায় লাল আইস-ক্যান্ডির মত আকার নিতে লাগল। আর অদূরে বাও স্ট্রীটের তিনতলায় হার্ভার্ডের সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের অন্ধকার সেমিনার রুমের ভিতরে, কার্পেটের লালিমা বেড়েই চলেছে। আজ সন্ধ্যার জান্তব হত্যালীলার একজনও জীবিত সাক্ষী নেই। তবে কি হার্ভার্ডের সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের তিনজন মহারথীর স্তব্ধতার কবরে চিরকালের জন্য চাপা পড়ে যাবে সুদূর ভারতবর্ষের এক প্রকাশ না পাওয়া ঐতিহাসিক সত্য?

    ৷৷ তিন ৷৷

    হার্লেম, নিউ ইয়র্ক

    ১৩ই জানুয়ারি ২০১৯

    নিউ ইয়র্ক সিটির প্রথম পাঁচটা সাংঘাতিক এলাকার মধ্যে পুলিশের খাতায় সবচেয়ে উপরে আসে এই লেক্সিংটন অ্যাভিনিউ আর হান্ড্রেড টোয়েন্টি ফিফথ স্ট্রীট ইন্টারসেকশন। NYPD বলে আর্মপিট। নিউ ইয়র্কের বগল৷ কয়েকদিন না পরিষ্কার করলেই গন্ধ ছড়াবে। পুলিশ হিমসিম খেয়ে যায়। ইস্ট-হার্লেমের ঘেটোর এই রাস্তার এপাশ-ওপাশে অন্ধকারে হারিয়ে থাকা জঞ্জালে ঠাসা এই গলিগুলোতে সন্ধ্যার পর কোনও বাইরের পথচারী এমনিই হাঁটে না, তার ওপর আজ তো প্রশ্নই নেই। সারা দিনের তুষারপাত রাস্তার জঞ্জালকে ঢেকে দিয়েছে, কিন্তু দেওয়ালে আছড়ে পড়া তুষারকণার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা উদ্ধত গ্রাফিটিগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছে খুব দরকার না পড়লে এসব পাড়ায় পা দিও না। রেগুলার হলদে ক্যাবগুলো, উবার, স্ট্রিট হকার, ড্রাগ পুশারস সকলেই এই অঞ্চলকে সন্ধ্যার পর এড়িয়ে চলে। এমনকি পারলে পুলিশও।

    সাইডওয়াকের ওপর তিন দিক কাঁচে ঢাকা বাসস্ট্যাণ্ড। গোটা দশেক যাত্রী আঁটে। আজ কোনও কমিউটার থাকার কথা না কারণ স্লাসি স্নো-স্টর্মে গোটা শহরের মেট্রোপলিটান ট্রান্সপোর্টেশনের বাস সার্ভিস গ্রাউণ্ডেড। কিন্তু অন্ধকার বাসস্ট্যাণ্ডে বসে আছে একজন। কৃষ্ণাঙ্গ গায়ানিজ যুবকটা কাগজের ঠোঙা দিয়ে মোড়ানো বিয়ারের বোতলে শেষ চুমুক দিয়ে হতাশায় ছুড়ে মারল ঠোঙাটা স্টপ সাইনের পাইপে। ঝনঝন শব্দে কাঁচ ভেঙে ঠোঙা ফেটে ছড়িয়ে গেল। উঠে দাঁড়াল ছেলেটা। এক ব্লক দূরে এক ফুট বরফে ঢাকা একটা কানাগলি। লম্বা পায়ে বরফ ঠেলে ঠেলে ছেলেটা গলির ভিতরে ঢুকল। গলির ভিতরে ‘লেজি বার্ডস’ পাব। কাঁচের দেওয়ালে লাল ‘ওপেন’ নিওন না জ্বললে বাইরে থেকে বোঝাই যেত না দোকানটার অস্তিত্ব। যুবক ভিতরে ঢুকল।

    টেবিলগুলো সব কটাই খালি। শুধু একটা টেবিলে একজন কালো ওবিস, ব্যাস। কাউচ পটেটোর সামনে প্রায় শেষ হয়ে আসা হাই-ফ্যাট হাই-ক্যালরি ঢাউস বার্গার, সঙ্গে সাইড ডিশ ফুটন্ত তেলে ডুব সাঁতার দেওয়া ফুলোফুলো আলুর ফ্রাই, সস্তা বাডলাইটের বোতল। দেখলেই মনে হয় হোমলেস, ওয়ালমার্ট থেকে গভর্নমেন্টের ফুডস্ট্যাম্প দিয়ে খাবার তুলে বাইরে সস্তায় বিক্রি করে সেই পয়সায় বিয়ার খেতে এসেছে।

    বারের কাউন্টারে একজন অ্যাফ্রো-আমেরিকান ছোকরা গবলেটগুলো মুছে মুছে মাথার ওপর উলটো করে ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে রাখছিল, তার পিছনে মদের বোতলের সারি, কাউন্টারের সামনে সুইভেল বাকেট উঁচু চারটে টুল— সবকটাই খালি।

    ‘হোয়াটস পপিন, ব্রো? ডার্বি ক্যানসেল্ড?’ বারটেণ্ডার ছেলেটা বলল।

    ‘দিস হরিবল ব্লিজার্ড! হেল অন আর্থ!’ যুবক ডোরম্যাটে থপ-থপ করে পা ঝাড়তে ঝাড়তে বলল। ভিতরে ঢুকে ছেলেটা একদম শেষ বুথের আধো-অন্ধকারে গিয়ে জ্যাকেট খুলে পুরোনো রেক্সিনের সোফায় ছুড়ে বারে এল— ‘হোয়াটস ক্র্যাকিং?’

    ‘আজকেরটা খুব টাফ!’

    কাউন্টারে একটা কাগজে লেখা রিডল বি’র এই রোববারের রিডল—

    ME IN A CAR ABACK

    অ্যাফ্রো-আমেরিকান ছেলেটা ঘন চুলে আঙুল চালিয়ে বলল, ‘বড্ড খটোমটো ধাঁধা! মানেটা কী? আমি একটা গাড়ির পিছনের সিটে?’

    একটা কোরোনা স্ট্রংয়ের ছিপি খুলতে খুলতে যুবক বলল – ‘আয়্যাম অল ক্যাশড আউট টুডে। মুডটা খিঁচিয়ে রয়েছে।’ তারপর নিজের টেবিলে ফিরে গিয়ে জ্যাকেটের পকেট থেকে ভাঁজ করা নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটা পাতা বের করে কাগজটা খুলল। তুষারঝড়ের জন্য জিগস পাজলের টুর্নামেন্টটা ক্যানসেল না হলে এক হাজার ডলার পকেটে আসতই আজ। খবরের কাগজের পাতাটাকে কুচি কুচি করে ছিঁড়ে টেবিলে কাগজকুচিগুলো ঢেলে দিল, তারপর বিয়ারে চুমুক মেরে ছেলেটা কাগজের টুকরোগুলোকে টেবিলের ওপর জিগস পাজলের মত সাজাতে লাগল।

    কিছুক্ষণ পর পাবের দরজা আবার খুলে গেল। এক ঝলক কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ার সঙ্গে ভিতরে ঢুকল অ্যাব লিঙ্কন দাড়িওয়ালা এক আগন্তুক। ওভারকোটের ঝুরো বরফ আর জুতোর গায়ে এঁটুলির মত সেঁটে থাকা বরফ ডোরম্যাটে ঝাড়তে ঝাড়তে লোকটা এমন ঘেন্নাভরে চারদিক জরিপ করল যেন চার্চের পাদ্রি ভুল করে সেক্স শপে ঢুকে পড়েছে। ভিতরটা অন্ধকার অন্ধকার, একদম অস্বস্তিকর নো-ফ্রিলস সারাউণ্ডিং। ছাদের কাছে দু’দিকে দুটো ওয়াল টিভি চলছে— একটাতে বাস্কেটবল, অন্যটাতে কার রেসিং। ঢুকেই বার। সস্তা – ডেকরের পাব।

    বারের অ্যাফ্রো-আমেরিকান ছেলেটা আগন্তুককে হেসে অভ্যর্থনা করলেও ওর চোখে অবাক দৃষ্টি। স্বচ্ছল ঘরের লোকেরা এই সব ডাইভ-বারে কখনোই আসে না। কালো মোটা কাস্টমার বিয়ার বেলিতে থাবার মত হাত বোলাতে বোলাতে আগন্তুকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটা অবনক্সাস বিয়ারের ঢেকুর তুলে বেরিয়ে গেল। পায়ে পায়ে বারের দিকে এগিয়ে গেল আগন্তুক। নিচু গলায় বলল— ‘হ্যারির সঙ্গে একটু দরকার ছিল।’

    ‘ওই কোনায়,’ দেখিয়ে দিল অ্যাফ্রো-আমেরিকান ছেলেটা।

    কোনার বুথটা অন্ধকারে মিশে আছে। যুবক সেখানে টেবিলে ঝুঁকে থাকায় প্রায় দেখাই যাচ্ছে না কেউ ওখানে পিছন ফিরে বসে আছে। বিয়ারের বোতল আধ খালি, সামনে টেবিলে অজস্র কাগজের কুচি। যুবক কাগজকুচিগুলোকে টেবিলের ওপর জিগস পাজলের মত সাজিয়ে সাজিয়ে রাখছে।

    আগন্তুক টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। যুবক লোকটার উপস্থিতি গ্রাহ্যের মধ্যেই আনল না, নিবিষ্টচিত্তে জিগস পাজল সমাধানে ব্যস্ত।

    আগন্তুক গলা খাকারি দিল—মিস্টার হ্যারি?’

    ‘হরি,’ যুবক একটা কাগজের কুচি রাখতে গিয়ে মাথা তুলল, ‘হরিপরসাদ।’ ‘সরি, মিস্টার হরি। আমার নাম মেজর হু, আমি—’

    ‘ওয়ান মিনিট,’ হরিপরসাদ আঙুল তুলে মেজরকে থামিয়ে দিল, তারপর হাতের কাগজের কুচিটাকে টেবিলে জিগসর অন্য দুটো কাগজের কুচির মধ্যে ঢুকিয়ে দু-হাতের তালু দিয়ে সোজা করে বলল— ‘ইয়েস?’

    ‘কিছু দরকার ছিল।’

    ‘বলুন!’ হরিপরসাদের কণ্ঠস্বরে ঔদ্ধত্য, কাগজের কুচির স্তূপ থেকে আরেকটা কাগজের কুচি টেনে নিয়ে নিজের পাজলে মনোযোগ দিল।

    ‘টু ডাইমেনশন পাজল নিয়ে মিডল স্কুলের ছেলেরা সময় কাটায়,’ আগন্তুক দাঁতে দাঁত ঘষে বলল। টেবিলের কোনার প্লাস্টার অব প্যারিসের আট ইঞ্চি ফুলদানিটা থেকে প্লাস্টিকের অর্কিডগুলো বের করে ফুলদানিটা কাঁধ সমান উচ্চতায় তুলে মাটিতে ছেড়ে দিল আগন্তুক। ‘থ্রি ডাইমেনশন জিগস। পারলে টোয়েন্টি বেঞ্জামিনস। থার্টি মিনিটস।’

    হরিপরসাদের চোখে কৌতূহলের দৃষ্টি। দু হাজার ডলার? মাটিতে ফুলদানির ভাঙা টুকরো ছড়িয়ে গেছে। প্রায় পঞ্চাশটা টুকরোতো হবেই।

    ‘টাইম স্টার্টস নাউ,’ আগন্তুক ওভারকোটের হাতা তুলে হাতঘড়ি দেখল।

    হরিপরসাদ দু’চুমুকে বাকি বিয়ার শেষ করে নিচু হয়ে বসে মেঝে থেকে কাঁচিয়ে সমস্ত টুকরো তুলে টেবিলে জড়ো করে ভাল করে দেখল। তারপর কাউন্টারে হনহন করে হেঁটে গিয়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এল হাতে একটা গোরিলা-গ্লু আঠার টিউব নিয়ে। এবার হরিপরসাদ নিজের টেবিলে এসে একের পর এক ফুলদানির এক টুকরোর সঙ্গে অন্য টুকরো গোরিলা-গ্লু লাগিয়ে লাগিয়ে জুড়তে লাগল। মেজর হু নামের লোকটা ছেলেটার হ্যাণ্ড-আই কো-অর্ডিনেশনের দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে দেখতে লাগল।

    দেখতে দেখতে ভাঙা টুকরোগুলো ফুলদানির আকার নিতে লাগল। ইন্টেন্স কনসেনট্রেশন, যুবকের মুখ দেখে মনে হচ্ছে ও যেন প্যাশন দিয়ে সাজাচ্ছে, সামনে যে অ্যাব লিঙ্কন দাড়িওয়ালা আগন্তুক দাঁড়িয়ে সেদিকে যেন কোনও খেয়ালই নেই ওর।

    ফুলদানি জোড়া লাগিয়ে হরিপরসাদ ঘড়ি দেখল। সাড়ে সাতাশ মিনিট। দু’হাতের তালুর মধ্যে ফুলদানিটা ধরে বলল, ‘হিয়ার ইউ গো।’

    আগন্তুক ফুলদানিটা ভালভাবে ঘুরিয়ে দেখে পকেট থেকে একটা খাম বের করে বলল, ‘টু গ্র্যাণ্ড!’

    হরিপরসাদের চোখ লোভে চকচক করে উঠল। ডলারের গোছাটা খাম থেকে বের করে হিপ পকেটে চালান করে বলল— ‘আমাকে কেন খুঁজছ?’

    ‘ফোর ডাইমেনশন জিগস পাজল,’ আগন্তুক যুবকের চোখে চোখ রাখল।

    ‘ফোর ডাইমেনশন?’ হরিপরসাদ ভ্রূ কুঁচকে মানেটা বোঝার চেষ্টা করল।

    ‘টাইম,’ আগন্তুক বলল।

    ‘মানে?’

    ‘বর্তমানের থেকে পিসগুলো একটা একটা করে অতীতে নিয়ে জিগস জুড়তে হবে,’ আগন্তুক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফুলদানিটা দেখছে।

    ‘কত পিস?’

    ‘জানি না এখনো, তবে হাজার দশেক তো হবেই ৷

    ‘কত পাব?’

    ‘পারলে হান্ড্রেড গ্র্যাণ্ড—’

    ‘হোয়াট!’ হরিপরসাদের বিস্ময় মেজরের কথা শেষ করতে দিল না।

    ‘আয়্যাম সিরিয়াস।’

    ‘হান্ড্রেড থাউজ্যাণ্ড ডলার!’ হরিপরসাদের কণ্ঠে অবিশ্বাস ।

    ‘হ্যাঁ। তবে এই খেলার একটা বিপজ্জনক শর্ত আছে।’

    ‘কী শর্ত?’

    ‘এটা একটা ডেডলি গেম,’ আগন্তুক চারপাশে তাকিয়ে গলার স্বর নামিয়ে বলল, ‘এই খেলার শর্ত হল যত দিন পাজলটা সলভ না হয় ততদিন আমার ক্লায়েন্টের ডেরা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না।’

    ‘যদি না পারি?’

    ‘না পারলে সারা জীবনের জন্য এটা ওয়ান ওয়ে স্ট্রীট।’

    যুবক একটু ভাবল। ‘অ্যামাউন্টটা আবার বলুন?’

    ‘ঠিকই শুনেছ। হান্ড্রেড থাউজ্যাণ্ড। কোকেন কেনার জন্য যে বেজম্মা রুকি কপটা ঘুষি মেরে তোমার নাক ফাটিয়ে দিয়েছিল, ওর দেড় বছর লাগবে অত কামাতে।’

    হরিপরসাদের চোখে দপ করে আগুন জ্বলে উঠল— ‘কোথায় যেতে হবে?’

    ‘গলির বাইরে গাড়ি দাঁড় করানো আছে।’

    ‘কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। আমাকে একবার বাড়িতে যেতে হবে।’

    ‘পেরেন্টাল গাইডেন্স?’

    ‘মা আর মা’র গোপন প্রেমিককে এক বিছানায় কুপিয়ে বাবা জেলে ।

    ‘আই সি,’ আগন্তুক মুখের বিস্ময় ঢাকার চেষ্টা করল। ‘তাহলে বাড়িতে?’

    ‘ওল্ড লুসি!’

    ‘গ্র্যানি?’

    ‘ব্যাসেট হাউণ্ড। একলা থাকতে পারবে না ।

    ‘কতক্ষণ সময় লাগবে?’

    ‘আধ ঘন্টা।’

    ‘ঠিক আছে, আমি অপেক্ষা করছি।’

    হরিপরসাদ কাউন্টারে এল। ক্যাশ বের করে কোরোনার দাম মেটাতে মেটাতে রিডল লেখা কাগজটা আবার দেখল। কাউন্টারের অ্যাফ্রো-আমেরিকান দাঁত ফোঁটাতে পারেনি।

    ‘ME IN A CAR; ME কে CAR এর ভিতর ঢুকিয়ে দে। মানে CA-MER, তারপর ABACK, মানে A কে BACK এ নিয়ে আয়। CA-ME-R -A,’ হরিপরসাদ বেরিয়ে গেল।

    ‘ক্যামেরা! ওয়াও!’ উচ্ছ্বসিত অ্যাফ্রো-আমেরিকান ছেলেটার চোখ ঝলমল করে উঠল।

    কী হল সেটা না বুঝলেও আগন্তুকের কানে ক্যামেরা শব্দটা যেতেই আগন্তুক সিলিংয়ের দিকে তাকাল। ‘ড্যাম!’ আগন্তুক বিড়বিড় করে বলল। ‘ভুলেই গেছিলাম ক্যামেরার কথা।’ আগন্তুক জ্যাকেটের কোমরে চাপ দিয়ে নাইন মিলিমিটার রুগার সিকিউরিটি সেমি অটোমেটিক বিস্কিটটা অনুভব করল। এটা ওর একটা ম্যানিয়া। তারপর ক্যাশ কাউন্টারে পাঁচশ ডলার রেখে বলল, ‘ফুলদানির দাম। সার্ভিলেন্স ক্যামেরাগুলো কাজ করে?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘ক্যাসেটটা দাও। আমি আজ এখানে আসিনি।’

    পাশের ঘর থেকে একটা ব্রাউন খাম এনে দিল অ্যাফ্রো আমেরিকান ছোকরা। আদিখ্যেতা করে বলল— ‘ইউ কেয়ার ফর চিকেন উইঙ্গ প্ল্যাটার, উইথ গিনেস?’

    আগন্তুক কিছু ভাবতে লাগল। অ্যাফ্রো আমেরিকান বুঝতে পারল না এতে এত ভাবার কী আছে। দাম? ছোকরা বলল— ‘অন দ্য হাউস!’

    ‘ঠিক মনে পড়ছে না টক্সিজেনিক ব্যাকটিরিয়াটার কী নাম—’ আগন্তুক অ্যাফ্রো— আমেরিকান ছোকরার উৎসাহের আতিশয্যে এতটুকু প্রভাবিত না হয়ে ঠোঁটে আঙুলের টোকা মেরে মনে করার চেষ্টা করল—‘এসেরিকিয়া কোলি? না না, ভাইব্রিও কলেরি—’

    ‘মানে?’

    ‘হার্লেমের এতগুলো রেস্টুরেন্ট সিটি ইনস্পেকটরের ইনস্পেকশনে হেলথ আর স্যানিটারি কোডের লাল তালিকায় ছিল, তোমাদের এই গাটারটাও ডেফিনিটলি ওই লিস্টের বাইরে ছিল না। এই নরকের ফুড লাইসেনস যে সাসপেণ্ড হয়নি সেটাই বিস্ময়কর। কলেরার ব্যাকটিরিয়াটার নাম ভুলে গেছিলাম ।

    ছেলেটা বোকা বোকা হাসি দিলেও, ছেলেটা যে মনে মনে ওর মা’র উদ্দেশ্যে অশ্লীল গালাগালি করছে সেটা আগন্তুক ভালই জানে।

    পনের মিনিটে হরিপরসাদ ফিরে এল— ‘লেটস গো।’ যুবকের হাতের লিশের অন্যদিকে লুসি। খুবই বিরক্ত, এই দুর্যোগের মধ্যে ওকে বের করা হয়েছে।

    ‘আমি এটা নিচ্ছি,’ আগন্তুক ফুলদানিটা সাবধানে তুলল। ‘টেস্টিমোনি।

    বাইরে বরফ পড়েই চলেছে, হাওয়ার দাপট বেড়ে গেছে। অ্যাব লিঙ্কন গ্লাভস হাতে গলাতে গলাতে শুনল হরিপরসাদ খুব ডিলিজেন্টলি ফার্মার্স অলম্যান্যাকের চোদ্দ পুরুষের উদ্দেশ্যে অশ্লীল গালাগালি দিল। আর তারপর আবার জিজ্ঞাসা করল— ‘ফোর ডাইমেনশন জিগস পাজল ব্যাপারটা কী?’

    ‘চল, যেতে যেতে বলছি,’ আগন্তুক গাড়ির দরজা খুলল। গাড়ির কাছে যেতেই পিছনের হ্যাচটা খুলে গেল, হরিপরসাদ ব্যাসেট হাউণ্ডকে কোলে তুলে নিল, কুকুরের পা কনকনে বরফ ঠাণ্ডা। কুকুরের পা আদর করে নিজের জ্যাকেট দিয়ে মুছে পিছনের কম্পার্টমেন্টে কুকুরটাকে ঢুকিয়ে দিয়ে হরিপরসাদ প্রশংসার স্বরে বলল, ‘গুড গার্ল, লুসি!’

    হ্যাচ বন্ধ হয়ে গেল। গাড়ি স্টার্ট করাই ছিল। ভিতরে হিট চলছে। ড্রাইভারের সিটে একজন, পিছনে আরেকজন আরোহী।

    ‘আফটার ইউ,’ অ্যাব লিঙ্কন দাড়ি ভদ্রতা করল।

    দু’জনের মাঝে বসল হরিপরসাদ। জ্যাকেটের পকেটে মেথের সাদা ক্রিস্টাল পাউডার বোঝাই ছোট জিপলক ব্যাগটা হাতের চাপে অনুভব করে স্বস্তি পেল সে। এক— লুসি আর দুই— এই গন্ধহীন তেতো পাউডার— ওর লাইফ লাইন। গাড়ি চলতে শুরু করার পর আগন্তুক একটা সিল্কের থলে বের করে বলল, ‘এটা মাথায় পরতে হবে।’

    ‘ইম্পসিবল!’ হরিপরসাদ মাথা নাড়ল। ‘ডিলে এটা ছিল না, আমার ক্লস্টোফোবিয়া—’ হরিপরসাদের কথা শেষ হওয়ার আগেই সে অনুভব করল মাথায় একটা ধাতব স্পর্শ। মাথা ঘুরিয়ে দেখল, পিস্তলের নল মাথায় ঠেকানো। ‘আমায় নামিয়ে দাও,’ হরিপরসাদ বলল।

    ‘টু লেট!’ আগন্তুক বলল। অন্য আরোহী হরিপরসাদের মাথায় সিল্কের কালো থলেটা টেনে ঢুকিয়ে দিল। আগন্তুক হিসহিস করে বলল, ‘বলেছিলাম এটা ওয়ান ওয়ে স্ট্রীট।’

    সিল্কের থলের ভিতর একটা মিস্টি গন্ধ, হরিপরসাদের দু-চোখে ঘুম নেমে আসছে। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় হরিপরসাদ বুঝল ওকে কিডন্যাপ করা হল।

    ৷৷ চার ৷৷

    ১৪ই জানুয়ারি, ২০১৯

    সকাল

    এয়ার ফ্রান্সের প্যারিস-বস্টন ফ্লাইট সতের ঘন্টা লেট!

    বোয়িং সেভেন সেভেন সেভেন লোগানের ভেজা টারম্যাক ছুঁতেই সেল ফোন অন করল রিধিমা। ডানদিকের ছুটন্ত জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে শুধু মোনোটোনাস হোয়াইট। প্লেনটা এবার একটা চক্কর খেয়ে রানওয়ে ছেড়ে ট্যাক্সিওয়েজ দিয়ে ধীরে ধীরে টার্মিনালের দিকে এগোতে লাগল। ইনবক্সে একগাদা কালো বোল্ড ইমেইল অপেক্ষারত। হোয়াটসঅ্যাপের চ্যাটগ্রুপে স্যালি আর রিধিমাকে লেখা ডঃ উইকসের একটা মেসেজ—

    SIDDHARTHA @ KAPILAVASTU

    PI – 13,33,24 37,38 22,20,2,20

    মেসেজটা দেখে রিধিমার ভ্রূ কুঁচকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ডঃ উইকসের ফোন নম্বরে স্পিড ডায়াল করল রিধিমা।

    জেট-ব্রিজগুলো প্রায় সবকটাই খালি, কদাচিৎ এক আধটা প্লেন দেখা যাচ্ছে, একটা জেট-ব্লু’র প্লেনকে ডি-আইসিং করা হচ্ছে। সাদা মিহি নুনের ঝড় প্লেনটাকে ঘিরে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বরফ সরিয়ে রানওয়েকে কোনমতে প্লেন ওঠা-নামার উপযুক্ত করা হয়েছে, আর তাতে সৃষ্টি হয়েছে কংক্রিটের ওপর স্থানে স্থানে বরফের টিলা। ফ্লাইট অ্যাটেণ্ডেন্ট ঘোষণা করল বাইরের টেম্পারেচার আট ডিগ্রি ফারেনহাইট। মাইনাস থার্টিন! কানের ভিতর ফোনটা কুরুর-কুরুর করে বেজে ভয়েস-মেলে চলে গেল।

    ডার্ন!

    ফোন বন্ধ করল রিধিমা। এক সপ্তাহ আগে হার্ভার্ড থেকে আচমকা ডঃ উইকসের ফোনটা এসেছিল। তখন রিধিমা ব্যস্ত কলকাতার ইণ্ডিয়ান মিউজিয়ামে একতলায় ‘টেরাকোটা ও মাইনর আর্টস’ গ্যালারির দরজায় টুলে বসে থাকা সিকিউরিটি গার্ডের সঙ্গে তুমুল তর্ক করছে। এই গ্যালারির ভিতর ছবি তোলা বারণ? কেন? গার্ড তার কর্তৃত্ব বজায় রেখে বলছে লেখা আছে বারণ, তাই বারণ। কিন্তু কেন বারণ? রিধিমা নাছোড়। এর চেয়েও কত পুরাতন প্রত্নমূর্তি একতলার অন্যান্য গ্যালারিতে রাখা, সেখানে দর্শকরা হেসেখেলে সেলফি তুলছে, তবে এই কক্ষে এমন অদ্ভূত নিষেধাজ্ঞা কেন? ঠিক তখনই ডঃ উইকসের ইমারজেন্সি ফোন, এক্ষুনি হার্ভার্ডে ফিরে এস। তার সঙ্গে সঙ্গেই ডিন অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের মিটিং নোটিশ। ম্যানডেটরি মিটিং তের তারিখ সন্ধ্যায়। সাবজেক্ট কনফিডেন্সিয়াল। ডঃ উইকসকে প্রশ্ন করেছিল রিধিমা কেন এত আর্জেন্ট তলব? ডঃ উইকস একটু আভাস দিয়েছিলেন— রিধিমার PhD’র ফাণ্ডিংয়ের জন্য একটা বড় গ্র্যান্টের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, কিন্তু ডেডলাইন ১৪ই জানুয়ারি। রিধিমা যেন প্রসপেক্টাসটা কমপ্লিট করে পাঠায়, আর অবশ্যই মিটিঙে আসে। তাছাড়া রিধিমাকে তিনি একটা খুব গোপন ডকুমেন্ট দিতে চান। কী সেই গোপন ডকুমেন্ট? কাল মিটিঙে কী হল? মনে অস্বস্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তার ওপর ডঃ উইকসের এই হেঁয়ালি ভরা ইমেইল। ডঃ উইকস এই সাংকেতিক ভাষায় লেখার খেলায় পারদর্শী, আর মনে করে বাকিরাও বুঝি তার মতই কোড ভাঙায় দক্ষ। কিন্তু, মনে একটা কু-ডাক দিচ্ছে।

    ‘ফ্রিকিং স্নো-স্টর্ম!’ রিধিমা বিড়বিড় করে গালি দিল।

    বেলার দিকে লোগান এয়ারপোর্ট সবে খুলেছে। কাজকম্মোর গতি অতি মন্থর। ইমিগ্রেশনে লাইনই নেই, দ্রুত হয়ে গেল। এক হাতে পাসপোর্ট, অন্য হাতে সেলফোন মুঠোবন্দী করে হনহন করে হেঁটে ব্যাগেজ ক্যারৌসেলে পৌঁছে লাগেজের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল রিধিমার। অধীর হয়ে এদিক সেদিক পায়চারী করতে করতে বার তিনেক ডঃ উইকসকে চেষ্টা করে কোনও সাড়া না পেয়ে ফোন পকেটে রাখল। অসহিষ্ণু মাথাটা ক্ৰমশঃ উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হচ্ছে। লোগানের অবস্থা দুর্বিষহ। চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে প্যাসেঞ্জারদের হতাশ চোখের দৃষ্টি। একজন মহিলা কর্মচারী মাথা ঠাণ্ডা রেখে অধৈর্য যাত্রীদের বোঝাচ্ছে— ‘সুইস এয়ার, ফিন এয়ার, আসিয়ানা এয়ারলাইন্সের লণ্ডন, জুরিখ আর ভিয়েনা থেকে ওড়া ফ্লাইটগুলো আটলান্টিক থেকেই ঘুরিয়ে দিয়েছে ইউরোপের দিকে। আপনাদের ফ্লাইটটা প্রথম ফ্লাইট লোগানে নামল। আপনারা লাকি আপনারা এয়ারপোর্টে নামতে পেরেছেন। লাগেজ এক্ষুনি আসবে, প্লিজ ধৈর্য ধরুন।’

    রিধিমা ভাবল মহিলা ঠিকই বলছে, তার কপালটা বাকিদের তুলনায় ভাল, কিন্তু তার অবস্থা অনেকটা টয়লেটে আসল কাজ শেষ করেও টয়লেট পেপার শেষ বলে মুছে বেরোতে পারছে না। আরও প্রায় আধ ঘন্টা লাগল এয়ারপোর্টের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে। সুটকেসটা নিয়ে এয়ারপোর্টের অ্যারাইভাল লাউঞ্জে এল। থিকথিক করছে যাত্রীদের ভিড়, উইমেন্স রুমের সামনে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রাতজাগা প্যাসেঞ্জারদের লম্বা অধৈর্য লাইন। ভিড়ের মধ্যে দিয়ে ‘এক্সকিউজ মি – এক্সকিউজ মি’ বলে চলার জায়গা বানাতে বানাতে বাইরে বেরোতেই ঠাণ্ডা কনকনে হাওয়ার দাঁত নাকের ওপর যেন ছুরি চালিয়ে দিল, আর সেই সঙ্গে ঠাণ্ডা জিনসের ওপর কেউ যেন থাইতে দুটো বরফের স্ল্যাব চেপে ধরল। নর্থ ফেসের ডাউন ফেদারের জ্যাকেট, মাথায় র‍্যালফ লরেনের উলেন টুপি, হাতে সফট লেদারের গ্লাভস, পায়ে হাঁটু অবধি চেন টানা লেদারের জুতো থাকা সত্ত্বেও সব কিছুকে ছাপিয়ে আটলান্টিকের ফ্রিজিং কোল্ড বাতাস যেন রক্তের ঘনত্ব বাড়িয়ে রক্ত চলাচলের গতি কমিয়ে দিল।

    ‘হার্ভার্ড প্লিজ,’ ক্যাবে উঠে ড্রাইভারকে বলল রিধিমা।

    বস্টন লোগান এয়ারপোর্ট থেকে কেমব্রিজ খুবই কাছে। কিন্তু আজ পথের বরফের জন্য ক্যাবটা মনে হচ্ছে যেন ফার্স্ট গিয়ারে চলেছে। কোথাও রাস্তার ধারে ন্যাশনাল গ্রিডের স্টর্ম রিকভারি ক্রু ট্রাকের উঁচু বুমের মাথায় চড়ে ঝুলন্ত ইলেকট্রিক লাইন জুড়ছে, কোথাও রাস্তায় স্টপ সাইনের ওপর বরফ এমনভাবে সেঁটে রয়েছে যে খুব কষ্ট করে বুঝতে হচ্ছে ওটা স্টপ সাইন। রিধিমার মনের অস্থিরতা ক্রমশঃ বেড়ে চলেছে— ডঃ উইকসকে আবার চেষ্টা করল রিধিমা । নো রিপ্লাই!

    ইউনিভার্সিটির কাছাকাছি এসে ওর অ্যাপল ওয়াচে সময় দেখল রিধিমা— এগারটা। রাস্তার দু’পাশে সাইডওয়াক ঘেঁষে হাঁটু পর্যন্ত উঁচু নোংরা কাদামাখা বরফের দেওয়াল। রিধিমা ক্যাব ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল— ‘সামনে বাও স্ট্রীটের মোড়ে নামাবেন প্লিজ।’

    বাও স্ট্রীটের মোড়ে এক বিশাল চমক! এক নম্বর বাও স্ট্রীটের মুখে হলদে ক্রাইম সিন টেপ দিয়ে কর্ডন করে রাখা। চারটে ‘কেমব্রিজ পুলিশ’ লেখা সাদাকালো ক্রুজার রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে, প্রত্যেক গাড়ির মাথায় লাইটবারে লাল-নীল স্ট্রবলাইট ঘুরে চলেছে, রাস্তায় পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। কেউ ঘাড় কাৎ করে শোল্ডার মাইকে কিছু বলছে, কারও হাতে ওয়াকি টকি, একজন পুলিশের হাতে লিশ, লিশের ওমাথায় জামা-টামা পরা একটা K-9 জার্মান শেফার্ড বরফ শুঁকতে শুঁকতে রাস্তায় নেমে পড়ল। ক্রাইম সিন টেপের বাইরে কিছু কৌতূহলী ছাত্র ও অন্যান্য পথচারীর ভিড়। বেন ওলকেন স্কোয়ারের কুইন্সি রোডের কার্বে একটা SUV, ছাতে লাগানো একটা ডিশ অ্যান্টেনা, আর একজন অল্পবয়সি ব্লণ্ড মহিলা করেসপণ্ডেন্ট একজন ক্যামেরাম্যানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক হাতে মাইক্রোফোন ধরে হাতটাত নেড়ে উত্তেজিত হয়ে অনেক কিছু বলছে। পুলিশের গাড়িগুলোর পাশে একটা মর্চুয়ারি ভ্যান, তার গায়ে লেখা কেমব্রিজ ফরেন্সিক সেন্টার, আর পাশে একটা অ্যাম্বুলেন্স।

    ক্যাবটা অনেকটা দূরে কার্বে দাঁড়িয়ে গেছে। ক্যাব থেকে রাস্তায় নামতেই তীব্র ঠাণ্ডা হাওয়া আবার গালে ক্ষুর ঘষে দিল। ট্রাঙ্ক খুলে রিধিমা রোলার সুটকেসটা রাস্তার বরফ জলের ওপর নামাল ।

    রিধিমা ঠেলেঠুলে জনতার ভিড়ের মধ্যে ঢুকল। দু’জন প্যারামেডিক টেকনিশিয়ান স্ট্রেচারে সাদা চাদর ঢাকা একটা বডি মর্চুয়ারি ভ্যানে ওঠাচ্ছে, আর দু’জন ওয়ান বাও স্ট্রীটের দরজা খুলে আরেকটা বডি বের করছে। অ্যাম্বুলেন্সের খোলা পিছনের দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে পাশে আর একটা সাদা চাদর ঢাকা মৃতদেহ। এক নম্বর বাও স্ট্রীটের দরজায় যে কোরিয়ান মেয়েটা স্টেট ট্রুপারদের মধ্যে দাঁড়িয়ে হিস্টিরিয়া রুগীর মত কাঁপছে, ওকে রিধিমা চেনে, লাস্ট ফলে PhD প্রোগ্রামে এনরোল করেছে মেয়েটা, অ্যালিসিয়া না অ্যালিসন কী যেন নাম। ডেডবডিগুলো ঢোকানো হলে মর্চুয়ারি ভ্যানের পিছনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। তারপর ভ্যানটা সাইরেন বাজাতে বাজাতে ছুটে বেরিয়ে গেল, সঙ্গে গেল দুটো পুলিশ ক্রুজার, অ্যালিসিয়া বা অ্যালিসনকেও সঙ্গে নিয়ে গেল। বাকি গাড়িগুলো রাস্তাতেই রইল।

    ‘মার্ডার!’ রিধিমা পাশের ছেলেটাকে জিজ্ঞাসা করল।

    ‘অ্যালিসনই আজ প্রথম তিনটে ডেড বডি দেখে নাইন ওয়ান ওয়ান কল করে।’ কোরিয়ান ছেলেটা উত্তেজিত। ‘সেমিনার রুমে কার্পেট রক্তে ভিজে—’

    ‘কী হয়েছে সেমিনার রুমে?’

    ‘অ্যালিসন কেন যে ফটোকপি করতে গেছিল তিন তলায়—’

    ‘তিন তলায়! মানে, সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ—?’ রিধিমা ঢোক গিলল।

    ‘ডিরেক্টরের লাশই তো কেমব্রিজ ফরেন্সিক সেন্টারে পাঠানো হচ্ছে, আমি অনেকক্ষণ এখানে। ইমারজেন্সি মেডিক্যাল টিম নাকি অনেকক্ষণ আগেই এদের ডেড ডিক্লেয়ার করে দিয়েছিল, এরা কোরনারের জন্য অপেক্ষা করছিল অফিসিয়ালি ডেড অ্যানাউন্স করার জন্য,’ ছেলেটা বলল। ‘এছাড়া পিবডি মিউজিয়ামের ডিরেক্টর ডঃ উইকস, প্রফেসর স্টিফেনকেও মার্ডার—

    রিধিমার কানে কিছু ঢুকছেনা। মাথা টলছে, মনে হচ্ছে মাটিতে টলে পড়বে।

    সর্বনাশ!

    এদের সঙ্গেই তার কাল সন্ধেবেলা মিটিং ছিল!

    তাহলে?

    বরফের যে ঝড়টাকে সে সারাটা রাস্তা গালাগালি করতে করতে এসেছে সেটা না হলে তার ডেডবডিও এতক্ষণে সাদা চাদর চাপা দিয়ে মর্চুয়ারি সার্ভিসের ভ্যানে কেমব্রিজ ফরেন্সিক সেন্টারের লাশকাটা ঘরের দিকে ছুটে চলত? রিধিমার শরীর থরথর করে কাঁপছে, বাইরের বিলো জিরো টেম্পারেচারও ওকে এতটা শীতল করতে পারেনি। মনে হচ্ছে স্পাইনে কেউ বরফ বেঁধে দিয়েছে, হাড়ে কাঁপুনি ঢুকে গেছে, গরম একটা ড্রিংক এক্ষুনি দরকার। পিছনে গ্র্যাফটন স্ট্রীট পাব, রিধিমা তাড়াতাড়ি ওখানে ঢুকল। বিশাল পাব, কিন্তু এই উইন্টার রিসেসে খালি।

    ওয়েট্রেস মেনু কার্ড নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল।

    রিধিমার হট ক্যাপ্পুচিনো আর ব্লু বেরি মাফিনের অর্ডারে মেয়েটার মুখ দেখে মনে হল টিপসের কথা ভেবে সে হতাশ। রিধিমা সেলফোনটা স্ক্রল করে দেখতে লাগল ডঃ উইকসের হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজের মানে কী?

    মেসেজটা ডঃ উইকস তাকে আর নিজের সেক্রেটারি স্যালিকে পাঠিয়েছেন।

    কিন্তু কী বলতে চেয়েছেন ডঃ উইকস এই সংখ্যার কোডে?

    রিধিমা সংখ্যাগুলোকে নানারকম ভাবে আক্রমণ করল— যোগ-বিয়োগনিউমেরিকের পরিবর্তে অ্যালফাবেট— কিছুতেই কোড ভাঙা যাচ্ছে না— রিধিমা ওর ঘন কোঁকড়া চুলে আঙুল চালাতে চালাতে অন্যমনস্ক হয়ে ভাবতে লাগল কীভাবে সংখ্যাগুলোকে কবজা করা যায়। দাদা হলে এক মিনিটে সলভ করে দিত এই পাজল। চমক ভাঙল, ওয়েট্রেস কফির কাপ আর ট্রেতে মাফিন টেবিলে নামিয়ে রাখছে। রিধিমা তাড়াতাড়ি ক্রেডিট কার্ডটা মেয়েটার হাতে ধরিয়ে দিল— ‘একটু তাড়া আছে।’

    গরম কফির কফির কাপে চুমুক লাগিয়ে রিধিমা দ্রুত চিন্তা করল, আউটলুক মিটিং ইনভাইট অনুযায়ী তাকে নিয়ে পাঁচজনের থাকার কথা। প্রফেসর হফম্যান, প্রফেসর উইকস, প্রফেসর স্টিফেন, আর ডঃ গিলমোর। তিনটে লাশ! ডঃ গিলমোরের ফোন নম্বরটা ফোনে সেভ করা নেই। আউটলুক দেখতে হবে। ব্যাকপ্যাক থেকে ম্যাকবুকটা বের করে খুলল রিধিমা, স্ক্রিনে তখনও জেগে আছে ওর রিসার্চের প্রসপেক্টাস, প্লেনে টেনশনে একদম ঘুম হয় নি, বারবার পড়ছিল প্রসপেক্টাসটা।

    পঁচাত্তর পাতার ডিসারটেশন প্রসপেক্টাস। ওর অ্যাডভাইসার, ডিরেক্টর সবাই একসঙ্গে খুন হয়ে গেল? তাহলে PhD-র কী হবে? নতুন কোনও অ্যাডভাইসার? রিধিমা কিছু ভাবতে পারছে না। পেজটা মিনিমাইজ করল রিধিমা।

    ওয়েট্রেস ফিরে এল। ‘সরি, কার্ড ডিক্লাইণ্ড!’

    ‘হোয়াট? রিধিমা অবাক। ‘সেভেন ডলার নাইনটি ফাইভ সেন্ট ওনলি! ডিক্লাইন্ড?’

    মেয়েটা অশ্রদ্ধার সঙ্গে ক্রেডিট কার্ডটা ফেরত দিল।

    রিধিমা খুব বিব্রত হয়ে পার্স থেকে একটা দশ ডলারের বিল বের করে বলল, ‘কিপ দ্য চেঞ্জ।’ রিধিমা দুরন্ত লজ্জার সঙ্গে ক্রেডিট কার্ডটা পার্সে ঢোকাবার সময় চারদিকে তাকাল, কেউ দেখেনি তো? আর তখনই রিধিমার অ্যানিমেল ইন্সটিংক্ট অস্বস্তিকর ভাবে ওকে জানিয়ে দিল যে কাঁচের দেওয়ালের গায়ে টুলের ওপর বসা স্কেচি লোকটা চোখের দৃষ্টি ওর থেকে সরিয়ে নিয়ে বাইরে তাকাল। লোকটা ওর দিকে আবার তাকাল, আবার চোখে চোখ পড়তেই চোখ ঘুরিয়ে নিল আর সেলফোনটা হাতে তুলে নিল। এক নজরে লোকটার দিকে একটা দৃষ্টি ছুড়েই দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল রিধিমা, মাথায় টুপি পড়া থাকলেও টানা চোখ দেখে মনে হচ্ছে লোকটা চিনা, বেশ ভারি বড়সড় চেহারা, কোনায় পর্কের র‍্যাক আর কোক নিয়ে বসে সেলফোন কানে, কিন্তু মাঝে মাঝেই ওর দিকে তাকাচ্ছে। লোকটার ডান কানটাতে একটা কাটা দাগ। লোকটার চোখ টকটকে লাল যেন সারা রাত ঘুমোয়নি, মেসড আপ লুক, চেহারায় রুক্ষতা।

    আউটলুকে গেল রিধিমা। পকেট হাতড়াল একটা কাগজের জন্য। হাতে উঠে এল বোর্ডিং পাসটা। ডঃ গিলমোরের ফোন নম্বরটা বোর্ডিং পাসের উলটো দিকে নোট করল৷ তবে ডঃ গিলমোরও কি তার মত ব্লিজার্ডের জন্য এই মিটিঙে আসতে পারে নি?

    রিধিমা ডঃ গিলমোরকে ফোনে পেল। খবরটা শুনে যেন ডঃ গিলমোরের মাথায় বজ্রপাত হল। টেলিফোন কিছুক্ষণ চুপ।

    ‘ডঃ গিলমোর?’ কোনও উত্তর নেই। ‘আর ইউ দেয়ার?’

    আমি ঠিক আছি। কিন্তু আমার খুব চিন্তা হচ্ছে তোমার জন্য।’

    আপনি কি জানতেন কীসের জন্য আমাকে এত তাড়াহুড়ো করে ডেকে আনা হল? কী এই কনফিডেন্সিয়াল মিটিং?’

    ‘তুমি এক্ষুনি হার্ভার্ড পুলিশের হেল্প নাও। রিধিমা, ইয়োর লাইফ ইজ ইন ডেঞ্জার।’

    ‘আমার লাইফ! কেন? আমি কী করেছি?’ রিধিমা অবাক।

    ‘সময় নষ্ট কোরো না।’

    ‘কিন্তু পুলিশকে আমি কী বলব? কেন আমার লাইফ ইন ডেঞ্জার?’

    ‘আমাকেও লুকিয়ে পড়তে হবে। এক্ষুনি। এরা ডেঞ্জারাস। কল ট্রেস করছে নিশ্চয়ই। আমাকে আর ফোনে তুমি পাবেনা।’

    ‘কারা ডেঞ্জারাস? ডঃ গিলমোর – ডঃ গিলমোর!’

    স্ট্রেঞ্জ! রিধিমা রিডায়াল করল। ফোন বেজে চলল, কোনও উত্তর নেই।

    পিছনে চিনা লোকটা সেলফি নিল, রিধিমা বেশ বুঝল আসলে রিধিমার ছবি তুলল। লোকটা এখনও বারবার ওর দিকে চোরা চাহনি দিচ্ছে। অস্বস্তিতে ল্যাপটপ বন্ধ করে ব্যাকপ্যাক পিঠে ঝুলিয়ে স্ট্র্যাপদুটো টেনে রোলার সুটকেসটা টানতে টানতে কাফে থেকে বেরিয়ে এল রিধিমা। সাইডওয়াক খুব পিচ্ছিল, দ্রুত হাঁটা যাচ্ছে না। সুটকেসটা হাতে তুলে নিয়ে জিরাফের মত ঠ্যাং লম্বা করে বরফের দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে রাস্তায় নেমে আবার বাও স্ট্রীটের মোড়ে ক্রাইম সিন টেপের কাছে এল রিধিমা। ওখানে ভিড় এখন কমেছে। দু’জন অফিসার ক্রুজার দুটোর পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল, বিল্ডিংয়ের দরজা থেকে একজন CSI বেরিয়ে এল, হাতে একটা সি থ্রু ব্যাগ। এতক্ষণ ভিতরে নিশ্চয়ই DNA স্যাম্পল, ফিঙ্গারপ্রিন্ট, পায়ের ছাপ নিতে ব্যস্ত ছিল। ডঃ গিলমোর বলেছেন পুলিশের আশ্রয় নিতে। এখানে পুলিশের আশ্রয় কীভাবে নেবে? কী বলবে? ডঃ গিলমোর খুব ঘাবড়ে গেছেন। ওর সঙ্গে একবার কথা বলতেই হবে৷ উনি ‘গোপন কিছু জানেন, কেন মার্ডারগুলো হল সেটা জানা এক্ষুনি দরকার। স্যালি কি জানে কীসের মিটিং ছিল কাল? স্যালির সঙ্গে দেখা করবে? পিছনে তাকাল রিধিমা। লোকটাকে পাবের কাঁচের দেওয়াল দিয়ে দেখা যাচ্ছে। লোকটা উঠে দাঁড়িয়েছে। রিধিমার ভয় ভয় করতে লাগল। তাড়াতাড়ি ম্যাসাচুসেটস অ্যাভিনিউ পেরিয়ে ওপারের সাইডওয়াকে উঠল রিধিমা।

    লোকটা এবার পাবের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। রিধিমা সাইডওয়াক ধরে তাড়াতাড়ি হাঁটতে লাগল। লক্ষ্য একটা ক্যাব। সামনে পরপর দুটো কেমব্ৰিজ ক্যাব দাঁড়িয়ে। রিধিমা সুটকেসটা প্রথম ক্যাবে তুলে বলল, ‘পার্কিন্স হল।’

    পাঁচ মিনিটে ক্যাব পার্কিন্স হলের সামনে পৌঁছে দিল। রিধিমা রোলার সুটকেস টানতে টানতে হলের সদর দরজার দিকে এগোল। ইটের সাইডওয়াক থেকে সুটকেসটা চারটে সিঁড়ি টেনে তুলতে রিধিমা অনুভব করল শরীরের শক্তিকে অনেকটা খেয়ে নিয়েছে আতঙ্ক। পার্কিন্স হলের বাইরের স্টর্ম ডোর দিয়ে ভিতরে ঢুকে স্বস্তি পেল রিধিমা, বাইরের ঠাণ্ডাটা নেই। সামনে ভিতরে যাওয়ার অটোমেটিক মেন গেট। রিধিমা ডোর স্ক্যানারে ওর হার্ভার্ডের স্টুডেন্ট আইডি কার্ড স্ক্যান করল।

    স্ক্যানারে সবুজ আলোর পরিবর্তে লাল আলো!

    ‘হোলি সুগার!’ রিধিমা হতভম্ব।

    আবার চেষ্টা করল, এবারও লাল আলো, দরজা খুলল না।

    সারপ্রাইজের পর সারপ্রাইজ!

    রিধিমা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে স্টর্ম ডোরের মাঝের কাঁচ দিয়ে তাকিয়ে দেখল একটা ক্যাব এসে থামল। গ্র্যাফটন স্ট্রীট পাবের সেই কানকাটা লোকটা নামল। লোকটা রাস্তার উল্টোদিকে কোন্যান্ট হলের দিকে যেতে যেতে ফোনে কথা বলতে বলতে দাঁড়িয়ে গেল, তারপর পিছন ফিরে পার্কিন্স হলের দিকে বারবার তাকাতে লাগল। কেউ নেই কাছাকাছি রিধিমাকে দরজাটা খুলে দেবার জন্য। হঠাৎ কোথা থেকে একজোড়া জাপানী ছেলে মেয়ে দেবদূতের মত পিছন থেকে আবির্ভূত হল। ছেলেটা আই কার্ড স্ক্যান করতেই দরজা খুলে গেল। রিধিমা পিগিব্যাকিং করে দরজা বন্ধ হওয়ার আগে দরজাটা ধরল। জাপানি ছেলেটা একটু দ্বিধাগ্রস্ত, চেনা মুখ, তবু হার্ভার্ড অথরিটির কড়া নির্দেশ নো পিগিব্যাকিং।

    ‘থ্যাঙ্কস, আই কার্ডটা কাজ করছে না,’ রিধিমা ভিতরে ঢুকল। সিঁড়ি দিয়ে তাড়াতাড়ি দোতলায় নিজের রুমে পৌঁছোল রিধিমা। চাবির গর্তে চাবি ঘুরিয়ে দরজা ফাঁক করতেই রিধিমার চক্ষুস্থির।

    পুরো ঘরটা অস্বাভাবিক টিপটপ ভাবে গোছানো। জীবনে কোনও দিন রিধিমা নিজের ঘর এত পরিষ্কার রাখেনি। কিন্তু কয়েকটা নতুন বস্তু দেখা যাচ্ছে। ডেস্কে রাখা তিনটে ল্যাপটপ!

    এতগুলো ল্যাপটপ!

    এগুলো কার? কোথা থেকে এল?

    ওর অনুপস্থিতিতে কে এসেছিল ঘরে?

    ক্লজেট খুলে আরও অবাক রিধিমা। ওর জ্যাকেটটা ভেজা, মনে হচ্ছে এটা পরে কেউ রাতে বরফঝড়ের মধ্যে ঘুরেছে, নিচে জুতো চুবচুব করছে ভিজে, জুতোর ওপর ওর ভেজা মোজা রাখা।

    কে ওর জ্যাকেট পরে রাতে ঘুরেছে?

    জ্যাকেটটা ক্লজেটের হ্যাঙার থেকে বের করল রিধিমা, ঠক করে ভারি কিছু একটা জ্যাকেটের পকেট থেকে মাটিতে পড়ল।

    রিধিমা মেঝের দিকে তাকাল।

    একটা পিস্তল!

    পিস্তল?

    রিধিমা নিচু হয়ে পিস্তলটা তুলল। জীবনে এই প্রথম রিধিমা আগ্নেয়াস্ত্র ধরল। প্রচণ্ড অস্বস্তি, হাতে যেন ফরবিডেন অ্যাপল। বুক অজানা আশঙ্কায় ধকধক করতে লাগল।

    পিস্তলটা বিছানায় ছুড়ে দিল রিধিমা। জ্যাকেটের অন্য পকেটটা ঝুলছে। পকেট হাতড়াতেই বেরিয়ে এল একটা ওয়ালেট। ভিতরে একটা পুলিশ অফিসারের ID!

    এগুলো এখানে কেন?

    রিধিমার স্পাইনাল কর্ডে শীতল স্রোত বয়ে গেল ডঃ গিলমোর ঠিক বলেছেন। এক্ষুনি হার্ভার্ড পুলিশকে ফোন করে সব জানাতে হবে।

    হঠাৎ বাইরে অ্যাম্বুলেন্সের অ্যালার্ম বেজে উঠল। রিধিমা ভেনিশিয়ান ব্লাইণ্ডটা অল্প তুলে রাস্তার দিকে তাকাল। এবার একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে থামল পার্কিন্স হলের সামনে রাস্তার উলটো দিকে। অ্যাম্বুলেন্সের পিছনের দরজা খুলে দুটো লোক একটা স্ট্রেচার নিয়ে তাড়াতাড়ি নামল। কানকাটা চিনা লোকটা এবার দৌড়ে এসে এদের সঙ্গে একজোট হল, তারপর অক্সফোর্ড স্ট্রীটের সাইডওয়াকে দাঁড়িয়ে রিধিমার রুমের দিকে দেখাল। লোকদুটোও রিধিমার রুমের দিকে তাকাল। তারপর তিনজনে রাস্তার চারদিকে তাকিয়ে দ্রুত পায়ে অক্সফোর্ড স্ট্রীট পেরিয়ে তার হলের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তাড়াতাড়ি ভেনিশিয়ান ব্লাইণ্ডটা নামিয়ে দিল রিধিমা। ওর সিক্সথ সেন্স বলছে বিপদ সন্নিকটে। ওরা ওকেই ধরতে আসছে। কাল রাতের অসমাপ্ত কাজটা এখানে সেরে ওকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে কোনও ডাম্পস্টারে ফেলে দেবে। যতদিনে পচা গন্ধ বেরোবে ততদিনে কানকাটা চিনা চিনে ভ্যানিশ।

    এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ব্যাকপ্যাক পিঠে তুলে চটপট হলওয়েতে বেরিয়ে এল রিধিমা। তারপর দ্রুতপায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে পার্কিন্স হলের পিছনের দরজা দিয়ে হল থেকে বাইরে বেরিয়ে, পিছনের দরজাটা বন্ধ করল। পিছনের পার্কিং লটে বরফের কাদা। রিসাইকেল ডাম্পস্টারগুলো উপছে পড়ছে মুভ-ইন বক্সেস, পিৎজার বাক্স, ফেডেক্সের কার্ডবোর্ড বক্স, প্লাস্টিকের ওয়েস্ট। রিধিমা দৌড়ে ওর গাড়ির কাছে গেল।

    পার্কিং লট প্রায় খালি, পাশাপাশি কয়েকটা মাত্র গাড়ি, সবকটা বরফে ঢেকে যেন ইগলু। কোনটা কার গাড়ি তা বোঝা যাচ্ছে না। রিধিমা চাবির গোছা বের করে রিমোটে চাপ দিতেই বরফের ভিতর থেকে ওর নিশান সেন্ট্রাটা কঁক করে আনুগত্য জানাল। হঠাৎ রিধিমার দৃষ্টি নিবদ্ধ হল পিছনের বাঁদিকের চাকায়।

    ফ্ল্যাট টায়ার!

    ইণ্ডিয়া যাওয়ার দিনও সে গাড়ি চালিয়েছে! পরক্ষণেই চোখ গেল পিছনের ডানদিকের চাকায়— সেটাও চুপসে আছে। রিধিমার মনে আর তিলমাত্র সন্দেহ রইল না যে কেন তার ক্রেডিট কার্ড ডিক্লাইন্ড আর কেনই বা ID দিয়ে পার্কিন্স হলের দরজা খোলে নি।

    বুক ধক করে উঠল রিধিমার। লোকগুলো ওর রুমে গিয়ে ওকে না পেলে এক্ষুনি বেরিয়ে আসবে। এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করা চলবে না। পাশের সরু গলিটার ওপাশে ম্যাক্সওয়েল ডরকিন অ্যাপ্লায়েড কম্পিউটেশনাল সায়েন্স বিল্ডিং। রিধিমা অক্সফোর্ড স্ট্রীটের এন্ট্রান্সের দিকে ছুটল। বিশাল কাঁচের দরজাটা ঠেলতেই খুলে গেল। ভিতর একদম খালি। এসব জায়গা স্কুল সিজনে গমগম করে। খালি টেবিল পাওয়াই মুশকিল। ল্যাপটপের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকে স্টুডেন্টরা – কিন্তু এখন ছুটিতে সব খালি – শুধু একটা লোক লম্বা এক্সটেনশন কর্ড লাগিয়ে ফ্লোর ভ্যাকিউম করছে।

    রিধিমা এক্সিকিউটিভ সেমিনার রুমের পাশ দিয়ে ছুটে দোতলার সিঁড়িতে উঠল। অ্যাপ্লায়েড কম্পিউটেশনাল সায়েন্স আর ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাপ্লায়েড ম্যাথেমেটিকস দুটো পাশাপাশি বিল্ডিং দোতলায় কানেকটার দিয়ে জোড়া। নিচ দিয়ে গাড়ির রাস্তা। কাঁচে ঢাকা ওয়াক-ওয়ে, কাঁচের দেওয়াল দিয়ে রিধিমা দেখল একটা ক্রুজার সাইরেন বাজাতে বাজাতে পার্কিন্স হলের দিকে ছুটে তেরছা করে রাস্তা আগলে দাঁড়াল। পিছনে আরেকটা ক্রুজার ছুটে এল। আর অ্যাম্বুলেন্সটা স্টার্ট করে বেরিয়ে গেল।

    পুলিশ এখানে পার্কিন্স হলে কেন?

    রিধিমা কানেকটারের ভিতর দিয়ে দৌড়ে অ্যাপ্লায়েড ম্যাথ ডিপার্টমেন্টে ঢুকল। খালি ডিপার্টমেন্ট, ছুটিতে বন্ধ তাই হলওয়ে অন্ধকার। হলওয়েতে একটা অফিসের বাইরে দেওয়ালের গা ঘেঁষে দুটো চেয়ার পাতা। রিধিমা সেখানে বসে হাঁফাতে লাগল। পুলিশকে সব জানাতে হবে। হার্ভার্ড পুলিশের নম্বরটা ID’র পিছনে লেখা। রিধিমা হার্ভার্ড পুলিশকে ডায়াল করা শুরু করল 617-495-12আর ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল।

    ‘ইজ ইট রিধিমা বোস?’ ওপাশে পুরুষের ভারি গলা।

    ‘হু ইজ ইট?’ রিধিমা তখনও হাঁফাচ্ছে।

    ‘কেমব্রিজ পুলিশ ডিপার্টমেন্ট।’

    রিধিমার শরীরে যেন কয়েক গ্যালন এনার্জি ড্রিঙ্কস কেউ ঠেসে ঢুকিয়ে দিল। ‘থ্যাঙ্ক গড! আমি পুলিশকেই কল করতে যাচ্ছিলাম—’

    ‘শাট আপ!’ অন্যদিক থেকে জোর ধমক ভেসে এল।

    ‘হোয়াট?’

    ‘ইউ বিচ! দাদার ওয়ালেট তোর ঘরে কীভাবে এল? উই উইল হান্ট ইউ ডাউন!’

    রিধিমা ভয়ে কেঁপে উঠল, মিনমিন করে বলল— ‘হান্ট মি ডাউন? কেন? আমি কী করেছি?’

    থ্রি কাউন্টস অব ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার অ্যাণ্ড ওয়ান কাউন্ট অফ সেকেণ্ড ডিগ্রি মার্ডার—’ তারপর পুলিশটা আইনি শব্দ ত্যাগ করে পাতি গালি দিল— ‘বেজম্মার বাচ্চা! তুই আমার দাদাকে খুন করেছিস!’

    ‘আমি! মাথা খারাপ? কে আপনার দাদা?’ রিধিমা অবাক।

    ‘বিচ! ইউ হোয়্যাকড হিম লাস্ট নাইট!’ লোকটার মুখ থেকে ড্রাগনের মত আগুন বেরোচ্ছে। ‘আমরা চার ভাই পুলিশে। তুই লোকাবি কোথায়? তুই কাউন্টি কোর্ট পর্যন্ত পৌঁছোবি না। তোর কপালে পিস্তল রেখে কন্ট্যাক্ট শট করব, ঠিক যেভাবে তুই হার্ভার্ড ইয়ার্ডে দাদাকে মেরেছিস সেভাবে। তুই সারেণ্ডার করলেও তোকে আমরা মারব, সোয়্যার টু গড, তোকে না মেরে আজ বাড়ি ফিরব না—’

    ফোনটা ভয়ের চোটে বন্ধ করে দিল রিধিমা। থরথর করে ভয়ে হাত কাঁপছে। কিছু একটা সিরিয়াস ভুল হয়েছে। এসব বিশ্বাসই হচ্ছে না। দুঃস্বপ্ন মনে হচ্ছে । ফেক কল না তো? খুনিটাই না তো? ওর ডর্মে তিনটে ল্যাপটপ আর একটা পিস্তল রেখে যেতে পারলে ওর এই ফোন নাম্বার নিশ্চয়ই ওর কাছে আছে।

    কিন্তু এখন অত রিসার্চ করার সময় নেই। রিস্ক নেওয়া যাবে না। কোনও পুলিশের ধারেকাছে এখন যাওয়া উচিত হবে না। বস্টন থেকে যেভাবেই হোক যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরিয়ে যেতে হবে। রিধিমা চটপট ল্যাপটপ বের করল। অ্যাসেলা ধরতে পারলে বেস্ট, সাড়ে তিন ঘন্টায় নিউ ইয়র্ক। রিধিমা ল্যাপটপ খুলে অ্যামট্র্যাক ওয়েবসাইটে গেল। শুধু অ্যাসেলাই ক্যান্সেল তা নয়, অ্যামট্র্যাক সার্ভিস নর্থ-ইস্ট করিডরের একশ ছটা ট্রেনের সবকটা ট্রেন কাল দুপুর পর্যন্ত ক্যান্সেল করে দিয়েছে। লাইনের ওপর দুফুট বরফ জমে রয়েছে। রিধিমা ল্যাপটপে গ্রেহাউণ্ড ওয়েবসাইটে গেল। সিভিয়ার ওয়েদারের জন্য বস্টনমন্ট্রিয়েল, বস্টন-নিউ ইয়র্ক সিটি, বস্টন-অলবানি, বস্টন-বাঙ্গার সব ক্যানসেল্ড। এয়ারপোর্টের অবস্থা রিধিমা নিজের চোখেই দেখে এসেছে। পপুলেশন এক্সপ্লোশন৷ অসম্ভব। তবু রিধিমা এক্সপিডিয়া থেকে লোগানের ডিপারটিং ফ্লাইটগুলোর স্কেজিউল আর টিকিট অ্যাভেইলেবিলিটি দেখল। সব ফুল৷ রিজার্ভের জন্য স্ট্র্যাণ্ডেড প্যাসেঞ্জাররা এয়ারলাইন্সগুলোকে ভরিয়ে রেখেছে। অনেক খুঁজে খুঁজে রিধিমা পেল ডেলটার একটা ফ্লাইট আছে বস্টন নিউ ইয়র্ক। দুটো মাত্র টিকিট আছে। আশায় রিধিমার আঙুল ল্যাপটপের কী বোর্ডে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তিনটে পাঁচের ফ্লাইট, গলা কাটা দাম সাড়ে চারশ ডলার ওয়ান ওয়ে। তবু এখন ডলার বাঁচানোর কথা ভাবার প্রশ্নই উঠছে না। আগে প্রাণ। বস্টন থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। অন্য কেউ টিকিট কেটে ফেলার আগেই টিকিটটা ধরতে হবে। রিধিমা অন-লাইনে টিকিটটা কাটার জন্য ক্রেডিট কার্ড নম্বরটা পাঞ্চ করল৷

    কার্ড ডিক্লাইন্ড!

    রিধিমা ভুলেই গেছিল। আরেকটা কার্ড আছে, ওর ব্যাঙ্কের ডেবিট কার্ড । রিধিমা ওটার নম্বর পাঞ্চ করল। আবার ডিক্লাইন্ড।

    ‘কেউ আমার আইডেন্টিটি থেফট করেছে!’ রিধিমা ল্যাপটপ বন্ধ করল। কে? খুনিরা? নাকি পুলিশ?

    যেই হোক এদের হাত অনেক লম্বা।

    রিধিমা ঢোক গিলল। গাড়ির টায়ার ফ্ল্যাট, ক্রেডিট কার্ড হ্যাকড, অন-লাইন টিকিট কাটতে পারছে না, তাহলে ও হার্ভার্ড ছেড়ে বেরোবে কীভাবে? পুলিশের কাছে সারেণ্ডার করতেও ভয় করছে, পকেটে হাত ঢোকাতেই বোর্ডিং পাসটা অনুভব করল রিধিমা। রিধিমা ফোনটা বের করে ডায়াল করল। ডঃ গিলমোরের ফোন বেজেই চলল কিছুক্ষণ। তারপর ডঃ গিলোমোরের শঙ্কিত গলা— ‘হ্যালো।’

    ‘ডঃ গিলমোর! দিস ইস রিধিমা।’

    ‘রিধিমা!’ ডঃ গিলমোরের গলায় বিস্ময়। ‘তোমাকে বলেছি আমাকে ফোন করো না! তুমি পুলিশের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করেছ?’

    ‘পুলিশ বলছে আমিই নাকি অ্যাসাসিন, পুলিশ মেরেছি— আমি তো ভাবতেই পারছি না-’

    ‘পালাও। ওরা তোমাকেও মেরে ফেলবে।’ ডঃ গিলমোর খুব নার্ভাস।

    ‘কারা?’ রিধিমার স্বর উচ্চগ্রামে। ‘ডঃ গিলমোর, প্লিজ বলুন কী হয়েছে? কেন আমাকে কেউ মারবে?’

    ‘একটা বড় অর্গানাইজড ক্রিমিনালের দল। পুলিশ-টুলিশকেও এরা কিনে রাখতে পারে। তুমি জীবিত থাকলে ওদের প্রচুর টাকার লোকসান হয়ে যাবে। ওরা সেই ঝুঁকি নেবে না। তুমি ইণ্ডিয়ান এম্বাসীতে শেল্টার নাও। এক্ষুনি হার্ভার্ড ছেড়ে পালাও।’

    ‘পালাব কীভাবে? অনলাইন টিকিট কাটতে পারছি না। কেউ আমার আইডেন্টিটি থেফট করেছে।’

    ‘আমি এখান থেকে এটুকুই তোমাকে সাজেস্ট করতে পারি।’

    ‘আপনি কোথায়?’

    ফোন কেটে দিল ডঃ গিলমোর। খুব ভয় পেয়ে গেছে। রিধিমা ল্যাপটপ বন্ধ করল। সংখ্যাগুলো কী হতে পারে? P.I কেন? এই P.I অক্ষরদুটোর সঙ্গে খুবই পরিচিত রিধিমা। সপ্তাহে অন্ততঃ কয়েক শ’ বার করে এই অক্ষরদুটোকে ঝেলতে হয়। ওর থিসিসের মেরুদণ্ড PITRAWA INSCRIPTION। কিন্তু সংখ্যাগুলো কী? এই সংখ্যাগুলো পিতরাওয়া ইন্সক্রিপশনের পজিশনের নাম্বার না তো?

    তাড়াতাড়ি কী-বোর্ডে দ্রুত অঙ্গুলিচালনে ল্যাপটপের স্ক্রিনে পিতরাওয়া ইনস্ক্রিপশন আনল রিধিমা।

    ইয়ং সলিল নিধনে বুধস ভগবতে সকিয়নং সুকিতিভতিনং সভতিনিকনং সপুতদলনং।

    সেলফোনে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট খুলে দেখে নিল ডঃ উইকসের সংখ্যাটা, তারপর গুনে গুনে অক্ষরগুলোকে একটা কাগজে নামিয়ে আনল রিধিমা।

    ল্যাপটপ ব্যাকপ্যাকে ঢুকিয়ে উঠে দাঁড়াল রিধিমা। বাঁ দিকে সিঁড়ি। লেখাটার মানে সে পড়তে পেরেছে। কিন্তু এই মেসেজটা স্যালিকেও কেন পাঠাল ডঃ উইকস? স্যালি তো ব্রাহ্মী জানে না। রিধিমা দ্রুত পায়ে নেমে গেল নিচে। দরজা খুলে বাইরে যাওয়ার আগে একবার উঁকি মেরে দেখে নিল। অ্যাম্বুলেন্সটাকে দেখা যাচ্ছে না। পুলিশ ক্রুজার দুটো এখনো পার্কিন্স হলের সামনে দাঁড়িয়ে মেঘলা-কালো দিনে আলো ছড়াচ্ছে।

    অক্সফোর্ড স্ট্রীটের ওপারে ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম। পিবডি আর্কিওলজি মিউজিয়াম বিল্ডিংটা ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের গায়েই। ভিতর দিয়ে এক মিউজিয়াম থেকে অন্য মিউজিয়ামে যাওয়া যায়। ছুটে অক্সফোর্ড স্ট্রীট পার হতে গেলে ওই লোকগুলো ওকে দেখে ফেলবে।

    কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল রিধিমা। মিনিট দশেক পর ক্রুজারদুটো বেরিয়ে গেল। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে রিধিমা দরজা খুলে বাইরে এল। তেরছা ভাবে অক্সফোর্ড স্ট্রীট পার হয়ে রিধিমা হফম্যান ল্যাবরেটোরির পাশের গলিতে ঢুকে পড়ল। এই গলিটা পিবডি মিউজিয়াম পর্যন্ত চলে গেছে। এদিকে একদম বরফ পরিষ্কার করা হয় নি। রিধিমা সাবধানে পিবডির সিঁড়ি ভেঙে ভিতরে ঢুকল। বাঁদিকে রিসেপশন, সামনে ফার্স্ট-ফ্লোরের গ্যালারি। রিসেপশনে কেউ নেই। রিধিমা দ্রুতপায়ে গ্যালারির দিকে হেঁটে রিসেপশনের পিছনের এডুকেশন ডিপার্টমেন্টের কাঁচের দরজায় টকটক করে টোকা দিতেই ভিতর থেকে স্যালি এসে দরজা খুলে দিল। স্যালির চোখে মুখে আতঙ্ক।

    ‘রিধিমা!’ বিস্ময়ে স্যান্সির চোখ কোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। ‘এসো এসো তাড়াতাড়ি।’ দরজা বন্ধ করে দিল স্যালি। উত্তেজনায় জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে বৃদ্ধা। ‘সাচ হেইনাস ক্রাইম! আমার হাজব্যাণ্ড টিভিতে দেখেছে বলল । এটা কার কাজ?’

    ‘পুলিশ এখানে এসেছিল?’ নষ্ট করার মত সময় রিধিমার হাতে নেই।

    ‘তোমাকে এত নার্ভাস দেখাচ্ছে কেন রিধিমা?’

    ‘স্যালি, একজন পুলিশও কাল রাত্তিরে খুন হয়েছে। সেই মৃত পুলিশের তিন ভাই পুলিশে চাকরি করে। ওদের এক ভাই আমাকে ফোন করে শাসিয়েছে, বলেছে ধরতে পারলেই আমার কপালে বন্দুক রেখে কন্ট্যাক্ট শট করবে—’

    ‘মাই গুডনেস!’ স্যালি আঁতকে উঠল। তারপর বলল, ‘পুলিশ আসেনি এখানে। কিন্তু ওটা ফেক কল না তো?’

    ‘আমার মনেও একবার সন্দেহটা এসেছে। কিন্তু ফেক কল কিনা সেই রিসার্চ করার মত সময় আমার কাছে নেই।’

    ‘ফোন নম্বরটা রিসেন্ট কল লিস্টে আছে না?’

    ‘হ্যাঁ এই যে,’ রিধিমা ফোন বের করে স্যালিকে দেখাল। ‘স্যালি, আমাকে এক্ষুনি পালাতে হবে। ‘

    স্যালি তাড়াতাড়ি ফোন নম্বরটা লিখে নিল। ‘আমি দেখছি খুঁজে—’

    ‘ডঃ উইকসের রুমের চাবিটা দাও,’ রিধিমা বলল।

    স্যালি ড্রয়ার থেকে চাবিটা বের করে ডঃ উইকসের অফিস খুলে দিল। স্যালি জানে এই মেয়েটাকে ডঃ উইকস নিজের মেয়ের মত ভালবাসেন, মানে ভালোবাসতেন।

    ‘স্যালি, আমাদের গ্রুপ চ্যাটে তুমি ডঃ উইকসের মেসেজটা পেয়েছ?’ রিধিমা ডঃ উইকসের ডেস্কের কাগজের জঙ্গল ঘাঁটতে লাগল।

    ‘পেয়েছি, কিন্তু মাথামুণ্ড বুঝতে পারছি না। কী খুঁজছ?’

    ‘কোনও পার্সোনাল টেলিফোন ডিরেক্টরি আছে ওর?’ রিধিমা ড্রয়ারগুলো খুলে খুলে ঘাঁটতে লাগল। একদম নিচের ড্রয়ারে গিয়ে পাওয়া গেল টেলিফোন ডিরেক্টরিটা। রিধিমা ডিরেক্টরিতে ‘S’ এর পাতা পাতিপাতি করে খুঁজেও নামটা খুঁজে না পেয়ে মুখে বিরক্তিসূচক পুচ করে আওয়াজ করল। তারপর পিছনের কয়েকটা পাতা খুঁজতে লাগল।

    ‘কার ফোন নাম্বার খুঁজছ?’ কিছু বুঝতে না পেরে স্যালি কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

    ‘স্যালি, সুনয়ন কে?’ রিধিমা খোঁজা থামিয়ে স্যালির দিকে তাকাল।

    ‘সুনয়ন!’ স্যালি ভ্রূ কুঁচকাল। ‘আমাদের হার্ভার্ডের কোনও ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট?’

    ‘ডঃ উইকস কখনো সুনয়ন নামটা বলেছেন?’

    ‘নাঃ, স্যালি মনে করার চেষ্টা করল। ‘কেন বলতো?’

    রিধিমা কাগজটা পকেট থেকে বের করে দেখাল—

    ‘স্যালি, ভক্তি নামটা কখনো ডঃ উইকসের মুখে শুনেছ?’

    ‘ভ-ক-টি?’ স্যালি অবাক হয়ে রিধিমার মুখের দিকে তাকাল। তুমি শিওর ডঃ উইকস ভক্তি নামটাই লিখেছেন?’

    ‘হ্যাঁ৷ কিন্তু উনি শুধু আমাকে মেসেজটা না পাঠিয়ে তোমাকেও কেন পাঠিয়েছেন? প্লিজ একটু চিন্তা কর, যদি মনে আসে।’

    স্যালি এবার চিন্তা না করেই বলল, ‘হার্ভার্ডের পুরোনো লোকেরা হয়তো মনে করতে পারবে যে ভক্তি নামে ডঃ উইকসের বাড়িতে এক গায়ানিজ নার্সমেইড থাকত।’

    ‘নার্স!’ রিধিমা অবাক। ‘ডঃ উইকসের নার্স?’

    ‘মিসেস উইকসের। গোর মাউন্টেনে স্কি করতে গিয়ে ওর ন্যাস্টি ফল হয়। স্পাইনে পাথরের চোট লেগে কোমর-হিপ-লোয়ার বডিতে প্যারালিসিস হয়ে গেছিল। যতদিন জীবিত ছিলেন টোটালি বেড-রিডেন। ওর জন্য একটা নার্স রাখা হয়েছিল। মেয়েটার নাম ছিল ভক্তি।’

    ‘সেই নার্সের কথা কেন এতদিন পর উনি উল্লেখ করছেন?’ স্যালি নিরুত্তর।

    ‘স্যালি, আমার হাতে একদম সময় নেই, ডঃ উইকসকে যারা মেরেছে তারা আমার পিছনে লেগে গেছে। স্নো-স্টর্ম আমায় বাঁচিয়েছে, না হলে আমার ডেডবডিও এতক্ষণে মর্গে শোয়ানো থাকত। প্লিজ বল ভক্তির সম্বন্ধে যা জানো।’

    ‘ভক্তি বছর দুয়েক ছিল ডঃ উইকসের বাড়িতে,’ স্যালির মন অতীতে। ‘মিসেস উইকসের সঙ্গে যখন দেখা করতে যেতাম তখন আমরা ওকে দেখেছি, খুব কাজের এবং চটপটে সপ্রতিভ মেয়ে ছিল। এবং বেশ সুন্দরী। তারপর একদিন হঠাৎ ও কাজ ছেড়ে চলে যায়।’

    ‘কেন?’ রিধিমা ডঃ উইকসের চ্যাটটা খুলল।

    স্যালি মুখটা হাত দিয়ে মুছল। প্রশ্নটা ওকে খুব অস্বস্তিতে ফেলেছে। ‘এটা আমার শোনা কথা, আমি শিওর না-কারণ হার্ভার্ডে এরকম অনেক বেসলেস স্ক্যাণ্ডাল রটে, ডঃ উইকস নাকি ধীরে ধীরে সেই নার্সের প্রেমে পড়ে যান এবং একদিন মিসেস উইকস আবিষ্কার করেন ভক্তির আর্লি প্রেগনেন্সি সিম্পটম।’

    ‘ইন্টারেস্টিং,’ রিধিমা মনে মনে বলল, ডঃ উইকসের এই গোপন অধ্যায়ের কথা ওর জানা ছিল না। ‘ভক্তির কী হল?’

    ‘ভক্তির বাবা ব্রিটিশ গায়ানা থেকে দেশের জমিজমা সব বেচে এদেশে ইমিগ্র্যান্ট হয়ে মেয়েকে নিয়ে এসেছিল। সঙ্গে যা পয়সা-কড়ি ছিল ওর বাবা তাই দিয়ে আমাদের এই কেমব্রিজেই একটা গায়ানিজ গিফট শপ খুলেছিল। ভক্তি ওখানেই থাকত।’

    ‘আর সুনয়ন?’

    ‘না। আমি ওর ছেলেকে কখনো দেখিনি।’

    ‘ডঃ উইকস আমাকে ভক্তির ছেলে সুনয়ন এই কথা কেন জানাতে চাইবেন? ‘একটা কথা মনে পড়ল,’ স্যালি চশমার ডাঁটি কামড়ে বলল। ‘বছর সাত আটেক আগে ভক্তির ছেলে ডঃ উইকসকে থানা পুলিশ করিয়েছিল।’

    ‘ডঃ উইকসকে থানা পুলিশ?’ রিধিমা অবাক। ‘কেন?’

    ‘আমি ঠিক জানি না কারণটা, ডঃ উইকস আমাকে বলেন নি, একদিন কেমব্রিজ পুলিশের শেরিফ দু’জন ট্রুপারকে নিয়ে এসেছিল অফিসে। অনেক কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল ডঃ উইকসের অফিসে বসে।

    ‘আমাকে ভক্তিদের দোকানটা দেখিয়ে দিতে পারবে?’

    ‘এখন?’

    ‘হ্যাঁ। ভক্তি আর সুনয়নের সঙ্গে দেখা করাটা খুবই দরকারি।’

    ‘ঠিক আছে। চল। গাড়ি পিছনের পার্কিং লটে।’

    ‘স্যালি, আমার সঙ্গে থাকাটা তোমার পক্ষে কিন্তু বিপজ্জনক,’ রিধিমা বলল।

    ‘আমি জানি,’ স্যালি বলল। ‘কিন্তু ডঃ উইকস আমার ওপর নির্ভর করতেন খুব— ‘স্যালি হাতের তালু দিয়ে মুখ চেপে চোখ বন্ধ করল। ‘যতই বিপজ্জনক হোক, ওঁর শেষ ইচ্ছা আমি—’ স্যালি উঠে দাঁড়াল— ‘তোমাকে ভক্তির দোকানে পৌঁছে দেব। তারপর বাকিটা তোমার কপাল।

    ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleতালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – সায়ক আমান
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    দোকানির বউ

    January 5, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    দোকানির বউ

    January 5, 2025
    Our Picks

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – সায়ক আমান

    March 23, 2026

    কালীগুণীন ও বজ্র-সিন্দুক রহস্য – সৌমিক দে

    March 23, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }