বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৫১
।। একান্ন ।।
নমিতাকে দেখে পৃথুযশ চেয়ার ছেড়ে হাসিমুখে উঠে দাঁড়াল। করমর্দনের জন্য এগিয়ে দেওয়া ওর হাতের তালু স্পর্শ করতে গিয়ে ঘেন্নায় নমিতার গা রি-রি করে উঠল। তবু জোর করে ঠোঁট থেকে হাসি অস্ত যেতে দিল না নমিতা। সোহৎসাহে বলে উঠল, ‘আরেব্বাবা, এ যে ভাবাই যায় না! কী সৌভাগ্য আজ আমাদের।’
নমিতা চেয়ারে বসলে পৃথুযশ বসল। পৃথুযশ বলল, ‘ওয়েস্ট বেঙ্গলের শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে একটা মিটিং ছিল। সেজন্য এদেশে আসা। ভাবলাম পুরোনো ইউনিভার্সিটিতে একবার ঢুঁ মেরে যাই।’
‘কিছু পরিবর্তন চোখে আসলো?’ নমিতা ডিপ্লোমেসি করে কথা বলল, মন যদিও এতটুকু চাইছে না।
‘অনেক। গেটে সুনীতিকুমারের স্ট্যাচুটার মাথায় শেড দেখলাম। খুব ভালো লাগল। আমাদের সময় ওখানে সুনীতিকুমারের মাথায় পায়রায় পায়খানা করত। আমরা কত চেঁচামেচি করেছিলাম। বাজেট ছিল না। আজ বড় ভালো লাগল।’
‘তোমার ইনিশিয়েটিভটা নমিতাকে বল, পৃথুযশ, ওর খুব ভালো লাগবে,’ ভিসি বললেন।
পৃথুযশ এবার সিরিয়াস মুখে বলল, ‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, শুধু আমেরিকায় সীমাবদ্ধ না থেকে তাদের ইউনিভার্সিটিকে কিছু গ্লোবাল লোকেশনে ছড়িয়ে দিচ্ছে। সিঙ্গাপুর, সাংহাই। আমি ম্যানেজমেন্টকে প্রপোজ করেছি কলকাতা। তাই একটা মেমোরান্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর ব্যাপারে বেঙ্গলের এডুকেশন মিনিস্টারের সঙ্গে কথা বলার ছিল।’
‘এক্সিলেন্ট!’ নমিতা বলল। ‘জাস্ট ভাবাই যায় না।’
ভিসি উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, ‘আরো কিছু আছে। আ গ্রেট গিফট ফর ইউ, নমিতা। পৃথুযশ বাকিটা বলো।’
‘ক্যালিফোর্নিয়া-ইন-কলকাতা বাস্তবে রূপান্তরিত হতে কিছুটা সময় লাগবে। অনেক কিছু ব্যুরোক্রেসির কাঠখড় পোড়াতে হবে। তাই আমি আপাতত ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া আর বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির মধ্যে একটা এক্সচেঞ্জ স্টুডেন্ট প্রোগ্রাম প্রোপোজ করছি। এটা আমার পাওয়ারের মধ্যে আছে। আমার কাছে বাজেটও আছে। এ’বছর আমি পাঁচজন ক্যালিফোর্নিয়ার স্টুডেন্টকে নিয়ে আসব ফর আ মান্থ। আমি বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিতে কয়েকটা লেকচার দেব এবং বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির ডিন অব আর্টস ফ্যাকাল্টিকে ক্যালিফোর্নিয়া ইনভাইট করবে পাঁচজন স্টুডেন্ট নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়াতে থাকতে ফর আ মান্থ।’
‘ইটস ইউ, নমিতা,’ ভিসি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন। ‘তুমি আর্টস ফ্যাকাল্টির ডিন।
পৃথুযশ বলল, ‘সুপার। আপনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়াতে কয়েকটা ক্লাস নেবেন আমাদের স্টুডেন্টদের। আপনার পাণ্ডিত্যে আমাদের স্টুডেন্টরা ঋদ্ধ হবে।’
অন্য সময় হলে নমিতা ভোকাবুলারি হাতড়ে একটা ভালো ধন্যবাদের শব্দ বের করে আনত, কিন্তু এখন যে শব্দটা ওর মাথায় চট করে চলে এল সেটা ভদ্রলোকেরা ব্যবহার করে না। কিন্তু মুখে কোনো প্রতিফলন হল না নমিতার। ও বলল, ‘বাহ্! ইটস অ্যান অনার ফর মি, ড. ভৌমিক। এটা মেটিরিয়ালাইজড হোক বা না হোক, অ্যাকচুয়্যালি, আপনার মতো পণ্ডিতের থেকে এরকম কথা শোনাও সম্মানের ব্যাপার।’
‘অনার ইজ মাইন,’ পৃথুযশ দু’হাত বুকের কাছে এনে নমস্কার করল। ‘আমরা তো দেশ থেকে পালিয়ে গেছি, আর আপনারা দেশের ফিউচার জেনারেশনের জন্য কত অসুবিধার সম্মুখীন হয়েও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। আপনার রিজুমে যা স্ট্রং, আপনি হাসতে হাসতে আমেরিকার যে কোনো ইউনিভার্সিটিতে চাকরি পেয়ে যেতে পারতেন।’
‘আমি বিএ, এমএতে সেকেন্ড হইনি, ড. ভৌমিক। আপনার মতো মানুষ এত প্রশংসা করছে একটু অস্বস্তিই হচ্ছে।’
‘তাহলে আমি আপনার অস্বস্তি আর বাড়াব না,’ পৃথুযশ হেসে বলল। আমার উদ্দেশ্য আমাদের বাংলার অপরিচিত প্রাচীন ট্যালেন্টদের বিশ্বের দরবারে নিয়ে যাব। আমি এই অপারচুনিটিতে সেই কাজটাও করব।’
‘একটু বুঝিয়ে বলুন ড. ভৌমিক।’
‘হ্যাঁ বলছি। একটা এক্সাম্পল দিই। ষষ্ঠীদাস নামে আমাদের একজন কবি কাম অ্যাস্ট্রোলজার কাম কৃষিবিদ ছিলেন। নাইন্টি পার্সেন্ট বাঙালি তো তার নামই শোনেনি। আমি তাকে জগৎসভায় পরিচয় করাতে চাই। ইন ফ্যাক্ট আমি আমার পিএইচডি থিসিসে প্রথম ষষ্ঠীদাসের পরিচয় করাই। আমি অবশ্য একটু স্ট্রং কনক্লুশন আনি যে ষষ্ঠীদাসই খনা। বাট ওই হাইপথেসিসের ওপর ব্রেনস্টর্মিং করাই যেতে পারে।’
‘আপনি ষষ্ঠীদাসকে আবিষ্কার করেছিলেন, ড. ভৌমিক?’ নমিতা ‘আপনি’ কথাটার ওপর জোর দিল। ‘ওঃ, শুধু ওই একটা কাজের জন্যই আপনি ডি- সিট ডিজার্ভ করেন।’
‘আমি রেকগনিশন নিয়ে কখনো ভাবি না, ড. স্যান্যাল। আমি দেখি কীভাবে কমিউনিটির কাজে লাগতে পারি। আমি আপাতত ষষ্ঠীদাসকে রিইনভেন্ট করতে চাই। এর জন্য আপনার হেল্প চাই।’
‘আমার হেল্প? বলুন আমি আপনাকে কী হেল্প করতে পারি?’
‘ষষ্ঠীদাসের ওপর আমার যে পিএইচডি থিসিসটা আছে সেটা আমার দরকার। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু রি-ইনভেন্ট দ্য হুইল। বোঝেনই তো এত ব্যস্ততা।’
‘আমাদের গোটা লাইব্রেরি এখন ডিজিটাইজড হয়ে গেছে, ড. ভৌমিক। আপনি অন লাইনে আপনার থিসিসের ফুল টেক্সট দেখতে পাবেন।’
‘আমি অন লাইনে তন্নতন্ন করে খুঁজেও আমার থিসিস এর টেক্সট পাইনি, ড. স্যান্যাল। ক্যান ইউ বিলিভ!’
হোয়াট! এবার নমিতা একটা বড়সড় ধাক্কা খেল। তার মানে ওরা হ্যাক করে পৃথু্যুশের থিসিস ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে উড়িয়ে দিয়েছে যাতে কেউ প্লেজারিজম প্রমাণ করতে না পারে! কিন্তু মুখে বিস্ময় প্রকাশ করল না নমিতা। ‘হার্ড কপি নিশ্চয়ই থাকবে লাইব্রেরির জার্নাল সেকশনে।’
‘আমি লাইব্রেরির জার্নাল সেকশনে গেছিলাম। জানলাম ওই ডকুমেন্ট আপনার কাছে।’
‘আমার কাছে? তা হবে, ডিন হয়ে কয়েকশো ফাইল আমাকে ঘাঁটতে হয়। মনে থাকে না সব।’
‘ডকুমেন্টটা আপনি সম্ভবত কাল নিয়েছেন লাইব্রেরি থেকে।’
‘কাল নিয়েছি? ষষ্ঠীদাস? ইয়েস ইয়েস আমি একটা ওই টপিকের ফাইল বের করেছিলাম বটে।’
‘ওটা কি আমি পেতে পারি?’
‘ওটা তো গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়ার অ্যাডভোকেট চেয়ে পাঠিয়েছিল। দেখছেন আমি একদম ভুলে গেছি। হ্যাঁ এবার মনে পড়েছে। আমেরিকার কোন একটা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি অন্যায়ভাবে আমাদের দেশের কী একটা ওষুধের নলেজ পাইরেসি করে পেটেন্ট নিয়েছে। গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া কেসটা ইন্টারন্যাশনাল কোর্টে আনছে। এ ব্যাপারে কিছু এভিডেন্স সংগ্রহ করার জন্য ভারত সরকারের উকিল আমাদের কাছে এসে বেশ কয়েকটা ফাইল নিয়ে যায়। এখন মনে পড়েছে আপনার ফাইলটাও ওদের কাছেই আছে।’
নমিতা তাকিয়ে দেখল যে পৃথুযশ ভৌমিকের মুখটা ঝুলে গেল। ‘ওটা আমার পিএইচডি থিসিস, অথচ আমি হাতে পাচ্ছি না। এটা কিন্তু ব্যুরোক্রেসি!’
‘আমি সরি ড. ভৌমিক। আমি ওদের লিখে পাঠাচ্ছি যাতে ওরা ফাইলটা তাড়াতাড়ি রিটার্ন করে। আনফরচুনেটলি সরকারের খাতায় একবার কিছু ঢুকলে বেরোতে খুব দেরি করে।
‘দেখুন যদি পাওয়া যায়। আচ্ছা আমি আজ আসবো, পৃথুযশ উঠে দাঁড়াল। ভিসি হাঁ হাঁ করে উঠলেন। ‘সে কি এই তো এলে। একটু চা তো অন্তত খাবে।’
‘আজ না জয়ন্তদা,’ পৃথুযশ বলল। ‘ড. স্যান্যাল যেদিন ফাইলটা দেবেন সেদিন এসে চা খেয়ে যাব। আজ আসি,’ পৃথুযশ কৃত্রিম একটা হাসি ছুঁড়ে দিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে বেরিয়ে গেল।
পৃথুযশ বেরিয়ে যেতে ভিসি বললেন, ‘নমিতা, তোমায় আমি কত বছর ধরে চিনি?’
‘অন্তত তেত্রিশ বছর স্যার।’
‘তুমি বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারি হয়েও কেন পলিটিক্সে সাকসেসফুল হলে না জানো?’
‘হ্যাঁ জানি। মিথ্যা বলতে গেলে আমার চোখ মুখ স্টিফ হয়ে যায়।’
‘ঠিক। সহজেই ধরা পড়ে যাও। পৃথু্যুশকে কেন মিথ্যার পুলটিশ পরানোর চেষ্টা করছিলে? আজ কী হয়েছে?’
‘খুব সিরিয়াস ব্যাপার, স্যার।’
‘আরে কী হয়েছে বলবে তো?’
‘ড. পৃথুযশ ভৌমিকের নামে প্লেজারিজমের অভিযোগ এসেছে আমার কাছে, জয়ন্তদা। লিখিত অভিযোগ।’
‘ইম্পসিবল! অবিশ্বাস্য। এত ইন্টেলিজেন্ট স্টুডেন্ট! বিএ এমএতে সেকেণ্ড! সে কখনো টুকতে পারে?’
‘যিনি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি ছিলেন বিএ এমএ তে ফার্স্ট।’
‘হোয়াট! ইউ মিন বিদ্যাধরী দাস?’
‘আপনার বিদ্যাদিকে মনে আছে জয়ন্তদা?’
‘বিদ্যাধরী দাস! মনে থাকবে না? ওরকম স্টুডেন্ট একটা জেনারেশনে কদাচিৎ আসে।’
‘দুর্ভাগ্যের বিষয় রিসেন্টলি ওঁর বাড়ি থেকে বিএ এবং এমএর সার্টিফিকেট ও মার্কশিট চুরি হয়ে গেছে।’
‘তাই নাকি?’
‘এটা খুব একটা বড় ব্যাপার নিশ্চয়ই না জয়ন্তদা। যে রাজ্যে নোবেল প্রাইজ চুরি হয়ে যায় সেখানে বিএ এবং এমএর ফার্স্ট পোজিশন পাওয়া সার্টিফিকেট সে তুলনায় কিছুই না।’
‘বিদ্যাধরী ওয়াজ আ জিনিয়াস, তবে আরেকটা ব্যাপার ছিল,’ জয়ন্তদা চোখ মটকে হাসলেন। ‘ও আমাদের হার্টথ্রুব ছিল। সুচিত্রা সেনের মতো হাঁটা-চলা। কী তেজ! আমাদের পাত্তাই দিত না। মনে মনে ওকে রোজ প্রেমপত্র লিখতাম। কিন্তু শেষমেষ কী যে আনফরচুনেট সিচুয়েশন ক্রিয়েট করল মেয়েটা!’
‘বিদ্যাদির অ্যালিগেশন এই যে স্যার,’ নমিতা চিঠিটা বের করে টেবিলে রাখল।
ভাইস চ্যান্সেলর জয়ন্ত শিকদার চিঠিটা পড়লেন। তারপর নমিতার দিকে এমনভাবে তাকালেন যে নমিতা স্মলপক্সের ভাইরাস ওঁর ডেস্কে এনে রেখেছে। ‘আর ইউ শিওর? এটা কোনো ডিফেমেশনের ষড়যন্ত্র না তো? তুমি নিজে ব্যাপারটা তদন্ত করে দেখেছ?’
‘আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর জয়ন্তদা। সে জন্যই পৃথু্যুশের থিসিসের হার্ড কপিটা আমি লাইব্রেরি থেকে তুলেছিলাম।’
‘আমি কিছু ভাবতে পারছি না। আমায় শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে একবার কথা বলতে হবে। তুমি বোধহয় জানো না যে ওকে এবার ডি-লিট দেওয়া হচ্ছে। জল ঘোলা করার আগে দেখতে হবে ওই জল কে কে খায়। তুমি আমাকে একটু সময় দাও। চিঠিটা তোমার কাছেই রাখো আপাতত। কাল আমি তোমায় আপডেট দেব।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ জয়ন্তদা,’ নমিতা উঠে দাঁড়াল। নমিতার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—পৃথুযশ এত জিনিয়াস স্টুডেন্ট, ও কেন কুম্ভীলকবৃত্তি করতে গেল?
নমিতা নিজের অফিসে ফিরে এসে দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ কপাল টিপে বসে রইল। হিপোক্রেসির একটা লিমিট আছে! এই ইন্ডিয়ান থেকে আমেরিকান বনে যাওয়া কিছু মানুষ আমাদের ভাবে কী? ভিখারি? আমাদের সামনে হাড়ের টোপ দিলেই আমরা কুকুরের মতো গিলতে ছুটে যাব? ক্যালিফোর্নিয়া! এক মাস আমেরিকায় থাকার লোভে নিজের সত্তা বিক্রি করে ক্যালিফোর্নিয়া ছুটব? আর বিদ্যাদিরা প্ল্যাটফর্মে বসে বসে ভিখারিদের পড়াবে? মাই ফুট! বিদ্যাদির ওপর শ্রদ্ধা ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে নমিতার।
টক-টক। দরজায় নক।
‘আসতে পারি?’
নমিতা দেখল এবার তার দরজায় দাঁড়িয়ে ড. পৃথুযশ ভৌমিক। মুখে হাসি এখনো আছে, তবে মধ্যগগন নয়, সূর্য পশ্চিম দিগন্তে।
‘আসুন আসুন,’ নমিতা ভদ্রতা করে উঠে দাঁড়াল।
‘কাজে বিরক্ত করলাম না তো?’
‘আরে কাজ তো থাকেই। প্লিজ আসুন। বসুন।’
পৃথুযশ বসল। ‘ড. স্যান্যাল, আপনার সময় নষ্ট করব না। তাই সোজাসুজিই বলি। আমি জানি আপনাকে অ্যাডভোকেট মিস মাধবী বসাক অ্যাপ্রোচ করেছেন। দেখুন, আমাদের দু’জনের একই আলমা মাটার। মানে আমরা সতীর্থ। তাই আপনার সঙ্গে এই কোর্ট-কাছারির বাইরে মন খুলে কয়েকটা সত্যি কথা আলোচনা করতে চাই। আপনার যদি আপত্তি না থাকে ‘
‘আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে আপনি যেহেতু সোজাসুজি কথা বলতে চান, তাই তার আগে সোজাসুজি একটা প্রশ্ন করব?’ নমিতা বলল। ‘যদি উত্তর দিতে অসুবিধা থাকে তবে দেবেন না।’
পৃথুযশ হাসল। নমিতা দেখল এখনো সেই হাসিতে টোল খায়। চোখ মটকে বলল, ‘করেই ফেলুন না প্রশ্নটা।’
‘আপনার মতো এমন প্রথিতযশা মানুষ এর মধ্যে জড়ালেন কীভাবে?’
‘আরে ধুৎ, আমি কে? আমি কেউ না। সব হল বড় ইউনিভার্সিটির স্ট্যাম্প। আমার জায়গায় অন্য কোনো বাঙালি যদি আজ ক্যালিফোর্নিয়ার এরকম নামকরা ইউনিভার্সিটির সাউথ ইস্ট এশিয়ান স্টাডিজের চেয়ার হতো তবে ওরা তাকেই ধরত। এত বড় আমেরিকান ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি, ওদের বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার কারবার। আমাকে তোয়াক্কা করবে ওরা?’
‘সেটা তো হল ওই ওষুধের কোম্পানি কেন আপনাকে কন্ট্যাক্ট করল। আমার প্রশ্নটা তা না। পৃথুযশ ভৌমিককে হারাবার মতো পাণ্ডিত্য আছে একথা বলার মতো স্পর্ধা ক’জন বাঙালির আছে তা জানি না। আপনি জানেন এই পেটেন্টের লড়াইয়ে অ্যামফার্মা জিতলে আমাদের দেশের একটা সম্পদ বিদেশিরা অধিকার করে নেবে। আমার প্রশ্ন একজন বাঙালি হয়ে আপনি কেন এই অ্যাসাইনমেন্টটা হাতে নিলেন?’ নমিতা এক মুহূর্ত থামল। ‘শুধু টাকার জন্য?’
পৃথুযশ চুপ করে রইল।
নমিতা এবার সত্যি অস্বস্তিতে পড়ল—একটু বেশি রুড ভাবে জিজ্ঞাসা করা হয়ে গেছে। এভাবে বলাটা উচিত হয়নি ‘আমি এজন্য প্রথমেই বলেছি আপনার অসুবিধা থাকলে উত্তর না দিলেও
‘আপনি অজান্তে একটা দুর্বল জায়গায় আঘাত করলেন আমার,’ পৃথুযশ বলল। ‘জানেন আমি আমেরিকান সিটিজেন হতে পারি, কিন্তু আমি আদ্যন্ত বাঙালি। মাতৃভাষা বাংলাকে আমার মাথায় রাখি। এটা আমার ভীষণ দুর্বল জায়গা। টাকা, খ্যাতি এসব দুর্বলতা আমি অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছি। কিন্তু বাংলার মাটি যেমন আমার এক দুর্বলতা, আমার সেরকম আরেকটা দুর্বলতা আছে। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আমার একমাত্র মেয়ে অমৃতা।’
‘আপনার মেয়ে কি ওই আমেরিকান ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে কাজ করেন?’
‘না। আমার মেয়ে হুইল-চেয়ারে দিন কাটায়। স্পাইনাল কর্ডে ক্যানসার। স্টেজ ফোর। অঙ্কোলজিস্ট বলে দিয়েছে ছ’মাস ম্যাক্সিমাম। স্পাইনাল কর্ডের কমপ্লিকেটেড নার্ভগুলোর মধ্যে একটা নার্ভ ওর দাঁড়াবার ক্ষমতাকে কেড়ে নিয়েছে।’
‘আই য়্যাম সো সরি!’ নমিতার সত্যি মন খারাপ হয়ে গেল। ‘কিন্তু আপনার মেয়ের সঙ্গে এর কী সম্পর্ক? ‘
‘ওকে একটা ছেলে ভালোবেসে ফেলল। এন আর আই বাঙালি সায়েন্টিস্ট। আমার মেয়ে ভাবতেই পারেনি যে কোনো ছেলে ওর এই শারীরিক অবস্থার কথা জেনেও ওকে ভালোবাসতে পারে। আর ছেলেটার সঙ্গে মিশে আমার মেয়ে যেন নতুন করে বাঁচার ইচ্ছাটা ফিরে পায়। ও আবার গুনগুন করে গান গাইতে শুরু করল, পিয়ানোতে আঙুল চালানো শুরু করল, প্যাস্টেল-রঙ-তুলি নিয়ে ছবি আঁকায় ফিরে গেল আমার চোখের সামনে যেন একটা শুকিয়ে যাওয়া হাউস-প্ল্যান্ট আবার জল পেয়ে সবুজ হয়ে উঠল। ছেলেটা অমৃতাকে প্রোপোজ করে। ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে এবছর থ্যাঙ্কসগিভিং এর পর
‘বাহ্, এটা তো খুবই ভালো খবর।’
‘কিছুটা কমপ্লিকেশনস আছে এখানে,’ পৃথুযশ বললেন। ‘ওর ফিয়াসে যে আমেরিকান ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিটাতে কাজ করে সেই কোম্পানি হল অ্যামফার্মা। আপনি জানেন অ্যামফার্মা এই পেটেন্টের মামলাটা লড়ছে।’
নমিতা চুপ করে রইল।
‘নাম তথাগত দাস,’ পৃথুযশ বলল। ‘তথাগত একটা ওষুধের ফর্মুলা পেটেন্ট নিয়েছিল জয়েন্টলি ওদের কোম্পানির সঙ্গে। একটা ইন্ডিয়ান কোম্পানি সেই পেটেন্ট ইনফ্রিঞ্জ করে। ইন্ডিয়ান কোম্পানি চিটিং করে রিসেন্টলি বাংলায় একটা বই বের করে দিল ‘বেহুলার খনা’ যাতে কিছু খনার বচন আছে, কিছু গালগল্প আছে এবং যার মধ্যে নাকি ওই পেটেন্টের ফর্মুলা লেখা আছে। অত্যন্ত ক্রুড ফর্মে লেখা কবিতা, আই এগ্রি। কিন্তু লেখা আছে। ইন্ডিয়ান কোম্পানি উল্টো কোর্টে নালিশ জানাল যে আমেরিকান কোম্পানি অ্যামফার্মা পেটেন্ট পেতে পারে না, কেননা খনার বচনে ওই ফর্মুলা লেখা আছে। তথাগত আমার মেয়ের মাধ্যমে আমার সাহায্য চেয়েছে প্রমাণ করতে যে ওই ফর্মুলা খনার লেখা না। পৃথযশ মাথা নীচু করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর মাথা তুলে বলল, ‘মেয়ের অনুরোধ আমি কিছুতেই ফেলতে পারলাম না। আর ক’দিন আছে ও!’
‘আমি অ্যাপ্রিশিয়েট করছি যে আপনি মন খুলে অন্তত একবার কথাটা বললেন। আপনার মেয়ের জন্য আমার সমবেদনা রয়েছে। তবে আমি তথাগতের পরিবারকে চিনি। আমি জানি তথাগত ওদের পরিবারের প্রাচীন কিছু পুঁথি ওর বাবার থেকে চেয়েছিল আমেরিকায় গিয়ে রিসার্চ করবে বলে। ওর বাবার আপত্তি ছিল, তথাগত তখন বাবাকে হুমকি দেয় যে তাহলে ও আর কখনো বাড়ি ফিরে আসবে না। ওর বাবা তবু রাজি হয় না। তখন তথাগত বাবার পুঁথিগুলো চুরি করে আমেরিকায় নিয়ে যায়। এতে ওর বাবা ওকে ত্যাজ্যপুত্র করে। আমার তথাগতের সততা সম্পর্কে যথেষ্ঠ সন্দেহ আছে। আপনার কী মনে হয় না যে তথাগত শুধু গ্রীন কার্ডের জন্য আপনার অসুস্থ মেয়েকে বিয়ে করতে চাইছে? যদি এত সহজে ওর বিপত্নীক বৃদ্ধ বাবাকে ত্যাগ করতে পারে তবে গ্রীন কার্ড পেয়ে গেলে ও আপনার হুইল-চেয়ারে বসা মেয়েকেও ত্যাগ করবে না তার কী গ্যারান্টি আছে? কিছু মনে করবেন না আমার এই রূঢ় ভাষণের জন্য।’
‘না না, রূঢ় কেন? আমি জানি প্রচুর ভারতীয় ছেলে আমেরিকায় এসে শুধু গ্রীন কার্ডের জন্য আমেরিকান সিটিজেন অনাবাসী ভারতীয় মেয়েদের ফাঁসায়, আর গ্রীনকার্ড পেয়ে গেলে ডিভোর্স করে নিজের পথ দেখে। কিন্তু আমার সামনে অল্টারনেটিভ কী আছে বলুন? আর তাছাড়া আমার মেয়ের হাতে আর বেশি দিন নেই।’
‘আপনার কী মনে হয়নি কক্ষনো যে তথাগত ওই ফর্মুলাটা নিজে আবিষ্কার করে নি, ওটা সত্যিই প্রাচীন ভারতীয় বিদুষী খনার লেখা এবং তথাগত যে সেই ফর্মুলাটা চুরি করেছে সেটা অন্যায়?’
‘এখানেই তো ধাঁধাটা ড. স্যান্যাল,’ পৃথুযশ উত্তেজিত হয়ে বলল। ‘ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড যা কিছু করতে যায় তাই নাকি আমাদের ‘ব্যাদে আছে’। কিন্তু এসব যদি মেনেও নিই, তবু আমি দৃঢ় নিশ্চিত যে খনা শুধুমাত্র রূপকথা। খনা কে? খনা বলে কেউ কখনো ছিল না। অনেকেই খনার নামে পদ্য লিখে গেছে।’
‘আপনাদের দ্বারভাঙা হলের ডিবেটের আমি সেদিন দর্শক ছিলাম, ড. ভৌমিক, নমিতা বলল।
পৃথুযশ নমিতার কথা কানেই নিল না। ও উত্তেজিত হয়ে বলে চলল, ‘ফর এক্সাম্পল কলা। শুধু কলার ওপরই খনার কত রকমের বচন।
ডাক দিয়ে বলে খনা,
আষাঢ় শাবনে কলা পুঁতনা,
রূবি বটে খাবিনে, কলাতলায় যাবিনে,
লেগে যাবে ছুঁয়ে, কলা পড়বে শুয়ে।
এখানে খনা বলেছে—আষাঢ় শ্রাবণে কলা রোপণ কোরো না, কারণ তাতে ছুঁয়ে ধরার সম্ভাবনা। ছুঁয়ে লাগলে কলাগাছ শুয়ে পড়বে। আবার সেই একই ম্যাডাম খনা অন্যত্র বলছেন
ডাক দে বলে রাবণ,
কলা পুঁতগে আষাঢ় শ্রাবণ।
তাহলে আপনি বলুন আষাঢ় শ্রাবণে কলা পুঁতবে কি পুঁতবে না? খনা কি তবে সেলফ-কনট্রাডিক্ট করছে না? খনা যদি বিদুষী নারী হয় তবে তা কি সম্ভব? তার মানে যে যখন পেরেছে খনার নামে বচন লিখে গেছে।’
নমিতা ভাবল সেম ওল্ড পৃথুযশ। এক্সিলেন্ট হোমওয়ার্ক। নমিতা কোনো মন্তব্য করল না। পৃথুযশ বলল, ‘একটা কথা আমি আপনার সামনে প্রমিস করে বলছি, পৃথুযশ ভৌমিক কোনোদিন তঞ্চকতা করবে না। মিথ্যা যুক্তি আমি দেব না। এই ‘বেহুলার খনা’তে সব ট্র্যাশ কাহিনির মধ্যে মধ্যে খনার বচন গুঁজে দিয়েছে। সব গাঁজাখুরি কাহিনি!’
‘কোনটা গাঁজাখুরি, ড. ভৌমিক?’
‘গাঁজাখুরি না? ওই ডিঙির বৃষ্টি। আকাশ থেকে ডিঙির বৃষ্টি—অনেকটা কাউ জাম্পস ওভার দ্য মুনের মতো শোনায় না? আমরা বলি ননসেন্স রাইমস, এটা কি ননসেন্স স্টোরি না? আমি বলেছি যে খনা বলে যে কোনো নারী ছিল তার কোনো এভিডেন্সই নেই। আমি আমার পিএইচডি থিসিসে প্রমাণ করেছি যে খনার বচনগুলো সব ষষ্ঠীদাসের লেখা। মাজিগ্রামের বন্দ্যোঘটি পরিবারের তান্ত্রিক সাধক ষষ্ঠীদাস। পিরিয়ড!’ পৃথুযশ উত্তেজিত।
‘আচ্ছা মানলাম এগুলো ষষ্ঠীদাসেরই লেখা। তাহলেও তো প্রমাণিত হয় যে ওগুলো তথাগতের আবিষ্কার না।’
‘আমি কোনটা কার আবিষ্কার সেই জটিলতায় ঢুকতে চাই না। আমি শুধু প্রমাণ করতে চাইছি যে খনা বলে কেউ ছিল না।’
‘তাহলে এতগুলো খনার বচন যে আমরা ছোটবেলা থেকে পড়ে এসেছি ওগুলোও মিথ্যে হয়ে যাবে?’
‘আমি তো বলিনি বচনগুলি মিথ্যে। কিন্তু খনা লিখেছে তার কী প্রমাণ?’
‘আমি খনা সম্বন্ধে অথরিটি নই। তাই আপনার এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না। এই বাংলায় জানি না ক’জনের খনার সম্বন্ধে প্রচুর জ্ঞান আছে। তবে একজনকে আমি চিনি যিনি আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন তিনি হলেন বিদ্যাধরী দাস। আপনার আপত্তি না থাকলে আমি তাঁকে আমার অফিসে নিয়ে আসতে পারি একদিন। আপনারা কথা বলুন।’
‘তা সম্ভব নয়,’ পৃথুযশ বলল। ‘আপনি তো জানেন যে উনি আমার থিসিস চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছিলেন। ওঁকে ইউনিভার্সিটি থেকে রাস্টিকের্ট করে দেওয়া হয়। আমি ওঁর সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসতে রাজি নই। যদিও ওঁর ট্যালেন্ট সম্বন্ধে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।’
নমিতার আর এই শঠতা সহ্য হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল এই নাটক এবার বন্ধ হওয়া উচিত। নমিতা পৃথু্যুশের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ড. ভৌমিক, আমি আপনাকে একটা মিথ্যা কথা বলেছি।’
‘আপনি মিথ্যা কথা বলেছেন! কী মিথ্যা কথা?’
‘আপনার পিএইচডি থিসিস আমার কাছে আছে। ওটা কোনো উকিলকে আমি দিই নি?’
‘বাঁচালেন,’ পৃথুযশ স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল। ‘ওটা কি আমাকে আপনি একদিনের জন্য দিতে পারেন?’
‘আপনার পিএইচডি থিসিসের ওপর একটা সিরিয়াস প্লেজারিজমের অ্যালিগেশন এসেছে আমার কাছে। সেটা আমি তদন্ত করে দেখছি।’
‘প্লেজারিজম! কী উল্টোপাল্টা বলছেন আপনি? আমি পৃথুযশ ভৌমিক, অন্যের লেখা থেকে টুকব?’ পৃথুযশ এবার বেশ উত্তেজিত। ‘কেন আমি টুকতে যাব? হোয়াই?’
‘সে প্রশ্নের উত্তর আপনি দেবেন যখন কমিটি আপনাকে ইন্টারোগেট করবে। তবে আমরা প্রাইমা ফেসি স্টাডি করে দেখেছি যে ষষ্ঠীদাসের লাইনগুলো আপনি বিদ্যাধরী দাসের প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ ডিসার্টেশন থেকে নিয়েছেন—’
‘ষষ্ঠীদাস কারোর বাপের সম্পত্তি না, ড. স্যান্যাল, পৃথুযশ খুব বিরক্ত। অন্য কেউ যদি ষষ্ঠীদাসের উল্লেখ করেও থাকে তবে এটা কীভাবে প্রমাণিত হয় যে আমি তার থেকে টুকেছি।’
‘আপনি টুকেছেন কি টোকেননি এটা আমি আলোচনা করতে চাই না। সেটা কমিটির কাজ। তবে আপনার কোনো ভয় নেই। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন যে আমি কোনো অন্যায় হতে দেব না।’
‘আপনি কি অলরেডি একটা অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না?’
‘বিদ্যাধরী দাস আমার কাছে ইন রাইটিং অ্যালিগেশন পাঠিয়েছেন যে ওঁর থিসিস থেকে অংশ চুরি করা হয়েছে। আমরা বিদ্যাধরী দাসের প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ ডিসারটেশনের সঙ্গে আপনার থিসিস কম্পেয়ার করেছি। আপনার থিসিসের লাইন বাই লাইন বিদ্যাধরী দাসের থিসিসের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।’
‘বিদ্যাধরী দাস আমার থিসিস চুরি করেছিল।’
‘বিদ্যাধরী দাসের থিসিসের সাবমিশনের তারিখ দেখেছি আপনার থিসিসের প্রিলিমিনারি সাবমিশনের ছয় মাস আগে। আমি দু’জনের তারিখ নোট করে কমিটির কাছে পাঠিয়েছি।’
‘আপনি বুঝতে পারছেন এই অ্যালিগেশনের সিরিয়াসনেস?’
‘যদি অ্যালিগেশন সত্যি প্রমাণ হয় তবে বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি আপনার পিএইচডি ডিগ্রীটা কেড়ে নেবে। আর আমেরিকান ইউনিভার্সিটিগুলো যে এ ব্যাপারে কত স্ট্রিক্ট তা তো আপনার ভালোই জানার কথা।’
‘এটা অন্যায়! ভীষণ অন্যায়,’ পৃথুযশ বলল। আমি একদম শেষ হয়ে যাব। আমার মেয়ের জীবনটাও শেষ হয়ে যাবে। এই অন্যায় অ্যালিগেশন আমার মৃত্যুপথযাত্রী মেয়ে এই শরীরে সহ্য করতে পারবে না। আমার একান্ত অনুরোধ যদি তদন্ত করতেই হয় তবে আমার মেয়ের মৃত্যু পর্যন্ত আপনারা অপেক্ষা করুন। প্লিজ, প্লেজারিজমের অ্যালিগেশনটা ছ’মাস পরে আনুন আপনারা। এতবড় ভুল প্লিজ আপনি করবেন না।’
‘আর আপনি যে বিদ্যাধরী দাসের জীবনটা শেষ করে দিলেন তার কী হবে?’
‘আমি একা?’ এবার পৃথুযশ তেড়েফুঁড়ে উঠল। ‘আমাকে মুখ খোলাতে চান? অলরাইট, দেন লেট মি টক। আপনারা সেদিন কোথায় ছিলেন? ডক্টর বক্সী যখন বিদ্যাধরীকে রাস্টিকেট করতে বদ্ধ পরিকর হয়ে কাগজ তৈরি করছেন, তখন আমি ওঁকে অনেক বোঝাই। আমি একদম চাইনি যে অত ট্যালেন্টেড একজন স্টুডেন্টের ফিউচার একদম শেষ হয়ে যাক। কিন্তু, উনি একদম নাছোড়। চড় খেয়ে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির মতো ফুটছেন। আমি তখন ওঁকে সামলাতে বলি যে বিদ্যাধরী দাস ছাত্র মহলে খুব পপুলার। স্যার, স্টুডেন্ট ইউনিয়ন আপনার ওপর কিন্তু ঝাঁপিয়ে পড়বে। তখন উনি যে কথাটা বলেছিলেন সেটা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম। ড. বক্সী বলেছিলেন আমি স্টুডেন্ট ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারি নমিতা স্যান্যালের সঙ্গে কথা বলে রেখেছি। স্টুডেন্ট ইউনিয়ন কিচ্ছু করবে না। আমি স্তম্ভিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম নমিতা স্যান্যাল মেনে নিল? ও বিদ্যাধরীকে খুব শ্রদ্ধা করে! উনি বললেন নমিতাকে জেনারেল সেক্রেটারি পদের ক্যান্ডিডেট করাবার জন্য পার্টির হাইকম্যান্ডকে কে রাজি করিয়েছিল জানো? এই পোস্ট এত সহজে পাওয়া যায়? আমার কথা নমিতা বেদবাক্যের মতো মানতে বাধ্য, পৃথুযশ থামল। ‘সেদিন বিদ্যাধরী আপনার দরজাতেও এসেছিল, এই একই অভিযোগ নিয়ে। সেদিন আপনি কেন ওকে ফিরিয়েছিলেন? আপনি ফিরিয়েছেন কারণ আপনি ড. বক্সীর বিরুদ্ধে যেতে চাননি। বিদ্যাধরীর জীবন শেষ হয়ে যাবে জেনেও আপনি কিচ্ছুটি করেননি। কারণ আপনার লোভ ছিল। হাই প্রোফাইল বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিতে কমিউনিস্ট পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি থেকে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে মন্ত্রীত্বের পথ সহজ হয়ে যায় তাই না? তাহলে আজ কেন এই নাটক?’
নমিতা নিরুত্তর। লজ্জা হচ্ছিল নিজের প্রতি। স্টুডেন্ট পলিটিক্সে পলিটিক্স আগে আসে, স্টুডেন্ট পরে। তাছাড়া ড. বক্সী তখন তাদের রাজনৈতিক দলের খোলাখুলি প্রবল সমর্থক। সবাই জানে দলের উপরমহলে ওঁর ঘনিষ্ঠতা খুব। ইউনিভার্সিটির পরের ভিসির জন্য ড. বক্সী প্রবল দাবিদার। হাইকম্যাণ্ডের নির্দেশে নমিতা পিছিয়ে গেছিল। নমিতা এখন বুঝতে পারছে তার অন্তরাত্মা তাকে ক্ষমা করতে পারেনি। আর সেজন্যই এখন সুযোগ পেতেই সে বারবার ছুটে আসছে বিদ্যাদির কাছে তার পুরোনো পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে। আমি প্রথম জীবনের ভুল শুধরোবার চেষ্টা করছি,’ নমিতা ডিফেন্সিভ।
‘ভুল শোধরাচ্ছেন? এবার তাহলে একই প্রশ্ন আমি আপনাকে করব বিদ্যাধরী দাসের জীবনটা যে শেষ হয়ে গেল তার কী হবে? শুধু নিজের পলিটিক্যাল উচ্চাশার রঙিন স্বপ্ন আপনাকে অন্ধ করে দিয়েছিল?’
‘আমি চুরিটা করিনি। চুরিটা আপনি করেছিলেন। আপনি একজন বিদ্বান মানুষ, ড. ভৌমিক,’ নমিতার চোখের দৃষ্টিতে তিরস্কার। ‘এত ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিলেন, আপনি তো হাজারটা অন্য টপিক নিয়ে রিসার্চ করে হাসতে হাসতে পিএইচডি কমপ্লিট করে ফেলতে পারতেন। আপনার কী দরকার পড়েছিল বিদ্যাধরী দাসের পেপার নিয়ে কাজ করার?’
পৃথুযশ হতাশায় মাথা ঝাঁকাল—‘হ্যাঁ মানছি প্রতিশোধ স্পৃহা আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল। বিএতে সকলেই ধরে নিয়েছিল যে আমি ফার্স্ট হব। কোথা থেকে এক আটপৌরে মেয়ে উঠে এসে আমাকে সাত নম্বরের জন্য হারিয়ে গোল্ড মেডেল জিতে নিল। সেই পরাজয়ে আমার অহংকারে প্রচণ্ড আঘাত লেগেছিল। কিন্তু আমি একজন উইনার। এমএ তে প্রতিশোধ নেব বলে উঠে পড়ে লাগলাম। সকলকে বললাম বিএ’র রেজাল্টটা একটা অ্যাকসিডেন্ট। কিন্তু এমএ’তে সতের নম্বরের তফাৎ। বিদ্যাধরী এবার বুঝিয়ে দিল তার সেই জয়টা অ্যাক্সিডেন্ট ছিল না। আমার মনে তখন প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে। ওকে হারাতে হবেই। আমি রাগে অন্ধ হয়ে ওর ক্ষতি হোক এটা মনে মনে সব সময় চাইতাম। সে সময় আমার সামনে একটা বড় সুযোগ এল। হার্ভার্ড থেকে ড. গ্যালাগার এদেশে এলেন। ড. গ্যালাগারের একজন অ্যাসিস্ট্যান্টের দরকার ছিল। ড. বক্সী ড, গ্যালাগারকে খুব হেল্প করছিলেন। আমায় বললেন ড. গ্যালাগারের রিসার্চে ফুলটাইম অ্যাসিস্ট করতে। আমি বললাম আমার পিএইচডি থিসিসের কী হবে? ড. বক্সী বললেন চিন্তা কোরো না। আমি তোমার পিএইচডি থিসিস লিখে দেব। ড. গ্যালাগার বলেছেন যে তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্টকে তিনি হার্ভার্ডে পোস্টডক করতে নিয়ে যাবেন। আমি রাজি হচ্ছিলাম না। তখন ড. বক্সী বললেন এটা ওয়ান্স ইন আ লাইফ টাইম অপারচুনিটি। আমি এটা না নিলে উনি বিদ্যাধরীকে এই অফারটা দেবেন। বিদ্যাধরীর নাম শুনেই আমি অন্ধ হয়ে গেলাম। আমি রাজি হলাম। আমি দিন রাত ড. গ্যালাগারের অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে তাঁর রিসার্চ, তাঁর বইয়ের কাজে লেগে রইলাম আর ড. বক্সী আমার পিএইচডি থিসিস লিখে দিলেন। ইউনিভার্সিটি ডিবেটে ড. বক্সী আমাকে জেতালেও আমি জানি আমি সেদিন হেরেছিলাম বিদ্যাধরীর কাছে। আমার বিদ্যা-জ্ঞানের অহংকারকে ও বারবার ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছিল। আমি ড. বক্সীর লিখে দেওয়া পিএইচডি প্রসপেক্টাস সাবমিট করলাম। পরে জানলাম ড. বক্সীকে ড. গ্যালাগার হার্ভার্ডে নিয়ে যাচ্ছেন ওঁর ডিপার্টমেন্টে অধ্যাপনা করাতে। সেজন্য ড. বক্সী এত তোড়জোড় করে ড. গ্যালাগারকে সাহায্য করলেন আমাকে ব্যবহার করে। কিন্তু ঈশ্বরের দিব্যি আমি জানতাম না ড. বক্সী ওটা বিদ্যাধরীর প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ ডিসার্টেশন থেকে হুবহু টুকে দিয়েছিলেন। পৃথুযশ ভৌমিকের একমাত্র অহংকার যে সে বিদ্বান। একজন বিদ্বান কখনো অন্যের লেখা থেকে টুকবে না। যখন জানলাম তখন ইটস টু লেট। বিদ্যাধরীকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এটাই সত্য। আপনি প্লিজ আপনার এই তদন্ত বন্ধ করুন। এখন এই জল ঘোলা করে কারোর কোনো লাভ হবে না।’
নমিতা পৃথুযশের দিকে তাকাল। পৃথু্যুশের চিবুক নিম্নমুখী, চোখে অপ্রস্তুত দৃষ্টি। ‘ড. ভৌমিক, আমি এখনো অ্যালিগেশন কোনো কমিটিকে দিই নি। আমি আপনার থেকে সত্য শুনতে চেয়েছিলাম। আপনার ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন করা মানে বাঙালি জাতের ক্ষতি। বাকিরা সকলে এই কেচ্ছায় আনন্দ পাবে। বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির বদনাম আমি কিছুতেই চাইব না। অ্যাট দ্য সেম টাইম, আমি চাইব বিদ্যাধরী দাসের প্রতি সুবিচার হোক। আমি বিদ্যাধরী দাসের জীবনের এতগুলো বছর ফিরিয়ে দিতে পারব না, কিন্তু আমি যেটা পারব সেটা হল ওর রাস্টিকেশন উইথড্র করে আমি ওঁকে আবার পিএইচডিতে এনরোল করাবো। ওঁর ওরিজিন্যাল পেপারে। আর আপনার ব্যাপারে কী হবে? ইটস হার কল। আপনার বিচার আমি বিদ্যাধরী দাসের হাতে ছেড়ে দেব।’
‘আমি জানি আপনারা আমায় ডেস্ট্রয় করে দেবেন। আমার মেয়েকে শেষ করে ফেলবেন। রিভেঞ্জ নেবেন। আপনারা হার্টলেস। ঠিক আছে নিন, যা পারেন করুন। আমিও দেখি আপনারা আমার কতটা ক্ষতি করতে পারেন, ‘ পৃথুযশ চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল। তারপর চুপচাপ ঘর ছেড়ে কিছু ভাবতে ভাবতে বেরিয়ে গেল। নমিতা তখন ভাবেনি যে এই লোকটা এখনও তার প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার জন্য এত নীচে নামতে পারে।
