আমাজনিয়া – ১
অধ্যায় ১
সাপের তেল
আগস্ট ৬,
সকাল ১০টা
আমাজন বন, ব্রাজিল
অ্যানাকোন্ডা নামের বৃহৎ অজগরটি এক ইন্ডিয়ান মেয়েকে দৃঢ়ভাবে পেঁচিয়ে ধরে নদীর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। খুব সকালবেলা ঔষুধি গাছ সংগ্রহ করতে আসা নাথান র্্যান্ড ইয়ানোমামোর নিজ গ্রামে ফেরার সময় মেয়েটির চিৎকার শুনল । ঔষুধি গাছ ব্যাকটন ফেলেই সে দৌড়ে গেল মেয়েটিকে সাহায্য করতে। দৌড় শুরু করতেই সে তার কাঁধে ঝোলানো শর্ট ব্যারেলের শটগানটা হাতে নিয়ে উঁচু করে ধরলো । জঙ্গলে একা থাকাকালীন সময়ে সবাই অস্ত্র বহন করে। ঘন ঝোপঝাড় ভেঙে এগোতেই নাথান সাপ আর মেয়েটিকে দেখতে পেল। তার দেখা সবচেয়ে বড় এ্যানাকোন্ডার মধ্যে এটা একটা । প্রায় চল্লিশ ফুট লম্বা সাপটির অর্ধেক পানিতে, বাকি অর্ধেকটা নদীপাড়ের কাদার মধ্যে। শরীরের কালো আশটেগুলো ভিজে চকচক করছে। মেয়েটি যখন পানি নিতে নদীতে আসে, নিশ্চিতভাবে সাপটা সে-সময়ে ওৎ পেতে ছিল। দৈত্যাকার এইসব সাপের পক্ষে সেইসব প্রাণীদের শিকার করা মোটেই অস্বাভাবিক নয় যেগুলো পানি পান করতে নদীতে আসে বুনো শূকর, তীক্ষ দাঁতের ক্যাপিরা কাঠবিড়ালী, বুনো হরিণ। কিন্তু মানুষদের সাধারনত আক্রমণ করে না এই বৃহদাকার সাপেরা । জল ও বনে ঘেরা এই আমাজনে একজন এথনোবোটানিস্ট হিসেবে গত এক দশক ধরে কাজ করতে গিয়ে নাথান র্ ্যান্ড একটি বিষয় বেশ ভালভাবেই শিখতে পেরেছে : যখন কোন জন্ত তীব্র ক্ষুধার্ত হয়ে যায় তখন সব নিয়ম ভেঙে পড়ে। এই সীমাহীন সবুজের সাগরে তখন পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়ায় খাও অথবা খাবার হও। পরিস্কারভাবে দেখার জন্য বন্দুকের গান-সাইটের মধয়ে তীক্ষ দৃষ্টি হানল নাথান। “ওহ্ গড়, টামা!” মেয়েটিকে চিনতে পারল সে ।নবছর বয়সী মেয়েটি স্থানীয় এক গোত্রীয় প্রধানের ভায়ের মেয়ে। মাসখানেক আগে নাথানের এই গ্রামে আসা উপলক্ষে এই হাসিখুশি মেয়েটি তাকে ফুলের তোড়া দিয়েছিল উপহার হিসেবে। পরে তার হাতের উপর বসে মেয়েটি নাথানের চুল ধরে টানাটানি করেছিল। মসৃণ ত্বকের ইয়ানামোমোদের মধ্যে তার কোমলতা ছিল দূর্লভ পর্যায়ের। মেয়েটি তাকে একটা নামও দিয়েছিল, জ্যাকো ব্যাসো – বানর ভাই।
নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে সে তার অস্ত্রে বসানো লেন্সের মধ্যে দিয়ে ওদেরকে দেখতে লাগল। পরভোজীটা পেশীবহুল শরীর দিয়ে মেয়েটিকে পেঁচিয়ে রেখেছে। ওটাকে সরাসরি গুলি করার চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে রাখতে হল নাথানকে।
‘ধুর শালা!” শটগান ফেলে দ্রুত কোমরের বেল্টে গোঁজা বড় ছুরিটা হাতে নিয়েই সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। কিন্তু কাছে যেতেই মেয়েটিকে পুরোপুরি পেঁচিয়ে ধরে নদীর কালো পানিতে ডুবে গেল সাপটি। থেমে গেল তার চিৎকার, বুদবুদ উঠতে লাগল তার ডুবে যাওয়া জায়গা থেকে ।
কোনকিছু চিন্তা না করেই নাথান ঝাপ দিল পানিতে। আমাজনের ভালোপথগুলোই এটার অন্যসব পরিবেশ থেকে বিপজ্জনক। শান্তশিষ্ট পানির নিচে ঘাপটি মেরে থাকে অগণিত বিপদ। হাঁড়খেকো পিরানহা মাছের ঝাঁক একদিকে যেমন গভীর পানিতে চষে বেড়ায় অন্যদিকে কাদার মধ্যে গা-ঢাকা দিয়ে থাকে স্টিং-রের মত চ্যাপ্টা মাছ যা মেরুদন্ড দিয়ে প্রচন্ড বেগে আঘাত করতে পারে শত্রুকে। আর ডুবন্ত গাছের গুঁড়ি বা শেকড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ইলেকট্রিক ইল বা বাইন তো আছেই। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে পানির নিচে মানুষের সত্যিকারের খুনি হল দৈত্যাকার কুমিরের মত সরীসৃপের দল। এইসব বিপদ-আপদের কথা আমাজনের ইন্ডিয়ানরা এই অচেনা-অদেখা পানির জগতে ডুব না দিলেও ভালই জানে। কিন্তু নাথান কোন ইন্ডিয়ান নয় ।
শাস বন্ধ করে ঘোলা পানিতে ডুব দিতেই নাথান পেঁচানো সাপটির অবস্থান বুঝতে পারলো । দুর্বল একটা বাহু দুলছে সেখানে। পা দিয়ে মাটিতে এক ধাক্কা দিতেই ছোট হাতটার কাছে পৌছে গেল সে। শক্ত করে ধরে নিয়ে উপরে তুলল হাতটা । নাথানকে জাপটে ধরার জন্য হাতটাও যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে। টামার চেতনা এখনও আছে। মেয়েটির হাত ব্যবহার করেই নিজেকে সাপটার কাছে টেনে নিল নাথান। অন্য হাত দিয়ে ছুরিটা পেছনে গুজে নিল সে। একদিকে পা দিয়ে মাটি ঠেলে রাখতে হচ্ছে নিজের জায়গা ধরে রাখতে অপরদিকে টামার হাত ধরে টেনে বের করার প্রচেষ্টা।
হঠাৎ সামনের কালো পানিতে একটা ঘুর্ণি উঠলো, নাথান আবিষ্কার করল দৈত্যাকার সাপটি তার দিকে রক্তিম চোখে খুনে দৃষ্টি হানছে। নিজের আহার টিকিয়ে রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হল যেন সাপটিকে। ওটার কালো মুখগহ্বর খুলে যেতেই আহড়ে পড়ল নাথানের উপর। আঘাত এড়াতে একটু পাশে সরে গেল নাথান। মেয়েটির এত ধরে রাখতে তাকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে।
অ্যানাকোন্ডাটি এবার নাথানের বাহুতে কামড় বসিয়ে খুব জোরে চোয়াল দিয়ে চেপে ধরল । যদিও এটার কামড় বিষাক্ত নয় কিন্তু হাতে যে অস্বাভাবিক চাপ পড়ছে তাতে তার কজি ভেঙে যাবার উপক্রম হল। পাহাড় সমান ভয় আর তীব্র ব্যাথা উপেক্ষা করে নাথান আরেক হাত দিয়ে ছুরি ঘুরিয়ে এনে সোজা তাক করল সাপটির চোখ বরাবর।
একেবারে শেষ মুহূর্তে বিশাল অ্যানাকোন্ডাটি নাথানকে পেঁচিয়ে ধরে নদীর তলায় নিয়ে কাদার মধ্যে চেপে ধরল । মাংসপেশীর সহ্যক্ষমতার প্রায় চারশ পাউন্ড চাপের ফাঁদে আটকা পড়তেই নাথানের মনে হল তার ফুসফুস ফেটে বাতাস বের হয়ে যাবে। সে লড়ে যাচ্ছে সাপের সাথে কিন্তু নদীর পিচ্ছিল কাদার মধ্যে ধরার মত কিছুই পেল না ।
এদিকে সাপের পেঁচানো অংশ একটু ওপরে উঠে যেতেই নাথানের হাত থেকে মেয়েটার আঙুলগুলো ছুটে গেল। না…টামা!
সে হাত থেকে ছুরিটা ছেড়ে দিয়ে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে নিজেকে সাপটার বিশাল দেহ থেকে মুক্ত করতে চাইল । নদীগর্ভের নরম কাদায় তার কাঁধ ডুবে গেল কিন্তু নাথান হাল ছাড়ল না একটুও। প্রচন্ড শক্তি দিয়ে সে একেকটা প্যাচ খুলছে তো আর আরেকটা প্যাচ পড়ছে আগের জায়গায়। তার বাহুগুলো যেন আর চলে না, একটু বাতাসের জন্য তার ফুসফুস চিৎকার করছে যেন। ঠিক এই মুহূর্তটায় নাথান বুঝতে পারলো, তার এমন বিপদে পড়াতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ সে জানত তার ভাগ্য তাকে এমন দন্ডই দিয়ে রেখেছে-এটাই তার নিয়তি, তার পরিবারের অভিশাপ। বিগত বিশ বছরে তার বাবা-মাকে এই আমাজন বন গিলে খেয়েছে । তার বয়স যখন এগার, তার মা এই জঙ্গলের অজানা এক জ্বরে ঘায়েল হয়ে মিশনারির এক ছোট্ট হাসপাতালে মারা যায় । তারপর চার বছর আগে তার বাবা জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে যায় একেবারে সবার অগোচরে ।
বাবাকে হারানোর কষ্টের কথা মনে উঠতেই নাথানের বুকে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠলো। অভিশাপ হোক আর যাই হোক, সে তার বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চাইলো না মোটেই। কিন্তু সেটার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো টামাকে হারাতে চায় না সে।
নাথান পা দিয়ো অ্যানাকোন্ডার বিশাল দেহটা একটু ঠেলে দিল। এক মুহূর্তের জন্য মুক্ত হতেই পা দোলাতে লাগলো উপরে ওঠার জন্য। এদিকে গোড়ালি পর্যন্ত পা ডুবে গেছে কাদায়। ফুসফুসের আটকে পড়া বাতাসটুকু বের করে দেওয়ার জন্য ছটফট করছে নাথানের বুক। আর একটা ধাক্কা দিতেই সরাসরি তার মাথাটা পানির উপর তুলতে পারলো । মুক্ত বাতাসে বুকভরে শ্বাস নিয়েই আমাজনের এই কালো পানিতে আবারও ডুব দিল সে।
এবার সাপটার সাথে সরাসরি কোন যুদ্ধে গেল না। একটা হাত বুকের সাথে শক্ত করে ধরে রেখে পেঁচানো অংশে ঢুকে গেল। শ্বাসরোধ করার জন্য আরেক হাতে দিয়ে সাপটার গলা বরাবর দিল এক প্যাঁচ। বেশ কাজ হলো এতে। সাপটাকে ফাঁদে ফেলতেই নাথান ওটার চোখ বরাবর বা-হাতের বুড়ো আঙুলটা সজোরে বসিয়ে দিল । তীব্র যন্ত্রণায় নাথানকে নিয়ে পানির উপর দলা পাকিয়ে ঠেলে উঠলো সাপটি। মুহুর্তের মধ্যেই পানিতে ঝপাত করে আছড়ে পড়লো আবার। নাথানও নাছোড়বান্দা। ধরেছে তো ধরেছেই, একেবারে শক্ত করে। বানচোত, উঠে আয়!
সে তার হাতের কব্জিটা একটু ঘোরালো। তারপর ঐ হাতটার বৃদ্ধাঙ্গুল বসিয়ে দিল সাপের অবশিষ্ট চোখে। দু-পাশেই সমান চাপ দিল নাথান। সরীসৃপলে সাইকোলজি নিয়ে ট্রেনিঙের সময় নাথান যা শিখেছিল তা-ই সত্য হতে দেখল কোন সাপের দু-চোখে চাপ দেয়া মানে ওটার চোখ আর মস্তিষ্ক সংযোগকারী স্নায়ুর মধ্যে গোঁজ ঢুকিয়ে দেওয়ার সূত্রপাত করা । আরও জোরে চাপ দিতে থাকলো নাথান। এদিকে হৃদপিণ্ডের ধকধক শব্দ কানে বেজে চলেছে।
হঠাৎ তার কজি চাপমুক্ত হয়ে গেল, সাপটি নাথানকে এত দ্রুত আর এত জোরে নদীর পাড়ে ছুঁড়ে মারল যে তার শরীরের উপরের অংশ গিয়ে আছড়ে পড়ল কাদায়। মাথা ঘুরিয়ে একটু এদিক-সেদিক দেখতেই কাদার মধ্যে উপুড় হয়ে থাকা আবছা কিছু একটা চোখে পড়ল যুদ্ধজয়ী নাখানের।
টামা! যেমনটি আশা করেছিল, সাপটার অস্ত্রে চাপের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার খেলাই তাদের দুই বন্দীকে মুক্ত করে দিয়েছে। নাথান ঝাপিয়ে পড়ে দু-হাত দিয়ে মেয়েটার নিথর দেহ নিজের দিকে টেনে নিল। কাঁধে ঝুলিয়ে দ্রুত ছুটল নিরাপদ স্থানের দিকে। তার ভেঁজা শরীরটা পাড়ের মাটির উপর ছড়িয়ে দিল সে। মেয়েটির শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ, ঠোঁট দুটো একেবারে রক্তবর্ণ। নাথান তার নাড়িস্পন্দন পেল ঠিকই কিন্তু বেশ দুর্বল।
সাহায্যের জন্য অসহায়ভাবে একটু এদিক-সেদিক চোখ বুলাল। কেউ নেই আশেপাশে । এখন মেয়েটির পুণর্জীবন পাওয়াটা নাথানের উপরেই নির্ভর করছে। ঝুঁকিপূর্ণ জঙ্গল ভ্রমণের আগেই নাথানকে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং সিপিআর (কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেইশন) সম্বন্ধে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল কিন্তু নাথান কোন ডাক্তার নয়। হাটু গেঁড়ে মেয়েটিকে উপুড় করে দিয়ে পিঠে হাত রেখে কয়েক বার চাপ দিতেই নাক-মুখ দিয়ে কিছু পানি ছিটকে বেড়িয়ে এল। এবার তাকে ঘুরিয়ে চিৎ করে দিয়ে মেয়েটির মুখ দিয়ে বাতাস ঢুকিয়ে দিল হৃদপিণ্ড সচল কার জন্য। ঠিক এই মুহূর্তে মধ্যবয়সী এক ইয়ানামামো মহিলা জঙ্গল থেকে বের হয়ে এলো । আর সব ইন্ডিয়ানদের মতই তার উচ্চতাও ছিল পাঁচ ফুটের নিচে । গতানুগতিক বাটি ছাঁট চুল, কানে পালক ও বাঁশের তৈরি দুল। সাদা চামড়ার একজন মানুষকে ছোট একটি বাচ্চার উপর ঝুঁকে থাকতে দেখে মহিলার চোখ বড় বড় হয়ে গেল ।
নাথান জানত ব্যাপারটা দেখতে কেমন লাগবে। টামার হঠাৎ করে চেতনা ফিরে আসা শুরু করতেই দ্রুত উঠে দাঁড়াল সে। ব্যাথার বহিপ্রকাশ ঘটানো ছোট ছোট কাশি দিতেই তার মুখ দিয়ে কিছুটা পানি বের হয়ে এল। ছোট হাত দিয়ে নাথানকে খামচে ধরে রইলো মেয়েটি-সাপের আতঙ্ক চোখেমুখে । এখনও সেটা কাটে নি।
“এখন তুমি নিরাপদ, সোনা,” ইয়ানামামো ভাষায় বলে মেয়েটির হাত শক্ত করে ধরার চেষ্টা করল নাথান তারপর সবকিছু ব্যাখ্যা করার জন্য মহিলার দিকে ঘুরল, খাটো ইন্ডিয়ান তার বাস্কেট ফেলে দৌড়ে ঘন জঙ্গলে হারিয়ে গেছে ততোক্ষণে, তবে নির্বাক থাকলো না সে। বিশেষ এক ধরনের চিকার করতে থাকলো। নাথান জানে এই সংকেতের মানে কি-যখন গ্রামের কেউ আক্রমণের শিকার হয় তখনই এই সংকেত দেওয়া হয়।
“দারুণ, আসলেই দারুণ,” চোখ দুটো বুজে ফেলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল নাথান।
প্রবীণ সামানের কাছ থেকে চিকিৎসাবিষয়ক জ্ঞান অর্জন করার জন্য নাথান চার সপ্তাহ আগে প্রথম যখন এই গ্রামে আসে দলীয়প্রধান তাকে স্থানীয় মহিলাদের থেকে দূরে থাকতে অনুরোধ করেছিলেন। অতীতে এমন সুযোগ ছিল যখন আগন্তুকেরা স্থানীয় মহিলাদের ভোগ করার সুযোগ গ্রহণ করত। নাথান সেই অনুরোধের সম্মান রেখেছে। এমনকি কিছু নারী তাদের বিছানা নাথানের সাথে ভাগাভাগি করার জন্য অত্যুত্সাহী থাকার পরও। তার ছয় ফুটের চেয়ে বেশি শারিরীক কাঠামো, নীল চোখ আর সোনালী চুল সবকিছুই নতুনত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছিল এইসব মহিলাদের কাছে ।
কিছুটা দূরে, দৌড়ে পালানো মহিলার চিৎকারে সাড়া দিল বেশ কয়েকজন ইয়ামোমামো। স্থানীয়ভাবে ইয়ানামামোদেরকে দূর্ধর্ষ জাত’ বলেও ডাকা হয়। আগে এই গোত্রের লোকজনকে বর্বর যোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা করা হত ।গ্রামের হুইয়াস’ বা তরুণেরা বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ প্রকাশ্যেই তুমুল যুদ্ধে উপনীত হত কখনও প্রতিবেশী গোত্রের সাথে, কখনও বা নিজেদের মধ্যেই। আর এই বিবাদের কারণ হিসেবে থাকত তাদের উপর আরোপিত অভিশাপ মোচনের ব্যাপারটি অথবা সম্মানের আসন ধরে রাখা। কারো নাম ব্যঙ্গ করে বলার মত ছোটখাট অপমানসূচক কাজকে কেন্দ্র করে মারামারি বাধিয়ে পুরো গ্রাম ছারখার করে দেয়ার মত নজিরও এদের আছে।
নাথান বড়বড় চোখ করে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলো। এই ব্যাপারটিকে হুইসরা কিভাবে নেবে যেখানে এক সাদাচামড়ার মানুষ তাদেরই গোত্রের তাদেরই প্রধানের ভাইঝিকে আহত করেছে।
নাথানের পাশেই টামা শুয়ে আছে। মেয়েটার আতঙ্ক ধীরে ধীরে কাটতে থাকলেও কিছুক্ষণ পরপর ক্লান্তি তাকে অচেতন করে ফেলছে। তার শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়মিতই হচ্ছে কি নাথান যতবারই তার কপালে হাত রাখছে ততবারই ধেয়ে আসা জ্বরের উপস্থিতি বুঝতে পারছে সে। হঠাৎ তার চোখ গেল মেয়েটির শরীরের ডান দিকটাতে। কালচে হয়ে থাকা বুকের পাঁজরে হাত বুলাতেই নাথান বুঝতে পারলো অ্যানাকোন্ডা তার বিধ্বংসী চাপ দিয়ে টামার দুটি হাঁড় ভেঙে দিয়ে গেছে । নিচের ঠোট কামড়ে ধরে নাথান গোড়ালির ওপর ভর করে বসে পড়তেই অসহায়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। মেয়েটিকে বাঁচাতে হলে এখনই চিকিৎসা দিতে হবে। মেয়েটিকে দু-হাতে তুলে নিল নাথান। সবচেয়ে কাছের হাসপাতালটি সাও গ্যানিয়েলের ছোট্ট এক শহরে, আর সেটাও নদীপথে নিদেনপক্ষে দশমাইল দূরের । তবু টামাকে সেখানেই নিতে হবে।
কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় সমস্যার নাম হলো ইয়ানোমামো । কোন রাস্তা দিয়েই মেয়েটিকে নিয়ে দূরে যেতে পারবে না, পালানো তো দূরের কথা। এটা হলো ইন্ডিয়ানদের ভূখন্ড। নাথান এই ইন্ডিয়ানদের সম্পর্কে ভাল না জানলেও কিছুই যায় আসে না। কারণ সে তো তাদের কেউ না। এই আমাজনজুড়ে একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে না বোয়েসি, ইঙ্গি আল সানি। এই জঙ্গলে ইন্ডিয়ানরা সবকিছুই জানে। পাশাপাশি এরা অসাধারণ শিকারী, তীর-বর্শা-লাঠি ছোঁড়ায় দক্ষ আর ব্লো-গান তো আছেই পার্লানোর কোন রাস্তা নেই তার।
নদী থেকে সরে এসে গাছে ঝুলতে থাকা শটগানটা তুলে কাধে ঝোলালো নাথান । দুহাতে মেয়েটিকে উঁচু করে ধরে নিয়ে গ্রামের দিকে রওনা হল সে। যেভাবেই হোক তাদেরকে বোঝাতে হবে আসলে কি ঘটেছে। আর এটা করতে হবে নাথান আর টামা উভয়ের ভালর জন্যই।
সামনেই ইন্ডিয়ানদের গ্রাম-যেটাকে নাথান নিজের বাড়ি বললে সেটা এখন মরণস্তব্ধ । প্রতি পদক্ষেপেই ব্যাথায় কুঁচকে উঠছে সে। চারপাশের সবকিছু যেন মৃত, শান্ত হয়ে গেছে। এমনকি সবসময় চলতে থাকা বানরের চিকার চেঁচামেচি, পাখির ডাক সবকিছুই কেমন থেমে গেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাস্তার একটা বাঁক ঘুরতেই পথরোধ করে থাকা ডিয়ানদের সামনে পড়ে গেল সে। তীর-বর্শা এমনভাবে তা করা যেন সেগুলো কেবল চুড়তে বাকি। নড়াচড়ার শব্দ থেকে যতটা বুঝতে পারলো তার থেকেও বেশি ইন্ডিয়ানদের উপস্থিতি অনুভব করতে পারছে নাথান তার পেছনে।
ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের সৈন্যগুলো একটু দেখে নিল নাথান । বোধহয় সবাই চলে এসেছে যুদ্ধ করতে প্রস্তুতিও দারুশ! সবাই যার যার পজিশনে স্থির হয়ে আছে। সবাই লাল রঙে মুখ রাঙিয়ে ময়দানে হাজির । দু-জনকে বাঁচানোর একটা উপায় দেখতে পাচ্ছে নাথান, একটু অভিনয়, যেটা করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই তার কিন্তু এটা ছাড়া উপায়ই বা কি?
“নারবুশি ইয়াই ইয়াই!” চিৎকার করে বলে উঠলো সে। “আমি আপনাদের কাছে ইনসাফ চাই!”
আগস্ট ৬,
সকাল ১১:৩৮
সাও গ্যাব্রিয়েল কোচিরিয়ার বাইরে
ম্যানুয়েল অ্যাজভেদো জানে তাকে শিকার করা হচ্ছে। বনের সরু রাস্তা ধরে দৌড়াতেই জাগুয়ারটার মৃদু গুঞ্জন তার কানে এল । স্যারেড ওয়ের খাড়া পাহাড়ি রাস্তায় হোঁচট খেয়ে ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে পড়ে গেল সে। সামনেই জঙ্গলের এক ফাঁক দিয়ে সাও গ্যাব্রিয়েলের একাংশ দেখা যাচ্ছে। ছোট এই মফস্বলটি রিও-নিগ্রো নদীর কোলে দাঁড়িয়ে আছে, আর বিশাল আমাজনের পানি বুকে নিয়ে বয়ে চলেছে উত্তরাঞ্চলের মধ্য দিয়ে ।
চলে এসেছি…বেশ কাছেই চলে এসেছি।
পড়তে পড়তে বেশ খানিকটা নিচে গিয়ে একটা জায়গায় থামতেই পেছনে তাকালো সে। জাগুয়ারটার উপস্থিতি টের পাবার জন্য তার সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ । ডাল-পালা ভাঙার কিংবা ঝরাপাতার মরমর শব্দ.. কিন্তু না। জঙ্গলি-বিড়ালটা কোথাও টিকিটাও প্রকাশ করল না এই আমাজনে। এমনকি জাগুয়ারটির শিকারী গুঞ্জনও থেমে গেছে। এটা সে জানত, শিকারকে দৌড়ের উপর রেখে ক্লান্ত করে দিয়ে এখন চূড়ান্ত আক্রমণের জন্য খুবই সতর্কতার সাথে এগুচ্ছে ওটা।
মাথা সামান্য একটু উঁচু করে এদিক-সেদিক তাকাল ম্যানুয়েল । ঝিঝি পোকার ডাক আর পাখির কিচিরমিচির শব্দ ছাড়া আর কিছু শুনলো না ঘাম ঝরছে তার মুখ দিয়ে। একদিকে উত্তেজনা চেপে রাখা অন্যদিকে শ্রবনেন্দ্রিয় সজাগ রাখতে রাখতে অজান্তেই তার একহাত চলে গেল কোমরে গোঁজা ছুরিটার হাতলে । অন্য হাতটিও ব্যস্ত থাকলো অপরপ্রান্তে ঝোলানো ছোট চাবুকটার উপর আঙুল বোলানোর কাজে।
তীক্ষ দৃষ্টি দিয়ে চারপাশটা দেখে নিল ম্যানুয়েল। রাস্তার উভয় দিকে লতা-পাতা আর ঝোঁপঝাড়ে ঢাকা। কোন দিক থেকে আসতে পারে জানোয়ারটা?
একটা ছায়া সরে গেল। গোড়ালিতে ভর করে একটু ঘুরে গুটিসুটি মেরে থাকলো ম্যানুয়েল । জঙ্গলের গভীরতা ভেদ করে কিছু দেখার জন্য মরিয়া তার চোখ দুটো কিন্তু কিছুই দেখতে পেলো না । কাছেই মসৃণ আর ছোপছোপ পশমের একটি ছায়া আবির্ভূত হল। কালো ও কমলা রঙের বাঘটা মাত্র দশ ফুট দূরেই । শিকার ধরার ঠিক আগ মুহূর্তেও প্রস্তুতি হিসেবে কাঁধ উঁচু রেখে মাথা নিচু করে লেজটা এদিক ওদিক নাড়াতে লাগল দুবছর বয়সী কৈশোরে পা দেয়া পুরুষ জাগুয়ারটি।
শুকনো পাতার মরমর শব্দ বেশ ভালভাবেই জানান দিচ্ছে ওটার উপস্থিতি। ম্যানুয়েল আরেকটু গুটিয়ে গেল..শিকারের জন্য প্রস্তুত ওটা । তীক্ষ্ণ দাঁত বের করে ঘরঘর শব্দ করতে করতে জাগুয়ারটা ঝাপিয়ে পড়ল তার উপর।
দীর্ঘকায় জাগুয়ারটা ম্যানুয়েলের উপর পড়তেই দম আটকে এল তার। ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলো সে। উভয়ে জড়াজড়ি করতে করতে কিছুটা নিচে নেমে এল। গড়িয়ে পড়তেই ম্যানুর হালকা পাতলা দেহটা ছুঁয়ে গেল বাতাস । আমাজনের এই জগৎ ডুবে থাকে সীমাহীন সবুজের সাগরে আবার ভেসে ওঠে তীব্র সূর্যালোকের বন্যায় , শিহরিত হয় বর্ণিল পশম আর বড় দাঁতের ভয়ালদর্শণ প্রাণীদের দ্বারা।
জাগুয়ারটা ম্যানুয়েলকে থাবা দিয়ে জাপটে ধরতেই তার গায়ের খাকি পোশাক বেশ খানিকটা ছিড়ে গেল। খুলে পড়ল একটা পকেট। দাঁত বসিয়ে দিল তার কাঁধে। স্থলভাগের সমস্ত প্রাণীকুলের মধ্যে জাগুয়ার হল দ্বিতীয় শক্ত চোয়ালের অধিকারী, তবে তাসত্ত্বেও এটার দাঁত ম্যানুয়েলের কাঁধের মাংস চেপে ধরা ছাড়া কিছুই করতে পারল না।
বন্য ও সভ্যর এই যুগল গড়াতে গড়াতে তুলনামূলক একটি সমতল জায়গায় এসে থামতেই ম্যানুয়েল নিজেকে জাগুয়ারটার নিচে আবিষ্কার করলো। প্রাণীটা গোঙাতে গোঙাতে শার্টের ওপর কামড় বসানোর চেষ্টা করতেই প্রতিপক্ষের আগুনজুলা চোখের দিকে তীক্ষ দৃষ্টি হানল ম্যানুয়েল।
“তোমার হয়েছে, টর-টর?” মুখ দিয়ে দম ছাড়তে ছাড়তে বলল সে। যে নামে বিশাল বিড়ালটাকে ডাকা হল সেটা মূলত আরাওয়াফ ইন্ডিয়ানরা কোন ভুত বা আত্মাকে বোঝানোর জন্য ব্যবহার করে। কিন্তু যেহেতু বিশাল আকৃতির জাগুয়ারটি জেঁকে বসেছে ম্যানুর বুকের উপর সেহেতু এই নামটা উপযুক্ত মনে না হওয়ার কোন কারণ দেখতে পাচ্ছে না। প্রভুর কণ্ঠ শুনেই জাগুয়ারটা শক্ত করে ধরে থাকা শার্ট হোলকা করে দিয়ে খানিক তাকিয়ে থাকল তার দিকে। তারপর ওটার উষ্ণ অমসৃণ জিহ্বা দিয়ে ম্যানুর কপালের ঘাম চাটতে লাগল।
“আমিও তোমাকে ভালবাসি, সোনা, এবার আমাকে ছাড়া ।”
থাবাটা সরে যেতেই ম্যানুয়েল উঠে দাঁড়াল জামা কাপড়ের বেহাল দশা দেখতে দেখতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। তরুণ জাগুয়ারকে শিকারের প্রশিক্ষণ দেওয়া মানে তার ওয়ার্ডরোবে হেঁড়া কাপড়ের আবর্জনা বেড়ে যাওয়া। কাতরাতে কাতরাতে উঠে দাঁড়িয়ে ম্যানুয়েল তার পেছনে একটা গিট্ট দিল । তার বয়স মাত্র বত্রিশ কিন্তু এই খেলাটার জন্য এই বয়সটাকে বার্ধক্যই বলা যায়। বিড়ালটা পায়ের উপর ভর করে নিজেকে একটু প্রসারিত করল, তারপর শব্দ করে লেজ নাড়াতে নাড়াতে বাতাসে নাক চালিয়ে গন্ধ শুকতে লাগল একেবারে পাক্কা শিকারীর মত। একটু হেসে জাগুয়ারের গলাটা বেধে দিল ম্যানুয়েল। “আজকের শিকার ধরা এ-পর্যন্তই। অনেক দেরি হয়ে গেছে। অফিসে আমার একগাদা রিপোর্ট জমে আছে।”
একটু রাগীসুরে আপত্তি জানালেও শেষ পর্যন্ত পেছন পেছন হাটা শুরু করল জাগুয়ারটি। বছর দুয়েক আগে নিঃস্ব এই শাবকটিকে বাঁচিয়েছিল ম্যানুয়েল । তখন ওটার বয়স ছিল মাত্র কয়েকদিন। ওর মা মারা পড়ে অবৈধ চামড়া ব্যবসায়ীদের হাতে এটার চামড়া এমনি চড়া দাম যে কালোবাজার চাঙ্গা করে রাখত। সাম্প্রতিক ধারণানুযায়ী, এই গভীর আমাজনের পুরোটাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জাগুয়ারের সংখ্যা পনের হাজারে নেমে এসেছে।প্রাণী সংরক্ষণমূলক কর্মকান্ড সেইসব দরিদ্র, মূর্থ ও বর্বর মানুষদের উপরে প্রভাব ফেলেছিল যারা এইসব প্রাণী বাণিজ্যের সাথে যুক্ত থেকে নিজেদের নূন্যতম চাহিদা মেটাত। তবে সত্যি কথা হল ক্ষুধার্ত পেট একজনের নৈতিকদৃষ্টির পরিধি কমিয়ে দেয়। আর তখন এসব জীবজন্তু বাঁচানোর দায়িত্ববোধ হয়ে পড়ে নিষ্ক্রিয়।
এই সত্যিটা আধা-ইন্ডিয়ান ম্যানুয়েল ভালভাবেই জানে। বার্সেলোর পথঘাটে, আমাজনের নদীর তীর ধরে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে শৈশব কেটেছে তার। সেই সময়ে অনাথ ম্যানুয়েলকে প্রতিদিনের খাবার প্রতিদিনই সংগ্রহ করতে হত। কখনও কটা পয়সার জন্য ভিক্ষার হাত বাড়াতে হত ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছে, আবার কখনও হাত একেবারেই খালি হয়ে গেলে চুরি করত সে। ফলে একদিন তাকে রোমান ক্যাথলিক আওতাধীন সেলসিয়াল মিশনারিতে নিয়ে থাকা-খাওয়া ও পড়াশোনার সুযোগ করে দেয়া হয়। ম্যানুয়েল বেশ সফলতার সাথেই ইউনিভার্সিটি অব সাও পাওলো থেকে বায়োলজিতে একটা ডিগ্রি নেয়। তার স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে দেয় ব্রাজিলিয়ান ইন্ডিয়ান ফাউন্ডেশন ফুনাই, আর এই স্কলারশিপের টাকা শোধ করতেই তাকে স্থানীয় ইন্ডিয়ানদের সাথে বিভিন্ন কাজ করতে হত । যেমন : ইন্ডিয়ানদের ঐতিহ্যগত আগ্রহের বিষয়-বস্তু, পুরনো জীবনধারা সংরক্ষণ করতে শেখানো, নিজেদের ভূ-খণ্ড বৈধভাবে নিজেদের দখলে রাখা, এসব। ত্রিশ বছর বয়সে সাও-গ্যাব্রিয়েলের স্থানীয় ফুনাই-এর অফিসের প্রধান করে পাঠানো হয় তাকে । ইয়ানোমামো অঞ্চলে বন্যপ্রাণীর চোরাকারবারিদের সম্পর্কে তদন্ত করতে গিয়ে তারই মত আরেক অনাথ টরটরকে খুঁজে পায় সে। আক্রমণকারী এক দস্যুর লাথি খেয়ে ওটার পেছনের ডান পা-টা থেতলে যায়। প্রচন্ড আঘাত পেয়ে কাতরাচ্ছিল ছোট্ট প্রাণীটি । ম্যানুয়েল এটা উপেক্ষা করতে পারে নি। ফুপিয়ে কাঁদতে থাকা বাচ্চাটাকে কম্বলে জড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে আসে সে। তারপর আজকের এই টরটরকে এতো বড় করার জন্য সব রকম যত্ন নিতে থাকে।
ম্যানুয়েল তার সামনে ধীরে ধীরে ছুটতে থাকা টর-টরের দিকে তাকাল । ছোটবেলার আঘাত পাওয়া পা-টা এখনও কিছুটা বাঁকা। ম্যানুয়েল ভাবল, আর মাত্র একবছরেরও কম সময়ের মধ্যে তার আদরের টর-টর পরিপূর্ণ যৌবনে পা দেবে। তখন ওটার মাঝে বন্যতা এবং হিংস্রতা এতটাই বেশি হবে যে ওটাকে জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না। তবে তার আগে নিজেকে বাঁচানোর সব কলা-কৌশল জানতে হবে ওকে।
জঙ্গলে অনভিজ্ঞদের কোন জায়গা নেই।
সামনেই জঙ্গলের শেষ মাথা ঢালু হয়ে স্যারেড ওয়ের পাহাড়ের পাদদেশে গিয়ে মিশেছে । জরাজীর্ণ আর পাকাবাড়ির সংমিশ্রণে বেড়ে ওঠা সাও-গ্যাব্রিয়েল ম্যানুর সামনেই বিস্তৃত হয়ে আছে । নিগ্রো নদীর চর দখল করে বেড়ে ওঠা স্থাপনার মধ্যে কিছু বড়বড় হোটেল এবং ঘর-বাড়িও চোখে পড়ে যেগুলো গত অর্ধশতকের মধ্যে গড়ে উঠেছিল ক্রমবর্ধমান পর্যটকদের থাকার জায়গা সংকুলানের জন্য। অদূরেই একটি বাণিজ্যিক বিমানবন্দর আছে এখানে। ওটার রানওয়ে দেখে মনে হয় যেন সবুজের বুকে বিশাল একটা কালো দাগ এঁকে দিয়েছে কেউ। এতসব কর্মকান্ড দেখে স্পষ্টতই বোঝা যায়, এই দূরের বন-জঙ্গলেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কখনই থামবে না ।
কপালের ঘাম মোছা শেষ হতেই ম্যানুয়েল ধাক্কা খেল টর-টরের সাথে। সে খেয়াল কল ওটা থমকে গিয়ে ঘরঘর শব্দ করছে। কোন বিপদ সংকেত।
“কি হয়েছে?”
তারপর সে নিজেও শুনতে পারল ওটা। সবুজের চাদরে ঢেকে থাকা পুরো জঙ্গলজুড়ে একটা শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, গভীর একটা স্পন্দন বাড়ছে ধীরে ধীরে। মনে হচ্ছে তাদের চারপাশ থেকেই আসছে। সংকুচিত হলো ম্যানুর চোখ, চিনতে পারল শব্দটা কিসের, যদিও এই শব্দ খুব কমই শোনা যায় এখানে। একটা হেলিকপ্টার। সাও-গ্যাব্রিয়েলে ভ্রমণ করা বেশিরভাগ লোকই রিভার বোট বা ছোটপাখার প্লেনে করে আসে। এই জঙ্গলে আসতে যে দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয় তা হেলিকপ্টার দিয়ে দেওয়া কঠিন। এমনকি স্থানীয় ব্রাজিলিয়ান আর্মিদের বেসক্যাম্পেও এই ডানাওয়ালা যন্ত্র মাত্র একটা আছে, তা দিয়েই উদ্ধার কাজ থেকে শুরু করে চোরাকারবারীদের ধরার কাজ চলে।
শব্দের পরিমান বাড়ছে খুব দ্রুত, আর তাতেই মনে একটু খটকা লাগল । সে ভাল করেই বুঝতে পারলো হেলিকপ্টারের সংখ্যা একাধিক । আকাশের দিকে তাকিয়ে খুঁজলেও কিছুই চোখে পড়ল না তার। হঠাৎ টর-টর আতঙ্কিত হয়ে পড়ল । কিছু একটা আঁচ করতে পেরে দৌড়ে পাশের ঝোপের আড়ালে গিয়ে লুকাল ওটা। তিনটি হেলিকপ্টারের একটি স্কোয়াড সশব্দ উড়ে গিয়ে চোখের পলকে মাউন্ট অফ স্যারেড ওয়ে অতিক্রম করে ছোট্ট শহরটার উপর চক্রাকারে ঘুরতে লাগল বোলতার ঝাঁকের মত। মলিটারিদের এই হেলিকপ্টারের সবগুলোই ইউএইচ-১ হিউজ মডেলের । ম্যানু মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাতেই চতুর্থ চপারটি তার ঠিক উপর দিয়ে হিসহিস শব্দ করতে করতে উড়ে গেল । প্রথম তিনটি থেকে এটি সম্পূর্ণ আলাদা ধাঁচের, চমৎকার গড়ন, রংটা চকচকে কালো। বিশেষ আকৃতির গঠন আর লেজের প্রান্তে থাকা পাখাগুলো দেখে এটাকে বেশ ভাল করেই চিনত্রে পরলো সে। মিলিটারিতে কিছুদিন কাজ করার সুবাদে এগুলো তার খুব পরিচিত।
আরএ-৬৬ কমানখ মডেলের এই চপারটি ব্যবহৃত হয় শত্রুদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও আক্রমণের কাজে ।
হালকা পাতলা হেলিকপ্টারটি ম্যানুর এত কাছ দিয়ে উড়ে গেল যে ওটার একপাশে ইউএস-এর ছোট্ট পতাকাটা চিনতে পারলো ভালভাবেই । বাতাসের তীব্র ধাক্কায় প্রকম্পিত
হল গাছপালার উপরের অংশ। বানরেরদল আতঙ্কে চেঁচামেচি করতে করতে এদিকসেদিক ছোটাছুটি করতে লাগল, আতঙ্ক ছড়াল পাখিদের মাঝেও। লালডানার একঝাক টিয়াপাখি ছত্রভঙ্গ হয়ে উড়াল দিতেই নীল আকাশ যেন অগ্নি-স্ফুলিঙ্গে ছেয়ে গেল।
চতুর্থ হেলিকপ্টারটি ততক্ষণে ব্রাজিলিয়ান আর্মি বেসক্যাম্পের উপর ঘুরতে থাকা বাকি তিনটি হেলিকপ্টারের সাথে যোগ দিয়েছে। দ্রু কুঁচকে থাকা ম্যানু শিষ দিয়ে টরটরকে ডাকতেই ঝোপের আড়াল থেকে বেড়িয়ে এল ওটা। চোখেমুখে এখনও কিছুটা ভয়। “ভয় পেও না, সব ঠিক আছে,” জাগুয়ারটির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল সে।।
কয়েক মুহূর্ত পর হেলিকপ্টারগুলো মাঠে নামতেই পাখার ধপধপানি মিলিয়ে গেল । ম্যানু একটু এগিয়ে গিয়ে টর-টরের কাঁধে হাত রাখতেই ওটার ভেতরের ভয়ের পরিমাণ বুঝতে পারল, এই ভয় তাকেও বেশ গ্রাস করেছে। কোমরে গোঁজা চাবুকটা হ্যাচকা টান দিয়ে হাতে নিল সে। “শালার স্টেটস মিলিটারি! এই সাও-গ্যাব্রিয়েলে কি করতে এসেছে?” দম নিয়ে সামনের ঢালু রাস্তায় পা বাড়াল ম্যানুয়েল।
গভীর আমাজনের ঠিক মাঝে ইয়ানোমামোদর সেন্ট্রাল প্লাজা অবস্থিত। গ্রামের মাঝখানে প্লাজায় নাথান তার প্রতিপক্ষ বক্সারের সামনে নগ্ন অবস্থায় দাঁড়ালো। তার চারপাশে ইয়ানামামো শাবানো ও ছোটছোট গোলাকৃতি ঘর বেষ্টন করে আছে। একটা ফুটবল মাঠের অর্ধেক পরিমাণ জায়গার সমপরিমাণ জায়গাজুড়ে অবস্থিত এই প্লাজার ছাদেও মাঝ বরাবর বেশ খানিকটা জায়গা খোলা যাতে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে। নারী এবং বৃদ্ধরা কলাপাতা ছাওয়া এক জায়গার দোলনার উপর আরাম করে বসেছে আর যুবকেরা ব্যস্ত অন্য কাজে। হুইয়াসদের সাথে তারা যোগ দিয়ে তীর-বর্শা তাক করে রেখেছে। নাথানের দিকে যেন পালানোর কোন চেষ্টাই সে করতে না পারে।
প্রথম দিকে অস্ত্রের মুখে নাথানকে যখন ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনা হচ্ছিল তখন সে তাদেরকে সব রকমভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল আসলে কি ঘটেছেঅ্যানাকোন্ডার কামড়ে সৃষ্ট কজির দগদগে ক্ষত প্রমাণস্বরূপ দেখানোর পরও তার কথা কেউ কানে তোলে নি। এমনকি গ্রামের প্রধান, যে নাথানের হাত থেকে মেয়েটিকে তুলে নিয়েছিল, এমনভাবে তাকে অবজ্ঞা করল যেন সে বিরাট বড় একটি অপরাধ করেছে
নাথান বেশ ভালভাবেই জানত এই বিচার শেষ হওয়া পর্যন্ত তার কোন কথাই শোনা হবে না । ইয়ামোমামোরা এরকমই বিচার করে নাথান এই দ্বৈত-যুদ্ধ করার দাবি করেছে কিছুটা সময় পার করার জন্য। আর তাই যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ তার কথা শুনবে না। এখন শুধুমাত্র ঈশ্বর যদি তাকে জয়ের মুখ দেখান তবেই সে কিছু বলতে পারবে এই যুদ্ধবাজ ইয়ানামামোদের কাছে।
খালি পায়ে কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে নাথান । অপরপ্রান্তে একদল হুইয়াস বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত কে যুদ্ধে নামবে, কোন অস্ত্র ব্যবহার করা হবে এসব নিয়ে। প্রথাসিদ্ধ দ্বৈতযুদ্ধে সাধারণত নাবরুশি, হালকা লাঠি, সূঁচালো মাথার আট ফুটের লম্বা লাঠি ব্যবহার করা হয় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে ব্যবহার করা হয় বিশালাকৃতির ছুরি বা বর্শার মত প্রাণঘাতি অস্ত্র।
হঠাৎ থেমে গেল চিল্লাপাল্লা, সরে গেল মানুষের দল। একজন ইন্ডিয়ান সামনে এগিয়ে এল। স্থানীয় গোত্রের মানুষ হিসেবে যথেষ্ট লম্বা এই মানুষ প্রায় নাথানের মতই। পেশীবহুল এই পুরুষটির নাম তাকাহো, সে গোত্রপ্রধানের ভাই। তবে তার চেয়েও বড় ব্যাপার হলো সে টামার বাবা। পরনে আর একটা কোমরবন্ধনী ছাড়া আর কিছুই নেই যেটার ঝুলে থাকা সামনের অংশ তার লিঙ্গের অগ্রভাগ পর্যন্ত ঢেকে রেখেছে। সারা বুকজুড়ে উজ্জ্বল বর্ণে ও রেখায় সজ্জিত তাকাহো মাথায় বানরের লেজের হেডব্যান্ড পরে মুখে গাঢ় রং মেখে রণক্ষেত্রে হাজির হয়েছে। নিচের ঠোটে তামাকের পুরুস্তর তাকে পুরোপুরি এক যোদ্ধার রূপ দিয়েছে যেন। সে এক হাত বাড়িয়ে দিতেই একজন ইন্ডিয়ান পড়িমরি করে ছুটে এসে তার হাতে বড়সড় একটা কুড়াল ধরিয়ে দিল। কালচে লাল রঙের স্নেইক-উডের হাতলটা একটু বাঁকানো আর অগ্রভাগে স্টিলের সঁচালো একটি ক্যাপ লাগানো। যেকোন দ্বৈতযুদ্ধের ক্ষেত্রে এই ভয়ালদর্শন হাতিয়ারের পক্ষে নৃশংস দৃশ্যের অবতারণা করা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার । এরকম আরেকটি কুড়াল দেওয়া হল নাথানের হাতেও। তার অপরপ্রান্তে এক হুইয়াসকে দৌড়ে আসতে দেখল নাথান। ওর হাতে একরকম তৈলাক্ত তরল পদার্থের পাত্র। হুইয়াসটা তরলে রা পাত্র তুলে ধরতেই তাকাহো তার কুড়ালের মাথাটা তরলের মধ্যে চুবিয়ে নিল।
নাথান জলবৎ পদার্থটাকে চিনতে পারলো সহজেই। কিছুদিন আগে এক শামানকে এটা বানাতে শিখিয়েছিল সে। স্থানীয় ভাষায় এটাকে বলে উরারি আর ইংরেজরা বলে ‘কিউয়ারি। মুনসিড গোত্রের একধরনের বিশেষ লতানো আঙ্গুর গাছের আঙ্গুর থেকে বেরা এই বিষ এতটাই মারাত্মক যে মুহূর্তেই এটা যেকারো স্নায়ুকে অকেজো করে দিতে পারে। এই বিশেষ পয়জনটা বানানো হয়েছিল মূলত বানর শিকার করার জন্য কিন্তু আজকে এটা ব্যবহৃত হতে যাচ্ছে আরো অশুভ একটি কাজে।
চারপাশে একটু দৃষ্টি বুলালো নাথান। তার জন্য কেউ কোন পাত্র আনল না যাতে সেও তার কুড়ালটার মাথা ভেঁজাতে পারে। গ্রামপ্রধান মাথার ধনুক তুলে ধরে বিশেষ এক ধরনের শব্দ করল যেন যুদ্ধটা এখনই শুরু হয়।
দক্ষতার সাথে হাতের কুড়ালটা ঘোরাতে ঘোরাতে প্লাজার প্রান্ত বরাবর হাটতে লাগল তাকাহো। নাথানও তার কুড়ালটা একটু উপরে তুললো। কিভাবে জিতবে সে এখানে? প্রতিপক্ষের অন্ত্রের সামান্য একটু খোঁচা খাওয়া মানে অবধারিত মৃত্যু। টামাকে বাঁচানোর জন্যই সে আজ এখানে কিন্তু তাকে বাঁচাতে দুঙিয়া মানে তার বাবার মৃত্যু হতে হবে নাথানের হাতে। নিজের ভারসাম্য ঠিক রাখতে হাতের কুড়ালটা বুক বরাবর সোজা তুলে ধরল নাথান । প্রতিপক্ষের ক্রোধান্বিত চোখ তাকে খেয়ে ফেলতে চাইছে যেন।
“আমি তোমার মেয়েকে আঘাত করি নি,” রাগ ও হিংস্রতা জড়ানো গলায় চিৎকার করে বলে উঠলো সে।
তাকাহোর চোখ দুটো সংকুচিত হয়ে গেল। নাথানের বক্তব্য তার কানে পৌঁছেছে ঠিকই কিন্তু অবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে তার চোখে। মেয়ের কথা মনে উঠতেই সে অন্যদিকে দৃষ্টি দিল যেখানে গ্রামের শামান তার মেয়ে টামাকে সারিয়ে তোলার কাজে ব্যস্ত । ছিপছিপে লম্বা এই বৃদ্ধ শামান মেয়েটার উপর ঝুঁকে মন্ত্র আওড়াতে আওড়াতে শুকনো ঘাস, লতাপাতা পুড়িয়ে ধোয়ার একটি আস্তরণ তৈরি করে ফেলেছে তাদের চারপাশ ঘিরে। লতাপাতা ও লবণের মিশ্রণ এক ধরনের কটু গন্ধের সৃষ্টি করেছে যা নাথানের নাকেও ধরা পড়ল। অনেক প্রচেষ্টা চলছে কিন্তু মেয়েটা এখনও নিথর ।
নাথানের দিকে দৃষ্টি হানল তাকাহো। হুঙ্কার দিয়ে ইন্ডিয়ানটা ঝাপিয়ে পড়ল তার দিকে, হাতের কুড়ালটা চালালো একেবারে নাথানের মাথা বরাবর।
অল্পবয়সে কুস্তির প্রশিক্ষণ নেওয়া নাথান ভালভাবেই জানে একেবারে নিজেকে কিভাবে সরিয়ে নিতে হয়। সে খুব দ্রুত নিচু হতেই তাকাহেরি কুড়ালটা তার মাথার উপর দিয়ে চলে গেল, আর সেই সুযোগে নিজের অস্ত্রটা চালালো প্রতিপক্ষের পা লক্ষ্য করে । তীব্র এক ঝাকুনি খেয়ে তাকাহো পড়ে গেল কাদায়। মাথার ব্যান্ডটাও ঢিলে হয়ে গেল। নাথান কঠিন আঘাতের পরিবর্তে কুড়ালের ধারহীন প্রান্ত দিয়ে আঘাত করায় তাকাহোর কোথাও জখম হলো না। সে কাদার মধ্যে পড়তেই নাথান তার বিশাল দেহ নিয়ে ইন্ডিয়ানটার উপর ঝাপিয়ে পড়তে চাইলো। একবার যদি তাকে বোঝাতে পারতাম।
কিন্তু চিতার ক্ষিপ্রতায় একপাশে সরে গেল তাকাহো । আবারো তার কুড়ালের ঘা বসিয়ে দিল নাথানের দিকে। বিষাক্ত ব্রেডটা একেবারে নাকের সামনে দিয়ে সাই করে নাথানের দু-হাতের মাঝ দিয়ে কাদার মধ্যে আছড়ে পড়ল। “মরতে মরতে বেঁচে গেছি।”
আবারো নাথানের উপর আঘাত এলে এবার সে যথেষ্ট দেরি করে ফেলল। তাকাহোর আক্রমণকে ধোকা দিতে পারল না, ওর বন্যপায়ের সজোরে লাথি এসে লাগল নাথানের মাথায়। কাদায় মধ্যে ছিটকে পড়ল নাথান। তার মনে হতে লাগল যেন সে দু-কানে বাতাসের শন শন শব্দ শুনতে পাচ্ছে। আঘাতের চোটে তার পেশীবহুল হাতে ধরে থাকা কুড়াল ছিটকে পড়ল দর্শকদের মধ্যে । কেটে যাওয়া ঠোটের রক্ত মুছতে মুছতে নাথান উঠে দাঁড়াল খুব দ্রুত। তার প্রতিপক্ষও দাঁড়িয়ে গেছে ইতিমধ্যে।
কাদার মধ্যে গেঁথে যাওয়া কুড়ালটা নেবার জন্য তাকাহো একটু নিচু হতেই নাথান ওর কাঁধের উপর দিয়ে শামানের দিকে খেয়াল করল । বৃদ্ধ লোকটা ধোঁয়ার কুন্ডলী সৃষ্টি করেছে টামার ঠোট ও মুখের চারপাশে। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে খারাপ আত্মাকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া এটি। শামানের চারপাশে আরও কিছু হুইয়াসও যোগ দিয়েছে তার সাথে মন্ত্র আওড়ানোর জন্য-যেন দুষ্ট আত্মার মৃতু খুব তাড়াতাড়ি হয়।
তাকাহো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গর্জন করতে করতে নাথানের দিকে ফিরল। মুখের লাল রঙ দেখে মনে হচ্ছে যেন ক্রোধের আগুন। মুহূর্ত পরেই হাতের কুড়ালটা ঘোরাতে ঘোরাতে নাথানের দিকে ধেয়ে আসতে লাগল সে।
এভাবেই মরছি তাহলে! একটু পেছনে সরে যেতে যেতে ভাবল নিরন্দ্র নাথান । আরও একটু পেছনে সরতেই ইন্ডিয়ানদের তা করে রাখা অন্ত্রের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল তার।
পালানোর কোন রাস্তাই নেই। এদিকে তাকাহো এসে দাঁড়িয়েছে তার সামনে। চূড়ান্ত আঘাতের জন্য অপেক্ষা…ধীরে ধীরে কুড়ালটা উঁচু করে ধরল ওর মাখা বরাবর। মৃত্যু থেকে সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নাথান ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে যতই বেঁকে যাচ্ছে পেছন দিকে তার নগ্ন পিঠে ইন্ডিয়ানদের বর্শার খোঁচা অনুভব করতে পারছে বেশ ভালভাবে। তাকাহো দু-হাতের সমস্ত শক্তি দিয়ে কুড়ালটা ধরে নাথানের মাথা বরাবর কোপ বসাতে উদ্যত।
কুড়ালটা নামছে। স্পন্দন বাড়ছে নাথানের।
‘ইউলো!” তীক্ষ চিৎকারটা ছড়িয়ে পড়ল মন্ত্র পড়তে থাকা হইয়াসদের শোরগোল ছাপিয়ে । “থামো?”
যে আঘাতের ভয়ে নাথান আড়ষ্ট হয়ে গেছিল সেই আঘাত আর তার উপর এসে পড়ল না। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলেও মুখ তুলে তাকাল সে। তাকাহোর কুড়ালটা তার মুখ থেকে মাত্র ইঞ্চিখানেক দূরে স্থির হয়ে আছে। এক ফোঁটা বিষ বেয়ে পড়ল ওটা থেকে নাথানের চিবুকে।
যে শামান চিৎকার করে উঠেছিল সে মানুষজন ঠেলেঠুলে একেবারে প্লাজার মাঝখানে চলে এল হাঁফাতে হাঁফাতে। “জ্ঞান ফিরেছে তোমার মেয়ের।” নাথানের দিকে নির্দেশ করল সে তারপর, “তোমার মেয়ে বলছে তাকে নাকি বড় একটা সাপের হাত থেকে এই সাদা লোকটা বাঁচিয়েছে।”
সবার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল এবার টামার দিকে, কিছু মহিলা গুয়াড় ফলের খোসা দিয়ে বানানো পানিরপাত্র ধরে রেখেছে টামার মুখের সামনে। সেই পাত্র থেকে দূর্বলভাবে আস্তে আস্তে চুমুক দিয়ে পানি পান করছে মেয়েটি। তাকাহো নাথানের দিকে তাকাতেই তাদের মধ্যে চোখাচোখি হল । মেয়েটির পিতার কঠিন অভিব্যক্তি ধুয়ে-মুছে গেল পরিত্রাণের স্রোতে। হাতের অস্ত্রটা কাদার মাঝে ছুঁড়ে ফেলল সঙ্গে সঙ্গে। তারপর একটা খালি হাত নাখানের কাঁধের উপর রেখে সজোরে তাকে বুকে টেনে নিল।
“জ্যাকো”, নাথানকে খুব শক্ত করে ধরে বলল সে। “ভাই।” আর এভাবেই কঠিন এই পরিস্থিতির সমাপ্তি ঘটল। তাকাহের ভাই অর্থাৎ গোত্রপ্রধান সামনে এগিয়ে এল।
“তুমি লড়েছ সুসুরি অ্যানাকোন্ডার সাথে, ওটার খপ্পর থেকে আমাদের মেয়েকে বাঁচিয়েছ।” সে তার চুলে গোজা পালক থেকে একটা লম্বা পালক খুলে নাথানের চুলে গুঁজে দিল । এই পালক দূত ও হিংস্র জাতের এক ঈগলের। যে কারো জন্যই এটা-আরাধ্যের বিষয়। “তুমি আর কোন নেইব নও, বাইরের কেউ নও। তুমি এখন জুফোভাই, আমার ভাই, আমার ভায়ের ভাই, তুমি আজ থেকে একজন ইয়ানোমামো।” ।
বিরাট একটা আনন্দ ধ্বনিতে জেগে উঠলো সমগ্র শাবানো ।
নাথান জানে এই সম্মান যেকোন সম্মান থেকেও বড় কিন্তু তার মনে অন্য একটা শঙ্কা দানা বেঁধে ছিল অনেক আগে থেকেই। “আমার বোন, টামার দিকে দেখিয়ে বলল নাথান। ইনোমামোদের মধ্যে কারো নাম ধরে ডাকা একেবারেই নিষিদ্ধ, হোক সে পুরুষ বা নারী। টামা শোয়া অবস্থায় একটু কাতরে উঠলো। “আমার বোনের অসুস্থতা এখনও কাটে নি। ওকে সাও-গ্যাব্রিয়েলে নিয়ে গিয়ে ওখানকার ওষুধপত্র দিলে আমার মনে হয় ও সুস্থ হয়ে যেত।” বৃদ্ধ শামান এবার এগিয়ে এল এ-কথা শুনে। নাথান শামানের এগিয়ে আসা দেখে ভয় অনুভব করল । তার ভয় শামানটি হয়ত এমন কিছু বলবে যে তার চিকিৎসাই মেয়েটির অসুস্থতা দূর করার জন্য যথেষ্ট। স্বাভাবিকভাবেই শামানরা খুব উচ্চগোত্রীয় হওয়ায় তাদের কথা বা কাজের উপর অন্য কারোর হস্তক্ষেপ মোটেই ভালভাবে দেখা হয়
। কিন্তু বয়স্ক শামানটি সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে নাথানের ঘাড়ে হাত রাখায় ঘটনা ইতিবাচক দিকেই মোড় নিল ।
“আমাদের এই নতুন ভাইটি সুসুরির হাত থেকে আমাদের বোনকে বাঁচিয়েছে। ঈশ্বর তাকে আমাদের বোনের রক্ষাকারী হিসেবে পাঠিয়েছেন। আমাদের উচিত সেই ঈশ্বরের কথাই শোনা। তার চিকিৎসার জন্য আমি আমার সাধ্যমত করেছি, এরপর কিছু করা আমার ক্ষমতার বাইরে।” স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলে নাথান তার মুখে লেগে থাকা পয়জন মুছতে লাগল সতর্কতার সাথে, যেন সেটা আবার তার ঠোটের ক্ষতস্থানে না লাগে। নাথান ভাবল এই বৃদ্ধ শামান যা করেছে তা আসলে যথেষ্ট থেকেও বেশি। তার প্রাকৃতিক চিকিৎসা মেয়েটার জীবন ফিরিয়ে এনেছে, হোক সেটা কিছু সময়ের জন্য । মোছা শেষ হতেই বৃদ্ধ শামানকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে তাকাহোর দিকে ফিরল সে। “তোমার ডিঙ্গি নৌকাটা পেলে ভালই হত, ভাই।” ‘আমার যা আছে সব তোমার,” বলল তাকাহো। “আমিও তোমার সাথে সাওগ্যাব্রিয়েলে যাবো।”
সায় দিল নাথান। “তাড়াতাড়ি করতে হবে আমাদের।”
অল্পসময়ের মধ্যেই বাঁশ ও পাম পাতায় বানানো স্ট্রেচারে টামাকে শুইয়ে স্ট্রেচারসহ নৌকাতে নিয়ে রাখা হল । তাকাহো চট করে পোশাক বদলে এল ত, এবার বড় আয়তনের হাতাকাটা ট্যাংক টপ আর হাটু পর্যন্ত নাইকি শর্টস। নৌকা সামনের অংশে নাথানকে যেতে বলে নৌকায় চড়ে বসল তাকাহো, তারপর সে বৈঠা দিয়ে পানিতে ধাক্কা দিতেই তাদের নৌকা নেগ্রো নদীর মূল স্রোতে এসে পড়ল। এই নদীই তাদেরকে সাওগ্যাব্রিয়েলে নিয়ে যাবে ।
দীর্ঘ দশ মাইল যাত্রায় নীরবই রইল তাদের সঙ্গী। টামা কখনো সজাগ, কখনো ঘোরের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। আবার মাঝেমাঝে মৃদু কাতরানোর শব্দ আসছে ওর কোমল ওষ্ঠ থেকে। নাথান একটা কম্বল জড়িয়ে দিল ছোট্ট মেয়েটার শরীরে।
পরিচিত রাস্তা দিয়েই নৌকা চালাচ্ছে তাকাহো। ভেঙে পড়া ডালপালা আর নুয়ে আসা “গাছের ভেতর দিয়ে দক্ষতার সাথে পানির সবচেয়ে দ্রুত প্রবাহগুলোর মধ্য দিয়ে। একটু তার দিকে নেমে তাদের নৌকা গতি পেতেই বর্শা দিয়ে মাছ ধরতে থাকা বেশ কিছু প্রতিবেশী ইয়ানামামোদের অতিক্রম করল তারা । নাথান দেখল এক ইয়ানোমামো মহিলা কালো রঙের একরকম পাউডার উপর থেকে পানিতে ভাসিয়ে দিচ্ছে। নাথান জানে সে কি করছে। আয়াইয়া নামক এক রকম আঙ্গুর শুকিয়ে গুড়ো করে তা নদীর বিশেষ এক জায়গায় ফেলা হয়। সাধারণত উচু জায়গায় যেখান থেকে পানির স্রোত কিছুটা নীচে নেমে আসে, পানির চাপে সেই পাউডার তলিয়ে যায়, আর তারপরই শুরু হয় আসল কাজ। পানিরতলে অবস্থান করা মাছগুলো এই পাউডারের প্রভাবে অনেকটা বোধহীন হয়ে পড়ে, তখন উপরে উঠে আসা ছাড়া কিছু করার থাকে না। উপরে অপেক্ষারত পুরুষ ইয়ানোমামোরা সাথে সাথেই সেগুলো যার যার অস্ত্র দিয়ে ঘায়েল করতে থাকে। সমগ্র আমাজনজুড়ে ব্যবহৃত মাছ ধরার এই রীতি অনেক প্রাচীন। কিন্তু কতদিন টিকে থাকবে এই রীতি, এই ঐতিহ্য? এক প্রজন্ম? দুই প্রজন্ম? তারপর একদিন চিরতরে হারিয়ে যাবে এই কৌশলগুলো। নিজের আসনে দৃঢ়ভাবে বসে এই আমাজনে নির্দিষ্ট কিছু গোত্রের কথা ভাবল নাথান। যাদেরকে কখনো বশে আনা যায় না। সভ্যতা পুরো জঙ্গলজুড়ে প্রভাব বিস্তার করবে এসব কম সভ্যমানুষদের সভ্য বানানোর জন্য, এর ফলাফল ভাল হোক বা খারাপ থোক তাতে কিছুই যায় আসে না।
তারা আরেকটু সামনে এগোতেই নাথানের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল সামনের গাছপালার ঘন সারির দিকে। এখানকার গাছের শাখা-প্রশাখাগুলো এত বড় আর বিস্তৃত যে নদীর দুই প্রান্তকে সংযোগকারী প্রাকৃতিক ব্রিজ তৈরি হয়ে গেছে আপনাতেই । সভ্য জগতের ছোঁয়া না লাগলেও প্রকৃতি যে নিজ থেকেই অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে পারে তার ভাল নিদর্শন এগুলো । গুনগুন, তীক্ষ চিঙ্কার, কর্কশ ও ঘোঁতঘোঁত শব্দে বিধৌত নাথানের চারপাশ ও আমাজনের পুরো বর্ণিল জগৎ।।
নদীর একপাশে একদল ফল-খেকো বানর হই-হুল্লোড় করে এগছ-গাছ করতে লাগল। তার ঠিক নিচে কমলা রঙের লম্বা ঠোটের বেশ কিছু কাদা-খোঁচা পাখি মাছ ধরায় ব্যস্ত। ওদের থেকে একটু ওপরে ডাঙ্গার দিকে বেশ কিছু শূকোরমুখো আমাজনিয় কুমির যার যার বাসস্থানে বসে রোদ পোহাচ্ছে। তাদের খুব কাছেই, একটু ওপরে, বোলতা ও বড় বড় ডাস-মাছির ঝাঁক মেঘের মত ভেসে বেড়াচ্ছে তাদের ক্ষুদ্র দেহে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করতে করতে । এখানে এই আমাজনে সবকিছুই নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী চলে । সীমাহীন এই জঙ্গল এতই রহস্যে ভরা যে মনে হয় এই জঙ্গল বা রহস্যের সবকিছুই অভেদ্য। এই গ্রহে এই আমাজনই একমাত্র অঞ্চল যেটা এখনো পুরোপুরি আবিষ্কার করা হয় নি। এখনো অনেক জায়গা আছে যেখানে পড়ে নি মানুষের পায়ের ছাপ। আর এগুলোই সেই রহস্য, সেই বিস্ময় যার মোহে মোহিত হয়ে নাথানের বাবা-মা অঙ্কের জীবনটা কাটাতে চেয়েছিল এখানে, ফলে এই বিশাল বনের প্রেম-ভালোবাসায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে তাদেরই একমাত্র সন্তান।
নাথান দেখল তারা জঙ্গল অতিক্রম করে সভ্যজগতে পা রাখতে শুরু করেছে, চারদিকে সেই সভ্যতারই চিহ্ন ফুটে উঠছে ধীরে ধীরে। তারা বুঝতে পারল তাদের নৌকা সাও-গ্যাব্রিয়েলের একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছে। শহর যে কাছেই তা নদীর পাড়ে কাজ করতে থাকা কয়েকজন কৃষককে দেখেই বোঝা গেল। নাথানদের নৌকা নদীতীরে খেলায় মগ্ন একদল ছেলেপুলেকে অতিক্রম করতেই ওরা একে অন্যকে নৌকাটা দেখাতে লাগল । যেন রকে টযুগের মানুষ ডায়নোসোর দেখছে। মাত্র অতিক্রম করে আসা আমাজনের শব্দের ঘনত্ব কমতে থাকলেও নাথানের নৌকা প্রবেশ করছে নতুন এক জগতে, নতুন এক বিশ্বে যেখানে শব্দের কারখানা গড়ে উঠেছে সারিসারি । ডিজেলচালিত ট্রাক্টরের শব্দ আসছে কৃষি জমি থেকে, তাদের ছোট্ট নৌকার আশপাশ দিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটে চলা নৌকা থেকে আসছে ইঞ্জিনের শব্দ। আবার দু-একটা খামার বাড়ি থেকে মেউিওর শব্দও ভেসে আসছে। কিছুক্ষণ পরেই তারা একটা মোড় নিতেই পেছনের জঙ্গল হঠাৎ করেই যেন উধাও হয়ে গেল। সাও-গ্যাব্রিয়েলের ছোট্ট এই শহরকে দেখে মনে হয় এটা যেন ক্যান্সার আক্রান্ত কোন কোষ যা এই জঙ্গলের পেটটাকে খেয়ে ফেলতে ফেলতে বড় হচ্ছে। নদীর আশেপাশে যে স্থাপনাগুলো আছে তার মধ্যে সরকারী কিছু দালানকোঠা আর বাকিরা সব জলে ভেজা রোদে পোড় খাওয়া, স্যাঁতস্যাঁতে কাঠের তৈরি। একটু দূরে, বেশ কিছু ঘরবাড়ি পাহাড়ের গা বেয়ে গড়ে উঠেছে পরজীবীর মত। নাথানের নৌকার খুব কাছেই জাহাজঘাট ও পণ্যবাহী বড় বড় বার্জ। সব জায়গাতেই পর্যটকরা গিজ গিজ করছে।
নৌকা ভেড়ানোর জন্য নদীর পাশে একটা খোলা জায়গা দেখিয়ে তাকাহোর দিকে ফিরলো নাথান। সে দেখলো ইন্ডিয়ানটি তীব্র ভয় নিয়ে চেয়ে আছে শহরের দিকে । ভীত তাকাহর বৈঠা কখন যে বুকের সাথে আটকে ধরেছে তা নিজেও জানে না বোধহয় ।
“দুনিয়াটা এসবে ভরে গেছে,” অস্ফুট স্বরে বললো সে।
নাথান আবার দৃষ্টি দিল শহরের দিকে। সর্বশেষ সে এখানে এসেছিল মাত্র দু-সপ্তাহ আগে কিন্তু এরমাঝেই যে পরিবর্তন, যে কর্মযজ্ঞ তা তাকেই অবাক করে দিচ্ছে। সে ভাবল, সেখানে এত যান্ত্রিকতা আর হই-হুল্লোড় দেখে সেই মানুষ কিভাবে স্বাভাবিক থাকে যে কোনদিনই আমাজনের কোল থেকেই বের হয় নি? নির্দিষ্ট একটি জায়গা দেখিয়ে নৌকা ভেড়াতে ইশারা কল সে।
“তোমার মত একজন বড় যোদ্ধাকে ভয় পাইয়ে দেয়ার মত কিছুই নেই এখানে, বুঝলে? এখন চল, মেয়েকে হাসপাতালে নিতে হবে দ্রুত।”
। সায় দিল তাকাহ, ভয়ের জগৎ থেকে ফিরে আসতে আসতে। তার চোখেমুখে আবার সেই পুরনো শঙ্কার ছায়া ভেসে উঠল স্ট্রেচারে শোয়ানো টামার নিথর দেহের দিকে তাকাতেই। নাথানের দেওয়া নির্দেশিত পথেই নৌকা পাড়ে ভেড়াচ্ছে সে কিন্তু তার দৃষ্টি ও চিন্তা ভাবনার বড় একটা অংশজুড়ে আছে তার আশেপাশের এই যান্ত্রিক জগৎ। নৌকা থামতেই দু-জনেই হাত লাগালো টামার স্ট্রেচারটা নৌকা থেকে নামানোর কাজে। নড়াচড়া লাগতেই টামা একটু কাতরে উঠল। চোখের পাতাগুলো কেঁপে কেঁপে উঠতেই চোখের ভেতরের সাদা অংশ দেখা গেল সহজেই। এখানে আসার সময়টুকুর মধ্যে বেশ মলিন হয়ে গেছে সে।
“খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে আমাদের।”
দু-জনে ধরাধরি করে স্ট্রেচারটা নামিয়ে কাদাপানিযুক্ত পথে একটু সামনে এগোতেই হা-করে তাকিয়ে থাকা মানুষের দৃষ্টি ও আশেপাশের ঘরবাড়ি থেকে আসা পর্যটকদের ক্যামেরার লাইটের তীব্র আলোয় বাঁধা পড়তে হল তাদের। তাকাহোর পরনে যদিও সভ্য পোশাক তারপরও তার মাথার বানরের লেজের ব্যান্ড, কানে গোঁজা পালক আর মাথার বাটিছাট চুল এগুলো বেশ ভালভাবেই জানান দিচ্ছে লোকটি আমাজনিয় ইন্ডিয়ান গোত্রের একজন।
সৌভাগ্যবশত একতলা হাসপাতালটি তাদের খুব কাছেই কাদামাটির রাস্তার শেষ প্রান্তে। মূল প্রবেশপথের ঠিক ওপরে রেডক্রসের প্রতীক অংকিত পতাকাটাই একমাত্র চিহ্ন যা দেখে বোঝা যায়, এটা একটা হাসপাতাল। তবে নাথান এর আগেও এখানে এসেছে মানাউস থেকে আসা কর্তব্যরত এক ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করতে। খুব দ্রুত রাস্তা ছেড়ে প্রধান ফটক দিয়ে হাসপাতালের ভেতর ঢুকতেই অ্যামোনিয়া ও ব্লিচিং পাউডারের গন্ধে নাক জ্বলে উঠল ওদের কিন্তু ভেতরটা খুব চমৎকারভাবেই শীততাপ নিয়ন্ত্রিত। ঠাণ্ডা বাতাস মুখ ছুঁয়ে যেতেই নাথানের মনে হল যেন ভেঁজা টাওয়েলে মুখ রেখেছে সে। কয়েকজন নার্সকে অতিক্রম করে এক মহিলার সাথে দ্রুত কথা বলতে শুরু করে দিল নাথান। তার কাছ থেকে সব শুনে ছোট গড়ন ও ভাল স্বাস্থ্যের এই মহিলার ভ্রু কুঁচকে গেল। যতক্ষণ পর্যন্ত না নাথান বুঝতে পারলো সে ইয়ানোমামাদের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছে না ততক্ষণ পর্যন্ত মহিলার ভ্রু কুঁচকেই থাকলো । বোঝার সাথে সাথেই তার মুখের ভাষা পর্তুগিজ ভাষায় পরিবর্তিত হল। “এই মেয়েটাকে অ্যানাকোন্ডা আক্রমণ করেছিল, মনে হয় কিছু হাঁড়ও ভেঙে গেছে। কি আমার মনে হয় ও যে ভয় পেয়েছিল সেটাই বেশি মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।”
“এদিকে আসুন,” মহিলা তাদেরকে দুইপাল্লার একটা দরজার দিকে যেতে নির্দেশ দিল, তারপর সন্দেহা দৃষ্টি হানল তাকাহোর দিকে।
ইনি মেয়ের বাবা?”
সায় দিল নাথান।
“ডা: রড্রিগেজ ডাক্তারি এক সভার জন্য বাইরে আছেন, কিন্তু জরুরিভিত্তিতে আসার জন্য তাকে আমি কল করতে পারি।”
“ঠিক আছে, তাই করুন,” বলল নাথান । মনে হয় আমি সাহায্য করতে পারব,” অন্য একটা কণ্ঠ বলে উঠল পেছন থেকে । নাথান ঘুরে দাঁড়াল।
লালচে বাদামী লম্বা চুলের ছিপছিপে দীর্ঘকায় এক নারী বসে আছে ওয়েটিং-রুমের কাঠের চেয়ারে। রেডক্রসের দেয়া পাত্রের এক অপর আড়ালে সে বসে থাকায় তাকে কারোর চোখে পড়ে নি। আর এখন আশারবাণী শোনাতে শোনাতে হাজির হয়ে সবাইকে বেশ ভালভাবেই পড়ে ফেলল সে।
সে উঠে আসতে নাথান আরেকটু সোজা হয়ে দাঁড়াল। “আমি কেলি ওব্রেইন,” পরিস্কার পর্তুগিজ ভাষায় বলল সে, তবে নাথান তার কণ্ঠে
বোস্টনের টান ভালই ধরতে পারল। একটা লাঠি দুটো সাপ পেঁচিয়ে রেখেছে-কুড়ুসিয়াস “মক খুবই পরিচিত একটি সিম্বলসম্বলিত আইডিকার্ড বের করে নাস্থানের সামনে তুলে ধরল সে। “আমি একজন আমেরিকান ডাক্তার।
ডা: ওব্রেইন,” সে বলল এবার ইংরেজিতে। ‘আমি অবশ্যই আপনার সাহায্য পেতে চাই। মেয়েটাকে আক্রমণ করেছিল ।স্ট্রেচারে শোয়া টামার শরীর হঠাৎ বেঁকে উঠল যেন। পা দুটো একটু নড়াচড়া করে সারা শরীরে কাঁপন উঠে গেল তার। “ওর শরীর খিঁচুনি দিচ্ছে,” বলল মহিলা, “এখনি ওয়ার্ডে নিতে হবে ওকে।” খাটো মহিলাটা সামনে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে ধরে রাখল স্ট্রেচারটা ঢোকার জন্য।
তাকাহো ও নাথান ইমারজেন্সি ওয়ার্ডের ছোট ঘরটায় দিকে ছুটতেই কেলি ওব্রেইন খুব দ্রুত একপাশে সরে গিয়ে চারটা বেডের একটা দেখিয়ে দিল। তারপর এক ঝটকায় পাশ থেকে এক জোড়া সার্জিক্যাল গ্লোভস হাতে লাগাতে লাগাতে জোরে জোরে বলল নার্সকে, “দশ মিলিগ্রামের ইয়াজিপাম নিয়ে এসোদ্রুত।”
নার্স মাথা নেড়ে সায় দিয়েই ওষুধের ক্যাবিনেটের উপর ঝুঁকে পড়ল। মুহুর্ত পরেই হলুদ রঙের তরলে ভরা একটি সিরিঞ্জ ওব্রেইনের হাতে দিল সে। ওব্রেইন ইতিমধ্যে টামার হাতে টারকুই বেঁধে দিয়েছে ওর হাতের শিরা খুজে পাওয়ার জন্য।
“ওকে একটু ধরুন, নাথান ও তাকাহোকে যেন আদেশ দিল সে। শান্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগটি জেগে উঠতেই একজন ক্লিনারকে সাথে নিয়ে নাথানদের কাছে চলে এল এক নার্স।
“একটা আইভি ও এক ব্যাগ এলআরএস রেডি করুন,” টামার সরু বাহুর শিরা খুঁজতে খুঁজতে তীক্ষ কণ্ঠে বলে উঠল কেলি। তারপর খুব দক্ষতার সাথে সিরিঞ্জের সূচটা ঢুকিয়ে ওষুধটুকু প্রবেশ করিয়ে দিল মেয়েটির শরীরে।
“এটা ভ্যালিয়াম,” কাজ করতে করতে বলল সে। “এটা ওকে আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য অচেতন করে রাখবে। আর সেই সুযোগে বুঝতে পারবো ওর মূল সমস্যাটা কোথায়।”
তার কথা সত্য হল সাথে সাথেই। টামার শরীরের কাঁপুনী শক্তি হয়ে এল। দাপাদাপি করা হাত-পাগুলো স্থির হয়ে গেল বিছানার সাথে, শুধুমাত্র চোখের পাতা ও ঠোট একটু একটু কাঁপছে। একটা পেনলাইটের আলো ফেলে দু-চোখের মণি পরীক্ষা করল কেলি । সহকারী নার্স এসে আইভি লাইন ও ক্যাথেটার নিয়ে কার্জ করতে থাকা নাথানকে ঠেলে সরিয়ে দিল । নার্সের কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাহর আতঙ্কগ্রস্থ চোখ দুটো খেতে পেল
নাথান।
“কি হয়েছিল ওর?” মেয়েটিকে পরীক্ষা করতে করতেই জিজ্ঞেস করল কেলি।
সব খুলে বলল নাথান। “জ্ঞান হারাচ্ছে আবার জ্ঞান ফিরে পাচ্ছে। এরকম করেই বেশির ভাগ সময় কেটেছে ওর। গ্রামের শামান কিছু সময়ের জন্য ওর চেতনা ফিরিয়ে এনেছিল।”
“ওর কয়েকটা হাড় ভেঙে গেছে, আবার কয়েক জায়গায় রক্তক্ষরণও হয়েছে কিন্তু ওর এই যে খিঁচুনি, অচৈতন্য এগুলোর জন্য তো কিছু করতে পারছি না। হাসপাতালে আসার আগে কি কোন খিচুনি উঠেছিল?”
“না।” “আগে এরকম কিছু হবার নজির আছে?”
নাখান তাকাহোর দিকে ফিরে ইয়ানোমামোদের ভাষায় প্রশ্নটি বুঝিয়ে দিল। সায় দিল তাকাহো । “আহ-দে-মে-নাহ গাক্তি।
ভুরু কুঁচকালো নাখান । “কি বললেন উনি? ” জিজ্ঞেস করল কেলি । “আহ-দে-মে-নাহ হলো ইলেকট্রিক ইল আর গান্তি হলো রোগ। “ইলেকট্রিক ইল রোগ?”
নাথান সায় দিল । “এমনটাই তো বলল সে। ইলেকট্রিক ইল কাউকে আক্রমণ করলে তো প্রায়ই খিচুনি ওঠার কথা কারণ এটা খুব দ্রুত প্রভাব ফেলে। কিন্তু টামা কয়েক ঘন্টার মধ্যে পানির ধারে কাছেও যায় নি। আমি জানি না…সম্ভবত এমনও হতে পারে ইলেকট্রিক ইল মাছের জন্যে নয়, এই রোগকে ইয়ানোমামারা এমনিতেই ইলেকট্রিক ইল রোগ বলে ডাকে।”
এর জন্য কি তাকে কোন চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে? মানে কোন ওষুধপত্র?”
প্রশ্নটা বুঝিয়ে দিয়ে তাকাহোর কাছ থেকে উত্তরটা বুঝে নিল নাথান। “গ্রামের শামান প্রতি সপ্তাহে একবার চিকিৎসা করত তাকে। একরকম আঙ্গুর গাছ শুকিয়ে তার ধোয়া ব্যবহৃত হত ওষুধ হিসেবে।”
খুব বিরক্তির সাথে নিঃশ্বাস ফেলল কেলি। “তাহলে বলা যায়, তাকে কোন সঠিক চিকিৎসা বা ওষুধ দেয়া হয় নি। তার এই রোগ পুরনো। আর পানিতে যে ধস্তাধস্তি হয়েছে তার প্রভাবই যদি এই বার বার ফিরে আসা খিচুনির কারণ হয়ে দাঁড়ায় তবে সেক্ষেত্রে অবাক হওয়ার মত কিছুই থাকবে না। ওর বাবার চোখেমুখে যে ভয় দেখছি..আচ্ছা, আপনি ওর বাবাকে ওয়েটিংরুমে নিয়ে গিয়ে বসাচ্ছেন না কেন? আমি দেখছি উচ্চমাত্রার কোন ওষুধ দিয়ে খিচুনির কোন ব্যবস্থা করা যায় কিনা।”
টামার শান্ত শরীরটার দিকে তাকালো নাথান। “আপনার কি মনে হয় ওর খুিঁচুনি আবার হবে?”
নাথানের চোখের দিকে তাকালো কেলি। “ওর এটা এখনও হচ্ছে।” সামান্য বেঁকে যাওয়া টামার মুখের দিকে নির্দেশ করল সে মেয়েটা এখন এপিলেপটিকাস অর্থাৎ নিরবিচ্ছি ঘোরের মধ্যে আছে। মারাত্মকভাবে আক্রান্ত এই ধরনের বেশির ভাগ রোগীই মুখ দিয়ে এরকম শব্দ করে, অচেতন থাকে আবার শরীর নড়াচড়া করে অসংলগ্নভাবে। একটু আগে যেমন তীব্র কাঁপুনি এসেছিল ওর শরীরে এমনটা আবারো হতে পারে, আর এটা যদি আমরা না থামাতে পারি সে মারা যাবে।”
নাথান মেয়েটার দিকে তাকালো চোখ বড় বড় করে। “আপনি কি বলতে চাচ্ছেন, পুরো সময় জুড়েই মেয়েটা এমন ঘোরের মধ্যেই ছিল?”
আপনার বর্ণনা হিসেবে কম হোক বা বেশি হোক ছিল।” “কিন্তু গ্রামের শামান তো কিছু সময়ের জন্য ওর জ্ঞান ফিরিয়ে এনেছিল?”
“এটা আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।” কেলি মেয়েটার দিকে আবারো তাকাল । “ওর ঘোর কাটতে পারে এমন শক্তিশালী ওষুধ শামান ওকে দেয় নি।”
নাথানের মনে পড়ল ওর পানি খাওয়ার কথা। কিন্তু সে তো তাকে চিকিৎসা দিয়েছিল। শামানরা জাদুজানা ডাক্তার ছাড়া আর কিছু নয় এটা ভাবা ভুল। তাদের সাথে আমি দীর্ঘদিন কাজ করেছি, আমি তাদের কাজের ধরন সম্পর্কে জানি। তারা যথেষ্ট অভিজ্ঞ।” ।
“আচ্ছা…ঠিক আছে…ভাল হোক বা না হোক আমাদের কাছে আরও শক্তিশালী ওষুধ আছে যা খুব কার্যকারী।” সে টামার বাবাকে দেখিয়ে বলল, “আপনি ওনাকে ওয়েটিং-রুমে নিয়ে কেন বসাচ্ছেন না?” কেলি সহকারী নার্সটার দিকে ঘুরে দাঁড়াল নাথানকে পুরোপুরি অবজ্ঞা করেই।
নাথানের অভিব্যক্তিতে বেশ বিরক্তি ঝরে পড়লেও সে কেলির কথা শুনল। প্রায় একশ বছর ধরে পশ্চিমা ডাক্তাররা শামানদের তীব্রভাবে অবজ্ঞা করে আসছে। নাথান তাকাহোকে ওয়ার্ড থেকে বাইরে এনে ওয়েটিং রুমে বসিয়ে পা বাড়াল মূল দরজার দিকে। দ্রুত পা চালিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে আমাজনের গরম বাতাসে ঝাপিয়ে পড়ল সে। আমেরিকান ডাক্তারটা বিশ্বাস করুক বা না করুক সে নিজে শামানকে দেখেছে টামার জ্ঞান ফিরিয়ে আনতে। টামার এই রহস্যময় অসুস্থতাকে ব্যাখ্যা করার মত একজনই আছে এখানে, আর নাথান জানে কোথায় পাওয়া যাবে তাকে। গরম বাতাসের ভেতর দিয়ে শহরের দক্ষিণ দিকটাতে মাঝারি গতির দৌড় দিতেই দশ ব্লক দূরের ব্রাজিলিয়ান আর্মি ক্যাম্পের কাছে চলে এল সে। সাধারণত ঘুমিয়ে থাকা ক্যাম্পটি এখন সরগরম হয়ে উঠেছে। নাথান দেখল ইউনাইটেড স্টেটসের চারটি হেলিকপ্টার মাঠে,পার্ক করা। স্থানীয়রা ভিড় করে ক্যাম্পটার বেড়া ঘেঁষে এই ডানাওয়ালা যন্ত্রগুলো দেখছে। তাদের চোখেমুখে যে উত্তেজনা তা দেখে মনে হচ্ছে হেলিকপ্টারগুলো যেন স্বর্গ থেকে উড়ে এসেছে। নাথান এসব উদ্ভট ব্যাপার মাথা থেকে সরিয়ে দৌড়ের গতি বাড়িয়ে দিল । তার লক্ষ্য এখন সামনের ব্লকটি যেখানে জরাজীর্ণ কাঠের একাধিক ঘর-বাড়ির মধ্যে কিছু কংক্রিটের পাকাবাড়ি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। খানিক দূরে থাকতেই নাথান তার গন্তব্যের নিশানা দেখতে পেল। এফ.ইউ.এন.এ.আই (FUNAI)-এই অক্ষরগুলো একটা বিল্ডিঙের বাইরের দেয়ালে বড় করে লেখা যা সহজেই চোখে পড়ল তার । বানইওয়া, ইয়ামোমামো ও স্থানীয় বিভিন্ন গোত্রের জনগনের মাঝে চিকিৎসা, শিক্ষা ও মৌলিক অধিকার বিষয়ক কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছে ব্রাজিলিয়ান ইন্ডিয়ান ফাউন্ডেশন-এর এই স্থানীয় অফিস। ছোট এই বিল্ডিঙের এক অংশে চলে অফিশিয়াল কাজ আর অন্য অংশে জায়গা করে দেয় সেই সব চালচুলোহীন ইন্ডিয়ানদের যারা সাদা চামড়ার লোকদের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য নিজেদের ঘাম ঝরিয়ে যাচ্ছে।
এফ.ইউ.এন.এ.আই-এর এই অফিসে এর নিজস্ব মেডিকেল কাউন্সেলরও রয়েছে যে নাখানের পরিবারের খুব পুরনো বন্ধু এবং ওর বাবাকেও এই আমাজনসহ অনেক বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছে খুব সুন্দরভাবেই । দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে একটা হলরুম পার হয়ে উপরে ওঠার সিঁড়িতে পা রাখল সে। সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে প্রার্থনা করল তার বন্ধু যেন অফিসেই থাকে। দ্রুত পা ফেলে উপরে উঠে একটা খোলা দরজার কাছাকাছি আসতেই মোজার্টের বেহালার পঞ্চম কনাসার্টোর সুমধুর সুর কানে এল তার। থ্যাংক গড।
দরজার ফ্রেমে টোকা দিয়ে জোর গলায় ডেকে উঠল নাখন, “প্রফেসর কাউয়ি?”
ছোট্ট ডেস্কের ওপাশ থেকে কফিবর্ণের এক ইন্ডিয়ান মুখ তুলে তাকালো স্তুপ করে রাখা ফাইলের ওপর দিয়ে। মধ্য-পঞ্চাশে থাকা লোকটার কালো চুলগুলো কপালের দু-পাশ দিয়ে নেমে ঘাড়ের উপর পড়েছে। ধাতব ফ্রেমের চশমার পেছনে চোখ দুটো আটকে ছিল বইয়ের ওপর, নাখালকে চিনতেই চশমা জোড়া খুলে প্রাণখোলা হাসি দিল সে। ‘নাথান!” কাউয়ি উঠে ডেস্ক থেকে ছুটে এসে নাথানকে বুকে জড়িয়ে ধরল। এত জোরে ধরল যে ঘণ্টা কয়েক আগে যুদ্ধ করে আসা অ্যানাকোন্ডার কথা মনে পড়ে গেল তার। ওর বিশাল দৈহিক কাঠামোর জন্য শরীরে যেন ষা৺ড়ের মত শক্তি। পেশীবহুল লোকটা আগে দক্ষিণ ভেনিজুয়েলার টিরিওস গোত্রের শামান ছিল। প্রায় ত্রিশ বছর আগে নাথানের বাবার সাথে পরিচয় এবং খুব তাড়াতাড়িই বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে ওদের মধ্যে। কাউয়ি তার বাবার সহায়তায় খুব দ্রুত জঙ্গল ছেড়ে অক্সফোর্ডে চলে গেছিল পড়াশোনা শেষ করার জন্য। কয়েক বছর পর ফিরে আসে ভাষা এবং আদিম মানুষের ফসিলের উপর দুটো ডিগ্রি নিয়ে। এসব বিষয় ছাড়াও সে এ অঞ্চলের সেরা উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের একজন।
“বাবা, আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না তুমি এখানে। ম্যানুয়েলের সাথে দেখা হয়েছে তোমার?”
নাথান ভ্রু কুঁচকে দানবের মত মানুষটার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। “না তো! আপনি কি বলতে চাচ্ছেন?”
“মানে সে তোমায় খুঁজছে। এই তো ঘন্টাখানেক আগে সে এখানে এসেছিল তুমি এখন কোন অঞ্চলে গবেষণা করছ সেটা আমি জানি কিনা তা জানতে”
“কেন?”ভ্রু দুটো আরও কুঁচকে গেল নাথানের।
“কিছু বলে নি তবে তার সাথে টেলাক্স-এর একজন কর্পোরেট লিডার ছিল।”
চোখ দুটো একটু ঘুরে উঠলো নাথানের, টেলাক্স ফার্মাসিউটিক্যালস নামের এই বহুজাতিক কোম্পানিটি নাথানকে অর্থের জোগাদিচ্ছে বিভিন্ন গোত্রের শামানদের উপর তার গবেষণা চালানোর জন্য। নাথানের ভেতরের তিক্ত অনুভুতি বুঝতে পারল কাউয়ি।
“তুমিই সেই লোক বুঝলে, যে কিনা ওরকম খারাপ লোকদের সাথে চুক্তি করতে পার।”
“বাবা মারা যাওয়ার পর এটা করা ছাড়া আর কীইবা করতে পারতাম।”
কপাল কুচকালো কাউয়ি, “এত তাড়াতাড়ি তোমার সব সিদ্ধান্ত তোমার নিজের ওপর ছেড়ে দেওয়া কখনোই উচিত হয় নি। সব সময়ই তুমি ছিলে…”
“শুনুন,” তাকে থামিয়ে দিল নাথান। অনেক পেছনে ফেলে আসা জীবনের কালো অধ্যায়গুলো স্মরণ করতে চায় না সে। তার জীবনশয্যা সে নিজেই বানিয়েছে আর তাতে পিঠ ঘেঁয়াতে হবে নিজেকেই।
“টেলাক্স থেকেও বড় সমস্যা এখন আমার রয়েছে”, সে দ্রুত টামার সবকিছু ব্যাখ্যা করল। “আমি তার চিকিৎসা নিয়ে খুব চিন্তার মধ্যে আছি। ভাবছিলাম ডাক্তার যদি কোনভাবে সাহায্য করতে পারতেন।
কাউয়ি খুব দ্রুত তার পাশের শেলফ থেকে ফিশিং বক্সটা হাত বাড়িয়ে নিল।“বোকা, বোকা, সব বোকার দল।” একথা বলেই দরজার দিকে পা বাড়াল সে।
নাথান অনুসরণ করতে থাকল তাকে। প্রথমে সিঁড়িতে তারপর রাস্তা পর্যন্ত। লোকটা খুব দ্রুত হাটছে, তাই সারাপথ নাথানকেও জোরে জোরে হেটে তাল মেলাতে হল। কিছুক্ষণ পরেই হাসপাতালের মূল দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল ওরা। নাথানকে ফিরে আসতে দেখে উঠে দাঁড়াল তাকাহো। “জ্যাকো…ভাই,” কাউয়িকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে গেল নাথান। “আমি একজনকে নিয়ে এসেছি, আমার মনে হয় তোমার মেয়েকে সারিয়ে তুলতে পারবে সে।”
পরিচয় পর্বের জন্য বিন্দুমাত্র অপেক্ষা কল না কাউয়ি। সে ইতিমধ্যে জরুরি, বিভাগের দরজার কাছে চলে গিয়েছে। নাথানও পিছু নিল দ্রুত । ওয়ার্ডে ঢুকেই সে যা দেখল তা খুবই হতাশাব্যঞ্জক। চিকন আমেরিকানটা ঘেমেঘুমে একাকার হয়ে ঝুঁকে আছে কাঁপতে থাকা টামার উপর । আর নার্সরা স্বল্প জায়গায় ছোটাছুটি করে তার আদেশ পালনে ব্যস্ত । বিক্ষিপ্তভাবে কাঁপতে থাকা টামার শরীরের দিকে দৃষ্টি দিল কেলি। “মনে হয় আমরা তাকে বাঁচাতে পারবো না, ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে বলল সে।
“মনে হয় আমি সাহায্য করতে পারি,” বললো কাউয়ি, “ওকে কি ওষুধ দেয়া হয়েছে?”
কেলি ঘামে ভেজা কপালের ওপর থেকে চুলগুলো সরাতে সরাতে দ্রুত একটা লিস্ট ধরিয়ে দিল তার হাতে। সায় দিল কাউয়ি, তার ফিশিং বক্সের ভেতর হাত চালিয়ে অনেক ছোটখাট জিনিসের মধ্য থেকে একটা ছোট পাউচ বের করে আনল। “একটা নল লাগবে আমার।”
একজন নার্স খুব দ্রুত কাজ শুরু করে দিল ঠিক যেমনটি করছিল ডা. কেলির বেলায়। নাথান খেয়াল করল প্রফেসর কাউয়ির এটাই প্রথম আসা নয় এই হাসপাতালে । এই প্রফেসরের মত স্থানীয়দের মধ্যে হওয়া রোগ ও তার প্রতিকারবিষয়ক জ্ঞান আর কারো নেই।
“আপনি করছেন কী?” জিজ্ঞেস করল কেলি, তার মুখ লাল হয়ে উঠেছে। লালচে বাদামী চুলগুলো মাথার পেছনে বেঁধে দিল সে।
“ভুল ধারনার উপর কাজ করে যাচ্ছ তুমি,” শান্তভাবে বললো সে নলের ভেতর পাউডার ঢালতে ঢালতে।
ইলেকট্রিক ইল রোগের কারণে ওর শরীরে যে অসংলগ্ন নড়াচড়া বা খিচুনী হচ্ছে সেটা হয়তো সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমের ডিজঅর্ডারের লক্ষণ হিসেবে ধরে নিয়েছ। কিন্তু এটা ওরকম স্নায়ুরোগ বা মৃগীরোগের মত কিছু নয়। মস্তিষ্ক থেকে মেরুদন্ডের মধ্যে দিয়ে যে ফ্লুইড প্রবাহিত হয় সেটার আভ্যন্তরীন অসামঞ্জস্যতাই এই রোগের মূল কারণ। ব্যাপারটা বংশানুক্রমিক, একই সাথে ইয়ানোমামোদের মধ্যে বিরলও।”
“হিরাভিটারি মেটাবোলিক ডিজঅর্ডার?”
“ঠিক তাই। এটা ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলের কিছু মানুষের ফেভিজম-এ আক্রান্ত হওয়া বা ভেনেজুয়েলার মারুন গোত্রের কিছু মানুষের কোল্ড-ফ্যাট-ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার মত।”
কাউয়ি মেয়েটিকে অতিক্রম করে নাথানকে হাত দিয়ে ইশারা করল।“শক্ত করে ধরে রাখো ওকে।”
নাথান এগিয়ে গিয়ে টামার মাথাটা বালিশের সাথে চেপে ধরল । শামান তার হাতের নলের একপ্রান্ত টামার নাকের ছিদ্রের মধ্যে খানিকটা ঢুকিয়ে দিয়ে অপরপ্রান্তে পাউডারের মিশ্রণ ঢালতে লাগল ধীরে ধীরে। ডা: ওব্রেইন পিছন থেকে সরে পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
“আপনি এই হাসপাতালের ডাক্তার? ডা: রড্রিগেজ?”
“নো, মাই ডিয়ার,” সোজা হয়ে বললো কাউয়ি, “আমি স্থানীয় তান্ত্রিক চিকিৎসক, মানে উইচ-ডক্টর।”
তীব্র ভয় আর অবিশ্বাসের অভিব্যক্তি নিয়ে তাকালো ডা: কেলি। সে বাঁধা দেওয়ার মত কিছু বলার আগেই টামার দাপাদাপি একটু থামতে শুরু করল। প্রথমে ধীরে তারপর দ্রুত।
কাউয়ি টামার চোখ পরীক্ষা করল। চামড়ার ফ্যাকাশে ভাবও কেটে যাচ্ছে খুব তাড়াতাড়িই। “কিছু ড্রাগস আমি পেয়েছি যেগুলো সাইনাসের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করালে সাইনাসের ঝিল্লি খুব দ্রুত ওটা শুষে নেয়। এটা শিরায় ওষুধ প্রবেশ কার মতই কার্যকরী।” বিস্ময়াভূত কেলি তাকিয়ে রইল টামার দিকে।
“এটা কাজ করছে”।
কাউয়ি তার হাতের পাউচটা এক নার্সের হাতে তুলে দিল। রড্রিগেজ কি রওনা হয়েছেন?”
“এই তো কিছুক্ষণ আগেই তাকে কল করেছি, প্রফেসর,” এক নার্স উত্তর দিল হাতের রিস্টওয়াচে চোখ বুলিয়ে, “দশ মিনিটের মধ্যেউনার এখানে চলে আসার কথা।”
“নিয়ম করে এই স্ট্র-এর অর্ধেক পরিমাণ পাউডার তিন ঘণ্টা পর পর ওকে দেবে। এরকম দেবে আগামী চব্বিশ ঘণ্টা। পরের দিন থেকে দিনে একবার দিলেই যথেষ্ট। এটা ওকে আরও আরও সুস্থিতভাবে টিকিয়ে রাখতে পারবে। তখন ওর অন্যান্য সমস্যাগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে ভালভাবে।”
“ঠিক আছে, প্রফেসর।”
এদিকে বিছানায় টামা চোখের পাতা পিট-পিট করতে করতে চোখ মেললো ধীরে ধীরে। চারপাশের অচেনা মুখগুলো দেখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল সে। ভয়, অনিশ্চয়তা সবকিছু ফুটে উঠেছে তার মুখে। চোখ ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে একসময় তার চোখ স্থির হলো নাথানের উপর ।
“জ্যাকো বাশ্যে,” দূর্বল গলায় বললো সে।
“এই যে, আমি তোমার বানর ভাই, এখানেই আছি,” ইয়ানোমামোতে বললো সে টামার হাতে কোমলভাবে হাত বুলিয়ে । “তুমি এখন নিরাপদ। তোমার বাবাও আছে এখানে।”
এক নার্স তাকাহোকে নিয়ে এল। যখন সে দেখল তার মেয়ের জ্ঞান ফিরেছে, কথা বলছে, তখনই হাটু গেঁড়ে বসে পড়ল মেঝেতে। তার উদ্বিগ্নতা উবে গেল মুহূর্তে, আনন্দ অশ্রু সিক্ত করল তাকে।
“ও এখান থেকে ভাল হয়ে উঠবে, তাকাহোকে আশ্বস্ত করল নাথান।
কাউয়ি তার ফিশিং বক্স গোছগাছ করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। নাথান এবং ওব্রেইন পিছু নিল তার ।
“ঐ পাউডারে কি ছিল?” লালচে বাদামি চুলের ডাক্তার জিজ্ঞেস করল । “শুকনো কু-নাহ-নে-মাহ লতা।
নাথান বুঝিয়ে দিলো ডাক্তারের এই হতবুদ্ধির উত্তর । “এক ধরনের লতানো গাছ। এই একই গাছ গ্রামের শামানও ওকে দিয়েছিল, একটু আগেই আপনাকে যেমনটা বলেছিলাম।”
কেলি লজ্জায় লাল হয়ে গেল। আমার মনে হয় আপনার কাছে আমার একটু ক্ষমা চাইবার আছে। আমি ভাবতেই পারি নি…মানে আসলে আমি কল্পনাও করতে পারি নি যে,”।
“পশ্চিমা চিন্তাধারা দিয়ে সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করার মত ধৃষ্টতা দেখানো একটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার এখানে। এতে লজ্জিত হবার কিছু নেই।” কেলির কনুইতে আলতো করে হাত রেখে কথাগুলো বলে চোখ টিপলো কাউয়ি।
নাথানও স্থির থাকতে পারলো না। এরপর থেকে সবকিছু আরও ভাল করে শোনার চেষ্টা করবেন, কর্কশভাবে বলল সে।
মেয়েটা নীচের ঠোট কামড়ে ঘুরে চলে গেল।
এমন রূঢ় একটা আচরণ করে নাথানের নিজেকে খুব ছোট মনে হতে লাগল। সারাটা দিন ধরে চলতে থাকা দুশ্চিন্তা আর ভয় তার ধৈর্যকে নাজুক করে দিয়েছে । এই মেয়ে ডাক্তার তো তার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিল আর সেটা জানার পরও তার সাথে নাথানের এমন রুক্ষ্ম আচরণ করা উচিত হয় নি মোটেই। সে দুঃখ প্রকাশ করার জন্য মুখ খুললো কিন্তু কিছু বলার আগেই সামনের দরজাটা শপাং করে খুলে গেল। লাল মাথার খাকি পোশাক পরা লম্বা এক মানুষ উপস্থিত হল সেখানে। মাথার উপর লাল রঙের সক্স বেসবল ক্যাপটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের বড় হয়ে গেছে । লোকটা লবি ধরে হেটে এসেই কেলির দিকে ইঙ্গিত করল ।
“কেলি, যদি এখানে তোমার সাপ্লায়ের কাজ শেষ হয়ে থাকে তো আমাদের এখান থেকে বেরুতে হবে। ওদিকে আমাদের জন্য নদীতে বোট অপেক্ষা করছে।”
“হ্যাঁ,” কেলি বলল। “আমার এখানকার কাজ শেষ। তারপর সে মাথান ও কাউয়ির দিকে ফিরলো, ধন্যবাদ আপনাদের।”
নাখানের চোখে কিছু সাদৃশ্য ধরা পড়লো এই তরুণ ডাক্তার এবং আগন্তুকের মাঝে। মুখের ছোপ ছোপ তিল, চোখের চারপাশের ভাঁজ এমনকি দু-জনের কণ্ঠেই বোস্টনের টান। মেয়েটার ভাই সে, ভাবলো নাথান । তাদের পেছন পেছন বের হয়ে রাস্তায় নামলো সে কিন্তু এগোতে পারলো না। ছোটখাট একটা ভীড় তাদের দিকে আসতেই প্রফেসার কাউয়িকে ঠেলেঠুলে পেছনে সরে আসতে বাধ্য হল নাথান ।
বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিত দশজন সৈন্যের একটি দল সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াল। নাথান দেখলো অগ্রভাগ স্পেশাল এম-১৬ মডেলের অস্ত্র তাদের হাতে, কোমরে পিস্তল ঝোলানো আর পিঠে জিনিসপত্র বোঝাই ভারি ব্যাগ । সবার কাঁধে লাগানো নির্দিষ্ট ব্যাজটাও চিনতে পারলো। আর্মি রেঞ্জার্স, কমান্ডো সেনা। একজন রেডিওতে কথা বলে সৈন্যদলটিকে নদীর দিকে যেতে নির্দেশ দিল । কেলি ও আগন্তক যোগ দিল সেই দলের সাথে।
“হল্ট, দূর থেকে একজন মানুষ বলে উঠলো।
মিলিটারিদের দেয়াল সরে যেতেই পরিচিত একটি মুখ দেখা গেল। এটা ম্যানুয়েল অ্যাজভেদো। কালোচুলের খাটোমতো লোকটি সৈন্যদের ঠেলে সামনে এগিয়ে এলো। তার পরনে ছেড়া ট্রাউজার আর যে শার্ট গায়ে দেওয়া সেটার পকেট ছিড়ে ঝুলে আছে। কোমরে ঝুলছে সবসময়ের সঙ্গি চাবুক।
নাথানও ম্যানুয়েলের হাসি দেখে হাসতে হাসতে এগিয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলো। একে অপরের পিঠ কিছুক্ষণ চাপড়িয়ে ম্যানুয়েলের শার্টের ছেড়া অংশে হাত বুলাতে থাকলো সে। “টর-টরের সাথে আবারও খেলেছ দেখতে পাচ্ছি।”
দাঁত বের করে হাসল ম্যানুয়েল। “তুমি শেষবার দেখার পর দৈত্যটার ওজন আরও দশ কেজি বেড়েছে।”
হাসলো নাথানও। “দারুণ।
নাথানের চোখ গেল রেঞ্জার্স বাহিনীর দিকে, বেচারারা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে তাদের দুজনের দিকে। কেলি-ওব্রেইন এবং তার ভায়েরও একই অবস্থা । নাথান মিলিটারিদের উদ্দেশ্যে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে তাদের রাস্তা ছেড়ে একপাশে সরে দাঁড়ালো। “তো এসবের মানে কি? এরা কোথায় যাচ্ছে?”
মিলিটারি দলটার দিকে তাকাল ম্যানুয়েল দর্শকের কমতি নেই আশেপাশে। হাঁ করে তাকিয়ে আছে ছত্রভঙ্গ আর্মি রেঞ্জারসের দিকে । “দেখে মনে হচ্ছে ইউএস সরকার গভীর জঙ্গলে কোন গবেষণা বা অনুসন্ধানমূলক কাজে টাকা ঢালছে।”
“কেন? মাদক চোরাচালানিদের পিছু নিচ্ছে নাকি?” তখনি কেলি ওব্রেইন উল্টো হাটা শুরু করলো নাথানদের লক্ষ্য করে ।
কেলিকে দেখে ম্যানুয়েল মাথা নেড়ে সায় দিয়ে একটা হাত নাথানের দিকে বুড়িয়ে দিলো। “আমি কি আপনাকে ডা: রান্ডের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি? ডা: নাথান রান্ড।”
“মনে হচ্ছে আগেই আমাদের পরিচয় হয়েছে,” কেলি বললো একটু অস্বস্তিকর হাসি দিয়ে। কিন্তু সে তার নাম বলে নি আমাকে।”
নাথান অনুভব করলো কিছু নিঃশব্দ অভিব্যক্তি কেলি ও ম্যানুয়েলের মধ্যে আদানপ্রদান হলো। “কি হচ্ছে এখানে?” জিজ্ঞেস করলো নাথান, “নদী বেয়ে কী খুঁজতে যাচ্ছেন আপনারা?”
মেয়েটা সরাসরি তার চোখের দিকে তাকালো ।এমেরান্ড পাথরের মত চকচকে সবুজ বর্ণের চোখ দুটো দারুণ আকর্ষনীয়। “আমরা আপনাকেই খুঁজতে এসেছি, ড. রান্ড।
