হাউ টু টক টু এ্যানিওয়ান – ১
অধ্যায় এক
তোমার হাতে মাত্র দশ সেকেন্ড সময় আছে, নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে প্রমাণ করার
তোমার ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলার অবিশ্বাস্য, অপরিহার্য এবং অপ্রতিরোধ্য সব কৌশল…
কারো সাথে প্রথম সাক্ষাতের সময়, বিশেষ করে প্রথম চোখাচোখির মুহূর্তটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
এটাই সেই সময়, যেটাতে নিজের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে নিতে হয়। শুরুর মুহূর্তটা এজন্যও গুরুত্বপূর্ণ যে, আজীবন সে তোমার এই সময়টা মনে রাখবে, তোমার একটা প্রতিচ্ছবি সে এই মুহূর্তটার উপরে ভিত্তি করেই গড়ে নেবে। মনে রেখো, অবস্থানটা হয়তো সারা জীবনের জন্যই অটুট থাকবে।
একজন চিত্রশিল্পি খুব সহজেই দোদুল্যমান এবং দ্রুত বয়ে চলা জীবনের এসব আবেগীয় মুহূর্ত স্মরণীয় করে রাখতে পারেন। রবার্ট গ্রসম্যান (বব) নামে আমার এক বন্ধু রয়েছে, যে ফোবস, নিউজ উইক, স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড, রোলিং স্টোনসহ উত্তর আমেরিকার অন্যান্য জনপ্রিয় প্রকাশনীর হয়ে ব্যঙ্গচিত্র অঙ্কন করে থাকে। ববের চিত্রের একটি বিশেষ গুণ ছিল। সে যেসব ছবি আঁকত, ওগুলো শুধুমাত্র সমগ্র দৃশ্যপটটাই অঙ্কন করত না, বরং প্রত্যেকটা দৃশ্যপট বিস্তারিত ফুটিয়ে তুলে আনত। ওর ছবি আঁকার স্কেচ বোর্ড থেকে সব সময় আলোর ঝলকানি ভেসে আসত। ববের চিত্রে যেসব লোকপ্রিয় ব্যক্তির ছবি দেখা যেত, মনে হতো তাঁরা সবাই যেন নিজস্ব স্বতন্ত্রতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। যেমন- ‘মেডোন্না’-এর অগ্নিমূর্তি, ‘নিউট গ্রিনরিচ’-এর স্বেচ্ছাচারিতা কিংবা লিওনেল হেলমদ্রেইয়ের অসভ্যতা সবই তার হাতের জাদুতে ফুটে উঠত।
বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত বব, দুষ্টুমি করতে পছন্দ করত। খাবার পরিবেশনকৃত রুমালে টুক করে কোনো এক অতিথির ছবি এঁকে বসতো সে! জট লেগে যেত ববের আশপাশে, অনেকেই আবিষ্কার করত, তাদেরই পরিচিত বন্ধুর ছবি ওর হাতের রুমালে জ্বলজ্বল করছে! এ যেন চোখকে বিশ্বাস করানোর মতো নয়। ছবি আঁকা শেষ হলে বব ছবিটি কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে উপহার হিসেবে দিয়ে দিত। কিছু উৎসাহী জনতা চোখ বড় বড় করে অঙ্কিত ছবির সাথে বাস্তবের ব্যক্তির মিল খুঁজে ফিরে।
নিজের ছবি দেখে সবাই যে খুশিতে আটখানা হতো, ওরকম বলার উপায় নেই।
কেউ কেউ হালকা নরম সুরে বলত, ‘বাহ! বেশ এঁকেছেন। কিন্তু ছবির ব্যক্তিটি পুরোপুরি আমার মতো হয়নি।’
উৎসাহী অতিথিরা সমস্বরে এর সত্যতা ফুটিয়ে তুলে, ‘ব্যাপারটা, সত্য।’ আন্তে করে মূল আলোচনা থেকে দূরে গিয়ে সবাই নিজেদের সংশয় কাটাতে ব্যস্ত হয়ে গড়ে।
হতভম্ব ব্যক্তিটির তখন রুমালের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো কাজ থাকে না।
একবার ববের চিত্রশালায় যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। তার ছবি আঁকার কারিশমা আমাকে আগেই মুগ্ধ করেছে।
আমি চেপে না রাখতে পেরে গোপন প্রশ্নটা ঝেড়েই ফেললাম, ‘তুমি কীভাবে এত নিখুঁতভাবে মানুষের ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তোলো, বব?’
তার জবাবটা ছিল সাদামাটা।
সে বলল, ‘আমি জাস্ট দেখি আর এঁকে ফেলি।’
উত্তরটা আমার মনঃপূত হয়নি। আমি আবার বললাম, ‘না, মানে আমি বোঝাতে চাচ্ছিলাম, ছবি আঁকার আগে কি তুমি তাদের সম্পর্কে বিশদ জানার চেষ্টা করো?
যেমন তার বংশ, তার সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি ইত্যাদি?’
ও মুখ চেপে হাসল, ‘অবশ্যই না। তোমাকে আগেই বলেছি, আমি যা দেখি তাই আঁকি, কোনো বিশদ গবেষণা বলে কিচ্ছু নেই।’
‘ওহ। আচ্ছা।’
সে এরপর পুরো ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করল। তার মতে প্রত্যেকটি মানুষের কথা বলার ধরন, শারীরিক অঙ্গভঙ্গি, হাঁটা-চলা দেখেই একটা স্পষ্ট ধারণা তৈরি করে ফেলা যায়। এর জন্য বিশদ গবেষণা করা লাগে না।
এরপর বব আমাকে তার ব্যক্তিগত ফাইল থেকে, বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির ব্যাঙ্গচিত্রগুলো দেখাতে আরম্ভ করল।
‘দেখো’, একটা ছবির দিকে বব ইঙ্গিত করল। ছবিতে সাবেক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনকে দেখা যাচ্ছে। বব এরপর খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখাল, ‘এই যে শরীরের এই অংশটা দেখো। দেখো তাঁর শারীরিক ভঙ্গিমা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তাঁর ব্যক্তিত্বে কী পরিমাণ বাচ্চামি খেলে যাচ্ছে!’
এরপর জর্জ বুশের ছবি সামনে এলো।
জর্জ বুশের কাঁধের দিকে নির্দেশ করে সে, ‘দেখো, এই ছবিতো বুশকে কেমন আনাড়ির মতো দেখাচ্ছে না?’
তারপর আমেরিকার আরেক সাবেক প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের ছবি দেখাল, ‘তাঁর হাসির জন্য তাকে কী প্রফুল্লই না দেখাচ্ছে! খেয়াল করেছো?’
এরপর নিক্সনের ধূর্ততা দেখাল সে। মাথার দিকে দেখিয়ে বলল, ‘দেখো, এই মাথার কাত হয়ে থাকা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সে কতটা ধূর্ত!’ ফাইলের অনেক ভেতরে দেখা গেল ফ্রাঙ্কলিং ডিলানো রুসভেল্টকে, যার উঁচু নাকটা খাঁড়া আকাশমুখী হয়ে আছে। সবশেষে তাকে নিয়ে তার মন্তব্য জানাল বব, ‘রুসভেল্ট, এই ব্যক্তিত্বের গুণেই এফডিআরের গর্বের বস্তু হয়ে আছেন।’
ও আরো যোগ করল, ‘আসলে আমার চিত্রে কারো যে বিষয়টা বেশি প্রভাব ফেলে তা হলো, তার মুখ আর শরীরের ভঙ্গিমা। জানো তো, জনশ্রুতি আছে, শরীর কথা বলে।’
এজন্য পরিচয়ের শুরুটা খুবই গুরুত্ব রাখে। প্রশ্ন আসতে পারে, কেন; তাই তো? ব্যাখাটা খুবই সোজা, প্রথম সাক্ষাতের সময়ই তোমার পাশের ব্যক্তিটির মস্তিষ্কে তোমার সমগ্র কিছু পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে তোমার একটা আনুমানিক ব্যক্তিত্ব জমা হয়ে যাবে। এর উপর ভিত্তি করে সে তোমার সম্পর্কে খুবই সংক্ষেপে একটা উপসংহারে চলে আসবে।
তুমি কথা বলার পূর্বে তোমার শরীর কথা বলে
তোমাকে মানুষ যেভাবে দেখে, যেভাবে তোমার ব্যক্তিত্ব তাদের চোখে ধরা পড়ে, ওটা কি পুরোপুরি নির্ভুল?
নির্ভুল বলা যায়। তোমার শারীরিক ও মৌখিক অঙ্গভঙ্গিমা তাদের অলরেডি জানিয়ে দিয়েছে- এই ব্যক্তি কেমন, এই ব্যক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
তোমার ব্যক্তিত্ব ঠিক কতটা প্রকট, এটা নির্ভর করছে তোমার বডি ল্যাঙ্গুয়েজের (শারীরিক অঙ্গভঙ্গির) উপরে। যেকোনো মানুষের ব্যক্তিত্বের প্রায় ৮০% অংশ তৈরি করে তার শারীরিক অঙ্গভঙ্গি। তুমি কীভাবে কথা বলছো, কীভাবে চলাফেরা করছো, কতটা গুরুত্বপূর্ণ তোমার হাতের ইশারা- সবই কিন্তু এই ৮০%-এর ভেতরে পড়ে যাচ্ছে। আর বাকি মাত্র ২০% নির্ভর করছে তোমার কথা কতটা যৌক্তিক, এর উপর।
কর্মক্ষেত্রের বদৌলতে আমাকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকতে হয়েছে, বিভিন্ন মানুষের সাথে মিশতে হয়েছে। স্থানীয় ভাষা না জেনেও শারীরিক অঙ্গভঙ্গি কাজে লাগিয়ে এমন অনেক সমস্যা আমি একাই কাটিয়ে উঠেছি।
প্রথম সাক্ষাতের সময়টা আমি খুবই সতর্ক থেকেছি, যে কারো ক্ষেত্রেই। যখনই আমি নতুন কোনো সহকর্মীর সংস্পর্শে এসেছি, তার প্রশংসা করতে কখনো কার্পণ্য করিনি। ওই কোম্পানিতে তার অবস্থান কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সে কীভাবে এত সাবলীলভাবে কাজগুলো করে এবং কোম্পানির জন্য তাদের আত্মত্যাগের কথা আমি নিজ থেকে তুলে ধরতাম। চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করেই বুঝে নিতাম, কে কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, আর কে কম গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যের পেটের কথা বা ধারণা বের করার ক্ষমতা আমাদের নেই। চাইলেই আমরা তার সম্বন্ধে এমন কিছু বলতে পারি না, যা আমাদের মাথায় এসেছে। এ কথা সবার জন্যই প্রযোজ্য। আমরা যে কারো সম্পর্কে ধারণা পোষণ করি সম্পূর্ণ নিজের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে। বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা বলছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের আবেগ, আমাদের ধারণা নিতে প্রভাবিত করে।
তোমার সাথে যখন কেউ কথা বলতে আগ্রহী হন, তিনি তোমাকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করেন, তারপর এগিয়ে এসে কথা বলেন। কথা বলার পূর্ব মুহর্তে তার ভেতরে তোমার একটা অবস্থান তৈরি হয়ে যায়। আর কথা শুরু হওয়ার পরবর্তী কিছু সময় বলে দেবে, তার মস্তিষ্ক সঠিক না ভুল। আর একবার যখন অবস্থানটা গেঁথে যায়, বুঝে নেবে, এর উপরেই তিনি তোমায় বিচার বিবেচনা করবেন: তোমার গুরুত্ব কতটুকু, তাও ঠিক হয়ে গেছে তার মস্তিষ্কে।
বব আরেকটা কথা জানায়, সে নিজের ব্যঙ্গচিত্রও একবার এঁকেছিল। নিজেকে নিজে আঁকার ক্ষেত্রে বব সেই একই কাজটাই করেছে, যা অন্যদের বেলায় সে করে। সে নিজের একটা কাল্পনিক চরিত্র মস্তিষ্কে সেট করে নিল সে কেমন, তার ব্যক্তিত্ব কেমন, সবটা মিলিয়ে যেটা দাঁড়াল, সেটাই হচ্ছে, ববের ব্যঙ্গচিত্র!
অন্য বিষয়ে আলোচনা বেশি হয়ে যাচ্ছে, বুঝতে পেরে আবার আসল আলোচনায় ফিরলাম। বই রচনার মূল উদ্দেশ্যে মনযোগ বাড়ালাম।
প্রসঙ্গে এসে ববকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কারো ছবিতে তাকে একেবারে নম্র, ভদ্র, জ্ঞানী, যত্মবান, উৎফুল্ল এবং নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল দেখাতে চাইলে তুমি কী করবে? তুমি কি সেটা ফুটিয়ে তুলতে পারবে বব?’
‘ধৈর্য্য ধরো বান্ধবী।’ বলে সে হাসল। সে বুঝতে পেরেছে আমি কী বোঝাতে চেয়েছি।
‘প্রথমত… হুমমম…’ একটু থামল সে, তারপর বলল, ‘তার শারীরিক অবস্থান থাকবে ফিটফাট, মাথাটা হবে একটু ঊর্ধ্বমুখী, মুখে লেগে থাকবে একটা বিশ্বস্ত হাসি এবং সে সরাসরি চোখে চোখ রেখে কথা বলবে। ব্যাস, এগুলো দেখালেই পরিপূর্ণ সব হয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।’
কীভাবে নিজেকে ‘গুরুত্বপূর্ণ কেউ একজন’ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়
আমার বন্ধু ক্যারেনের ডেকোরেশনের ব্যবসা রয়েছে। তার স্বামী সমাজের একজন নামকরা ব্যক্তি, যিনি যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেন। তাদের ফুটফুটে দুটো ছেলে সন্তান রয়েছে।
ক্যারেনও তার ব্যবসায়িক দুনিয়ায় খুবই পরিচিত নাম। যখনই সে কোনো অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক হয়ে যায়, তার সহকর্মীরা তার আশপাশে থাকতে পছন্দ করে, তার সাথে একটা ছবি তুলতে পারলে নিজেকে গর্বিত বোধ করে। ওর কাঁধে হাত রেখে একটা ছবি তোলাটাই বুঝি অনেক সম্মানের ব্যাপার।
অথচ এর বিপরীতটা ঘটে, যখন ক্যারেন তার স্বামীর কোনো আয়োজনে সাথে থাকে। সেখানে সে নিজেকে খুবই অপরিচিত হিসেবে আবিষ্কার করে। সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, সে যেন কেউই না! আবার যখন সন্তানদের স্কুলে উপস্থিত হতে হয়, সেখানে ক্যারেন অন্য অনেক মায়ের মতো একজন মা হিসেবে নিজেকে অনুভব করে। একদিন ক্যারেন কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করল, ‘লেইল, তোমার কি এমন কোনো কৌশল জানা আছে, যা প্রয়োগ করলে যেকোনো ভিড়ে, যেকোনো অপরিচিত মানুষ আমার সাথে নিজ থেকে কথা বলতে চাইবে, আমাকে দেখে সে আগ্রহী হবে। আছে কি?’
ক্যারেনের প্রশ্নের জবাবটা আমি তোমাদের জন্য এখানে তুলে ধরছি। উত্তরটা হচ্ছে, ‘হ্যাঁ। যাবে।’
তবে এজন্য অবশ্যই তোমাকে কিছু কৌশল রপ্ত করতে হবে। যেগুলো তোমাকে যেকোনো ভিড়ের মাঝেই অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলবে। হোক না সেটা এমন লোকদের ভিড়, যাদের কেউই তোমায় চেনে না।
নিজেকে উপস্থাপন করো সুন্দর একটা হাসি দিয়ে। যে হাসিতে ভরে আছে বিশ্বস্ততা।
পর্ব ১
হাসির বন্যা
দ্রুত হাসবে, নাকি মনোরম একটা হাসি দেবে?
ডেল কার্নেগির লেখা হাউ টু উইন ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপল (১৯৩৬) বইয়ের ছয়টি বিশেষ কৌশল দশকের পর দশক উচ্চারিত হয়ে গেছে। আত্ম উন্নয়নমূলক অনুষ্ঠানের পরিচিত রথি-মহারথি বক্তারা মাইকের সামনে দাঁড়ালেই এই কৌশলগুলো ঝেড়ে গেছেন শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে। অথবা নিজেরাই তার উন্মেষ ঘটিয়েছেন একটি বিশ্বস্ত হাসির মাধ্যমে।
সে যাই হোক, বছরের পর বছর ধরে এই অনুশীলন কার্যকরী রইল মানুষের আত্মিক সম্পর্ক উন্নয়নে। যারা আরো গভীরভাবে এ নিয়ে গবেষণা করল তারা একটা সময় বুঝতে পারল, শুধুমাত্র হেসে যাওয়া যথেষ্ট নয় বরং আজকের দিনে, এই যান্ত্রিক বিশ্বে অনেক সময় এই কৌশলটি পুরোপুরি অকেজো।
এই মুচকি হাসিকে আজকের আধুনিক বিশ্বের অনেকেই সেকেলে বা আনাড়ি হিসেবেই দেখেন। বর্তমান বিশ্বের যত রথি-মহারথি আছেন, তাদের দিকে তাকালে দেখতে পাবে, তারা তাদের হাসিকে আরেকটু উন্নত করেছেন। তারা শুধু মুখ টিপে হাসেন না, বরং অনেক ক্ষেত্রে হো হো করে মন থেকে হাসিতে ফেটে পড়েন। তাদের হাসির এই বিস্ফোরণ তাদের মাঝে আরো অনেক বেশি পরিমাণে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে। সবচেয়ে মজার ব্যাপারটা হচ্ছে, হাসি ছোঁয়াচে। তাদের সাথে সাথে অন্যদের মুখেও ওটা ছড়িয়ে পড়ে, মুহূর্তগুলো হয়ে ওঠে আরো মধুর।
গবেষকরা গবেষণা করে দেখেছেন, বিভিন্ন রকমের হাসি সমাজে প্রচলিত রয়েছে। মিথ্যাবাদীর মুখের হাসি থেকে শুরু করে ছোটো বাচ্চাদের উদ্দেশ্যে অর্থহীন হাসি,
সবটাই লিপিবদ্ধ হয়েছে। বের হয়েছে, কোনটা আসল আর কোনটা নকল হানি (তুমি নিজেই এমনটা অনুভব করেছো, বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন সময়ে। তোমার বন্ধু না চাইতেও তোমাকে গাড়িতে করে নামিয়ে দেওয়ার সময় আন্তরিক হাসির নামে ব্যর্থ হাসিটি নিশ্চয়ই তোমার চোখে পড়েছে। অথবা সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার তোমার অঞ্চলে বিশেষ প্রয়োজনে আসার পরে সবাইকে খশি করতে যেসব কথা বলেন, এই যেমন, ‘আমি এখানে এসে অত্যন্ত খুশি হয়েছি। আপনাদের ব্যবহারে…’ ব্লা ব্লা নিশ্চয়ই শুনেছো।)
তবে সত্যিকার বিজয়ীরা জানেন, হাসি তাদেও একটা বড় অস্ত্র। এজন্য তারা কখনোই নকল হাসিতে মানুষের মন জয় করতে চায় না। বরং তাদেও মুখে ফুটে ওঠে আন্তরিক এবং বিশ্বস্ত হাসি। এবং এঁাঁই কার্যকরী।
কীভাবে তোমার হাসিকে উন্নত করবে
আমার কলেজ সময়ের এক মেয়ে বন্ধু, মিসি, সম্প্রতি কাগুজে বক্স উৎপাদনের তাদের পারিবারিক ব্যবসাটার দায়িত্ব হাতে পেয়েছে। সে একদিন হুট করে জানাল, সে ব্যবসায়িক কাজে নিউইয়র্ক আসছে এবং আন্তরিকভাবে আমায় আমন্ত্রণ করল তার সাথে দেখা করতে।
যখন তার সাথে সাক্ষাৎ হলো, তার উপচে পড়া হাসি দেখে আমিও হেসে দিলাম। মেয়েটা মুখ চেপে হাসতে ওস্তাদ ছিল, যা তাকে আলাদাভাবে পরিচিতি দিত।
গত বছর তার বাবা মারা গেছেন। তার কোনো ভাই না থাকায় ওদের পুরো ব্যবসার দায়িত্ব মিসির উপরে এসে পড়েছে। আমার ধারণা ছিল, একটা কোম্পনির মালিক হবার মতো এত বড় যোগ্যতা এখনো এই মেয়ের হয়ে ওঠেনি, যদিও ব্যবসা সংক্রান্ত ধারণা আমার নেহায়েত শূন্য।
আমরা একটা রেস্তোরাঁয় দেখা করলাম। সাথে মিসির তিনজন ক্লায়েন্টও রয়েছেন। মিসি হঠাৎ আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, ‘শোনো লেইল, আজ রাতের জন্য আমাকে মিলিসা বলেই ডেকো। বুঝতেই পারছো।’
সে ক্লায়েন্টের কাছে তার প্রচলিত নামটি শোনাতে চাচ্ছিল না। আমি ইশারায় আশ্বস্ত করলাম, ঠিক আছে। সবাই যার যার অবস্থানে বসে পড়লাম। আমার হঠাৎ করেই মিলিসাকে অচেনা মনে হচ্ছিল, কলেজের চেনা সেই মেয়েটা, যে কি না মুচকি হাসতে খুব ভালোবাসত, সে আর এই মিলিসার মাঝে আকাশ পাতাল তফাত! ওকে খুবই সুন্দর আর খুবই উৎফুল্ল দেখাচ্ছে! মিলিসার মুখের হাসি যেন তার সীমানাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ এই হাসির ধরনটা অন্যরকম নজরকাড়া। এভাবে তাকে কখনোই হাসতে দেখিনি। বান্ধবীটাকে আমার অদ্ভুত ভালো লাগছে। চেহারায় বিশেষ কোনো পরিবর্তন নেই। হাসির জোয়ার তার আত্মিক সৌন্দর্যকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলেছে। মিলিসা খুবই সাধারণ এবং বিনীত হয়ে তার ক্লায়েন্টদের সাথে কথা বলছে, ওদের দেখে বোঝাই যাচ্ছে, তারা ওর সাথে কথা বলে আনন্দ পাচ্ছে। আমি খুবই আশ্চর্য এবং একই সাথে খুব খুশি হলাম। কারণ, মিলিসা খুব সহজেই তিনজন ক্লায়েন্টকেই হাত করে ফেলেছে। ওরা তার সাথে ব্যবসা করতে এক বাক্যে রাজি হয়ে গেল!
আমরা গাড়িতে ফিরে আসছিলাম, ওই সময়টা আমি মিসিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মিসি, আমি অভিভূত তোমার ব্যক্তিত্ব দেখে। তোমার ব্যক্তিত্বে তুমি এমন কিছু বৈশিষ্ট্য যোগ করেছ, যা তোমাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সত্যিই আমি অভিভূত।’
মিসি হাসল, ‘তোমার ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়, লেইল। আমি শুধুমাত্র একটা ব্যাপারেই উন্নতি করেছি। আর কিছুই না।’
‘কী সেটা?’ আমার যেন উত্তরটা শোনার আগ্রহ আরো বেড়ে গেল!
‘আমার হাসি।’ আন্তে বলল সে।
‘কী! শুধুমাত্র হাসি?’ আমি অবিশ্বাসের সুরে বললাম। আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না!
‘হ্যাঁ। তুমি ঠিকই শুনেছো লেইল।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ও, “বাবা যখন খুবই অসুস্থ, একদিন আমাকে ডাকলেন। তার পাশে বসিয়ে নানা বিষয়ে আলোচনা করলেন। তারপর আমাকে জানালেন, পারিবারিক ব্যবসাটা এখন থেকে আমাকেই সামলাতে হবে। সেই সাথে আমার জীবন পরিবর্তনকারী কিছু সূক্ষ্ম বিষয় আমাকে জানালেন। বলে গেলেন, কীভাবে খুব সহজে কারো প্রিয় হওয়া যায়। এরপর তিনি একটি গানের কিছু লাইন বিড়বিড়িয়ে শোনালেন। তারপরই কথাটা বললেন, ‘মিসি, আমি চাই তুমি ব্যবসাটাকে আরো বড় করো। আর যদি তা তুমি করতে পারো, আমি খুব খুশি হব মা’।”
মিসি তার বাবাকে উত্তরে বলল, ‘আমি সফল হতে পারলে তুমি খুশি হবে, তাই তো?’
আমি মিসির দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে থাকলাম। আমার আগ্রহের যেন শেষ নেই। আমি তাগাদা দিলাম, ‘মিসি তারপর? তারপর কী হলো?’
মিসি পরের অংশ শুরু করল, ‘বাবা আমাকে বলল, তোমার সফলতায় আমি অবশ্যই খুশি হব। কিন্তু তার আগে তোমাকে, তোমার একটা দুর্বলতা বলি মা।
তুমি খুব দ্রুত এবং সংক্ষিপ্তভাবে হাসো, যা অনেকেই পছন্দ করে না।’
মেয়েটা এরপর আমাকে পরখ করে নিল, আমি শুনছি কি না? আমার আগ্রহী চোখ দেখে সে বাকিটা বলার আগ্রহ দেখাল, ‘এরপর বাবা পুরোনো একটা পত্রিকা হাতে নিল, ওখানে একটা আর্টিকেল দেখাল আমায়। গোট গোট হরফে লিখা রয়েছে-একটা গবেষণা রিপোর্টে দেখা গেছে যে, যেসব নারীরা লম্বা সময় নিয়ে ধীরে ধীরে হাসে, তাদের ব্যবসায়িক সফলতা অবিশ্বাস্য।’
মিসির কথা শুনে অনুধাবন করলাম, ব্যাপারটা আসলেই সত্য। এই যেমন-মার্গারেট থ্যাচার, মাদার তেরেসা, ইন্দিরা গান্ধী, গোল্ডা মেইর, মেডেলিনি আলব্রাইটসহ অন্য নারীরা, যারা বিশ্বে এত প্রভাব ফেলে গেছেন, কারো মুখেই সংক্ষিপ্ত হাসি ছিল না। বরং, সবাই লম্বা হাসির জন্য পরিচিত ছিলেন।
মিসি আবার আরম্ভ করল, ‘মূলত পত্রিকার রিপোর্টটা আমাকে বদলে দিয়েছে লেইল। ওখানে আরো লেখা ছিল, যারা দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে হাসে, তাদের ব্যক্তিত্ব অনেক বেশি ফুটে ওঠে। তাদের গ্রহণযোগ্যতা আরো বেশি বেড়ে যায়। তখন থেকে আমি আস্তে আস্তে দীর্ঘ সময় ধরে হাসার অনুশীলন শুরু করে দিলাম। নিজের ঠোঁট, মুখ এসবকে অভ্যন্ত করে তুললাম, নতুন এই কৌশলটার সাথে। আর সেগুলোই ক্লায়েন্টদের সাথে প্রয়োগ করতে লাগলাম। প্রথম দিকে আমি তেমন অগ্রগতি করতে পারিনি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, একটা সময় আমি সবখানেই অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে শুরু করলাম। ক্লায়েন্টদের থেকে অনেক বেশি রেসপন্স পেতে থাকলাম।’
‘তাহলে এটাই পেছনের রহস্য?’ ভাবলাম আমি। তথ্যটা সত্যিই অবাক করল। ছোট্ট একটা কৌশল কীভাবে মিসিকে অনন্য করে তুলল! মাত্র এই একটা কৌশল ব্যবহার করে সে তার ব্যক্তিত্বে ফুটিয়ে তুলেছে দারুণ পেশাদারিত্ব এবং প্রফুল্লতা। সত্যিই অসাধারণ অনুভূতি।
এরপর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম, আমি মানুষের মুখের হাসির উপরে গবেষণা চালাব এবং একদিন শুরুও করে দিলাম।
যখন আমরা জুতা কিনতে যাই, তখন আমাদের চোখ থাকে মানুষের জুতোর দিকে। যখন আমরা চুলের কাটিং দেবার চিন্তায় থাকি, তখন আমাদের চোখ ঘুরঘুর করে আশপাশের মানুষদের হেয়ার কাটিংয়ের উপরে। তেমনিভাবে আমার চোখও ঘুরঘুর করতে থাকল মানুষের মুখের দিকে। অনেক মাস ধরে আমি অনুসরণ করলাম, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মানুষ কীভাবে হাসে? কাজের সুবিধার্থে আমি রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে অফিস আদালতে চাতক পাখির মতো ঘুরতে থাকলাম। দেখতে লাগলাম, কীভাবে সবাই হাসে। এমনকি কীভাবে টিভির স্ক্রিনে দেখা মানুষেরা হাসে সেটাও চোখ এড়াল না।
বিশ্বমোড়ল থেকে শুরু করে বিশ্ব নেতা, কেউই আমার গবেষণার বাইরে নয়। এবং এক সময় আবিষ্কার করলাম, কীভাবে ধীর গতির লম্বা হাসি মানুষকে অনন্য করে তোলে এবং বিপরীতে ক্ষণিকের ছোট্ট হাসি কীভাবে বক্তার প্রতি শ্রোতার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। ওই সময়টায় একটা ব্যাপার খুব বেশি অনুভব করলাম, মানুষকে মুগ্ধ করতে চাইলে তুমি হাসো যত লম্বা সময় পারো। সে হাসি যেন অন্যদেরও ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
কৌশল ১
হাসির বন্যা
কারো সাথে সাক্ষাতের শুরুতেই হাসবে না, বরং তার মুখের দিকে তাকাও, তারপর তাকে চেনার ভান করে লম্বা করে একটা হাসি দাও, যাতে সে বুঝতে পারে, তুমি তাকে দেখে কতটা খুশি হয়েছ। তোমার উচ্ছ্বসিত হাসি তাকে আনন্দ দেবে। একটু সময়ের জন্য বিরতি দিয়ে হাসায় সে বুঝবে তুমি তাকে চিনতে পেরেই এমন উদ্দীপ্ত। ফলস্বরূপ তোমাদের সম্পর্ক হবে মধুর।
পর্ব ২
আঠালো চাহনি
কীভাবে সঠিক জায়গায় বোমাগুলো ফাটাবে?
অতিরঞ্জিত শোনালেও জনশ্রুতি আছে- ট্রয় নগরীর সুন্দরী নারী হেলেনের চোখের আগুনে জাহাজ পর্যন্ত ভস্মীভূত হয়ে যেত এবং বিপরীতে ডেভিড ক্রকেটের তীক্ষ্ণ চোখের দিকে তাকালে ভয়ে ভালুক পর্যন্ত পালিয়ে যেত। এর থেকে বোঝা যায়, আমাদের চোখ একটা স্বতন্ত্র বোমা হিসেবে কাজ করে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে। তোমাকে শুধু এটা জানতে হবে, এই বোমাটা কখন, কোথায় এবং কীভাবে ছুড়লে সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে। সামরিক জান্তার শক্তির মূল উৎস যেমন প্রাণঘাতী মারণাস্ত্র, ওইরকমই আমাদের মূল অস্ত্র হচ্ছে আমাদের চোখ। চোখের সঠিক ব্যবহার আমাদের খুব সহজেই অন্যের নজরে নিয়ে আসে।
অন্যের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলাটা একটা পুরোনো কিন্তু কার্যকরী কৌশল, যা সচরাচর সব সফল ব্যক্তি অনুসরণ করে থাকেন। অন্যদিকে, তোমার আই কন্টাক্ট বা চোখাচোখি যদি সঠিক না হয়, তবে মানুষ খুব সহজেই তোমার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।
ছেলে বেলায় আমাদের বাড়িতে এক কেয়ারটেকার রাখা হয়েছিল, কালো জাদু, ডাইনি, ভূত এসব ব্যাপারে তার ছিল খুব আগ্রহ। আমাদের পোষা বেড়াল ‘লাউয়ি’কে সে খুব ভয় পেত। তার অভিযোগ ছিল, লাউয়ি (বেড়ালটা) তার দিকে এমনভাবে তাকায়, তার ভয় করে। কিছু কিছু অঞ্চলে প্রচলিত আছে যে, ডাইনিরা ভয়ংকর চোখে তাকিয়ে থাকে। বেড়ালটার চাহনি কি সত্যিই ডাইনিদের মতো?
অন্তত কেয়ারটেকার তো তাই ভাবে?
এর সারাংশ থেকে আমরা এটা ভালোই বুঝতে পারছি, মানুষের তাকানোর ভঙ্গি দেখে অনেক সময় তাকে যেমন নম্র-ভদ্র বলা হয়, তেমনি শুধুমাত্র চোখের তাকানো দেখে তাকে বলে ফেলা হয়, অসভ্য বেয়াদব!
বড় বড় ব্যক্তিরা, যেকোনো দেশ ভ্রমণের পূর্বে সেদেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে জেনে নেন। দেখা গেছে, সংস্কৃতিভেদে মানুষের শারীরিক অঙ্গভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে থাকে। তারা চাইলেই সে দেশের হালকা-পাতলা টুকটাক ভাষা শিখতে পারতেন। অথচ তারা প্রথমটাই আকাঙ্ক্ষা করেন।
মজার ব্যাপার হলো, আমাদের সমাজের সফল ব্যক্তিরা খুব ভালো করেই জানেন, মধুর চোখের চাহনি মানুষকে আকর্ষণ করতে পারে। বিশেষ করে বিপরীত লিঙ্গের কাউকে তো বটেই! আবার ব্যবসায়িক অবস্থানে যদিও রোমান্টিকতা কাজ করে না, তবুও সঠিক চাহনি অনেক কাজে দেয়।
অ্যা বোস্টন নামের একটা প্রতিষ্ঠান থেকে একটা গবেষণার আয়োজন করা হয়েছিল। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল, একজন পুরুষ ও একজন নারীকে একাকী শুধুমাত্র নিত্যদিনের কথাবার্তা বলতে দেওয়া হলে তার ফলাফল কী আসে। একটা কঠিন শর্ত দেওয়া ছিল, দুজনকেই চোখের দিকে তাকিয়ে, সঠিক চাহনি বজায় রেখে কথাগুলো বলতে হবে। কথা বলা অবস্থায় দুজনই হিসেব রাখবে- কে কতবার চোখের পাতা ফেলছে।
পাশাপাশি আরেকটা পরীক্ষা চালানো হয়েছে, যেখানে চোখের দিকে তাকানোর বাধ্যবাধকতা নেই।
রিপোর্টের ফলাফলে দেখা যায়, ‘যাদের বিশেষ নজরে’ তাকাতে বলা হয়েছে, তারা অপেক্ষাকৃত মধুর এবং আনন্দময় সময় কাটিয়েছে। যারা চোখের চাহনি বজায় রাখেনি, তাদের আলাপ তেমন মধুর হয়নি।
আমার একটা সম্মেলনে এক শ্রোতা আমার মনযোগ আকৃষ্ট করেছেন। শতাধিক মানুষের সামনে বক্তৃতা দিতে গেলে আলাদা করে কাউকে নজরে নেয়া যায় না। এই বড় ভিড়ের মাঝে একজন ভদ্রমহিলাকে আমার চোখে লাগল। আমি যতবারই সবার দিকে তাকিয়ে ফিরতি তার দিকে তাকালাম, প্রত্যেকবারই তার সাথে আমার সরাসরি চোখাচোখি হলো। তার চাহনি এমন ছিল, মনে হতে থাকল, ভদ্রমহিলা আমার কথায় ডুবে আছেন!
মহিলা একবারের জন্যও চোখাচোখি বন্ধ করেননি। ব্যাপারটা আমাকে তার প্রতি বাড়তি আকর্ষণ দিয়েছে। আমার কথার প্রতি তার মনযোগ দেখে, আমি অভিভূত হয়েছি। তার গভীর আই কন্টাক্ট আমাকে অনুষ্ঠান পরবর্তী সময়ে তাকে খোঁজার তাগাদা দিল।
অনুষ্ঠান শেষে সত্যিই আমি নারীটিকে খুঁজতে থাকলাম। দেখলাম তিনি গেট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। আমার ডাক তার কান পর্যন্ত পৌছাল না। আমি দ্রুত তার কাছে ছুটে গেলাম, ভদ্রভাবে তার কাঁধে হাত দিয়ে ডাকলাম। ভদ্রমহিলা অবাক হয়ে আমাকে দেখলেন! স্বয়ং আমি তাকে ডাকছি, তার বোধহয় বিশ্বাস হচ্ছে না!
আমিও কী বলব, গুছিয়ে উঠতে পারলাম না। তবুও নিজেকে সংযত রেখে জানতে চাইলাম, তাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারি কি না?
তার সম্মতি পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি খুব মনযোগ দিয়ে আমার কথাগুলো শুনছিলেন, আমি খেয়াল করেছি। আপনি কি আমাদের সম্মেলন থেকে নতুন কিছু শিখতে পেরেছেন?’
তার চেহারা দেখে মনে হলো, তিনি তেমন একটা উপকৃত হননি। বরং আস্তে অনুযোগের সুরে বললেন, ‘ওরকম না। আপনার কথাগুলো বুঝতে আমার বেশ কষ্ট হচ্ছিল। আপনি বারবার এদিক সেদিকে হেঁটে হেঁটে কথা বলছিলেন বলে আপনার মুখ দেখা যাচ্ছিল না। তাই কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করছিলাম।’
তার উত্তরটা আমাকে প্রচণ্ড হতাশ করল। বুঝতে পারলাম, সে কথাগুলো বুঝতে পারছিল না, তাই অমন গভীরভাবে তাকিয়ে বোঝার প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল! অথচ আমি ভেবে আছি, সে বুঝি আমার কথায় মুগ্ধ হয়ে আছে!
তার এমন চাহনি আমাকে বাধ্য করল, তার সাথে আরো কিছুক্ষণ সময় কাটাতে। একদিন অবসরে তাকে কফির দাওয়াতও দিয়ে দিলাম, যা সচরাচর আমি অন্যদের দেই না।
আঠালো চাহনিতে তোমাকে বুদ্ধিমান দেখাবে
অপলক তাকিয়ে থাকা নিয়ে সমাজে প্রচলিত রয়েছে, যারা অপলক তাকিয়ে থাকার গুণটি আয়ত্ত্ব করেছেন, তাদের অনেক বেশি জ্ঞানী ও বাস্তববাদী বলে মনে হয়। গভীর মনযোগী মানুষ অনেক বেশি তথ্য উপাত্ত মনে রাখতে পারেন, যা একজন বদ্ধমূল চিন্তাভাবনা করা মানুষ পারেন না। অর্থাৎ তোমার গভীর মনযোগী চোখের চাহনি, তোমাকে অন্যের সামনে খোলামেলা মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করাবে।
অভ্যাসটি রপ্ত করতে পারলে অন্যের অমনযোগ অথবা তার নীরব সময়টাতে সে বুঝতে পারবে, তুমি এখনো মনযোগী যেমনটা শুরুতে ছিলে।
বিশিষ্ট মনোচিকিৎসকদের কাছে ফিরে যাই। ইয়াল ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে যে, সঠিক চোখাচোখি মানুষের গ্রহণযোগ্যতা অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয় এবং তাদেরকে অনেক বেশি আশাবাদী হিসেবে উপস্থাপন করে।
গবেষণার সুবিধার্থে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দুজন নারীকে নিজেদের দিকে অপলক তাকিয়ে তাকিয়ে কথা বলার কাজটি দিল।
ঠিক একই সময় দুজন পুরুষকে অন্য একটা কক্ষে একই ধরনের কাজ দিল। তাদের উপরে নির্দেশনা ছিল, চোখে চোখ রেখে কথা বলে যেতে হবে।
গবেষণায় অদ্ভুত ফল হলো!
যখন বক্তা এবং শ্রোতা দুজনই নারী, অপলক চেয়ে থাকাটা অনেক কার্যকরী দেখাল। দুজনের কথা আরো ঘনিষ্ঠ ও মধুর হয়ে উঠল।
বিপত্তি বাধল, যখন দুজনই পুরুষ! কেউ কেউ অভিযোগ করল, অপর পুরুষটা অপলক তাকিয়ে থাকায় তারা আত্মত্মবিশ্বাস হারাতে থাকল। কেউ কেউ অভিযোগ করল, এভাবে তাকিয়ে থাকাটা অসহ্যকর, কেউ কেউ কথা গুলিয়ে ফেলেছে।
সবচেয়ে অদ্ভুত অভিযোগটা এসেছে- ‘আমাদের মা-বাবাও আমাদের দিকে শাসন করতে গিয়ে এভাবে তাকান না।’ পুরুষদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ আই কন্টাক্ট ভয়াবহ!
তোমার সঙ্গী, তোমার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকলে তোমার আবেগীয় আচরণে কিছু পরিবর্তন দেখা দেবে। এটার পেছনে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে। যখন তোমার দিকে কেউ এভাবে তাকিয়ে থাকে, তোমার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, শরীরের শিরায় শিরায় হরমোনের আনাগোনা বাড়তে থাকে। এটা ঠিক সেই একই হরমোনের আনাগোনা, যা আমরা ভালবাসার মানুষের সঙ্গ পেলে অনুভব করি।
যখন তুমি মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকার এই অভ্যেসটা রপ্ত করে ফেলবে, যে কোনো জায়গায়, হোক কোনো অনুষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি জীবনে, তুমি অনেকের মনযোগ আকর্ষণ করতে সচেষ্ট হবে। তারা ভাববে, আরেহ, এই ভদ্রলোক তো আমার সাথে কথা বলতে আগ্রহী মনে হচ্ছে!
দুজন নারীর কথোপকথনের সময়টা কিংবা বিপরীত লিঙ্গের দুজনের কথা বলার সময়ে চোখাচোখির উক্ত অবস্থানকে আমি নাম দিয়েছি আঠালো চাহনি, অর্থাৎ যে চোখ অপলক তাকিয়ে থাকে। (পরবর্তী অংশে আমরা জানব, দুজন পুরুষ কীভাবে সংশোধিত কৌশল কাজে লাগিয়ে তাদের কথোপকথন আরো বেশি আকর্ষণীয় করে তুলতে পারবে। উপরোক্ত কৌশলটি শুধুমাত্র ‘নারী-পুরুষ’ এবং ‘নারী-নারী’র ক্ষেত্রে কার্যকর।)
কৌশল ২
আঠালো চাহনি
অপলক তাকিয়ে থাকার অভ্যেসটা রপ্ত করে নাও, হোক সেটা কৃত্রিম। বক্তার কথা শেষ হয়ে গেছে, তবুও তাকাও। তাকে বুঝতে দাও, তুমি এখনও একজন মনযোগী শ্রোতা। আর যদি ক্ষণিকের জন্য অন্য দিকে তাকাতে মন চায়, অন্যদিকে তাকিয়ে আবার ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাও, ঠিক আগের ভঙ্গিতে।
ছেলেদের ক্ষেত্রে কী নিয়ম?
এবার আসি পুরুষদের ব্যাপারে। তোমরা অপলক তাকিয়ে থাকার কৌশলটা চালিয়ে যেতে পারবে, ছোট্ট একটু পরিবর্তনের মাধ্যমে। কেউ যখন তোমাকে তার ব্যক্তিগত জীবনের নানা দিক নিয়ে কথা বলবে, তখন তুমি অপলক না তাকিয়ে একটু কম গাভীরভাবে তাকাও। প্রখর চাহনি তাকে ভীত অনুভব করাতে পারে। অপর দিকে, যখন নিত্যদিনের কাজকর্ম, নিত্য কথাবার্তা চালিয়ে যাবে তখন অপলক তাকিয়ে থাকতে পারবে। নারীদের ক্ষেত্রে কীভাবে তাকাবে, তা পূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি। আশা করি ব্যবধানটা তোমরা ধরতে পেরেছো।
আমার বিক্রয় বন্ধু স্যামি, যে কি না তার খিটখিটে মেজাজের জন্য সুপরিচিত। অন্যদের সাথে কথা বলার সময় তার হুঁশ থাকে না। মুখ গম্ভীর করে চেঁচামেচি করে। সে একটা সমাধান আমার কাছে আশা করে। ফলত, আমার সাথে রেস্তোরাঁয় দেখা করল, তার খিটখিটে মেজাজের জন্য কেউ তাকে পছন্দ করে না, এটাও আমাকে জানাল।
তাকে আমার আঠাল চাহনি অংশের চোখাচোখির কৌশলটা জানালাম। সে প্রথমে রাজি হচ্ছিল না, পরবর্তীতে রাজি হলো, ওটা সে প্রয়োগ করবে।
ঠিক তখনই ওয়েটার এলো। স্যামি মেন্যুটা দেখল, ওয়েটারের দিকে খুব সুন্দর করে তাকাল, মনযোগ দিয়ে চোখাচোখি করে অর্ডারটা দিল। অর্ডারের পরও কয়েক সেকেন্ড ওয়েটারের দিকে তাকিয়ে তারপর নিজের দৃষ্টি সরাল! আমি নিজেই অবাক হয়ে গেলাম! ওয়েটারের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। আমার মনে আছে, সেদিন ওয়েটার আমাদের অনেক বাড়তি সেবা দিয়েছিল, যা সচরাচর কেউ আশা করে না!
এর মাঝে একদিন স্যামির কল পেলাম। সে আমাকে উচ্ছ্বাসিত হয়ে জানাল যে, আমার বলা কৌশল তার জীবন বদলে দিয়েছে!
মেয়েদের ক্ষেত্রে অপলক তাকিয়ে থাকা, আর ছেলেদের একটু কম ঘনিষ্ঠভাবে তাকানোর কৌশলটা আসলেই দারুণ কাজে দেয়। যারা ওকে গুরুত্ব দিত না, তারাও এখন বিশেষ সমীহ করে। স্যামি গত কয়েক মাসে তার জীবনের সবচেয়ে বেশি পণ্য বিক্রি করতে সামর্থ্য হয়েছে।
এই কৌশলটা তোমাকে তোমার ক্রেতা-বিক্রেতা বা অন্য কোনো পেশাদার স্থানে দারুণ সাফল্য দেবে। মনে রাখবে, শুধু স্যামি নয়, যে কেউ কৌশলটা রপ্ত করতে পারবে এবং মানুষের কাছে বিশ্বস্ত হয়ে উঠবে, খুব সহজেই।
আশা করি, তোমাদের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে তোমার চোখের ভাষা, তোমায় এগিয়ে রাখবে নাকি আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেবে, তা সম্পূর্ণটা তোমার হাতেই রয়েছে।
পর্ব ৩
গভীর চাহনি
প্রাথমিক অস্ত্রে ফিরে আসো
কারো দিকে অপলক তাকিয়ে থাকার কৌশল যাকে আমরা আঠালো চাহনি হিসেবে জেনেছি, এই কৌশলে নতুন সংযোজনই হচ্ছে গভীর চাহনি।
অফিসের বস তাদের কর্মীদের মূল্যায়নে, পুলিশ অপরাধীর পেট থেকে কথা বের করতে এবং কোনো পুরুষ কোনো নারীকে আকৃষ্ট করতে এই চোখে তাকায়।
কৌশলটা সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এটা সেখানেই কাজ করবে যেখানে ‘কমপক্ষে’ তিনজন বা অধিক ব্যক্তির উপস্থিতি রয়েছে।
ধরো এক ভদ্রলোক কথা বলছেন, সেখানে তুমিসহ আরো কয়েকজন উপস্থিত রয়েছে। বক্তা কী বলে যাচ্ছেন তাতে তোমার কোনো আকর্ষণ নেই। তোমার বিশেষ আগ্রহ ওখানকার কোনো একজন শ্রোতা, যাকে জানান দিতে চাচ্ছো, ‘আমি তোমার সাথে পরিচিত হতে চাই’। সরাসরি গিয়ে কথা বলবে তেমন অবস্থা তোমার হাতে নেই।
সেক্ষেত্রে তোমার হাতে কৌশলটা রয়েছে। বক্তার কথার ফাঁকে ফাঁকে তোমার কাঙ্ক্ষিত শ্রোতার দিকে তাকাও। যত বেশি সম্ভব চোখাচোখি করো। তোমার গভীর চাহনি তাকে নিশ্চিত করবে, তোমার সমস্ত মনযোগ বক্তার দিকে নয় বরং তার দিকে!
কাঙ্ক্ষিত মানুষটি সবার আগে কী ভাববে কল্পনা করতে পারছো?
‘এই ভদ্রলোক আমার দিকে এভাবে তাকাচ্ছেন কেন? তিনি কি আমার সাথে পরিচিত হতে চাচ্ছেন?’
টেকনিকটার সফলতা এখানেই। সবাই যখন বক্তাকে আকর্ষিত করছে, তুমি তখন একজন শ্রোতাকে আকর্ষিত করছো। আসল প্রশ্নটা এখন সামনে আসছে, এই কৌশলটা কোথায় কোথায় ব্যবহার করা যাবে?
তুমি যেকোনো ভিড়ের ভেতরে এটা কাজে লাগাতে পারবে। হতে পারে ওটা কোনো সেমিনার, রাজনৈতিক সভা সমাবেশ বা পেশাদার কোনো প্লাটফর্ম। মনে রাখবে এটা তখনই খাটাবে, যেখানে দর্শক সারিতে কেউ একজন বসে আছেন, যার সাথে পরিচিত হওয়া তোমার জন্য জরুরি।
মানবসম্পদ বিভাগের (হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্ট) কর্মীদের কাজই হচ্ছে নতুন যোগ্য কর্মীকে কোম্পানির জন্য পছন্দ করা। সেক্ষেত্রে তারা প্রায়শই এই কৌশলটা ব্যবহার করেন। তবে তারা যে শুধুমাত্র কৌশল হিসেবেই ব্যবহার করেন এমনটা নয়, বরং এটা তাদের সাহায্য করে একজন কর্মীকে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে। এছাড়াও কোম্পানির পরিচালক, আইনজীবী, গোয়েন্দা, পুলিশ, মনোচিকিৎসক এবং অন্যান্য ব্যক্তি যাদের পেশাদারিত্বের সফলতা নির্ভর করে অন্যের আচার-আচরণ বুঝতে পারার উপরে, তারা এই ট্রিকসটা একেবারে আত্মস্থ করে নেন। ব্যক্তি জীবন থেকে পেশাদার জীবনে এর প্রয়োগ অব্যাহত রয়েছে।
উল্লিখিত কৌশলটা যখনই ব্যবহার করবে তখনই তুমি নিজের আত্মবিশ্বাসকে আরো বাড়িয়ে নেবে এটা সত্য। এটা ব্যবহার করার ক্ষেত্রে তোমাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে অতিরিক্ত কারো দিকে তাকানো, তোমাকে তার কাছে নির্লজ্জ হিসেবে প্রমাণ করতে পারে। সুতরাং পরিমিত আকারে তুমি তোমাকে চোখের মাধ্যমে উপস্থাপন করো, বুঝিয়ে দাও, তুমি বক্তার চেয়ে তার প্রতিই বেশি আগ্রহী। আবারও বলছি, পরিমিত আকারে তাকাও যখন বক্তা একটু বিরতি নিচ্ছে তখন। এমন নয় যে ফ্যালফ্যাল করে তার দিকেই তাকিয়ে থাকবে।
কৌশল ৩
গভীর চাহনি
উল্লিখিত ট্রিকসটির সফলতা নির্ভর করছে ওটাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার উপর।
যার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাও, সে হোক নারী বা পুরুষ শ্রোতা, তাতে কিছু যায় আসে না। তার প্রতি আগ্রহ দেখাও। তুমি খুব তাড়াতাড়িই তার চোখে পড়ে যাবে। সাবধান! বক্তার দিকে না তাকিয়ে যদি সারাক্ষণ তোমার নির্ধারিত ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে থাকো এটা উল্টো খারাপ ফল দেবে। সে তোমাকে নির্লজ্জ ভেবে বসতে পারে।
যখন তুমি প্রেমিক পুরুষ
কাউকে তোমার প্রেমে ফেলা যদি তোমার মুখ্য উদ্দেশ্য হয় থাকে তবে গভীর চাহনি তোমাকে দেবে অন্যরকম ফলাফল। কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটি অনুভব করবে, কেউ একজন তার দিকে তাকাচ্ছে। আর বারবার তাকানোর অর্থ, ‘সে আমার থেকে চোখ সরাতে পারছে না! প্রেমে পড়ে গেছে নাকি বেচারা?’
গবেষণায় দেখা গেছে, নারী-পুরুষের প্রেম কিংবা রোমান্টিকতার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম সাড়া দেয় আমাদের চোখ। চোখ পুলকিত বোধ করলেই আমাদের সমস্ত শরীরে হরমোনের দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে যায়।
তোমার চাহনি বলে দেবে তুমি কী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছ। তোমার চোখ দেখে যেমন সে ভয় পেতে পারে, একই চোখ দেখে সে রোমাঞ্চিত হতে পারে। তোমার দৃষ্টিতে থাকবে সহজ সরলতা, গভীর চাহনি কিন্তু লাজুক প্রকাশ।
চোখ দুটোকে কীভাবে ব্যবহার করছো, তার উপরে নির্ভর করবে তোমার সফলতা কিংবা ব্যর্থতা!
বিশেষ করে পুরুষদের উদ্দেশ্যে বলা, কোনো নারীকে আকৃষ্ট করতে অবশ্যই এই কৌশলটা রপ্ত করতে পারো। সঠিকভাবে তাকানো তার ভেতরে অন্যরকম একটা অনুভূতির জন্ম দেবে।
পরিস্থিতি যদি এমন হয়, ওই নারী তোমাকে পছন্দ করার মতো কোনো গুণই পেল না, সেক্ষেত্রে এটা তাকে বিরক্তি দেবে।
এজন্য বলি, পুরোপুরি কনফিডেন্স থাকলেই কাজটা করো। (কোনো জনসমাগম যেখানে তোমাদের পূর্ব পরিচিতি নেই, ওখানে অচেনা কারো উপরে এমন কৌশল খাটানোর সাহস করো না। কারণ মাঝেমধ্যে পুলিশ তোমার সাহসের সঠিক দাম নাও দিতে পারে।)
শির্লি ব্যেসির পুরোনো গানের কথাগুলো মনে আছে?
‘যেকোনো ভিড়েই আমি খুঁজে পাই তোমায়, তুমি যে অনন্য, তুমিতো শুধু তুমিই… তোমার সুপুরুষ চেহারাটা আমায় বারবার মনে করিয়ে দেয় তোমায়… অথচ তুমি কখনোই জানতে চাওনি আমার ভেতরটা তোমার জন্য কেমন দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে!’
এই কথাগুলো তোমাকে অত্যধিক পটু বা স্মার্ট প্রমাণ করতে নয় বরং অনেকের সামনে কেউ একজন হয়ে উঠতে সাহায্য করবে।
পর্ব ৪
দাঁতের সাহায্যে ঝুলে পড়ো
তোমার হাঁটার ধরনই বলে দেয় তুমি একজন প্রকৃত বিজয়ী
ডাক্তার যখন তোমার থুতনিতে রাবারের মাতুল দিয়ে টোকা দেয়, নিশ্চয়ই অনুভব করেছো একটি মৃদু কম্পন যা তোমার চোয়ালের মধ্য দিয়ে প্রকম্পিত হচ্ছে।
অনুরূপভাবে যখন কোনো খুশির সংবাদ তোমার কানে আসে, তুমি খুশিতে মাথা নাড়াও, তোমার শরীরের পেছনটা ঝুঁকে যায়, তোমার মুখে ফুটে ওঠে বিজয়ীর হাসি। পুরো শরীরে এক মৃদু কম্পন খেলে ওঠে।
সফল ব্যক্তিরা ঠিক ওভাবেই নিজেদের তুলে ধরেন। তাদের দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা অন্যদের আশ্বস্ত করে। তাদের মৃদু হাসি তাদের গর্বিত দেখায়। এখানে কোনো সন্দেহ নেই যে, তোমার এই বিশ্বস্ত এবং হাসিখুশি চেহারা তোমাকে খুব সহজেই অন্যদের থেকে আলাদা করে দিচ্ছে। তোমায় নিয়ে যাচ্ছে আরেক উচ্চতায়।
লক্ষ লক্ষ মা-বাবা চেষ্টা চালিয়ে যান, তাদের সন্তানকে সঠিকভাবে দাঁড়ানো শেখাতে। তেমনই কোটি কোটি শিক্ষক প্রায়শই বলেন, ছাত্রছাত্রীরা, তোমরা সোজা হয়ে দাঁড়াও। সোজা হয়ে দাঁড়ানো কি আসলেই গুরুত্বপূর্ণ? হ্যাঁ, গুরুত্বপূর্ণ। তুমি যদি কৌশল মেনে সঠিকভাবে দাঁড়াও, তবে তুমি নিজেকে অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকতে দেখবে। কৌশলটা তোমার শিক্ষক কিংবা-পিতা মাতার পরামর্শের চেয়েও অত্যধিক কার্যকরী, যেটা তোমায় কেউ একজন হয়ে উঠতে সাহায্য করবে। যেকোনো পেশায়, যেকোনো জায়গায়, তুমি যদি সঠিকভাবে না দাঁড়াও, সঠিকভাবে না তাকাও কিংবা সঠিকভাবে নিজেকে উপস্থাপন না করো, তবে তোমার ভেতরে যত গুণই থাকুক না কেন, ওটা তোমাকে একটা পর্দার ভেতরে ঢেকে নেবে। ফলশ্রুতিতে এত গুণের অধিকারী হয়েও তুমি নিজেকে প্রকাশ করতে পারবে না। তাই সঠিক সময়ে সঠিক বডি ল্যাঙ্গুয়েজ (শারীরিক অঙ্গভঙ্গি) অনেকখানি গুরুত্ব রাখে।
অনেকদিন আগের ঘটনা।
একদিন আম্মু আমাকে সার্কাস দেখতে নিয়ে গেলেন। দেখলাম, একটা গোল রিংয়ের ভেতর দিয়ে সাতজন মানুষ লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে গেল। অবিশ্বাস্য! আশপাশের সমস্ত দর্শক তালি দিতে লাগল। কেউ কেউ খুশিতে চেঁচিয়ে উঠল। তারা সাতজন, একজন আরেকজনের উপরে উঠে দাঁড়াল। মা আমার কানের কাছে ফিসফিস করল, ‘মা লেইল, এরাই সেই বিখ্যাত ওয়ালেনডাস, যেখানে সাতজন ব্যক্তি কোনো সুরক্ষা না নিয়েই একটা মানব পিরামিড বানিতে ফেলে। এটা বিশ্বের আর কোথাও হয় না।’
মায়ের কাছ থেকে এমন তথ্য পেয়ে আমি আরো বেশি অবিশ্বাস নিয়ে দেখতে থাকলাম।
হঠাৎ চারদিকে সুনসান নীরবতা নেমে এলো। কেউ কেউ খাবার মুখে নিয়ে থেমে গেছে, সবার চোখ বিস্ফোরিত হয়ে মানব পিরামিডের সামনে দাঁড়ানো কার্ল এবং ওয়ালেনডাকে দেখছে, ওরা জার্মান ভাষায় কী কী যেন বলছিল। এরপরই সবাইকে হতবাক করে দিয়ে এই দম্পতি মানব প্রাচীর বেয়ে পিরামিডের উপরে উঠে গেল। আমাদের ভেতরটা ধুক ধুক করছে! এই বুঝি ভেঙে পড়ল মানব প্রাচীর! আমিও চোখের পাতা ফেলতে যেন কয়েক মুহূর্ত ভুলে গেলাম। এই দম্পতি আমাদের চূড়ান্ত অবাক করে দিয়ে উপরে ঝুলতে থাকা চিকন একটা তারে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল।
হায় স্রষ্টা। ওদের মধ্যখানে আর কিছুই রইল না, মৃত্যু ছাড়া। নেই কোনো সুরক্ষা।
এই দম্পতি এই সরু তার ধরে হাঁটছে যা মাটি থেকে অনেক বেশি ওপরে! ওখান থেকে পড়লে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মেকি। তাদের প্রচেষ্টাটা ছিল সত্যিই ভয়ংকর!
সার্কাসের পরবর্তী অংশে সাতজনের এই ওয়ালেনডার দলটি উঠে এলো সর্বোচ্চ উঁচুতে। ওখান থেকে একে একে লাফিয়ে পড়তে থাকল দড়ি সমেত।
ভয়ংকরভাবে হলেও প্রত্যেকে খুব সুন্দরভাবে মাটিতে অবতরণ করল। প্রত্যেকের মুখে ছিল খুশির ঝলক, বিজয়ীর হাসি (এটাই সঠিক বডি ল্যাঙ্গুয়েজ)। পুরো প্রচেষ্টাজুড়ে তাদের মুখ থেকে শুরু করে পুরো শরীর কথা বলেছে। বেঁচে ফেরার আনন্দে তাদের ভেতরটা আনন্দের ফোয়ারা ফুটে উঠছে। আর আমরা ওদের এমন ভেলকি দেখে দারুণ খুশি হয়েছি, যা ভোলার নয়।
তোমার দেহভঙ্গি হচ্ছে তোমার বিজয়ের সোপান
ধরে নাও তুমি সার্কাসের একজন বাজিকর যে কি না ‘আয়রন-জ’র জন্য বিখ্যাত! রিংলিং ব্রোস, বার্নম এবং বেইলির সার্কাসের তুমিই আসল আকর্ষণ। গোলকের ভেতর দিয়ে নিক্ষিপ্ত হবার জন্য পারদর্শী। দর্শক তোমাকে খুবই পছন্দ করে, কারণ তুমি এত বিপজ্জনক সব জায়গায় ভারসাম্য রাখতে ওস্তাদ। তুমি ঠিকই বুঝতে পারো মানুষ কেন তোমায় এত পছন্দ করে।
যেকোনো দরজা দিয়ে হাঁটার সময়, হতে পারে সেটা তোমার অফিস, আদালত কিংবা তোমার রান্নাঘরের দরজা, কল্পনা করো একটা দড়ি সিলিং থেকে ঝুলছে যেটা ধরে লাফালে তুমি অনেকটা উপরে উঠে যাবে। যেমনটা সার্কাসে আমরা দেখি দড়ির খেলায়। ধরো তুমি দড়িটি ধরে শূন্যে ঝাঁপিয়ে অনেকটা ঊর্ধ্বে আরোহণ করলে, যেখান থেকে দর্শকদের মাথা উঁচিয়ে দেখতে হচ্ছে। তোমার দাঁড়িয়ে থাকা মাথা, মাসল, ধড় এবং তোমার নিজেকে তখন পুরোপুরি ওজনশূন্য
মনে হচ্ছে। উৎসুক দর্শক অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে তোমাকে দেখছে। অবাক হচ্ছে। হ্যাঁ তাদের জন্য তুমি এখন কেউ না থেকে কেউ একজন হয়ে গেছো।
একদিন গুনতে থাকলাম, আমি দিনে কতবার বিভিন্নভাবে দরজা খুলি। হিসেব করে দেখা গেল রান্নাঘরের দরজা বড়জোর ছ’বার খুলি। সদর দরজা বড়জোর দু’বার। আর অফিসের হিসেবে আসলে অসংখ্যবার। মানুষ যখন প্রতিদিন নিয়ম করে ষাটবারের মতো কোনো কিছু করতে থাকে তখন ওটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়। সুতরাং মানুষের সাথে কথা বলার স্পেশাল কৌশলগুলো রপ্ত করে নাও! ওটাই তোমাকে বিজয়ী করে তুলবে।
কৌশল ৪
দাঁতের সাহায্যে ঝুলে পড়ো
সার্কাসের ‘আয়রন-জ’র দড়িটিতে তোমার পরিচিত প্রত্যেকটি দরজার সাথে কল্পনায় ঝুলিয়ে দাও। আর কল্পনায় ‘আয়রন-জ’র দড়িতে উঠে পড়ো। ঊর্ধ্বে আরোহণ করো, আর অনুভব করো তোমার মাসলগুলো কীভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে যা তোমাকে নির্ভুল শারীরিক অঙ্গভঙ্গি দিচ্ছে। তোমার কাজ হচ্ছে, তোমার শারীরিক এসব ভঙ্গিমাকে নিত্য অভ্যাসে পরিণত করা, যা তোমার বড়ি ল্যাঙ্গুয়েজকে করে তুলবে আরো উন্নত।
আমার বন্ধু বব যে কি না ব্যাঙ্গচিত্র অঙ্কনের জন্য পরিচিত, তার কথাগুলো মনে রেখেছো তো?
সে বলেছিল, ‘সঠিকভাবে দাঁড়ানো, সঠিকভাবে মাথাকে একটু উর্ধ্বমুখী রাখা, বিশ্বস্ত হাসি এবং সঠিকভাবে তাকানো একজন মানুষকে অনন্য করে তোলে।’
পর্ব ৫
বড়দের কৌশল
তোমার আমাকে কেমন লাগে?
পুরনো ওই কৌতুকটা মনে আছে তো সবার? মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন কেউ একজন বলে, ‘আচ্ছা, আমি জানতে চাই আমার কাজ আপনারা কেমন পছন্দ ও উপভোগ করেন?’
শ্রোতা বা দর্শক তখন গুনগুন করতে শুরু করে। একজন আরেকজনকে প্রশ্ন করে আসলেই তো? আমরা কি তার কাজ আদৌ পছন্দ করি? মানুষের এই অনুভূতির পেছনে যে সূক্ষ্ম ব্যাপারটা কাজ করে ওটার নামই আবেগ। আমাদের যখন পরিচিত কারো দেখা হয়ে যায়, অথবা তারা দেখে এগিয়ে আসে তখনও আবেগ বেশ জোরেশোরে প্রভাব বিস্তার করে।
আমার প্রতি তার আগ্রহ কতটা, তার প্রতিক্রিয়া আমরা আলাদা করে খুঁজে ফিরি।
আমাদের জানতে ইচ্ছে করে-
-সে আমাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে?
-সে কি আমার দিকে তাকিয়েছে?
-আমাকে দেখেই তার মুখে হাসি ফুটেছে?
-কথায় কথায় আমার দিকে ঝুঁকে এসেছে?
-ও কি এটা প্রকাশ করতে চাইছে, আমি তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেউ?
উত্তরটা যদি হ্যাঁ হয়ে থাকে, তবে আমাদের ভেতরটা প্রশান্তিতে ভরে যায়। তার আচার-আচরণ ভালো বলে স্বীকৃতি দেই। আর যদি সে এর উল্টোটা করে, তবে মনে মনে তার সম্পর্কে খারাপ ধারণা রাখি।
তাকে নির্বোধ হিসেবে ধরে নিতেও পিছপা হই না।
যখন দুজন অপরিচিত পরিচিত হতে চায়, তারা ঠিক সেই ছোট্ট বাচ্চাদের মতো, যারা নিজেদের দেখে অদ্ভুত অদ্ভুত শব্দ করে ওঠে।
আমাদের লেজ নেই যে, ওটা নাড়িয়ে কাউকে আকৃষ্ট করব! অথবা চুল নাড়িয়ে তার প্রিয় হয়ে যাব! মানুষের এরচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ রয়েছে, যাকে আমরা চোখ বলে জানি। চোখের চাহনি চাইলে ছোট কিংবা বড় করতে পারি। কথোপকথনের সময়টা নিজের ভাব প্রকাশ করতে, ওটা ব্যবহার করতে পারি। এছাড়া দু’হাত বিভিন্ন ভঙ্গিতে নাড়িয়ে নিজের কথার গুরুত্ব আরো ছড়িয়ে দিতে পারি। অন্যদিকে, আমাদের হাতের তালু চিন্তামতোই গুটিয়ে কিংবা ছড়িয়ে দিতে পারি। এমন সব অঙ্গভঙ্গির ব্যবহার, আগত অতিথির কাছে আমাদের করে তুলে আরো আকর্ষণীয়।
যখন কাউকে জেরা করা হয়, তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ জেরাকারীর অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিতে সাহায্য করে।
তারা জানতে চায় তুমি কীভাবে, কতটা স্বাভাবিকভাবে তাদের প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছো। উত্তর দেবার সময় তুমি ঠিক কতটা ঝুঁকে কথা বলছো। তারা তোমার হাতের নাড়াচাড়া দেখবে। ওগুলো কি স্বাভাবিকভাবেই নড়ছে, না তুমি ওগুলো এলোমেলো নাড়াচ্ছো?
সব কিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখবে তোমার উত্তর কতটা গ্রহণযোগ্য এবং কতটা জোরালো ছিল। আবার কথার সাথে শারীরিক অঙ্গভঙ্গির অমিল, তাদের চোখে আলাদাভাবেই ধরা দেবে, যা তোমার জবাবের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দেয়। নিয়মিত বিরতিতে চোখাচোখির অবস্থান অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তারা নানা প্রশ্ন ছুড়বে।
তোমাকে মৃত্যু ভয়ও দেখাতে পিছপা হবে না। তুমি কীভাবে তার প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছো?
আজকাল দায়িত্বরত জজদের সহকারী রাখতে দেখা যাচ্ছে। যার আসল কাজই হলো কথা বলার সময়ের শারীরিক অসঙ্গতি টুকে রাখা। ওগুলো অবশ্যই তোমার দুর্বলতা।
অনেক আইনজীবী তার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন নারীকে নিয়োগ দিতে বেশি আগ্রহ দেখান। এর পেছনে একটা স্কুল ব্যাপার কাজ করে। নারীদের একটা বিশেষ গুণ রয়েছে অন্যের ত্রুটি খুঁজে বের করার।
অপরদিকে ওটাও সত্য, নারীরা পুরুষের তুলনায় বেশি আবেগী হয়। (কিছু কিছু ক্ষেত্রে অত্যধিক কেঁদে স্বামীকে কিছু কাজ করাতে বাধ্য করার গুণও তাদের রয়েছে।)
দায়িত্বশীল এবং তার সহকারীর পরবর্তী কাজ হলো বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা এবং মিলিয়ে নেওয়া কোন কোন প্রেক্ষাপটে তুমি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উদ্দেশ্যহীন নাড়াচাড়া করেছো এবং তা কতটা এলোমেলো ছিল।
ট্রায়ালে আইনজীবীরা সব সময়ই বডি ল্যাঙ্গুয়েজের দিকে বেশি মনযোগ দেয়।
১৯৬০-এর আলোড়িত শিকাগো সেভেনের ট্রায়ালে প্রতিপক্ষ আইনজীবী উইলিয়াম কুন্টসলার প্রধান বিচারকের বিরুদ্ধে তার শারীরিক অঙ্গভঙ্গিতে অসঙ্গতি আছে বলে জোরালো অভিযোগ পেশ করেছিলেন। তার মতে প্রধান বিচারক নিজের অবস্থান থেকে সরে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে আছেন। যার অর্থ দাঁড়ায়, নির্ণায়ক সভার সদস্যদের তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, তিনি এই ব্যাপারে আগ্রহী নন। বোঝাই যাচ্ছে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তোমাকে অন্যের সামনে সঠিকটা বলে দেবে, যদিও তুমি মুখ দিয়ে কিছুই বলোনি।
তুমি আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছ এবং তোমার হাতে রয়েছে শুধুমাত্র দশ সেকেন্ড, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার!
আইনজীবীদের মতো প্রত্যেকেই আলাদা আলাদাভাবে অবচেতন মনে অন্য মানুষদের সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি করে নেয়। আর এই অবস্থানটা পুরোপুরি তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে। এমনকি মানুষের শারীরিক অঙ্গভঙ্গি তোমাকে বুঝিয়ে দেবে তুমি তাদের জীবনে কতটা গুরুত্ব রাখো। কতটা গ্রহণযোগ্যতা তুমি অর্জন করেছো। কথার চেয়ে বরং এমন অনেক উত্তর তারা তোমার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে খুঁজে নেবে যা তুমি ধারণাও করোনি।
‘আমাকে তোমার ব্যক্তিগতভাবে কেমন লাগে?’
সাক্ষাতের শুরুর মুহূর্তগুলো, তোমার শারীরিক প্রতিক্রিয়া তাকে বুঝিয়ে দেবে তোমাদের সম্পর্ক পরবর্তীতে কোন অবস্থানে গিয়ে দাঁড়াবে। তোমার অনুচ্চারিত প্রশ্নগুলো কিংবা তার না বলা উত্তরগুলো তুমি খুব সহজেই পড়তে পারবে, যদি তুমি তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজের দিকে জোর দাও।
‘আমাকে তোমার ব্যক্তিগতভাবে কেমন লাগে?’ এর জবাবটা ফিরে আসবে তোমার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে, ‘অবশ্যই, খুব ভালো লাগে।’ অথবা ‘ভালো লাগে না।’
যখন চার-পাঁচ বছরের একটা বাচ্চার সামনে তুমি দাঁড়াও, তোমাকে দেখেই সে দু’হাত দিয়ে চোখ লুকায়। এক সময় দৌড়ে গিয়ে মায়ের আঁচলের নিচে আশ্রয় নেয়। সেই একই বাচ্চাটা তার পিতার আগমনে হাত-মুখ ছুড়ে, বিজয়ীর হাসি নিয়ে হাত নাড়াতে নাড়াতে চোখের পাতা দুটো প্রসারিত করে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। ওর শারীরিক এসব ভঙ্গিমাকে আমরা অঙ্কুরিত সেই ফুলটির মতো কল্পনা করতে পারি, যেটি সূর্যের আলোয় চকচক করছে।
বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ কিংবা পঞ্চাশ বছরের তোমাকে কখনো কল্পনা করেছো? একেকটা বয়সে তোমার চরিত্রের একেকটা পরিবর্তন দেখা দেবে। চিন্তা করো, চল্লিশ বছরের তুমি কোনো কারণে ভয় পেয়েছো। অস্বস্তি অনুভব করছো! হাতগুলো বুকের কাছে গুটিয়ে নিয়ে হতাশভাবে তাকিয়ে আছ।
অপর দিকে তোমার কোনো এক বিক্রয় বন্ধুর কাজগুলো তোমাকে বিরক্ত করছে অথবা ব্যবসায়িক কোনো সঙ্গীর সাহচর্য তোমার অসহ্য লাগছে। তখন তুমি কী করো? খুব সুন্দরভাবে তাকে এড়িয়ে চলো। তোমার শারীরিক অঙ্গভঙ্গি দিয়ে বুঝিয়ে দাও, তুমি কথা বলতে আগ্রহী নও। চল্লিশ বছরের সেই তুমি যখন পরিবারের কাউকে দীর্ঘ অনুপস্থিতির পরে ফিরতে দেখো, নিজেই ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরো। তোমার সমস্ত আত্মিক শক্তি যেন ওখানে কাজ করে। তোমার মুখের হাসিটা তখন তেমনই সুন্দর দেখায় যেমনটা এক পশলা বৃষ্টির পর ফুলের হলুদ পাপড়িগুলো ঝলকানি দিয়ে ওঠে।
লুকানো বাচ্চামিগুলো বের করে আনো
একটি কোম্পানির অনুষ্ঠানে আমার থাকার সুযোগ হয়েছিল। বরাবরের মতো দেশের অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন। আমি আর আমার বন্ধু কার্লা একসাথেই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। কার্লা সুপ্রতিষ্ঠিত একটি কোম্পানিতে কপিরাইটার হিসেবে কাজ করত। ওর মতো লাবণ্যময়ী, সুদর্শন একটা মেয়ে, কে বলবে সম্প্রতি বিধবার খাতায় নাম লেখিয়েছে? ওর জীবনে আরেকটা বাজে ব্যাপার ঘটে গেছে। ওদের কোম্পানি সম্প্রতি কর্মী ছাটাই করেছে, ছাটাইকৃতদের মাঝে একজন স্বয়ং কার্লা!
এই অনুষ্ঠানটাকে ধরে নিতে হবে, ওর জন্য মহা সুবর্ণ সুযোগ, নিজের একটা কাজ বাগিয়ে নেবার জন্য। আমাদের আশপাশ দিয়েই ঘুরছে ফিরছে বড় বড় কোম্পানির বড় বড় কর্তা ব্যক্তিরা!
এক সুদর্শন পুরুষ কার্লার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে নিজের উপস্থিতি জানান দিলেন। আমার ধারণা ভদ্রলোক, বড় কোনো কোম্পানির, বড় কোনো পদে আছেন। চোখাচোখি হতেই কার্লা মাথা ঝুঁকিয়ে একটু হেসে তার প্রতি উত্তর দিল। ঠিক অতটুকুই। কার্লা আর আমি আবার আগের মতো কথা বলতে আরম্ভ করলাম।
যেভাবেই হোক বুঝতে পারলাম, আমার বন্ধুটি তার সমস্ত কষ্টগুলোকে লুকানোর চেষ্টা করছে। ‘বোকা মেয়ে। আমাদের কাছে খুলে বললেই তো পারে সবটা। কী এমন দুঃখ পুষে রাখছে মেয়েটা।’ মনে মনে ভাবলাম আমি।
এরপর একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল! অপর একজন ভদ্রলোক কার্লার দিকে তাকিয়ে হাসল। এবার কার্লা দেখেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। ভদ্রলোকের মুখের হাসি উবে গেল। তারপর আন্তে ভিড়ের মাঝে হারিয়ে গেলেন।
আমার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে এল। মন চাচ্ছিল চেঁচিয়ে বলি, ‘কার্লা কী বোকা তুমি! লোকটা কে ছিল তোমার ধারণা আছে? ও স্রষ্টা। এই ভদ্রলোক যে স্বয়ং প্যারিসের বিখ্যাত কোম্পানি ইয়ং অ্যান্ড প্যারিক্যামের মালিক। তার চেয়ে বড় কথা লোকটা এখনো অবিবাহিত।’
কার্লা মুখ চেপে কাঁদতে লাগল। আমিও নিজেকে সংযত রাখলাম। মেয়েটা বোধহয় অনেক বেশি কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছে, যেটা আমার দ্বারা অনুধাবিত হচ্ছে না।
তখনই পাঁচ-ছয় বছরের একটা বাচ্চা কোথেকে যেন উড়ে এসে জুড়ে বসল। বাচ্চাটা কার্লার জামা ধরে টানতে থাকল। তারপর পিচ্চিটা বলল, ‘এই যে।’
পিচ্চির প্রধান আকর্ষণ কার্লার মনযোগ পাওয়া। পরে জানা গেল, ছেলেটা অনুষ্ঠান তত্ত্বাবধায়কের ছোটো ছেলে ‘উইলি’, দেখতেও প্রচণ্ড মায়াবী।
কার্লা নিজেকে গুছিয়ে নিল। হাঁটু গেড়ে বাচ্চাটার সামনে বসল সে। হাসিমুখে বাচ্চাটাকে টেনে নিল নিজের দিকে। তারপর বলল, ‘বাহ! বাহ! বাহ!’
শুধু বাহ বাহ বলেই কার্লা থামেনি। বরং বাচ্চাটাকে আলতো করে ধরল, আদর করল একটুখানি।
মেয়েটা আবার বলল, ‘হেই, উইলি, মায়ের অনুষ্ঠানটা কেমন উপভোগ করছো, বাবা?’
শিশু উইলির চোখেমুখে আনন্দের ঝলকানিতে ভরে উঠল। বাচ্চাটা দৌড়ে চলে গেল অন্যদিকে। আমি আর কার্লা আবার পুরনো কথাবার্তায় ফিরে এলাম। অলরেডি কার্লার সাথে ৪-৫ জন বড় বড় ব্যক্তির মৌখিক পরিচয় হয়ে গেছে এর মাঝেই। তার ছোট্ট করে অনুমোদন সূচক হাসিতে কেউই সামনে এগিয়ে আসেনি।
আর এলেও সেটা বেশিক্ষণ আগায়নি।
আমি আন্তে ডাকলাম, ‘কার্লা।’
কার্লা গভীরভাবে তাকাল, ‘বলো, লেইল?’
‘বেশ কয়েকজন তোমার সাথে কথা বলার আগ্রহ দেখিয়েছে, কিন্তু, কেউই আর সামনে এসে কথা বলেনি। তুমি কি বিষয়টা খেয়াল করেছো?’
‘হ্যাঁ, লেইল। আমিও ব্যাপারটা দেখেছি।’
আমি আরেকটু ক্লিয়ার করে বললাম, ‘তুমি সবাইকে দেখেই ছোট্ট করে হাসলে। তোমার কি মনে হয় না, তোমার হাসিতে কোথাও কমতি আছে? অথবা তুমি চাচ্ছো না যে, কেউ কথা বলুক?’
কার্লা আমার দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। সে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াল, ‘আমি চাই তারা কথা বলুক। আমার কী-বা করার আছে?’
আমি পরবর্তীতে বাচ্চাটাকে দেখিয়ে বললাম, ‘এই যে উইলি তোমার সামনে আসতেই কী হাসিটাই না ফুটালে! মনে হচ্ছিল হাসির বন্যা বয়ে যাচ্ছে তোমার ভেতর থেকে! তোমার হাসি উইলিও কতটা পছন্দ করেছে। অথচ সেই একই তুমি এত বড় বড় ব্যক্তিদের শুধুমাত্র ছোট্ট করে হেসে মন জয় করতে চাচ্ছো? কেন তুমি সেই হাসিটা দিচ্ছ না, যেটা উইলির জন্য দিয়েছো? কেন তুমিই একটু এগিয়ে গিয়ে কারো কাঁধে হাত রাখছো না, যেমনটা উইলির জন্য রেখেছো?’
মেয়েটা বিস্ফোরিত চোখে তাকাল। কী যেন নিজে নিজে বিড়বিড় করে উঠল। আমার মাথা ঠিক আছে কি না, এটাই ভাবছে বোধহয়?
কার্লা চোখ বড় বড় করে জবাব দিল, ‘তুমি এমনটাই চাচ্ছো, লেইল? এটা একেবারে অসম্ভব। আমি পারব না। বাচ্চা আর বড় মানুষের মাঝে পার্থক্য আছে, ব্যাপারটা তুমিও বুঝো।’
আমি অনুরোধের সুরে বললাম, ‘শুধুমাত্র একবার। প্লিজ, কার্লা।’
ঠিক তখনই আরেকজন ভদ্রলোক কার্লার দিকে তাকিয়ে হাসল। কার্লা প্রতিক্রিয়ায় বড় করে হাসিতে মেতে উঠল। লোকটার দিকে নিজে থেকে এগিয়ে গেল। হেসে বলল, ‘আমি কার্লা, আর ও আমার বান্ধবী লেইল।’
‘হাই, আমি জনসন।’ হেসে বললেন ভদ্রলোক।
‘চাইলে আমাদের সাথে আড্ডায় যোগ দিতে পারেন।’ কার্লা আগ বাড়িয়ে বলল।
ভদ্রলোক দ্বিতীয়বার ভাবলেন না। বরং সাথে সাথে আমাদের সাথে আড্ডায় যুক্ত হলেন। খুব হাসিখুশি, সুন্দরভাবে সব চলতে লাগল। ভদ্রলোকের কার্লার প্রতি আগ্রহ দেখে, সময় বুঝে ওখান থেকে কেটে পড়লাম। অনুষ্ঠান শেষে যখন কার্লা জনসনের হাতে নিজের হাত জড়িয়ে যেভাবে যাচ্ছিল, কে বলবে তারা সদ্য বন্ধুত্বে জড়িয়েছে? অথচ ছোট্ট একটা কৌশল কীভাবে কার্লাকে অপূর্ব অবস্থানে নিয়ে গেল।’
এই কার্যকরী কৌশলটি ঠিক এখান থেকেই জন্ম নিল।
কৌশল ৫
বড়দের কৌশল
যাদের সাথেই তোমার নতুন পরিচয় হচ্ছে, তাদের সবার ক্ষেত্রেই এই কৌশলটা অনেক কার্যকরী। নিজেকে তার সামনে খোলামেলাভাবে উপস্থাপন করো। কেউ যদি তোমার প্রতি হালকাও আগ্রহ দেখায়, তুমি দ্বিগুণ আগ্রহ দেখাও, লম্বা করে হেসে তার দিকে এগিয়ে যাও। তোমার প্রতিক্রিয়া দেখে সে যেন নিজেকে নিজেই বলে ওঠে, “এই ব্যক্তিটির কাছে আমি নিশ্চিত, ‘স্পেশাল’ কেউ একজন।”
পর্ব ৬
হেই, পুরনো বন্ধু
যে গুপ্ত জ্ঞান তোমায় পছন্দনীয় করে তুলবে
জিগ নামের এক ভদ্রলোকের সাথে আমার পরিচয় আছে। তিনি সকলের কাছে জ্ঞানী মানুষ হিসেবে সুপরিচিত। ব্যক্তি জীবনে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন।
স্লিগ একদিন আমায় জানালেন, মানুষ যত জ্ঞানীই হোক, যতক্ষণ না সে অন্যদের বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয় ততক্ষণ অন্যরাও তার কথা শুনতে আগ্রহী হয় না।
অর্থাৎ তুমি যত জ্ঞানীই হও না কেন, তোমার উচিত তোমার শ্রোতাকে বুঝতে দেওয়া যে, তুমি তাকে পছন্দ করো। এরপর তোমার কথাগুলো তাকে বলো। দেখবে সে খুব মনযোগ দিয়ে তোমার প্রতিটি কথা শুনছে। মানবদেহ ঠিক চব্বিশ ঘন্টার সংবাদ চ্যানেলের মতো। যা তুমি দেখাতে চাইবে তাই লোকজন দেখবে।
তুমি যখন দাঁতের সাহায্যে ঝুলে পড়ো কৌশলটি ব্যবহার করবে, এটা তোমাকে সম্মান অর্জন করতে সাহায্য করবে। তোমার হাসির বন্যা বড়দের কৌশল অন্যদের ভাবতে বাধ্য করাবে, তারা তোমার কাছে ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এবং আঠালো চাহনি কৌশলটি তোমাকে তাদের হৃদয়ে জায়গা করে দেবে।
এগুলোর পরেও তোমার বাড়তি কিছু করার আছে। আর সেটা হলো তোমার সমস্ত দেহের, প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে ঠিকভাবে ফুটিয়ে তোলা যেন শুধু মুখেই নয়, তোমার সমস্ত শরীর বলতে থাকে- ‘হেই, তুমি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ কেউ।’
আমরা যখনই নতুন ব্যক্তির সাক্ষাৎ পাই, আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করে দেয়। শেক্সপিয়রের জুলিয়াস সিজারকে মনে আছে তো? সে ক্যাসিয়াস নামেও পরিচিত ছিল। সিজার সব সময় একটু ঝুঁকে এবং ক্ষুধাতুর চোখে তাকাত। তাকে সব সময় চিন্তিত দেখাত। এই গুণগুলো জুলিয়াসকে করে তুলেছিল অত্যন্ত ভয়ংকর। অর্থাৎ বোঝা গেল, আমাদের ব্রেইন আমাদের নানাবিধ নির্দেশনা প্রদান করে, যখনই আমরা নতুন কারো সাথে পরিচিত হতে যাই।
আমরা অনেক সময় অতিরিক্ত চিন্তা-ভাবনা করতে গিয়ে মানুষের সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তা করে ফেলি অথবা নিজেদের বন্ধুত্ব করা থেকে বিরত রাখি, যা খুবই হতাশাজনক। হোক সেটা প্রেম ঘটিত, হোক সেটা সাধারণ বন্ধুত্বে।
যে সময়টা আমরা কারো সাথে কথা বলি, প্রায় ১০ হাজারের মতো আলাদা আলাদা প্রতিক্রিয়া আমাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ধরা দেয়, যা আমাদের সম্পর্ক উন্নয়নে অনেক বড় ভূমিকা রাখে। তুমি যদি তোমার স্বতঃস্ফূর্ত শারীরিক ভঙ্গিমা ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হও, সেটা অনেক ক্ষেত্রে তোমাকে কম আকর্ষণীয় করে তুলবে। এখনই মনযোগ দাও যে, কীভাবে তুমি স্বতঃস্ফূর্ত শারীরিক অঙ্গভঙ্গি ফোটাতে পারো। মনে রাখবে, তোমার লজ্জা এবং ভয় তোমার শারীরিক ভঙ্গিমার প্রবাহে অন্যতম বাধা।
তোমরা কি খুঁজে দেখেছো, ঠিক কোন সময়টাতে আমরা লজ্জা, নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনার তোয়াক্কা না করে কথা বলে যাই? একবারের জন্যও কি এসব চিন্তা মাথায় আসেনি?
হ্যাঁ, ঠিক ধরেছো; যখন আমরা একা থাকি অথবা এমন মানুষদের আশপাশে থাকি যাদের আমরা অনেকদিন ধরে চিনি, তখন কোনো কিছুর তোয়াক্কাই করি না।
এই যেমন তোমার প্রিয় বন্ধুরা, তাদের সাথে কথা বলতে গিয়ে তুমি যেভাবে মন চায় সেভাবে মন খুলে হাসো, হাত নাড়াচাড়া করো, চোখের আকৃতি ছোটো-বড় করো, একজন আরেকজনের কাঁধে হাত বাড়িয়ে দাও, অথচ একবারের জন্যও তোমার লজ্জা কিংবা ভয় কাজ করছে না! এটাই স্বতঃস্ফূর্ত বডি ল্যাঙ্গুয়েজ।
যেভাবে তোমার শরীরকে সবকিছু সঠিকভাবে করার প্রশিক্ষণ দেবে
এখন আমরা জানব কীভাবে আমরা কল্পনা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এই স্বতঃস্ফূর্ততা বজায় রাখব, স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলব। যেমনটা আমরা বলি আমাদের অতি পরিচিত ব্যক্তিদের সাথে।
এই অংশে আমরা একটা মাইন্ড গেম খেলি। আমাদের খেলাটা হচ্ছে, নিজের মস্তিষ্ককে ধোঁকা দেওয়া।
ধরো তোমার সামনে একজন অপরিচিত ব্যক্তি আছেন, যার সাথে তুমি প্রাণ খুলে কথা বলতে চাও। নিজেকে নিজে কল্পনা করো, সামনের ব্যক্তিটি তোমার হারিয়ে যাওয়া সেই বন্ধুটি, যাকে তুমি অনলাইন, অফলাইনে সব জায়গায় খুঁজে ফিরেছো। কোথাও পাওনি তাকে।
তোমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি, তোমার সেই পরিচিত বন্ধুটি, এমনটাই তোমার মস্তিষ্ককে বুঝ দিতে পারবে? তারপর পূর্ব পরিচিত মানুষের মতো মানুষটার সাথে মিশে যাও। দেখবে তোমার ভয় নিতান্ত অমূলক। আমি এই কার্যকরী কৌশলটিকে নাম দিয়েছি ‘হাই, পুরনো বন্ধু’।
অবশ্যই সবার আগে সতর্কতা জেনে নেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ। তোমরা উক্ত কৌশল শুনেই নিশ্চয়ই কাউকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলবে না, ‘কী হে, এতদিন কোথায় ছিলে?’ কিংবা ‘তোমায় খুঁজতে খুঁজতে আমি হয়রান। বাছা আবশেষে তুমি ধরা পড়েছো!’
বরং তুমি মস্তিষ্কে খুশির ফোয়ারা বজায় রাখো এবং তার সামনে নিজেকে তুলে ধরে বলো, ‘হ্যালো, আমি কেভিন, কেমন আছেন? আমার বাসা… আপনার পরিচয়টা জানতে পারি?’
যে সময়টাতে তুমি এমনটা ঘটাবে, তোমার ভেতরটা আনন্দে ভেসে যাবে। দেখবে, তোমার শারীরিক অঙ্গভঙ্গিমা আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে। আমি মজার ছলে অনেককে বলি, এমনভাবে নিজেকে প্রকাশ করো, যদি বৈদ্যুতিক বাতি হও তবে নতুন সঙ্গীকে আলোকিত করো, যদি কুকুর হও তবে লেজ নাড়িয়ে নিজের মনের অবস্থা প্রকাশ করো। যেভাবেই হোক তুমি প্রকাশ করে যাও। তুমি অনুভব করতে পারবে, নতুন পরিচিত, পরিচিতা তোমাকে বিশেষ মর্যাদা দিচ্ছে।
কৌশল ৬
হেই, পুরনো বন্ধু
যখন নতুন কারো সাথে দেখা হয় এবং তুমি তার সাথে কথা বলতে আগ্রহী, সুন্দর করে তার সামনে এগিয়ে যাও। সমস্ত ভয় এবং লজ্জা ঝেড়ে ফেলে তোমার মাথায় এটাই সেট করে নাও, সামনের মানুষটি তোমার একজন পুরোনো বন্ধু। যাকে তুমি অনেকদিন ধরে খুঁজে ফিরছো। ঠিক সেইভাবে বন্ধুর মতো চিন্তা করে কথা বলতে থাকো।
দেখবে তোমার মস্তিষ্ক তোমাকে কত সুন্দর মুহূর্ত তৈরি করতে সাহায্য করছে! তোমার পুরো শরীরই যেন আলাদাভাবে কথা বলছে।
আমার একটা অনুষ্ঠানে আমি কয়েকজন অপরিচিত ব্যক্তিকে দাঁড় করিয়ে দিলাম পরস্পরের সাথে কথা বলতে। তারা ভালোই চেষ্টা চালাল। তাদের কথাবার্তা তেমন জমলো না। কিন্তু এর পরের ঘটনায় আমি তাদের মাইন্ড সেট করতে বললাম, এখন যার সাথে দেখা হবে, সে তোমার পূর্ব পরিচিত সেই বন্ধুটি যাকে তুমি জীবনের একটা অংশে হারিয়ে ফেলেছো। যাকে এখনো তুমি খুঁজে বেড়াও। এটা মাথায় নিয়ে তারা অপরিচিত কয়েকজনের সাথে কথা বলা শুরু করল। আশ্চর্য ফলাফল দেখা গেল! কিছুক্ষণের মাঝে পুরো কক্ষে হইচই শুরু হয়ে গেল। যেমনটা অনেকদিন পর বন্ধুদের দেখা হলে বন্ধুদের বড় জটলা, হই-হুল্লোড় দেখা দেয় তেমনটা এখানে ঘটছে!
একটা শব্দও উচ্চারণ করার প্রয়োজন নেই
এতক্ষণ আমরা এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা করলাম যেখানে একজন আরেকজনের মুখের ভাষা বুঝি। কিন্তু যদি এমনটা হয় যে, আমি ভিন্ন একটা দেশে ভ্রমণে গেলাম এবং তারা আমার ভাষা জানে না। আবার আমিও তাদের ভাষা বুঝি না! তখনও কি এই কৌশল কাজ করবে? এমনটাই তোমাদের অনেকে এখন ভেবে চলেছো তো?
উত্তরটা হচ্ছে, হ্যাঁ, কাজ করবে। এমন অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তোমার মুখের ভাষা তারা একদমই বুঝতে পারছে না কিন্তু তোমার শরীরের অঙ্গভঙ্গি দেখে তারা অনেকটাই বুঝে নিচ্ছে তুমি কী বোঝাতে চাইছো? আমার ব্যক্তি জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই বলি; আমি প্রায়শই বিভিন্ন দেশে ঘুরতে যাই। যেসব জায়গায় আমার ইংরেজি কাজে দেয়নি সেখানে আমি আমার বডি ল্যাঙ্গুয়েজের সর্বোত্তম ব্যবহার করেছি। একবার আমার ইউরোপ যাত্রার শেষে আমার ইউরোপীয় বন্ধু চোখ বড় বড় করে জানাল, ওখানে থাকাকালীন আমি যাদের সাথে দেখা করেছি তারা আমার খুবই প্রশংসা করেছে। তাদের ভাষ্যমতে, ‘এমন মিশুক আমেরিকান তারা পূর্বে দেখেননি!’
অথচ আমার সাথে তাদের কোনো কথাই হয়নি! কারণ ওরা ইংরেজি বুঝে না। এ থেকে বোঝাই যাচ্ছে মানুষের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ কতটা কার্যকরী।
নিজেকে পরিপূর্ণতা দেওয়ার পথ
এডেলফি ইউনিভার্সিটি একটা গবেষণার আয়োজন করেছে। তাদের গবেষণার বিষয়বস্তু হচ্ছে মানুষের গতিপ্রকৃতি। কিছু স্বেচ্ছাসেবক পাওয়া গেল। তাদের বলা হলো, অপরিচিত কিছু মানুষের সাথে মিশতে এবং কথা বলতে। প্রথম অংশে অপরিচিত ব্যক্তিটি সম্পর্কে স্বেচ্ছাসেবকদের পজিটিভ ধারণা দেওয়া হলো। তাদের বলা হলো, অপরিচিত ব্যক্তিটিকে মন থেকে পছন্দ করতে। তারা অচেনা আগন্তুককে না দেখেই পছন্দ করার মানসিকতা নিয়ে পরিচিত হলো, কথা বলল। এবং দ্বিতীয় সমীক্ষায় তাদের এমন ব্যক্তিদের সাথে পরিচিত হতে হয়েছে, যাদের পছন্দ করার ‘শর্ত’টা যুক্ত করা হয়নি। দুটো গবেষণার ফলাফল সামনে এলে দেখা যায়, যেখানে কাউকে পছন্দ করে এই মাইন্ডসেট নিয়ে স্বেচ্ছাসেবকরা এগিয়েছে সেখানে তাদের সম্পর্ক হয়েছে আকর্ষণীয়। কথাবার্তা সব দিক থেকেই প্রচুর সাড়া মিলেছে। বিপরীতে যেখানে মাইন্ডসেট ছিল না সেখানে সম্পর্ক খুব একটা আগাতে দেখা যায়নি। স্বেচ্ছাসেবীরাও নিজেদের অনাগ্রহ দেখিয়েছেন।
সুতরাং বন্ধুরা, আশা করি তোমরা বুঝে গেছো, এখন তোমাদের কী করতে হবে। হ্যাঁ, অবশ্যই অনেক বেশি অনুশীলন করতে হবে।
পর্ব ৭
ছটফটানি কমাও
কীভাবে শতভাগ বিশ্বাসযোগ্য হবে?
আমার এক বান্ধবী রয়েছে, নাম হেলেন। হেলেন বিভিন্ন কোম্পানিকে উপযুক্ত কর্মী খুঁজে পেতে সাহায্য করে। সে বেশ নাম ডাক কুড়িয়েছে তার কর্মক্ষেত্রে। আমি একবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কীভাবে যোগ্য কর্মী খুঁজে বের করো, তাও মাত্র একটা ইন্টারভিউ নিয়েই?’
হেলেন আমার প্রশ্নে চমকালো না। সে বোধহয় আমার দিক থেকে এমন প্রশ্নই আশা করছিল। ও একটা অর্থপূর্ণ হাসি দিয়ে বলল, ‘আমি তো কোনো কর্মী নির্বাচন করি না! আমি জাস্ট কোন কর্মী কী কী মিথ্যা বলছে, সেটা কোম্পানিকে জানিয়ে দেই। ব্যাস।’
হেলেনের কথার অর্থ আমি ধরতে পেরেছি। কিন্তু প্রার্থীদের কে সত্য বলছে, কে মিথ্যা বলছে তা বের করা এত সোজা নয়। হেলেন আমার অবস্থা দেখে নিজেই জবাবটা দিল, ‘অস্থির হবার কিছু নেই, লেইল। আমি বলছি কীভাবে আমি এটা করি…’
একটু থেমে হেলেন শুরু করে, ‘সেবার আমি এক ভদ্রমহিলার ইন্টারভিউ নিচ্ছিলাম, যিনি কি না একটা ফার্ম হাউজের মার্কেটিং ডিরেক্টর পদের জন্য আবেদন করেছেন। ভদ্রমহিলা এসে খুবই স্বাভাবিকভাবে বসেছেন। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে গেছেন। তিনি কেমন বেতন আশা করছেন এটাও খুব স্বাভাবিকভাবে জবাব দিলেন। বিপত্তি দেখা দিল যখন আমি জানতে চাইলাম, তিনি কেন পূর্বের চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছেন?’
আমার বন্ধুটি আমার দিকে এক নজর দেখে বাকি অংশ বলতে আরম্ভ করল, ‘আমার এমন প্রশ্নে চাকরিপ্রার্থী ভদ্রমহিলা কিছুটা ভড়কে গেছেন। তার হাত-পা নাড়াচাড়া শুরু করলেন। আমার সাথে সঠিক চোখাচোখি যা এতক্ষণ হচ্ছিল, সেটাও ভেঙে গেল। তিনি এক পায়ের উপর আরেক পা ছড়িয়ে নিলেন। এবং সর্বশেষ নিজের হাতটা মুখে স্পর্শ করলেন।’
হেলেনের ইশারা আমাকে ঘোর থেকে বের করল। হেলেন জানতে চাইল, ‘এ থেকে
তুমি কী বুঝলে, লেইল?’
আমি ব্যাপারটা তার উপরেই ছেড়ে দিলাম। বাকিটা শুনে আমার মতামত জানাব বলে রাজি হলাম।
হেলেনও বলে মজা পাচ্ছে। সে বলল, ‘তার এসব অদ্ভুত শারীরিক ভঙ্গিমা দেখে আমার বোঝা শেষ, তিনি আমার মন গলানোর বৃথা একটা চেষ্টা চালালেন, জানালেন আগের কোম্পানিতে তিনি যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা পেতেন না। তাই তিনি একই পদে এই কোম্পানিতে কাজ করতে আগ্রহী হয়েছেন। তার মুখের কথা এবং তার শারীরিক অঙ্গভঙ্গিমা সম্পূর্ণ বিপরীত। তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজই বলে দিচ্ছে, তিনি সত্য লুকোচ্ছেন! বিশেষ করে তার ছটফটানি বেশ চোখে লাগছে। আমি তাই প্রসঙ্গ পরিবর্তন করলাম। জানতে চাইলাম, তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? এবার তিনি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন, ছটফটানি বন্ধ হয়ে গেল! হাত, মুখ থেকে নেমে স্বাভাবিক হলো। তিনি পা ছড়িয়ে বসলেন। তারপর জানালেন, তিনি এই কোম্পানির মতো একটা ছোট্ট কোম্পানিতেই থাকতে চান, যেখানে হাতে কলমে বিভিন্ন কাজ করার সুযোগ পাবেন।’
আমি আবার আগের প্রসঙ্গে ফিরে এলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘পূর্বের চাকরিতে পদোন্নতির সম্ভাবনা কম ছিল, শুধুমাত্র এই কারণেই কি তিনি চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছেন?’ তার আবার হঠাৎ ছটফটানি দেখা দিল। আমার সাথে চোখাচোখি আবার বন্ধ হয়ে গেল! তিনি এক হাত দিয়ে আরেক হাতের উপরে নাড়াচাড়া শুরু করে দিলেন। হ্যাঁ, বিশেষ করে পা দুটো আবার গুটিয়ে ফেললেন।
হেলেন ততক্ষণ পর্যন্ত নিজের প্রশ্ন চালাল যতক্ষণ না প্রার্থী সঠিক তথ্য দিয়েছেন। সবশেষে আসল কথাটি বেরিয়ে আসে। ভদ্রমহিলার আগের কোম্পানির মার্কেটিং ডিরেক্টর তাকে এমন কু-প্রস্তাব দিয়েছেন যা তিনি কখনোই রাখতে পারবেন না। ফলে তিনি চাকরিটা ছাড়তে বাধ্য হন।
ঠিক এই কারণেই হিউম্যান রিসোর্স বা মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগে, পুলিশ বিভাগে যারা কর্মরত আছেন, তাদের মানুষের আচার-আচরণ এবং বডি ল্যাঙ্গুয়েজ রিড করার মতো পারদর্শী হতে হয়। যে যত পারদর্শী, সে ততই চতুর।
হেলেন আরো জানাল, তার এক কলিগ, যে কি না এক ব্যক্তির ইন্টারভিউ নিয়েছেন। অদ্ভুতভাবে ওই ব্যক্তি সব প্রশ্নের সোজাসাপ্টা জবাব দিলেও তার ঠিক মনঃপূত হয়নি। সে তার এমন সব সাফল্যের গল্প বলছিল যা তার বলার কনফিডেন্টের সাথে ঠিক মিলছিল না। কোথায় যেন ঘাটতি থেকে গেছে!
সে সকল প্রশ্নের জবাবই তার চোখের দিকে তাকিয়ে দিয়েছে। তার শারীরিক অঙ্গভঙ্গি তাকে সব বলতে সাহায্য করেছে। কিন্তু তবুও কোথাও যেন কিছু একটা মিসিং যাচ্ছিল। ঠিক মিলছিল না!
কোম্পানির বড় কর্তারা মাঝেমধ্যে এসব বুঝতে পারেন। কিন্তু চাইলেই কারো দিকে আঙুল তুলে অভিযোগ করা এবং তা প্রমাণ করা যায় না! এজন্যই অনেক বড় বড় কোম্পানিকে দেখা যায় লাই ডিটেক্টর মেশিনের সাহায্য নিতে। তারা কর্মী নিয়োগপূর্বক এই মেশিনের মধ্য দিয়ে যেতে দেয়, দেখতে চায় কর্মীরা কোনো সত্য গোপন করে কি না! লাই ডিটেক্টর মেশিন এমন একটি যন্ত্র যেটি তোমার ব্লাড প্রেশার, শ্বাস-প্রশ্বাস, হার্টবিট, ঘেমে যাওয়া এবং অন্য সব শারীরিক অনুভূতিজনিত ব্যাপারগুলো বিশ্লেষণ করে তথ্য প্রদান করে যে, সে সত্য কি বা মিথ্যা বলছে।
এফবিআই, পুলিশ, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এ কারণেই লাই ডিটেক্টর মেশিন ইউজ করে। এটি যদিও সরাসরি নির্দেশ করে না কে মিথ্যা বলছে অথবা কে সত্য বলছে, কিন্তু যেসব তথ্য দেয় ওসব বিশ্লেষণ করে খুব সহজেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধরে ফেলা যায় সত্য-মিথ্যার অবস্থান।
এই পদ্ধতি কি শতভাগ কার্যকরী? বলা চলে। বিশেষ করে যেসব মানুষ মিথ্যা বলতে খুব বেশি অভ্যস্ত নয় কিংবা যারা ইমোশনে গিয়ে মিথ্যা বলে না, তাদের ক্ষেত্রে খুবই কার্যকরী। তবে তুমি যদি মিথ্যা বলার জন্য ট্রেইনড হও, সেক্ষেত্রে এই যন্ত্রকে বোকা বানানো কঠিন কিছু না।
সত্যের সাথে মিথ্যা মেশাবে না, সর্বদা সত্য বলো
একমাত্র মিথ্যা বলার সময়েই আমরা সমস্যার সম্মুখীন হই ব্যাপারটা পুরোপুরি সত্য নয়। সত্য বলতে গেলেও অনেক সময় আমরা অতিরিক্ত ছটফট করি, বিশেষ করে যখন আবেগতাড়িত হয়ে উঠি অথবা কারো কাছ থেকে ভয় পেয়ে বসি। এই যেমন, এমন একজন ব্যক্তির সামনে আমি দাঁড়িয়ে, যাকে আমি সমীহ করি! কল্পনা করো, একজন পুরুষ তার সফলতার গল্প বলছেন এমন নারীকে, যিনি দেখতে অত্যধিক সুন্দরী। যাকে দেখলে ভেতরটা ধুক ধুক করে ওঠে! এমন পরিস্থিতিতে তার উল্টাপাল্টা শারীরিক অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করে ফেলার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
আবার ধরো একজন নারী কর্মী তার কোম্পানির পরবর্তী পদক্ষেপ এমন একজন ক্লায়েন্টের কাছে তুলে ধরছেন, যেই ব্যক্তিটি খুবই গম্ভীর। এমন পরিস্থিতিতেও ব্যাপারটা ঘটতে পারে।
এ জাতীয় সমস্যা আরো বড় হতে পারে যখন তুমি অনুভব করবে, চারদিকের তাপমাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। যা তোমার দ্বারা সহ্য করা যাচ্ছে না। গরম সহ্য করতে না পেরে দেখা গেলো উদ্ভট শারীরিক অঙ্গভঙ্গি করে বসলে! অথবা খোলা ময়দানে তোমার বক্তৃতা চলছে, হঠাৎ তীব্র বাতাসের সাথে ধুলোবালি এসে সবটা পরিবর্তন করে দিল। তুমি নিজেকে ঠিক রেখে বক্তৃতা দিচ্ছ, কিন্তু শ্রোতাদের মনে হতে লাগল তুমি ভুল বলছো, অথবা মিথ্যা বলছো। কারণটা খুবই স্বাভাবিক। তোমার শরীর আর মুখ একটা আরেকটাকে সাহায্য করছে না।
অভিজ্ঞ ও বাকপটু ব্যক্তিরা কখনোই প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা প্রাকৃতিক ব্যাপারগুলোকে আমলে নেয় না। হোক সেটা তীব্র গরম কিংবা তীব্র বাতাস। তারা জানে বারবার মুখে হাত নেওয়া, হাত দিয়ে ঘাম মোছা, শরীর চুলকানো, নিজেকে দর্শকের সামনে অনাগ্রহী করে তুলবে। এজন্যই পেশাদার বক্তারা ছোটোখাটো ব্যাপারগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে নিজের কার্যসিদ্ধি ঘটান, হোক সেটা গরম কিংবা শীত!
এই বিষয়ে একটা স্মরণীয় ঘটনা উল্লেখ করা যাক। ১৯৬০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, রিচার্ড মিলহোয়াস নিক্সনের সাথে জন ফিজাল্ড ক্যানেডির একটি লাইভ টেলিভিশন বিতর্ক হয়। ওটা যেনতেন কোনো বিতর্ক নয়। বরং অ্যামেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচন বিষয়ক বিতর্ক। রাজনৈতিক বোদ্ধাদের দাবি ছিল নিক্সনের অপরিপক্ব সাজসজ্জা, তার অতিরিক্ত ছটফটানি এবং বারবার চোখের ভ্রুর ঘাম মোছার প্রবণতা তাকে ক্যামেরা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এবং নির্বাচনে অদ্ভুতভাবে নিক্সন হেরে যান!
কৌশল ৭
ছটফটানি কমাও
বিশেষ করে যখন তুমি কারো সাথে কথা বলছো, ওই সময়ে তোমার নাক চুলকাচ্ছে, কানে কেমন জানি লাগছে কিংবা পায়ের পাতা চুলকাচ্ছে, এসব হলে তুমি ছটফট করতে থাকো। এবং হাত, নাক, কান চুলকাতে আরম্ভ করো। ফলস্বরূপ তুমি তোমার কথা থেকে বিচ্যুত হও। মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং ভাবে, তুমি তাদের গুল মারছো। তাই অবশ্যই কথা বলার সময়ে ছটফট করা বন্ধ করে দাও। একটু সহ্য করে নিতেই হবে। তুমি যদি একটু সহ্য ক্ষমতা অর্জন করো, মানুষ তোমার কথা গুরুত্ব দিয়েই শুনবে।
পর্ব ৮
হ্যানস নামের ঘোড়াটির বোধশক্তি
মানুষ বলতে বাধ্য হবে তোমার আন্দাজ ক্ষমতা ঘোড়ার মতো প্রখর
হ্যানস নামের একটা ধূর্ত ঘোড়ার কথা বলব এই অংশে, যার থেকে নিম্নে উল্লেখিত কৌশলটার জন্ম হলো…
হার্বন ওস্টেন নামক ব্যক্তিটির মালিকানায় ছিলো হ্যানস। বার্লিনের একটি শহরে বসবাস ছিল তার।
হার্বন, পোষা ঘোড়া হ্যানসকে পাটিগণিতের এমন কিছু বিষয় শেখাতে সমর্থ হয়েছিল যা উনিশ শতকের ইউরোপে একটি তাজ্জব ব্যাপার হিসেবে রটে গিয়েছিল। হ্যানসই একমাত্র পশু হিসেবে আবির্ভূত হলো, যে কি না নিজের সামনের দুই পা এবং ক্ষুরের সমন্বয়ে পাটিগণিতের নানা দিক সমাধান করতে পারত।
হার্বন ওস্টেন, হেনসকে আরো অনেক কিছুই শিখিয়ে ফেলেছিল ইতোমধ্যে। যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ হ্যানসের জন্য কোনো ব্যাপারই ছিল না। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপারটা দেখা দিল, যখন হ্যানস তার মালিকের কোনো ইশারা বা শব্দ না শুনেই নিজ থেকে উপস্থিত মানুষের সংখ্যা গণনা করতে পারল! এমনকি কতজন মানুষ চোখে গ্লাস পরে আছে, তাও হ্যানস বলে দিতে পারত। উৎসাহী জনতার প্রশ্নের উত্তরও ঘোড়াটা দেওয়া শুরু করল সময়ের সাথে সাথে!
হ্যানস এতটাই প্রশিক্ষিত হয়ে গেল যে, সে মানুষের জানা-অজানা নানা বিষয়ও রপ্ত করতে আরম্ভ করল। পাটিগণিতকে সাধারণ বিষয় হিসেবে না হয় ধরে নেয়া যায়। অথচ ঘোড়াটা পাটিগণিতের অধ্যায় পার করে অন্যান্য ব্যাপারগুলোতেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর ছড়িয়ে দিল।
ইংরেজি বর্ণমালা, সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় একটা ঘোড়া মনে রাখতে পারছে, এর চেয়ে বিস্ময়কর কিছু তৎকালীন ইউরোপে ছিল বলে মনে হয় না।
হ্যানস কোথাও থেমে যায়নি। তার মালিক যেদিকেই তাকে শেখাতে লাগল, সেটাই সে লুফে নিচ্ছিল। এমন চালাক ঘোড়া এ পৃথিবীর কেউ দেখেনি।
ঘোড়াটা নিজের সামনের দুই ক্ষুরের সাহায্যে ইতিহাস, ভূগোল থেকে শুরু করে মানুষের সৃষ্টি সংক্রান্ত জীববিজ্ঞানের সাধারণ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারত। স্বাভাবিকভাবে হ্যানসের কথা ছড়িয়ে গেল দেশে দেশে। সে কী এক আশ্চর্য ঘোড়া!
হ্যানস হয়ে উঠল মিডিয়ার তুমুল আলোচনার বিষয়। ইউরোপজুড়ে পার্টি থেকে রেস্তোরাঁ সব জায়গায় হ্যানসকে নিয়ে আলোচনা বেশ জমে উঠল। অবস্থা এতই বেগতিক হয়ে উঠল যে বিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী এবং ঘোড়াবিদদের ঘুম হারাম হবার উপক্রম। তারা কত কত ভাবে প্রমাণ করতে চাইল, সব কিছু ভাওতাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু… সকলেই হ্যানসের সামনে নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ল।
কত কত অঞ্চলের বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করতে থাকল হ্যানসের এই আশ্চার্য গুণগুলো। অধিকাংশই বিশ্বাস করতে পারছিল না ব্যাপারটা। সবাই এটা এক বাক্যে স্বীকার করে নিল, হ্যানস খুবই ধূর্ত। একটা ঘোড়া এতটা ধূর্ত হতে পারে এটা ভাবা যায় না।
হ্যানসের অধ্যায়টা একটু সময়ের জন্য বন্ধ রেখে আমরা বাস্তবে ফিরি। তবে দেখতে পাই আমাদের আশপাশে, যাদের আমরা অন্যদের থেকে ‘উপরে’ অথবা ‘কেউ একজন’ হিসেবে বিশেষায়িত করি, তারা কিন্তু আমাদের থেকে খুব বেশি আলাদা নয়।
প্রত্যেকটা মানুষের সমান সংখ্যক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকার পরেও কেউ কেউ ঠিকই আমাদের উপরের চেয়ারটা দখল করে বসে আছেন। সমাজের মানুষ তাদের গুরুত্বপূর্ণ কেউ বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে। তারা অন্যদের থেকে আলাদা, ঠিক অন্যদের থেকে একটু বেশি গ্রহণযোগ্য।
এসব গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া ব্যক্তিদের ভালো করে পর্যবেক্ষণ করেছো? তারা অনেক বেশি জ্ঞানধর্মী কথা বলেন এমনটাও না। আমাদের মতো সাধারণ বিষয় নিয়েই কথা বলেন। অথচ তাদের কথা মানুষজন মন্ত্রমুগ্ধের মতো শোনেন। কিছু সময় আমরাই তাদের নানা সর্বনামে ভূষিত করি।
এই যেমন-
-মেয়েটা চাবুকের মতো শক্তিশালী।
-সে কখনোই ভুল করে না।
-এই মেয়েটা সবকিছুতেই পারদর্শী। এমন গুণ সব সময় দেখা যায় না।
এ জাতীয় শব্দগুলো আজকাল আমাদের মুখের বুলি হিসেবে ধরা দিয়েছে। আরো কিছু বিশেষণ মানুষের মুখে শোভা পায়। যেমন-
-সে সব সময় সঠিক জিনিসটাই খুঁজে পায়।
-মেয়েটির আন্দাজ শক্তি ঘোড়ার মতো প্রখর।
বিশেষণগুলো ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে দেখো তো। এই সবগুলো বিশেষণই কিন্তু হ্যানসের কাহিনির পর থেকে প্রচলিত হয়েছে।
আবার হ্যানসের কাছে ফেরা যাক।
অবশেষে দিনটি এসেই পড়ল। হ্যানসকে আলাদাভাবে নিয়ে বিশেষ অনুসন্ধান শুরু হলো। অনুসন্ধানকারীরা অতিরিক্ত আশাবাদী যে তারা খুব সহজেই কিছু গোপন ট্রিকস বের করে ফেলবেন, যা হ্যানসের মালিক হার্বন ওস্টেন ব্যবহার করে মানুষদের ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছেন। অনুসন্ধান দলের মধ্যে যেমন কিছু গবেষক ছিলেন, তেমনই কিছু ঘোড়ার মালিকও ছিলেন। তারা খুব ভালো করেই জানেন কীভাবে ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাদের ধারণা হ্যানসের নিজস্ব ক্ষমতা বলে কিছুই নেই। সবটাই হার্বনের ছলচাতুরি।
উৎসাহি সাংবাদিক, ঘোড়াপ্রেমীসহ নানা শ্রেণির উৎসুক জনতা ভিড় করতে শুরু করল ওখানে। হ্যানসকে একেবারে তার মালিকের সংস্পর্শ ছাড়াই পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। হার্বন ওস্টেনও এতে বাধা দিলেন না।
গবেষণা কমিশনের সবাই মালিক হার্বনকে ওখান থেকে চলে যেতে বলল। তিনি সাথে সাথে চলে গেলেন, যাতে তাদের পরীক্ষায় তার কোনো প্রভাব না পড়ে।
অনেকের ধারণা ছিলো হার্বন যেতে চাইবেন না। কিন্তু সে সত্যিই সবাইকে অবাক করে ওই স্থান ত্যাগ করলেন। বেচারা হ্যানস, মালিকের এভাবে চলে যাওয়া অসহায় চোখে দেখতে থাকল।
পরীক্ষকরা হ্যানসকে প্রথম পরীক্ষার সামনে ফেললেন। একটা গাণিতিক সমস্যা ঘোড়াটার সামনে উপস্থিত হলো। সবার মনে একই প্রশ্ন উকি দিচ্ছে, ওটা কি মালিকের অনুপস্থিতিতে এর জবাব দিতে পারবে?
অবিশ্বাস্য! হ্যানস তার মালিকের সাহচর্য ছাড়াই উত্তর দিয়ে দিল নিজের দুই ক্ষুরের ইশারায়। তারপর একে একে দ্বিতীয়, তৃতীয় প্রশ্ন করা হলো। হ্যানসের নির্ভুল উত্তর। পরীক্ষকরা এবার নড়েচড়ে বসলেন।
যারা এতদিন সমালোচনা করে আসছিলেন, তারা সবাই চুপ হয়ে গেলেন। হ্যানস যেন তাদের মুখে চপেটাঘাত করে বসেছে! একেকজন লজ্জায় লাল হয়ে গেলেন, একটা ঘোড়া তাদের এমন লাঞ্ছনার স্বাদ দিল!
অন্যদিকে উৎসুক জনতার পালে আরো হাওয়া লাগল। তারা বিজয়ীর বেশে চেঁচাতে লাগল। কেউ কেউ তো সমালোচকদের ক্ষেপাতে আরম্ভ করে দিল, ‘এখন? এখন?’
প্রথম অনুসন্ধানকারী দলটি যখন হ্যানসকে স্বীকৃতি দিল, চারদিকে আরো হইচই পড়ে গেল। হ্যানস আর শুধু ইউরোপের জন্য বিস্ময় হয়ে থাকেনি বরং বাকি বিশ্বের জন্য বিস্ময় হিসেবে দেখা দিল!
দ্বিতীয় পরীক্ষক দলেও আগের মতো বিভিন্ন ভার্সিটির প্রফেসর, বিজ্ঞানী, পশু বিজ্ঞানী এবং ঘোড়ার প্রশিক্ষকদের সমন্বয় ঘটল।
এই ঘোড়াটা কীভাবে এসব প্রশ্নের নির্ভুল জবাব দেয়? তবে কি ঘোড়াটা সত্যিই গণিত বুঝে, কেউ কেউ নিজেদের প্রশ্ন করল।
দ্বিতীয় পরীক্ষক দল এগিয়ে এল। তারা ছোট্ট একটা বুদ্ধি খাটাল, যা ইতোপূর্বে কারো মাথায় আসেনি। পূর্বের পরীক্ষকদের মতো জোরে শব্দ করে কোনো প্রশ্নই করেনি এই দলটি। একজন হ্যানসের কানে কানে প্রশ্নটা ছড়ে দেয়। ঘোড়াটা অসহায়ের মতো চারদিকে তাকাল।
উপস্থিত দর্শকদের কেউই এবার প্রশ্নটি শুনতে পায়নি। তাই সবাই চুপচাপ হ্যানসের উত্তরের আশায় ওদিকে মনযোগ দিল।
চারদিকে সুনসান নীরবতা। সবাইকে অবাক এবং চরম হতাশ করে দিয়ে হ্যানস দাঁড়িয়ে রইল! হ্যানস উত্তর দিতে ব্যর্থ হলো? দর্শকদের মাঝে এক করুণ সুর বেজে উঠল।
তার মানে হ্যানসের কাছে এই গাণিতিক যোগফলের উত্তর নেই? পরীক্ষক দলের মুখে ফুটে এলো বিজয়ীর হাসি। তারা বুঝে গেছেন হ্যানস কীভাবে নির্ভুল উত্তর দিয়ে গেছে এতদিন! কীভাবে বোকা বানিয়েছে বাঘা বাঘা সব ব্যক্তিদের।
তোমাদের কী ধারণা? কীভাবে হ্যানস নামের ঘোড়াটি এত সব বিষয়ের নির্ভুল জবাব দিয়ে গেছে? বলতে পারবে? আর এখনই বা কেন সে উত্তর দিতে ব্যর্থ হলো?
আসলে ঘোড়াটা গণিত-ফনিত কিছুই বুঝত না। ঘোড়া কি আর মানুষের ভাষা বোঝে! কিন্তু তাহলে এতদিন কীভাবে এসব উত্তর দিয়ে গেল? প্রশ্নটা সবার মনেই উকি দিচ্ছে। হ্যানস এখানেই তার বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। সঠিক উত্তর ঘোড়াটা না জানলেও ওর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ছিল মারাত্মক লেভেলের।
ওটার সামনে রাখা উত্তরগুলোর মাঝে যেটা ভুল, সেটার দিকে যখনই সে ক্ষুর তুলত উপস্থিত দর্শক একটা হতাশ ভাব করত। তাদের চেহারা এবং প্রতিক্রিয়া দেখে হ্যানস বুঝে নিত ওটা ভুল উত্তর। আবার যখন সে সঠিক উত্তরের দিকে ক্ষুর তুলত তখন দর্শকরা খুশিতে নিজেদের হাত-পা ছোড়াছুড়ি করত। অনেকে খুশিতে চেঁচাত, হ্যানস বুঝে নিত ওটাই আসল উত্তর।
নিশ্চয়ই এতক্ষণে তোমরা সবাই হ্যানসের সফলতার এই কৌশলটা বুঝে নিয়েছো।
এই চমৎকার কৌশলটিকে আমি নাম দিয়েছি হ্যানস নামের ঘোড়াটির বোধশক্তি। সে তার দর্শকদের প্রতিক্রিয়া খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষক করে তার প্রতিক্রিয়া দেখাত, যা ছিল পুরোপুরি সফল।
একটা ঘোড়া ওটা করতে পারলে তুমি কেন নও?
তুমি কি শব্দ ছাড়া কখনো টিভি দেখেছো? হঠাৎ করে একটা ফোনকল এলো, আর ওপাশ থেকে তোমার বাবার কণ্ঠ শুনতে পেলে, ‘টিভির শব্দটা একটু বন্ধ রাখো,
একটা ফোনকল এসেছে।’
অমনি না চাইতেও তোমাকে সাউন্ড অফ করে মিউট করে দিতে হলো। মিউট করার পরেও তুমি যদি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে থাকো, তবে দেখবে এখনো টিভিতে চলা দৃশ্যপট স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। অভিনেতাদের হাতের নাড়াচাড়া, তাদের মুখের ভঙ্গি, ভ্রু কুঁচকানো, অট্টহাসি ইত্যাদি তোমাকে স্পষ্ট বলে দিচ্ছে তারা ঠিক কী বোঝাতে চাচ্ছে। তুমি কারো সাথে ফোনে কথা বলা অবস্থায়ও যদি টিভিতে চোখ রাখো, তবে স্পষ্ট প্রতিটি ঘটনার মোড় বুঝে যাবে। হ্যানসের ঘোড়ার কৌশলটা ঠিক তেমনই। শুধু ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে অন্যরা কী করছে, কীভাবে করছে। তোমাকে বলে দেওয়া লাগবে না, বরং তুমি নিজেই সঠিক উত্তর
খুঁজে নিতে পারবে। তারা কি হাসছে? তারা কি মাথা ঝাঁকাচ্ছে? তারা কি হাত নাড়াচ্ছে? তারা ওসবই করছে যা তারা শুনছে।
তারা কি চোখের ভ্রু কুঞ্চিত করছে? তারা কি দূরে কোথাও তাকিয়ে আছে? তারা কি হাত-পা ভাঁজ করে রেখেছে? এর উত্তর হতে পারে, না।
তারা কি তাদের গলা চুলকাচ্ছে?
তারা কি পেছনের দিকে ফিরে আসছে?
হতে পারে তারা এখান থেকে সরে পড়তে চায়।
তোমার শারীরিক অঙ্গভঙ্গি চেনার জন্য কোনো প্রশিক্ষণ নেওয়া লাগবে না। বরং আমরা সবাই-ই জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে অনুভব করি অপর ব্যক্তি আমার কথা না শুনে দূরে তাকিয়ে আছে। আমার থেকে পেছনে সরে যাচ্ছে। বুঝে নাও তারা কথা এগিয়ে নেওয়ার প্রতি আগ্রহী নয়।
যখন তোমার শ্রোতা তোমার থেকে সরে পড়তে চায়, দেখবে, সে ঘাড় চুলকাচ্ছে। অথবা পেছনে সরে এসেছে। তার মুখে বিরক্তি।
এসব বুঝতে রকেট সায়েন্স জানা লাগে না। নিজেই বুঝে ফেলবে তোমার কোন কথাটা, কে কীভাবে নিচ্ছে।
কৌশল নাম্বার ৭৭-এ আমরা এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানব।
কৌশল ৮
হ্যানস নামের ঘোড়াটির বোধশক্তি
নিজের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আরো বাড়িয়ে নাও। যখন কথা বলছো, তখন নিজের এই সেন্সটাও কাজে লাগাও যে, মানুষের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কী তোমার কথা শুনে? তাদের প্রতিক্রিয়া বুঝে সামনে আগাও।
সবচেয়ে বড় ব্যাপার, একটা ঘোড়া যদি মানুষের প্রতিক্রিয়া বুঝে তার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, তুমি আমি মানুষ হয়ে কেন পারব না? যদি তুমি এই গুণটা অর্জন করতে পারো তবে দেখবে, মানুষই তোমার সুনাম করবে। তারা বলবে তুমি সর্বক্ষেত্রেই হুঁশিয়ার। কেউ কেউ তো মুখের উপরেই বলে দেবে, ‘ও সব সময়ই সঠিকটা বেছে নেয়। ওর সেন্স ক্ষমতা মারাত্মক।’
পর্ব ৯
কোনো কিছু করার পূর্বে অন্তত একবার পুরোটা কল্পনার চোখে দেখে নাও
কীভাবে নিশ্চিত হবে যে একটুও বাদ যায়নি?
বরফের উপরে স্কাইয়িং কখনো টিভিতে দেখার সুযোগ হয়েছে? যদি হয়ে থাকে তবে খেয়াল করে দেখেছো, পাহাড়ের উপরটায় যেই খেলোয়াড়টি স্কাইয়িং শুরুর সংকেতের জন্য অপেক্ষায় আছে, তার শারীরিক ভাষা? সে যদিও গুলির শব্দের প্রতীক্ষায় রয়েছে, কিন্তু ভেতর থেকে সে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। সে নিজেকে কল্পনায় অনুশীলন করে নিচ্ছে কত দ্রুত সে স্কাইয়িং করে নামছে। কতটা প্রাণবন্ত তার গতি, কীভাবে দারুণ সব জায়গা সবার আগে পার হয়ে যাচ্ছে, এটাই তার একমাত্র ধ্যান হয়ে আছে। অথচ আমরা শুধুমাত্র তাকে অপেক্ষা করতে দেখছি।
সব ধরনের খেলোয়াড়ই এমনটা করে, যেমন- রেসিং গাড়ির চালক, বর্শা নিক্ষেপকারী, দৌড়বিদ, সাঁতাড়ু, স্কাইয়ার এবং স্ক্যাটার থেকে শুরু করে পিস্তল শুটার সবাই। প্রত্যেকেই খেলা শুরুর পূর্বে কল্পনায় অনুশীলন সেরে নেয়, যেখানে সে ছুটে চলে দুরন্ত গতিতে, পানির গন্ধ, ঘাসের গন্ধ কিংবা নিঃশ্বাসের শব্দও ওরা অনুভব করতে পারে। জাম্পার যেমন মাটিতে সঠিকভাবে অবতরণের কল্পনা করে, সাঁতারু তেমনই অসীম তেজে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ার কল্পনায় বিভোর থাকে। সবার কল্পনার শেষটা পুরোপুরি একই। নিজেকে বিজয়ীর আসনে দেখতে পাওয়া।
স্পোর্টস সাইকোলজিস্টদের মতে, খেলার পূর্বে এই কাল্পনিক অনুশীলন প্রায় সকল শ্রেণির খেলোয়াড়ই করেন। হোক তিনি তুখোড় কিংবা কম পারদর্শী।
তাদের মতে আসন্ন খেলার মুহূর্তটা যদি তুমি কল্পনায় অনুভব করতে পারো, এই যেমন, তুমি যদি ক্রিকেটার হও তবে তোমার শর্টটা কীভাবে নিচ্ছো তা অনুভব করছো, গলফ প্লেয়ার ঘাসের ঘনত্ব অনুভব করছে কিংবা দৌড়বিদ মাটি অনুভব করছে, তবে এটা তোমার খেলায় ভালো প্রভাব ফেলবে। তোমাকে মানসিকভাবে অনেকটা এগিয়ে রাখবে।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে ছাব্বিশ মাইল!
নিশ্চয়ই আমাকে পাগল মনে হচ্ছে? বিছানায় শুয়ে শুয়ে কীভাবে ছাব্বিশ মাইল অতিক্রম করা যায়! এটাই ভাবছো তো? এমনটাই ঘটেছিল আমার বন্ধু রিচার্ডের সাথে। রিচার্ড একজন ম্যারাথন দৌড়বিদ। বেচারা কত কত অনুশীলন করে গেল নিউইয়র্ক ম্যারাথন প্রতিযোগিতার জন্য। অথচ প্রতিযোগিতার সপ্তাহখানেক আগে সে কার এক্সিডেন্ট করে! ভয়াবহ কোনো ইঞ্জুরি না হলেও তাকে দুই সপ্তাহ বিছানায় বিশ্রাম নিতে বলা হয়। কোনোভাবেই দুই সপ্তাহের পূর্বে তার সুস্থ হওয়া সম্ভব নয়, ডাক্তার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। আমরাও হতাশ হয়ে গেলাম। ওকে বেশি বেশি সমবেদনা জানালাম। এছাড়া আমাদের করারও বেশি কিছু ছিল না।
প্রতিযোগিতার দিন আমাদের সবার চোখ যেন আকাশে উঠে গেল। আমরা বিস্ময়ের সুরে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘রিচার্ড, তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? তোমার তো বিছানায় থাকার কথা!’
রিচার্ড দৌড়ের জন্য স্পেশাল জুতো, জামা সব পরে চলে এসেছে। ওকে আটকে রাখার সাধ্য কার? এই অবস্থায় কেউ ম্যারাথনের মতো প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়?
রিচার্ড মনে হচ্ছে খুব স্বাভাবিকভাবে ব্যাপারটা নিয়েছে। সে আন্তে বলল, ‘তোমাদের চোখে হয়ত আমি বিছানায় পড়ে ছিলাম। সত্য। কিন্তু আমি প্রতিদিন বিছানায় শুয়ে শুয়েই ২৬ মাইল, ৩৮৫ গজ দৌড়েছি। আমি প্রতিদিন দৌড়ানোর কল্পনা করেছি। প্রতিটি রাউন্ড আমি সম্পন্ন করেছি, হোক না সেটা কল্পনায়।’
বুঝলাম বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছে। ম্যারাথনের একজন প্রতিযোগীর মতো সে দৌড়েছে তার কল্পনায়। তাকে দেখে মনে হচ্ছে কল্পনায় হলেও সে বাস্তবের চেয়ে কম আশাবাদী নয়!
রিচার্ড বিজয়ীর বেশে পুরো সবটা রাউন্ড লড়ে গেছে। প্রতিযোগিতা শেষে দেখা গেল সে খুবই স্বাভাবিক। কোনো ধরনের চোট কিংবা দুর্বলতা তার মধ্যে দেখা গেল না। আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম! এমন অবস্থায় ও কীভাবে এত সাহস পেল আমি এখনো কল্পনা করলে থমকে দাঁড়াই। রিচার্ড আমাদের কাছে একটা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়ে গেছে।
কোনো কিছু করার পূর্বে তা কল্পনায় অনুশীলন করে নেওয়াটা কত কার্যকরী, সেক্ষেত্রে রিচার্ডের এই ঘটনার চেয়ে আর ভালো কোনো উদাহরণ হতে পারে?
কৌশল ৯
কোনো কিছু করার পূর্বে অন্তত একবার পুরোটা কল্পনার চোখে দেখে নাও
অনুশীলনের যেমন বিকল্প নেই, তেমনি মানসিক অনুশীলনেরও বিকল্প নেই। তুমি যেকোনো কিছু করার পূর্বে যদি কল্পনায় সেটা একবার অনুশীলন করে নাও তবে তোমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাবে। তোমার কল্পনার অনুশীলনে তোমার হাতের নাড়াচাড়া, মুখের হাসি, নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাওয়া একটা ভালো লক্ষণ। আর যদি তুমি সত্যিই প্রতিযোগিতার মঞ্চে নিজেকে অনুভব করতে পারো তবে বুঝে নিতে হবে তুমি কয়েক কদম সামনে এগিয়ে আছ।
