Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    গজনবীর দেশ থেকে সোমনাথের পথে

    July 15, 2026

    ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে

    July 15, 2026

    আদর্শ বিবাহ ও দাম্পত্য – আব্দুল হামীদ ফাইযী

    July 15, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ৩ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত এক পাতা গল্প305 Mins Read0
    ⤷

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ৩.১

    ১

    নরেন্দ্রনাথের পিতা বিশ্বনাথ দত্ত হঠাৎ মারা গেলেন।

    বরানগরে ভবনাথ চাটুজ্জের বাড়িতে নেমন্তন্ন ছিল নরেনের। বিকেল থেকেই আড্ডা জমিয়েছে সেখানে। সঙ্গে বন্ধু সাতকড়ি লাহিড়ি আর দাশরথি সান্ন্যাল।

    রাত দুটো, চার বন্ধু ঘুমিয়েছে একসঙ্গে, খবর এসে পৌঁছল, বাবা আর নেই। হার্ট ফেল করে মারা গিয়েছেন।

    আরামশয্যা থেকে উন্মুলিত হল নরেন। প্রথমটা সম্মুঢ় হয়ে গেল। জীবনের প্রথম প্রতিবেশী মৃত্যুকে দেখলে। যে অপেক্ষা করে না, কিছুমাত্র কৈফিয়ত শোনে না, সবলে কেশ আকর্ষণ করে টেনে নিয়ে যায়।

    ছুটল ঘরের দিকে। ভবনাথ বললে, ‘দাঁড়াও, আমিও যাচ্ছি।’

    ‘জন্মান্তরে তুই নরেনের জীবনসঙ্গিনী ছিলি বোধ হয়।’ ভবনাথকে নিয়ে রহস্য করেন ঠাকুর।

    এমনি ভাব নরেনের সঙ্গে। গাছের সঙ্গে যেমন ছায়া। একটি পাতা যেন ফুলের বৃন্তে।

    ‘ভবনাথ, বাবুরাম—এদের প্রকৃতি ভাব।’ বলেন ঠাকুর: ‘আর হরীশ তো মেয়ের কাপড় পরে শোয়। বাবুরাম বলেছে ঐ ভাবটা ভালো লাগে। ভবনাথেরও তাই।’ যে যে-ভাবে আছে, যার যে-ভাব ভালো লাগে। স্ব-ভাবটিই আসল ভাব। আমার অঙ্কে মাথা, আমি সাহিত্য দিয়ে কি করবো। আমার চিত্রে অভিরুচি, আমি চাই না মসীজীবী হতে। স্বভাব কখনো বর্জনীয় নয়। স্বভাবে নিধনও শ্রেয়।

    শুধু একটু বাঁক ঘুরিয়ে দেওয়া। কামকে প্রেম করা। ক্রোধকে তেজ করা। লোভকে ব্যাকুলতায় নিয়ে যাওয়া। অবন্ধন স্রোত থেকে বন্দরে নৌকো ভেড়ানো। শুধু একজনকে বা একটাকে ধরো। যাকে ভালো লাগে, যাকে ভালোবাসি, যাকে ভাবলে অন্তর-বাহির আলোকিত হয়ে ওঠে। ভাবো তো ডুবে গিয়ে ভাবো। ধরো তো পাকা করে ধরো। নড়নচড়ন নেই, ছাড়ানছোড়ান নেই।

    ‘ভাব কি জানো?” বললেন ঠাকুর, ‘তাঁর সঙ্গে একটা সম্বন্ধ পাতানো। সেইটে সর্বক্ষণ মনে রাখা। যেমন তাঁর দাস আমি, তাঁর সন্তান আমি, তাঁর অংশ আমি। প্রথম অবস্থায় তুমি-টুমি, ভাব বাড়লে তুই মুই। যেমন ধরো, নষ্ট মেয়ে। পরপুরুষকে প্রথম-প্রথম ভালোবাসতে শিখছে, তখন কত লুকোলুকি, কত ভয়, কত লজ্জা। তারপর যেই ভাব বেড়ে উঠল, তখন আর কিছু নেই—একেবারে তার হাত ধরে সকলের সামনে কুলের বাইরে এসে দাঁড়াল। তখন যদি সে পুরুষ আদর-যত্ন না করে, ছেড়ে যেতে চায়, তো তার গলায় কাপড় দিয়ে টেনে ধরে বলে, তোর জন্যে পথে দাঁড়ালুম, এখন তুই খেতে দিবি কিনা বল্। তেমনি যে ভগবানের জন্যে সব ছেড়েছে, তাঁকে আপনার করে নিয়েছে, সে তাঁর উপর জোর করে বলে, তোর জন্যে সব ছাড়লুম, এখন দেখা দিবি কিনা বল্।’

    কালীবাড়ির নবতে বাজনা শোনা যাচ্ছে।

    ঠাকুর বলছেন কেশব সেনকে, ‘দেখলে কেমন সুন্দর বাজনা! একজন পোঁ করছে, আরেকজন নানা সুরের লহরী তুলে কত রাগরাগিণীর আলাপ করছে। আমারও ঐ ভাব। আমার সাত ফোকর থাকতে শুধু কেন পোঁ করব—কেন শুধু সোহহং সোহহং করব! আমি সাত ফোকরে নানা রাগরাগিণী বাজাব। কেন শুধু ব্রহ্ম-ব্রহ্ম করব! শান্ত দাস্য বাৎসল্য সখ্য মাধূর্য—সব ভাবে ডাকব। আনন্দ করব বিলাস করব।’

    হায়, রুদ্ধরন্ধ্র বাঁশি হয়ে পড়ে আছি। নানা অহঙ্কারে আর মোহে ফোকরগুলি বন্ধ হয়ে আছে। তাই আর বাজছে না একটাও। ছিদ্র যদি না শূন্য হয়, বাজবে কি করে? দরজা যদি না মুক্ত হয় আসবে কি করে সে অতিথি-পথিক?

    তাই, ‘শূন্য করিয়া রাখ তোর বাঁশি, বাজাবার যিনি বাজাবেন আসি।’ পূর্ণ করা সোজা, শূন্য করাই তপস্যা।

    ভবনাথ যে দক্ষিণেশ্বরে আসে তার বাড়ির লোক পছন্দ করে না। তার চেয়ে ব্রাহ্ম-সমাজে যে নাম লিখিয়েছে সে অনেক ভালো। কিন্তু প্রাণ জানে তার টানের কথা।

    ‘তুই এত দেরিতে-দেরিতে আসিস কেন?”

    ‘আজ্ঞে, পনেরোদিন অন্তর দেখা করি।’ ভবনাথ হাসল। ‘সেদিন আপনি নিজে রাস্তায় দেখা দিলেন, তাই আর আসিনি।’

    ‘সে কি রে?’ ঠাকুর ফোড়ন দিলেন: ‘শুধু দর্শনে কি হয়? স্পর্শন, আলাপ, এ সবও চাই।’

    তোমাকে দেখব অথচ তোমাকে ধরতে পারব না এ সইব কি করে? তুমি আমার মুখোমুখি বসবে অথচ কথা কইবে না এ যে আমার মরণাধিক যন্ত্রণা। শুধু চোখের উপর চোখ রাখলেই চলবে না, আমার হাতের উপর তোমার হাত রাখো। আর আমার বুকের মধ্যে তোমার পা দুখানি।

    কি করে তোমার কৃপা আকর্ষণ করব তাই ভাবি। কায়দা-কানুন কিছই জানি না, শুধু কর্ম দিয়েছ দুহাত ভরে, তাই করে যাচ্ছি উদয়াস্ত। ক্লান্ত করছি নিজেকে, যদি তোমার দক্ষিণ সমীরের আনন্দটি অহেতুক এসে স্পর্শ করে। যদি তুমি একখানি হাত সন্তর্পণে তুলে ধরো। তখন এক হাতে তোমাকে ধরব আরেক হাতে কাজ করব। কখন আবার আরেকখানি হাতও তুলে নেবে। তখন হাতে ধরব তোমাকে। আর কোনো সাধন-ভজন জানি না আমরা। কর্ম আর ক্লান্তি—এই আমাদের সাধন-ভজন।

    ‘ভবনাথ নরেন্দ্রের জুড়ি—দুজনে যেন স্ত্রী-পুরুষ।’ বললেন ঠাকুর, ‘তাই ভবনাথকে নরেন্দ্রের কাছে বাসা করতে বললুম। ওরা দুজনেই অরূপের ঘর।’

    হরি-নামের মাহাত্ম্যের কথা হচ্ছিল সেদিন। ঠাকুর বললেন, ‘যিনি পাপ হরণ করেন তিনিই হরি। হরি ত্রিতাপ হরণ করেন।’

    ভবনাথ বললে, ‘হরিনামে আমার গা যেন খালি হয়।’

    সব অহঙ্কারের পোশাক যেন খুলে দিতে পারি গা থেকে। যেন মা’র কোলে নগ্ন শিশু হয়ে খেলা করতে পারি। অহঙ্কার করছি, কিন্তু এ অহংটি কার? ঠাকুর বললেন, ‘মান করাতে একজন সখী বলেছিল, শ্রীমতীর অহঙ্কার হয়েছে। বৃন্দে বললে, এ অহং কার? এ তাঁরই অহং। কৃষ্ণগরবে গরবিনী।

    চৈতন্যদেব অবতার হয়ে যেকালে হরিনাম প্রচার করেছিলেন সেকালে এ অবশ্য ভালো—এই বলেও অন্তত লেগে যাক সকলে। যদি চৈতন্যমন্ত্রেও চৈতন্য হয়। রসিকতা করলেন ঠাকুর: ‘চাষারা নিমন্ত্রণ খাচ্ছে। তাদের জিজ্ঞেস করা হল, তোমরা আমড়ার অম্বল খাবে? তারা বললে, যদি বাবুরা খেয়ে থাকেন তা হলে আমাদের দেবেন। তাঁরা যেকালে খেয়ে গেছেন সেকালে ভালোই হয়েছে।’

    ‘কিন্তু যাই বলো,’ বললেন ঠাকুর, ‘আমি নরেন্দ্রকে আত্মার স্বরূপ বলে জ্ঞান করি। আর আমি ওর অনুগত।’

    অনুগত তো, কী সুরাহা হল নরেন্দ্রের! বাবার মৃত্যুতে জগৎ-সংসার নিবে গেল এক ফুঁয়ে। সৌভাগ্যের ঝাড়-লণ্ঠনটা মৃত্যুর পাথরের উপর ছিঁড়ে পড়ে চুরমার হয়ে গেল। সংসার সরতে সরতে থমকে দাঁড়াল পাতালের গুহামুখে। ছোট-ছোট ভাই আর মা, পাঁচ-সাতটি আর্ত মুখ তাকিয়ে রয়েছে নরেনের দিকে! বাবা এটর্নি ছিলেন, রেখে যাননি সংস্থান? দূরস্থ আত্মীয় পালন করে-করে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। রেখে গেছেন ঋণ। আয়ের ঘরে শস্যহীন মাঠ, ব্যয়ের ঘরে লবণাক্ত বন্যা। সেবার বি-এ দিয়েছে নরেন। কত রঙিন ভাবনার ফোঁড়-সেলাই করে বিচিত্র করে রেখেছিল জীবনের নক্সা। সব ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। আর সব আচ্ছাদনের আগে গ্রাসাচ্ছাদন। উদরপূরণ না হলে উদার অম্বর অর্থহীন। কিন্তু উদরপূরণের ব্যবস্থা কি! সঞ্চিত টাকা নেই, জমিদারি নেই, কৃপালু আত্মীয়-রক্ষক কেউ নেই আশে-পাশে। চারদিকে শুধু একটা নিস্তৃণ মরুবিস্তার। থাকবার মধ্যে আছে এই নগ্ন পদ আর দৃপ্ত বাহু।

    ‘আর কেউ নেই?’ কে যেন জিজ্ঞেস করল কানে-কানে।

    তুমি আছ? করুণানিধান হয়ে আছ? কে জানে! আছো তো, এত দুঃখ কেন, দারিদ্র্য কেন, কেন এত অপ্রতিকার অবিচার?

    পায়ে জুতো নেই, গায়ে একটা আস্ত জামা নেই, চাকরির জন্যে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াতে লাগল। এ আফিস থেকে ও আফিস, এ দরজা থেকে ও দরজা। সর্বত্র এক উত্তর। এক নিরুত্তর নিশ্ছিদ্র প্রত্যাখ্যান। হবে না, জায়গা নেই, পথ দেখ। পাথরে দেয়ালে মাথা ঠুকতে লাগল, ঠেলতে লাগল লৌহদুয়ার। নিশ্চল নিষেধ রয়েছে দাঁড়িয়ে-দুর্ধর্ষ ঔদাসীন্য। এতটুকু টলে না, এতটুকু পথ ছাড়ে না। মধ্যাহ্নের রৌদ্রে কেউ আনে না এতটুকু ছায়া-স্নেহ। রাশি-রাশি নৈরাশ্যের বালুকায় শুধু বৈফল্যের অনাবৃষ্টি।

    বন্ধুরা মুখ ঘুরিয়ে নেয়, সুখীরা সহানুভূতি করতে আসে, আর অপরিচিত জনস্রোত ফিরেও তাকায় না। সর্বত্রই একটা নীতিহীন অসামঞ্জস্য। একটা পাগলের খামখেয়াল।

    তবে কি তিনি নেই? এ সমস্ত কি একটা দায়িত্বহীন দানবের রচনা?

    আর কার কাছে প্রার্থনা করবে? নিজের কাছেই প্রার্থনা করে নরেন। আশ্রয় নেয় আত্মশক্তির তরুতলে। দৃঢ়হাতে সরিয়ে দেব এ দুর্দিনের যবনিকা। উচ্ছেদ করব এ দুঃখ-দুর্যোগের আবর্জনা। ওঁ সহোহসি সহং ময়ি থেহি। ওঁ মন্যুরসি মন্যুং ময়ি ধেহি। তুমি সহনশক্তির ঘনীভূত মূর্তি, আমাকে সহিষ্ণুতা দাও। তুমি অন্যায়ের প্রতি ক্রোধস্বরূপ দণ্ডদাতা, আমাকে অন্যায়ের প্রতি ক্রোধ ও অন্যায়ের প্রতিরোধের শক্তি দাও।

    শুধু একটা গাড়োয়ানই বুঝি ডেকে জিজ্ঞেস করে। খালি গাড়ি নিয়ে চলেছে রাস্তা দিয়ে। চেনা গাড়োয়ান। বাবা থাকতে কত দিন চড়েছে ঐ গাড়ি, ভাড়ার উপরে বকশিস দিয়েছে গাড়োয়ানকে–

    ‘বাবু আসুন না! কোথায় যাবেন?’ নুয়ে পড়ে জিজ্ঞেস করল গাড়োয়ান। ‘পয়সা নেই।’

    ‘তাতে কি! আসুন না! আমি নিয়ে যাব।’

    রাজী হয় না নরেন। পায়ের নিচে প্রস্তররুক্ষ পথ পেয়েছি, মাথার উপরে নগ্ন নিষ্ঠুর আকাশ—আমি একাই যেতে পারব দিগন্ত পর্যন্ত।

    ঘোড়ার পিঠে চাবুক কষল গাড়োয়ান। চাবুকের শব্দটা নরেনের বুকে লাগল একটা তীক্ষ্ণ চমকের মতো।

    আমি কোচোয়ান হব। একদিন বলেছিল সে বাবাকে। এ মহাজড়বুদ্ধির দেশটাকে নিয়ে যাব রাজসিক কর্মৈশ্বর্যে। সত্ত্বগুণের ধুয়ো ধরে দেশ নেমে যাচ্ছে তমোময় মহাসমুদ্রে। জন্মালস বৈরাগ্যের লেপ মুড়ি দিয়ে অক্ষম জড়পিণ্ড শুয়ে আছে কুণ্ডলী পাকিয়ে। পরাবিদ্যার ছলনায় ঢাকতে চাচ্ছে নিজের মূর্খতা। ভণ্ডের দল তপস্যার ভান করে অবিবেক আর অবিচারকে মানছে ধর্ম বলে। নিজের আলস্য আর অসামর্থ্যের দিকে লক্ষ্য নেই, অহোরাত্র অন্যের দোষদর্শন। এ তামসী রাত্রির অবসান ঘটাবো, চতুর্দিকে হানব শুধু চেতনার চাবুক, বেগবীর্যহীন তামসিকতার ঘোড়াকে উজ্জীবিত করব দিবস্পতি ইন্দ্রের উচ্চৈঃশ্রবায়।

    হায়, সঙ্কল্পও বুঝি কল্পনা! নইলে তুচ্ছ একটা চাকরিও জোটাতে পাচ্ছি না এত দিন ধরে! পেট ভরিয়ে খাওয়াতে পাচ্ছি না ভাইগুলোকে। মায়ের মুখের বিষাদ ও ক্লান্তির করুণ রেখাটি অটুট হয়ে রয়েছে।

    ‘এ কি, স্নান করে উঠেই চললি কোথায়?’ মা দাঁড়ালেন এসে পথের সামনে: ‘খাবি নে?’ চোখ নামাল নরেন। বললে, ‘বন্ধুর বাড়িতে নেমন্তন্ন আছে।’

    মনে-মনে একটু কি আরাম পেলেন ভুবনেশ্বরী? বাড়িতে আজ পর্যাপ্ত আহার নেই সকলের, হাত শূন্য। এমন অদিনে বাইরে কোথাও নিমন্ত্রণ আছে-সেটা শুধু আস্বাদনীয় নয় আরাধনীয়।

    পথ ছেড়ে দিলেন ভুবনেশ্বরী। শুকনো মুখে বেরিয়ে গেল নরেন। মনে খটকা লাগল। নরেন কি ছলনা করল? তবে কি সে অনশনে থাকবে?

    খালি পায়ে রোদে ঘুরে ঘুরে পায়ের নিচে ফোস্কা পড়েছে। গড়ের মাঠের মনুমেন্টের নিচে বসেছে বিশ্রাম করতে। হঠাৎ এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা। সুখে-শান্তিতে আছে খেয়ে-পরে। সুখে-শান্তিতে আছে বলেই হয়তো ঈশ্বরভক্ত। জানত সব নরেনের কথা। তার ভাগ্যহীন দুঃসময়ের কথা। তার চেষ্টা ও অসাফল্যের কাহিনী। সান্ত্বনা দেবার জন্যে বসল তার পাশটিতে। গান ধরল: ‘বহিছে কৃপাঘন ব্রহ্মনিশ্বাস পবনে—’

    “নে, নে, রাখ তোর ব্রহ্মনিশ্বাস।’ ক্ষোভে অভিমানে ঝাঁজিয়ে উঠল নরেন: ‘যারা খেয়ে-পরে সুখে-সৌভাগ্যে আছে তাদেরই ভালো লাগে ব্রহ্মনিশ্বাস। ইজিচেয়ারে শুয়ে টানাপাখার হাওয়া খাচ্ছে আর ভাবছে, ব্রহ্ম নিশ্বাস খাচ্ছি! আর ক্ষুধার তাড়নায় যার মা-ভাইয়েরা কষ্ট পাচ্ছে, দোরে দোরে ঘুরে একটা যে চাকরি জোটাতে পাচ্ছে না, তার কাছে আর ব্রহ্মনিশ্বাস নেই, বজ্ৰনিশ্বাস!’

    বন্ধুকে অকারণে আঘাত দিল হয়তো। তা আর কি করবে! পেটে ভাত নেই, বলে কিনা আফিঙের মৌতাত চড়াও। কর্ম জোটে না একটা, বলে কি না ধর্ম করো। ঠনঠনের ঈশান মুখুজ্জের বাড়িতে এসেছেন ঠাকুর। সকাল বেলা। মাস্টারমশাই এসে খবর দিলে নরেনকে। বললে, তোমাকে যেতে বলেছেন।

    “গিয়ে কি হবে! চাকরি জুটিয়ে দেবেন একটা? উপবাসী মা-ভাইয়ের মুখে অন্ন তুলে দেবেন? তবু গেল নরেন। প্রণাম করে ঠাকুরের পাশটিতে এসে বসল। ঠাকুরের কেমন চিন্তিত ভাব। সব খবর রেখেছেন আদ্যোপান্ত। নরেনের বাড়ির কষ্টে তাই তিনিও বিমর্ষ। হঠাৎ নরেনের দিকে ঝুঁকে পড়ে বললেন, ‘ঈশানকে তোর কথা বলেছি। অনেকের সঙ্গে তার আলাপ আছে। একটা কিছু যোগাড় হয়ে যাবে হয়তো।’

    কাষ্ঠ হাসি হাসল নরেন। এমনি কত লোকই কত আশ্বাস দিয়েছে এতদিন। শুধ কৃপাঘন ব্রহ্মনিশ্বাসটিই টের পাওয়া যায়নি।

    উপরের ঘরে চলে এসেছেন ঠাকুর। বলছেন মাস্টারকে, ‘সংসারে কিছুই নেই। ঈশানের সংসার ভালো তাই-তা না হলে ছেলেরা যদি রাঁড়খোর গাঁজাখোর মাতাল অবাধ্য এই সব হত, কষ্টের একশেষ হত। সকলেরই ঈশ্বরের দিকে মন-বিদ্যার সংসার! এরূপ প্রায় দেখা যায় না। এরূপ দু-চার বাড়ি দেখলুম। নইলে, কেবল ঝগড়া কোঁদল হিংসা–তারপর রোগ শোক দারিদ্র্য। দেখে বললাম, মা, এইবেলা মোড় ফিরিয়ে দাও।’ একটু থামলেন ঠাকুর। বললেন, ‘এই দেখ না, নরেন্দ্র কি মুশকিলেই পড়েছে! বাপ মারা গেছে, বাড়িতে যেতে পাচ্ছে না, কাজকর্মের এত চেষ্টা করছে, জুটছে না একটাও। এখন কি করে বেড়াচ্ছে দ্যাখো।’ হঠাৎ জনান্তিকে বললেন, ‘তুমি আগে অত যেতে, এখন তত যাও না কেন? পরিবারের সঙ্গে বেশি ভাব হয়েছে বুঝি?”

    নিচে হঠাৎ গান শোনা গেল। কে গায় রে? কার কণ্ঠস্বর?

    এ কি আর চিনতে ভুল হয়? নরেনের গলা। নরেন গান করছে। কী গান করছে? ‘বহিছে কৃপাঘন ব্রহ্মনিশ্বাস পবনে’? না কি ‘ওহে ধ্রুবতারা মম হৃদে জলন্ত বিশ্বাস হে!’

    কে জানে কী গান! ঠাকুর তাকে গান গাইয়ে ছাড়লেন।

    ২

    ঈশ্বর কি শুধু কোমলকান্ত পদাবলী? শুধু কি কলিতললিত বংশীস্বর? বিলাস-আলস্যে সুখে-সমৃদ্ধিতে থাকলেই কি বলব তিনি আছেন? তাঁর আবির্ভাব কি শুধু আরামরম্যতায়? কণ্টক-শয়নে তিনি নেই? নেই কি কোপকর্কশ বজ্রবহ্নিতে? তাঁর আশীর্বাদ কি শুধু ধনমান সাফল্য-স্বাচ্ছন্দ্য? এই আঘাত আর অভাব, সংগ্রাম আর ব্যর্থতা—এ কি নয় তাঁর অনুকম্পা? সুখের পেলবতাটুকুই তাঁর স্পর্শ, দুঃখের কাঠিন্যটুকুই আর তাঁর স্পর্শ নয়?

    হায়, সুখ হচ্ছে চকিতে একটু ছোঁয়া, দুঃখই হচ্ছে নিবিড় আলিঙ্গন।

    যা দেন সব নেব নতশিরে। খরশর হোক, হোক বা পুষ্পবৃষ্টি। জল যেখান থেকেই আসুক, কুম্ভ থেকেই হোক বা কূপ থেকেই হোক, হোক তা খাল-বিলের বা বর্ষা-বাদলের, নেব সব অঞ্জলি ভরে। ঈশ্বর সুখকরও নন দুঃখকরও নন, ঈশ্বর কল্যাণকর। নন শুধু শীতনিবারিণী কাঁথা, তিনি আবার হিমরাত্রির অনাবরণ।

    তাই ঘুম থেকে উঠে ঈশ্বরের নাম করে নরেন।

    পাশের ঘর থেকে একদিন শুনতে পেলেন ভুবনেশ্বরী। ঝাঁজিয়ে উঠলেন, চুপ কর্। ছেলেবেলা থেকেই তো কত ভগবান-ভগবান করলি–ভগবান তো সব করলেন!’ বুকের মধ্যে ধাক্কা খেল নরেন। সর্বংসহা যে মা তিনিও অস্থির হয়েছেন। ভগবান তাঁর কান্নাও কানে নেননি। তবে তাঁকে করুণাময় বলি কি করে? যিনি কল্যাণ করেন তিনি একটু করুণা করতে পারেন না?

    পর-দুঃখে কাতর হয়ে তাই বলেছিলেন বিদ্যাসাগর: ‘ভগবান যদি দয়াময়ই হবেন তবে দুর্ভিক্ষে লাখ-লাখ লোক দুটি অন্নের জন্যে কেঁদে-কেঁদে মরে কেন?” ঠিকই বলেছিলেন। যার ব্যবস্থা করবার ক্ষমতা আছে সে যদি এত কান্নায়ও বিচলিত না হয়, তবে কী বলব? হয় বলব তিনি নেই বা তাঁর ব্যবস্থা করবার ক্ষমতা নেই, কিম্বা বলব তিনি নিশ্চেষ্ট নিষ্ঠুর অনাত্মীয়। কেউ নন তিনি আমাদের।

    এই প্রশ্ন নিয়েই একদিন সটান গিয়েছিল ঠাকুরের কাছে।

    ‘বলুন ঈশ্বর কিসে দয়াময়? দয়াময় তো, এত দুঃখ কেন দিনে-রাত্রে? যারা নিষ্পাপ-নির্দোষ তাদের কেন এত যন্ত্রণা?”

    আয়ত-স্নিগ্ধ চোখে তাকালেন ঠাকুর। বললেন, বোস পাশটিতে। একটু স্তব্ধ হয়ে তাকা একবার রাতের আকাশের দিকে।

    কোথায় রাতের আকাশ! রাতের আকাশের মতই রহস্যগভীর যে দুটি চোখ তার দিকে তাকিয়ে রইল নরেন।

    হ্যাঁ রে, কী দেখছিস? গুঁড়ো-গুঁড়ো কাঁচের টুকরোর মত কত তারা ছড়িয়ে রয়েছে আকাশে গুনতে পারিস? কেউ পারে? একথালা সুপারি, গুনতে নারে বেপারী। তেমনি গুনতে পারিস গঙ্গাপারের কাঁকড়া? চেয়ে দ্যাখ ভালো করে। শর্বরীর নীলাম্বরীতে কুচি-কুচি চুমকি। একটা দুটো নয়, লক্ষ-লক্ষ, হয়তো কোটি-কোটি। তার মধ্যে তোর এই পৃথিবী। হাওয়ায় উড়ে আসা ছোট্ট একটা বালু কণা। সেই পৃথিবীই বা কি কম বড়! হাঁটতে শুরু করলে পথ আর ফুরোয় না একজন্মে। অন্তরীক্ষের প্রেক্ষিতে তোর এই বিশাল পৃথিবীই বা কি। তুচ্ছ একটা কীটাণু। তার মধ্যে আবার তুই! তোর মস্তিষ্ক! তোর হৃৎস্পন্দন!

    নরেন মাথা নোয়াল।

    হ্যাঁ, নত কর মাথা। কার বিচার করবি তুই, কোন আইনে? সেই বিচারদৃষ্টি কতদূরে প্রসারিত করবি? তারপর শেষে আকাশে এসে ঠেকবে না? এই কালো রাত্রির আকাশ? তখন কী বলবি রে নরেন? এতগুলো তারা কেন? কোন ভূতের বাপের পিণ্ডি দিতে? সূর্য-চন্দ্র বুঝি, কিন্তু তারা দিয়ে কি মানুষ ধরে খাবে? কী উত্তর দিবি? যদি বলি ওরা সব চিন্তামণির নাচ-দুয়ারের মণি-মাণিক্য, পারবি মেনে নিতে? বলি, বিচার কতদূর যাবে? শেষে সকল পথ পায়ে হেঁটে দুয়ারে এসে আছড়ে পড়বি! বিচার থা পাবে না।

    না পাক, নোয়াব না মাথা। ঈশ্বরের কাছেও না। নিজের পায়ে দাঁড়াব। লড়ব নয় মরব। আকাশটাকে ছিনিয়ে আনব দুহাতে।

    পূজার ঘর থেকে বেরিয়ে ছেলের সামনে পড়ে গিয়েছেন ভুবনেশ্বরী। যেন ধরা পড়ে গিয়েছেন। যেন জল খাচ্ছিলেন ডুবে-ডুবে। মুখে ঠাট্টা, অন্তরে কান্না। মুখে রাগ, অন্তরে অনুরাগ!

    তাড়াতাড়ি সরে যাচ্ছিলেন ভুবনেশ্বরী। আর কিছুর জন্যে নয়, যে চেলি পরে আহ্নিক-করছিলেন সেটা শতচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল কথাটা: ‘আমাকে একখানা চেলি বা গরদের কাপড় কিনে দিতে পারিস? এটা পরে আর পারা যায় না।’ মাথা হেঁট করল নরেন। কোথায় পাবে সে চেলি-গরদ? সে বেকার, উদয়াস্ত ভূতের বেগার খাটছে। কোথায় পাবে সে পট্টবস্ত্রের পয়সা? লজ্জা মা পাবে কেন, লজ্জা পেল ছেলে। মা’র সম্মুখ থেকে চলে গেল ম্লানমুখে।

    সেইদিনই বিকানির থেকে এক মাড়োয়ারি এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। সঙ্গে মিছরির থালা তার উপরে একখানা গরদের কাপড়। দেখে ঠাকুরের বড় খুশি খুশি ভাব। ডুমো ডুমো মিছরি দিয়ে ভর্তি-করা গরদ-ঢাকা থালা নামিয়ে প্রণাম করল মাড়োয়ারি।

    দু দিন পরে নরেন এসে হাজির। যাকে মানে না সেই আবার টানে। যার নিন্দে তারেই বন্দে।

    ‘শোন, কাছে আয়—’নরেনকে ডাকলেন ঠাকুর।

    নরেন কাছে এল। দাঁড়িয়ে রইল, বসল না।

    ‘শোন, এই মিছরির থালা আর গরদখানা তুই নিয়ে যা’–

    উচ্চশব্দে হেসে উঠল নরেন! পরবার নেংটি নেই দরবারে যেতে চায়! মিছরি দিয়ে আমি কী করব? আমি কি ছোট ছেলে যে মিষ্টি দিয়ে ভোলাবেন? আর গরদ—‘গরদখানা তোর মাকে নিয়ে দে গে। তার আহ্নিক করবার চেলি ছিঁড়ে গিয়েছে। সে এ গরদ পরে আহ্নিক করবে।’

    বুকের মধ্যে ধক করে উঠল নরেনের। তা আপনি কি করে জানলেন? আপনাকে বললে কে?

    ওরে, আমি জানতে পাই। উৎসটি ঠিক থাকলে ধ্বনিটি ঠিক আমার কানে লাগে। দ্রৌপদী বস্ত্রহরণের সময় এক হাতে নিজের কাপড় ধরে আরেক হাত তুলে ডাকছিল কৃষ্ণকে। প্রথম-প্রথম শত কান্নায়ও কৃষ্ণ সাড়া দেয়নি। কিন্তু দ্রৌপদী যখন দু হাত তুলে দিলে, ছেড়ে দিলে, তখনই বস্ত্রভার কাঁধে নিয়ে দাঁড়ালেন শ্রীকৃষ্ণ। যোগক্ষেম বহন করে নিয়ে এলেন। তেমনি যে দু হাত ছেড়ে দিয়ে ডাকে, তাকে তুলে নেন ভগবান। তার ডাকাটি ঠিক।

    ‘শোন, নিয়ে যা গরদখানা। তোর নিজের জন্যে বলছি না, তোর মা’র জন্যে।’

    মা’র জন্যে আপনার কাছে ভিক্ষে করতে যাব কেন?”

    ‘ভিক্ষে?’

    ‘তা ছাড়া আবার কি! মা আমার কাছে চেয়েছেন। আমাকে বলেছেন কিনে দিতে। যখন উপার্জন করতে পারব তখন কিনে দেব। আপনার কাছ থেকে ভিক্ষে করে নেব কেন?”

    নরেনের তেজ দেখে প্রসন্নবয়ানে হাসতে লাগলেন ঠাকুর। বললেন, ‘এই না হলে নরেন! আমরা হলাম নর আর তুই যে নরের ইন্দ্র।’

    কিছুতেই নিল না নরেন। গরদের কাপড় মা’র কত দরকার, আকস্মিক ভাবে পেয়ে গেলে কত খুশি হতেন—তা জেনেও টলল না একচুল। মা আমার কাছে চেয়েছেন, আমি রোজগার করে তা কিনে দেব। কিন্তু হাত পেতে ভিক্ষে নিতে যাব কেন? না, কিছুতেই ভিক্ষে করব না। স্বয়ং ভগবানের কাছেও নয়।

    নরেন চলে গেলে ডাকলেন রামলালকে। বললেন, তোকে একটা কাজ করতে হবে রামনেলো!

    কি কাজ?

    ‘কাল শিগগির করে খেয়ে নিয়ে চলে যাবি কলকাতায়। সেই শিমলেয় নরেনের বাড়িতে। বাইরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে যখন বুঝবি নরেন বাড়িতে নেই, সটান চলে যাবি তার মা’র কাছে। ঠিক তার মা’র হাতে এই গরদখানা আর এই মিছরির থালা পৌঁছে দিয়ে আসবি। বুঝলি? বলবি, আমি পাঠিয়ে দিয়েছি। কি, পারবি তো?”

    পারব।

    “দেখিস বাইরে থেকে যেন ডাকাডাকি করিসনে।’ নরেনকে যেন কত ভয় ঠাকুরের। ‘দেখিস অন্যের হাতে গিয়ে যেন পড়ে না। নরেন টের পেলে দরজা বন্ধ করে দেবে।’ কিন্তু ঠাকুর যখন নিজে নরেনকে খুঁজতে আসেন, বাড়ির ভিতর ঢোকেন না। বাইরে থেকে বলেন, ‘লরেন কোথায়? লরেনকে ডেকে দাও৷’

    কিন্তু রামলালের জন্যে অন্য ব্যবস্থা। তাকে তাগ বুঝে বাড়ির মধ্যে ঢুকতে হবে। ঢুকতে হবে নরেনের দৃষ্টি এড়িয়ে।

    চাদরের তলায় থালা আর কাপড় লুকিয়ে গ্যাসপোষ্টের নিচে দাঁড়িয়ে আছে রামলাল। গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের তিন নম্বর বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে। দুপুরের রোদ উঠে এসেছে মাথার উপর। চারদিক ঝাঁ-ঝাঁ করছে। কখন না-জানি নরেন বেরোয় বাড়ি থেকে। তার দৈনন্দিন চক্রাবর্তে।

    কি হল? নরেন আজ আর বেরুবে না নাকি?

    না, ঐ বেরুচ্ছে। খুলেছে সদর দরজা। মলিন চাদরখানা গায়ে ফেলে চলেছে পথ দিয়ে। অমনি ঐ ফাঁকে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছে রামলাল। একেবারে ভুবনেশ্বরীর ‘দরবারে।

    ‘আপনাকে এই মিছরির থালা আর গরদের কাপড় পাঠিয়ে দিলেন ঠাকুর।’

    গরদের কাপড়! পাঠিয়ে দিলেন লোক দিয়ে! হাসলেন ভুবনেশ্বরী। কি করে জানলেন তিনি? তিনি কি দূরের ভাষা শুনতে পান? শুনতে পান মনের মৌন? বললেন, ‘এইখানে কি কথা হল বিলের সঙ্গে, তাই দক্ষিণেশ্বরে অমনি টেলিগ্রাম হয়ে গেল?’

    কেন হবে না? তিনি খুব কানখড়কে। সব শুনতে পান। যত ডেকেছ যত কেঁদেছ সব শুনেছেন। শুধু কথাটিই শোনেন না, বলতে না পারার ব্যথাটিও শোনেন। এক মুসলমান নমাজের সময় হো আল্লা হো আল্লা বলে খুব চেঁচিয়ে ডাকছিল। একজন তার চীৎকার শুনে বললে, তুই অত চেঁচাচ্ছিস কেন? তিনি যে পিঁপড়ের পায়ের নুপূর শুনতে পান। শুনতে পান তোর অস্ফুটতম দীর্ঘনিশ্বাস।

    নরেন বাড়ি ফিরে এসে দেখল মা গরদের কাপড় পরে বসে আছেন পূজার ঘরে। এ কে ওস্তাদ বীণকার! সব সুরের রাগিণীই যেন জানেন খেলতে। কখনো আঘাতে কখনো আনন্দে, কখনো কড়িতে কখনো কোমলে। শুধু তার বাঁধা সুর বাঁধার মুখেই যন্ত্রণা। এই বুঝি ছিঁড়ে গেল তার, শুরু হল বেসুরের আর্তনাদ। বিচ্ছিন্ন তারের ঝঙ্কারকে কবে নিয়ে যেতে পারব একটি সঙ্গীতের সমগ্রতায়? পৃথক-পৃথক জিজ্ঞাসাকে গ্রথিত করতে পারব একটি মহাবিশ্বাসের মূলসূত্রে?

    যত দিন তা না পারি তত দিন হাজরার কাছে গিয়ে বসি।

    দক্ষিণেশ্বরে বসে জপ করে হাজরা। তারই মধ্যে আবার দালালির চেষ্টা করে। বাড়িতে ক’হাজার টাকা দেনা আছে তা শোধবার ফিকির খোঁজে। জপ করে তার বেজায় অহঙ্কার। রাঁধুনে বামুনদের কথায় বলে, ওদের সঙ্গে কি আমরা কথা কই?

    শোনো কথা! রাঁধুনে বামুনরা যেন আর মানুষ নয়!

    শ্রীরামপুর থেকে একটি গোঁসাই এসেছে সেদিন। ইচ্ছে দু-এক রাত্তির থেকে যায় দক্ষিণেশ্বরে। ঠাকুর তাকে যত্ন করে থাকতে বললেন। কিন্তু হাজরা ঝামটা মেরে উঠল। বললে,’এ ঘরে নয়, ওকে খাজাঞ্চির ঘরে পাঠিয়ে দাও।’

    মানেটা বুঝতে পেরেছেন ঠাকুর। মানেটা আর কিছুই নয়, এখানে থাকলে পাছে হাজরার দুধ-মিষ্টিতে ভাগ বসায়। যদি তার বরাদ্দে কিছু টান পড়ে। এত হিসেবী এত স্বার্থপর! ঠাকুর ঝলসে উঠলেন,’তবে রে শালা! গোঁসাই বলে আমি ওর কাছে সাষ্টাঙ্গ হই, আর সংসারে থেকে কামিনীকাঞ্চন নিয়ে নানা কাণ্ড করে—এখন একটু জপ-তপ করে তোর এত অহঙ্কার হয়েছে! লজ্জা করে না?’

    লজ্জা করবে কি! জটিল-কুটিল না হলে লীলারস জমবে কি করে?

    কিন্তু নরেন বলে, ‘হাজরা খুব ভালো লোক।’

    ‘তুমিও একদিন বলবে, আমি বলে রাখছি।’ হাজরা লক্ষ্য করে ঠাকুরকে: ‘এখন আমাকে তোমার ভালো লাগছে না, কিন্তু দেখো, পরে আমাকে তোমার খুঁজতে হবে।’

    আমি হচ্ছি সংশয়। আমি হচ্ছি স্বার্থপরতা। আমি হচ্ছি ব্যবসাবুদ্ধি। সংশয় ছাড়া প্রত্যয়ের দাম কোথায়? স্বার্থপরতা না থাকলে কোথায় থাকবে আত্মত্যাগের মহিমা? ব্যবসাবুদ্ধিতে শেষ পর্যন্ত কুলোবে না বলেই তো শরণাগতির শান্তিজল। থেকে-থেকে রসিকতা করে। সত্ত্বগুণের রঙ শাদা, রজোগুণের লাল, তমোগুণের কালো। সত্ত্বগুণ ঈশ্বরের কাছে নিয়ে যায়, রজ তম ঈশ্বর থেকে তফাত করে। হাজরাকে জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর: ‘বলো তো, কার কত সত্ত্বগুণ হয়েছে?’

    ‘নরেনের ষোলো আনা।’ নির্লিপ্ত মুখে বললে হাজরা। ‘আমার এক টাকা দুই আনা।’

    ‘বলো কি? আর আমার?”

    ‘তোমার এখনো লালচে মারছে—তোমার বারো আনা।’

    বাইরের বারান্দায় হাজরার কাছে গিয়ে বসেছে নরেন। হাজরাও অভাবী লোক, জীবিকার্জনের জন্যে সংগ্রাম করে, আবার সেই সঙ্গে নিবিষ্ট নিষ্ঠায় জপধ্যান করে, তারই জন্যে বোধ হয় পক্ষপাত। কিন্তু বেশিক্ষণ ঠাকুরকে না দেখেও থাকা যায় না। বারান্দা ছেড়ে ঘরের মধ্যে এসে বসল নরেন।

    ‘তুই বুঝি হাজরার কাছে বসেছিলি?” বললেন ঠাকুর, ‘আহা, তুই বিদেশিনী, সে বিরহিণী। হাজরারও দেড় হাজার টাকার দরকার।

    সবাই হেসে উঠল।

    ‘হাসলে কি হবে? আমি তাকে বলি, তুমি শুধু বিচার করো তাই তুমি শুষ্ক। সে বলে, আমি সৌরসুধা পান করি, তাই শুষ্ক। যদি শুদ্ধা ভক্তির কথা বলি, যদি বলি শুদ্ধ ভক্ত টাকাকড়ি কিছু চায় না, সে বিরক্ত হয়, বলে, কৃপাবন্যা এলে নদী তো উপচে যাবেই খাল ডোবাও পূর্ণ হবে। শুদ্ধা ভক্তিও হয়, আবার ষড়ৈশ্বর্যও হয়, টাকাকড়িও হয়। কি হয় না হয় কে বলবে?”

    কৃপাবৃষ্টি অজস্র ধারায় ঝরে পড়ছে দিবানিশি। সেই বৃষ্টির জল ধরি তেমন পাত্রই এখনো হতে পারছি না। কিন্তু আমি যদি তোমার কৃপাপাত্র না হই, তবে আর কোথায় পাবে তোমার কৃপার পাত্র?

    নরেন অন্য কথা পাড়ল। বললে, ‘গিরিশ ঘোষের সঙ্গে আলাপ হল। আপনার কথা হচ্ছিল-‘

    ‘কি কথা?’ একটু বোধ হয় কৌতূহলী হলেন ঠাকুর।

    ‘এই আপনি কিচ্ছু লেখাপড়া জানেন না—আমরা সব পণ্ডিত, এই সব কথা।’

    ‘তা তো ঠিকই বলছিলি। আমি শুধু সার কথা জেনে নিয়েছি। বেদান্তের সার, ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা; আর গীতার সার ত্যাগী। আর বই পড়ে কি হবে? জানবার পর এখন শুধু সাধন-ভজন। সর্ষে পিষে তেল, মেদিপাতা বেটে রঙ আর কাঠ ঘষে আগুন বের করো।’

    আরো এক দিন তর্কের মুখে বলেছিল নরেন: ‘তুমি দর্শনশাস্ত্রের কী জানো? তুমি তো একটা মুখ্‌খু।

    সেবার ঠাকুর করেছিলেন রসিকতা। বলেছিলেন, ‘নরেন আমাকে যত মুখ্‌খু বলে আমি তত মুখ্‌খু নই।’ বাঁ হাতের চেটোতে ডান হাতের আঙুল দিয়ে লিখে দেখিয়ে দিয়েছিলেন: ‘আমি অক্ষর জানি।’

    ঠাকুরের ইচ্ছে নরেন একখানা গান গায়। মাস্টারকে বললেন তানপুরাটা পেড়ে দিতে। নরেন বাঁধতে লাগল তানপুরা।

    বাঁধা আর শেষই হয় না। বিনোদ বললে, ‘বাঁধা আজ হবে, গান আরেক দিন হবে।’ আর সকলের সঙ্গে ঠাকুরও হেসে উঠলেন। বললেন, ‘ইচ্ছে করছে তানপুরোটা ভেঙে ফেলি। কি টং-টং শুরু হয়েছে—তারপর আবার তানা নানা নেরে নাম হবে।’

    ‘যাত্রার গোড়ায় অমনি বিরক্ত হয়। ফোড়ন দিলে ভবনাথ।

    নরেন ঝলসে উঠল: ‘সে না বুঝলেই হয়।’

    সদানন্দ ঠাকুর প্রসন্ন স্নেহে বলে উঠলেন, ‘ঐ! আমাদের সব উড়িয়ে দিলে।’

    ৩

    দারিদ্র্যের রন্ধ্র দিয়ে উঁকি দিতে চাইল অবিদ্যা। নানা ভাবে কি পরীক্ষা করে নেবে না? তুমি কি স্ফটিক দিয়ে তৈরি, না, ইস্পাত দিয়ে। পরীক্ষায় না ফেলে কি করে বুঝব তুমি দুর্বাসনারজ্জু নারীকে প্রত্যাহার করতে পেরেছ?

    একটি সুন্দরী মেয়ের নজর ছিল নরেনের উপর। শুধু সুন্দরী নয়, ধনিনী। ভাবলে, তার এই দুর্যোগের সুযোগে টোপ ফেলি। গোপনে প্রস্তাব করে পাঠাল, সভূমিভূষণা আমাকে গ্রহণ করো। শুধু দারিদ্রমোচন হবে না, নিঃসঙ্গতার অবসান হবে। রুক্ষবেশ ছেড়ে ধরো এবার রাজবেশ।

    ধ্যান ভেঙে মুনিরা তপস্যার ফল বিসর্জন দিয়েছে নারীর পায়ে। কিন্তু নরেন্দ্রনাথ ও-সব মুনি-ঋষির চেয়ে দৃঢ়ব্রত।

    প্রথমটা অবজ্ঞায় মুখ ফিরিয়ে নিল নরেন। মেয়েটা তবু ফেরে না। শেষে কাঁদতে শুরু করল। ভাবলে নারীর বল, চোখের জল। ছলনাজাল গুটিয়ে বিস্তার করলে শোকজাল। যদি এবার একটু বিগলিত হয় সেই পাষাণপিণ্ড।

    কিন্তু পাষাণের চেয়েও কঠোর নরেন্দ্রনাথ। ধ্রুব, নির্বিচল। তার শুধু এক প্রার্থনা: ‘ব্রতপতে, ব্রতং চরিষ্যামি, সত্যং উপৈমি অনৃতাং।’ হে ব্ৰতপতি, যে দীক্ষা দিয়েছ তাই আমাকে রক্ষা করুক। মিথ্যা থেকে দূরে থেকে যেন সত্যেই শরণাগত থাকি। আর কাউকে চিনি না তুমিই শক্তি দাও। সাহস দাও।

    সেই রজনীরঞ্জিনী দুঃখশৃঙ্খলা নারী চলে গেল দুয়ার থেকে।

    কিন্তু এবার যে এল প্রলুব্ধ করতে, সে বারবধূ। সে জলন্ত দুষ্কৃতাগ্নিশিখা। গুরুকে এসেছিল পরখ করতে, শিষ্যকে একবার দেখবে না বাজিয়ে?

    আগে বীর্যলাভ, পরে ব্রহ্মলাভ। আগে বীর্যানন্দ, পরে ব্রহ্মানন্দ।

    বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে বাগানবাড়িতে গিয়েছে নরেন। কি অমন দারিদ্র্যদুঃখে ম্লান হয়ে আছিস। চল ফুর্তি করবি চল। ‘ন পুণ্যং সুখতঃ পরং।’ সুখের চেয়ে আর পুণ্য নেই। দু ঢোঁক খেলেই দেখবি সমস্ত জগৎসংসার একটা রঙিন ফানুস হয়ে উড়ে চলেছে।

    রাজী হয়নি প্রথমে। সে কি কথা, তুই না গেলে গান গাইবে কে? ফুর্তির মুখে হরিনাম যেন মুড়ির সঙ্গে ফুটকড়াই। যেমন ভোজন তেমন দক্ষিণা। চল চল, মনমরা হয়ে বসে থাকিস নে মুখ গুঁজে।

    গান গাইবে এই শুধু জানে নরেন। কিন্তু এ কাকে পাঠিয়ে দিয়েছে বন্ধুরা? মাংসপাঞ্চালীকায়া শৃঙ্গারবেশাঢ্যা রমণী। নববিহঙ্গের বন্ধনবাগুরা।

    বুঝল এও এক মহামায়ার খেলা। বিচলিত হল না। বিমোহিত হল না। শুধু জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার নাম কি?”

    স্ফুরৎচকিতচক্ষে তাকাল একবার মোহিনী। উত্তর দিল না।

    ‘তোমার বাবার নাম কি? বাড়ি কোথায়? কেন পা বাড়ালে এ পথে?”

    আবার কটাক্ষগর্ভ নেত্রপাত। আবার স্তব্ধতা।

    ‘নিজের কথা একবার ভাবো? ভবিষ্যতের কথা? কি হবে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? নিত্য ভিক্ষায় তনু রক্ষাই সাধনা? কিন্তু যখন ভিক্ষে আর মিলবে না? ”

    অপাঙ্গবীক্ষণ নেই আর মোহিনীর। চোখের দৃষ্টিটি এবার স্থির হয়েছে, শাস্ত হয়েছে। ভরে উঠেছে তাতে হতাশার কুয়াশা, লজ্জায় আচ্ছন্ন হয়ে এসেছে!

    ‘যখন থাকবে না এই শরীর? কি সম্বল নিয়ে যাবে তুমি ওপারে?”

    এবার বুঝি দিগদর্শন হল মেয়েটির। দেখল চারদিকে শুধু ধু-ধু করছে মরুভূমি। কোথাও এতটুকু পিপাসার জল নেই, নেই অনুতাপের অশ্রুলেখা।

    দ্রুতপায়ে চলে গেল। বললে গিয়ে বন্ধুদের, ‘অমন লোকের কাছে পাঠাতে আছে আমাকে?”

    ঠাকুর নরেনকে বলেন, শুকদেব।

    তাই শুনে বিশ্বনাথ দত্ত ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ‘ব্যাসদেবের ব্যাটা শুকদেব।’

    কায়রোতে এক দিন পথ হারিয়ে ফেলেছেন বিবেকানন্দ। সঙ্গীদের সঙ্গে ঈশ্বরীয় কথা বলতে-বলতে। সঙ্গী সস্ত্রীক ফাদার লয়সন, শিকাগোর মিস ম্যাকলিয়ড আর সুপ্রসিদ্ধা গায়িকা এন্মা ক্যালভি। পথ হারিয়ে চলে এসেছেন একটা নোংরা গলির মধ্যে।

    দুদিকে সার-সার ঘর, দরজা-জানলা খোলা। সেই সব জানলা আর দরজার সামনে অর্ধনগ্ন নারীর দল বসে আছে দেহের বেসাতি সাজিয়ে। কিছু লক্ষ্য করেননি স্বামীজী, ঈশ্বরোন্মাদনার আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে আছেন। চারদিকে শুধু ঈশ্বর-প্রতিভাস।

    কিন্তু তাঁর লক্ষ্য না ফিরিয়ে ছাড়বে না মেয়েগুলো। কে একটা মুখরা মেয়ে তাঁকে ডাকতে লাগল হেসে হেসে। দেহে যৌবনের এমন দিব্যশোভা নিয়ে কোথায় তুমি চলে যাচ্ছ, উদাসীন!

    সঙ্গীরা ব্যস্ত হয়ে উঠল। কি করে অবিলম্বে এখান থেকে নিয়ে যেতে পারবে স্বামীজীকে তার জন্যে তাড়া দিতে লাগল। কিন্তু সহসা বিবেকানন্দ দল ছেড়ে সেই পণ্যাঙ্গনাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘কি করেছ! নিজেদের দেবীত্বকে ঢেকেছ এ কোন সৌন্দর্য সজ্জায়! আত্মস্বরূপকে দেখ, দেখ সেই দেবীবৈভব! এ করেছ কি!’ বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন। রূপাজীবাদের সামনে দাঁড়িয়ে যেমন কেঁদেছিলেন যীশু খৃষ্ট।

    মেয়েগুলির মুখে আর কথা নেই। একজন এগিয়ে এসে স্বামীজীর গৈরিক বাসের এক প্রান্ত স্পর্শ করল, সেই প্রান্তভাগ চুম্বন করে ভাঙা-ভাঙা স্পেনীয় ভাষায় বলতে লাগল, ‘হোমব্রি ডে ডিওস, হোমব্রি ডে ডিওস—দেব-মানব, দেব-মানব।’ আরেকজন চোখ ঢাকল দুহাতে। স্বামীজীর সেই চক্ষুচ্ছটা যেন সে সইতে পারছে না। তার পাপলিপ্ত আত্মা যেন সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে।

    চারদিকে রাষ্ট্র হয়ে গেল বকে গিয়েছে নরেন্দ্রনাথ, নাস্তিক হয়ে গিয়েছে। মদ আর তার অনুষঙ্গ কিছুতেই তার অরুচি নেই। কেউ যদি এ প্রশ্ন নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ায়, কি উত্তর পেলে সে সুখী হবে বুঝতে পেরে নরেন বলে, ‘বেশ করেছি। যদি কেউ বুঝে থাকে ও-সব ক্ষণিক সুখভোগেই সাংসারিক দুঃখ-কষ্ট ভুলে থাকা যায়, তবে তাকে তা বুঝতে দিতে আপত্তি কি? যাও, সরে পড়ো, যত পারো নিন্দা করো মনের সুখে। নিন্দা করে আনন্দিত হও।’

    কথা কানে হাঁটে। দেয়ালে শোনে। বাতাসে লেখা হয়ে যায়।

    দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে ঠাকুরের কানে উঠল। তাও আবার কানে এল নরেনের। তবে আর কি, ঠাকুরও এবার বিশ্বাস করুন তাঁর নরেন মন্দিরের দ্বার ছেড়ে চলে এসেছে নরকের দরজায়! তাঁর সেই বৃহদ্ ব্রতধর ব্রহ্মতেজা নরেন!

    ভবনাথ তো একেবারে কেঁদে পড়ল ঠাকুরের পায়ে।

    ‘নরেনের এমন হবে এ কথা স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবিনি।’

    ঠাকুর পা ছাড়িয়ে নিলেন। বললেন, ‘দূর শালারা, চুপ কর। আমার মা’র কথার চেয়ে তোদের কথা বড় হবে? আমার মা বলে দিয়েছেন, সে কখনো ও রকম হতে পারে না, তার জীবনে যোষিৎসঙ্গ হবে না কোনোদিন। তার জন্যে ভাবতে হবে না তোদের। ফের যদি ও কথা বলিস তোদের মুখ-দর্শন করব না।’

    কথা শুনে আনন্দে বুক ভরে গেল নরেনের। সত্যদর্শী অন্তর্যামী ঠিক দেখতে পেয়েছেন তার অন্তরের মানচিত্র। তিনিই তাকে রক্ষা করবেন আমরণ।

    কেউ যদি কখনো বলে, সে কি মশাই, এ তো নরেনও বলে, তখন ঝলসে ওঠেন ঠাকুর: ‘এ তো নরেন বলে! নরেন বলতে পারে, তা বলে তুই বলতে যাসনি। তুই আর নরেন এক না।’

    ‘আপনি নরেনকে এত ভালোবাসেন কেন? নিজের ছোট হুঁকোয় করে নরেনকে তামাক খেতে দিলেন, হুঁকোটা যে এঁটো হয়ে গেল!’ আরেকজন কে নালিশ করলে ঠাকুরের কাছে: ‘ও যে হোটেলে খায়। ওর এঁটো কি খেতে আছে?”

    ওরে শালা, তোর কি রে? নরেন হোটেলে খাক বা নাই থাক, তাতে তোর কি? তুই শালা যদি হবিষ্যিও খাস আর নরেন যদি হোটেলে খায়, তা হলেও তুই নরেন হতে পারবি নে।’

    কেবল নরেন আর নরেন! নরেন যে আপনাকে গাল দেয় তার হিসেব রাখেন?

    ‘নরেন আমাকে গাল দেয়, কিন্তু আমার ভিতরে যে শক্তি আছে তাকে সে মানে, তাকে সে গাল দেয় না।’

    সে আশ্চর্য শক্তিই বরাবর রক্ষা করে এসেছে নরেনকে। সে শক্তিই তো ত্রৈলোক্যাকর্ষিণী বংশীধ্বনি। নিরন্তর বেজে চলেছে বাতাসপ্রবাহে। শোণিতপ্রবাহে। আমেরিকাতে একবার একটি মেয়েকে দেখে খুব সুন্দরী বলে মনে হয়েছিল স্বামীজীর। কোনো মন্দ ভাব থেকে নয়, অমনি। ইচ্ছে হয়েছিল আরেকবার দেখি। দেখা হল আরেকবার। কোথায় সুন্দরী। দেখলেন একটা বাঁদরের মুখ!

    স্বপ্নে কখনো স্ত্রীলোক দেখেননি স্বামীজী। একবার কিন্তু দেখে ফেললেন। একটি স্ত্রীলোক মাথায় ঘোমটা দিয়ে বসে আছে। ইচ্ছে হল ঘোমটা খুলে মুখখানি দেখি। যাই ঘোমটা খোলা, অমনি দেখেন ঠাকুর!

    ‘অন্যেরা কলসী বাটি, নরেন্দ্র জালা। অন্যেরা ডোবা পুষ্করিণী, নরেন্দ্র বড় দীঘি, যেমন হালদারপুকুর। মাছের মধ্যে নরেন্দ্র রাঙা চক্ষু বড় রুই, আর এরা সব পোনা, মৃগেল, কাঠিবাটা।’ বলছেন ঠাকুর, ‘নরেন্দ্র পুরুষ, গাড়িতে তাই ডানদিকে বসে। আর ভবনাথের মেদি ভাব, ওকে তাই অন্য দিকে বসতে দিই।”

    ওর বিষয়ে নালিশ করতে আসিসনে। ওকে আমার তামাক সাজতে পর্যন্ত দিই না, দিই না শৌচের জল বইতে। ও সব কাজের জন্যে অন্য লোক আছে। তোরা আছিস।

    ‘আমি নরেন্দ্রকে বলেছিলাম-‘

    ‘কে নরেন্দ্র?’ জিজ্ঞেস করলে প্রতাপ মজুমদার।

    ‘ও আছে একটি ছোকরা।’ বলতে লাগলেন ঠাকুর: ‘আমি নরেন্দ্রকে বলেছিলুম, দ্যাখ, ঈশ্বর রসের সাগর। তোর ইচ্ছে হয় না কি, এই রসের সাগরে ডুব দিই! আচ্ছা, মনে কর এক খুলি রস আছে, আর তুই মাছি হয়েছিস। তা হলে তুই কোনখানে বসে রস খাবি? নরেন্দ্র বললে, আমি খুলির কিনারায় বসে মুখ বাড়িয়ে খাব। কেন, কিনারায় বসবি কেন? সে বললে, বেশি দূরে গেলে ডুবে যাব আর প্রাণ হারাব। তখন আমি বললুম, বাবা, সচ্চিদানন্দ সাগরে সে ভয় নেই। এ যে অমৃতের সাগর, ঐ সাগরে ডুব দিলে মৃত্যু হয় না, মানুষ অমর হয়। ঈশ্বরেতে পাগল হলে মানুষ বেহেড হয় না।’

    দুটোর একটা করো। হয় পাগলামি ছেড়ে দাও, নয় তো ঈশ্বরের নামে পাগল হও।

    নববৃন্দাবন প্লে হচ্ছে কেশব সেনের বাড়িতে। নরেন শিব সেজেছে। ঠাকুর দেখতে গিয়েছেন। অভিনয়ের মধ্যেই ঠাকুর বলে উঠলেন, ‘নরেনকে নেমে আসতে বলো। হ্যাঁ, ঐ বেশেই নেমে আসুক আমার সামনে। চোখের সম্মুখে দাঁড়াক একবার স্থির হয়ে, শিব হয়ে।’

    নরেন ইতস্তত করছে। কেশব বললে, ‘উনি যখন বলছেন তখন এস না নেমে।’ কে নামে, কে ওঠে!

    নরেন অবতার মানে না, তাতে কি এসে যায়! এতে যেন আরো উথলে উঠেছে ঠাকুরের ভালোবাসা। নরেনের গায়ে হাত দিয়ে বলছেন, ‘মান করলি তো করলি, আমরাও তোর মানে আছি রাই।’

    ওরে, কতক্ষণ বিচার? নিমন্ত্রণ বাড়ির শব্দ কতক্ষণ শোনা যায়? যতক্ষণ লোকে খেতে না বসে। যেই লুচি-তরকারি পড়ে, বারো আনা শব্দ কমে যায়। অন্যান্য খাবার পড়লে আরো কমতে থাকে। দই পড়লে তখন কেবল সুপসাপ। খাওয়া হয়ে গেলে নিদ্রা। তেমনি ঈশ্বরকে যত লাভ হবে ততই বিচার কমবে। তাঁকে লাভ হলে, ক্ষুন্নিবৃত্তি হলে আর শব্দ বা বিচার থাকে না। তখন শব্দ নিদ্রা–সমাধি।

    নরেনের গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, মুখে হাত দিয়ে আদর করছেন আর বলছেন, ‘হরি ওঁ! হরি ওঁ। হরি ওঁ।

    ক্রমশ বহির্জগতের হুঁশ চলে যাচ্ছে। একেই বুঝি বলে অর্ধবাহ্যদশা, যা শ্রীগৌরাঙ্গের হত। আশ্চর্য, এখনো নরেনের পায়ের উপর হাত, যেন ছল করে নারায়ণের পা টিপছেন। অত গা টেপা পা টেপা কেন? কেন কে বলবে! এ কি নারায়ণের পদসেবা, না, শক্তিসঞ্চার!

    তারপর হাত জোড় করে বলছেন, ‘একটা গান গা। নইলে উঠতে পারব কেমন করে? গোরাপ্রেমে গর্গর মাতোয়ারা।’ বলেই নিজে গান ধরছেন: ‘দেখিস রাই, যমুনায় যে পড়ে যাবি! সখি, সে বন কতদূরে। যে বনে আমার শ্যামসুন্দর। ঐ যে কৃষ্ণগন্ধ পাওয়া যায়। আমি যে চলতে নারি—’উঠতে চেয়েই আবার বসে পড়ছেন। বলছেন, ‘ঐ একটা আলো আসছে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু কোন দিক দিয়ে যে আসছে, আমাকে কে বলে দেবে! ধর একটা গান ধর—’

    নরেন গান ধরল:

    ‘সব দুঃখ দূর করিলে দরশন দিয়ে

    সপ্ত লোক ভোলে শোক, তোমারে পাইয়ে

    কোথায় আমি অতি দীনহীন!’

    ঠাকুরের নেত্র নির্মীলিত। দেহ স্পন্দহীন। সমাধিস্থ।

    সমাধিভঙ্গের পর বলছেন বিহ্বল কণ্ঠে, ‘আমাকে কে লয়ে যাবে?’ সঙ্গীহারা বালক যেমন অন্ধকার দেখে তেমনি।

    ‘কে যায় অমৃতধামযাত্রী, আজি এ গহন তিমির রাত্রি, কাঁপে নভ জয় গানে।

    ৪

    কেশবের খুব অসুখ। দেখতে এসেছেন ঠাকুর।

    আগেরবার যখন অসুখ হয় তখন কালীর কাছে ডাব-চিনি মেনেছিলেন। বলেছিলেন, মা, কেশবের যদি কিছু হয়, তাহলে কলকাতায় গেলে কার সঙ্গে কথা কইব? এবার অসুখ কিছু বাড়াবাড়ি। এমনিতে কতবার গিয়েছে দক্ষিণেশ্বরে। শেষ দিকে একেবারে শুধু-গায়ে। ফল হাতে করে। এখন একেবারে বিছানা নিয়েছে। ‘দেখ কেশব কত পণ্ডিত। ইংরিজিতে লেকচার দেয়, কত লোক তাকে মানে, স্বয়ং কুইন ভিক্টোরিয়া তার সঙ্গে বসে কথা কয়েছে। বলছেন ঠাকুর ভক্তদের। ‘কিন্তু এখানে যখন আসে, শুধু-গায়ে। সাধুদর্শন করতে হলে হাতে কিছু আনতে হয়, তাই ফল হাতে করে আসে। একেবারে অভিমানশূন্য।’

    একদিন এসে কথায়-কথায় রাত দশটা বেজে গিয়েছে। প্রতাপ মজুমদার বললে, আজ সব থেকে যাব এখানে। বাড়ি ফিরে আর কাজ নেই।

    ‘না, না, আমার কাজ আছে। আমাকে যেতে হবে।’ কেশব ব্যস্ত হয়ে উঠল।

    ‘এই যে সেই মেছুনীর মত করলে।’ ঠাকুর হেসে উঠলেন: ‘আঁস-চুপড়ির গন্ধ না হলে বুঝি আর ঘুম হয় না? এক মেছুনী মালিনীর বাড়িতে অতিথি হয়েছে। মাছ বিক্রি করে আসছে, তাই হাতে চুপড়ি। মালিনী তাকে ফুলের ঘরে শুতে দিয়েছে। কিন্তু অনেক রাত হয়ে গেল, কিছুতেই তার ঘুম আসছে না। কি গো, ছটফট করছ কেন? জিজ্ঞেস করলে মালিনী। কে জানে বাপু বুঝি এই ফুলের গন্ধে ঘুম আসছে না। মেছুনী মিনতি করল, আমার আঁস-চুপড়িটা আনিয়ে দিতে পারো? তাই আনিয়ে দিল মালিনী। তখন আঁস-চুপড়িতে জল ছিটে দিয়ে নাকের কাছে রেখে মেছুনী ভোঁস-ভোঁস করে ঘুমুতে লাগল।’

    গল্প শুনে কেশব আর তার দলের লোকের হাসি আর থামে না।

    ‘রোগটি হচ্ছে বিকার। যে ঘরে বিকারী রুগী সেই ঘরেই আবার আচার-তেঁতুল। সেই ঘরেই আবার জলের জালা। তা রোগ সারবে কেমন করে? আচার-তেঁতুল—এই দেখ,’ ঠাকুর তাকালেন সবাইয়ের দিকে, ‘বলতে-বলতে আমার মুখে জল এসেছে। সামনে থাকলে কি হয় কে বলবে! মেয়েমানুষ পুরুষের পক্ষে এই আচার-তেঁতুল। ভোগবাসনা জলের জালা। আর সব কিনা এই রুগীর ঘরে।’

    দিন কতক ঠাঁই-নাড়া হয়ে থাকো। কদিন এমন জায়গা ঘুরে এস যেখানে আচার-তেঁতুল নেই, জলের জালা নেই। চলে যাও নির্জনে। নীলের নিলয়ে। হয় নীল সমুদ্রে, নীল অরণ্যে, নয় নীল আকাশের নিঃসীমায়। নীল হচ্ছে অনন্তের রঙ, অবিনশ্বরতার রঙ। তোমার নির্জনতার রঙও হচ্ছে নীল। নির্জনে থাকতে-থাকতেই নীরোগ হবে। নীরোগ হয়ে ঘরে ফিরে এলে আর ভয় নেই।

    ‘অশ্বত্থ গাছ যখন চারা থাকে তখনই চারদিকে বেড়া লাগে। পাছে ছাগল-গরুতে নষ্ট করে। কিন্তু গুঁড়ি মোটা হলে বেড়ার আর দরকার থাকে না। তখন হাতি বেঁধে দিলেও কিছুই হয় না গাছের। যদি নির্জনে সাধন করে ঈশ্বরের পাদপদ্মে ভক্তিলাভ করে বল বাড়িয়ে বাড়ি গিয়ে সংসার করো, কামিনী-কাঞ্চন তোমার কিচ্ছু করতে পারবে না।’

    দলের মধ্যে ছিলেন একজন সদরওয়ালা। বললেন, ‘সংসারত্যাগের যে প্রয়োজন নেই, বাড়িতে থেকেও যে ঈশ্বরকে পাওয়া যায় এ জেনে মনে বড় শান্তি হল।’

    ‘যা আছে হোথায় তা আছে হেথায়।’ রামকৃষ্ণ বললেন দীপ্তম্বরে: ‘ত্যাগ তোমাদের কেন করতে হবে? যে কালে যুদ্ধ করতেই হবে, কেল্লা থেকেই যুদ্ধ ভালো। ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে, ক্ষুধা-তৃষ্ণার সঙ্গে যুদ্ধ তো করতে হবে। এ যুদ্ধ সংসারে থেকেই সুবিধে। শরীরের যখন যেটি দরকার কাছেই পাবে—রোগ হলে সেবা পর্যন্ত।’

    দেখছ না আমাকে! সন্ন্যাসীর শ্রেষ্ঠ হয়ে সংসারীর শিরোমণি।

    ‘আমার তো মাগ আছে। ঘরে-ঘরে ঘটি-বাটি আছে। হরে-প্যালাদের খাইয়ে দিই। আবার হাবির মা এলেও ভাবি।’

    পিঁপড়ের মত সংসারে থাকো। বালিতে-চিনিতে, নিত্যে-অনিত্যে, মিশেল হয়ে আছে। বালি ছেড়ে চিনিটুকু নাও। থাকো পাঁকাল মাছের মতো। পাঁকে থাকে কিন্তু গা ঝকঝক করছে। থাকো পানকৌটির মত। পাখা ঝাপটেই গায়ের জল ঝেড়ে ফেল। হাতে তেল মেখে কাঁঠাল ভাঙো।

    ‘একজন তার স্ত্রীকে বলেছিল, আমি সংসার ত্যাগ করে চললাম। স্ত্রীটি একটু জ্ঞানী ছিল। সে বললে, কেন মিছে ঘুরে-ঘুরে বেড়াবে? যদি পেটের ভাতের জন্যে দশ ঘরে যেতে না হয়, তবে যাও। আর তাই যদি হয় এই এক ঘরই ভালো।’

    তার মানে জ্ঞানলাভ করে সংসারে থাকো।

    “জ্ঞান হয়েছে তা কেমন করে জানব?’ জিজ্ঞেস করলেন সদরালা।

    “জ্ঞান হলে ঈশ্বরকে আর দূরে দেখায় না। তিনি আর তখন তিনি নন। তিনি তখন ইনি। হৃদয়মধ্যে বসে আছেন।’

    অন্তরের মধ্যেই সেই স্থিরধাম। কেউ চলেছে দ্বারকানাথ, কেউ মথুরায়, কেউ বা কাশীতে। কিন্তু প্রভু রয়েছেন অন্তরের নিরালায়। পিপাসিত হয়ে কোথায় যাচ্ছ গঙ্গা-যমুনা সরস্বতীতে, মানস সরোবরেই সঞ্চিত আছে জলপুঞ্জ। সেই মন-সরসীতে এবার স্নান করো।

    অনেক বদ্ধ ঘরে কান পেতেছ। এবার নিজের অন্তরে এসে কান পাতো। এবার শুনতে পাবে সে দুয়ার খোলার শব্দ।

    সদরালার তবু সংশয় যায় না। বললেন, ‘মশায়, আমি পাপী, কেমন করে বলি যে তিনি আমার ভিতরে আছেন?”

    একটু যেন বিরক্ত হলেন ঠাকুর। বললেন, ‘ঐ তোমাদের পাপ আর পাপ। এ সব বুঝি খৃষ্টানি মত? সে দিন একটু বাইবেল পড়া শুনলাম। তাতে কেবল ঐ এক কথা। পাপ আর পাপ! আমি তাঁর নাম করেছি, রাম কি হরি বলেছি, আমার আবার পাপ! এমন বিশ্বাস থাকা চাই। দৃপ্ত বিশ্বাস। তপ্ত বিশ্বাস।’

    ‘মশায়, কেমন করে অমন বিশ্বাস হবে?”

    ‘তাঁতে অনুরাগ করো। তাঁকে ভালোবাসো। ডাকো। তাঁর জন্যে কাঁদো’।

    ‘কেমন করে ডাকবো?”

    ডাক দেখি মন ডাকের মতন কেমন শ্যামা থাকতে পারে। কেমন করে ডাকবো! তাও আমায় শিখিয়ে দিতে হবে?

    ‘আমি মা বলে এইভাবে ডাকতাম—মা আনন্দময়ী, দেখা দিতে যে হবে! আবার কখনো বলতাম, ওহে দীননাথ জগন্নাথ, আমি তো জগৎছাড়া নই নাথ। আমি জ্ঞান-হীন, সাধনহীন, ভক্তিহীন—আমি কিছুই যে জানি না-দয়া করে দেখা দিতে যে হবে—’

    ঠাকুরের করুণ স্বরে সকলের হৃদয় গলে গেল। মহিমাচরণ তো কেঁদে আকুল। ওরে বিশ্বাস কর, তাঁর নামমাহাত্ম্যে বিশ্বাস কর।

    বিশ্বাস? অন্ধ বিশ্বাস?

    ওরে, অন্ধ হওয়াই সুবিধে। যার চোখ আছে সে তো নিজের অহঙ্কারে ঘুরে বেড়ায়। যার চোখ নেই তার হাত একজনকে এসে ধরতে হয়। ওরে তুই হাত-ধরা লোক কোথায় পাবি? প্রভুই এসে তার হাত ধরবেন।

    কিন্তু কেশবের এমন অসুখ হল কেন? শুধু খাটতে খাটতে দেহপাত হল। শুধু লেখা আর লেখা। বক্তৃতা আর বক্তৃতা।

    যোগীন যখন প্রথম ঠাকুরের ঘরে এসে প্রণাম করে দাঁড়ায়, তার হাতে একখানা খবরের কাগজ।

    ‘কোত্থেকে আসছ?’ জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর।

    ‘এই দক্ষিণেশ্বর থেকেই। আমি নবীন চৌধুরীর ছেলে।’

    চিনতে পারলেন। দক্ষিণেশ্বরের সাবর্ণ চৌধুরীদের নাম কে শোনেনি? এদের প্রতাপে বাঘে-গরুতে একসঙ্গে জল খেত সেকালে। যেমন অন্যের জাতি নিতে পারতেন তেমনি জাত দিতেও পারতেন অকাতরে। কিন্তু ঠাকুর আশ্চর্য হলেন, দক্ষিণেশ্বরের লোক তাঁকে চিনল কি করে? প্রদীপের নিচেই তো অন্ধকার। মন্দিরের যত কাছে, ঈশ্বরের তত দূরে। সামনের মাঠকে হলদে লাগে, দূরের মাঠই সবুজ।

    দক্ষিণেশ্বরের লোক বেশি পাত্তা দেয় না ঠাকুরকে। গেঁয়ো যোগীরই ভিখ মেলে না। তাই তিনি একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘এখানকার কথা কি করে জানলে?” ‘খবরের কাগজ থেকে।’

    ‘কোথাকার কাগজ?”

    ‘কেশব সেনের। কেশব সেন আপনার সম্বন্ধে লিখেছেন কাগজে।’

    কি লিখেছে, পড়িয়ে শোনাও তো? এমন কথা জিজ্ঞেসও করলেন না ঠাকুর। ডাকিয়ে আনালেন কেশববাবুকে। বাহবা দিলেন না। বরং ধর্মকিয়ে বললেন, ‘আমি কি মান-ভিখারী? আমি কি ইদানীং-সাধু?”

    কেশব হাত জোড় করে বসে রইল। ‘যা করেছ করেছ, আর লিখো না।’

    কিন্তু কেশবের কথা কে লেখে! একটা লোক জগৎ মাতিয়ে দিল—চেয়ে দেখ কত বড় শক্তি! কিন্তু আজ ব্যাধির কবলে পড়ে কী নিঃসহায়!

    শীতকাল। ঠাকুর দেখতে এসেছেন কেশবকে। গায়ে সবুজ রঙের বনাতের গরম জামা। জামার উপর আবার একখানি বনাত। সন্ধ্যা হয় হয়। কেশবের বাড়ির লোকেরা ঠাকুরকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন উপরে। বৈঠকখানার দক্ষিণে বারান্দা। সেখানে তক্তপোশ পাতা। তার উপরে বসাল ঠাকুরকে। বসে আছেন তো বসেই আছেন। কেউ নিয়ে যাচ্ছে না ভিতরে। তাঁর কেশবের পাশটিতে। বসে-বসে তার কষ্ট-ভরা কাশির আওয়াজ শুনেছেন।

    কত কীর্তন করেছে কেশব। ঠাকুরকে মাঝখানে রেখে কত নেচেছে। কেশবকে বেশি-দিন না দেখতে পেলেই অধীর হয়েছেন। সেবার যেন বড় বেশি ছটফট করছেন। রাজেন মিত্তির পাশে বসা, তাকে বলছেন বার-বার, দ্যাখো দিকিন কেশব আসছে কিনা। রাজেন মিত্তির একটু এগিয়ে গিয়ে দেখে আসে। কই, কোথায় কেশব! আবার কোথাও একটা শব্দ হল। দ্যাখো আবার দ্যাখো। আবার ফিরে এল রাজেন। কেশবের কেশাগ্রেরও দেখা নেই। ঠাকুর হাসতে-হাসতে বললেন, ‘পাতের উপর পড়ে পাত। রাই বলে, ওই এল বুঝি প্রাণনাথ।’ তার পরে স্বরে অনুযোগ মেশালেন: ‘হ্যাঁ, দ্যাখো, কেশবের চিরকালই কি এই রীত? আসে আসে আসে না!’

    কিন্তু সেদিন না এসে আর পারল না কেশব। কিন্তু সঙ্গে সেই দলবল।

    ‘রাজ্যের কলকাতার লোক জুটিয়ে এনেছেন! আমি কিনা বক্তৃতা করব! তা আমি পারবো-টারবো-নি। করতে হয় তুমি করো। আমি তোমার খাবো দাবো থাকবো’ তবে তুমি যদি একা-একা আস, বেশ হয়। দুজনে মিলে মনের সম্মূখে কথা কই সঙ্গোপনে। ভক্তের স্বভাব গাঁজাখোরের স্বভাব। তুমি একবার গাঁজার কলকেটা নিয়ে টানলে, আমিও একবার টানলাম।

    ‘কেশব, তুমি আমায় চাও, কিন্তু তোমার চেলারা আমায় চায় না। তোমার চেলাদের সেদিন বলছিলাম, এখন আমরা খচমচ করি, তারপর গোবিন্দ আসবেন। তারপর তুমি যখন এলে, বললাম, ঐ গো তোমাদের গোবিন্দ আসছেন। আমি এতক্ষণ খচমচ করছিলাম, জমবে কেন?”

    ঐ দল-দল করেই গেল! পাকা আমি কি দল করতে পারে? আমি দলপতি, আমি দল করেছি, আমি লোকশিক্ষা দিচ্ছি, এ আমি কাঁচা আমি।

    ‘কিন্তু, তোমরা এত দেরি করছ কেন? কতক্ষণ বাইরে বসে থাকব? আমাকে তার কাছে নিয়ে চলো।’

    ‘তিনি এখন এই একটু বিশ্রাম করছেন। একটু পরেই আসছেন এখানে।’

    ‘হ্যাঁ গা, তার এখানে আসবার কি দরকার? আমিই যাই না কেন ভিতরে!

    ডাক্তার বলে গেছে বিশ্রামে রাখতে। তাই কেশবের শিষ্যরা খুব হুঁশিয়ার। এই একটু চুপচাপ আছে কেশব। এখুনি যদি আবার তাকে ব্যস্ত করা হয়—

    কিন্তু ঠাকুরের ধৈর্য মানছে না। যাই যাই করছেন।

    ‘আজ্ঞে এই একটু পরেই আসছেন তিনি।’

    ‘যাও, তোমরাই অমন করছ। না, আমিই ভিতরে যাই-

    প্রসন্ন ভুলাতে এল ঠাকুরকে। কেশবের কথা ছাড়া আর কথা কোথায় মনভুলানো! প্রসন্ন বললে, ‘তাঁর অবস্থা আরেকরকম হয়ে গেছে। আপনারই মত মা’র সঙ্গে কথা কন। মা কি বলেন, শুনে কাঁদেন-হাসেন।’

    এত দূর! সেবার কেশবকে বললেন, বলো ভাগবত-ভক্ত-ভগবান। কেশব তো বললেই, তার শিষ্যরাও বললে। আবার বললেন, বলো, গুরু-কৃষ্ণ-বৈষ্ণব। তখন কেশব বললে, ‘মশায়, এখন এত দূর নয়। তা হলে লোকে গোঁড়া বলবে।’

    কালী শুধু মানা নয়, কালীর সঙ্গে কথা বলা! শুনেই ঠাকুর ভাবাবিষ্ট হয়ে গেলেন। বৈঠকখানায় আলো জ্বালা হয়েছে। সমাধিভঙ্গের পর ঠাকুরকে সবাই নিয়ে এল সে ঘরে। আসবাবে ঠাসা, চেয়ার, কৌচ, আলনা, গ্যাসের আলো। ঠাকুর বসলেন একটা কৌচে। তখনো যেন ভাবাবেশ কাটেনি সম্পূর্ণ। ঘরের জিনিসপত্র লক্ষ্য করে বললেন, ‘আগে এ সব দরকার ছিল। এখন আর কী দরকার!’ বলতে-বলতেই আবার আবেশ উপস্থিত। বলছেন, ‘এই যে মা এসেছ! এসো। আবার বারানসী শাড়ি পরে কি দেখাও! হাঙ্গামা কোরো না। বোসো গো বোসো ।’

    এই কেশবের বাড়িতেই আগে একবার বলেছিলেন ঠাকুর, মা গো, এখানে তুই আসিসনি। এরা তোর রূপ-টুপ মানে না। কেবল নিরাকার নিরাকার করে।

    আজ একেবারে সটান এসে পড়েছেন। তায় আবার সেজে-গুজে এসেছেন।

    হরীশ ঠিকই বলে। ঠাকুরকে দেখিয়ে বলে, ‘এখান থেকে সব চেক পাশ করিয়ে নিতে হবে। তবে ব্যাঙ্কে টাকা দেবে। নইলে টাকা নয়, ফাঁকা।’

    ঠাকুর বলছেন আপন মনে, ‘দেহ হয়েছে আবার যাবে। দেহ আর আত্মা। কিন্তু আত্মা যাবে না। যেমন সুপারি। কাঁচা বেলায় ফলে আর ছালে লেগে থাকে, আলাদা করা যায় না। কিন্তু পাকলে সুপারি আলাদা হয়ে যায় ছাল থেকে। কিন্তু পাকবে কখন? যখন তাঁর দর্শন মিলবে। তখন দেহ আলাদা আত্মা আলাদা হয়ে যাবে।’

    কেশব আসছেন। পূর্ব দিকের দরজা দিয়ে আসছেন। আসছেন দেয়াল ধরে ধরে। কী হয়ে গিয়েছে চেহারা! কঙ্কালের উপর শুধু একটা চামড়ার প্রলেপ! চোখ মেলে তাকানো যায় না। বুক ফেটে যায়!

    ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleঅথ রম্যকথা – অনন্যা পাল
    Next Article কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর

    Related Articles

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    May 18, 2026
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ১ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    April 27, 2026
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনন্যা পাল
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক দত্ত
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুর রহমান আল-আরিফি
    আবদুল হালিম
    আব্দুল মালেক আলী আল-কুলাইব
    আব্দুল হামীদ ফাইযী
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোপেন্দ্র বসু
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভট্টাচার্য
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বাণ রায়
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পরিমল ভট্টাচার্য
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণু শর্মা
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহতাব উদ্দিন
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রণদীপ নন্দী
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সায়ক আমান
    সায়ন্তনী পূততুণ্ড
    সায়ন্তনী পূততুন্ড
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    গজনবীর দেশ থেকে সোমনাথের পথে

    July 15, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    গজনবীর দেশ থেকে সোমনাথের পথে

    July 15, 2026
    Our Picks

    গজনবীর দেশ থেকে সোমনাথের পথে

    July 15, 2026

    ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে

    July 15, 2026

    আদর্শ বিবাহ ও দাম্পত্য – আব্দুল হামীদ ফাইযী

    July 15, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }