Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মাহতাব উদ্দিন : জীবন ও গান

    May 18, 2026

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    May 18, 2026

    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রেমের গল্প – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    May 16, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    বি.টি. রোডের ধারে – সমরেশ বসু

    সমরেশ বসু এক পাতা গল্প177 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৬. দুপুরবেলা নিঝুম বস্তি

    দুপুরবেলা। নিঝুম বস্তি। নতুন আর পুরনো বেকারেরা বেরিয়েছে, হন্যে ক্ষুধার্ত শিকারির মতো। বউ আর বাচ্চাগুলির কষ্ট বেড়েছে। এক মুহূর্ত বসে থাকার উপায় নেই। তারা ফিরছে শহরের আশেপাশে গোচারণ ভূমিতে গোবরের সন্ধানে। রেলের লাইনে পোড়া কয়লার জন্যে, শহরের কাগজ ও রাবিশ, দূর গ্রামের পথে পথে শুকনো ডালপালা কুড়োবার জন্য।

    লোটন বউও গোবর কুড়িয়ে এনেছে। কুড়িয়ে এনে হাঁপিয়ে পড়েছে। তার পেট উঁচু হয়ে উঠেছে অনেকখানি। কালি পড়েছে চোখের কোলে। চেহারাটি চওড়া হয়েছে আরও।

    এসে দেখল ঘর খোলা। ঢুকে দেখল, জিনিসপত্র তছনছ। সারা গায়ের মধ্যে পাক দিয়ে উঠল অসহ্য যন্ত্রণা। বুঝল, ওরা দুজন মারামারি করে গেছে। ওরা দুজন, যাদের দ্বৈত-মনের মণি রেখেছে সে তার জঠরে। কিন্তু ওরা বুঝি আজ তাকে নির্বিঘ্নে আসতেও দিতে চায় না। আর যদি সে আসে, যখন সে আসবে তখন ওরা কী করবে? ওরা ঝগড়া করে, ছিনিয়ে ছুড়ে ফেলে দেবে হয়তো তাকে। তার অপমান, কলঙ্কের সুন্দর ডালিকে।

    আতঙ্কে নিজের পেট দুহাতে জড়িয়ে ধরল সে। ঘা খাওয়া ক্রুদ্ধা সর্পিণীর মতো শূন্য ঘরটার চারপাশে দেখল তাকিয়ে তাকিয়ে। ওরা আজ ক্ষিপ্ত। মানুষের বাইরে। তার রক্তে, নাড়িতে নাড়িতে যে জড়িয়ে আছে, তাকেও ওরা তছনছ করতে আসবে এই ঘরটার মতো! ইস! লোটন বউ তো বাচ্চাখাগী বেড়াল নয়। সে পেটে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে বলতে লাগল, চলে যাব বাছা তোকে নিয়ে। আমার জাদুমণি, সোনামণি, ওদের সামনে এ সংসারে আনব না আমি তোকে।

    ক-দিন পর ভোববেলা নন্দ-হরিশের চিৎকারে হুলুস্থুল পড়ে গেল সারা বস্তিময়। সবাই সেখানে ছুটে এল। কী হয়েছে?

    লোটন বউ পালিয়ে গেছে!

    নন্দ হরিশ পাগলের মতো ছুটোছুটি শুরু করল এখানে সেখানে, মহল্লায় এলাকায়। জান পহচান আদমি আত্মীয়স্বজনের ঘরে।…নেই কোথাও।

    সারা দিন পরে একেবারে নিরাশ হয়ে তারা দুই ভাই হঠাৎ নিজেদের মধ্যে ঝগড়া লাগিয়ে দিল।

    ও বলে, তুই তো শালা রোজ আগে মারামারি করতিস?

    ও বলে, তুই তো করতিস।

    বলতে বলতে তারা হঠাৎ হাতাহাতি শুরু করে দিয়ে আবার নিজেরাই থেমে গিয়ে যেন অবাক হয়ে ঘরের খোলা দরজাটার দিকে তাকিয়ে থাকে। ছাই পোড়া উনুন, রান্নার সরঞ্জাম সব পড়ে আছে। পাতা আছে লোটন বউয়ের পিড়িটা। কালকের মারামারির সময় ওটা আর ভোলা হয়নি।

    গোবিন্দ এসে কাছে দাঁড়াতেই নন্দ বলে উঠল, বলেছিল সে, আমরা মারামারি করলে গলায় দড়ি লাগাবে।

    হরিশ জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা, তবে বাচ্চাটাও মরে যাবে তো?

    কথা না বলে সরে আসে হঠাৎ গোবিন্দ। আজকাল কেমন অস্থির অস্থির লাগে তার। নিজেকে বড় একা মনে হয়। জগতে সে যেন নিঃসঙ্গ। দুলারীর কাছে বার বার যেতে চায় মনটা, কিন্তু নিজের কাছেই যেন তার কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। অবসর সময়ে সে দুলারীর কাছে বসে নানান কথা বলে। আজকাল সে মহল্লায় মহল্লায় যায় গণেশের বন্ধুদের কাছে, তাদের সঙ্গে কারখানা কোম্পানি নিয়ে নানান কথা আলোচনা করে, আস্তে আস্তে সে এখানকার মজুর সংগঠনের মধ্যে জড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। যেন জলে জল টেনে যাওয়ার মতো সে এক জোয়ারের তরঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে ফেলছে। শুধু তাই নয়, তাকে না হলে আজকাল আসর বৈঠক জমে না। গোবিন্দের চরিত্রটা অনেকের কাছে আজ আদর্শস্থানীয় হয়ে উঠেছে। এই সব কারণেই আরও বিশেষ করে বস্তির মামলাটা যেন এ এলাকার সমস্ত বস্তিবাসীদের জয়-পরাজয়ের পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। শেষ নেই আলোচন-বিবেচনার। এমনকী যেচেও অনেকে জিজ্ঞেস করে, মামলাটা চালাতে পয়সাকড়ি কিছু লাগবে কি না। এ সমস্ত কথাই সে এসে বলে দুলারীকে। কিন্তু ভাল করে তাকাতে পারে না দুলারীর দিকে। কোথায় যেন খচ করে বাজে, নিজেকে নিয়ে আজ তার বড় ভয় হয়।

    দুলারী আজকাল কলে হাজিরা দিচ্ছে আবার। আবার কাজ ধরেছে। গোবিন্দকে কাছে পেলে খুশি হলেও তার কেমন যেন আড়ো আড়ো ছাড়ো ছাড়ো ভাব। সে হঠাৎ হাসে, হঠাৎ রাগ করে। কিংবা গোবিন্দ একটু কড়া কথা কিছু বললেই কেঁদে ফেলে! কোনও কোনও সময় গোবিন্দের দিকে তাকিয়ে তার বান্ধবীর বুক মুচড়ে ওঠে, মানুষটা যেন দিনকে দিন কী হয়ে যাচ্ছে। তারপর কী এক বিচিত্র চিন্তায় মন তার কোন অতলে হারিয়ে যায়, যেন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে নিজের দিকে। পরমুহূর্তে রান্নাঘরে ছুটে গিয়ে গোবিন্দকে বলে, হটো তুমি, আজ আমি পাকাব।

    সময় পেলেই সে আজকাল রান্নার কাজটা নিজের হাতে নিয়ে নেয়। শীত যায়, বসন্ত আসে। মিঠে মিঠে হাওয়া বয়। রাত্রির আকাশ ভরা তারা। পূর্বে কর্ড রোডের বন গাছপালা সরসরিয়ে হাওয়া ছুটে আসে। রেল লাইনের ওপাশ থেকে মিউনিসিপ্যালিটির ময়লা ফেলা ধাপা থেকে বয়ে আসে দুর্গন্ধ।

    শীতের শেষে আবার উঠোন জুড়ে আড্ডা বসতে আরম্ভ করেছে। বৈজু চামার প্রত্যহ পাঠক ঠাকুরের মতো রাজা হরিশ্চন্দ্রের কাহিনীর আসর বসায়। হাওয়ায় লক্ষ আর ফেঁসের শিসগুলি ধ্ব সময় অস্থির।

    সব ভোলা রসিকের হারমোনিয়মটার বেলো ফেটে গিয়ে পোঁ পোঁর চেয়ে ফোঁস ফোঁস শব্দই বেশি শোনা যায়।

    এর মধ্যে শুরু হয়ে গেছে শিশুদের যোগেড়ী নাচ আর দুর্বোধ্য ভাষায় খেমসা গান। অর্থাৎ এ হল পশ্চিম প্রদেশগুলোর হোলির আগমনী উৎসব। একটা ছেলেকে মেয়ে সাজায়, ভাঁড়বেশে সাজায় একটি পুরুষকে, ঝুমুরের ঝুমঝুম শব্দে সে টগবগ করে ছোটে আর গায়। কিন্তু শিশুদের নকল ঘোড়া নেই, দোসরদেরই একজনকে ঘোড়া সাজতে হয়।

    সেই রুগ্ন ছেলেটি তাকিয়ে দেখে। সে প্রায় অথর্ব হয়ে গেছে তবুও যোগেড়ীর ঘোড়সওয়ারকে দেখে আপন মনে বলে ওঠে :

    মাকি সায়েব, মাকি সায়েব, বিলেত চলেছে,
    ডানা কাটা পরী মেম, সঙ্গে চলেছে।

    বাপটা তার বেকার হয়ে কোথায় উধাও হয়ে গেছে। মা সারা দিন কুড়োয় কয়লা গোবর, এখানে সেখানে ছোটে কাজের সন্ধানে। এখন সে বেশিরভাগ সময় একলা থাকে। কখনও ফোটুন্টি চাচাকে পেলে আরম্ভ করে প্রাণ ভরে গল্প।

    সেই বুড়োটে গম্ভীর গলাটা কী রকম নিস্তেজ হয়ে এসেছে। কখনও জয়দেবের কৃষ্ণগাথা, কখনও তুলসীদাসের রামায়ণ সে একঘেয়ে সুরে বলে যায় আর ঈশ্বরের প্রতি দুরন্ত অভিমানে ভরে ওঠে তার গলা। আর নেই নেই শব্দে দিগন্ত মুখরিত। এটা নেই, সেটা নেই করে প্রত্যহ ঘরে ঘরে ঝগড়া লেগেই আছে। ছাঁটাই হওয়া ঘরগুলোর দিকে তাকানো যায় না।

    শুক্রবারের রাতটা নিঝুম হতে একটু সময় লাগে। হপ্তার দিন, দিন দেনা পাওনার, হিসেব নিকেশের।

    এইদিন মাদারি খেলোয়াড় তার দিনের শেষে খেলা দেখায় বস্তির উঠোনে। সপ্তাহান্তে, আমোদ আহ্বাদের সময়, খেলাটা জমে যায়, কিছু পাওনাও হয় মাদারি খেলোয়াড়ের।

    রাত হয়ে গেছে। গোবিন্দ আজকের মতো রান্নাঘর বন্ধ করে ঘরে যেতে গিয়ে একটা অদ্ভুত শব্দ শুনে দাঁড়িয়ে পড়ল। বেড়ার ফাঁকে দেখল, মাদারি খেলোয়াড়ের ঘরে আলো জ্বলছে। কী মনে করে গোবিন্দ উঁকি দিল বেড়ার ফুটো দিয়ে। ভিতরের দিকে দেখে স্তম্ভিত হয়ে রইল সে।

    দেখল ছেড়ে দেওয়া সাপ দুটো মাদারি খেলোয়াড়ের গায়ের উপর বার বার উঠে আসছে। খেলোয়াড় নিজে তার রোজকার ফ্যান একটা থালায় ঢেলে খানিকটা নুন মিশিয়ে আঙুল দিয়ে নাড়তে লাগল। অমনি সাপ দুটো কিলবিল করে তার গায়ের থেকে নেমে মুখ দিতে গেল ফ্যানের থালায়। সাপ দুটোর মুখে থাবড়া দিয়ে ফিসফিসিয়ে উঠল সে, ইস্টাপ…ডারলিন, নট নাউ।

    সাপ দুটো অপলক চোখে থালাটার দিকে তাকিয়ে কেবলি চেরা জিভ বার করতে লাগল আর খেলোয়াড় থালাটা তুলে এক নিশ্বাসে কোঁত কোঁত করে খেয়ে ফেলল অনেকটা ফ্যান। তারপর থালাটা নামাতেই সাপ দুটো হুমড়ি খেয়ে পড়ল থালার উপর।

    সে একটা আরামের শব্দ করে বলে উঠল, নট ফ্যান…ইসকো বোলতা মিল…দুধ। বলে আপন মনে হি হি করে হেসে উঠল, বলে সবাই, সাপে খায়! দ্যাটাজ ফোরটুয়েন্টি…হি হি…।

    লক্ষের আলো আঁধারিতে যেন লোকটাকে চিনতে পারছে না। গোবিন্দ। তার নিজের পেটের। মধ্যে যেন কী একটা পাক খেয়ে উঠল। ওহো! তাই মাদারি খেলোয়াড় বার বার ফ্যানের কথাটি বলতে ভোলে না। রোজকার পাওনা খাবারে পেট ভরে না তার। তাই, ভাই!। পরদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে খেলোয়াড়ের ফ্যানের পাত্রটিতে ফ্যান রাখার সময় গোবিন্দ এক দলা।

    ভাত তার মধ্যে ফেলে দিয়ে বলল, যা শালা, খুব কষে আমাদের ফোরটুয়েন্টি কর।

    রাতের নিরালায় ফ্যান ঢালতে গিয়ে ভাতের দলাটা দস করে পড়তেই চমকে উঠল খেলোয়াড়। বিকৃত মুখে সন্দেহ ভরে আঙুল দিয়ে নেড়ে চেড়ে যখন দেখল ভাত তখন সে নিঃশব্দ উল্লাসে মুখ ব্যাদান করে ফেললে।—ভাত-রাইস? আই সি!

    বলে ভাতগুলো আলাদা করে নিয়ে অস্থির সাপ দুটোর দিকে বাড়িয়ে দিল ফ্যান, বলল, নে হারামজাদীরা, আজ খুব করে খা।

    তারপর হেসে উঠে বলল, ফোরটুয়েন্টি মাদারিকা কানা চিড়িয়া বন গয়া। মেরা মাদারি! রোজ ওকে এমনি কানা করে দিয়ো।

    বুঝি মাদারির গুণেই গোবিন্দ রোজই কানা হয়ে যেত। কেবল নিজে খাবার সময় এ সংসারের উপর, নাকি নিজের উপরই তার রাগে ভরে উঠত মনটা।

    মাদারি খেলোয়াড়ের কথাটা দুলারীকে বলবে মনে করে সন্ধ্যার একটু পরে গোবিন্দ ঘরে ঢুকে দেখল দুলারী একেবারে একলা চুপচাপ বসে আছে। কারখানার কাপড়টাও ছাড়েনি। গোবিন্দকে দেখে একটু চমকে উঠল সে। এমনি চমকায় সে আজকাল। হাসে, কথা বলে, হঠাৎ চমকে যায়। গোবিন্দ বলল, কী ভাবছ একমনে? দোস্তের কথা?

    দুলারী হঠাৎ বলে উঠল, থাক তার কথা বলো না তুমি।

    বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল গোবিন্দ, কেন?

    দুলারী হঠাৎ কেমন হয়ে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমার সঙ্গে বসে বসে এত বাত তোমাকে করতে হবে না!

    গোবিন্দ একেবারে দিশেহারার মতো দু-পা এগিয়ে এসে বলল, কেন দোস্তানি?

    দুলালী মুখ ফিরিয়ে বলল তীব্র গলায়, তুমিই তো বেচারিকে উসকানি দিয়ে জেলে পাঠিয়েছ জানি না, না?

    গোবিন্দ নির্বাক, নিথর।

    দুলারী একেবারে তিক্ত গলায় হিসিয়ে উঠল, ওকে জেলে পাঠিয়ে তুমি আমাকে আমার সঙ্গে মহব্বত ফাঁদতে চাও, জানি না ভেবেছ? গোবিন্দের মনে হল সে অন্ধ হয়ে গেছে, বোবা হয়ে গেছে, কোথায় যেন তলিয়ে যাচ্ছে, কে যেন গরম শিক দিয়ে তাকে তাকে খোঁচাচ্ছে। সে যন্ত্রণায় ফিসফিস করে উঠল, দোস্তানি…দোস্তানি।

    বলতে বলতে সে ছুটে বেরিয়ে গেল।

    দুলারী চকিতে মুখ তুলে ডাকতে গেল গোবিন্দকে। কিন্তু তার আগে গোবিন্দ উধাও। দুলারী দু-হাতে মুখ ঢেকে ফুলে ফুলে উঠল কান্নায়। না না…।

    সম্বিত নেই গোবিন্দের। চলছে, যেন নিজের পায়ে নয়। একবার ভাবল মহল্লার দিকে যাবে। কিন্তু মোড় ফিরে নিউ কর্ড রোড পেরিয়ে, পুবের ঝোপে ঝাড়ে ছাওয়া অন্ধকার পথে রেল লাইনের দিকে এগিয়ে চলল। চলল যেন নিশি-পাওয়া অচেতন মানুষের মতো। অবশ, বিহুল। হুস হুস করে দানবীয় শব্দে ছুটে আসছে একটা রেলগাড়ি দক্ষিণ দিক থেকে।

    গোবিন্দের চোখের উপর ভেসে উঠল পুবের এই নাক বরাবর রাস্তাটা।… নীলগঞ্জ… বারাসত… বসিরহাট… ইটিন্ডেঘাট… ইচ্ছামতী! নোনা কালোবরণী ইচ্ছামতী মানুষের মনের ইচ্ছা পূরণ করেছে। …ও-পারে মুখ থুবড়ে পড়া ছুতোরের ঘর, ছুতোর বউ, মাটিমাখা হোঁতকা ছেলে, ছোট বিনুনির চুড়ো বাঁধা মেয়ে, আর…

    গাড়িটা এসে পড়েছে, ঝম ঝম ঝম ঝম…। কে? চোখের সামনে ভেসে উঠল অনেকগুলো মুখ। বাড়িওয়ালা, কালো, ফুলকি, নগেন, রুগ্ন ছেলেটা, গণেশ, ছাঁটাই, মামলা…দুলারী। মামলা!…মামলা!….

    ঘং করে একটা শব্দের সঙ্গে লাইনের গেটটা একবার ককিয়ে বন্ধ হয়ে গেল!

    কে? ফোরটুয়েন্টি? দুটো লোক দাঁড়িয়ে পড়ল।

    গোবিন্দ খানিকটা যেন বিস্ময়ের ঘোরে লক্ষ করল, দুটো ভিন মহল্লার লোক।

    রেল ইঞ্জিনের উত্তপ্ত হাওয়া ঝাপটা মেরে গেল চোখে মুখে।

    কোথায় চলেছ রাত করে? একজন জিজ্ঞেস করল।

    গোবিন্দ বলল, এমনি, ঘুরতে।

    লোক দুটো হো হো করে হেসে উঠে তার হাত ধরে শহরের দিকে এগুলো। বলল, পাগলা।…হ্যাঁ, ফোরটুয়েন্টি, মাঙ্গি ভাতা আদায়ের পিলানটা তুমি যা বাতলেছ, সেটাই–

    লোক দুটো বকবক করতে লাগল নানান কথা।

    একটা নিশ্বাস ফেলে বস্তির মধ্যে ঢুকল গিয়ে গোবিন্দ। সকলে খাওয়ার অপেক্ষা করছে তার, জন্য। থালা নিয়ে ভিড় করেছে সবাই রান্নাঘরের দরজায়। চিৎকার করে ডাকছে ফোরটুয়েন্টিকে।

    মনের মধ্যে একটা ভাবনা কেবলি আনাগোনা করতে লাগল, মাছ ডাঙায় উঠলে মরে। এ সংসার ছেড়ে মানুষ কোথায় খুঁজবে মুক্তি। আজ তাকে মিথ্যা সন্দেহ করেছে দুলারী। অপমান করেছে। মানুষ যখন তার প্রাণ-ধনের অদর্শনে ব্যাকুল হয়, তখন যে তার সব সত্যি মিথ্যে একাকার হয়ে যায়। নিজেকে নিয়ে সে ফাঁপরে পড়ে। দিক-পাশ জ্ঞান থাকে না! দুলারী পুড়ছে। পুড়ে পুড়ে সোনা হবে। সেইদিন সব সংশয়, সব মিথ্যা দূর হয়ে দেখা দেবে সত্য। সে সত্য অনেক দূরে হয়তো। তা বলে মৃত্যু-শক্তি! ছি ছি! ছিঃ!

    বেলা এগারোটা। গোবিন্দ বসে আছে বাইরের রকে। বাড়িওয়ালা বসে রয়েছে পাশে। গোবিন্দ তাকে বোঝাচ্ছে মোকদ্দমার আসল অবস্থাটা।

    ঠিক এ সময়েই এল ফিটফাট বেঁটে বিরিজমোহন। সঙ্গে একটা ডাকঘরের পিয়ন।

    এই যে বাবুসাহেব, জয় গোপালজি। এ পিয়নটা আপনার দৌলতখানা খুঁজছিল, তাই দেখাতে নিয়ে এলুম।

    পিয়নটা একটা খাম আর পেন্সিল বাড়িয়ে দিয়ে একটা জায়গা দেখিয়ে দিয়ে সই করতে বলল।

    বিরিজমোহন বলল, বাবুসাহেবের আঙুলে কালি লেপে দাও, টিপসই দেবেন। মানে উনি আবার—

    বাড়িওয়ালা প্রথম মুখ খুলেই বলল, আমি কোনও শুয়োরের বাচ্চার মতো মুরুখ নই। বলে বড় বড় অক্ষরে খাপছাড়া ভাবে সই করে দিল। চিঠিটা একটা হিন্দি ভাষায় নোটিশ-ঠিকা মেয়াদ আগামী তিন মাসের মধ্যেই শেষ হবে। তার মধ্যে যেন জমি খালাস করে দেওয়া হয়।

    বিরিজমোহন ব্যাপারটা জেনেই চোখ পিটপিট করে পকেট থেকে সেই রাংতার মোড়ক খুলে সিদ্ধি বের করে বলল, বাবুসাহেব?

    বাড়িওয়ালা বলল, চোরের মালে থুক দিই।

    বিরিজমোহন নিজে একটি গুলি গিলে বলল, হ্যাঁ বাবুসাহেব, আপনার এখানে যে খুব একটা চালু ছোকরা আছে, ফোরটুয়েন্টি নাম। সবাই তার কথা বলে, কিন্তু আমি তো চিনিনে।

    নিশপিশ করে উঠছে বাড়িওয়ালার হাত পা বেঁকিয়ে উঠল, কোনও জুয়াচোরই ওকে চেনে না।

    বিরিজমোহন হেসে বলল, আপনি চটে যাচ্ছেন বাবুসাহেব। কিন্তু আমি ভাল মনেই বলছি তা সে চারশো বিশ আপনার মামলাটা কী রকম চালাচ্ছে।

    মুহূর্তের জন্য গোবিন্দ ভুলে গেল অন্য সব কথা। লোকটার নিষ্ঠুর ভাঁড়ামি সে সহ্য করতে পারল না। কাছে উঠে এসে সে বলল, কী দরকার আপনার?

    তুই কে রে? লোকটা দাঁত খিচোল।

    আমি যে-ই হই, তোমার আর কী বলার আছে? শক্ত হয়ে উঠেছে গোবিন্দের হাত। কিন্তু বিরিজমোহন বাড়িওয়ালার দিকেই ফিরে বলল, তা হলে আপনার পাকা মোকামের পিলানটা

    রসিকতাটুকু শেষ না হতে থস করে এক গাদা গোবর বিরিজমোহনের গিলে করা পাঞ্জাবির বুকে এসে পড়ল যেন একটা পালটা রসিকতার মতো। মুহূর্তে খেপে বারুদ হয়ে উঠল বিরিজমোহন, কোন শালা রে? বলতেই খানিকটা কাদা এসে পড়ল তার নাকে মুখে।

    বাড়িওয়ালা হা হা করে হেসে উঠল। বলে উঠল, আরে ছি ছি, কেয়া বাত। হোলি আ গয়া?

    বিরিজমোহন লাফিয়ে খানিকটা দূরে সরে গিয়ে খিস্তি করতে লাগল। কিন্তু গোবর কাদার বৃষ্টি থামল না।

    বিরিজমোহন যখন ছুটে পালাতে বাধ্য হল, তখন সদী বুড়ি বেরিয়ে এল বস্তির ভিতর থেকে হাত, ভরা কাদা গোবর আর একপাল ছেলেমেয়ে নিয়ে। ছেলেমেয়েগুলির হাত-ভরতি কাদা গোবর। কিন্তু বাড়িওয়ালার মুখে আর একটুও হাসি নেই। সে বলে, ফোরটুয়েন্টি, তা হলে মামলাটা একেবারে ধোঁকা দিচ্ছিস আমাকে।

    গোবিন্দ স্তম্ভিত, নির্বাক। বুঝি তার প্রতি সকলের অবিশ্বাস ও অপমানেরই পালা পড়েছে আজকাল। বাড়িওয়ালা বলল, কথা বলছিস না যে? এতদিন যে মামলা খরচের পয়সা নিয়েছিস, সে সব—তাহলে—

    গোবিন্দ যেন জ্বলে উঠল, বলল, সত্যি তুমি মুখ, যা বোঝ না, তা নিয়ে কথা বলো না।

    বলে সে সেখান থেকে সোজা মাঠ ভেঙে রাস্তার বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

    আশ্চর্য কোথা থেকে কী হয়ে গেল। বাড়িওয়ালা নিজের কপালটা চাপড়ে বারবার বলতে লাগল, কেবলি ঠকতে জন্মেছি এ জীবনে, কেবল ঠকতে।

    চাঁদ উঠেছে।

    ফাল্গুনের হাওয়া মাতাল। সে হাওয়ায় ভেসে আসছে পেপার মিলের দুর্গন্ধ। বস্তিটাকে মনে হয় দেওয়ালের একটা বেড়া। চালার খোলাগুলো রোদে জ্বলে কালো হয়ে দেখাচ্ছেন যেন সারি সারি ময়াল সাপের রেখা। চাঁদের আলোয় নর্দমার পাঁকে কী যেন ঝিকমিক করে নড়ে। মাতাল বাতাসে তার গন্ধ উঠে আসছে।

    উঠোনে বসেছে ছোট ছোট আসর। হারমোনিয়ামের শব্দ শোনা যাচ্ছে প্যাঁ…পো..। অনেকগুলো গলার গান শোনা যাচ্ছে একসঙ্গে। তার মধ্যে মিশে গেছে সেই বুড়োটে গলার গান, কোনও ঘরে ঝগড়া চলছে, কোনও ঘরে হাসি, কেউ বা কাঁদছে।

    একদল বাচ্চা খেলা করছে উঠোনে।

    সেই রুগ্ন ছেলেটা রকে চিত হয়ে শুয়ে হাঁ করে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে, তার পাশে বসে আছে গোবিন্দ। ওর মা গেছে গোবিন্দকে বসিয়ে কোথায় কোন কুঠিতে, কাজের জন্য। ছেলেটার গায়ে অসহ্য জ্বর। ওর তাপে মাটি তেতে উঠেছে। গোবিন্দ আজকাল যেন খানিকটা একঘরে হয়ে গিয়েছে। বাড়িওয়ালার সঙ্গে তার খুবই কম কথা হয়। তাও হয়তো হত না, যদি না সে একটা অডার পেত কোর্ট থেকে। সেই অডারে ছিল, মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত জমি বর্তমান দখলকারীর দখলেই থাকবে।

    গোবিন্দ ছেলেটার গায়ে হাত দিয়ে দেখল একবার, জ্বরটা যেন কমছে একটু।

    ফিসফিস করে ডাকল, ছেলেটা, ফোটুন্টি চাচা!

    বল বাবা।

    মাকি সাহেব!

    কোথা?

    ছেলেটা একদৃষ্টে চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল। গোবিন্দও তাকাল চাঁদের দিকে। পূর্ণ চাঁদ যেন আকাশের কোল জোড়া সোনা।

    ছেলেটা ফিসফিস করে বলল, উ-ই যে। চাঁদের মধ্যে হাঁটছে, খট খট খট। মাকি সায়েব বলছে, হেঁয়ো ছোকরা, আও আও। আমি যাব।

    গোবিন্দ সেই ফিসফিসানি শুনতে শুনতে তন্ময় হয়ে গেল। তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রইল চাঁদের দিকে। যেন সেও দেখতে পাচ্ছে মাকি সায়েবকে। ডাকছে, আও আ-ও।…

    ছায়া ঘিরে এল যেন চাঁদে। দৃষ্টিটা কোথায় হারিয়ে গেল গোবিন্দের।

    দুলারীর সঙ্গে তার একেবারেই কথা নেই। কখনও মুখোমুখি দেখা হয়, হয়তো দুজনেই থমকে দাঁড়ায়। একজন অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে নীরবে। ভুলেও চোখাচোখি করে না। যেন, আরও যদি কটুকথা বলতে চাও, বলো। আজকে যে শুধু মেঘ। মেঘ ও অন্ধকার। আর একজন অপলক চোখে তাকায়। ঠোঁট কাঁপে থরথর করে। ভূজোড়া ওঠানামা করে। জ্বলে ওঠে বুক। কিছু যেন বলতে চায়। বলতে চায়, পারে না। মুখে আঁচল চেপে চলে যায়। ভাবে, ওরা যে পুরুষ। মরদ। নিরেট পাথর, নিষ্ঠুর ক্ষমাহীন!

    এমনি নীরবে দেখা আর চলে যাওয়া।

    গোবিন্দ এখানকার কাজটুকু শেষ করেই বাইরে চলে যায়। সারা দিন কোথায় কোথায় ঘোরে। বস্তিতে কোনও সময় দেখা যায়, ঝিবহুড়িদের কাজের ফাঁকে সে তাদের বাচ্চাদেরও কোলে করে রাখে, এর তার খুঁটিনাটি কাজ করে দেয়। বাইরে থেকে মনে হয় বস্তিটার কোনওই বুঝি পরিবর্তন হয়নি। তবু ঠিক যেন আগের মতো নেই!

    ফুলকির সঙ্গে কালো সেই যে চলে গেছে, আজ অবধি আসেনি। গোবিন্দ শুনেছে ফুলকির কী একটা কালরোগ হয়েছে, অথর্ব হয়ে গেছে। কেউ ছোঁয় না কালো ছাড়া। কালো খাওয়ায়, রোগের সেবা করে। এইবারটি যে তার শেষবার, সে বলেছিল। জানটা যে তার কাছে শস্তা নয়!

    একটু পরেই রুগ্ন ছেলেটার মা এল। এসেই ছেলের গায়ে হাত দিয়ে চিৎকার করে উঠল, হায় রাম রাম—এ কী গোভূতের কাছে ছেলেটাকে রেখে গেছি গো!

    গোবিন্দ একেবারে ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। বলল, কী হয়েছে মা?

    মা তেমনি ভাবেই বলল, বলে কী গো চোখ খেগোটা? বাছা যে আমার মরেছে!

    বলে সে তার ছেলের মুখ থেকে হঠাৎ জ্যান্ত কয়েকটা কৃমি টেনে বার করে ফেলল। কিন্তু ছেলেটা তখন মরে গেছে। যেন অবাক ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে আছে চাঁদের দিকে। তার চোখের মণির অতলে চলে গেছে চাঁদের কণা।

    জ্যোৎস্নায় কীটগুলো কিলকিল করছে। সবাই এসে দাঁড়াল সেখানে।

    মা তার একটানা গলায় কাঁদতে লাগল, ওরে বাবা…মাকি সায়েবের বিলেত দেখা তোর যে হল। এমন যমের কাছেই তোকে রেখে গেছলাম।

    নির্বাক হতভম্ব গোবিন্দের দিকে সবাই এমনভাবে তাকাল যেন সত্যি যম দেখছে।

    চাঁদ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে বস্তিটার দিকে।

    কে একটা বহুড়ি শিউরে উঠে গোবিন্দকে দেখিয়ে বলল, হায় রামজি ওর কাছে আমার বাচ্চাকে দিয়ে আমি আমার কাজ করি। আর কভি নয়।

    দুলারীও সকলের আড়াল থেকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে গোবিন্দের দিকে। হঠাৎ তার বুকটা কেমন টনটন করে ওঠে ওই হতভম্ব মুখটার দিকে চেয়ে। কী যেন ঠেলে আসে গলার কাছে। কিন্তু কিছু না বলে সে তাড়াতাড়ি ঘরের অন্ধকার কোলে মিশে যায়।

    হাওয়া মাতাল হয়েছে। মাতাল হয়ে উঠছে বস্তি। এবার ফাগুয়া পডেছে চৈত্র মাসের একেবারে শেষে, বৈশাখের লাগোয়া।

    কাজের অবসরটুকু ঢোল করতাল ও গানের শব্দে মুখরিত। কারও খেয়াল নেই যে-কোনও মুহূর্তে তাদের এখান থেকে উঠে যাওয়ার হুকুম আসতে পারে।

    গোবিন্দের মন অস্থির, কিন্তু ধীর। মামলার শেষ শুনানির দিন এসে পড়েছে। আর মাত্র। মাসখানেক বাকি। এটা শেষ না হলে সে বিদায় নিতে পারছে না।

    বাড়িওয়ালা যেন হতাশায় ভেঙে পড়েছে। সে গোবিন্দকে শুনিয়ে শুনিয়েই বাইকে বলছে, তলপি গোটা সব…আর আমার কাছে তোদের রাখতে পারলাম না।

    গোবিন্দ বোঝে, এ শুধু তার উপর রাগ নয়। বাড়িওয়ালার জীবনের সব শেষের আশা ধূলিসাৎ হওয়ার যন্ত্রণা।

    উকিলের কাছে বারবার গিয়েও কোনও আশা পাচ্ছে না গোবিন্দ। একবার ভেবেছিল, এ বাড়ির সবাইকে নিয়ে সে একটা ডেপুটেশন নিয়ে যাবে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। কিন্তু তাতে মামলার ফল রোখা যাবে না। একদিন উকিল বলল, গোবিন্দ, তোমাকে ভাল জানি, তাই বলছি। তোমাদের বস্তিটার উপর দেখছি পুলিশেরও নজর আছে! মহকুমা হাকিমের কাছে থানার বড়বাবু একটা প্রাইভেট রিপোর্ট পাঠিয়েছে। সুপারিশ করেছে উচ্ছেদের।

    গোবিন্দ বলল, বাবু, ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে একবার বস্তিটা ঘুরিয়ে দেখিয়ে দিন…।

    উকিল জিভ কেটে বললেন, মাখা খারাপ! এত বোঝো, তুমি, এটা বুঝলে না? তা হলে প্রমাণ হয়ে যাবে, আমি থানার চিঠির সংবাদটা জোগাড় করেছি। আমাকে আর প্র্যাকটিস করতে দেবে না,

    তা হলে এ-সব কাজ ভেতরে ভেতরে চলছে। তোমাদের শত্রু বড় শক্ত।

    কিন্তু গোবিন্দ যেন ইহজগতে নেই। সে পাগল হয়ে গেছে। প্রায় পাগলের মতোই কেবলি গোবিন্দ ছোটে উকিলের বাড়িতে। আবার একদিন উকিল বলল, দেখো, আমার যা করার করব। তুমি যদি একটা ব্যারিস্টার আনতে পারো, তা হলে খুব ভাল হয়।

    গোবিন্দ একেবারে ভেঙে পড়ল, ব্যারিস্টার কোথা পাব বাবু?

    উকিল বলল, তোমাকে আমি একটা ঠিকানা দিচ্ছি কলকাতার। সে ঠিকানায় গিয়ে তুমি যদি সব বলতে পারো, তা হলে সে বিনা পয়সায়ও আসতে পারে। লোকটা গরিবের বন্ধু। পারবে যেতে?

    পারব, বলল গোবিন্দ। কি না পারে সে। এখন যা বলো, তাই। প্রাণ বলল, সেটাও তুচ্ছ হয়ে গেছে।

    তিনদিন গোবিন্দের কোনও দেখা নেই।

    বাড়িওয়ালা সকলের সামনে বসে বসে তাকে খিস্তি করছে, গালাগালি দিচ্ছে। ফোরটুয়েন্টির কাণ্ড দেখে সবাই অবাক হয়েছে! লোকটা গেল কোথায়। মামলার শেষ দিন যে ঘনিয়ে আসছে। সমস্ত এলাকায় মহল্লাতেও তার কোনও পাত্তা নেই।

    তিনদিন পরে দেখা গেল রুগ্ন ক্ষীণজীবী উসকো-খুসকো গোবিন্দ এসে, আবার হাজির হয়েছে। সবাই তার দিকে একবার তাকিয়ে দেখল, কিন্তু কোনও কথা বলল না।

    গোবিন্দও কোনও কথা না বলে, নিজের কাজে লেগে গেল আবার স্বাভাবিকভাবে। কাজের শেষে সারাদিন বাইরে থাকে। বাড়িওয়ালা কিছু বললে বলে, একটা কাজ খুঁজছি কারখানায়।

    এ চৈত্র হাওয়াতে বুঝি দুলারীর বিরহ আর বাধা মানতে চায় না। সে বারবার পা বাড়ায় গোবিন্দের কাছে যাওয়ার জন্য। সে খুলে বলতে চায় তার বদ্ধ হৃদয়ের সমস্ত কথা। একবার গোবিন্দের মুখে তার জেলবন্দি বন্ধুর নামটি শুনতে চায়। একটু ভরসা চায়। সে বলুক, দোস্ত আমার ভাল আছে গো দোস্তানি। সে ভুল বলে। এই বলে গোবিন্দ হাসুক, হেসে তাকে কাঁদাক।  আর দুলারী এ বস্তির মানুষগুলিকে একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিক, গোবিন্দ কাউকে ফাঁকি দিতে চায়নি, ঠকায়নি, সে যম নয়। কিন্তু দুলারী তাকে আড়াল থেকে দেখে, কখনও কাছে আসতে পারে না। গোবিন্দও দেখে, কিন্তু সেটা যেন স্থবিরের চাউনি। তাতে কোনও ভাব নেই, বোধ নেই। তার বোবা বুকে কী কথা লুকানো আছে, কেউ তা জানতেও পারে না।

    বুঝি সে সত্যিই যম হয়েছে,এমনি নির্বাক হয়ে সে সবাইকে দেখে। কেবল সদী বুড়ি আর মাদারি খেলোয়াড়ের সঙ্গে সময় পেলেই বকবক করে। রান্নার কাজটা আজকাল তার আর কিছুতেই জমে না। দুলারীও আসে না সাহায্য করতে।

    একদিন সে একটা মস্ত বড় গর্ত খুঁড়ে দিয়েছে বাচ্চাদের পায়খানার জন্য মায়েরা যতই আগলাক, ফোটুন্টি চাচাকে কেউ ছাড়তে পারে না।

    এর মধ্যেই একদিন রাতে খাওয়ার পর মাদারি খেলোয়াড় চেঁচিয়ে উঠল, দ্যাটাজ কোল ফোরটুয়েন্টি কা খেল। দেখ একবার শালারকাজ। হিয়ার..ফ্যান উইথ রাইস…শালা রোজ এমনি ভাত নষ্ট করে মাইরি। বলে সে ফ্যানের ভেতর থেকে একদলা ভাত তুলে ফেলল। মানুষ কী বিচিত্র! কী বিচিত্ৰতর তার মন বুঝি মাদারি তার এ মুহূর্তের মনের চেহারাটি নিজেও চেনে না।

    সবাই একযোগে গোবিন্দের হতবাক মুখটার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল—

    শালা ফ্যান ঢালতে জানে না।

    কে বলল,তাই আমার ভাত রোজ কম পড়ে।

    আর একজন বলল, মাইরি, আমারও পেট ভরে না।

    একদলা ভাতের জন্য হঠাৎ সকলের ক্ষুধার অভিযোগ হুড়মুড় করে ঝরে পড়ল। কিন্তু গোবিন্দের দিকে তাকিয়ে মাদারি খেলোয়াড়ের মুখটা বিকৃত হয়ে উঠল। ভাতগুলো চটকাতে চটকাতে সে বিড়বিড় করে উঠল, ব্যাড…দুনিয়া…আই ফল…ডেম ইস্টাপেড…আমি-আমি।

    গোবিন্দ চুপ করে রইল তবু। তার চোখের দিকে তাকিয়ে কী যেন বলতে এল মাদারি। পারল না, কেবল ব্যাগপাইপে ফুঁ দেওয়ার মতো তার গলার শিরগুলি ফুলে উঠল।

    গোবিন্দের চোখের উপর ভেসে উঠল, মাদারির ফ্যান ঘেঁকে সেই ভাত খাওয়ার কথা। আর আজ সে কাকে ফোরটুয়েন্টি করল, কে জানে। তার বিশ্বাস কাঁপতে লাগল থরথর করে।

    দুলারীর কথা সে ঠিক ভেবেছিল। দুর্দিনে সংশয় ও অবিশ্বাস মেঘে ঢাকা পড়েছে। কিন্তু মাদারির বেলায়ও যে তা-ই সত্য, এটুকু তার মনে রইল না।

    সন্ধ্যার ঘোর আঁধারে গোবিন্দ কালোকে দেখতে গেল একবার। হয় তো কালোও বিরূপ হয়ে আছে আজ তার প্রতি।

    অন্ধকার অলিগলি দিয়ে একটা প্রকাণ্ড বস্তির সামনে এসে দাঁড়াল সে। বিরিজমোহনের অনেক বস্তি। এটি তার মধ্যে একটি বস্তির। মধ্যে ঢুকে একটু বিপদে পড়ল সে। কালোর ঘর চেনে না। কাউকে জিজ্ঞাসা করাও মুশকিল এমনিতে কারও খেয়াল নেই। যে খুশি সে যাচ্ছে আসছে। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। এ বস্তি আরও ননাংরা ও ভয়াবহ। উঠোনের বুকে আদিকালের পাঁক ও নোংরা-পুকুরের মতো ছড়িয়ে আছে। পা বাড়ালে হাঁটু অবধি ড়ুবে যাবে। গোবিন্দকে যদি কেউ চিনতে পারে ক্ষতি নেই। বিরিজমোহন টের পেলে শ্রীঘর চালান দেবে।

    হঠাৎ কে যেন তার কানের কাছে বলে উঠল, ফোরটুয়েন্টি। গোবিন্দ চমকে তাকিয়ে দেখল, নয়াবাড়ি কারখানার একজন মজুর! লোকটা খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠল। হাত ধরে দাওয়ায় নিয়ে তুলল তাকে। এদিক ওদিক করে আরও অনেকে এসে ঘিরে বসল তাকে। সকলেই গোবিন্দের নতুন পরিচিত। সকলেরই জিজ্ঞাস্য, বস্তির মামলটার কী হল? তোরা জিততে পারবে তো? কেউ বলল, বিরিজমোহন শালা দিনরাত ফন্দি খাটাচ্ছে। বাঙালি জমিদারবাবুও হাত মিলিয়েছে ওর সঙ্গে।

    মগর হাঁ, আলবাত তুমি ফোরটুয়েন্টি। তোমাকে ওরা উকিল, ব্যারিস্টার, সরকার খিলাপ-আদামি, যা খুশি তাই ভাবছে। তোমার কথা ভেবেই ওদের শালা মাথা খারাপ হয়ে গেল।

    সকলেই জানতে চায়, জিত হবে কিনা। তারা বিরিজমোহনের পরাজয় চায়। জিত চায় গোবিন্দের। গোবিন্দ খালি বলল, ওদের আইনের কাজ। আইনের ফয়সালায় যা হয়, তাই হবে। ভাঙা বেড়া, ফুটো ঘর, কে চায় বলে? কিন্তু উচ্ছেদ করলে আমরা মাথা গুজব কোথায়?

    এ অঞ্চলের সর্বত্রই নয়াসড়কের বস্তির কথা। সকলের মনে উত্তেজনা, রাগ ও ঘৃণা। সকলেই অপেক্ষা করছে ফলাফলের জন্য। যেন আর একটা মস্ত বড় ছাঁটাই আসন্ন।

    তারপর গোবিন্দকে তারা কেউ বিড়ি দিল। ভাল করে বানিয়ে দিল খইনি। খাওয়ার নেমতন্ন করল অনেকে। চা দিল খেতে।

    গোবিন্দর বুকের মধ্যে একটা নিঃশব্দ কান্না গুমরে উঠতে লাগল। এ আপ্যায়ন সে পেয়েছিল

    ওখানেও। কিন্তু কী হল সেখানে। কী হল আজ ওদের।

    সে বলল, কালোর সঙ্গে দেখা কররে একবার।

    অমনি সকলের মুখগুলি রাগে ও ঘৃণায় কুঁচকে গেল। বেতমিজ, উল্লুক কালো। একটা জানোয়ার। ঘিয়ে ভাজা নেড়ি কুত্তার মতো একটা রেন্ডি হল ফুলকি, মরবার জন্য ধুকছে। তার সেবা করছে কালো। সেল সায়েবের মেম বিলাত থেকে এসেছে, এখন তাড়িয়ে দিয়েছে। ওর আর কী আছে। ও তো মরবে।

    ঘর দেখিয়ে দিল তার, ঘরে ঢুকেই একটা দুর্গন্ধ পেল গোবিন্দ। দেখল বাতি জ্বলছে। রীতিমতো দেশি হ্যারিকেনের আলো। আর সবই নোংরা। জামাকাপড় থালা বাসন যেন দলা দলা ময়লা। কালো হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো ফুলকির গায়ে। গোবিন্দকে দেখে বলে উঠল, তুমি এসেছ? এসো এসো।

    হাসল কালো। ফোকলা মাড়িতে, সে হাসি শিশুর মতো।

    ফুলকি তাকাল। লাল চোখ! খানিকক্ষণ পর বলল, ফোরটুয়েন্টি? হাসল। সেই তীব্র হাসিই যেন। বলল, এসো গো এসো। পরানটা জুড়োল তোমাকে দেখে মাইরি!

    গোবিন্দ বসল গিয়ে কাছে। শুকিয়ে পুড়ে ফেটে ফেটে গেছে ফুলকির মুখের চামড়া। কুৎসিত। সামনে এসে তাকালে মনে হয়, ভয়ংকরদর্শনা রাক্ষুসী যেন। মাথার চুলগুলি উঠে গেছে যেন চরা পড়েছে নদীর মাঝখানে। মুখটা একবার যন্ত্রণায় কুঁচকে উঠল। তারপর আবার হেসে বলল, এমনিই ছিলুম দেখতে কয়েকমাস ধরে। টের পাওনি, রং-মাখতুম যে। রং মেখে সব ঢেকে রাখতুম মাইরি। আয়নাটা ভেঙে ফেলেছি মুখ দেখব না বলে। কালোর চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, আমি এখনও কত সুন্দরী মাইরি, কত সুন্দরী। ইশারা করলেই ঝাপিয়ে পড়বে বুকে। কিন্তু তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝছি, আয়না ভাঙলে কী হবে। আসল আয়নায় ঠিকই দেখা যাচ্ছে।…

    একটু অপ্রতিভ হল গোবিন্দ। চোখে তার ঘৃণা ফুটে উঠেছে। ঘৃণা কেন? বিস্মিত তো সে একটুও হয়নি। এ তো সে জানত। জানা কথা, একদিন এই হবে। নগেনকে সে তাই বলেছিল। আজ থাকলে কী বলত নগেন।

    গোবিন্দ বলল, ফুলকি, তোমাকে আমি ঘেন্না করিনে।

    ফুলকি বলল, কেন করো না, তুমিই জানো। মন্দকে ঘেন্না করাই তো ঠিক।

    তুমি কি মন্দ? তোমার রোগ মন্দ।

    না, আমিও মন্দ। সে বুঝত তোমাদের নগেন। মন্দ না হলে সেল সায়েবের কুঠিতে যেতুম? বলে এক মুহূর্ত চুপ করে আবার বলল, সায়েবের কুঠিতে, ঘরের মেঝেয় মুখ দেখা যায়। কী ঘর! আর কী জিনিস! সেই ঘরে আমাকে রানী করেছিল সেল সায়েব। অমন বিছানা তোমরা চোখে দেখোনি গো কোনওদিন। শুলে পরে মনে হত কোথায় তলিয়ে গেলুম মাইরি! মেমসায়েব শোয় ওখানে। পালকের বিছানা। আর মদ! সগগের অমর্ত। এক বোতলের দাম শালা দেড়শো টাকা। কে না যেতে চায়, বললা। সোমসারে এত আরাম, এত সুখ, এত ভোগ ঐশ্বিয্যি।

    কালো অনেকবার শুনেছে। তবু হাঁ করে শশানে এখনও। গোবিন্দ বলল, হ্যাঁ ফুলকি, ওদের অনেক সুখ, অনেক ভোগ। তুই দুদিনের জন্যে…

    না না না, ও কথা বলল না। ফুলকি বলে উঠল, রোগ আমাকে সায়েব দেয়নি পেখমে। দিয়েছে এক বাবু। ছোটখাটোতে মন উঠতে না আমার। নিজের দেশ থেকে পেখম বেরিয়েছিলাম যার সঙ্গে, সে আমাদের পাড়ার এক কেরেস্তান মিলিটারির চাকুরে। মাদ্রাজ শহরে তার বড় বাড়ি। আমার কি মধুর বুলিতে মন ওঠে? মিছে রাগ নয় নগেনের? আমি সুন্দর খুজেছি, বাড়ি চেয়েছি, ঝকমকে তকতকে। পেয়েছিলুম অনেককে। সবাই চেয়ে খেয়ে ছেড়ে দিল। কী করব? ওদের রাঁড় হয়ে রইলুম চিরকাল। তোমাদের নগেন বুঝত না। ওকে বললা…

    গোবিন্দ বলল, সে চলে গেছে।

    গেছে? আবার যন্ত্রণায় কাতরে উঠল সে। কালোকে দেখিয়ে বলল, তবে একেও নিয়ে যাও।

    গোবিন্দ তাকাল কালোর দিকে। কালো গোবিন্দের দিকে। দাঁতহীন মাড়িতে হেসে বলল, এমনি বলে। পাগলি। বলে সে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল ফুলকির।

    গোবিন্দ গালে হাত দিল ফুলকির। মনে হচ্ছে তপ্ত লোহা। হাত পুড়ে যায়। ফুলকি চমকে উঠে বলল, ছি ছি, হাত দিয়ো না। বিষ! একেবারে বিষ!

    গোবিন্দ বলল, চিকিচ্ছের কী হচ্ছে?

    কালো বলল, এখানকার ডাক্তার বলেছে, কলকাতার হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। এখানে কেউ সারাতে পারবে না। ও যেতে চায় না। ফুলকি এর মধ্যেও ফুসে উঠল, তোমার মরণ! শখ থাকে অন্য মেয়ে মানুষ দেখোগে। কলকাতায় নিয়ে ভাল হয়ে আমি তোমার কাছে শুতে পারব না।

    কালো আবার বলল, পাগলি!

    ফুলকি বলল, ফোরটুয়েন্টি দোহাই, দুলারীর মতো ফোরটুয়েন্টি করো না আমাকে। ওর গণেশ আছে, তুমি আছ, সকলে আছে। সেই ওর সগগ। আমার সগ মরণ। তবে মরণের আগে একটা কথা জানতে ইচ্ছে যায়। নয়া সড়কের বস্তির কী হবে?

    সেই কথা। নয়াসড়কের বস্তি! মরবার আগেও ফুলকি জানতে চায়। আবার বলল সে, ফোরটুয়েন্টি, যতটা পারো, করো। তুমি ভরসা। ভরসা। গোবিন্দ ভরসা। বিদায় নিল সে। কোথায় যাবে সে বস্তিতে? না, তার চেয়ে উকিলের বাড়িই ভাল। যদি আরও কিছু বাকি থাকে।

    গোবিন্দ যাওয়ার সময় কালো বলল, ফাঁক পেলে আবার এসো।

    ফুলকি কয়েকবার ককিয়ে ডাকল, কালো।

    বলো।

    তুমি আমাকে এটুস সুখে মরতে দেবে না?

    আটকাইনি তো।

    আটকাওনি তো কি। তোমার সেবায় যদি বেঁচে যাই।

    যদি বেঁচে যায়! মুখটা হাঁ হয়ে গেল কালোর। জানোয়ারের মতো।

    আর চোখ দুটো থেকে খোঁচা খোঁচা গালে জল গড়িয়ে এল।

    ফুলকি বুকের ঢাকনা খুলে ফেলল। এখনও নিভাঁজ। মুখের মতো শুকিয়ে পুড়ে যায়নি চামড়া। এখনও সুন্দর পুষ্ট। সুউচ্চ বুকের তলায় গাঢ় অন্ধকার। নীচে অস্পষ্ট পেট। তার ক্ষীণ কটিদেশ। সেইখানে রোগের চিহ্ন ইতস্তত ছড়ানো, স্পষ্ট। কালোকে বলল, এসো। মরতে চাও, আজকের রাত থেকে কাল চলে যেয়ো। তোমার আশা পূরণ হোক।

    কালো তাড়াতাড়ি ঢাকা দিয়ে, বুকে মুখ গুঁজে বলল, না না, এ মরণ আমি চাইনি ফুলকি। আমি তোমাকে চেয়েছিলুম। তোমাকে।

    আমাকে? এই তো আমি।

    না। এ তো তুমি অনেককে দিয়েছ। যা তুমি কাউকে দাওনি, তাই আমি চাই।

    সে কী বস্তু কালো?

    তোমার মহব্বত।

    দুচোখ বড় বড় করে বলল, মহব্বত কী কালো। আমাকে বলল, বলো।

    মহব্বত, মহব্বত। সে আবার কী, আমিও যে জানিনে।

    তবে? মহব্বত। সে কী জিনিস, কী জিনিস।…চাপা গলায় খাঁ খাঁ করে বোকার মতো গোঙানি উঠল ফুলকির গলায়। গোঙানিটা কালোরও বুকের মধ্যে খুঁয়ে ছুঁয়ে উঠতে লাগল।

    দুদিন পর মারা গেল ফুলকি। মরবার আগে সে বলছিল, কালো, মরলে যখন নিয়ে যাবে পোড়াতে, আমাকে সাজিয়ে নিয়ে যেয়ো। কেউ যেন আমাকে ঘেন্না না করে, কুচ্ছিত না দেখে।

    তাই করেছে কালো। স্নাে পাউডার আলতা কাজলে সাজিয়েছে তাকে কালো। তারপর নিয়ে গেছে। প্রথমে কেউ আসেনি। গোবিন্দ আসতে অনেকেই এসেছিল।

    পুড়িয়ে ফেরবার পথে কালো বলল গোবিন্দকে, ফোরটুয়েন্টি, আমার শেষবার শেষ হয়ে গেল। বলে গোবিন্দর সঙ্গে এসে উঠল নয়াসড়কের বস্তিতে।

    হোলি-উন্মত্ত বস্তি। ঢোল করতালের শব্দে আজ কান পাতা দায়। ঢোকে ঢোকে তাড়ি আর যোগেড়ী নাচে পাগল হয়ে গেছে সবাই। একটা ছোকরা নাচছে মেয়ে সেজে। উকট দেহভঙ্গি, কামাতুর কটাক্ষ, ঢলে ঢলে, গায়ে পড়া, তার সঙ্গে যৌবনের রংসার গান, খেমসা। হাওয়া মাতাল, মন মাতাল, মাতাল হয়েছে আকাশ।

    রঙে কাদায় মাখামাখি চলেছে, বাসন্তী রঙে ছোপানো পোশাকে ছোপ লেগেছে টকটকে লাল রঙের। ড়ুগড়ুগি বাজাচ্ছে মাদারি খেলওয়ালা, রঙ্গ করার জন্য উঠোনে ছেড়ে দিয়েছে তার সাপ দুটো।

    ঝি-বহুড়িরা ঘোমটার ফাঁকে চোখের ইশারায় পুরুষদের আরও উসকে দিচ্ছে।

    সদী বুড়ি প্রায় ন্যাংটো, বাড়িওয়ালাও সব ভুলে গড়াগড়ি খাচ্ছে কাদায়।

    ফাগে রঙে ফাগুয়া উত্তাল।

    দুলারী বাইরে আসেনি। সে তার বাসন্তীরঙে ছাপানো শাড়িটি পরে, পারে লাল মাটির পাত্রে রক্ত আবীর নিয়ে হাত দিয়ে ঘাঁটছে। সামনেই ঠোঙায় রয়েছে নিজের হাতে বানানো টিকলি, দোকানের জিলিপি মণ্ডা, খাজা। আর সলজ্জ মুখে টিপে টিপে হাসছে।

    আজকের দিনটির মতোই মুখ তার মেঘমুক্ত। সব সংশয় পেরিয়ে আজ সে প্রস্তুত হয়েছে দোস্ত ফোরটুয়েন্টির অভ্যর্থনার জন্য। তার গোস্তাকি হয়েছে, তার পাপ হয়েছে। জীবনদাতাকে সে অপমান করেছে, আঘাত দিয়েছে।

    অন্যান্য বছর সে এমনি অপেক্ষা করে থাকত, কখন গণেশ আসবে। গণেশ যখন আসত কিছুটা মত্তাবস্থায়, তখন তারা দুজনে খেলত ফাগুয়া। আজ সে ফাগুয়া খেলবে দোস্তের সঙ্গে, যার কাছে নেই তার কোনও মানার মানামানি।

    দিন গেল, সন্ধ্যায় গেল, প্রাণ রাঙিয়ে এল পূর্ণিমার রাত্রি। নাচে-গানে দ্বিগুণ উন্মত্ত হল বস্তি। যেন সব আশা শেষ হয়েছে। সব শেষে এক প্রলয় মাতনে ভয়ংকরকে ঠেকিয়ে রাখার এক ব্যর্থ উন্মত্ত চেষ্টা চলেছে।

    কিন্তু গোবিন্দের দেখা নেই। সে শেষ মাতনে মাততে পারেনি। তার আশা আছে। সে এখনও ঘুরছে। ওরা অনেক সময় অপরের উপর সব ভার ছেড়ে দিয়ে নিজেরা ব্যর্থ জীবনের অভ্যাসে থাকে মত্ত হয়ে। নিরাশার গ্লানির এই তো রূপ। সে ছাঁটাই বলল, আর উচ্ছেদ বলল, যখন তার আশা যায়, ভয় আসে, তখন সে এমনি করে। ওদের এতখানি নির্ভরতার জন্য গোবিন্দের বড় যন্ত্রণা আছে। কিন্তু চুপ করে বসে থাকতে পারেনি। সে আসতে পারেনি, মাততে পারেনি।

    মধ্যরাতে ঘুম এসে হরণ করে নিয়ে গেল সব মত্ততা। বস্তি নিঝুম হয়ে এল। দুলারী তখনও বসে আছে দরজা খুলে, কান পেতে আছে বাইরের দিকে। তারপর এক সময় ঢলে পড়ল ঘুমে।

    এবড়ো-থেবড়ো উঠোনটা রঙে আবীরে বিচিত্র হয়ে হাঁ করে যেন তাকিয়ে রইল চাঁদের দিকে।

    ভোরবেলা কারখানার বাঁশির শব্দ কানে যেতে ধড়ফড়িয়ে উঠে দুলারী একমুহূর্তে হতভম্ব চোখে তাকিয়ে দেখল তার হোলির আয়োজন। তারপর পা দিয়ে সব কিছু ছুড়ে ফেলে, দরজায় শেকল তুলে দিয়ে চলে গেল কারখানার দিকে।

    গোবিন্দ তখন ফিরে এসেছে কলকাতা থেকে। গতকাল সে উকিলের কাছ থেকে সমস্ত নথিপত্র নিয়ে ব্যারিস্টারের কুঠিতে গিয়েছিল, আর ফিরতে পারেনি। আর তিন দিন মাত্র মামলার রায় বেরুতে বাকি। তার সময় নেই কোনওদিকে নজর দেওয়ার।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleগোগোল অমনিবাস – সমরেশ বসু
    Next Article বাঘিনী – সমরেশ বসু

    Related Articles

    সমরেশ বসু

    প্রজাপতি – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    গঙ্গা – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    বিবর – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    অকালবৃষ্টি – সমরেশ বসু

    December 2, 2025
    সমরেশ বসু

    নয়নপুরের মাটি – সমরেশ বসু

    December 1, 2025
    সমরেশ বসু

    শ্রীমতি কাফে – সমরেশ বসু

    December 1, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোপেন্দ্র বসু
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণু শর্মা
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহতাব উদ্দিন
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সায়ন্তনী পূততুন্ড
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মাহতাব উদ্দিন : জীবন ও গান

    May 18, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মাহতাব উদ্দিন : জীবন ও গান

    May 18, 2026
    Our Picks

    মাহতাব উদ্দিন : জীবন ও গান

    May 18, 2026

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    May 18, 2026

    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রেমের গল্প – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    May 16, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }