Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    অপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026

    শ্মশানকোকিলের ডাক – সৌভিক চক্রবর্তী

    May 1, 2026

    এসো না অসময়ে – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    মরুস্বর্গ – আবুল বাশার

    লেখক এক পাতা গল্প255 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    মরুস্বর্গ – ৬

    ০৬.

    এক গভীর অবসাদ ছাড়া আর কিছুই নেই। রিবিকার শরীরকে শতবার আলিঙ্গন করেও সাদইদের তৃপ্তি হয়নি। এক অব্যক্ত অবসাদে মন ভরে আছে। তার কোমরে ঝুলছে রাজা হিতেনের দেওয়া সন্ধিপত্রের স্বর্ণফলক। এই সন্ধিপত্রে রাজা সাদইদের কল্যাণ কামনা করে লিখেছে–তুমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, সীলমোহর অঙ্কিত স্বর্ণফলকে তোমার স্বাক্ষর চিহ্নিত করেছি, তোমার আমার যুক্ত স্বাক্ষর খোদিত হয়েছে। তোমার সৈন্যবাহিনী আমার অনুগত থাকবে। কেউ কোন সামাজিক অপরাধ করলে তার বিচার-ভার তোমার বটে, কিন্তু আমার পরামর্শ প্রার্থনীয়, তুমি অনুগৃহীত সেনাধিপতি, আমার দানছত্রের অধীন মরু অঞ্চল, পাহাড় ও দ্রাক্ষাকুঞ্জগুলি শোভিত রাখা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা তোমার কাজ। তোমার নিকট কর প্রার্থনা করি না। কেবল যখন আমার সাম্রাজ্যে সুন্দরীদের প্রতিযোগিতা হয় তখন তুমি উৎকৃষ্ট সুন্দরী সরবরাহ করবে। একটি উৎকৃষ্ট সুন্দরীর বিনিময়ে তোমাকে দেওয়া হবে কিছু ডুমুরবৃক্ষ, একটি দ্রাক্ষাবাগিচা এবং নতুন কোন অঞ্চলরেখা, তাতে থাকবে উদ্যান আর শান্ত জলাশয়। তোমার কল্যাণ এবং মঙ্গলসাধনা রাজা হিতেনের কর্তব্য। তুমি নিজে কোন আইন প্রণয়ন করতে পারো না। আমার প্রণীত আইনই তোমার পালনীয় আজ্ঞাস্বরূপ। কারো উপর মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা প্রয়োগ করার অধিকার তোমার নেই। যৌন-পীড়কের শাস্তি মৃত্যু। দেশদ্রোহিতা-হত্যা এবং যৌন অপরাধের জন্য আমার নির্দেশ আছে মৃত্যুদণ্ড। তাছাড়া বাকি অপরাধের দণ্ডগুলি মৃদু ও কোমল। ‘নারী-বিলাস’ পুরুষের সৌন্দর্যচর্চা। নারী তার প্রিয় পুরুষের কাম প্রশমন করে সূক্ষ্ম কলানৈপুণ্যে, ব্ৰীড়ায়, লাস্যে,সংগীতে ও নৃত্যে। নারীর ক্ষমতা স্বর্গীয়। তাকে পদাঘাত ও বলাকার করা পাপ। অত্যন্ত সুদক্ষ, প্রত্যয়বান সৈনিকও যদি কোন সামান্য দেবদাসীর উপর গর্হিত আচরণ করে এবং তা প্রমাণিত হয়, তবে মৃত্যুদণ্ডই হবে সৈনিকটির শাস্তি। মনে রাখবে আমার চর তোমাকে সর্বদা অনুসরণ করে। অথচ তুমি আমার সন্তান মাত্র।

    নারীর ক্ষমতা স্বর্গীয় অথচ আমি হিতেনের সন্তান হয়েও চোখের সামনের এই নারীকে উপভোগ করতে পারছিনে। কেবলই এক বিষাদ আমাকে আচ্ছন্ন করছে। ভাবতে ভাবতে বেদনা-জড়ানো চোখের পাতা তুলে রিবিকাকে দেখল সাদইদ। ভোর হয়েছে পাহাড়ের শীর্ষে–শান্ত সাদা সীসার মত উজ্জ্বল।

    পাহাড়ের মাথায় সেই এক শান্ত রহস্যময় স্নিগ্ধ প্রত্যুষ। সূর্য ওঠেনি। ঈশ্বরের নিঃশ্বাসে ভরে আছে মরুভূমি।

    সাদইদ রিবিকার দিকে চেয়ে বলল-রুহার মৃত্যু এক অভিশাপ রিবিকা! রাজা হিতেন লোটার মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা দিয়েছে। রাজার রথ আসবে। তার সুন্দরী প্রতিযোগিতায় তোমার নাম তালিকাবদ্ধ হয়েছে। এই দণ্ডাজ্ঞা পালন করতে আমি বাধ্য। তোমাকে উপহার দিয়ে আমি যা পাব–দ্যাখো রিবিকা রাজাই তো ঈশ্বর! তার অলক্ষ্য কিছু নেই।

    বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সাদইদ। সাদইদ ফের বলল–লোটা জানেই না, তার পরমায়ু শেষ হয়ে গিয়েছে। তুমিও জানতে না তোমার ভবিষ্যৎ। গত রাত্রি এক দুঃস্বপ্ন ছিল। কোন নারী বা কোন সৈন্য আমার নয় রিবিকা। এই পাহাড়ও আমার নয়। ইতিহাস সুদীর্ঘ  মানুষ একদিন বিশ্বাস করতেই চাইবে না রাজা ঈশ্বরের মত ক্ষমতাবান ছিল। এই যুদ্ধ শেষ হবে। আমি কী তুচ্ছ দ্যাখো, তোমাকেও রক্ষা করতে পারি না! নারী আর শিশুর রূপ স্বর্গীয় নিশ্চয়ই–যুদ্ধই বারবার তাকে ধ্বংস করেছে। আমার যদি দেশ থাকত তোমাকে আর লোটাকে নিয়ে সেখানে চলে যেতাম। চোখের সামনে লোটার মৃত্যু আর তোমার বিসর্জন দেখে যেতে হবে।

    –না। এ হতে পারে না। কিছুতেই হতে পারে না!

    বিপন্ন আর্তস্বর রিবিকার কণ্ঠে দলিত হয়ে ওঠে। তার কেবলই মনে হতে লাগল, এই ভোর কেন এল? এই জীবন কেন সে পেয়েছিল! গত রাত্রির মত একটি বিপুল বিস্ময়কর অপার সুখের রাত কেন তার মত হতভাগ্য দেবদাসীর জীবনে আসে! কেন তার হৃদয়কে দুটি নির্মল প্রজাপতি অধিকার করেছিল। শববাহক লোটা কেন এই মরুমর্তে জন্মলাভ করে! রাজাই যদি দেবতা, রাজাই যদি ঈশ্বর, তবে মহাত্মা ইহুদ কেন তাদের মুক্তির কথা বলেছিলেন?–হায় যবহ, হায় ইয়াহো!

    –অসম্ভব! এ হতে পারে না। কিছুতেই নয়। আমি যাব না সারগন! ছেড়ে দাও। তুমি যুদ্ধ ছেড়ে দাও! এতটুকু জায়গা কি কোথাও নেই?

    কামনাদীর্ণ স্বর উচ্চকিত নিনাদে ফেটে পড়ে পাহাড়ের অভ্যন্তর-সীমায়। যখন দিনের প্রথম সূর্যালোক মরুভূমির বালুকা স্পর্শ করল, লোটার কালো ঘোড়া লাফিয়ে উঠল, লোটা তার পিঠে চড়েছে–একা ভোরে অশ্বারোহণ লোটার এক ধরনের নিঃসঙ্গ খেলা। অশ্ব মাঝে মাঝেই তাকে পিঠ থেকে ফেলে দেয়। ইচ্ছে করেই হুমড়ি খেয়ে বালুতে আচমকা লুটায়। অশ্ব জানে না, এইই লোটার শেষ ঘোড়ায় চড়া। ঘোড়াটি থাকবে। লোটা থাকবে না। একথা অশ্ব যেমন জানে না, নোটাও জানে না।

    মরুস্থলীর সকলে জেনেছে যেকথা–ভাষার অভাবে লোটা তা জানতে পারেনি। সে আহ্লাদে নিশ্চিন্তে আপন মনে খেলা করে চলেছে। তার বিশ্বাস। অগাধ। সাদইদ থাকতে তার কোনওই ভয় নেই। মৃত্যুও তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। সাদইদ লোটার চাউনি, চলাফেরা, যুদ্ধযাত্রার প্রতি মুহূর্তে একথা অনুভব করেছে।

    লোটার আহ্লাদিত অশ্বক্রীড়া দেখতে দেখতে সাদইদের বুক অসম্ভব বিষাদে। পূর্ণ হয়ে যেতে লাগল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিস্তব্ধ রিবিকার চোখ ছলছল করে উঠল। মনে পড়ল, কালই বেচারি তার কাছে অদ্ভুত প্রস্তাব করেছিল। একবার অন্তত সারগন বলে ডাকার জন্য আকুল প্রার্থনা জানিয়েছিল। ডাকলে কী ক্ষতি ছিল!

    মহাত্মা ইহুদ পাহাড়ের দিকে এই ভোরবেলা পায়ে পায়ে হেঁটে আসছেন। অদ্ভুত দৃপ্ত তাঁর ছুটে আসার ভঙ্গি। মসীহরা যেমন লম্বা পা ফেলে হাঁটেন। তাঁকে দেখে অশ্বপৃষ্ঠ থেকে সহসা স্খলিত লোটা কপালে হাত ঠেকিয়ে সহাস্য অভিবাদন জানাল। সলজ্জ ভঙ্গিতে গা ঝাড়তে লাগল। ইহুদ ইশারায় লোটার অভিবাদন গ্রহণ করলেন। তারপর একদণ্ড সময় নষ্ট না করে সাদইদের সামনে এসে বিনা ভূমিকায় বললেন–লোটা জানে না আজ তার মৃত্যুর দিন। তাকে এ কথা শোনানোর দায়িত্ব কে নেবে? তুমি তার মৃত্যু-সংবাদ বহে এনেছ।

    –হ্যাঁ এনেছি।

    -সেকথা বলার জন্য কাউকে নির্দেশ দাওনি? তোমার সন্ধিপত্র মাটির ফলকে উৎকীর্ণ করে দেবমন্দিরের সামনে স্থাপন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না হিতেনের পোলা!

    এরকম দৃপ্ত বাঁকা কথায় কী আশ্চর্য আজ সাদইদের মেরুদণ্ড কেঁপে উঠল। হঠাৎই ইহুদ নামের সামান্য সেবক লোকটি, দেবদাসীর অনুগত অত্যন্ত নিম্ন পেশার মানুষটি যেন রাতারাতি বদলে গিয়েছেন। সাদইদ ইহুদকে চিনতে পারছিল না।

    –রাজার আইন আমি মানতে বাধ্য ইহুদ!

    –কিন্তু আমি ঈশ্বরের আইন ছাড়া কোন আইন মানতে বাধ্য নই সাদইদ! একথাটা তোমাকে বলার আজ বিশেষ প্রয়োজন। রাজার রথকেও আমি ডরাই না। জানি রথ আসবে। কিন্তু লোটার মৃত্যুই কি অনিবার্য। তুমি তাকে ভাষা দিতে পারোনি, ধর্ম দিতে পারোনি–এমনকি একটি নারীও তোমার ছিল না! অথচ সে তোমার জন্য প্রাণ বিপন্ন করেছে কতবার! সেই প্রাণটাই আজ তুমি। কেড়ে নিতে চলেছ! এই যদি তোমার আইন–তবে সেই আইন আমি মানি না। কেউ মানে না।

    –এ আমার আইন নয় ইহুদ। রাজার আইন!

    –তুমি তার পুত্র!

    –না। আমার পিতা একজন ভিস্তি। আমার জন্মের ইতিহাস নেই।

    –তবে তুমি এই আইনকে অস্বীকার কর।

    আপনি করুন। আমি বাধা দেব না। আপনি আমাকে কেন এভাবে আঘাত করছেন!

    সাইদের চোখ ছলছল করে উঠল। ইহুদ কিঞ্চিৎ নরম হয়ে সাদইদের সামনে মেঝেয় বসে পড়লেন।

    সসম্ভ্রমে ব্যস্ত হয়ে সাদইদ বলল–ওভাবে মাটিতে বসছেন কেন আপনি! আহা! আপনি ওই শিলাসনে বসুন!

    –না থাক!… যেন বিরক্ত হয়ে ঈষৎ ধমকেই উঠলেন ইহুদ! তাঁর চোখ সহসা কেমন এক অনির্বচনীয় দিব্যালোকে যেন ভরে যেতে লাগল। সেই আলো ছড়িয়ে পড়ল রিবিকার মুখে। রিবিকার দ্বাঙ্গ ভাষাতীত এক মহাভাবে মুহূর্তে শিহরিত হয়ে উঠল।

    ইহুদের গলা ভারী হয়ে উঠল–আমার এই হাতের লাঠিখানা চিনতে পারিস মা!

    ইহুদের কণ্ঠস্বরে অপার্থিব এক জাদু মিশেছিল, রিবিকার সমস্ত শরীর যেন অবশ হয়ে গেল। তার পা দুখানি যেন গেঁথে গেল পায়ের তলার পাষাণের সঙ্গে। কোলের শিশুকে সে বুকের সঙ্গে সপাটে আঁকড়ে ধরেছিল। হঠাৎ তার মনে হল সমস্তই যেন ইহুদ ছিনিয়ে নিতে এসেছেন।

    অর্ধস্ফুট স্বরে রিবিকা বলল–পারি বাবা!

    –আমাকে তুমি ভুলে গেছ!

    –আপনাকেই আমি মরুভূমির বুকে খুঁজেছি বাবা!

    ইহুদ এবার ফের ঈষৎ গর্জে উঠলেন–মিথ্যে কথা!… সেই গর্জনে হেরাপুত্র মায়ের বুক থেকে মাথা তুলে শূন্যে চোখ মেলে কী যেন খুঁজে দেখল, পেল না। আবার মায়ের বুকে মাথা রাখল। লজ্জায় রিবিকা চোখ নত করল।

    ইহুদ বললেন–তাই যদি না হবে তাহলে আমার অপমান তোমার বুকে বাজল না কেন? তুমি কী করে এই পাহাড়দুর্গে রাত কাটালে! তোমার পাপের বিচার কে করবে! রাজার আইন আছে, সে আইন রাজাকে স্পর্শ করে না।

    সাদইদ আর স্থির থাকতে না পেরে বলল–মানুষকে প্রাণে বাঁচানো যদি পাপ হয় তাহলে সে পাপ আমি করেছি! আপনি রিবিকাকে হায়নার মুখে ফেলে রেখে গেছিলেন।

    ইহুদ বললেন-তোমার সৈন্য আমাদের আক্রমণ করে। হায়নার চেয়ে তোমার লোভ অনেক কদর্য। আমার হাতে লাঠি দেখেও তোমার সেপাই আমাকে রেয়াত করেনি। তুমি তোমার চোখের সামনে আমাকে দেখেছ কখনও মনে করনি এ অন্যায়!

    –আমায় ক্ষমা করুন!

    সাদইদের গলা কেঁপে উঠল।

    –ইয়াহোর কাছে ক্ষমা চাও সাদইদ! রুহার মৃত্যুর কৈফিয়ত তোমায় দিতে হবে। বন্ধু লোটা তোমার নারী-সৌভাগ্যে পীড়িত হয়ে ঘরের বশে রুহাকে বলাৎকারের চেষ্টা করে। অথচ লোটাকেই তুমি মৃত্যুদণ্ড দিলে! ইয়াহোর বিচার অনেক সূক্ষ্ম সাদইদ! তুমি শাস্তি পাবে!

    মাথা নিচু করে ইহুদের কথা শুনতে শুনতে সাদইদ বলল–আজ পর্যন্ত রাজা হিতেনের সঙ্গে আমার কোন সন্ধিপত্রই ছিল না মহাত্মা ইহুদ! একজন সামান্য সৈনিক, ভাড়াটে সৈনিকের সঙ্গে কোন রাজা কখনওই সন্ধিপত্রের চুক্তি করেন না। অতি সম্প্রতি সেই সন্ধিপত্র হয়েছে! কালই আমি সেটা হাতে পেয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, লোটা সম্পর্কে আমার কখনও কোন অভিসন্ধি ছিল না। এই সন্ধিপত্রও রাজার কাছে আমি প্রার্থনা করিনি।

    ইহুদ বললেন–তুমি কী করেছ না করেছ সে সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। এখানকার কারুরই নেই, সেকথা তোমার জানা দরকার। সমস্ত রাত্রি আমরা আলোচনা করেছি। তোমার সন্ধিপত্রের নকল মাটির ফলক আমরা উপড়ে ফেলেছি। তুমি জেনে রাখো, তুমি হিতেনের দাসত্ব করতে পারো, আমরা নই। আমরা নেই তোমার সঙ্গে!

    –আমি জানি। হঠাৎ এই সন্ধিপত্র করে রাজা আমাকে দুর্বল করতেই চেয়েছেন।

    –সে বুদ্ধি তোমার আছে?

    –আমায় এভাবে বলবেন না মহাত্মা ইহুদ!

    –আমি মহাত্মা নই সাদইদ। তাই যদি হতাম, তাহলে এত হীন পেশায় নিয়োগ করে তুমি আমায় অপমান করতে না। তবে এই লাঠির কোন ক্ষমতা

    আছে কি নেই তুমি এবার প্রমাণ পাবে। লোটাকে মারবার জন্যই চালবাজ রাজা এই সন্ধিফলক সোনায় মুড়িয়ে তোমার হাতে তুলে দিয়েছে! যাতে সারা জীবন তুমি এই মরুভূমিতে ঘুরে মরো! তবে তুমি যা খুশি করতে পারো–আমার কিছু এসে যায় না। মধুদুগ্ধের দেশে আমার পোঁছনো দরকার।

    –আপনার স্বপ্ন সফল হোক মহাত্মা ইহুদ!

    –তুমি আমাকে ব্যঙ্গ করছ?

    ইহুদের এই আকস্মিক আঘাতে সাদইদ বিমূঢ় হয়ে যায় এক মুহূর্ত! সে অতিকষ্টে চোখ তুলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিবিকার মুখের দিকে চায়। এই সেই নারী, যাকে সে নগ্নাবস্থায় বস্ত্র দান করেছিল, ক্ষুধা তৃষ্ণা কাতর মুমূর্ষ দেবদাসী, যাকে সে মধু রুটি আর তৃষ্ণার জল দিয়েছিল–যাকে সে মন্দিরে ঠেলে দিতে পারেনি, যার সীমাহীন রূপ তাকে মুগ্ধ করেছে, লোভী করে তুলেছে, সেই নারী ভেবেছিল সাদইদ বুঝি রাক্রান্ত পুরুষ, তার কাছে সে জানতে চেয়েছিল তার ভবিষ্যৎ! কী পরিহাস জীবনের ওই শিশু অবধি আজ বুঝে ফেলেছে সাদইদ তার নিজেরই ভবিষ্যৎ জানে না।

    সাদইদ বলল–একটা সামান্য শিশুকে ব্যঙ্গ করার সাহসও আমার নেই!

    বলেই সাদইদ রিবিকার ম্লান চোখ থেকে চোখ নামিয়ে মাথা নিচু করল।

    ইহুদ বললেন–তোমার সাহস যথেষ্টই আছে। লোকে তোমায় সারগন বলে ডাকে। আমি স্বপ্নদ্রষ্টা, আমার হাতে মসীহের ‘আঁসা’–এই জাদুদণ্ড! এই মহাবিদ্যার নামে শপথ করে বলছি, তুমি ব্যর্থ হবে! আমি স্বপ্ন দেখেছি, নিনিভের পতন হয়েছে! মারী আর মড়কে ফতুর হয়ে গেছে নগরী! ক্রমাগত এই স্বপ্ন! ক্রমাগত!

    বলতে বলতে ইহুদের দুই চোখ কেমন ঘোর হয়ে আসে! যেন তিনি মুহূর্তে স্বপ্নবিষ্ট হয়ে পড়লেন। অনেকক্ষণ নিঃশব্দে স্থির রইল জুম পাহাড়।

    হঠাৎ মন্দ্রস্বর ভেসে উঠল–তুমি ঈশ্বরের ভাষার উপর খোদকারী করেছ সাদ। এই এক পাপ। ক্ষমা নেই।

    –নতুবা মানুষ কীভাবে কথা বলত! একটা ভাষা তো লাগে! এইভাবে মানুষ মিলিত হয়!

    –এই চেষ্টা হাস্যকর কোমলমতি সাদ। পৃথিবীতে ধর্ম ছাড়া ঐক্য হয় না। তোমার সাহসকে বলিহারি যে, তুমি নিজের মূর্খতা বুঝতে পারো না। ঈশ্বর ভাষার সাহায্যে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করেন। ধর্মের সাহায্যে একত্রিত করেন। মসীহের ধর্মে একথার বারংবার উল্লেখ আছে। তুমি ভাষার চর্চা করলে অথচ লোটার মুখে ভাষা যোগাতে পারলে না। কবিতা গেয়ে ধর্মের শক্তিকে খর্ব করা যায় না। ইয়াহহ! ইয়াহো! তাঁর ইচ্ছেয় সব হয়।

    মাদইদ নরম সুরে বলল–ক্ষমা করবেন মহাত্মা ইহুদ! আপনার আদর্শের জয় হোক। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা আলাদা। অত্যন্ত অল্প সময়ের জন্য হলেও মানুষ যে একটি ভাষার তলে মিলিত হয়েছিল সেই ইতিহাস ধর্ম এসে মুছে দেবে কিন্তু এই সত্য।

    –এ সত্য নয় সাদইদ! লোটাই তার প্রমাণ!

    –সে তো ধর্মও ছাড়েনি।

    –ছাড়বে। আমি যা পারি তুমি তা পারো না। তোমার ভিতর ঈশ্বরের কোন প্রত্যাদেশ নেই। তুমি অভিজ্ঞতাবাদী। আমি প্রত্যাদেশবাদী, ধার্মিক! আমি জড়ো করি, তুমি জড়ো করার মন্ত্র কখনও পাবে না। চলো মা রিবিকা–আমরা উঠি!

    –কোথায় যাব বাবা!

    –ইয়াহো যেখানে নিয়ে যেতে চাইছেন! যে লোক লুঠ করে, সে কখনও গুছিয়ে তুলতে পারে না। এখানে থেকো না! সাদইদ এবার একা নিনিভে লুঠ করতে যাবে। একা। একদম একা।…

    বলেই ইহুদ হা হা করে হেসে উঠলেন। রিবিকা অত্যন্ত করুণ চোখে সাদইদের দিকে চাইল। শিশুকে গভীরভাবে বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরল।

    গম্ভীর সুরে ইহুদ বললেন–যার শিশু তাকে ফেরত দাও রিবিকা!

    –এ শিশু যে আমার বাবা! একে ফেরত দিতে বলো না!

    হাহাকার করে উঠল রিবিকা!

    সাদই অত্যন্ত ধরা গলায় ঢোক গিলে বলল–আমি এই শিশু আর নারীকে লুঠ করিনি মহাত্মা ইহুদ! আমি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। আপনিই তাদের ছিনিয়ে নিচ্ছেন!

    অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন ইহুদ। তাঁর শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। বললেন–আমার ধর্ম কখনও ছিনিয়ে নেয় না সাদ। সে-ধর্ম দেয়। রিবিকা আমার কন্যা! ওই শিশু তোমারই রইল। দাও মা, দিয়ে দাও! দেরি করো না। সকলে তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছে! তুমি লোটার মৃত্যুর কথা ঘোষণা করবে। লোটা শুনবে।

    ঘোড়ার পিঠে তখনও খেলা করে চলেছে লোটা। সেদিকে একবার চেয়ে দেখে আর্তনাদ করে উঠল রিবিকা-বাবা তুমি আমায় এমন নির্দেশ দিচ্ছ কেন! আমি কী অন্যায় করেছি!

    –এ নির্দেশ আমার নয় রিবিকা। হিতেনের নির্দেশ। রাজার হুকুম!

    –আমি পারব না! এ আমি পারব না কিছুতে।

    –পারতেই হবে মা! ধৈর্য ধরো। মন শক্ত করো!

    ছেলেকে বুকে করে কাঁপতে কাঁপতে রিবিকা মেঝেয় বসে পড়ে, সাদইদের ঠিক পায়ের তলায়। ভয়ে সাদইদ পা টেনে নেয়।

    –আমার তো আর কোনওই আশ্রয় রইল না সাদইদ!–সরে যাওয়া সাদইদের পায়ের দিকে চেয়ে বলে উঠল রিবিকা। সাদইদ অনড় পাষাণের মত স্থির।

    এই প্রথম সাদইদের নাম ধরে ডাকল রিবিকা। বুকের ভিতরটা সাদইদের কেঁপে উঠল।

    –বাদশার বাদশা ইয়াহহ, তিনিই তোমার আশ্রয় রিবিকা। সমস্ত দেবদাসী, তামাম ক্রীতদাস, সকল সৈন্য তাঁরই বান্দা। ফেরাউনের আইন, হিতেনের আইন, অসুরদের আইনের চেয়ে বড় তাঁর আইন । তিনি যা জানেন, আমরা কেউ তা জানি না। নইলে লোটার ভাষা একমাত্র তুমিই কেন জানবে। এ ঘটনা তিনিই ঘটিয়েছেন। তাঁর অভিপ্রায় বোঝা আমার কর্তব্য! লোটার মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞার কথা তুমিই তাকে বলবে।

    –পারব না! কিছুতেই পারব না! সাদইদ তুমি আমায় বিষ দাও সারগন! এই শিশুকে তুমি হত্যা কর!

    –আজ তোমার বিবাহ রিবিকা!

    মহাত্মা ইহুদ যেন আকাশ থেকে বলে উঠলেন। রিবিকার কান্না মুহূর্তে জমাটবদ্ধ পর্বততুষারে আবৃত হল। পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা একটি শীর্ণ দীর্ঘ গাছে এসে বসল একটি ভয়ানক কালো মরু-ঈগল। তার ভারে নুয়ে পড়ল বৃক্ষের একটি ডাল। ঈগলের পাখার ঝাঁপটে কেঁপে উঠল মরু-প্রান্তর!!

    মহাত্মা ইহুদ বললেন–লোটার মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা ঘোষণা করা নিশ্চয়ই খুব কষ্টের রিবিকা। তার মত সৈনিক শত অশ্বের চেয়ে, শিক্ষিত ঘোড়ার চেয়ে দামী। অথচ ইয়াহো সেই নিষ্ঠুর কাজের জন্য তোমাকেই নির্বাচন করেছেন। কিন্তু সেই নিষ্ঠুরতা সহনীয় করার জন্য সেই লোটাকেই তোমাকে বিবাহ করতে হবে। বিয়ের পর তুমি লোটাকে মৃত্যুর কথা বলবে! সমস্ত শিবির দেখবে নগর নির্মাতা মানুষ, যুদ্ধবাজ রাজারা কীভাবে এই সংসারকে মারছেন। মৃত্যু তো ক্রীতদাসের মুক্তি রিবিকা–তুমি সেই মৃত্যুকে বরণ করো মা গো!

    মহাত্মা ইহুদের কণ্ঠস্বর ভাবাবেগে বুজে এল। দাড়ি গোঁফে আচ্ছন্ন মুখে চোখ দুটি সিক্ত হয়ে উঠল।

    সাদইদ বলল–তোমার চোখের জল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার রিবিকা! এই শিশু আমার সম্পদ। দাও আমাকে! কখনও ধর্ম বুঝিনি। যে ঈশ্বরকে কখনও দেখিনি, তার অস্তিত্ব কেমন তাও জানি না–তবে কুড়িয়ে পাওয়া আমার ভালবাসার আজ সম্মতি হবে এই আনন্দ একজন সৈনিকের পক্ষে যথেষ্ট রিবিকা। তুমি সম্মত হও। লোটা মৃত্যুর আগে যদি একথা বিশ্বাস করে মরে যে সে পেয়েছিল। সেই শক্তির জোরেই আমি বেঁচে থাকব।

    –এই সৌভাগ্য ইয়াহোর দান। তোমার এবং লোটার! যে ঈশ্বরকে তুমি চেনো না, সব তাঁরই অভিপ্রায় মাত্র। চলো রিবিকা।

    বলে উঠলেন ইহুদ! রিবিকা তার শিশুকে সাদইদের কোলে অর্পণ করে বলল–আজ আমি দেবতা সূর্যের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হচ্ছি, দেবদাসী হবে কনে! তুমি যাকে আমনের বউ বলে ডাকতে, তার আজ মৃত্যু হল সারগন! দেবদাসীর ভাগ্যকে নিশ্চয়ই তুমি ঈর্ষা করছ! কুড়িয়ে পেয়েছিলে তো তাই এত সহজে ফেলে দিতে পারলে! তোমার লুঠ করা হাত দু’খানি এত দুর্বল সাদইদ!

    কালো ঈগল পাখা ঝাঁপটে উঠল। তার পাখায় মরুভূমির শুকনো বালি, পায়ের নখে ধরা ধ্বস্ত নগরী নিনিভের রক্তাক্ত ইঁদুর! রিবিকা দ্রুত পাহাড় ছেড়ে মরুভূমিতে নেমে গেল। মরুকণ্ঠ তৃষ্ণার্ত ঈগল চিৎকার করল।

    মরুভূমিতে একা ঘুরে ফেরাই কি তবে নিয়তি। ভিস্তির কোলে যে মানুষ হয়েছে, যার জন্মের সঙ্গে সঙ্গে যাকে মা ত্যাগ করে চলে গেছেন অমরাবতী–যে শিশু পিচ আঁটা ঝুড়িতে ভেসেছে কুফর দ্বীপের কোলে, যে দ্বীপ তলিয়ে গেছে সমুদ্রে, জিব্রিল ছাড়া যার জন্য কেউ অশ্রুপাত করেনি, তার নিয়তি কি আকাশের মত নিঃসঙ্গ? শুভ্র শ্বেত, উল্লসিত অগ্নিশিখার মত প্রখর অশ্বের দিকে চেয়ে ছিল সাদইদ।

    আপন হাত দুখানির দিকে চেয়ে ছিল সে। দুমুঠো বালুর মত এ জীবন–যতই আঁকড়ে ধরা যাক, ঝরে পড়ে। এ তো কোন মৃত্তিকা নয়। দেশ নয়। তবু ভাল যে,মহাত্মা ইহুদের আশ্রয়েই চলে গেল রিবিকা। লোটার সঙ্গে তার বিবাহ–এ যে সত্যিই ঘটতে চলেছে ভাবলে চোখের পলক পড়তে চায় না। যাকে সাদইদ ছাড়তে পারছিল না, আপনিই সে চলে গেল ইয়াহোর ইশারায়। মরুমর্তের সেই ঈশ্বর কী মারাত্মক কুশলী! কখন দেয় আর কখন নেয়, সামান্য মানুষ বুঝতেই পারে না।

    একজন দীন দেবদাসীর সেবক রাতারাতি হয়ে ওঠেন দিব্যজ্ঞানী মহাত্মা মসীহ। মরুজন্ম কী বিচিত্র! দুখানি হাতে ধরবার মত আর কিছু নেই, শুধু লাগাম ছাড়া! ভাবতে ভাবতে স্বর্ণালী বৈকালিক মরুরৌদ্রে সাদা অশ্বের কাছে নেমে এসে দাঁড়ায় সাদইদ। কোলে তার শিশু। শিশুই হাত বাড়িয়ে লাগাম টেনে ধরে। কী অবাক! হা থোকা! তুমি যদি রিবিকাকে এমন করে আঁকড়ে ধরতে পারতে!

    সাদইদ শিশুকে নিয়ে অশ্বে উঠে বসে। হঠাৎ আকাশে শিঙার তুরীয় তীব্র নিনাদ ভেসে ওঠে। মহারাজা হিতেনের রথ আসছে দিগন্তের পারে স্বর্ণবিস্ময় ছড়াতে ছড়াতে। ধাতু বলয়ের ঘর্ষণে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ মরুপথকে ফুলঝুরির মত বর্ণালী করেছে কল্পনা করা যায়। তার চোখের সামনে লোটার মরদেহ লটকানো হবে–বর্শাবিদ্ধ করার পর। তক্তার একটি যোগচিহ্নের কাঠামো খাড়া করা হয়েছে মরুভূমির উপর। লোটাকে গাঁথা হবে সেই দৃশ্যে। তার আগে তার বিবাহ সম্পন্ন হবে।

    সাদইদ ঘোড়া নিয়ে এসে যোগচিহ্নবৎ তক্তার কাঠামোটির কাছে চুপচাপ দাঁড়ায়। সবচেয়ে নিঃস্ব বঞ্চিত ক্রীতদাসের জন্য, নারীকে পেতে চাওয়ার, ভাষা ও ধর্মের অধিকার চাওয়ার দণ্ড এখানে, বধ্যভূমির মরুচিহ্ন এটি, এখানে আমি কী করছি, ভাববার চেষ্টা করে সাদইদ। কাঠামোর দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে হাত থেমে যায়। বিবাহের পর মৃত্যুর উৎসব। ইয়াহোর ধর্ম কি জীবনের এই নিরাশ্রয় নিষ্ঠুরতার ভিতর উপ্ত হয় উদ্ভিদের মত?

    মন্দির আর তাঁবুর এলাকায় এই মরুপ্রান্তরে এই প্রথম একটি বিবাহের মন্ত্র উচ্চারিত হবে। বিবাহ মাত্রই এখানে অতি কল্পনার একটি দৃশ্য। এ জিনিস কখনও হয় না। এখানে যেমন নদী নেই, তেমনি এখানে বিবাহ নেই। সমুদ্র যেমন এখানে বাতাসকে আড়াল করেছে, তেমনি আড়াল করেছে দাম্পত্য। এখানে প্রতিটি শুকনো বালুকণার মধ্যে যুদ্ধের দানা ছড়ানো, বিচ্ছেদ যেন লু। অশ্বের চমকিত দেহের কাঁপুনিতে রয়েছে যুদ্ধের আবেগ। আকাশের শূন্য হাওয়ার ভিতর ঝাঁপটা দিচ্ছে মরু-ঈগল।

    তবে বিবাহ কিসের! ভাড়াটে সৈনিকের তাঁবুতে, নকল মন্দিরে, বিবাহ তো হাস্যকর! মন্দিরগুলি না হয়েছে মিশরের পাষাণ-ভাস্কর্যের সমতুল কোন বিপুল নির্মাণ, এখানে না আছে নিনিভে নগরীর ডানাঅলা বৃষের মানুষমুখো দুর্দমনীয় ঐশ্বর্যের মূর্তি কোন–এ যেন হিদ্দেকলের তীরের এঁটেল মাটির দৃঢ়তা নিয়েও দাঁড়াতে পারেনি। সবই আসলে ছায়ামাত্র–এ বসতি জীবনের নকলী প্রচ্ছায়া শুধু। সৈন্য বটে, কিন্তু সকলেই তো পলাতক দাসদাসী। কোন সম্রাট বা রাজা এদের বিশ্বাস করে না। এরা মিশরের পক্ষে ভাড়া খাটছে, যে কোন সময় অসুরদের পক্ষ অবলম্বন করতে পারে–রাজা হিতেন সাদইদকে তার বাহিনী নিয়ে যে কোন শক্তির তরফে যুদ্ধে যোগ দেবার স্বাধীনতা দিয়েছে–এ স্বাধীনতা হিতেনের খেয়ালিপনা মাত্র। আবার সন্ধিপত্র রচনাও সেই রাজারই পাগলামি। এই পাগলামি নিঃসন্দেহে ভয়ানক নিষ্ঠুর। সাদইদ যে অতি ক্ষুদ্র একজন রাজা নয়, দু পাঁচটি গ্রামের অধিকর্তা সামন্তও নয়, ভূস্বামী পুরোহিত নয়–হিতেন সে কথা সন্ধিপত্রে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

    তক্তার কাঠামো ছেড়ে পাথর মেশানো মরুপথ ভাঙতে লাগল সাদইদ। আজ দেবী ইস্তারের জন্মদিন। প্রেমের দেবী ইস্তার। জমিজমার দেবী, বীজের গর্ভস্থানের দেবী, মৃত্তিকার দেবী। আজ বড় শুভদিন। মড়কের দেবী নয়, যুদ্ধের দেবতা নয়, জলের দেবতা কুমীরের জন্মদিন নয়–আজ চাষীদের উৎসবের দিনে রিবিকার বিবাহ, শুকনো মরুস্থলী আজ স্বপ্নবিষ্ট। কিন্তু আজ মৃত্যুরও দিন।

    শিঙার আওয়াজ শোনা যায় বাতাসে। এ ধ্বনি-বিভ্রমও হতে পারে। সাদইদ হয়ত সবই ভুল শুনছে। সবই ভুল দেখছে। সামনে এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখা যায়। প্রতিটি দাস সৈন্য এবং দেবদাসীর হাত বা শরীর থেকে পাথর ঘষে ঘষে দাসমালিক এবং সম্রাটদের এঁকে দেওয়া উল্কি মুছে ফেলা হচ্ছে, শরীরে রক্তপাত হয়ে যাচ্ছে তবু এই দৃশ্য থামছে না। রক্তপাতের পর ভেষজ দাওয়াই লাগানো হচ্ছে। এই উল্কি মুছে ফেলার অপরাধের দণ্ড হল আঙুল কর্তন।

    এক ধরনের অম্নরস উল্কিস্থানে লেপন করে তীক্ষ্ণ পাথর বা ছুরির সাহায্যে চামড়া চেঁছে তোলা হচ্ছে দাসমালিকের ছাপ, নাম-ঠিকানা। মানুষ চিৎকার করে উঠছে যন্ত্রণায় আর আনন্দে। কিশোর-কিশোরীর চোখে জল টুপিয়ে পড়ছে। এ কোন আশ্চর্য ছবি! সৈনিকদের অনেকেই ছিল কৃষক, দাসমালিক তাদের পায়ে দলেছে, বেগার খাঁটিয়েছে, বাধ্যতামূলক কাজে নিয়োগ করেছে–তার নিজের জমি ফেলে কৃষক তার মালিকের জল তোলার কপিকল চালিয়েছে ভোররাত্রি থেকে মধ্যরাত অবধি। তার দেহ ধনুকের মত বেঁকে গেছে। তার জমির গম পুড়ে গেছে মরু লু-তে, গমের শিষ বালির স্তরে ছোপ ধরে শুকিয়ে গেছে, তার সেচের নালা বুজে গেছে ধূলায়, তার কুটিরখানি উড়ে গেছে ঝড়ে, নলখাগড়ার চালা উধাও। একদিন সে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে এসেছে গৃহে, রাজার আমলারা তার বউ আর বাচ্চাদের ফিনিসীয় জাহাজে তুলে দিয়েছে, ফিনিসীয় ধূর্ত বণিকদের দাসব্যবসা কখনও বন্ধ হয়নি–জাহাজ ভেসে গেছে কোথায় কেউ জানে না। যে ফিনিসীয়রা বাইশটি বর্ণ আবিষ্কার করে বর্ণমালা প্রস্তুত করেছে, ভাষাকে করেছে উন্নত, তাদের মূল ব্যবসাই ছিল দাসদাসী কেনাবেচা।

    সাদইদ বুঝে পায় না একটা সভ্য জাত কী নিষ্ঠুর হয়! বউ হারিয়ে, সন্তান হারিয়ে সেই কৃষক তবু বাঁচতে পারেনি। তার হাতে উল্কি আঁকা–চাষী বর্ণমালা বোঝে না। দাসমালিকের বাইশী ভাষা আয়ত্ত তিনি উল্কির নকশায় তাঁর নাম ঠিকানা লিখে ছেড়ে দিয়েছেন–মানুষ পালাবে কোথায়! সেই সব-হারানো কৃষক ধরা পড়ে গেছে অতঃপর–আত্মগোপন করেও থাকতে পারেনি। দাসমালিক আর ফেরাউনের চোখের আড়ালে। ফেরাউনের চোখ পিরামিডের মত আকাশ থেকে দৃষ্টি ছড়িয়ে দেয়। ধরা পড়ার পর সেই কৃষক হয়েছে চিরস্থায়ী সৈনিক। তারপর শেষবারের মত পালিয়ে এসেছে হেথায় মরুমর্তে! সাদইদ কখনও জোর করে তাদের দেহের উল্কি মুছে ফেলার নির্দেশ দিতে পারেনি। অথচ ইহুদ নিজে হাতে সেই উন্নত ভাষার ছাপ মুছে দিচ্ছেন। চাষীর মনের উপর চলেছে অতীতের স্মৃতির প্রহার। তার বউকে, সন্তানকে মনে পড়ছে।

    চাষী কেঁদে উঠছে আনন্দে। ভয় করছে, আনন্দ হচ্ছে। তার দীর্ণ কান্নায় আর উল্লাসে মথিত হচ্ছে অপরাহু। একদিকে বাঁটা মেহেদিপাত্র মুঠোয় চেপে ধরে বসে আছে সজ্জিত রিবিকা, চোখে সুর্মা, গলায় ঝুলছে বনকুসুমের মালা, বাহুতে জড়ানো পুষ্পবন্ধ, পরনে জড়ানো মেসোপটেমিয়ার রেশমী বসন, সূক্ষ্ম বস্ত্রের আড়ালে তার দেহাবয়ব স্পষ্ট রাঙা। বসনের তলায় কোন পরিধান নেই। তার হাতের উল্কি আগেই তোলা হয়েছে।

    সাদইদ ঘোড়া নিয়ে এসে অনেকখানি তফাতে একটি ছায়ানিবিড় বৃক্ষের তলে দাঁড়াল। কেউ তাকে একবার ভাল করে চেয়েও দেখল না। এই প্রথম সাদইদ অদ্ভুতভাবে অনুভব করল, সে এই জনমণ্ডলীর সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন। এরা তার উপস্থিতির কোন পরোয়া করে না। যেন এরা তাকে কখনও দেখেওনি। সে বড়জোর একজন বহিরাগত পলাতক সৈনিক। তার দিকে কেউ কেউ পরম করুণার চোখে চাইল।

    একজন সৈনিক সকৌতুকে বলে উঠল–এসো মুছে নাও! রাজার ছাপটা গা থেকে ছাড়িয়ে ফেলে স্বাধীন হও বাছা! রক্ত কিছুটা ঝরবে বটে, কিন্তু হৃদয়ে তাম পাবে। মরুভূমিতে কতকাল ঘুরে মরছ–একটু আহ্লাদ, একটু মুক্তির কথা ভাবো। কী হে, শুনতে খুব মন্দ লাগে বুঝি?

    এক বুড়ি বলল–বাছার কী আর সাধ আহ্লাদ আছে! মহাত্মা পয়গম্বর যে কনের বাবা, তা জানলে কী আর লোটার দোস্ত নিবিকের সাথে ফস্টিনস্টি করে–সেই শরমে দেইড়েই আছে, ঘোড়াটি তেনার বিবশ হয়েছেন গো!

    এই কথায় গায়ে টোনা মেরে গালের টোল নাচিয়ে হি হি করে হেসে উঠল দঙ্গলবাঁধা দেবদাসীরা। মরুমর্তে এ এক বিষম মর্মান্তিক দৃশ্য–আহ্বাদে দিশেহারা, দুঃস্বপ্নেভরা এ ছবি, তবু কান্নায় বিষণ্ণ, রক্তপাতে, রঙে উচ্চকিত মধুর। সেই মাধুর্যে কাঁপছে হৃদয়, রাঙা ঠোঁট, ফের মৃত্যুর গন্ধে বাতাস উতলা।

    ইয়াহোর ধর্মের প্রতিষ্ঠা হচ্ছে ইস্তারের জন্মদিনে। এই মরু তার ক্রোড়, তার গর্ভস্থান, ইহুদের দণ্ডখানি তার নির্ভরতা। দণ্ডখানি নেড়ে নেড়ে সকলের সঙ্গে কত কথা বলে চলেছেন ইহুদ। সাদইদের ইচ্ছে হল, সে ভয়ানক আর্তনাদ করে ওঠে।

    কিন্তু কী বলে সে আর্তনাদ করবে? কী হবে তার মুখের ভাষা? এখানে যে তার কেউ নেই। কে শুনবে তার কথা! সাদইদ বিড় বিড় করে উঠল–এ ভারী অন্যায় মহাত্মা ইহুদ! বিয়ের নামে, মুক্তির নামে এ আপনি কী করছেন! এই মানুষেরা সকলে লোকটাকে ঘৃণা করত! কোন দেবদাসী ওকে আশ্রয় দেয়নি। তার মৃত্যুর দিনে কিসের আয়োজন করেছেন আপনি! রিবিকাকে এভাবে কাঁদিয়ে তার ভাগ্যকে পরিহাস করছেন কেন? ওগো, তোমরা থামো!

    সাদইদের স্বর ফুটল না। চোখ বহে গণ্ডদেশ প্লাবিত করে সাদইদের অশু গড়াতে চাইছিল, সাদইদ জানে এই মরু-বাতাসে সেই অশ্রু গড়িয়ে পড়ে না, চোখের পাতার আড়ালে কেবল চিক চিক করে সূর্যবিম্বিত বালুকণার মত তীব্র।

    অথচ ইয়াহোর ধর্ম এক অবিনাশী উদ্ভিদ! ইয়াহো বলেন–হোক! শুধু হউক’ বলাই যথেষ্ট, সৃষ্টি পুরাণে মরুমর্তে, জীবকুলে এক অমৃত মন্থন শুরু হয়।

    মহাত্মা ইহুদ বললেন–আমার কন্যার হৃদয়ের বেদনা জয়ী হোক।

    কথাটা শুনে সাদইদ কেঁপে উঠল। সে সহসাই চিৎকার করে উঠল–লোটা! এ হতে পারে না লোটা! তোমার কালো ঘোড়া কোথায়? নিনিভের পতন হয়েছে, এসো আমরা যাত্রা করি। থেকো না, ওভাবে পড়ে থেকো না দোস্ত!

    এই মুহূর্তে সাদইদের সাদা অশ্ব এক বেগার্ধ স্বরে হেষাধ্বনি করে ওঠে আকাশে মুখ তুলে। সাদইদের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যায়–এ মিথ্যা! এ অন্যায় লোটা! যুদ্ধ তোমার নিয়তি, তুমি উঠে এসো!

    লোটার দুই চোখ তন্ময় ছিল। সে চেয়ে ছিল তার কনেটির দিকে। সাদইদের মুখে ‘লোটা’ নাম উচ্চারণ শুনে একবার চকিতে চোখ তুলে সাদইদকে দেখে স্মিত হাস্য করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। অশ্বের হেষাধ্বনিতে রিবিকার মুষ্টিবদ্ধ দু’ হাত শিথিল হয়ে খুলে গেল। তৃষ্ণাকুল দুটি চোখ তার, সুর্মার নদীতে ছল ছল করতে লাগল। সে সাদইদের দিকে নয়ন মেলে চাইতে পারল না। তার সাধ হচ্ছিল সে একবার শিশুকে দেখে।

    মহাত্মা ইহুদ বললেন–আমার কন্যার হৃদয়ের বেদনা তোমার পাহাড়ের চেয়ে উচ্চ সাদ। পিরামিডের চেয়ে মহৎ। রাজার আইন টলে পড়ে, কিন্তু মেষশিশুর চেয়ে পবিত্র হৃদয় কর্তব্যে বিচলিত হয় না।

    রিবিকার বিবাহ ইয়াহোর নির্দেশ মাত্র। বঞ্চিত লোটার জন্য ঈশ্বরের একমাত্র উপহার। সাদ, তুমি পাগল হয়ে গেছ!

    সকলে উচ্চহাস্যে বিদ্রূপ করে উঠল। কিসের মাতমে এরা সব বধির হয়েছে, সাদইদ ভেবে পেল না। আবার বলে উঠল–আমরা এখনও চলে যেতে পারি লোটা! রিবিকা তুমি বলে দাও–সব কথা বলে দাও নোটাকে।

    রিবিকা শিহরিত হয়ে উঠল। তার প্রাণ বলল, সে বলে দেয়। সে চোখ তুলে কতজনের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চাইল, কোথাও সে কণামাত্র সমর্থন পেল না। সবাই যেন এক পাষাণের মত স্থির, চোখে এক মদির স্বপ্ন জমাট বেঁধে আছে, কিন্তু কোন তরঙ্গ নেই। রিবিকা হতাশায় ভেঙে পড়ল আপন হৃদয়ে। তারপর সে মহাত্মার দিকে চোখ তুলল।

    ইহুদ বললেন–আমার ধর্মে কোন প্রতিমাপূজা নেই। আমার ধর্ম দেবতা সামাশ বা আমনের চেয়ে শক্তিশালী। ইয়াহো নিরাকার। তাঁর কোন শরিক নেই। তিনি অদ্বিতীয় ঈশ্বর। বলল, তিনি যা তিনি তাই। তুমি এই কথাগুলি লোটাকে বলিয়ে নাও। এই মন্ত্রই বিবাহের মন্ত্র। এখানকার সমস্ত পুরুষ তোমার মত নারীর স্বপ্ন দেখে। আমি সকলকে সেই স্বপ্নের দিকে নিয়ে চলেছি। তোমরা সকল বিগ্রহ বর্জন কর। ইয়াহো সূর্যকে অবধি নিয়ন্ত্রণ করেন। বাতাস তাঁরই নির্দেশে চলে, মেঘ বৃষ্টি, সমুদ্র নদী তাঁরই ইশারায় আন্দোলিত হয়। বৃক্ষের একটি পাতাও তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কাঁপে না।

    ঠিক এই উচ্চারিত মন্ত্র রিবিকা বলে উঠবে, তখনই হিতেনের রথকে দুটি ঘোড়ায় টেনে আনল মরুপথ বিদীর্ণ করে তীব্র বেগে। শিঙা নিনাদিত হল।

    মহাত্মা ইহুদ রাজার উপস্থিতি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে লোটা আর রিবিকার বিবাহ নিষ্পন্ন করলেন। বিবাহের দৃশ্য দেখতে দেখতে হিতেনের দুই চোখ মহাক্রোধে চকচক করে উঠল। রাজা এসেছে লোটাকে বধ করতে আর সুন্দরী রিবিকাকে রথে তুলে নিতে। এ দৃশ্য তার কাছে অভাবিত, অপমানজনক। সে হুংকার দিয়ে উঠল। বলল–সৈনাধিপতি সাদইদ, এ কী দেখছি আমি! সুন্দরীকে টেনে আনো আমার কাছে! লোটাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে চলো!

    একজন সৈনিক বলে উঠল–সাদইদের আধিপত্য আমরা স্বীকার করি না। রাজা হিতেন। তুমি ফিরে যাও।

    –এতবড় স্পর্ধার কথা কী করে বলছে লোকটা!

    –যে ফেরাউন আমাদের সর্বস্ব ধ্বংস করেছে–আমার জমিজমা, বউ, সন্তান নষ্ট করে দিয়েছে, তারই হয়ে ভাড়া খাটছি আমরা–এই অপমান কত সইব বলতে পারো! তোমার তদারকির পরোয়া করি না রাজা। তুমি ফিরে যাও। ফেরাউন আমার হাতের আঙুল কেটে দিয়েছে, এই দ্যাখো!

    দু’ হাত মাথায় তুলে দেখালো সেই সৈনিক।

    –অসম্ভব! ওই সুন্দরীকে আমার চাই! বলল রাজা হিতেন।

    ইহুদ বললেন–মা রিবিকা, তুমি এবার লোটাকে বলে দাও, রাজা তাকে বধ করতে এসেছে!

    রিবিকার ঠোঁট দুটি থরথর করে কেঁপে উঠল। সে কিছুতেই এতবড় মর্মান্তিক কথা উচ্চারণ করতে পারছিল না। তার কেবলই মনে পড়ছিল তার মায়ের ভাষা ছিল লোটারই মত বিচ্ছিন্ন,সকলে তাকে ঘৃণা করত। মা ছিল বাবার উপপত্নী! লোটার মুখটা তেমনই সরল।

    ইহুদ এবার রিবিকাকে ধমক দিয়ে উঠলেন। রিবিকার চোখ দুটি এমন অসহায় মুহূর্তে সাদইদকে খুঁজছিল। সে নিজেও অবাক হল, তার চোখ কেন সাদইদকেই খুঁজছে!

    হিতেন গর্জন করে উঠল–সাদইদ লোটাকে বাঁধো–আমার হুকুম!

    সাদইদ তার সাদা অশ্ব রাজার রথের কাছে হাঁকিয়ে নিয়ে এল। তারপর বলল–আপনার সঙ্গে রয়েছে সারথী আর মাত্র একজন ঢাল ধরা সৈনিক-তাই সম্বল করে এত হাঁকাহাঁকি ঠিক নয় মহারাজা।

    রাজা হিতেন উচ্চ হাস্য করে উঠল। বলল–তুমি বড় মূর্খ সাদ। তোমায় সন্ধিফলক মাগনাই দিয়েছি দেখছি।

    এই সময় দূরে থেকে প্রখর তূর্যনাদ ভেসে এল। দেখতে না দেখতে সমস্ত তল্লাট রাজা হিতেনের অশ্বারোহী সেনায় ভরে গেল। লোটার কোমরে দড়ি বাঁধা হল শক্ত করে–দুহাত বাঁধা হল। সন্ধ্যার আগের সূর্যালোকে নীল আকাশ রক্তে প্লাবিত। সেই দিকে দু চোখ মেলে লোটা হাঁটতে থাকল বধ্যভূমির দিকে।

    রিবিকা লোটার ভাষায় আর্তনাদ করে উঠল–যেও না লোটা, রাজার লোক তোমায় হত্যা করতে নিয়ে যাচ্ছে! মহাত্মা ইহুদ, এ আপনি কী করলেন।

    প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ল রিবিকা। দুহাত মুখ ঢেকে মাটির উপর বসে পড়ল। যে ক্রীতদাস সৈন্য দু হাতের আঙুল কেটে দিয়েছে মিশরের দাসমালিক বলেদু হাত তুলে দেখাচ্ছিল সেই সৈনিকটি রিবিকার কাছে এগিয়ে এসে বলল–কেঁদো না বউ! তুমি কাঁদলে মানুষের সংসার কাঁদে!

    লোটা আকাশে চোখ মেলে এগিয়ে চলেছে, তার পিছু পিছু সমস্ত মানুষ ধীরে ধীরে দীর্ঘ সারির মিছিলে চলতে শুরু করেছে। সাদইদ সেই প্রবাহের দিকে বিষাদপূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়েই রয়েছে। তার করার কিছুই নেই।

    লোটা প্রায়ই বলত, যা রিবিকা অনুবাদ করেছিল সেদিন আমি একদিন বৃষ্টি ঝরা ভোরে ঝাঁপসা দিগন্তে উটের পিঠে চড়ে চলে যাব, আর ফিরব না।

    কিন্তু এখন তো সন্ধ্যাকাল। সবাই চলে গেছে বধ্যভূমির দিকে। ভয়াবহ আর্তনাদ করে উঠলেন মহাত্মা ইহুদ। ইয়াহো! ইয়াহো। …

    তারপর হঠাৎ তিনি স্বয়ং বধ্যভূমির দিকে পাগলের মত ছুটতে শুরু করলেন। রাজার রথ ধীরে ধীরে তাঁর পিছু পিছু এগিয়ে চলল। বাবার পিছনে ছুটে গেছে রিবিকা–তার ছুটে যাওয়ার দিশে ছিল না।

    এমন সময় বধ্যভূমির কাছে মিছিল থামলে এই মরুমর্তে এক আশ্চর্য দৃশ্যের ঘটনা দেখা যায়। নোটাকে আঁকড়ে ধরেছে রিবিকা। মহাত্মা ইহুদ বলছেন–এই কান্নার শেষ কি নেই? ঈশ্বর!

    লোটার বুকে লুটিয়ে পড়েছে রিবিকা।

    সাদা অষের পিঠে হেরার পুত্রকে কোলে করে ছুটে এসেছে সাদইদ। তার মনে হল, সামনের এই ছবিই পৃথিবীর শেষ ছবি। এর চেয়ে সুন্দর কিছু নেই। তার দেখা প্রজাপতি অধিকৃত নারীই লোটার বুকে আরো সুন্দর হয়ে ফুটে উঠেছে। এবং এর পরই পৃথিবীর নৃশংসতম দৃশ্যটি সে দেখবে।

    কিন্তু দৃশ্যান্তর হল ইয়াহোর নির্দেশে। কেননা মহাত্মা আকাশে মুখ তুলে ইয়াহোর নামে আতশব্দ করে উঠলেন মুহুর্মুহু ।

    দিগন্ত সহসা কালো হয়ে উঠল। মনে হল দিগন্তজুড়ে কী যেন কালো মতন ভেসে আসছে। রাজা হিতেন সুন্দরী রিবিকাকে ধরবার জন্য রথ ছেড়ে নেমে পড়েছিল। সে কেবল সম্মুখে এগিয়ে এসেছে মাত্র দুটি ধাপ ফেলে, এমন সময় দিগন্ত সমাচ্ছন্ন হল! অজস্র ঈগল নিনিভের দিক থেকে উড়ে আসছে।

    প্রত্যেকটির পায়ে ধরা ইঁদুর। মাথার আকাশ ভরে গেল মুহূর্তে।

    রাজার পায়ের কাছে ঈগল তার শিকার ফেলে দেয়। ইঁদুরের মুখ টুকটুকে লাল। পেট মোটা। ধপ ধপ শব্দে ইঁদুর পড়তে থাকে আকাশ থেকে। মানুষ আর্তনাদ করে ওঠে–মড়ক! মড়ক! মানুষের মড়ক! নিনিভে মানে মড়কের নগরী! সব শেষ হয়ে গিয়েছে।

    রাজার দেহ সঙ্গে সঙ্গে হিম হয়ে যায়। সে হাত বাড়িয়েছিল কিন্তু পা আর নড়াতে পারল না। রাজা রথে গিয়ে চড়ল।

    মহাত্মা ইহুদ লোটার দড়ি গা থেকে দ্রুতহাতে খুলে দিলেন। লোটা ছাড়া পেয়ে তার কালো অর্থের দিকে দৌড়ে গেল। সমস্ত মরুভূমিতে পা ফেলা যাচ্ছে না। ভয়ে রাজার সৈন্যরা অশ্ব ছুটিয়ে দিয়েছে অন্য দিগন্তের দিকে। পা আর ফেলা যাচ্ছে না কিছুতেই। প্রচুর ইঁদুর দৌড়চ্ছে। লাল মুখ। পেট ফোলা। কোনটির ভুড়ি বেরিয়ে পড়েছে। লোটা লাফিয়ে উঠল কালো ঘোড়ার পিঠে।

    তেড়ে গেল রথ লক্ষ্য করে। রাজার বুক ভেদ করে গেল লোটার ছুঁড়ে দেওয়া বর্শা। রাজার দেহ রথ থেকে মাটিতে পড়ে গেল। তারপর এক দণ্ডে কালো অশ্ব কোথায় হারিয়ে গেল দেখা গেল না।

    সমস্ত রাত কম-বেশি সকলেই জেগে থাকল লোটার অপেক্ষায়। লোটা এই বুঝি ফিরে আসে। সবাই ভয় করছিল সমস্ত মরুভূমিতে লালমুখো মড়কের ইঁদুর ছড়িয়ে গেছে। জুম পাহাড়ী এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া দরকার। মহাত্মা ইহুদ রাত্রির আকাশে আর্তনাদ ভাসিয়ে দিচ্ছিলেন মাঝে মাঝে ইয়াহো!

    মানুষের হৃদয় সেই আর্তনাদে কেঁপে কেঁপে উঠছিল। তারা শেষ রাত্রের লাল চাঁদের আলোয় দিগন্তে চেয়ে ভাবছিল–একটি কালো অশ্ব তারা দেখতে পাবে। সমস্ত রাতের প্রতীক্ষা ব্যর্থ করল লোটা। ফিরে এল না। মহাত্মা ইহুদ ভোরের সূর্যকে লাঠি তুলে শাসন করে বললেন–হ্যাঁ সামাশ! তুমি আবার এসেছ! তোমাকে ইয়াহোর নির্দেশে বারবার আসতে হবে! রানী ইসাবেলা তুমি দেখে যাও, ইয়াহোর হুকুমে শত শত ঈগল উড়ে এসেছে। সূর্য এসেছে। লোটা তাঁরই নির্দেশে হারিয়ে গেল! ইয়াহো চাইলে সে আবার ফিরে আসবে! নতুবা সে আর ফিরবে না। চলো আমরা মধুদুগ্ধের দেশে যাত্রা করি!

    রিবিকা এ সময় ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সকালের দিগন্তে চেয়ে থাকতে থাকতে রিবিকার মনে হল, কালো ঘোড়া ওই বুঝি দেখা যায়! কিন্তু সে দেখল একটি সাদা অশ্ব দিগন্তে উদ্ভাসিত হয়েছে। সে তখন আরো জোরে কেঁদে উঠল উচ্চকিত সুরে।

    এরপর সব প্রবল প্রবাহ এল নানা দিগন্ত থেকে। মহাত্মা প্রস্তুত। বিশাল এক জনসমুদ্র মহাত্মাকে অনুসরণ করবে। সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে। সূর্যের কুসুম আলো লাল বালুতে পড়ে জ্বলজ্বল করছে। জুম পাহাড় একা দাঁড়িয়ে আছে। তার ভাষা কেউ আর শুনবে না।

    সাদা অশ্ব থেকে ছেলে কোলে করে নেমে এল সাদইদ। তার চোখে সমস্ত রাত্রির জাগরণ। সে লোটাকে খুঁজে ফিরেছে তামাম রাত্রি। সাদইদ মাথা নিচু করে রিবিকার দিকে শিশুকে এগিয়ে ধরে বলল-একে বাঁচিয়ে রেখো রিবিকা। আমি লোটাকে খুঁজতে গেলাম।

    জনস্রোত চলতে শুরু করল। রিবিকা হঠাৎ শিশুকে কোলে নেবার সময় লক্ষ্য করল সাদইদের হাতের উল্কি রক্তাক্ত, সদ্য ছুরিতে কেটে ফেলেছে সে। রক্ত ঝরে পড়ছে। সাদইদ চিৎকার করে উঠল

    –কেউ তোমরা আমার সঙ্গে যাবে না? অন্তত একজন কেউ? আমার ভাষায় যারা কথা বলেছ, তারা কেউ নেই?

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleসিমার – আবুল বাশার
    Next Article দ্য গড ইকুয়েশন : থিওরি অব এভরিথিংয়ের খোঁজে – মিচিও কাকু

    Related Articles

    আশাপূর্ণা দেবী

    সমুদ্র কন্যা – আশাপূর্ণা দেবী

    April 24, 2026
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    আমাদের মহাভারত – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    March 20, 2026
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    বিপিনের সংসার – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    January 8, 2026
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    ভয় সমগ্র – হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    December 9, 2025
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    কিশোর অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র – হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    December 9, 2025
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    প্রকাশ্য দিবালোকে – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    November 18, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    অপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    অপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026
    Our Picks

    অপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026

    শ্মশানকোকিলের ডাক – সৌভিক চক্রবর্তী

    May 1, 2026

    এসো না অসময়ে – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }