Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    May 14, 2026

    বৃশ্চিক – পিয়া সরকার

    May 14, 2026

    সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

    May 14, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    স্বর্ণমুকুট – গোপেন্দ্র বসু

    গোপেন্দ্র বসু এক পাতা গল্প154 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    স্বর্ণমুকুট – ২

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

    প্রায় সাড়ে তিন শো বছর আগের কথা।

    এক মহা দুর্যোগের রাত—বোধহয় দুইপ্রহর। দারুণ শীত পড়েছে। সারা আকাশ ঝুলের মতো কালো কালো মেঘে ও জমাট কুয়াশায় ঢাকা। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে হু হু করে। চারদিকে ভয়াবহ নিঝুম স্তব্ধতা। জনপ্রাণীর সাড়া নেই কোথাও।

    প্রকৃতি যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

    মহারাজ প্রতাপাদিত্যের রাজধানী ধুমঘাটা আজ কদিন নীরব নির্জন। যশোর রাজ্যের প্রজারা বেশীর ভাগ মোগল সৈন্যদের হাতে নিহত হয়েছে, অন্যেরা কোনমতে প্রাণ নিয়ে রাজধানী ত্যাগ করে দূরে পালিয়েছে। প্রতাপাদিত্যের প্রাসাদ আজ খাঁ খাঁ করছে—যেন মহা শ্মশান। একটি জীবও সেখানে নেই।

    সেই দারুণ রাতে রাজপ্রাসাদের পিছনের পরিখার ওপর ঘন অন্ধকারের মধ্যে একজন লোক অধীর প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। লোকটি প্রৌঢ়। ভালো করে দেখলে তাঁকে বলশালী ও অভিজাত বংশীয় বলে মনে হয়। প্রৌঢ়টির দেহ স্থানে স্থানে ক্ষতবিক্ষত। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তিনি আশে পাশে ও সামনে যমুনা নদীর দিকে লক্ষ্য করছেন; এক-একবাব অন্ধকার আকাশের দিকে তাকাচ্ছেন। প্রৌঢ়টির পায়ের কাছে একটা মাঝারি আকারের লোহার সিন্দুক আর একটা গাদা বন্দুক। কি এক অজ্ঞাত কারণে অধীর উৎকণ্ঠায় তিনি অপেক্ষা করছেন।

    বহুক্ষণ পরে গভীর অন্ধকারের মধ্যে অল্প দূরে একটি লোককে দেখা গেল—গাছপালার মাঝ দিয়ে সে প্রৌঢ়টির দিকেই এগিয়ে আসছে। প্রৌঢ় তাড়াতাড়ি বন্দুকটা হাতে নিয়ে দৃঢ় চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, “কে?”

    আগন্তুক উত্তর দিলে, “বাবা, আমি—দুর্লভ।”

    দুর্লভ কাছে এলো। প্রৌঢ় জিজ্ঞাসা করলেন, “বাড়ির সকলকে বসুরহাটে রেখে এসেছো তো?”

    হল ভ বললে, “হাঁ। সেইজন্যেই দেরি হয়ে গেল। ওদিক থেকে ফেরবার সময় নৌকো পাই নি। এখানে এসে মা যশোরেশ্বরীর কৃপায় একটা কোশা নৌকে। পেয়েছি। নৌকো চালাবার লোকও পেয়েছি। মহাবাজার একদল নৌসেনা ও মাঝিমাল্লা রাতের অন্ধকারে দেশে ফিরছিল, আপনার কথা বলতেই তারা রাজী হয়ে গেল। তারা আমাদের সাগরদ্বীপে পৌঁছে দেবে। ওদের বাড়ি ও ঐদিকে।”

    নদীর দিকে ফিরে দুর্লভ একটা সাংকেতিক শব্দ করতে জনকয়েক নৌসেনা এসে প্রৌঢ়কে মহাসম্ভ্রমের সঙ্গে কুর্নিশ করলে। ওদের দলপতি বললে, “মীরবহর সাহেব, আপনার হুকুম চিরদিন তামিল করে এসেছি, এই শেষবারও করবো। আমরা হতাশ হয়ে যে যার ঘরে ফিরছিলুম, আপনাকে পেয়ে ভালোই হলো। আপনার সঙ্গে আমরাও সাগরদ্বীপে যাব, সেখানে আপনার অধীনে আবার কাজ করবো। মনে হয়, সাগরদ্বীপ এখনও মোগলদের হাতে যায় নি বা ধুমঘাটার খবর ওখানে পৌঁছয় নি।

    অন্ধকার আকাশের গায়ে দু-একটা ভার। ফুটেছে। সেদিকে লক্ষ্য করে প্রৌঢ় মীরবহর বা নৌসেনাধ্যক্ষ মধুসূদন রায় বললেন, “ঠিক রাত দ্বিপ্রহর। আব আমাদের দেরি করা সঙ্গত হবে না। এক্ষনি যাত্রা করতে হবে।”

    দুর্লভ বললে, “বাবা, আপনি ঘাটে গিয়ে নৌকোতে অপেক্ষা করুন। আমরা সিন্দুকটা নিয়ে সেখানে যাচ্ছি।”

    মধুসূদন রায় বললেন, “না, আমিও সিন্দুকের সঙ্গে সঙ্গে যাব। মহারাজার শেষ আদেশের কণামাত্র অবহেলাও আমার দ্বারা হবে না।”

    নৌসেনারা সিন্দুকটা নিয়ে নদীর দিকে রওনা হলো। মধুসূদন রায় বন্দুক-হাতে ওদের সঙ্গে চললেন।

    দুর্লভ জিজ্ঞাসা করলে, “বাবা, আপনার হাতে কি এটা বন্দুক?”

    মধুসূদন রায় জবাব দিলেন, “হাঁ। একটা বন্দুক আর কিছু ছটরা বারুদ সঙ্গে নিয়েছি।”

    দুর্লভ বললে, “আর বন্দুক বারুদ! ও সবের দরকার তো ফুরিয়ে গেলো!”

    মধুসূদন রায় দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “হু! তা বোধহয় গেলো। তবে যাচ্ছি বহু দূরদেশে,—পথে চোর-ডাকাত, মগ-ফিরিঙ্গি জলদস্যুর দল, হিংস্র জন্তুজানোয়ার আরো কত কি থাকতে পারে। তাই এটা সঙ্গে নিয়েছি। মহারাজার এই সিন্দুকটা তাঁর দ্বিতীয় রাজধানী সাগরদ্বীপে পৌঁছে না দেওয়া পর্যন্ত আমাকে আত্মরক্ষা করতেই হবে।”

    যমুনা নদীর রাজঘাট থেকে কিছু দূরে গোপন একটা ঝুপী জঙ্গলের মধ্যে নৌকোটা নোঙর করা ছিল। নদীতে তখনও ভাটার টান পড়ে নি। নৌকোটা একেবারে তীর ঘেঁষে আছে। নৌ-সেনাদের তাই সিন্দুকটা নৌকোয় তুলতে বেশী কষ্ট হলো না।

    দুর্লভ বললে, “বাবা, এইবার আপনি উঠুন।”

    মধুসূদন রায় তন্ময় হয়ে রাজপ্রাসাদের দিকে চেয়ে ছিলেন। দুর্লভের ডাকে যেন সম্বিৎ ফিরে এলো। কি বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোলো না। তাঁর দুচোখে তখন জলের ধারা নেমেছে।

    নিঃশব্দে তিনি ধীরে ধীরে নৌকোয় উঠলেন। দুর্লভ উঠতেই নৌকো ছেড়ে দিলে।

    .

    বোধহয় অমাবস্যা বা প্রতিপদ তিথি। ফাঁকা চওড়া নদীর উপরেও গভীর অন্ধকার। নদীতে ভাটার টান পড়েছে। কিছুদূর আসতে মধুসূদন রায় নৌসেনাদের উদ্দেশ করে বললেন, “এইখানে বোধহয় মহারাজার ঘাট—নয়?”

    মহারাজ প্রতাপাদিত্যের বাঁধানো ঘাটের সামনে নৌকো এসে গিয়েছিল। ওদের একজন উত্তর দিলে, “হাঁ, হুজুর।”

    মধুসূদন রায় ঘাটের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, “মোগল সৈন্যরা সেদিন যখন রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে ঢুকলো, তখন মহারানী শরৎকুমারী রাজপরিবারের স্ত্রীলোক ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে গুপ্তদ্বার দিয়ে এই ঘাটে এসে আত্মবিসর্জন দিয়েছিলেন। দুর্লভ, আমরা রক্ষা করতে পারি নি—”

    মধুসূদন রায়ের চোখ দিয়ে অবিরল জল গড়িয়ে পড়ে।

    দুর্লভ সান্ত্বনার সুরে বললে, “সে কথা ভেবে আর কি ফল, বাবা। আপনি তো রাজপরিবারকে রক্ষা করার জন্যে প্রাণ বিসর্জন দিতে গিয়েছিলেন।”

    মধুসূদন রায় ক্ষুব্ধ হতাশ কণ্ঠে বললেন, “কিন্তু ব্যর্থ হতে হলো।”

    ভাটার টানে নৌকো ঠিকমতোই চলছিল। হঠাৎ একজন মাঝি চাপা গলায় বললে, “এই জায়গাটা খুব চুপি চুপি পার হতে হবে। এখানে বোধহয় মোগল সেপাইদের একটা ঘাঁটি আছে। আমরা গুন টেনে যাবো। হুজুর ছইয়ের মধ্যে যান। যতক্ষণ না খাঁড়ি পার হচ্ছি, ততক্ষণ বিপদের সম্ভাবনা পুরোপুরি থাকবে।”

    মাঝিদের আট-দশজন নিঃশব্দে নৌকো থেকে নেমে নদীর তীরে উঠে গুন টেনে চললো। দাঁড়ের শব্দ হলে বিপদের সম্ভাবনা আছে।

    নৌকোর গলুয়ের উপর মধুসূদন রায় বসে ছিলেন। স্থির গম্ভীর। মহারাজ প্রতাপাদিত্যের রাজধানী ধুমঘাটার দিকে নিষ্পলক চোখে চেয়ে আছেন। গভীর অন্ধকার,—তবুও অল্প অল্প দেখা যাচ্ছিল প্রতাপাদিত্যের প্রাসাদ, দুর্গ, প্রাকার, মন্দিরের চূড়া। মধুসূদন রায়ের দৃষ্টিপথ থেকে অল্প অল্প করে ধুমঘাট। মিলিয়ে গেল—বোধহয় চিরদিনের জন্যে। মধুসূদন রায় ছইয়ের মধ্যে গেলেন।

    শীতের রাতের উত্তুরে বাতাস ও ভাটাব টানে মধুসূদন রায়ের নৌকো চলেছে হু হু করে; মাঝিরা পাল খাটিয়ে দিলে। তারা যশোরের সীমানা পার হয়েছে।

    … … …

    চূড়ান্ত দুঃখ-কষ্টের দিনও কেটে যায়। মধুসূদন রায় ও তাঁর সঙ্গীদেরও দু দিন দু রাত কেটে গেল। যমুনা নদী ছেড়ে নৌকো রায়মঙ্গলে পড়েছে। এ অঞ্চলে লোকের বাস খুব কম। নদীর দুপাশে মাঝে মাঝে হোগলা হেঁতালের জঙ্গল।

    দুর্লভ ঘুম থেকে উঠে দেখলে—মধুসূদন রায় ইতিমধ্যে কখন উঠে চুপ করে বসে আছেন, কি চিন্তা করছেন গভীর তন্ময় হয়ে।

    দুর্লভ বললে, “বাবা, আপনি ঘুমোন, এখনও সকাল হয় নি।”

    হঠাৎ চিন্তাজাল ছিড়ে যেতে মধুসূদন রায় যেন একটু চমকে উঠলেন। কিছুক্ষণ দুর্লভের দিকে চেয়ে থেকে বললেন, “আর শোব না। তুমিও আর শুয়ো না, আমার পাশে এসে বস। তোমাকে আমার অনেক কথা বলবার আছে।”

    দুর্লভ এসে মধুসূদন রায়ের পাশে বসলো। ধরা গলায় ধীরে ধীরে মধুসূদন রায় বলতে লাগলেন, “লেখাপড়ার সুবিধা হবে বলে ছেলেবেলা থেকেই তোমাকে তোমার মামার বাড়িতে রেখে দিয়েছিলাম। তুমি এদিককার খবর কিছুই জানো না। এমন কি এই যশোরের দুটো যুদ্ধের খবরও খুব কম জানো, অথচ তোমার সবই জানা দরকার। যদি মা যশোরেশ্বরীর কৃপায় আবার যশোররাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়, তাহলে আমার উত্তরাধিকারী হিসাবে তুমিও যশোরের রাজকার্যে যোগ দেবার সুযোগ পাবে—আমি এখনো আশা রাখি। তাই বলছি, যশোরের সকল ইতিবৃত্তই তোমার জানা উচিত। মহারাজ প্রতাপাদিত্যের বিষয়, তাঁর বংশপরিচয়, বা আমাদের বংশের সঙ্গে তাঁদের কি সম্পর্ক, তাও বোধহয় তুমি ভালো করে জানো না। আজ সব বলবো।”

    পুব আকাশে অল্প অল্প আলো দেখা দিয়েছে। জোয়াব আসতে কিছু দেরি আছে। কিন্তু নদীর জল বেশ চঞ্চল হয়ে উঠেছে। তার ফলে, নৌকোর গতিও কিছুটা কমে গিয়েছে।

    মধুসূদন রায় বলে চললেন, “যশোরবাজ্য প্রতিষ্ঠা হবার বহু আগে থেকে এই রাজবংশের সঙ্গে আমাদের বংশের সম্পর্ক খুব নিকট আমাদের দুই বংশের পূর্বপুরুষদের অনেকে একসঙ্গে বাংলার পাঠান সুলতানদের অধীনে উচ্চ রাজকর্মচারীর কাজ করেছেন। পাঠান রাজ-সরকারে কাজ করার জন্যে আমাদের পূর্বপুরুষরা কেউ কেউ ‘খাঁ’ বা ‘রায়’ উপাধি পান। কিন্তু আমাদের বংশের ‘বসু’, আর যশোর রাজবংশের ‘গুহ’ হলো আসল উপাধি। আমাদের বংশের গোপীনাথ বসু বা পুরন্দর খাঁ ছিলেন পাঠান সুলতান হোসেন শার একজন মন্ত্রী। আর মহারাজ প্রতাপাদিত্যের বাবা ও কাকা দুজনেই ছিলেন বাংলার শেষ পাঠান সুলতান দাউদ খাঁর মন্ত্রী। তাঁদের দুজনের নাম ছিল শ্রীহরি গুহ ও শ্রীজানকীবল্লভ গুহ। দাউদ খাঁর বহু ধনরত্ন এঁদের কাছে থাকতো। রাজমহলের যুদ্ধে মোগলদের হাতে দাউদ খাঁ পরাজিত ও নিহত হবার পর শ্রীহরি গুহ ও শ্রীজানকীবল্লভ গুহ দু ভাই যশোরে আসেন ও যশোররাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। বড় ভাই শ্রীহরি গুহ মোগল বাদশার অধীনে যশোরে সামন্ত রাজা হলেন, তাঁর নাম হলো ‘বিক্রমাদিত্য’। জানকীবল্লভের নাম হলো ‘বসন্ত রায়’। বসন্ত রায়ের দক্ষতায় যশোররাজ্য দিনে দিনে উন্নত হতে লাগল।

    “রাজমহল থেকে এঁরা দু ভাই যখন আসেন, তখন আমি অভিভাবকহীন বালক। বসন্ত রায় ছিলেন আমার পিতৃবন্ধু। তিনি আমাকে যশোর-রাজবাড়িতে স্থান দেন। প্রতাপাদিত্য আমার চেয়ে বয়সে কিছু ছোট ছিলেন। তাঁর ছোটবেলার নাম ছিল ‘গোপীনাথ’। যুবরাজ হলে নাম হয় ‘প্রতাপাদিত্য’। আমরা ছেলেবেলায় একসঙ্গে বসন্ত রায়ের কাছে রাজনীতি ও রণবিদ্যা শিক্ষা করতাম। দশ-বারো বৎসরের মধ্যে যশোররাজ্য বাংলার প্রায় শ্রেষ্ঠ রাজ্য হয়ে উঠলো কিন্তু বাংলার ভাগ্যেও সে-সময় ঘনিয়ে এলো এক মহাদুর্যোগ।”

    মধুসূদন রায় থামলেন। কয়েক মুহূর্ত পরে শোনা গেল তাঁর বিষণ্ণ কণ্ঠ—যেন দূর অতীত থেকে ভেসে আসছে—”রাজমহল-যুদ্ধে মোগলসম্রাট আকবর পাঠানশক্তি দমন করে বাংলাদেশ অধিকার করেছিলেন সত্য, কিন্তু তিনি বাংলাকে সম্পূর্ণ পদানত করতে পারেন নি। মোগলরা কোনদিনই পাঠানদের মতো এদেশের লোকের হৃদয় জয় করতে পারে নি। পাঠানদের সময় বাংলার জমিদাররা প্রায় স্বাধীন ছিল। কিন্তু মোগলরা অতটা স্বাধীনতা তাদের দিতে চাইল না। ফলে, বারোজন বড় বড় জমিদার বা ভুইয়াদের মধ্যে অনেকের মন মোগলদের উপর বিরূপ হলো। কেউ কেউ মোগল-শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন, বাদশাহ সরকারে কর দিলেন না।

    “যশোরের বিক্রমাদিত্য বা বসন্ত রায় এ সব পছন্দ করতেন না, মোগল বাদশার অনুগত হয়েই থাকতেন। তাঁরা দুজনেই ছিলেন অতি ধীর ও শান্ত প্রকৃতির। কিন্তু প্রতাপাদিত্য ছিলেন ঠিক বিপরীত—অতি চঞ্চল ও উদ্ধৃত প্রকৃতির। তাঁর মধ্যে বীরভাবও ছিল অত্যন্ত প্রবল। বসন্ত রায় প্রতাপাদিত্যকে শান্ত ও সভ্য করার বহু চেষ্টা করেন। শেষে তিনি যশোররাজ্যের প্রতিনিধি হিসাবে তাকে আগ্রায় বাদশার দরবারে পাঠালেন, যাতে তিনি সেখানে গিয়ে পাঁচজন বড় বড় লোকের সঙ্গে মিশে সংযত ও শিষ্ট হন। কিন্তু তার ফল হলো বিপরীত।

    “প্রতাপাদিত্য যখন আগ্রায় মোগল দরবারে গেলেন, তখন মেবারের রানা প্রতাপের সঙ্গে আকবরের যুদ্ধের পর যুদ্ধ চলেছে। প্রচণ্ড মোগলশক্তির বিরুদ্ধে রানা প্রতাপ সামান্য কয়েকজন সৈন্য নিয়ে লড়ছেন,—রানা প্রতাপের বীরত্বে সারা ভারত মুগ্ধ। প্রতাপাদিত্য এই সব দেখে শুনে মনে মনে স্থির করলেন, ‘রানা প্রতাপের মতো আমিও মোগল-শক্তির বিরুদ্ধে লড়বো। আমিই বা কম কিসে! কিন্তু এ ব্যাপারে প্রধান অন্তরায় হবেন তাঁর বাবা ও কাকা—এ কথা বুঝতে পেবে কৌশলে বাদশাহ সরকার থেকে নিজের নামে যশোররাজ্যের সনদ লিখে নিয়ে প্রতাপাদিত্য দেশে ফিরলেন।

    এ খবরে বিক্রমাদিত্য দারুণ মর্মাহত হলেন। কয়েক মাস পরে তাঁর মৃত্যু হলে।। বসন্ত রায় রাজধানী ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেন। বসন্ত রায়েব ছেলে গোবিন্দ বায় প্রতাপাদিত্যকে হত্যা করার চেষ্টা করায় বসন্ত রায়ের সঙ্গে প্রতাপাদিত্যের মনোমালিন্য হয়। প্রতাপাদিত্য ক্রুদ্ধ হয়ে বসন্ত রায়কে হত্যা করেন। রাজনীতিতে এ সব কাজ গর্হিত বলে তিনি মনে করতেন না। বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করবার অদম্য ইচ্ছায় এ সব তিনি করেছিলেন।

    “আগ্রায় বাদশা আকবর তখন রাজপুতদের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত। বাংলাদেশকে ভালো রকম শাসন করার তাঁর অবসর নেই। বাংলার বারো ভু ইয়াদের অনেকেই তখন বাদশাকে কর দেওয়া বন্ধ করে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে চলছেন। প্রতাপাদিত্য তো একাজে সকলের অগ্রণী। তিনি মোগলশক্তিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করলেন। প্রকাশ্যভাবে বিদ্রোহ ঘোষণা করার আগে মোগল-শক্তির বিরুদ্ধে লড়বার মতো শক্তিও তিনি সঞ্চয় করলেন। এই সব সংবাদ ও বসন্ত রায়কে হত্যা করার নালিশ আগ্রার দরবারে পৌঁছলো। বাদশা আকবর মানসিংহকে বাংলায় পাঠালেন বিদ্রোহী ভূঁইয়াদের দমন করার জন্যে – বিশেষ ভাবে প্রতাপাদিত্যকে। প্রতাপ তখন বেশ শক্তিশালী। তাঁর ষোলোটা দুৰ্গ, বিশ হাজার ঢালী সৈন্য, ফিরিঙ্গি গোলন্দাজ, হাতী, ঘোড়া, নৌকো, কামান, বন্দুক সবই হয়েছে। স্বাধীন রাজার মতই তিনি ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছেন।”

    মধুসূদন বায় আবার থামলেন। সূর্য পুব আকাশে অনেক উপরে উঠেছে। মধুসূদন রায়কে কিছুটা চঞ্চল মনে হলো—স্মৃতির ভাণ্ডারে কি যেন খুঁজছেন তিনি। দুর্লভের উৎসুক দৃষ্টি তাঁর মুখের উপর নিবদ্ধ। নিস্তব্ধ প্রকৃতি। তালে তালে শুধু দাঁড়ের শব্দ হচ্ছে। মধুসূদন রায় আবার শুরু করলেন—বলতে বলতে তাঁর কণ্ঠ উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে।

    “মোগল সৈন্যরা যশোব আক্রমণ করলে। যুদ্ধ চলতে লাগলো অতি প্রচণ্ডভাবে। প্রতাপাদিত্য যে সত্যই শৌর্যশালী বীরপুরুষ, তা সকলেই বুঝলে—এমন কি মোগল সেনাপতি মানসিংহও। প্রতাপাদিত্যের বীরত্ব, যুদ্ধকৌশল আর শক্তিসম্পদ দেখে মানসিংহ মুগ্ধ হলেন। মোগল সৈন্যরা প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে পেরে উঠলো না। মানসিংহ সামান্য কয়েকটি শর্তে প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে সন্ধি করে আগ্রায় ফিরে গেলেন।

    “তারপর বছর কতক বেশ শান্তিতেই কেটে গেল। কিন্তু খুব বেশী দিন নয়। এই সময় বাদশা আকবর মারা গেলেন। আগ্রার সিংহাসনে বসলেন জাহাঙ্গীর। ভারতে আবার অশান্তি দেখা গেল নানা দিক থেকে। বাদশাহ-দরবারে তখন মনোমালিন্য চলেছে জাহাঙ্গীরের বাদশা হওয়া নিয়ে। অনেকে চাইতেন না যে, তিনি সিংহাসনে বসেন। এই হলো মনোমালিন্যের কারণ। মানসিংহ তখনও জীবিত। অনেকের চক্ষে তিনিও সন্দেহজনক ব্যক্তি। এর ফলে দেশের সর্বত্র আবার বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে। বাংলার ভূঁইয়াদের অনেকে বাদশাকে অগ্রাহ্য করলেন। প্রতাপাদিত্য তো বাদশার অধীনতা স্বীকারই করতেন না। তিনি হলেন বিদ্রোহীদের মধ্যে শুধু অগ্রণীই নন, সর্বাপেক্ষা শক্তি ও সম্পদশালী।

    “বাদশা জাহাঙ্গীর ইসলাম খাঁকে বাংলার সুবেদার করে বিদ্রোহী ভু ইয়াদের দমন করতে পাঠালেন। ইসলাম খাঁর সময় বাংলার রাজ-ধানী হলো ঢাকায়। ইসলাম খাঁ ঢাকায় এসে প্রথমেই প্রতাপাদিত্যকে ডেকে পাঠালেন, প্রতাপাদিত্য কৌশলে সময় নিয়ে নিজেকে আরও শক্তিশালী করবার চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু দিন কয়েকের মধ্যে দেখা গেল, মোগল সৈন্যরা যশোর আক্রমণ করেছে।

    “যশোরের দ্বিতীয় যুদ্ধ আরম্ভ হলো।

    “এই যুদ্ধেব আগে প্রতাপাদিত্য ভেবেছিলেন, মোগলদের সঙ্গে যুদ্ধ আরম্ভ হলে অন্য ভুইয়ারা সকলে, তাঁর সহায় না হোন, নিজেরা বিদ্রোহ করবেন, আর চন্দ্রদ্বীপের ভুইয়া তাঁর জামাতা রাম-চন্দ্রের ও হিজলীর ভুইয়া বন্ধু ওসমান খাঁর সাহায্য তিনি পাবেন। কিন্তু দুটির কোনটিই হলো না। উপরন্তু, ভূষণার ভু ইয়া মুকুন্দরাম ও মাটিয়ারীর জমিদার ভবানন্দ হীন স্বার্থসিদ্ধির জন্যে মোগলদের সহায় হলেন। যুদ্ধেব আরম্ভে প্রতাপাদিতা নিজে রাজধানী ধূমঘাটায় রইলেন, আর যুবরাজ উদয়াদিত্যকে শালখার দুর্গে পাঠালেন। মোগল সৈন্যরা ঐদিক দিয়ে যশোবে আসছিল।

    “উদয়াদিত্য বাবার মতোই বীর ছিলেন, কিন্তু যুদ্ধে আদৌ সুবিধা করতে পারলেন না। তাব প্রধান কারণ—যুদ্ধের প্রথমেই তাঁর প্রধান সহায় কমল খোজার মৃত্যু আর জমাল খাঁর বিশ্বাসঘাতকতা। শালখার যুদ্ধে মোগলদের শুধু জয়ই হলো না, যশোর রাজকোষের বহু অর্থ ও সৈন্যদের খাদ্যসামগ্রী তাদের হস্তগত হলো। উদয়াদিত্য কোনমতে প্রাণ নিয়ে ধূমঘাটায় ফিরে এলেন। যুদ্ধের মোড় ফিরে গেল। এই সময় প্রতাপাদিত্যের শরীরও খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে, বীর প্রতাপাদিত্য জীবনে এই প্রথম দমে গেলেন। তিনি মোগল সেনা -পতি গিয়াস খাঁর সঙ্গে যুদ্ধ স্থগিত রাখবার চুক্তি করে ঢাকায় ইসলাম খার কাছে সন্ধির প্রস্তাব করতে গেলেন।

    “মহারাজা ঢাকায় যাবার আগে যুবরাজ উদয়াদিত্যের হাতে যশোরের ভার দিলেন। আর আমাকে তাঁর একটা গুপ্ত ঘরে নিয়ে গিয়ে এই সিন্দুকটা দেখিয়ে বললেন, ‘আপনি শুধু আমার বিশ্বস্ত কর্মচারীই নন, আপনি আমার আবাল্য বন্ধু—নিকট-আত্মীয়ের মত। এই সিন্দুকটি আপনার কাছে গচ্ছিত রেখে যাচ্ছি। এর মধ্যে কি আছে, তা এখন আপনাকে বলবো না। মা যশোরেশ্বরীর কৃপায় যদি কোনদিন আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়, তখন আপনার কাছ থেকে এ সিন্দুক ফিরিয়ে নেব। এর মধ্যে সব কথাই লেখা রইল। সিন্দুকের চাবি ও আমার আদেশ পত্র একসঙ্গে রইল, বিশেষ প্রয়োজন না হলে খুলবেন না। সিন্দুকটি নিরাপদে রাখা ও যথাস্থানে ফেরত দেবার জন্যে যদি রাজধানী থেকে অন্যত্র যাওয়া দরকার মনে করেন, তাহলে উপযুক্ত ব্যক্তির উপর আপনাব কাজের ভার দিয়ে যেতে পারবেন। আপনি এখন ধূমঘাটার দুর্গ ও রাজপ্রাসাদ-রক্ষকেরও কাজ করবেন।”

    বলতে বলতে অশ্রুতে মধুসূদন রায়ের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো। একটু থেমে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে তিনি আবার শুরু করলেন, “মহারাজা মোগল সেনাপতি গিয়াস খাঁর সঙ্গে ঢাকায় চলে যাবার পর মোগল সৈন্যদের সেনাপতি হলেন সোহন মীর্জা। লোকটি অতি বদ স্বভাবের। বিনা কারণেই সে যশোরের লোকদের উপর নানারকম অত্যাচার শুরু করলে। এই সময় যশোবে খবর রটলো, ঢাকায় প্রতাপাদিত্য গেলেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। সন্ধি হয় নি। মোগল সেনাপতি সোহনের বিক্রম বেড়ে গেল। উদয়াদিত্য তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ না করে পারলেন না। কিন্তু যুদ্ধ বন্ধ থাকবে ভেবে যশোরের বহু সৈন্য এ সময় রাজধানীতে ছিল না। যুদ্ধে উদয়াদিত্যের পরাজয় ও মৃত্যু ঘটলো। মোগল সৈন্যরা রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করলে। তখন রাজ-প্রাসাদের রক্ষী-সৈন্যও সংখ্যায় কম ছিল। তারা মোগলদের সঙ্গে পেরে উঠলো না। শেষ পর্যন্ত আমি আর মহারাজার কিশোরবয়স্ক পুত্র রামভদ্র মোগল সৈন্যদের রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে যাবার পথে প্রাণপণে বাধা দেবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু ব্যর্থ হলাম।”

    মধুসূদন রায়ের দু চোখ বেয়ে তখন অশ্রুধারা নেমেছে। নতনেত্রে নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি বলতে লাগলেন যেন আপন মনেই, “যশোররাজ্যের গৌরব-সূর্য যখন মধ্যাহ্ন-গগনে, তখনি অমাবস্যার অন্ধকার সব গ্রাস করবে, এ যে স্বপ্নেরও অতীত ছিল। … মহারানী এবং রাজপরিবারের অন্যান্য মহিলা ও শিশুরা কেমন ভাবে নদীতে আত্মবিসর্জন করেছিলেন, তা আগেই বলেছি। মোগল সৈন্যরা যখন রাজপ্রাসাদ লুঠ করে চলে গেল, তখন আমি অচৈতন্য আর রামভদ্র মৃত।—উঃ! আমি কেন রইলাম! …

    “বোধহয় একদিন পরে জ্ঞান ফিরে পেয়ে প্রথম ছুটলাম সেই গুপ্ত কক্ষে যেখানে এই সিন্দুকটা ছিল। দেখলাম, এটা ঠিকই আছে, মোগল সৈন্যরা দেখতে পায় নি। চরম শোকের মধ্যেও মনে একটু শান্তি পেলাম, মহারাজার শেষ আদেশটা পালন করতে পারবো মনে করে।

    “এখন এই সিন্দুকটা মহারাজাব দ্বিতীয় রাজধানী সাগরদ্বীপে নিয়ে নিরাপদে রাখতে পারলে, বোধহয় তাঁর আদেশ পুরোপুরি পালন করতে পারবো। আমার মনে হয়, সাগরদ্বীপ এখনও মোগলদের হাতে যায় নি। আমরা এখন সেখানে গিয়ে উঠবো, পরে পরিবারের সবাইকে সেখানে নিয়ে যাবো। তারপর মা যশোরেশ্বরী যদি কৃপা করেন তো, আবার সেই যশোরে সেই ধুমঘাটায় মহারাজার রাজ্যে সকলে ফিরে যাবো।”

    মধুসূদন রায় থামলেন।

    … … …

    বেলা প্রায় দ্বিপ্রহর। নদীতে জোয়ার এসে গেল। নদীর জল ফুলে ফুলে উথলে উথলে উঠছে। মাঝিরা মৃদঙ্গভাঙা নদীর পুব তীরে একটা বেশ ফাঁকা জায়গায় নৌকো নোঙ্গর করলে।

    জায়গাটা বেশ উঁচু। বনজঙ্গল এমন কি ঝোপঝাড়ও নেই। কাছাকাছি লোকালয় আছে বোঝা যায়।

    নদীটা এখানে বাঁক নিয়েছে। নদীর তীরে উঁচু বাঁধ। তারপর বিরাট ফাঁকা মাঠ। মাঠের প্রথমেই একটা একতলা বাড়ি ও একটা ভাঙা মন্দির। খুব দূরে দূরে দু-একটা গ্রাম ও গভীর বনের রেখা পাড়ের উপর থেকে অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

    মাঝি ও নৌসেনারা স্নান, রান্না-খাওয়। আরম্ভ করলে। একজন মাঝি মধুসূদন রায়কে বললে, “হুজুব, আমরা প্রায় সাগরদ্বীপের কাছাকাছি এসে গেছি। পশ্চিমে কাকদ্বীপ, সামনে দক্ষিণে হার্মাদখালি। এ জায়গাটা আমি চিনি—এদিকটায় হার্মাদ বা বোম্বেটে জলদস্যুদের উৎপাত খুব বেশী। এখন আর আমরা নৌকো চালাবো না। রাতের আধারে নৌকো ছাড়বো। আর দুটো ভাটা পেলেই সাগবদ্বীপে পৌঁছে যাবো।”

    মধুসূদন রায় ও দুর্লভ নদীর তীরে উঠে এলাকাটা ভালো করে দেখতে লাগলেন। চারিদিক নির্জন—জনশূন্য। হঠাৎ তাঁরা চমকে উঠলেন, দেখলেন—বিস্তৃত মাঠের ভিতর দিয়ে একজন লোক তাঁদের দিকে ছুটে আসছে।

    মধুসূদন রায় একটু চিন্তিতভাবে দুর্লভকে বললেন, “লোকটা কি উদ্দেশ্যে এদিকে আসছে বুঝতে পারছি নে। আমার বন্দুকটা নিয়ে এসো। নিজের জন্যেও একটা কিছু হাতিয়ার এনো।”

    দুর্লভ ছুটে গিয়ে নৌকো থেকে বন্দুকটা ও একটা তলোয়ার নিয়ে এলো।

    লোকটা এগিয়ে আসছে ঊর্ধ্ব শ্বাসে। সে আরও কিছুদূর এগিয়ে এলে, মধুসূদন রায় বন্দুকটা হাতে নিয়ে তাকে উদ্দেশ করে বললেন, “ঐখানে থামো, আর এগিও না। ঐখান থেকে বল, কি উদ্দেশ্যে এদিকে আসছ?”

    লোকটি বৃদ্ধ। হাঁফাতে হাঁফাতে কাতর কণ্ঠে বললে, “আমি আপনাদের সাহায্যপ্রার্থী 1 আমাদের সর্বনাশ হতে চলেছে,—হার্মাদ জলদস্যুরা আমাদের গ্রামে ঢুকে যত ছেলেমেয়ে পারছে, ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আমার একটা নাতনীকেও ওরা বেঁধেছে। এখন আপনারা হয়তো রক্ষা করতে পারেন, তাই দূর থেকে আপনাদের নৌকোর পাল দেখে ছুটে আসছি।”

    মধুসূদন রায় বৃদ্ধটিকে কাছে আসতে বলতেই, সে এসে তাঁর পায়ের কাছে ধপ্‌ করে বসে পড়লো। সে হাঁফাচ্ছে ভীষণভাবে। দুর্লভ বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করলে, “হার্মাদরা কজন? কতদূর আপনাদের গ্রাম?”

    বৃদ্ধটি উত্তর দিলে, “জলদস্যুরা সংখ্যায় তিনজন। আমাদের গ্রাম বেশী দূরে নয়—ঐ যে হেঁতাল জঙ্গল দেখছেন, ওর রশিখানেক পর খাঁড়ির ধারেই আমাদের বাড়ি। যদি দয়া করেন তো আপনারা আর বিলম্ব করবেন না—হার্মাদরা এক্ষনি ছেলেমেয়েদের নিয়ে ওদের বজরায় তুলবে, বড় নদীতে তাদের বজরা দেখে এসেছি। দেশে একটাও শক্তসমর্থ লোক নেই, সবাই মহাবাজ প্রতাপাদিত্যের ডাকে মোগলদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে রাজধানীতে গেছে। এখন ভগবান বোধহয় আপনাদের পাঠিয়েছেন গাঁয়ের গাঁয়ের ছেলেমেয়েদের রক্ষা করতে।”

    বৃদ্ধের দু চোখ বেয়ে জলের ধারা নামলে।।

    মধুসূদন রায় দুর্লভকে বললেন, “একথা শুনে আর চুপ করে থাকা যায় না। এসো, আমরা বেরিয়ে পড়ি। নৌসেনাদের যারা ভালো সড়কি চালাতে পারে, এমন ঢালী জন দুই আমাদের সঙ্গে থাক। আমার মনে হয়, তাতেই হবে।”

    দুর্লভ বললে, “আমার মনে হয়, হার্মাদরা তাদের বজরা যেখানে রেখেছে, সেই ঘাটে আমাদের যাওয়া উচিত। ওরা ছেলেমেয়েদের নিয়ে তীরের কাছে গেলেই, আমরা বাঁধের পিছন থেকে হঠাৎ ওদের আক্রমণ করবো।”

    মধুসূদন রায় বললেন, “ঠিকই বলেছ। আমরা সবাই আত্মগোপন করে ঐ দিকে যাবো, ওদের কাছে সব সময় বন্দুক থাকে।”

    হরিণখালি গ্রাম যশোররাজ্যের অধীনে। লোকের বাস নেহাত মন্দ নয়। কিন্তু গ্রামে যুবক কেউ নেই—সবাই গেছে মহারাজ প্রতাপাদিত্যের হয়ে মোগলদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে। সেই সুযোগে হার্মাদ বা পর্তুগীজ জলদস্যুদের তিনজন গ্রামে ঢুকেছে; এবং দশ-বারোটি ছেলেমেয়ে ধরে তাদের প্রত্যেকের হাতের চেটো পেরেক দিয়ে ফুটো করে তার মাঝ দিয়ে একটা দড়ি ঢুকিয়ে শক্ত করে বেঁধে দড়িটা মহাস্ফুর্তিতে টানতে টানতে নিয়ে চলেছে। ছেলেমেয়েদের হাত থেকে অঝোরে রক্ত ঝরছে, তারা যন্ত্রণায় আর প্রাণভয়ে চিৎকার করে কাঁদছে। তাদের মা-বোনেরাও বুক চাপড়ে কাঁদছে। কেউ কেউ প্রাণের মায়া ত্যাগ করে এগিয়ে যাচ্ছে। আর হার্মাদদের যার যার হাতে বন্ধুক, তারা ওদের গুলি করবার ভয় দেখাচ্ছে। তবুও তারা হটছে না।

    .

    দুম্!—হঠাৎ বন্দুকের আওয়াজ হলো

    বন্দুকধারী হার্মাদটি মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। তার বন্দুকটা অপর একজন দস্যু কুড়িয়ে নিতে যেতেই, ‘ঔফ!” বলে সে-ও শুয়ে পড়লো—তার পিঠে সড়কি ঢুকেছে। অবশিষ্ট হার্মাদটি এই রকম আকস্মিক বিপর্যয়ে বেসামাল হয়ে বন্দী ছেলেমেয়েদের এমন কি বন্দুকটা ফেলে ঊর্ধ্ব শ্বাসে ছুটলো ওদের বজরা যে ঘাটে আছে সেই দিকে। এসে দেখলে, ঘাট ফাঁকা—বজরা মাঝ নদীতে ভাসছে! নিরুপায় হার্মাদ নদীতে ঝাঁপ দিলে।

    দুর্লভ আগেই বোম্বেটে বজরার নোঙরের দড়ি কেটে দিয়েছিল।

    বোম্বেটেদের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে ছেলেমেয়েরা মহা আনন্দে বাড়ি ফিরে গেল। তাদের মা-বোনেরা আর সেই বৃদ্ধ এলো মধুসূদন রায় ও দুর্লভকে অন্তরের কৃতজ্ঞতা জানাতে। বৃদ্ধটি আনন্দে আত্মহারা হয়ে মধুসূদন রায়ের পা জড়িয়ে ধরতে যেতেই, বাধা দিয়ে মধুসূদন রায় তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “মানুষের কর্তব্য যা তাই করেছি ভাই, তার বেশী কিছু করি নি। সবই ভগবানের ইচ্ছা। আমিও আজ তোমাদের মতো অসহায়—আমাকে মস্ত বড় কিছু বলে মনে করো না।”

    মধুসূদন রায় ও দুর্লভদের সকলকে বৃদ্ধ বাড়ি নিয়ে গেল।

    বৃদ্ধটি পরিচয় দিলে, সে ও তার ভাই দুজনে মহারাজ প্রতাপাদিত্যের অধীনে কাজ করে। সে নিজে এই অঞ্চলের একজন ঘাঁটিদার বা দারোগা নাম গয়ারাম হাতী। আর তার ভাই জয়রাম হাতী মহারাজার মনিরতট দুর্গের রক্ষক।

    মধুসূদন রায় বৃদ্ধের হাত দুটো চেপে ধরে বললেন, “তাহলে আপনাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে বলতে হবে। আমিও মহারাজার একজন কর্মচারী।”

    গয়ারাম হাতী জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার নাম?”

    “মধুসূদন রায়।”

    গয়ারাম হাতী উৎফুল্ল ও বিস্মিত হয়ে বললেন, “মীরবহর মধুসূদন রায়! আপনাকে দেখে প্রথমে তাই মনে হয়েছিল। পরক্ষণে মনে হলো, এসময় আপনি ধূমঘাট! রাজধানী ছেড়ে আসবেন কি করে?”

    “আর ধূমঘাটা—রাজধানী!”

    মধুসূদন রায় দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে নীরব হয়ে গেলেন। রক্তঝরা স্মৃতির বেদনায় তিনি বিচলিত। দুর্লভের কাছে গয়ারাম হাতী স্তব্ধ হয়ে সব কথা শুনলেন। অন্যেরাও শুনলো। গয়ারামের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। শেষে আত্মসংবরণ করে ধীরে ধীরে তিনি বললেন, “সবই তো শুনলুম! ধূমঘাটার যা অবস্থা, সাগরদ্বীপেরও তাই। সাগরদ্বীপও মোগল সেনারা অধিকার করেছে, আজ খবর পেয়েছি।”

    “তাহলে উপায়?” আত্মগতভাবে মধুসূদন রায় বললেন।

    গয়ারাম বললেন, “একটা উপায় আছে,—আপনারা এই গ্রামেই থেকে যান। নদীর তীরে যে বাড়িটা আপনারা দেখেছেন, ওটা হলো মহারাজার ফিরিঙ্গিখানা। আর যে বড় মাঠটা পার হয়ে এলেন, সেটা হলো মহারাজারই ঘোড়াছুটের মাঠ। এ সবই মহারাজার খাস সম্পত্তি। আপনি এগুলি এখন দখল করুন। তারপর যশোরে ফিরে যেতে চান যাবেন; আর যদি থাকতে চান তো যশোর রাজসরকার থেকে ব্যবস্থা করে নেবেন।”

    গয়ারাম হাতীর কথাটা মধুসূদন রায় ও দুর্লভের মনঃপুত হলো। এছাড়া আর উপায়ই বা কি আছে? একটা বাসস্থান চাই এবং সিন্দুকটাকেও নিরাপদে রাখতে হবে।

    মধুসূদন রায় নদীর তীরে এসে সেই বাড়িতে স্থায়ীভাবে উঠলেন। নৌসেনার। অনেকে তাঁর সঙ্গে থেকে গেল।

    কিছুদিন পরে মধুসূদন রায়ের পরিবারবর্গও সেখানে এসে গেল। তাঁর সব কাজেই প্রধান সহায় হলেন গয়ারাম হাতী। তিনখানা গ্রামের মোড়ল বা কর্তা তিনি। লোকটা সত্যই খুব ভালো ও প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী। তাছাড়া, মধুসূদন রায়ের কাছে গয়ারাম কৃতজ্ঞ ও একান্ত অনুগত।

    স্থায়ী বাসিন্দা হয়েই মধুসূদন রায় প্রতাপাদিত্য বা তাঁর পুত্র-পৌত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করবার বহু চেষ্টা কবে ব্যর্থ হলেন—কেউই মহারাজা বা তাঁর বংশধরদের কোন সঠিক সন্ধান দিতে পারলে না।

    নানা রকম জনরব রটছিল লোকের মুখে মুখে। কেউ বলে, মহারাজ প্রতাপাদিত্য সন্ধির জন্যে ঢাকায় যাওয়ামাত্র মোগল সুবাদার ইসলাম খাঁ তাঁকে হত্যা করে তাঁর দেহ তেলে ভেজে আগ্রায় বাদশা জাহাঙ্গীরের কাছে পাঠিয়েছে। কেউ বলে, তা নয়, ইসলাম খাঁ প্রতাপাদিত্যকে বন্দী করে লোহার খাঁচায় পুরে গরুর গাড়ি করে আগ্রায় পাঠায়; আগ্রার পথে কাশীতে মহারাজার মৃত্যু হয়। কোন খবর যে ঠিক, তা কেউ জোর করে বলতে পারে না।। মহারাজার ছেলেদের সম্পর্কেও নানা রকম গুজব চলেছে। কেউ বলে, মহারাজার বংশের কেউ জীবিত নেই। আবার কেউ কেউ বলে, তাঁর একটি ছেলে এখনও জীবিত আছে, মোগল সৈন্যরা তাকে ধরে পাটনায় নিয়ে গিয়ে মুসলমান করেছে। এই সব গুজবের মধ্যে একটা কথা কিন্তু সবাই জানলো এবং তা সত্য। সেটা হলো, মহারাজা প্রতাপাদিত্য ঢাকা থেকে আর যশোরে ফেরেন নি, আর যশোররাজ্য এখন বসন্ত রায়ের ছেলে কচু রায়ের অধীনে। দুর্লভ রায় ছদ্মবেশে নিজে যশোরে গিয়ে দেখে এসেছেন।

    মধুসূদন রায় উদ্যোগী ও কর্মী পুরুষ। তাঁর হাতে কিছু অর্থও ছিল আর ছিল গয়ারাম হাতীর মতো লোক প্রধান সহায়। এই সব মিলে তখনকার অরাজক সময়ে দূর পল্লীঅঞ্চলে সেই ঘোড়াছুটের মাঠকে কেন্দ্র করে বহু জমি ও কয়েকখানা গ্রামের মালিক হতে মধুসূদন রায়ের বেশী সময় লাগলো না। কিছু দিনের মধ্যে এই অঞ্চলে তিনি একজন বড় জমিদার হয়ে উঠলেন। তাঁর নিজের বসত গ্রামের নাম দিলেন ‘মীরবহরপুর’।

    দেখতে দেখতে বৃদ্ধ মধুসূদন রায়ের তিনমহল বাড়ি হাতী ঘোড়া লোকজন খ্যাতিপ্রতিপত্তি, সবই হলো। কিন্তু মহারাজ প্রতাপাদিত্যের সেই সিন্দুক তাঁকে বা তাঁর কোন বংশধরকে ফিরিয়ে দেওয়া তাঁর জীবনে ঘটলো না, দুর্লভ রায়েরও না।

    দুর্ল ভ রায় শেষ জীবনে নদীর তীরে একটা বিরাট শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই মন্দিরের একটা গোপন স্থানে মহারাজ প্রতাপাদিত্যের সেই সিন্দুকটি তিনি পুঁতে রাখলেন, আর মহারাজার আদেশ-পত্রটি তাঁর জমিদারীর কাগজপত্রের সঙ্গে যত্ন করে রেখে দিলেন।

    .

    তারপর—

    তারপর প্রায় আড়াইশো বছর কেটে গেছে। এই সময়ের মধ্যে সারা ভারতের উপর দিয়ে কল্পনাতীত দুর্বিপাক বয়ে গেছে। ভয়ঙ্কর ও শোচনীয় বিদ্রোহ, বিপ্লব ও যুদ্ধের আগুনে বারবার দেশ ছারখার হয়েছে, রক্তের বন্যা বয়েছে। মহামারী-মন্বন্তরে অঞ্চলকে অঞ্চল জনশূন্য গভীর জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। আর এই সময়ের মধ্যেই ভারতে বহু রাজ-শক্তির উত্থান, পতন ও পরিবর্তনও ঘটেছে।

    বাংলার বীর সন্তান প্রতাপাদিত্য ও বিদ্রোহী ভূঁইয়াদের নাম আজ দেশের লোকের কাছে বিস্মৃতপ্রায়। ভূঁইয়াদের মধ্যে যাঁরা মোগল-শক্তির বিরুদ্ধে প্রচণ্ড বিক্রমে অস্ত্র ধরেছিলেন, তাদের বংশধরেরা আজ শক্তিহীন খ্যাতিহীন নির্জীব। কেউ কেউ সামান্য জমিদারীর মালিক। আর সেই দুর্ধর্য মোগল বাদশাবা—যারা দোর্দণ্ড প্রতাপের সঙ্গে প্রায় সারা ভারতের উপর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রাজত্ব করেছিলেন, তাঁদেবও শক্তি ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়েছে। আর সেই অরাজকতার সুযে,গে পূর্ব-দমিত বিদ্রোহীরা বার বার মাথা তুলেছে। বাদশাদের নিযুক্ত প্রাদেশিক শাসনকর্তা বা নবাবেরা নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। বিদেশী ইংরেজ বণিকেরাও এ সুবর্ণ সুযোগ হেলায় নষ্ট করে নি। ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করে দেশের বুকে তারা ঘাঁটি গেড়েছে—বহু স্থানে নিজেদের অধিকার কায়েম করেছে। শেষ পর্যন্ত তাদের হাতেই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব পলাশীর মাঠে পরাজিত হলেন। দিল্লীর বাদশা ইংরেজশক্তিকে দমন করতে পারলেন না—সে ক্ষমতা তখন আর তাঁর নেই। ভারতের শেষ স্বাধীন বাদশা ইংরেজ বণিকদের দ্বারা সিংহাসনচ্যুত ও সুদূর বর্মায় নির্বাসিত হয়ে ইংরেজদেরই দয়ার অন্ন ভোগ করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। মোগলশক্তির পতনের সঙ্গে সঙ্গে ধূর্ত ইংরেজ বণিকের দল ছলে বলে কৌশলে অল্প অল্প করে প্রায় সারা ভারতবর্ষ গ্রাস করলো। তারপর এরা অর্থাৎ ঈস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী প্রায় এক শতাব্দী ধরে শাসনের নামে ভারতবর্ষের বুকে চরম শোষণ ও বীভৎস অত্যাচার-অবিচার চালালো, যার ফলে দেশের সর্বত্র দেখা দিল অশান্তি, দুর্ভিক্ষ ও মহামারী। আত্মকলহে ছিন্নভিন্ন শক্তিহীন ভারত নির্জীবের মতো সেসব সহ্য করে গেল, বিদ্রোহ করবার মতো একতা বা শক্তি তার ছিল না।

    তবুও শেষ পর্যন্ত একদিন দেখা দিল প্রচণ্ড বিদ্রোহ। এবং তা এলো সিপাহীদের মধ্যে। সে আগুনে ভারতপ্রবাসী ইংরেজদের অনেকে প্রাণ হারানোর ফলে ইংরেজের টনক নড়লো,—তার স্বার্থে ঘা পড়লো, জঘন্য কলঙ্ক রটলে। ইংরেজ জাতির বিরুদ্ধে, যার খবর বিলাতেও পৌঁছলো। ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট স্বহস্তে ভারত-শাসনের ভার নিলেন। বুদ্ধিমান চতুর ইংরেজ ভারতকে বংশ-পরম্পরায় ভোগদখল করতে চায়। নিজেদের স্বার্থেই তারা বুঝলে, ভারতবাসীকে কোনমতে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তার জন্যে দেশে কিছু আইনকানুন, আপাত সুশাসন ও শৃঙ্খলা দরকার। নতুন শাসকেরা এটা বুঝেছিলেন বলেই দেশ শাসনের অন্যরকম ব্যবস্থা করলেন। দেশে কতকট। শান্তি ফিরে এলো।

    এই আড়াই শো বছর ধরে বাংলাদেশের উপর দিয়েও অতি শোচনীয় সর্বনাশ ও বিপর্যয় গিয়েছে—মধুসূদন রায়েব প্রতিষ্ঠিত মীরবহরপুরও তা থেকে বাদ যায় নি।

    মীর বহরপুরের জমিদ।ব রায়দের পূর্বের সে প্রতাপ নেই। প্রচণ্ড ভূমিকম্পে ও জলপ্লাবনে তাঁদের জমিদারীর বহু অংশ লোপ পেয়েছে। বড় বড় নদীর ধাবের গ্রামগুলির প্রজারা মগ-ফিরিঙ্গি জলদস্যুদের অত্যাচারে বাস ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। সে সব গ্রাম বহুদিন জন-মানবশূন্য অবস্থায় থেকে গভীর জঙ্গলে ভরে গেছে। সেখানে দিনের বেলায়ও বাঘ চরে বেড়ায়। ভূমিকম্পে মীরবহরপুরের রায়দের শুধু জমিদারীর ক্ষতিই হয় নি, তাঁদের তিনমহল বাড়ির অনেকটা হঠাৎ ভেঙে পড়ায় জমিদার বংশের প্রায় সকলের জীবন্ত সমাধি ঘটেছে।

    এই মহা দুর্যোগের হাত থেকে শুধু রক্ষা পেয়েছেন রাঘবনারায়ণ রায় ও তাঁর নিজের পরিবারবর্গ আর জমিদার বাড়ির একটা মহল। দুর্লভ রায়ের প্রতিষ্ঠিত শিবমন্দির ও বিগ্রহ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

    জমিদার রাঘব রায়ের দাপটে বাঘে হরিণে এক ঘাটে জল খায় কি না, জানা নেই, তবে তাঁকে ‘যে এই অঞ্চলের লোকেরা ভয় ও ভক্তি করে আর তাঁর প্রজারা যে তাকে রাজা রাঘব রায় বলে সম্মান দেখায়, তাতে কোন সন্দেহ নেই। রাঘব রায় জমিদার হিসেবে দুর্দান্ত। কিন্তু প্রজাবৎসল বলে তাঁর সুখ্যাতিও যথেষ্ট।

    বাংলাদেশে এখন কোন রাজনৈতিক গোলযোগ নেই। কারণ দেশবাসী শক্তিহারা। বাংলার দক্ষিণ অঞ্চলে জলদস্যুদের উৎপাতও আর নেই। আওরঙ্গজেবের সময় বাংলার শাসনকর্তা শায়েস্তা খাঁ তাদের দমন করে গেছেন।

    কিন্তু কিছুদিন থেকে অন্য এক উৎপাত সারা বাংলাদেশে শুরু হয়েছে, যার ফলে দেশেব লোকের, বিশেষত চাষীদের অবস্থা হয়েছে অতি ভয়াবহ শোচনীয়।

    নীলকুঠির সাহেবদের অত্যাচারে বাংলার লোকদের জীবনযাত্রা অচল হবার উপক্রম হয়েছে। তারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। নীলকুঠির সাহেবরা চায়, সারা বাংলাদেশের সব ভালো ভালো জমিতে তারা নীল চাষ করবে। টাকার জোরে বা অস্ত্রবলে, যে কোন উপায়ে হোক ভাবা তা করবেই। কুঠির সাহেবরা রাজার জাত—দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। তাদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র, আইন-আদালত। দেশবাসীও অশক্ত বীর্যহীন। তার উপর এদেশের লোকদের উপর অত্যাচার করলে সাহেবরা আইনে দণ্ডনীয় হয় না। ফলে, নীলকুঠির সাহেবদের অত্যাচারের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলছিল।

    বাংলার দক্ষিণ অঞ্চলেও বহু নীলকুঠি গড়ে উঠেছে। জনকয়েক কুঠিয়াল এ অঞ্চলে আরও জমি চায়। তাদের দৃষ্টি পড়লো মীরবহর-পুরের রায়দের ভালো ভালো জমিগুলোর উপর। জমিগুলো বেশ উঁচু বাঁধ দিয়ে ঘেরা—নদীর নোনা জল ঢুকতে পারে না। লোকের ও বসবাস আছে, কুলী-মজুরের অভাব হবে না। তিন দিকে নদীপথ আছে, ফলে শহরে আসা-যাওয়া, মাল আনা-নেওয়ার সুবিধাও প্রচুর।

    বেলা সেদিন প্রায় দ্বিপ্রহর। জমিদার রাঘব রায় তাঁর কাছারি ঘরের গদীর উপর বসে প্রজাদের মকদ্দমার বিচার করছেন। বাদী-বিবাদী দু পক্ষের প্রজাব দল তাঁর সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে যে যার বক্তব্য বলছে। রাঘব রায় গম্ভীরভাবে সব শুনছেন আর মাঝে মাঝে পালকের কলম দিয়ে তুলট কাগজে কি সব টুকে নিচ্ছেন।

    হঠাৎ কাছারি মহলের দরোয়ান -পাইকদের মধ্যে একটা চাপা সোরগোল উঠলো। প্রজারা এদিক ওদিক চাইতে লাগলো।

    একটু পরেই সাতগাঁর নীলকুঠির মালিক ডিমোলো সাহেব আব তার দেওয়ান ফকরে মার্টিন কাছারি ঘরে ঢুকে সোজা রাঘব রায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

    কাছারির নায়েব-গোমস্তার। এমন কি দেওয়ান পর্যন্ত একটু ত্রস্ত হয়ে উঠলেন।

    রাশভারী রাঘব রায় সাহেবকে একবার আড়চোখে দেখলেন, কোন প্রকার অভিবাদন করলেন না। সাহেব করমর্দন করবার জন্যে হাত বাড়ালেও রাঘব রায় নিজের হাত না বাড়িয়ে তাকে ফরাশের ওপর গোমস্তাদের সঙ্গে বসবার ইঙ্গিত করে আবার বিচার করতে লাগলেন।

    ডিমোলো অধীর প্রকৃতির লোক, তায় আবার সাহেব। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই ফরাশের উপর সে বসে নি। কিছুক্ষণ অস্থির ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে রাঘব রায়কে বললে, “রয়, হামার ওটিক সময় নাই, এখনি টুমার সাটে একটা কটা শেষ কড়িতে চাই।”

    বিরক্ত হয়ে রাঘব রায় জিজ্ঞাসা করলেন, “কি কথা?”

    ডিমোলো উত্তর দিলে, “হামি টুমার কিছু জমিটে নীল চাষ কড়িতে চায়। হামি বহুত রূপিয়া দিয়ে জমি পট্টন নিবে।”

    কৃষকদের উপর নীলকুঠির সাহেবদের বহু অত্যাচারের কাহিনী রাঘব রায় শুনেছেন, নিজেও কিছু কিছু দেখেছেন। তিনি মাথা নেড়ে উত্তর দিলেন, “নাঃ, নীল চাষের জন্যে আমি এক ছটাক জমিও তোমাকে দেব না, তুমি যেতে পার।

    ডিমোলো সাহেব খুব উদ্ধৃত প্রকৃতির লোক, কিন্তু রাঘব রায়ের বলবিক্রমের কথা সে জানে, তাই নরম ভাবেই তাকে বোঝাতে লাগল—জমি পত্তন দিলে বহু টাকা সেলামী হিসাবে জমিদাররা পায়। জমিদারীর মধ্যে নীল চাষ হলে প্রজাদের আর্থিক উন্নতি হবে। যারা কুলীর কাজ করবে তারা মাসে চার-পাঁচ টাকা মাহিনা পাবে, দেওয়ানরা পাবে মাসে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ টাকা। তাছাড়া আমিন, মুৎসদ্দী, পাইক-পেয়াদা—বহু লোক এই জমিদারী থেকে নেওয়া হবে, দেশে বেকার লোক আর থাকবে না, চুরী-ডাকাতি হবে না, প্রজারা খুব সুখে থাকবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

    রাঘব রায় গম্ভীরভাবে উত্তর দিলেন, “আমার প্রজাদের আমি সুখেই রেখেছি, তোমাকে তাদের কথা ভাবতে হবে না; আর আমার টাকারও খুব দরকার নেই। নীল চাষের জন্যে আমি জমি পত্তন দেব না।”

    রাঘব রায়ের সাফ জবাবে ডিমোলো সাহেব আর ধৈর্য রাখতে পারলে না, উদ্ধত ভাবে বললে, “জানো, হামি ড়াজার জাট, হামি খুশী মট টুমার সব জমি ডখল কড়িতে পারি জোর জলুমসে

    রাঘব রায়ও উত্তপ্ত কণ্ঠে বললেন, “তা পার না। এখনকার লাট সাহেব নীল কুঠিয়ালদের অত্যাচার জবরদখল আদৌ পছন্দ করেন না। তিনি এসব দমন করবেন, ঠিক করেছেন।”

    ডিমোলো সাহেব তাচ্ছিল্যের স্বরে বললে, “টুমি একটা বিয়াকুব, টাই ইহা বলিটেছ। লাট সাহেব ক্যানিং হামার জানা লোক–ডোস্ট, বলিলেই হয়। সে কুঠিয়াল সাহেবডের ডমন আডৌ কড়িতে চাহে না। আড়ও, সে টুমার মত বড়, লোকডের জন্য ‘মুগুড় আইন’ কড়িয়াছে। জমি না ডিলে টুমাকে কয়েদ কড়িতে বা চাবুক পিটিতে পাড়ি।”

    রাঘব রায় উত্তেজিতভাবে বললেন, “সাহেব, তুমি এক্ষনি কাছারি থেকে বেরিয়ে যাবে, না আমার পেয়াদা তোমাকে কান ধরে বের করে দেবে?”

    কি এতদূর স্পর্ধা একট! নেটিভের!

    ডিমোলো সাহেব রাগে জ্বলে উঠে তার দেওয়ানকে আদেশ করলে, “ফক্‌রে, জলদি হামার শ্যামচাঁদ চাবুকটা লে আও! হামি এই রয় কুত্তাটাকে—”

    ঠাশ!

    সাহেবের কথা শেষ না হতেই তাকে মেঝের উপর শুয়ে পড়তে হলো। রাঘব রায়ের এক চড়ে তার লাল মুখের উপর তিন-চারটে নীল নীল দাগ পড়েছে রাঘব রায়ের বলিষ্ঠ আঙ্গুলের! কাছারির সর্দার পাইক সময় বুঝে গুলবাধা খেঁটে লাঠি নিয়ে এসে সাহেবের ঠিক সামনে দাঁড়িয়েছে—সাহেব যদি কিছু করতে চেষ্টা করে, তাহলে লাঠির

    এক ঘায়ে তার মাথা ভেঙে দেবে।

    ফক্‌রে মার্টিন চাবুক নিয়ে ঘরে ঢুকতেই রাঘব রায় পাইককে হুকুম দিলেন, “এই তেয়রটাকে কান ধরে সারা গ্রাম ঘোড়ছুট করিয়ে এনে তিন দিন ঠাণ্ডা গারদে আটক রাখবি। যা, নিয়ে যা।

    পাইকরা ফক্‌রে মার্টিনকে কান ধরে টানতে টানতে কাছারি মহলের বাইবে নিয়ে গেল।

    একটু পরে ডিমোলো সাহেব গালে হাত বুলুতে বুলুতে গম্ভীরভাবে কাছারি ত্যাগ করলে।

    রাঘব রায় আবার প্রজাদের মকদ্দমার বিচার করতে লাগলেন স্থির ভাবেই।

    কিন্তু এর পর থেকে লাগলো রাঘব রায়ের সঙ্গে কুঠিয়াল সাহেবদের বিবাদের পর বিবাদ।

    রাঘব রায়ের প্রচণ্ড চড় খেয়ে যে কুঠিয়াল ডিমোলে। সাহেব কাছারির মেঝেয় গড়াগড়ি খেয়েছিল, সে ছিল অতি দুর্দান্ত ও শয়তান প্রকৃতির লোক, পর্তুগীজ জলদস্যুদের বংশধর। তার দেওয়ান ফকুরে মার্টিন লোকটি যেমন চতুর তেমনি হিংস্র। জাতিতে সে তিয়র। নেটিভ খ্রীশ্চান। একটা হাইসের দেওয়ান। মাসিক মাইনে চল্লিশ টাকা পায়। এজন্যে সে শুধু নিজেকে মস্ত লোক ভাবে তাই নয়, রাজার জাত বলেও মনে করে নিজেকে

    রাঘব রায়ের হাতে যে চূড়ান্ত অপমান তাদের হয়েছিল, তার প্রতিশোধ নেবার জন্যে ডিমোলো ও ফকরে মার্টিন কাছাকাছি অন্যসব কুঠিয়াল সাহেবদের কাছে যাতায়াত আরম্ভ করলে। যথেষ্ট শক্তিশালী না হতে পারলে দুর্দান্ত রাঘব রায়ের সঙ্গে পেরে ওঠা অসম্ভব—এটা বুঝে তারা দল পাকাতে শুরু করলে।

    মীরবহরপুরের কিছু দূরে অন্য এক জমিদারের এলাকায় দু বছর হলো একটা নীলকুঠি হয়েছে। সে কুঠির মালিক সি. প্যারেরা। সে-ও জাতে পর্তুগীজ। স্বভাব-চরিত্র যথারীতি যেমন হয়ে থাকে। রাঘব রায়ের উপর তারও দারুণ আক্রোশ।

    প্যারেরা মীরবহরপুরের একটি মেয়েকে অপমান করেছিল। সেই অপরাধে রাঘব রায় তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে কাছারি বাড়ির ‘থামে বেঁধে চাবুক পেটা করেছিলেন। এত দিন সে অপমানের প্রতিশোধ প্যারেরা নেবার চেষ্টা করে নি। কারণ রাঘব রায়ের বলবিক্রমের কথা তার অজানা ছিল না। সুতরাং ডিমোলোর প্রস্তাবে সে সহজেই রাজী হয়ে গেল।

    সিংহেশ্বরের নীলকুঠির সাহেব হাণ্ট জাতিতে ইংরেজ। জাত বেনে। ডিমোলোর সে অনেক দিনের বন্ধু। মীরবহরপুরে সে-ও কিছু জমির চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল। ঐ অঞ্চলের কিছু জমি, দরকার হলে জোর করে, দখল করার ইচ্ছা তার অনেক দিনের। কিন্তু একলা রাঘব রায়ের সঙ্গে পেরে উঠবে না বুঝে এতকাল চুপ করে ছিল। ডিমোলোর কথায় সে-ও সাগ্রহে রাজী হলো। কিন্তু তার কথা হলো, জমির অর্ধেক সে পাবে; বাকি অর্ধেক পাবে ডিমোলো ও প্যারেরা।

    ডিমোলো সাহেব বললে, “আমরা তিনজন যখন এক হয়েছি, তখন আমার ধারণা, জোর করে আমরা মীরবহরপুরে নীল চাষ করতে পারবো। প্যারেরা কি বল?”

    প্যারেরা একটু চিন্তা করে বললে, “কিন্তু লর্ড ক্যানিং, শুনেছি, এই রকম কাজ দমন করতে চায়।”

    হাণ্ট সাহেব ব্যঙ্গ করে বললে, “ক্লিমেন্সী ক্যানিং! ফুঃ! একটা ভণ্ড অকর্মণ্য ব্যক্তি! তাছাড়া নেটিভদের ওপর জুলুম হলে যে কাঁদুনী উঠবে, তা বেশীদূর পৌঁছবে না। ওর। বড় জোর ম্যাজিস্ট্রেটকে জানাবে। এ পরগনার ম্যাজিস্ট্রেট আমার খুব দোস্ত লোক। দেশ থেকে একই জাহাজের বয়লারে কয়লা ঝাড়তে ঝাড়তে এই স্বর্ণগর্দভদের দেশে এসেছিলুম। যদি কোন গোলমাল হয়, তাকে হাত করা যাবে। একবার তাকে নীলকুঠিতে এনে আচ্ছা খানাপিনা দিলেই সব চাপা পড়ে যাবে। আমি আইন-আদালত, এমনকি লর্ড ক্যানিংয়ের কথাও ভাবি না। আমাদের ভাববার বিষয় শুধু রাঘব রায়ের লোকবল আর অস্ত্রশস্ত্র সম্পর্কে।”

    ডিমোলো বললে, “সে কথা ঠিক। রাঘব রায়ের লোকবল যথেষ্ট। বহু লেঠেল চোয়াড় ঠ্যাঙাড়ে ঢালী ওর অধীনে আছে। তিন-চারটে গাদা বন্দুকও আছে শুনেছি। লোকটা নিজেও যেমন সাংঘাতিক জোয়ান, তেমনি ভীষণ সাহসী।”

    হাণ্ট সাহেব গড়গড়া টানতে টানতে বললে, “তা বটে। তবে ওকে ঠাণ্ডা করার দাওয়াইও আমার যথেষ্ট আছে। আমার তিন-তিনটে টোটার বন্দুক। আমার কুঠির লোকজনদেরও এই বন্দুক চালাতে শিখিয়েছি।”

    প্যারেরা বললে, “কিন্তু এ দেশের লোকেরা টোটা ছোঁবে না।”

    হাণ্ট বললে, “হাঁ, তা শুনেছি। গেল বছর যে সিপাই মিউটিনী হয়েছিল, তার একটা কারণই হলো ওই টোটা। আমি সেজন্যে ভাবি নে। আমার কুঠির বেশীর ভাগ লোকই নেটিভ খ্রীস্টান। তাদের কোন কুসংস্কার নেই। আমাদের গভর্নমেন্ট যদি প্রথমেই এ দেশের সব লোককে খ্রীস্টান করে ফেলতো, তাহলে এই মিউটিনী কেন, কোন বিদ্রোহের সম্ভাবনাই এ দেশে থাকতো না। যাক সেসব কথা। আমার লোকেরা আমায় জাত-ভাই ভেবে শেষপর্যন্ত আমার হয়ে দেশের লোকের বিরুদ্ধে লড়বে,—এটা আমি বলতে পারি।”

    প্যারেরা জিজ্ঞাসা করলে, “তাহলে এখন আমরা। কি করবো?”

    হাণ্ট বললে, “আমার মত, রাঘব রায়ের জমিদারীর কোণে যে নতুন ঘরটা আছে, সেটা আমরা তিনজনে মিলে জোর করে দখল করে একটা যৌথ নীলকুঠি পত্তন করবো। রাঘব রায় যদি বাধা দিতে আসে, তাহলে তিনজনে সদলবলে তাকে দমন করবো। কিন্তু আগেই বলেছি, মুনাফার অর্ধেক আমার চাই।”

    প্যারেরা বললে, “তাই হবে। আমি কিন্তু রাঘব রায়ের অপমানের প্রতিশোধ নিতে শুধু তার জমি ছিনিয়ে নিয়েই ক্ষান্ত থাকবো না, আরও কিছু করার মতলব আমার আছে।”

    হাণ্ট সাহেব উঠে দাঁড়ালো, বললে, “বিশেষ জরুরী কাজে এখনই আমাকে বেরোতে হবে। এই কথাই তাহলে ঠিক রইল। কাল তোমরা দুজনেই এসো। কালই এ কাজের দিন ও প্রোগ্রাম স্থির করবো।”

    কুঠিয়ালদের সভা ভঙ্গ হলো।

    .

    রাঘব রায় প্রবল জ্বরবিকারে প্রায় দেড় মাস শয্যাশায়ী ছিলেন। এখন জ্বর নেই, কিন্তু বেশ দুর্বল। বহু দিন অন্দরমহল থেকে তিনি বের হন নি। কিন্তু আজ প্রবীণ দেওয়ান রঘুপতির বার বার অনুরোধে বিকাল বেলায় রোদের তাপ কমে গেলে ধীরে ধীরে বাইরের মহলে বৈঠকখানায় এসে বসেছেন।

    মাথার ওপর টানা পাখা চলেছে, তবু একজন বরকন্দাজ একটা আড়-পাখা নিয়ে তাঁকে বাতাস করছে। একজন এসে তাঁর হাতে গড়গড়ার নল তুলে দিলে। এমন সময় দেওয়ান রঘুপতি ও সদর নায়েব শ্রীমন্ত এসে নমস্কার করে দাঁড়ালো।

    রঘুপতি ও শ্রীমন্তের চোখেমুখে দারুন উত্তেজনার ভাব। রাঘব রায় বুঝলেন, জমিদারীতে বিশেষ কোন গোলযোগ ঘটেছে। কিঞ্চিৎ উদ্বিগ্ন স্বরে রঘুপতিকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “কি খবর বলুন তো? আপনাদের হাবভাব দেখে তো ভাল মনে হচ্ছে না?

    দেওয়ান উত্তর দিলেন, “হুজুর, খবর খুবই খারাপ ডিমোলো সাহেব আরও দুজন কুঠিয়াল সাহেবের সঙ্গে মিলে জমিদারীর বিষম ক্ষতি করবার উদ্যোগ করেছে।”

    রাঘব রায় জিজ্ঞাসা করলেন, “ডিমোলো? ওঃ–-হ্যাঁ! সেই চড় খাওয়ার প্রতিশোধ বুঝি? কি ক্ষতি তার। করতে চাইছে?”

    দেওয়ান বললেন, “সে রাগ তো আছেই। তাছাড়া ওরা জোর করে আমাদের নতুন চর এলাকায় নীলকুঠি তৈরি করেছিল—”

    বিস্মিত উত্তেজিত রাঘব রায় দেওয়ানকে বাধা দিয়ে বললেন, “জোর করে নীলকুঠি তৈরি করেছিল? আমার জমিদারীর এলাকায়? কবে?”

    দেওয়ান উত্তর দিলেন, “আপনি তখন জ্বরে বেহুশ ছিলেন। তাই তখন কিছু আপনাকে জানাই নি।”

    রাঘব রায় জিজ্ঞাসা করলেন, “হঠাৎ এত তাড়াতাড়ি একটা নীলকুঠি ওরা তৈরি কবলে কি করে?”

    দেওয়ান বললেন, “ঐজন্যে ওর। বিদেশ থেকে বহু মিস্ত্রী, কারিগর, লোকজন এনেছিল। তারপর দিনে রাতে কাজ করিয়ে এক হপ্তার মধ্যে একটা পুরে। নীলকুঠি তৈরি করেছিল।

    ও দিকটা চর এলাকা, পঙ্গার বসতি নেই, জমিদার সরকারে লোকদের যাতায়াতও কম, তাই খবর পেতে দেরি হয়েছিল। যাই হোক এক হপ্তা পরে খবর পেয়ে আমি নিজে পাল্কীতে করে গিয়ে দেখি, নতুন চরের ঠিক মাঝখানে দিব্বি একটা কুঠবাড়ি আর লোকজন। বড় বড় চৌবাচ্চা বা হোজ তৈরী হয়েছে। টানা কলে নদী থেকে হুড় হুড় করে জল উঠছে। নৌকো বোঝাই করে অন্য জায়গা থেকে নীল গাছ আসছে। আর বহু বুনো স্ত্রী-পুরুষ কুলীর কাজ করছে!”

    উত্তেজিতভাবে রাঘব রায় বললেন, “সে সময় আমাকে জানালেন -না কেন? ম্যাজিস্ট্রেটকে দরখাস্ত করতুম।”

    মাথা চুলকুতে চুলকুতে দেওয়ান রঘুপতি উত্তর দিলেন, “হুজুরের কবিরাজ মশাই নিষেধ করলেন, বললেন, এ সময় ঐ খবর আপনাকে জানালে আপনার শরীরের পক্ষে খুব খারাপ হবে।”

    রাঘব রায় গম্ভীর ভাবে বললেন, “হুঃ! তারপর—?”

    দেওয়ান বললেন, “তারপর আমি নিজে গিয়ে ডিমোলে। সাহেবের কাছে অভিযোগ করতে, সে আমাকে চাবুক মারে।”

    ক্রুদ্ধ রাঘব রায় ছটফট করে উঠলেন, অধীর কণ্ঠে বললেন “চাবুক মেরেছে! চাবুক? আপনাকে?”

    দেওয়ান বললেন, “হুঃ, তা মেরেছে। তবে তার প্রতিশোধও নিয়েছি। সেই রাত্রেই লোকজন নিয়ে গিয়ে সেই নীলকুঠি পুড়িয়ে চাই করে দিয়ে এসেছি।”

    এতক্ষণ বাদে রাঘব রায়ের মুখে যেন একটু স্বস্তির আভাস দেখা গেল। তিনি মাথা নেড়ে বললেন, “সাবাস্! ঠিক করেছেন!”

    দেওয়ান বললেন, “না হুজুর, কাজটা বোধহয় ভালো করি নি। নীলকুঠি পুড়িয়ে দেবার পর ওরা আরও ক্ষেপে গেছে, ভীষণ প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করছে।

    রাঘব রায় জিজ্ঞাস করলেন, “ভীষণ প্রতিশোধ? কি রকম?”

    দেওয়ান বললেন, “তিন কুঠির সাহেবরা মিলে স্থির করেছে, ওরা আমাদের জমিদারীর দক্ষিণ দিকের বাঁধ কেটে ঐ দিককার গ্রামগুলো সব ভাসিয়ে দেবে, আর—”

    রঘুপতি একটু থামলেন। রাঘব রায় তাঁর মুখের দিকে চেয়ে-ছিলেন, জিজ্ঞাসা করলেন, “থামলেন কেন? বলুন – আর কি?”

    দেওয়ান মাথা নীচু করে চাপা গলায় জবাব দিলেন, “আরও সংকল্প করেছে, ওরা জমিদার বাড়ি আক্রমণ করে যথাসর্বস্ব লুঠ করবে, মেয়েদের অপমান করবে।”

    রাঘব রায় যেন আগুন হয়ে উঠলেন, বললেন, “এ্যাঁ! এত স্পর্ধা! কবে তারা এ কাজ করতে বাসনা করে?”

    দেওয়ান উত্তর দিলেন, “আজ রাত্রে ওরা তিন দল একত্র হয়ে কালই এইসব করবে,—এই রকম খবর পেয়েছি।”

    রাগে কাঁপতে কাঁপতে রাঘব রায় চিৎকার করে ডাকলেন, “করালী!” সঙ্গে সঙ্গে একটা লোক এসে রাঘব রায়কে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালো।

    লোকটার চেহারা যেমন লম্বা তেমনি চওড়া। মাথায় বাবরি চুল। গায়ের রং কালো কুচকুচে। গালে গালপাট্টা দাঁড়ি, চোমরানো গোঁফ চোখ দুটো ফিকে লাল। হাতে একটা ছোট ছাঁটা মুগুর।

    রাঘব রায় তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “শুনেছিস কিছু?”

    করালী বললে, “সবই শুনিছি হুজুর, শুধু আপনার হুকুমের অপেক্ষায় আছি।”

    জলদগম্ভীর কণ্ঠে রাঘব রায় বললেন, “আমার জমিদারীতে আর তোর হাতে যত লেঠেল ঠ্যাঙ্গাড়ে চোয়াড় সড়কিগুলা ঢালী আছে, তাদের ডেকে আজই রাত্রের মধ্যে তৈরী হবি। ভোর হবার আগেই তোরা দক্ষিণের বাঁধের ওপর গিয়ে উঠবি। যদি সাহেবদের দলের কাউকে সপ্তমুখী নদীর এপারে দেখবি তো একেবারে শেষ করে দিবি। আমি হুকুমদার রইলুম।”

    দুর্দান্ত লেঠেল ও দাঙ্গাড়ে ভীষণ শক্তিশালী করালী সর্দার এই আদেশেরই অপেক্ষা করছিল। রাঘব রায়ের কথা শেষ হতেই সে উল্লাসের সঙ্গে বললে, “করালী সর্দার বেঁচে থাকতে আপনার কোন ভাবনা নেই, হুজুর।”

    আর একবার রাঘব রায়কে প্রণাম করে করালী বুক ফুলিয়ে সদর্পে বেরিয়ে গেল।

    রাঘব রায় কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থেকে দেওয়ান রঘুপতিকে বললেন, “আমাকেও কাল ঐ দক্ষিণের বাঁধে যেতে হবে।”

    বিস্মিত দেওয়ান বললেন, “আমরা থাকতে হুজুর নিজে কেন যাবেন? আপনার শরীর তো ভাল নয়।”

    রাঘব রায় বললেন, “না, আমাকে যেতেই হবে। ব্যাপারটা সোজা বলে মনে হচ্ছে না। যদি সাহেবরা কোন মতে ওদিককার বাঁধ কাটতে পারে, তাহলে ঐ অঞ্চলের দুখানা চক এক ঘণ্টার মধ্যে নোনা জলে ভেসে যাবে, আমার হাজার হাজার প্রজার সর্বনাশ ঘটবে। যেতেই হবে আমাকে। আমি জানি, আমার প্রজারা আমাকে যেমন ভয় করে, তেমনি ভালবাসে ভক্তিও করে।”

    একটু কিন্তু-কিন্তু করে দেওয়ান বললেন, “কিন্তু, হুজুর, সাহেবদের দল যদি ঠিক ঐ সময় জমিদার বাড়ি হানা দেয়?”

    একমুহূর্ত চিন্তা করে রাঘব রায় বললেন, “আমার মনে হয়, অতটা সাহস ওদের হবে না। আর যদি একান্তই হয়, তাহলে ওদের রোখবার ব্যবস্থাও করে যাব। আপনিই এখানে থাকবেন। আপনার সঙ্গে থাকবে জনকতক বাছাইকরা লেঠেল ঢালী; তাছাড়া বাড়ির পাইক-পেয়াদার। তো আছেই। একটা মুঙ্গেরী বন্দুকও রেখে যাব। আর কুঠিয়াল সাহেবরা আসে তে। ঐ পথ দিয়েই আসবে। আসবার পথেই ওদের আমরা আটকে ফেলবো। আমার কথা ভাববেন না। করালী আছে, দেহরক্ষী হিসেবে শ্রীমন্ত আমার সঙ্গে থাকবে।”

    রাঘব রায়ের স্বয়ং ঘটনাস্থলে যাওয়াটা দেওয়ানের ঠিক মনঃপূত নয় দুই কারণে। প্রথমত, রাঘব রায়ের শরীর ভাল নয়, সবে কঠিন রোগ থেকে উঠেছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি ভীষণ রাগী, রাগলে জ্ঞান থাকে না। জমিদারী রক্ষার ব্যাপারে কয়েকটি দাঙ্গায় এর আগে তিন-চারটে খুন হয়েছে। কিন্তু সে সময় এখন আর নেই। বহু পরিবর্তন হয়েছে দেশে, আইন-আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার উপর এবার বিবাদ হচ্ছে সাহেবদের সঙ্গে, যারা আজ রাজার জাত, যাদের হাতে আজ আইন-আদালত।

    দেওয়ান রঘুপতির মাথায় এই সব চিন্তা ঘুরতে থাকে।

    সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। কুলবিগ্রহের মন্দিরের সন্ধ্যা আরতির শাঁখ-ঘণ্টা বাজতেই রাঘব রায় উঠে পড়লেন।

    .

    সারা মীরবহরপুরে সাজ-সাজ রব পড়ে গেছে—রীতিমত যুদ্ধের ব্যাপার। বিপক্ষে তিন-তিনটে কুঠির সাহেব,—তাদের দলবল অস্ত্রশস্ত্র আছে। তাদের সঙ্গে লড়তে হলে নিজেদের কতটা শক্তিশালী হতে হবে, সে বিষয়ে করালীর ভালরকম জ্ঞান আছে, আর আছে সদর নায়েব শ্রীমন্তের। করালী সর্দার শুধু বিখ্যাত লেঠেল নয়, সে এ অঞ্চলের লেঠেল-ঢালীদের দলপতি। বহু দুর্ধর্ষ ডাকাতও তাকে ভয়-ভক্তি করে, তার ডাকে এসে পাশে দাঁড়ায়, সাহায্য করে।

    রাত শেষ হবার অনেক আগেই করালী সদলবলে রীতিমত প্রস্তুত হয়ে দক্ষিণের বাঁধের আশপাশে হেঁতাল জঙ্গলের মধ্যে গোপনে অপেক্ষা করতে থাকে। নীলকুঠির কোন লোক সপ্তমুখী নদীর এপারে এলেই আত্মপ্রকাশ করবে; বেপরোয়! সড়কি, তারপর লাঠি চালাবে। তাতে যদি না হয়, ছাটা মুগুর তলোয়ার ছোরা তো আছেই। হুজুর এলে দুটো বন্দুক থাকবে তাদের দলে।

    .

    সবে ভোর হয়েছে।

    কুলবিগ্রহদের প্রণাম করে এসে রাঘব রায় স্ত্রী দশভুজা দেবীকে সহজ কণ্ঠে বললেন, “প্রজারা আমাদের সন্তান। তাদের ধনপ্রাণ রক্ষার জন্যে আমি সেখানে যাচ্ছি, আমার জন্যে ভেব না। আমার যা লোক-বল অস্ত্রশস্ত্র আছে, তাতে মনে হয় কুঠিয়াল সাহেবরা পেরে উঠবে না। দেওয়ানজী আশঙ্কা করেন, সাহেবরা আমাদের বাড়ি আক্রমণ করবে। আমার মনে হয়, অতটা সাহস ওদের হবে না। তাছাড়া আমরা দক্ষিণের বাঁধে গিয়ে ওদের এদিকে আসার পথও আটকে ফেলছি। তাহলেও বাড়িতে জনকয়েক ভাল ভাল লেঠেল, একটা বন্দুক ও দেওয়ানজীকে রেখে যাচ্ছি। দেওয়ানজী সিংহদ্বার ও দেউড়ি আটকে থাকবেন। বাড়ির পাইক-বরকন্দাজরা বাড়ির চারদিক টহল দেবে। এই ব্যবস্থাই আমি করে গেলুম।”

    দশভুজা দেবী স্থির হয়ে সব কথা শুনছেন। মেয়ে মহামায়া ও ছেলে দর্পনারায়ণ তখনও পালঙ্কে ঘুমোচ্ছে। রাঘব রায় তাদের দুজনের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে আবার বলতে লাগলেন, এবার তাঁর গলার স্বর বিষণ্ণ আরও গম্ভীর, “দেখ, একটা কথা বলি—যদিও সাহেবরা আমাদের সঙ্গে পেরে উঠবে বলে মনে হয় না, তবু দাঙ্গা-লড়াইয়ের ব্যাপারে কখন কি ঘটে, অনেক সময় আগে থাকতে ঠিক করে বলা যায় না। যদি—যদি ওখানে আমার তেমন কিছু হয়, তাহলে আমার ঘোড়া উল্কা একলা চলে আসবে। তাকে যদি একল। ফিরে আসতে দেখ, তাহলে তক্ষনি বাড়ির গড়ের খিল খুলে দেবে। বাড়ির চারদিকের খাদ দেখতে দেখতে জলে ভর্তি হয়ে যাবে, বাইরে থেকে কেউ বাড়িতে ঢুকতে পারবে না। চোরা কুঠরির কোণে যে সরু লোহার শিকল আছে, সেটা টানলেই গড়ের খিল খুলে যাবে, আর সেখানে যে কাছিটা আছে, সেটা টানলেই গড়ের খিল বন্ধ হয়ে যাবে। খুব সাবধান, বেশীক্ষণ গড়ের খিল খুলে রেখো না। তাহলে সারা বাড়ি এমন কি নীচের তলা জলে ডুবে যাবে। আর এক কথা—”

    রাঘব রায় থামলেন। একটু যেন বিচলিত।

    দশভুজা দেবী তাঁর মুখের দিকে চেয়ে ছিলেন, জিজ্ঞাসা করলেন, “আর কি?”

    রাঘব রায় বললেন, তাঁর গলা একটু কেঁপে উঠলো, “আর—আর কোন মতে সাহেবরা কেউ যদি বাড়ির অন্দরমহলে ঢোকে…তুমি আছ, মেয়ে মহামায়াও বড় হয়েছে, কুলবিগ্রহ আছেন—”

    দশভুজা দেবী বুদ্ধিমতী। সাহসী নারী। স্বামী কি বলতে চাইছেন, বুঝে নিয়ে বললেন, “আর বলতে হবে না। এ দেশের কোমল নারীরাও পশু বা দৈত্য বধের সময় কিরকম ভয়ঙ্করী হতে পারে, তা পড়েছি। অন্দরমহলের পবিত্রতা রক্ষা করবার জন্যে কি করতে হয়, তা আমার জানা আছে।”

    রাঘব রায় মাথা নেড়ে বললেন, “আমি তা জানি। তাই নির্ভাবনায় সেখানে যেতে পারছি।”

    .

    রাঘব রায়ের সব চেয়ে প্রিয় ঘোড়াটির নাম ‘উল্কা’। উল্কার যেমন বলিষ্ঠ উন্নত দেহ, তেমনি সে তেজী, তার বুদ্ধিও তেমনি প্রখর। রাঘব রায়ের মনের কথা সে যেন ধরতে পারে। গায়ের রং তার দুধের মতো সাদা। তার পিঠে রাঘব রায়কেই মানায়।

    ভোর হতেই রাঘব রায় সিংহদ্বারের সামনে উল্কার পিঠে উঠে বসলেন—তাঁর কাঁধে ঝোলানো মুঙ্গেরী বন্দুক, কোমরের খাপে তলোয়ার। উল্কা ছুটে চললো। সঙ্গে চললে। শ্ৰীমন্ত—একটি তেজী ঘোড়ায়।

    মীরবহরপুরের জমিদারীর দক্ষিণ সীমানার প্রায় সবটাই সপ্তমুখী নদী এঁকে বেঁকে ঘিরে রেখেছে। অতি ভয়ঙ্কর এই সপ্তমুখী। কাছেই বঙ্গোপসাগর। জোয়ারের সময় নদীতে জল থৈ থৈ করে, উথলে উথলে ওঠে, বড় বড় ঢেউ তীরে গিয়ে আছড়ে পড়ে। ভাঙনের আশঙ্কা থাকে প্রায় সব সময়। সেইজন্যে রাঘব রায় এর উত্তর তীরে খুব উঁচু ও মজবুত বাঁধ বেঁধে দিয়েছেন। তাই রক্ষা পেয়েছে বহু ক্ষেত, বহু পল্লী, হাজার হাজার কৃষকের ধনপ্রাণ। এই বাঁধকে এ অঞ্চলের লোকেরা বলে দক্ষিণের বাঁধ।

    সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণের বাঁধে নীল কুঠিয়ালদের সঙ্গে করালী সর্দারের দলের রীতিমত লড়াই আরম্ভ হয়েছে। বাঁধের ওপর রাঘব রায়ের এলাকায় করালীর দল, নদীর ওপারে কুঠিয়ালরা।

    কুঠিয়ালদের দশ-বারোখানা ডিঙ্গিবোঝাই লোক-লস্কর লাঠি সড়কি গাঁতি কোদাল নিয়ে নদী পার হয়ে এ পারে আসবার চেষ্টা করছে, আর করালীর দল প্রাণপণে তাদের বাধা দিচ্ছে।

    দু পক্ষেই সড়কি চলছে সমানে। সাহেবদের দল নেহাত কম নয়। তার উপর ওদের বন্দুক আছে দুটো।

    করালীর দেহ ক্ষতবিক্ষত। তার প্রধান সাকরেদ লোটনকে হাণ্ট সাহেব গুলি করেছে। তার অবস্থা শোচনীয়। হাণ্ট সাহেবের দল একটা বড় বজরা করে তীরের কাছে এসে গেছে। এইবার বুঝি ঘাটে ভিড়বে।

    করালীর দল লাফ দিয়ে কোমর জলে পড়ে নৌকোটা ডুবিয়ে দেবার চেষ্টা করলো। হাণ্ট সাহেবের গুলিতে করালীর দলের দুজন আহত হলো। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সাহেবদের একটা নৌকে। করালীর দল ডুবিয়ে দিলে বটে, কিন্তু পরক্ষণে তাদের অপর একখানা নৌকো তীরে এসে ভিড়লো। এই নৌকোতে স্বয়ং হাণ্ট সাহেব—হাতে বন্দুক। তার সঙ্গে করালীর দল আর পারছে না।

    হাণ্টের দ্বিতীয় দল কোদাল গাঁতি নিয়ে মহোল্লাসে বাঁধে ওঠবার উপক্রম করছে, এমন সময় চারদিকে ভীষণ সোরগোল উঠলো—রাঘব রায়! রাঘব রায়! রাঘব রায় নিজে এসেছেন!

    ক্ষণেকের জন্যে সবাই বুঝি থমকে দাঁড়ালো। সেই দুর্দান্ত রাঘব রায়, যে রাজার জাতকে চড় মেরে অজ্ঞান করে দেয়! চাবুক মেরে যে সাহেবের দেহ রক্তাক্ত করে, যার ভয়ে সুন্দরবনের বাঘরা পর্যন্ত নদীর এপারে আসে না, সেই রাঘব রায় নিজে এসেছেন? নিজে—?

    “খবরদার!”

    ছু পক্ষের দলই কেঁপে উঠলো–সপ্তমুখী নদীর তীরে বাঁধের ওপর কে যেন কামান দাগলে।

    রাঘব রায় আবার গর্জন করে উঠলেন, “খবরদার! কুঠিয়ালদের কেউ আমার এলাকার মাটিতে পা দিয়েছে কি পুঁতে ফেলবো।”

    পলকের মধ্যে দৃশ্য পালটে গেল। সাহেবদের পক্ষের দেশী খৃস্টান আর ভাড়াকরা লোকজন প্রাণভয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লো। তারা জানে, নদী বড় বড় কুমীরে ভরতি। তবু সাঁতার কেটে তারা নদীর ওপারে যাবার চেষ্টা করতে থাকে। কুমীরের গ্রাস থেকে তবু রক্ষা পাওয়া সম্ভব, কিন্তু রাঘব রায়?—সাক্ষাৎ যম! হাণ্ট সাহেব বন্দুক উঁচিয়ে নিজের লোকদের আটকাবার চেষ্টা করলে। কিন্তু ফল হয় না। রাঘব রায়ের জমিতে পা দেবার সাহস দলের কারো নেই। তারা তখন প্রাণপণে সাঁতার কাটছে। একজনকে ইতিমধ্যে কুমীরে ল্যাজের ঝাপটা মেরে শেষ করে দিয়েছে, আর একজনকে টেনে নিয়ে গেছে। তবুও তারা ফিরছে না। মাঝ নদীতে নৌকোর উপর দাঁড়িয়ে হাট সাহেব ব্যর্থ আক্রোশে রাগে অপমানে জ্বলতে লাগলো। তার নৌকোর দাঁড়ি-মাঝিরাও পালিয়ে গেছে রাঘব রায়ের হুঙ্কার শুনে।

    নৌকো টলছে, হাণ্টও টলছে। রাঘব রায়কে লক্ষ্য করে হাণ্ট বন্দুকের ট্রিগার টিপলে আর ঠিক সেই মুহূর্তে কোথা থেকে এক সড়কি এসে তার কাঁধ ভেদ করলে। হাণ্ট নদীর জলে পড়ে গেল।

    সড়কিটা ছেড়েছিল শ্রীমন্ত। হাণ্টের নৌকোটা তখন নদীর ঢেউতে সরে সরে যাচ্ছিল, দুলছিল অত্যন্ত। তাই হাণ্টের ঠিক মাথায় সড়কিটা বেঁধে নি। তা না হলে শ্রীমন্তের তাক কখনো একচুলও এদিক-ওদিক হয় না।

    হাণ্ট নদীতে পড়ে সাহায্যের জন্যে চিৎকার করে উঠলো। কিন্তু কে সেদিকে এগিয়ে আসবে? স্বয়ং রাঘব রায় বাঁধ থেকে তীরে এসে নেমেছেন।

    হাণ্টের কুঠর দেওয়ানকেও দেখা গেল না। কোনমতে সাঁতার কেটে হাণ্ট ওপারের দিকে এগিয়ে চললো। তার পরে তার বা তার দলের খবর কেউ জানে না।

    হাণ্টের গুলি রাঘব রায়ের দেহে না লেগে লেগেছিল তাঁর প্রিয় ঘোড়া উল্কার মুখে। উল্কা যন্ত্রণায় পাগলের মতো লাফাতে শুরু করলে। রাঘব রায় বহু চেষ্টা করেও তাকে বাগে আনতে পারলেন না। শেষে রেকাব থেকে পা খুলে তিনি মাটিতে লাফিয়ে পড়লেন। উল্কা বেপরোয়া ছুটতে ছুটতে হেঁতাল জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। তার দিকে নজর দেবার অবসর রাঘব রায়ের তখন ছিল না। তিনি দেখলেন, কিছু দূরে একট। গেঙ গাছের আড়ালে ডিমোলো আর ফকরে মার্টিন জন কয়েক লোক নিয়ে বাঁধ কাটবার উপক্রম করছে, করালী ছুটে যাচ্ছে সেদিকে। সঙ্গে তার প্রিয় সাকরেদ ভোটন 1 রাঘব রায় শ্রীমন্তকে সঙ্গে নিয়ে সেই দিকে ছুটে গেলেন।

    ডিমোলো করালীকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে। গুলি লাগলো ভোটনের কাঁধে। সে যন্ত্রণায় শুয়ে পড়লো। এ দৃশ্যে রাঘব রায় আর স্থির থাকতে পারলেন না। বন্দুকটা শ্রীমন্তের হাতে দিয়ে খাপ থেকে তলোয়ার খুলে তিনি ডিমোলো ও ফকরে মার্টিনের দিকে ছুটে গেলেন।

    ডিমোলোর বন্দুকে টোটা ছিল না। তাড়াতাড়ি বন্দুক খুলে সে টোটা পুরবার উপক্রম করতেই করালী তার মাথায় প্রাণপণ শক্তিতে ছাঁটা মুগুর বসিয়ে দিলে। ডিমোলো। চিত হয়ে পড়লো। পরক্ষণে করালীর ছোরা আমূল বিধে গেল ফকরের পিঠে। যন্ত্রণায় বিকট চিৎকার করে ফকরে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। রাঘব রায়ের তলোয়ারের আঘাতটা যে কত সাংঘাতিক, তা উপলদ্ধি করবার আগেই সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলে। কুঠিয়ালদের দলের শেষ যে ক জন অবশিষ্ট ছিল, তারা ইতিমধ্যে প্রাণভয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। নদীর এপারে ওদের কাউকেই আর দেখা গেল না।

    লড়াই শান্ত হলে, করালী রাঘব রায়ের কাছে এসে শান্ত কণ্ঠে বললে, “হুজুর, প্যারেরাকে তো দেখছি নে। সে কোথায়?”

    রাঘব রায়ের খেয়াল হলো। চিন্তিত কণ্ঠে বললেন, “তাই তো!কোথাও লুকিয়ে নেই তো?”

    শ্রীমন্তকে বিচলিত মনে হলো। বললে, “ব্যাপারটা কিন্তু খুবই সন্দেহজনক মনে হচ্ছে। সে এই সুযোগে অন্য কোন পথ দিয়ে মীরবহরপুরে যায় নি তো?”

    বিশেষ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন রাঘব রায়, বললেন, “তা হতে পারে—খুবই সম্ভব। আমি আর দেরি করবো না। এক্ষনি বাড়ি যাওয়া দরকার। এদিককার অবস্থা তো ঠাণ্ডা। কিন্তু উল্কা কোথায় গেল? উল্কা?”

    একজন লেঠেল বললে, “হুজুরের ঘোড়াকে মাঠময় পাগলের মতো ছুটাছুটি করতে দেখেছি। তারপর যে কোন্ দিকে গেছে, বলতে পারি নে।”

    অস্থির কণ্ঠে রাঘব রায় বললেন, “সর্বনাশ! উল্কা যদি বাড়ি ফিরে থাকে! ছিপ নৌকোয় এক্ষনি আমি বাড়ি ফিরবো। একাই যাবো। শ্রীমন্ত, তুমি আরো কিছুক্ষণ এখানে থেকে অবস্থা ভাল বুঝলে চলে যেও। করালী আজ এখানে থাক্। আমার বন্দুকও রইল। দু পক্ষের লাশগুলো গুম করবে।”

    রাঘব রায় একটি ছিপে উঠে পড়লেন।

    … … …

    মীরবহরপুরের জমিদার বাড়ি রাজপ্রাসাদ বললেই হয়। বিরাট মহল। চারদিককার বাগান পুকুর সবই উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। পাঁচিলের পর গভীর খাদ বা গড়। খাদের সঙ্গে নদীর যোগাযোগ করা যায়। গড়ের খিল খুলে দিলে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই নদীর জলে গড় ভরে যেতে পারে—বিশেষত জোয়ারের সময়। তখন এই বাড়িতে যাতায়াতের একমাত্র পথ থাকে সিংহদ্বার দিয়ে। সিংহদ্বার ও দেউড়িতে জমিদার বাড়ির সান্ত্রীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দিনরাত পাহারা দেয়।

    জমিদার বাড়ির গড় ছাড়িয়ে একটু দূরে প্রায় নদীর ধারে জমিদারদের হাতীশালা, পিলখানা, গোয়ালঘর। তারপর পাতাল-শিবের ভাঙা মন্দির। নদীর পাড়ে কয়েক ঘর জেলে-মালোদের বাসও আছে।

    রাঘব রায়ের দেওয়ান রঘুপতি বয়সে প্রৌঢ় হলেও বেশ শক্তিশালী ও সাহসী। এ বয়সে এখনো বন্দুক ছুড়তে সড়কি চালাতে ক্লান্তি বোধ করেন না। তখনকার দিনে জমিদারীর কর্মচারীদের এসব বিষয়ে দক্ষতা না থাকলে চলতো না।

    রাঘব রায়ের ব্যবস্থা মতো জমিদার বাড়ির রক্ষীরা ঢাল সড়কি তলোয়ার নিয়ে দেউড়িতে পাহারা দিচ্ছে।

    দেওয়ান রঘুপতি একটা বন্দুক নিয়ে উঁচু নহবতখানায় দাঁড়িয়ে ফাঁকা মাঠ ও নদীর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছেন। কিন্তু বেলা প্রায় দ্বিপ্রহর হতে চললো,—সাহেবদের কাউকেই দেখা যায় না, কর্তার কাছ থেকেও কোন লোক ফিরে এল না।

    কুঠিয়াল প্যারেরা সাহেব যেমন শয়তান তেমনি ধূর্ত। তার ধারণা, জমিদার রাঘব রায়ের আজ সদলবলে বাঁধ রক্ষা করতে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশী। যদি যায় তো, জমিদার বাড়িতে বেশী লোক থাকবে না। আর সেই সুযোগে সে জমিদার বাড়ি আক্রমণ করবে। সেইজন্যে সে খুব ভোরেই নিজের দলবল নিয়ে একটা বজরায় করে নদীর ধারে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পরে তার একজন দেশী অনুচর এসে খবর দিলে, জমিদার বাড়ি আক্রমণ করার সুবিধা নেই। সেখানে দেউড়িতে পাইক লেঠেল বহু। বরকন্দাজরা বাড়ির চারদিকে টহল দিচ্ছে। বাড়ির তিন দিকে গড়। সামনের দিকে দেওয়ান রঘুপতি স্বয়ং বন্দুক নিয়ে পাহারা দিচ্ছে।

    সব শুনে প্যারেরা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললে, “জমিদার বাড়ির রক্ষীদের দেউড়ি থেকে সরাতেই হবে।”

    মনে মনে সে মতলব ভাজতে থাকে।

    .

    বেলা ঠিক দ্বিপ্রহর। দেওয়ান রঘুপতি হঠাৎ জমিদার বাড়ির দক্ষিণ মহলের ছাদের উপর থেকে দেখলেন, হাতীশালা পিলখানা গোশালা থেকে আরম্ভ করে নদীর ধারের জেলেদের কুড়েগুলোতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো। বুড়ো হাতীটা, বিশ-পঁচিশটা ঘোড়া,

    খুবই সম্ভব। আমি আর দেরি করবো না। এক্ষনি বাড়ি যাওয়া দরকার। এদিককার অবস্থা তো ঠাণ্ডা। কিন্তু উল্কা কোথায় গেল? উল্কা?”

    একজন লেঠেল বললে, “হুজুরের ঘোড়াকে মাঠময় পাগলের মতো ছুটাছুটি করতে দেখেছি। তারপর যে কোন্ দিকে গেছে, বলতে পারি নে।”

    অস্থির কণ্ঠে রাঘব রায় বললেন, “সর্বনাশ! উল্কা যদি বাড়ি ফিরে থাকে! ছিপ নৌকোয় এক্ষনি আমি বাড়ি ফিরবো। একাই যাবো। শ্রীমন্ত, তুমি আরে। কিছুক্ষণ এখানে থেকে অবস্থা ভাল বুঝলে চলে যেও। করালী আজ এখানে থাক্। আমার বন্দুকও রইল। দু পক্ষের লাশগুলো গুম করবে।”

    রাঘব রায় একটি ছিপে উঠে পড়লেন।

    … … …

    মীরবহরপুরের জমিদার বাড়ি রাজপ্রাসাদ বললেই হয়। বিরাট মহল। চারদিককার বাগান পুকুর সবই উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। পাঁচিলের পর গভীর খাদ বা গড়। খাদের সঙ্গে নদীর যোগাযোগ করা যায়। গড়ের খিল খুলে দিলে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই নদীর জলে গড় ভরে যেতে পারে—বিশেষত জোয়ারের সময়। তখন এই বাড়িতে যাতায়াতের একমাত্র পথ থাকে সিংহদ্বার দিয়ে। সিংহদ্বার ও দেউড়িতে জমিদার বাড়ির সান্ত্রীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দিনরাত পাহারা দেয়।

    জমিদার বাড়ির গড় ছাড়িয়ে একটু দূরে প্রায় নদীর ধারে জমিদারদের হাতীশালা, পিলখানা, গোয়ালঘর। তারপর পাতাল-শিবের ভাঙা মন্দির। নদীর পাড়ে কয়েক ঘর জেলে-মালোদের বাসও আছে।

    রাঘব রায়ের দেওয়ান রঘুপতি বয়সে প্রৌঢ় হলেও বেশ শক্তিশালী ও সাহসী। এ বয়সে এখনো বন্দুক ছুড়তে সড়কি চালাতে ক্লান্তি বোধ করেন না। তখনকার দিনে জমিদারীর কর্মচারীদের এসব বিষয়ে দক্ষতা না থাকলে চলতো না।

    রাঘব রায়ের ব্যবস্থা মতো জমিদার বাড়ির রক্ষীরা ঢাল সড়কি তলোয়ার নিয়ে দেউড়িতে পাহারা দিচ্ছে।

    দেওয়ান রঘুপতি একটা বন্দুক নিয়ে উঁচু নহবতখানায় দাঁড়িয়ে ফাঁকা মাঠ ও নদীর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছেন। কিন্তু বেলা প্রায় দ্বিপ্রহর হতে চললো,—সাহেবদের কাউকেই দেখা যায় না, কর্তার কাছ থেকেও কোন লোক ফিরে এল না।

    কুঠিয়াল প্যারেরা সাহেব যেমন শয়তান তেমনি ধুর্ত। তার ধারণা, জমিদার রাঘব রায়ের আজ সদলবলে বাঁধ রক্ষা করতে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশী। যদি যায় তো, জমিদার বাড়িতে বেশী লোক থাকবে না। আর সেই সুযোগে সে জমিদার বাড়ি আক্রমণ করবে। সেইজন্যে সে খুব ভোরেই নিজের দলবল নিয়ে একটা বজরায় করে নদীর ধারে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পরে তার একজন দেশী অনুচর এসে খবর দিলে, জমিদার বাড়ি আক্রমণ করার সুবিধা নেই। সেখানে দেউড়িতে পাইক লেঠেল বহু। বরকন্দাজরা বাড়ির চারদিকে টহল দিচ্ছে। বাড়ির তিন দিকে গড়। সামনের দিকে দেওয়ান রঘুপতি স্বয়ং বন্দুক নিয়ে পাহারা দিচ্ছে।

    সব শুনে প্যারেরা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললে, “জমিদার বাড়ির রক্ষীদের দেউড়ি থেকে সরাতেই হবে।”

    মনে মনে সে মতলব ভাজতে থাকে।

    .

    বেলা ঠিক দ্বিপ্রহর। দেওয়ান রঘুপতি হঠাৎ জমিদার বাড়ির দক্ষিণ মহলের ছাদের উপর থেকে দেখলেন, হাতীশালা পিলখানা গোশালা থেকে আরম্ভ করে নদীর ধারের জেলেদের কুড়েগুলোতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো। বুড়ো হাতীটা, বিশ-পঁচিশটা ঘোড়া, শখানেক গরু আর জেলে পরিবারের লোকজন সবাই আর্তনাদ করছে।

    দেওয়ান অধীর হয়ে উঠলেন। কিন্তু কি করবেন? আগুন-নেভানোর জন্যে জমিদার বাড়ির রক্ষীদের সেখানে পাঠানো উচিত হবে ন।। সেই সুযোগে সাহেবরা যদি কেউ আসে বা আক্রমণ করে! তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। আগুন জ্বলতে লাগলো। আগুনের লেলিহান শিখা সব কিছু গ্রাস করছে। হাতী ঘোড়া গরু ও জেলেদের করুণ আর্তনাদে মীরবহরপুরের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

    অন্দরমহলে দশভুজা দেবীর কানেও সে আর্তস্বর পৌঁছলো। তিনি দেওয়ানজীকে বলে পাঠালেন, জমিদার বাড়ির রক্ষীদের ঐ আগুন নেভানোর জন্যে পাঠিয়ে দিতে।

    রঘুপতি রানীমার আদেশ পালন করলেন বটে, কিন্তু নিজে সেখানে গেলেন না। জনকতক লেঠেলকেও দেউড়িতে রেখে দিলেন।

    বেশীর ভাগ রক্ষীদের আগুন নেভানোর জন্যে পাঠিয়ে দিয়ে দেওয়ান রঘুপতি আবার কাছারি বাড়ির ছাদে উঠে এলেন। পরক্ষণে, বাইরের দিকে লক্ষ্য করার জন্যে তিনি গলা বাড়াতেই, হঠাৎ বন্দুকের আওয়াজ হলো। দেওয়ানজীর নিষ্প্রাণ দেহ ছাদের উপর লুটিয়ে. পড়লো। বন্দুকের একটা গুলি এসে তাঁর মাথা ভেদ করেছে।

    আবার গুলির শব্দ হলো—একবার নয়, পরপর বহুবার। প্যারেরার দল জমিদার বাড়ি আক্রমণ করেছে। তারা সিংহদ্বার পার হয়ে দেউড়িতে ঢুকছে। দেউড়ির রক্ষীরা প্রাণপণে সড়কি তলোয়ার চালাচ্ছে। কিন্তু তারা সংখ্যায় কম। বন্দুকও মাত্র একটা, তাও গাদা বন্দুক। প্যারেরার দলে বন্দুক দুটো। তাদের সঙ্গে জমিদার বাড়ির রক্ষীরা পেরে উঠছে না। দেওয়ানজীর দেখা নেই, তবু তারা লড়ছে। কিন্তু কতক্ষণ।

    প্যারেরা আর তার একজন সঙ্গী যখন অন্দরমহলে ঢুকলো, তখন জমিদার বাড়ির চাকর বরকন্দাজ একজনও জীবিত নেই।

    দশভুজা দেবী সবই স্থিরভাবে দেখছিলেন। তিনি দ্রুত দোতলার ঘরে গিয়ে রুগ্ন দর্পনারায়ণকে পালঙ্কের নীচে গোপনে শুইয়ে দিয়ে অস্ত্রঘরে ঢুকলেন। সঙ্গে মেয়ে মহামায়া। নীচের বারান্দা থেকে প্যারেরার উল্লাসধ্বনি কানে এল। সে যেন রাজ্য জয় করেছে।

    দশভুজা দেবী মহামায়াকে উপরে থাকতে বলে, নিজে সিঁড়ি দিয়ে একতলায় আসতেই বারান্দার ওপর প্যারেরাব সঙ্গে একেবারে চোখাচোখি। প্যারেরা সেই দিকেই আসছে। সিঁড়ি দিয়ে ওপরের ঘরে যাওয়াই তার মতলব। তার হাতে বন্দুক, তার সঙ্গীর হাতে ছোরা।

    দশভুজা দেবী প্যারেরাকে দেখে নড়লেন না। সিঁড়ির পথ আটকে নিষ্পলক চোখে প্যারেরার দিকে চেয়ে রইলেন। নিষ্কম্প নিৰ্ভীক দৃষ্টি।

    তাঁর পরনে চওড়া লালপাড় গরদের শাড়ী। আট করে পরা গায়ের রং কাঁচা সোনার মতো। অটুট স্বাস্থ্য। বলিষ্ঠ উন্নত দেহ। মাথায় কাপড় নেই। কোঁকড়ানো চুল সারা পিঠে ছড়িয়ে পড়েছে। সিথিতে সিঁদুর, কপালে সিন্দুরের ফোঁটা। সর্বাঙ্গে সোনার গয়না, হার চুড়ি ঝলমল করছে। দশভুজা দেবীকে আজ চণ্ডিকা দেবীর মতো দেখাচ্ছে। তার দু চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে পড়ছে।

    প্যারেরা থমকে দাঁড়িয়েছে, তাঁর দিকে চেয়ে আছে এক দৃষ্টে। দশভুজা দেবী তবুও অচঞ্চল। স্থির নেত্রে তিনিও তাকিয়ে রইলেন প্যারেরার দিকে। সিঁড়ির পথ ছাড়লেন না।

    সাহেব কি ভেবে তার সঙ্গীকে বাইরে যেতে বলে দশভুজা দেবীর দিকে এগিয়ে গেল।

    দশভুজা দেবী তবুও স্থির নিশ্চল নিথর—যেন পাথর প্রতিমা। তাঁর পিছনে মহামায়া এসে কখন দাঁড়িয়েছে।

    আরও—আরও এগিয়ে এল প্যারেরা…আরও…একেবারে কাছে—

    “মাই ঘড্‌!!”

    প্যারেরা বিকট আর্তনাদ করে বারান্দায় লুটিয়ে পড়লো। দশভুজা দেবীর হাতে আঁচলের আড়ালে যে ভীষণ তীক্ষ্ণ খাঁড়া ছিল, প্যারেরা তা বুঝতেই পারে নি। তাছাড়াও এদেশের শান্তশিষ্ট অবলা মেয়েরাও যে আত্মরক্ষার জন্যে দুর্বৃত্ত নিধনে নামতে পারে, তা জলদস্যুদের এই বংশধরটির জানা ছিল না।

    এই বীভৎস দৃশ্যে মহামায়া কেঁদে উঠলো। দশভুজা দেবী হাঁপাচ্ছেন।

    হঠাৎ দেউড়িতে কিসের যেন শব্দ! দশভুজা দেবী রক্তাক্ত খাঁড়াটা আবার তুলে নিয়ে দেউড়ির সামনে যেতেই দেখলেন—উল্কা!

    উল্কা? স্বামীর প্রিয় ঘোড়া উল্কা দেউড়িতে একলা ফিরে এসেছে! জীবনে এই প্রথম উল্কা শুয়ে পড়লো। তারপর সব শেষ। দশভুজা দেবী আর্তনাদ করে উঠলেন, “উল্কা! একলা ফিরে এসেছে! একলা! ওঃ! তাহলে তিনি আর নেই।”

    ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মহামায়া বললে, “তাহলে আমাদের কি হবে মা? কে আমাদের রক্ষা করবে, যদি আবার সাহেবরা আসে?”

    দশভুজা দেবীর চোখে জল নেই। হাত-পা কাঁপছে থরথর করে। তিনি বললেন, “তুমি ওপবে যাও মা। দাসীদের কাউকে দেখছি নে। তুমি তোমার ভায়ের কাছে গিয়ে বস। সাহেবরা যদি আবার আসে তো আমি এইখান থেকে আটকাবো। যতক্ষণ পারি তোমাদের রক্ষা করবো। আমি গড়ের খিল খুলে দিচ্ছি।”

    মহামায়া কিন্তু মাকে ছেড়ে গেল না। দশভুজা দেবী শিকল টেনে গড়ের খিল খুলে দিলেন।

    জমিদার বাড়ির চারদিকের গড় দেখতে দেখতে জলে ভরে গেল।

    হঠাৎ দূর থেকে আবার শব্দ কানে এল। হল্লা হচ্ছে। কারা যেন আসছে। নদীর ঘাটে কারা যেন কথা কইছে। তারা হয়তো সিংহদ্বারও পার হলো। দশভুজা দেবী মহামায়াকে বললেন, “সাহেবদের অন্য দল বোধহয় আসছে। আর রক্ষা নেই, তুমি ওপরে যাও।”

    মহামায়া কিন্তু কিছুতেই মাকে একলা রেখে ওপরে যেতে রাজী হলো না।

    বাইরের হল্লা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলো।

    দশভুজা দেবী মহামায়াকে বললেন, “আমাকে ছেড়ে যখন যাবে না, তখন এস দুজনের একই গতি হোক।

    কাপড়ের ভিতর থেকে তিনি, একটা ছোট কৌটা বের করলেন, মহামায়াকে বললেন, “এটা খাওয়ার পর সাহেবরা কেন, দুনিয়ার কেউই আর আমাদের স্পর্শ করতে পারবে না।”

    .

    গড়ে জল বাড়ছে হু হু করে। গড় ভর্তি হয়ে জল আরও বাড়লো। নদীতে এখন জোয়ার। জমিদার বাড়ির মধ্যে সর্বত্র জলে জলময়। একতলার বারান্দার উপরও প্রায় এক হাঁটু জল থৈ থৈ করছে গড়ের খিল কে বন্ধ করবে?

    দশভুজা দেবী ও মহামায়ার দেহে তখন কালকূট বিষের প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। দুজনেরই অচৈতন্য দেহ লুটিয়ে পড়েছে জলের উপর।

    হঠাৎ পাগলের মতো সেখানে এসে ঢুকলেন রাঘব রায়। কিন্তু তখন সব শেষ হয়ে গেছে। দেউড়ীর রক্ষীদল, দেওয়ান রঘুপতি, উল্কা, দশভুজা দেবী, মহামায়া, কেউই জীবিত নেই। আছে শুধু রুগ্ন বালক দর্পনারায়ণ। তারও জীবন-দীপ অতি স্তিমিতভাবে জ্বলছে, যে কোন মুহূর্তে নিভে যেতে পারে।

    রাঘব রায় কাঁপতে কাঁপতে দশভুজা দেবী ও মহামায়ার দেহের পাশে বসে পড়লেন। গড়ের খিল বন্ধ করা বা রুগ্ন দর্পনারায়ণের কথা তাঁর মনে হলো না।

    জল বাড়ছে—ধীরে ধীরে নয়, প্রবল বেগে। মৃত দেহগুলি জলের স্রোতে ডুবছে ভাসছে। রাঘব রায় দশভুজা দেবী ও মহামায়ার দেহের দিকে চেয়ে স্থিরভাবে বসে আছেন। তাঁর বুক পর্যন্ত জল। যেন বাহ্যজ্ঞান লোপ পেয়েছে। প্রাণ নেই, চেতনা নেই, যেন বিরাট এক পাথরের মূর্তি।

    ঊর্ধ্ব শ্বাসে ছুটতে ছুটতে শ্রীমন্ত এসে উপস্থিত হলো। অবস্থা দেখে সে ডুকরে কেঁদে উঠলো, “এ সর্বনাশ কি করে হলো?”

    রাঘব রায়ের চোখে জল নেই এক ফোঁটা। স্থির অচঞ্চল কণ্ঠে উত্তর দিলেন, “সবই বিধির বিধান! মীববহরপুরের রায়বংশের সব গেছে, সবাইও গেছে। আছি শুধু আমি আর রুগ্ন দর্পনারায়ণ। যাক —তুমি আসবে জানতাম, তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছি। এখন শোন, সাহেবদের যখন হত্যা করা হয়েছে, তখন আমাদের কারোও নিস্তার নেই। ওরা রাজার জাত। আইন দণ্ড অস্ত্র, সবই ওদের হাতে। আমার জীবনের প্রয়োজন শেষ হয়েছে। স্ত্রী ও কন্যা যে পথে গেছে, সেই পথে যাবার জন্যে আমিও এখন প্রস্তুত। কিন্তু আমাদের এই প্রাচীন বংশ যাতে রক্ষা হয়, সেইটা আমার শেষ ও একান্ত ইচ্ছা। তোমার কাছেও আমার শেষ অনুরোধ সেইজন্যেই।”

    একটু যেন দম নিয়ে রাঘব রায় আবার শুরু করলেন, “ ওপরের ঘরে দর্পনারায়ণ আছে, তুমি তাকে নিয়ে এক্ষনি বাড়ির পিছন দিকের সুড়ঙ্গ দিয়ে বের হয়ে যেখানে হোক পালিয়ে যাও। খিড়কির ঘাটে একটা ছিপ নৌকো আছে, তাতে করেই যাও। রাত শেষ হবার আগে যে লোকালয় পাবে, সেইখানে গিয়ে উঠবে। কেউ যেন তোমাদের পরিচয় জানতে না পারে। তাহলে সাহেবরা তোমাদের রেহাই দেবে না–হয় গুলি করবে, না হয় ফাঁসিতে লটকাবে। ভগবানের কৃপা থাকে তো, তোমার সাহায্যে দর্পনারায়ণের মারফত আমাদের প্রাচীন বংশ রক্ষা হবে। সব ভারই তোমাকে দিচ্ছি শ্রীমন্ত।”

    শ্রীমন্ত কেঁদে বললে, “আপনিও চলুন, যারা গেছে, তারা তো আর ফিরবে না—।”

    বাধা দিয়ে দৃঢ়কণ্ঠে রাঘব রায় বললেন, “না। আমার স্ত্রী, আমার কন্যা, আমার মীরবহরপুর, আমার প্রজাদের ছেড়ে কোথাও যাব না, শ্রীমন্ত। আমার ভুলেই সব গেছে। আমার ভুলেই এই সব হয়েছে,—আমি আর বাঁচতে চাই না। আমার শেষ অনুরোধ রাখ, ভাই।”

    শ্রীমন্ত কাঁদছে। রাঘব রায় বললেন, “কাঁদছ কেন শ্রীমন্ত? যা বলি, তাই করো। আর দেরি করো না। জল বাড়ছে, এর পর অন্দর-মহল থেকে বের হতে পারবে না। সুড়ঙ্গের পথও জলে ভরে যাবে। মালখানার সিন্দুকে মোহর আছে, সেগুলি সঙ্গে নিও।”

    কাঁদতে কাঁদতে শ্রীমন্ত ওপরের ঘরে চলে গেল।

    জল আরো বেড়েছে। ঢেউ খেলছে। দশভুজা দেবী ও মহামায়ার দেহ অল্প অল্প দেখা যায়। রাঘব রায়ের গলা পর্যন্ত ডুবে গেছে। নিথর নিশ্চল তিনি। পাথরের মূর্তির মতো স্ত্রী-কন্যার দিকে চেয়ে বসে আছেন।

    জল জল জল—সর্বত্র জল। জল সব গ্রাস করছে। ধীরে ধীরে রাঘব রায়ের দেহও গ্রাস করলো।

    ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে এলো। অমানিশার গাঢ় অন্ধকার।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleশ্রীকান্ত – চলিত ভাষার
    Next Article সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোপেন্দ্র বসু
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    May 14, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    May 14, 2026
    Our Picks

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    May 14, 2026

    বৃশ্চিক – পিয়া সরকার

    May 14, 2026

    সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

    May 14, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }