Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    May 14, 2026

    বৃশ্চিক – পিয়া সরকার

    May 14, 2026

    সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

    May 14, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    স্বর্ণমুকুট – গোপেন্দ্র বসু

    গোপেন্দ্র বসু এক পাতা গল্প154 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    স্বর্ণমুকুট – ৩

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ

    ডায়মণ্ড হারবার রোড।

    আলিপুরের পশ্চিমে মোমিনপুর। মোমিনপুর হয়ে ডায়মণ্ডহারবার রোড বেহালা পেরিয়ে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। মাইলের পর মাইল বড়লোকের বাগানবাড়ি বড় বড় মাঠ ছোট ছোট পল্লীগ্রাম পিছনে ফেলে, ডায়মণ্ড হারবারে গিয়ে শেষ হয়েছে। সেইখান থেকে কিছু দূরে উত্তর-পশ্চিমে দশক্ষরা গ্রাম।

    দশক্ষরা গ্রামে বহু লোকের বাস।

    বুলেট ও বজ্র যখন দশঙ্করার জমিদারদের পুরনো ও পরিত্যক্ত বিরাট বাড়িটার সামনে এসে সাইকেল থেকে নামলো, তখন বেলা প্রায় বারটা।

    জমিদারবাড়ির সামনে একটা মাঠ। তারপর সরু রাস্তা। রাস্তার পর বিরাট পুকুর। পুকুরের পাড়ে একটা শিব মন্দির। বুলেট ও বজ্র সাইকেল দুটো মাঠের উপর কাত করে রেখে শিবমন্দিরের দাওয়ায় গিয়ে বসলো।

    একটু পরে বুলেট বললে, “এই হলো বীরেনদাদের আদি বাড়ি।”

    বজ্র জবাব দিলে, “তাতো বুঝলুম, কিন্তু বাড়িটা দেখে মনে হয়, বহু দিন পরিতক্ত অবস্থায় আছে।”

    বাড়িটার দিকে চোখ রেখে বুলেট বললে, “বাড়ির সদর দরজা ছাড়া ওপর-নীচের সব দরজা-জানালা বন্ধ। বাড়ির দেওয়ালে শেওলা পড়েছে। বালি-কাজ খসে গিয়েছে বহু জায়গায়। গত ত্রিশ-চল্লিশ বছর এ বাড়িতে কেউ বাস করেছে বলে মনে হয় না।”

    বজ্র বললে, “তার মানে বীরেনদার ঘটনার সঙ্গে এখানকার কোন সম্পর্ক থাকতে পারে না। যদি বীরেনদার এখানে যাওয়া-আসা থাকতো বা তার কোন জ্ঞাতি বা শরিক এখানে থাকতো, তাহলে না হয় বুঝতুম—”

    বুলেট তাকে ইশারা করে থামিয়ে দিলে। একটা লোক ঘাটের দিকে আসছে।

    লোকটা আরও কাছে আসতে বুলেট জমিদারবাড়িটা হাত দিয়ে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, “আচ্ছা, এই বাড়িটা এখানকার জমিদার রায়বাবুদের নয়?”

    লোকটা ওদের দুজনকে ভাল করে দেখে নিয়ে বললে, “হাঁ, জমিদারবাবুদের বাড়ি বটে, তবে বাবুরা কেউ এখানে থাকেন না। আপনারা কোথা থেকে আসছেন?”

    বুলেট বললে, “আসছি একটু দূর থেকে। আর কেউ থাকেন এখানে?”

    লোকটি বললে, “তা থাকেন। আপনাদের কিছু দরকার থাকে তো বাবুদের নায়েব শ্রীচরণবাবুর সঙ্গে কথা কইতে পারেন। তিনি বাবুদের জমিদারী ভিটা-ভদ্রাসন কুলবিগ্রহের সেবা, সবই দেখাশুনা করেন।

    বুলেট জিজ্ঞাসা করলে, “তিনি এই বাড়িতেই থাকেন তো?” লোকটি বললে, “না। তিনি নিজের বাড়িতেই থাকেন। এখান থেকে খুব কাছেই তাঁর বাড়ি। কিন্তু তিনি তো আজ কদিন বাড়িতে নেই, বাবুদের সুন্দরবনমহলে গেছেন। তাঁর ভাই মাধব গুরুমশাই আছেন, তিনিও বাবুদের কিছু কিছু কাজ করেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারেন। আপনাদের কি দরকার?”

    বুলেট বললে, “আমরা এই দিকে কিছু জমি কিনতে চাই। একটা বড় বাগান করবাব ইচ্ছা আছে। শুনলুম, জমিদারবাবুদের অনেক জমি পড়ে আছে, হয়তো বিক্রি হতে পারে।”

    লোকটা বললে, “সে বিষয়ে মাধব গুরুমশাইকে জিজ্ঞেস করতে পারেন। তিনি এখন জমিদারবাড়িতেই আছেন। তাঁর পাঠশালা বাবুদের পূজোর দালানে হচ্ছে। এইবার বোধহয় ছুটি হবে। ঐ শুনুন, পাঠশালার ছেলেরা ডাক পড়ছে। আপনারা এইবার যান। সদর দেউড়ি পার হলেই পূজোর দালান দেখতে পাবেন। সেখানেই মাধব গুরুমশাই আছেন।”

    লোকটা চলে গেল।

    একটু পরে বুলেট ও বজ্র জমিদারবাড়ির সদর দরজা ও দেউড়ি পার হয়ে যখন পূজার দালানের সামনে এলো, পাঠশালা তখন সবে ছুটি হয়েছে। ছেলেমেয়েরা তালপাতার পাততাড়ি বই শ্লেট নিয়ে পূজার দালান থেকে কলরব করতে করতে নেমে আসছে সিঁড়ি বেয়ে। গুরুমশাই এখনো নামেন নি। দু-একটা ছেলে তখনো সেখানে আছে।

    বাইরে থেকে বাড়িটা যত জীর্ণ মনে হয়, ভিতরে ঢুকলে তা মনে হয় না। সদর দরজার পর দেউড়ি। দেউড়ি শেষ হতেই বাঁধানো বিরাট উঠান, উঠানের তিন দিকে চক মিলানো দোতলা বাড়ি, অপর দিকে পূজার দালান। পাঁচ-ছ ধাপ বেয়ে দালানে উঠতে হয়। পূজার দালান প্রায় দোতলা সমান উঁচু। সামনে একটু খোলা রক বা বারান্দা। তারপর চারটা মোটা মোটা থাম দোতলার সমান উঁচু। সেই থামগুলির মাথায় পূজার দালানের ছাদ।

    পাঠশালার ছুটি হয়ে গেলেও মাধব গুরুমশাই তাঁর জলচৌকির উপর বসে থেলো হুকো টানতে টানতে একজন ছেলেকে কি যেন বলছেন। এ ছেলেটি অন্যদের চেয়ে বয়সে কিছু বড়।

    বুলে ও বজ্র জুতো খুলে মোজা পায়েই পূজার দালানে উঠলো।

    তাদের দেখে গুরুমশাই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। হুকো ও কঞ্চির ছড়িটা দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রেখে শশব্যস্তে বললেন, “আসুন, আসুন। কোথা থেকে আসছেন আপনারা?”

    বুলেট বললে, “আসছি কলকাতা থেকে। আপনার সঙ্গে একটু দরকার আছে।”

    গুরুমশাই একবার পাঠশালার বেঞ্চ ও মাদুরগুলোর ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, “আচ্ছা, তাহলে আসুন, বৈঠকখানায় বসে আপনাদের সঙ্গে কথা বলি। আপনাবা প্যান্ট পরে আছেন, এখানে বসতে অসুবিধা হবে।”

    গুরুমশাইয়ের সঙ্গে বুলেট ও বজ্র বৈঠকখানায় ঢুকলো। বৈঠক-খানা ঘরটা বেশ লম্বাচওড়া। প্রায় আগাগোড়া নীচু তক্তপোশ পাতা, কেবল একদিকে খানিকটা জায়গায় একটা টেবিল ও চার-পাঁচটা ভারি ভারি চেয়ার। দেওয়ালে থানকয়েক বহু পুরনো অয়েলপেন্টিং টাঙানো। ঘরের নানাস্থানে সাবেকী বহু আসবাবপত্র, এমন কি টানা পাখা ঝাড়লণ্ঠন সবই আছে। অতি প্রাচীন হয়ে গেছে সবই। কিন্তু ভাল করে দেখলে মনে হয়, আজো তাদের যত্ন লওয়া হয়, ঘরটা ব্যবহারও করা হয়।

    বুলেট ও বজ্রকে দুখানা চেয়ারে বসিয়ে গুরুমশাই পাঠশালার সর্দার পোড়োকে ডেকে বললেন, “হারান, বাবুদের জন্যে ডাব পেড়ে নিয়ে এস।”

    বুলেট বললে, “আবার ডাব কেন?”

    গুরুমশাই বললেন, “শুধু ডাব দিয়েই আজ এই রায়বাড়ির অতিথি সৎকার করছি। ‘একদিন কত সাহেব, কত জজ ম্যাজিস্ট্রট এই বাড়িতে এই ঘরে বসে পোলাউ কালিয়া খেয়ে গেছেন। হুঃ! সে রামও নেই, সে অযোধ্যাও নেই! যাক সে কথা—আপনাদের আগমন কি জন্যে?”

    বুলেট বললে, “আমার এক আত্মীয় শহরের বাস ছেড়ে এমনি কোন পল্লীতে এসে একটা বাগানবাড়ি করে বাস করতে চান। আমরা তাঁর জন্যে জমির সন্ধান করছি। রায়বাবুদের কোন উপযুক্ত জমি থাকে তো উচিত দামে তিনি কিনতে পারেন।”

    গুরুমশাই বললেন, “বাবুদের এ গ্রামের সব জমিই দেবত্র সম্পত্তির মধ্যে—বিক্রি হবে না। তবে বড় রাস্তার ধারে কিছু খাস জমি আছে। তা বাবুরা বিক্রি করবেন কিনা, দাদা বলতে পারেন। বাবুরা নিজেরা কিছু দেখেন না, থাকেন কলকাতায়। দাদা সবই দেখেন। কিন্তু তিনি তো আজ এখানে নেই, গেছেন বাবুদের সুন্দর-বনের মহলে।”

    বুলেট জিজ্ঞাসা করলে, “কবে নাগাত ফিরবেন?”

    চিন্তিত কণ্ঠে গুরুমশাই বললেন, “দাদা যে কবে ফিরবেন, সেইটে বলাই তো আজ এক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর জন্যে বিষম ভাবনায় পড়েছি। তিনি এবার প্রায় দু হপ্তা হলো বাবুদের সুন্দরবন মহলে গেছেন। কিন্তু আজও ফিরে এলেন না বা কোন খবরও পাঠালেন না। এমন কখনও হয় নি। দাদা মহলে গেলে চার-পাঁচ দিনের বেশী কখনো থাকেন না। বেশী বারও যান না সেখানে। বছরে মাত্র দুবার—একবার পোষ মাসে আর একবার চৈত্র মাসে। তবে এবার কর্তাবাবুর আদেশ হয়েছে, তাদের আদি বাড়ির ভাঙা মন্দিরটাকে সংস্কার করার। তাই এবছর সেখানে প্রায়ই যেতে হচ্ছে।”

    বুলেট সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলে, “বাবুদের আদি বাড়ি? সে আবার কোথায়?”

    গুরুমশাই বললেন, “রায়বাবুদের আদি দেশ এটা নয়। আদি দেশ এককালে যেখানে ছিল, তা এখন সুন্দরবনের পাশে বললেই হয়।

    বুলেট বললে, শুনেছি, এই রায়বাবুরা খুব প্রাচীন বনেদী বংশ। এঁদের আদি বাস ছিল তাহলে সুন্দরবনের কাছাকাছি? তারপর সেখান থেকে এঁরা এইখানে উঠে আসেন। তারপর বাংলাদেশের সব জমিদার পরিবারের যা হয়, এঁদেরও তাই হয়েছে। এখন তাঁরা কলকাতার বাসিন্দা। কেমন কিনা?”

    গুরুমশাই বললেন, “ঠিকই বলেছেন।”

    বুলেট বললে, “তবে এ গ্রামটা তো কলকাতার কাছেই। এরকম জায়গায় বহু জমিদার আজও থাকেন। কিন্তু আপনাদের বাবুরা এমন বাড়িঘর ছেড়ে কলকাতায় থাকেন কেন? তাদের তো শহরে গিয়ে টাকা রোজগার করতে হয় না?”

    গুরুমশাই বললেন, “না। এদের বংশের কাউকে এখনো চাকরি করতে হয় নি। আর আছেই বা কে? এঁদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণ বলতে গেলে এক বিরাট ইতিহাস বলতে হয়।”

    উৎসাহের সঙ্গে বুলেট বললে, “বলুন না। আমরা দেশবিদেশের অতীত যুগের রাজারাজড়াদের ইতিহাস মুখস্থ করি, কিন্তু ঘরের পাশের এইসব প্রাচীন বনেদী বংশের কথা কিছুই জানি নে। এ বংশের ইতিহাস কিছু বলেন তো অনেক কথাই হয়তো জানতে পারবো।”

    সর্দার পোড়ে। হারান এসে তিনটে ডাব কেটে দিয়ে গেল। ডাব খাওয়া শেষ হলো। গুরুমশাই কলকেতে তামাক সাজতে বসলেন।

    সবাই চুপ। হুকো টানতে টানতে গুরুমশাই বললেন, “রায়বংশের ইতিহাস আমি যে খুব বেশী জানি, তা নয়। তবে ঠাকুরদার কাছ থেকে যা শুনেছি, তাই বলতে পারি।”

    বুলেট ও বজ্র সমস্বরে বললে, “তা-ই বলুন ।”

    গুরুমশাই বলতে আরম্ভ করলেন, “বাবুদের আদি দেশ ছিল সুন্দরবনের কাছাকাছি। বাবুদের প্রাচীন বাড়ির ধ্বংসাবশেষ এখনো সেখানে দেখা যায়, এখন জঙ্গলে ভরা। বাংলাদেশে যখন নীলকুঠির সাহেবদের খুব অত্যাচার চলছিল, তখন এই বাবুদের এক পূর্বপুরুষের সঙ্গে কুঠিয়াল সাহেবদের খুব গোলমাল-লড়াই-দাঙ্গা হয়। বাবুদের বংশের সবাই সে সময় মারা যান। একটি মাত্র ছেলে কোনমতে বেঁচে যায়। নীলকুঠির সাহেবব। সেই ছেলেটাকে পেলে হত্যা করবে, এই আশঙ্কা করে আমার এক পূর্বপুরুষ তাকে নিয়ে অতি গোপনে রাতারাতি এই গ্রামে এসে ওঠেন, সঙ্গে কিছু টাকাও আনেন। আমার সেই পূর্বপুরুষ এঁদের সরকারে কাজ করতেন। তিনি ছিলেন খুব প্রভুভক্ত ও বিচক্ষণ ব্যক্তি। শুনেছি, তাঁর চেষ্টায় ও বুদ্ধিবলে সেই ছেলেটি বড় হয়ে এই অঞ্চলের জমিদার হন। আর তাঁরই দক্ষতায় এঁদের সুন্দরবনের সম্পত্তিও উদ্ধার পায়। এই বংশের সকলের কথা আমি জানি নে, তবে এই বংশের বর্তমান থেকে তিন পুরুষ আগে যিনি কর্তা ছিলেন, তাঁর নাম জানি। তাঁর নাম ছিল হরিনারায়ণ রায়। তাঁর ছিল তিন ছেলে—দ্বিজেন্দ্র, ধীরেন্দ্র আর শৈলেন্দ্র। এই তিনজনের মধ্যে এক শৈলেনবাবু এখন জীবিত আছেন। তিনি সংসারত্যাগী সাধু। অনেক বয়স হয়েছে। এতকাল তীর্থে তীর্থে ভ্রমণ করতেন। বর্তমানে গুরুর আদেশে বর্ধমান জেলার বরাকরে একটা আশ্রম স্থাপন করছেন। তিনিই এই বংশে বর্তমানে সকলেব চেয়ে বয়সে বড়। তাই তিনি সেবায়েত ও দেবত্র সম্পত্তিরও কর্তা। কিন্তু কোন দিনই বিষয় আসয় নিজে কিছু দেখেন না। দাদাই সব দেখেন। দাদাব সঙ্গে এ বিষয়ে তাঁর আলাপ-আলোচনা হয় চিঠিপত্রে।”

    বুলেট জিজ্ঞাসা করলে, “শৈলেনবাবু মাঝে মাঝে এখানে বা কলকাতায় আসেন তো?

    গুরুমশাই বললেন, “না। তিনি আজ উনিশ-কুড়ি বছর এখানে বা কলকাতায় আসেন নি। তবে মেজবাবুর ছেলে বিলেত থেকে ফিরলে একবার তিনি কলকাতায় আসতে পারেন। মেজবাবুর ছেলেকে শৈলেনবাবু দেবত্র সম্পত্তির ভার ও নিজের যা আছে সবই দেবেন, স্থির করেছেন। তাছাড়া এই বংশে আর আছেই বা কে? নিজে তিনি বিয়ে থা করেন নি। মেজবাবুর ঐ ছেলেই একমাত্র বংশধর। ছেলেটিকে আমি দেখি নি বহুদিন। দাদা বলেন, ছেলেটি একেবারে হীরের টুকরো—ডাক্তারী পড়তে বিলেতে গেছে। এই সময় ফিরে আসার কথা। হয়তো ফিরেছেও।”

    বুলেট জিজ্ঞাসা করলে, “আপনি ঠিক জানেন, শৈলেনবাবু আর বিলেতে-পড়া ছেলেটি ছাড়া এই বংশের আর কেউ কোথাও নেই?”

    একটু ভেবে গুরুমশাই বললেন, “আর একজন ছিল—এই বংশেরই ছেলে। সে বেঁচে আছে কি মরে গেছে, কেউ বলতে পারে না। সে হলো শৈলেনবাবুর বড়দাদার ছেলে। তার নাম ছিল সুরেন। ডাক নাম মন্টু। কখনো শুনি, সুরেন সাধু হয়েছে। আবার কখনো শুনি, চুরি না ডাকাতি করে সে জেলে গেছে। সুরেনই হলো এই বংশের একমাত্র কুলাঙ্গার।

    বুলেট জিজ্ঞাসা করলে, “সুরেন যদি এখন বেঁচে থাকে, তাহলে তার বয়স কত হতে পারে, বলতে পারেন?”

    মনে মনে একটা হিসাব করে গুরুমশাই বললেন, “সুরেনের বয়স আমার চেয়ে বছর আট-দশ কম। তাহলে বর্তমানে তার বয়স হবে চল্লিশ-বিয়াল্লিশ।”

    বুলেট আবার জিজ্ঞাসা করলে, “সুরেনকে দেখতে কেমন, গুরুমশাই?”

    বুলেটের প্রশ্ন করার ধরন দেখে গুরুমশাই একটু অবাক হলেন। পরক্ষণে, এটা ছোকরা বয়সের কৌতূহল ধরে নিয়ে, মৃদু হেসে বললেন, “সুরেনকে বহুদিন দেখি নি। দেখেছি প্রায় কুড়ি-বাইশ বছর আগে। তা ওর স্বভাবচরিত্র যাই হোক, চেহারাটা এই বংশের অন্য সকলেরই মতো অর্থাৎ বেশ সুপুরুষই হবে। এই সুরেনের জন্যেই এই জমিদার বংশ দেশত্যাগী হয়েছিল।”

    বিস্মিত হয়ে বুলেট বললে, “বলেন কি? ওর জন্যে জমিদার বংশ দেশত্যাগী হলো?”

    গুরুমশাই বললেন, “হাঁ। ওর জন্যেই এই জমিদার বংশের মুখে চুনকালি পড়েছিল। সে কাহিনীও বলি—বড় কর্তা অর্থাৎ সুরেনের বাবা দ্বিজেনবাবু মারা যাবার পর সুরেনের হাতে বহু টাকা পড়ে। অর্থ ই অনর্থের মূল। অল্প বয়সে হাতে টাকা পড়লে অনেকের যা হয়, সুরেনেরও তাই হলো। ওর মতিগতি খারাপ হতে বেশী সময় লাগলো না। ইতিমধ্যে ওর মাও মারা গেলেন। তখন আর দেখে কে! বহু বন্ধুবান্ধব ওর জুটলো—যত হতভাগার দল। ফলে, সুরেনের টাকা ফুরোতে বেশী দেরি হলো না। কিন্তু ওর বন্ধুরা তখনও ওকে ছাড়লে না। সমানে টাকা উড়োতে লাগলো। কিছুদিন পরে জানা গেল, সুরেন কাজীপুরের শেখদের কাছে তার যথাসর্বস্ব মায় ভিটা-ভদ্রাসন পর্যন্ত বাঁধা দিয়ে টাকা নিয়েছে। তারা কোর্ট থেকে ডিগ্রি করেছে। মেজবাবু জানতে পেরে বহু টাকা গুনাগারি দিয়ে সেই সব সম্পত্তি রক্ষা করে নিজের নামে লিখে নেন। সুরেনের নামে কোন সম্পত্তি থাকলে ও আবার এই রকম করবে, তাই মেজবাবু এই ব্যবস্থা করেছিলেন। যাই হোক, এর পরও সুরেনকে তিনি মাসে মাসে কিছু হাতখরচ দিতেন। বাড়ির ছেলের মতোই তাকে রেখেছিলেন। সুরেন বন্ধুবান্ধব নিয়ে বার মহলেই থাকতো। মাঝে মাঝে কোথায় চলে যেত। আবার দু-চার দিন বাদে ফিরে এসে বন্ধুদের নিয়ে গান-বাজনা আমোদ-ফূর্তিতে খুব খরচ-খরচা করতো। কোথা থেকে সে এত টাকা পেত, কেউ ভেবে পেত না। তারপর একদিন সকাল বেলায় দেখা গেল, পুলিসের দল বাড়ি ঘেরাও করেছে। তারা ওয়ারেন্টের বলে বাড়ি খানাতল্লাশী করলে। সুরেনের ঘর থেকে বহু সোনার গহনা বের হলো। পুলিস ইন্সপেক্টার সুরেনের কোমরে দড়ি বেঁধে এই গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে গেল। ওরা ছিল কলকাতার পুলিস। মেজবাবুকে কোন খাতির করলে না, তাঁর অনুরোধও শুনলে না। মেজবাবু চেষ্টা করেছিলেন, পুলিস যাতে সুরেনকে সকলের সামনে কোমরে দড়ি বেঁধে না নিয়ে যায়। কিন্তু তাঁর সে অনুরোধ ব্যর্থ হলো। অপমানে দুঃখে মেজবাবু এক হপ্তার মধ্যে সপরিবারে দেশত্যাগী হলেন।”

    বুলেট ও বজ্র গুরুমশাইয়ের কথা মন দিয়ে শুনছিল। হঠাৎ একটা লোক গুরুমশাইয়ের সামনে এসে দাঁড়াতেই গুরুমশাই উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, “কি হরিদাস! দাদার কোন খবর পেলে?”

    হতাশ কণ্ঠে হরিদাস বললে, “না। কোন খবরই পাওয়া গেল না। মীরবহরপুরের কাছারিতে গিয়ে, তশীলদারবাবুর কাছে শুনলুম যে, তিনি ওখানে তেশরা তারিখে গিয়ে দুদিন থেকে চলে গেছেন। তারপর তাঁর কোন খবরই তশীলদার জানে না।”

    গুরুমশাইয়ের চোখমুখ কালো হয়ে উঠলো। বিষম বিপন্ন কণ্ঠে বললেন, “তাহলে দাদা গেলেন কোথায়? তেশরা তারিখে দাদা মহলে গিয়ে ছদিন থেকে চলে আসেন, অর্থাৎ তিনি পাঁচুই ওখান থেকে রওনা হন। আসতে ধর দুদিন, তাহলে সাতুই তাঁর এখানে ফিরে আসার কথা। কিন্তু আজ তো উনিশে হল। তিনি তো ওদিকে কোথাও থাকেন না, এক কাকদ্বীপে ছাড়া। তাও যেতে আসতে দু-এক ঘণ্টার জন্যে বিশ্রাম করেন সেখানে। আচ্ছা হরিদাস, তুমি কি কাকদ্বীপ হাটের বনমালী হালদারের ওখানে খবর নিয়েছিলে?”

    হরিদাস বললে, “হ্যাঁ, তাও নিয়েছিলুম। বনমালী বললে, নায়েব মশাই মহলে যাবার সময় ওদের দোকানে থেকে খাওয়াদাওয়া করেছিলেন। কিন্তু তারপরের কোন খবর সে জানে না।”

    গুরুমশাই বললেন, “দাদা মহল থেকে ফেরবার সময়ও বনমালীর ওখানে হয়ে আসেন। বনমালী দাদার বিশেষ বন্ধু। …তাই তো মহা ভাবনার কথা হল। আচ্ছা হরিদাস, তুমি মহলে গিয়ে কি দেখলে—বাবুদের মন্দিরটা কি পরিষ্কার হয়েছে?”

    হরিদাস জানালে, “শুধু ভিতরটা খুলতে বাকী। আর সব পরিষ্কার করা হয়েছে। তশীলদারমশাই লোক খাটাচ্ছে। দুজন হিন্দুস্থানী লোক আর একজন সাধুকে দেখলুম কাছারিতে।”

    বুলেট ও বজ্র হরিদাসের কথা শুনছিল। বুলেট জিজ্ঞাসা করলে, “একজন সাধুকে সেখানে দেখেছেন? আচ্ছা, সাধুটি দেখতে কেমন?”

    অল্পবয়স্ক অপরিচিত প্রশ্নকর্তার দিকে একটু তাকিয়ে থেকে হরিদাস বললে, “সাধুদের সাধারণত যেমন দেখতে হয়, সেই রকমই। পরনে গেরুয়া আলখাল্লা, মাথায় বড় বড় চুল, মুখে দাঁড়ি গোঁফ, গায়ের রং বেশ ফরসা। তবে চোখে নীল চশমা। শুনলুম, সাধুটি ঐ অঞ্চলের গরীব দুঃখীদের বিনামূল্যে হোমিওপ্যাথি ওষুধ দেন।”

    বুলেট ও বজ্রের চোখে চোখে কি যেন কথা হলো। গুরুমশাই কিন্তু সাধুটির সম্পর্কে কোন আগ্রহই দেখালেন না। বুলেটকে বললেন, “ওরকম অনেক সাধুসন্ন্যাসী বা চকদার-লাটদার বাবুদের কাছারিতে এসে মাঝে মাঝে দু-চার দিনের জন্যে থেকে যায়। কিন্তু দাদার কি হল? ব্যাপারটা মোটেই সহজ মনে হচ্ছে না। বাড়িতে সবাই খুব ভাবছে। কি খবরই বা তাদের দেব?”

    করে গেছেন। তাঁর চোখে-একটু পরে বুলেটদের দিকে “আপনারা তো শহরের লোক, এখন কি করি বলুন তো? পুলিসে

    সবাই নির্বাক। গুরুমশাইও চুপ মুখে উদ্বেগ-দুশ্চিন্তার ছাপ পরিস্ফুট। তাকিয়ে অসহায় কণ্ঠে তিনি বললেন, সব কথাও তো শুনলেন, জানাব?”

    বুলেট উত্তর দিলে, “নিশ্চয়ই। আর আপনি একবার নিজে সেখানে যান। একলা যাবেন না—সঙ্গে দু-একজনকে নিয়ে যাবেন।”

    গুরুমশাই বললেন, “ঠিকই বলেছেন। আমি কাল সকালেই রওনা হব। আর আজ রাত্রেই হাজীপুর থানায় জানিয়ে আসবো।”

    বজ্র জিজ্ঞাসা করলে, “আচ্ছা, আপনার দাদার বা এই জমিদারদের কোন বিপক্ষ বা শত্রু আছে কি?”

    গুরুমশাই বললেন, “না। তাহলে তো কথা ছিল না দাদার সে রকম কোন শত্রু থাকতেই পারে না। দাদা অতি সৎ ও সজ্জন। আর জমিদারদেরই বা শত্রু বা বিপক্ষ থাকবে কে? তাঁরা দেশেও থাকেন না বা জমিদারীও নিজেরা দেখেন না।”

    বুলেট জিজ্ঞাসা করলে, “ওখানকার তশীলদার লোকটা কেমন?” গুরুমশাই বললেন, “লোকটা শুনেছি তেমন ভালো নয়, একটু হাতটান আছে। তবে সে দাদার সঙ্গে কোন শত্রুতা করবে না – দাদাই তাকে চাকরি দিয়েছিলেন, আর সে এদিককারই লোক।”

    বুলেট আবার জিজ্ঞাসা করলে, “লোকটার বাড়ি কোথায়? ওর নাম কি?”

    গুরুমশাই বললেন, “তার নাম হাবু নস্কর, পৈলানে বাড়ি।”

    বুলেট দু-চার সেকেণ্ড কি যেন ভাবলে তারপর আবার গুরুমশাইকে জিজ্ঞাসা করলে, “আচ্ছা, কি জন্যে শৈলেনবাবু ভাঙা মন্দিরটা পরিষ্কার করাচ্ছেন, বলতে পারেন?”

    গুরুমশাই উত্তর দিলেন, “তার কারণ দাদার কাছে শুনেছি। ওই মন্দিরের ভিতের মধ্যে কি একটা জিনিস আছে, সে জিনিসটা জমিদারদের বংশের নয়,—এঁদের পূর্বপুরুষদের একজনের কাছে বহু কাল আগে কে যেন রেখেছিল গচ্ছিত সম্পত্তি হিসাবে। শৈলেন-বাবু কি এক দরকারে জমিদারীর পুরনো কাগজপত্র ঘাটতে ঘাটতে ঐ কথা জানতে পেরে, দাদাকে লেখেন ভাঙা মন্দিরের ইটপাথর পরিষ্কার করে সেই জিনিসটা উদ্ধার করতে। জিনিসটা যে কি, শ আমি জানি না। দাদাও জানেন না। ইদানিং দাদার সঙ্গে শৈলেনবাবু এই বিষয়ে প্রায়ই পত্রালাপ করছেন। দাদা এবার মহলে যাবার পরও তাঁর একটা চিঠি দাদার নামে এসেছে। এইখানেই সেটা রয়েছে, সেটা দেখলে বোধহয় বুঝতে পারবেন।”

    গুরুমশাই একটা খোলা খাম বুলেটের হাতে দিলেন। বুলেট ও বজ্র চিঠিখানা পড়তে লাগলো।

    “কল্যাণীয়েষু,

    শ্রীচরণ, মন্দিরের কাজটা কত দূর হলো? যত শীঘ্র পার, জিনিসটা উদ্ধার করবে। ঐ জিনিসটা আমাদের কোন পূর্বপুরুষের কাছে যিনি গচ্ছিত রেখেছিলেন, তাঁর বর্তমান বংশধরকে প্রত্যর্পণ করা আর বীরেনকে সব সম্পত্তি বুঝিয়ে দেওয়া, এই দুটি সাংসারিক কর্তব্য এখনও আমার আছে। এসব সাংসারিক কাজে আমার অন্তর আর থাকতে চাইছে না। ডাক এসেছে। তার আগে পাথেয় কিছু সঞ্চয় করতে ইচ্ছা করি। তুমি যত শীঘ্র পার আমাকে এই দায়িত্ব ছুটি থেকে মুক্তির ব্যবস্থা কর। বীরেন বিদেশ থেকে কৃতী হয়ে ফিরে আমাকে পত্র দিয়েছে। আমি মধ্যে নানা স্থানে ভ্রমণ করছিলাম, তাই ওকে এখানে আসতে নিষেধ করেছিলাম। এইবার থেকে বরাকরে থাকবো। ওকে আসতে লিখেছি। দু-এক দিনের মধ্যে ও আমার কাছে আসবে। বীরেনকে জমিদারীর কাগজপত্র দেওয়া ও ঐ সব বুঝিয়ে দেওয়ার ভার তোমার উপর। আমার অবসর খুবই কম—এখানে আশ্রম তৈরির কাজে প্রায় সর্বদাই ব্যস্ত থাকতে হয়। অত্র পত্রে তোমাকে একটি খুব আনন্দের সংবাদ জানাচ্ছি—হঠাৎ মন্টুকে ফিরে পেয়েছি। তার জীবনে মহা পরিবর্তন ঘটেছে—সত্যই সে আজ অতি সৎ ও সাধু প্রকৃতির মানুষে রূপান্তরিত হয়েছে। তীর্থে তীর্থে সে সাধুসঙ্গ করে বেড়ায়। ইদানীং আমাদের আশ্রমে মধ্যে মধ্যে আসে, দু-চার দিন করে থাকে। এটা আমাদের বংশের উপর শ্রীভগবানের অসীম করুণা বলে মনে করি। আর এক কথা, আমার হিসাব থেকে খড়দার শ্রীবিষ্ণুপ্রিয়। আশ্রমের শ্রীধর বাবাজী মহাশয়কে ৫০ টাকা সাহায্য পাঠিও।

    স্নেহাশিস সহ
    শ্রীশৈলেন্দ্রনারায়ণ রায়
    বরাকর
    ১৩ই মাঘ ১৩৬২

    চিঠি পড়া শেষ হলে বুলেট ও বজ্র যাবার জন্যে উঠলো। বুলেট বললে, “গুরুমশাই, আজ আমরা আপনার বড় চিন্তার দিনে এসে অনেক বিরক্ত করে গেলুম, কিছু মনে করবেন না। আপনাকে বড় ভালো লেগেছে আমাদের। আপনার আত্মীয়ের মতো মিষ্টি মধুর ব্যবহার কোন দিন ভুলতে পারবো না। আবার হয়তো আপনার কাছে আসবো। এখন যাই।”

    গ্রামের পথ ছেড়ে বুলেট ও বজ্র সাইকেলে করে যখন ডায়মণ্ড হারবার রোডে এসে উঠলো তখন বিকাল হয়েছে।

    বিরাট বিরাট ফাঁকা মাঠ। তার মাঝখান দিয়ে চলে গেছে পীচঢালা সোজা রাস্তা—ডায়মণ্ড হারবার রোড। বিকাল বেলার দক্ষিণে হাওয়া বইছে হু হু করে, বুলেট ও বজ্রের সাইকেল চালাতে খুবই সুবিধা।

    চলতে চলতে বজ্র জিজ্ঞাসা করলে, “আজ আমাদের যাত্রার কি রকম ফল হলো মনে হয়?”

    বুলেট বললে, “খুবই ভালো। এখন আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে ঐ সাধুটির সন্ধান নেওয়া।”

    বজ্র বললে, “এই সাধুটি কে? বীরেনদার কাক। শৈলেনবাবু যে নন তা নিশ্চিত। তাহলে সাধুটি কে?”

    বুলেট বললে, “সুন্দরবনে বীরেনদাদের জমিদারীতে একবার যেতে হবে। সাধুটি বোধহয় সেখানেই আছেন। গুরুমশাইয়ের লোক হরিদাস সাধুটির যে বর্ণনা দিলে, তার বর্ণনার সঙ্গে বীরেনদার অপহরণকারী সাধুটির বেশ মিল আছে, মনে হলো। আমার ধারণা, এই দু জায়গার সাধু একই লোক।”

    বজ্র বললে, “আমারও তাই মনে হয়। কিন্তু কে এই সাধুটি? একবার মনে হয়েছিল, বোধহয় সুরেন। কিন্তু শৈলেনবাবুর চিঠি পড়ে সে সন্দেহ কেটে গেছে। শৈলেনবাবুই লিখছেন, সুরেনের জীবনের ধারা একদম পালটে গেছে।”

    বুলেট বললে, “আমাদের একবার সুন্দরবনে আর একবার বরাকরে শৈলেনবাবুর আশ্রমে যেতে হবে। আমার মনে হয়, শৈলেনবাবুর কাছ থেকে বা অন্য কোন ভাবে কেউ জানতে পেরেছে যে, ওদের আদি বাড়ির মন্দিরের তলায় একটা মূল্যবান জিনিস আছে আর এখন সেটা উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। সেই লোকটি অর্থাৎ যে ঐ গুপ্ত জিনিসের খবর পেয়েছে, সে নিজে ঐ সব হাত করার মতলবে বীরেনদাকে গুম করেছে। গুরুমশাইয়ের দাদা নায়েবমশাইয়ের কি হলো, কোথায় গেলেন তিনি, সেটাও ভাববার বিষয়।”

    ডায়মণ্ড হারবার রোড ধরে উত্তর দিকে ঘণ্টা দুই সাইকেল চালাবার পর বুলেট ও বজ্র পৈলান বলে একটি গ্রামের দক্ষিণ সীমানায় এসে পৌঁছলো।

    বুলেট জিজ্ঞাসা করলে বজ্রকে, “পৈলান জায়গাটার নাম মনে পড়ছে?”

    বজ্র উত্তর দিলে, “হু, এইখানেই সেই তশীলদার হাবু নস্করের বাড়ি।”

    সাইকেলের গতি কমিয়ে বুলেট বললে, “চল আজই সেই হাবু নঙ্করের সন্ধান নিয়ে যাই।”

    বজ্র বললে, “সে তো মহলে।”

    বুলেট উত্তর দিলে, “সেইজন্যেই তো যাচ্ছি। এইসময়েই তার সন্ধান নেবার সুবিধা হবে।”

    পৈলানে আজ হাটবার।

    ছোটখাটো সুন্দর হাট। হাটের মধ্যে বহু ব্যাপারী চাল বিক্রি করছে। প্রায় তিন দিকে সারি সারি স্থায়ী দোকান।

    বুলেট ও বজ একটা ময়রার দোকানে ঢুকে খাবাবের অর্ডাব দিলে।

    খাবার খেতে খেতে চিন্তান্বিত কণ্ঠে বুলেট বজ্রকে বললে, “এখন তাহলে কি করা যায় বলো তো? ব্যাপারীটাকে তো দেখছি না। আজ হাটে আসে নি বোধহয়।”

    বুলেটের মুখের দিকে চেয়ে বজ্র উত্তর দিলে, “তাই তো মনে হচ্ছে।” দোকানীকে উদ্দেশ করে বুলেট বললে, “আপনি কি এইখানের বাসিন্দা?”

    দোকানদার উত্তর দিলে, “হ্যাঁ, কেন বলুন তো?”

    বুলেট বললে, “দেবেন নস্করের বাড়িটা কোথায় বলতে পারেন?”

    বজ্র কি বলতে যাচ্ছিল, বুলেট তাকে আঙুলের টিপ মারতেই সে থেমে গেল।

    দোকানী একটু ভেবে বললে, “দেবেন নস্কর! ও নামে তো কেউ নেই এ গ্রামে। কি করে লোকটা?”

    বুলেট উত্তর দিলে, “এই হাটে চাল বিক্রি করে। গেল হপ্তায় হাটে আমি চাল কিনতে এসেছিলুম। সে আমাকে এক মণ পুরনো চাল দেবে বলে পাঁচ টাকা আগাম নিয়েছে।”

    দোকানী বললে, “হেটো ব্যাপারীকে আগাম টাকা দিতে গেলেন কেন? হাটে ওদের কারো কোন স্থায়ী জায়গা নেই। ওদের বেশীর

    ভাগই দূর দূর গ্রাম থেকে হাটের দিন এখানে আসে। কে কোন্ গ্রাম থেকে আসে তার ঠিক নেই, বেচাকেনা করে চলে যায়। আচ্ছা, সে কি বলেছিল, এই পৈলান গ্রামেই তার বাড়ি?”

    বুলেট উত্তর দিলে, পৈলানে কে হাবু নস্কর আছে, তার কাছে সে চাল রেখে দেবে বলেছিল।

    দোকানী বললে, “হাবু নস্করকে জানি। হাটের পূব দিকে যে সরু রাস্তাটা গেছে, ঐ রাস্তা ধরে কিছু দূর গেলে একটা বাঁশের সাঁকো আছে; সাঁকোর ওপারে হাবু নস্করের বাড়ি। আমার বাড়িও প্রায় ঐখানে। কিন্তু হাবুদা তো বাড়ি নেই। সে প্রায় সব সময়েই বিদেশে থাকে। গেল হপ্তায় বাড়ি এসেছিল। বাড়িতে খুব ঘটা করে হরিলুট দিলে। কোন্ এক জমিদারের নায়েব হয়েছে সেই জন্যে।।

    আমরা তার বাড়িতে প্রসাদ পেতে গিয়েছিলুম। কলকাতা থেকে দুজন হিন্দুস্থানী এসেছিল। তারা ‘রাম গান’ করলে। তার পর দিন জমিদারের মোটর গাড়ি করে হাবুদা মহলে গেছে। আজো বাড়ি ফেরে নি জানি।”

    এক নিঃশ্বাসে কথাগুলি শেষ করে দোকানী অন্য দিকে চলে গেল। দোকানে কয়েকজন খরিদ্দার ঢুকেছে।

    দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বুলেট বললে, “তাহলে টাকা পাঁচটা বোধহয় গেল।”

    বুলেট ও বজ্র উঠে পড়লো।

    … … …

    ক্রীং ক্রীং–ক্রীং—

    রাত প্রায় সাড়ে সাতটা। বাইরের ঘরে চেয়ারে বসে বুলেট পড়ছে। ফোন বেজে উঠলো। বুলেট রিসিভার তুলে জিজ্ঞাসা করলে, “কে?…হাঁ আমি বুলেট…ওঃ পোনা? এসেছে…এক্ষনি যাচ্ছি…তুমি কারখানায় ফিরে যাও… আমাদের ওখানে পৌঁছবার আগেই ও যদি বেরিয়ে যায় তো, পিছু নেবে…ট্যাক্সি করবে… ভাড়া আমি দেবো…জগুবাবুর বাজারের সামনে আমাকে পাবে…যাচ্ছি।”

    বুলেট রিসিভার রেখে দিয়ে আবার তুললে বজ্র আর বোমাকে খবর দেবার জন্যে। তাদের দুজনের আজ শক্তিসংঘের হরিজন নাইট স্কুলে পড়াবার ডিউটি। বুলেট সেখানে ওদের ফোন করলে।

    পনের মিনিটও দেরি হল না, বুলেট, বজ্র ও বোমা জগুবাবুর বাজারের সামনে এসে ট্যাক্সি থেকে নামতেই বুলেটের সঙ্গে পোনার চোখাচোখি হলো। বুলেট ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে বজ্র ও বোমাকে নীচু গলায় কি বলতে তারা চলে গেল।

    পোনাকে নিয়ে বুলেট একটা ফাঁকা জায়গায় এসে দাঁড়ালো। চারদিক দেখে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, “কি খবর? সাধু এসেছে? এখনি চলে যাবে নাকি?”

    পোনা আস্তে উত্তর দিলে, “না। এখন যাবে না। তবে ওরা সবাই খুব ভোরে পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটা নাগাত সাধুর সঙ্গে কোথাও যাবে—খুব দূর দেশে মনে হচ্ছে। তাই পরামর্শ করছে। আমাকে সাধুর মোটরে ছ টিন পেট্রোল রাখতে বলেছে। আমি রেখে দিয়ে এসেই আপনাকে ফোন করেছি। গাড়িখানা কারখানার সামনে আছে চাবুরলাট গাড়ি, নম্বর বি. এল. বি. ৬৪৬৪, ছাদ খোলা। দেখতে চান তো দেখুন গিয়ে। বোধহয় বর্ধমানের নম্বর।”

    বুলেট বললে, “সে হবে’খন। সাধু তোমাদের কারখানায় আছে তো?”

    পোনা বললে, “আছে। আরও অনেকে আছে। খুব পরামর্শ হচ্ছে। তাই আমায় ছুটি দিলে।”

    বুলেট বললে, “তুমি বেশীক্ষণ এদিকে থেক না। যাও। আমি ঐ দিকেই যাচ্ছি।”

    বুলেট ও পোনা দুজন দুদিকে চলে গেল।

    আগলু মাহাতো কোম্পানীর কারখানার একটা দরজা গলির মধ্যে কারখানার সব দরজার ঝাঁপ ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। কারখানার মধ্যে একটা কম-পাওয়ারের আলো জ্বলছে। ভিতরে তক্তপোশের উপর চারজন লোক গভীর পরামর্শ করছে খুব সংগোপনে।

    তক্তপোশের ঠিক মাঝখানে বসেছে সাধু, তার পাশে আগলু। এদের দুজনের সামনে বসে আছে একজন হিন্দুস্থানী আর একজন বাঙালী। বাঙালীটি প্রৌঢ় লম্বা—পাতলা চেহারা, পরনে গলা-আটা ছিটের কোট আর আধ ময়লা ধুতি চাদর।

    সাধু আগলুকে কি বলতে সে ক্যাশবাক্স থেকে খানকয়েক নোট বের করে লম্ব। লোকটিকে দিলে।

    সাধু বললে, “নায়েব মশাই, এখন এই নিয়ে যান। এক্ষনি বেরিয়ে পড়ুন। মোমিনপুর পর্যন্ত ট্যাক্সি করে যাবেন। তা না হলে ডায়মণ্ড হারবারের বাস পাবেন না। ভোরের প্রথম বাসেই কাকদ্বীপে যাবেন। কালই মহলে পৌঁছনো চাই। আপনি ওখানে গেলে, তবে লছমন আসবে। আমরা ভোর ছটার মধ্যে যাত্রা করবো। এই সোমবারের পরের সোমবার আপনার সঙ্গে দেখা হবে। যা যা বলেছি, সবই ইতিমধ্যে ঠিক করে রাখবেন।”

    নায়েব মশাই সাধুকে জিজ্ঞাসা করলে, “আপনি কি এঁদের সঙ্গেই ফিরবেন?”

    সাধু বললে, “বলতে পারছি নে। আট-দশ দিন দেরিও হতে পারে।”

    নায়েব মশাই চলে গেল। ওরাও ক’জন উঠে পড়লো। বোধহয় সবাই এখন আগলুর বাড়িতে যাবে। আগলুর বাড়ি কারখানার সামনেই।

    বুলেট এতক্ষণ কারখানার পাশে একটা অন্ধকার জায়গায় আত্ম-গোপন করে ওদের আলোচনা শুনছিল। সবটা না শুনতে পেলেও কিছু কিছু শুনেছে।

    কারখানা বন্ধ করে আগলুরা বের হবার আগেই বজ্র ও বোমাকে ডেকে নিয়ে বুলেট পদ্মপুকুর রোড ধরে চলতে শুরু করে।

    সব শুনে বজ্র বললে, “এই সেই নায়েব মশাই! গুরুমশাইয়ের দাদা! এই হীন ষড়যন্ত্রের একজন! অথচ গুরুমশাই বলেছিল, তার দাদা অতি সৎ লোক—খুব বিশ্বাসী। এই জমিদার বংশের ওরা নুন খেয়ে আসছে বংশপরম্পরায়। ওঃ লোক চেনা ভার!”

    বুলেট বললে, “এখনি কিছু ধারণা করা ঠিক হবে না। এই নায়েব মশাই গুরুমশাইয়ের দাদা নাও হতে পারে। বীরেনদার জমিদারীতে অন্য নায়েবও তো থাকতে পারে। যাই হোক, এখন সে কথা ভাববার সময় নেই। এক্ষনি আমাদের অর্থাৎ আমি, তুমি, বোমা আর বাঘ, এই চারজনকে প্রস্তুত হতে হবে। আমি আত্মরক্ষার ও ছদ্মবেশের এবং আর যা যা জিনিস দরকার হতে পারে, সে সবেরই ভার নিচ্ছি। বোমা, তোমার গাড়ি আর পেট্রোল যতটা পার, ঠিক করে রাখবে। সবাই মনে রেখ, ভোর পাঁচটার সময় আমাদের বাড়ি থেকে সবাই রওনা হবো। সাধুদের গাড়ি ছাড়বে সকাল ছটা নাগাত। কারখানা থেকেই ওরা যাত্রা করবে। আমরা আগে গিয়ে ওদের গাড়ি থেকে কিছু দূরে অপেক্ষা করবো। তারপর ফলো করবো—যতদূর ওরা যায়।”

    বুলেটের কথায় সবাই সায় দিলে।

    .

    শীতকালের সকাল-সাড়ে পাঁচটা। ভোর হতে দেরি আছে এখনো। কলকাতা শহরে এখনো ব্যস্ততা ও কোলাহল শুরু হয় নি। রাস্তায় সবে লোকচলাচল শুরু হয়েছে। জগুবাবুর বাজারের দোকান-দাররা কেউ কেউ সবে ঘুম ভেঙে উঠেছে।

    বি. এল. বি. ৬৪৬৪ গাড়িখানা ভবানীপুর জগুবাবুর বাজারের উত্তর দিকের রাস্তা মোহিনীমোহন রোড থেকে বের হয়ে আশু মুখার্জির রোডে পড়ে সোজা উত্তর দিকে চলতে শুরু করলো।

    আগলু গাড়ি চালাচ্ছে। তার পাশে সাধু। পিছনের সীটে বসে আছে আর একজন লোক। লোকটি হিন্দুস্থানী, চেহারা বেশ লম্বা-চওড়া, খদ্দরের ধুতিপিরানপরা, মাথায় গান্ধি টুপি। বুলেটের বিশ্বাস, লোকটা মাহাতো—কারখানার অন্যতম মালিক।

    গাড়িখানা চলছে মাঝারি গতিতে। কলকাতা হাওড়া পার হলো তারা। ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুখানা গাড়িই শহরের সীমা ত্যাগ করলে—একটি অপরটির অলক্ষ্যে কিছু ব্যবধান রেখে।

    ফাঁকা গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড। যানবাহন বিরল। আগলু গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে দিলে।

    বি এল. বি. ৬৪৬৪ চলেছে তো চলেইছে, থামছে না কোন জায়গায়। যাচ্ছে সোজা উত্তরমুখো। চন্দননগর এসে গেল। আগলু গাড়িখানা রাস্তার পাশের একটা বড় দোকানের সামনে থামাতেই, সেখান থেকে একটা লোক ছুটে এসে মাহাতোর সঙ্গে কি কথাবার্তা বললে। মাহাতো তার হাতে কি একটা প্যাকেট দিতেই সে দ্রুত চলে গেল।

    আবার গাড়ি চলতে শুরু করলে।

    রোদ বেশ জোর উঠেছে। গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোডে গাড়ি চলাচলও বেড়েছে। বেলা প্রায় সাড়ে নটা। বি. এল. বি. ৬৪৬৪ বর্ধমান শহরে এসে গেল। আগলু কার্জন গেটের কাছে গাড়ি থামালে।

    সাধু ও আগলু গাড়ি থেকে নেমে গেল। মাহাতো গাড়িতেই বসে রইল।

    খানিকটা দূরে বুলেটদের গাড়িও থেমেছে। বজ্র বুলেটকে বললে, “ওরা বোধহয় এখানেই খাওয়াদাওয়া সারবে। আমরাও কিছু খেয়ে নিলে কেমন হয়।

    গাড়ি থেকে নেমে সাধু ও আগলু যে দিকে যাচ্ছিল, সেদিকে চোখ রেখেই বুলেট উত্তর দিলে, “হাঁ খেয়ে নিতে হবে বইকি। আর সাধুরা কোন্ দিকে যাচ্ছে, সে খবরও রাখতে হবে। আমি ওদের দিকে যাই। সাধুরা খুব সম্ভব কোন হোটেলে বা দোকানে ঢুকবে। বজ্র, তুমি আর বাঘ কোন দোকান থেকে খেয়ে এস। আমি যে দিকে যাচ্ছি, সেদিকে যেও না। বোমা গাড়িতেই থাক। ওর জন্যে তোমরা খাবার এনো।”

    বুলেট গাড়ি থেকে নেমে গেল।

    সাধু আগে আগে যাচ্ছে। তার হাতে একটা ডাক্তারি ব্যাগ। আগলু তাকে অনুসরণ করছে। তার হাতেও একটা র‍্যাশন ব্যাগ—কিসব জিনিসে ভর্তি। দুজনে চারদিক লক্ষ্য করতে করতে চলেছে। কিছু দূর আসতেই হঠাৎ একজন লোক এসে সাধুকে কি বললে। সাধু আগলুকে ইশারা করতে সে ঐ লোকটার হাতে র‍্যাশন ব্যাগটা তুলে দিলে। লোকটা মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

    সাধু ও আগলু একটা ময়রার দোকানে ঢুকে একটা বেঞ্চে বসে সীতাভোগ আর মিহিদানার অর্ডার দিলে।

    দোকানটা বেশ বড়। এসময় লোকের ভিড় নেই বললেই হয়। তবু সাধু ও আগলু কথ। কইছে খুব নীচু গলায়—অতি সাবধানে সব দিকে লক্ষ্য রেখে। যে লোকটা আগুলুর কাছ থেকে র‍্যাশান ব্যাগ নিয়ে গিয়েছিল, সে এসে সাধুকে এক তাড়া নোট দিলে। না গুণেই সাধু সেগুলি বেনিয়ানের পকেটে রেখে উঠে দাঁড়ালো। আগলুও উঠলো।

    বুলেট ঐ দোকানের একটা আলমারির পিছনে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল। সে চায়ের কাপ প্লেট টেবিলের উপর রেখে সট করে দোকানের পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।

    প্রায় মিনিট দশেক আগে বঙ্গ ও বাঘ মোটরে ফিরেছে। বজ্র বোমার জন্যে খাবার ও ফ্লাস্কে করে চা এনেছে। বোমা খাবার খাচ্ছে। বজ্র বললে, “সাধুদের যে স্থানে স্থানে চোরাই কারবার আছে, তা বেশ বোঝা যায়।”

    হঠাৎ বোমা ব্যস্ত হয়ে বললে, “দেখ দেখ, সাধুরা তাদের মোটরে ফিরছে। আমাদেরও এখুনি রেডি হওয়া দরকার।”

    বজ্রও ব্যস্ত হয়ে উঠলো, “তাইতো বুলেট এখনও—”

    “গাড়ির পিছন থেকে উত্তর এলো, “আমি এখানে আছি, তোমরা রেডি হও। সাধুদের গাড়ি চলতে আরম্ভ করলেই আমি উঠবো।”

    .

    দুখানা গাড়ি আবার গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে চলেছে হু হু করে উত্তর-পশ্চিমমুখো। একটার সঙ্গে অপরটি খানিকটা দূরত্ব রেখে চলেছে। বেলা হয়েছে বেশ।

    বর্ধমান শহর—গলসী—বুদবুদ চটি – পানাগড়—দুর্গাপুর জঙ্গল—ফরিদপুর ফাঁড়ি পার হয়ে সাধুদের গাড়ি অণ্ডালের চৌমাথায় এসে দাঁড়ালো।

    এখানকার দৃশ্য বড় সুন্দর। উঁচু নীচু মাঠের মধ্যে দিয়ে গেছে গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড। তাকেও তাই উঁচু নীচু হতে হয়েছে। রাস্তার দুপাশে বড় বড় কৃষ্ণচূড়া হরীতকী বয়ড়ার গাছ—অত চওড়া রাস্তাটাকেও ছেয়ে ফেলেছে। দূরে দূরে বহু কোলিয়ারীর চাকু দেখা যায়।

    অণ্ডাল-উখরা রোড ও গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোডের চৌমাথায় বি. এল. বি. ৬৪৬৪ গাড়িখানা থামতেই আগলু নেমে পড়ে। সাধুদের গাড়ি আবার স্টার্ট দিলে। এবার সাধু গাড়ি চালাচ্ছে। পায়ে হেঁটে আগলু চলেছে উত্তরমুখো।

    বুলেট চোখে বায়নোকুলার লাগিয়ে ওদের উপর নজর রাখছিল। বজ্রকে বললে, “তুমি এইখানে নেমে পড়। আগলু যাচ্ছে এখানে কোথায় ‘বিবির বাগান’ আছে সেইখানে। ওই বাগানের কিছু মিস্ত্রী আছে বলে মনে হয়। তুমি ওকে ফলো করো। কিন্তু সাবধান, নিজে আর কিছু করবে না। আমরা যেমন ফলো করছি, করবো। তোমার কাজ হয়ে গেলে কলকাতায় ফিরে যেও। আমাদের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে না। সাধুরা যাচ্ছে বরাকরে, আমরাও সেখানে যাবো। আগলু যে এখানে নামবে, তা বর্ধমানে তাদের গোপন পরামর্শ থেকে জেনেছি। এখানে ওদের বিশেষ কি দরকার আছে। তাই আমার খুব সন্দেহ হচ্ছে।”

    বজ্র তার ব্যাগটি নিয়ে নেমে যেতে বোমা আবার গাড়ি চালিয়ে দিলে।

    বি. এল. বি. ৬৪৬৪ চলেছে এগিয়ে, আরও আরও এগিয়ে। বুলেটদের গাড়ি তাদের অনুসরণ করছে আগের মতোই দূরত্ব রেখে।

    .

    রানীগঞ্জ পার হয়ে কিছু দূর যাবার পর সাধু মাহাতোকে জিজ্ঞাসা করলে, “মাহাতো, তোমার সব ঠিক আছে তো?”

    মাহাতো উত্তর দিলে, “বিলকুল ঠিক আছে। তুমি ঘাবড়াইবে না। হামার দাওয়াইতে রোগরোগী দোনই খতম হোবে।” বড় বড় দাত বের করে মাহাতো হাসতে লাগলো।

    সাধু বললে, “কিন্তু খুব সাবধানে সব করতে হবে। তড়িঘড়ির জরুরত নেই।”

    মাহাতো বললে, “হাঁ হাঁ সে ঠিক হোবে। হামার দাওয়াই পেটে পড়লে বিশ-বাইশ দিন বেমারে ভুগবে। তারপর কুছ হোয় তো হোবে।”

    সাধু বললে, “হাঁ, আমিও তাই চাই। খুড়ো এখন কিছু দিন উঠতে না পারলেই হলো। ও মতলব করেছে, এই সপ্তায় ওর বন্ধু এটর্নি মিত্তির সাহেবের সঙ্গে মূলাকাত করবে। তাহলে সব ভেস্তে যাবে।”

    মাহাতো বললে, “না, তা হোতে দিবেক না। হামার এই দাওয়াইটা আজই ওকে পিলাই দিবে। কালসে উ খাটপর র যায়গা। বারেনকে এই দাওয়াই পিলাইয়েছি। উতো মুর্দা মাফিক পড়িয়ে থাকে।”

    সাধু স্টীয়ারিং থেকে বাঁ হাত তুলে মাহাতোর পিঠ চাপড়ে বললে, “সাবাস্, কবিরাজ মশাই, সাবাস্!”

    গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে সাধুদের গাড়ি চলেছে। বেলা প্ৰায় দুটো। আসানসোল টাউন হলের সামনে এসে বি. এল. বি. ৬৪৬৪ থেমে গেল। মাহাতো গাড়ি থেকে নেমে একটা খুব বড় স্টেশনারী দোকানের সামনে এসে দাঁড়াতেই একজন এ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান সাহেব এসে তার হাতে কি একটা জিনিস দিলে। মাহাতো গাড়িতে ফিরে এলো। সাধু গাড়ি ছেড়ে দিলে।

    দূর থেকে বুলেট বায়নোকুলার দিয়ে দেখছে। তাদের গাড়িও চলতে শুরু করলো।

    আসানসোল পার হয়ে গেল। বোমা বুলেটকে বললে, “বাংলা দেশ তো প্রায় শেষ হতে চললো।”

    বুলেট বললে, “সাধুরা যাচ্ছে বরাকরে। বরাকর জায়গা বাংলার একেবারে শেষ সীমান্তে। ওখানে গেলে বুঝতে পারবে, চোখের সামনে দেখতেও পাবে ছোট ছোট পাহাড় নদী ঝরনা।”

    আসানসোল থেকে বরাকর খুব বেশী দূর নয়। বি. এল. বি. ৬৪৬৪ বরাকর স্টেশনের সামনে পৌঁছলো। বেলা তখন প্রায় চারটে। সাধুদের গাড়ি কিন্তু এখানেও থামলো না, এগিয়ে চললো।

    রেল লাইনের প্রায় সমান্তরাল একটা সরু রাস্তা। কিছু দূরে একটা মোড়, তারপর রাস্তাটা গেছে লাইনের তলা দিয়ে। এটা গ্ৰাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড না হলেও রানীগঞ্জ-কল্যাণেশ্বরীর বহু যাত্রীবাস-লরী এ পথে চলাচল করে।

    ঐ রাস্তা ধরে সাধুদের গাড়ি খানিকটা এগিয়ে গেলে বুলেটের কথামতো বোম। বরাকর স্টেশনের সামনে গাড়ি থামালে। বুলেট -বললে, “তুমি এইখানে থাকো। আমি আর বাঘ কল্যাণেশ্বরীতে যাত্রীবাসে যাচ্ছি। সাধুরা শৈলেনবাবুর আশ্রমে যাচ্ছে। দু-এক দিন ওরা থাকবে সেখানে।। আমিও যদি দরকার বুঝি ঐ আশ্রমে বা কাছাকাছি কোথাও থাকবো। কি রকম কি হয় পরে বাঘকে দিয়ে খবর দেব। সাধুদের ছেড়ে আমি আসবো না।”

    বুলেট ও বাঘ ছুটে গিয়ে কল্যাণেশ্বরীর বাসে উঠলো।

    বাঘ বুলেটকে বললে, “ওদের গাড়িখানা খুব এগিয়ে গেছে, আর দেখা যাচ্ছে না।”

    বুলেট বললে, “সেজন্যে ভাবনা নেই, ওরা বরাবর শৈলেনবাবুর আশ্রমে যাচ্ছে। ওদের একটু এগিয়ে যেতে দিচ্ছি ইচ্ছা করেই। আমিও ঐ আশ্রমে যাব, কিন্তু সন্ধ্যার বেশী আগে নয়। কিছু ছদ্মবেশের ব্যবস্থা করতে হবে। তুমিও কল্যাণেশ্বরীর মন্দিরে থাকবে। অতবড় বিখ্যাত মন্দির—ওখানে নিশ্চয়ই যাত্রীবাস বা ধৰ্মশালা আছে। আমিও মন্দিরের আশপাশে কোন জায়গা থেকে পোশাক বদলে নেব।”

    বাস এসে কল্যাণেশ্বরীর সামনে থামলো। বুলেট ও বাঘ নেমে পড়লো।

    .

    চারদিকে ছোট পাঁচিলঘেরা বাগান। বাগানের ঠিক মাঝখানে একটা একতলা ইটের বাড়ি ও মন্দির। ইটের বাড়িটা ঘিরে আট-দশখানা টালির ছাওয়া বড় বড় ঘর তৈরী হচ্ছে—এখনও শেষ হয় নি। গেটের সামনে ফুলের বাগান, তারপর সবুজ ঘাসে ঢাকা একটা ছোট মাঠ। সব দেখে মনে হয়, বাগানটা এককালে কোন সৌখীন ধনীর বাগানবাড়ি ছিল।

    মাঠের মাঝখানে ঘাসের উপর অতি সৌম্য শান্তদর্শন এক প্রৌঢ় বসে আছেন। তাঁর সামনে সাধু ও মাহাতো বসে কথা কইছে। প্রৌঢ়টি শৈলেনবাবু।

    সন্ধ্যা হতে বিশেষ দেরী নেই। কল্যাণেশ্বরীর মন্দিরে আরতি আরম্ভ হয়েছে।

    একজন তরুণ বৈরাগী এসে শৈলেনবাবুকে খুব ভক্তিভরে পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলে।

    শৈলেনবাবু খুব ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, “নারায়ণ! নারায়ণ!”

    বালকটির দিকে চেয়ে হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “বাবা, কোথা থেকে আসছ? বসো এখানে।” হাত দিয়ে তিনি নিজের ডান দিকটা দেখিয়ে দিলেন।

    বালকটি শৈলেনবাবুর মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে হাত জোড় করে বিনীতভাবে বললে, “আমি কানে কম শুনি। আপনি জোরে বলুন কি বলছেন।”

    তরুণ কিশোরের সাজপোশাক বৈরাগীর মতো। সে বসতেই, শৈলেনবাবু এবার একটু জোরে বললেন, “কোথা থেকে আসছ, বাবা?”

    কিশোর উত্তর দিলে, “আমি আসছি খড়দার বিষ্ণুপ্রিয়া আশ্রম থেকে।”

    বিষ্ণুপ্রিয়া আশ্রমের কথা শুনে শৈলেনবাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন, “বিষ্ণুপ্রিয়া আশ্ৰম! শ্রীধর বাবাজী মশাই কেমন আছেন? তাঁর মঠের খবর কি বল তো, বাবা?”

    বৈরাগী বললে, “বাবাজী মশাই ভাল আছেন। তাঁর ও মঠের অবস্থাও ভাল। আপনাদের মত সৎ ব্যক্তির দানে—”

    বাধা দিয়ে শৈলেনবাবু বললেন, “গুরু! গুরু! আমি অতি সামান্য ব্যক্তি, আমি কি দান করবো! সবই প্রভুর ইচ্ছা। যাক তোমাকে পেয়ে খুব আনন্দ হলো। এই বয়সে ধর্মপথে এসেছ, অমন সৎ গুরু পেয়েছ—মহাভাগ্যবান তুমি। তা দু-এক দিন এখানে থেকে যাও, বাবা। সদালাপ করা যাবে। তা তোমার নামটি কি, বাবা?”

    বৈরাগী বললে, “দাসানুদাস পরমানন্দ।”

    সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। একজন আশ্রমবাসী একটা বড় হারিকেন লণ্ঠন সেখানে রেখে গেল।

    শৈলেনবাবু তাকে ডাকলেন, বললেন, “মণি ভাই, এই ছেলেটির খাওয়া থাকার ব্যবস্থা কোরো।” শৈলেনবাবু বুলেটকে দেখিয়ে দিলেন। লোকটি চলে গেল।

    সাধু শৈলেনবাবুকে বললে, “কাকাবাবু, কবিরাজ মশাই আপনার শরীরটা একবার পরীক্ষা করবেন। ওঁকে বহু সাধ্যসাধনা করে কাশী থেকে ধরে এনেছি।”

    শৈলেনবাবু বললেন, “ওসব আর কেন, মন্টু? ডাক পড়লেই যেতে হবে। রোগ ভোগ থাকলে ভুগতেই হবে, বাবা।”

    মন্টু বললে, “তা হবে না, কাকাবাবু। আমার মুখ চেয়ে আপনাকে আরো কিছু দিন থেকে যেতে হবে। চিকিৎসা আপনাকে করতেই হবে। তাই কবিরাজ মশাইকে কত সাধ্যসাধনা করে এনেছি।”

    শৈলেনবাবু নিরুপায়ভাবে বসে রইলেন।

    কবিরাজ অর্থাৎ মাহাতো শৈলেনবাবুর বুক পিঠ চোখের পাতা বেশ গম্ভীরভাবে পরীক্ষা করে কিছুক্ষণ চিন্তিত থেকে বললে, “খারাপ আছে, লেকিন খুব খারাপ কুছ দেখছে না।”

    শৈলেনবাবু বললেন, “আমার নিজের শরীরের জন্যে বিন্দুমাত্র চিন্তা করি নে, দেহ আর বেশী দিন বহনও করতে চাই নে। আমার কর্তব্যগুলি সেরে তাড়াতাড়ি সরতে পারলে হয়।”

    মন্টু উদ্বিগ্নভাবে বললে, “কিন্তু আমি তো আপনাকে ছাড়বো না। আমার মতো পাপীকে উদ্ধার একমাত্র আপনিই করতে পারবেন। আমি আপনার কাছে দীক্ষা নেব। তা না দিলে আপনার পা আমি ছাড়বো না, কাকাবাবু।”

    মণ্ট সত্যসত্যই শৈলেনবাবুর পা দুটি দুহাতে জড়িয়ে ধরলে। শৈলেনবাবু মন্টু র হাত থেকে পা ছাড়িয়ে নিতে নিতে হাসিমুখে বললেন, “ছাড়,, পাগলা, পা ছাড়। আমি তোকে কি দীক্ষা দেব! আমার মূলধন কতটা, কতটুকুরই বা অধিকারী আমি! অন্ধ কি অন্ধকে পথ দেখাতে পারে?”

    মন্টু বললে, “কোন কথা শুনবো না। আপনি যদি দীক্ষা না দেন তো এই আশ্রমেই আমি অনশনে আত্মহত্যা করবো।”

    আশ্রমবাসী সেই লোকটি এসে শৈলেনবাবুর সামনে দাঁড়াতেই শৈলেনবাবু সকলকে লক্ষ্য করে বললেন, “এইবার আমাকে উঠতে হবে, মন্দিরে যাবার সময় হয়েছে। কবিরাজ মশাই যখন দয়া করে এসেছেন, তখন দু-এক দিন এখানে থেকে যান। মন্টু যখন ছাড়ছে না, তখন আপনার চিকিৎসাধীন থাকতেই হবে। কিছু মনে করবেন না, আমি উঠছি।”

    শৈলেনবাবু মন্দিরের দিকে চলে গেলেন।

    .

    রাত অনেক। শৈলেনবাবুর আশ্রমের আরতি সাধনভজন বহুক্ষণ শেষ হয়েছে। চারিদিক স্তব্ধ নিঝুম। একটা ঘরে শুয়েছে মাহাতো আর সাধু বা মন্টু, আর ঠিক তার পাশের ঘরে বুলেট বা দাসানুদাস পরমানন্দ। মাহাতোদের ঘরে একটা দেশী লণ্ঠন টিমটিম করে জ্বলছে। বুলেট তার ঘরের বাতি নিভিয়ে দিয়েছে।

    মাহাতো চাপা গলায় বললে, “তারপর সুরেনবাবু, বুড্ডাকে কি রকম দাওয়াই দিব বলিয়ে। বুড্ডার কিন্তু তবিয়ত ভালা নেহি।”

    সাধু বললে, “সামান্য ভোজের কিছু দাও। ওকে এখুনি শেষ করা আমার ইচ্ছে নয়, তাহলে নান। ফ্যাসাদ হতে পারে। দিন পনের-কুড়ি শুয়ে থাকলেই হলো। ইতিমধ্যে আমাদের সব কাজ হয়ে যাবে।”

    মাহাতো বললে, “সেই মাফিকই দিবে।, তবে বুড্ডা খাইবে তো?”

    সাধু বললে, “আমি নিজের হাতে খাইয়ে দেব মহাভক্তিভরে। ঐ জন্যেই এখানে দিন দুই থাকবো।”

    সাধু হাসতে লাগলো।

    মাহাতে। বললে, “আস্তে, সেই বাচ্ছা সাধুটা নগিজ আছে।”

    সাধু বললে, “সে এতক্ষণে ঘুমুচ্ছে। তাছাড়া ও বদ্ধকালা, কিছুই শুনতে পাবে না।”

    মাহাতো জিজ্ঞাসা করলে, “এদফে চীনাটা কুছ আফিং কি কোকেন দিইয়েছে?”

    সাধু উত্তর দিলে, “যৎসামান্য। ও আবার সিঙ্গাপুরে গেছে ঐ জন্যে।”

    মাহাতো বললে, “যাক সে লিয়ে আভি হামাদের মাথা ঘামাইলে চলিবেক না। মহলে কাম কেত্তো দূর?”

    সাধু বললে, “প্রায় শেষ হয়েছে। মন্দিরের ভিতের নীচে একটা সিন্দুকের সন্ধান পাওয়া গেছে। আমরা গেলে সেটা বের করা হবে। ওখানে লছমন আছে। বড় নায়েবটাকে ফাঁদে ফেলেছি, একেবারে আমার আস্তানায় নিয়ে রেখেছি। কিন্তু আচ্ছা ঝানু বুড়ো, একেবারে দখনে শয়তান। একটা কথাও ওর পেট থেকে বের করা যাচ্ছে না। ওকেও দাওয়াইয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।”

    মাহাতো বললে, “উস্‌কো একদম খতম করনেসে ক্যা ডর?”

    সাধু বললে, “দেখি শেষ চেষ্টা করে, যদি ওর কাছ থেকে কথা বের করতে পারি। কদিন ঠাণ্ডা গারদে থাকবার পর যদি নরম হয়, তাই ওকে শেষ করি নি, এখনও গুম করে রেখেছি।”

    মাহাতো বললে, “গুম-করা আদমিকো যাদা দিন এক জায়গামে রাখা ভালা নেহি। উস্‌কাভি জঙ্গলী আস্তানামে চালান দে দো।”

    সাধু বললে, “শীঘ্রই দোব। ও কথা আমারও মনে হয়েছিল।”

    মাহাতো বললে, “কিন্তু বহুৎ হুঁশিয়ার! দু দু আদমীকে। গুম করা হুয়া। উস্‌নেসে আপনা জন আছে, বন্ধু বেরেদার আছে, পুলিস ভি আছে।”

    সাধু বললে, “আমার তো মনে হয় না, কিছু ভয় করার আছে। কারণ পুলিস বা বীরেনের বন্ধুবান্ধবদের ধারণা, ওকে কোন গুপ্ত ডাকাতের দল সরিয়েছে মোটা টাকা আদায়ের জন্যে। পুলিস সেই দিক দিয়ে অনুসন্ধান করছে। অন্য কেউ যে বীরেনকে গুম করতে পারে, সে কথা ওদের মনেই ওঠে নি। সেই জন্যে মনে হয়, এক্ষেত্রে আমাদের বিপদের সম্ভাবনা কম।”

    মাহাতে। বললে, “হু, আমাদের বহুৎ হু সিয়ার থাকিতে হোবে। আর আত্মরক্ষার ব্যবস্থ। ভি কোরতে হোবে।”

    সাধু বললে, “তাও কিছু কিছু আছে বৈকি। গেল হপ্তায় খিদিরপুরে এক সারেঙ্গের কাছ থেকে একটা ভাল জিনিস সংগ্রহ করেছি। দেখাচ্ছি।”

    সাধু তার হোমিওপ্যাথিক ঔষধের হাত ব্যাগের তলা খুলে একটা পিস্তল বের করে মাহাতোর হাতে দিলে।

    লণ্ঠনের আলো একটু বাড়িয়ে দিয়ে মাহাতো পিস্তলটা ভাল করে দেখতে দেখতে বললে, “আচ্ছা চিজ!”

    সাধু বললে, “আসল কোল্টের পিস্তল–ফাইভ শটূ, ডেথরেঞ্জ একশ’ ইয়ার্ড! তবে বুলেট বেশী পাওয়া যায় নি—তিন ডজন মাত্র।”

    মাহাতো বললে, “হামার তো এর চেয়ে আচ্ছা চিজ থা, উতো খোয়া গিয়া, থুমি তুমার রিভলভারটা দিবে বলিয়েসিলে। কি হইল?”

    সাধু উত্তর দিলে, “আমার রিভলভারটা হাবু নস্করের কাছে আছে। তাকে বলেও রেখেছি তোমার কথা, তুমি ওর কাছ থেকে নিয়ে নিও।”

    মাহাতো খুব খুশী হলো। সাধুকে সে পিস্তলটা ফিরিয়ে দিতে, সাধু তার ডাক্তারী ব্যাগের তলার বোতাম খুলে পিস্তলটা রাখলে।

    মাহাতো বললে, “আচ্ছা কায়দা ভি করিয়েছো তো। যে। জানে না, পিস্তলটাও বাহার করতে সেকবে না।”

    সাধু হাসতে হাসতে বললে, “নিজেই করেছি।”

    আশ্রমের দেওয়াল-ঘড়িতে বারোটা বাজলো।

    সাধু ও মাহাতো খাটে শুয়ে কম্বল মুড়ি দিলে। বুলেটও জানালার কাছ থেকে সরে এসে নিজের বিছানায় শুয়ে পড়লো।

    ***

    কাজোরা গ্রাম।

    গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোড ও অণ্ডাল-উখরা রোডের চৌমাথা থেকে কিছু উত্তর-পশ্চিমে মিনিট দশ-বারোর পথ গেলেই কাজোরা গ্রাম বা কাজোর। বাজার। বাজার থেকে বের হলেই অনেকগুলি কোলিয়ারীর চানক দেখা যায়, তারপর মাঠ। মাঠের মধ্যে একটা বহুকালের প্রাচীন ভাঙা দেড়তলা বাড়ি। বাড়িটা উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। আশে পাশে কতকগুলো বড় বড় আমজামের গাছ ও ঝোপজঙ্গল আছে। দুর থেকে দেখলে মনে হয় না, ঐ বাড়িতে কোন লোক বাস করে।

    আগলু আস্তে আস্তে সেই বাড়িটার সামনে এসে বার কতক চারদিক ভাল করে দেখে নিয়ে দরজার কড়া নাড়লে।

    একটু পরেই দরজা খুলে গেল। খুলে দিলে একটা হিন্দুস্থানী বুড়ী। আগলু বাড়ির মধ্যে যেতেই আবার দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

    বজ্র দূর থেকে সবই দেখলে। সেখান থেকে আরো একটু কাছে এসে একটা আমলকী গাছের আড়ালে সে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু বাড়িটার দরজা আর খুললো না।

    বজ্র বহুক্ষণ সেখানে অপেক্ষা করার পর মাঠের মধ্যে এসে একটা গাছের আড়ালে বসলে। লক্ষ্য তার সেই দরজার দিকে। একটা চৌদ্দ-পনেরো বছরের ছেলে কতকগুলো ছাগল নিয়ে সেইখান দিয়ে যাচ্ছিল। বজ্র তাকে কাছে ডেকে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলে, “কোথায় যাচ্ছ, হারু? আমাকে চিনতে পাবছে। তো?”

    বিস্মিত হয়ে ছেলেটা বললে, “আমার নাম তো হারু নয়, আর আপনাকেও তো চিনতে পারছি নে।”

    বজ্র বললে, “বল কি! চিনতে পারছ না? আচ্ছা, তোমার বাড়ি কোথায়?”

    ছেলেটি উত্তর দিলে, “কান্দ্রায়।”

    বজ্র বললে, “তাই তোমাকে চেনা-চেনা লাগছে। তবে নামটা ভুল হয়ে গেছে। আমি ওদিকে প্রায়ই যাই। আচ্ছা, তুমি তো এখানকার লোক, বলতে পার, ঐ ভাঙা বাড়িটায় কারা থাকে? বাড়িটা কার?”

    আগলু যে ভাঙা বাড়িটায় ঢুকেছিল, সেই বাড়িটা বজ্র হাত দিয়ে দেখালে।

    ছেলেটা বললে, “বাড়ি কার তা তো জানি নে,–লোকে বলে ‘বিবির বাগান’। কিন্তু কোন দিন কোন বিবি বা সাহেবকে ও বাড়িতে দেখি নি। ওখানে থাকে একদল কানা-খোঁড়া ছেলেমেয়ে আর থাকে একটা পাগলা বাবু ঐ ওপরের ঘরে। আর থাকে জন দুই হিন্দুস্থানী বুড়ো বুড়ী। তারা এদের দেখে।”

    বয়সের তুলনায় ছেলেটার কথাবার্তা বেশ পাকাপাকা—বজ্রের শুনতে বেশ আমোদ লাগে।

    সে জিজ্ঞাসা করলে, “পাগলা বাবুর বয়েস কত? খুব বুড়ো?”

    ছেলেটা বললে, “বুড়ো কেন হবে? তার বয়েস চব্বিশ-পঁচিশ হবে। তাকে হিন্দুস্থানীরা বের হতে দেয় না, সারা দিনরাত ঐ ঘরে শিকল বন্ধ করে রাখে। ও বাড়িতে কেউ গেলে হিন্দুস্থানীরা তাড়িয়ে দেয়। কাউকে ঢুকতে দেয় না। একবার আমার একটা ছাগল ঐ বাড়ির মধ্যে গিয়েছিল, তাকে আনতে গিয়ে সব দেখে এসেছি।”

    ছেলেটার ছাগলগুলো এগিয়ে গিয়েছিল। সে ‘হেই! হেই!’!’ করতে করতে সেইদিকে ছুটে চলে গেল।

    সন্ধ্যা প্রায় সাতটা। কাজোর। গ্রামের একটা মন্দির থেকে আরতির বাজনা শোনা যাচ্ছে। বজ্র খুব আস্তে আস্তে চারদিকে ভাল করে লক্ষ্য রেখে সেই দেড়তলা বাড়ির কাছে এসে কিছুক্ষণ পাঁচিলের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল। জনপ্রাণীর সাড়া নেই কোথাও।

    বাড়িটা ছোট। তার চারদিকে প্রচুর ফাঁকা জায়গা ও বাগান। সবই উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। পাচিলের গা ঘেঁষে একটা বড় আম গাছ। গাছটার অনেকগুলো ডালপালা পাঁচিলের উপর দিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকেছে।

    বজ্র সাবধানে সেই গাছে উঠে একটা ডাল বেয়ে অতি সন্তর্পণে পাঁচিল ডিঙিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকলো।

    পাঁচিলের মধ্যে দেড়তলা বাড়ি ছাড়া আরো কতকগুলি টিনের চালা। একটা বড় টিনের চালায় কতকগুলি ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। তাদের কারুর পা খোঁড়া, হাত ভাঙা, কেউ বা অন্ধ। কিন্তু সবারই পা বাঁধা। অনেকে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, কেউ কেউ ক্ষুধায় কাঁদছে। কদাকার একটা লোক হাতে ছড়ি নিয়ে তাদের সামনে বসে ঝিমুচ্ছে, আর মাঝে মাঝে চাবুকের ঘা মারছে। সব দেখে শুনে মনে হয় না, এই ছেলেমেয়েদের এখানে রাখা হয়েছে কোন সৎ উদ্দেশ্যে লালনপালনের জন্যে।

    বজ্র শুনেছিল, একশ্রেণীর বদলোক আছে যারা অসাবধানী ছোট ছোট ছেলেমেয়ে চুরি করে নিয়ে গিয়ে এই রকম বিকলাঙ্গ ও অন্ধ করে তাদের দিয়ে ভিক্ষে করিয়ে টাকা রোজগার করে। এই ছেলেমেয়েদের দেখে বজ্রর ধারণা হলো, এদের অর্থাৎ মাহাতোদের ভিখারীর ব্যবসাও আছে।

    বজ্র সেই চালার পিছন থেকে সরে এসে দেড়তলা বাড়িটার ঠিক নীচে এসে দাঁড়ালো। কোথাও কোন লোক নেই, কেবল একটা কুকুর এক ছাই গাদায় চুপ করে শুয়ে আছে। নিঝুম নিস্তব্ধ সব, কেবল উপরের ঘর থেকে মাঝে মাঝে কাশির শব্দ আসছে। কাশির শব্দ শুনে বজ্র বুঝলে, বীরেন রায় কাশছে। ঘরটির দিকে ভাল করে লক্ষ্য করতে বজ্র দেখতে পেলে, ঘরটির একটি জানালা খোলা, ঘরে একটা আলো জ্বলছে। জানালাটার গরাদ আছে।

    বজ্র অন্ধকারে ব্যাগ থেকে একটা মোটা দড়ি বের করলে। দড়িটার এক প্রান্তে একটা লোহার বাঁকা হুক্ লাগানো। হুক্‌টা দেখতে অনেকটা বঁড়শির মতো।

    বজ্র সেই জানাল। লক্ষ্য করে দুবার দড়িটা ছুড়তেই হুক্‌টা একটা গরাদে শক্তভাবে আটকে গেল। দড়ির অপর প্রান্তটা একটা গাছের ভালে বেঁধে বজ্র অতি সন্তর্পণে সেই দড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। জানালার সামনে গিয়ে দেখলে, বীরেন রায় চুপ করে শুয়ে আছে। তার মাথার কাছে একটা আলো জ্বলছে টিমটিম করে। তার হাত পা বাঁধা নেই, তবে ঘরের দরজায় কুলুপ লাগানো।

    বজ্র চাপা গলায় ডাকলে, “বীরেন দা! বীরেন দা!”

    দ্বিতীয় ডাকে বীরেন রায় চমকে উঠে জানালার দিকে চাইতেই বজ্ৰ বললে, “আমি বজ্র!”

    “বজ্র!” বীরেন রায় দারুণ বিস্ময়ে উঠে বসলেন।

    বজ্র বললে, “চুপ চুপ! আস্তে কথা বল। বহু কষ্টে তোমার সন্ধান পেয়েছি। তোমাকে উদ্ধার করবোই। তুমি দড়ি বেয়ে নীচে নামতে পারবে?”

    একটু ভেবে বীরেন রায় বললে, “না ভাই, পারবো না। শরীর খুব দুর্বল, তবে আমাকে কোনমতে যদি ধরে নামিয়ে দিতে পার তো তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারবো। কিন্তু ঘর থেকে বের হব কি করে? ঘরের দরজায় কুলুপ লাগানো, জানলাতেও গরাদ।”

    বজ্র বললে, “গরাদ কাটবার অস্ত্র আমার কাছে আছে, তোমাকে দিচ্ছি। কিন্তু খুব সাবধান। কোন শব্দ যেন না হয়। তুমি কাট। আমি নেমে গিয়ে নীচটা আবার ভাল করে দেখে আসছি।”

    বজ্র বীরেন রায়ের হাতে একটা লোহা কাটা হ্যাক্‌স্ ব্লেড দিয়ে নেমে গেল।

    বজ্র নীচে গিয়ে বুঝলে, দু-একজন লোক আছে বটে, তবে তারা অনেক দূরে—বোধহয় রান্না করছে; উঠনের মধ্যে সেই কুকুরটা বসে আছে অন্য দিকে চেয়ে।

    বজ্র এবার উপরে উঠে দেখলে, জানালার গরাদ কাটা হয়ে গেছে; বীরেন রায়ও প্রস্তুত।

    বজ্র বললে, “বীরেন দা, আমার কাঁধের ওপর চড় তুমি, তোমাকে বয়ে নীচে নামবো। বাড়িটা বেশী উঁচু নয়, নামতে বেশী কষ্ট হবে না। কিন্তু খুব সাবধান! সব সময় আমাকে ভাল করে ধরে থেক।”

    বীরেন রায় বজ্রর কাঁধে চড়ে নামতে লাগলেন। কিন্তু যা ভাবা যায়, অনেক সময় তা হয় না। অতি সাবধানে নামলেও তারা মাটিতে পা দিতেই একটু শব্দ হল, সঙ্গে সঙ্গে কুকুরটা চিৎকার আরম্ভ করলে।

    কুকুরের চিৎকার শুনে টর্চ-হাতে একজন হিন্দুস্থানী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল। চারদিকে টর্চের আলো ফেলতে, বজ্র ও বীরেন রায়কে সে দেখে ফেললে।

    বজ্র ত্রস্তভাবে বললে, “বীরেন দা, যে দিকে পার ছুটতে থাক, পিছনের দরজা খুলে রেখেছি। আমার কথা ভেব না। হাতের কাছে ইট আছে, কোমরে ছোরাও আছে। তোমার শিষ্য আমি, একথা মনে রেখ। আমি পথ আটকাচ্ছি, ওরা তোমাকে ধরতে যাবে নিশ্চয়ই।”

    দারুণ অন্ধকার। পিছনের দরজাটা অল্প অল্প দেখ! যাচ্ছে। দুর্বল শরীর নিয়ে বীরেন রায় যথাসম্ভব জোরে সেই দিকে ছুটতে লাগলেন।

    হিন্দুস্থানীটার একলা এগুতে সাহস নেই। সে চিৎকার করে কাকে যেন ডাকতে লাগলো। কুকুরটাও সমানে ঘেউ ঘেউ করছে। এক-একবার সে তেড়ে আসছে। বজ্র তার দিকে দু-তিনবার ইঁট ছুড়তেই আর সে এগিয়ে এল না, কিন্তু পিছিয়েও বেশীদূর গেল না।

    হিন্দুস্থানীটার ডাকে আর একজন লোক ছুটে এল। ব্যাপারটা বুঝেই ঘরে ঢুকে সে একটা লাঠি নিয়ে এগিয়ে গেল বজ্রর দিকে।

    বজ্র কিন্তু সরলো না। সে পথ আটকে আছে, বীরেন রায়কে পালাবার সুযোগ দিচ্ছে।

    লোক দুজন আরে। একটু এগিয়ে আসতেই বজ্র তাদের লক্ষ্য করে ইট ছুড়তে আরম্ভ করলো।

    ইটের পর ইট সে ছুঁড়ছে। সাঁ সাঁ করে ইটগুলো ছুটছে বুলেটের মতো।

    ওদের দলে আরো দুজন এসে যোগ দিল। তাদের হাতেও লাঠি। তাদেরও একজন ইট ছোড়া আরম্ভ করলে। বজ্র তবুও পালাচ্ছে না। কাছে একটা হাত চারেক লম্ব। বাঁশ ছিল। সেটা নিয়ে সে ঘোরাতে লাগলো।

    বজ্ৰ লাঠি চালনায় দক্ষ। এ বিষয়ে তার নাম আছে যথেষ্ট। কিন্তু চারজনের বিরুদ্ধে একলা কতক্ষণ যুঝতে পাবা যায়! তবু সে দমছে না। বিপক্ষের ইট তার বাঁশের ঘায়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। দু-একটা যে গায়ে লাগছে না তাও নয়। তার কপাল কেটে গেছে, হাঁটু বেয়ে রক্ত ঝরছে। তবু সে পথ আটকে আছে। সমানে একলা লড়ছে চার জনের বিরুদ্ধে।

    কিন্তু দুর্ভাগ্য! বাঁশটা ভেঙে গেল। ইটও ফুরিয়ে এসেছে। বজ্র লাফ মেরে পাঁচিল টপকে বাইরে আসতেই অন্ধকারে কে একজন তার মাথায় লাঠি মারলে। বজ্র যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে অন্ধকারের মাঝ দিয়েই ছুটতে লাগলো। তখনো সে এদিক-ওদিক লক্ষ্য করছে বীরেন রায়কে দেখার জন্যে! কিন্তু বৃথা চেষ্টা।

    ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। একহাতও দৃষ্টি চলে না। বজ্র হঠাৎ একটা ডোবার মধ্যে গিয়ে পড়লো। ডোবা পুকুরটায় জল নেই—আছে কাদা।

    .

    বোধ হয় শেষ রাত। অল্প অল্প আলো দেখা দিয়েছে। কোলিয়ারীর দিক থেকে ঠং ঠুং শব্দ আসছে—লিফট্ ওঠা নামার শব্দ। কুলীদের গলাও কানে আসে। গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোডে দু-একখানা গাড়িও চলতে শুরু করেছে।

    ধীরে ধীরে বজ্রর জ্ঞান ফিরে এল। সারা দেহ কাদায় ও রক্তে মাথা। কানের কাছে ঝিঁঝি পোকার ডাক। গায়ের ওপর ব্যাং লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে। অসহ্য মশার কামড়। ঝাঁকে ঝাঁকে মশা উড়ছে। সারা দেহে দারুণ যন্ত্রণা, বিশেষ করে মাথায়। তবু মনে তার পরম তৃপ্তি, বীরেনদাকে সে মুক্ত করতে পেরেছে। বছর বিশ্বাস, বীরেনদা যদি কোনমতে বড় রাস্তায় বা কোন কোলিয়ারীর দিকে গিয়ে থাকেন, তাহলে এদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন।

    তারও ভাগ্য ভাল বলতে হবে! এই ডোবার মধ্যে এসে পড়েছিল, তাই হিন্দুস্থানীরা দেখতে পায় নি।

    ভোরের আলো আরো একটু স্পষ্ট হয়। বজ্র ডোবা থেকে উঠে অতি ধীরে ধীরে বড় রাস্তায় আসতেই তার সামনে দিয়ে একটা মোটর গাড়ি সাঁ করে বেরিয়ে গেল।

    মোটরটা চালাচ্ছে আগলু, তার পিছনের সীটে কে একজন শুয়ে আছে। তাঁর সারা দেহ মোটা কম্বলে জড়ানো—শুধু মুখখানা দেখা যাচ্ছে অল্প অল্প। তাকে দেখতে বজ্রর মনে হলো বীরেনদার মতো। রাস্তার উপর সে বসে পড়লো।

    .

    মাঝ রাত। সুপ্ত আশ্রম। মোটর গাড়ির ইলেক্‌টি ক হর্নের তীব্র শব্দে শৈলেনবাবুব ও আশ্রমের আর সবারই ঘুম ভেঙে গেল। শৈলেনবাবু একটা হারিকেন আলো নিয়ে তাঁর ঘব থেকে বেরিয়ে এলেন। একখানা মোটর গাড়ি এসে আশ্রমের বাগানের মধ্যে থেমেছে। গাড়ি থেকে একজন লোক তাঁর দিকে এগিয়ে এল। শৈলেনব। বু জিজ্ঞাসা করলেন, “কে আপনি? কোথা থেকে আসছেন?”

    লোকটি উত্তর দিলে, “আমি রানীগঞ্জ থেকে আসছি তারক ব্রহ্মচারীর কাছ থেকে। মহারাজের কলেরা হয়েছে, তাই কবরেজ মশাইকে নিয়ে যেতে এসেছি। কবরেজ মশাই এখানে আসবার পথে আমাদের মঠবাড়ি হয়ে এসেছিলেন। তাই জানি, তিনি এখানে আছেন।

    রানীগঞ্জের তারক ব্রহ্মচারী একজন নামজাদা সাধুসজ্জন ব্যক্তি। শৈলেনবাবুর সঙ্গে তাঁর খুব হৃদ্যতাও আছে।

    বিশেষ উদ্বিগ্ন হয়ে শৈলেনবাবু বললেন, “এ্যাঁ? ব্রহ্মচারী মশায়ের কলেরা হয়েছে? কবিরাজ মশাই যাবেন বৈকি। নিশ্চয়ই যাবেন।”

    মাহাতো ও সাধু অর্থাৎ মন্টু ইতিমধ্যে উঠে পড়েছে। মন্টু বললে, “কাকাবাবু, আদেশ করুন, আমিও কবরেজ মশায়ের সঙ্গে রানীগঞ্জে যাই, ব্রহ্মচারী মশায়ের সেবা করে ব্যর্থ জীবনে কিছু পুণ্য সঞ্চয় করি।”

    শৈলেনবাবু সম্মতি দিলেন। আগন্তুকের গাড়িতে মাহাতো আর বি. এল. বি ৬৪৬৪-তে করে সাধু চলে গেল।

    বুলেট তার ঘরের মধ্য থেকে সব শুনছিল ও দেখছিল। সে বুঝলে, গুরুতর কোন ব্যাপার ঘটেছে।

    অন্ধকারে পা টিপে টিপে সাধুদের ঘরে ঢুকে সে দেখলে, সাধু তার ব্যাগটা নিয়ে যেতে ভুল করে নি। সে ভেবেছিল, সাধুর পিস্তলটা সরিয়ে রাখবে। তা আর হলো না।

    শৈলেনবাবু তাঁর ঘরে ফিরে যেতেই, বুলেট আশ্রম থেকে বেরিয়ে ছুটতে ছুটতে কল্যাণেশ্বরীর মন্দিরের সামনে এসে বার কয়েক জোরে জোরে হাততালি দিলে। নাটমন্দিব থেকে বাঘ দ্রুত বেরিয়ে এল, “কি ব্যাপার?”

    বুলেট বললে, “পরে বলছি, চল বরাকর স্টেশনে। এখন কোন গাড়ি পাওয়া যাবে না। চল—ডবল মার্চ!”

    বরাকর স্টেশনে একখানা ট্রেন আসছে জোরালো হেড লাইট জ্বেলে। স্টেশন মাস্টার ব্যস্ত হয়ে হাঁকাহাঁকি করছেন। প্লাটফরমে যাত্রীরা মুখর হয়ে উঠেছে। ঘুমভাঙা চোখে তারা হাঁকডাক আব ছুটোছুটি করছে মোটমাট আর সঙ্গীদের নিয়ে।

    স্টেশনের সামনে মোটরে স্টীয়ারিং হুইলের ওপর মাথা রেখে বোমা বসে আছে। বুলেটের আকস্মিক ডাকে ধড়মড়িয়ে উঠে দেখলে, বুলেট ও বাঘ এসে তার পাশে দাঁড়িয়েছে। বুলেট তখনও তার বৈরাগীর ছদ্মবেশ ছাড়তে পারে নি। ব্যস্তভাবে সে বললে, “এক্ষুনি গাড়ি ছাড়, বোমা।”

    বুলেট ও বাঘ গাড়িতে উঠে বসলো।

    বোম। গাড়ি স্টার্ট দিলে। বাঘ বললে, “যত পার স্পীড়, দাও, একেবারে টপ গীয়ারে চল।”

    গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক বোডে পড়ে বোমা পুরো স্পীডে গাড়ি চালিয়ে দিলে।

    সব কথা শুনে বোমা বললে, “আধ ঘণ্টার ওপর হলো বি. এল. বি. ৬৪৬৪ চলে গেছে। এখন কি আর তার নাগাল পাব!”

    বুলেট সবসময় আশাবাদী। বললে, “দেখা যাক চেষ্টা করে, এই স্পীডে অণ্ডাল পর্যন্ত তো যাই।”

    রোদ উঠেছে। গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোডে লরি, বাস, প্রাইভেট গাড়ি চলতে শুরু করেছে। কোলিয়ারীর কুলীমজুররা যাতায়াত করছে। রাস্তার পাশে স্থানে স্থানে যাত্রীরা অপেক্ষা করছে বাসের জন্যে।

    বুলেটরা অণ্ডালের চৌমাথায় এসে গেল।

    বাঘ জিজ্ঞাসা করলে, “এখানে থামবো নাকি?”

    বুলেট কাজোরা গ্রামেব দিকে চেয়ে ছিল, উত্তর দিলে, “একটু এগিয়ে গিয়ে থামবে।”

    আধ মাইল প্রায় এগিয়ে গিয়ে অণ্ডাল গ্রামের কাছে বোমা গাড়ি থামালে। বুলেট বাঘকে বললে, “তুমি এখানে নাম। আজ সারা দিন কাজোরা গ্রামের আশেপাশে কাটাবে। একটা ছদ্মবেশ পরে নিও। ওখানে বোধহয় বজ্রকে দেখতে পাবে, না পেতেও পারো। তার জন্যে ভেব না। ওখানকার বাজারে দোকানে বা কুলীমজুরদের কাছে খবর নেবে, রাত্রে বিবির বাগানে কোন ঘটনা ঘটেছে কিনা। কোন কারণেই বেশী দেরী করবে না। আজই বিকালের ট্রেনে কলকাতায় ফিরবে।”

    বাঘ নেবে যেতেই বোমার গাড়ি আবার চলতে শুরু করলে। একটা বাঁক ঘুরতেই বুলেট দেখলে, বজ্র রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বোমা গাড়ি থামালে। সেও বজ্রকে দেখতে পেয়েছিল। বজ্র গাড়িতে উঠতেই আবার গাড়ি চলতে লাগলো।

    বজ্র উঠেই জিজ্ঞাসা করলে, “বাঘকে দেখছি না তো! সে কোথায়?”

    বুলেট উত্তর দিলে, “চল, যেতে যেতে সব বলছি, তোমার কথাও সব শুনছি। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, বিশেষ কিছু ঘটেছে।”

    বোমাকে বিশ্রাম দেবার জন্যে বুলেট এবার গাড়ি চালাতে লাগলো। বজ্র তার পাশে এসে বসলো।

    ফাঁকা চওড়া রাস্তা। বুলেট টপ, গীয়ারে গাড়ি চালাচ্ছে। গাড়ি চলছে হু হু করে। উঁচু নীচু রাস্তা, ঢেউ খেলানো।

    ছ পাশে গেরুয়া রংয়ের মাঠ—যুদ্ধের সময় মিলিটারী দখল করে নিয়েছিল। এখনও সেসব জমি অনাবাদী পতিত পড়ে আছে।

    ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়। বুলেট গাড়ি চালাচ্ছে অবিরাম। মিনিটে মিনিটে পার হয়ে যাচ্ছে বড় বড় মাঠ পল্লী। পার হয়ে গেল দুর্গাপুরের জঙ্গল—পানাগড়—গলসী—বর্ধমান শহর—চন্দননগর–উত্তরপাড়া—বালি। ক্রমে হাওড়া এসে গেল। কিন্তু বি. এল. বি. ৬৪৬৪ কোথায়! তার কোন পাত্তাই নেই।

    হাওড়া স্টেশনের কাছাকাছি এসে বুলেট বোমাকে বললে, “এইবার তুমি গাড়ি চালাও। তোমার ওনার্স লাইসেন্স আছে, আমার নেই। ট্রাফিক আইনও ভাল জানি নে। এখানকার ট্রাফিক পুলিসরা ভারী সতর্ক। আমাদের সকলেরই বয়স কম। সহজেই ওরা সন্দেহ করতে পারে, আমরা হয়তো বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালাচ্ছি।”

    বোমা বললে, “ফলস্ গোঁফ, সান গ্লাস আর হ্যাট পরে বয়েস বাড়িয়ে নেওয়া যাক।” সে গাড়ি চালাতে আরম্ভ করলে।

    হাওড়া ব্রীজের প্রায় শেষ প্রান্তে আসতেই বুলেট প্রায় লাফিয়ে উঠলো, “দ্যাখ, দ্যাখ–বি. এল. বি. ৬৪৬৪! স্ট্রাণ্ড রোড ধরে দক্ষিণ দিকে যাচ্ছে।”

    বজ্র দূরবীন দিয়ে দেখছে। সামনের সীটে মাহাতো আর আগলু। আগলু গাড়ি চালাচ্ছে। পিছনের সীটে কি একটা কালো জিনিস অল্প দেখা গেল। মানুষ কি বিছানাপত্র তা বুঝতে পারার আগেই বি. এল. বি. ৬৪৬৪ বাস ট্রাম ও জনতার মধ্যে মিলিয়ে গেল। তবে গাড়িটা যে সোজা দক্ষিণ দিকে যাচ্ছে, তা বুঝা যায়।

    বুলেটদের গাড়ি হাওড়া ব্রীজ পার হয়ে স্ট্রাণ্ড রোডে পড়লো। বুলেট বললে, “বি. এল. বি. ৬৪৬৪ যাচ্ছে বোধহয় পৈলানে। তারপর ডায়মণ্ড হারবার হয়ে কাকদ্বীপেও যেতে পারে। তোমরা ফলো করো যতদূর পার। আমি এইখানে নেমে লালবাজার পুলিস হেড কোয়ার্টারে জানাই, ওরা যদি বেহালা থেকে গাড়িটা আটক করতে পারে।”

    বুলেট গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে একটা ট্যাক্‌সিতে উঠলো। বোমার গাড়ি স্ট্রাণ্ড রোড ধরে চললো দক্ষিণ দিকে।

    কলকাতায় এখন অফিস টাইম্। অফিস অঞ্চলের সব রাস্তায় লোকজন বাস ট্রাম প্রাইভেট গাড়ির মিছিল। এ সময় ভীড় হয় অসম্ভব। তার উপর আছে পদে পদে ট্রাফিক পুলিসের বা সিগন্যালের বাধা। সেসবের মধ্য দিয়ে দ্রুত গাড়ি চালানো অসম্ভব বলা চলে। বোমা তবু বেশ জোরেই চলেছে। বজ্র দূরবীন নিয়ে লক্ষ্য রেখেছে বি. এল. বি. ৬৪৬৪-এর উপর। এখনও এক-একবার দেখা যাচ্ছে গাড়িখানা, আবার ভীড়ের মধ্যে মিশে যাচ্ছে।

    পনেরো মিনিটের মধ্যে লালবাজার থেকে বেহালা থানার ও সি. বা ইন্সপেক্টারকে জানানো হলো, “বি. এল. বি. ৬৪৬৪ নম্বরের একখানা টুরিং বডি গাড়ি ডায়মণ্ড হারবার রোড ধরে দক্ষিণ দিকে যাচ্ছে। ঐ গাড়িতে কয়েকজন ডেন্জারাস টাইপের ক্রিমিনাল আছে; সঙ্গে একজন কিডন্যাপ-করা রুগ্ন যুবকও থাকতে পারে। গাড়িখানা দেখলেই আটকাবেন। ওদের কাছে পিস্তল আছে। আত্মরক্ষার ব্যাপারে সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে কাজ করবেন।”

    বুলেট লালবাজার কন্ট্রোল রুমের সামনের বারান্দায় অধীরভাবে পায়চারি করতে করতে, প্রত্যেক সেকেণ্ড-মিনিট গুণছে। ঘরের মধ্যে একজন পুলিস অফিসার বসে আছেন। অফিসার এ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান সাহেব। ঘটনাটা তিনি সবই শুনেছেন। তিনিও ফোনের অপেক্ষা করছেন আর মাঝে মাঝে পাইপ টানছেন।

    প্রায় মিনিট পনেরো পরে বেহালা থানা থেকে খবর এল, “লালবাজার থেকে ফোন পাবার মিনিট খানেক আগে ঐ গাড়িখানা বেহালা থানা পার হয়ে সোজা দক্ষিণ দিকে গেছে। পুলিস-ট্রাক পাঠানো হয়েছে ফলো করবার জন্যে। দরকার হয়তো ডায়মণ্ড হারবার পর্যন্ত ট্রাক যাবে। বিষ্ণুপুরের থানার ও. সি.-কেও জানাচ্ছি।”

    আর ফলো!–বুলেট খুবই আশা করেছিল বেহালায় বি এল বি. ৬৪৬৪ আটক পড়বে। তা হলো না। এরপর ডায়মণ্ড হারবার রোডের মত ফাঁকা নির্জন রাস্তায় ও গাড়িকে এত দেরির পর ফলো করে ধরাটা যে কতখানি অসম্ভব ব্যাপার, বুলেট তা বোঝে। তাই স্বগতভাবে বললে, ‘আর ফলো!’

    তবে এখনও সে দমে নি। তার সবচেয়ে বড় গুণ, সহজে সে দমে না বা ক্লান্ত হয়ে পড়ে না, ব্যর্থ হলে তার কর্মশক্তি আরও যেন বেড়ে যায়।

    বুলেট রাস্তায় বেরিয়ে একটা ফাঁকা চলতি ট্যাক্সিতে উঠলে। ড্রাইভারকে বললে, “চল, বেহালা।”

    অফিস কোয়ার্টারে এখনও গাড়ি বা লোকজনের ভীড় কমে নি, বিশেষত বড় বড় রাস্তায়, তাই বড় রাস্তা ছেড়ে গলির পথ দিয়ে এই অঞ্চলটা পার হয়ে ট্যাক্‌সি গড়ের মাঠের কাছে এসে রেড রোড ধরলে।

    আলিপুর পার হয়ে দুর্গানগর পোলের কাছে আসতেই বুলেট ট্যাসি থেকে দেখতে পেলে, বোমার গাড়ি রাস্তার ধারে একটা পেট্রোল পাম্পের সামনে রয়েছে। বজ্র তাতে পেট্রোল ভরাচ্ছে। বুলেট ট্যাক্‌সি ছেড়ে দিলে।

    বোমা বললে, “মোমিনপুর আসতেই বি. এল, বি. ৬৪৬৪-কে স্পষ্ট দেখতে পেলুম। ফলো করে যেমনি এই পোলটা পার হয়েছি, অমনি আমাদের গাড়ি থেমে গেল। কিন্তু হিসাব মতো পেট্রোল ফুরোবার কথা নয়।”

    বোমা খুব লজ্জিত হয়েছে।

    পেট্রোল নেওয়া শেষ হলে বুলেট বোমাকে বললে, “চল একবার বেহালা থানায় যাই। দেখি ওরা আর কোন নতুন খবর দিতে পারে কি না।”

    প্রায় এক ঘণ্টা বেহাল। থানায় অপেক্ষা করবার পর বেহালার পুলিস ট্রাক ফিরে এসে রিপোর্ট দিলে—তারা ডায়মণ্ড হারবার রোড ধরে বহুদূর পর্যন্ত গিয়েছিল; কিন্তু বি. এল. বি. ৬৪৬৪ নম্বরের কোন গাড়ি দেখতে পায় নি! তবে বিষ্ণুপুর থানার একজন কন্সটেবল বলেছে, একখানা গাড়ি কয়েক মিনিটের জন্যে সে পৈলান বাজারের সামনে থামা অবস্থায় দেখেছে। গাড়ির সামনে দুজন লোক, আর পিছনের সীটে একজন লোক, বোধহয় রোগী, কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে, দেখেছে। সে পৈলান হাটে নিজের দরকারে গিয়েছিল মিনিট দশেকের জন্যে, ফিরে এসে গাড়িটাকে আর দেখতে পায় নি, গাড়িটা কোন্ দিকে গেছে, তা বলতে পারে না।

    বেহালা থানার ও. সি লালবাজার পুলিসকে সব জানালে। তারা কি বললে জানা গেল না।

    বুলেটরা যখন ভবানীপুরে ফিরলো, তখন রাত আটটা। সকলেই কিছুটা বিমর্ষ—অবশ্য বুলেট ছাড়া। সে বললে, “এবারের যাত্রায় আমরা পুরোপুরি সফল হই নি বটে, কিন্তু আসল সূত্র দেখতে পেয়েছি যেভাবে আমরা পরিশ্রম করছি, এইভাবে করলে নিশ্চয়ই সফল হবো।”

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleশ্রীকান্ত – চলিত ভাষার
    Next Article সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোপেন্দ্র বসু
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    May 14, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    May 14, 2026
    Our Picks

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    May 14, 2026

    বৃশ্চিক – পিয়া সরকার

    May 14, 2026

    সংস্কৃতির ভাঙা সেতু – আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

    May 14, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }