Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    কিতাগড় – শ্রীপারাবত

    July 31, 2026

    বন্ধনী – সরোজকুমার রায়চৌধুরী

    July 31, 2026

    চাঁদের অমাবস্যা – সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ

    July 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    কিতাগড় – শ্রীপারাবত

    শ্রীপারাবত এক পাতা গল্প213 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    কিতাগড় – ৬

    ৬

    রান্‌কো চলে যাবার কিছুদিন পরে এক সন্ধ্যায় বাঘরায় মুখ কালো করে কিতাগড়ে এসে দাঁড়ায়। ত্রিভন তখন সবে শিকার থেকে ফিরেছে—হাতে তার দুটো সেরালী।

    এমন অসময়ে বাঘরায় সাধারণতঃ আসে না কিতাগড়ে। তার মুখের দিকে সপ্রশ্নদৃষ্টিতে চেয়ে ত্রিভন চমকে ওঠে। সে মুখে রক্তের কিছু মাত্র চিহ্ন নেই।

    —কি হয়েছে বাঘরায়?

    জবাব নেই? নির্বাক দৃষ্টিতে রাজার দিকে শুধু চেয়ে থাকে সর্দার।

    রাজা সজোরে ঝাঁকি দেয়।

    তবু বাঘরায় নীরব।

    ত্রিভন অনুমান করে বড় রকমের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে। সেরালী দুটোকে মাটির ওপর আছড়ে ফেলে দেয় সে। বাঘরায়ের হাত দুটো নিজের হাতে তুলে নেয়।

    —চুপ করে থাকলে চলবে না সর্দার। কি হয়েছে বল। যদি কিছু ঘটে থাকে তার প্রতিকার তো করতে হবে। তুমি হলে সতেরখানির সর্দার। যাই হোক না কেন, সকলের মতো ভেঙে পড়া তোমার সাজে না।

    দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাজার সামনে মাটিতেই বসে পড়ে বাঘরায় সোরেণ। রুদ্ধ কান্নার আবেগকে কোনোরকমে সামলে নিয়ে বলে—ছুট্‌কী নেই।

    —নেই? তার মানে?

    —খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

    —তবু ভালো। ত্রিভন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে—কি হয়েছে খুলে বল।

    প্রতিদিনের মতো আজও বাঘরায় ভোরবেলা উঠে তার ক্ষেতের দিকে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে ছুীকে আর দেখতে পায় না। বাঘরায় ভাবল হয়তো কোনো কারণে বাপের বাড়ী গিয়েছে। তাই কিতাগড় চলে আসে সে। বাপের বাড়ী ছুট্‌কী মাঝে মাঝে যায়। শরীরটা তার ভালো যাচ্ছিল না কিছুদিন থেকে। সব সময়েই বিমর্ষ বলে মনে হত। কথাবার্তা কম বলত শাশুড়ী বলেছিল, ছেলে হবার আগে অমন হয়। প্রথম ছেলে হবার সময় কিন্তু হাসিখুসীই ছিল ছুট্‌কী। বাঘরায় ভেবেছিল, প্রতিবার হয়তো একরকম থাকে না মন মেজাজ।

    দুপুরে কিতাগড় থেকে বাড়ী ফিরতে পারেনি বাঘরায়। কতকগুলো কাজে আটকে পড়েছিল সে। রান্‌কো বরাহভূমে যাবার পর থেকে তার ওপর কাজের চাপ পড়েছে অনেক বেশী। তাই গড়েই খাওয়া দাওয়া করেছিল। শিকারে যাবার আগে ত্রিভনই তাকে খেয়ে নিতে বলেছিল এখানে।

    বাড়ী পৌঁছে বাঘরায়ের বুক কেঁপে উঠল। ছুট্‌কী ফেরেনি। সকালের যে যে জিনিস, যেখানে পড়েছিল সেখানেই রয়েছে। তাড়াতাড়ি সারিমুর্মুর বাড়ী ছুটে যায় সে। গিয়ে শোনে, ছুট্‌কী তিনদিন যায়নি ওখানে।

    চারদিকে খুঁজতে শুরু করে বাঘরায়। প্রতিটি বাড়ীতে গিয়ে খোঁজে। কিন্তু নেই। কোথাও নেই। নিরাশ হয়ে কিতাগড়ে এসেছে শেষে

    ত্রিভন ভেবে পায়না, কী হতে পারে ছুট্‌কীর। বাঘরায় যখন খুঁজে এসেছে তখন আশেপাশে কোথাও নেই। কিন্তু যাবেই বা কোথায়?

    —কোনো ঝগড়া হয়েছিল তোমার সঙ্গে?

    —না। ওর সঙ্গে আমার কখনো ঝগড়া হয়নি।

    —আমি এখনি লোক পাঠাচ্ছি চারদিকে। তুমি যাবে?

    —না। আমার ভীষণ ভয় হচ্ছে। সাঙ্ঘাতিক কিছু দেখব হয়তো। বাঘরায় দুহাতে আবার মুখ ঢাকে।

    —ছিঃ বাঘরায়, ধারতির বেলায় তো আমি অমন করিনি।

    —আপনি রাজা।

    —আমি মানুষ—তুমিও মানুষ।

    কিছুক্ষণ স্থির হয়ে থেকে বাঘরায় বল্লে—আমি যাব রাজা।

    —আমিও যাব তোমার সঙ্গে।

    —এই অন্ধকারে?

    —ধারতির বেলায় তুমি খুঁজে বেড়াওনি সারারাত?

    —রাজা! বাঘরায়ের চোখে জল আসে এতক্ষণে। শুকনো চোখ নিয়ে বড় কষ্ট পাচ্ছিল সে।

    একটু চুপ করে থেকে বাঘরায় বলে ওঠে—কিন্তু রাজা, এখন তো মঙ্গল হেম্বরম্ নেই।

    —চপ্। ও নাম মুখেও এনো না। লোকের যা বিশ্বাস তাকে যেন বিন্দুমাত্র সন্দেহের ছায়া না পড়ে।

    অনুসন্ধান ব্যর্থ হয়। ছুটকী নেই। ঘুরতে ঘুরতে মারাংবুরুর গুহার সামনে আসে ত্রিভন আর বাঘরায়। এখানেও একবার খুঁজতে হয়—নইলে মনের খুঁতখুঁতি যায় না।

    এখন আর এখানে এলে কুকুরের আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায় না। সেই কুকুর বন্দী অবস্থায় না খেতে পেয়ে মরে পড়েছিল। নতুন পূজারী এসে ফেলে দিয়েছে তাকে।

    ঘুমিয়ে ছিল পূজারী। ত্রিভনের ডাকাডাকিতে চোখ মুছতে মুছতে বাইরে আসে। রাজাকে দেখে বিস্মিত হয়।

    সমস্ত ঘটনা শুনে সে বলে,—তাকে তো দেখেছি রাজা!

    —দেখেছ? ছুট্‌কীকে?

    হ্যাঁ। সারিমুর্মু সর্দারের মেয়ে তো?

    —হ্যাঁ হ্যাঁ, কখন দেখেছো? কোথায়? বাঘরায়ের হৃপিণ্ড যেন ফেটে বার হয়ে আসতে চায়।

    —সকালে। ওই নীচের পথ দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল।

    —ছুটে যাচ্ছিল?

    —হ্যাঁ। খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ছেলেপিলে হবে দেখলাম।

    বাঘরায় নিজেকে সংযত করে বলে—কিছু জিজ্ঞাসা করেছিলেন আপনি?

    —করেছিলাম। বলল, মানত আছে কোন্ বন-দেবতার কাছে। ছেলে যাতে বাঁচে।

    ত্রিভন আর বাঘরায় পরস্পরের মুখের দিকে চায়। এ এক গভীর রহস্য। মানতই যদি থাকে, সেকথা স্বামীকে গোপন করবে কেন?

    —সত্যিই তুমি জানতে না বাঘরায়?

    —না রাজা।

    আরও এগিয়ে যায় দুজনা কিন্তু কোথায় সেই বন-দেবতার ঠাঁই? নিরাশ হুয়ে শেষরাতে ফিরে আসে তারা কিতাগড়ে।

    দুপুরে অনুসন্ধানকারীদের একজন ফিরে আসে।

    বাঘরায় বার হয়নি। দেহ-মনে সে অবসন্ন। ফাঁকা দৃষ্টিতে সামনের দিকে চেয়ে সে চুপ করে বসেছিল রাজার পাশে।

    লোকটি রাজার সামনে এসে দাঁড়ায় মাথা নীচু করে।

    —খবর পেলে?

    —হ্যাঁ, রাজা।

    পেয়েছো? কোথায়? চিৎকার করে ওঠে বাঘরায়। মুহূর্তে তার সমস্ত অবসন্নতা ঘুচে যায়। উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে সে।

    —আমদাপাহাড়িতে।

    বাঘরায় মূক। আর উত্তেজনা স্তব্ধ। দৃষ্টিতে তার চূড়ান্ত অসহায়তা। সে টলতে থাকে।

    ত্রিভন তাড়াতাড়ি উঠে তাকে ধরে ফেলে বলে—এ কী বাঘরায়?

    —আমি বুঝতে পেরেছি রাজা।

    —কী বুঝেছ?

    —ওর মানত। একটি সুদীর্ঘ শ্বাস নির্গত হয় তার অতবড় বুকখানাকে কাঁপিয়ে দিয়ে। শেষে অস্ফুট স্বরে লোকটিকে প্রশ্ন করে,—সে কি বেঁচে আছে?

    —না।

    ত্রিভনও এতটা আশঙ্কা করেনি। কিন্তু বাঘরায়ের দিকে চেয়ে সে বিস্মিত হয়। দুঃসংবাদটা জানার সঙ্গে সঙ্গেই সে যেন নিজের শক্তি নিজের দৃঢ়তা ফিরে পায়। একটুও টলে না, পা কাঁপে না। চোখের পাতাও নড়ে না তার। লোকটির দিকে চেয়ে ধীরে ধীরে বলে—কোথায় সে? নাগাদের সেই টিলার ওপর?

    —হাঁ। বাচ্চাটাও বাঁচেনি।

    বাঘরায়ের মুখ যন্ত্রণায় নীল হয়ে ওঠে।

    —তুমি স্থির হয়ে বসো বাঘরায়। ত্রিভন বলে

    —ভাববেন না রাজা। আমি ঠিক আছি। কিন্তু বাচ্চাটা হল কখন? আপন মনে বিড়বিড় করে বাঘরায়।

    লোকটি শুনতে পায় বাঘরায়ের স্বগতোক্তি। সে বলে—ওখানেই হ’য়েছে সর্দার। তিনি যেখানে পড়ে আছেন—তার পাশেই; মারা যাবার ঠিক আগে হয়েছে মনে হয়।

    —কাকে পাহারায় রেখে এসেছ? ত্রিভন প্রশ্ন করে।

    —গ্রামের সবাই। সোরেণ সর্দারের বউ শুনে একপাও নড়েনি, কেউ-নড়বেও না।

    আমদাপাহাড়ীতে যাবার পথে বাঘরায় কোনো কথা বলে না। কলের মতো চলেছে ত্রিভনের পাশে পাশে। বিজলীর পিঠে চড়ে আসতে পারেনি ত্রিভন—বাঘরায় সঙ্গে ছিল বলে। সে চেষ্টা করেছিল বাঘরায়কে রেখে আসতে। পারেনি।

    শেষে সেই প্রসিদ্ধ পরিচিত টিলাটির কাছাকাছি এসে থমকে দাঁড়ায় বাঘরায়। ছুট্‌কীর শেষ অবস্থা নিজের চোখে দেখতে বোধ হয় ভীতি বোধ করে সে—সইতে পারবে না বলে। কিংবা এ-ও হ’তে পারে—শক্তি সঞ্চয় করছে একটু থেমে নিয়ে

    —তুমি না হয় এখানে দাঁড়াও। আমি দেখে আসি।

    —না না, রাজা। আমি যাব। দেখতেই হবে আমাকে।

    ইতিমধ্যেই খবর রটেছিল, রাজা আসছেন। একদল লোক দেখতে পেয়ে টিলার ওপর থেকে ছুটে এসে অভ্যর্থনা জানায়। বাঘরায় প্রতিটি মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখে। আশার কথা এতগুলো লোকের মধ্যে কেউ-ই শোনাতে পারে না? কেউ বললেও বলতে পারে, একটু নড়ে উঠল যেন, বোধ হয় বেঁচে আছে।

    —না, ভুল। আশা করা পাগলামী। সর্দারের পক্ষে এ-পাগলামী শোভা পায় না।

    —চলুন রাজা। বাঘরায় বলে।

    —আগে আমিই যাই।

    —না। আমি যাব।

    ভীড়ের মধ্যে একজন বলে—মনে হচ্ছে যেন ঘুমিয়ে আছে বাচ্চাটাকে পাশে নিয়ে। প্রথমে যে দেখেছিল, সে তো তাই ভেবেছিল।

    তারা গিয়ে দেখে, সত্যিই ঘুমিয়ে রয়েছে ছুট্‌কী। বাচ্চাটাও পড়ে রয়েছে মায়ের ঠিক পাশেই। কিন্তু মায়ের সঙ্গে নাড়ীর সংযোগ ছিন্ন হয়নি। অবসর মেলেনি। এ এক ভয়ংকর নাড়ীর টান—যার ফলে মা-ছেলে কেউ-ই বাঁচল না।

    ত্রিভনের চোখের পলক পড়ে না।

    বাঘরায় নির্বাক।

    হঠাৎ সে ছুটে যায় ছুট্‌কীর দিকে। বসে পড়ে তার পাশে। ছুট্‌কীর ডান হাতের মুঠো বন্ধ। যেন চেপে ধরে রেখেছে সে। বাঘরায় মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নেয় সেটা। জিনিসটির দিকে চেয়ে শিশুর মতো কেঁদে ওঠে সে।

    কেউ কিছু বুঝতে পারে না। ত্রিভনও নয়। দুঃখের মধ্যে একটা চাপা কৌতূহল সবার চোখে মুখে।

    বাঘরায় ধীরে ধীরে উঠে রাজার কাছে এগিয়ে আসে। পাতায় জড়ানো একটি মোড়ক দেখিয়ে বলে—এই দেখুন রাজা।

    —এটা কী বাঘরায়?

    —ডুইঃ-এর অস্থি। এতদিন খুঁজে খুঁজে পাইনি। ছুটকী লুকিয়ে রেখেছিল যখের ধনের মতো।

    —তোমার কথা তো বুঝছি না বাঘরায়।

    রাজাকে একপাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে চোখের জলে ভেসে সর্দার বাঘরায় সোরেণ বলে—ছুট্‌কী ছেলেমানুষ ছিল, তাই বুঝতে পারেনি আগে। নিজে মরল—আমাকেও মেরে রেখে গেল।

    আমদাপাহাড়িতে কতবার ছুটকী আসতে চেয়েছে। সাধারণ কৌতূহল ভেবে প্রথমে উড়িয়ে দিত বাঘরায়। শেষে এড়িয়ে গিয়েছে। রাগও করেছে ছুট্‌কীর বাড়াবাড়ি দেখে। কিন্তু কখনো কোনো সন্দেহ জাগেনি মনে। ডুইঃ-এর সঙ্গে ছুট্‌কীর একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। তাই ডুইঃ শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছে কোথায়, সে জায়গা দেখার আগ্রহ খুবই স্বাভাবিক।

    কিন্তু দিনে দিনে ভেতরে ভেতরে মিথ্যার ভিত্‌ ধ্বসে গিয়েছে। উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে—যা আসল সত্যি। তখন আর ছুটকী কোনো বাধাই মানেনি। ছুটে এসেছে আপনজনের কাছে। নিজেও সেখানে শেষ নিঃশ্বাস ফেলে নিশ্চিন্ত হ’য়েছে। এখন বাঘরায় বুঝেছে, কেন ছুট্‌কী হাসি ভুলেছিল, কেন সে সব সময় একা একা বসে ভাবত—কেন গুণগুণ করে গাইত ডুইঃ-এরই বাঁধা গান।

    নাগা সন্ন্যাসীদের সঙ্গে যুদ্ধে জিতে ডুইঃ-এর অস্থি নিয়ে বাঘরায় যখন ফিরে এল বাটালুকায়, তারপর থেকেই আসল সত্যি আবছাভাবে ছুট্‌কীর মনে ধরা পড়েছিল। কিন্তু গভীরভাবে জিনিসটি সে তলিয়ে দেখেনি। তবু অস্থির মোড়কটি লুকিয়ে রেখেছিল মহা সম্পদ হিসাবে। সেই সম্পদের মূল্য দিনে দিনে বাড়তে বাড়তে শেষে কাণায় কাণায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

    ভাঙা গলায় বাঘরায় বলে—রাজা, তীর্থস্থানে এসেছে ছুট্‌কী। মারাংবুরুর পূজারীকে সে ঠিক কথাই বলেছিল—বন-দেবতার পূজো দিতে এসেছে। সে-পূজোর বলি ছুী নিজে আর তারই রক্তমাংসে বড় হয়ে ওঠা ওইটি। বাঘরায় আঙুল দিয়ে দেখায়।

    ত্রিভন স্তব্ধ। এ অভিজ্ঞতা তার কখনো হয় নি। মানুষের মনের এই জটিলতার শিক্ষা আজ তার প্রথম। অপরাধ কারও নয়—অথচ এই নিষ্করুণ অভিশাপ ব্যর্থ করে দিল তিনটি জীবনী-শক্তিতে ভরপুর মানুষকে।

    বাঘরায়, ডুইঃ, রান্‌কো—সব সর্দারই যে শুধু বিষটুকুই পান করছে। সারিমুর্মুও। মেয়ের জন্যে তারও বুক ভাঙবে। সর্দাররা বোধ হয় শুধু দুঃখই পায়। পারাউমুর্মুও তাই পেয়েছিল। তবে কি অমৃতটুকু রাজাদের একচেটিয়া?

    নিজেকে অপরাধী বলে মনে হয় ত্রিভনের। বাঘরায়ের দিকে চাইতে পারে না। সতেরখানির সব রূপ, সব রস, সবটুকু গন্ধ যেন নিজেই শুষে নিয়েছে সে। কারও জন্যে ছিটেফোঁটাও ফেলে রাখে নি। হতভাগ্যেরা ছোটাছুটি করেছে, সামান্য একটু আনন্দ, সামান্য সান্ত্বনার জন্যে কিন্তু পাচ্ছে না। পেতে হলে রাজার স্বার্থপর বুকখানাকে ভেঙে চুরমার করে দিতে হয়।

    চোখে জল আসে ত্রিভনের। সামনের ভীড় করা বুকগুলো যেন বিরাট শূন্যতা নিয়ে হাহাকার করছে।

    ত্রিভনের দুহাতের মুঠো শক্ত হয়ে ওঠে। একটা প্রতিহিংসার চরিতার্থতা প্রয়োজন। কিন্তু কার ওপর সেই প্রতিহিংসা? সে জানে না। তবু বুঝতে পারে, কে যেন অন্যায় করছে—ঘোরতর অন্যায়। তাকে খুঁজে বার করতে হবে। এতে দিন যাক্ মাস যাক্, বছর যাক—ক্ষতি নেই, সে থামবে না। মুখোমুখি দাঁড়াবে সেই অন্যায়ের জঘন্য প্রতিমূর্তির সামনে—মঙ্গল হেম্বরমের সামনে যেভাবে দাঁড়িয়েছিল। সে দিনের পরই আসবে সুদিন। ভরে উঠবে এতগুলো বুক—রূপ রস গন্ধে। মাতাল হবে তারা মহুয়া খেয়ে—নাচবে তারা, গাইবে তারা। কিতাডুংরিতে আনন্দের ঢেউ বইবে। টামাক, তিরিওর শব্দে শালবনের পাতা নাচবে।

    রান্‌কো কিস্‌কু ফিরে আসে বরাহভূম থেকে। দুঃসংবাদ নিয়ে আসে সে। মহারাজ তার কোনো কথাই শোনেননি। এ-বছরের জন্যে কর না দেবার প্রশ্ন দূরে থাকুক, দরবারে তাকে ভৃত্যদের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। অথচ সে শুধু দূত নয়, সে গিয়েছিল রাজার ব্যক্তিগত প্রতিনিধি হিসাবে।

    রান্‌কোর প্রতিটি কথা ত্রিভন গম্ভীর হয়ে শোনে। বুধকিস্‌কুর কপালের রেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমন কি বাঘরায়ের এ-কয়দিনের ভাবলেশহীন মুখেও রক্তের আভাস দেখা যায়

    সারিমুর্মুও এসেছিল কিতাগড়ে। বাড়ীতে তার মন টেকে না—সব সময় তার আতঙ্ক, সে পাগল হয়ে যাবে। তাই অবসর চেয়েও পুরোপুরি অবসর নিতে পারেনি। রান্‌কোর কথায় সে ধীরে ধীরে বলে—এবারে প্রস্তুত হন রাজা।

    কিছুক্ষণ আলোচনা চলার পর রান্‌কো হঠাৎ বলে ওঠে—এবারে আসল কথা বলি রাজা?

    তার কথা শুনে সবাই অবাক হয়। এত কথার পরও আসল কথা বলেনি রান্‌কো?

    —আসল কথা? সবাই নড়েচড়ে বসে। ভাবতে চেষ্টা করে, এর পরও আসল কথা তার কি থাকতে পারে।

    ত্রিভনের সপ্রশ্ন মুখের দিকে চেয়ে রান্‌কো বলে—সমস্ত কিছুর জন্যে শুধু একজনও দায়ী।

    —একজন? কে সে?

    —নরহরি।

    বিস্মৃতির দিকে দুহাতে ঠেলে দেওয়া একটা নাম যেন ঘুরে এসে সবার মনকে নাড়া দিল।

    —নরহরি? সে কোথায়?

    —দরবারে ঢোকার সময়ে দেখি, মর্যাদার আসনগুলির একটি দখল করে বসে আছে। আমাকে দেখেই কোনো ছুতো করে তাড়াতাড়ি চলে গেল। মনে হল ভালুকের তাড়া খেয়ে যেন পালাচ্ছে।

    অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে রাজা বলে—বুঝেছি, নরহরি প্রতিশোধ নিতে চায়। বৈষ্ণব ধর্ম জলাঞ্জলি দিয়ে তাই রাজার মন্ত্রী হয়ে বসেছে।

    —তাহলে আমাদের প্রস্তুতই হতে হবে? বুধ বলে।

    —হাঁ, কোনো সন্দেহ নেই তাতে। বাঁচতে আমাদের হবেই। তবে মহারাজের আক্রমণের অপেক্ষায় বসে থাকলে চলবে না। আমরাই আক্রমণ চালাব।

    —সে কি সম্ভব? বুধ বলে।

    —অসম্ভব হবে কেন? খাঁড়েপাথরের কথা কি শোনেনি কেউ।

    বুধ যেন লজ্জা পায়। বয়স হয়েছে তার। ভীরু না হলেও, নতুন কিছুতে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে নানান্ চিন্তা আচ্ছন্ন করে তাকে।

    ত্রিভন বুঝতে পারে তার মনোভাব। সে বলে—তুমি আর সারিমুর্মু দেশেই থাকবে সর্দার। বাইরে থেকে কোনো হামলা এলে, তাদের শান্তি দেবার ভার তোমাদের দুজনার ওপর রইল।

    —তাই হবে রাজা।

    —বাঘরায়, তুমি সুপুর রাজ্যের ভার নাও। পাঁচদিনের মধ্যেই চোয়াড়দল নিয়ে রওনা হতে হবে তোমাকে। এর সব বন্দোবস্ত তোমাকেই করতে হবে।

    —আমি প্রস্তুত রাজা। বাঘরায়ের চোখ দুটো চক্‌চক্ করে ওঠে। সে এইরকম একটা কিছু চাইছিল। বাটালুকায় এখন তার দম বন্ধ হয়ে আসে। সে চায় উত্তেজনা—সব কিছুকে ভুলিয়ে দেবার মতো নেশা-ধরা উত্তেজনা। যুদ্ধের চেয়ে সেরা জিনিস আর কি থাকতে পারে? নাম শুনলেই রক্ত নেচে ওঠে।

    —রান্‌কো।

    —আমাকে বরাহভূমের ভার দিন রাজা। ভৃত্যদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার অপমান ভুলতে পারছি না।

    —বরাহভূমের আগে একবার ধলভূম ঘুরে এসো। অনেক দূরের পথ বটে, কিন্তু জিততে পারলে কিছু রসদ সংগ্রহ করে আনতে পারবে। আমাদের রসদের প্রয়োজন।

    —আমি ধলভূমেই যাব রাজা। মনে মনে ত্রিভনের বুদ্ধির তারিফ করে রান্‌কো।

    —বুধকিস্‌কু, আজই ঢাউরার ব্যবস্থা কর। শুধু হাটে-মেলার নয়। প্রতিটি গ্রামের প্রতিটি বাড়ীর লোক যাতে শুনতে পায় সেইভাবে ঢাউরা দিতে হবে। লোক চাই—যুদ্ধের জন্যে প্রচুর লোক চাই। স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয় যেন, এ-যুদ্ধ এক-আধ দিনের নয়। কতদিন চলবে কেউ বলতে পারে না। যারা আসতে চায় তারা খুব তাড়াতাড়ি যেন কিতাগড়ে এসে জমা হয়।

    —আমি আজই ব্যবস্থা করছি রাজা।

    —সর্দার সারিমুর্মুকেও একটা ভার দিচ্ছি। কে কোন্ দলে গেল, গোবিন্দকে দিয়ে তা যেন লিখে রাখা হয়।

    সম্মতি জানায় সারিমুর্মু।

    ত্রিভন এবারে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,—সবশেষে একটা কথা জানিয়ে দিই। তা না জানালেও চলত অবশ্য কারণ-নতুন কিছু নয়। তবু নিয়মতো জানানই উচিত। চোয়াড়বাহিনীর চিরকালের যা যুদ্ধপ্রথা তাই আমরা অনুসরণ করব। আমাদের উদ্দেশ্য হবে ওদের রাজ্যের শান্তি নষ্ট করা আর রসদ সংগ্রহ। আসল যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে হবে। লোকসংখ্যা আমাদের বড় কম। তবে দৈবাৎ যদি কখনো শত্রুসৈন্যের মুখোমুখি পড়ে যাও, তখন আমাদের শক্তিটা দেখিয়ে দিতে ভুলো না।

    চার সর্দারের সপ্রশংস দৃষ্টির সামনে দিয়ে ত্রিভন কিতাগড়ের অন্দরমহলে প্রবেশ করে।

    .

    সে রাতে বিমর্ষ ত্রিভনের পাশে ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ায় ধারতি। কিতাগড়ের প্রহরী ছাড়া সমস্ত প্রাণী ঘুমে অচেতন। ত্রিভন শয্যার ওপর কিছুক্ষণ ছট্‌ফট্ করে ধারতিকে নিদ্রিত ভেবে উঠে এসেছিল অন্দরের আঙিনায়। গ্রহরীরও প্রবেশের অধিকার নেই এখানে।

    বসে বসে ভাবছিল সে, এভাবে এগিয়ে যাওয়াটা উচিত হল কিনা। নিজের তরফের অবস্থা তার অজানা নেই। যুদ্ধের জন্যে চাষবাষ হবে না ভালো করে। অনেক পুরুষ নিহত হবে—কিংবা ফিরে আসবে বিকলাঙ্গ হয়ে। সে সময়ে দুর্দিন দেখা দিতে বাধ্য

    ধারতির স্পর্শে চমকে ওঠে রাজা।

    —ঘুমোওনি তুমি?

    —তোমার মনে অশান্তি। কোন্ শান্তিতে ঘুমোবো?

    —ভাবছি ঝোঁকের মাথায় এ সব করে বসলাম না তো?

    —এ ছাড়া আর কি করতে পারতে?

    —একটা মীমাংসায় আসা কি সম্ভব হতো না চেষ্টা করলে?

    —হ্যাঁ। তবে মাথা বিকিয়ে। বুড়ো দাদুর মুখে শুনেছি, সম্মানটাই হল আসল, তারপরে জীবন।

    ত্রিভন ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলে—পারাউ সর্দার সত্যি কথাই বলত। ভুল আমি করিনি। কিন্তু এতগুলো লোককে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছি বলে দুশ্চিন্তা

    —তারা তোমাকে ভুল বুঝবে না রাজা।

    —তাদের স্ত্রী—তাদের ছেলেমেয়ে? পথের পানে দিনের পর দিন চেয়ে থেকে যখন তারা হতাশ হবে? তাদের প্রিয় পুরুষটি যখন আর ফিরবে না—তখন?

    —তখনো। আমি যে তাদেরই একজন রাজা। আমার মন আর তাদের মন একই। আমাকে দিয়েই আমি বুঝতে পারছি। সতেরখানির মেয়েরা যোদ্ধারি মেয়ে, তারা যোদ্ধার স্ত্রী। বিয়ের পরের দিন বুড়োদাদু কি বলেছিলেন ভুলে গেলে।

    ধারতিকে দুহাত দিয়ে চেপে ধরে ত্রিভবন উত্তেজিত হয়—বলে, ঠিক বলছ ধারতি?

    —হ্যাঁ রাজা। সাঁওতাল আর মুণ্ডাদের কাছে সম্মানই জীবন

    কৃষ্ণপক্ষের রাতের কোটি তারার অস্পষ্ট আলোয় ত্রিভন চেয়ে থাকে তার ধারতির মুখের দিকে। সে মুখ কাঁটারাঞ্জার শালবনের মতই সজীব, সতেজ আর সত্যি।

    ধারতি মৃদু হেসে বলে, কি দেখছ অত?

    —সতেরখানি।

    —এখেনে? ধারতি আঙুলের ডগা দিয়ে নিজের মুখ স্পর্শ করে।

    —হুঁ।

    —দেখোনি?

    —এমনভাবে বোধ হয় দেখিনি।

    —আর দেখতে হবে না। ত্রিভনের কোলে মুখ লুকোয় ধারতি।

    পরম পরিতৃপ্তি ত্রিভনের মনে। সেই মুহূতে সে ভুলে যায় যে বাঘরায় শূন্য মনে শূন্য শয্যার ওপর ছট্‌ফট্ করছে। সবই হত, কিন্তু কিছুই হলো না তার। স্ত্রীকে পেল, ভালোবাসল, প্রতিদানও পেল ভালোবাসার অথচ টিকল না। মাঝখান থেকে শুধু পেয়ে হারানোর তীব্র ব্যথা, পিতৃস্নেহের ব্যথা, তার বুকখানাকে ধসিয়ে দিয়ে গেল।

    তবু আজ রাতে অন্তত বাঘরায়ের এক মস্ত সান্ত্বনা রয়েছে—সে যুদ্ধে যাবে। যুদ্ধ থেকে না-ফেরার সৌভাগ্য তারও হতে পারে ডুইঃ-এর মতো। ডুইঃ-এর মৃত্যু দুর্ভাগ্যের। সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে কত আনন্দই না অনুভব করেছিল পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারল ভেবে। বেচারা জানতে পারল না, মরে যাওয়ায় কত বড় হতভাগ্য সে।

    পারাউ মুর্মুর ঘরে রান্‌কো তখন তার নিজের জন্যে একটা ধনুক তৈরী করছিল—প্রদীপের আলোর নীচে। রাতের নিদ্রা বহুদিন থেকেই তার নেই। শেষ রাতে অবসন্ন হয়ে একটু ঘুমিয়ে নেয়।

    রান্‌কোর চোখে ভাসে ঝাঁপনীর সেই মূর্তি—শালবনের মধ্যে বরাহভূমে যাবার দিন দেখেছিল যাকে। সে যেন ঝাঁপনীর প্রেতাত্মা। দেখার পর থেকে পৃথিবীর অনেক কিছু তার কাছে মূল্যহীন বলে বোধ হয়েছিল। কিন্তু ছুট্‌কীর মৃত্যুর বিবরণ শুনে সে যেন আবার বল পেয়েছে। ব্যর্থতার বল–বেদনার বল। কোমরে কাঠ নেওয়া ঝাঁপনীর সাংসারিক কথাবার্তার মধ্যে তাকে খোঁজা বৃথা। আসল ঝাঁপনী রয়েছে তার অন্তরের গভীরতম প্রদেশে। সে নিজেই হয়তো তা জানে না—জানতে চায় না। কারণ জেনে লাভ নেই কোনো। সেদিন ঝাঁপনী নিজের ওপরটাই শুধু দেখিয়েছিল হয়তো, যেমন ছুট্‌কী দেখাত নিজেকে না জানতে পেরে। তবু যদি একবার ঝাঁপনী আচমকা আভাসে প্রকাশ করে ফেলত তার আগেকার মনকে, বড় ভালো হত। ব্যর্থতার বেদনা উপভোগের মধ্যে একটা দ্বিধাভাব আসত না।

    ধনুক তৈরী করতে করতে রান্‌কো প্রতিজ্ঞা করে আর কোনোদিন সে ঝাঁপনীর সামনে যাবে না। দৈবাৎ দেখা হলেও কথা বলবে না। সেদিনের ঘটনা ভুলে যাবার চেষ্টা করবে। ঘর ছেড়ে চলে আসার দিনের ঝাঁপনীকেই সে মনে রাখবে চিরকাল।

    বিদায়ের দিন এসে গেল। বাঘরায় আর রান্‌কো প্রস্তুত হল। তাদের সঙ্গে যাবে সতেরখানি তরফের সিকি ভাগ পুরুষ। চাষবাসকে তো বন্ধ করা যায় না। নইলে অধ্যেক যেত। ঢাউরার জবাবে প্রায় সবাই জমা হয়েছিল কিতাগড়ে। সবাই যেতে যায়। বেছে নিতে হল তাদের ভেতর থেকে। শুধু একজন পুরুষই যে পরিবারের সম্বল। তাদের ঠেলে দেওয়া যায় না মরণের মুখে। আর যেতে দেওয়া যায় না তাদের, যারা ফসল ফলায়। অনেক আবেদন নিবেদনকে উপেক্ষা করতে হল তাই।

    যাত্রার আগে কিতাডুংরির উৎসবের স্মৃতি মনের মধ্যে গেঁথে নিয়ে যাবে তারা।

    রাজা রাণীর সঙ্গে তরফের সবাই ভেঙে পড়ে সেখানে। রাণী বসলো রাজার পাশেই সেই পাথরের ওপর। চোখ জুড়োলো সকলের সজল চোখে ভাবল সবাই, রাণী যে তাদেরই ঘরের মেয়ে।

    সারিমুর্মু কেঁদে বলে ওঠে—রাজা, আজ যদি আমার ছেলে থাকত।—আছে। রাণী বলে ওঠে সঙ্গে সঙ্গে।

    ত্রিভন অবাক হল। অবাক হয় সর্দারেরা—আর যারা শুনেছিল রাণীর কথা।

    —বাঘরায় সোরেণ আপনার ছেলে সর্দার।

    —বাঘরায়? তাই তো। হ্যাঁ হ্যাঁ—বাঘরায়, তুই-ই আমার ছেলে।

    ছুটে এসে বৃদ্ধ সর্দারের হাঁটু জড়িয়ে ধরে ছিল বাঘরায়। বলেছিল-আমি তোমারই ছেলে সর্দার। কিন্তু আশীর্বাদ করে যেন আর ফিরে না আসতে হয়। আমারও যে ছেলে নেই। ছুট্‌কী একজনকেও রেখে গেল না।

    রাণীর মুখ বেদনায় ক্লিষ্ট। রাজা বিচলিত

    রান্‌কো এগিয়ে আসে। বাঘরায়ের হাত ধরে টেনে তোলে। তার মুখের দিকে চেয়ে মৃদু হাসে! শেষে বলে—খালি বুকেই আগুন জ্বলে বাঘরায়। সেই আগুণই না ঘরের বাইরে ছুটিয়ে নিয়ে যায়! এত বীরত্ব আর যুদ্ধ—সব ওই খালি বুকের কাণ্ড। ভরা বুক একটুকুতেই ভয়ে কাঁপে। হারাবার ভয়। যার সব হারিয়েছে তার ভয় কি?

    শেলের মতো ত্রিভনের বুকে কথাগুলো এসে বেঁধে। থাকতে না পেরে সে বলে- একি সত্যি রান্‌কো?

    —হ্যাঁ রাজা।

    —এত লোক এখানে জমা হয়েছে,—হাণ্ডি খেয়ে নাচছে, গাইছে। অনেকেই শেষবারের মতো এসব করছে। সবারই বুক কি খালি?

    —না রাজা। সতেরখানিকে তারা ভালোবাসে, তাই যাচ্ছে। তারা লড়বে, বীরত্বও দেখাবে। কিন্তু ঝাঁপিয়ে পড়া যাকে বলে—তারা তা পারবে না। ভানুমতীর খেল দেখাবার সাধ্য তাদের নেই। খেল দেখায় ডুইঃ টুডু। বাঘরায় সোরেণ আর রান্‌কো কিস্‌কুর দল।

    রাণীর কথা রান্‌কো ভুলে গিয়েছিল। হঠাৎ সেদিকে নজর পড়তে রাজ্যের সংকোচ এসে তারা মাথাটাকে হেঁট করে দেয়।

    রাজা চিন্তান্বিত হয়। মনে পড়ে তার সেদিনের কথা, সেদিন অদৃশ্য হল ধারতি। প্রচণ্ড মশার কামড় সহ্য করে প্রহরের পর প্রহর বসেছিল মারাংবুরুর ঠাঁইয়ের পাশে ঝোপের মধ্যে। ভালুকের কথা মনে হয়নি—সাপের কথাও নয়। স্বাভাবিক অবস্থায় সে কি তা পারত? বোধ হয় না। তখন যে বুক ছিল শূন্য।

    —তোমার কথা সত্যি রান্‌কো। ধীরে ধীরে বলে ত্রিভন।

    ত্রিভন আবার ভাবে। বুক ছিল তার শূন্য সেদিন, কিন্তু তবু আশা ছিল। ধারতিকে ফিরে পাবার আশা। তাই নির্ভীক হলেও, সতর্কতা ছিল বাঘরায়ের সে বালাই নেই। সে সব চাইতে হতভাগা। রান্‌কোর আশা এখনো সম্পূর্ণ নিঃশেষিত হয়েছে বলা যায় না—কিন্তু বাঘরায়ের আশার ভাণ্ডার পুরোপুরি খালি। সে জেনেছে, এতদিন যাকে নিয়ে ঘর করেছে, সে ছিল একান্তই অন্যের। ছুট্‌কী বেঁচে থাকলে তবু প্রতীক্ষার অগ্নি-পরীক্ষা দিতে পারত সে-যেমন দিচ্ছে রান্‌কো–সে পথও বন্ধ বাঘরায়ের

    মেয়েরা দল বেঁধে নেচে চলেছে পুরুষদের ঘিরে ঘিরে। হাণ্ডি খাওয়া নাচে সংযমের বালাই থাকে না। আজ একেবারেই নেই। সবাই জানে যে-সমস্ত পুরুষ আজ জমা হয়েছে এখানে তাদের অনেকেই সতেরখানির মাটিতে আর পা দেবে না কোনোদিনও। উদ্দামতা তাই সীমা ছাড়িয়েছে। পুরুষেরা চায় চরম স্ফূর্তি, মেয়েরা চায় শেষবারের মতো তুষ্ট করতে তাদের—নিজেরাও তুষ্ট হতে।

    কাণ্ড দেখে ত্রিভন নীচুগলায় ধারতিকে বলে—এবার তোমার ফিরে যাওয়াই ভালো।

    —কেন?

    —দেখছ না?

    —কি?

    —বলে দিতে হবে?

    —এমন তো হবেই। আমার তুমি আছো–তোমার আমি আছি। কিতাপাট দুজনকে কাছে এনে দিয়েছেন। অনেকের তো সে সুযোগ হয় নি। কাঁটারাঞ্জায় যখন ছুটে যেতাম আমরা—সে সময়ে যদি তুমি যুদ্ধে যেতে কি করতাম আমি? এমন সুযোগ হয়তো তোমার আসেনি রাজা বলে। এলে কি ব্যর্থ হতে দিতে?

    ত্রিভন যেন ধারতির নতুন পরিচয় পায়। তারও ইচ্ছে হয় ধারতির হাত ধরে ওদের দলে মিশে গিয়ে উন্মত্ত হয়ে ওঠে।

    ঝাঁপনী বসেছিল এক শালগাছের গোড়ায় তিনটে ছেলে নিয়ে। সবচেয়ে ছোটটি ঘুমিয়েছিল তার কোলে। তার ওপরেরটি সামনে কাঁদছিল মায়ের দুধ খাবার জেদ ধরে। অন্যদিন হলে তার পিঠে দু’চার ঘা বসিয়ে দিত ঝাঁপনী। কিংবা রাগ করে স্তনের ডগা মুখে ভরে দিয়ে নিশ্চিন্ত হত। কিন্তু আজ একটু অন্যমনস্ক সে।

    সাল্হাই হাঁসদা আসেনি এখানে। তার নাকি অনেক কাজ রয়েছে ক্ষেতে। ঢাউরা শুনে সে কিতাগড়েও যায়নি। ঝাঁপনী ছি ছি করেছিল লজ্জায়। সাল্‌হাই হেসেছিল। সর্দার হবার শখ ছিল তার। তা যখন সম্ভব হয়নি, তখন এসব অশান্তির মধ্যে গিয়ে লাভ কি?

    ঝাঁপনীকেও আজ সে আসতে মানা করেছিল কিতাডুংরিতে। শোনেনি ঝাঁপনী। এতগুলো লোক যুদ্ধে যাচ্ছে—দেখেও কত আনন্দ। তাছাড়া আর একটা আশাও ছিল।

    হঠাৎ সে চমকে দেখে পাশে রান্‌কো দাঁড়িয়ে। হাসিমুখে তার ছোট বাচ্চাটার দিকে চেয়ে রয়েছে।

    —আবার হবে নাকি? প্রশ্ন করে রান্‌কো। ঝাঁপনীকে একা বসে থাকতে দেখে সে পূর্ব প্রতিজ্ঞা ভুলে গিয়েছিল।

    —যাঃ, কি যে বল।

    —সাল্হাই কোথায়?

    —আসেনি!

    —আজও এলো না?

    —তার নাকি ক্ষেতে অনেক কাজ।

    —ও। রান্‌কো একটু থেমে বলে,—তুমি এমন চুপ করে বসে আছো যে?

    —কি করব?

    —নাচবে, হাণ্ডি খাবে—সবাই যা করছে।

    —এরা? নিজের ছেলেদের দেখায় ঝাঁপনী

    রান্‌কো অবাক হয়, ঝাঁপনী একেবারে বদলায় নি তাহলে। সাল্হাই তাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে পারেনি এখনো। সে বলে—এরা আর কারও কাছে থাকবে। বুড়ীর অভাব আছে নাকি?

    —কার সঙ্গে নাচবো?

    —যার সঙ্গে ইচ্ছে।

    —ঝাঁপনী সঙ্কোচে বলে—তুমি? রান্‌কোর কাছে থাকার সময়ে তারা প্রায়ই নাচত। সেই স্মৃতি বোধহয় মনে পড়ে।

    —হুঁ।

    ঝরঝর করে ঝাঁপনীর চোখে জল গড়িয়ে পড়ে। সে কোনোরকমে বলে—তুমি যদি আর না ফের।

    অবাক হয় রান্‌কো। সেদিন তবে ভুলই দেখেছিল। আগের ঝাঁপনীই রয়েছে এখনো। আনন্দে মন নেচে ওঠে তার।

    বহুদিন পরে রান্‌কোকে পেয়েই আবার হারানোর ভয় তার।

    অপ্রস্তুত হয় রান্‌কো। কি করবে ভেবে পায় না। কিছুই করার নেই অথচ—। সে আস্তে আস্তে ঝাঁপনীর একখানা হাত নিজের হাতের মধ্যে তুলে নেয়।

    হাণ্ডি না খেয়েও মাতালের মতো নাচে তারা দুজনে। পায়ে পাথরের খোঁচা লাগে—পা ফেটে রক্ত বার হয়। হুঁস থাকে না। টামাকের তাল তাদের পায়ে। তাদের সর্বাঙ্গে, তাদের হৃদপিণ্ডে, তাদের মনে।

    —আমাকে নেবে তোমার সঙ্গে? আস্তে আস্তে বলে ঝাঁপনী।

    —কোথায়?

    —যুদ্ধে।

    —পাগল।

    —কেন?

    —ছেলেপিলে?

    —ওদের বাপ্ দেখবে। আমার দোষে হয়েছে ওরা?

    —কারও দোষেই নয়।

    —নেবে?

    —তা হয় না ঝাঁপনী।

    —তবে কথা দাও।

    —কি কথা?

    —ফিরে আসবে।

    রান্‌কোর মাথা ঘুরতে থাকে। কিছুক্ষণ আগে বাঘরায়কে যা বলেছিল সব মনে পড়ে তার। ভাবতে অদ্ভুত লাগে—এর মধ্যেই কত বড় এক পরিবর্তন ঘটে গেল। ডুইঃ টুডু আর বাঘরায়ের দলে নিজেকে আর নির্বিচারে ফেলতে পারছে না সে এখন। কারণ শালবনের ঝাঁপনী আর কিতাডুংরির ঝাঁপনী এক নয়।

    রাজাকে সে গর্ব করে বলেছিল, যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে সবাই পারে না, সেও কি পারবে এখন?

    ঝাঁপনী জানে, রান্‌কোর সঙ্গে সে জীবনে মিলতে পারবে না। নিজে হাতে তার কাজ সে কখনই করে দিতে পারবে না। পারাউ সর্দারের নির্জন কুটিরে রান্‌কোর পিপাসা মেটাবার জন্যে এক লসী জল পৌঁছে দেবারও সৌভাগ্য তার হয়তো হবে না কোনোদিন। তবু সে তার নিরাপত্তা চায়। সে বেঁচে আছে এইটুকুতেই তার শান্তি।

    আকুলভাবে রান্‌কোর মুখের দিকে চেয়ে থাকে ঝাঁপনী। জবাব চায় সে। স্পষ্ট জবাব। অমন হেঁয়ালী-ভরা হাসিমুখ দেখে সে কখনই কিতাডুংরি ছেড়ে যাবে না।

    —বল।

    —কি বলব।

    —ফিরে আসতেই হবে।

    —লাভ?

    —জানিনে। শুধু বল ফিরে আসবে।

    —পালিয়ে?

    —না না—যুদ্ধ করে! রান্‌কো সর্দার পালাতে জানে না তা আমি জানি।

    —যুদ্ধ করে ফিরে আসা কিতাপাটের হাত

    —জানি। কিন্তু যুদ্ধ করতে গিয়ে পাগলামী করো না।

    রান্‌কো বুঝতে পারে ঝাঁপনী কি বলতে চায়। এবারের পুরো সম্মান বাঘরায়ের ভাগ্যে।

    —তুমি কি চাও বাঘরায়ের চেয়ে আমি ছোট হয়ে যাই?

    —না।

    —তবে?

    —অত জানি না—বলতে পারি না। ফিরে এসো—শুধু তুমি ফিরে এসো। কান্নায় ভেঙে পড়ে ঝাঁপনী।

    বহুদিন পরে বুক-ভরা দুর্বলতা রান্‌কোকে চুরমার করে দিতে চায়। শালগাছের আড়ালে ঝাঁপনীকে টেনে নিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে—যদি ফিরি, তোমার জন্যেই ফিরব ঝাঁপনী। এককালে তুমি ছিলে সবার ওপরে। এখন সতেরখানির পরেই তুমি এইটুকু পার্থক্য।

    এক সময় নাচ থামায় তারা। ফিরে আসে রান্‌কো রাজারাণীর পাশে। শরীর আর মনে তার অসীম শক্তির অবসাদ।

    বাঘরায় ম্লান হেসে তার দিকে চেয়ে থাকে। সে আগাগোড়া দেখেছিল সব। রান্‌কোর মুখ নীচু হয়। তাকাতে পারে না বাঘরায়ের চোখের দিকে। ছোট—অনেক ছোট সে বাঘরায়ের চেয়ে। বুকের আগুন আর আগের মতো জ্বলছে না।

    —বড় আনন্দ হল রান্‌কো। বাঘরায়ের কথায় অকৃত্রিমতার ছাপ।

    —কি বললে? থতমত খায় রান্‌কো।

    —তুমি ডুইঃ-এর দলে। জিতে গেলে। ভুল করো না সেই হতভাগার মতো।

    রান্‌কো মর্মে মর্মে অনুভব করে—এত যে ভীড়, এর মধ্যেও বাঘরায় একা। নিঃসঙ্গ। তার সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। যেন অ-নে-ক উঁচু এক পাহাড়ের চূড়ায় সে রয়েছে—সবাই দেখতে পাচ্ছে অথচ নাগাল পচ্ছে না।

    ত্রিভন সিং একসময়ে সর্দারদের কাছে ডাকে। দিন শেষ হয়ে আসে। আনন্দ উৎসব বন্ধ করতে হবে।

    কিতাপাটের কাছে আশীর্বাদ চেয়ে নেয় সবাই। শেষবারের মতো মাদল বেজে ওঠে।

    রাজারাণী বিদায় নেয়।

    কিতাগড়ে ত্রিভনের সামনে এখন এসে বসে শুধু বৃদ্ধ সারিমুর্মু আর প্রৌঢ় বুধকিস্‌কু। সবারই মুখ থমথমে। তীর ছোঁড়া হয়ে গিয়েছে—ফিরিয়ে আনার উপায় নেই। লক্ষ্যস্থলে গিয়ে বিঁধবেই। তাতে উঠবে বিরাট আলোড়ন–সে আলোড়নের ঢেউ দ্রুত ধাবিত হবে বাটালুকার দিকেই। হয়তো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে বাটালুকা—নিশ্চিহ্ন হবে গোটা সতেরখানি তরফই।

    তবু উপায় নেই।

    সারিমুর্মু আপন মনে ঘাড় নাড়ে—উপায় নেই। সম্মানই যদি জীবনের মুখ্য জিনিস হয়, তবে অন্য পথ ছিল না। সে ধীরে ধীরে বলে—রাজার কি আফশোস হচ্ছে?

    চমকে ওঠে ত্রিভন সারিমুর্মুর কথায়। বুধকিস্‌কু ঘাড় ফেরায়।

    —কিসের আফশোস সর্দার?

    —পরিণাম ভেবে?

    —না, দুঃখ হচ্ছে। সমস্ত ঘটনার জন্যে নিজেকে দায়ী বলে মনে হচ্ছে। আজ বার বার একই কথা মাথার মধ্যে ঘুরছে। আমি রাজা না হলে হয়তো সতেরখানির এ-বিপদ কোনোদিনই আসত না। দূরের পোতামকে তীর দিয়ে মেরে ফেললাম দেখে তোমরা অবাক হয়েছিলে সর্দার। নির্বিচারে আমাকে রাজা করলে। কিন্তু ঠিক কাজ করেছিলে কি সেদিন?

    —হ্যাঁ। ঠিক কাজই করেছিলাম। জীবনে বোধহয় ওই একটাই ঠিক কাজ করেছি। বুধকিস্‌কুর গলার পেশী ফুলে ওঠে।

    —নরহরিকে সহ্য করলে এ বিপদ আসত না। ত্রিভন বলে।

    —তা আসত না। তবে সমস্ত বীর্য হারিয়ে গলায় মারা পরে বেঁচে মরে থাকতাম রাজা তার চেয়ে এ অনেক ভালো। বীরের মতো মরা। আমরা, সাঁওতাল মুণ্ডারা এর চেয়ে বড় কিছু চাই না।

    ত্রিভন চেয়ে থাকে বুধকিস্‌কুর দিকে। এমনিতে লোকটা বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা দেখাতে পারে না। অথচ মাঝে মাঝে এমন সব কথা বলে, যা ভাবিয়ে তোলে। হৃদয় দিয়ে অনুভব করা জিনিস কথায় রূপ পেলে সবার মুখেই সমান শুনতে লাগে।

    —বুধ ঠিকই বলেছে রাজা। সারিমুর্মু বলে।

    —আমি নিজেও জানি ঠিক। কিন্তু সতেরখানির শত শত কুঁড়েঘরের কথা মনে পড়ে গেলে বড় দুর্বল হয়ে পড়ি।

    —সে দুর্বলতাকে আর মনে স্থান দেবেন না রাজা। যে কুঁড়েঘরের কথা ভেবে আপনি কষ্ট পান, একবার গিয়ে দেখবেন চলুন, সে কুঁড়েঘরের প্রাণীগুলোর বুকে কতখানি গর্ব আজ। রাজা খাঁড়েপাথরের পরে এ-গর্ব অনুভব করার সুযোগ আর কখনো আসেনি। সারিমুর্মু বলে।

    —যদি তাদের আপন মানুষরা ঘরে না ফেরে?

    —তারা কাঁদবে—আকুল হয়েই কাঁদবে। তবু তাদের গর্ব বাতাসে মিলিয়ে যাবে না। আমার মতো যখন বয়স হবে তাদের নাতি নাতনিদের শোনাবে বংশের গৌরবের কথা। আর নাম করবে আপনার। বৃদ্ধ সর্দারের গলা আবেগে কেঁপে ওঠে।

    মুৎনী এসে ত্রিভনের সামনে দাঁড়ায়। মেয়েটি রাণীর পরিচারিকা—বছর তেরো বয়েস। সারিমুর্মু বহুদিন রেখেছিল একে। সেখান থেকে বাঘরায় নিয়ে আসে কিতাগড়ে।

    রাজার দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে মুৎনী। কি যেন বলতে চায়—অথচ বলে না। কিছু বলার জন্যেই এসেছে সে। নইলে দরবারে অন্তঃপুরের পরিচারিকার দাঁড়াবার কোনো কারণ নেই।

    ত্রিভন অস্বস্তি অনুভব করে। সে জানে, ধারতির কাছ থেকে তলব এসেছে। মুৎনী না বললেও, তার চোখে মুখে সেই কথাই লেখা রয়েছে। তবু একটা গুরুতর আলোচনার মধ্যে তার আবির্ভাব বেমানান। উঠে অন্দর মহলে যেতে ইতস্তত করে ত্রিভন।

    মুৎনী ফিরে যায় তার চোখের ইসারায়। আলোচনার জের টেনে ত্রিভন বলে—সতেরখানির ভবিষ্যৎ বাসিন্দারা যদি আমার নামই শুধু মনে করে—সেটা হবে মস্ত ফাঁকি। তাদের মনে রাখা উচিত বাঘরায় আর রান্‌কোর নাম। স্মরণ করা উচিত তাদের ডুইঃ টুডু, সারিমুর্মু আর বুধকিস্‌কুকে। আমি কে?

    —মনে তারা সবাইকে রাখবে রাজা। একজনকে আশ্রয় করেই তো অন্য সবাই অমর হয়। বুধকিস্‌কু আরও জেঁকে বসে।

    সারিমুর্মু ভাবে বুধটার বুদ্ধি আর পাকল না। চিরকাল সাদাসিদেই থেকে গেল সে। রাজার চোখ-মুখের চাঞ্চল্য লক্ষ্য করার মত চোখও নেই তার। সে তাড়াতাড়ি বলে—আমরা আজ চলি রাজা। কাল সকালে আবার আসব।

    —এখনই। বুধ অবাক হয়।

    —হ্যাঁ, তোমার ওই দোষ। একবার বসলে আর উঠতে চাও না। এখনি কেমন যেন বুড়ো হয়ে পড়েছ।

    —কে বলল? লাফ দিয়ে উঠে বড়ে বুধ।

    ত্রিভন হেসে ফেলে বলে—সর্দারকে এ-বদনাম দিও না সারিমুর্মু।

    বুধের পিঠে হাত রেখে হাসতে হাসতে কিতাগড় ছাড়ে সারিমুর্মু।

    অন্দরে যেতেই ধারতি ফুলের মালা হাতে এগিয়ে আসে। বিস্মিত হয় ত্রিভন। কিতাডুংরির উৎসবের পর যেদিন রান্‌কো আর বাঘরায় চোয়াড়ে বাহিনী নিয়ে দেশ ছাড়ল সেদিন বিকেলে মালা না নিয়ে এগিয়ে এসে তাকে চমকে দিয়েছিল ধারতি। প্রথম নিয়মভঙ্গ সেদিন। আঘাত পেয়েছিল ত্রিভন মনে মনে।

    ধারতি হেসে বলেছিল—কত মেয়ের স্বামী গেল যুদ্ধে। দিনে তারা আনমনা হয়ে ঘরের কাজ করছে আর রাতে একলা বিছানায় শুয়ে ছট্‌ফট্ করছে। আমাদের এ আনন্দও বন্ধ থাক না রাজা। ওরা যে তোমারই প্রজা। ওদের দুঃখের অংশীদার তো আমরাই।

    আনন্দে ভরে উঠেছিল ত্রিভনের মন।

    এতদিন পরে আবার ধারতির হাতে ফুলের মালা দেখে সে ভাবল, কষ্টকে দীর্ঘতর করা সামর্থ্যে কুলালো না তার। মনে মনে দুঃখ পায় তাই।

    —আবার এ সব কেন ধারতি? বেশ তো সয়ে গিয়েছিল।

    —শুধু আজকের জন্যে।

    —কিন্তু কেন?

    —কারণ রয়েছে। মিষ্টি হাসে ধারতি।

    —বিয়ের দিন তো আজকে নয়? জন্মদিনও নয়।

    —এছাড়া অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে না। আজকের দিনের?

    —পারে, তবে আমার অনুমানের বাইরে।

    —তাই-ই। হেসে ফেলে ধারতি।

    —বল তবে।

    —বলব বলেই তো মুৎনীকে পাঠিয়েছিলাম। এখন যে পারছি না। বলা এত কঠিন আগে বুঝিনি।

    ত্রিভবন চেয়ে দেখে রাজ্যের লজ্জা এসে জড়ো হয়েছে ধারতির মুখে। সে বলে—মালা যখন হাতে নিয়েছ বলতেই হবে। নইলে গলায় পরিয়ে দেবে কি বলে?

    —বলব। ধারতি মালা হাতে আরও অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে। কি যেন ভাবে। শেষে ছুটে এসে ত্রিভনের গলায় পরিয়ে দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলে—তোমার ছেলে।

    —আমার ছেলে? বিস্মিত হয় ত্রিভন।

    ধারতি ছেলেমানুষের মত মাথা ঝাঁকায়।

    —কই।

    —এসেছে।

    —আলো দেখতে পায় ত্রিভন। ধারতিকে ছেড়ে দূরে সরে গিয়ে বলে—সত্যি?

    —হুঁ।

    আনন্দে বুক ভরে উঠলেও সে সংযত হয়ে বলে—ভালোই হ’ল। এই দুর্দিনে আসছে সে—দুঃখের মধ্যেই মানুষ হ’তে হবে। শক্ত হয়ে উঠবে। সতেরখানির সার্থক রাজা হবে। রাজাই তো ধারতি?

    —হ্যাঁ—রাজাই তো। এমনভাবে বলে ধারতি যেন যে সব জেনে ফেলেছে।

    —কি করে বুঝলে?

    —আমার মন বলছে।

    —একটা নাম দিতে হয়।

    —এখনি?

    —নিশ্চয়।

    —তুমি আস্ত পাগল।

    —আর তুমি পাগলি।

    —ধারতি হাসে। ত্রিভনও হাসে। পাশাপাশি বসে দুজনা।

    —কি নাম দেবে ধারতি।

    —তোমার ছেলে, তুমি জান।

    —তোমার কেউ না?

    —তবু।

    —তুমিই নাম দাও ধারতি।

    —বেশ, দিলাম লাল সিং।

    —সুন্দর। এত তাড়াতাড়ি এমন সুন্দর নাম কি করে দিলে?

    —অনেক দিন দিয়েছি।

    —সে কি!

    —হ্যাঁ। যেদিন আমাদের বিয়ে হল—সেদিন বাঁশী বাজিয়ে তুমি শেষ রাতে ঘুমিয়ে পড়লে। আমার চোখে ঘুম ছিল না। তোমার মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে হঠাৎ তোমার ছেলের নাম মনে এসে গেল।

    ত্রিভন স্তব্ধ হয়ে চেয়ে থাকে সতেরখানি তরফের রাণীর দিকে।

    .

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleবন্ধনী – সরোজকুমার রায়চৌধুরী

    Related Articles

    শ্রীপারাবত

    মমতাজ-দুহিতা জাহানারা – শ্রীপারাবত

    July 29, 2026
    শ্রীপারাবত

    রাজপুত নন্দিনী – শ্রীপারাবত

    July 27, 2026
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনন্যা পাল
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক দত্ত
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুর রহমান আল-আরিফি
    আবদুল হালিম
    আব্দুল মালেক আলী আল-কুলাইব
    আব্দুল হামীদ ফাইযী
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোপেন্দ্র বসু
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভট্টাচার্য
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বাণ রায়
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পরিমল ভট্টাচার্য
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণু শর্মা
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাসরুর আরেফিন
    মাহতাব উদ্দিন
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রণদীপ নন্দী
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজর্ষি দাশ ভৌমিক
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শহীদুল্লা কায়সার
    শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শৈবাল মিত্ৰ
    শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রীপারাবত
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
    সন্মাত্রানন্দ
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সরোজকুমার রায়চৌধুরী
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সায়ক আমান
    সায়ন্তনী পূততুণ্ড
    সায়ন্তনী পূততুন্ড
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুব্রত গুহ
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
    সৈয়দ শামসুল হক
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হরিশংকর জলদাস
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    কিতাগড় – শ্রীপারাবত

    July 31, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    কিতাগড় – শ্রীপারাবত

    July 31, 2026
    Our Picks

    কিতাগড় – শ্রীপারাবত

    July 31, 2026

    বন্ধনী – সরোজকুমার রায়চৌধুরী

    July 31, 2026

    চাঁদের অমাবস্যা – সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ

    July 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }