Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    গজনবীর দেশ থেকে সোমনাথের পথে

    July 15, 2026

    ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে

    July 15, 2026

    আদর্শ বিবাহ ও দাম্পত্য – আব্দুল হামীদ ফাইযী

    July 15, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ৩ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত এক পাতা গল্প305 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ৩.১০

    ১০

    দ্বিতীয় দেখা বলরাম-মন্দিরে।

    অনেককেই নিমন্ত্রণ করেছে বলরাম। গিরিশকেও।

    কিন্তু ও কে ? ওকে চেন না? ও বিধু। কীর্তনওয়ালী।

    ঠাকুরকে প্রণাম করল বিধু। ঠাকুরও মাটিতে মাথা রেখে দীনভাবে নমস্কার করলেন। কথা বলতে লাগলেন বিধুর সঙ্গে। পরিহাসমধুর সরল আলাপ।

    অমৃতবাজারের শিশিরকুমার ছিলেন সেখানে। তাঁর ভালো লাগল না। গিরিশের সঙ্গে জানাশোনা, তাই তাকেই জানালেন তাঁর বিরক্তি। বললেন, ‘চলো হে গিরিশ আর কী দেখবে?’

    না, আরো একটু দেখি।’

    ‘এই তো দেখলে-‘প্রায় জোর করে টেনে নিয়ে গেলেন গিরিশকে।

    গিরিশ দেখেও দেখল না, বুঝেও বুঝল না।

    চৈতন্যলীলা অভিনয় করছে গিরিশ। দৃশ্যপট আঁকছে যে চিত্রকর তার সঙ্গে কথা কইছে। আঁকিয়ে গৌরভক্ত। ভক্তি না হলে রেখায় ফুটবে কি করে পেলবতা! চোখে জাগবে কি করে সংবেদনের স্বপ্ন!

    ‘তোমার গৌরাঙ্গের মহিমা কিছু বলতে পারো?’

    পারি বৈকি। তাঁকে দেওয়া ভোগের রুটিতে তাঁর দাঁতের দাগ দেখি।

    ‘বলো কি হে’–

    ‘সারাদিন খেটে-খুটে বাড়ি ফিরি। বাড়ি ফিরে স্নান করে নিজের হাতে রাঁধি। গৌর-হরিকে ভোগ দিই। আকুল হয়ে ডাকি তাঁকে অন্ধকারে। দেখি তিনি খেয়ে গেছেন। ভোগের রুটিতে তাঁর দাঁতের দাগ।’

    অন্তরের প্রেমধ্যানটি চোখে-মুখে ফুটে রয়েছে। অগাধ বিশ্বাসের স্বচ্ছ সরোবরে ভক্তির শ্বেতপদ্ম। এ যেন সেই তনু বিনু পরশ নয়ন বিনু দেখা।

    ঘরের দরজা বন্ধ করে কাঁদতে বসল গিরিশ।

    কবে নিজের রূপ ভুলে অরূপের রূপ দেখতে পাব? কে দেবে আমাকে সেই তৃতীয় নয়ন? কে আমাকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে যাবে? কে দেবে সেই আলোকময়ের সংবাদ?

    চৈতন্যলীলা মূর্ত হল রঙ্গমঞ্চে। নামল জগাই-মাধাই। গগনমণ্ডপ থেকে নামলেন গৌরচন্দ্র। বাজল খোল-করতাল। হরিনামের বান ডেকে এল। সবাই ডুবল সেই নামপ্রেমসাগরে।

    ‘থিয়েটারে গৌর নেমেছে। তীর্থ হয়েছে নাট্যশালা। বসে গিয়েছে ভক্তির চাঁদনি বাজার। চল দেখে আসি–

    লোক আসছে দলে-দলে। শহর-গ্রাম ভেঙে। দিঙ্মূঢ় হয়ে। কিন্তু হে অমানীমানদ, দূর্বাদলশ্যামমূর্তি, তুমি কবে আসবে? হে লাবণ্যমনোরম, কবে দেখব তোমাকে? মাধাই বলছে জগাইকে: ‘জগা তুই নাচছিস কেন?”

    ‘বৈরাগী হব। ব্যাটারা কিন্তু বেড়ে গায়, হরি হে দেখা দাও। মেধো, আমায় তেলক কেটে দিতে পারিস?’

    ‘আচ্ছা হরে কে রে শালা, জগা, জানিস?’ মাধাই টলছে নেশার ঝোঁকে: ‘আমি হলে বলতেম, ধরে লে আও শালাকো! আমার মনে হয় এক শালা মালপোওয়ালা। খিদে পেলেই ডাকে।’

    “চিল্লে খিদে বাগিয়ে নেয়। আমার তো চারখানা খেতেই কুপোকাৎ। আর ওরা এক-এক ব্যাটা রাধা বলে আর বিশখানা ওড়ায়।’

    ‘এক শালাকে একদিনও বাগে পেলাম না।’ মাধাই আপসোস করল।

    জগাই ঠেলা মেরে বললে, ‘তুই শালা যে মাতাল হয়ে ভোঁ হয়ে থাকিস’–

    ‘দ্যাখ মাতাল বলিস তো ভালো হবে না। কোনো দিন মাতাল দেখেছিস? তুই যেমন ছটাকে—আমি দুসের খেয়ে সানসা আছি। এখন চলেছিস কোথায়?’

    “চল না কেত্তন শোনা যাক গে। ব্যাটারা বেড়ে বাজায়–‘

    ‘তুই বড় গান শোননেওয়ালা’ ঠেলা মারল মাধাই।

    ‘ওরে বেশ এক রকম রাধে রাধে বলে, আমার ভাই রাধী নাপতিনীকে মনে পড়ে।’

    ‘তুই দেখছি বৈরাগী হবি–

    ‘তোর চৌদ্দ দুগুনে বাহান্ন পুরুষ বৈরাগী হোক।’

    আহত অভিমানের সুরে মাধাই বললে, ‘ভেয়ের চৌদ্দপুরুষ তোলে রে শালা?’

    কে এরা জগাই-মাধাই? এরা কি দুকড়ি সেন আর স্বয়ং গিরিশচন্দ্র?

    ট্যাঁকে মটর-ভাজা, গিরিশের বাড়িতে এসেছে দুকড়ি। এসেছে মদের পিপাসায়।

    বাবা, সঙ্গে ‘দগ্ধ মটর’ আছে, এখন একটু মদিরা পেলেই দাহ মেটে।

    মদ নেই। আসবাব-পত্র পালিশ করবার জন্যে এক বোতল মেথিলেটেড স্পিরিট আছে। তাই সই।

    নরেন সেই স্পিরিট ঢেলে দিল গেলাশে। জল না মিশিয়ে অম্লানবদনে তাই টেনে নিল দুকড়ি। অম্লানবদনে দগ্ধ মটর চিবুতে লাগল।

    ‘এ করলে কি?” নরেনকে ধমকে উঠল গিরিশ: ‘এ যে সাক্ষাৎ বিষ। লোকটা যে এক্ষনি মারা যাবে।’

    ‘আরে মশাই, ওতে আমার কি হবে?’ অম্লানবদনে বললে দুকড়ি সেন। ‘ও আমি নিত্য খাই।’

    ‘বোতল-বোতল মদ খেয়েছি। একদিন বাইশ বোতল বিয়র খেয়েছিলাম।’ অতীতের কথা বলছেন গিরিশচন্দ্র। মদ খেয়ে দেখেছি কি জানো? জোর করে মনকে ধরে রাখা—সে চেষ্টায় আবার অবসাদ আসে-আবার সেই অবসাদ দূর করবার জন্যে আবার মদ খাও।’

    ‘তামাক?’ জিজ্ঞেস করলেন কুমুদবন্ধু।

    ‘তামাক! তামাক ঢের দেখেছি। ওর ঝাড়ে-বংশে খেয়েছি। শুধু কি তামাক? গাঁজা, আফিং, চরস, ভাং – কিছু বাকি রাখিনি।’

    তাই বলে গাঁজা?”

    ‘গাঁজাতে ভীষণ উইল-পাওয়ার বাড়ে। যখন গাঁজা টেনে বুঁদ হয়েছি, তখন সত্যি-সত্যি রোগ সারিয়েছি উইল-পাওয়ারে। কিন্তু যাই বলো, আফিঙের মত ছোটলোক নেশা আর নেই। আমার শেষ নেশা দাঁড়িয়েছিল আফিং। একদিন আঙুর কিনেছি কতগুলি। অবিনাশ, বামুনের ছেলে, সর্বদা আসে এখানে। ওকে চারটে আঙুর দিলাম। কিন্তু দেবার পরক্ষণেই মনে হল চারটে না দিয়ে দুটো দিলেই হত। তখন মনে-মনে বিচার করলাম—মন শালা এত ছোটলোক হল কেন? ভেবে-চিন্তে দেখলাম, আফিঙের এই কাজ। তখন দৃঢ়সঙ্কল্প হয়ে আফিং ত্যাগ করলাম-

    ‘আর সব?’

    ‘সব ছেড়েছি।’

    ‘ছাড়তে পারলেন?’ বিস্ময়ে ও ভক্তিতে আপ্লুত কুমুদের কণ্ঠস্বর।

    ‘সাধে ছেড়েছি? প্যায়দায় ছাড়িয়েছে।’

    ‘কোনো নেশা করতে ইচ্ছে হয় না?’

    ‘ঠাকুরের ইচ্ছেয় হয় না।’ অশ্রুতে আচ্ছন্ন হয়ে এল গিরিশের চোখ: ‘জীবনে অনেক অকাজ-কুকাজ করেছি। কোনো পাপ করতে আমার বাকি নেই। সব রকম হয়েছে। কিন্তু ওই আমার গৌরবের পসরা। ধুলোকাদা মেখেই দাঁড়িয়েছি ঠাকুরের সামনে। শুধু এই আমার গৌরব আর আমার কিছু নেই—এই আমার পাপ, এই আমার ধুলোকাদা। এখন তুমি কোলে তুলে ধুলোকাদা মুছে না ও তো নাও—’ আর আমার কিছু নেই। আমার শুধু শরণাগতি। আমার শুধু সমর্পণের তর্পণ। তুমি যদি আমাকে ফেলে দেবে তো দাও। কিন্তু কোথায় তুমি ফেলবে? যেখানে ফেলবে সেখানেও তোমার কোল মেলা। তোমার কোলের বাইরে তো আর জায়গা নেই। তাই যেখানে রাখবে সেখানেই আমি তোমার কোলে ব’সে।

    শাস্ত্রে বলে, কাশীতে মরলে মুক্তি মেলে। তাই মৃত্যুকালে কবীর চললেন কাশী ছেড়ে। বললেন, কাশীর বাইরেও যে মুক্তি আছে এটি প্রত্যক্ষ করব।

    পরিচ্ছন্ন ও পুণ্যরুচিকে স্থান দেবে এর মধ্যে বাহারি কি! যে কাঠে ঘুণ ধরে তাকে যজ্ঞের সমিধ করতে পারো তবেই বুঝি বাহাদুরি। যে লোহায় মরচে ধরে তাকে করতে পারো স্বর্ণপ্রভ তবেই বুঝি তোমার কৃতিত্ব। আর যে দেহে কামের বাসা তাকে করতে পারো তোমার মোহন মুরলী তবেই বুঝি তুমি কত বড় কারিগর। তোমার দরশ-পরশ যে অমৃতসরস তা বুঝি কি করে? তোমার প্রেম যে শুনি স্পর্শ-মণি তার প্রমাণ কি? আমার হৃদয় ছাড়া কোথায় আর তার পরখ হবে? যদি আমিও হিরন্ময় হতে পারি তবেই তো বলতে পারি তোমার প্রেম পরমধন পরশমণি। আমি যদি নিরাময় হতে পারি তবেই তো জানবে জগজ্জনে, তুমি অন্নময় অমৃতময় কল্যাণ-করুণাময়। তুমি রোগার্তের ভিষক, অকিঞ্চনের সর্বস্ব, দরিদ্রের অক্ষয় কোষাগার।

    যখন তপ্ত লোহার শলাকা দিয়ে বিদ্ধ করে ছিদ্র করেছ তখন বুঝিনি, যন্ত্রণায় আর্তনাদ করেছি, কিন্তু এখন যখন হাতে তুলে মুরলী করে বাজাচ্ছ, তখন এই বলে কাঁদছি, শুধু সপ্ত ছিদ্র না করে কেন আমাকে তুমি শতচ্ছিদ্র করোনি? বাঁশকে যদি বাঁশিই না করবে তবে কেমন তুমি বংশীধর?

    ‘চৈতন্যলীলা’ অভিনয় দেখে বৈষ্ণব বাবাজীরা ভয়ানক বিগলিত হয়েছে। সব সময়ে ঘিরে আছে গিরিশকে। তার হলঘরে তাদের ঘনঘন আনাগোনা। কেউ বলছে তার মধ্যে নিত্যানন্দ আবির্ভূত হয়েছেন, কেউ বলছে আপনার উপর মহাপ্রভুর কী কৃপা! গিরিশ দেখল তার কাজকর্মের সমূহ বিপদ। এদের না তাড়ালে রক্ষে নেই ।

    সে দিন হল-ভর্তি লোক। বাবাজী বৈষ্ণবদেরই ভিড়। কেউ বলছে, কি ভক্তি, কেউ বলছে, কি প্রেম! কেউ বলছে, কি গান! এমন সুধার হরিনাম সাধের পণে কিনবি আয়!

    বোতল খুলে গেলাশে মদ ঢালল গিরিশ।

    ‘কি খাচ্ছেন? ওষুধ?’ জিজ্ঞেস করল এক বাবাজী।

    আরেক জন গদগদ হবার চেষ্টায় বললে, ‘ও কি মহাপ্রভুর চরণামৃত?’

    ‘না, মদ।’ গিরিশ একটা বোমা ফেলল ঘরের মধ্যে।

    ‘রামো! রামো!’ নাকে-কানে কাপড় গুঁজে পালালো বাবাজীরা।

    হ্যাঁ, মদের নেশা। পদের নেশা। ঈশ্বরপদের নেশা। নেশা ছাড়তে ছাড়তে চলেছি। একটার পর আরেকটা। নতুনের পর আরো নতুন। নেশা ছাড়া নিশি নেই। সর্বশেষে সর্বনাশের নেশা। শিখর-শিহর।

    চৌরাস্তায় রকে বসে আছে গিরিশ। ভক্তপরিবৃত হয়ে সমুখ দিয়ে চলে গেলেন ঠাকুর। চোখের পরে চোখ পড়ল। এক চোখের আকাশ থেকে আলো এসে পড়ল আরেক চোখের উঠোনে।

    হৃদয়ের ঘুড়িতে যেন কার সুতো বাঁধা। টান পড়েছে ঘুড়িতে। কান্নিক খাচ্ছে। আপনাকে ডাকছেন পরমহংসদেব।’ একজন ভক্ত এসে খবর দিল।

    লাফিয়ে উঠল গিরিশ। ‘কোথায়?’

    বলরাম-মন্দিরে।

    আর কথা নেই, ডাক এসে গেছে। কিন্তু পাব কি ঠিকানা? ঠিকানা পেলেও কি পারব পৌঁছতে?

    ‘বাবু আমি ভালো আছি। বাবু আমি ভালো আছি।’ আপন মনে বলছেন ঠাকুর। এ কি গিরিশকে উদ্দেশ করে বলা?

    বলতে-বলতে ভাবান্তর হল ঠাকুরের। বললেন, ‘না, না, এ ঢং নয়। এ ঢং নয়।’ কি করে বুঝলেন আমার মনের কথা? কে এ সত্যবাক, সত্যজ্ঞানী? যে রূপে যা নিশ্চিত তাই সত্য। সর্বরূপে নিত্য যে বিরাজিত সেই সত্য। সমস্ত সংশয়খিন্ন বুদ্ধির উপরে সেই সত্যই কি জ্বলছে সূর্যের মত?

    সরাসরি আলাপ হল গিরিশের সঙ্গে।

    ‘গুরু কি?’ জিজ্ঞেস করল গিরিশ।

    ‘ঐ যে, কুটনি। যে মিলন ঘটিয়ে দেয়। ঘটক।’

    সচ্চিদানন্দই গুরুরূপে আসেন। গুরুকে সাক্ষাৎ ঈশ্বর ভাবতে হয়, তবে তো মন্ত্রে বিশ্বাস হবে? বিশ্বাস হলেই বিশ্বজয়। একলব্য কি করেছিল? মাটির দ্রোণ তৈরি করে বাণশিক্ষা করেছিল। মাটির দ্রোণ নয়, সাক্ষাৎ দ্রোণাচার্য। তবেই বাণসিদ্ধি। যদি সদগুরু হয় জীবের অহঙ্কার তিন ডাকে ঘোচে। গুরু কাঁচা হলে গুরুরও যন্ত্রণা, শিষ্যেরও যন্ত্রণা। সেই যে ঢোঁড়া ব্যাঙ ধরেছিল, ছাড়াতেও পারে না গিলতেও পারে না। দুয়েরই অশেষ ক্লেশ। জাত সাপে ধরলে তিন ডাকের পর ব্যাঙটা চুপ হয়ে যেত।

    “তা তোমার ভয় নেই। তোমার গুরু হয়ে গেছে।’

    হয়ে গেছে? কে সে? কোথায়?

    বুঝেও বুঝল না গিরিশ। আবার বলল, মন্ত্ৰ কি?’

    ‘ঈশ্বরের নাম।’

    দুর্গানাম, কৃষ্ণনাম, শিবনাম যে নাম খুশি। যদি একটু রুচি থাকে তবেই বাঁচবার আশা। তাই নামে রুচি।

    এ সেই ‘খেতে-খেতে বেশ লাগছে।’ জানো না বুঝি গল্প? মা’র রান্নাতে অরুচি– আরে, ছি ছি, এ যে মুখে দেওয়া যায় না। তুমি কি বলছ? এ যে আমি রেঁধেছি। বললে এসে স্ত্রী। তুমি রেঁধেছ? খেতে-খেতে বেশ লাগছে।

    ১১

    কেন এত ঈর্ষা? ঈশ্বরকে স্মরণ করো। কেন এত পরশ্রীকাতরতা? ঈশ্বরের শ্রী দেখ। কেন মিথ্যা আত্মস্ফীতি? সব দুদিনের।

    ‘সব দুদিনের।’ বললেন ঠাকুর: ‘তালগাছই সত্য, তার ফল-হওয়া আর ফল-খসা দুদিনের।’

    রাখালেরও মাঝে-মাঝে হিংসে হয়। সে বালকের হিংসে। ভালোবাসার অভিমান। গাড়িতে ঠাকুরের সঙ্গে যাবে বলে উসখুস করে। যদি আর কাউকে ডেকে নেন ঠাকুর, হিংসেয় জ্বলে যায়। যদি বলেন, যাই, কলকাতায় গিয়ে ছোকরাদের একটু দেখে আসি, রাগে ঝলসে ওঠে, ‘ওরা কি সংসার ছেড়ে আসবে যে আপনি যাবেন?” কিন্তু দক্ষিণেশ্বরে এসেই বা রাখালের কী হচ্ছে? কই এখনো তো লাগল না কৃপার মলয় হাওয়া! তবে কি আমি পাঁকাটি? আমি কি অপদার্থ? আমার মধ্যে কি এতটুকুও সার নেই? কোথায় তবে সেই চন্দনগন্ধ?

    জপে বসেছিল নাটমন্দিরে, বিরক্ত হয়ে উঠে পড়ল। এত প্রেম এত কৃপা পেয়েও যার কিছু হয় না, তার মুখ দেখিয়ে কাজ নেই। উঠতেই পড়ে গেল ঠাকুরের সামনে। ‘কি রে, এরই মধ্যে উঠে পড়লি?

    ‘আমার দ্বারা কিছু হবে না।’

    ‘কেন, কি হল?’

    রাখাল মাথা হেঁট করে রইল।

    ‘কি রে, মুখখানি অত ম্লান কেন? বল আমাকে।’

    বলতে হল না। বুঝতে পারলেন ঠাকুর। বললেন, ‘হাঁ কর।’

    হাঁ করতেই জিভ টেনে ধরলেন রাখালের। আঙুল দিয়ে তিনটে রেখা টেনে দিলেন। কি যেন মন্ত্র পড়লেন নিচু গলায়। বললেন, ‘যা, এখন বোস গে।’

    রাখালের মন হালকা হয়ে গেল। মুখ ভরে উঠল খুশিতে।

    শুধু তাই নয়, ঠাকুর একদিন তাকে টেনে আনলেন ভবতারিণীর সামনে। কপালে কারণের ফোঁটা দিয়ে শাক্ত মন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে দিলেন। শিখিয়ে দিলেন আসন আর মুদ্রা। শিখিয়ে দিলেন ষটচক্র। সোপান-পরম্পরা!

    আর রাখালকে পায় কে!

    কৃপা আর কাকে বলে! মেঘ নেই জল ঝরে পড়ল। হলকর্ষণ নেই শস্য এল মাটি ফুঁড়ে। এমনি করেই আসে দয়ার দক্ষিণ হাওয়া! চাইতে না জানলেও এসে পড়ে। মনের বায়ুমণ্ডলে একটি উত্তপ্ত শূন্যতা সৃষ্টি হলেই বাতাসের আলোড়ন জাগে। কৃপাস্পর্শে সাধনার দীপ্তি ফুটেছে চেহারায়। কণ্ঠস্বরে মমতাময় মাধুরী।

    ‘আহা, রাখালের স্বভাবটি আজকাল কেমন হয়েছে! দেখ, দেখ, ঠোঁট নড়ে—’বলছেন ঠাকুর ভক্তদের, ‘অন্তরে নামজপ করছে কিনা!’

    তারপর বললেন, ‘কোথায় আমার সেবা করবে, তা নয়, আমাকেই এখন তাকে জল দিতে হয়।’

    ‘কি করছিস রে বাবুরাম?’ ঠাকুর ডাক দিলেন: ‘এদিকে একটু আয় না।’

    পান সাজছে বাবুরাম। বললে, ‘পান সাজছি।’

    ‘রেখে দে তোর পান সাজা।’ বিরক্ত হলেন ঠাকুর। শুনে যা।’

    শোন। গুরুসেবাই সাধনাঙ্গ। তদ্বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া। ‘ভক্তি কি গাছের ফল রে বাবা পেড়ে খাবি?’ বলছেন ঠাকুর: ‘সেবা ছাড়া প্রেম নেই। সেবা ছাড়া ভক্তি নেই।’

    নিজে-নিজেই পান সাজেন কখনো। ঘর ঝাঁট দেন। মালীর কাজ করেন।

    ‘ওরে, ও মালী, ঐ গোলাপ ফুলটা তুলে দে তো—’একজন সত্যি-সত্যি সেদিন বললে ঠাকুরকে।

    যা কাপড় পরেন! আর যেমন ভাবে পরেন! একটা মালী বলে ভাববে তা আর আশ্চর্য কি। বলামাত্রই ঠাকুর ফুলটি তুলে দিয়ে দিলেন লোকটাকে। খুশি হয়ে চলে গেল। কিছুদিন পরে জানতে পারল সেই মালীই শ্রীরামকৃষ্ণ। তখন লজ্জায়-অনুতাপে মাটির সঙ্গে তার মিশে যেতে শুধু বাকি। দক্ষিণেশ্বরে এসে দেখা করল ঠাকুরের সঙ্গে। কুণ্ঠিত হয়ে বললে, ‘সেদিন আপনাকেই ফুল তুলতে বলেছিলাম-‘ ‘তা কী হয়েছে!’ অমলিন কণ্ঠে বললেন ঠাকুর, ‘কেউ সাহায্য চাইলে তাকে তা দিতে হয়।’

    ঠিক লোককেই তো বলেছিল ফুল তুলতে। মালী ছাড়া আর কি! আগাছার জঙ্গলকে পুষ্পোদ্যানে পরিণত করছেন। প্রার্থীকে ঠিক পৌঁছে দিচ্ছেন কৃপার প্রফুল্ল ফুল। পঞ্চবটীর উত্তরে লোহার তারের বেড়া। তারই ওপারে ঝাউতলা। ঝাউতলার দিকে যেতে ঠাকুর পড়ে গেলেন বেড়ার উপর। হাতের একখানা হাড় সরে গেল।

    তাই দেখে রাখালের মনোবেদনার অন্ত নেই। যাঁর শরীররক্ষা করার কথা তাঁকেই সে ফেলে দিলে। সেই তো ফেলে দিয়েছে! তা ছাড়া আবার কি। যদি সঙ্গে-সঙ্গে থাকত, চোখে-চোখে রাখত, ঘটত না এমন অঘটন। তার দোষেই এই দুর্দশা। ধিক্কারে মন ভরে গিয়েছে রাখালের। ঠাকুর বুঝতে পেরেছেন। বললেন, ‘তোর দোষ কি। তুই থাকলেও তোকে তো নিতুম না ঝাউতলা।’

    অপূর্ব মমতায় উথলে উঠলেন। বললেন, ‘দেখিস তুই যেন পড়িসনে। যেন ঠকিসনে মান করে।’

    কত লোক আসছে কতদিক থেকে। পাছে ঠাকুরের হাত-ভাঙা দেখে কেউ কিছু ভুল বোঝে তারই জন্যে রাখাল কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয় হাতখানি। ঠাকুরের হাত ভেঙেছে এ যেন তার নিজের কলঙ্ক।

    ‘কেন অমন ঢাকাঢাকি করিস?’ বিরক্ত হন ঠাকুর। ‘মা যে অবস্থায় রেখেছেন সেই অবস্থায় থাকতে দে। লোকে নিন্দে করে তো আমাকে করবে! বলবে নিজের একখানা হাত সামলাতে পারেন না সে আবার কেমনতরো কি!”

    মধু ডাক্তার এসেছে তাকে পর্যন্ত লুকোনো! আড়ালে নিয়ে গিয়ে কি সব বলছে তাকে রাখাল। ঠাকুর চেঁচিয়ে উঠলেন ঘরের থেকে: ‘কোথা গো মধুসূদন, দেখবে এস, আমার হাত ভেঙে গেছে।’

    যন্ত্রণায় অধীর হয়ে একে-ওকে হাত দেখান ঠাকুর। রাখাল শুধু চটে। বলে, ‘এ কি বাড়াবাড়ি! তা হলে এখান থেকে চলে যাই আমি।’

    ওরে স্বভাবের যন্ত্রণায় কাঁদতে দে আমাকে। যন্ত্রণার মধ্যে কান্নাটাই আনন্দ। আমার কান্না দেখে লোকে যদি একটু কাঁদে সেটুকুও আমার উপশম।

    এখান থেকে যাবি তো যা। পরেই আবার মাকে বলেন, ‘কোথায় যাবে, কোথায় যাবে জ্বলতে পুড়তে!’

    ভাবনয়নে দেখলেন মা যেন সরিয়ে নিচ্ছেন রাখালকে। অমনি ব্যাকুল হয়ে কেঁদে উঠলেন, ‘মা, ওকে হৃদের মত সরাসনি। ও ছেলেমানুষ, কিছু বোঝে না, তাই কখনো-কখনো অভিমান করে -ও চলে গেলে কাকে নিয়ে থাকব!

    আরো একটি ছেলের জন্যে কাঁদেন বসে বসে। সতেরো আঠারো বছর বয়েস, গৌর-বর্ণ, নাম নারান। স্কুলে পড়ে। তাকে নিজের হাতে খাওয়াবার জন্যে ব্যাকুল ঠাকুর। তার মাঝেই দেখেন সেই নারায়ণকে।

    ‘মশায়, আপনার গান হবে না?’

    প্রশ্নের এই তো ছিরি। তবু যেহেতু নারান বলেছে, নারান গান শুনতে চেয়েছে, ঠাকুর গান ধরলেন।

    ‘অহরহ নিশি, দুর্গানামে ভাসি,

    তবু দুঃখরাশি গেল না—এবার যদি মরি,

    ও হরসুন্দরী, তোর দুর্গানাম আর কেউ লবে না—’

    বলরামের বাড়িতে নামছেন সিঁড়ি দিয়ে, ভাববিভোর হয়ে, টলতে টলতে। পাছে পড়ে যান, নারান হাত ধরতে গেল। বিরক্ত হলেন ঠাকুর, নারানের হাত ছুঁড়ে দিলেন। পরে, পাছে ব্যথা পায়, অযতন হয়েছে ভাবে, তাই সস্নেহে বললেন, ‘হাত ধরলে লোকে মাতাল মনে করবে। আমি আপনি-আপনি চলে যাব।’

    বলরামের বাড়িতে সেদিন এসেছে নারান।

    ‘বোস কাছে এসে বোস। কাল যাস ওখানে। গিয়ে সেখানে খাবি, কেমন?”

    কে নারান? তার পুরো নাম বা পদবীও কেউ জানে না। তবু তার প্রতি কি সর্বঢালা স্নেহ!

    কথামত এসেছে নারান। ছোট খাটটির উপর বসিয়েছেন পাশটিতে। গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করছেন। মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন। বললেন, জল খাবি? জল খাওয়াচ্ছেন নিজের হাতে।

    এখানে আসে বলে বাড়ির লোকে মারে ছেলেটাকে। তাই কানের কাছে মুখ এনে স্নেহভরা স্বরে বললেন, ‘একটা চামড়ার জামা কর, মারলে বেশি লাগবে না। ‘ কীর্তন শুনছেন ঠাকুর, নারান এসে উপস্থিত। তাকে দেখে চটে উঠলেন ঠাকুর। বললেন, ‘তুই আবার কেন এসেছিস এখানে? অত মেরেছে তোকে সেদিন তোর বাড়ির লোক, আবার এসেছিস?”

    চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল নারান।

    কোথায় তবে যাব? প্রহারের পর কোথায় তবে উপশম! প্রখর রৌদ্রের পর কোথায় তবে পাদপচ্ছায়া। সংসার-রাক্ষস আমাকে হরণ করে রেখেছে, আরামময় রাম এসে আমাকে উদ্ধার করবেন বলে। প্রহারেই তো আমি দৃঢ় হব বলিষ্ঠ হব, আমার সমস্ত কলুষ ক্ষয় হয়ে যাবে। প্রহার তো তোমারই উপহার। তুমি হানো তুমিই টানো তুমিই আনো তোমার কোলের কাছে। তুমি ছাড়া আর কে আছে! সকল আত্মীয়ের চেয়েও তুমি আমার আপনার।

    ঠাকুরের ঘরের দিকে চলে গেল নারান। বাবুরামকে ঠাকুর বললেন, ‘যা, ওকে কিছু খেতে দে।’

    কীর্তনে সমাধিস্থ হয়ে যাবার কথা, কিন্তু মন বসল না। হঠাৎ উঠে পড়লেন। ঘরে ঢুকে নিজের হাতে খাওয়াতে লাগলেন নারানকে।

    ‘আজ নারানকে দেখলাম! রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর বলছেন ঠাকুর। ভাবাবেশে কণ্ঠ-স্বর আচ্ছন্ন হয়ে আসছে।

    ‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’ বললে মাস্টার, ‘চোখ দুটি জলে ভেজা। মুখ দেখে কান্না পায়।’

    ‘আহা, ওকে দেখলে যেন বাৎসল্য হয়! কান্নায় ঠাকুরের গলাও ভিজে উঠল: ‘এখানে আসে বলে ওকে বাড়িতে মারে। ওর হয়ে বলে এমন বুঝি কেউ নেই। কুব্জা তোমায় কু বোঝায়। রাই-পক্ষে বোঝায় এমন কেউ নেই।’

    ‘আপনিই বোঝাবেন।’

    ‘দেখ ওর খুব সত্তা। নইলে কীর্তন শুনতে-শুনতে উঠে যাই! ওর টানে কীর্তন ছেড়ে উঠে যেতে হল ঘরের মধ্যে। কীর্তন ফেলে উঠে গেছি এমনিটি আর হয়নি কখনো।’

    কীর্তনের চেয়েও ক্রন্দন যে তোমাকে বেশি টানে। কীর্তন হচ্ছে গণকথন, যশোবর্ণন আর ক্রন্দন হচ্ছে বেদন-নিবেদন। তুমি আমাকে কাঁদাচ্ছ এইই তো তোমার শ্রেষ্ঠ কীর্তি। তাই ক্রন্দনই শ্রেষ্ঠ কীর্তন।

    কিন্তু ওকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছিস? ও এক কথায় বললে, আনন্দে আছি।’

    তাই তো আর ওর ভয় নেই। প্রহারের প্রত্যক্ষ ভয়কেও উপেক্ষা করতে পেরেছে। জর্জর হয়েও অবসন্ন হয়নি। ধূলোতে শয়ন নিয়েও ভাবছে ঈশ্বরের কোলে মা’র কোলে শুয়ে আছি। আনন্দে থাকা মানে ধূলোকেও ব্রজরেণু মনে করা। নারানের সেই অবস্থা। কিশোর বালক কিন্তু বিশ্বাসের নিষ্কম্প বর্তিকা। বরিষ্ঠ ব্রহ্মবিৎ। যন্ত্রণাকে নিয়ে এসেছে জয়ধ্বনিতে।

    মাস্টারকে বললেন, ‘তুমি কিছু কিনে-টিনে মাঝে-মাঝে খাইও ওকে। আচ্ছা, একবার ওর ইস্কুলে গিয়ে দেখতে পাই?’

    ‘কেন, আমার বাসায় না-হয় ওকে ডেকে আনব। সেখানে চলুন।’

    ‘না, না, একটা ভাব আছে। ওকে ওর স্বভাবে দেখতে চাই। তা ছাড়া, দেখে আসতুম আরো কেউ ছোকরা আছে নাকি—’বলেই আবার নারানে ফিরে এলেন। বললেন গদগদ হয়ে, ‘আহা, নাউএর ডোলটা ভালো-তানপুরো বেশ বাজবে। আমায় বলে, আপনি সবই।’

    এইটিই তো চরম ভালোবাসার কথা। তুমি আমার সব। তারই জন্যে তো তোমাকে ছেড়ে পালাবার পথ পাই না। দূরে-দূরান্তরে এমন জায়গা নেই যেখানে তুমি নেই। এমন শূন্যতা ভাবা যায় না যা তুমি ছাড়া। সব হারিয়েও দেখি তোমাকে হারাতে পারিনি।

    ‘ওরে বাবুরাম, একবার নারানের বাড়িতে যা না–’নারানের জন্যে ব্যাকুল হয়েছেন ঠাকুর।

    কিন্তু বাড়িতে যেতে ভয় পাছে ওর বাবা খেপে ওঠেন, তেড়ে আসেন লাঠি নিয়ে। ‘এক কাজ কর। হাতে করে একখানা ইংরাজি বই নিয়ে যা। তা হলে তার বাবা আর কিছু বলবে না।’

    কিন্তু তার মা এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। কার টানে ছেলে এমন ঘরছাড়া, মার-ঘেঁচড়া, তাকে একবার দেখে আসি নিজের চোখে। পারি তো শুনিয়ে আসি দুটো কঠিন কথা। নিজের পাগলামি নিয়ে আছ থাকো, পরের ছেলেকে পাগল করা কেন? কিন্তু এসেই তার চোখ ডুবে গেল অমৃত-অঞ্জনে। এ কে অপরূপ! একে দেখে আমিই মুগ্ধ হচ্ছি, আমার নারান তো ছেলেমানুষ! যে সরল সে তো ডুবেই যাবে এ সরলতার সমুদ্রে!

    ‘মা, আমার নারানকে বেশি পীড়ন কোরো না।’ বললেন তাকে ঠাকুর, ভগবানের দিকে যদি ওর মন যায়, ওর মনটিকে দুমড়ে দিও না।’

    ঈশ্বর পুত্রের চেয়েও প্রিয়। সেই মুহুর্তে মনে হল নারানের মা’র। ঈশ্বরকেই সব চেয়ে আমরা বেশি ঠকাই। সংসারে সব চেয়ে যেটা অল্পমূল্য, যা খোয়া গেলে বঞ্চিত মনে হয় না নিজেকে, সেইটিই ঈশ্বরকে নিবেদন করি। কাকে-ঠোকরানো ফলটাই সাজাই এনে পূজার থালায়। কিন্তু সেই মুহূর্তে নারানের মা’র মনে হল এমন প্রিয়তম যে পুত্র তাও সম্ভব দিয়ে দেওয়া যায় ঈশ্বরকে।

    ১২

    “ওরে কী শুনছি, থিয়েটারে সত্যি গৌর এল নাকি রে?” পদরত্নকে জিজ্ঞেস করলে তার বাপ। ‘যা তো কলকাতায় গিয়ে একবার দেখে আয়।’

    বাপ ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন। নবদ্বীপের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত।

    পদরত্ন গেল কলকাতা। যা দেখল তা আর যায় না দৃষ্টি থেকে। রঙ্গমঞ্চের পর্দা পড়ল কিন্তু চোখের আর পলক পড়ল না। গিরিশকে আশীর্বাদ করল প্রাণ ভরে, “গৌর তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করবেন।’

    ঠাকুর বললেন, ‘আমি থিয়েটার দেখতে যাব।’

    সকলে তো অবাক। যেখানে পণ্যস্ত্রীরা অভিনয় করে সেখানে ঠাকুর যাবেন দেখতে? রাম দত্ত বললে, ‘অসম্ভব।’

    ‘হ্যাঁ, যাবো। দেখব চৈতন্যলীলা।

    কে ঠেকায়! গৌর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করলেন। থিয়েটারের দরজার সমুখে দাঁড়াল পালকি গাড়ি। গৌর নিজে এসেছেন থিয়েটারে।

    কেন কে জানে গিরিশ নিজে গেল গাড়ির দিকে। তার আগেই নেমে পড়েছেন ঠাকুর। গিরিশকে দেখতে পেয়েই নত হয়ে নমস্কার করলেন। নমস্কার ফিরিয়ে দিল গিরিশ। তখনি আবার ঠাকুরের নমস্কার। নমস্কারে পারবে ঠাকুরের সঙ্গে? কোনো কিছুতে পারবে?

    ছেড়ে দিল, হেরে গেল গিরিশ। শেষ নমস্কার ঠাকুরের। যার শেষ নমস্কার তারই শেষ জয়।

    শুধু গায়ের জোরে নমস্কার নয়। এ একটি বিনয়নমিতা দীনতার নির্ঝরিণী। ধারাবাহিকী দ্রবীভূতা প্রীতিসুধা।

    উপরে একটি বক্সে জায়গা হল ঠাকুরের। এক পাখাওয়ালা এসে হাওয়া করতে লাগল।

    নিমাই বলছে শচীমাকে:

    ‘কৃষ্ণ বলে কাঁদো মা জননি,

    কেঁদো না নিমাই বলে—

    কৃষ্ণ বলে কাঁদিলে সকলি পাবে

    কাঁদিলে নিমাই বলে নিমাই হারাবে।’

    সমাধিতে ডুবে গেলেন ঠাকুর। আবার এলেন জীবভূমিতে। আবার খানিকক্ষণ শোনেন। আবার সমাধিস্থ হন।

    আচ্ছা, গিরিশকে আগে কোথায় দেখেছি বলো তো? এখনকার দেখা নয়, যেন বহু আগের দেখা, আগের আলাপ। ঐ সেই দক্ষিণেশ্বরে, প্রথম দিককার সাধনার পরিচ্ছেদে। কালীঘরে বসে আছি, দেখলাম একটি উলঙ্গ বালক নাচতে-নাচতে কাছে এল। কোমরে রূপোর পেটি, মাথায় ঝুঁটি বাঁধা। এক হাতে মদের ভাঁড়, অন্য হাতে সুধাপাত্র। কে তুই? হাঁক দিলাম। বললে, আমি ভৈরব। তা এখানে কেন? বললে, আপনারই কাজ করব বলে এসেছি। সেই ভৈরবই যে গিরিশ।

    ব্রাহ্মসমাজের নাটকে সাধু সেজেছিল নরেন। ঠাকুর দেখতে গিয়েছেন। সাধুবেশে যেই দেখলেন নরেনকে, দাঁড়িয়ে পড়লেন। বলতে লাগলেন আপন মনে, ‘এই ঠিক হয়েছে। ঠিক মিলেছে।’ তারপর ডাকতে লাগলেন হাতছানি দিয়ে। এ কি অসম্ভব কথা! সেজে আছে রঙ্গমঞ্চে, সে এখন নেমে আসবে কি! তখন কেশব বললে, ‘উনি যখন বলছেন, এসো না নেমে!’ উনি যেন সব নিয়মের ব্যতিক্রম! কিন্তু, যাই বলো, নেমে আসতেই হল নরেনকে। ঠাকুর তার হাত ধরলেন, আনন্দ-উজ্জল চোখে বললেন, তোকে এই বেশে একদিন দেখিয়েছিল মা। ঠিক এই বেশে। সত্যি, মিলে যাচ্ছে ঠিক-ঠিক—

    অভিনয়ের শেষে চৈতন্য এসে দাঁড়াল ঠাকুরের সামনে। যে এ পার্টে নামে, রোজ গঙ্গাস্নান করে হবিষ্যি করে নামে।

    সে মেয়ে অভিনেত্রী। নাম বিনোদিনী।

    বিনোদিনী সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল ঠাকুরকে। কল্পতরু ঠাকুর তাকে আশীর্বাদ করলেন, ‘মা, তোর চৈতন্য হোক।’

    তোমার চিত্তদর্পণের মার্জন হোক, ভবদাবাগ্নির নির্বাণ হোক, মঙ্গলজ্যোৎস্নায় ভরে যাক মনোমন্দির। হৃদয়ে সত্য ও শ্রদ্ধাকে প্রতিষ্ঠিত করো। হৃদয়ই সর্বভূতের আয়তন। হৃদয়ই সর্বভূতের প্রতিষ্ঠা। হৃদয়ই সম্রাট। হদয়ই পরম ব্রহ্ম। চৈতন্যমন্ত্রে তাকে জাগাও। মলয়স্পর্শে সুগন্ধানন্দ চন্দন হয়ে যাও।

    রোগ বড় শক্ত, কিন্তু ভয় নেই, রোজাও বড় পোক্ত। রোজার নামেই রোগ পালায়। হলাম গণিকা, তবু তোমার গণনাতে গণ্য হলাম। হে অখিলরসামৃতমূর্তি, আমি তাতেই ধন্য। আর কিছুই চাই না। গণ্য হয়েই ধন্য হলাম।

    একটি স্ত্রীলোক এসেছে দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের কাছে। ব্রীড়ার সঙ্গে বিষণ্ণতা মিশে মুখখানি ভারি করুণ। কি চাই? স্বামী মাতাল উচ্ছৃঙ্খল, সংসারে পয়সাকড়ি কিছু দেয় না, সব মদ খেয়ে নষ্ট করে। ঠাকুর যদি কিছু একটা ব্যবস্থা দেন। স্বামীর মন যাতে ভালো হয়।

    ঠাকুর পরিচয় নিয়ে জানলেন শ্যামপুকুরের কালীপদ ঘোষের স্ত্রী। কালীপদ মানে দানাকালী, গিরিশের বন্ধু। এক গ্লাশের ইয়ার। জন ডিকিন্সনে বড় কাজ করে কিন্তু মাইনে যা পায় তা প্রায় অকাজেই শেষ হয়৷

    ঠাকুর পাঠিয়ে দিলেন নহবতখানায়। সতীর দুঃখে সারদা বিচলিত হল। একটি পূজো-করা বেলপাতায় ঠাকুরের নাম লিখলে। বউটিকে দিয়ে বললে, রেখে দিও নিজের কাছে, আর খুব নাম কোরো।

    সতী স্ত্রী বারো বছর নাম করেছে।

    তারপর এক দিন দানাকালী হাজির দক্ষিণেশ্বরে। তাকে দেখেই ঠাকুর বলে উঠলেন, ‘বউটাকে বারো বচ্ছর ভুগিয়ে তবে এখানে এল!’

    কথা শুনে চমকে উঠল দানাকালী। তুমি কি করে জানলে? কিন্তু নিমেষে আবার আড়ষ্ট হয়ে গেল। সে তো ভক্তিতে আসেনি, সে এসেছে কৌতূহলে। পাঁচজনে বলাবলি করছে, দেখে আসি কেমনতরো! সেই অলস উসখুসুনি।

    ‘কি চাই তোমার? বলো না গো মুখ ফুটে। ঠাকুর প্রশ্ন করলেন আত্মজনের মত। দানাকালী এমন ছ্যাঁচড়, বললে, ‘একটু মদ দিতে পারেন?’

    ‘তা পারি বৈ কি। তবে এখানকার মদে এমন নেশা, তুমি সইতে পারবে না।’ দানাকালী হাসল। সে আবার সইতে পারবে না! বললে, ‘কি, বিলিতি মদ?’

    ‘না গো, একদম খাঁটি দিশি কারণ-বারি।’ ঠাকুর বললেন প্রসন্ন মুখে, ‘এখানকার মদ পেলে আর বিলিতি মদ ভালো লাগে না। তুমি ঐ মদ ছেড়ে এখানকার মদ ধরতে রাজী আছ?’

    দানাকালী স্তব্ধ হয়ে রইল এক মুহূর্তে। পরে উচ্ছ্বসিত হয়ে বললে, ‘সেই মদ আমায় দিন যা পেলে আমি সারা জীবন নেশায় বুঁদ হয়ে থাকব।’

    এমন কিছু দিন যা পেলে আর আমার কিছু পাবার থাকবে না। এমন প্রাপ্তি দিন যার পরে আর কোনো প্রত্যাশা নেই। এমন আনন্দ দিন যা সুখে-দুঃখে অবিচ্ছিন্ন। ঠাকুর দানাকালীকে ছুঁয়ে দিলেন। ছোঁয়ামাত্র কাঁদতে লাগল দানাকালী। কত লোকে কত বোঝায়, তবু সে কাঁদে। বাড়ি ফিরে এল বটে, মন পড়ে রইল দক্ষিণেশ্বরে। ক’দিন পরে আবার গিয়ে হাজির। ঠাকুর বললেন, ‘তুমি এসেছ? আমার একবার কলকাতা যাবার ইচ্ছে।

    ‘যাবেন?” দানাকালী উল্লসিত হয়ে উঠল: চলুন আমার সঙ্গে। ঘাটে বাঁধা আছে নৌকো।’

    সঙ্গে লাটু, ঠাকুর উঠলেন এসে নৌকোয়। মাঝনদীতে এসে বললেন, ‘জিব বের করো তো দেখি।’

    দানাকালী জিভ বের করল। আঙুলের ডগা দিয়ে কি তাতে লিখে দিলেন ঠাকুর। মৌতাত ধরল বুঝি এতক্ষণে। মনে হল, এমন বোধ হয় কিছু আছে যা পেলে নিজেকে নিঃস্ব জেনেও আনন্দ হয়। চন্দ্রসূর্যহীন অন্ধকার গুহাও আলো হয়ে ওঠে। যার ঘর নেই, পথই তার ঘর হয়ে দাঁড়ায়। যার সবাই পর, পরের মধ্যেই সে আপন জনের মুখ দেখে।

    ঘাটে নৌকো লাগল। দানাকালী জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় যাবেন?

    ‘কোথায় আবার! তোমার সঙ্গে এসেছি, তুমি যেখানে নিয়ে যাবে।’

    আনন্দে বিভোর হল দানাকালী। গাড়ি করে ঠাকুরকে তার নিজের বাড়িতে নিয়ে এল। শবরীর কুটিরে শ্রীরামচন্দ্র।

    “স্ত্রী যদি সতী-সাধ্বী হয়,’বললে লাটু ‘তা হলে সে স্বামীর জন্যে কঠোর করতে পেছপা হয় না। স্ত্রীর জন্যে উদ্ধার হয়ে গেল কালীপদ।’

    স্ত্রীর সাধনায় কালীপদ ধ্রুবপদ পেয়ে গেল। বুঝতেও পারেনি স্ত্রীর রূপ ধরে কৃপা এসেছিল তার সংসারে। আর যা দীনতা আর প্রতীক্ষা, যা নিষ্ঠা আর আঘাতসহতা তাই স্ত্রী। সংসারে দীনা দাসীর বেশে রাজেশ্বরী বিরাজ করছে বুঝতেও পারেনি। বুঝতেও পারেনি পরিধানে যে চীরবাস আছে আসলে তা তপস্বিনীর রাজবেশ। বাইরে যা প্রতিবাদ অন্তরে তাই প্রার্থনা।

    চিনতে পারল এতদিনে। বারো বছর ধরে যে নিশ্বাসবায়ু রুদ্ধ করে সঞ্চিত করে রেখেছিল তাই এখন কৃপার শীতলবায়ু হয়ে প্রবাহিত হল। এবার নোঙর তোলো, নৌকো ছাড়ো। যে বস্ত্রখণ্ড দিয়ে সঞ্চিত ধন বেঁধে রেখেছিলে, সঞ্চিত ধন জলে ফেলে দিয়ে সেই বস্ত্রখণ্ডকে এখন পাল করো। এত দিন তোমার স্ত্রী একা দাঁড় টেনেছেন, এবার হালে এসে বসেছেন স্বয়ং ভবার্ণবের কাণ্ডারী। আর ভয় নেই! ঠাকুরের অসুখ কাশীপুরের বাড়িতে, নিরঞ্জন দরজা আগলে রয়েছে, অবান্তর লোক কাউকে ঢুকতে দেবে না। যে-সে ঢুকবে আর ঠাকুরকে প্রণাম করবে, প্রণাম করে ঠাকুরের অসুখ বাড়িয়ে দেবে এ অসম্ভব। খুব কড়া মেজাজের ছেলে নিরঞ্জন। দেখতেও বেশ বলশালী। গয়নার নৌকোয় ফিরছে দক্ষিণেশ্বর, আরোহীরা খুব নিন্দা করছে ঠাকুরের। নিরঞ্জন প্রথম প্রতিবাদ করল, যুক্তিতর্কের রাস্তায় গেল, কিন্তু কেউই নিরস্ত হল না। তখন বললে, গুরুনিন্দা সইতে পারব না, নৌকো ডুবিয়ে দেব। শুধু মুখের কথা নয়, সাঁতারে ওস্তাদ নিরঞ্জন, জলে লাফিয়ে পড়ল, নৌকো ফেলতে গেল উলটিয়ে। তখন সকলে দেখলে মহৎভয় সমুদ্যত। করজোড়ে ক্ষমা চাইতে লাগল সকলে। করতে লাগল অনেক কাকুতি-মিনতি। তখন ছেড়ে দিলে। জল ছেড়ে ফের উঠল গিয়ে নৌকোয়।

    কথাটা কানে উঠল ঠাকুরের। নিরঞ্জনকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, ‘কে কি বলে না বলে তোর কী মাথাব্যথা পড়েছিল? ক্রোধ চণ্ডাল, তার কি বশীভূত হতে আছে? সৎ লোকের রাগ জলের দাগের মত, হতে না হতেই মিলিয়ে যায়। তা ছাড়া হীন-বুদ্ধি লোক কত কি অন্যায় কথা বলে, তা কি গায়ে মাখতে আছে? তা ছাড়া—’ নিরঞ্জন মাথা হেঁট করে রইল।

    ‘তা ছাড়া নৌকো যে ডোবাতে গিয়েছিলি, মাঝিমাল্লারা কি দোষ করেছিল? নিরীহ গরিবের উপর অত্যাচার হয়ে যেত, খেয়াল আছে?’

    আত্মগঞ্জনায় বিদ্ধ হল নিরঞ্জন।

    তার পর নিরঞ্জন আবার মাতৃভক্ত। ঠাকুরের পথে এসেছে অথচ চাকরি করছে এ কিছুতেই চলতে পারে না। কিন্তু চাকরি না করলে মা’র ভরণপোষণ হবে কি করে? আমার মুখের দিকে মা চেয়ে আছেন, আমি ছাড়া তাঁর কেউ নেই। কিন্তু ঠাকুর যদি জানতে পান?

    ‘তোর মুখে যেন একটা কালো ছায়া পড়েছে।’ ধরতে পেরেছেন ঠাকুর, ‘আপিসের কাজ করিস কিনা।’

    মুখের উপর যেন আরো এক পোঁচ কালি পড়ল।

    ‘তার জন্যে মুখ ম্লান করছিস কেন? তুই তো তোর মা’র জন্যে কাজ করছিস, ওতে কোনো দোষ নেই। ওরে মা যে ব্রহ্মময়ীস্বরূপা।

    বীর নিরঞ্জন, ভক্তিতে আর নির্মলতায় বিশ্বজিৎ নিরঞ্জন, সে ঠাকুরের দ্বাররক্ষী হবে না তো কে হবে! অপ্রিয় কর্তব্য সমাধা করবার মত নির্বিকার সামর্থ্য শুধু তারই আছে।

    দানাকালী তার এক সাহেব-বন্ধু নিয়ে হাজির। বললে, ঠাকুরের বিশেষ ভক্ত, অসুখ শুনে দেখতে এসেছে। এক মুহূর্ত দ্বিধা করল নিরঞ্জন, তাকাল একবার সাহেবের হ্যাট-কোটের দিকে। খাস ইংরেজ নয় হয়তো, কিন্তু ফিরিঙ্গি বলতে আপত্তি হবে না।

    সাহেব আর দানাকালী উঠে এল উপরে। ঠাকুরের ঘরে, একেবারে বিছানার কাছটিতে। মাথার থেকে হ্যাট খুলে নিয়ে সাহেব বললে, ‘আমি বিনোদিনী! চৈতন্যলীলার বিনোদিনী।’

    বলতে-বলতে সে কেঁদে ফেললে। ঠাকুরের রোগক্লিষ্ট মুখে দেখে তার কান্না আরো উথলে উঠল। মেঝেতে বসে পড়ে ঠাকুরের পায়ের উপরে মাথা রাখলে।

    কিন্তু ঠাকুরের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বললেন, ‘খুব ফাঁকি দিয়ে এসে পড়েছ তো! মেয়েছেলেকে একেবারে সাহেব সাজিয়ে! হ্যাটকোট পরিয়ে! খুব বাহাদুর তুমি কালীপদ!’

    ‘নইলে ওকে যে আসতে দিত না আপনার ভক্তেরা।’ বললে দানাকালী: ‘কতদিন থেকে কাঁদছে, বলছে ঠাকুরের এমন অসুখে আমি একবার দেখতে পাই না? আপনার পায়ে পড়ি, আমাকে একবার নিয়ে চলুন। ঠাকুরকে না দেখে আমি থাকতে পারছি না। তাই দয়া হল। নিয়ে এলাম আপনার কাছে।’

    এতটুকু ক্ষুব্ধ বা বিরক্ত হলেন না ঠাকুর। বরং পরিহাসটুকু পরমরসিকের মত উপভোগ করলেন। তাঁর বীর ভক্তদল প্রতারিত হয়েছে বলে এতটুকু তাঁর জ্বালা নেই, বরং ভক্তি ও ব্যাকুলতাকে কেউ যে রুখতে পারে না তাতেই ভীষণ প্রসন্ন হয়েছেন। বললেন, ‘তোমার বুদ্ধিকে বলিহারি!’

    “নইলে এমনি এলে ঢুকতেই দিত না যে। সাধারণ লোককেই দেয় না, আর এ তো অভিনেত্রী। বলে কিনা পা ছুঁয়ে প্রণাম করলে ঠাকুরের অসুখ বাড়বে।’ দানাকালী জোরের সঙ্গে বললে, ‘এ আমি বিশ্বাস করি না। যে পাপের জন্যে এখন অনুতাপ করছে তার স্পর্শে তো এখন শান্তি।’

    নিচে খবর পৌঁছে গিয়েছে ভক্তদের মধ্যে, দানাকালী বিনোদিনীকে সাহেব সাজিয়ে নিয়ে এসেছে ঠাকুরের কাছে। সকলের চোখে ধূলো দিয়ে দ্বারীকে কলা দেখিয়েছে। রাগে ফুলতে লাগল ভক্তদল। দানাকালী যতই ঠাকুরের আশ্রিত হোক, গিরিশের অনুগামী হোক, একবার দেখে নেবে তাকে।

    কিন্তু কিসের প্রতিশোধ, কার উপর! ঠাকুর যে সমস্ত ব্যাপারটা নিয়ে ভীষণ হাসি-পরিহাস করছেন! যা ঠাকুরকে এত আনন্দিত করছে তা তাঁর ভক্তদের ক্ষুদ্ধ করে কি করে? অগত্যা দানাকালী আর বিনোদিনীকে ছেড়ে দিতে হল দরজা। কিন্তু এবার রাম দত্তকে ঠেকিয়েছে নিরঞ্জন। কিছু মিষ্টি আর মালা উপর থেকে প্রসাদ করে এনে দিতে বলেছিল লাটুকে। হামাকে কেন, আপনি নিজে যান না। বললে লাটু। তখন নিরঞ্জন বাধা দিলে। লাটু বললে, ‘এঁকে যেতে দাও না! আপনা-আপনির মধ্যে এ সব নিয়ম কি জারি করতে আছে?”

    নিরঞ্জন তবু অনড়। অনমনীয়।

    তখন লাটু ফোঁস করে উঠল: ‘সেবার যখন দানাকালী বিনোদিনীকে সাহেব সাজিয়ে নিয়ে এসেছিল তখন তো তাকে ছেড়ে দিতে পেরেছিলে, আর আজ এঁর মত লোককে ছাড়তে চাইছ না? এর মানে কি?”

    অগত্যা ছেড়ে দিল রাম দত্তকে।

    লাটুকে ডাকলেন ঠাকুর। কেউ তাঁর কাছে নালিশ করেনি তবু শুনতে পেয়েছেন অন্তর্যামী। বললেন লাটুকে, ‘দ্যাখ কারুর কখনো দোষ দেখবিনি, ভুল দেখবিনি, কেবল গুণ দেখবি, ভালো দেখবি। বুঝলি?’

    লাটু চুপ করে রইল। মনকে শাসন করলে ব্যথার চাবুক মেরে। তাড়াতাড়ি নিচে নেমে নিরঞ্জনকে জড়িয়ে ধরল। বললে, ‘ভাই আমার মত মুখ্‌খুর কথায় দুঃখ করিসনি।’

    ১৩

    ‘আরেকদিন দেখাবে?’ বালকের মতন জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর। নয়নে সানন্দ-কৌতূহল।

    ‘বেশ তো যাবেন যে দিন খুশি। দেখে আসবেন।’

    ‘কিন্তু কিছু নিতে হবে।’

    কি নেব? টিকিটের দাম? ঠাকুর পয়সা পাবেন কোত্থেকে? কৃপা করে যে আসছেন সেই কি অনেক নিচ্ছি না?

    না, ঠাকুর পীড়াপীড়ি করছেন, নিতে হবে কিছু। কিছু না দিয়ে তিনিই বা দেখবেন কেন?

    গ্যালারির সিট আট আনা। গিরিশ হেসে বললে, ‘বেশ, আপনি আট আনা দেবেন।’ আমি গ্যালারিতে বসতে পারব না। সে বড় র‍্যাজলা-‘

    ‘না, না, আপনি গ্যালারিতে বসবেন কেন। সে দিন যেখানে বসেছিলেন সেই বক্সেই বসবেন।’

    ‘কিন্তু মোটে আট আনা?” গূঢ় রহস্যভরা হাসি হাসলেন ঠাকুর।

    তা—’ গিরিশ তাকিয়ে রইল মুখের দিকে।

    ‘আট আনা নয়, ষোলো আনা দেব।’

    ষোলো আনা দেব। ফাঁক রাখব না, ছিদ্র রাখব না, নিরবকাশ করে দেব। ভরে দেব সম্পূর্ণ করে। ষোলো কলা একত্র করে দেব তোমাকে পূর্ণচন্দ্র। করুণার পূর্ণচন্দ্র। প্রসাদের পূর্ণঘট।

    কিন্তু তুমিই শুধু দেবে, আর আমি নেব হাত পেতে? আমার এ দারিদ্র্য এ কার্পণ্য আর সহ্য হয় না। শুষ্ক পিপাসা দিয়ে গড়েছি যে শূন্য পেয়ালা তা এবার ভেঙে ফেলব। আমি নিজেকে বুঝেছি এবার মহীয়ান রূপে, ঐশ্বর্যবান দাতারূপে। এবার আমি দেব, তুমি নেবে। তুমি আমার দুয়ারে এসে দাঁড়াবে প্রার্থী হয়ে আর আমি তোমাকে ভিক্ষে দেব।

    বলো তো, কী দেব? নয়নের অশ্রু, হৃদয়ের চন্দন, কন্ঠের ফুলমালা।

    না, আংশিক নয়, তোমাকেও আমি দেব ষোলো আনা। আমার আমি-কে দিয়ে দেব তোমার হাতে। ঢেলে দেব, বিকিয়ে দেব, বিলিয়ে দেব। কিছু রাখব না আপনার বলে। তখন আমিই তোমার আপনার।

    তোমার দান, আমার সমর্পণ। তোমার দয়া, আমার উৎসর্গ।

    জানি না দাতা হিসাবে কে বড়? তুমি না আমি?

    প্রথমবার যখন যান থিয়েটারে, লোকজন আলো দেখে ঠাকুর বালকের মতন খুশি। বক্সে বসে বলছেন মাস্টারমশাইকে, ‘বাঃ, এখানে এসে বেশ হলো। অনেক লোক এক সঙ্গে হলে উদ্দীপন হয়। দেখতে পাই তিনিই সব হয়েছেন।’

    জগন্নাথ মিশ্রের ঘরে অতিথি এসেছে। অতিথি চোখ বুজে ভগবানকে অন্ন নিবেদন করছে, নিমাই ছুটে এসে তাই খেয়ে নিচ্ছে পলকে। গঙ্গাস্নানের পর ঘাটে বসে পূজো করছে ব্রাহ্মণেরা, নিমাই এসে কেড়ে খাচ্ছে নৈবেদ্য। বিষ্ণুপূজোর নৈবিদ্যি কেড়ে নিচ্ছিস, সর্বনাশ হবে তোর—এক ব্রাহ্মণ তেড়ে গেল নিমাইকে। পালিয়ে গেল নিমাই। মেয়েরা ভালোবাসে ছেলেটাকে। নিমাই চলে যাচ্ছে দেখে তারা ব্যাকুল হয়ে উঠল। ডাকতে লাগল, নিমাই, ফিরে আয়, নিমাই, ফিরে আয়। নিমাই ফিরল না।

    আমি জানি কি করে ফেরাতে হয় নিমাইকে। আমি জানি সেই মহামন্ত্র। বললে একজন উটকো লোক। বলেই সে বলতে লাগল, হরিবোল, হরিবোল। হরিবোল বলতে-বলতে ফিরে এল নিমাই। ফিরে এল নাচতে নাচতে।

    ঠাকুর আর স্থির থাকতে পারলেন না। মুখে বললেন, আহা, আর নয়নে ঝরতে লাগল প্রেমাশ্রু।

    বাবুরামও সঙ্গে ছিল। তাকে আর মাস্টারমশাইকে বললেন, ‘দেখ আমার যদি ভাব কি সমাধি হয়, গোলমাল কোরো না। ঐহিকেরা ঢং বলবে।’

    বহুবার, নাটকের বহু জায়গায় ঠাকুরের সমাধি হল, কিন্তু নিমাইয়ের সন্ন্যাসের সংবাদ পেয়ে শচী যখন মুর্ছিত হয়ে পড়ল ঘর ভরা দর্শকের দল হায় হায় করে উঠলেও ঠাকুর বিচলিত হলেন না। এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন সেই ঝড়ে-ছেঁড়া বৃক্ষশাখার দিকে।

    অভিনয়ের পর গাড়িতে উঠতে যাচ্ছেন, একজন এসে জিজ্ঞেস করলে, কেমন দেখলেন?

    প্রসন্ন-স্বরে ঠাকুর বললেন, ‘আসল-নকল এক দেখলাম।’

    মহেন্দ্ৰ মুখুজ্জের বাড়ি হয়ে গাড়ি চলেছে দক্ষিণেশ্বরে। ঠাকুর গান ধরেছেন:

    ‘গৌর-নিতাই তোমরা দু ভাই,

    পরমদয়াল হে প্রভু–

    আমি গিয়েছিলাম অনেক ঠাঁই,

    কিন্তু এমন দয়াল দেখি নাই,

    ব্রজে ছিলে কানাই বলাই, নদে হলে গৌর-নিতাই।

    ব্রজের খেলা ছিল, দৌড়োদৌড়ি,

    এখন নদের খেলা ধূলায় গড়াগড়ি।

    ছিল ব্রজের খেলা উচ্চ রোল,

    আজ মদের খেলা কেবল হরিবোল।।

    ওহে পরম করুণ, ও কাঙালের ঠাকুর–

    মাস্টারমশাইও গাইছেন সঙ্গে-সঙ্গে।

    মহেন্দ্র মুখুজ্জে খানিকটা এগিয়ে দিচ্ছেন গাড়িতে। বললেন, একবারটি তীর্থে যাব।

    ঠাকুর হাসলেন। বললেন, “কিন্তু প্রেমের অঙ্কুরটি হতে না হতেই তাকে শুকিয়ে মারবে? কিন্তু যাও যদি, শিগগির এস, দেরি কোরো না।’

    তীর্থ কোথায়? তীর্থ তোমার এই অন্তরের নির্জনতায়। সেইখানেই গহন গিরি-গুহা, শিহরময় শৈলশিখর, সেইখানেই সঙ্গবিহীন সমুদ্র তীর! তোমার বাইরের তীর্থ জীর্ণ হয়, পুরোনো হয়, কিন্তু এই অন্তরের দেবালয় রোজ তুমি নিজের হাতে নিত্যনবীন ভাবরসে নির্মিত করো। ধৌত করো অশ্রুজলে। জ্বালো একটি অনাকাঙ্ক্ষার ঘৃতপ্রদীপ। বাইরের তীর্থে কত বিক্ষোভ কত মালিন্য কিন্তু অন্তর-তীর্থে অনাহত প্রশান্তি। এই অন্তরতীর্থে আশ্রয় নাও। অন্তরতমকে দেখ। তার সামনে দাঁড়াও করজোড়ে।

    গিরিশ ঠাকুরকে একটি ফুল দিল।

    নিয়ে তখনি আবার ফিরিয়ে দিলেন ঠাকুর। বললেন, ‘আমায় ফুল দিচ্ছ কেন? ফুল দিয়ে আমি কী করব? ফুলে আমার অধিকার নেই।’

    ফুলে আবার কার অধিকার?”

    দুজনের। এক দেবতার, আর ফুল-বাবুর।’

    সকলে হাসতে লাগল।

    থিয়েটারে কনসার্টের সময় আরেক কামরায় বসালো ঠাকুরকে। কথায় কথায় ঠাকুরের ভাবসমাধি হল। মনের আড় যায়নি এখনো গিরিশের। ঠিক ঢং না ভাবলেও ভাবল বোধ হয় বাড়াবাড়ি। যে মুহূর্তে সংশয় ছায়া ফেলল, ঠাকুর চোখ চাইলেন। কুয়াশা কাটিয়ে দেবার জন্যে উদয় হল দিবাকরের।

    ‘মনে তোমার বাঁক আছে।’ বললেন ঠাকুর।

    শুধু একটা? অসংখ্য। কত কুটিল আবর্ত। অন্ধ ঘূর্ণিবাত। কত অসরল পন্থা, অস্বচ্ছ লক্ষ্য। বক্তৃতা আর শীর্ণতা। মালিন্য আর আবিল্য। শুধু বিবৃদ্ধ বাসনা।

    ‘এ বাঁক যায় কিসে?’ গিরিশের কণ্ঠে লাগল বুঝি কান্নার রঙ।

    শুধু বিশ্বাসে।’

    বিশ্বাসে কী না হতে পারে? যার ঠিক, তার সবতাতে বিশ্বাস। সাকার, নিরাকার, রাম, কৃষ্ণ, ভগবতী। বিশ্বাস একবার হয়ে গেলেই হল। বিশ্বাসের বড় আর জিনিস নেই। বিভীষণ একটি পাতায় রাম নাম লিখে একজনের কাপড়ের খুঁটে বেধে দিলে। বললে, সমুদ্রের ওপারে যাবে তো, ভয় নেই, দিব্যি জলের উপর দিয়ে চলে যাও। বিশ্বাস করে চলে যাও। কিন্তু অবিশ্বাস করেছ কি, পড়েছ জলের তলে। বিশ্বাস করে সোজা চলে যাচ্ছে সে লোক, ঢেউয়ের উপর দিয়ে, চোখ সামনে রেখে, ঘাড় খাড়া করে। যাচ্ছে-যাচ্ছে, হঠাৎ মনে হল, কাপড়ের খুঁটে কী বাঁধা আছে একবার দেখি। খুলে দেখে, আর কিছু নয়, শুধু একটি রাম নাম লেখা। এই? শুধু একটি রাম নাম? যেই অবিশ্বাস, অমনি ডুবে গেল, ঢেউ এসে গ্রাস করলে!

    সেই কৃষ্ণকিশোরের বিশ্বাস। একবার ঈশ্বরের নাম করেছি, আমার আবার পাপ কি! অনাময় নির্মল হয়ে গিয়েছি আমি।

    আর আমাকে কে টলায়! বিশ্বাস করে বসেছি। আকাশ নিজে জানে না তার ব্যাপ্তি কতদূর। তেমনি আমি নিজে জানি না আমার এ অনুভূতির সীমা কোথায়! কিসের ব্যাপ্তি, কিসের অনুভূতি? আর কিছু নয়, আর কিছু নেই, শুধু তুমি আছ। তোমার প্রকাশেই আর সকলে অনুভাত। তুমিই রথেশ্বর আত্মা। সর্বলোকচক্ষু সূর্য। বিশ্বাস করে ফেলেছি। আর আমাকে কে ফেলে! এবার জলে পড়লেও জলে ডুবব না। আগুনে পুড়লেও পুড়বে না কপাল। ভবমরুপরিখিন্ন হয়ে পথ চলছিলাম, এবার নেমে পড়েছি এক মনোহর সরোবরে। যত ক্লান্তি আর ক্লেদ, যত সন্তাপ আর অতৃপ্তি সব শান্ত হল অবগাহনে। আর কে আমাকে তোলে সেই সরোবর থেকে? সেই আমার তাপতৃষাহর হরিসরোবর।

    দেখ, দেখ, তাঁর অঙ্গকান্তি সেই সরোবরের জল, তাঁর করতল ও পদতল পদ্ম হয়ে ফুটে আছে, তাঁর চক্ষু হচ্ছে মীন আর তাঁর বাহুর আন্দোলন হচ্ছে তরঙ্গলীলা। শুধু শান্তি আর শান্তি। অগাধ ভবজলধি ভেবেছিলাম, এখন দেখি সরল-স্বচ্ছ শীতল সরোবর।

    তোমাকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। তুমি কত সহজ! আকাশের মত সহজ, প্রাণের মত সহজ, তৃণের মত সহজ। আমার নিশ্বাসের মত সহজ।

    তুমি যে আমার নিশ্বাস, এইটিই বিশ্বাস করেছি আজ।

    “ও দেশে যাবার সময় রাস্তায় ঝড়-বৃষ্টি এল।’ বলছেন ঠাকুর, ‘মাঠের মাঝখানে আবার ডাকাতের ভয়। তখন সবাই বললাম, রাম কৃষ্ণ ভগবতী। আবার বললাম, হনুমান। আচ্ছা, সব যে বললাম, এর মানে কি? কি জানো, ঐ যখন চাকর বা ঝি বাজারের পয়সা নেয় প্রথমটা আলাদা-আলাদা করে নেয়, এটা আলুর পয়সা, এটা বেগুনের, এ কটা মাছের। সব থাক-থাক হিসেব করে নিয়ে তারপর দে মিশিয়ে।’

    একই অনেক হয়ে মিশেছে। অনেক আবার মিশেছে সেই একে। চাই সেই বিশ্বাস। বালকের বিশ্বাস। গুরু বাক্যে বিশ্বাস। মা বলেছে ওখানে ভূত আছে, তা ঠিক জেনে আছে যে ভূত আছে। মা বলেছে, ওখানে জুজু তা ঠিক জেনে আছে ওখানে জুজু ছাড়া কেউ নেই। মা বলেছে ও তোর দাদা হয়, তা জেনে আছে, পাঁচ সিকে পাঁচ আনা দাদা।

    চোখওয়ালা বিশ্বাস নয়, চোখ বন্ধকরা অন্ধ বিশ্বাস। বিচারের পরেও আবার বিচার চলে, কথার পরে আরো কথা। কিন্তু বিশ্বাসের পরে আর কিছু নেই। স্তব্ধতার পরে আবার স্তব্ধতা কি।

    ভক্তদের জন্যে মা’র কাছে কাঁদছেন ঠাকুর। ‘মা, যারা যারা তোর কাছে আসছে তাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিস মা। সব ত্যাগ করাসনি! কী নিয়ে থাকবে, খুব কষ্ট হবে যে! সংসারে যদি রাখিস, এক-একবার দেখা দিস! এক-একবার দেখা না দিলে উৎসাহ পাবে কি করে? শেষে যা হয় করিস, একেবারে বিমুখ করিসনে।’

    রাম দত্তের বাড়িতে আরেকবার দেখা পেয়েছে ঠাকুরের। জিজ্ঞেস করছে আকুল হয়ে, ‘বলুন, আমার মনের বাঁক যাবে তো?’

    থিয়েটারে এসে সেদিন একটা চিরকুট পেল গিরিশ। কে দিয়েছে? কেউ বলতে পারলে না। লেখা কি? লেখা, আজ রাম দত্তের বাড়ি পরমহংসদেব আসবেন। তাতে গিরিশের কি? জোয়ারের জলে কাছিতে হঠাৎ টান পড়ল, গিবিশ বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়।

    অনাথবাবুর বাজারের কাছাকাছি এসে থামল গিরিশ। ওই কি নেমন্তন্নের চিঠি? অচেনা লোকের বাড়ি ওই চিরকুটের নেমন্তন্নে যাব? রামবাবুর সঙ্গে আলাপ নেই, তাঁর নেমন্তন্ন কি এমনি উপেক্ষার চেহারা নেবে? দরকার নেই আমার রবাহূতের দল বাড়িয়ে।

    কিন্তু ফেলবে এমন সাধ্য নেই। তবে ও কার নেমতন্ন? চিরকুটটা কি উপেক্ষা? না কি অন্তিকতম আন্তরিকতার ডাক?

    রামবাবু খোল বাজাচ্ছে আর ঠাকুর নাচছেন। ছন্দের দৃঢ়তার উপর দাঁড়িয়ে ভাব-কোমল নৃত্য। সঙ্গে গান হচ্ছে ‘নদে টলমল করে গৌরপ্রেমের হিল্লোলে।’ কাকে বলে প্রেম আর কাকে বলে প্রেমের হিল্লোল সমস্ত প্রাণকে দুই চক্ষুর মধ্যে পরিপূর্ণ করে দেখল গিরিশ। আর কাকে বলে টলমল করা দেখল একবার অন্তরীক্ষের দিকে তাকিয়ে। আকাশের তারা আর মর্তের মুহূর্তে নাচছে হাত ধরাধরি করে। এখনো চিনতে পারছে না, তার মনে কি এখনো বাঁক আছে? বাঁকাকে দেখে বাঁক কি এখনো সিধে হয়নি?

    নাচতে নাচতে ঠাকুর একবার গিরিশের কাছে এসে পড়েছেন। আর সেইখানেই সমাধিস্থ। মাথাকে নত করে দিল, গিরিশ প্রণাম করল ঠাকুরকে। কীর্তনান্তে ঠাকুর যখন পুরোপুরি নামলেন দেহভূমিতে, গিরিশ জিজ্ঞেস করল, আমার মনের বাঁক যাবে?

    ঠাকুর বললেন, ‘যাবে।’

    যেন স্বকর্ণে শুনেও বিশ্বাস করা যায় না, এমনি দ্বিধান্বিতভাবে আবার জিজ্ঞেস করল গিরিশ, ‘সত্যি, যাবে?’

    ‘যাবে।’

    তবু, বার-বার তিনবার।

    ‘ঠিক বলছেন, যাবে আমার মনের বাঁক?

    ‘সত্যি বলছি, যাবে, যাবে, যাবে।’

    মনোমোহন মিত্তির বসেছিল পাশে। বিরক্তির ঝাঁজ নিয়ে বললে, ‘এক কথা একশো-বার জিজ্ঞেস করছেন কেন? উনি বলছেন যাবে, তবু বার-বার ত্যক্ত করা।’

    কি আস্পর্ধা লোকটার, মুখের উপর সমালোচনা করে! গর্জে উঠতে যাচ্ছিল, মুহুর্তে শান্ত হয়ে গেল গিরিশ। অনুভব করল তার মনের বাঁক কেটে গেছে। ক্রোধের বদলে দীনতা এসেছে। রূঢ়তার বদলে স্নৈধ্য। কলহ না করে দেখলে আত্মদোষ। সত্যিই তো, ঠাকুরের এক কথাই একশো সত্যের সমান। তবে কেন অসহিষ্ণু হয়েছিলাম? ঠাকুরকে কেন বসাতে পারিনি এক কথার একাসনে?

    পরদিন থিয়েটার যাবার পথে তেজ মিত্তিরের সঙ্গে দেখা।

    ‘ও মশায়, কাল আপনার জন্যে একটি চিরকুট রেখে এসেছিলাম, পেয়েছিলেন?’

    ‘তুমি কোথায় পেলে?’

    ‘কোথায় আবার পাব! থিয়েটারে গিয়ে দেখলাম আপনি নেই, তাই নিজের হাতে লিখলাম চিরকুট।

    ‘কিন্তু আপনাকে সংবাদ কে দিলে?’

    ‘কিসের সংবাদ?’

    বিরক্ত হয়ে ঝাঁজিয়ে ওঠবার প্রশ্ন এই। কিন্তু অদ্ভুত নম্র থেকে গিরিশ বললে, ‘রাম দত্তের বাড়িতে পরমহংসদেবের আসার সংবাদ!’

    ‘আর কে দেবে! স্বয়ং প্রভু। আমাকে বললেন থিয়েটারের গিরিশ ঘোষকে একটা খবর দিও।’

    ‘আমাকে কেন খবর দিতে বললেন বলতে পারেন?”

    ‘তার আমি কি জানি!’ তেজ মিত্তির দু’হাতে শুন্যায়িত ভঙ্গি করলে: মা কেন তার সন্তানকে ডাকবে, এই কৈফিয়ত আমার জানা নেই।’

    তুমি আমাকে ডাক দিয়েছ এ কি আসেনি আমার কর্ণকুহরে? আমার অন্তরতিমিরে জ্বলেনি কি তোমার ডাকের দীপশিখা? হৃদয়ের শুষ্ক মঞ্জরীর মর্মদেশে লাগেনি কি ডাকের লাবণ্যবর্ণ? বিভাবরী ভোর হল, তোমার ডাকটি এল আজ তপস্বিনী ঊষসীর মূর্তিতে। তোমার ডাক শুনে জাগি আজ অম্লান-নির্মল নেত্রে, শ্যামায়মান প্রাণের সমারোহে। বলবান বিশ্বাসের দুর্বারতায়। নিমেষের কুশাঙ্কুরকে পায়ে দলে চলব নবতর প্রভাতের আবিষ্কারে। মৃত্যুর উদার তীর্থে। সেই পরমা নিবৃতির শেষ প্রান্তে।

    ভবনাথকে বলছেন ঠাকুর, ‘আসবে হে আসবে! আমি চেয়েছিলাম ষোলো আনা, গিরিশ আমাকে পাঁচ সিকে পাঁচ আনা দিলে। না দিয়ে যাবে কোথা? আলো যখন উপচে পড়বে, তখন যাবে কোথা, দিতেই হবে। প্রেম যখন উপচে পড়বে তখন ধরবে কি আর প্রাণপাত্রে? যাবে কোথায়, ঢালতেই হবে সে মধু প্লাবন! সে দানের ক্ষয় নেই। সে গানের শেষ নেই। আর সে প্রাণ অপরিচ্ছেদ্য।

    ১৪

    গিরিশ দক্ষিণেশ্বরে এসে উপস্থিত। আর গড়িমসি নয় একেবারে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম। জানু, পদ, হস্ত, বক্ষ, শির, দৃষ্টি, বুদ্ধি ও বাক্য সহযোগে সম্পূর্ণ আত্মসমৰ্পণ। দক্ষিণের বারান্দায় একখানি কম্বলের উপর বসে আছেন ঠাকুর। সামনে আরেকখানি কম্বলে ভবনাথ বসে।

    ‘এসেছিস? আমি জানি তুই আসবি। জিজ্ঞেস কর একে,’ ভবনাথের দিকে ইশারা করলেন ঠাকুর, ‘তোর কথাই বলছিলাম এতক্ষণ। বোস, পাশে এসে বোস।’ পায়ের কাছে বসে পড়ল গিরিশ। বললে, ‘আপনি জানেন না আমি কত বড় পাপী। আমি যেখানে বসি সাত হাত মাটি পর্যন্ত তলিয়ে যায় পাপের ভারে।’ ‘তাই নাকি?” অভয়মাখা হাসি হাসলেন ভুবনসুন্দর। বললেন, ‘তুই এত পাপী যে পতিতপাবনও সে পাপ হরণ করতে অক্ষম—তাই না?’

    ‘কিন্তু আমি যে পাপের পাহাড় করেছি।’

    ‘পাহাড় করেছিস নাকি?” ক্লান্তিহরণ হাসি হাসলেন আবার। বললেন, ‘ও তো তুলোর পাহাড়। একবার মা বলে ফুঁ দে, উড়ে যাবে।’

    অকূলে যেন কূল পেল গিরিশ। যেন আর সে ভেসে যাবে না, তলিয়ে যাবে না, হারিয়ে যাবে না। বললে, ‘এখন থেকে আমি কী করব?”

    ‘যা করছিস তাই কর।’

    কী করছি? বই লিখছি। ধারণা নেই, লিখে চলেছি অভ্যাসবশে। লোকে বলে, অন্তরে বিশ্বাস না থাকলে অমন জিনিস বেরোয় না কলমে। বিশ্বাসের জোর তো ভারি, কখানি নাটক লেখাচ্ছে। লোকশিক্ষা হচ্ছে নাকি! মস্ত পণ্ডিত আমি, লোক-শিক্ষা দেবার আর লোক নেই দুনিয়ায়! ঠাকুরের পদাশ্রয়ে এসে এখনো বই লেখা! তুচ্ছ পুঁথির পুঁতির মালা তৈরি করা।

    “হ্যাঁ, বই লেখাটাও কর্ম। কর্ম না করলে কৃপা পাবে কি করে? জমি পাট করে রইলেই তো জন্মাবে ফসল।’

    সেই দিনানুদৈনিক কাজ, সেই বই লেখা, সেই থিয়েটার করা–এখনো ঠাকুরের এই ব্যবস্থা?

    হ্যাঁ, এই। কর্মে ঈশ্বরের সাথে যুক্ত হয়ে যখন তোর ঘর্ম ঝরে পড়বে তখনই তোর আসল ধর্ম। তবে একটু স্মরণ-মনন চাই। ওটিই হচ্ছে যুক্ত হবার সেতু। লেগে থাকবার আঠা।

    এখন এদিক-ওদিক দুদিক রেখে চল।’ বললেন ঠাকুর, ‘তারপর যদি এই দিক ভাঙে তখন যা হয় হবে। তবে,’ ঠাকুরের কণ্ঠে মিনতি ঝরে পড়ল: ‘সকালে-বিকালে স্মরণ-মননটা একটু রাখিস, পারবিনে?’

    মুষড়ে পড়ল গিরিশ। এ আবার কী বাঁধাবাঁধি! সকালে কখন ঘুম থেকে ওঠে তার ঠিক নেই। বিকেলে হয় থিয়েটারে নয় অন্য কোথাও! স্মরণ-মননের সময় কই! শেষকালে কথা দিয়ে কথার খেলাপ করি আর কি! কিন্তু কত সামান্য কথা। এটুকুও গিরিশ রাখতে পারবে না? কোনো কঠিন ব্রত-নিয়ম করতে বলছেন না, নয় কোনো আসন-প্রাণায়াম, নিশান্তে ও দিনান্তে একটু শুধু মনে করে ঈশ্বরকে বাধিত করা! এটুকুতেও গিরিশ অসমর্থ! লোকে বলবে কি!

    কিন্তু মনকে চোখ ঠেরে তো লাভ নেই। সরলতার ঠাকুর, তাঁর সামনে কেন ধরব ছদ্মবেশ? মুখে যাই বলি মনের কথা তিনি ঠিক নখমুকুরে দেখে নেবেন।

    ‘বহু দিনই সকালের সঙ্গে দেখা হয় না, ঘুম ভাঙতে ভাঙতেই দুপুর। আর বিকেল?” গিরিশ কুণ্ঠিত মুখে বললে, ‘বিকেল যেখানে কাটে সেখানে আরেক রকম মোহনিদ্রা!

    ‘বেশ, খাবার আগে?’ ঠাকুরের কত দায় এমনি ভাবে বলছেন কাতর হয়ে: ‘না খেয়ে তো আর থাকিস না? বেশ তো, খেতে বসে একটু নাম করিস মনে-মনে।’ সত্যি, রোজ খাই তো? এমন এক-একদিন গেছে কাজে-কর্মে খাওয়াই হয়নি। খেতে বসেছি, কিন্তু এত দুশ্চিন্তা, খাচ্ছি বলে হুঁস নেই। কোনোদিন দশটায়, কোনোদিন বা বিকেল তিনটেয়। কোনোদিন কতগুলি শিঙাড়া-কচুরি খেয়ে দিন কেটেছে থিয়েটারে। আমার আবার খাওয়া! আসন নেই, বাসন নেই, ফরাসে বসে ঠোঙায় করেই খেয়ে নিলাম। আমার আবার স্থির হয়ে বসে নাম করা!

    ‘ও পারব না।’ মাথা চুলকোতে লাগল গিরিশ: ‘খাওয়ার আমার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। তা ছাড়া খিদের সময় খাবার পেলে আর কিছু তখন মনে থাকে না।’

    যেন কত বাহাদুরের মত কথা বলছে। সামান্য একটা অনুরোধ, অত্যন্ত সোজা অত্যন্ত হালকা, তবুও সে অপারগ! সমাজে সে মুখ দেখাবে কি করে!

    কিন্তু ঠাকুর দেখুন তার গহন মনের গোপন মুখচ্ছবি। যা সে পারবে না তা সে বলবে করব? অসত্যের চেয়ে অক্ষমতা অনেক নির্দোষ।

    তবু নিরস্ত হন না ঠাকুর। বললেন, কণ্ঠস্বরে সেই মমতাময় মিনতি, ‘বেশ তো, শোবার আগে? শুতে না শুতেই তো ঘুম আসে না! অন্তত এক-আধ মিনিট তো অপেক্ষা করতে হয়! তখন, সেই এক-আধ মিনিট সময়টুকুর মধ্যে একটু নাম করিস!’

    ভালো সময়ই বের করেছ বটে! আমার কি ওটা ঘুম? আমার ওটা বিস্মরণ। কিংবা বিস্মরণের সমুদ্রে আত্মবিসর্জন। একটি শুচিস্নিগ্ধ শান্তির জন্যে প্রতীক্ষা নয়, জ্বালা-নিবারণের ওষুধ। আর শুই কোথায়? কোন বিছানায়? কার বিছানায়? মাথা হেঁট করল গিরিশ। বললে, ‘আমার ঘুম আসে না। আর ঘুম যদি না আসে নামও আসে না।’

    ছি-ছি, এমন করে কেউ প্রত্যাখ্যান করেছে ঠাকুরকে! গন্ধমাদন আনতে বলেননি, গাণ্ডীব তুলতে বলেননি, চাননি দধীচির অস্থি। বলেননি, গুহায় যাও পর্বতে গিয়ে ওঠো বা অরণ্যে প্রবেশ করো। শুধু একটি চিহ্নিত সময়ে মনের নির্জনে একটু ঈশ্বরকে স্মরণ করা। এত সংখ্যা জপ করতে হবে, তাও না। কোনো ধরা-বাঁধা মন্ত্ৰ নয় যে মুখস্ত লাগবে বা উচ্চারণে ভুল হবে। একেবারে বেকড়ার, একেবাবে বেকসুর। চোখ পর্যন্ত বুজতে হবে না। একটু শুধু ভাবা। মনে দাগ রাখতে হবে বা স্থান দিতে হবে মনের কোণে এমনও কোনো কথা নেই। শুধু সময়ের উড়ন্ত বাতাসে একটি চপল মুহূর্তের ঘ্রাণ নেওয়া। এটুকুও করতে পারবে না, দিতে পারবে না গিরিশ? ছি-ছি, তবে সে জন্মেছিল কেন মানুষ হয়ে?

    কিন্তু বৃথা বড়াই করে লাভ নেই। গিরিশ নিজেকে তো জানে। কেমন সে বাউণ্ডুলে কেমন সে ছন্নমতি! শেষে যদি কথা দিয়ে কথা রাখতে না পারে। আসলে ভগবানের যে নাম করব তাঁর কৃপা না হলে হবে কি করে? এই যন্ত্রে যে তিনি ঝঙ্কার তুলবেন যন্ত্র নিজের হাতে তো তাঁকে বেঁধে নিতে হবে! বাঁধবার সময় ব্যথা লাগবে সন্দেহ নেই, কিন্তু সেই ব্যথাই তো কৃপা।

    কিন্তু, এ কি, এ কৃপা যে ব্যথাহীন। এ কৃপা যে অহেতুক!

    ‘বেশ, তোকে কিছুই করতে হবে না। ঠাকুর বললেন প্রসন্নাস্য: ‘আমাকে তুই বকলমা দে।’

    তার মানে?

    তার মানে, তোকে কিছুই করতে হবে না, তোর ভার আমার উপর ছেড়ে দে! তোর হয়ে আমিই নাম করব। তুই শুধু কলম ছুঁয়ে দে, আমিই সই করব তোর হয়ে। আর কি চাই! আমার একেবারে ছুটি, আমি নেচে-গেয়ে আনন্দ করে বেড়াব। যা করবার প্রভু করবেন। আমি নন্দের গোপাল হামা দিয়ে বেড়াব। তিনিই ধূলো মুছে কোলে তুলে নেবেন।

    কিন্তু এ কি গিরিশ ছুটি পেল, না বাঁধা পড়ল দ্বিগুণ শৃঙ্খলে?

    বাঁধা পড়ল। গিরিশের আর আমি রইল না। ঠাকুর যখন ভার নিয়েছেন তখন নিজের আর কোনো কর্তৃত্ব নেই, সব তাঁর ইচ্ছাধীন। আমার হয়ে তিনি সত্যি নাম করছেন কিনা এটকু প্রশ্ন করবারও আর অধিকার নেই। সব তাঁর খুশি, তাঁর এক্তিয়ার। ভার নেওয়া কঠিন হতে পারে, ভার দেওয়াও কম কঠিন নয়। ভার দেওয়া মানে পালিয়ে যাওয়া নয়, ভার দেওয়া মানে কোলের উপর বসা, কাঁধের উপর চড়া। নইলে, ভার যে দিলাম চাপিয়ে, বোঝাব কি করে?

    আমার হয়ে সত্যি নাম করছেন কিনা–মাঝে-মাঝে এ চিন্তা আসে। এমনিতে হলে একবার নাম হত, এ চিন্তায় দুবার করে হচ্ছে। প্রথমত, নাম হচ্ছে কিনা-নামই রাম-আর দ্বিতীয়ত, ঠাকুর করছেন কিনা। নামের সঙ্গে-সঙ্গে ঠাকুরের মূর্তি মনে ভাসছে। একের জায়গায় দুই হচ্ছে।

    এ যে অছি বসিয়ে দেওয়া। আর ‘আছি’ নয়, এবার অছি। আর ‘আমি’ নয়, এবার তুমি। আমার বলে আর কিছু নেই সংসারে। আমার কলম তোমার হাতে তুলে দিয়েছি। পা-টি ফেলছি এ আমার জোরে নয়, তোমার জোরে। নিশ্বাসটি ফেলছি এ আমার কেরামতি নয়, তোমার করুণা।

    ‘বকলমা দেওয়ার মধ্যে যে এত আছে তা কে জানত! সময় করে নাম করা যেত তার একটা অন্ত থাকত। এ যে একেবারে অনন্তের মধ্যে এসে পড়লাম।’ গিরিশ বলছে তদ্‌গত হয়ে: ‘কোথাও একটুকু ফাঁক নেই, ফাঁকি নেই। বকলমা দেওয়া মানে গলায় বকলস লাগানো। খাস ছেড়ে দিয়ে দাস বনে যাওয়া!’

    স্ত্রী মারা গেল গিরিশের। পুত্র মারা গেল।

    উপায় নেই, বকলমা দিয়ে দিয়েছ। মনকে প্রবোধ দেয় গিরিশ: ‘তুমি কী জানো কিসে তোমার মঙ্গল, ঠাকুর জানেন। তুমি তাঁর উপর তোমার ভার দিয়েছ তিনিও নিয়েছেন সে-ভার। এখন তো আর বিচার চলবে না, সমালোচনা চলবে না। দলিলে এমন কোনো লেখাপড়া নেই কোন পথ দিয়ে তিনি তোমাকে নিয়ে যাবেন। তুমি তোমার জীবনস্বত্ব দান করে দিয়েছ ঈশ্বরকে। এখন তিনি তাঁর জিনিস নিয়ে যা খুশি করুন, মারুন কাটুন, ফেলুন-ভাঙুন, তোমার কিছু বলবার নেই। তাঁর কুলাল-চক্রে তুমি এখন এক তাল নরম কাদা হয়ে যাও।’

    তাই হোক। তাই হোক।

    আমাকে তুমি নিযুক্ত করো। আমার বাক্যকে নিযুক্ত করো তোমার গণকথনে, কর্ণকে নিযুক্ত করো তোমার রসশ্রবণে, হস্তকে নিযুক্ত করো তোমার মঙ্গলকর্মে। মন থাক তোমার পদযুগে, মাথা থাক তোমার জগৎপ্রণামে আর দৃষ্টি থাক দিকে দিকে তোমারই মূর্তিদর্শনে।

    ‘যার যা মনের পাপ আছে, অকপটে জানাও ঈশ্বরকে।’ বলছেন ঠাকুর বরদমূর্তিতে “যিনি বিন্দুকে সিন্ধু করতে পারেন তিনি পারেন পাপকে মার্জনার পারাবারে ডুবিয়ে দিতে।’

    ‘কি করে জানাব!’ গিরিশ কেঁদে পড়ল, ‘আমি যে দুর্বল।’

    ‘তা কি ঠাকুর জানেন না? খুব জানেন। তাই, একবার তাঁর শরণাগত হও, সব সমাধান হয়ে যাবে। শরণাগতকে শ্রীহরি পরিত্যাগ করেন না। দীনের ত্রাণকর্তা তিনি, নিশ্চয়ই তোমাকে ত্রাণ করবেন।’

    ‘আমি কি হরি-টরি কাউকে চিনি? আমি চিনি তোমাকে।’ গিরিশ জোড় হাত করল: ‘তোমাকে বকলমা দিয়েছি। তুমি নিয়েছ আমার ভার। তুমিই আমার ভারহরণ—’

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleঅথ রম্যকথা – অনন্যা পাল
    Next Article কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর

    Related Articles

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    May 18, 2026
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ১ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    April 27, 2026
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনন্যা পাল
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক দত্ত
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুর রহমান আল-আরিফি
    আবদুল হালিম
    আব্দুল মালেক আলী আল-কুলাইব
    আব্দুল হামীদ ফাইযী
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোপেন্দ্র বসু
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভট্টাচার্য
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বাণ রায়
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পরিমল ভট্টাচার্য
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণু শর্মা
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহতাব উদ্দিন
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রণদীপ নন্দী
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সায়ক আমান
    সায়ন্তনী পূততুণ্ড
    সায়ন্তনী পূততুন্ড
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    গজনবীর দেশ থেকে সোমনাথের পথে

    July 15, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    গজনবীর দেশ থেকে সোমনাথের পথে

    July 15, 2026
    Our Picks

    গজনবীর দেশ থেকে সোমনাথের পথে

    July 15, 2026

    ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে

    July 15, 2026

    আদর্শ বিবাহ ও দাম্পত্য – আব্দুল হামীদ ফাইযী

    July 15, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }