Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    গজনবীর দেশ থেকে সোমনাথের পথে

    July 15, 2026

    ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে

    July 15, 2026

    আদর্শ বিবাহ ও দাম্পত্য – আব্দুল হামীদ ফাইযী

    July 15, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ৩ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত এক পাতা গল্প305 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ৩.২৫

    ২৫

    কিন্তু হাজরা একেবারে শুকনো কাঠ। অথচ দালালি জ্ঞান টনটনে!

    ঠাকুরের দেশের লোক, বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। হঠাৎ কি খেয়াল হয়েছে, চলে এসেছে সংসার ছেড়ে। আমি ছাড়ব বললেই তো সে ছাড়ে না! তাই ঠাকুরের ঘরের পুবের বারান্দায় বসে মালা ফেরায় বটে কিন্তু মন পড়ে থাকে বাড়িঘরে। হাজার টাকা দেনা, শোধ হবে কি করে? বাড়িতে সামান্য যে জমি তা দিয়ে স্ত্রী-পুত্রের পেট চলতে পারে কিন্তু নগদ টাকা জুটবে কোথায়? তাই মালা জপে আর মিটির-মিটির করে তাকায় যদি মিলে যায় কোনো শিষ্যচেলা। যদি ভক্তিভরে মুক্ত করে ঋণভার।

    এক নম্বরের তার্কিক। ঠাকুর যত বলেন তর্জনগর্জনে হবে না, হাজরা তত তেড়ে-ফুঁড়ে ওঠে। বলে, ‘আমাকে বলছ কি, তুমিও তো ধনীর ছেলে দেখে সুন্দর ছেলে দেখে ভাব করো, ভালোবাসো।’

    নরেনের কথা বলছে বুঝি! নরেন আবার হাজরার ‘ফেরেন্ড’। ওরে নরেনের নুন দিয়ে ভাত খাবার পয়সা জোটে না। ওকে দেখলে জগৎ ভুল হয়ে যায়।

    সবাইকে কেবল পাটোয়ারি বুদ্ধির মন্ত্র দেবে। সাধন করো তো সকাম সাধন। সব মেহনতের মজুরি আছে, আর সব চেয়ে যে কষ্টের কাজ–এই সব জপ-তপ আসন-শাসন—এর বেলায় ফক্কিকার। চলবে না এ ফাঁকিবাজি। রোদে পুড়তে পুড়তে যেতে পারব না ফাঁকায় ফাঁকায়।

    সুখ ধনে নয় মনে। সে কথা কে শোনে।

    কেবল অহঙ্কার। এত জপ করলাম। ঠায় বসে এত ডাকলাম রুদ্ধনিশ্বাসে। আমার হবে না তো হবে কার!

    হবার মধ্যে, বেরিয়ে যেতে হল দক্ষিণেশ্বর থেকে। কথায়ই আছে, বড় বাড়লে ঝড়ে ভাঙে। কিন্তু বেরিয়ে যাবে কোথায় আবার এদিকেই উসখুস।

    ‘হাজরা এখন মানছে।’ বললে নরেন। ‘তোর অহঙ্কার হয়েছিল–

    ‘ও কথা বিশ্বাস করো না। দক্ষিণেশ্বরে ফের আসবার জন্যে বলছে অমনি।

    ‘কি করে বুঝলেন? ‘

    ‘সে আমি বেশ বুঝেছি।’ হাসলেন ঠাকুর। ভক্তদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নরেনের মতে হাজরা খুব ভালো লোক।

    ‘একশোবার।’ নরেন জোর দিয়ে বললে।

    ‘কেন? এই যে এত সব শুনলি। দেখলি –’

    ‘তা হোক গে। দোষ কি একেবারে নেই? আছে, তবে অল্প। গুণই বেশি।’ ঠাকুরকে সায় দিতে হল। ‘হ্যাঁ, নিষ্ঠা আছে বটে।’

    তবে আর কি। যদি একটা কিছু থাকে, টেনে নাও। যদি অভিমুখী হয়, সাধ্য কি তুমি মুখ ফেরাও! আর কিছু না থাক নিয়তস্থিতি তো আছে। স্থিতি থেকেই প্রীতি আসবে একদিন।

    আর কি করা! নরেন যখন বলেছে, হাত বাড়িয়ে টেনে নিতে হল হাজরাকে।

    ‘হাজরা একটি কম নয়।’ প্রাণকৃষ্ণকে বলছেন ঠাকুর। ‘যদি এখানে বড় দরগা হয় তবে হাজরা ছোট দরগা।’

    কিন্তু দোষের মধ্যে, পরনিন্দায় পঞ্চমুখ। আর বড্ড আচারী। তা ছাড়া একটু পেটুক।

    নবতের কাছে দেখা। বললেন তাকে ঠাকুর, ‘শোনো। বেশি নেয়ো না। আর শুচিবাই ছেড়ে দাও। আচার যতটুকু করবার ততটুকু করবে। বেশি বাড়াবাড়ি ভালো নয়!’ ‘আর?’

    ‘কারু নিন্দা করো না, পোকাটিরও না।’ অগাধ স্নেহস্বরে বললেন ঠাকুর, ‘যেমন ভক্তি প্রার্থনা করবে তেমনি এও বলবে, যেন কার নিন্দা না করি।’

    নিন্দা করে আনন্দ, নিন্দা না করে আনন্দ। কোন আনন্দ বেশি? কোন আনন্দ অম্লান?

    ‘কিন্তু প্রার্থনা করলে তিনি কি শুনবেন?’

    ‘নির্ঘাত শুনবেন। যদি ডাকটি ঠিক হয়, আন্তরিক হয়। ও দেশে একজনের স্ত্রীর খুব অসুখ হয়েছিল। কে বললে, সারবে না। তাই শুনে লোকটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। অজ্ঞান হয় আর কি! এমন কে হচ্ছে ঈশ্বরের জন্যে?’

    কি আশ্চর্য, হাজরা হঠাৎ ঠাকুরের পায়ের ধুলো নিল।

    ‘এ আবার কি!’ অত্যন্ত কুণ্ঠিত হলেন ঠাকুর।

    ‘যাঁর ছায়ায় আছি তাঁর পায়ের ধূলো নেব না?’

    না, না, তুমি নেবে কেন? আমি নেব। তুমি শুধু ঈশ্বরকে তুষ্ট কর। শাখা-প্রশাখায় জল দিতে হয় না, মূলে জল দিলেই বৃক্ষ তুষ্ট হয়। তেমনি মূলে জল দাও। দ্রৌপদীর হাঁড়ির শাক খেয়ে কৃষ্ণ যেই বললেন তৃপ্ত হয়েছি তখন আর সকলেও তৃপ্ত হল। হেউ-ঢেউ উঠল চারদিকে। তার আগে নয়। সুতরাং তাঁকে খুশি করো। তাঁর আনন্দেই আর-সকলে আনন্দিত। তাঁর সমর্থনেই আর সকলের সমর্থন। ‘তাই সংসারে যেতে জ্ঞানীর ভয় কি?’ জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর।

    ‘মশাই, জ্ঞান হলে তো?” মহিমাচরণ টিপ্পনী কাটল।

    ঠাকুর পরিহাস করে বললেন, ‘হাজরার সবই হয়েছে, তবে একটু সংসারে মন আছে, এই যা। তা কি আর করা, ছেলেরা রয়েছে, জমি-টমি রয়েছে, ধার রয়েছে—উপায় কি!

    ‘তাহলে আর জ্ঞান হল কোথায়?’ মহিমাচরণ আবার ফোড়ন দিল।

    ‘না গো, তুমি জানো না।’ সস্মিতমুখে ঠাকুর বললেন, ‘সব্বাই হাজরার নাম করে। বলে রাসমণির ঠাকুরবাড়িতে হাজরা বলে যে আছে, সেই হচ্ছে একটা লোক।

    লোকের মত লোক।’

    হাজরা মুখ খুলল। বললে, ‘তা কেন? আপনি হচ্ছেন নিরূপম, আপনার উপমা নেই, তাই কেউ বুঝতে পারে না আপনাকে।

    ‘তবেই বুঝতে পারছ নিরূপমকে দিয়ে কোনো কাজ হয় না।’

    ‘সে কি মশাই?” মহিমাচরণ গর্জে উঠল: ‘হাজরা কি জানে? আপনি যেমনি বলবেন তেমনি শুনবে ও।’

    ‘তা কেন? ওকে জিজ্ঞেস করে দেখ না! ও আমায় স্পষ্ট বলে দিয়েছে, তোমার সঙ্গে আমার লেনাদেনা নেই।’

    ‘তাই নাকি? ভারি তার্কিক তো!’

    “শুধু তাই নয়, আমায় আবার শিক্ষা দেয় মাঝে-মাঝে।’

    সবাই হেসে উঠল। চুপ করে হাজরা বসে আছে এক কোণে।

    ‘কেন দেব না? আমার কি কিছুই বক্তব্য নেই? থাকতে পাবে না? বেশ তো, এস, তর্ক করি।”

    কিন্তু তর্ক ঠাকুরের পোষায় না। তর্ক করতে গিয়ে গালাগাল দিয়ে বসলেন হাজরাকে। তারপর শুতে গেলেন মশারির মধ্যে। শুয়ে কি শান্তি আছে? তর্কের ঝোঁকে কি কটু কথা বলেছেন, হয়তো মনে ব্যথা পেয়েছে হাজরা, সেই ভেবে অস্বস্তি।

    তারপর আবার চলে এসেছেন মশারির বাইরে। বাইরে এসে হঠাৎ প্রণাম করে বসলেন হাজরাকে।

    তোমাকে না মানি কিন্তু তোমার নিষ্ঠাকে প্রণাম। প্রণাম তোমার বাক্‌শক্তিকে। গালাগালিতেও যে তুমি অবিচলিত থাকো, প্রণাম তোমার সেই আঘাতবিজয়ী প্রতিজ্ঞাকে।

    শুয়েছি, আবার কি বলেছি মনে করে বেরিয়ে এসে হাজরাকে প্রণাম করে যাই তবে হয়।’

    কিন্তু এততেও হাজরার হল না। ছাড়তে পারল না দালালি। বৈধীভক্তির দেশাচার। কামনাকণ্টকিত ফলাকাঙ্ক্ষা। মায়ের কাছে বসেও মালা জপ করবে। এ কী হীনবুদ্ধি! যে এখানে আসবে তারই চৈতন্য হবে, একবারে চৈতন্য হবে। তার আবার কিসের মালাজপ। তার শুধু রাগভক্তি। তার শুধু রঞ্জন-অঞ্জন।

    গোলোকধাম খেলা হচ্ছে। মাস্টার, কিশোরী, লাটু আর হাজরা। চারজন খেলোয়াড়। হঠাৎ ঠাকুর এসে দাঁড়ালেন এক পাশে। কী ব্যাপার? কত দূর?

    মাস্টার আর কিশোরীর ঘুঁটি উঠে গেল।

    ‘ধন্য তোমরা দু ভাই।’ উল্লাস করে উঠলেন ঠাকুর। শুধু তাই? নমস্কার করলেন দু ভাইকে।

    কেন করব না? ওরা জয়ী হয়েছে। ওদের জয়ের মধ্যে যে ঈশ্বরের করুণা।

    কাকে না নমস্কার করেছেন।

    পঞ্চবটীতে এক সাধু এসেছে। যেন মূর্তিমান দুর্বাসা। যাকে-তাকে গাল দেয়, শাপ দেয়, মারতে আসে। যখন-তখন, কারণে-অকারণে। ক্রোধে একেবারে নগ্ন-অগ্নি।

    ‘হিঁয়া আগ মিলেগা?’ হুঙ্কার দিয়ে উঠল সাধু।

    হাত জোড় করে সাধুকে ঠাকুর নমস্কার করলেন। একবার নয় বহুবার। যতক্ষণ সাধু ছিল ততক্ষণই রইলেন করজোড়ে। নীরব বিনতিতে।

    আগুন নিয়ে প্রসন্নমনে চলে গেল সাধু। কাউকে শাপমান্য করলে না। তেড়ে এল না পায়ের খড়ম নিয়ে।

    সাধু চলে গেলে ভবনাথ বললে হাসতে হাসতে: ‘আপনার সাধুর উপর কী ভক্তি! ‘ওরে তমোমুখ নারায়ণ। যাদের তমোগুণ তাদের এই রকম করে প্রসন্ন করতে হয়।’ বললেন ঠাকুর, ‘আর এ তো সাধু।’

    খেলা দেখছেন ঠাকুর। ওরে, হাজরার কি হল আবার!

    কী হল!

    চেয়ে দ্যাখ, হাজরার ঘুঁটি আবার নরকে পড়েছে।

    সকলে হেসে উঠল হো-হো করে।

    লাটুর কী অবস্থা! সাত-চিৎ ঢেলেছে লাটু। এক ঢালে মুক্তি। এক লাফে উল্লঙ্ঘন।

    সংসারঘর থেকে একেবারে ব্রহ্মলোক।

    ‘ধেই ধেই করে নাচতে লাগল লাটু।

    ‘এর একটা মানে আছে।’ বললেন ঠাকুর, ‘অহঙ্কারের উত্থান নেই, আর ঠিক লোকের সর্বত্র জয়। হাজরার বড় অহঙ্কার হয়েছিল তাই তার পতন আর লেটো হচ্ছে ঠিক লোক, তাই তার ঊর্ধ্বগতি। ঈশ্বরের এমনও আছে যে ঠিক লোকের কখনো কোথাও তিনি অপমান করেন না। সর্বত্র জিতিয়ে দেন।’

    তবে কি হাজরা ঠিক লোক নয়?

    নইলে তাকে রাখা গেল না কেন?

    এমনিতে থাকত নিজের খেয়ালে কিছু এসে যেত না। উলটে ঠাকুরের বিরুদ্ধতা করতে লাগল।

    ঠাকুর তখন ভবতারিণীকে বললেন, ‘মা, হাজরা যদি মেকি হয়, ওকে সরিয়ে দে এখান থেকে।’

    কদিন পরে সরে গেল হাজরা। কিন্তু নরেন তাকে ছেড়ে দেবে না সহজে। বললে, ‘কিন্তু এক কথা। বলো, মৃত্যুকালে ওর ইষ্ট দর্শন হবে।’

    ঠাকুর চোখ তুলে তাকালেন নরেনের দিকে।

    বন্ধুর জন্যে আবার অনুনয় করল নরেন। ‘ও চলে যাচ্ছে যাক, কিন্তু এটুকু অভয় ওকে দিতে হবে। নইলে কি নিয়ে থাকবে ও? ও তাপে লজ্জায় বিমর্ষ। ও কিছু বলতে পারছে না, আমি ওর হয়ে বলছি। বলো ইষ্টদর্শন হবে ওর মৃত্যুকালে। আর কিছু না থাক, নিষ্ঠা ছিল ওর, ও আর কিছু না পাক তোমারও প্রণাম পেয়েছে। বলো, সত্যি নয়? আর, তোমার প্রণাম যে পেয়েছে—বলো, হবে?”

    ঠাকুর বললেন, ‘হবে।’

    প্রতাপ হাজরাকে আর পায় কে। অনুরক্ত করে না পাক, বিরক্ত করে আদায় করে নিয়েছে। এই তার অসীম প্রতাপ।

    হৃদয়ের মত সেও ছেড়ে গেল দক্ষিণেশ্বর। কিন্তু তার তো তবু হবে শেষ সময়। হৃদয়ের কি হবে না? তার পক্ষে নরেনের মত মুরুব্বি নেই বলেই কি এই দীন দশা? এত বলবান সেবা, এত সহিষ্ণু, সান্নিধ্য, এত অকাতর শুশ্রূষা—এ কি ব্যর্থ হবে? কিছুই কি ব্যর্থ হয়?

    ২৬

    ‘মশাই, আপনার সঙ্গে কে দেখা করতে এসেছেন।’ কে একজন লোক বললে এসে ঠাকুরকে।

    ‘আমার সঙ্গে?” ঠাকুর তো অবাক।

    ‘হ্যাঁ, আপনারই নাম করলে।’

    ‘কোথায় সে লোক?’

    ‘যদু মল্লিকের বাগানে এসেছেন। দাঁড়িয়ে আছেন ফটকের সামনে।’

    এখানে নিয়ে এস, এ কথা বললেন না ঠাকুর। এতদূর যখন এসেছে তখন ফটক ডিঙিয়ে ভিতরে চলে আসতে দোষ কি, তাও বললেন না। যখন ফটকের সামনে এসেই থেমে পড়েছে তখন নিশ্চয়ই ভিতরে ঢুকতে কোনো বাধা আছে। নইলে এটকু পথ আর আসবে না কেন? যাই দেখি গে কে এল। হয়তো হৃদে এসেছে। ও বলেই ঢুকছে না এখানে।

    পা চালিয়ে পুবমুখো চলে গেলেন ঠাকুর। যা ভেবেছিলেন। হৃদয়ই দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে আছে করজোড়ে। রামসমীপে মহাবীরের মত।

    ঠাকুরকে দেখেই পথের ধূলোয় লুটিয়ে পড়ল। কাঁদতে লাগল অঝোরে। পরিত্যক্ত শিশুর মত।

    ঠাকুর বললেন, ‘ওঠ। কাঁদিসনি। কান্নার কী হয়েছে!’ বলছেন আর নিজে কাঁদছেন। যেন কান্নার কিছুই নেই এমনিভাবে নিজের চোখ মুছছেন গোপনে।

    যে যন্ত্রণা দিয়েছে, তারও জন্যে করুণা। যে বিরক্ত করেছে, তারও জন্যে অনুরাগ! শুধু ভক্তের ডাকেই সাড়া দেন না, যে পরিত্যক্ত তারও ডাকে সাড়া দেন। ছুটে আসেন নিষেধের গণ্ডি পেরিয়ে। ধূলোর থেকে তুলে নেন হাত বাড়িয়ে। ‘কিরে, এখন যে এলি?’

    ‘তোমার সঙ্গে দেখা করতে এলাম।’

    তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসব তার কি সময়-অসময় আছে? হৃদয় কাঁদছে তো কাঁদছেই। বললে, ‘আমার দুঃখ আর কার কাছে বলব?”

    আমার আর কে আছে? শত ফটক বন্ধ হয়ে গেলেও তুমি আছ আমার ফটিকজল। মেয়াদহীন কয়েদখানার বাইরে মুক্ত প্রান্তরের ডাক। তোমাকে কে আটকাবে? আর সবাই ঠেলুক তুমি ঠেলতে পারবে না।

    “তোর আবার কিসের দুঃখ?’ জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর।

    ‘তোমার সঙ্গছাড়া হয়ে আছি। সে দুঃখের কি আর শেষ আছে?’

    ‘বা, তখন যে বলে গেলি,’ ঠাকুর মনে করিয়ে দিলেন, ‘তোমার ভাব নিয়ে তুমি থাকো, আমাকে থাকতে দাও আমার নিজের ভাবে।’

    কান্নার একটা প্রবল ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিল হৃদয়কে। বললে, ‘হ্যাঁ তখন তো তা বলেছিলাম, কিন্তু আমি তার কি জানি! আমি তার কি বুঝি।’

    ‘তাতে কি হয়েছে! এমনিতর দুঃখকষ্ট আছেই সংসারে।’ ঠাকুর সান্ত্বনা দিলেন ‘সংসার করতে গেলেই আছে এমন সুখদুঃখ, এমন ওঠা-নামা। তাতে কি! এমনিতে কেমন আছিস? ধান-টান কেমন হয়েছে এবার?”

    ‘মন্দ নয়।’ একটা নিশ্বাস ছাড়ল হৃদয়।

    ‘আজ এখন তবে আয়। আজ রোববার, অনেক লোকজন এসেছে, তারা বসে আছে সকলে।’

    আমিও কি সকলের মধ্যে একলা নই? আমিও কি বসে নেই এক পাশে?

    ‘শোন, আরেকদিন আসিস। তখন বসে কথা কইব তোর সঙ্গে। ‘সাষ্টাঙ্গ হয়ে প্রণাম করল হৃদয়। চোখ মুছতে-মুছতে চলে গেল সমুখ দিয়ে। দুর্দান্ত সেবাও যেমন করেছে, তেমনি যন্ত্রণাও দিয়েছে অফুরন্ত। ছেলেকে যেমন মানুষ করে তেমনি করে নেড়েছে-চেড়েছে ঘষেছে-মেজেছে ঠাকুরকে। রাত-দিন বেহুঁস হয়ে থাকতেন, নিষ্পলক চোখে পাহারা দিয়েছে। আজ সবাই তোমরা পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছ, হৃদয় থাকলে পায়ে হাত দেয় কার সাধ্যি? অসুখে দুখানা হাড় হয়ে গেছি, কিছু খেতে পারি না, আমাকে দেখিয়ে-দেখিয়ে খাচ্ছে হৃদয়, যদি খেতে আমার রুচি আসে। বলছে, এই দেখ না আমি কেমন খাই। তুমি শুধু তোমার মনের গুণে খেতে পাচ্ছ না। কাটিয়ে ফেল মনের গুণ। কত করেছে আমার জন্যে। গঙ্গায় নেমে তুলে এনেছে এই ডুবন্ত দেহকে। ফুলুই শ্যামবাজারে কীর্তনের সময় ভিড়ে আমার সর্দি-গর্মি’ হয়, সেই ভয়ে খোলা মাঠে টেনে নিয়ে গেছে। বেলঘরে নিয়ে গেছে কেশবের কাছে। কলকাতায় নিয়ে গিয়ে লাটসাহেবের বাড়ি দেখিয়েছে। তেমনি যন্ত্রণা দিতেও কসুর করেনি। ভেবেছিল ওর ‘আণ্ডারে’ আছি, যা করাবে তাই করব। বললে, মা’র কাছে ক্ষমতা চাও, ব্যামোর ওষুধ চাও। নইলে আবার মা কি। ওর পরামর্শ শুনতে গিয়ে ঘা খেলাম। শম্ভু মল্লিকের কাছে টাকা চায়, যদি পারে হাতিয়ে নেয় লক্ষ্মীনারায়ণ মাড়োয়ারীর সেই থলেটা। দশ হাজারের থলে। কেবল বিত্তবেসাত জমি-গরুর দিকে লালসা। সিদ্ধাই সিদ্ধাই করে আস্ফালন। জ্বালিয়ে মেরেছে। এমন জ্বলুনি, পোস্তার উপর থেকে জোয়ারের জলে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলাম।

    তারই জন্যে, সেই হৃদয়ের জন্যেই, কাঁদছেন ঠাকুর। যে কাঁদায়, কি আশ্চর্য, তারই জন্যে আবার কাঁদেন। যে বিতাড়িত, তারই জন্যে আবার ছুটে আসেন ব্যগ্র হয়ে। যে অযোগ্য, অকর্মণ্য, তারও জন্যে রেখে দেন আশ্বাসের আতপত্র।

    এঁটে ধরে থাক, কিছুতেই ছাড়িসনে, সাধ্য কি তোকে ফেলে রাখে জলের পাশে। পালিয়ে সে কোথায় যাবে, তুই যে তার পা নিয়ে বসে আছিস। ঐ দ্যাখ সে হেসে উঠেছে অন্ধকারে, নিবিড় বনের অন্তরালে ঐ দ্যাখ জেগে উঠেছে শুকতারা। সামান্য যাত্রাদলের ছোকরা, তার সঙ্গেও ঈশ্বরকথা।

    দক্ষিণেশ্বরের নাটমন্দিরে যাত্রা হচ্ছে। পালা বিদ্যাসুন্দর। শেষরাত্রি থেকে শুরু হয়েছে, সকালেও শেষ হয়নি। মন্দিরে মাকে দেখতে এসে ঠাকুর একটু শুনেছেন কান পেতে। যাত্রাশেষে ঠাকুরের ঘরে এসেছে অভিনেতারা।

    যে ছোকরা বিদ্যা সেজেছিল তার অভিনয়ে ঠাকুর খুব খুশি। বললেন, ‘বেশ করেছ তুমি। শোনো, যদি কেউ গাইতে বাজাতে নাচতে পটু হয়, যে কোনো একটা বিদ্যাতে যদি তার দক্ষতা থাকে, তাহলে চেষ্টা করলে সহজেই সে ঈশ্বর লাভ করতে পারে। আমিও তো ভালো অ্যাকটিং করতে পারি। চমকে উঠল ছোকরা। আমার পক্ষেও সম্ভব ঈশ্বর লাভ?

    তা ছাড়া আবার কি। কত অভ্যাস করেই না তবে গাইতে-বাজাতে শিখেছ। কত লাফঝাঁপ করেই না রপ্ত করেছ নাচ। সেই অভ্যাসযোগেই লাভ হবে ঈশ্বর। ‘আজ্ঞে, কাম আর কামনায় তফাত কি?’ জিজ্ঞেস করল ছোকরা।

    তুচ্ছ লোকের আবার তত্ত্বজিজ্ঞাসা, এই বলে উড়িয়ে দিলেন না ঠাকুর। বললেন, ‘কাম যেন গাছের মূল আর কামনা তার ডালপালা। যদি কামনা করতেই হয়, ঈশ্বরে ভক্তি-কামনা করো। যদি মত্ততা করতেই হয় আমি ঈশ্বরের সন্তান এইভাবে মত্ত হও।’

    তাকালেন ছোকরার দিকে। শুধোলেন, ‘তোমার বিয়ে হয়েছে?”

    ছোকরা ঘাড় কাত করল।

    ‘ছেলে পুলে?”

    ‘আজ্ঞে একটি কন্যা গত। আরেকটি হয়েছে।’

    ‘এর মধ্যে হলো-গেলো? এই তোমার কম বয়স! বলে, সাঁজসকালে ভাতার মলো, কাঁদব কত রাত!’

    সবাই হেসে উঠল।

    ‘সংসারে সুখ তো দেখলে।’ ঠাকুর আবার তাকালেন ছোকরার দিকে। ‘যেমন আমড়া, কেবল আঁটি আর চামড়া।’

    ‘কিন্তু সংসার ছাড়ব কি করে?”

    “না, না, ছাড়বে কেন? সংসার করবে কিন্তু মন রাখবে ঈশ্বরের দিকে। সেই যে ছুতোরের মেয়ে চাল এলে দেয় অথচ সর্বক্ষণ হুঁস রাখে ঢেঁকির মুষল যেন হাতে না পড়ে—তেমনি। ছেলেকে মাই দিচ্ছে, খদ্দেরের সঙ্গে কথা কইছে, এক ফাঁকে এক হাতে খোলায় ভেজে নিচ্ছে ভিজে ধান—’

    ‘মনে রাখব আপনার কথাগুলো।”

    ‘মাঝে-মাঝে এখানে এসো। রবিবার কিংবা অন্য ছুটিতে—’

    ‘আজ্ঞে আমাদের তিন মাস রবিবার। শ্রাবণ, ভাদ্র আর পৌষ। বর্ষা আর ধান কাটবার সময়। আপনার কাছে আসব সে আমাদের ভাগ্য।’

    ‘হ্যাঁ, সবাই মিল হয়ে থাকবে। মিল থাকলেই দেখতে-শুনতে ভালো। চারজন গান গাইছে, কিন্তু প্রত্যেকে যদি ভিন্ন সুর ধরে যাত্রা ভেঙে যায়।’

    সবাই মিলে এক সুর ধরো। এক তরীতে ভাসো। একাকার হয়ে যাও।

    যাত্রা থেকেই যাত্রা করো।

    বললেন ঠাকুর, ‘তোমাদের মধ্যে যারা কেবল মেয়ে সাজে তাদের মেয়েলি ভাব হয়ে যায়। তাই না? তেমনি যারা রাতদিন ঈশ্বরচিন্তা করে তাদের মধ্যে ঈশ্বরসত্তার রঙ ধরে। মন ধোপাঘরের কাপড়, তাকে যে রঙে ছোপাবে সেই রঙ হয়ে যাবে।’

    আমি কেন বিদ্যাসুন্দর শুনলাম? এর মানে কি? দেখলাম, তাল মান গান নিখুঁত। তারপর মা দেখিয়ে দিলেন, নারায়ণই যাত্রাওয়ালাদের রূপ ধরে যাত্রা করছেন।

    এই ঠাকুরের অবতারবাদ। সকলেই ঈশ্বরের প্রতিবিম্ব। ঈশ্বরের প্রতিধ্বনি। এই ঠাকুরের আত্মদর্শন। সমস্ত মন ঈশ্বরকে না দিলে ঈশ্বরের দর্শন হয় না। তেমনি সমস্ত জনে তাঁকে না দেখলেও হয় না দর্শন। মনে-জনে দেখাই ঠিক দেখা।

    ২৭

    যে মা-মন্ত্র দেবে তাকে মায়ের জন্যে কাঁদতে হবে। শুধু বিশ্বের মায়ের জন্যে নয়, ঘরের মায়ের জন্যে। শুধু ব্রহ্মাণ্ডভাণ্ডোদেবীর জন্যে নয়, সামান্য গর্ভধারিণীব জন্যে। জগৎ ছাড়লেও যাকে ছাড়া যাবে না। সন্ন্যাসী হয়েও যাকে আঁকড়ে থাকতে হবে জপমালার মত। পঞ্চবায়ু, পঞ্চকোষের মত। শুধু তাই নয় নিজেকেও মা হয়ে দেখাতে হবে মাঝে-মাঝে। আরো কঠিন কথা, মা-মন্ত্রের দিতে হবে একটি পর্যাপ্ত মূর্তি, একটি শরীরী তর্জমা, একটি শাশ্বতী প্রতিলিপি।

    সব পুরোপুরি করে গিয়েছেন ঠাকুর। তাইতো তাঁর মন্ত্র এত প্রাণময়। তার শক্তি এত উজ্জীবনী। তার অর্থ এত গভীরগ।

    ঈশ্বরের চেয়েও মায়ের, চন্দ্রমণির মুখখানি বেশি সুন্দর দেখেছেন। মায়ের মুখখানি মনে পড়তেই ছুঁড়ে দিলেন গঙ্গাময়ীর হাত, ছেড়ে এলেন বৃন্দাবন। কিসের শ্রীমতীর সাধন শ্রীমতী মাতার কাছে! ‘মা বলিতে প্রাণ করে আনচান—’একেবারে নাড়ী ধরে টান মারে। মা মরে যাবার পর এমন কান্না কাঁদলেন, নির্বিকল্প সন্ন্যাসেও কুলোল না। এমন মা। এমনই মহীয়সী জীবিতাশা! তারপর নিজে রূপ ধরে দেখালেন মা কেমন। চুল এলিয়ে বুকভরা স্নেহক্ষীর নিয়ে কোল পেতে বসলেন মাটির উপর। রাখাল দেখল মা বসে আছে। সোজাসুজি কোলের উপর গিয়ে বসল, দুধের ছেলের মত পান করতে লাগল মা’র স্তন্যসুধা। এই তো না-হয় হল যারা স্বগণ-স্বজন তাদের জন্যে, কিন্তু আর সকলের কী হবে, তাদের মা কোথায়? শুধু মন্ত্রে, মুখের কথায় কি সাধ মেটে না, বুক ভরে? আমাদের একটি মূর্তি চাই, প্রতিমা চাই। প্রমিতা, প্রস্ফুটা প্রতিমা। মন্ত্রের উজ্জ্বল উচ্চারণ। ঘনীভূতা নিয়তস্থিতি।

    ঠিক কথা। এই দেখ সেই মন্ত্রের মূর্তি, সান্দ্রীভূতা স্মিতজ্যোৎস্না। বলে প্রতিষ্ঠা করলেন সারদামণিকে। চেয়ে দেখ এই মূর্তির দিকে, একে মা বলে ডাকতে ইচ্ছে করে কিনা এবং ডাকবার সঙ্গে-সঙ্গে মনে এই আশ্বাস আসে কিনা যে সাড়া পাব! দুর্গাদুর্গতিহারা জন্মজলধিতারিণী মা। শঙ্খেন্দুকুন্দোজ্বলা সশূভ্রা। ভবভয়দ্রাবিণী দীনবৎসলা।

    রাখালের মত তারকও এসে দেখল ঠাকুর নয়, মা বসে আছেন। কোথায় পায়ে মাথা রেখে প্রণাম করবে তা নয়, লাজুক শিশুর মত ঠাকুরের কোলের মধ্যে মাথা গুঁজে দিল। কি রে, আমি কে? অমন করলি কেন?

    তুমি? তুমি আমার মা। তোমার চাহনিতে সেই নিমন্ত্রণ।

    ‘হ্যাঁ রে, তোকে আগে কোথাও দেখেছি?”

    আমি দেখেছিলাম একদিন রামবাবুর বাড়িতে। সিমলেতে তাঁর বাড়ির কাছেই আমার বাসা। গিয়ে দেখি একঘর লোক, বাইরেও উদ্বেল জনতা। কি যেন দেখতে কি যেন শুনতে সবাই উন্মুখ-উৎসুক। ভিড় ঠেলে গেলাম এগিয়ে। গিয়ে দেখলাম আপনাকে। আহা কি মনোহর দর্শন। অমৃতমহোদধি বসে আছেন শান্ত হয়ে। ভাবারূঢ় অবস্থায়। কন্দর্পকোটিসৌন্দর্য। জগৎগুরু জগন্নাথ। আড়ষ্ট ভাবজড়িত স্বরে বলছেন, আমি কোথায়? কে একজন বললে, রামের বাড়িতে। কোন রাম? ডাক্তার রাম। তখন ফিরে পেলেন সম্বিৎ।

    বলতে লাগলেন সমাধির কথা। কাকে বলে সমাধি? সমাধি কয় রকম? কিসে কেমন অনুভূতি।

    সে এক অপূর্ব বর্ণনা ৷

    সমাধি পাঁচ রকম। পিপীলিকা, মৎস্য, কপি, পক্ষী আর তির্যক। কখনো বায়ু ওঠে পিঁপড়ের মত শিরশির করে। কখনো ভাবসমুদ্রে আত্মা মাছের মতো খেলা করে।

    আনন্দে সাঁতার কাটে। কখনো বা পাশ ফিরে রয়েছি, মহাবায়ু পাশ থেকে ঠেলতে থাকে, আমোদ করতে চায়। আমি চুপ করে থাকি, টুঁ শব্দও করি না। কিন্তু নিঃসাড় হয়ে কাঁহাতক থাকা যায়? বানরের মত লম্বা লাফ দিয়ে মহাবায়ু উঠে যায় সহস্রারে। তাই তো, দেখ না, মাঝে-মাঝে তিড়িং করে লাফিয়ে উঠি। তারপর আবার পাখি হয় মহাবায়ু। এ ডাল থেকে ও ডাল, ও ডাল থেকে এ ডালে উড়তে থাকে। যেখানটায় বসে সেখানে যেন আগুন জ্বলে। মূলাধার থেকে স্বাধিষ্ঠান, স্বাধিষ্ঠান থেকে হৃদয় এমনি উড়ে-উড়ে বেড়ায়। শেষে এসে মাথায় আশ্রয় নেয়। তির্যকও প্রায় তাই। লাফিয়ে লাফিয়ে চলে না, এঁকে-বেঁকে চলে। তারও শেষ লক্ষ্য ঐ মাথা। ঐ কুলকুণ্ডলিনী। মূলাধারে কুলকুণ্ডলিনী। ঐ কুলকুণ্ডলিনী জাগলেই শেষ সমাধি।

    আমরা কি অত সব পারব? মহাবায়ুর সঙ্গে কি আমাদের মহাসাক্ষাৎকার হবে? নিয়ে যাবে সেই প্রস্ফুটিত শতদলের মর্মকোষে?

    কেন হবে না? শুধু পুঁথি পড়লেই হবে না। শুধু শুকনো চর্বিতচর্বণে হবে না। তাঁকে ডাকলে হবে। তাঁর জন্যে কাঁদলে হবে। তাঁকে ভালোবেসে তাঁর জন্যে ব্যাকুল হলে হবে।

    কান্না কখনো পুরোনো হয় না। এর কান্নার সঙ্গে মেলে না ওর কান্না। প্রত্যেকটি কান্না মৌলিক। নিত্যনতুন।

    বিষয়চিন্তাই মনকে দেয় না সমাধিস্থ হতে। আবার বলতে লাগলেন ঠাকুর, সূর্য উঠলে পদ্ম ফোটে। কিন্তু মেঘে যদি সূর্য ঢাকা পড়ে তা হলে আর পদ্ম তার দল মেলে না। তেমনি বিষয়মেঘে জ্ঞানসূর্য ঢাকা পড়লে ফোটে না আর ভক্তিকমল। আরেকরকম সমাধি আছে। যাকে বলে উন্মনা-সমাধি। ছড়ানো মন হঠাৎ কুড়িয়ে আনা।

    এ কি যে-সে কথা? মানুষের মন সরষের পুঁটলি। পুঁটলি খুলে সরষে ছড়িয়ে পড়লে ওদের কুড়িয়ে এনে ফের পুঁটলি বাঁধা কি সোজা কথা? একটু মন হয়তো গুটিয়ে এনেছে অমনি কোত্থেকে বিষয়চিন্তা এসে উদয় হল, দিল সব ছত্রখান করে।

    সেই নেউলের গল্প জানো না? ন্যাজে ইঁট-বাঁধা নেউল? দেয়ালের গর্তে, তার নিভৃত সমাধির কোটরে আছে দিব্যি আরামে, ঐ ইঁটের টানে বারে বারে বেরিয়ে পড়ে গর্ত থেকে। যতবারই গর্তের মধ্যে স্বস্থানে বসতে যায় আরামে, ইঁটের জোরে ততবারই এসে পড়ে বাইরে। বিষয়চিন্তাও অমনি। যতই মন ঈশ্বরের পাশটিতে এসে বসতে চায় ততই বিষয়চিন্তা টেনে বের করে দেয়। ঘটায় যোগভ্রংশ। উন্মনা-সমাধি কেমন জানো? সেই থিয়েটারের ড্রপ উঠে যাওয়া। দর্শকেরা পরস্পরের সঙ্গে গল্প করছে, হাসি-ঠাট্টা করছে, অমনি থিয়েটারের পর্দা উঠে গেল। তখন সকলের মন সহসা অভিনিবিষ্ট হল অভিনয়ে। আর নেই তখন বাহ্যদৃষ্টি, বাহ্যচেতনা। যেন উঠে পড়ল মায়ার পর্দা। জেগে উঠল যোগচক্ষু। আবার খানিকক্ষণ পর যখন নেমে এল মায়ার পর্দা, মন আবার বহির্মুখ হয়ে গেল। আবার শুরু হল গালগল্প, বিষয়কথা। যে-কে-সে।

    তাই বা মন্দ কি। সংসারী লোকের পক্ষে যত বেশি উম্মনা হওয়া যায়! যত বেশি ঘরে থেকে নিজেকে অনুভব করা যায় বনবাসীর মত!

    উন্মনা হতে-হতেই স্থিত-সমাধি হয়ে যাবে। একেবারে বিষয়বুদ্ধি ত্যাগ হলেই স্থিত-সমাধি। সর্বক্ষণই বাহ্যজ্ঞানশূন্য।

    রাম-লক্ষ্মণ পম্পাসরোবরে গিয়েছেন। লক্ষণ দেখলেন, জলের ধারে বসে আছে একটা কাক। পিপাসার্ত তবু খাচ্ছে না জল। কেন, কি হল? রামকে জিজ্ঞেস করলেন লক্ষ্মণ। রাম বললেন, ভাই, এ কাক পরমভক্ত। অহর্নিশ রামনাম করছে। ভাবছে জল খেতে গেলে পাছে রামনাম জপ ফাঁক হয়ে যায় তাই ঠোঁট দিয়ে জলস্পর্শ করছে না।

    নামসুধাই হরণ করেছে তার দেহপিপাসা।

    সংসারীলোকের সেই একমাত্র উপায়—নামজীবিকা। হরিনামকৃতা মালা পবিত্রা পাপনাশিনী।

    শুধু তাঁকে ব্যাকুল হয়ে ডাকো। তাঁর নাম করো। তাতেই জাগবে কুলকুণ্ডলিনী। জাগো মা কুলকুণ্ডলিনী, তুমি নিত্যানন্দস্বরূপিনী, প্রসুপ্তভুজগাকারা আধারপদ্মবাসিনী। ঐ কুণ্ডলায়িত সাপ ফণা না তুললে কিছুই হবে না। ও জাগলেই চৈতন্য, ও জাগলেই ঈশ্বরদর্শন।

    ন্যাংটা বলতো গভীর রাত্রে অনাহত শব্দ শোনা যায়। এই শব্দ আবার শোনবার জন্যে তপস্যা। এই প্রণবের ধ্বনি। ঐ ধ্বনি উঠছে ক্ষীরোদশায়ী পরব্রহ্ম থেকে, প্রতিধ্বনি জাগছে নাভিমূলে। অনাহত শব্দ ধরে এগুলেই পৌঁছানো যায় ব্রহ্মের কাছে, যেমন কল্লোল শুনে পৌঁছনো যায় সমুদ্রে। কিন্তু যতক্ষণ দেহের মধ্যে আমি-আমি রব উঠছে ততক্ষণ শোনা যাবে না সেই শব্দ, দেখা যাবে না সেই শেষশায়ীকে।

    মুগ্ধের মত শুনেছিল সব তারক আর ভাবছিল এমন ভাগ্য কি হবে যে এই মহাসমাধিস্থ মহাপুরুষের কৃপা আমি পাব?

    শুধু কৃপা নয়, কোল দেব তোকে।

    রামবাবু বললেন কাঁধে হাত রেখে, ‘এখানে খেয়ে যাবেন চারটি।’

    ‘বাড়িতে বলে আসিনি।’

    ‘তাতে কি?’ উড়িয়ে দিলেন রামবাবু।

    একটা অতি তুচ্ছ কথা কিছু নয়। সত্যের ছোট-বড় নেই, তুচ্ছ-উচ্চ নেই, সত্য সব সময়েই সত্য, সর্বাবস্থায় জগৎপ্রদীপ সূর্যের মতো বৃহত্তেজা।

    খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছে দক্ষিণেশ্বর। দক্ষিণেশ্বরে তারকের এক বন্ধুর বাড়ি, সেই তাকে নিয়ে যাবে পথ দেখিয়ে। বড়বাজার থেকে চলতি নৌকোয় চলে এসেছে শনিবার, আফিসের ছুটির পর। বন্ধুর বাড়ি হয়ে ঠাকুরের কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় সন্ধ্যে।

    প্রথমেই টেনে নিলেন কোলে। দুঃখদারিদ্রনাশিনী সর্ববান্ধবরূপিণী মায়ের মত। আরতির কাঁসরঘণ্টা বেজে উঠল।

    ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন তারককে, ‘তুমি সাকার মানো না নিরাকার?”

    ‘নিরাকারই আমার ভালো লাগে।’

    ‘না রে, শক্তিও মানতে হয়।’ বলে ঠাকুর উঠলেন। টলতে-টলতে এগুতে লাগলেন কালীমন্দিরের দিকে। কেন কে বলবে তারকও তাঁর পিছু-পিছু চলতে লাগল।

    প্রতিমা প্রস্তর ছাড়া কিছু নয়, ব্রাহ্মসমাজে ঘুরে-ঘুরে এই শিক্ষাই পেয়েছিল তারক। অথচ, কি আশ্চর্য, এই পাষাণাকারা প্রতিমার কাছে ভাববিভোর হয়ে প্রণাম করছেন ঠাকুর। শুধু শুকনো মাথা নোয়ানো নয়, হৃদয়কে জল করে প্রতিমার পায়ের উপর নিঃশেষে ঢেলে দেওয়া।

    স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে রইল তারক।

    সহসা কে যেন বলে উঠল তার মর্মের কানে-কানে: ‘অত গোঁড়ামি কেন? এত সঙ্কীর্ণতা কিসের? ব্রহ্ম তো ভূমা, সর্বব্যাপী। তাই যদি হয় এই প্রতিমার মধ্যেও তিনি আছেন। সেই বিভুকে প্রস্তরমূর্তিতে প্রণাম করতে দোষ কি?”

    মাথা নত হয়ে এল তারকের।

    নীলঘনশ্যামা ভবতারিণীর সামনে সে রাখল তার প্রণিপাত।

    ঠাকুর বললেন, ‘আজ রাত্রে এখানেই থেকে যাও না।’

    কত বড় প্রলোভনের কথা। কিন্তু তারক বললে সহজ সুরে, ‘বন্ধুর সঙ্গে এসেছি। উঠেছি তার ওখানে। কথা দিয়ে এসেছি ওখানেই থাকব রাত্রে।’

    ‘কথা দিয়ে এসেছ?’ ঠাকুর উল্লসিত হয়ে উঠলেন, ‘এর উপরে আর কথা নেই। ঐ সামান্য একটু কথা রাখাই হচ্ছে তপস্যা। সত্য কথার মত বড় তপস্যা আর নেই কলিতে।’

    সব মাকে দিয়েছিলাম কিন্তু সত্য দিতে পারলাম না।

    মাড়োয়ারী ভক্তরা আসে ঠাকুরের কাছে। খালি হাতে নয়, নানারকম ফল-মিষ্টান্ন নিয়ে। থালা সাজিয়ে। গোলাপজলের গন্ধ ছিটিয়ে। আমি ওসব কিছু নিতে পারি না। বলছেন ঠাকুর। ওদের অনেক মিথ্যা কথা কয়ে টাকা রোজগার করতে হয়। গোলাপজলের গন্ধে কি সেই অপলাপের গন্ধ ঢাকা পড়বে?

    সরলভাবেই বলছেন সব মাড়োয়ারীদের, বোঝাচ্ছেন। ‘দেখ ব্যবসা করতে গেলে সত্যকথার আঁট থাকে না। ব্যবসায়ে তেজী মন্দি আছে, তখন মিথ্যে চালাতে হয়। মিথ্যে উপায়ে রোজগার করা জিনিস সাধুদের দিতে নেই। শুদ্ধ জিনিস সত্য জিনিস সাধুদের দেবে। সত্যপথেই ঈশ্বরের সাক্ষাৎকার।’

    তুমি কী করেছ তপস্যা? কিছু করিনি। শুধু মৌনাবলম্বন করেছি। তাতেই তোমার সিদ্ধি হয়েছে।

    তাতেই?

    হ্যাঁ, তার মানে মৌনাবলম্বন করে ছিলে, ফলে তুমি মিথ্যে বলোনি। মিথ্যা না বলাটাও এক হিসেবে সত্য বলা।

    সকলসুন্দরসন্নিবেশ ঠাকুর তাকালেন তারকের দিকে। বললেন, ‘বেশ কাল এসো।’ সত্যমেব জয়তে, নানৃতম।

    ২৮

    কিন্তু কাল কি আর আসবে ইহকালে?

    ঠিক আসবে যদি তিনি কৃপা করেন। যিনি কোল দিয়েছেন তিনি কি করেননি কৃপা?

    পরদিন সন্ধ্যের আগে ঠিক এসে হাজির।

    ওরে এসেছিস? তোর জন্যে মা-কালীর প্রসাদী লুচি-তরকারি রেখে দিয়েছি। কি রে, আজ রাত্রে থাকবি তো এখানে? সামনের ঐ দক্ষিণের বারান্দায় শুবি, কেমন? আজ রাতে কেউ এখানে থাকবে না। শুধু তুই আর আমি।

    যেন কতকালের চেনা। কত দেশ ঘুরেছেন ওকে সঙ্গে করে। তোর নাম কি, তোর বাপের নাম কি, কোথায় তোর বাড়ি, কিছুর খোঁজখবরে দরকার নেই। শুধু তুই এলি আর আমি নিলুম। তুই আর আমি এ দুয়ের মধ্যেই ব্রহ্মাণ্ডলীলা। শুধু শিলা নয় রে, লীলা। শুধু কুরুক্ষেত্রের কৃষ্ণ নয়, রাধাকৃষ্ণ।

    বৈষ্ণবসম্প্রদায়ের এক সাধু এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। এরা কৃষ্ণ মানে, কিন্তু রাধাবিহীন কৃষ্ণ। এদের মতে রাধা বলে কিছু নেই। খাজাঞ্চির ঘরের কাছে আছে কিন্তু কোনো দেবমন্দিরেই প্রণাম করতে আসে না। মায়ের মন্দিরে শিবের মন্দিরে তো নয়ই, রাধাগোবিন্দের মন্দিরেও নয়।

    সাধুর ইচ্ছে ঠাকুরের ভক্তেরা ওর কাছে এসে সমবেত হয়, শোনে ওর কথাবার্তা। এমনিতে বেশ খাঁটি সাধু কিন্তু দোষের মধ্যে, শুকনো।

    সকলে তাকায় ঠাকুরের দিকে। ঠাকুর বললেন, ‘হতে পারে ওর ভালো মত, কিন্তু আমার প্রাণের মতো নয়। ভগবানের লীলা চাই।’

    লীলা ভুবনপাবনী। মা আর ছেলে। বর আর বধূ । প্রভু আর দাস। বন্ধু আর সখা।

    নারদ দ্বারকায় এসে হাজির। ষোলো হাজার স্ত্রী নিয়ে শ্রীকৃষ্ণ কি ভাবে বাস করছেন তা একবার দেখে যেতে হবে স্বচক্ষে। বিশ্বকর্মার নির্মাণকৌশলের পরাকাষ্ঠা, কী সুন্দর-সুমহান রাজপুর! নির্ভয়ে প্রবেশ করল নারদ, একেবারে নিভৃত অন্তঃপুরে। গিয়ে দেখল রুক্মিণী রত্নখচিত চামর দিয়ে ব্যজন করছে শ্রীকৃষ্ণকে। নারদকে দেখে উঠে পড়লেন শ্রীকৃষ্ণ, বসবার জন্যে মহার্ঘ আসন দিলেন, নিজের হাতে ধুয়ে দিলেন তাঁর পদযুগল। শুধু তাই নয়, সেই পা-ধোয়া জল রাখলেন নিজের মাথার উপর। বললেন, ‘প্রভু, আপনার কোন কাজ সাধন করব বলুন।

    নারদ বললে, ‘আর কিছু নয়, যেন আপনার চরণদ্বয়ের ধ্যানে আমার স্মৃতি সতত স্থির থাকে।’

    নারদ নিষ্ক্রান্ত হয়ে আরেক মহিষীর ঘরে প্রবেশ করল। গিয়ে দেখল সেখানে শ্রীকৃষ্ণ স্ত্রীর সঙ্গে পাশা খেলছেন। নারদকে দেখে তেমনি পদবন্দনা করে জিজ্ঞেস করলেন শ্রীকৃষ্ণ, ‘প্রভু, আপনার কী প্রিয়সাধন করব?’

    তেমনি এক-এক ঘরে যাচ্ছে নারদ, এক-এক অভিনব দৃশ্য দেখছে। কোথাও শ্রীকৃষ্ণ শিশুপালন করছেন, কোথাও হোম বা সান্ধ্যবন্দনা করছেন, কোথাও অস্ত্রবিদ্যা শিখছেন, কোথাও অশ্ব হস্তী বা রথপৃষ্ঠে বিচরণ করছেন। কোথাও বা শুয়ে রয়েছেন পর্যাঙ্কে, কোথাও বা মন্ত্রীদের সঙ্গে বসেছেন মন্ত্রণায়, কোথাও বা গোদান করছেন ব্রাহ্মণদের। কোথাও স্নান করতে চলেছেন, হাস্যালাপ করছেন প্রিয়ার সঙ্গে, কোথাও বা পুত্রকন্যার বিয়ের আয়োজন করছেন।

    নানা ভাবে অবস্থিত। নানা লীলায় উদ্ভিন্ন।

    তখন নারদ বললে করজোড়ে, “হে যোগেশ্বর, আজ দেখলাম আপনার যোগমায়ার প্রভাব। এবার আমাকে অনুমতি করুন, আমি সকল লোকে আপনার ভুবনপাবনী লীলাগান গেয়ে বেড়াই।’

    “পুত্র, তুমি মোহগ্রস্ত হয়ো না।’ বললেন শ্রীকৃষ্ণ, ‘লোকশিক্ষার জন্যে আমি এরূপ করে থাকি।’

    আবার দেখ, ব্রাহ্মমুহর্তে শয্যা ছেড়ে জলস্পর্শ করে পরমাত্মার ধ্যান করি। অন্ধকারের পরপারে যাঁর বাসা সেই পরমাত্মা।

    সেই এক, স্বয়ংজ্যোতি, অনন্য, অব্যয়, নিরস্তকল্মষ ব্রহ্মনামা পুরুষ। উদ্ভব আর বিনাশের মধ্যে যে শক্তি সেই শক্তিতেই যাঁর সত্তা ও আনন্দস্বরূপত্বের উপলব্ধি। আবার যেমন ধরো নিত্যগোপাল। এত বড় ভক্ত, ঠাকুরের মতে যে পরমহংস অবস্থা পেয়েছে তার সঙ্গে মিশতে বারণ করছেন তারককে। বলছেন, ‘দ্যাখ তারক, নিত্যগোপালের সঙ্গে বেশি মিশিসনে। ওর আলাদা ভাব। ও এখানকার লোক নয়।’

    তেইশ-চব্বিশ বছরের ছেলে এই নিত্যগোপাল। বিয়ে থা করেনি। বালকস্বভাব। নিয়ত বাস করে ভাবরাজ্যে। ডিমে তা দেওয়া পাখির দৃষ্টির মতো ফ্যালফেলে। ঠাকুর বলেন, পরমহংস অবস্থা। তাই দেখেন গোপালের মত।

    গিরিশের বাড়িতে এসেছেন ঠাকুর। বসতে গিয়ে দেখেন আসনের কাছে একখানা খবরের কাগজ পড়ে আছে। যত বিষয়ব্যাপারের কথা, পরনিন্দা আর পরচর্চা। ইশারায় বললেন কাগজখানা সরিয়ে নিতে। কাগজ সরাবার পর বসলেন আসনে। সেখানে নিত্যগোপাল এসেছে।

    ‘কি রে, কেমন আছিস?’

    ‘ভালো নেই।’ বললে নিত্যগোপাল। শরীর খারাপ। ব্যথা।’

    ‘দু-এক গ্রাম নিচে থাকিস।’

    লোক ভালো লাগে না। কত কি বলে, ভয় হয়। আবার জোর করে ভয় কাটিয়ে উঠি।’

    ‘ওই তো হবে। তোর আছে কে?”

    ‘এক তারক আছে। সর্বদা সঙ্গে-সঙ্গে থাকে। কিন্তু সময়ে সময়ে ওকেও ভালো লাগে না।’

    এত উচ্চভূমিতে আছে নিত্যগোপাল তার সঙ্গে সঙ্কেতে কথা হয় ঠাকুরের। ‘তুই এসেছিস?’ অমনি আবার উত্তর দেন নিগূঢ় স্বরে, ‘আমিও এসেছি।’

    ভাবাবস্থায় নিত্যগোপালের বুক রক্তবর্ণ। কিন্তু ভাব প্রকৃতিভাব। বলরামের বাড়িতে ভাবাবস্থায় নিত্যগোপালের কোলের উপর পা ছড়িয়ে দিলেন ঠাকুর। ঠাকুর সমাধি‍, আর নিত্যগোপাল কাঁদতে লাগল অঝোরে।

    একটু প্রকৃতিস্থ হয়ে জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর, নিত্য থেকে লীলা, লীলা থেকে নিত্য, তোর কোনটা ভালো?”

    ‘দুইই ভালো।’ বললে নিত্যগোপাল।

    ‘তাই তো বলি, চোখ বুজলেই তিনি আছেন আর চোখ চাইলেই তিনি নেই?” সেদিন যেই নরেন গান ধরল- সমাধিমন্দিরে মা কে তুমি গো একা বসি, অমনি ঠাকুর সমাধিস্থ হয়ে গেলেন। সমাধিভঙ্গের পর ঠাকুরকে বসানো হল আসনে, সামনে ভাতের থালা। সমাধির আবেশ এখনো কাটেনি সম্পূর্ণ, দুই হাতেই ভাত খেতে শুরু করে দিলেন। শেষে খেয়াল হলে বললেন ভবনাথকে, তুই খাইয়ে দে। ভবনাথ খাওয়াতে লাগল। ঠিকমত খাওয়া হল না আজ, বেশির ভাগই পড়ে রইল। বলরাম বললে, ‘নিত্যগোপাল কি পাতে খাবে?’

    ‘পাতে? পাতে কেন?’ ঠাকুর প্রায় ধমকে উঠলেন। ‘সে কি, আপনার পাতে খাবে না?’

    নিত্যগোপালও ভাবাবিষ্ট। ঠাকুর এসে বসলেন তার পাশটিতে। যে পাতেই তোকে দিক, তোকে আমি খাইয়ে দি নিজের হাতে। তুই আমার গোপাল।

    সেই গোপাল সেন। অনেক দিন হল সেই যে একটি ছোট্ট ছেলে আসত এখানে, এর ভেতর যিনি আছেন সেই মা তার বুকে পা রাখলে, মনে নেই? বললে, তোমার এখনো দেরি আছে, আমি পারছি না থাকতে ঐহিকদের মধ্যে। এই বলে যাই বলে বাড়ি চলে গেল। আহা, আর ফিরে এল না। তারপর শুনলাম দেহত্যাগ করেছে। সেই গোপালই নিত্যগোপাল।

    এমন যে নিত্যগোপাল তার সঙ্গে মিশতে বারণ করলেন তারককে।

    ‘ওরে সেখানে তুই যাস?’ জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর।

    বালকের মতো সরল মুখে বললে নিত্যগোপাল। ‘যাই। নিয়ে যায় মাঝে-মাঝে।’ সে একজন ত্রিশ-বত্রিশ বছরের স্ত্রীলোক। অপার ভক্তিমতী, ঠাকুরে দত্তচিত্ত। নিত্যগোপালের অপূর্ব ভাবাবস্থা দেখে বড় আকৃষ্ট হয়েছে, তাকে সন্তানরূপে স্নেহ করে, কখনো-কখনো নিয়ে যায় নিজের বাড়িতে।

    ‘ওরে, সাধু সাবধান।’ শাসনবাণী উচ্চারণ করলেন ঠাকুর। ‘বেশি যাসনে, পড়ে যাবি। কামিনীকাঞ্চনই মায়া। মেয়েমানুষ থেকে অনেক দূরে থাকতে হয় সাধুকে। ওখানে সকলে ডুবে যায়। ব্রহ্মা-বিষ্ণু ও ডুবে গিয়ে খাবি খাচ্ছে সেখানে।’

    নিত্যগোপালের পরমহংস অবস্থা আর স্ত্রীলোকটিও অশেষ ভক্তিসম্পন্না। তবুও কি অমোঘ শাসন। শাসনবেশে কি করুণা! সাধু সাবধান! কে জানে লৌহগৃহের কোন অসতর্ক ছিদ্রপথে সাপ ঢুকবে! পরমহংস হয়েছ বলেই মনে কোরো না তোমার আর পতন হবার সম্ভাবনা নেই। সুতরাং, সাধু সাবধান!

    সেই নিত্যগোপাল অবধূত হয়েছে। জ্ঞানানন্দ অবধূত। চিতাভস্মভূষোজ্জ্বল দ্বিতীয় মহেশ। পরনে রক্তবাস হাতে ত্রিশূল গলায় নাগসূত্র। করে পানপাত্র মুখে মন্ত্রজাল বনে-গৃহে সমানুরাগ সন্ন্যাসী।

    ঠাকুর তাই ঠিকই বলেছিলেন, ওর ভাব আলাদা। ও এখানকার নয়।

    ওরা একডেলে গাছ, আমি পাঁচডেলে। আমার পাঁচফুলের সাজি।

    মনের আনন্দে সে রাতে আর ঘুম এল না তারকের। একটি মৃদুমিঠে গন্ধের মতো উপভোগ করতে লাগল সেই অনিদ্রাটুকুকে।

    মাঝরাতে চেয়ে দেখল ঠাকুর দিগ্বসন হয়ে ভাবের ঘোরে ঘুরছেন ঘরের মধ্যে আর কি সব বলছেন নিজের মনে। খানিক পরে বেরিয়ে এসেছেন বারান্দায়। বলছেন জড়িতম্বরে, ‘ওগো, ঘুমিয়েছ?’

    ধড়মড় করে উঠে বসল তারক। বললে, না তো, ঘুমুইনি। ‘ঘুমোওনি? তবে আমাকে একটু রামনাম শোনাও তো।’ কি ভাগ্য, তারক উঠে বসে রামনাম শোনাতে লাগল।

    রাত তিনটে বাজলেই আর ঘুমাতে পারেন না ঠাকুর। এমনিতে ঘুম দু-এক ঘণ্টার বেশি নয়, বাকি সময় যতক্ষণ জীবভূমিতে থাকেন, নাম করেন। যারা থাকে তাঁর কাছাকাছি সকলকে ডেকে তোলেন। ওরে ওঠ, আর কত ঘুমাবি? উঠে একবার ভগবানের নাম কর।

    এক-এক দিন খোল করতাল নিয়ে এসে বাজনা শুরু করে দেন। কীর্তনের ধুম লাগান। তারপর নাচেন ভাবের আনন্দে ভরপুর হয়ে। ওরে তোরাও নাচ। লজ্জা কিসের? হরিনামে নৃত্য করবি তাতে আর লজ্জা কি! লজ্জা ঘৃণা ভয় তিন থাকতে নয়। যে হরিনামে মত্ত হয়ে নৃত্য করতে পারে না তার জন্ম বৃথা! নাচছেন আর দরদরধারে অশ্রু ঝরছে।

    বাক্যে যা বলবে মনে যা ভাববে বুদ্ধি দিয়ে যা নিশ্চয় করবে সবই অর্পণ করবে ঈশ্বরকে। সংকল্পবিকল্পকারী মনকে নিরোধ করে ভক্তিভরে ভজনা করলেই মিলবে অভয়। সুতরাং স্বীয় প্রিয়ের নাম করো। লজ্জা ত্যাগ করে অনাসক্ত হয়ে বিচরণ করো সংসারে। অনুরাগ উদিত হলেই চিত্ত বিগলিত হবে, কখনো হাসবে কখনো কাঁদবে কখনো রোদন-চীৎকার করবে কখনো বা উন্মাদের মত নৃত্য করবে। বায়ু অগ্নি সরিৎ সমুদ্র দিক দ্রুম আকাশ নক্ষত্র সমস্ত কিছুকে শ্রীহরির শরীর জেনে অনন্য মনে প্রণাম করবে। যে ভোজন করে তার যেমন প্রতি গ্রাসেই একসঙ্গে তুষ্টি পুষ্টি ও ক্ষুন্নিবৃত্তি হয় তেমনি যে ভজনা করে তারও নাম করার সঙ্গে-সঙ্গেই ভক্তি, ঈশ্বরের অনুভব ও বৈরাগ্য এসে পড়ে। ‘ভক্তির্বিরক্তিভগবৎপ্রবোধঃ।’ এই ভজনাতেই পরা শান্তি, আর কিছুতে নয়।

    শিখে রাখ, যখন যেমন তখন তেমন, যাকে যেমন তাকে তেমন। সামনে মাতাল, তাকে ধর্ম কথা বলতে গেলে হয়তো কামড়ে দেবে। বরং তার সঙ্গে একটা সম্পর্ক পাতা, খুড়ো বলে ডাক, হয়তো তোকে আদর করে বসবে। দেখবি, শুনবি, বলবি নে। অন্যায় দেখে প্রতিবাদ করার চেয়ে সহ্য করা ভালো। তুই কি কারু দণ্ডমুণ্ডের কর্তা যে তোর শাসনে শোধন হবে? যিনি শাসন করবার ঠিক করবেন। তুই বিচারের ভালো-মন্দ কী বুঝিস? আর শোন, তৈরি অন্ন ছাড়বিনে কখনো। যদি ডাল-ভাত জুটে থাকে তাই খেয়ে নে, পোলাওয়ের আশা করবি নে। কাঠের মালা আর ঘেঁটু ফল পেয়েছিস তাই দিয়ে সেরে নে শিবপুজো। কবে জবাফুল আর স্ফটিকের মালা পাবি তারই জন্যে বসে থাকবি পথ চেয়ে?

    ভক্ত হবি, তাই বলে বোকা হবি? তোর হক ছাড়বি, স্বত্ব খোয়াবি? লোকে তোকে ঠকিয়ে নেবে? ঠিক-ঠিক জিনিস দিলে কিনা দেখে তবে দাম দিবি। ওজনে কম দিল কিনা দেখে নিবি যাচাই করে। আবার যে সব জিনিসের ফাউ পাওয়া যায় সে সব জিনিস কিনতে গিয়ে ফাউটি পর্যন্ত ছেড়ে আসবিনি।

    মোট কথা, সরল হবি, উদার হবি, বিশ্বাসী হবি। তাই বলে বোকা বাঁদর হবি না। কাছাখোলা, আলাভোলা নেলাখেপা হবি না।

    ‘অনেক তপস্যা, অনেক সাধনার ফলে লোকে সরল হয়, উদার হয়। সরল না হলে পাওয়া যায় না ঈশ্বরকে। সরল বিশ্বাসীর কাছেই তিনি আপনার স্বরূপ প্রকাশ করেন।’ বললেন ঠাকুর।

    আর শোন, কান্না পেলেই কাঁদবি।

    বিকেলে দক্ষিণেশ্বরে বালকের মত রামলালের কাছে বসে কাঁদছেন ঠাকুর ‘আমি একটু খাঁটি দুধ খাব। কালীবাড়িতে যে দুধ খাই তাতে স্বাদগন্ধ নেই। বড় সাধ শাদা-শাদা ধোবো-ধোবো মেটো-মেটো গন্ধ এমন একটু খাঁটি দুধ খাই। একটু খাওয়াতে পারিস রামনেলো? বাজারে কি গয়লাবাড়িতে গিয়ে দেখ দেখি মেলে কিনা!’

    ঘুরে এল রামলাল। হাত খালি। দুধের বিন্দুবিসর্গও কোথাও নেই। তবে কি হবে? পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসলেন ঠাকুর।

    এদিকে বলরামের স্ত্রী তার গৃহে বসে দুধ জ্বাল দিচ্ছে আর কাঁদছে। যোগেন-মা কাছে বসে, তাকে লক্ষ্য করে বলছে, ‘দেখ দিদি, এমন দুধ, প্রাণভরে ভগবানকে খাওয়াতে পারলুম না। এ দিয়ে কেবল বাড়ির লোকের পেটপুজো হবে। এক কাজ করবি দিদি? যাবি দক্ষিণেশ্বর?’

    যোগেন-মা তো স্তম্ভিত।

    ‘রাত হয়ে এসেছে কেউ টের পাবে না। চল খিড়কি খুলে বেরিয়ে পড়ি। প্রাণ বড় উচাটন হয়েছে, ঠাকুরকে একটু খাইয়ে আসি খাঁটি দুধ। তুই যদি সঙ্গে যাস-যাবি?”

    ‘যাব।’

    আধসেরটাক দুধ নিলে একটা ঘটিতে করে। বাটি ঢাকা দিয়ে গামছা জড়ালে। তারপর গা ঢাকা দিয়ে চলল দক্ষিণেশ্বর। সেই একরাজ্যের পথ। তাও কিনা পায়ে হেঁটে!

    সমস্ত বন্ধনবেষ্টনী লঙ্ঘন করে এ সেই ডাক। এ ডাক নিরবধি, এ ডাক পৃথিবী ছাড়িয়ে।

    ঠাকুরের ঘরে ঢুকল এসে দুজন। হাতে গামছা-বাঁধা ঘটি।

    পুলকিত হলেন ঠাকুর। শুধোলেন, ‘দুধ এনেছ বুঝি?

    ‘আজ্ঞে হ্যাঁ-’

    ‘বিকেল থেকেই মনে হচ্ছে একটু ধোবো-ধোবো মেটো মেটো খাঁটি দুধ খাই। তাই নিয়ে এসেছ তোমরা—-

    যেন নন্দরানীর সামনে গোপাল, তেমনি ভাবে দুধ খেলেন ঠাকুর। পরে পরিহাস করে বললেন, ‘তোমরা কুলের কুলবধূ এত রাতে যে আমার কাছে এলে তা তোমরা আমার হাতে দড়ি দেবে নাকি?’ বলে হাসতে লাগলেন।

    রামলালকে বললেন একটা গাড়ি নিয়ে আসতে। গাড়ি এলে বললেন, ‘বলরামকে চুপিচুপি বলবি এরা আমার কাছে এসেছিল যেন রাগ না করে।’

    কিন্তু রাগ করছে হরিবল্লভ। বলরামের খুড়তুতো ভাই, কটকের সরকারী উকিল। অধিকন্তু রায় বাহাদুর।

    নানা কথা কানে ঢুকেছে। নানা বিরুদ্ধ কথা। তুমি যাচ্ছ তো যাও, তুমি মাতামাতি করছ তো করো, কিন্তু বাড়ির মেয়েদের ওখানে পাঠাও কেন? ওদের কি মাথাব্যথা? বলরামের এক উত্তর। ‘তুমি ভাই একবার তাঁকে দেখে যাও স্বচক্ষে।’

    তাই এসেছে হরিবল্লভ। তাকে দেখি আর না দেখি তোমাকে এবার কটকে টেনে নিয়ে যাব। এই মত্ততার প্রভাব থেকে মুক্ত করব তোমাকে।

    বলরামের বাড়ি ঠাকুরের ‘কলকাতার কেল্লা’। বলরামের অন্নই ঠাকুরের শুদ্ধান্ন। বলরামের সমস্ত পরিবার এক সুরে বাঁধা। এক মন্ত্রে উদ্দীপিত। স্বামী-স্ত্রী থেকে শুরু করে ছোট-ছোট ছেলেমেয়ে পর্যন্ত ঠাকুরে প্রেরিত, ঠাকুরে ভাবিত, ঠাকুরে নিমজ্জিত।

    স্বভাবে কৃপণ কিন্তু সাধু সেবায় বদান্য। বলেন, সাধু সেবা ছাড়া আত্মীয়পোষণ মানে ভূতভোজন। আত্মীয়স্বজনের পাল্লায় পড়ে ছোট মেয়ে কৃষ্ণময়ীর বিয়েতে অনেক খরচ করে ফেলেছেন তাই সারাদিন আছেন ভারি বিমর্ষ হয়ে। একটা সাধুভোজন হল না অথচ এতগুলো টাকা বেরিয়ে গেল জলের মত। অকারণে এত অপচয়!

    এমন সময়ে দৈবযোগে ঠাকুরের প্রিয় ভক্ত যোগীন এসে উপস্থিত।

    বলরামের আনন্দ তখন দেখে কে। ব্যাকুল হয়ে তার দুহাত চেপে ধরল বলরাম। বললে, ‘গৃহীর বিবাহে সন্ন্যাসীদের নিমন্ত্রণ খাওয়া বারণ। জানি। তবু ভাই তুমি যদি দয়া করে অন্তত একটা মিষ্টিও খাও আমার সব সার্থক হবে। তখন এত ব্যয় আর অপব্যয় বলে মনে হবে না।”

    তা কি করে হয়! যোগীন মুখ ফেরাল।

    কান্নার কাছে কার নিস্তার আছে! বাপই গলবেন, আর এ তো তাঁর সন্তান। বলরামের কাতরতায় নরম হল যোগীন। নিল একটা মিষ্টি। মুখে দিল। অমনি সমস্ত মধুর হয়ে গেল বলরামের। যা মনে হয়েছিল ক্ষয় তাই মনে হল আনন্দ। যা মনে হয়েছিল অপব্যয় তাই ঐশ্বর্য-উদ্ভাস।

    কৃষ্ণময়ীর খুব বড় ঘরে বিয়ে হয়েছে। কিন্তু শ্বশুরঘর করতে যাবার সময় গাড়িতে উঠেছে গয়নার বাক্স সঙ্গে নিয়ে নয়, ঠাকুরপূজোর বাক্সটি কাঁখে করে। ঠাকুরের নিত্যপূজোর ছবিখানি আব জপের মালাগাছি রয়েছে সে বাক্সটিতে। সেই তার ইহজীবনের পাথেয়, পরজীবনের ভাণ্ডার।

    ঠাকুর বললেন, আহা দেখেছ, কৃষ্ণময়ীর চোখ দুটি ঠিক ভগবতীর চোখের মত!

    বলরামের শাশুড়িও কম যায় না। ঠাকুর প্রণাম করে করে কপালে কড়া পড়িয়ে ছেড়েছে। পুত্র বাবুরামকে অর্পণ করে দিয়েছে ঠাকুরের পদসেবায়। পরিপূর্ণ চিত্তে। ‘যমে নিলে যতটা শোক না হয় তার চেয়ে বেশি হয় ছেলে সংসারবিরাগী হলে। বললেন ঠাকুর।

    কিন্তু বাবুরামের মা মূর্তিমতী প্রশান্তি।

    বলরামের অসুখ করেছে, তার গায়ে হাত বুলোচ্ছেন ঠাকুর। বলছেন, ‘রুগীকে আমি ছুঁতে পারি না, রোগের যাতনায় ভগবানকে ভুলে থাকে বলে। কিন্তু বলরামের কথা আলাদা। রোগের মধ্যেও ওর মন ইষ্টচিন্তায় নিমগ্ন।’

    ভাইয়েদের উপর জমিদারির ভার তুলে দিয়েছে। বাঁধাবরাদ্দ মাসোয়ারা নিয়েই সে খুশি। কিন্তু সে টাকায় যেন ইদানীং সঙ্কুলান হচ্ছে না। তা নিয়ে একদিন আক্ষেপ করল বলরাম। নরেন কাছে ছিল, বলে উঠল, ‘নিজের বিষয় নিজে দেখলেই তো হত। বেশ থাকতে পারতেন স্বচ্ছন্দে।’

    কথাটা যেন মর্মে লাগল এসে বলরামের। বললে, ‘নরেনবাবু, গড অলমাইটি। আপনার কথা ফিরিয়ে নিন। প্রভু আর তাঁর সন্তানদের সেবা করছি আমি। আমি কি করে বিষয়ী হব?”

    সেই বলরামকে ফেরাতে এসেছে হরিবল্লভ।

    শ্যামপুকুরে ঠাকুর তখন অসুস্থ, একদিন এসেছে বলরাম। মুখখানি চিন্তাম্লান। ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি হয়েছে? কিসের এত ভাবনা?”

    বলরাম বললে যা বলবার।

    ‘কি রকম লোক তোমার এই ভাইটি?’

    ‘এমনিতে ভালো। ঈশ্বরবিশ্বাসী। দোষের মধ্যে এই, শুধু ঈশ্বর নয়, যা শোনে তাই বিশ্বাস করে বসে।’

    ‘তা করুক। একদিন এখানে আনতে পারো?’

    ‘জানি না আসবে কিনা। এত সব বাজে কথা শুনেছে আপনার সম্বন্ধে, বোধহয় চাইবে না আসতে।’

    ‘তা হলে এক কাজ করো। গিরিশকে ডাকো।’

    এল গিরিশ। কি ব্যাপার? হরিবল্লভ? হরিবল্লভ বোস? বা, ও আর আমি যে একসঙ্গে পড়েছি। আমি ঠিক ওকে নিয়ে আসতে পারব।

    পরদিনই টেনে নিয়ে এল গিরিশ।

    ‘ঐ দেখ আমি বলেছিলাম না, কেমন শিশুর মতো সরল দেখতে!’ হরিবল্লভের দিকে তাকিয়ে ভাবাকুলস্বরে বলতে লাগলেন ঠাকুর: ‘যার হৃদয় ভক্তিতে ভরপুর নয় তার কি অমন চোখ হতে পারে?’ তারপরে হরিবল্লভকে সবিশেষ লক্ষ্য করলেন। ‘ভেবেছিলুম কটকের সরকারী উকিল কত না জানি তোমার চোটপাট, কিন্তু এখন দেখছি বিনম্র, অকিঞ্চন—’

    ঠাকুরকে অতি ভক্তিভাবে প্রণাম করল হরিবল্লভ। এ কার সম্বন্ধে শুনেছিল সে? এ কে পীযূষপুঞ্জদৃষ্টি কোমলগাত্রপবিত্র মধুমঙ্গলপ্রিয়।

    ‘শুধু তাই নয়, আমার আত্মীয় আপনি। বলরাম যেমন আত্মীয়। কি বলেন?” ঠাকুরের পায়ের ধুলো নিল হরিবল্লভ। বললে, ‘আপনার দয়া।’

    গলে গেল সমস্ত কাঠিন্য। উড়ে গেল সমস্ত বিমুখতা। এই করুণাঘনের কাছে বসতে ইচ্ছা হল ঘন হয়ে।

    ‘মেয়েরাও পায়ের ধুলো নেয়। তা ভাবি, তিনিই একরূপে আছেন ভিতরে-এ প্রণাম তাঁর, আর কারু নয়! ‘

    ‘বা, আপনি তো সাধু।’ বললে হরিবল্লভ, ‘আপনাকে সকলে প্রণাম করবে তাতে দোষ কি।’

    হরিবল্লভের দোষদৃষ্টি ঘুচে গেল মুহুর্তে।

    ঠাকুর বললেন, ‘আমি কি! সে ধ্রুব প্রহ্লাদ নারদ কপিল কেউ এলে হত। আমি রেণুর রেণু।’ তাকালেন হরিবল্লভের দিকে। ‘আপনি আবার আসবেন।’

    ‘আপনি বলছেন কেন?”

    ‘বেশ, আবার এসো।’

    ‘বলতে হবে কেন, নিজের টানেই আসব।’

    ‘বলরাম অনেক দুঃখ করে। মনে হল একদিন যাই, গিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করি। তা আবার ভয় হয়। পাছে বলো, একে কে আনলে?’

    বড় লজ্জিত হল হরিবল্লভ। যেন ধরা পড়ে গেছে। পাশ কাটাবার চেষ্টায় বলল, ‘ও সব কথা কে বলেছে? আপনি কিছু ভাববেন না।’

    পাশ কাটিয়ে চলে যাবার উপায় নেই, পথও নেই। একেবারে ঢেলে দিতে হবে পায়ের উপর। নৈবেদ্য করে দিতে হবে দেহ-মন!

    বড়লোক বলেই তো এটুকু অহঙ্কার! ঈশ্বরকৃপা না থাকলে খুব বড়লোকও অপদার্থ হয়ে যায়। যদু বংশ ধ্বংসের পর অর্জুন আর পারল না গাণ্ডীব তুলতে।

    যাবার আগে ঠাকুরের পায়ের ধূলো নিতে গেল হরিবল্লভ। ঠাকুর পা গুটিয়ে নিলেন। কিন্তু হরিবল্লভ ছাড়বার পাত্র নয়। আর সে ছাড়বে না এ প্রাণজীবনকে। জোর করে টেনে নিল দু পা। ধূলো নিল ললাটে।

    নীরোগনির্মল হয়ে গেল। জীবনের চক্রাবর্তের মধ্যে খুঁজে পেল ধ্রুব বিন্দু।

    এসেছিল বলরামকে নিয়ে যেতে, নিজেই বাঁধা পড়ল। ঐ যে বাপ বলেছিল নেশাখোর ছেলেকে, কি মধু যে পাস ঐ মদে কে জানে। ছেলে বলেছিল, একটু খেয়েই দেখ না। বাপ খেল, দেখি কি ব্যাপার। খেয়ে উঠে ছেলেকে বললে, ও তুমি ছাড় বাপু, আমি আর ছাড়ছিনে। সেই অবস্থা!

    হরিবল্লভ চলে গেলে পর বললেন ঠাকুর, ‘কেমন ভক্তি দেখেছ! নইলে জোর করে পায়ের ধুলো নেয়!

    পরে মাস্টারকে বললেন চুপিচুপি, ‘সেই যে তোমায় বলেছিলুম না ভাবে দেখলাম দুজন লোক। একজন ডাক্তার, মহেন্দ্র ডাক্তার, আর, আরেকজন এই লোক, এই হরিবল্লভ। তাই দেখ এসেছে।’

    আবার এসেছে।

    এবার নিচে মাটির উপর বসে ঠাকুরকে পাখা করছে হরিবল্লভ।

    কিন্তু হরীশের সর্ব বিসর্জন। সব ছেড়েছুড়ে ডেরা নিয়েছে দক্ষিণেশ্বরে। বলে, ‘উপায় নেই, এখান থেকে সব চেক পাশ করিয়ে নিতে হবে। নইলে টাকা দেবে না ব্যাঙ্ক।’

    মহিমাচরণ বেদান্তচর্চা জ্ঞানচর্চা করে, হরীশ রাগভত্তির আখড়াধারী।

    ‘জ্ঞান কি জানিস?’ ঠাকুর বোঝাচ্ছেন হরীশকে। স্বস্বরূপকে জানা। মায়াই দেয় না জানতে। যেন সোনার উপর ঝোড়াকতক মাটি পড়েছে সেই মাটিটা ফেলে দেওয়া। ঐ মাটিটাই মায়া।’

    ‘আর রাগভক্তি?’

    ‘যেমন একটা পোড়োবাড়ির বনজঙ্গল কাটতে কাটতে নলবসানো ফোয়ারা পেয়ে যাওয়া। মাটি সুরকি ঢাকা ছিল, যেই ঢাকা সরে গেল ফরফর করে জল উঠতে শুরু করল।’

    প্রকৃতিভাব হরীশের, মেয়ের কাপড় পরে শোয়। অথচ নিজের স্ত্রী-পুত্র ত্যাগ করে এসেছে। ঠাকুর তাকে বলছেন, ‘ওরে যা না একবার বাড়ি। তোর বউ খায় না, ঘুমোয় না, খালি কাঁদে। একবারটি তাকে দেখা দিয়ে এলে কি হয়?”

    মুখ গোঁজ করে বসে থাকে হরীশ। কানে আঙুল দেয় মনে-মনে।

    ‘কচি মেয়েটাকে একটু দয়া করতে পারিসনে? দয়া কি সাধুর গুণ নয়? ওরে তাকে যদি একটু বোঝাস সে ঠিক বুঝবে।’

    দয়া দেখাতে গিয়ে দায়ে পড়ে যাই আর কি। চোখের জল দেখে ফের ব্যাধের জালে জড়িয়ে পড়ি। ঠাকুর কি আমাকে পরীক্ষা করছেন?

    ২৯

    ‘ভয় কি রে? আমি আছি।’ তারককেও তাই বলছেন ঠাকুর। ‘স্ত্রী যতদিন বেঁচে থাকবে তাকে দেখাশোনা করতে হবে বৈকি। একটু ধৈর্য ধর, মা সব ঠিক করে দেবেন। মাঝে-মাঝে যাবি বাড়িতে, যেমন-যেমন বলে দেব তেমন-তেমনটি করবি। দেখবি স্ত্রী সঙ্গে থাকলেও কোনো ক্ষতি হবে না।’

    রাখালকেও পাঠিয়েছি অমনি তার স্ত্রীর কাছে। ভয় কিসের? আমি আছি।

    দুস্তর সমুদ্রে আমিই দীপস্তম্ভ। বিপথ-বিপদের অন্ধকারে আমিই অরুণোদয়। নিদারুণ নৈষ্ফল্যের মধ্যে আমিই মঙ্গলস্বরূপ। যদি কিছু থাকে এ বিশ্বলোকে, যদি কোনো শ্রী–সমস্ত বিরোধ ও বৈচিত্রের মধ্যে যদি কোনো শৃঙ্খলা-তবে আমি আছি।

    আফিসে কাজ করত তারক, ছেড়ে দিল। আর যখন রাখালের বেলায় কথা উঠল তাকে চাকরিতে বসিয়ে আবদ্ধ করবে তখন ঠাকুরকে এসে জানাতেই ঠাকুর বললেন, ‘খবরদার, ঈশ্বরের জন্যে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে মরেছিস এ বরং শুনব তবু কারুর দাসত্ব করছিস চাকরি করছিস এ কথা যেন না শুনি।’

    কিন্তু নিরঞ্জনের বেলায় অন্য কথা। কেন হবে না? সেও চাকরি করছে বটে, কিন্তু মা’র ভরণপোষণের জন্যে।

    ‘মা’র জন্যে কর্ম করে, তাতে দোষ নেই।’ বলছেন ঠাকুর। ‘আহা মা! মা ব্রহ্মময়ী স্বরূপা!’

    মা নেমে আয়, নেমে আয়। একদিন হঠাৎ তারকের বুকে পা রাখলেন ঠাকুর। মাথায় হাত বুলুতে-বুলুতে বলতে লাগলেন, নেমে আয় মা, নেমে আয়। যেমন রাখালের জিভ টেনে ধরে সাঙ্কেতিক মন্ত্র এঁকে দিয়েছিলেন তেমনি তারকের জিভে নখাগ্র দিয়ে লিখে দিলেন বীজমন্ত্র। কুণ্ডলী পাকানো সাপ হেলে-দুলে উঠল। করল ফণাবিস্তার।

    কেমন ভাবে শুবি? ভক্ত সন্তানদের শেখাচ্ছেন ঠাকুর: ‘প্রথমটা চিত হয়ে শুবি। ভাববি মা-কালী দাঁড়িয়ে আছেন বুকের উপর। এই ভাবে মায়ের ধ্যান করতে-করতে ঘুমিয়ে পড়বি। দেখবি সুস্বপ্ন হবে।’

    রাত দুপুরে উঠে পড়েছেন কখন। ওরে তারক, আমাকে একটু গোপালনাম শোনা তো! নারায়ণ নারায়ণ জয় গোপাল হরে।

    যদি কাউকে না পান, দারোয়ানকে ডাকিয়ে আনেন। আমাকে একটু রামনাম শোনাও দারোয়ানজী। শুধু নাম। সীতারাম। জীবনের সমস্ত শীতে যে আরাম সেই সীতারাম।

    তারকের সময়-সময় ইচ্ছে হয় ঠাকুরের কাছে বসে কাঁদে। কেন কাঁদবে? তা জানে না। দুঃখে না আনন্দে, তাও না। দুঃখের আনন্দে না আনন্দের দুঃখে, তা বা কে বলবে? এমনি অহেতুক কাঁদব। সব চেয়ে বড় কথা, কাঁদতে ভালো লাগবে। একদিন সত্যি-সত্যি বকুলতলার কাছে পোস্তার উপর বসে খুব খানিকটা কাঁদল তারক।

    ‘ওরে ওরে দ্যাখ তো, তারক কোথায় গেল?’ ঠাকুর ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। কান্না ঠিক তাঁর কানে গেছে। আর অমনি চঞ্চল হয়েছেন।

    ডাকিয়ে আনলেন তারককে। কাছে বসালেন। বললেন, ‘কাঁদছিস? খুব ভালো কথা। ভগবানের কাছে কাঁদলে তাঁর ভারি দয়া হয়। জন্মজন্মান্তরের মনের গ্লানি অনুরাগ অশ্রুতে ধুয়ে যায়।’

    কাঁদতে-কাঁদতে ধ্যান, তন্ময়তা। কান্নাতেই কুলকুণ্ডলিনীর জাগরণ।

    ধ্যান হত গিয়ে এঁড়েদার বিষ্ণুর। ধ্যানে কাঠ মেরে যেত। সবাই ধাক্কা মারছে, তবু নিঃসাড়। কত ডাকাডাকি, বিষ্টু ও বিষ্টু, কোথায় কে। নাকের নিচে হাত রাখো, নিশ্বাসের রেখা নেই। তখন সবাই খবর দিতে ছুটল ঠাকুরকে। ঠাকুর এসে ছুঁয়েছেন কি, বিষ্ণু চোখ মেলেছে। সূর্যের স্পর্শে জেগেছে অরবিন্দ।

    ছোকরা বয়েস, ইস্কুলে পড়ে। এরই মধ্যে এত!

    ঠাকুর বললেন, ‘পূর্বজন্মের সংস্কার। গভীর বনে ভগবতীর আরাধনা করছে একজন। আরাধনা করছে শবের উপর বসে। কিন্তু মন কিছুতেই স্থির হচ্ছে না। নানারকম বিভীষিকা দেখছে। শেষকালে মূর্তিমান বিভীষিকা বাঘ তাকে ধরে নিয়ে গেল। আরেকজন বাঘের ভয়ে গাছে চড়ে বসেছিল। সে ভাবলে এই ফাঁকে একটু শবসাধন করে নি। পূজার সমস্ত উপকরণ তৈরি, আচমন করে একটু বসে পড়ি শবের উপর। যেই ওকথা মনে এল তরতর করে নেমে এল গাছ থেকে। আচমন করে শবের উপর বসে জপ করতে লাগল। একটা জপ করতে না করতেই ভগবতী আবির্ভূত হলেন। বললেন, প্রসন্ন হয়েছি, বর নাও। তখন সে লোক বললে, মা, এ কী কাণ্ড। ঐ লোকটা অত খেটেপিটে অত আয়োজন করে তোমার সাধন করছিল, তোমার দয়া হল না, আর আমি ওর ছাড়া আসনে বসে কি একটু জপ করলাম আর অমনি আমাকে দর্শন দিলে! ভগবতী তখন হাসিমুখে বললেন, বাছা, তুমি কি জন্মান্তরের কথা কিছু জানো? তুমি কত জন্ম আমার জন্যে তপস্যা করেছ তা কি আর তোমার মনে আছে? এই একটু শুধু বাকি ছিল, আজ এই দণ্ডে তা পূরণ হয়ে যেতেই আমার দর্শন পেলে। এখন বলো কি বর পছন্দ?”

    সেই বিষ্ণু গলায় ক্ষুর চালিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

    শুনে অবধি ঠাকুরের মন খুব বিষণ্ণ। বললেন, ‘অনেক দিনই বলত আমাকে—সংসার ভালো লাগে না। পশ্চিমে কোন আত্মীয়ের বাড়িতে ছিল, সারা দিন এখানে-সেখানে মাঠে-নির্জনে পাহাড়ে-বনে বসে শুধু ধ্যান করত। আমাকে বলত কত ঈশ্বরীয় রূপ সে দর্শন করে। বোধহয় এই শেষ জন্ম। পূর্বজন্মে অনেক করা ছিল, বাকিটুকু সেরে নিল এ জন্মে, এই কটি অল্প বছরের মধ্যে।’

    ‘কিন্তু আত্মহত্যা শুনে ভয় হয়।’ বললে একজন ভক্ত।

    ‘আত্মহত্যা মহাপাপ। ফিরে-ফিরে আসতে হবে সংসারে আর জ্বলতে হবে দাবাগ্নিতে। তবে যদি কেউ ঈশ্বরদর্শন করে দেহত্যাগ করে স্বেচ্ছায়, তবে তাতে আর দোষ নেই। তাকে বলে না আত্মহত্যা। যখন একবার সোনার প্রতিমা ঢালাই হয়ে যায় মাটির ছাঁচে, তখন মাটির ছাঁচ ভেঙে ফেললে আর দোষ কি।’

    আত্মহত্যা কি রকম জানো? জেল থেকে কয়েদী পালানো। জেল থেকে পালিয়ে কয়েদীর রেহাই নেই, এক সময় না এক সময় সে ধরা পড়বেই। তখন তার দ্বিগুণ খাটনি। প্রথম, তার প্রথম মেয়াদের বাকি অংশ; দ্বিতীয়, জেল-পালানোর জন্যে অতিরিক্ত দণ্ড। তাই আত্মহত্যা অর্থে দ্বিগুণ কারাবাস।

    ওরে এবার তোরা ভিক্ষেয় বেরো। ঠাকুর ডাকছেন তাঁর ভক্ত-সন্তানদের। ওরে কাঁধে ঝুলি নে, নগ্ন পায়ে ফের গৃহস্থের দ্বারে-দ্বারে। নীরবে নম্রমুখে গিয়ে দাঁড়া। যাতে তোকে দেখলেই বুঝতে পারে তুই দীনহীন, তুই ভিক্ষুক-

    ভিক্ষেয় বেরুব?

    হ্যাঁ, অভিমান নাশ করতে হবে, নির্মল করতে হবে। নত হতে হবে প্রত্যেকের সামনে। পায়ের নিচে মাটির ঢেলার মতো অহঙ্কারকে ধূলো করে দিতে হবে। দ্বারে-দ্বারে নিষেধ দ্বারে-দ্বারে প্রত্যাখ্যান তবু অক্ষম রাখতে হবে চিত্তের প্রসন্নতা। চতুর্দিকে নৈরাশ্য, তবু তার ঊর্ধ্বে জাগ্রত রাখতে হবে নিষ্ঠার জয়নিশান। ওরে ভিক্ষেয় বেরো। অহমিকাকে কুহেলিকার মত উড়িয়ে দে। জীবনের দৈন্যের গহ্বরকে গভীর করে তোল। ভিক্ষার সুধায় ভরে তোল সেই বিরহের পাত্র।

    সব চেয়ে সহজ কে? ঈশ্বর। দুঃখ কি? অসন্তোষ। সুখ কি? আত্মবোধের যে শান্তি। শত্রু কে? গুরুবাক্যে সংশয়। প্রেয়সী কে? দীনে করুণা ও সজ্জনে মৈত্রী। শোভা কি? নিস্পৃহতা। তৃপ্তি কি? সর্বসঙ্গবিরতি। কামধেনু কি? অনঘা শ্রদ্ধা।

    বলরামের সঙ্গে রাখাল বৃন্দাবনে গিয়েছে। শরীর টিকছে না কলকাতায়। যদি বৃন্দাবনে গিয়ে ভালো হয়, আনন্দে থাকে।

    ওমা, সেই বৃন্দাবনে গিয়ে ফের রাখালের অসুখ করেছে।

    ‘কি হবে? ঝরঝর করে বালকের মতো কেঁদে ফেললেন ঠাকুর। ‘ওরে ও যে সত্যিই ব্রজের রাখাল। যদি ওর নিজের জায়গা পেয়ে আর ফিরে না আসে! যদি স্বস্থানে শরীর রাখে!

    রেজেস্ট্রি করে চিঠি পাঠানো হল কিন্তু উত্তর নেই।

    মা’র কাছে গিয়ে কেঁদে পড়লেন। পরিত্রাণপরায়ণা’ ভক্তাভীষ্টকরী বিশ্বেশ্বরীর কাছে। মা, আমার রাখালকে ফিরিয়ে দে। ও আমার গোপাল, ও আমার নিত্যসঙ্গী। আমার হাড়ের হাড়। আমার নয়নের নয়ন।

    রাখালের চিঠি এসেছে। লিখেছে মাস্টারকে। লিখেছে এ বড় ভালো জায়গা।

    এখানে ময়ূর-ময়ূরী আনন্দে নৃত্য করছে-

    শুনে ঠাকুরের আনন্দ দেখে কে। তার জন্যে চণ্ডীর কাছে মানসিক করেছিলুম। সে যে বাড়িঘর ছেড়ে আমার উপর সব নির্ভর করেছিল। তাকে আমিই তার পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিতুম–একটু ভোগের যে তখনো বাকি ছিল! আহা, কি লিখেছে দেখ! ময়ূর ময়ূরী নৃত্য করছে। লিখবেই তো! ওর যে সাকারের ঘর। বৃন্দাবন থেকে ফিরে পিতৃগৃহে উঠেছে রাখাল। ঠাকুরের অভিমান নেই। বললেন, ‘রাখাল এখন পেনসন খাচ্ছে।’

    ‘আপনার সামনে একটি ব্রহ্মচক্র রচনা করে সাধনা করি এ আমার ইচ্ছে।’ একদিন বললে মহিমাচরণ।

    বেশ তো! রাজী হলেন ঠাকুর।

    কৃষ্ণচতুর্দশীর রাত্রে রচিত হল সেই ব্রহ্ম চক্র। মাস্টার, কিশোরী আর রাখাল বসেছে সেই চক্রে। চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু গঙ্গার ছলছলানি যা একটু শোনা যাচ্ছে। আর ঝিল্লির অন্ধগুঞ্জন। মহিমাচরণ সবাইকে বললে ধ্যানস্থ হতে। ছোট খাটটিতে বসে একদৃষ্টে দেখছেন ঠাকুর।

    ধ্যান শুরু হতে না হতেই রাখালের ভাবাবস্থা উপস্থিত। ঠাকুর নেমে এসে রাখালের বুকে হাত বুলুতে লাগলেন। শোনাতে লাগলেন মা’র নাম।

    ব্রহ্মচক্রে বসে রাখালই ব্রহ্মানন্দ।

    ‘রাখালকে দিয়ে মা কত কি দেখালেন। ওরে সব কথা বলতে নেই, বলতে বারণ।’ তোমাকে জানি আমার সাধ্য কি! আনন্দে যে তুমি আমার কাছে একটু ধরা দিয়েছ এতেই আমি তোমার আপন হয়ে গেছি। আমার শরীরে এই যে বহমানা প্রাণধারা এ তো তোমারই নামজপমালা।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleঅথ রম্যকথা – অনন্যা পাল
    Next Article কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর

    Related Articles

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    May 18, 2026
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ১ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    April 27, 2026
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনন্যা পাল
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক দত্ত
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুর রহমান আল-আরিফি
    আবদুল হালিম
    আব্দুল মালেক আলী আল-কুলাইব
    আব্দুল হামীদ ফাইযী
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোপেন্দ্র বসু
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভট্টাচার্য
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বাণ রায়
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পরিমল ভট্টাচার্য
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণু শর্মা
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহতাব উদ্দিন
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রণদীপ নন্দী
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সায়ক আমান
    সায়ন্তনী পূততুণ্ড
    সায়ন্তনী পূততুন্ড
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    গজনবীর দেশ থেকে সোমনাথের পথে

    July 15, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    গজনবীর দেশ থেকে সোমনাথের পথে

    July 15, 2026
    Our Picks

    গজনবীর দেশ থেকে সোমনাথের পথে

    July 15, 2026

    ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে

    July 15, 2026

    আদর্শ বিবাহ ও দাম্পত্য – আব্দুল হামীদ ফাইযী

    July 15, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }