Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    গজনবীর দেশ থেকে সোমনাথের পথে

    July 15, 2026

    ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে

    July 15, 2026

    আদর্শ বিবাহ ও দাম্পত্য – আব্দুল হামীদ ফাইযী

    July 15, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ৩ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত এক পাতা গল্প305 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ৩.৩০

    ৩০

    ‘একটা চিল একটা মাছ মুখে করে উড়ে যাচ্ছে, আর-সব চিল তাকে তাড়া করল, ঠোকরাতে লাগল।’ বলছেন ঠাকুর। ‘মহাযন্ত্রণা। তখন চিল করলে কি! মাছটা ফেলে দিলে মুখে থেকে। ব্যস নিশ্চিন্দি। তখন তার মহানিস্তার।

    অতএব চিল তোমার গুরু। তার থেকে শিখলে অপরিগ্রহ। শিখলে অকিঞ্চনতা। ‘গুরুর কাছে সন্ধান নিতে হয়।’ বললেন ঠাকুর। ‘বাণলিঙ্গ শিব খুঁজছিল একজন।

    কোথায় পাবে কে জানে। তখন একজন বলে দিল, অমুক নদীর ধারে যাও, অমুক গাছ দেখতে পাবে সেখানে। সেই গাছের কাছে দেখতে পাৰে ঘূর্নী জল। সেই জলে গিয়ে ডুব দাও, পাবে বাণলিঙ্গ। তাই বলি সন্ধান নিয়ে ডোবো।’

    প্রথম গুরু পৃথিবী।

    কি শিখলে পৃথিবীর কাছ থেকে? আপন ব্রতে অচল থাকবার বুদ্ধি। কত উৎপাতে আক্রান্ত হচ্ছে তবু অবিচল। আর শিখবে ক্ষমা। সহিষ্ণুতা।

    দ্বিতীয় গুরু বৃক্ষ।

    কি শিখলে বৃক্ষের কাছ থেকে? পরার্থে জীবনধারণ। কেটে ফেললেও কিছু বলে না, রৌদ্রে শীর্ণশুষ্ক হয়ে গেলেও জল চায় না। ‘তরু যেন কাটিলেও কিছু না বোলয়। শুকাইয়া মৈলে তবু পানি না মাগয়।’ অস্নেহে-অসেবায়ও ফলধারণ করে, আর যারা স্নেহ-সেবা করেনি তাদেরই জন্যে করে সেই ফলোৎসর্গ।

    তৃতীয় গুরু বায়ু।

    গন্ধবহন করে কিন্তু লিপ্ত হয় না। তেমনি বিষয়ে প্রবিষ্ট হয়েও বাক্য ও বুদ্ধিকে অবিকৃত রাখব। শিখব অনাসক্তি।

    চতুর্থ আকাশ।

    অনন্ত হয়েও সামান্য ঘটের মধ্যে এসে ঢুকেছে। ব্যাপ্ত হয়ে আছে মেঘলোকে অথচ মেঘ তাকে ছুঁতে পাচ্ছে না। তেমনি আত্মা দেহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়েও অস্পষ্ট। তেমনি আকাশের মত অসঙ্গ হও।

    তারপর, জল।

    কি শিখবে জলের থেকে? স্বচ্ছতা, স্নিগ্ধতা, মধুরতা। জল যেমন নির্মল করে তুমিও তেমনি দর্শন স্পর্শন ও কীর্তন দ্বারা বিশ্বভুবন পবিত্র করো।

    ষষ্ঠ গুরু অগ্নি।

    কাঠের মধ্যে অগ্নি প্রচ্ছন্ন, অব্যক্ত, নিগূঢ়। প্রতি কণা কাঠে প্রতি কণা অগ্নি। তেমনি সমস্ত বিশ্বে ঈশ্বর গুপ্তরূপে অনুস্যুত। প্রদীপ্ত হলেই অগ্নি সমস্ত মালিন্য দগ্ধ করে অথচ সেই মালিন্যস্পর্শে নিজে কলুষিত হয় না। তেমনি তুমিও তেজে ও তপস্যায় প্রদীপ্ত হও, যারই সেবা পাও না কেন, পাপমলে লিপ্ত হয়ো না। আগুনের নিজের কোনো উৎপত্তিবিনাশ নেই। উৎপত্তিবিনাশ শিখার, আগুনের নয়।

    পরের গুরু চন্দ্র।

    হ্রাসবৃদ্ধি হয় কার? চন্দ্রকলার, চন্দ্রের নয়। তেমনি জেনে রাখো যা কিছু জন্মমৃত্যু সব দেহের, আত্মার নয়।

    চন্দ্ৰ গুরু হলে সূর্যও গুরু

    কী শিখবে সূর্যের থেকে? আত্মা যে স্বরূপতঃ অভিন্ন সেই তত্ত্ব। পাত্রে জল আছে তার উপরে পড়েছে সূর্যকিরণ। জলপাত্রের আকারভেদে সূর্যকিরণকে ভিন্ন-ভিন্ন সূর্যরূপে প্রতীয়মান হচ্ছে। আসলে সূর্য এক, অনন্য। তেমনি উপাধিভেদে আত্মাকে ভিন্ন-ভিন্ন আত্মা মনে হয়। আসলে আত্মা এক, দ্বিতীয়রহিত। আরো কিছু শেখবার আছে সূর্যের কাছে। সূর্য পৃথিবীর জল আকর্ষণ করে আবার পৃথিবীকেই প্রত্যর্পণ করে। তুমিও তেমনি বিষয় গ্রহণ করে যথাকালে অর্থীদের বিতরণ করো।

    নবম গুরু কপোত।

    কপোতের কাছ থেকে শিখবে অতিস্নেহ বা আসক্তিবর্জন। কি হয়েছিল শোনো। এক কপোত কপোতীর প্রণয়ে আবদ্ধ হয়ে বাসা বাঁধল বৃক্ষচূড়ে। স্বাধীন বিচরণের আনন্দ আর রইল না। কালক্রমে সন্তান হল কতগুলি। সংসারবাসের এই বা কম আনন্দ কি! এই সুখস্পর্শ মধুর কূজন, এই অঙ্গচেষ্টা। একদিন আহারের খোঁজে গিয়েছে দুজনে, শাবকগুলি মাটির উপর ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমন সময় এক দূরন্ত ব্যাধ এসে উপস্থিত। জাল ফেলে সহজেই ধরে ফেলল বাচ্চাগুলোকে। মা মায়ামুগ্ধা কপোতী এসে দেখে সর্বনাশ। রোদন করতে লাগল। কাঁদতে-কাঁদতে নিজেও সেই জালের মধ্যে আটকা পড়ল। কপোত এসে দেখল, স্ত্রী পুত্র কন্যা সবাই চলে যাচ্ছে তাকে ফেলে। এ সব স্নেহপুত্তলীদের ছেড়ে কি করে থাকব বৃক্ষনীড়ে, আর কেনই বা থাকব? এই বিবেচনা করে সে নিজের থেকেই ঢুকল গিয়ে জালের মধ্যে। ব্যাধ তো সিদ্ধকাম। এক জালে এতগুলো পাখি ধরতে পারবে এ তার কল্পনার অতীত ৷ অত্যাসক্তির জন্যেই কপোত-কপোতীর এই ছিন্নদশা। সুতরাং স্নেহপ্রসঙ্গে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ো না।

    তারপর, অজগর।

    অজগর কী করে? যথালব্ধ দ্রব্যদ্বারা শরীরমাত্র নির্বাহ করে। যদি কিছু নাও জোটে, নিশ্চেষ্ট হয়ে ধৈর্য ধরে পড়ে থাকে। তেমনি অজগরকে দেখে সর্বারম্ভপরিত্যাগী হও।

    তারপর চেয়ে দেখ সমুদ্রের দিকে।

    প্রসন্ন, গম্ভীর, দুর্বিগাহ্য ও দূরত্যয়। তেমনি হবে সমুদ্রের মত। আর কী? বর্ষায় জলাগমে স্ফীত হয় না, গ্রীষ্মে জলাভাবে শুষ্ক হয় না। তেমনি নিরভিমান তেমনি নিত্যসরস চিরপরিপূর্ণ থেকো।

    দ্বাদশ গুরু পতঙ্গ।

    কামমূঢ় হয়ো না। আগুনে মুগ্ধ হয়ে পুড়ে মরে পতঙ্গ তেমনি বস্ত্রাভরণসজ্জিত নারী দেখে উড়ে পড়ো না। বিরত থাকো। দৃঢ়ব্রত হও।

    ত্রয়োদশ, মধুকর।

    ছোট-বড় নামী-অনামী সকল ফল থেকেই ভ্রমর মধু আহরণ করে। তেমনি ছোট-বড় মানী-অমানী সকলের কাছ থেকেই সারসংগ্রহ করবে। আর কী শিখবে? শিখবে সঞ্চয়নিবৃত্তি। মৌমাছি যে মধু সঞ্চয় করে, অন্যে এসে কেড়ে ধরে নিয়ে যায়। তেমনি কৃপণের ধন যায় সেয়ানের পেটে।

    আরেক গুরু হাতি।

    করিণীর অঙ্গসঙ্গ লাভের জন্যে গর্তে পড়ে বাঁধা পড়ে। সূতরাং যে সন্ন্যাসী সে দারুময়ী যুবতিমূর্তিকেও ছোঁবে না পা দিয়ে।

    পরের গুরু হরিণ।

    হরিণ ধরা পড়ে ব্যাধের গীতে আকৃষ্ট হয়ে৷ ঋষ্যশৃঙ্গও নারীদের নৃত্যগীতে মুগ্ধ হয়ে আটকা পড়েছিল সংসারে। সুতরাং নৃত্যগীত সেবা করবে না।

    তারপরে মৎস্য।

    রসে জিতে সর্বং জিতং। রসনা জয় করতে পারলেই সর্বজয়ী হলে। আমিষযুক্ত বড়িশ দিয়েই মাছ ধরে। সুতরাং সর্ব অর্থে রসনাকে সংযত করো।

    আরেক গুরু পিঙ্গলা।

    বিদেহনগরের গণিকা এই পিঙ্গলা। একদিন বেশভূষা করে প্রণয়ীর আশায় অপেক্ষা করছে গৃহদ্বারে। এ এল না, ও নিশ্চয়ই আসবে এমনি ভাবছে পথচারীদের লক্ষ্য করে। একবার ঘরে ঢোকে, আবার দরজার বাইরে এসে দাঁড়ায়। আশা-নিরাশায় দুলছে এমনি সারাক্ষণ। প্রায় মধ্যরাতও বুঝি কেটে যায়। তখন মনে নির্বেদ এল পিঙ্গলার। ছি-ছি, নিজ দেহ বিক্রয় করে অন্য দেহ থেকে রতি আর বিত্ত আশা করছি। যিনি সর্বদা সমীপস্থ, যিনি রতিপ্রদ বিত্তপ্রদ তাঁকে ছেড়ে দিয়ে দুঃখভয়শোকমোহের আকর তুচ্ছ দেহকে ভজনা করছি। না, এ অপমান সহনাতীত। সর্বদেহীর যিনি সুহৃৎ, প্রিয়তম, নাথ আর আত্মা, তাঁর নিকট দেহ বিক্রয় করে লক্ষ্মীর মত তাঁর সঙ্গেই আমি রমণ করব। এখন যেহেতু কামনাভঙ্গজনিত, নৈরাশ্য আমার মনে এসেছে ভগবান বিষ্ণু নিশ্চয়ই আমার উপর সদয় হয়েছেন। অতএব বিষয়সঙ্গহেতু যে দুরাশা তা ত্যাগ করে ভগবানের শরণ নিলাম। শান্তি পেল পিঙ্গলা। শয্যায় গিয়ে সুখে ঘুমিয়ে পড়ল। আশাই দুঃখের কারণ, আশাত্যাগই পরম সুখ।

    অষ্টাদশ গুরু বালক৷ অজ্ঞ বালক৷

    মান নেই অপমান নেই চিন্তা নেই ভাবনা নেই লজ্জা ঘৃণা ভয় কিছু নেই। বালকের থেকে শেখ আত্মক্রীড়তা। আত্মক্রীড় হয়ে সংসারে অবস্থান করো।

    অন্য গুরু কুমারী।

    হাতে কয়েক গাছি কঙ্কণ, ঘরে বসে ধান কুটছে কুমারী। মৃদু-মূদু শব্দ হচ্ছে কঙ্কণের। বাইরে উৎকর্ণ পথিক দাঁড়িয়ে পড়েছে কঙ্কণের শব্দে। নিশ্চয়ই এ কোনো কুমারীর গৃহকাজ, তারই হাত দুটির নড়াচড়া। কঙ্কণনিক্কনে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করে ফেলেছে। তখন কী করে কুমারী! দুগাছি রেখে বাকি কঙ্কণ খুলে নিল হাত থেকে। সে কি, এখনো একটুএকটু শব্দ হচ্ছে যে। দেয়ালের বাইরে এখনো লোকে কান খাড়া করে আছে। তখন আরো একগাছি খুলে ফেলল। মোটে একগাছি রাখল তার মণিবন্ধে। আর শব্দ নেই। সেই এককঙ্কণন্যায় একাকী থাকো! কুমারীর থেকে শেখ সঙ্গরাহিত্য।

    পরের গুরু শরনির্মাতা।

    শরনির্মাতা যখন একমনে শর সরল করে তখন সমুখ দিয়ে ভেরীঘোষসহ রাজাও যদি চলে যায় টের পাবে না। তেমনি মনকে এক বস্তুতে, সার বস্তুতে যুক্ত করো।

    তারপর সৰ্প।

    পরকৃত গর্তে বাস করে সাপ। একা ঘুরে বেড়ায়। সাপের থেকে শেখ অনিকেতমতা।

    ঊর্ণনাভ আরেক গুরু।

    কী করে মাকড়সা? নিজের হৃদয় থেকে মুখ দিয়ে সুক্ষ্ণ তন্তুজাল বিস্তার করে। সেই জালের মধ্যেই বাস করে বিহার করে। আবার শেষকালে নিজেই গ্রাস করে সেই জাল। তবে এই শেখ মাকড়সা থেকে যে ঈশ্বরই সৃষ্টি করছেন স্থিতি করেছেন আবার সংহারও করছেন।

    আরেক গুরু কীট।

    এমন কীট আছে যে অন্য কীট কর্তৃক ধৃত হয়ে নীত হয় তার বিবরে। তখন ভয়ে-ভয়ে সে আততায়ী কীটের ধ্যান করতে-করতে তারই আকারপ্রাপ্ত হয়। তেমনি তন্ময় হয়ে ভগবানের ধ্যান করো। তাঁর সারুপ্যলাভ হয়ে যাবে।

    শেষ গুরু শ্রেষ্ঠ গুরু তোমার নিজের দেহ।

    নিজের দেহ? হ্যাঁ, এর সাহায্যেই সমস্ত তত্ত্ব নিরূপণ করছ। বড় বিচিত্রচরিত্র এই গুরু। একে একটু বেশি সেবা করলেই নিয়ে যায় অধঃপাতে। একে শুধু প্রাণমাত্রধারণের উপযোগী ভোগ দাও, তোমাকে জ্ঞানবৈরাগ্য দেবে। আর কী দেখছ? দেখছ পরিবার বিস্তার করছে দেহ, সে পরিবারপালনের জন্যে কত ক্লেশকষ্ট, শেষে বৃক্ষের মতো দেহান্তরের বীজ সৃষ্টি করে নিজেকে নাশ করছে।

    বহু সপত্নী যেমন গৃহপতিকে টানছে তেমনি মনকে টানছে নানা শক্তি, নানা ইন্দ্রিয়। সর্বপ্রকার আসক্তি ত্যাগ করে সমচিত্ত হও।

    শুধু একজনের কাছ থেকে নয়, বহুজনের কাছ থেকে, যার কাছ থেকে যেটকু পারো, জ্ঞানকণা কুড়িয়ে নাও।

    তদ্‌গতান্তরাত্মা হও।

    যাকে ঠাকুর বলেন, ‘ডাইলিউট হয়ে যাও।’

    নাটমন্দিরে একা-একা পাইচারি করছেন ঠাকুর। যেমন সিংহ অরণ্যে একা থাকতে ভালোবাসে তেমনি। নিঃসঙ্গানন্দ।

    শশধর পণ্ডিতকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘দেখলে, ডাইলিউট হয়ে গেছে। কেমন বিনয়ী। আর সব কথা লয়।’

    যে আসল পণ্ডিত সে সব কথাই নেবে। যখন যেটুকু পায়, যেখান থেকেই পাক। কোনো গোঁড়ামি নেই, বাঁধা-ধরা নেই, এই পাত্র ধরে আছি যেখান থেকে পারো দাও আমাকে স্নিগ্ধ হবার শান্ত হবার শরণাগত হবার মন্ত্র।

    কিন্তু যাই বলো, শুধু পাণ্ডিত্যে কী হবে? কিছু তপস্যার দরকার। কিছু সাধ্য-সাধনার।

    তবে জ্ঞান হলে কী হয়? ঠাকুর বললেন শশধরকে দেখে, ‘প্রথম চিহ্ন, শান্ত। দ্বিতীয় অভিমানশূন্য। দেখ না শশধরের দুই চিহ্নই আছে।’

    দেরি করে এসেছে বলে ঠাকুর রসিকতা করছেন, ‘আমরা সকলে বাসরশয্যা জেগে বসে আছি। বর কখন আসবে।’

    ঠাকুরকে প্রণাম করে বসল শশধর।

    জিজ্ঞেস করল, ‘আর কি লক্ষণ জ্ঞানীর?”

    ‘আরো লক্ষণ আছে।’ বলছেন ঠাকুর। ‘সাধুর কাছে ত্যাগী, কর্মস্থলে, যেমন লেকচার দেবার সময় সিংহতুল্য। আবার স্ত্রীর কাছে রসরাজ, রসিকশেখর। সবাই হেসে উঠল।

    শশধর জিজ্ঞেস করলে, ‘কিরূপ ভক্তিতে তাঁকে পাওয়া যায়?”

    ‘আমার বাপু জ্বলন্ত ভক্তি, জ্বলন্ত বিশ্বাস। ভক্তি তো তিনরকম। সাত্ত্বিক ভক্তি, সব সময়ে গোপনে রাখে নিজেকে। হয়তো মশারির মধ্যে বসে ধ্যান করে কেউ টেরও পায় না। আর রাজসিক ভক্তি-লোকে দেখুক, আমি ভক্ত। ষোড়শ উপচারে পূজা করে, গরদ পরে বসে গিয়ে ঠাকুর ঘরে, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, মালায় মুক্তো, মাঝে-মাঝে আবার একটি করে সোনার রুদ্রাক্ষ।’

    ‘আর তামসিক?’

    ‘যাকে বলে ডাকাতে ভক্তি, উৎপেতে ভক্তি।’ বলতে-বলতে ঠাকুরের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল: ‘ডাকাত ঢেঁকি নিয়ে ডাকাতি করে, আটটা দারোগায় ভয় নেই, মুখে কেবল মারো, কাটো, লোটো। উন্মত্ত হুঙ্কার, হর হর ব্যোম ব্যোম। মনে খুব জোর। খুব বিশ্বাস। একবার নাম করেছি, আমার আবার পাপ!

    এই তমোগুণেই ঈশ্বরলাভ। ঈশ্বরের কাছে জোর করো। রোক করো। তিনি তো পর নন, আপনার লোক, আমার সব কিছু। তাঁর কাছে আবার ঢাকব কি, লুকোবো কি! তিনিই তো আমাকে ভক্ত করে দীপ্ত করলেন। আমার লজ্জাহরণ করলেন। তাই নির্লজ্জের মত ধরব এবার আঁকড়ে। আর ছাড়ানছোড়ান নেই। দেখ আবার সেই তমোগুণেই পরের ভালোর জন্যে প্রয়োগ করা যায়। যে বৈদ্য শুধু রোগীর নাড়ী টিপে ‘ওষুধ খেয়ো হে,’ বলে চলে যায়, রুগী খেল কিনা খোঁজ নেয় না, সে অধম বৈদ্য। যে বৈদ্য রুগীকে ওষুধ খেতে বোঝায় অনেক করে, মিষ্টি কথায় বলে, ‘ওষুধ না খেলে কেমন করে ভালো হবে, লক্ষ্মীটি খাও, এই দেখ আমি ওষুধ মেড়ে দিচ্ছি, সে মধ্যম বৈদ্য। আর উত্তম বৈদ্য কে? রুগী কোনোমতেই খেল না দেখে সে বুকে হাঁটু দিয়ে বসে জোর করে ওষুধ খাইয়ে দেয়। কি, খাবে না কি, জোর করে জবরদস্তি করে খাইয়ে দেব। এটা হল বৈদ্যের তমোগুণ। এতে রুগীর মঙ্গল, বৈদ্যেরও সাফল্য।

    ‘তেমনি ভক্তির তমঃ। যেন ডাকাতপড়া ভাব। তাঁর নাম করেছি আমার আবার পাপ। আমি যেমনই ছেলে হই তুমি আমার আপন মা, তোমাকে দেখা দিতেই হবে।’ বলে প্রেমে উম্মত্ত হয়ে গান ধরলেন ঠাকুর:

    আমি দূর্গা দুর্গা বলে মা যদি মরি

    আখেরে এ দীনে না তারো কেমনে,

    জানা যাবে গো শঙ্করী।

    নাশি গোব্রাহ্মণ হত্যা করি ভ্রুণ

    সুরাপানাদি বিনাশি নারী

    এ সব পাতক না ভাবি তিলেক

    ওমা, ব্রহ্মপদ নিতে পারি।।

    ঠাকুর গাইছেন আর তাই শুনে কাঁদছে শশধর। পাণ্ডিত্যের তুষারপিণ্ড গলে গিয়েছে। ডাইলিউট হয়ে গিয়েছে।

    ৩১

    তবে এক গল্প শোনো:

    এক ব্রাহ্মণ অনেক যত্নে সুন্দর একটি বাগান করেছে। নানারকমের গাছ, ফুলে-ফলে ভরা। সেদিন হল কি, একটা কার গরু ঢুকে পড়েছে বাগানে। ঢুকে পড়েই, বলা-কওয়া নেই, খেতে শুরু করে দিয়েছে গাছ-গাছালি। দেখতে পেয়ে বামুন তো রেগে টং। হাতের কাছে ছিল এক আস্ত মস্ত লাঠি, তাই দিয়ে গরুর মাথায় মারলে এক ঘা। সেই ঘা এত প্রচণ্ড হল যে গরুটা মরে গেল তক্ষুনি। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল বামুন। গোহত্যা করে ফেললাম। হিন্দু হয়ে? এ পাপের কি আর চারা আছে? তখন তার মনে পড়ল বেদান্তে আছে, চোখের কর্তা সূর্য, কানের কর্তা পবন, হাতের কর্তা ইন্দ্ৰ। ঠিকই তো, বামুন লাফিয়ে উঠল, এ গোহত্যা তো আমি করিনি, ইন্দ্র করেছে। যেহেতু ইন্দ্রের শক্তিতে হাত চালিত হয়েছে এ গোহত্যার জন্যে দায়ী ইন্দ্র। মন খাঁটি করলে বামুন। ফলে গোহত্যার পাপ তার শরীরে ঢুকতে পেল না, মনের দরজায় ধাক্কা খেয়ে থমকে দাঁড়াল। মন বললে, এ পাপ আমার নয়, ইন্দ্রের। আমাকে কেন, তাকে গিয়ে ধরো। পাপ তখনি ছুটল ইন্দ্রকে ধরতে। ব্যাপার শুনে ইন্দ্র তো অবাক। বললে, রোসো, আগে বামুনের সঙ্গে দুটো কথা কয়ে আসি। মানুষের রূপ ধরে ইন্দ্র তখন এল সেই বাগানে। ফুল-ফল লতাপাতা দেখে মন খুলে খুব প্রশংসা করতে লাগল। বামুনকে শুনিয়ে-শুনিয়ে। মশাই, বলতে পারেন এ বাগানখানি কার? জিজ্ঞেস করল বামুনকে। আজ্ঞে, এটি আমার করা। এ সব গাছপালা আমি পুঁতেছি। আসুন না, ভালো করে দেখুন না ঘুরে-টুরে। ইন্দ্র ঢুকল বাগানের মধ্যে। যেন কতই সব দেখছে এমনি ভাব করতে-করতে অন্যমনস্কের মত সে জায়গাটায় এসে উপস্থিত হল যেখানে সদ্যমৃত গরুটা পড়ে আছে। রাম, রাম, এ কি, এখানে গোহত্যা করলে কে! বামুন মহা ফাঁপরে পড়ল। এতক্ষণ সব আমি করেছি, সব আমার করা, বলে খুব বরফট্টাই করছিল, এখন মাথা চুলকোতে লাগল। তখন ইন্দ্র নিজরূপ ধরলে। বললে, তবে রে ভণ্ড, বাগানের যা কিছু ভালো সব তুমি করেছ আর গো-হত্যাটিই কেবল আমি করেছি! বটে? নে তোর গোহত্যার পাপ। আর যায় কোথায়, পাপ এসে ঢুকে পড়ল ব্রাহ্মণের শরীরে। তাই বলি, যা করেন সব তিনি এই বলে নিজেকে ঠকিও না। নিজের বেলায় ভালোটি আর মন্দটি ভগবানের ঘাড়ে। ওটি চলবে না। ভালোমন্দ সব তাঁকে অর্পণ করে ভালোমন্দের ওপারে চলে যাও।

    জ্ঞেয় বস্তু কি?

    সুখদুঃখরহিত ঈশ্বরই জ্ঞেয়।

    সুখদুঃখরহিত কোনো বস্তু আছে, থাকতে পারে?

    পারে। শীত আর গ্রীষ্মের সন্ধিস্থলে কি আছে? এমন একটি অনির্বচনীয় অবস্থা, যা শীতলও নয় উষ্ণও নয়। যদি শৈত্যোষ্ণতাজ্ঞানহীন বস্তু থাকা সম্ভব, তাহলে সুখদুঃখবিহীন বস্তুর অস্তিত্বও মানতে হবে।

    অমৃত সরকার ডাক্তার মহেন্দ্র সরকারের ছেলে। সে অবতার মানে না।

    ‘তাতে দোষ কি?” ঠাকুর বললেন স্নেহহাস্যে। ঈশ্বরকে নিরাকার বলে বিশ্বাস থাকলেও তাঁকে পাওয়া যায়। আবার সাকার বলেও যদি বিশ্বাস করো, ঠকবে না। দুটি জিনিস শুধু দরকার, সে দুটি থাকলেই হল। সে দুটির একটি হচ্ছে বিশ্বাস, আর একটি শরণাগতি। ঈশ্বর মানুষ হয়ে এসেছেন এ বিশ্বাস কি করা সোজা? এক সের ঘটিতে কি চার সের দুধ ধরতে পারে? তাই কথা হচ্ছে যে পথে যাও যদি আন্তরিক হও ঠিক-ঠিক মিলে যাবে অমৃত। মিছরির রুটি সিধে করেই খাও আর আড় করেই খাও সমান মিষ্টি।’

    আবার, সাকারবাদীদের মতে একটি-দুটি দেবতা নয়, তেত্রিশ কোটি।

    হলই বা। কলকাতা শহরে হাজার-হাজার ডাকবাক্স। বড় পোস্টাপিসেই ফেল আর ছোট ঐ ডাকবাক্সেই ফেল, ঠিকানা যদি ঠিক-ঠিক লেখা থাকে, যথাস্থানে গিয়ে পৌঁছবে। একটি ডাক পাঠাও তাঁকে, তোমার পায়ে পড়ি। পাঠিয়ে একবারটি দেখ ঠিক পৌঁছয় কিনা।

    ‘তোমার ছেলে অমৃতটি বেশ।’ ডাক্তারকে বললেন ঠাকুর।

    ‘সে তো আপনার চেলা।’

    ‘আমার কোনো শালা চেলা নেই।’ ঠাকুর হাসলেন। ‘আমিই সকলের চেলা। সকলেই ঈশ্বরের ছেলে, ঈশ্বরের দাস। আমিও ঈশ্বরের ছেলে, ঈশ্বরের দাস। চাঁদা মামা সকলের মামা।’

    একটি যুবক ঠাকুরকে এসে জিজ্ঞেস করলে, “মশায়, কাম কি করে যায়? এত চেষ্টা করি তবু মাঝে-মাঝে মনে কুচিন্তা এসে পড়ে।

    ‘আসুক না।’ ঠাকুর নিশ্চিতের মত বললেন। ‘কেন এল তাই বসে-বসে ভাবতে যাওয়া কেন? শরীরের ধর্মে আসে, আসবে। তাই বলে মাথা ঘামাবিনে। মাথা না ঘামালেই মাথা তুলতে পারবে না কাম। তা ছাড়া তোকে বলে দি, কলিতে মনের পাপ পাপ নয়।’

    ‘কিন্তু মনের ও ভাবটা যাবে কি করে?’

    ‘হরিনামে। হরিনামের বন্যায় ভেসে যাবে সব আবর্জনা।’

    যোগীনেরও সেই জিজ্ঞাসা। কাম যায় কিসে? শুধু হরিনামে যাবে এ সে মানতে রাজী নয়। কত লোকই তো হরি-হরি করছে, কারুরই তো যাওয়ার নমুনা দেখছি না। পঞ্চবটীতে এক হঠযোগী এসেছে, তার সঙ্গ করল। যদি কিছু আসন-প্রাণায়ামের ক্রিয়া-প্রক্রিয়া দিয়ে দমন করা যায় শত্রুকে। ঠাকুর তাকে ধরে ফেললেন। হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে চললেন নিজের ঘরের দিকে। ‘তুমি আমার দিকে না গিয়ে এদিকে এসেছ, তাই না? তোকে, শোন, বলি, ওদিকে যাসনি। ও সব হঠযোগ শিখলে ও করলে মন শরীরের উপরই পড়ে থাকবে সর্বক্ষণ, যাবে না ঈশ্বরের দিকে। আমি তোকে যা বলেছি সেই পথই ঠিক পথ। হরিনামের পথ। হরিনামের শব্দেই উড়ে যাবে পাপ-পাখি।’

    নিজেকেই তবু বেশি বুদ্ধিমান বলে যোগীনের ধারণা। ভাবলে এসব ঠাকুরের অভিমানের কথা। পাছে তাঁকে ছেড়ে আর কারু কাছে যাই সেই ভয়েই অমনি একটা ফাঁকা উপদেশ দিয়েছেন। শেষকালে মনে কি ভাব এল, ঠাকুরের কথামতই দেখি না করে। লেগে গেল হরিনামের মহোৎসবে। ঠাকুরের কী অশেষ কৃপা, কয়েকদিনের মধ্যে ফল পেল প্রত্যক্ষ।

    কিন্তু কামক্রোধ ঈশ্বর দিয়েছেন কিসের জন্যে?

    ‘মহৎ লোক তৈরি করবেন বলে।’ বললেন ঠাকুর। ‘মন্দ না থাকলে ভালোর মাহাত্ম্য কি! অন্ধকার না থাকলে আলোর দাম কে দেয়! সীতা বললেন, রাম, অযোধ্যায় সব যদি সুন্দর অট্টালিকা হত তো বেশ হত। অনেক বাড়ি দেখছি ভাঙা আর পুরোনো। রাম বললেন, সব বাড়িই যদি সুন্দর হয়, নিখুঁত হয়, তো মিস্ত্রিরা করবে কি।’ থাক মন্দ, থাক পাপ, থাক কামক্রোধ। শুধু সংযম করো, সাবধান হও। কত রোগের থেকে সাবধান হচ্ছ, সম্ভোগের জন্যেই কত অভ্যাস করছ সংযম। এও তেমনি। আর ঈশ্বরের চেয়ে বড় সম্ভোগ আর কি আছে!

    ‘দেখ না এই হনুমানের দিকে চেয়ে। ক্রোধ করে লঙ্কা পোড়ালো, শেষে মনে পড়ল, এই রে, অশোকবনে যে সীতা আছেন। তখন ছটফট করতে লাগল।’

    তাই তো বলি রাশ টানো।

    মদনকে দগ্ধ করলে শিব। মুগ্ধ করলে কৃষ্ণ। শিব মদনদহন। আর কৃষ্ণ মদনমোহন! দাক্ষিণাত্য বেড়াবার সময় রামচন্দ্র ঠিক করলেন চাতুর্মাস্য করবেন। চাতুর্মাস্য কাটাবার জন্যে একটি পাহাড় মনোনীত করলেন। গিয়ে দেখলেন সেখানে একটি শিবমন্দির। রাম লক্ষ্মণকে বললেন, মন্দিরে যাও। শিবের অনুমতি নিয়ে এস। মন্দিরে গিয়ে শিবকে লক্ষণ জানাল তাদের প্রার্থনা। শিব কিছুই বললেন না, শুধু অন্যমূর্তি ধারণ করলেন। অন্যমূর্তি মানে অদ্ভুত এক নৃত্যমূর্তি। নিজ লিঙ্গ নিজের মুখে পুরে নৃত্য করছেন। লক্ষ্মণ ফিরে এল রামের কাছে। তাঁকে বললে সব আগাগোড়া। শুনে রাম উৎফুল্ল হলেন। লক্ষ্মণ বললে, বুঝলাম না কিছু। রাম বললেন, শিব অনুমতি দিয়েছেন। তিনি ঐ মূর্তির মাধ্যমে বলছেন, লিঙ্গ আর জিহ্বা সংযম করে যেখানে খুশি সেখানে থাকো। রসনা আর বাসনাকে যদি একসঙ্গে বন্দী করতে পারো তা হলেই অভয়লাভ।

    চৈত্রমাসের প্রচণ্ড রোদে ঠাকুর এসেছেন বলরাম-মন্দিরে।

    বললেন, ‘বলেছি তিনটের সময় যাব, তাই আসছি। কিন্তু বড় ধূপ।’

    ভক্তেরা হাওয়া করতে লাগল ঠাকুরকে। সেবা করবে না সুধাদ্রব মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবে বুঝতে পারছে না। পাখার ছন্দ ভুল হয়ে যাচ্ছে।

    ‘ছোট-নরেন আর বাবুরামের জন্যে এলাম।’ মাস্টারের দিকে তাকালেন ঠাকুর:

    ‘পূর্ণকে কেন আনলে না?’

    ‘সভায় আসতে ভয় পায়।’ বললে মাস্টার।

    ‘ভয়?’

    হ্যাঁ, পাছে আপনি পাঁচজনের সামনে সুখ্যাত করে বসেন, সব লোকজানাজানি হয়—’

    ‘বা, এ তো বেশ কথা। ঠাকুর বললেন অন্যমনস্কের মত: কে জানে কখন কি বলে ফেলি। যদি বলে ফেলি তো আর বলব না। আচ্ছা, পূর্ণের অবস্থা কি রকম দেখছ? ভাব-টাব হয়?’

    ‘কই বাইরে তো কিছু, দেখতে পাই না।’

    ‘কি করে পাবে? তার আকর আলাদা। বাইরে তো তার ফুটবে না ভাব।’

    ‘হ্যাঁ, আমিও তাকে সেদিন বলছিলাম আপনার সেই কথাটা।’ মাস্টার বললে প্রফুল্ল মুখে।

    ‘কোন কথাটা?’

    ‘সেই যে বলেছিলেন, সায়র দীঘিতে হাতি নামলে টের পাওয়া যায় না, কিন্তু ডোবায় নামলে তোলপাড় হয়ে যায়।’

    ‘শুধু তাই নয়, পাড়ের উপর জল উপচে পড়ে।’ ঠাকুর জুড়ে দিলেন আরেকটু ‘কিন্তু তা ছাড়া, দেখেছ? ছেলেটার আর সব লক্ষণ ভালো।’

    ‘হ্যাঁ,’ মাস্টার সায় দিল: ‘চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। যেন ঠেলে বেরিয়ে আসছে সমুখে।’

    ‘চোখ শুধু উজ্জ্বল হলেই হয় না। এ অন্য জাতের চোখ। আচ্ছা, ঠাকুর আরেকটু অন্তরঙ্গ হলেন: ‘তোমায় কিছু বলেছে?’

    ‘কি বিষয়?’

    ‘এই এখানকার সঙ্গে দেখা হবার পর কিছু হয়েছে তার?”

    ‘হ্যাঁ, বলেছে, ঈশ্বরচিন্তা করতে গেলে, আপনার নাম করতে গেলে, চোখ দিয়ে জল পড়ে, গায়ে রোমাঞ্চ হয়।’

    ‘বা, তবে আর কি।’ যেন মুক্ত হাওয়ার শান্তি পেলেন ঠাকুর।

    কতক্ষণ পরে মাস্টার আবার বললে, ‘সে হয়তো দাঁড়িয়ে আছে—’

    ‘কে? কে দাঁড়িয়ে আছে?’ চমকে উঠলেন ঠাকুর।

    ‘পূর্ণ’ ‘

    ‘কোথায়?’

    দরজার দিকে উৎসুক হয়ে তাকালেন ঠাকুর। উঠি-উঠি করতে লাগলেন।

    ‘এখানে নয়, হয়তো তার বাড়ির দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে।’ বললে মাস্টার।

    ‘আমাদের কাউকে যদি যেতে দেখে রাস্তা দিয়ে অমনি ছুটে আসবে, প্রণাম করে পালাবে।’

    ‘আহা, আহা—’ ভাবে তন্ময় হলেন ঠাকুর। ‘ও একটা বিরাট আধার। তা না হলে ওর জন্যে জপ করিয়ে নিলে গা?’

    সবাই কৌতূহলী হয়ে তাকাল। ঠাকুর বললেন, ‘হ্যাঁ গো, পূর্ণের জন্যে বীজমন্ত্র জপ করেছি।

    বিরাট আধার, কিন্তু পূর্ণের বয়েস মোটে তেরো। বিদ্যাসাগর-ইস্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। ঠাকুরের কাছে যে আসে এবাড়ির লোক পছন্দ করে না একদম। তাই লুকিয়ে লুকিয়ে আসে এক-আধটু, মাস্টারমশায়ের ছায়ায় ছায়ায়। সবাই সন্ত্রস্ত, কে কখন টের পায়। সকলের চেয়ে ভয় বেশি মাস্টারমশায়ের, কেননা বাড়ির লোক জানতে পেলে তাকেই দায়ী করবে সর্বাগ্রে। পূর্ণের আসা কোনো ভক্তের আসা নয় এমনি কোনো এক পথভোলা পথের ছেলের ঢুকে পড়া। সব সময়ে আড়াল করে রাখবার চেষ্টা।

    এতই যখন ভয় তখন ও-ছেলেকে পথ দেখানোর কি দরকার!

    আমি পথ দেখাব? ও নিজেই পথের ঠিকানা নিয়ে এসেছে। কে ওকে বলেছে ঠিকানা কে বলবে!

    কানের কাছে মুখ এনে ঠাকুরও বলছেন চুপি-চুপি, ‘সে সব করো? যা সেদিন বলে দিয়েছিলাম-

    পূর্ণ ঘাড় নাড়ল। হ্যাঁ, করি।

    “স্বপনে কিছু দেখ? আগুন, মশালের আলো, সধবা মেয়ে, শ্মশানমশান? এ সব দেখা বড় ভালো। দেখ?

    পূর্ণ হাসল এক মুখে। বললে, ‘আপনাকে দেখি।

    ‘তা হলেই হল।’

    দেখারও দরকার নেই। শুধু টানটুকু থাকলেই হল। তুমি তো আয়-আয় করছই, আমিই শুধু যাই-যাই করছি না। তুমি যদি কারণরূপে আছ, এবার তারণরূপে এস। তোমার রূপ সর্বপ্রত্যকভূত হোক। তোমার চরণতরী আশ্রয় করতে দাও। তোমার চরণতরী আশ্রয় করে ভবান্ধিকে যেন গোষ্পদ জ্ঞান করতে পারি।

    ‘তোমার উন্নতি হবে।’ পূর্ণকে বললেন শেষ কথা: ‘আমার উপর তোমার টান তো আছে।

    কাছি দিয়ে নৌকো বাঁধা আছে ঘাটে। তুমি জোয়ারের জল হয়ে সেই কাছিতে টান দাও। আমি যেন তোমার দিকে মুখ ফেরাতে পারি। আমার হাল না থাক পাল না থাক, তবু তুমি আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলো। তুমি হও আমার স্রোতের টান। সব ভাসানো সব-ডুবানোর টান।

    ঠাকুরের তখন অসুখ। পূর্ণ চিঠি লিখেছে ঠাকুরকে। কি লিখেছে পড়ো তো!

    ‘আমার খুব আনন্দ হয়।’ কে একজন পড়ে শোনাল পূর্ণের চিঠি: ‘এত আনন্দ যে মাঝে-মাঝে রাত্রে ঘুম হয় না।’

    ‘আমার গায়ে রোমাঞ্চ হচ্ছে।’ অসুখের কষ্টকে নিমেষে উড়িয়ে দিলেন: ‘আহা, দেখি দেখি চিঠিখানা।’

    চিঠিখানি নিলেন হাতে করে। মুড়ে টিপে দেখতে লাগলেন। বললেন, ‘অন্যের চিঠি ছুঁতে পারি না। কিন্তু এর চিঠি বেশ ভালো চিঠি। ধরতে পারি হাতের মধ্যে। ধরতে পারি বুকের উপর।’

    তোমার এই আকাশব্যাপিনী জ্যোতির্ময়ী নক্ষত্রলিপিটি কবে ধরতে পারব হাতের মুঠোয়। কবে বা ধরতে পারব বুকের উপর!

    ৩২

    ‘ভক্ত্যা সর্বং ভবিষ্যতি।’ ভক্তি দ্বারাই সব কিছু হবে। ভাগবতী প্রীতিই ভক্তি। ভক্তি শ্রীপাদপদ্মবিষয়িনী।

    স্ফটিকমণির ঘরে যে প্রদীপ জ্বলে তার প্রকাশ তীব্র। সেই প্রদীপই যদি জ্বলে আবার পদ্মরাগমণির ঘরে তার প্রকাশ মধুর। তেমনি একই নিখিলপ্রদীপে ভগবানের দুরকম প্রকাশ–তীব্র আর মধুর। তীব্র প্রকাশের নাম ঐশ্বর্য, মধুর প্রকাশের নাম মাধুর্য।

    আমার এমন কোনো সাধ্য নেই, নেই আমার আধারে এত আয়তন যে তোমার ঐশ্বর্যকে প্রকাশ করি। কিন্তু ভালোবাসতে কে না পারে বলো? বনের পশুপাখিও পারে।

    তেমনি যদি একবার ভালোবাসতে পারি তোমাকে, দেখাতে পারি মধুর হওয়া কাকে বলে। তুমি তো মধুলব্ধ মধুসূদন। তাই আমার মধুর হওয়ার কারণই হচ্ছে তুমি আছ। ভক্তই ভগবদস্তিত্বের প্রমাণ। তেমনি আমিও যেন তোমার পরিচয়টি বহন করি। পাত্র না পেলে তুমি তোমার কৃপা ঢালবে কি করে? আমাকে সে শূন্য শান্ত পাত্রটি হতে দাও।

    অমলা ভক্তি। নিশ্চলা ভক্তি। বিশুদ্ধা ভক্তি। বিমুক্তা ভক্তি।

    স্বীয় প্রিয়ের নামকীর্তন করবে, লজ্জা কি। কণ্ঠস্বরটি গাঢ় করো, তীক্ষ্ণ করো। কখনো উচ্চহাস্য, কখনো রোদন কখনো আর্তনাদ কখনো গান কখনো উন্মাদনৃত্য। জড় জীব জ্যোতিষ্ক—যা কিছু আছে

    স্থুলে অস্থুলে, সমস্তই হরির শরীর বলে জেনো। অনন্যমনে প্রণাম কোরো। যে ভোজন করে তার একসঙ্গেই তুষ্টি পুষ্টি ও ক্ষুন্নিবৃত্তি হয়। তেমনি যে হরিকে ভালোবাসে বা ভজনা করে সে একসঙ্গেই ভক্তি, ঈশ্বরানুভূতি ও বৈরাগ্য লাভ করে।

    বৈদ্যের মতো ভক্তও তিনরকম। যে সর্বভূতে সমদৃষ্টি, অর্থাৎ যে সর্বভূতে ঈশ্বরকে দেখে সে উত্তম ভক্ত। যার ঈশ্বরে প্রেম, জীবে মৈত্রী, অজ্ঞে কৃপা, বিরোধীর প্রতি উপেক্ষা সে মধ্যম ভক্ত। আর, অধম বা প্রাকৃত ভক্ত কে? যে শুধু বিগ্রহে-প্রতিমায় হরির পূজা করে, হরিভক্ত বা আর কাউকে নয়, সে অধম বা প্রাকৃত ভক্ত।

    সন্দেহ কি, উত্তম ভক্তই ভাগবতপ্রধান। বাসনা নয়, বাসুদেবই তার একমাত্র আশ্রয়। অবশে অভিহিত হলেও যে হরিনাম পাপহরণ করে, সেই হরির পাদপদ্ম সে প্রেমরজ্জু দিয়ে বেঁধে রেখেছে হৃদয়ের মধ্যে। সাধ্য নেই হরি ত্যাগ করে সেই সুধানিবাস।

    ‘কলিতে নারদীয় ভক্তি।’ বললেন ঠাকুর।

    নারদ মানে কি? যে নার অর্থাৎ জল দেয়। জল মানে কি? জল মানে পরমার্থ বিষয়ক জ্ঞান।

    নারদ কী করে?

    শ্বাসে-গ্রাসে হরিনাম করে।

    বীণাহস্তে সুখাসীন, নারদ একদিন জিজ্ঞেস করলে ব্যাসকে, তোমাকে ক্ষুব্ধ দেখছি কেন? এমন মহাভারত রচনা করেছ, ব্রহ্মসূত্র রচনা করেছ, তোমার আর কী চাই?

    এত বই লিখেও তৃপ্তি হল না। ব্যাস দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কেন আমার এই অতৃপ্তি আপনিই বলুন বিচার করে।

    আমি জানি। বললে নারদ, তুমি ভগবানের অমল চরিতকথা বলোনি বিশদ করে। ব্রহ্মজ্ঞান হরিভক্তিপূর্ণ না হলে প্রীতিপদ হয় না।

    ভক্তিতেই তৃপ্তি। ভালোবাসাতেই গৌরব। অশ্রুতেই আনন্দ।

    সুতরাং ঈশ্বরের লীলাকথা বর্ণনা করো। রসের আকার হচ্ছে রাস। বর্ণনা করো সেই রাসলীলা।

    ব্যাস রচনা করল ভাগবত। পরমবেদ্যকে শুধু জানা নয়, তাকে ভালোবাসতে জানাই আসল বিদ্যা। ‘বিদ্যা ভাগবতাবধি।’

    “হাবাতে কাঠ নিজে একরকম করে ভেসে যায়। কিন্তু একটা পাখি এসে বসলেই ডুবে গেল।’ বলছেন ঠাকুর। ‘কিন্তু নারদাদি বাহাদুরী কাঠ। নিজে তো ভাসেই, আবার কত মানুষ গরু, হাতি পর্যন্ত নিয়ে যায় সঙ্গে করে। যেমন স্টিম-বোট। আপনিও পারে যায়, আবার কত লোককে পার করে।

    ঠাকুরের কাশি হয়েছে।

    মহেন্দ্র ডাক্তার বললে, ‘আবার কাশি হয়েছে? তা কাশিতে যাওয়া তো ভালো।” হাসল ডাক্তার।

    ঠাকুর হাসলেন। বললেন, ‘তাতে তো মুক্তি গো। আমি মুক্তি চাই না ভক্তি চাই।’ মুক্তি হলে তো সব ফুরিয়ে গেল। সব শূন্যাকার। আমার স্পৃহা আস্বাদনে। ভাবগ্রহণে। ভাবের কি শেষ আছে? ভালোবাসার কি অন্ত হয়? তবে আমিই বা কেন অন্ত হব?

    আমি অব্যর্থকালত্ব চাই। হে ঈশ্বর, তোমাকে ছেড়ে যেটুকু সময় যায় সেটুকুই ব্যর্থ। এমন করো যেন সব সময়েই তোমাতে লেগে থাকি, মগ্ন থাকি, এতটুকু ক্ষণকণা যেন বিফল না হয়। আর দাও তোমার বসতিপ্রীতি। তোমার যেখানে বসতি সেখানেই আমার অনুরাগ। তোমার বাস তো শুধু তীর্থে নয়, অখিলসংসারে। অনুতে রেনুতে। তোমার সর্বব্যাপিত্ববোধে আমার সমস্ত স্থান তীর্থান্বিত করো। বিশ্বময় প্রীতিতে বিস্তৃত হই। স্থানে আর সময়ে এক তিল পরিমাণ তোমার বিরহব্যবধান না থাকে।

    ‘লাখজন্ম হলেই বা ভয় কি।’ বললে নরেন, ‘বারে বারে আসব, ছুঁয়ে যাব ঝরা-মরাকে, ধুয়ে যাব কটি ধূলিকণা, তুলে দিয়ে যাব কটি কাঁটার ক্লেশকষ্ট।’

    আমি বৃষ্টিবিন্দু হতে চাই। বললে বিবেকানন্দ। আকাশবাসী একটি ছোট্ট বারিকণা। কিন্তু আকাশেই থাকব না। ঝরে পড়ব।

    ঝরে পড়ব কোথায়? জিজ্ঞেস করলে স্বামীজী।

    শিকাগোতে স্বামীজীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে সেই ফরাসিনী গায়িকা। মাদাম কালভে। তাকেই এই প্রশ্ন।

    নীরবে গাঢ়নম্র চোখে চেয়ে আছে মাদাম।

    ঝরে পড়ব, কিন্তু সমুদ্রে নয়। সমুদ্রে পড়ে মিশে যাব সেই সমুদ্রের সঙ্গে এই কল্পনা আমার কাছে অসহ্য লাগে। কিছুতেই না, উদ্দীপ্তকণ্ঠে বলতে লাগল বিবেকানন্দ, আমি মোক্ষ চাই না, নির্বাণ চাই না, বিলুপ্তি চাই না। বারে বারে আমি আমার এই ব্যক্তিত্বের চেতনা নিয়ে বাঁচতে চাই। আমি চাই লক্ষ-লক্ষ পুনর্জন্ম ঠাকুরের অভ্রান্ত প্রতিধ্বনি।

    জানো না বুঝি? একদিন এক সমুদ্রে ছোট্ট একটি বৃষ্টিবিন্দু ঝরে পড়ল। মাদাম কালভের দিকে চেয়ে বলল আবার স্বামীজী। সমুদ্রে পড়েই কাঁদতে লাগল বৃষ্টিবিন্দু।

    কাঁদতে লাগল? কেন? তন্ময়ের মতো জিজ্ঞেস করলে মাদাম।

    ভয়ে। দুঃখে। মিশে যাবে মিলিয়ে যাবে এই বেদনায়। সমুদ্র বললে, ভয় কি, দুঃখ কি, কত শত বৃষ্টিবিন্দু, কত শত তোমার ভাইবোন এমনি করে পড়েছে আমার মধ্যে। জল হয়ে মিশে গিয়েছে জলাশয়ে। তোমাদের এই বিন্দু-বিন্দু জলবিম্ব দিয়েই তো আমি তৈরি। বিন্দু ছাড়া কি সিন্ধু আছে?

    তবু কাঁদতে লাগল বৃষ্টিবিন্দু। আমি লুপ্ত হতে চাই না, আমি লিপ্ত হতে চাই। সমুদ্র বললে, বেশ, তবে সূর্যকে বলো তোমাকে মেঘলোকে নিয়ে যাক। আকাশ থেকে ঝরে পড়ো আরেকবার।

    খুশির রঙে টলমল করে উঠল সেই বৃষ্টিবিন্দু। চলে গেল মেঘলোকে। আবার ঝরে পড়ল। এবার জলে পড়ল না, মাটিতে পড়ল। তৃষ্ণার্ত, মলিন মাটিতে। মুছে দিল এক কণা ধূলি। মুছে দিল এক কণা পিপাসা।

    মাদাম কালভের দুই চোখে মন্ত্রের সম্মোহন। মন্ত্রের সঞ্জীবনী।

    হ্যাঁ, বারে বারে জন্মাব। শঙ্খনাদ উদার কন্ঠে বললে বিবেকানন্দ, যতবার যেটুকু পারি কাঁটা তুলে দিয়ে যাব পৃথিবীর। যেটুকু পারি দেয়াল ভেঙে ফেলব ব্যবধানের। যেটুকু পারি পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে যাব সর্বসমুখদাতা ঈশ্বরের দিকে। আমি চাই না আমার এই ব্যক্তিত্বের বিনাশ, এই আত্মচেতনার বিলুপ্তি। আমিই সেই মহান অজানা। সেই অখিল-অলৌকিক। বারে বারে এই লোকসংসারে ফিরে-ফিরে এসে জানাব নিজেকে, এক অধ্যায় থেকে আরেক অধ্যায়ে, বৃহত্তর অধ্যায়ে দুই চোখ জ্বলে উঠল স্বামীজীর।

    ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন, ‘হ্যাঁ রে নরেন, আর পড়বি না?’

    নরেন বললে, ‘একটা ওষুধ পেলে বাঁচি, যাতে পড়াটড়া যা হয়েছে সব ভুলে যাই। শুধু পাণ্ডিত্যে কী হবে? আর কতই বা পড়বে জিজ্ঞেস করি? হাটের বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে একটা হো-হো শব্দ শোনা যায়, হাটের মধ্যে ঢুকলে তখন অন্যরকম। তখন সব দেখছ-শুনেছ কোথায় কি বেপারবেসাতি, কোথায় কি দরদাম! সমুদ্রও দূর থেকে হো-হো শব্দ করছে। কী হবে শুধু শব্দ শুনে? কাছে এগোও, দেখবে কত জাহাজ কত পাখি কত ঢেউ। তারপরে স্নান করে তার স্বাদ নাও। সার কথা, হাটের মধ্যে প্রবেশ করা, অবগাহন করা সমুদ্রে।

    গুরুর জন্যে শাস্ত্রপাঠ? পথনির্দেশের জন্যে? গুরু না থাকে, না জোটে, শুধু ব্যাকুল হয়ে কাঁদো, কেঁদে কেঁদে প্রার্থনা করো। তিনিই দেবেন সব বলে-কয়ে, জানিয়ে বুঝিয়ে।

    সমুৎকণ্ঠায় কণ্টকিত হও। আসন জমিয়ে বসলাম তোমার এই দুয়ারে। প্রস্তুত হয়ে এসেছি, মরবার জন্যে প্রস্তুত। যাকে ইচ্ছে সরিয়ে দাও তুলে নাও, আমাকে পারবে না হটাতে। কিছু একটা করে তবে উঠব। হয় ধরে নয় মরে। হয় তোমার ঘরে মিলন নয় তোমার দুয়ারে মৃত্যু। ঘর-দুয়ার এক করে ছাড়ব।

    ‘নরেন বেশি আসে না।’ ঠাকুর আক্ষেপ করছেন। নিজেই আবার প্রবোধ দিচ্ছেন নিজেকে। ‘তা ভালোই করে। ও বেশি এলে আমি বিহ্বল হই।’

    কাউকে কেয়ার করে না নরেন। এইটেই যেন কত বড় তার গুণের কথা। ‘বলব কি, আমাকেই কেয়ার করে না।’ স্নেহদ্রবস্বরে বলছেন ঠাকুর, ‘সেদিন কাপ্তেনের গাড়িতে যাচ্ছিল আমার সঙ্গে। ভালো জায়গায় তাকে কত বসতে বলল কাপ্তেন। তা সে চেয়েও দেখল না। সেদিন হাজরার সঙ্গে কত কি কথা কইছে। জিজ্ঞেস করলাম, কি গো, কি সব কথা হচ্ছে তোমাদের? উড়িয়ে দিল আমাকে, বললে, লম্বা-লম্বা কথা। দেখেছ তো কত বিদ্বান আমার নরেন, তবু আমার কাছে কিছু প্রকাশ করে না, পাছে লোকের কাছে বলে বেড়াই। মায়ামোহ নেই, বন্ধনপীড়ন নেই, একেবারে খাপখোলা তরোয়াল।

    প্রথমে ধুমায়িত পরে জ্বলিত, পরে দীপ্ত, পরে উদ্দীপ্ত এই অগ্নি। সন্ধ্যের পর ঠাকুরের কলকাতা যাবার কথা। পাইচারি করছেন এদিক-ওদিক আর মাস্টারের সঙ্গে পরামর্শ করছেন, ‘তাই তো হে কার গাড়িতে যাই—’

    এমন সময় নরেন এসে উপস্থিত। এসেই ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করল ঠাকুরকে।

    ‘এসেছ? তুমি এসেছ?’ যেন গুমোট করে ছিল চারদিক এক ঝলক বসন্তবাতাস ছুটে এল। যেমন কচি ছেলেকে আদর করে তেমনি ভাবে নরেনের মুখে হাত দিয়ে আদর করতে লাগলেন। ভাবখানা এই, আমাকে ছেড়ে কোথায় যাবি? কতদিন থাকবি তোর ও-সব জ্ঞানতর্কের পাথরের দেশে? আমি তোকে গলিয়ে দেব, ছুঁয়ে-ছুঁয়ে, আদর করে-করে, তোর চোখের সঙ্গে চোখ মিলিয়ে। জ্ঞান-তর্কে পারব না তোর সঙ্গে, কিন্তু তোকে ভালোবাসায় জিতে নেব। আমি যদি তোকে ভালোবাসি তবে সাধ্য কি তুই আমাকে ফেলে যাস, আমাকে ছেড়ে থাকিস?

    মাস্টারের দিকে তাকালেন ঠাকুর। হাসিহাসি মুখে বললেন, ‘কি হে, আর যাওয়া যায়?”

    আনন্দভরা চোখে মাস্টারও হাসতে লাগল।

    ‘জানো, লোক দিয়ে নরেন্দ্রকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম। ও এসেছে। বলো, আর কি যাওয়া যায়?’

    ‘যে আজ্ঞে। আজ তবে থাক।’

    ঠাকুরও যেন পরম স্বস্তি পেলেন। বললেন, ‘হ্যাঁ, কাল যাব। গাড়ি না হয় নৌকোয় যাব। কি বলো? আজ নরেন এসেছে। লোক পাঠিয়েছিলুমই বা। ওর কী দায় ছিল আসতে? তবু ও এসেছে। আজ আর যাওয়া যায না।’ আর সব ভক্তবৃন্দ যারা সমবেত হয়েছিল তাদের উদ্দেশ করে বললেন, ‘তোমরা আজ এস। অনেক রাত হল।

    একে-একে প্রণাম করে বিদায় হল ভক্তেরা। নরেনের বেলায় না-রাত না-দিন।

    হরি বিনে কৈসে গোঙায়বি দিনরাতিয়া। শুধু একবেলার ক্ষণিক মিলন নয়, চাই চিরজীবনধনের সঙ্গে চিরজীবনক্ষণের মিলন।

    আমি একতাল সোনা আমাকে তুমি আগুনে পুড়িয়ে গলিয়ে নাও। কি, বিশ্বাস হয় না? জ্বালো তোমার আগুন, আজই হাতে-হাতে নাও পরখ করে। তোমার যেমন খুশি সকল নাচে নাচিয়ে নাও আমাকে, বাজিয়ে নাও সকল রাগিণীতে। সব ছেঁকে নাও, বেছে নাও, পিষে নাও। তোমার যা পছন্দ তাতেই আমি রাজী। তুমি যাতে নিশ্চিত তাতেই আমি নিশ্চিন্ত। তাই যদি হয় তবে আমার সুখও বাহবা দুঃখও বাহবা।

    রাম দত্তর সঙ্গে তর্ক করছে নরেন। তুমুল তর্ক।

    মাস্টার এক পাশে বসে। ঠাকুরও দেখছেন চুপ করে। শেষকালে বললেন মাস্টারকে লক্ষ্য করে, ‘আমার এসব বিচার ভালো লাগে না।’ ধমক দিলেন রামকে। ‘থামো।’ না থামো তো, আস্তে-আস্তে। কে কার কথা শোনে। রাম থামলেও নরেন থামবে না। কিন্তু তাকে কে ধমক দেবে?

    অসহায়ের মত তাকালেন আবার মাস্টারের দিকে। বললেন, ‘আমি এসব বাকবিতণ্ডা জানিও না, বুঝিও না। আমি অবোধ ছেলের মত শুধু কাঁদতুম আর বলতুম, মা, এ বলছে এই, ও বলছে ঐ। কোনটা সত্য তুই আমাকে বুঝিয়ে দে।’

    এই আত্মনিবেদন। এই ভক্তি পরমপ্রেমরূপা। ভালোবাসার করস্পর্শে লৌহদুর্গের দ্বার খোলা।

    কিছু জানি না কিছু বুঝি না। তবু তোমাকে ভালোবাসি।

    ৩৩

    যদি আর কিছু না পারো সারা দিনমানে একবার, শুধু একবার আমাকে মনে কোরো।

    নবগোপাল ঘোষ প্রথম দিন তো একেবারে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে এসেছিল। তারপর সেই যে ডুব মারল, তিন-তিন বছর আর দেখা নেই।

    ‘হ্যাঁ রে, কি হল বল দেখি নবগোপালের? তাকে একটা খবর দে।’ তিন-তিন বছর পর একদিন খোঁজ করলেন ঠাকুর।

    খবর গেল নবগোপালের কাছে। সে তো প্রায় আকাশ থেকে পড়ল। সেই কবে একবার গিয়েছিলাম তিন বছর আগে, সেই কথা আজও পর্যন্ত মনে করে রেখেছেন! ভুলে যাননি। দিনে-রাত্রে কত লোক আসছে তাঁর কাছে, তার মধ্যে কে-না-কে নবগোপাল ঘোষ, তাকেও হারিয়ে যেতে দেননি। স্মৃতির কৌটোর এক পাশে কুড়িয়ে রেখেছেন। কিছুই তিনি হারান না। ফেলে দেন না ভোলেন না এতটুকু। আমরাই ভুলি। ফিরে যাই। পথ হারিয়ে পথ খুঁজি।

    সময় হলে তিনিই আবার পথ দেখান। ডাক দেন।

    নবগোপাল পড়ল আবার পায়ে এসে। তুমি ভোলো না। চিরজ্যোতির্ময়ী নক্ষত্র লিপিতে প্রতি রাত্রে তুমি লিখে পাঠাও, আমি ভুলিনি। বিনম্রকোমল শ্যামলশীতল তৃণদলেও সেই ভাষাই লিখে রেখেছ, ভুলিনি তোমাকে। বললে, ‘আমার সাধনভজন কি করে কী হবে?”

    ‘তোমাকে কিছু করতে হবে না।’ বললেন ঠাকুর, ‘মাঝে-মাঝে শুধু দক্ষিণেশ্বরে এসো।’

    শুধু এইটুকু?

    এই বা কি কম কঠিন? দেখ না, কত বাধা এসে পড়বে যাবার মুখে। মন ঠিক করতেই এক যুগ। তারপর মন যদি ঠিক হল তো শরীর বললে ঠিক নেই। মন-শরীর দুই-ই ঠিক, হঠাৎ দেখা দিল সর্বসঙ্কল্পনাশন অকাজের তাড়না। হাতের কাছে দক্ষিণেশ্বর, সেই হাত খুঁজতেই রাত ফুরোয়।

    একদিন ভাবসমাধি হয়েছে ঠাকুরের, নবগোপাল এসে হাজির। রাম দত্ত ছিল, নবগোপালকে বললে, ‘এইবেলা ঠাকুরের কাছ থেকে কিছু বর চেয়ে নিন।

    নবগোপাল সাষ্টাঙ্গ হয়ে পড়ল ঠাকুরের পায়ের কাছে। বললে, ‘বিষয়চিন্তায় ডুবে আছি। কি করে যাবে এই বিষজ্বালা আমাকে বলে দিন।

    ‘কোনো চিন্তা নেই।’ আশ্বাস দিলেন ঠাকুর। ‘যদি আর কিছু না পারো সারা দিন মানে একবার, শুধু একবার আমাকে স্মরণ কোরো।’

    শুধু এইটুকু?

    হ্যাঁ, এইটুকু। অঙ্কুরটি ছোট, কিন্তু ওর মধ্যে অব্যক্ত আছে বনস্পতির আয়তন। বেশ তো, দেখ না, সারা দিনে-রাত্রে শুধু একবার আমাকে স্মরণ করে দেখ না কি হয়। একবার স্মরণ করলেই কতবার সাধ যায় স্মরণ করতে। স্মরণ করতে-করতেই অনন্যশরণ।

    একদিকে তুমি কত সহজ, আমার দূর্বল দুই বাহুর বন্ধনে বন্দী, আবার আরেকদিকে তুমি অপরিসীম, সমস্ত আয়ত্তের অতীত, সমস্ত বন্ধন-ক্রন্দনের বাইরে। একদিকে তুমি কঠোর কাজের মানুষ, আরেকদিকে তুমি অকাজের রাজা। বৃত্তিরূপে থেকে আবার নিবৃত্তিরূপে বিরাজিত। একবার দেখি অমোঘ নিয়মে বেঁধে রেখেছ আমাকে, আবার দেখি তোমার অশাসনের অঙ্গনে বাজিয়ে দিয়েছ আমার ছুটির ঘণ্টা। একদিকে তুমি সুদুর্গম সুগম্ভীর, আবার, কি আশ্চর্য, তুমি একেবারে হিসাব কিতাব ছাড়া উদ্ভ্রান্ত ভোলানাথ।

    সেইখানেই তো আমার ভরসা। আমি কি পারব তোমাকে গৌরীশঙ্করের চূড়ায় গিয়ে ধরতে? আমি ধরব তোমাকে বিধি-বাধা-না-মানা ঝড়ের ঘূর্ণ বেগে। আর সকলের কাছে তুমি দস্তুরসঙ্গত, আমার কাছে তুমি খাপছাড়া, অগোছালো। আমার যে ভালোবাসার বেসাতি। অনাবশ্যকের ঐশ্বর্য।

    নবাই চৈতন্যরও সেই কথা।

    পানিহাটির উৎসবে এসেছেন ঠাকুর। নৌকোয় উঠেছেন ফিরে যাবার মুখে, ছুটতে ছুটতে নবাই এসে হাজির। বাড়ি কোন্নগর, মনোমোহনের খুড়ো। শুনেছে ঠাকুর এসেছেন উৎসবে, তাই দেখতে এসেছে। এতক্ষণ খুঁজেছে ভিড়ের মধ্যে, দলের মধ্যে সেই শতদল কোথায়, ভিড়ের মধ্যে কোথায় সেই অপরপ! এত দেরি করে এলে কেন? ঐ যে তিনি নৌকোয় উঠছেন। সত্যি? ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল নবাই। ছেড়ো না, ছেড়ো না নৌকো। আর কি ছাড়ে। যে মুহূর্ত দেখতে পেলেন ব্যথিতের ব্যাকুলতা, পারায়ণ-পরায়ণ স্তব্ধ হলেন।

    পায়ের উপর লুটিয়ে পড়ল নবাই। আকুল হয়ে কাঁদতে লাগল।

    একেই বলে দেখা আর প্রেমে পড়া। কিম্বা প্রেমে পড়ে দেখা। খুঁজেছে, ছুটেছে, লুটিয়ে পড়েছে। প্রশ্ন করেনি, তর্ক করেনি, বিশ্বাসের দৃঢ় ভূমিতে জাগতে দেয়নি দ্বিধার কুশাঙ্কুর। শুধু বিশ্বাস নয়, উন্মত্ত ব্যাকুলতা। একেবারে সর্বসমর্পণ। ঠাকুর তাকে স্পর্শ করলেন।

    পাগলের মত নাচতে লাগল নবাই। নাচে, নাচে, আবার থেকে-থেকে প্রণাম করে ঠাকুরকে।

    আরেক রকম স্পর্শে তাকে ফের প্রকৃতিস্থ করলেন ঠাকুর। সবাই ভাবলে শান্ত হয়ে গেল বুঝি নবাই। দেখল ছেলের উপর সংসারের ভার দিয়ে নবাই গঙ্গাতীরে কুটির বেঁধে বাস করতে লাগল নির্জনে। সঙ্গের সাথী তিনজন। ধ্যান কীর্তন আর উপাসনা।

    ‘ধ্যান চক্ষু বুজেও হয়, চক্ষু চেয়েও হয়।’ বললেন ঠাকুর। ‘ধ্যান যে ঠিক হচ্ছে তার লক্ষণ আছে। মাথায় পাখি বসবে জড় মনে করে। আমি দীপশিখা নিয়ে আরোপ করতুম। শিখার যেটা লালচে রঙ সেটাকে বলতুম স্থূল, আর শাদা অংশটাকে বলতুম সুক্ষ্ম। মধ্যখানে একটা কালো খড়কের মত রেখা আছে। সেটাকে বলতুম কারণশরীর।

    গভীর ধ্যানে ইন্দ্রিয়ের সব কাজ বন্ধ হয়ে যায়। মন আর বহির্মুখ থাকে না, যেন বা’র-বাড়িতে কপাট পড়ল। দয়ানন্দ বললে, অন্দরে এসো কপাট বন্ধ করে। অন্দর বাড়িতে কি যে-সে আসতে পারে?

    ধ্যান হবে তৈলধারার মত।’ বললেন আবার ঠাকুর। ভিতরে আর ফাঁক নেই। অনর্গল প্রবাহ। তেমনি মনেরও অনর্গল মগ্নতা। একটা ইটকে বা পাথরকেও যদি ঈশ্বর বলে ভক্তিভাবে পূজো করো, তাতেও তাঁর কৃপায় ঈশ্বরদর্শন হবে।

    আর কীর্তন?

    কীর্তন হবে হিল্লোল-কল্লোল। ক্রন্দনের সঙ্গে নর্তন মিশলেই কীর্তনের জন্ম। নরোত্তম কীর্তনীয়াকে বললেন ঠাকুর, ‘তোমাদের যেন ডোঙ্গা-ঠেলা গান। এমন গান হবে যে নাচবে সকলে।’ বলেই গান ধরলেন নিজে ‘নদে টলমল টলমল করে। গৌরপ্রেমের হিল্লোলে রে। তারপর এবার আখর দাও, আর নাচো -‘

    যাদের হরি বলতে নয়ন ঝরে

    তারা, তারা দু ভাই এসেছে রে।

    যারা মার খেয়ে প্রেম যাচে

    তারা, তারা দু ভাই এসেছে রে।

    যারা আপনি কেঁদে জগৎ কাঁদায়

    তারা, তারা দু ভাই এসেছে রে।

    যারা আপনি মেতে জগৎ মাতায়

    তারা, তারা দু ভাই এসেছে রে৷৷

    নবাই এসেছে। এসেই উচ্চতালে কীর্তন শুরু করে দিল। বইয়ে দিল সুরের গঙ্গা। আসন ছেড়ে উঠে ঠাকুর নাচতে লাগলেন। কাছে ছিল মহিমাচরণ, জ্ঞানপথে যার চর্চা-চিন্তা, সেও মেতে উঠল নৃত্যে।

    গাইতে-গাইতে বড় টলছেন ঠাকুর। নিরঞ্জন ভাবলে, পড়ে যাবেন বুঝি। হাত বাড়িয়ে ধরতে গেল। মৃদুস্বরে ধমকে উঠলেন: ‘এই শালা ছুঁসনে।’ মাস্টার ছিল সামনে। তার হাত ধরে টান মারলেন। ‘এই শালা, নাচ।’

    একেই বলে উর্জিতা ভক্তি। ভাবে হাসে কাঁদে নাচে গায়। ভক্তি যেন উথলে পড়ছে। রাম বললেন লক্ষ্মণকে, ভাই যেখানে দেখবে উর্জিতা ভক্তি, সেইখানে জানবে আমি আছি।

    ‘হরিনামে কেমন আনন্দ দেখলে?’ সবাইকে উদ্দেশ করে জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর। বললেন, ‘আমার আরো বেশি আনন্দ। কেন বলো তো? মহিমাচরণ আসছে এদিকে, জ্ঞান পেরিয়ে ভক্তির দিকে। জ্ঞান হচ্ছে একটানা স্রোত আর ভক্তি হচ্ছে জোয়ার-ভাঁটা। আর দেখ না জ্ঞানীর মুখ-চেহারা শুকনো আর ভক্তের মুখ-চেহারা স্নিগ্ধ। ‘তারপর তৃতীয় সাথী প্রার্থনা।

    কী প্রার্থনা করবে? শুধু বলবে, ঈশ্বর, যেন ভোগাসক্তি যায় আর তোমার পাদপদ্মে মন হয়। কাতর হয়ে প্রার্থনা করলেই চোখে জল আসবে। ঈশ্বর তৃষ্ণার্ত। চোখের জল না পেলে তাঁর পিপাসা নিবারণ হয় না। চাতক যেমন বৃষ্টির জলের জন্যে চেয়ে থাকে ঈশ্বরও তেমনি চোখের জলের জন্যে চেয়ে আছেন। শিশির না ঝরলে ফুলটি ফোটে না, আর ফুলটি না ফুটলে উড়ে আসে না মধুকর। তেমনি অশ্রু না ঝরলে ফোটে না হৃদকমল, আর হৃদকমল না ফুটলে ছুটে আসেন না ভগবান। তাই কাঁদবার জন্যেই প্রার্থনা।

    না কাঁদলে ধুয়ে যাবে না আসক্তির ধূলোবালি। বাইরে শুকনো জ্ঞানের কথা, অন্তরে প্রচ্ছন্ন ভোগতৃষ্ণা-কিছু হবে না। হাতির যেমন বাইরের দাঁত আছে তেমনি আবার ভিতরের দাঁত। বাইরের দাঁতে শোভা, ভিতরের দাঁতে খায়। তেমনি বাইরে লেকচার উপাসনা ভক্তির আড়ম্বর, ভিতরে কামকাঞ্চনে স্পৃহা। লুকিয়ে-লুকিয়ে লেহনচর্বণ। সমস্তই অনর্থক। যত জলই ঢালো গাছ অফলা।

    তাই কেঁদে-কেঁদে মা’র কাছে শুধু এই প্রার্থনা:

    মা, তোর পাদপদ্মে শুদ্ধা ভক্তি দে। আর যা কিছু চাইছি, কী যে সত্যি চাইবার তা না জেনেই চাইছি। সন্তান যদি একবার মাকে পায় সে কি আর রঙিন খেলনার জন্যে কাঁদে?

    প্রথমে অভ্যাস পরে অনুরাগ। ঠাকুর বললেন, ‘প্রথমে বানান করে লেখ, তারপর টেনে যাও।’

    অন্তরের টানেই তখন টেনে যাবে। এই অভ্যাসটি কেন? যাতে শরীর যাবার সময় ঈশ্বরকেই মনে পড়ে। নাম শুধু মুখে বললেই হবে না, মনে ধরতে হবে। মনে-মনে এক হতে হবে। শুধু কাঁচের উপর ছবি থাকে না। তাই ভোগাসক্ত মনে ফুটবে না নামমূর্তি। কাঁচের পিঠে কালি মাখিয়ে ছবি ধরো। তেমনি মনে মাখাও ভক্তি আর বৈরাগ্যের রঙ, ফুটে উঠবে নামের প্রতিচ্ছায়া।

    হেম ঠাকুরকে কীর্তন শোনাবে বলেছিল। তা আর হল না। শেষে বললে, ‘আমি খোল-করতাল নিলে লোকে কি বলবে!’ ভয় পেয়ে গেল পাছে লোকে পাগল বলে।

    আর, এই যে সুখের আশায় ছন্নছাড়ার মত উদ্দাম হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এতে সবাই তাকে সুস্থমস্তিষ্ক বলছে। আর যা অক্ষয় আনন্দের আকর তার জন্যে ক্রন্দন কীর্তনই পাগলামি।

    কোথা থেকে কি ছদ্মবেশে যে আসক্তি আসে তার ঠিক নেই।

    হরিপদকে চেনো তো?

    সে ঘোষপাড়ার এক মেয়েমানুষের পাল্লায় পড়েছে। বলে, তার নাকি গোপাল ভাব। কোলে বসিয়ে খাওয়ায়। বলে, বাৎসল্য ভাব। ঠাকুর পরিহাস করে বললেন, ‘ঐ বাৎসল্য থেকেই তাচ্ছল্য।’

    সাবধান করে দিলেন হরিপদকে। ছেলেমানুষ, কিছু বোঝে না। ভাবে, বোধহয় ‘রাগকৃষ্ণ’ হয়েছে।

    জানো না বুঝি? ঐ মেয়েছেলেটি যে পথের পন্থী তাদের মানুষ নিয়ে সাধন। মানুষকে মনে করে শ্রীকৃষ্ণ। ওরা বলে ‘রাগকৃষ্ণ’। গুরু জিজ্ঞেস করে, রাগকৃষ্ণ পেয়েছিস। উত্তর চাই, হ্যাঁ, পেয়েছি।

    তাই ধরেছে হরিপদকে। এমন সুন্দর ছেলেটা না মেছমার হয়ে যায়।

    সুন্দর কথকতা জানে। সব না মাটি হয়। গলার এমন মিঠে সুর, তা না উড়ে পালায়।

    সেদিন তার চোখ দুটি লক্ষ্য করলেন ঠাকুর। যেন চড়ে রয়েছে। বললেন, হ্যাঁ রে, তুই খুব ধ্যান করিস?”

    মাথা হেঁট করে রইল হরিপদ।

    ‘শোন, অত নয়।’

    পদসেবার ভার দিয়েছেন হরিপদকে। হাত-ভরা কোমল ভক্তি, স্নেহসিক্ত পবিত্রতা। হায়, আসক্তির ছোঁয়া লেগে হাত দুটি না তার শূন্য-শুষ্ক হয়ে যায়।

    মনে শান্তি পাচ্ছেন না ঠাকুর। সে মেয়েছেলেটিকে ডেকে পাঠালেন। বললেন মিনতি করে, ‘হরিপদকে নিয়ে যেমন করছ করো কিন্তু দেখো, অন্যায় ভাব যেন এনো না।’

    হরিপদর যম-দুয়ারে কাঁটা দিয়ে দিলেন।

    ‘আচ্ছা, এই যে ছেলেরা সব আসছে এখানে, বাধা-বারণ মানছে না, এর মানে কি?” ঠাকুর বলছেন আত্মভোলার মত: ‘এই খোলটার মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু আছে, নইলে টান হয় কি করে? কেন আকর্ষণ হয়? বলা নেই কওয়া নেই দলে-দলে লোক অমনি এলেই হল? কোনো মানে নেই ওর?”

    সকলেই তো আসবে। তোমার ওখানেই যে সকলের সকল পথ সমাপ্ত হয়েছে। তুমি যে সর্ব সমন্বয়ের সমুদ্র।

    ‘কেন একঘেয়ে হব? কেন হব একরোখা?’ বলছেন ঠাকুর উদার সারল্যে: ‘অমুক মতের লোক তা হলে আসবে না, এ ভাবনা আমার নয়। কেউ আসুক আর নাই আসুক, আমার বয়ে গেছে। লোকে কিসে হাতে থাকবে, কিসে দল বাড়বে এ সব আমার মনে নেই। অধর সেন বড় কাজের জন্যে বলতে বলেছিল মাকে, তা ওর সে কাজ হল না। তাতে যদি ও কিছু মনে করে আমার বয়ে গেল।’

    ৩৪

    চিৎপুর রোড দিয়ে গড়ের মাঠের দিকে চলেছেন ঠাকুর। চলেছেন গাড়ি করে। উইলসনের সার্কাস দেখতে। সঙ্গে রাখাল, মাস্টারমশাই, আরো দু-একজন। একজনের হাতে ঠাকুরের বটুয়া। তাতে মশলা, কাবাবচিনি। ঠাকুরের গায়ে সবুজ বনাত। কার্তিকে নতুন শীত পড়েছে।

    একবার এধার একবার ওধার ঘন-ঘন মুখ বাড়াচ্ছেন গাড়ি থেকে। লোক দেখছেন। আপনমনে কথা কইছেন তাদের সঙ্গে। মাস্টারকে বলছেন, ‘দেখছ সবার কেমন নিম্নদৃষ্টি। সব পেটের জন্যে চলেছে। কারুর ঈশ্বরের দিকে দৃষ্টি নেই ।

    মাঠে তাঁবু পড়েছে সার্কাসের। গ্যালারির টিকিট আট আনা। তাই কেনা হল ঠাকুরের জন্যে। শুধু ঠাকুরের জন্যে কেন, সকলের জন্যে। সব চেয়ে উঁচু ধাপে গিয়ে সবাই বসল। ঠাকুরের মহামূর্তি। বালকের মত আনন্দ করে বললেন, ‘বাঃ, এখান থেকে তো বেশ দেখা যায়।’

    সার্কাসের মেয়ে ঘোড়ার পিঠে এক পায়ে দাঁড়িয়ে ছুটছে। বড়-বড় লোহার রিঙ-এর মধ্যে দিয়ে ছুটছে ঘোড়া, ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে উঠে আবার ঘোড়ার পিঠে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে এক পায়ে, মাঝখানে ডিঙিয়ে গিয়েছে সেই লোহার রিঙ। খুব কায়দার কসরত। বিস্ময়-আয়ত চোখে তাই দেখছেন ঠাকুর।

    সার্কাসের শেষে বলছেন মাস্টারকে, ‘দেখলে বিবি কেমন এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে ঘোড়ার উপর, আর ঘোড়া কেমন ছুটছে বনবন করে। ভাবো দিকিন, কত অভ্যেস করেছে তবে না হয়েছে। কত মনোযোগ, কত একাগ্রতা! একটু অসাবধান হলেই হাত-পা ভেঙে যাবে, হয়তো বা অবধারিত মৃত্যু। অভ্যাসযোগে সব এখন জল-ভাত। সংসার করাও এমনি কঠিন। অনেক সাধন-ভজন করেই তবে না ঈশ্বরকৃপা! সাধন আর ভজন, অভ্যাস আর অনুরাগ।’

    অভ্যাস যদি থাকে, মৃত্যুর সময় তাঁরই নাম মুখে আসবে। সেই অভ্যাস করে যাও। মৃত্যুর সময়ের জন্যে প্রস্তুত রাখো নিজেকে।

    ‘সাধনের সময়, ঠাকুর বললেন, ‘এই সংসার ধোঁকার টাটি। কিন্তু জ্ঞানলাভ হবার পর তাঁকে দর্শনের পর এই সংসারই আবার মজার কুটি।’

    শুধু অভ্যাস। মন যায় না তবু কষ্টকাঠিন্য করে একটু বোসো। এইটুকুই সাধন। প্রথমে তেতো লাগে, এই তেতোটুকুই খাও। খেতে-খেতেই মধু খেতে-খেতেই নেশা। ছেলের পড়ায় মন নেই, বাপ-মা জোর করে বসাচ্ছে তাকে বইয়ের সামনে। এই জোরটুকুই কৃচ্ছ। পড়তে পড়তে ছেলের কখন অনুরাগ এসে গিয়েছে, তখন বই আর নামায় না মুখ থেকে। বাপ-মা বারণ করলেও না। অভ্যাস করাই এই অনুরাগের নাগাল পাবার জন্যে। মরা জল ঠেলে ঠেলে স্রোতের জলে চলে আসার জন্যে।

    ঘষো তোমার শুকনো কাঠ। মরা কাঠেই জ্বলবে একদিন আগুনের অনুরাগ। চেঁচিয়ে গলা সাধো, একদিন হঠাৎ এসে যাবে সুররাগের ঢেউ। রুদ্ধ দরজার পাশে বসে ডাক-নামটি ধরে ডাকো একমনে। কখন দরজা খুলে গিয়ে জেগে উঠবে ভালোবাসার প্রতিধ্বনি ।

    হাতে দাঁড় পড়েছে, দাঁড় টেনে যাও, ঝাঁ করে কখন পাড়ি জমে যাবে টেরও পাবে না। দুপুরবেলা ইস্কুল পালিয়ে চলে এসেছে মাস্টার। শুনেছে বলরামমন্দিরে এসেছেন ঠাকুর, আর কে রোখে! শুধু ছাত্রই ইস্কুল পালায় না, মাস্টারও ইস্কুল পালায়।

    ‘কি গো, তুমি? এখন? ইস্কুল নেই?’ জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর।

    কে একজন ভক্ত ছিল সামনে, বলে উঠল, ‘না মশাই, উনি ইস্কুল পালিয়ে এসেছেন। সবাই হেসে উঠল। কিন্তু মাস্টার জানে কে যেন তাকে টেনে আনলে! এমন টান যার ব্যাখ্যা হয় না। পায়ে কুশকণ্টকের বোধ নেই, পথ মনে হয় একটানা বাঁশি।

    মাস্টারকে সেবা শেখাতে লাগলেন ঠাকুর। আমার গামছাটা নিংড়ে দাও তো। জামাটা শুকোতে দাও। পা-টা কামড়াচ্ছে, একটু হাত বুলিয়ে দিতে পারো?

    সাহ্লাদে সেবা করছে মাস্টার।

    সমুদ্রের দিকে চলেছে নদী। নদীতে উচ্ছাস উঠেছে। নদী ভাবছে এ উচ্ছাস কার, আমার না সমুদ্রের ওগো সমুদ্র, বলে দাও, এ আবেগ-আবর্ত কার? আমার, না, তোমার? কিন্তু এ জিজ্ঞাসা কতক্ষণ? যতক্ষণ না ঐকান্তিক সমর্পণ হচ্ছে সমুদ্রে। সমুদ্রে একবার মিশে গেলে, পূর্ণ সমর্পণ হয়ে গেলে, তখন কি আর থাকবে এ জিজ্ঞাসা? তখন কি আর থাকবে আমি-তুমি?

    গিরিশ ঘোষ বললে, ‘আমরা সব হলহল করে কথা কই। কিন্তু মাস্টার ঠোঁট চেপে বসে আছে। কি ভাবে কে জানে।’

    ঠাকুর বললেন, ‘ইনি গম্ভীরাত্মা।

    তাই বলে একটা গান গাইবে না? সবাই গাইছে, ও কেন মুখ বুজে থাকবে? ঠাকুরের কাছে নালিশ করল গিরিশ। ‘কিছুতেই গাইছে না মাস্টার।’ ঠাকুর বললেন, ‘ও স্কুলে দাঁত বার করবে। যত লজ্জা গান গাইতে!’ মাস্টারের দিকে তাকালেন। ‘ঈশ্বরের নামগুণকীর্তনে লজ্জা করতে নেই। নামগুণকীর্তন অভ্যাস করতে-করতেই ভক্তি আসে।

    ভক্তিতেই সর্বসিদ্ধি। এমন কি ব্রহ্মজ্ঞান।

    ‘তাঁর দয়া থাকলে কি জ্ঞানের অভাব থাকে? ওদেশে ধান মাপে, পেছনে বসে রাশ ঠেলে দেয় আরেকজন। দয়ায় মা জ্ঞানের রাশ ঠেলে দেন। আর দয়া আকর্ষণ করবে কি করে? শুধু ভক্তিতে, ভালোবাসায়। ভালোবাসাতে কান্না আর কান্নাতেই দয়া।’ আমার কী ছিল? কান্না ছাড়া আর ছিল না কিছু পুঁজিপাটা। কেঁদে-কেঁদে বলতুম ‘তাই মাকে, বেদ-বেদান্তে কি আছে জানিয়ে দাও, কি আছে বা পুরাণ-তন্ত্রে। সব জানিয়ে দিলেন দেখিয়ে দিলেন। শিবশক্তি, নৃমুণ্ডস্তুপ, গুরুকর্ণধার, সচ্চিদানন্দসাগর।

    ‘একদিন দেখলুম কি জানো? চতুর্দিকে শিবশক্তি। মানুষ পশুপাখি তরুলতা সকলের মধ্যেই এই পুরুষ আর প্রকৃতি। আরেকদিন দেখলাম নরমুণ্ডের পাহাড়। আমি তার মধ্যে একলা বসে। সেদিন দেখলাম মহাসমুদ্র। নুনের পুতুল হয়ে সমুদ্র মাপতে চলেছি। গুরুর কৃপায় পাথর হয়ে গেলাম। কোত্থেকে একটা জাহাজ চলে এল। তাতে উঠে পড়লাম। দেখলাম গুরু কর্ণধার। তারপরে আবার দেখলাম ছোট্ট একটি মাছ হয়ে খেলা করছি সাগরে। সচ্চিদানন্দসাগরে প্রফুল্ল মৎস্য। কি হবে বুদ্ধিবিচারে? কি বুঝবে তুমি তিনি না বোঝালে? এইটিই সকল বোঝার সার করো, যে, তিনি যখন দেখিয়ে দেন তখনই সব বোঝা যায়। তার আগে নয়।’

    মাস্টারকে দিয়ে গান গাইয়ে ছাড়লেন ঠাকুর। সিদ্ধেশ্বরী বাড়ি পাঠিয়েছেন তাকে পুজো দেবার জন্যে। ঠনঠনের সিদ্ধেশ্বরী। স্নান করে খালি পায়ে গিয়েছে মন্দিরে আবার খালি পায়ে ফিরে এসেছে প্রসাদ নিয়ে। ডাব চিনি আর সন্দেশ৷ ঠাকুর তখন শ্যামপুকুরে। দক্ষিণের ঘরে দাঁড়িয়ে আছেন মাস্টারের প্রতীক্ষায়। পরনে শুদ্ধ বস্ত্র কপালে চন্দনের ফোঁটা।

    পায়ের চটিজুতো খুলে রেখে প্রসাদ ধরলেন ঠাকুর। খানিকটা মুখে দিয়ে বললেন, ‘বেশ প্রসাদ।’

    তারপর চমকে উঠে বললেন, ‘আমার বই এনেছ?’

    ‘এনেছি।’

    রামপ্রসাদ আর কমলাকান্তের গানের বই। ঠাকুর বললেন, ‘বেশ, এখন এইসব গান ডাক্তারের মধ্যে ঢুকিয়ে দাও।’

    বলতে-বলতেই ডাক্তার এসে হাজির। ‘এই যে গো তোমার জন্যে বই এসেছে।’ সোল্লাসে বলে উঠলেন ঠাকুর।

    বই দুখানি হাতে নিলেন ডাক্তার। বললেন, ‘গান পড়ে সুখ কি, গান শুনে সুখ।’ “তবে শোনাও হে মাস্টার’–

    এবার আর ঠাকুরের কথা ঠেলতে পারল না। গলা ছেড়ে গান ধরল মাস্টার।

    ‘মন কি তত্ত্ব করো তাঁরে,

    যেন উম্মত্ত আঁধার ঘরে।

    সে যে ভাবের বিষয়, ভাব ব্যতীত

    অভাবে কি ধরতে পারে।

    হলে ভাবের উদয় লয় সে যেমন

    লোহাকে চুম্বকে ধরে।

    তারপর নাচিয়ে পর্যন্ত ছেড়েছেন। আমি হরিনামে যদি নাচি, লোকে আমায় কি বলবে এ ভাব ত্যাগ করো। লজ্জা, অভিমান, গোপন ইচ্ছা—এ সব পাশ। এ ছুঁড়ে ফেলে দিতে না পারলে স্ফূর্তি কই, সারল্য কই? গড় হয়ে দেবতার দুয়ারে প্রণাম করতে গেলে দামী শালে ধূলো লাগবে সুতরাং মনে-মনে প্রণাম করে দায় সারি এ হচ্ছে অহঙ্কারের কথা। কিন্তু শাল গায়ে দিয়ে ঐ ধূলোয় গড়াগড়ি দেওয়াই আনন্দ। সত্যিকার আনন্দ হলে, গায়ের শাল আর পথের ধূলোয় ভেদ থাকে না। সত্যিকার বন্যা এলে বালির বাঁধে কি করবে? কালীপদসুধাহ্রদে একবার যদি ডুবতে পারো, সব হিসেব পচে যাবে, পুজা হোম জপ বলি কিছুরই আর ধার ধারতে হবে না।

    কিন্তু শিবনাথের উলটো কথা। সে বলে, বেশি ঈশ্বরচিন্তা করলে বেহেড হয়ে যায়।

    ‘শোনো কথা!’ বললেন ঠাকুর, ‘জগৎচৈতন্যকে চিন্তা করে অচৈতন্য! যিনি বোধস্বরূপ, যাঁর বোধে জগৎকে জগৎ বলে বোধ হয় তাঁকে চিন্তা করা মানে অবোধ হওয়া?’

    ‘ভাবতে গেলে সব কিন্তু ছায়া।’ বললে প্রতাপ মজুমদার।

    ‘তা কেন?” আপত্তি করল ডাক্তার। ‘বস্তুরই তো ছায়া। ঈশ্বর যদি বস্তু হন তা হলে তাঁর ছায়াও বস্তু। এদিকে ঈশ্বর সত্য অথচ তাঁর সৃষ্টি মিথ্যে এ মানতে রাজী নই। তাঁর সৃষ্টিও সত্য।’

    সেকথা বৈকুণ্ঠ সেনও বলেছিল। ঠাকুরকে জিজ্ঞেস করলে, ‘আচ্ছা মশাই সংসার কি মিথ্যে?”

    এক কথায় জল করে দিলেন ঠাকুর। বললেন, ‘যতক্ষণ ঈশ্বরকে না জানা যায় ততক্ষণ মিথ্যে। ততক্ষণ মায়া। ততক্ষণ আমার-আমার। এদিকে চোখ বুজলে কিছু নেই অথচ আমার হারুর কি হবে। নাতির জন্যে কাশী যাওয়া হয় না! এ সংসার মিথ্যে একশোবার মিথ্যে।’

    ‘কিন্তু সংসারে থেকে তাঁকে জানব কি করে?”

    ‘এক হাত তাঁর পাদপদ্মে রাখো আরেক হাতে সংসারের কাজ করো। ছেলেদের গোপাল বলে খাওয়াও। বাপ-মাকে দেব-দেবী বলে সেবা করো। স্ত্রীর সঙ্গে ঈশ্বরের প্রসঙ্গ নিয়ে থাকো, ভোগাসনে না বসে বোসো যোগাসনে।’

    ‘কেন মশাই, এক হাত ঈশ্বরে আরেক হাত সংসারে রাখব কেন?’ কে একজন ফোড়ন দিল: ‘সংসার যে কালে অনিত্য তখন এক হাতই বা সংসারে রাখব কেন?” সদানন্দ ঠাকুর হাসলেন। বললেন, ‘তাঁকে জেনে সংসার করলে সংসার অনিত্য নয়।’ সেদিন সদরালাও জিজ্ঞেস করেছিল এই কথা। ‘কতদিন খাটনি খাটব সংসারের?” ‘যতদিন তিনি খাটান। তিনি যা কাজ করতে দিয়েছেন তাই নির্বাহ করো। যদি মনে করো তাঁর দেওয়া কাজ তবে আর শুকনো কর্তব্য নয়, তবে তা পূজো।’

    ‘এ সব কর্তব্যের জন্যে সংসার করা?’

    ‘নিশ্চয়। সংসার করা মানেই কর্তব্যসাধন। ছেলেদের মানুষ করা, স্ত্রীর ভরণপোষণ করা, নিজের অবর্তমানে স্ত্রীর ভরণপোষণের যোগাড় রাখা। তা যদি না করো তুমি নির্দয়। যার দয়া নেই সে মানুষই নয়।’

    ‘কিন্তু সন্তানপালন কতদিন?’

    ‘যদ্দিন না সাবালক হয়। পাখি উড়তে শিখলে তখন কি আর ঠোঁটে করে খাওয়ায় তার মা? কাছে এলে ঠোকরায়, কাছে আসতে দেয় না।’

    ‘কিন্তু যদি জ্ঞানোন্মাদ হয়?’

    ‘জ্ঞানোম্মাদ হলে আর কর্তব্য নেই। তখন কালকের কথা আর তুমি ভাববে না, ঈশ্বর ভাববেন। জমিদার তো মরে গেল নাবালক ছেলে রেখে। নাবালকের কি হবে? তখন তার অছি এসে জোটে। অছি এসে ভার নেয়।’ জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন সদরালার দিকে। ‘এ সব তো আইনের কথা। তুমি তো সব জানো। আর এ তো তুমি মন্দ লোকের উপর ভার দিচ্ছ না, স্বয়ং ঈশ্বরের উপর দিচ্ছ।’

    ‘আহা কি অপরূপ কথা!’ পাশে বসে ছিলেন বিজয় গোস্বামী, বলে উঠলেন মধ্যভাষে: ‘নাবালকের অমনি অছি এসে জোটে। আহা। কবে সেই অবস্থা হবে! যাদের হয় তারা কি ভাগ্যবান!

    আমি হাল ছেড়ে দিলেই তুমি এসে হাল ধরবে। আমি শুধু অভয়মনে ছেড়ে দেব আমার নৌকো। হোক আমার পাল ছেঁড়া হাল ভাঙা, তবু ঝড়ের রাতে মত্ত সাগরকে আমার ভয় নেই। আমি জানি তুমি বসে আছ হালের কাছে। লক্ষ্য করছ হাল কতক্ষণে ছেড়ে দিই তোমার হাতে।

    ছেড়ে দিয়েছি এবার। দেখি তুমি এখন কি কবে ছাড়ো।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleঅথ রম্যকথা – অনন্যা পাল
    Next Article কিয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর

    Related Articles

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    May 18, 2026
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ১ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    April 27, 2026
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনন্যা পাল
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক দত্ত
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুর রহমান আল-আরিফি
    আবদুল হালিম
    আব্দুল মালেক আলী আল-কুলাইব
    আব্দুল হামীদ ফাইযী
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোপেন্দ্র বসু
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভট্টাচার্য
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বাণ রায়
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পরিমল ভট্টাচার্য
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণু শর্মা
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহতাব উদ্দিন
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রণদীপ নন্দী
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সায়ক আমান
    সায়ন্তনী পূততুণ্ড
    সায়ন্তনী পূততুন্ড
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    গজনবীর দেশ থেকে সোমনাথের পথে

    July 15, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    গজনবীর দেশ থেকে সোমনাথের পথে

    July 15, 2026
    Our Picks

    গজনবীর দেশ থেকে সোমনাথের পথে

    July 15, 2026

    ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে

    July 15, 2026

    আদর্শ বিবাহ ও দাম্পত্য – আব্দুল হামীদ ফাইযী

    July 15, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }