আত্মহত্যা – শঙ্কর চ্যাটার্জী
প্রথম পর্ব
লিপিকা আর অভীকের জমাট বাঁধা প্রেম। অবশেষে তিন বছর বাদে বিয়ের পিঁড়েতে এসে দম্পতির রূপ পেল। নতুন এক অধ্যায় শুরু হল তাদের জীবনে। দুজনেই চাকরি করে, তবে আলাদা আলাদা কোম্পানিতে। রাজারহাটে একটা ফ্ল্যাট কিনল অফিসে যাতায়াতের সুবিধের জন্য। কেননা লিপিকার শ্বশুরবাড়ি বারাসাত। রঙে-রসে বেশ ভালভাবেই দিনগুলো কাটছিল। কিন্তু সব কিছুই একভাবে যায় না। তাহলে ব্রিটিশ আজকেও শাসন করত।
একদিন সুর কাটল। অফিসে যাবার জন্যে অভীক বাথরুমে ঢুকেছে স্নান করতে। লিপিকা ডিভানে বসে অপেক্ষা করছে। অভীক বেরোলে ও ঢুকবে। কারণ অন্য বাথরুমটা বেশ ছোট। স্নান করে সুখ নেই। অভীকের স্মার্টফোনটা পড়েছিল ডিভানে। লিপিকার মনে হল হোয়াটসঅ্যাপে রাখা ওদের ভালোবাসার ছবিগুলো দেখে। ওর বিভিন্ন মুডের ছবি অভীককে পাঠাত। কিন্তু অ্যাপ খুলেই একটা ছবির দিকে ওর চোখ আটকে যায়। তারই বয়সি মেয়েটা। পরনে ফিকে গোলাপি স্কার্ট, ওপরের সাদা টপটার ডিজাইন একেবারে হিন্দি সিনেমার উঠতি নায়িকাদের মতো। এর ফলে তাকে আরও মোহিনী করে তুলেছে। মাতাল করা তার শরীরের আবেদন। ডাই করে চুলগুলো অল্প বাদামী করা করা। মুখটা পানপাতার মতো। টানা টানা দুই চোখে যৌন আবেদন। যে কোনো পুরুষ এর প্রেমে পড়তে বাধ্য। লিপিকার থেকে হাজার গুণ বেশি সুন্দরী!
লিপিকার মনে প্রশ্ন ওঠে। ইনি আবার কিনি? কোনোদিন সে এই সুন্দরীর ছবি দেখেনি! ছবিটা কয়েকদিন আগে পোস্ট হয়েছে। তাহলে কি অভীকের জীবনে এঁর নতুন আগমন? এক পলক বাথরুমের দরজার দিকে তাকায়। ছবির নিচে লিখেছে — ছবিটা কেমন হয়েছে জানাবে। ওপরে নামটা রয়েছে রুমি মুখার্জি। অভীকের স্নান মনে হয় শেষ হয়েছে। ফোনটা অফ করে রেখে দিল। লিপিকার মনের ভেতর একটা সন্দেহের ধোঁয়া দেখা দিল।
অভীক খালি গায়ে টাওয়েল পরে বেরোল। ওর ঐ সুঠাম স্বাস্থ্য দেখে প্রায়ই লিপিকা নানারকম রোমান্সের কথা বলে। একটু ফষ্টিনষ্টি চলে স্বামী-স্ত্রীতে। আজ সেসবের ধার দিয়ে গেল না লিপিকা। সোজা উঠে বাথরুমে ঢুকে গেল। অভীকের চোখে ব্যাপারটা অস্বাভাবিক লাগল। মনে মনে ভাবল — যাহ বাবা, এই একটু আগে হাসিখুশি বউটার এরই মধ্যে কি হল? মনে করতে পারল না। কি থেকে হঠাৎ এত গম্ভীর হয়ে গেল?
এরপর দু’জনে ডাইনিং টেবিলে খেতে বসল। লিপিকার খেতেও তেমন ইচ্ছে করছিল না। স্নান করতে করতে ওর ছোট্ট সন্দেহটা ইতিমধ্যে একটা বিরাট গল্পে পরিণত হয়ে গেছে। ভাত নাড়াচাড়া করতে করতে সে ভেবে চলে। সেইজন্যে কিছুদিন ধরে অভীকের ব্যবহারে কিরকম একটা আড়ো আড়ো ছাড়ো ছাড়ো ভাব! সন্দেহের ভূত একবার যদি মাথায় ঢোকে তাহলে আর রক্ষে নেই। যে কোনো মধুর সম্পর্ক বিষিয়ে উঠতে বাধ্য।
অর্ধেক খেয়ে উঠে পড়ল লিপিকা। অভীক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার শরীর ঠিক আছে তো?’
বেসিনে মুখ ধুতে ধুতে কঠিন গলায় লিপিকা বলে উঠল, ‘কেন, আমার শরীর খারাপ হলে তুমি খুশি হও?’
— ‘দেখো কান্ড! কী প্রশ্নের কী উত্তর।’
অভীকের কথার আর কোনো জবাব না দিয়ে ও অফিস যাবার জন্যে ড্রেস পরতে চলে গেল। ব্যাজার মুখে অভীক বসে রইল। সে মনের ভেতর পোস্টমর্টেম করে চলল কী কারণে লিপিকা এই আচরণ করছে।
দু’জনে এক সঙ্গেই অফিস বেরোয়। অবাক হয়ে দেখল স্ত্রী বড় ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে জুতো পরছে। অভীক গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
লিপিকা বিদ্রুপের কণ্ঠে বলে উঠল, ‘তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। যার কথা চিন্তা করছিলে বসে বসে তার কথাই ভাবো। পুরনো কুৎসিত বউয়ের কথা ভাবতে হবে না।’
দরজাটা জোরে বন্ধ করে লিফটের দিকে এগিয়ে গেল। অভীক চুপচাপ বোকার মতো এঁটো হাতে দাঁড়িয়ে রইল। এবার তার মনে চাপা রাগ দানা বাঁধছে। অকারণে গায়ে গা লাগিয়ে ঝগড়ার কী প্রয়োজন? খুলে বললেই ল্যাঠা চুকে যায়। মেয়েদের এই এক স্বভাব।
ব্যাস, শুরু হয়ে গেল জাতির বিচার!
বিরক্ত মুখে সে অফিস যাবার জন্যে তৈরী হতে লাগল। দুজনের কাছেই ফ্ল্যাটের চাবি আছে। অভীক রোজ যাবার সময় লিপিকাকে ওর অফিসের সামনে বাইকে করে নামিয়ে দিয়ে যায়। অনেকদিন বাদে এই রুটিনে ছেদ পড়ল। অনেকের জীবনে সামনা সামনি খোলসা করে কথা না বলার জন্যেই দুরত্ব বাড়ে। অনেক সময় নিজেরাই একটা অবাস্তব গল্প খাড়া করে নিই। যেমন লিপিকা অফিসে বসে কাজের ফাঁকে ভেবে চলেছে। রুমির সঙ্গে অভীকের পরিচয় কতদিনের? বিয়ের আগে কি? তাহলে তাকে বিয়ে করার কী প্রয়োজন ছিল? যে কোনো অজুহাতে এড়িয়ে যেতে পারত! যতদূর ধারণা বিয়ের পরে পরিচয় হয়েছে। ছেলেদের মন হল পদ্মপাতায় জলের মতো। একটু সুন্দরী মেয়ে তাকাল কি হাসল — ব্যাস, একেবারে গলে পড়ল! আর ঐ রুমিটাই বা কি? বিয়ে করা লোকটার সঙ্গে প্রেম? তোর একটা অঙ্গুলি হেলনে কত আইবুড়ো ছেলে পায়ে এসে লুটোপুটি খাবে!
আচমকা আরও একটা কথা মনে ভেসে ওঠে। অভীক হয়তো জানায়ইনি তার বিয়ের কথা! মনটা আরও বিষাক্ত হয়ে উঠল। অভীককে জিজ্ঞাসা করলে মিথ্যের চাষ শুরু করে দেবে। যেটা লিপিকার একেবারে না-পসন্দ। মেয়েরা সব কিছু মেনে নিতে পারে। শুধু নিজের ভালোবাসার ভাগ অন্য কেউ নেবে তা সহ্য করতে পারে না।
মাথাটা ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে সে। ভালোবাসা হারানোর চেয়ে মৃত্যু অনেক ভাল।
অফিসে পৌঁছে অভীক একবার ভাবল লিপিকাকে ফোন করে। হঠাৎ মেজাজের পরিবর্তনের কারণ কী? সে কি কিছু অন্যায় করেছে? তাহলে খুলে বলুক। তারপরেই মত পরিবর্তন করে। ফোনে যদি আবার ভারী ভারী কথা শুরু করে? তাহলে সে নিজেও সংযত থাকতে পারবে না। মুখ দিয়ে বাজে কথা বেরিয়ে আসবে। তার ফলে শুধু লোক হাসানো হবে! বরং বাড়ি গিয়ে সামনাসামনি আলোচনা করা ভাল।
একটা প্রবাদ বাক্য আছে — সময়ে সব কাজ সারতে হয়। নাহলে দেরিই হয়ে যায়। ওদের জীবনে সেটাই মনে হয় ঘটতে চলেছে। দেখা যাক, বিধাতা পুরুষের কী ইচ্ছা। আর যে ছবি নিয়ে একতরফা সন্দেহ তার উত্তরে অভীক কী বলে?
লিপিকা ভেবেছিল তার মান ভাঙাবার জন্যে হয়তো স্বামী ফোন করবে! কাজের মাঝে উৎকর্ণ হয়েছিল। কিন্তু নিরাশ হল। সেই সঙ্গে রাগের পারদ আরও চড়ল। অফিস থেকে বেরিয়ে ফ্ল্যাটের দিকে চলল। এখন আবার গিয়ে রান্নার ব্যবস্থা করতে হবে। সকালে কাজের মেয়ে এসে এক বেলার রান্না করে দিয়ে যায়। মনটা বিস্বাদে ভরা। এর ওপর জ্যামে আটকাল বাস। একে প্যাচপ্যাচে গরম। ভিড় বাসে দমবন্ধ হয়ে আসছে। সাড়ে ছ’টা বেজে গেছে। সাতটার সময় বাবু ফিরে আসবেন। মুখের কাছে চা চাই। নিজেও চাকরি করে সে। কিন্তু সংসারে কাজের মধ্যে সে একাই। এটাই বোধহয় মেয়েদের জীবনের অলিখিত নিয়ম।
যখন লিপিকা ফ্ল্যাটে এসে পৌঁছল তখন সাতটা বেজে গেছে। মনের মধ্যে একটা ক্ষীণ আশা জেগে উঠল। হয়তো অভীক দরজা খুলে এক গাল হেসে এক কাপ চা হাতে নিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানাবে। কিন্ত দরজার কাছে এসে বুঝল তার ধারণা সম্পূর্ণ মিথ্যে। বাবু এখনও ফেরেইনি। হয়তো ঐ রুমির সাথেই কোনো ক্যাফেতে বসে ফষ্টিনষ্টি করছে। একবারও ভাবল না, স্বামীও তো জ্যামে ফেঁসে থাকতে পারে? ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলতে খুলতে মাথাটা হিটারের মত গরম হয়ে গেল।
দ্বিতীয় পর্ব
ঘরে ঢুকে রাগের চোটে হাতের ব্যাগটা ছুঁড়ে সোফায় ফেলে দিল। হাতে নাইটি নিয়ে বাথরুমে ঢুকল। সালোয়ার-কামিজ ছেড়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। মেদহীন সুন্দর গড়ন তার। মুখশ্রী খুব একটা খারাপ নয়। গায়ের রংটাই যা একটু চাপা। এর মধ্যেই তাকে একঘেয়ে লেগে গেল অভীকের?
শাওয়ারটা চালিয়ে তার নিচে দাঁড়াল ও। বৃষ্টির মতো জলধারা তার পেলব শরীরকে শীতল করে চলল। উত্তপ্ত মাথাটা স্বল্প শান্ত হল। গোলাপি রঙের স্লিভলেস নাইটি পরে বাথরুম থেকে বেরোতেই সোফার ওপর গা এলিয়ে পড়ে থাকতে দেখল অভীককে। অফিসের জামা-প্যান্টটা পর্যন্ত ছাড়েনি। চোখের কোণ দিয়ে সাদা জামাতে লিপস্টিকের কোনো দাগ আছে কিনা দেখে নিল।
অভীক ঘেমো শরীর নিয়ে দাঁড়াল, ‘অমন করে জামার দিকে তাকিয়ে কেন ডার্লিং? জামাটা তুমিই পছন্দ করে কিনেছিলে।’
ওর মন জোগানো কথার উত্তর না দিয়ে বেডরুমে ঢুকল লিপিকা। ভেজা চুল হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শোকাবার জন্যে। অভীক একটু ক্ষুণ্ণ হল। মনের ঘরে কী জন্য এত গোঁসা সেটা মুখ ফুটে বললেই হয়! বুঝল আজ আর চা ভাগ্যে জুটবে না। অগত্যা কাঁধ ঝাঁকিয়ে সাদা টাওয়েল নিয়ে অফিসের পোশাক চেঞ্জ করে নিল। তারপর বাথরুমে ঢুকল।
এই সুযোগটাই লিপিকা খুঁজছিল। সেন্টার টেবিলে রাখা অভীকের মোবাইল নিয়ে কিচেনে গেল। প্রেসার কুকারে ডিম আর আলু সেদ্ধ করতে বসিয়ে ফোন অন করল। রুমির সেই ছবিটা বার করল। নিচে অভীক লিখেছে — ‘সত্যিই অসাধারণ ছবি। বিধাতা অনেক সময় নিয়ে মনোযোগ দিয়ে তোমায় তৈরী করেছে।’
লিপিকার কান দুটো গরম হয়ে উঠল। ছিঃ ছিঃ কিরকম নির্লজ্জ তোষামোদ! রুমি তার উত্তরে লিখেছে — ‘সাবধান, তোমার বউ যদি লেখাগুলো দেখতে পায়! সঙ্গে সঙ্গে ডিভোর্স।’
টয়লেটের দরজা খোলার শব্দ কানে আসতে ও ফোনটা যথাস্থানে রেখে এল। লোকটাকে একটা তুচ্ছ ঘৃণ্য কীটের মতন মনে হচ্ছে। পুরুষ মাত্রই কি সব এক? সুন্দরী মেয়ে দেখলেই জিভের লালা গড়ায়! কুকারে সিটি বাজল। গ্যাস বন্ধ করল সে। এই সময় অভীক এসে তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল। লিপিকার সমস্ত দেহ ঘৃণায় কিলবিল করে উঠল। এক ঝটকায় নিজেকে মুক্ত করে নিল, ‘আঃ, গরমে বিরক্ত কোরো না!’ বিরক্তি ঝরে পড়ল ওর মুখ থেকে।
অভীক দেখল বউয়ের মেজাজ এখনও গরম আছে। বুঝে পাচ্ছে না কেন? আবার শান্ত গলায় বলে উঠল, ‘তুমি সকাল থেকে এমন করছ কেন বলো তো? আমার অপরাধটা কি বলবে?’ লিপিকা মনে মনে ভাবে — যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না! আসল কথা বললে এখনই শুরু হয়ে যাবে গপ্পো বানাবার খেলা।
‘তুমি দয়া করে সোফায় বসে মোবাইল নিয়ে মহান কাজগুলো করো। দাসীবাঁদিকে রান্নাটা করতে দাও।’
অভীক বুঝল কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। হয়ত অফিসে কোনো ঝামেলা হয়েছে! গোলাপি নাইটি পরা লিপিকার সুন্দর ফিগারটা দেখে ভেবেছিল আজ রাতটা ভালো কাটবে। সে গুড়ে বালি পড়ল। সোফায় ফিরে এল। ওর মনেও এবার রাগ জমল। লিপিকা কি নিজেকে রানি এলিজাবেথ ভেবেছে? ও যদি ভেবে থাকে সারাক্ষণ রাগ দেখাবে আর স্বামী হেটো কুকুরের মতো তার রাগ ভাঙাবে — তাহলে ভুল করছে। চা পর্যন্ত করে দিল না। টেবিল থেকে জলের বোতল নিয়ে জল খেল অভীক। তারপর সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে ব্যালকনিতে চলে গেল।
একটু বাদে অভীকের মুঠোফোনটা বেজে উঠল। লিপিকা কিচেন থেকে দ্রুত বেরিয়ে স্ক্রিনে নামটা দেখল। সুলগ্না — এ আবার কোনজন? লিপিকা ক্রমশ গর্ত থেকে খাদে গিয়ে পড়ছে। ব্যালকনি থেকে ঘরে আসার আওয়াজ পেতেই ও কিচেনে চলে এসে কান খাড়া করে রইল। অভীক কল রিসিভ করে আবার ব্যালকনিতে চলে গেল। তার মানে গোপন কথা স্ত্রীকে শোনাবে না। সন্দেহ ক্রমশ গভীর হচ্ছে। তার অজান্তে অভীক কতগুলো মেয়ের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে? তবে কি সে তার সঙ্গেও একই খেলা খেলেছে? তাকে কাটাতে না পেরে বাধ্য হয়ে বিয়ে করেছে?
রাগে গা রি রি করতে থাকে ওর। ব্যালকনি থেকে স্বামীর হাসির শব্দ ওর কানে বিষ ঢেলে চলেছে। তখনি মনস্থির করে ফেলে লিপিকা। এর যোগ্য জবাব দেবে সে। লিপিকার জীবনটা যেমন নরকে পরিণত করেছে অভীক তেমনি ও-ও মুখোশধারী রোমিওর বাকি জীবন হেল করে দেবে।
এই হল বয়সের দোষ। একবার খোলাখুলি আলোচনা করলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত? অভীকেরও তো কিছু বলার ছিল হয়তো। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে রান্না করতে লাগল লিপিকা।
এক টেবিলে দুজনে খেতে বসল। যেন দু’জন অচেনা মানুষ। অভীক দেখল ডিমের তরকারিতে অত্যধিক ঝাল যা ও খেতে পারে না। তার মানে ইচ্ছে করে এত ঝাল দিয়েছে। ঠোঁট-মুখ জ্বলছে। থাকতে পারল না সে, ‘এত ঝাল রান্না কোনো মানুষে খেতে পারে?’
— ‘মানুষ সব পারে। ভালো-মন্দ খেতে হলে রাত দিনের লোক রাখলেই পারো।’ লিপিকার গলায় ডোন্ট কেয়ার ভাব।
অভীক খাওয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে বেডরুমে চলে গেল। সবেতে খুঁত ধরা স্বভাব এই লোকটার! যেন বিরাট কোম্পানির ম্যানেজিং ডাইরেক্টর! আমিও তো চাকরি করি, আবার এই সংসার টানি। মনের ভেতর গর্জায় লিপিকা। যখন কারোর ওপর বিতৃষ্ণা আসে, তার প্রতিটি জিনিস খারাপ লাগে। প্লেট-বাটি সিঙ্কে রেখে এসে টিভি চালিয়ে বসে লিপিকা। এই মুহূর্তে ঘরে গিয়ে স্বামীর পাশে শোবার মুডটা নষ্ট হয়ে গেছে। মাথার ভেতর চিন্তাগুলো তাকে কুরে-কুরে খাচ্ছে। ছোট থেকেই এই স্বভাব লিপিকার। নিজে যেটা ভাববে সেটাই ধ্রুব সত্য।
এদিকে ঘরে শুয়ে অভীক অপেক্ষা করছিল স্ত্রী এলে আর একবার চেষ্টা করবে জানার তার হঠাৎ রাগের কারণটা কী! কিন্তু টিভির শব্দ কানে আসতে বুঝল লাভ নেই। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে শুয়ে অভীক ঘুমিয়ে পড়ল। আর তখনই লিপিকা সিদ্ধান্তে এল — আত্মহত্যা! এক টুকরো ভুল বোঝাবুঝির জন্যে এত বড় মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত? মানুষের সন্দেহ এমন মারাত্মক জিনিস। তখন লঘু-গুরু জ্ঞান সে হারিয়ে ফেলে। যা আকছার এখন সমাজে ঘটে চলেছে। পরীক্ষায় ফেল, প্রেমে অসফল, সংসারে অশান্তি, বাবা মায়ের শাসন — একটু উনিশ-বিশ ঘটলেই চলো, সুইসাইড করে ফেলি। এই মুহূর্তে লিপিকার মতো শিক্ষিতা, চাকুরীরতা মেয়েও সেই ফাঁদে ধরা দিল।
টিভি সামনে চললেও ওর মস্তিষ্কে চলছে সুইসাইডের জোগাড়যন্ত্র। সে নিজে মরবে কিন্তু অভীককেও ফাঁসিয়ে দিয়ে যাবে যাতে বাকি জীবনটা ও গরাদের ভেতরে বসে অনুশোচনা করে। ঘড়ির দিকে তাকাল সে। এগারোটা বাজতে চলেছে। এবার তাকে একটু ঠান্ডা মাথায় প্ল্যান খাটাতে হবে। তার আগে ঘরে গিয়ে দেখতে হবে স্বামী ঘুমিয়েছে কিনা।
অন্তিম পর্ব
লিপিকা সন্তর্পণে উঠে বেডরুমে গিয়ে দরজা খুলে দেখল। নাক ডাকিয়ে তোফা ঘুমোচ্ছে অভীক। আর এদিকে সে নিজের সুন্দর জীবনটাকে আর কয়েক মুহূর্ত বাদে শেষ করে দিতে চলেছে! দরজা ভেজিয়ে দিয়ে যথাস্থানে ফিরে এল।
বেশ কিছু থ্রিলার বই ও পড়েছিল। তাই মাথা খুলতে দেরি লাগল না। প্যাডের পাতা বার করে সুইসাইড নোট লিখতে শুরু করল:
‘নিজেই সিদ্ধান্ত নিলাম এ জীবন আর রেখে লাভ নেই। যাকে ভালোবেসে এই জীবন শুরু করেছিলাম তার কাছ থেকেই যখন এতবড় বিশ্বাসঘাতকতার প্রমাণ পেলাম! হ্যাঁ, আমার হাজ়ব্যান্ড অভীক কুমার রায়। জানতে পারলাম তার মতো দুশ্চরিত্র খুব কম আছে। প্রথমে ওর ফোনে রুমির ছবিটা দেখে সন্দেহ হয়। তারপর ওর টাইপ করা নোংরা লেখাগুলো সন্দেহের ভিতকে শক্ত করে। একটু আগে আবার অন্য একজন মহিলা কল করে। অভীকের মোবাইল সেট ভেরিফাই করলে আমার কথার সত্যতা জানা যাবে। আমি চাই আমার অকাল মৃত্যুর জন্যে আমার স্বামী কড়া শাস্তি পাক।
— লিপিকা রায়।
লেখাটা বার দুয়েক পড়ল লিপিকা। এতেই ওর শাস্তি হবে আশা করি। টিভির দিকে একবার তাকাল। একটা মারপিটের সিনেমা হচ্ছে। অভীকের ঘুম পাতলা হলে ভাববে বউ টিভি দেখছে। অবশ্য ঘুম পাতলা হবার সম্ভাবনা কম। ইদানিং শোবার আগে দু’পেগ করে ড্রিঙ্ক করে। নাহলে নাকি ঘুম আসতে চায় না। যেদিন দুজনে সহবাসে মিলিত হয় সেদিন শুধু মদ খাওয়া বাদ।
কিন্তু কাগজটা রাখবে কোথায়? যাতে শুধু পুলিশের চোখে পড়ে! আগে অভীকের চোখে পড়লে সরিয়ে ফেলবে। হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। চিঠিটার একটা ছবি তুলে তার মায়ের হোয়াটসঅ্যাপে সেন্ড করে দিল। জানে রাত বারোটায় মা ঘুমের সাগরে। আর যখন দেখবে, তখন মেয়ে… মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। পরক্ষণেই সেটা কাটিয়ে উঠল। বরং নিজের বুদ্ধির তারিফ করল। আচমকা একটা খটকা লাগল মনে। বুদ্ধিটা এত জলদি তার মাথায় এল কী করে? মনে হচ্ছে কেউ বা কারা অগোচরে তাকে অনবরত সাহায্য করে চলেছে নিখুঁতভাবে সুইসাইড করার জন্য। মগজে কথাটা আসতেই নিজের অজান্তে শরীরে এক শিহরণ খেলে গেল। কেন জানে না মনটা একবার দুলে উঠল। ডাইনিং রুমে একা বসে আছে সে। শুধু টিভির শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই। কারণ রাত্রি ইতিমধ্যে কিশোর থেকে যুবক হতে চলেছে। পাখাটা মাথার ওপর বনবন করে ঘুরে চলেছে। ঘাড় উঁচু করে পাখার দিকে তাকাল সে। যেন পাখাটা বলে উঠল, ‘ভয় কি আমি তো রয়েছি!’
পাতলা ভয়ের রেশ ওর নরম শরীরকে ছুঁল! ওর মনে হল পরিবেশটা ধীরগতিতে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পরিবর্তনটা কী? ও ধরতে পারছে না। সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠল ঊনত্রিশ বছরের লিপিকা। চিঠিটা নিয়ে টিভির সামনে কাবার্ডের ওপর রিমোট চাপা দিয়ে রাখল। মনস্থির করে নিয়েছে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলবে সে। শালোয়ারের ওড়না গলায় জড়িয়ে পাখা থেকে ঝুলে পড়বে। কিন্তু কে যেন কানের কাছে গুনগুন করে বলে উঠল, ওতে রিস্ক আছে। মাঝপথে ছিঁড়ে যেতে পারে। তার থেকে মোটা প্লাস্টিক দড়ি হচ্ছে বেস্ট! যেটা ব্যালকনিতে টাঙানো আছে কাপড় শুকোতে দেবার জন্য।
‘কে?’
আচমকা প্রশ্নটা ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল। ভয়ার্ত চোখ দুটো ফাঁকা ঘরে ঘুরে বেড়াল! তবে কি অভীক চাইছে তার জীবন থেকে তাড়াতাড়ি দূর করতে তাকে? কিন্তু ও তো গভীর ঘুমে মগ্ন! বুকের স্পন্দন দ্রুত হচ্ছে। নিজেকে বোঝাল তার উর্বর মস্তিষ্কই এই কান্ড ঘটাচ্ছে। ও পায়ে পায়ে ব্যালকনির দিকে এগোতেই ওর কানের কাছে কারোর স্বস্তির শ্বাস পড়ল। আবার থমকাল সে। ও কি মনে মনে দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে এমন মনে হচ্ছে? মনকে সংযত করল। অন্ধকার ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। দড়ির দু’দিকের হুক ওর হাতের নাগালের বাইরে। হঠাৎ মনে হল এই সাততলা উঁচু ব্যালকনি থেকে লাফালেই তো কাম ফতে। নিচের দিকে তাকাতে দুজন সিকিউরিটির লোককে দেখতে পেল। চিন্তাটা মাথা থেকে সরিয়ে দিল। এখন তাকে চেয়ার নিয়ে এসে তার ওপর উঠে ছুরি দিয়ে দড়ি কাটতে হবে। এইসব করতে গিয়ে আবার আওয়াজ না হয়! গরমে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল। আর একবার চেষ্টা করতে গিয়ে অবাক হয়ে গেল। এই তো নাগালের মধ্যে হুকটাকে পাচ্ছে! কেউ মন্ত্রশক্তি প্রয়োগ করে লোহার হুক দুটোকে খানিকটা করে নামিয়ে দিয়েছে! কে সে ? যে চাইছে তার মৃত্যুকে নিশ্চিত করতে। প্রতি পদক্ষেপে তাকে সাহায্য করে চলেছে! দড়ি হাতে নিয়ে সে ঘরে ঢুকে বারান্দার দরজা বন্ধ করে দিল।
ঘরে ঢুকে ভয়ে এবার বিষম খেল লিপিকা! পাখাটা স্থির চোখে তিনটে হাত ছড়িয়ে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে। সে কখন পাখা বন্ধ করল? তাহলে মৃত্যুভয়ে সে উল্টোপাল্টা কাজ করে যাচ্ছে যা স্মরণে থাকছে না? পাখা বন্ধ থাকার ফলে সে ঘামতে শুরু করেছে। জল তেষ্টা পাচ্ছে। রান্নাঘরে এসে ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা জলের বোতল বার করে গলায় ঢালল। এটাই জীবনের শেষ জল খাওয়া। দাঁতে দাঁত চেপে মনকে শক্ত করল। আর তো কয়েক মিনিটের ব্যাপার। পড়ে থাকবে তার এক আলমারি ভর্তি পছন্দ করা শাড়ি-গয়না-কসমেটিক্স। শুধু থাকবে না লিপিকা।
কিচেন থেকে বেরিয়ে এসে কাঁচের সেন্টার টেবিলটা পাখার তলা থেকে সরিয়ে দেয়। এর মধ্যে গলদঘর্ম হয়ে উঠেছে! নাইটির বুক-পিঠ ভেজা। হাতে দড়ি নিয়ে চেয়ারের ওপর উঠে দাঁড়াল। খুব একটা লম্বা নয় লিপিকা। ঝুলন্ত পাখার লোহার রড নাগালে পাচ্ছে না। সারা মুখ ঘামে জবজব করছে। কপাল থেকে দু’-চার ফোঁটা ঘাম হাতে পড়ল। বরফের ফোঁটা যেন। এবার কী উপায়? এতক্ষণ যারা ওকে সাহায্য করছিল তারা কোথায় গেল? অর্থাৎ তার সূক্ষ্ম বুদ্ধিগুলো?
কথাটা মনে আসতেই কেউ যেন তার ঘাড় ধরে দৃষ্টিটা কোণায় দাঁড় করানো উঁচু টুলটার দিকে ফেরাল। টুলটার ওপর ফুলদানি রাখা থাকে। চেয়ার থেকে নেমে পড়ে সোফায় বসে পড়ে। এরই মধ্যে হাঁপিয়ে গেছে। এত গরম লাগছে মনে হচ্ছে বেডরুমে গিয়ে ঠান্ডায় শুয়ে পড়ে। টিভির শব্দটাও বড় কানে লাগছে। আসলে, রাত যত বাড়ছে চারিদিক তত নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে টিভির আওয়াজ কানে লাগছে। এক মিনিট চোখ বুজে বড় শ্বাস নিল। কানে লাগা টিভির শব্দ হঠাৎ কমে যেতে চোখ খোলে সে। রিমোট যথাস্থানে আছে। ভলিউম কী করে নিজে থেকে কমে গেল? অবাক হওয়ার আরও কিছু বাকি ছিল লিপিকার। আতঙ্কিত চোখে দেখল উঁচু টুলটা পাখার নিচে রয়েছে। সে একশো ভাগ নিশ্চিত যে টুলটা সে আনেনি এবং টিভির ভলিউমও কমায়নি! কোনো অদৃশ্য শক্তি এই ঘরে আছে যে লিপিকাকে ক্রমাগত হেল্প করে চলেছে সুইসাইডের জন্য। ঘড়িতে সাড়ে বারোটা বাজছে।
লিপিকার আবার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। নিজেকে ঝাঁকুনি দিল। হয়তো মৃত্যুর আগে মানুষের মনের অবস্থা এরকম হয়। স্নায়ুগুলো ঠিকঠাক কাজ করে না। সেটাই ঘটছে হয়তো তার ক্ষেত্রে। এইসব ভেবে মনের মধ্যে থাকা ভয়টা তাড়াতে সে চেষ্টা করে। একটা পুরনো কথা ওর মনে পড়ে যায়। ছোটবেলায় ঠাকুমা বলত কখনও ছুরি, ব্লেড, কাঁচি, বঁটিতে হাত দেবে না। ওরা নাকি ডাকে! সবসময় বাচ্চাদের ভজায় বা ফুসলায়। লিপিকা বড় হয়ে কথাগুলো মনে পড়লে হাসত। আসলে বাচ্চারা যাতে ঐসব ধারালো জিনিসে হাত না দেয় সেজন্য ভয় দেখানো হত।
এখন হাসি আসছে না তার। কথাগুলো কেমন যেন সত্যি মনে হচ্ছে! নাহলে পরপর কতগুলো অবাস্তব ঘটনা ঘটে গেল। বারান্দায় দড়ির হুকগুলো কয়েক মিনিটে হাতের কাছে নেমে এল! পাখা আপনা থেকে বন্ধ হয়ে গেল! টিভির সাউন্ড কমে গেল! টুল পায়ে হেঁটে চলে এল! লিপিকার মাথায় প্রশ্নগুলো নিজেদের মধ্যে কাটাকুটি খেলে চলেছে। নাঃ, আর সময় নষ্ট করে লাভ নেই। ভাবনার ভূতকে ঘাড় থেকে নামানো দরকার। মনের সব শক্তিকে একজোট করে কাঁপা পায়ে ও টুলে উঠে পড়ল। এবার পাখাটা নাগালের মধ্যে কেমন যেন দাঁত বার করে হাসছে। দড়িটা রডের সঙ্গে বাঁধল। ঘর্মাক্ত নরম গলায় দড়ির ফাঁস লাগাবার চেষ্টা করল। কিন্তু প্লাস্টিক দড়িটাকে কব্জা করতে পারছে না। হাতদুটো বারে বারে কেঁপে যাচ্ছে। ঘাড় উঁচু করে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকায় শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
কানের কাছে ফের ফিসফিস করে কেউ বলে উঠল, ‘পারবি, পারবি। ঠিক পারবি। আমরা রয়েছি তোর পাশে।’
উঁচু টুলে দাঁড়িয়ে কণ্ঠস্বরের উৎস খুঁজতে গিয়ে এক লহমার জন্যে ফুসফুসটা বোধহয় বন্ধ হয়ে গেল। ওরা কে? ব্যালকনির বন্ধ দরজার সামনে দুটো অস্পষ্ট কালচে ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ধোঁয়াটে কালো বাঁকাচোরা হাতগুলো হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকছে!
আচমকা একটা বরফ শীতল অনুভূতি গলার কাছে অনুভূত হল। বিস্ফারিত চোখে দেখল দুটো কনুই পর্যন্ত কাটা হাত তার গলায় ফাঁসটা শক্ত করে বেঁধে দিচ্ছে। যেন অদৃশ্য শক্তি তাকে আর সময় দিতে রাজি নয়। আর সহ্য করতে পারল না লিপিকা। মৃত্যুর আগে এইরকম অভিজ্ঞতা সে কল্পনা করতে পারেনি। ভয়াল আতঙ্কে তার গলা চিরে তীব্র আর্তনাদ বেরিয়ে এল। সেই অন্তিম আর্তনাদ ঘরের কোণে কোণে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
উপসংহার
শোবার আগে অভীক আজ ড্রিঙ্ক করেনি। কারণ মনটা খিঁচিয়ে ছিল। লিপিকার হঠাৎ রাগের কারণ খুঁজতে খুঁজতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমের মধ্যে লিপিকার ঐ অমানুষিক চিৎকার কানে এসে এক নিমেষে ঘুমটাকে তাড়িয়ে দিল। ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে দেখে পাশে স্ত্রী নেই। এক লাফে ঘর ছেড়ে বেরিয়েই ঐ ভয়ঙ্কর দৃশ্যের মুখোমুখি হল। তার সারা দেহের রক্ত চলাচল এক সেকেন্ডের জন্যে থেমে গিয়ে দ্রুত চলতে শুরু করল। বিদ্যুৎবেগে ছুটে গিয়ে টুলের ওপর দাঁড়ানো লিপিকাকে জাপটে ধরল। কোনোরকমে ওকে নামাবার চেষ্টা করল। লিপিকা তার অবশ হাত দুটো দিয়ে অভীকের কাঁধ দুটো ধরল। তখনও ওর গলায় প্লাস্টিকের দড়ির ফাঁস আটকানো। অভীক জানে একটু এদিক-ওদিক হলে ফাঁস গলায় আটকে যাবে। তখন বাঁচানো মুশকিল হয়ে যাবে।
‘প্লিজ়, তুমি এক মিনিটের জন্য স্থির হয়ে দাঁড়াও। আমি চেয়ারের ওপর উঠছি।’ অভীকের গলায় কাতর অনুরোধ। ঘুমচোখে চেয়ে এই দৃশ্য দেখে তার হাত-পা রীতিমতো কাঁপছে। এক মিনিটের এদিক-ওদিক হলে বিরাট বিপদ হয়ে যাবে। চেয়ারে উঠে সাবধানে বউয়ের গলার ফাঁসটা খুলে নির্জীব লিপিকাকে পাঁজাকোলা করে ঘরে এনে শুইয়ে দিল। চোখ বন্ধ লিপিকা ধীরে ধীরে শ্বাস নিচ্ছে। অভীক ভেবে পাচ্ছে না কেন এমন মারাত্মক সিদ্ধান্ত নিতে চলেছিল লিপিকা? ও ঝুঁকে পড়ে স্ত্রীর ভয়ার্ত মুখটা দেখে। মরার আগে নিশ্চয়ই খুব ভয় পেয়েছিল।
রাত দেড়টা নাগাদ লিপিকা কিছুটা সুস্থ অনুভব করল। মুখের সামনে উদ্ভ্রান্তের মতো অভীককে বসে থাকতে দেখে মনের মাঝে জমা রাগ দুঃখ মিলেমিশে সারা মুখে ফুটে উঠল। পরম যত্নে ওর কপালে হাত বোলাতে বোলাতে অভীক বলল, ‘আমার লক্ষ্মী মেয়ে, সোনা মেয়ে। এবার বলো তো কী কারণে তুমি শেষ পথটা বেছে নিয়েছিলে?’
— ‘আমি অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে তোমার ভালোবাসাকে শেয়ার করতে পারব না। তুমি শুধু আমার। একান্ত আমার।’
— ‘কে বলল তোমায় আমাকে শেয়ার করতে হবে?’ ভুরু কুঁচকোল অভীক।
উঠে বসে লিপিকা, ‘কেন? রুমি? সুলগ্না — আরও কত কে।’
— ‘রুমি ? তাকে কোথায় পেলে ? সে তো আমার দুর সম্পর্কের খুড়তুতো বোন। কানপুরে থাকে। ব্যাঙ্কে চাকরি করে। আমাদের বিয়ের সময় আসতে পারেনি। কাল সকালেই ফোন করে তোমার সন্দেহ দূর করছি। আর সুলগ্না হল আমাদের কোম্পানির অডিটর। বয়স পঞ্চান্ন। তুমি কথাগুলো আগে বললে সন্দেহ দূর করে দিতাম। এত অবিশ্বাস করো আমাকে?’
লিপিকার চোখে লজ্জার ছোঁয়া, ‘যাকে প্রাণের থেকেও বেশি ভালোবাসি, সেখানেই সন্দেহ থাকে। তবে এখন মনে হচ্ছে আলোচনা করাটা হয়তো ঠিক ছিল।’
— ‘যাক, চেতনা হয়েছে। এবার বলো ভয়ঙ্কর আর্তনাদের পিছনে কী রহস্য ছিল?’
লিপিকার চোখে ফুটে উঠল বীভৎস দৃশ্যগুলোর ছবি, ‘আজ রাত্রে শুনতে চেয়ো না। তাহলে হয়তো ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাব। কাল সকালে দু’জনেই অফিস যাব না। সব বলব তোমায় একটু আগে যে ঘটনাগুলো আমার চোখের সামনে ঘটে গেল। আত্মহত্যার কথা মনে আনাও যে মহাপাপ এখন মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি। অপঘাতে মরা মানুষগুলো আমাদের চারপাশে হাওয়ায় মিশে থাকে। সুযোগ পেলেই দলে টানার চেষ্টা করে।’
অভীক বুঝল কোনো ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা লিপিকার হয়েছে। এই রাতে শোনার জন্যে বেশি চাপ না দেওয়াই ভালো।
