বৈদ্যুতিক চুল্লি – শঙ্কর চ্যাটার্জী
প্রথম পর্ব
হারু ইলেক্ট্রিকের কাজ করছে প্রায় আট বছর। এখন পুরোপুরি পাকা মিস্ত্রি হয়ে গেছে। ওর অধীনেই এখন তিনটে ছেলে কাজ করে। একটা দোকানও দিয়েছে। দিন রাত একটুও ফুরসৎ নেই।
সেদিন সাত সকালেই মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যানের ফোন এল, ‘হারু, শ্মশান ঘাটের চুল্লিটা বিগড়েছে কাল রাত থেকে। আগেরবার তুই ঠিক করে দিয়েছিলিস। এক্ষুণি একবার গিয়ে দেখ। তাড়াতাড়ি না ঠিক হলে খুব মুশকিল।’
সকাল সকাল হারুর মেজাজটা গেল বিগড়ে। গতবার চুল্লিতে কাজ করার সময়ই কসম খেয়েছিল আর এই আগুন ঘরে ঢুকে সে কোনদিন কাজ করবে না। ওর ছেলেগুলো পর্যন্ত কাজ করতে চায় না। কেমন যেন একটা গা ছমছম করে, যখনই মনে পড়ে যায় প্রতিদিন কত শত মড়া এখানে পোড়ে! কিন্তু চেয়ারম্যানের মুখের ওপর না বলাটাও কঠিন। বাধ্য হল যেতে। আগে গিয়ে দেখতে হবে কোনো শট সার্কিট হয়েছে কি না। যদি বড়সড় কোনো ফল্ট হয়ে থাকে তাহলে জানিয়ে দেবে ইঞ্জিনিয়ার ডেকে সারাতে। তার কম্মো নয়। সাইকেল নিয়ে একাই শ্মশানের দিকে চলল সে। মনে মনে ভাবল তার মানে এখন দাহের কাজ কাঠের চিতায় চলছে।
মিনিট দশেক বাদেই গঙ্গার দিকে রাস্তাটা ধরল। অন্যান্য কাজে ছেলেগুলোকে পাঠিয়ে দিয়েছে। এবার শ্মশানের রাস্তাটা ধরল। একটা বিড়ি ধরাল। শ্মশানের কাছাকাছি আসতেই মাংস পোড়ার গন্ধটা নাকে এসে লাগল। বড় বট গাছটার পাশ দিয়ে শ্মশানের ভেতর ঢুকল। কমিটির ঘরের সামনে এসে সাইকেলে লক করে দিল। ঘরের ভেতর থেকে সৎকার সমিতির ছেলে কমল বেরিয়ে এল, ‘এসেছ হারুদা! তোমার জন্যই অপেক্ষা করছি। কাল রাত থেকে চুল্লি অকেজো হয়ে গেছে।’
এক মুখ বিরক্তি নিয়ে সাইকেলের হ্যান্ডেল থেকে যন্ত্রপাতির ব্যাগটা বার করল হারু, ‘চুল্লির ঘরের শাটারটা খুলবে চলো।’ বলে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে লাগল।
‘এক্ষুণি আসছি,’ কমল বলল।
একটু ওপরে উঠেই দেওয়াল ঘেরা জায়গাটায় দাঁড়াল ও। এক কোণে এক গাদা শুকনো রজনীগন্ধা পড়ে আছে। একটা বোঁটকা গন্ধ সারা জায়গা জুড়ে ম ম করছে। আধ পোড়া কয়েক গোছা ধূপকাঠি। খালি মধু আর ঘিয়ের শিশি। এসব দেখলেই ওর মনে কীরকম একটা অস্বস্তি জাগে। এরপর আবার আসল ঘরে ঢুকতে হবে। আগের বারে ঢুকে মনে হয়েছিল একটা রাক্ষুসে হিটার ঘরে যেন ঢুকে পড়েছে! সেবার তবু সঙ্গে সহকারী মিহির ছিল। ও দেওয়ালে লাগানো বড় সুইচ বোর্ডটা দেখল। আগে বরং এই মেইন সুইচগুলো চেক করা যাক। এখানে কোনো তারের গন্ডগোল থাকলে ল্যাঠা চুকে যায়।
কিন্তু হারু কল্পনাও করতে পারেনি ইতিমধ্যেই সে বিরাট বিপদের মধ্যে ঢুকে পড়েছে!
স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে একমনে মেইন সুইচটা খুলছিল। এই সময় কমল পিছনে এসে চাবি হাতে দাঁড়াল। খেয়াল করেনি ও।
‘শাটারটা খুলব নাকি?’ হঠাৎ গলার স্বরটা শুনে চমকে উঠল হারু। হাত থেকে স্ক্রু ড্রাইভারটা পড়ে গেল। ‘একটু সাড়া দিয়ে আসতে পারোনি?’ খেঁকিয়ে উঠল হারু।
কমল বুঝল হারুদা ভয় পেয়ে গেছে। চুপ করে রইল। সবে সকাল সাড়ে নটা। চারদিকে রোদ ফটফট করছে! কমলের মত রাতবিরেতে এখানে থাকলে কী করত! মনে মনে ভাবে কমল। ও চাবি দিয়ে মড়া পোড়াবার ঘরের শাটারটা ঘড়ঘড় করে খুলল। হারুর মনে হল ভয়ের দরজাটা কে যেন খুলে দিল!
সেই চামড়া পোড়ার গন্ধটা নাকে ভক করে এসে ধাক্কা মারল।
‘আমার হয়েছে যত জ্বালা!’ কমল গজগজ করতে থাকে, ‘শেষ রাতে মড়াটা এল। ভাগ্যিস আধ পোড়া অবস্থায় চুল্লি খারাপ হয়ে যায়নি! তাহলে আরও কেলেঙ্কারি হত। তবু পুরোটা ছাই হয়নি।’
‘তুই থামবি?’ হারুর গলা। এইসব কথা বলে আরও ওর মনে ভয় ঢোকাচ্ছে ছেলেটা।
‘আমি কিছু জানতে চেয়েছি ?’ কমলের এবার রাগ ধরে যায়।
‘বেশ, তুমি কাজ করো। আমি নিচে অফিস ঘরে আছি। যদি কেউ আবার মৃতদেহ নিয়ে আসে! অবশ্য অনেকেই এতক্ষণে খবর পেয়ে গেছে। সবাই চারুচন্দ্র ঘাটে চলে যাচ্ছে।’ কমল সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল। একটা নীরবতা নেমে এল। মাটি থেকে স্ক্রু ড্রাইভারটা নিচু হয়ে কুড়োবার সময় হারুর চোখটা খোলা ইলেকট্রিক চুল্লির ভেতর গিয়ে পড়ল। কিছুটা ছাই পড়ে আছে। বাইরের হাওয়া ঢুকে পড়ার জন্যই বোধহয় ছাইগুলো উড়ছে। চোখটা জোর করে সরিয়ে নিয়ে কাজে মন দিল। কমলকে না চটালেই ভালো ছিল। হারু এমনিতে ভীতু নয়। কিন্তু এইসব জায়গায় এসে পড়লে ও কীরকম ভীতু হয়ে পড়ে! সামনের বড় নিম গাছটার পাতাগুলো বাতাসে শির শির করে কাঁপছে। ঠিক যেন মানুষের মতো ভয় পেয়ে কাঁপছে! ওর মনেও একটা শিরশিরানি ভাব লাগছে।
মেইন সুইচ খুলে দেখল সবই ঠিক আছে। তার মানে এবার ওকে ভেতরে ঢুকতে হবে। তখনই কমলের বলা কথাটা মনে পড়ে গেল। ও বলল মৃতদেহটা পুরো পোড়েনি! তবে কি ছাইয়ের মধ্যে এখনও কিছু অবশিষ্ট পড়ে আছে? কাজ মাথায় উঠল। কমলকে ডেকে আনাই স্থির করল।
সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে দেখল অফিস ঘরে তালা ঝুলছে। এপাশ-ওপাশ তাকিয়েও কমলের দেখা পেল না। সারা শ্মশান এলাকা খাঁ খাঁ করছে। মৃতদেহ না এলে কে-ই বা থাকবে? গঙ্গার ছলাৎ ছলাৎ জলের শব্দ শুধু কানে আসছে। ওকে কিছু না বলে কোথায় গেল? এদিকে ওপরে চুল্লি ঘর খোলা পড়ে আছে! ওখানে একা গিয়ে কাজ করতে হবে ভাবলেই হারুর বুক শুকিয়ে যাচ্ছে! হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল ওর। সাইকেলে চড়ে এখানে আসার সময় একটা মড়া পোড়ানোর গন্ধ পেয়েছিল। কিন্তু এখানে এই মুহূর্তে কোনো মৃতদেহ দাহ হয়নি! তবে? সেই সময় কোনো আত্মা ওর পিছু নেয়নি তো? সে শুনেছে কাছাকাছি কোনো অশুভ আত্মা থাকলে অমন বিটকেল গন্ধ ছাড়ে! সুযোগ পেয়ে এতক্ষণে কাঁধে ভর করেনি তো? কথাগুলো মাথায় আসতেই হাত-পা কেমন অবশ লাগল।
ভয় জিনিসটা একবার মনের মধ্যে ঢুকে পড়লেই বিপদ। মানুষকে একেবারে বশীভূত করে ফেলে। বিচার বুদ্ধি তখন কোনো কাজ করে না। চারিদিকে ভুল দেখতে শুরু করে! যেমন এই মুহূর্তে হারুর অবস্থা। এই সকালবেলাতেও ভয় ওকে পাকে পাকে ক্রমশ জড়িয়ে ধরতে শুরু করল। মনেও পড়ল না পকেটে মোবাইলটা রয়েছে। ইচ্ছে করলেই সবাইয়ের সাথে এক্ষুণি যোগাযোগ করতে পারে।
আচমকা ওর কানে ঘড়ঘড় করে শাটার টানার শব্দটা এসে ঢুকল। ওর মুখের সমস্ত রক্ত কে যেন এক নিমেষে ব্লটিং পেপার দিয়ে শুষে নিল। ওখানে তো কেউ নেই! নিজে থেকে শাটারটা বন্ধ হল কী করে? বুকটা ধড়ফড় করছে। যন্ত্রপাতির ব্যাগটা ফেলে রেখেই পালাবে? কিন্তু কয়েকটা দামি যন্ত্র আছে। বড় একটা ঢোঁক গিলল ও। সিঁড়িটার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাল। আচ্ছা এমন তো হতে পারে, কমল ওর চোখকে ফাঁকি দিয়েই ওপরে গেছে! অন্যমনস্কতার জন্যে দেখতে পায়নি।
এবার মনে একটু সাহস এল। ভাবনার ভূত মাথা থেকে নামতে শুরু করল। দেশলাই জ্বালিয়ে আবার একটা বিড়ি ধরাল। কিন্তু ওর মস্তিষ্কে অশুভ একটা সংকেত কেউ দিয়ে চলেছে। শ্মশানের গাছগুলোর ওপর দিয়ে একটা সকরুণ হাওয়া বয়ে চলেছে। বাতাসের কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। শোনা যাচ্ছে শুধুমাত্র একটা আতঙ্কময় করুণ বিলাপধ্বনি। মনে হয় যেন কোনো হতভাগ্যের শেষকৃত্যের জন্য কোনো অশরীরীর আর্তনাদ! বাতাসের জলীয় কণাগুলো বয়ে আনছে সেই বিষাদময় ঐ ধ্বনির সকরুণ ব্যঞ্জনা!
বিড়িটা ফেলে দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করল মনকে শক্ত করতে। ব্যাগটা নামিয়ে এনে কেটে পড়তে হবে। হারু চুল্লি ঘরে যাবার জন্য সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা দিয়েই চরম ভুলটা করে ফেলল। কমলের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। নিজের কণ্ঠস্বর নিজের কানে শুনেও ভয়টা কমতে লাগল। কিন্তু যার নাম ধরে ডাকা তার কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না।
চুল্লির সামনে এসে ও অবাক হয়ে গেল। শাটারটা পুরো খোলা! ও নিজের কানে শুনেছে বন্ধ হবার ঘড়ঘড় শব্দ। তাহলে আবার কখন খুলল? তাও নিঃশব্দে? এ যেন ভেলকিবাজি!
ওকে এবার ঐ দু’ধারে তারের বড় বোর্ডগুলোর কভারটা খুলতে হবে। এই সময় চোখে পড়ল ছাইগুলোর ভেতর হাঁটু মুড়ে বসে পিছন ঘুরে কে যেন কিছু খুঁজছে! ভয়ের জায়গায় এবার রাগটা ফিরে এল। ব্যাটা কমল এখানে বসে মড়ার ছাই ঘাঁটছে? আর সে যে গলা ফাটিয়ে ডাকছে তার কোনো সাড়া দিচ্ছে না!
হারু বিরক্ত কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘কী রে কালা! আমার ডাক কানে যাচ্ছে না? এই ছাইয়ের ভেতর কী খুঁজছিস? কী কী অংশ পোড়েনি তাই দেখছিস?’ কমল হাঁটু গেড়ে বসেই জবাব দিল, ‘কাল রাতে নাভিটা গঙ্গার জলে দেওয়া হয়নি! ওটা জলে না দিলে আত্মার সদগতি হয় না।’
কমলের গলার আওয়াজটা কেমন যেন অচেনা ঠেকল হারুর কানে। ঐ ছোট্ট বদ্ধ ঘরে ওরা শুধু দু’জন। মনে একটা সন্দেহ দেখা দিল। এই কাজ তো কমল করে না! আর ও নিঃসন্দেহ যে এটা কমলের গলার স্বর নয়। কেমন যেন ফ্যাঁসফেঁসে, ভেজা ভেজা কণ্ঠ!
ইতিমধ্যে লোকটা ডান হাতে একটা মাংসের ডেলা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। সরু পোড়া হাতটা হারুর দিকে বাড়িয়ে ধরে বলল, ‘এতক্ষণে শান্তি পেলাম। নিজের নাভিটা নিজের হাতেই গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দিই গে যাই।’
হারু লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে একেবারে চমকে উঠল। এটা কে? মুখের জায়গায় শুধু পোড়া একটা মুন্ডু! কী বীভৎস লাগছে! মনে হচ্ছে এখনই ওর গলা টিপবে। ওর হাতের তালুতে রয়েছে একটা ছাই মাখানো মাংসের টুকরো। ওর কথায় নাভি! একেই কাল রাতে শেষ পোড়ানো হয়েছিল? ঐ ভয়ঙ্কর দৃশ্য আর কথাগুলো ওর মনে ঢুকে পড়তেই আতঙ্কের শীতল নাগপাশ তার হৃৎপিণ্ডকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। দু’ চোখে অন্ধকার দেখতে লাগল। এরপরেই ওর গলা চিরে একটা বিকট ভয়ার্ত আর্তনাদ বেরিয়ে এল। ওর স্নায়ুগুলো ভেঙেচুরে টুকরো টুকরো হয়ে যেতেই পা ভেঙে মাটিতে দেহটা আছড়ে পড়ল।
সেই সময় চা খেয়ে আর একটা গ্লাসে করে হারুর জন্যে নিয়ে আসছিল কমল। ঐ ভয়ঙ্কর চিৎকার আর পড়ে যাওয়ার শব্দ কানে আসতেই কমল ছুটে ওপরে চলল। নির্ঘাৎ কারেন্ট খেয়েছে হারুদা!
কমল ওখান থেকেই কাউন্সিলার আর সেক্রেটারিকে ফোন করল। কেননা অজ্ঞান অবস্থায় হারুকে দেখে কমলের অভিজ্ঞ চোখ বুঝে গেছে রীতিমতো ভয়ে ও অজ্ঞান হয়ে গেছে। তার কারণ হারুর মুখ জানান দিচ্ছে সে কথা। পুরো মুখটাই ভয়ের মুখোশ হয়ে গেছে।
দিন পনেরো লেগেছিল ওর স্বাভাবিক হতে। কেননা চোখ বন্ধ করলেই সেই পোড়া চ্যালাকাঠের মতো হাড়ের নড়বড়ে কাঠামোটা সামনে ভেসে উঠত।
হারুর মা ছেলের মুখে শুনে ঠাকুরবাড়ি গেল। প্রসাদী ফুল নিয়ে এসে মাথায় দিল। ধীরে ধীরে হারুর মন থেকে সেই ভয়ঙ্কর দিনটা অস্পষ্ট হতে শুরু করল।
তারপর সে আবার কাজে লেগে পড়ল। এই কয়েক দিনে কাজের বেশ ক্ষতি হয়ে গেছে। এদিকে সামনেই বিশ্বকর্মা পুজো আসছে। বেশ কয়েকটা বারোয়ারিতে আলো-মাইক লাগানোর কাজ পেয়েছে। সারাদিন রাত ব্যস্ত। ওর মা ওকে বলে দিয়েছে একা কোথাও যাবি না। সঙ্গে তোর সহকারী মিহিরকে অন্তত রাখবি।
মায়ের এই কথাটা শুনে ওর মনে একটা খটকা লাগে। কারণটা কী? কী জন্য এই সাবধানবাণী? তবে কি এখনও কোনো ভয়ের সম্ভাবনা আছে? এইসময় পুরনো কথাটা ওর মনে পড়ে যায়। কোনো আত্মা এখনও ওর ওপর ভর করে নেই তো? সেই বট গাছের তলা দিয়ে শ্মশানে ঢোকার সময় পচা চামড়া পোড়ার গন্ধ…
ওর ধারণা কিছুদিনের মধ্যেই সত্যিতে পরিণত হয়েছিল। সেইদিন থেকেই ওকে ভূতে পেয়েছিল। কেউ ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। এমনকি নিজেও নয়। যদি কখনও সুযোগ বা সময় পাই আপনাকে সেই ঘটনাটাও জানাব।
দ্বিতীয় পর্ব
হারুর কয়েক দিন ধরেই খিদে-তেষ্টাটা একটু বেশিই বেড়ে গেছে। হয়ত বিশ্বকর্মা পুজোর কাজের দৌড়ঝাঁপের জন্য। কয়েকটা বারোয়ারী আলোর অর্ডার পেয়েছে। হারুর মা বর্ণালী কয়েকদিন ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছে। যে ছেলে খেতে বসে ভাতের থালা নিয়ে শুধু নাড়াচাড়া করে। এখন ঠিক তার উল্টো। দু’জন মানুষের খাবার ও একাই খাচ্ছে। বর্ণালী নিজের মনকে বোঝায় — ইয়ং ছেলে, তার ওপর এত খাটাখাটুনি। কিন্তু ছেলের স্বাস্থ্য দিনকে দিন এত খারাপ হয়ে যাচ্ছে কেন? চোয়াল দুটো চামড়া ঠেলে বেরিয়ে আসছে! হাত-পাগুলো দড়ি পাকানো। হনু উঁচু! বর্ণালীর মনে কিছুদিন আগে শ্মশানে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা পুনরায় জেগে ওঠে। শ্মশান থেকে নিজের অজান্তে হারু কাউকে বয়ে আনেনি তো? কথাটা মনে হতেই বুকটা শিউরে ওঠে। পুজোর আশীর্বাদি ফুল নেবার সময়ই ঠাকুর মশাই বলেছিলেন ছেলেকে কিছু দিন চোখে চোখে রাখতে। কেননা কোনো খারাপ হাওয়াও লেগে থাকতে পারে। অত সামনাসামনি কোনো মৃত মানুষকে দেখা মোটেই মঙ্গলকর নয়। আর কয়েকদিন দেখা যাক তারপর না হয় বর্ণালী একবার ফকিরবাবার শরণাপন্ন হবে। উনি কামরূপ থেকে তন্ত্রমন্ত্র অনেক কিছু শিখে এসেছেন। এলাকার মানুষ খুব ভিড় করে ওঁর কাছে।
হারুর মনেও এই কথাটা কয়েকদিন ধরে ঘুরছে। এখন যেন সারাক্ষণই একটা খিদে খিদে ভাব লেগে থাকে। এদিকে এত খাচ্ছে তবুও চেহারাটা কেমন প্যাঁকাটির মতো হয়ে যাচ্ছে। আগে সাইকেলে চেপে কাজে গেলে পাড়ার মেয়ে রুমি তাকিয়ে দেখত। এখন চোখ ঘুরিয়ে নেয়। ওর মনেও পুরোনো কথাটা খেলা করতে লাগল। ঐ শ্মশান থেকেই আজ পর্যন্ত তার শরীরের ভেতর কেউ ঢুকে বসে নেই তো? মনের জোরটা কেমন কম কম লাগল। ওর শরীরের মাঝে যে ঢুকেছে সে এই এত খাবার খেয়ে নিচ্ছে না তো?
রাত্রে শুতে যাওয়ার সময় বিড়ি মুখে হারু আবোল-তাবোল ভেবে চলেছে। এই সময় মনে এল একটা ছোট পরীক্ষা করলেই বোঝা যাবে তার ধারণা সঠিক কিনা। ছোটবেলা থেকেই জানত আয়নার সামনে দাঁড়ালেই পরিষ্কার হয়ে যাবে মনের সন্দেহ। কেননা ভূতের ছায়া আয়নায় প্রতিফলিত হয় না। বিড়িটা ফেলে আয়নার দিকে এগোল। রাত্রি বেশ ঘন হয়েছে। ওর মা অনেকক্ষণ হল শুয়ে পড়েছে। সারা বাড়ি নিস্তব্ধ। বাগান থেকে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। আয়নাতে মুখ দেখার আগে মাথায় বিদ্যুৎচমকের মতো একটা কথা খেলে গেল। যার ফলে ও দাঁড়িয়ে গেল। যদি আয়নায় নিজেকে দেখতে না পায়? সেই অবস্থা ওর হৃদয় সহ্য করতে পারবে? দোটানায় পড়ে গেল। আর এক পা এগোলেই আয়নাটা। ভাদ্র মাসে একেই গুমোট। তার ওপর এই পরিস্থিতিতে ও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামতে লাগল। মেরুদন্ড বেয়ে হিমশীতল স্রোত নিচের দিকে নেমে চলল। বুকের মধ্যে সবটুকু সাহস কর্পূরের মতো উবে গেল। সম্মোহিতের মতো চুপ করে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। দেওয়ালে ঝোলানো আয়নাটা যেন ওকে হাতের ইশারায় ডাকছে — আয় আয়, একবার দেখ তোর মুখখানা। খানিক বাদে ও বাস্তবে ফিরল। কোনোরকমে ভারী পা দুটো টেনে চৌকির কাছে গেল। আয়নার দিকে না তাকিয়ে নিজের অবসন্ন দেহটাকে বিছানায় এলিয়ে দিল। যা করবার কাল সকালেই করা যাবে। রাত্রিতে ওদের শক্তি সব থেকে বেশি থাকে। এখন কিছু করতে যাওয়া মানে যেচে বিপদ ডেকে আনা।
তার মানে ওর অবচেতন মন মেনেই নিচ্ছে কোনো অশুভ আত্মার উপস্থিতি। সারারাত এপাশ ওপাশ করে কাটাল হারু। ছোটখাটো শব্দেও চমকে চমকে উঠছে। অবশেষে ভোরের আলো দেখা দিল। ও বুঝতে পারছে এইভাবে যদি তার বিনিদ্র রাত কাটে ও অচিরেই অসুস্থ হয়ে পড়বে। এদিকে সকাল থেকেই শুরু হয়ে যাবে কাজের মেলা।
ওর মা সকালেই ছেলের দিকে তাকিয়ে বুঝল রাত্রে ছেলের ঘুম হয় নি। তাই বলে ওঠে, ‘সাতসকালে উঠলি কেন? আজ বাজারে যেতে হবে না।’ হারু কথা না বাড়িয়ে মুখ ধুতে গেল। চোখ চেয়ে শুয়ে থাকার কোনো মানে হয় না। মাথার মধ্যে এই চিন্তার পাহাড় যতক্ষণ না শেষ হচ্ছে তার নিস্তার নেই। কিন্তু সমাধানের পথ ও জানে না।
মুখ ধুয়ে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে নিজের পরিষ্কার মুখটা দেখতে পেল। একটা শান্তির প্রলেপ মনটাতে পড়ল। ইস, রাত্রে সাহস করে দেখলে ঘুমটা মাটি হত না। মনটা অল্প খুশি হল। বর্ণালী চা আর দুটো বিস্কুট আনল। ওটা দেখে হারুর খিদেটা চাগাড় দিয়ে উঠল। মাত্র দুটো বিস্কুট! ও উঠে গিয়ে বিস্কুটের কৌটোটা নিয়ে এল। তারপর মনের আনন্দে বিস্কুট খেয়ে চলল। বর্ণালীর মনে হল এ তার ছেলে হতেই পারে না। কিছুদিন আগেও আধখানা বিস্কুট মুখে ফেলে যে চা খেত তার এত অস্বাভাবিক পরিবর্তন কী করে সম্ভব? তাড়াতাড়ি ঘর ছেড়ে বর্ণালী বেরিয়ে গেল। কীরকম একটা চাপা ভয় ওর শরীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। বাইরে থেকেও বিস্কুট খাবার কড়মড় শব্দ সে শুনতে পাচ্ছে। যেন একটা ছোট রাক্ষস বসে বসে মানুষের হাড় চিবোচ্ছে। প্রায় গোটা বারো বিস্কুট খেয়ে গরম চা এক চুমুকে শেষ করে উঠে দাঁড়াল হারু, ‘মা, বাজারের থলি দাও। একটু মাংস নিয়ে আসি।’ ছেলের কথা শুনে মায়ের মুখটা শুকনো হয়ে যায়। এমনিতে কথাটা কিছুই নয়। কিন্তু এখন যেন কেমন শুনতে লাগে বর্ণালীর। শ্মশানের ঘটনাটা ঘটার আগে বরং হারু বিধবা মায়ের মুখ চেয়ে বলত আমার জন্যও নিরামিষ রেঁধো। মাছ-মাংসের ঝামেলা করার দরকার নেই। আর এখন? প্রতিদিনই মাছ-মাংসের ভোজ। বর্ণালী মনে মনে ঠিক করে হারু কাজে বেরিয়ে গেলে সে ঐ তান্ত্রিকের বাড়ি আজ যাবে।
এদিকে বাজারের পথে যেতে যেতে হারু মনস্থির করে নেয়। যাই ঘটুক আজ রাত্রেই ও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনের ভুলটা সংশোধন করে নেবে। সেই মুহূর্তে ও ভাবতে পারেনি রাত্রি আসার আগেই পরীক্ষার ফল ওর সামনে এসে যাবে!
বেলায় জলখাবার সেরে সাইকেল নিয়ে বেরোল হারু। এখন সে যাবে তেঁতুলতলা ক্লাবে। কালকে বিশ্বকর্মা পুজোর প্যান্ডেল বাঁধা হয়ে গেছে। এখন চলছে লাইট লাগানোর কাজ। মিহির আগেই পৌঁছে গেছে। বর্ণালী জানে সেই দুপুরে ফিরবে ছেলে ভাত খেতে। কোনরকমে রান্না সেরে বাড়িতে চাবি দিয়ে ও চলল ফকির বাবার ডেরায়। ওখানে ভিড় একটু পাতলা হলে হারুর ব্যাপারটা বলল।
সব শুনে কপালে লাল তিলক কাটা বাবা বলল, ‘দেখো মা, আজ থেকে তিনদিন রাত্রে ছেলেকে ভালভাবে নজর রাখতে হবে। ও কী করে সারারাত সেটা জেনে আমাকে বলবে। তারপর আমি আমার কাজ আরম্ভ করব।’ বর্ণালীর মুখটা শুকিয়ে গেল।
— ‘বাবা, তার আগে কিছু করা যায় না?’ ওর গলায় আকুতি।
— ‘আগে আমাকে জানতে হবে সত্যি কোনো অপদেবতা ওর ঘাড়ে চেপে আছে কিনা? তবে তুমি খুব সাবধানে আড়ি পাতবে। ছেলে যেন বুঝতে না পারে। তাহলে হিতে বিপরীত হতে পারে।’
বড় বড় চোখে কথাগুলো বলল ফকির বাবা। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে চলল বর্ণালী। মাথার মধ্যে চিন্তার ভার। কয়েক বছর আগেই স্বামীকে হারিয়েছে। এখন হারুই সব আশা ভরসার স্থল। ঠাকুরকে ডাকতে থাকে। রক্ষা করো আমার ছেলেকে।
দুপুরবেলা হারু বাড়ি এসেই বলল, ‘জলদি ভাত বাড়ো। আমি এক মিনিটে স্নান সেরে আসছি।’ যেন দু’দিন অনাহারে আছে ছেলে। বর্ণালীর মনে ক্রমশ দূরাগত এক ভয়ের ছায়া জমাট বাঁধছে। ভাত আর পুরো মাংসের বাটিটা এনে ছেলের সামনে রাখল। সবিস্ময়ে দেখল, হারু মাথাটা পর্যন্ত ভালো করে মোছেনি। টপ টপ করে জল গড়াচ্ছে।
আর চুপ করে থাকতে না পেরে বর্ণালি বলল, ‘তুই মাথাটা পর্যন্ত ভালো করে মুছিসনি। এত খাবার তাড়া! পেটে কি রাক্ষস ঢুকেছে নাকি?’
হারু কোনো কথা না বলে একবার শুধু মায়ের মুখের দিকে তাকাল। সেই চাউনি দেখে বর্ণালীর সারা শরীর অবশ হয়ে গেল। এ কার চাউনি? দুটো চোখ দিয়ে যেন তাকে ভস্ম করে দেবে। দুটো চোখে যেন রাজ্যের কুটিলতা আর হিংস্রতা আশ্রয় নিয়েছে। এই দৃষ্টির সামনে কোনো সুস্থ মানুষ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
বর্ণালী কোনরকমে উচ্চারণ করল, ‘তুই খা, আমি স্নান করে আসছি।’ যেন পালিয়ে বাঁচল। বাথরুমে ঢুকে ভয়ে কাঁপতে লাগল। একটু আগে দেখা ঐ ভয়ঙ্কর চোখ দুটোকে ভুলতে পারছে না। এক গলা গঙ্গাজলে দাঁড়িয়ে ও বলতে পারে ওটা তার ছেলের চোখ নয়। ওর ভেতর লুকিয়ে থাকা কোনো শয়তানের চোখ!
হারু খেয়েদেয়ে কাজে বেরিয়ে গেল। ও পৌঁছলে তবে মিহির খেতে যাবে। তেতুঁলতলার মাঠটা ধরল। কাল বিশ্বকর্মা পুজো বলে আকাশে বেশ ঘুড়ি উড়ছে। বছর পাঁচেক আগেও ওর ঘুড়ি ওড়াবার নেশা ছিল। বারোয়ারীতে এসে মিহিরকে ছুটি দিল। নিজে মইয়ের ওপর উঠে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কাল বেলার মধ্যেই কাজটা কমপ্লিট করতে হবে।
বিকেলের মধ্যেই খিদে পেয়ে গেল হারুর। নিজের মনেই অবাক হল। ঘন্টা তিনেক কাটেনি পেট ভরে খেয়ে এসেছে! পুরনো চিন্তা আবার কুরে কুরে খেতে শুরু করল। তবে কি পুনরায় ঐ আত্মা তার শরীরে ফিরে এসেছে? আজ রাত্রেই এর ফয়সালা করতে হবে। যা থাকে কপালে।
বিকেল পাঁচটার সময় আর স্থির থাকতে পারল না খিদের চোটে। রীতিমতো গা গুলোচ্ছে। মিহিরকে বলল, ‘তুই বাকি আটটা টিউবলাইট ফিট করে বাড়ি যাবি। বাকিটুকু কাজ কাল সকালে হবে। আমি বাড়ি যাচ্ছি। খিদের চোটে নাড়িভুঁড়ি হজম হয়ে যাবার জোগাড়।’ সাইকেল নিয়ে বাড়ির দিকে চলল ও। মিহির অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে তার মালিকের দিকে।
সূর্য পশ্চিম দিকে হেলছে। আকাশে ঘুড়ির মেলা। তেতুঁলতলা মাঠের কাছে এসে হারু দেখে অধীরদার ছোট ছেলে বাবলু বড় উঁচু তেঁতুল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ওপর দিকে তাকিয়ে আছে। ও সাইকেল থামিয়ে দেখল উঁচু সরু ডালটাতে একটা বড় লাল ঘুড়ি কেটে এসে আটকে আছে। এই গাছের নামেই মাঠের নাম। গাছটা খুব অদ্ভুত গড়নের। মাটি থেকে গাছের মোটা কান্ডটা সোজা খানিকটা আকাশের দিকে উঠে গেছে। তারপর থেকে ডালপালা শুরু। সেই জন্যে কেউই গাছটাতে উঠতে পারে না। সে নিজেও ছোট বেলায় ঘুড়ির জন্য বাবলুর মত গাছের নিচে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকত। যদি হাওয়ায় পড়ে যায় ঘুড়িটা! বাবলুর করুণ মুখটা দেখে ওর এই মুহূর্তে বেশ কষ্ট লাগল। একবার চেষ্টা করে দেখবে নাকি? জানে অসম্ভব, তবু!
বাবলু বলল, ‘হারু কাকা, দাও না আমায় ঘুড়িটা পেড়ে। কালকে ওড়াব। মাত্র দুটো ঘুড়ি বাবা কিনে দেছে।’
হারু সাইকেলটা স্ট্যান্ড দিয়ে বলল, ‘তুই জানিস বাবলু, এই গাছে ওঠা খুব কষ্টসাধ্য। তবু আমি চেষ্টা করছি।’
হারু চটিটা খুলে গাছের মোটা গুঁড়িটার কাছে এল। হাত দুটো দিয়ে আঁকড়ে ধরে ওপরে ওঠার জন্যে চাড় দিল।
আশ্চর্য কান্ড! ও অতি অনায়াসেই হাত-পায়ের সাহায্যে গাছের উঁচুতে উঠতে লাগল। নিচ থেকে এগারো বছরের বাবলুর চোখে দৃশ্যটা কীরকম অদ্ভুত লাগল! মনে হচ্ছে একটা বিশাল গিরগিটি সরসর করে গাছের ওপরে উঠছে। ঐ বাচ্চাটা এই রকম ভাবে কোনো মানুষকে গাছে চড়তে দেখেনি। গাছের ওপর যেসব পাখিগুলো ছিল তারাও ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে আকাশের দিকে উড়ে গেল। পাঁচ মিনিটেই হারু ঘুড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেল। ও তাকিয়ে দেখল লাল ঘুড়িটা একটা সরু ডালে আটকে আছে। ঐ ডাল ওর শরীরের ভার নিতে পারবে না। হাত বাড়ালেও নাগাল পাবে না! ইস, এত কষ্ট বৃথা যাবে! শেষ চেষ্টা করার জন্য হাতটা বাড়াল। হাতটা কয়েক ফুট লম্বা হয়ে ঘুড়িটা ধরে ফেলল।
হারু নিচ থেকে বাবলুর ভয়ার্ত আর্তনাদ শুনতে পেল, ‘ভূত! ভূত! বাঁচাও! বাঁচাও!’ ভয়ে নীল হয়ে গিয়ে বাবলু প্রাণপনে বাড়ির দিকে দৌড়োল। গাছের ওপর বসে পড়ন্ত বিকেলে হারুর আসল সত্যিটা অনুভূত হল। এই অসম্ভব কাজটা ওর দ্বারা হল কী করে? একটা নিদারুণ আতঙ্ক ওকে জড়িয়ে ধরল। গাছের অত উঁচু থেকে এখন নামবে কি করে বুঝতে পারছে না। সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। কোনরকমে হাত পা ছেঁচড়ে যখন মাটিতে নামল তখন হামাগুড়ি দিয়ে সন্ধ্যের অন্ধকার সারা মাঠটাকে ঘিরছে। এরপর সাইকেল চড়ে অবসন্ন শরীরটাকে নিয়ে বাড়ির দিকে চলল।
রাত্রের পরীক্ষার আর কোনো প্রয়োজন নেই তার কাছে। বর্তমান পরিস্থিতি ভালোভাবে তাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে কোনো অশরীরি শক্তি তার ওপর ভর করেছে। এবং সে এও বুঝতে পেরেছে সেই অশুভ শক্তি পুরোটা তাকে এখনও গ্রাস করতে পারেনি। যদি করত তাহলে এই চিন্তাগুলো তার মনে আসত না।
এর থেকে মুক্তির উপায় কী? কে আলোর পথ দেখাবে তাকে? বাড়িতে এসে ঢুকল সে। বর্ণালী দেখল ছেলের হাতে-পায়ে রক্ত।
‘কী করে হল?’ বর্ণালীর গলায় উৎকণ্ঠা।
— ‘সাইকেল থেকে পড়ে গেছি। ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই।’
মাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকল হারু। বিশ্রী গরম পড়েছে। হারুর খিদেটা আবার চাগাড় দিতে শুরু করল।
‘স্নান করে আসছি। তুমি দুটো রুটি আর তরকারি দাও। খিদে পেয়ে গেছে।’ বলে ও বাথরুমে ঢুকল। লাইটের আলোতে দেখল হাত দুটো বেশি ছড়েছে। এখনও রক্ত বেরোচ্ছে। ঐ তাজা লাল রক্ত খাওয়ার হঠাৎ ইচ্ছে জাগল। প্রাণপণ শক্তিতে ইচ্ছেটাকে দমন করল ও। তাড়াতাড়ি বাথরুম ছেড়ে বেরিয়ে এল। মন বলছে একা থাকলে ও বেশিক্ষণ ইচ্ছেটাকে আটকাতে পারবে না।
বর্ণালী ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছে হারুর মনে বিরাট এক দ্বন্দ্ব চলছে। কপালের ওপর চিন্তার অজস্র রেখা ! ছেলের ঐ অবস্থা দেখে কোনো মা স্থির থাকতে পারে?
‘হারু, তুই আমার কাছে কিছু লুকোস না। তোর মনে কিছু চলছে।’ মায়ের গলায় আবেগের ছোঁয়া স্পষ্ট।
রুটি খেতে খেতে ও বলল, ‘কী আবার হবে আমার? তুমি ভুল করছ।’
তখনই যদি হারু মাকে সব খুলে বলত তাহলে হয়ত ভালোই হত। রাত্রের ঐ হাড় হিম করা ঘটনাটা ঘটত না।
অন্তিম পর্ব
রাত তখন বারোটা। বর্ণালী চুপিসাড়ে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে হারুর ঘরের খোলা জানালাটার কাছে এল। ভাদ্র মাসের পচা গরমের জন্য হারু মশারিটাও খাটায়নি। ঘরের রাত-আলোটা জ্বেলে পাখা চালিয়ে ঘুমোচ্ছে।
একটু দাঁড়াবার পরেই বর্ণালী লক্ষ্য করল ছেলে ঘুমের মধ্যেই উশখুশ করতে শুরু করল। যেন চাপা স্বরে কারুর সঙ্গে কথা বলছে! কান খাড়া করেও কিছু বুঝতে পারল না পাখাটার আওয়াজের জন্য। ঘুমের ঘোরেই হারু একবার চৌকির ওপর উঠে বসল। বর্ণালী সাবধান হল। তাকে দেখে না ফেলে! ফকিরবাবা বলে দিয়েছিল। নজর রাখবে এমনভাবে যেন দেখতে না পায়! হারু বিছানায় বসে বিস্ফারিত চোখে বন্ধ দরজাটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। যেন কারোর আসার প্রতীক্ষা করছে। বর্ণালীর ঐ দৃশ্য দেখে মুখটা চকখড়ির মতো সাদা আকার ধারণ করল। এবার ও দেখতে পেল একটা কালো ছায়ার মত শরীর দরজার দিক থেকে এগিয়ে এসে ছেলের গায়ে লেপটে গেল। অমনি হারুর দেহটা অসম্ভব রকম ভাবে কেঁপে উঠল। বর্ণালীর বুঝতে বাকি রইল না ছেলের ভেতর কোনো ভৌতিক আত্মা প্রবেশ করল। ওর বুকের ভেতর হৃৎপিন্ডটা ভয়ে লাফাতে লাগল।
বর্ণালীর মস্তিষ্ক ওকে জানিয়ে দিল আর এক মুহূর্ত এখানে থাকলে ঐ অশরীরীর চোখে ও ধরা পড়ে যাবে। ও দ্রুত পায়ে ঘরে ফিরে এল। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এক গ্লাস জল ঢকঢক করে খেল। যদি কেউ জানতে পারে তার পাশেই থাকা প্রিয়জনকে কোনো আত্মা ভর করে আছে যত বড় সাহসীই হোক, সে ভির্মি খাবে। বর্ণালী ভেবে পাচ্ছে না সারা রাত একা একা সে কাটাবে কী করে? এরপর কী ঘটবে তাও সে জানে না! মনে মনে ঠিক করে নেয় কাল সকালেই ফকিরবাবার কাছে যাবে। আর দেরি করলে তার একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে পারবে না।
ও ঘরে এখন কী হচ্ছে? সেটা জানার আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে। কেননা বেচারা ছেলেটা একা ঐ ঘরে পড়ে আছে ঐ অন্ধকারের আত্মাটার সাথে। কি করবে সে? সিদ্ধান্ত নিতে বেশ কিছু সময় কেটে গেল। অবশেষে যাওয়াই স্থির করল। যা থাকে কপালে — মা হয়ে নিজের সন্তানকে বাঁচাতে তার নিজের যে কোনো ক্ষতি হয় হোক।
যখন ও ঘরে যাওয়ার জন্য বর্ণালী পা বাড়াল তখন ঘড়িতে সময় রাত দেড়টা। অতি সন্তর্পণে জানালা দিয়ে উঁকি মারল। ঘরের ভেতর দৃশ্যটা দেখে বর্ণালীর হাত-পা পেটের ভেতর সেঁধিয়ে যাবার উপক্রম হল! দেখে চৌকির ওপর ছেলে বসে ছড়ে যাওয়া ডান হাতটাকে বাঁ হাতের আঙ্গুল দিয়ে খোঁচাচ্ছে। যেই রক্তের ধারা বেরিয়ে আসছে, মুখে করে চুষছে! ঐ বীভৎস দৃশ্য দেখে বর্ণালীর মুখ দিয়ে একটা অস্পষ্ট চিৎকার বেরিয়ে এল। ঐ আওয়াজ শুনে সঙ্গে সঙ্গে হারু জানলার দিকে তাকাল। আধো অন্ধকারে বর্ণালী দেখল হারুর জায়গায় একটা বুড়োটে মতো লোক বসে আছে। নীলচে আলোয় বীভৎস মুখটাতে কোনো প্রাণের স্পন্দন নেই!
বর্ণালীর শরীরের সমস্ত স্নায়ুগুলো অবশ হয়ে আসছে। চোখে কালো অন্ধকার ঘনাচ্ছে। বুড়োটা একদৃষ্টে বর্ণালীর গলায় ঝোলানো নারায়ণ ঠাকুরের লকেটটা দেখছে। দু’মিনিট বাদেই একটা কালো ছায়া হারুর দেহ থেকে বেরিয়ে এসে দরজার দিকে গেল। হারুও নেতিয়ে পড়ল বিছানায়। বর্ণালী আবছা অন্ধকারে দেখল কালো পিচের মতো এক দলা অন্ধকার দরজার ভেতর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এল। তারপর হাওয়ায় ভেসে সামনের কাঁঠাল গাছটার কাছে গিয়ে মিলিয়ে গেল। পরক্ষণেই ঐ গুমোট গরমেও কাঁঠাল গাছের ডাল সমেত পাতাগুলো কেঁপে উঠল। মনে হল কয়েকটা হনুমান গাছে লাফাচ্ছে।
অনেক বেশি মনের জোর বলে এতক্ষণ বর্ণালী নিজের পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। আর পারল না। জানলার গরাদটা দু’ হাতে ধরতে গিয়েও ব্যর্থ হল। জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। বাইরের বারান্দায় ওর পড়ে যাবার শব্দ পেয়ে হারু উঠে এল। মাকে ঐ ভাবে পড়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি করে জল এনে মায়ের চোখে-মুখে দিল। মনে হয় বাথরুম থেকে আসতে গিয়ে মাথা ঘুরে গেছে। বর্ণালী জলের ঝাপটায় চোখ মেলেই মুখের কাছে হারুকে দেখল। ভয়ের স্পর্শটা নতুন করে মুখে পড়ল।
— ‘কী হয়েছে তোমার?’ উদ্বিগ্ন কণ্ঠ হারুর।
— ‘মাথাটা ঘুরে গিয়েছিল।’ কাঁপা কণ্ঠ।
— ‘চলো ঘরে। আমি তোমার পাশে শুচ্ছি।’
বাধ্য হয়ে ছেলের সঙ্গে ঘরে এল। একটু বাদেই যদি ঐ শয়তান গাছ থেকে নেমে এই ঘরেও হানা দেয়?
— ‘কটা বাজে এখন?’ বর্ণালীর প্রশ্ন।
— ‘তিনটে বাজছে।’ হারু মায়ের পাশে শুয়ে বলে।
বর্ণালী মনে মনে ভাবে, এখনও এক ঘন্টা কাটাতে হবে। ও শুনেছে রাত বারোটা থেকে ভোর চারটে পর্যন্ত ভৌতিক আত্মারা জাগ্রত থাকে। ছেলে যখন স্বাভাবিক তখন ঐ প্রেতাত্মা নিশ্চয়ই ঐ গাছেই আছে। হারু মায়ের পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। বর্ণালীর চোখে ঘুম নেই। জানলার ফাঁক দিয়ে ডালপালা ছড়ানো কাঁঠাল গাছটা অন্ধকারেও চোখে পড়ছে। মনের মধ্যে জমে থাকা ভয়টাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। এই সময় মনে পড়ল হারু ঐ অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় তার গলায় ঝোলানো ঠাকুরের লকেটটা দেখছিল কেন? তবে কি নারায়ণের ছবিটাই তাদের রক্ষাকবচ? মনে একটু জোর পায় বর্ণালী।
আচমকা চোখে পড়ে জানলায় দাঁড়ানো কদাকার একটা মূর্তি। যেন কালো সেলুলয়েড দিয়ে তৈরী। প্রথমটা ভয় পেলেও ঠাকুরের লকেটটা মুঠো করে চেপে ধরে। মূর্তিটা ধোঁয়ার আকার ধারণ করে জানলা গলে ঢুকতে গিয়েও থমকাল। একটু বাদেই আবার একটা কালো গোলা পাকিয়ে গড়িয়ে গাছটার অন্ধকারে মিশে গেল। গাছের মগডাল থেকে একটা বুক কাঁপানো হাসির শব্দ সারা আকাশ বাতাস জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। মা তার ছেলেকে জড়িয়ে ধরে এক মনে ভগবানের নাম জপতে শুরু করল।
কালরাত্রির অবসান হল। কালো আকাশে রঙের ছোঁয়া লাগল। দু’-একটা পাখির ডাকও বর্ণালীর কানে এল। গভীর ঘুমের মধ্যে রয়েছে হারু। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল বর্ণালী। আজই ছেলেকে নিয়ে ফকিরবাবার কাছে যাবে। যদি কিছু উপায় বার করতে পারেন বাবাজি।
ভোর ছ’টার সময় পাড়ার বাসিন্দা অধীর এসে হাজির হল। বর্ণালী এই সাত সকালে ওকে দেখে অবাক হয়ে গেল।
— ‘বৌদি, তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল। হারু ঘুম থেকে ওঠেনি তো?’ নিচু স্বরে বলল। যার ফলে বর্ণালীর মনে রহস্য দানা বাঁধল। কি এমন কথা বলতে চায় ও?
— ‘কী বলবে তুমি?’ এগিয়ে এল গেটের কাছে।
— ‘গতকাল সন্ধ্যের দিকে হারুর হাবভাব দেখে আমার ছেলে বাবলু ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে। সারা রাত ঘুমোতে পারেনি চমকে চমকে উঠছে আর কেঁদে ফেলছে।’
এরপর অধীর সেই গাছ থেকে ঘুড়ি পাড়ার ঘটনা বলে। বর্ণালীর চোখ আরও কপালে ওঠে। আর লুকোতে পারে না। সেও অধীরকে শুরু থেকে সব ঘটনা বলে। শেষে বলে, ‘আজকেই ছেলেকে নিয়ে ফকিরবাবার কাছে যাব।’ অধীর বাধা দেয়, ‘অমন কাজ মোটেও করো না। সারা পাড়ায় ঢিঢিকার পড়ে যাবে। লোকে রং চড়িয়ে আরও কিছু বলবে। তাতে হারুর কাজ পাওয়া মুশকিল হয়ে যাবে।’ কথাগুলো ঠিকই বলেছে ও। বর্ণালী চিন্তার স্বরে বলে, ‘তাহলে এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাব কি করে?’
অধীর বলে, ‘আমার একজন চেনাজানা লোক আছে। হরিপালের কাছে তার মাজার। পীরবাবার মাজার১ বলে বিখ্যাত। অবশ্য পীরবাবা এখন বেঁচে নেই। কিন্তু তার শিষ্য রফিক এইসব কাজ করে। আজ বিশ্বকর্মা পুজোর জন্য আমাদের কারখানা বন্ধ। তুমি হারুকে নিয়ে আমার সঙ্গে চলো। এখানকার কেউ জানতে পারবে না।’ বর্ণালী বুকে বল পেল।
— ‘হরিপাল? তার মানে সেই তারকেশ্বর লাইনে? এখান থেকে দূর আছে।’
— ‘তুমি ভেবো না। আমার শালার গাড়িটা আনিয়ে নিচ্ছি। তুমি শুধু তেলের খরচটা দিও।’ কথা পাকা হয়ে গেল। অধীর যাবার আগে বলে গেল ঘন্টাখানেক বাদে সে আসছে। আর হারুকে বানিয়ে কিছু একটা বলতে।
বর্ণালী বাড়ির ভেতরে ঢুকল ছেলেকে ঘুম থেকে তোলার জন্য। ও যদি লক্ষ করত তাহলে দেখতে পেত কাঁঠাল গাছের পাতার জটলার মধ্যে একটা কালো ছায়া জমাট বেঁধে আছে।
এরপর ওরা তিনজন গাড়ি নিয়ে পীরবাবার মাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হল। যাওয়ার পথে কী হল? আর ওখানে কী ঘটেছিল?
হারুকে বর্ণালী আসল কথাটাই বলল। রাতের ঘটনাটাও উল্লেখ করল। মায়ের কথা শুনে সে নিজেও ভয় পেয়ে গেল। মনে পড়ল গাছ বেয়ে গিরগিটির মতো ওঠা। কয়েক ফুট লম্বা হাত বাড়িয়ে ঘুড়ি ধরা। ও ফোন করে মিহিরকে বলল, ‘আজ তোরা একটু কাজে সামাল দে। আমি বিশেষ কাজে কলকাতা যাচ্ছি।’
বেলা সাড়ে নটা নাগাদ ওরা গাড়ি নিয়ে বেরোল পীরবাবার মাজারের উদ্দেশ্যে। ঠিক সেই সময়ই কাঁঠাল গাছটা অস্বাভাবিক ভাবে ডালপালা সমেত নড়ে উঠল।
গাড়ি কিছুক্ষণ বাদেই বড় রাস্তা ধরল। ড্রাইভারের পাশে অধীর। আর ওরা দু’জন পিছনের সিটে। খানিকটা গেলে ওরা দিল্লি রোড ধরবে। বর্ণালী একমনে ঠাকুরকে ডেকে চলেছে। যদি কোনোভাবে এই অশুভ আত্মার প্রভাব ছেলের ওপর থেকে কাটানো যায়। হারুও একই কথা ভাবছে। ওর চিন্তা — সব কথা মনে থাকছে না কেন? রাতের ঘটনা শুনে অর্ধেক কথা মনে করতে পারল না। এটা কি ঐ আত্মার জন্যই হচ্ছে?
দিল্লি রোডে পড়ে মারুতিটা গতি তুলল। জানলা দিয়ে বেশ হাওয়া ঢুকছে। অধীরের চিন্তা অন্যরকম। ঝোঁকের মাথায় ওদের নিয়ে এল। যা শুনেছে, তাতে ঐ বিদেহী আত্মা এত সহজে পিছু ছাড়বে না। রাস্তাঘাটে যদি কোনো বিপদ হয়? পিছনের সিটে ঐ যে হারু বসে আছে ও সত্যিই হারু তো? ওর ছদ্মবেশে ঐ দুষ্ট আত্মা নয় তো? ওর মনে একটা ভয়ের আস্তরণ পড়তে শুরু করল। ভয়চকিত চোখে গাড়ির হেড মিররের দিকে তাকাল। যেখান থেকে হারুকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। স্পষ্টভাবে তাকাতেই মুখের চেহারা ওর বদলে গেল। হারুর মাথার কালো চুলের পিছনে একটা অস্পষ্ট কুচকুচে কালো জমাট বাঁধা অন্ধকার! যেন একটা বাদুড় ঝুলে আছে। অধীরের সারা শরীরে একটা ঠান্ডা বাতাস কে যেন বুলিয়ে দিল। আর ঠিক তখন ফটাস করে গাড়ির একটা চাকা ফাটল। ড্রাইভার খুব পাকা ছিল, তাই গাড়িটা উল্টে যেতে যেতে বেঁচে গেল। রাস্তার সাইডে গাড়ি দাঁড়াল। মৃত্যুর খুব কাছ থেকে বেঁচে ফিরে এল ওরা।
সবার মুখেই ভয়ের রেখা। ড্রাইভার বলল, ‘নতুন টায়ার। বুঝে পাচ্ছি না কীভাবে ফাটল। আপনারা একটু নেমে দাঁড়ান। চাকা পাল্টাই।’
ফাঁকা রাস্তায় ওরা নেমে দাঁড়াল। রৌদ্রের তেজ এর মধ্যেই চড়া। দু’দিকে ফাঁকা জমি। রাস্তার ধারে দু’ একটা বড় কৃষ্ণচূড়া গাছ একটু ছায়া করে রেখেছে। অধীর চেষ্টা করছে ফোনে পীরবাবার শিষ্য রফিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। ওর মনে আতঙ্কের মেঘ। হারু অধীরকে কড়ে আঙ্গুল তুলে মাইনাসের চিহ্ন দেখিয়ে কৃষ্ণচূড়া গাছটার কাছে এগিয়ে গেল। সেই সময় অধীর রফিকের লাইনটা পেল। দ্রুত সব কথা বলল। এমন কি হারুর মাথার পিছনে কালো অন্ধকারের ডেলাটার কথাও। রফিকের গম্ভীর স্বর ও প্রান্ত থেকে ভেসে এল, ‘মন দিয়ে শোনো। ছেলেটাকে চোখের আড়ালে কোরো না। তোমার কথায় বুঝতে পারছি ঐ প্রেত এখনও ওর সঙ্গেই রয়েছে। ও চাইবে না এই মাজারে আসতে। এরপরেও দুর্ঘটনা ঘটাবে। গাড়ির সব কাঁচ তুলে দিয়ে ধূপের কাঠি কয়েকটা জ্বালিয়ে রাখো। হয়ত কিছুটা সুরাহা মিলবে। কালীতলার মুখে এসে ফোন করবে। আমার কয়েকজন শিষ্য তোমাদের নিয়ে আসবে। কেননা ঐ পথে গাড়ি ঢুকবে না।’ লাইন কেটে গেল।
রফিকের কথায় অধীর আরও ভীত হয়ে পড়ল। গাছের তলায় চোখ পড়ল। হারু সেখানে নেই। বর্ণালীকে জিজ্ঞেস করল হারুর কথা। বর্ণালীও অন্যমনস্ক ছিল। খেয়াল করে নি। অধীর গাছের কাছে গিয়ে এদিক ওদিক দেখল। ঝামেলায় পড়া গেল! বর্ণালীও উদ্বিগ্ন। এই সময় হারু গাছের ওপর থেকে হি হি করে হেসে উঠল। দু’জনের বুকটাই ছ্যাঁৎ করে উঠল। ওপর দিকে তাকিয়ে দেখে একটা ডালে পা দুটো ঝুলিয়ে বাবু বসে আছে। ঐ দৃশ্য দেখে যে কোনো মানুষ ভয় পেয়ে যাবে।
অধীর কাঁপা গলায় বলল, ‘হনুমানের মত গাছে উঠে বসে আছিস কেন? নেমে আয়। যেতে হবে।’
ও কোনো উত্তর না দিয়ে দাঁত বার করে হাসতে লাগল। বর্ণালী বুদ্ধি করে হাতের ব্যাগ থেকে একটা কেক বার করে বলল, ‘এই নে তোর জন্য কেক এনেছি।’ কেকটা দেখে হারুর চোখ দুটো চকচক করে ওঠে। অত উঁচু ডাল থেকে এক নিমেষে সড়াৎ করে নিচে নেমে আসে।
গাড়ির টায়ার ইতিমধ্যে পাল্টানো হয়ে গেছে। অধীর আর বর্ণালী ভয়টাকে গিলে ফেলল। অধীরের ইশারা অনুযায়ী বর্ণালী ছেলেকে নিয়ে গাড়ির ভেতর গিয়ে বসল। অধীর ড্ৰাইভারকে জানলার কাঁচ বন্ধ করে এসি চালাতে বলল। অধীরের কথামত ড্রাইভার সুকান্ত ড্যাশবোর্ডের ভেতর থেকে কয়েকটা ধূপকাঠি জ্বালিয়ে দিল এবং গাড়ি চালু করল।
বর্ণালী আড়চোখে ছেলেকে দেখল। রাক্ষসের মতো কেক চিবোচ্ছে। নিজের ছেলে হলেও কি রকম একটা লাগছে! কেননা ও জানে ছেলের শরীরের ভেতর লুকিয়ে বসে আছে একটা পিশাচ! এই ভাবনাটাই ওর মনে তুলছে একটা বিরাট আতঙ্কের ঝড়। মনে মনে ডেকে চলেছে ঈশ্বরকে। এইটুকু পথ যেন নির্বিঘ্নে পার হতে পারে! আবার যেন কোনো অজানা বিপদ হাঁ করে তেড়ে না আসে।
অধীর উপকার করতে এসে ফেঁসে গেছে। ভাবতেই পারেনি এই রকম বিপদে পড়তে হতে পারে। ও ঘন ঘন ঘড়ি দেখছে। আর কতক্ষণ দেরি? এখন যেন এক মিনিট সময় এক ঘন্টার মত লাগছে। শুকনো মুখে সামনের দিকে চেয়ে আছে।
হারু মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ধূপের ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসছে।’ ওরা কোনো উত্তর দিল না। রাগে দাঁত কড়মড় করে উঠল হারু, ‘অধীরদা, ধূপগুলো নেভাও!’ যেন কেউ নির্দেশ দিচ্ছে।
বর্ণালী সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, ‘তুই আর একটা কেক খাবি?’ যেন বাচ্চা ছেলেকে ভোলাচ্ছে। হারু কথা না বলে হাত বাড়াল। কেকটা হাতে দিতে গিয়ে চমকে উঠল বর্ণালী। ছেলের হাতটা কালো বড় বড় লোমে ভরা! যেন গরিলার হাত। কোনো রকমে কেকটা হাতে দিয়ে একটু সরে বসল। ক্রমশ তার স্নায়ুর ওপর চাপ বাড়ছে। কতক্ষণ সহ্য করতে পারবে কে জানে! ধূপের গন্ধ ছাপিয়ে একটা জান্তব বোঁটকা গন্ধে গাড়ির ভেতরটা ভরে উঠল।
অধীরের সাথে ড্রাইভার সুকান্ত দু’বার নাক টানল। ‘ইস, কী পচা একটা গন্ধ বেরোচ্ছে!’ অধীরের মুখ থেকে বেরিয়ে এল। সুকান্তও ড্রাইভ করতে করতে কথাটায় সায় দিল। অধীর আরও দুটো ধূপকাঠি জ্বালিয়ে দিল। বর্ণালী লক্ষ্য করল দেশলাই জ্বালাবার আগুন দেখেই হারু কি রকম সিঁটিয়ে গেল। উঃ, পথটাও যেন শেষ হচ্ছে না! আর থাকতে না পেরে বর্ণালী জিজ্ঞেস করল, ‘আর কতদূর?’ সুকান্ত উত্তর দিল, ‘হরিপাল ঢুকছি।’ হাইওয়ে ওরা খানিকটা আগেই ছেড়ে এসেছে।
অধীর এক বছর আগে এই কালীপুর মাজারে এসেছিল দিদির মেয়েকে নিয়ে। দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছিল। অনেক ডাক্তার — ওষুধ করেছিল। সেই সময় ওর অফিসের এক বন্ধু এখানকার ঠিকানাটা দিয়েছিল। রফিক দেখেই বলেছিল বেটিকে কেউ শুখা বাণ মেরেছে। একটা তাবিজ দিয়েছিল। অধীর আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল তাবিজের ক্ষমতা দেখে। কয়েক মাসের মধ্যে ভাল হয়ে গিয়েছিল তার বোনঝি। সেই থেকে রফিকের ওপর ওর বিশ্বাস।
সুকান্তকে ডান দিকের রাস্তাটা ধরতে বলল। এই রাস্তা গিয়েছে কালিপুর অটো স্ট্যান্ডের ওপর দিয়ে। ঐ স্ট্যান্ডে ওদের গাড়ি থেকে নামতে হবে। তারপর পায়ে হাঁটা পথ।
‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’ হারুর মুখ দিয়ে কে যেন চোঙা করে কথাটা বলল। সুকান্ত পর্যন্ত ঘাড় ঘুরিয়ে হারুকে দেখল। এটা কি কোনো মানুষের কণ্ঠস্বর? ড্রাইভার যাতে কিছু বুঝতে না পারে তাই বর্ণালী তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘কেন, তোকে বলেছি তো! একজন ভালো কবিরাজকে দেখাব যাতে তোর অসুখ ভালো হয়ে যায়।’ কথাটা শুনে হারু ওরকম যান্ত্রিক গলাতেই বলে উঠল, ‘আমি সব জানি। এখনও ভালো কথায় বলছি ফিরে চলো।’ অধীর মোবাইলে রফিককে মেলাল।
দু’মিনিটের মধ্যে কালিপুর অটো স্ট্যান্ডে ওদের মারুতি পৌঁছল। ওখানেই গাড়িতে ওয়েট করার জন্য সুকান্তকে বলল অধীর। কিন্তু গাড়ি থেকে হারু নামতে চাইছে না। অধীর টেনে নামাতে পারছে না। মনে হচ্ছে সিটের গদির সঙ্গে কেউ ওকে ফেভিকল দিয়ে সেঁটে রেখেছে। এই সময় দু’জন লোক এল। অধীর বুঝল এরা ঐ দরগা থেকেই আসছে। ওরাও টানাহ্যাঁচড়া করে হারুকে কোনোরকমে নামাল। একরকম পাঁজাকোলা করে নিয়ে চলল। অনেকেই অবাক চোখে তাকাচ্ছে।
ওরা এবার আলু আর সবজি ক্ষেতের ভেতর দিয়ে সরু আলপথটা ধরল। রাগে গরগর করছে হারু। রোগা পাতলা ছেলেটার গায়ে এত শক্তি কোথা থেকে এল? বর্ণালী ছেলের ঐরকম মূর্তি দেখে কেঁদে ফেলল। অধীর সান্ত্বনা দিল, ‘আমার মন বলছে সব ঠিক হয়ে যাবে।’ দু’জন শিষ্য বলে উঠল, ‘বাবার কাছে এসেছেন। কোনো চিন্তা করবেন না। কত ভূতে ধরা, প্রেত, পিশাচ, জিন বাবার সর্ষেপোড়ায় পালাবার পথ পায় না।’ হারু রক্ত চোখে চ্যালা দুটোকে একবার দেখল।
মাজারের গেটের কাছে এসে ও এক ঝটকায় ডান হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। চোখের পলকে ডান হাত দিয়ে পাশের লোকটার গলার টুঁটিটা চেপে ধরে। এত জোরে ধরেছে যে ওর গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। অধীর আর বর্ণালী পিছনে আসছিল। ওরা ঐ দৃশ্য দেখে ভয়ে চেঁচিয়ে উঠল। সেই শব্দে মাজারের ভেতর থেকে অনেকেই বেরিয়ে এল। তার সঙ্গে বেরিয়ে এল রফিক। গায়ে কালো রঙের বিরাট পকেট দেওয়া আলখাল্লা। গলায় পুঁতির অনেকগুলো মালা। শক্তসমর্থ চেহারা। কালো লম্বা দাড়ি। কপালে কালো তিলক।
‘গলা থেকে হাত নামা এখনই।’ বজ্রকঠিন গলায় বলল রফিক।
ঐ কঠিন গলার শব্দে হারু ওর দিকে তাকাল। রফিকের চোখ দুটো যেন হারুর চোখ ফুঁড়ে ভেতরে ঢুকে গেল। মনে হচ্ছে হারুর ভেতরটা পর্যন্ত রফিক দেখতে পাচ্ছে। হারুর হাতটা একটু শিথিল হল। সবাইকে চমকে দিয়ে আবার একবার বাজখাঁই কণ্ঠে চিৎকার করে ওঠে রফিক, ‘শেষ বার বলছি। হাত নামা! আর ভেতরে এসে এই গোল কাটা জায়গাটার ভেতর চুপ করে দাঁড়া।’ হারু এক মিনিট কী চিন্তা করল। সবাই নিশ্চুপ। তারপর বাধ্য ছেলের মত গুটিগুটি পায়ে মাটিতে কাটা একটা গোল দাগের মধ্যে গিয়ে দাঁড়াল। চোখে-মুখে রাগের চিহ্ন।
বেশ কয়েকজন এসেছিল রফিকের কাছে নানারকম সমস্যা নিয়ে। রফিক বলল, ‘এঁরা দূর থেকে এসেছেন। আজ তোমরা বাড়ি যাও। কাল এসো।’
কয়েক মিনিটেই জায়গাটা ফাঁকা হয়ে গেল। বর্ণালী দেখল একটা বড় নিমগাছের নিচে পীরবাবার ছোট মাজার। চারিদিকে শুধু সবজি ক্ষেত। লোকবসতি নেই বললেই চলে। আলোর কোনো ব্যবস্থা নেই। শুধু দু’ সার টিনের ছাউনি দেওয়া ঘর। শান্ত নিরিবিলি। দু’জন শিষ্য ওদেরকে মাটির দাওয়ায় বসতে বলল। অধীর ভাবছে বেলা হয়েছে। কতক্ষণ লাগবে কে জানে! ক্ষিদে তেষ্টাও তো আছে।
রফিক ওদের কাছে এসে নিচু স্বরে বলল, ‘একেবারে ছেলেটাকে গ্রাস করে ফেলেছে। কতক্ষণ সময় লাগবে বলতে পারব না। তুমি তো মা, মনটাকে একটু শক্ত রেখো। মনে রাখবে আমি যেসব কান্ডকারখানা করব সব কিছুই তোমার ছেলের মঙ্গলের জন্য। জানবে এই মুহূর্তে ওটা তোমার ছেলে নয়। ছেলের রূপ ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর আত্মা। একটু বাদেই ঐ আত্মা অনেক কিছু করবে। কখনও কাঁদবে, কখনও হিংস্র হবে। শুধু নিজের মনকে শক্ত রেখে আল্লার নাম স্মরণ করবে।’ এই সময় একজন লোক ওদের জন্য জল আর কিছু বোঁদে নিয়ে এল।
রফিক কালো লম্বা দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে চিন্তান্বিত মুখে একটা ছোট ঘরে ঢুকে গেল। বর্ণালী আর অধীর ভেবে পাচ্ছে না এরপর কী ঘটবে। ওরা কখনও নিজের চোখে ভূত ছাড়ানো দেখেনি। শুধু লোকের মুখে শুনেছে। একটু পরেই তারা ঐ অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে চলেছে।
ওরা হারুর দিকে তাকাল। তখনও রাগে ফুঁসছে। মাঝে মাঝে একটা পা গোলাকার দাগের বাইরে দিতে গিয়েও পিছিয়ে যাচ্ছে। আশ্চর্য ব্যাপার! ওদের মনে খানিকটা ভরসা এল। কিছু সুরাহা এই পীরবাবার শিষ্য রফিকই করতে পারবে। এক শিষ্য কানে কানে ওদের বলল, ‘বাবা ওকে মন্ত্র পড়ে বেঁধে দিয়েছে। ওখান থেকে ও এক পাও নড়তে পারবে না।’
রফিক ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ডান হাতে একটা চামর। মুখটা থমথমে। একেবারে হারুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, ‘কোথা থেকে একে ধরেছিস?’
প্রশ্ন শুনেই হারু মাটিতে এক দলা থুতু ফেলল। বর্ণালী দেখল থুতুর মধ্যে ছোট ছোট পোকা কিলবিল করছে! কোনো মানুষের থুতুতে এইরকম পোকা থাকতে পারে? রফিকের মুখটা ক্রমশ আরও কঠিন আকার ধারণ করছে। হাতের চামরটা ওর সামনে দুলিয়ে বলল, ‘কী হল? কোনো জবাব নেই কেন? শেষবার জিজ্ঞেস করছি এই ছেলেটার ঘাড়ে চাপলি কেন?’
কোনো উত্তর নেই।
হাতের চামরটা মাথায় একবার ঠেকাতেই হারু মুখ দিয়ে একটা যন্ত্রণার শব্দ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। বর্ণালীর মনটা কেঁদে উঠল। তারপরেই মনে পড়ল রফিকের কথাগুলো। ঢোঁক গিলে ফেলল। হারু কান্নার স্বরে বলল, ‘খুব খিদে লেগেছে, কিছু খেতে দাও না গো!’ বর্ণালীর মায়ের মন কেঁদে উঠল। ভুলে গেল রফিকের সব সাবধানবাণী। ব্যাগের মধ্যে মিষ্টি এনেছিল সেই নিয়ে হারুর কাছে পৌঁছে গেল। রফিক নিজেও এই ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না। একেবারে গোলাকার বৃত্তের মধ্যে চলে গেছে বর্ণালী।
হারুর মুখে একটা পরিবর্তন দেখা দিল। বর্ণালী দেখল ছেলের জায়গায় একজন বুড়োটে মতো লোক দাঁড়িয়ে আছে। তার হাত দুটো কালো বড় বড় লোমে ঢাকা। সারা মুখে হিংসার ছায়া। চোখের তারা বনবন করে ঘুরছে। বর্ণালীর মুখে ভয় খেলা করতে লাগল। ঐ বুড়োটার কালো লোমশ হাত দুটো তার গলা লক্ষ করে এগিয়ে আসছে। ওর মস্তিস্ক জানান দিচ্ছে সে ভয়ঙ্কর বিপদের মধ্যে পড়ে গেছে যেখান থেকে ফেরা খুবই কষ্টকর।
হারুবেশী শয়তানটার হাত দুটো বর্ণালীর কণ্ঠ নালি চেপে ধরার এক সেকেন্ড আগেই রফিক ক্ষিপ্র হাতে ওকে সরিয়ে নিল। এক চুলের জন্যে রক্ষা পেল বর্ণালী। লক্ষভ্রষ্ট হতেই শয়তানটা ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করল। মনে হচ্ছে কোনো ক্ষুধার্ত বাঘকে খাঁচায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। রফিক কঠিন মুখে বর্ণালীর দিকে তাকাল, ‘আমি আগেই বলেছি এই মুহূর্তে ও তোমার বেটা নয়। আগে থেকে বেশি করে খেয়ে খেয়ে জিনটা নিজের শক্তি বাড়িয়েছে। তোমরা নিজের জায়গা থেকে একদম হেলবে না যাই ঘটুক না কেন।’ বর্ণালী নিজের ভুল হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছে।
এবার রফিক ইঙ্গিত করল এক শিষ্যের দিকে। সে দৌড়ে গিয়ে ঘর থেকে একটা পিতলের সর্ষের তেলের বাটি আর এক কৌটো কালো সর্ষে নিয়ে এল। অধীর দেখছে সূর্য মাথার ওপর এসে গেছে। সাড়ে বারটা বাজছে। রফিক চামরটা রেখে তেলের বাটি থেকে কিছুটা তেল আর কিছু সর্ষে হাতের তালুতে নিল। বিড়বিড় করে কিছু দুর্বোধ্য মন্ত্র আউড়ে সেটা ছুঁড়ে দিল হারুর গায়ে। মনে হল এক রাশ বিছুটি পাতা কেউ ওর সমস্ত দেহে মাখিয়ে দিল। ‘জ্বলে গেল, জ্বলে গেল’, করে সারা গা হাত—পা চুলকোতে লাগল।
— ‘এখনও বল কে তুই? কী নাম? নাহলে এরপর…’ কথা শেষ করল না রফিক।
গা চুলকোতে চুলকোতে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে হেসে উঠল ঐ মনুষ্যরূপী দানব। তারপর রফিকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুই কয়েকটা মন্ত্র শিখে আমাকে তাড়াতে পারবি না। তোর গুরু থাকলে হয়ত পারত!’
গরমে রফিকের সারা মুখ ঘামে জবজব করছে। সেই অবস্থায় ও কর্কশ গলায় বলে উঠল, ‘দেখি পারি কি না?’ বলে পাশের থেকে লোহার একটা লম্বা চিমটে তুলে নিল। আলখাল্লার পকেট থেকে একটা সাদা কড়ি বার করে চিমটের সরু মুখে আটকাল। ওর সমস্ত ভাবভঙ্গি একদৃষ্টে তাকিয়ে লক্ষ্য করছে ঐ অপদেবতা। চিমটে দিয়ে কড়িটা ওর কপালে ধরতেই শয়তানটার গগনভেদী আর্তনাদ গরম বাতাসকে ভারী করে তুলল। অধীর আর বর্ণালী দুরুদুরু বুকে যেন হাড় হিম করা ভূতের সিনেমা দেখে চলেছে। এসব যে সত্যি হয় বা আছে না দেখলে বিশ্বাস হত না।
হারুর কপালে যেখানে কড়িটা ধরেছিল সেখানে একটা লাল দগদগে ঘায়ের চিহ্ন। হারুর জায়গায় আবার সেই কদাকার বুড়োটা ফিরে এসেছে। গাল দুটো তোবড়ানো। সারা গালে খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি। নাকের জায়গায় একটা কালো গর্ত। চোখ দুটো দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। রাস্তাঘাটে এইরকম চেহারার কাউকে দেখলে সকাল বেলাই লোকে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাবে।
রফিক চিমটে আবার বাড়িয়ে ধরতেই ও গুরুগম্ভীর গলায় বলে উঠল, ‘আমার নাম রুদ্র তান্ত্রিক। শ্মশানের বটগাছটা আমার থাকার জায়গা।’
রফিক বুঝল এত সহজে একে ঘাড় থেকে নামানো যাবে না। কেননা এই বিদেহী আত্মা নিজেও মন্ত্রতন্ত্র জানে। কাটান দিতে পারবে। নিমগাছের ছায়া সরে গিয়ে রোদ্দুরে ভরে গেছে মাজারের প্রাঙ্গন। এই প্রখর সূর্য মাথায় নিয়ে এখানে আর দাঁড়ানো যাচ্ছে না। তাই রফিক শেষ করতে চাইল প্রশ্নোত্তর পর্ব। কাগজের মোড়ক থেকে কিছু গুঁড়ো মন্ত্রপূত গুঁড়ো পাউডারের মত জিনিস ভূতে ধরা হারুর মুখে ছুঁড়ে দিল। ইশারায় ওর সহচরদের ডাকল। পাউডারের গুঁড়ো ধোঁয়ার আকারে আধা মানুষ আধা ভূত জীবটিকে ক্রমশ নির্জীব করে দিল।
রফিক হুকুম করল, ‘একে নিয়ে গিয়ে তন্ত্রের ঘরে বসা।’ ওরা তিনজনে অজ্ঞান হারুকে চ্যাংদোলা করে ঘরে নিয়ে গেল। ঐ রোদ্দুর থেকে উঠে রফিক ছায়ায় ওদের কাছে এল। ঘামে কালো আলখাল্লাটা ভিজে গেছে। রোদের তাপে মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। অধীরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যত সহজ হবে ভেবেছিলাম ততটা না।’ ওর কপালে চিন্তার রেখা।
বর্ণালী সে কথা শুনে আতঙ্কিত হল। ঐ মুখ দেখে রফিক বলে উঠল, ‘ভয় পেও না। আমিও পীরবাবার শিষ্য। এত সহজে হার মানব না। একটু দেরি হবে এই যা। বরং তোমরা এই ফাঁকে কালীপুর গিয়ে কোনো হোটেলে খেয়ে এসো।’ আর না দাঁড়িয়ে রফিক ঘরে ঢুকে গেল। ওদের দু’জনেরই খাবার ইচ্ছে নেই। কিন্তু ড্রাইভার সুকান্ত ওখানে আছে। তাই ওরা আল ধরে কালীপুরের দিকে এগোল। চারিদিক রোদের তেজে উত্তপ্ত। গাছপালাগুলো নিথর। একটুও বাতাস নেই। কেমন যেন চুপচাপ সব। যেন সবাই মিলে দূরাগত কোনো বিপদের ভয়ে অপেক্ষারত! বর্ণালী বলল, ‘আমাদের জন্য তোমাকেও কষ্ট করতে হচ্ছে।’
অধীর উত্তর দিল, ‘হারু ভালো হয়ে গেলেই আমার কষ্ট সার্থক।’
সুকান্তকে খাবার টাকা দিয়ে ওরা ফিরে এল দরগায়। যে ঘরে হারুকে রেখেছিল সেখান থেকে ভেসে আসছে নানাবিধ নারকীয় চিৎকার। ওদের দু’জনের বুকের ভেতরে হাতুড়ি পিটতে শুরু করল। খোলা দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই ওদের মুখগুলো ভয়াল আকার ধারণ করল। রফিকের সামনে লোহার বাক্সের মধ্যে ছোট ছোট কাঠ জ্বলছে। তার উল্টো দিকে একটা আসনে বসে আছে এক তাল রক্তাক্ত মাংসের একটা শরীরের মূর্তি। রফিকের চোখ মুখে ধনুক ভাঙা পণ। তার আসনের একধারে ছোট একটা করোটি আর পীরবাবার একটা বড় ছবি। ঐ মাংসের পিন্ড থেকে ভেসে আসছে এক অদ্ভুত শব্দ। অনেকটা বিলাপ ধ্বনির মত। কিন্তু হারু কই?
রফিকের কঠিন গলা, ‘আর তোমার তন্ত্রমন্ত্র কিছু খাটবে না। ভুলে যেও না তুমি এখন মৃত।’
অস্পষ্ট কণ্ঠে কতশত যোজন দূর থেকে কেউ বলে উঠল, ‘জানি আমি মৃত। আমার অপূর্ণ সাধনার পূর্ণতার জন্যই এই নবীন দেহটা আমি ধারণ করেছি। এর হালকা রাশ সে কাজে সহায়তা করেছে।’ কথাটা বর্ণালীও শুনতে পেল। কথাগুলো শুনে মনে হল হৃৎপিন্ডটা এক লাফে গলার কাছে চলে এসেছে। অধীর বুঝল বৌদি আবার কিছু করে বসতে পারে এবং রফিক এই সময় অমনোযোগ হয়ে পড়লে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা।
রফিক একটু নরম স্বরে আত্মাটাকে বলল, ‘এ তোমার মিথ্যে ধারণা। কারোর ক্ষতি করে কোনো সাধনায় ফল লাভ করা যায় না। এ আমার গুরুর কথা। ছায়া কোনোদিন কায়ার রূপ ধরে বেশিদিন থাকতে পারে না। এই হল জগতের নিয়ম। তুমি ভুল ধারণা ছেড়ে এই শরীরটাকে মুক্তি দাও। দেখ ওর মা কাতর চোখে তোমার কাছে এই প্রার্থনা করছে। মায়ের কান্না তোমাকে অভীষ্ট লাভ করতে দেবে না।’ এক টানে কথাগুলো বলল।
অতৃপ্ত আত্মা নীরব। সারা ঘর জুড়ে নিস্তব্ধতার আবেশ। পিন পড়া নীরবতা। মনে হচ্ছে ঐ বিদেহী তান্ত্রিক কিছু চিন্তা করছে। পরবর্তী উত্তরের জন্যে সবাই উদগ্রীব। এই সময় একটা চোরা শব্দ সবাইয়ের কানে এসে লাগল। রফিক ছাড়া বাকিরা এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। রফিক হঠাৎ চেঁচিয়ে বলে উঠল, ‘ঐসব ঝামেলা করে তুমি পার পাবে না। মন্ত্রের দ্বারা এখানের সবাইকে আমি সুরক্ষিত করে রেখেছি। নিজে তান্ত্রিক হয়ে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ।’ এবার অধীরের চোখ পড়ল চোরা শব্দের উৎসস্থলে। দেওয়ালে টাঙানো মরচে-ধরা তরোয়ালটা পেরেক থেকে আপনা-আপনি খুলে মাটির দিকে নেমে আসছে কাউকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে। মুখ দিয়ে একটা অষ্ফুট আওয়াজ ওর বেরিয়ে এল।
রফিকের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওটা পুনরায় দেওয়ালে আটকে গেল। রফিক যে আরও বেশি শক্তি ধরে তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
আবার কঠিন গলার স্বর শোনা গেল রফিকের, ‘অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। তুমি যদি ভেবে থাকো যে কোনো ভাবে সময় কাটিয়ে রাত্রি ডেকে আনবে তাহলে ভুল করছ।’ করোটিতে মাখানো সিঁদুরের ডেলা থেকে একটু সিঁদুর আঙুলে করে নিয়ে চোখ দুটো বুজে দুর্বোধ্য মন্ত্র পড়ে চলল ও। প্রায় মিনিট তিনেক ঐরকম উচ্চস্বরে মন্ত্র পড়ার পর সিঁদুরটা মৃত রুদ্র তান্ত্রিকের আসনে ছোঁয়ানো মাত্রই ঐ রক্তাক্ত মাংসপিন্ডের মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখা দিল। ওটা ধীরে ধীরে আবার হারুর আকৃতি ধারণ করতে শুরু করল। রফিকের মুখে একটা জয়ের হাসি এতক্ষণ বাদে দেখা দিল।
মিনিটখানেকের মধ্যেই আসনে হারুর উপস্থিতি দেখা গেল। বর্ণালী ভেবেছিল ছেলেকে বোধহয় আর এ জীবনে দেখতে পাবে না। হারুর দিকে তাকিয়ে রফিক প্রশ্ন ছুঁড়ল, ‘এই অস্থায়ী আধার ছেড়ে তোমার স্থায়ী আধারে যেতে কিসের অবলম্বন চাও?’ ঘর্মাক্ত হারু মাথা দোলাল। কিন্তু উত্তর দিল না। সবাইকে অবাক করে দিয়ে রফিক হঠাৎ উঠল। জ্বলন্ত ধূপের গোছা হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে ওটা হারুর গায়ের কাছে নিয়ে যেতেই হারু ভয়ে ককিয়ে উঠল। রফিকের চোখ দুটো রাগে ফেটে পড়ছে।
‘বলছি বলছি। ওদের বাড়ির কাঁঠাল গাছটাকে অবলম্বন করে আমার স্থায়ী ঠিকানায় চলে যাব।’ আবার রফিক নিজের আসনে বসল। ছোট্ট ঘরটা গরমে কাঠের আগুনের ধোঁয়ায় যেন বৈদ্যুতিক চুল্লিতে পরিণত হয়েছে।
রফিক অধীরের দিকে ফিরে বলল, ‘তুমি ওদের বাড়িতে খোঁজ নিয়ে বলো কাঁঠাল গাছটা কী অবস্থায় আছে। এর ছলচাতুরিতে বিশ্বাস করা যায় না।’
অধীর অনেক চেষ্টায় বাড়ির লাইন পেয়ে ভাইকে পাঠাল হারুদের বাড়ি। হারু ধীরে ধীরে ন্যাতার মতো আসনে এলিয়ে পড়ল। আর এই সময় বাইরে বড় নিমগাছটার ডালপালাগুলো এক দমকা হাওয়ায় দুলে উঠল। একটু বাদেই অধীরের ফোনে খবর এল হারুদের বাড়ির কাঁঠাল গাছের একটা মোটা ডাল একটু আগেই ভেঙে পড়ে গেছে।
রফিক সন্তুষ্ট হয়ে একটা কাঁচের বোতল থেকে খানিকটা জল হারুর সারা গায়ে ছিটিয়ে দিয়ে বলল, ‘ওকে শুদ্ধ করে দিলাম। আর কোনো ভয়ের কারণ নেই। তবু আমি একটা তাবিজ দিচ্ছি। ওটা ওর গলায় পরিয়ে রাখবে। কেননা কয়েকটা দিন ঐ আত্মা ওর ধারে কাছে ঘুরঘুর করবে একটু সুযোগের আশায়। আগামী তিনদিন একা একা ওকে কোথাও যেতে দেবে না। সন্ধ্যের পরে তো নয়ই।’
বর্ণালী হাত জোড় করে রফিককে বলল, ‘আমি কী বলে কৃতজ্ঞতা জানাব! আমার একমাত্র ছেলেকে আপনি নতুন জীবন দান করলেন।’
— ‘আমি নই। সব আল্লার কৃপা আর গুরু পীরবাবার দোয়া।’ হারুকে হাত ধরে রফিক দাঁড় করাল। যেন গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠল ও।
ফিরে আসার সময় জোর করে পাঁচ হাজার এক টাকা ওদের হাতে তুলে দিল বর্ণালী। সূর্য এখন পশ্চিম দিকে ঢলছে। একটু এগোতেই দু’-একটা ঘুড়ি আকাশে উড়ছে দেখতে পেয়ে হারু বলে উঠল, ‘ইস আজকে বিশ্বকর্মার দিন, ঘুড়ি ওড়ানো হল না!’ ফাঁকা আলের পথ ধরে ওরা তিনজন কালীপুরের দিকে এগোল। যেখানে সুকান্ত গাড়ি নিয়ে ওদের জন্যে অপেক্ষা করে আছে।
_____
১. যাঁরা পীরবাবা রফিকের ব্যাপারে জানেন না তাদের কাছে অনুরোধ ‘পীরবাবার শক্তি’ ‘ভুতে ধরা ‘ ‘শিহরনের ছোঁয়া ‘ ‘ও একা’ গল্পগুলো পড়লে জানতে পারবেন।
