সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ১
এক
সব মানুষের থাকে বোধহয় এক সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম। ঋতুকালের কোনো এক নির্দিষ্ট আবর্তে সেই মোকামের কথা তার স্মরণ হয়। কেউ তা বোধ করে বর্ষায়, কেউ শরতে বা শীতে, কারুর বা অন্য ঋতুতে।
একসময় রাজারা এই ঋতুকালে দিগ্বিজয়ে বেরোতেন। এখন আমাদের মতো গেরস্তেরা যায় বেড়াতে। আমি ভাটিকুমার, আমার বোধ যেন-বা বাঁধা আছে শরতে। তাই ঘাসের ডগায় শিশির পড়লে আমার প্রাণ আনচান করতে শুরু করে। তখন বাক্স বাঁধার হুটোপুটি। কিন্তু বহু স্থানে গিয়ে থুয়ে দেখেছি প্রাণের মধ্যে ওই হায় হায় ভাবটি থেকেই যায়। এই ভোরে শিশিরভেজা ঘাসের উপর যেন কাকে চেয়েছিলাম, সে নেই। কৌশানির বিজন বাসে, রানিক্ষেতের শৈলাবাসে বা কংখলের গঙ্গাকিনারে গিয়েও মনে হয়েছে, না, এ ঠিক নয়।
অবশেষে তার সন্ধান পাই কালীগঙ্গার পারের এক হিজল-কাশ-হোগল-নলখাগড়ার ঝোপে। আর সেই হলো কাল। এখন ঘাসে শিশির পড়লেই পা চঞ্চল, এই হলো আমার সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম। একদা এখান থেকেই দেহতরী ভাসিয়েছিলাম গোনে, তাই এখন উজানযাত্রায় যাই সিদ্ধিগঞ্জের মোকামে। কালীগঙ্গার শেষ ঘাট আমার সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম।
হোগল, কাশ, নলখাগড়ার ঝোপের মধ্যে থাকে আবার এক মুখ। সে মুখের কোনো বাস্তব অবয়ব নেই। আমার আছেও বা। সে এক বিশাল বিস্তার নদীতে ভাসে। নদীর নাম জানি–ওই কালীগঙ্গা। মুখের নাম, সাধ করে রাখি জলেশ্বরী। সেই মুখ দেখতে যাওয়া। ওখানে আমার সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম।
দেখা তো কম হলো না। এখান থেকে দেহতরী ভাসানোর পর কত না দেখলাম। দেখলাম, সর্বত্রই মানুষ মানুষকে খায়। আবার মানুষই মানুষকে মানুষ বানায়। এর নানান কিসিম আছে। একদিন অমূল্য নামের একজন মানুষ গান শুনিয়েছিল রানাঘাটের ইস্টিশানে বসে। বলেছিল সে–মাইনষের চউক্ষের দিকে চাইয়া দ্যাখবেন, তা হলেই বোঝতে পারবেন হে আপনার আত্মীয় কিনা। সে গেয়েছিল–
মধুর কৃষ্ণ প্রেম যার
অন্তরে লেগেছে
নয়ন দেখিলে যায় চেনা – মনরে।
মনরে, পাখি ধরা আঁখি তার
সমার্থ ভাবময়
জগৎজোড়া চোখের চাহনি।
যেই জন কৃষ্ণ জানে
তারে সে আপন মানে
তার সাথে করে লেনাদেনা রে
মনরে…
বলেছিল, আত্মীয় যে, হ্যার চোউক্ষে দ্যাখবেন জগৎজোড়া চৌখের চাহুনি। বলে আবার এক নতুন গান ধরে–
আহা এ ব্রহ্মাণ্ডে
কেবা পর, কেবা রে আপন,
যারে দেখি ধুলাকাদায়,
সেই তো প্রাণেরই ধন।
যার চৌখে ফাঁদ পাতা
সে আমারও হয় বিধাতা।
আবার তারও সাথে
হয় আমারও ভাবও নিবন্ধন
আহা এমন সুহৃদ বিনে আমার
অবশ্য মরণ…
এরকম বলেছিল অমূল্য, তার দোতারার দোরতং-এর সঙ্গে। তো সেই পাখি-ধরা আঁখির ঠিকানাই আমার সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম হলো শেষ তক। সে আঁখি দেখলাম রূপসার ঘাটে, হুলার হাটে আর কালীগঙ্গার কিনারে।
সীমান্তেও সে আঁখি ঝিলিক দিয়েছিল। কিন্তু সেখানে তখন বড় ব্যবহারের জগৎ। সেখানে যারা বসে, তারা বড় ব্যবহারজীবী। তারা বলে–তুই কী নিবি, আমারে কী দিবি? তাও কি স্বভাবের পাখি-ধরা আঁখি কারও অক্ষিকোটরে ছিল না? কিন্তু তা সমার্থ ভাবময় হতে পারল কই? বাধা ছিল যে দুস্তর। কিন্তু সে কথা তুচ্ছ কথা। এলেবেলে কথা, তা বরং আড়ালেই থাক।
সীমান্ত থেকে ছিটকে বেরিয়ে খোঁজ করছিলাম। সেই পাখি-ধরা আঁখির। পাইনি বললে ভুল হবে, আবার পেয়েছি বললেও মিথ্যা হবে। শুধু ওই ঝিলিক, চোখের ঝিলিক। এক রিকশাওয়ালা বলেছিল–রাস্তার মাপ বুঝে পয়সা দেবেন। পরদেশি মানুষ, ঠকাব না। ওঠেন আমার রিকশায়। নেমে দশটি টাকা দিতে বলে, ইণ্ডিয়ার দশ ট্যাহা, মোর গো পনেরো ট্যাহার ল্যাহান জানবেন–তাই আরও পাঁচ টাকা দিই।
