Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026

    বৈদ্যুতিক চুল্লি – শঙ্কর চ্যাটার্জী

    April 27, 2026

    সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – মিহির সেনগুপ্ত

    April 27, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    ৫৭ থেকে ৪৭ (স্বাধীনতা সংগ্রামের কল্পিত বিকল্প ইতিহাস)

    অরিন্দম দেবনাথ এক পাতা গল্প290 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    মেরা হিন্দোস্তাঁ নহী দুঙ্গী – দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

    যাকে ইতিহাস বলে জানো, সময়ের যে চেনাস্রোতে পালকের মত ভেসে যাও, সে তার একমাত্র ধারা নয়। সময় বহুস্রোতা। তার একেক ধারা একেক ইতিহাসের জন্ম দেয়। আমি তাদের প্রতিটিকে দেখি।দেখতে পাই। এসো আজ তোমাদের আর এক কালস্রোতের গল্প বলি। সময়ের এই স্রোত, এই আমি, এই তুমি, এই ভারতবর্ষ যেমন সত্য, তেমনই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সত্য সেই অন্য ধারাও। আজ থেকে দীর্ঘ একশো তেষট্টি বছর আগে, উত্তরপ্রদেশের কানপুরের কাছে কল্পি নামের এক শহরের বাইরে এক পলাতক যোদ্ধারমণী অন্ধকারে একটা গলার শব্দ শুনেছিলেন। সামান্য দু’একটা কথা। আর তারপর সেই যোদ্ধারমণীর ঘোড়া ঘুরে গিয়েছিল উত্তর-পশ্চিম মুখে, পশ্চিম নেপালের কাঠমান্ডুর উপকন্ঠে থাপাথালি নামের এক শহরতলীর দিকে।

    সেই যাত্রা এক দ্বিতীয় কালস্রোতের সৃষ্টি করে এই দেশের ইতিহাসে। সময়ের সেই ধারায় সৃষ্টি হয় এক নতুন ভারতবর্ষের। সে ভারতও তোমার ও আমার।তবে তা অন্য ভারত। জ্ঞানে গরিমায় শৌর্যে বিশ্বসেরা ভারত।

    যোদ্ধারমণীর এই যাত্রার কিছুকাল বাদে, বর্মার রেঙ্গুন শহরের বিখ্যাত শেওডাগন প্যাগোডার ছায়ায় একটি তুচ্ছ কাঠের কুটিরের উঠোনে দাঁড়িয়ে তাঁরই কন্ঠে ফের উচ্চারিত হয়েছিল এক অমোঘ মন্ত্র… “মেরা হিন্দোস্তাঁ নহী দুঙ্গী…”

    তোমরা বলো, ক্লিওপেট্রার চোখের ইশারায় হাজার রণতরী সমুদ্রে ভেসেছিল। সে কেবল গল্পকথা। কিন্তু এই যোদ্ধারমণীর সেই একটি মন্ত্র সেদিন একটি জীর্ণ শরীরে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছিল। তারপর সুবিপুল ঢেউ হয়ে উঠে, বর্মা থেকে বঙ্গোপসাগর বেয়ে ঢুকে এসেছিল উপমহাদেশে। ভারত, নেপাল ও বর্মার মানুষেরা হাতে হাত মিলিয়ে সেই ডাকে সাড়া দিয়ে এক বিপুল তুফান তুলেছিলেন দেশের বুকে।তার আঘাতে এদেশের বুক থেকে ভেসে গিয়েছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তুচ্ছ শক্তি। জন্ম নিয়েছিল গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষ। তার প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান হন সেই যোদ্ধারমণী। তাঁর নাম… মণিকর্ণিকা তাম্বে। এসো তোমাদের সেই গল্প বলি…

    ১। দাউন্না পাহাড়ের আগন্তুক

    দাউন্না পাহাড়। অতীতকালে একে ত্রিকূট পর্বত নামে ডাকা হত। স্থানীয় মানুষরা বলেন, নাকি একসময় বাল্মিকী তপস্যা করেছেন এই পাহাড়ে। এই পাহাড়েই একসময় নাকি তপস্যায় বসেছিলেন সিদ্ধার্থের মা মায়াদেবীও। সময় বদলেছে। এখন এ-পাহাড় দেবী দাউন্নার। তিনি দেবী দুর্গারই রূপ।পাহাড়ের মাথায় তাঁর প্রাচীন মন্দির থেকে একদিকের ঢাল নেমে গেছে বরদাঘাট ছুঁয়ে ভারতের সমতলের দিকে। অন্যদিকে তা ক্রমশ উঁচু হয়ে এগিয়ে গেছে নেপালের গভীরে।

    মন্দিরটা আকারে বিশেষ বড়ো নয়। তবে খ্যাতিতে বড়ো। দেবী দুর্গার প্রাচীন মূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে তাতে। ভারতের সমতল এলাকা থেকে নেপালের দিকে আসা ব্যাপারীরা পাহাড়ি পথে এগিয়ে যাবার আগে এইখানে দেবীর মূর্তিকে পুজো করে তাঁর আশীর্বাদ নিয়ে নেয়।

    ইদানিং ব্যাপারীদের ভিড় বিশেষ নেই এখানে। মন্দিরটা নির্জন হয়েই পড়ে থাকে বেশির ভাগ সময়। ভারতবর্ষে আগুন জ্বলছে। সেখানে ক্ষমতা দখল করে বসা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়েছে দিশি সেপাইরা। ডামাডোলের বাজারে বেণেরা আর তাদের পণ্য নিয়ে পথে বের হতে সাহস করে না। কখন কোথায় যুদ্ধ বাধে। তাছাড়া সেপাইরা সকলেই যে লোক সুবিধের তা-ও নয়। দল বেঁধে লুটতরাজও চালায় পথেঘাটে। মন্দিরটা তাই কয়েক মাস ধরে খানিক অবহেলিত হয়েই পড়ে থাকে। পুরোহিত কোনোমতে নমো নমো করে নিত্যপূজাটুকু করে যান কেবল।

    তবে আজ সে নিয়মের খানিক ব্যত্যয় হয়েছে। অতিথি এসেছেন মন্দিরে। লম্বা চওড়া চেহারার একজন ভারতীয় গৃহী যোগী।গতকাল সন্ধ্যায় একটা গরুর গাড়িতে স্ত্রীকে নিয়ে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন।তবে কথা হল, নিজেকে তিনি যোগী বলে পরিচয় দিলেও তাতে পুরোহিতের খুব একটা বিশ্বাস হয়নি। কারণ পরণে গেরুয়া, গলায় রুদ্রাক্ষ, আর মাথায় জটা আছে বটে, কিন্তু তাঁর চোখের দৃষ্টি বড়ো কঠোর। রাজপুরুষদের মতই। স্ত্রীকে গরুর গাড়িতে আনলেও নিজে তিনি এসেছেন ঘোড়ার পিঠে। শরীরে কোনো অস্ত্র না থাকলেও, ঢাকা দেয়া গাড়িটার ভেতরে ধাতব জিনিসপত্রের নড়াচড়ার শব্দ ওঠে।

    সাধুমহাত্মা পুরুতমশাই কম দেখেননি। ভণ্ড যোগীও কম চোখে পড়েনি তাঁর। বটের আঠা আর খানিক ধুলো দিয়ে জটাজুট সহজেই বানিয়ে নেয়া যায় এ তিনি জানেন। ফলে গত সন্ধ্যায় যখন এই আগন্তুক এসে আশ্রয় চাইলেন, তখন পুরোহিত প্রথমে খানিক ইতস্তত করেছিলেন। কিন্তু প্রায় একই সময়ে কাছাকাছি বরদাঘাট শহরের নগর পঞ্চায়েতের প্রধানের কাছ থেকে এক ঘোড়সওয়ার তাঁর কাছে একটা হাতচিঠি নিয়ে এসে হাজির হয়। তাতে প্রধান এই অতিথির চেহারার একটা ছোটো বিবরণ দিয়ে লিখেছিলেন, ইনি এলে এঁকে রাত্রের মতন গোপনে আশ্রয় দেবার হুকুম এসেছে কাঠমাণ্ডু থেকে। সেখান থেকে পরদিন জং বাহাদুর রাণার ডানহাত শেরবাহাদুর ধামী স্বয়ং আসবেন এই সন্ন্যাসীর সঙ্গে দেখা করতে।

    এই হুকুমের পর আর সন্ন্যাসী আসল না ভণ্ড তা নিয়ে ভাবনাচিন্তার আর কোনো সুযোগ ছিল না পুরুতমশাইয়ের। নিজের বাড়িতেই নিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি তাঁদের। কিন্তু অতিথি তাতে রাজি হননি। লোকালয়ের বদলে স্ত্রীকে নিয়ে নির্জনে মন্দিরের পেছনদিকের বারান্দাতেই রাতটা কাটাবেন বলে জানিয়েছিলেন। জানিয়েছিলেন, দেবীকে সন্ধ্যারতিতে যে সামান্য ভোগ নিবেদন করা হয় তাইতেই রাতের খাবার হয়ে যাবে তাঁদের। এবং সেইসঙ্গেই দেবীর প্রণামী হিসেবে পাঁচটা সোনার আশরফি তুলে দিয়েছিলেন পুরোহিতের হাতে।

    আশরফিগুলো পেয়ে একেবারে বিগলিত হয়ে গিয়েছিলেন পুরোহিত। গত কিছুদিন যাত্রীর অভাবে তাঁর যে লোকসানটুকু হয়েছে, দেবী ভবানী আজ সে ক্ষতি পুষিয়ে অনেক বেশি দিয়েছেন তাঁকে এই আগন্তুকের হাত দিয়ে। তীক্ষ্ণবুদ্ধি মানুষটা অনুমান করে নিয়েছিলেন, ইনি ছদ্মবেশী কোনো ভারতীয় রাজপুরুষই হবেন। সম্ভবত পালিয়ে আশ্রয় নিতে আসছেন নেপালে। তবে তিনি তুচ্ছ পুরুত। বড়ো বড়ো বিষয়ে তাঁর আগ্রহ কম। কাজেই আশরফিগুলো হস্তগত করে বাড়ি ফিরে গিয়ে তিনি ছেলেকে ডেকে পরদিন দেবীর ষোড়শোপচারে পুজোর বন্দোবস্ত করেছিলেন। প্রণামির কিছুটা অন্তত অতিথির কল্যাণে লাগা উচিৎ।

    পুজোর সঙ্কল্প যজমানের নামে করতে হয়। আয়োজন করতে গিয়ে ছেলে তাঁকে সে-প্রশ্ন রাখতে পুরোহিতের খেয়াল হয়েছিল, আগন্তুক নিজের নাম জানাননি তাঁকে। গোপন সফর। অতএব নাম জিজ্ঞাসা করাটাও উচিৎ হবে না হয়তো। শেষমেষ অনেক ভেবে তাঁর খেয়াল হয়, গরুর গাড়ি থেকে নামাবার সময় মানুষটা তাঁর স্ত্রীকে নাম ধরে ডেকেছিলেন। গোপিকাবাই। কাজেই সেই নামেই পুজোর সংকল্প করতে বলে দিয়েছিলেন তিনি ছেলেকে।

    আজ সকালে শেরবাহাদুর ধামী এসে পৌঁছোবার পর পুজো শুরু হয়। খানিক আগে পুজোর পালা শেষ হতে আগন্তুক বলেছিলেন, মন্দিরের গর্ভগৃহে শেরবাহাদুর ও সস্ত্রীক তিনি দেবী ভবানীর ধ্যান করতে চান কিছুক্ষণ। অতএব তাঁদের ভেতরে রেখে মন্দিরের দরজা বন্ধ করে তার দরজায় পাহারা দিচ্ছিলেন পুরোহিত নিজে।মাঝে মাঝেই, ভেতর থেকে নিচুগলায় কিছু কথাবার্তার শব্দ কানে আসছিল। তবে সে নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাননি তিনি। তাঁর মন পড়ে আছে সামনে রাখা বড়োসড়ো একটা থলির দিকে। শেরবাহাদুর ও এই অতিথি দুজনের দেয়া ভালো পরিমাণ প্রণামী রয়েছে ওতে। সবই দেবীর কৃপা।

    মন্দিরের ভেতরে তখন শেরবাহাদুর ধামী তীক্ষ্ণ চোখে আগন্তুকের দিকে দেখছিলেন। আগন্তুক ধীরগলায় বলছিলেন, “দেবী ভবানীর সামনে তাঁর ও আমার স্ত্রী–র নামে শপথ নিয়ে বলছি বন্ধু, কানপুরে বিবিমহলের নারকীয় হত্যাকাণ্ড আমার হাতে হয়নি। এত নিরীহ মহিলা আর শিশুর রক্ত আমার হাতে লেগে নেই।আমি, ধন্ডু পন্ত, মারাঠা সাম্রাজ্যের পেশোয়া, শিবাজি মহারাজের ঐতিহ্যের বাহক। এ-পাপ আমার হাত দিয়ে ঘটা সম্ভব নয়।”

    একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ধামী। কানপুরের ঘটনাবলীর ওপরে সতর্ক নজর রেখেছিলেন প্রধানমন্ত্রী জংবাহাদুর। ঘটনাগুলোর পর্যালোচনা করে তাঁরও সেই একই মত। তিনি নিজে দুর্গার উপাসক। ভবানীর উপাসক মারাঠাদের কেউ এমন ঘৃণ্য কাজ করতে পারে তা তিনিও মানতে রাজি নন। আর তাই বিবিমহলের হত্যাকাণ্ডের পর, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাপতি হ্যাভলকের বাহিনী যখন প্রতিশোধ নেবার জন্য কানপুরের দিকে এগোচ্ছে তখন সেখান থেকে ধন্ডু পন্তের আশ্রয় প্রার্থনার চিঠিটা এসে পৌঁছোতে তিনি এক কথায় তাতে সম্মতি দিয়েছিলেন। তারপর ধুরন্ধর রাজনীতিবিদ শেরবাহাদুরকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন দাউন্নায় তাঁকে স্বাগত জানাবার জন্য। অবশ্য এর পেছনে একটা অন্য উদ্দেশ্যও ছিল তাঁর। এইবার শেরবাহাদুর সেই কথাটা উত্থাপন করলেন।

    “সে আমরা জানি শ্রদ্ধেয় নানাসাহেব। আর সেইজন্যই নেপাল আপনাকে আশ্রয় দিতে প্রস্তুত। আমাদের সেনাবাহিনী আপনার মত একজন নেতাকে পেলে নেপালের সুরক্ষা… একী? আপনি…”

    চোখ থেকে বের হয়ে আসা বেয়ারা জলের ফোঁটাগুলোকে মুছে নিলেন কঠোর মানুষটা। তারপর স্ত্রীর দিকে একনজর দেখে নিয়ে বললেন, “না শেরবাহাদুর। অনেক অসহায় মানুষের রক্ত মেখেছি হাতে। যুদ্ধে আর কোনো রুচি আমার অবশিষ্ট নেই। ভারতবর্ষের বুকে আর আমার জায়গা হবে না। ওই শ্বেতাঙ্গ কুকুরের দল সেখানে হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছে আমায়। ভারতবর্ষে স্বাধীন ধর্মরাজ্যের আর কোনো আশা নেই। ওরা…”

    “ভুল করছেন নানাসাহেব,” শেরবাহাদুর মাথা নাড়লেন, “দিল্লিতে বখ্‌ত্‌ খানকে প্রধান সেনাপতির পদ দিয়েছেন বাহাদুর শা। সেখানে প্রতিদিন নতুন নতুন সিপাহীর দল এসে জড়ো হচ্ছে। মহাবিদ্রোহ সফল হবার আশা এখনো…”

    “আশা নেই শেরবাহাদুর, “ মাথা নাড়লেন নানাসাহেব, “ওই সিপাহীদের আমি জানি। এক বৃদ্ধ অকর্মণ্য বাদশাকে সামনে রেখে ওরা যথেচ্ছ লুটতরাজেই ব্যস্ত। ঐক্য নেই, শৃঙ্খলা নেই। ওরা পারবে না।”

    তাঁর দিকে তাকিয়ে একটু হতাশ হচ্ছিলেন শেরবাহাদুর। এ কোন নানাসাহেব! একজন ভেঙে পড়া দুর্বল মানুষ! খানিক চুপ করে থেকে নিজের চিন্তাভাবনাগুলোকে একটু গুছিয়ে নিলেন তিনি। প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াটা এঁর এমন হতে পারে সে আন্দাজ জং বাহাদুর সঠিকভাবেই করেছিলেন তবে। এঁর এখন কিছুদিন বিশ্রাম প্রয়োজন প্রথমে। শান্ত হওয়া দরকার। তারপর… বাঘের বাচ্চা বাঘই হয়। একদিন ফের ইনি উঠে দাঁড়াবেন। তবে উপস্থিত…

    “বেশ। তাই হোক তবে,” অবশেষে কথা বললেন তিনি, “রাজধানীর কাছেই থাপাথালি। শান্ত জায়গা। সেখানেই উপস্থিত পৃথিবীর দৃষ্টির আড়ালে, নেপালের রাজকীয় নিরাপত্তায় আপনি বিশ্রাম নিন। আপনার ইচ্ছা বিনা কেউ আপনাকে বিরক্ত করবে না। পাশেই নিমিষা অরণ্য। শিকারের অভাব নেই। আপনার পছন্দের খেলা।”

    স্ত্রী গোপিকাবাইয়ের দিকে একবার ঘুরে দেখলেন ধুন্ডু পন্ত উর্ফ নানাহাসেব। সেখানে নীরব সম্মতির ইশারা ছিল। এবারে শেরবাহাদুরের দিকে ঘুরে ক্লান্ত গলায় তিনি বলে উঠলেন, “তাই হোক তবে।”

    ২। অন্ধকারের স্বর

    সব দেখি আমরা। সময় আমাদের স্পর্শ করে না। তার চলাচল, তারা হাজারো শাখাপ্রশাখায় ইতিহাসের নানান রূপ আমাদের চোখে ধরা পড়ে, যেমন তোমাদের চোখে ধরা পড়ে সিন্ধু-গঙ্গা-ব্রহ্মপত্রের জলধারা। নিমিষা অরণ্যের গভীরে, প্রাচীন পার্বতী মন্দিরের ধ্বংসস্তূপ আজও দাঁড়িয়ে। তোমাদের চেনা সময়স্রোতে এরপর, সেই ধ্বংসস্তূপের পাশে একটা বাঘের থাবায় প্রাণ দিয়েছিলেন নানাসাহেব। ১৮৫৮ সালের একুশে এপ্রিল তারিখে দুপুর বারোটায়। সেদিন, চূড়ান্ত হতাশায় দেবী পার্বতীর কাছে মৃত্যুর প্রার্থনা করে, নির্ভয়ে গিয়ে তিনি নিজেকে বলি দিয়েছিলেন দেবীর বাহনের থাবায়।

    কিন্তু সময়ের যে দ্বিতীয় ধারার কথা বলছি সেখানে নানাসাহেবের এমন দুঃখজনক মৃত্যু হয়নি। হয়নি যে, তার কারণ, আমি নিজে তাতে হস্তক্ষেপ করেছিলাম। হস্তক্ষেপ করেছিলাম, ঐ বাঘের আক্রমণে ষোলোদিন আগে, থাপাথালি থেকে বহু দূরে, তোমাদের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের কল্পি নামের এক ছোটো শহরের ঠিক বাইরে। সামান্য একটা পরামর্শ। তবে ওইটুকুই যথেষ্ট হয়েছিল সময়ের আর ইতিহাসের এই নতুন ধারাকে নতুন খাতে বইয়ে দিতে। এবারে সেই কাহিনি বলব।

    “মণিকর্ণিকা!”

    হালকা গলার শব্দটা পেয়ে চমকে উঠলেন রানি। পুরোনো নামে কে ডাকল তাঁকে এই গভীর রাতে! নাকি স্বপ্নেই নামটা শুনে…

    নামটার সঙ্গে ছোটোবেলার কতো স্মৃতিই যে জড়িয়ে আছে! বিঠুর শহরের সেই ব্রহ্মাবর্ত ঘাট, ধ্রুব টিলা, বাল্মিকী আশ্রমের পথে ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো এক কিশোরী আর তার দুই অসমবয়েসি বন্ধু- ধণ্ডু পন্ত ও তাঁতিয়া…

    “মণিকর্ণিকা… এদিকে দ্যাখ তুই ছবেলি, এই যে এইভাবে তলোয়ারের মুঠ ধরতে হয়, বুঝলি? নে এবারে… আক্রমণ কর আমাকে… আরে ভয় নেই। কাঠের তলোয়ার তো… কিচ্ছু হবে না আমার… হা হা…”

    যুদ্ধ, মৃত্যু, হতাশা, সেই সবকিছু পেরিয়ে কতকালের চেনা সেই অতি প্রিয় গলাটা ফের একবার কানে বাজছে যেন তাঁর, ওই পুরোনো নামটা শুনে।ধুন্ডুর গলা। প্রিয়তম ধুন্ডু…

    কিন্তু তারপর, একদিন ঘটা করে বিয়ে হয়ে গেল তাঁর। ঝাঁসির রাজবাড়িতে সংসার করতে আসবার পর ওই নাম ধরে আর কেউ কখনো ডাকেনি তাঁকে। সে নাম মরেছে আজ অনেক দিন হল। তাহলে…?

    পাশে ঘাসের পুরু বিছানায় ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট দামোদর।ওর শরীর ভালো নয়। কেল্লার পাঁচিলের ওপর থেকে ঐ বিশাল লাফ! বাদলের মত তেজি ঘোড়াও সে লাফের বিপুল ধাক্কায় প্রাণ দিল। ওইটুকু শিশু সে-সময় মায়ের পিঠের বাঁধা থেকে সেটা সহ্য করলেও, এবারে তার খানিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে তার শরীরে। তার কপালে একবার হাত ছুঁইয়ে দেখলেন মণিকর্ণিকা। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। জ্বর নেই আর। কিছু দূরে তাঁর পাহারাদার সেপাইয়ের দলটা ঘুমিয়ে। মাত্রই কয়েকজনকে সঙ্গে আনতে পেরেছেন তিনি এই যাত্রায়। তবে কল্পি আর বেশি দূর নয়। একবার সেখানে পৌঁছোতে পারলে… ফের নতুন যুদ্ধ।

    নানাসাহেব, কৈশোরের প্রিয়সখা তাঁর, সে আজ প্রায় ন’মাস হল কানপুর থেকে নিখোঁজ হয়েছে। কল্পি, অথবা সেখান থেকে এগিয়ে গিয়ে গোয়ালিয়র দুর্গে ঘাঁটি গেড়ে প্রথম কাজ হবে তাকে খুঁজে বের করা। তারপর… মনিকর্ণিকা আর ধন্ডুপন্ত একত্র হলে তখন দেখব কোম্পানি, তোমার ভাড়াটে সৈন্যদের তলোয়ার কতো জোর ধরে! এত সহজে আমার ঝাঁসি আমি দেব না তোমায় হে ব্রিটিশ!

    “মণিকর্ণিকা…”

    ফের রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরের ফিসফিসে হাওয়া যেন কথা বলে উঠেছে তাঁকে ঘিরে। সতর্ক হলেন রানি। স্বপ্ন নয়। কারণ এখন তিনি সম্পূর্ণ জেগে।

    “কে?”

    প্রশ্নের জবাব এলো না কোনো। তার বদলে তাঁকে ঘিরে বইতে থাকা বাতাস ফের একবার ফিসফিস করে বলে উঠল, “কল্পি-তে তোমার দ্বিতীয় সত্ত্বাকে পাঠাও।সেখান থেকে গোয়ালিয়রে যাবে সে। প্রাণ দেবে তোমার হয়ে।আর তোমায় যেতে হবে কাঠমান্ডুর পাশে থাপাথালি। তার পাশে নিমিষা অরণ্য। সেইখানে যাও।”

    তাড়াতাড়ি পাশে শুইয়ে রাখা তলোয়ারটা টেনে নিলেন মণিকর্ণিকা।গলাটা যারই হোক, সে তাঁর গন্তব্যগুলো জানে।

    “কে তুমি? সামনে এস। নচেৎ…”

    “নিমিষার অরণ্যে, যাকে তুমি খুঁজছ তার দেখা পাবে, “ তাঁর কথার জবাব না দিয়ে ফের একবার গলাটা কথা বলে উঠল। তারপর আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে যেতে বলে গেল, “আজ থেকে ষোলো দিনের মাথায়… নিমিষার অরণ্যের গভীরে… পার্বতীর ভাঙা মন্দিরের পাশে… ঠিক দুপুর বারোটায়… তৈরি হও।তাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করো… তোমার স্বপ্নকে সফল করো…”

    স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন মণিকর্ণিকা। কথাগুলো তাঁর মাথায় ঝনঝন করে বাজছিল। ।একটা নিখুঁত স্থান ও সময় নির্দেশ করেছে তা। এবং… যাকে তিনি খুঁজছেন… নানাসাহেব! নিশ্চিত মৃত্যু…

    তাঁকে যেতে হবে।

    কিন্তু দামোদর? ভাবনাটা মাথায় আসবার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মনে পড়ে গেল, সে প্রশ্নের উত্তরও দিয়ে গেছে ওই অশরীরি গলা। তাঁর দ্বিতীয় সত্বা! ঝলকারি বাই! ঝলকারি কোরিন! বিধাতার আশ্চর্য নিয়মে তার চেহারা অবিকল মণিকর্ণিকার মতই। দুর্গের পাঁচিল থেকে মহালম্ফে তাঁর পালিয়ে যাবার সময় সে-ই তো তাঁর ছদ্মবেশ ধরে সামনের যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে ব্রিটিশকে ভুল বুঝিয়ে আটকে রেখেছিল!

    “নারায়ণ!” চাপা গলায় ডাক দিয়ে উঠলেন মণিকর্ণিকা।

    “মহারানি!” অন্ধকার থেকে আওয়াজটা কাছে এগিয়ে এল।

    “কাগজ কলম দাও।”

    ***

    একটা মাত্র মশাল জ্বলেছে। তার ধিকিধিকি আলোয় মানুষগুলো নিঃশব্দে দুটো ঘোড়াকে তৈরি করে। পবন ও সারেঙ্গী। বাদলের পরেই রানির দুই প্রিয়তম বাহন। ঝলকারিকে উদ্দেশ্য করে লেখা চিঠিটা শেষ করে নারায়ণের হাতে তুলে দিলেন রানি। গুপ্তচর খবর এনেছিল, রানির পালাবার পরে লড়তে লড়তেই ঝলকারি অবশেষে ধরা পড়ে গেছে। তার আসল পরিচয় জেনে তাকে বন্দি করেছিল ব্রিটিশরা। কিন্তু সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে ফের যুদ্ধে নেমেছে সে, যুদ্ধে প্রাণ দেয়া স্বামীর জায়গায় দাঁড়িয়ে কামানের আগুন উগড়ে চলেছে কোম্পানির সেনাকে লক্ষ করে।

    “সারেঙ্গিকে নিয়ে যাও নারায়ণ। আজ রাত্রি ভোর হবার আগে ঝাঁসি পৌঁছে, ঝলকারিকে খুঁজে বের করে, এই চিঠি তার হাতে তুলে দেবে।বলবে, ঝাঁসির রক্ষার চাইতেও গুরুতর কর্তব্য আছে তার এইবার। চিঠিতে তার বিস্তারিত নির্দেশ রয়েছে।”

    “আর আপনি?”

    সামান্য হাসি ফুটে উঠল রানির মুখে। “আমি যাব পবনকে নিয়ে অন্য পথে। একদিন আমি ফিরে আসব। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত জীবিত বা মৃত অবস্থায় ঝলকারিই পৃথিবীর চোখে মণিকর্ণিকা। সে-ই দামোদরের মা। এ আদেশের অন্যথা যেন না হয়।”

    তাঁকে ঘিরে দাঁড়ানো অনুগত সেনার দল নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। তারপর অন্ধকারে নিঃশব্দে রওনা হয়ে গেল দুটি ঘোড়া। সারেঙ্গী চলেছে ফের ঝাঁসির দিকে। আর পবন, তার প্রিয় মালকিনকে পিঠে নিয়ে ছুটে চলল এক দীর্ঘযাত্রায়। তার পিঠে বসে থাকা তরুণ যোদ্ধাটিকে খুব ঘনিষ্টভাবে না দেখলে একজন সাধারণ সেপাই বলেই মনে হবে। এই দোলাচলের সময়ে ভারতবর্ষের পথে অমন হাজারো সেপাইয়ের দেখা মেলে। কেউ তাকে নজর করে দেখবে না। খুঁজে খুঁজে জঙ্গলের পথ বেয়ে ছুটেছে সে। লোকালয়দের সযত্নে দূরে রেখে।

    উত্তরের এই সুন্দর অরণ্যেরা দয়ালু। ফলে নুয়ে থাকা গাছ, ছোটোখাটো শিকার, কোনোকিছুরই অভাব হয় না। আছে অজস্র জলধারাও।তবে, নিতান্ত খাওয়া ও খানিক বিশ্রামের সময়টুকু বাদে সেখানে একটা মুহূর্তও নষ্ট করে না তারা। মালকিনের মনের ইচ্ছা বুঝতে পেরেছে পবন। আর তাই যেন বাতাসের মতই বনজঙ্গল পেরিয়ে সে ভেসে যায়… তার খুরের নীচে ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসে নরম, ঝোপাঝারে ছাওয়া পলির আস্তর। সমতল মাটি হয়ে ওঠে খাড়াই পাথুরে চত্বর।এগিয়ে আসে হিমালয়…

    একের পর এক দিন বয়ে যায়। আধীর আগ্রহে সামনের পথের দিকে চেয়ে থাকে রানির চোখদুটো। আর কত দূর?

    ৩

    নিমিষার অরণ্যে

    নাঃ। আর কোনো দ্বিধা নয়। একদিন বড়ো সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। স্বপ্ন দেখেছিলেন, জেগে ওঠা বিদ্রোহী ভারতের সেনাবাহিনীর সামনে মার্চ করে দিল্লিতে পৌঁছোবেন। সেখানে এখনও শেষ মুঘল তাঁর অস্তিত্ব ধরে রেখেছেন। ফের একবার তাঁর সঙ্গে হাত মিলিয়ে… মারাঠা ও মোগল, দুই চিরশত্রু একত্র হয়ে ওই ভিনদেশি কুকুরদের এদেশের মাটি থেকে মুছে দেবেন। অথচ…

    ঠিক কোথায় ভুল করেছেন তিনি তা তিনি নিজেও জানেন না। পাপ। মহাপাপ লেগেছে এদেশের কপালে। বিবিঘরের অতগুলো নিরীহ মানুষকে খুন করল ওরা। তাদের সেই মরণ চিৎকার… না। ঐ সিপাহিদের নেতা হিসেবে এ-পাপের দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারেন না তিনি।

    থাপাথালির এই নির্জনে গত একটা বছর ধরেই নিজের সঙ্গে ক্রমাগত যুদ্ধ করে গেছেন নানা। কিন্তু এবারে আর পারছেন না তিনি। দুঃস্বপ্নে সেই অসহায় মুখগুলো ভেসে ওঠা ক্রমশ বেড়েই চলেছে তাঁর। অসহ্য চিৎকার করতে করতে জীবন্ত শিশুরা তলিয়ে যায় বিবিঘরের পাশের মরণ কুয়োর গভীরে…

    আজ তাই নির্জন বনের ভেতর এই মন্দিরের সামনে এসে হাজির হয়েছেন তিনি।গত কয়েকদিন ধরেই একটা বড়োসড়ো বাঘ থানা দিয়েছে এইখানে। শিকারে বেরিয়ে তার অস্তিত্ব বারেবারেই টের পেয়েছেন নানা। অন্য সময় হলে দারুণ বিপজ্জনক এই প্রাণীটাকে শিকার করবার জন্য হয়তো উদগ্রীব হয়ে উঠতেন তিনি। শিকার প্রিয় খেলা ছিল তাঁর। কিন্তু এখন আর সে চিন্তা তাঁর মাথায় নেই। ওই বাঘ, দেবীর বাহন। আজ ওর মাধ্যমেই একটা প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়ে তাঁর এখানে আসা। ঠিক কতটা পাপ করেছেন তিনি কানপুরের ওই দিনগুলোতে?

    আর তাই আজ দুপুরে, সম্পূর্ণ নিরস্ত্র হয়ে এইখানে এসে হাজির হয়েছেন তিনি। একা। কোনো বাধা দেবেন না। যদি শাস্তিই প্রাপ্য হয় তাঁর, তবে দেবী নিজের বাহনের থাবায় সে শাস্তি দিন তাঁকে। তা হলে বিবেকের নিষ্ঠুর কামড় নিয়ে এই দুঃসহ জীবন থেকে মুক্তি তো অন্তত মিলবে তাঁর!

    ভাঙা মন্দিরের ভেতরে পরিত্যক্ত পার্বতী মূর্তির আংশিক দেখা যায় এখান থেকে। এখানে মাথার ওপরে গাছের পাতার নিবিড় ঢাকনা দিয়ে রোদ আসে না। তাকে ঘিরে গভীর অরণ্যের ভেতর হালকা শব্দ ওঠে। কান পেতে শোনেন নানাসাহেব। শিক্ষিত শিকারী কান টের পায় অপেক্ষায় আছে ব্যাঘ্ররাজ। তবে সাবধানী জীব সে। নিরস্ত্র মানুষকেও খানিক সমঝে চলে। তাই, প্রায় নিঃশব্দে, অতি সাবধানে একটু একটু করে পাক দিতে দিতে বৃত্তটাকে ছোটো করে আনছে সে জঙ্গলের ভেতর থেকে।

    দেরি নেই আর। ভাঙা দরজাটার সামনে নিঃশব্দে হাঁটুগেড়ে বসে পড়লেন নানাসাহেব। “এইবারে তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক দেবী পার্বতী ভবানী। নেমে আসুক তোমার শাস্তি…তোমার আশীর্বাদ…”

    ঝোপঝাড় ভাঙার একটা সংক্ষিপ্ত শব্দ উঠল পেছনে। আর তার পরেই নিস্তব্ধ আকাশবাতাস কাঁপিয়ে বাঘের গম্ভীর গর্জন ভেসে এল। চোখদুটো বুঁজে ফেললেন নানাসাহেব…

    কিন্তু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা দ্বিতীয় শব্দ ভেসে উঠেছে মাথার খানিক ওপর থেকে। তীক্ষ্ণ, রিণরিণে একটা যুদ্ধের ডাক। তার মধ্যে মিষ্টত্ব ও হিংস্রতার আশ্চর্য মিশেল। চমকে উঠে ঘুরে তাকালেন নানাসাহেব। আর তারপরেই স্তম্ভিত হয়ে সারা শরীর অবশ হয়ে এল তাঁর। দেবী পার্বতী! রণরঙ্গিনী মূর্তিতে গাছের একটা নিচু ডাল থেকে দুহাতে খোলা তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছেন আক্রমণোদ্যত বাঘের পিঠে।

    চমকে উঠে শিকারের দিক থেকে মনোযোগ ঘুরিয়ে নিল বাঘ। পিঠে এসে নামা আকস্মিক এই উৎপাতটাকে যেন ঝেরে ফেলতে চায় মাংশপেশীর শক্তিশালী দোলানীতে।

    কিন্তু আশ্চর্য কৌশলে শুধুমাত্র দুটি পা দিয়ে তার পিঠটাকে আঁকড়ে রেখেছে তার আক্রমণকারিনী। তার খোলা চুল বাতাসে লকলক করে ওড়ে। তার দুচোখে যেন আগুন ঝরছে। সুশিক্ষিত ঘোড়সওয়ারের মতই হাতের বদলে কেবল পায়ের কৌশলে সে নিজেকে স্থির রেখেছে ছটফট করতে থাকা বিরাট প্রাণীটার পিঠে। আর একই সঙ্গে তার দু’হাতে ধরা রাখা জোড়া তলোয়ার নিখুঁত লক্ষে আঘাত হেনে চলে জন্তুটার ঘাড়ে, পাঁজরে।

    আর তারপর, হঠাৎ আশ্চর্য কৌশলে রণক্লান্ত বাঘটার পিঠে লাফ দিয়ে উঠে খাড়া হয়ে দাঁড়াল সে। তলোয়ারদুটো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চোখের পলকে তার হাতে উঠে এসেছে পিঠে বাঁধা একটা ধারালো বল্লম। দুহাতে তার হাতলটা ধরে প্রাণপণ শক্তিতে তার গেঁথে দেয়া বল্লম বাঘের কাঁধের সংযোগস্থলের দুর্বল এলাকাটা দিয়ে ঢুকে আমূল গেঁথে গেল তার হৃৎপিণ্ডে।

    ***

    “মণিকর্ণিকা!”

    “হ্যাঁ এলাম।”

    মড়া জন্তুটার শরীর ছড়িয়ে আছে তাদের পায়ের কাছে। সেদিকে তাকিয়ে চুপ করে বসেছিলেন নানাসাহেব।

    “তুই…”

    “তার আগে বলো, এভাবে আত্মহত্যা করতে কেন এসেছিলে তুমি? বন্ধু বলো, গুরু বলো সবই তো আমার তুমি! আমায় বড়ো করলে, অস্ত্রশিক্ষা দিলে, ভালোবাসা দিলে, তারপর বুকটা ভেঙে দিয়ে আমার বিয়ে দিলে রাজার সঙ্গে। আর সেই তুমি, আমার সবচেয়ে বিপদের দিনে আমার পাশে না দাঁড়িয়ে এভাবে নিজের প্রাণটা ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাইছিলে! কেন?”

    “কিন্তু তুই… এখানে… এই সময়ে…”

    প্রশ্নটা পুরোপুরি শেষ না করেই থেমে গেলেন নানাসাহেব। হঠাৎ বুকের ভেতরে একটা সত্যকে অনুভব করেছেন তিনি। উত্তরের তাঁর প্রয়োজন নেই আর। দেবীই তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। আজকের এই ঘটনাটার মধ্যে দিয়েই তাঁর আদেশ তিনি শুনিয়ে দিয়েছেন তাঁকে। যে-ব্রত নিয়ে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নেমেছিলেন কোম্পানির বিরুদ্ধে, সে-ব্রত সম্পূর্ণ করায় জীবনটাকে উৎসর্গ করতে হবে তাঁকে। সে কাজ শেষ না করে মৃত্যুর অধিকার নেই তাঁর।

    তা নইলে এভাবে মণিকর্ণিকা একেবারে সঠিক সময়ে এখানে এসে পৌঁছোত না। যুদ্ধের মুহূর্তটায় তার দিকে কেবল চেয়ে চেয়ে দেখেছেন তিনি। সাধারণ কোনো মানুষ মনে হচ্ছিল না তাকে। যেন স্বয়ং ভবানী পার্বতীই নেমে ভর করেছিলেন তার শরীরে।

    সেই মণিকর্ণিকা! বিঠুরের পথে পথে… তাঁর কাছে ঘোড়ায় চড়া শেখা, তাঁর সঙ্গে কাঠের তলোয়ার নিয়ে তলোয়ারবাজির প্রথম পাঠ। আর আজ সে…

    “কী হল? কী বলছিলে, শেষ করলে না?”

    নানাহাসেব মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন, “নাঃ। সব প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেছি রে। দেবীর কী ইচ্ছে সেইটেও বুঝেছি। এখন চল, গোপিকা দুপুরের খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছে। গরিবের বাড়ির খাবার। রুটি আর সামান্য লাউ-এর সবজি। মুখে রুচবে তো?”

    মণিকর্ণিকা হেসে মাথা নাড়লেন, “চলো। কতদিন দেখিনি তাঁকে। বড়ো ক্লান্ত আমি। ষোলোদিন ধরে একটানা ঘোড়ার পিঠে ছুটেছি। প্রথমে ভাওজির রান্না খেয়ে ক’টা দিন বিশ্রাম। তারপর…”

    “উঁহু। আগে সব খবর শুনব।তারপর যত খুশি বিশ্রাম নিস। তারপর আজ রাতে আমি রওনা দিচ্ছি। কাঠমাণ্ডু যেতে হবে একবার। সেখানে বেগম হজরত মহল রয়েছেন। তাঁর ও জং বাহাদুর রানার সঙ্গে কিছু পরামর্শ করবার আছে। আমার মৃত্যুসংবাদটা ছড়িয়ে দেবার দায়িত্ব নিতে হবে তাঁকে। সেই হবে আমার সেরা ছদ্মবেশ। সেখান থেকে দরকারে আরো কয়েকদিন এদিক-ওদিক ঘুরতে হবে। সেই কয়েকটা দিন তুই তোর ভাওজির কাছে আরাম করে নে। তারপর অনেক কাজ আছে রে। অনেক কাজ!”

    তখন সেই গভীর নিমিষা অরণ্যের পথ ধরে দুজন মানুষ হাত ধরাধরি করে একটা ছোট্ট কুটিরের দিকে ফিরে চলেন। একজন, এক অভিশাপমুক্ত বীরপুরুষ। আর অন্যজন, শরীরে শিকারের রক্তের দাগে মাখামাখি এক রানি। তাঁদের চোখে অজস্র নতুন স্বপ্ন। তাঁদের মুখ প্রতিজ্ঞায় দৃঢ়।

    ৪

    একটি প্রতিবেদন

    দ্য কোম্পানি বুলেটিন। কলিকাতা। ২৭ এপ্রিল ১৮৫৮

    বিশেষ প্রতিবেদন- সিপাহি বিদ্রোহের মঞ্চে নবতম অঙ্কের ।সূচনা

    কোম্পানি বাহাদুরের মুখপাত্র লেঃ জোনাথন স্টান সাহেব এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানাইয়াছেন যে ইংল্যান্ডেশ্বরী ও ঈশ্বরের শত্রু, বিবিঘর হত্যাকাণ্ডের কলঙ্কিত খলনায়ক, পলাতক নানাসাহেব অবশেষে মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছেন।কোম্পানির বিশেষ সুহৃদ, নেপালেশ্বরের প্রধানমন্ত্রী মিস্টার জং বাহাদুর রানার প্রেরিত সন্দেশ মোতাবেক, তাঁহার গুপ্তচরগণ বিশেষ সূত্রে কাঠমান্ডুর উপকন্ঠে নিমিষা অরণ্যে এই পলাতক অপরাধীর অবস্থানের সংবাদ পাইয়া তাহাকে গ্রেফতার করিবার মানসে সেইস্থলে উপস্থিত হইয়া তাহার ব্যাঘ্রভক্ষিত দেহাবশেষ উদ্ধার করিয়াছে। রানা পবিত্র হিন্দুমতে মৃত্যুস্থলেই সেই গলিত দেহাবশেষের সৎকার সম্পন্ন করিয়াছেন।

    অপরদিকে লালকেল্লায় সিংহাসনচ্যূত প্রাক্তন মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের বিচারের সূচনা হইয়াছে। বিদ্রোহীদিগের সপক্ষে যোগদানের ফলস্বরূপ বিচারে তাঁহার মৃত্যুদণ্ড না হইলেও কঠোরতম শাস্তি হইবার প্রভূত সম্ভাবনা রহিয়াছে বলিয়া কোম্পানির তরফে প্রকাশ। অতঃপর কোম্পানিবাহাদুরের সুশাসন ভারতবর্ষের বুকে সুপ্রতিষ্ঠিত হইবার পথে আর একটিমাত্র কন্টক অবশিষ্ট রহিল। তিনি ঝাঁসির প্রাক্তন রানি লক্ষ্মীবাই। এই উদ্ধতা রমণী স্বয়ং কোম্পানি বাহাদুরের সেনাপতির সম্মুখে ‘মেরি ঝান্সি নহি দুঙ্গী’ সুলভ ভয়াবহ রাজদ্রোহমূলক উক্তি প্রকাশ করিয়া কোম্পানি বাহাদুরের বিশেষ বিরাগভাজন হইয়াছেন।

    তবে আশার সম্বাদ এই যে উপস্থিত গোয়ালিয়র দুর্গে আত্মগোপনকারী এই বিদ্রোহীর শাসনের নিমিত্ত বিরাট বাহিনী সেইদিকে অগ্রসরমান। আমরা আমাদের সুধী পাঠকদের শীঘ্রই এই বিষয়ে আরো শুভ সম্বাদ দিব এই আশা রাখি…

    মন্দির চত্বরের খানিক দূরে ধুনি জ্বালিয়ে তার সামনে বসে থাকা এক সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনী কাগজে যত্ন করে মোড়া একটা রুটির পুঁটুলি ধরে নীরবে বসেছিলেন। মোড়কের কাগজটা ইংরাজি ভাষার। ‘দ্য কোম্পানি বুলেটিন’ ।নামের। সংবাদপত্রের। ২৭ এপ্রিল। ১৮৫৮ তারিখের সংস্করণের একটা পাতা সেটা।

    সন্ন্যাসীটি ধীরে ধীরে তার গায়ের লেখাগুলো পড়ে তার অর্থ বুঝিয়ে দিয়েছেন সন্নাসিনীকে। জবাবে সন্ন্যাসিনীর মুখে একচিলতে হাসি খেলা করে যাচ্ছিল।

    কাঠমাণ্ডুর বিখ্যাত পশুপতিনাথ মন্দির। ভারতবর্ষ ও নেপালের অসংখ্য তীর্থযাত্রী সাধারণ মানুষ আসেন সেখানে। সেইসঙ্গে এসে উপস্থিত হন অসংখ্য পরিব্রাজক সন্ন্যাসীও। ভিক্ষাই এই সন্ন্যাসীদের জীবিকা। এই পরিব্রাজক সন্ন্যাসীদের ভিড়ে মিশে তাঁরা দুজনও এসে হাজির হয়েছেন এইখানে। হাজারো মানুষের ভিড়ে কেউ তাঁদের আলাদাভাবে লক্ষ করেনি।

    গত তিনদিন ধরে মন্দির চত্বরেই অপেক্ষায় থাকবার পর আজ তাঁদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে। খানিক আগে নেপালের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং মন্দির দর্শনে এসেছিলেন। দেবদর্শনের পর উপস্থিত ভিখারি ও সাধুসন্ন্যাসীদের মধ্যে খাদ্য ও বস্ত্র বিতরণ করে গিয়েছেন তিনি।

    এই সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীর সামনে একমুহূর্ত থেমে দাঁড়িয়ে তাদের সামনে এক পুঁটুলি রুটি আর কাপড়ের একটা ভারী গাঁটরি নামিয়ে দিয়ে নমস্কার জানিয়ে তিনি খানিক আগে চলে গিয়েছেন। কলকাতা থেকে প্রকাশিত এই খবরের কাগজটা দিয়ে রুটিগুলো সযত্নে মোড়া ছিল।

    কাগজটাকে এইবার অবহেলায় ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে তার ভেতর থেকে একটা রুটি হাতে তুলে নিলেন সন্ন্যাসী। তারপর তাতে একটা তৃপ্তির কামড় বসিয়ে সন্ন্যাসিনীর দিকে তাকিয়ে নীচুগলায় বললেন, “প্রস্তুতির প্রথম ধাপ শেষ হল মণিকর্ণিকা। জং বাহাদুরের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এই খবরটা বের হবার পর, এবারে আর ভারতের বুকে ইচ্ছামত ঘোরাঘুরিতে অসুবিধা রইল না কোনো আমার।”

    মণিকর্ণিকা ততক্ষণে কাপড়ের গাঁটরিটার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছেন। আঙুলের ছোঁয়ায় সেখানে রাখা মুদ্রাগুলোকে গুণতে গুণতেই মাথা নাড়লেন তিনি, “এদিকেও খবর ভালো। প্রাথমিক কাজ শুরু করবার জন্য যথেষ্ট অর্থই পাঠিয়েছেন বেগম।”

    এই আর্থিক সহায়তার প্রাথমিক দায়িত্বটা বেগম হজরত মহল নিজে থেকেই নিয়েছেন। তার কারণটাও যুক্তযুক্ত। নেপাল রাজসরকারের ছাপ দেয়া সোনারূপার মুদ্রা নিয়ে ভারতের বুকে কাজ করলে তাতে এই ষড়যন্ত্রে নেপাল সরকার সরাসরি জড়িয়ে পড়বে। জং বাহাদুর তা চান না। প্রাথমিকভাবে তাই হজরত মহল এ-দায়িত্ব নিয়েছেন। নিজের সঙ্গে করে আনা সঞ্চিত মুদ্রার ভাঁড়ার উজার করে তুলে দিয়ে চলেছেন এঁদের হাতে।

    কিন্তু যে-পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন নানাসাহেব ও মণিকর্ণিকা, তাতে সেই অর্থও যথেষ্ট হবে না। এই সমস্যাটারর সমাধান শিগগিরই হতে চলেছে। কাঠমান্ডুর উত্তরে ধোবি নামের একটি গ্রামে একটা গোপন টাঁকশাল তৈরির কাজ শুরু করেছেন জং বাহাদুর। সেখানে এরপর কোম্পানির ছাপ দেয়া জাল ভারতীয় মুদ্রার উৎপাদন শুরু হলে আর এ-সমস্যা থাকবে না।

    মুদ্রাগুলোয় হাত ছুঁইয়ে সন্ন্যাসী আপনমনেই বিড়বিড় করছিলেন, “একদিন এই উপকারের উপযুক্ত প্রতিদান পাবেন আপনারা। নানাসাহেব নিমকহারাম নয়।”

    ৫। বরদাঘাট।২০ জুন। ১৮৫৮

    নেপাল ও ভারতের সীমান্তে ছোট্ট গঞ্জ বরদাঘাট। তার একদিকে ভারতের সমতলভূমি। আর অন্যদিকে নেপালের পার্বত্য জমি ক্রমশ উঁচু হয়ে গেছে। ভারত থেকে নেপালের দিকে আসা বাণিজ্যসড়কগুলোর মধ্যে একটা প্রধান সড়ক এইখানে এসে নেপালের মাটি ছোঁয়। ফলে জায়গাটা ছোটো হলেও বেশ সরগরম। দুদিক থেকে আসা ব্যাপারী, ভবঘুরে আর ভাগ্যান্বেষীদের ভিড় লেগেই থাকে এখানে।

    বরদাঘাটের একপাশে খুদে একটা সরাই। তার চেহারায় পড়ন্ত সময়ের ছাপ। সরাইয়ের মালিক রবিকুমার নিজেও বৃদ্ধ। আদি নিবাস তাঁর পাটনা। এককালে কোম্পানির ফৌজে সুবাদার ছিলেন। জাতে কামার।। সেনাছাউনির। অস্ত্রশালায় অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করতেন তিনি।

    কিন্তু তারপর একসময় গোরখপুরে কোম্পানির সেনাছাউনি থেকে প্রাণ নিয়ে পালাতে হয় তাঁকে। বিনা কারণে প্রায় প্রতিদিন, সাহেব লেফট্যানেন্টের বুটের লাথি মেনে নিতে পারেননি তিনি। সুযোগ পেয়ে একদিন এক নির্জন পথে তাঁকে ধরে উপযুক্ত সাজা দিয়েছিলেন নিজের হাতে। তারপর বড়ো কষ্টে গ্রেফতারি এড়িয়ে পালিয়ে এসেছিলেন নেপালে। নিজের নাম, পরিচয় সবকিছু বদলে ফেলেছিলেন বাঁচবার তাগিদে।

    তাঁর নাগাল না পেয়ে কোম্পানি তাঁর পরিবারের ওপরে এর প্রতিশোধ নেয়। তাঁর পাটনার ভিটেমাটি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাঁর স্ত্রী ও দুটি শিশুসন্তানের কোনো খবর মেলেনি আর।

    এখন, দীর্ঘদিন নেপালে থেকে হাবেভাবে, ভাষায় স্থানীয় ছাপ তাঁর গভীর হয়ে বসেছে। এই সরাইখানাই এখন তাঁর পৃথিবী।

    সন্ধে হয়ে আসছিল। সরাইয়ের খাওয়ার জায়গায় আজ অনেক মানুষের ভিড়। সেখান থেকে ওঠা গুণগুণ শব্দটার দিকে কান খাড়া রেখে রবিকুমার তাঁর গদিতে বসেছিলেন। সাধারণত শহরের একটেরেতে দাঁড়ানো এই ভাঙাচোরা সরাইতে এ-সময় খরিদ্দারের সংখ্যা কমই হয়। তবে আজ একটা বিশেষ দিন। ঠিক দু’মাস আগে, নেপালের প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে রাজসরকারের ছাপ্পা লাগানো একটা গোপন আদেশ এসে পৌঁছেছিল তাঁর কাছে। সে-আদেশ বয়ে নিয়ে এসেছিলেন একজন দীর্ঘদেহী সন্ন্যাসী। সন্ন্যাসীকে তিনি চিনতেন না, অথচ তিনি দেখা গিয়েছিল রবিকুমারের সমস্ত ইতিহাসই জানেন। জানেন তার দেশভক্তির কথাও।

    এরপর সন্ন্যাসীর পরিচয় পেয়ে প্রথমে ভূত দেখবার মত চমকে উঠেছিলেন রবিকুমার। কিন্তু রাজকীয় ছাপ লাগানো চিঠিটা পড়ে সে অবিশ্বাস তাঁর মিলিয়ে যায়। তাঁকে আভূমি প্রণাম করেছিলেন রবিকুমার।

    এরপর থেকে মাঝে মাঝেই তাঁর এই সরাইতে এমন অতিথিসমাগম ঘটে চলেছে।

    সন্ধ্যা। গভীর। হচ্ছিল।। কিছু কিছু সাধারণ মুসাফির এর মধ্যেই খাওয়া সেরে টাকাপয়সা মিটিয়ে খাওয়ার ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছেন। কিন্তু অধিকাংশ অতিথিই এখনো রয়ে গিয়েছেন। তাঁদের চলে যাবার কোনো ব্যস্ততা নেই। রবিকুমার একটু উদ্বিগ্ন মুখে খাবার জায়গাটার পাশের গলিটার ওধারে, রান্নাঘরের ঠিক পাশে একটা বন্ধ দরজার দিকে চোখ ফেলছিলেন বারবার। জায়গাটা এই ঘরে একমাত্র তাঁর গদি থেকেই চোখে পড়ে। আজ একটু বেশিই দেরি হচ্ছে।

    আরো প্রায় মিনিট পনেরো বাদে বন্ধ দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল। সেখান দিয়ে ঢুকে আসা একজন মানুষ রুটির একটা ঝুড়ি রান্নাঘরের ভেতরে রেখে দিয়েই ফের বাইরের জঙ্গলের দিকে চলে গেলেন।

    এইবার রবিকুমার উঠলেন। রাত হয়ে গেছে। রাঁধুনি আর সাহায্যকারী ছোকরা চাকরটা বাড়ি ফিরে গেছে এর মধ্যে। রোজই যায়। তারপর সকালে ফিরে খাবার ঘর সাফসুতরো করে।

    রান্নাঘরে গিয়ে রুটির ঝুড়িটা হাতে তুলে নিলেন রবিকুমার। তারপর সেটা খাবার ঘরে বয়ে নিয়ে এসে অতিথিদের উদ্দেশে বললেন, “আপনাদের কারো আর চাপাটি লাগলে একটু কষ্ট করে এসে নিয়ে যাবেন গো। বুড়োমানুষ। অত ছোটাছুটি করতে পারব না।”

    কথাটায় অন্যায্য কিছু ছিল না। অতিথিদের অনেকেই এবারে একে একে উঠে আসতে লাগলেন। রবিকুমার ঝুড়ি থেকে সতর্কভাবে বেছে বেছে রুটি তুলে তাদের হাতে দিচ্ছিলেন একে একে। এই বাছাইটার সময় সতর্ক থাকতে হয় তাঁকে। এঁদের মধ্যে সাধারণ বেণেও কিছু রয়েছে। কোম্পানির গুপ্তচর থাকবার ভয়ও আছে। অপরিচিতদের হাতে সাধারণ রুটিই তুলে দিতে হবে হিসেব করে। ভুল হাতে ভুল জিনিস একবার চলে গেলে বড়ো ক্ষতি হয়ে যাবে।

    রুটিগুলো নিয়ে একে একে অতিথিরা যার যার জায়গায় ফিরে যায়। তারপর তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন, সবার অলক্ষ্যে তাদের রুটির ভেতরে রাখা কাগজের টুকরোগুলোয় চোখ বুলিয়ে, রুটির সঙ্গেই মুখে চালান করে দিয়ে, সরাইওয়ালার প্রাপ্য মিটিয়ে দিয়ে বের হয়ে যায় বাইরে। এইবার ওরা ভারতবর্ষের সর্বত্র ছড়িয়ে যাবে। ওদের সঙ্গে ছড়িয়ে যাবে কিছু নির্দেশ।

    ‘বড়ো কোনো খবর আছে আজ-’ মনে মনে ভাবছিলেন রবিকুমার। নইলে সাধারণত এত ‘সন্দেশি চাপাটি’ একদিনে বিলি করা হয় না এখানে।

    খানিক বাদে সমস্ত অতিথি বিদায় নিলে রবিকুমার উঠলেন। সরাই উপস্থিত ফাঁকা। তার সদর দরজা বন্ধ করে দিয়ে, পেছনে খিড়কির দরজাটা খুলে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালেন। একটুক্ষণ অপেক্ষা করে, একটা ছোটো মশাল জ্বালিয়ে তুলে ধরলেন তিনি এরপর। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সামনের জঙ্গল থেকে বের হয়ে এলেন, সম্ভ্রান্ত বণিক-দম্পতির পোশাক পরা দুজন মানুষ। তাঁদের ভেতরে ডেকে এনে আভূমি প্রণাম করে রবিকুমার বললেন, “দুটো ঘর তৈরি করা আছে। রাতটা খানিক বিশ্রাম নিয়ে নিন আপনারা।”

    বলতে বলতেই মহিলাটির দিকে চোখ গিয়েছিল রবিকুমারের। এবারে একটু অপ্রস্তুত হয়ে তিনি বললেন, “আ… আপনি কাঁদছেন কেন মা? কোনো খারাপ খবর?”

    চোখের জল মুছে রবিকুমারের দিকে ঘুরে দেখলেন একবার মণিকর্ণিকা। বরদাঘাট থেকে গোরখপুর অবধি প্রায় আশি মাইল জুড়ে বিস্তৃত এলাকাটার দায়িত্ব রয়েছে রবিকুমারের হাতে। গোটা এলাকা জুড়ে ছড়ানো ছোটো ছোটো বিপ্লবী গোষ্ঠীকে গোপনে তৈরি করা, তাদের মধ্যে যোগাযোগের ব্যবস্থা গড়ে তোলা, এই সবকিছুর দায়িত্ব তিনি নিজে নিয়েছেন। আশ্চর্য সাংগঠনিক শক্তি মানুষটার। কোম্পনির ফৌজে থাকবার সময়কার অভিজ্ঞতাটাও ভালো কাজে আসছে তাঁর। গোপনীয়তা বজায় রেখে নিজের শেকড় ছড়িয়ে দিয়েছেন এমনকি গোরখপুরের সেনাছাউনিতেও। এঁকে বলা যায়।

    “আমার সন্দেশ তুমি কি পড়নি রবিকুমার?”

    রবিকুমার মাথা নাড়লেন, “আগে তা আমার অন্য সর্দারদের মধ্যে বিলি করবার কাজ শেষ করে নিয়েছি। পড়বার অবসর মেলেনি।”

    চোখের জল এবারে শুকিয়ে গেছে মহিলার। এইবার মাথা নেড়ে তিনি বললেন, “এ আনন্দের কান্না রবিকুমার! নিজের জন্য আমি যে-সৌভাগ্যের স্বপ্ন দেখি চিরকাল, আমার প্রিয় সহচরী ঝলকারি বাঈ সে-সৌভাগ্য পেয়েছে অবশেষে। গোয়ালিয়রের যুদ্ধে বীরগতি পেয়েছে সে! কেবল দুঃখ এই যে, মৃত্যুর পর তার যে সৎকার হয়েছে তাতে তার নাম উচ্চারিত হয়নি। উচ্চারিত হয়েছে আমার নাম। আমার বিদেহী আত্মার উদ্দেশ্যে শ্মশানে পবিত্র মন্ত্র পড়েছেন সেখানকার পুরোহিত।”

    বলতে বলতে চোখে ফের জলে ভরে উঠছিল তাঁর।

    “চোখের জল ফেলিস না মণিকর্ণিকা, “ তাঁর সঙ্গের মানুষটা গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন এইবার। চোখদুটো যেন শ্বাপদের মত জ্বলছিল তাঁর, “আনন্দ কর। শুধু যুদ্ধে বীরগতি পাওয়াই নয়, তার চেয়েও বড়ো একটা কাজ করে গিয়েছে ঝলকারি। আমাদের গোটা পরিকল্পনাটাকে এক ধাক্কায় বহুদূর এগিয়ে দিয়ে গিয়েছে।প্রথমে আমার মৃত্যুর ভুয়ো খবর ভারতবর্ষের ছড়িয়ে দেবার বন্দোবস্ত করেছিলেন জং বাহাদুর। এবারে তোরও মৃত্যু হয়েছে গোয়ালিয়রে এই ভেবে কোম্পানি, তার পথের শেষ কাঁটাটাও উচ্ছেদ হয়েছে বলে নিশ্চিন্ত হবে। এইবার নিজেদের দখলদারির কাজটাকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাবে এরা। লালকেল্লায় বাহাদুর শাহ জাফরের যে বিচারের প্রহসন চলছে তাকে শেষ করতে আর দেরি করবে না। জং বাহাদুর রানা নিশ্চিত খবর সংগ্রহ করেছেন। এই বছরের শেষের দিকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত হতে চলেছেন বাদশাহ।

    “গত দু’মাস ধরে উন্মাদের মত ঘুরে চলেছি আমি। গোরখপুর, মীরাট, পাটনা, এলাহাবাদ… প্রতিটি জায়গায় গোপনে ওদের সেনাছাউনি ঘিরে সংগঠন গড়ে তোলবার কাজ এগিয়ে নিয়ে চলেছি। আগের বার যে ভুল আমি করেছিলাম, এইবার আর সে ভুল হবে না আমার। শুধুমাত্র মাইনে করা সিপাহী নয়, তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও সঙ্গে নেব আমি এইবার। তারাই আসল শক্তি। তারাই ঈশ্বর।

    “ব্রিটিশ টের পায় না। সিপাহীদের যুদ্ধে হারিয়ে, বাদশার সন্তানদের রক্তে দিল্লির খুনি দরজাকে রাঙিয়ে ওরা ভেবেছে ভারতবর্ষের সব শক্তি শেষ। কিন্তু, ওদের চোখের আড়ালে, গোটা দেশ এখন ফুটছে মণিকর্ণিকা। সে অসন্তোষের তাপ, বিদ্রোহ দমনের পর ওদের ঔদ্ধত্যের বাতাস পেয়ে ক্রমশই বেড়ে চলবে। কেবল আগুন ছোঁয়ানোর কাজটা বাকি।

    “এবারে, ঝলকারির আত্মাহুতির পর তুইও, আমারই মতন ওদের চোখের সামনে থেকেও অদৃশ্য হয়ে সে-কাজে আমার সাহায্যে আসতে পারবি। দেশের বুকে সংগঠনের কাজে নেতৃত্ব দিতে আর আমি একা নই।”

    রাত গভীর হয়। সকাল হবার আগেই পথে বেরিয়ে যাবেন এই দুজন অসামান্য মানুষ। তাঁদের দুজনের দুটি ঘরের মাঝখানের মেঝেতে একলা বসে রবিকুমার জেগে থাকেন। এঁদের নিরাপদে রওনা না করিয়ে দিয়ে তিনি দু’চোখের পাতা এক করবেন না আজ।

    তিনি জানেন, তিনি একা নন। গোটা উত্তর ভারত, মাদ্রাজ ও বোম্বাই জুড়ে বিভিন্ন ব্রিটিশ সেনাছাউনিকে ঘিরে তাঁর মতই একেকজন দেশপ্রেমিককে কেন্দ্র করে চলেছে সলতে পাকাবার পালা। বড়ো যত্নে তাঁদের একেকজনকে খুঁজে বের করে ভাগে ভাগে সে-দায়িত্ব তাদের হাতে তুলে দিয়ে চলেছেন নানাসাহেব। তবে, এখনো সে-কাজের অনেক বাকি। এখনও কলকাতা দূর অস্ত্‌। সেই কাজেই এবার ফের একবার ঝাঁপিয়ে পড়বেন এই দুজন অসামান্য মানুষ। নিঃশব্দে তাঁদের খুঁটিনাটি নির্দেশগুলো বার বার ঝালিয়ে নিচ্ছিলেন তিনি মনে মনে।

    রাত শেষ হয়ে আসছিল। চতুর্থ প্রহরের শেয়াল ডেকে উঠল কোথাও। সময় হয়েছে। রবিকুমার উঠলেন। তারপর দুপাশের দুটো দরজায় গিয়ে হালকা টোকা দিলেন।

    খানিক বাদে ফের একবার ঘর ছেড়ে খিড়কির দিকের জঙ্গলে বের হয়ে এলেন তাঁরা তিনজন। বণিকের ছদ্মবেশ বদলে গিয়েছে এবারে। নানাসাহেবের শরীরে কোম্পানির সিপাহির উর্দি। সঙ্গের পুঁটুলিতে সামান্য গৃহস্থালির জিনিস। ছোটো মাটির হাঁড়িতে মুখবাঁধা একটু আচার, একটা তামার পাত্রে সামান্য গঙ্গাজল। যেন বাড়িতে ছুটি কাটিয়ে কোনো সিপাহি ফিরে চলেছে তার কাজের জায়গায়। তাঁর পাশে মণিকর্ণিকা দেবীকে দেখলে মনে হবে যেন একজন সদ্য কিশোর, বাপের সঙ্গে প্রথমবার চলেছে বাইরের দুনিয়ার দিকে। হয়তো বাপ তাকে নিয়ে চলেছেন কোনো সেনাছাউনিতে ভর্তি করিয়ে দেবেন বলে। দেখে মাথা নেড়ে একটু হাসলেন রবিকুমার। নিখুঁত ছদ্মবেশ। কারো সন্দেহ হবে না।

    এবার বিদায়ের পালা। জঙ্গলের মধ্যে বেঁধে রাখা সুশিক্ষিত ঘোড়াদুটো তাদের মালিকদের দেখে চঞ্চল হয়ে উঠেছে। সেখানে এসে পৌঁছে জেব থেকে একটা কাগজ বের করে নানাসাহেব গুঁজে দিলেন রবিকুমারের হাতে। কাগজটার দিকে একনজর তাকিয়ে চোখদুটো সামান্য বিস্ফারিত হল রবিকুমারের। একটা হুন্ডি। গোরখপুরের মহাজন ধর্মেন্দ্র বক্সির গদির ঠিকানা তাতে।  সেখানে রবিকুমারকে কেউ চেনে না। ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশ নিয়ে সে
    খানে গিয়ে ওটা ভাঙিয়ে নিতে সমস্যা হবে না কোনো। কেউ সন্দেহও করবে না। কিন্তু চোখদুটো তাঁর বড়ো বড়ো হয়ে উঠেছিল হুন্ডিতে লেখা টাকার পরিমাণটা দেখে।

    “এতে হবে?”

    “হ্যাঁ। উপস্থিত এই যথেষ্ট। এতে আমার হিসেবমত যতটা প্রয়োজন সেই পরিমাণ বন্দুক, বারুদ ও ছোটোমাপের বহনযোগ্য কামান ঢালাইয়ের কাজ পুরো করে নেয়া যাবে।”

    বলতে বলতেই ফের একটা কথা মনে পড়ে যেতে মণিকর্ণিকার দিকে ঘুরে তাকালেন রবিকুমার, “আপনি যা চাইছিলেন সেটা করা গেছে মা। জোরহিগ্রামের কর্মকাররা নতুন একটা দিশি রাইফেলের নকশা তৈরি করতে পেরেছে। আমি নিজের যা যতটুকু জ্ঞান তাই দিয়ে সাহায্য করেছিলাম খানিক। এনফিল্ড রাইফেলের নকশা থেকে বানানো। তবে এর পাল্লা আরো বেশি। বলে বলে চোদ্দোশ গজ দূরে মারবে।”

    মণিকর্ণিকার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল, “তুমি পরীক্ষা করে দেখেছ?”

    “দেখেছি মা। তবে আমার ইচ্ছে, আপনি নিজে একবার সেটার মহড়া দিয়ে দেখুন। তারপর পছন্দ হলে…”

    বলতে বলতেই ঘরে ঢুকে গিয়ে একটু বাদে অস্ত্রটা হাতে নিয়ে ফিরে এলেন রবিকুমার।

    “এই যে মা। একবার পরখ করে দেখুন।” সঙ্গে আনা একটা থলে থেকে তার ভেতরে বারুদ আর একটা টোটা পুরে দিয়ে যন্ত্রটা মণিকর্ণিকার হাতে তুলে দিলেন তিনি।

    সামান্য ভোঁতা চেহারার যন্ত্রটার বাঁটটা অমসৃণ। যেন অপ্রয়োজনীয় সৌন্দর্যের দিকে কোনো নজর ছিল না এর কারিগরের। তবে ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যায়, সেটার গড়ণ নিশানাবাজির জন্য স্থিরভাবে ধরে রাখবার পক্ষে খুবই সুবিধের। নিশানা করবার মাছিটা নেড়েচেড়ে এগোনো পিছোনোও যায়।

    ভোরের হালকা আলো ফুটে উঠছিল পুবদিগন্তে। সেই আবছায়া আলোয় অস্ত্রটা তুলে ধরে দূরে একটা শালগাছের গায়ের ছোটো একটা গর্তের দিকে নিশানা করলেন মণিকর্ণিকা। পরমুহূর্তে কানফাটানো শব্দ করে উড়ে যাওয়া বুলেট নিখুঁত লক্ষ্যে আঘাত করে গর্তটাকে বড়ো করে তুলল।

    “চমৎকার। কিন্তু সিপাহীদের যে এনফিল্ড রাইফেল দেয়া হয় তাতে তো এতটা পাল্লা বা এত নিখুঁত নিশানাবাজি…”

    রবিকুমার হাসলেন, “দিশি সেপাইদের ওরা ভয় পায় মা এখন। তাই ওদের যে অস্ত্র দেয় তার নলের ভেতর প্যাঁচ কাটা থাকে না। টোটা হয় গোল গোল। ওর জোর কম যে। নিশানাও ভালো হয় না। আমার এ-জিনিস সাহেবরা নিজেরা যে এনফিল্ড ব্যবহার করে তার ছাঁচে গড়া যে। ওদের আর্মারির সুবেদার ছিলাম। ওদের অস্ত্র সাফা করাতাম, সারাই করাতাম। সব দেখেছি খুঁটিয়ে। কিচ্ছু ভুলিনি।

    “এবারে ভেবে দেখো মা, লড়াই যখন বাধবে এবারে, ওদের সেপাইদের হাতে হাজারটা দুবলা বন্দুক আর গুটিকতক সাহেবের হাতে দশটা এই খাঁটি রাইফেল, আর আমাদের হাতে হাজার হাজার এই খাঁটি জিনিস… তুমি ভাবো একবার…”

    বলতে বলতেই মহা উৎসাহে সে বন্দুকটার নলটা ধরে প্যাঁচ দিতে শুরু করেছে, “এর আরো মজা আছে মা। এই দেখেন।” প্যাঁচ ঘুরে নলটার একটা বড়ো অংশ আলাদা হয়ে খুলে এসেছে। তারপর বাঁটটার মাঝখানে আটকানো খুদে একটা কবজায় চাপ দিতে তার অর্ধেকটা খসে পড়ে যন্ত্রটা একেবারে ছোটো হয়ে গেল।

    “চাইলে একই রাইফেল আর পিস্তল দুভাবেই কাজে লাগানো যায় মা। লড়াই হাতাহাতি হোক কি দূরপাল্লার এ-জিনিস দুটোতেই কাজ দেবে।”

    একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন মণিকর্ণিকা। তারপর বললেন, “এরকম ক’টা অস্ত্র আছে তোমার কাছে?”

    “আজ্ঞে এই একখানা পরখ করবার জন্য বানিয়ে এনেছিলাম। আপনারা দেখে সায় দিলে তবে…”

    অস্ত্রটা নিয়ে কোমরে গুঁজলেন মণিকর্ণিকা, “এটা আমি নিলাম। বুলেটের থলিটা দাও। আর, রবিকুমার, এ-জিনিস আমাদের হাজার হাজার দরকার হবে। ছ’মাস সময় দিলাম। খরচ নিয়ে ভেবো না। পারবে?”

    “জো হুকুম মহারানি।” বলতে বলতে মাথা নাড়লেন রবিকুমার। রক্তে তাঁরও নেশা জেগেছে এবারে। অনেক কাজ সামনে। দূরদর্শী মানুষটার চিন্তা এখন অস্ত্র তৈরি ছাড়িয়ে আরো এগিয়ে গেছে। মনে মনে তিনি নকশা বানান, এরপর, রানির আদেশ এলে কেমন করে, কোন পথে সবার নজর এড়িয়ে সে অস্ত্রদের চালান দেবেন তিনি ভারতের নানান ঘাঁটিতে। হাজারো ফন্দি আসছে মাথায়। কঠিন কিছু নয়। যেন মজার খেলা একখানা।

    সামনে থেকে কখন যে রানি ও নানাসাহেব উধাও হয়েছেন তা তিনি খেয়ালও করেননি।  সেদিকে তখন
    তাঁর মনও নেই আর। যেন নতুন করে যৌবনের দিনগুলোতে ফিরে গিয়েছেন বৃদ্ধ রবিকুমার। কী যে জাদু আছে তাঁর মেয়ের বয়েসি ওই রানির মধ্যে! ওর সামনে আপনি মাথা নুয়ে আসে। আর তেমনই বীরপুরুষ তাঁর ওই সঙ্গী… নানাসাহেব। এমন মানুষের জন্য প্রাণ দিতেও তৈরি রবিকুমার।

    ***

    তখন জঙ্গলের পথে দুটো ঘোড়া এগিয়ে যায়। দুলকি চালে প্রথম সূর্যের আলো মাখতে মাখতে এগিয়ে চলেছে তারা। এবারে, নেপাল পেরিয়ে ভারতবর্ষে ঢুকে তাঁদের পথ চলবে দেশের এমুড়ো-ওমুড়ো। কম করে আরও সাত-আটটা মাস দরকার। দরকার যথেষ্ট পরিমাণ অস্ত্র, নিখুঁত পরিকল্পনা, আর শেষ মুহূর্তে দেশ জুড়ে প্রতিটি সেনাছাউনি ঘিরে ত্রুটিবিহীন, শৃঙ্খলাপরায়ণ বিদ্রোহের আয়োজন। আসমুদ্র হিমাচল ভারতবর্ষের প্রতিটি ব্রিটিশ সেনাছাউনিতে একসঙ্গে…

    কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই ভ্রূদুটো সামান্য কুঁচকে উঠছিল নানাসাহেবের। টেলিগ্রাফ! ওই এক শয়তানি যন্ত্রের জাল সারাদেশে ছড়িয়ে দিয়েছে ওরা গত তিন চার বছরে। প্রথমে ওর গুরুত্ব বোঝেননি নানা। এখন তিনি বোঝেন ওর কল্যাণেই নিজেদের মধ্যে অত তাড়াতাড়ি খবর দেয়ানেয়া করে তাঁদের বিশৃঙ্খল বাহিনীকে এত সহজে গুঁড়িয়ে দিতে পেরেছিল ওরা। এইবার…

    “আক্রমণের শুরুতে ওই শয়তানী যন্ত্রগুলোকে আগে বিকল করে দিতে হবে মণিকর্ণিকা।”

    “কোন যন্ত্র গো?”

    “টেলিগ্রাফ। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় খবর নেয়াদেয়া করতে না পারলে ওরা…”

    মণিকর্ণিকা চুপ করে কিছু ভাবছিলেন। এবারে মাথা নেড়ে হেসে বললেন, “বিকল করব না। ওদের যন্ত্র দিয়েই ওদের মারব। শুধু একটু সাবধানে কাজে লাগাতে হবে। আমি ভাবছি…”

    ৬। প্রস্তুতি

    দিন আসে, দিন যায়। একে একে কেটে যায় সপ্তাহ, মাস। ভারতবর্ষের বিরাট অঞ্চল জুড়ে ঘনঘোর বর্ষা আসে। তার কিছু কিছু এলাকায় এখন রেলপথ চালু হয়েছে বটে, তবে সে আর কতটুকু! খোলা ইঞ্জিনের কয়লা ভিজে যাওয়ায় সেই রেলের চাকাও প্রায়শই অচল থাকে এই সময়টা।

    দেশের মূল শহরগুলোকে ঘিরে যে বিশাল গ্রাম ভারত, ।যেখানে তার নব্বই শতাংশের মানুষের বসবাস, এই সময় শাসনের প্রাণকেন্দ্রদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিশেষ থাকে না। সেই সব শহরের বাসিন্দা যে বিদেশি সাহেব বা তাদের এদেশিয় শহুরে সেবকের দল, তাঁদের কাছে তখন এই বিশাল গ্রামীন ভারতবর্ষ প্রায় অদৃশ্য হয়েই থাকে। তাকে ঘিরে রাখে ক্রমাগত মৌসুমী ঝঞ্ঝা, ঘোর বৃষ্টি আর বন্যার ঘেরাটোপ।

    দেশের প্রধান শহরগুলোর মধ্যে এ-সময় তাও রাজপথ দিয়ে খানিক যোগাযোগ বজায় রাখা সম্ভব হয়। বিপুল খরচ ও পরিশ্রমে সেটাকে বজায় রাখে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আর তাদের অনুগত দেশীয়রাই। রাখে নিতান্তই প্রাণের দায়ে। এই প্রধান শহরগুলোয় তাদের সেনাছাউনি। তাদের শক্তির উৎস এই ছাউনির সৈনিকরা। নিজেদের দেশ থেকে বহু হাজার মাইল দূরের এই সদ্য দখল করা দেশের মানুষ তাদের চায় না। তাদের সামান্য অসন্তোষের মাথা নাড়ার ভয়াল ফলাফল তারা সবে স্বচক্ষে দেখেছে ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের সময়। তাই এই সেনাছাউনিগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখাটা তাদের কাছে এই মুহূর্তে নিতান্তই প্রাণের দায়।

    আর সেই প্রাণের দায়েই আরো একটা কাজ তারা করেছে। সদ্য আবিষ্কার হওয়া টেলিগ্রাফ যন্ত্রটার জাল তারা বিদ্যুতগতিতে ছড়িয়ে চলেছে এদেশের বিভিন্ন এলাকায়।

    কিন্তু, আর দশটা যন্ত্রের মতই এই টেলিগ্রাফ যন্ত্রটাও একেবারেই প্রভুভক্ত জীব নয়। যে তাকে কাজে লাগায় তার কাজেই লেগে যায় সে সহজেই।তবে এদেশের গরুর গাড়িতে চরা মূর্খ মানুষ তাকে কাজে লাগাতে পারে এমন সন্দেহ তখনও সাহেব কিংবা তাদের বশম্বদ উঁচুতলার ভারতীয়দের হয়নি।

    ১৭ আগস্ট ১৮৫৮, বৃহস্পতিবার বেলা বারোটার সময় বাংলার বৃহত্তম সেনাছাউনি বারাকপুরের অনতিদূরে সদ্য বসানো টেলিগ্রাফ অফিসের ভেতরে সিগন্যালার রমেন মুখুজ্জের সামনে রাখা টেলিগ্রাফ যন্ত্রটা কথা বলে উঠল। অফিসের ভেতর থেকে টেলিগ্রাফ মাস্টার সুইনসন সাহেব একবার ঘুরে তাকালেন সেদিকে। ছোট্ট মেসেজ। খানিক বাদে। তার সাঙ্কেতিক। চিহ্নগুলোকে ইংরিজি অক্ষরে বদলে নিয়ে সুইনসনের কাছে উঠে এলেন রমেন।

    মেসেজটার দিকে একটু বাঁকা চোখে একনজর দেখলেন সুইনসন। মীরাট থেকে টেলিগ্রাফ। কাছেই শ্যামনগর গ্রামের পঞ্চানন কর্মকারের নামে। করেছে তার ছেলে মণিময়। পঞ্চানন কর্মকার এককালে কোম্পানির সিপাই ছিল। উপস্থিত বুড়ো বয়েসে গ্রামে ফিরে জাতব্যাবসায় ফিরে গেছে। সংক্ষিপ্ত দু’এক কথায় মণিময় তার বাবাকে জানাচ্ছে, সে ভালো আছে। হুন্ডিতে পেনেটির ভবানীর গদিতে বাপের নামে কিছু টাকা পাঠিয়েছে। পঞ্চানন যেন পরদিন বারোটা নাগাদ গিয়ে ছাড়িয়ে নেন।

    সাধারণ ব্যাপার। আজকাল এ-অঞ্চলের বহু পরিবারের ছেলেরাই কাজের খোঁজে দেশের নানান এলাকায় ছড়িয়ে যাচ্ছে। মহান ব্রিটিশ সরকার শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি করার ফলে কাজের সুযোগও বাড়ছে তাদের। এখন এই টেলিগ্রাফ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে তারা দেশে বাপ-মায়ের সঙ্গে অনেক সহজেই যোগাযোগটাও রাখতে পারছে। সুইনসন নিজে খানিক প্রাচীনপন্থী। এই নেটিভগুলোকে আধুনিক ইউরোপের এইসব সুযোগ সুবিধে বেশি না দেয়াই উচিৎ বলে তাঁর বিশ্বাস। তবে কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। অতএব, টেলিগ্রামটা নির্মল ডাকিয়ার হাতে দিয়ে তিনি রওনা করিয়ে দিলেন। এবং তারপর মাঝে মাঝেই আসা আরো বিভিন্ন টেলিগ্রাফের খবর ও অন্যান্য সরকারি কাজে ডুবে গিয়ে ভুলেও গেলেন সেই টেলিগ্রাফের কথাটা।

    সেদিন শ্যামনগর গ্রামে পঞ্চানন কর্মকারের আনন্দের শেষ নেই। নির্মল ডাকিয়া এসে টেলি পড়ে শুনিয়ে বখশিস নিয়ে গেছে। ছেলে টাকা পাঠাচ্ছে প্রবাস থেকে। অতএব, বাড়িতে পুজোপাঠ হওয়া দরকার। সেদিন সন্ধ্যায় নারায়ণ পুজো হল তাঁর বাড়িতে। গোটা গ্রামের নিমন্ত্রণ হল নারায়ণের প্রসাদের জন্য। পুজোপাঠ ও প্রসাদ খাওয়া শেষ হতে উপস্থিত বেশ কিছু
    তরুণ তাদের বাড়ির জন্য খানিক খানিক প্রসাদ চেয়ে নিয়ে গেল। গ্রামদেশে এ প্রথা স্বাভাবিক। গোটাপঞ্চাশেক মালসা এজন্য আগে থেকেই তৈরি রেখেছিলেন পঞ্চানন। তাতে। প্রসাদ। ভরে। সেগুলো। তুলে দিলেন তিনি তাদের হাতে।

    বাড়ি থেকে বের হয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে গেল সে তরুণরা। তারপর
    মালসার প্রসাদের ভেতর থেকে একেকটা চিরকুট বের করে নিয়ে এসে সেগুলোয় চোখ বুলিয়ে নিয়ে ঘন বৃষ্টির মধ্যে হারিয়ে গেল। দুটিমাত্র শব্দ লেখা তাতে। ‘ভবানী ঘাট’ ও ‘রাত বারোটা।’ টেলিগ্রামের আপাতনিরীহ খবরের আড়ালে আসলে এই নির্দেশটাই এসে পৌঁছেছে পঞ্চাননের কাছে।

    পেনেটিতে ভবানী মহাজন এ অঞ্চলে পরিচিত নাম। হুন্ডির বিরাট কারবার তার। কিন্তু, সে বাদে আরো একটি ‘ভবানী’ আছে পেনেটিতে। ভবানীর ঘাট। প্রাচীন এই ভাঙা ঘাট এখন পরিত্যক্ত। সেদিন রাত্রি বারোটা নাগাদ গভীর অন্ধকারের মধ্যে একটা আলোহীন মালবাহী নৌকা এসে ভিড়ল সেখানে। পাড়ের অন্ধকারের ভেতর থেকে এইবার এক এক করে কালো কালো কিছু ছায়া সুশৃঙ্খলভাবে নেমে এল নৌকোটার দিকে। তাদের সবার সামনে আছেন পঞ্চানন ঘোষাল নিজে। খানিক বাদে সেখান থেকে একেকটা ভারী পুঁটুলি বয়ে উঠে এসে ফের তারা ফিরে চলল।

    সদরের রাস্তা এড়িয়ে বনজঙ্গল বেয়ে এগিয়ে যায় তারা। রাত কেটে যায়। অবশেষে ভোররাতের মুখে তারা এসে পৌঁছল গঙ্গাপাড়ে মুলাজোড়ের ডাকাতে কালীর মন্দিরচত্বরে। ঘন অরণ্যছাওয়া সে-এলাকায় বিশেষ পূজাপাঠ বিনা সাধারণ মানুষের পা পড়ে না।

    এইখানে এসে, জড়ো করা পুঁটুলিগুলো একে একে খুলে ফেললেন তাদের নেতা পঞ্চানন কর্মকার। ততক্ষণে তাঁর নির্দেশে মন্দির থেকে খানিক দূরের জঙ্গলের ভেতর বড়ো বড়ো কিছু গর্ত খুঁড়ে ফেলেছে যুবকরা। পুঁটুলি থেকে বের করে আনা অস্ত্র আর বারুদের স্তূপকে সেই গর্গুলোয় যত্ন করে লুকিয়ে রেখে ফের তাদের ঢেকে দেয়া হল নিঃশব্দে।

    এইবার পঞ্চাননের কাছে এই অস্ত্রদের ব্যবহারে হাতেখড়ি হবে এই যুবকদের। লোকচক্ষুর আড়ালে এই অরণ্যেই চলবে তাদের নিয়মিত অভ্যাস। তারপর… সমাজের সাধারণ মানুষজনের মধ্যে মিশে থেকে অপেক্ষায় থাকবে তারা। অপেক্ষা করবে একটা আহ্বানের। সে-আহ্বান কবে আসবে তারা জানে না। কেবল জানে একদিন না একদিন ডাক পড়বে। সেদিন তাদের কর্তব্য তারা জানে।

    সেই একই রাত্রে উড়িষ্যার এক প্রত্যন্ত গ্রামে সীতা নদীর এক পরিত্যক্ত ঘাটে, পাটনার কাছে গঙ্গানদীর ধারের এক অরণ্যময় এলাকায় এই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হচ্ছিল। গত কিছুকাল ধরেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় এভাবেই পঞ্চানন কর্মকার, সীতারাম বিসওয়াল, অনিল পাণ্ডের মত অনেক মানুষই তাঁদের প্রবাসী ‘আত্মীয়’দের কাছ থেকে টেলিগ্রাফে এমন খবর পেয়ে চলেছেন। খবর আসে কখনো মীরাট, কখনো গোরখপুর, কখনো বা বারাকপুর থেকে।

    একটা আশ্চর্য কর্মকাণ্ড চলেছে দেশ জুড়ে। দুজন প্রায় অশরীরি মানুষ, ঝড়ের বেগে তাঁরা ঘুরে বেড়ান দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। কখনো ঘোড়ায়, কখনো নৌকায়, যেখানে সুযোগ মেলে সেখানে সদ্য চালু হওয়া রেলের কামরাতেও তাঁদের দেখা মেলে। কখনো একত্রে স্বামী-স্ত্রী চলেছেন যেন, কখনো বা বাপ চলেছেন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে, কখনো বা নিতান্তই অচেনা দুই পথিক,
    পথে আলাপ হয়ে একত্র চলেছেন।

    আশ্চর্য যন্ত্র এই টেলিগ্রাফ। দেশজোড়া তার মাকড়শার জালের মত ছড়িয়ে পড়া বিস্তারকে কাজে লাগিয়ে, মণিকর্ণিকার নিখুঁত পরিকল্পনায় গড়ে উঠেছে বিদ্রোহীদের নিজস্ব এই সাঙ্কেতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। তার একপ্রান্তে স্থির হয়ে আছেন রবিকুমার। কোম্পানির এলাকার বাইরে নেপালের সীমানার মধ্যে বসে, জং বাহাদুর রানার সহায়তায় তাঁর গোপন কারখানা
    অস্ত্রের সম্ভার গড়ে তোলে। তারপর, বর্ষার উদ্দাম নদীদের কাজে লাগিয়ে সকলের চোখের আড়ালে এইভাবে তারা ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা এলাকায়, কোম্পানির সেনাছাউনিগুলোকে ঘিরে রাখা গ্রামাঞ্চলগুলোতে।
    পাশাপাশি, পথকে ঘর করে নেয়া সেই দুই আশ্চর্য মানুষ, কখনো একত্র, কখনো আলাদা আলাদাভাবে ঘুরে বেড়ান বিভিন্ন অঞ্চলে। খুঁজে বের করেন কোম্পানির প্রাক্তন কর্মচারীদের, তাঁদের মধ্যে থেকে সঠিক মানুষদের নির্বাচন করে নিয়ে অগ্নিমন্ত্রে তাদের দীক্ষিত করে তাঁদের হাতে তুলে দেন স্থানীয় সংগঠনের ভার।সংগঠন ছড়িয়ে যায় কত না অজস্র পঞ্চানন কর্মকার, সীতারাম বিসওয়াল, অনিল পাণ্ডেদের মধ্যে।

    এমনি করে বর্ষা কেটে একসময় শরৎ এল। শান্ত হয়ে এল ভারতবর্ষের আকাশ।ভারতবর্ষের সীমার বাইরে বরদাঘাটের সেই গোপন কারখানায় এতদিন ধরে তৈরি হওয়া অস্ত্রদের বিলি করা শেষ হয়েছে। তবে রবিকুমারের বিশ্রাম নেই তখনও। পাহাড়ের গভীরে গড়ে ওঠা অজস্র ছোটো ছোটো কারখানায় তাঁর নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের হাপর ও হাতুড়ির শব্দ ওঠে ক্রমাগত। মাটিতে তৈরি বড়ো বড়ো গর্তে সোরা গন্ধক ও কাঠকয়লার মিশ্রণে তৈরি হয় বারুদের স্তূপ। সবে পূর্বভারতের কিছু এলাকার অস্ত্র পৌঁছোবার কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু তবু, এখনও অনেক কাজ বাকি। পরের বর্ষায় ফের একবার… এবার দেশের অন্যান্য এলাকাতেও…

    বিশ্রাম নেই সেই দুই নারীপুরুষের পথ চলাতেও।এখনও অনেক পথ চলা বাকি তাঁদের। অনেক কাজ বাকি। উত্তর-পশ্চিমে পলাতক নেতা বখ্‌ত্‌ খান, নানাসাহেবের নির্দেশমত গোপনে সে-অঞ্চলে প্রস্তুতি শেষ করে এনেছেন প্রায়। সেখানে ইউসুফজাই গোষ্ঠীর আমীর আখুন্ড আবদুল গফুর তাঁকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছেন।পূর্ব ভারতের প্রস্তুতিও প্রায় শেষ। তবু, আরো অনেক এলাকা বাকি রয়ে গেছে।

    অক্লান্ত পরিশ্রমে তাঁদের শরীর শীর্ণ। সেই শীর্ণ শরীরের বুকের অনির্বাণ আগুনের শিখার আভা ফুটে থাকে তাঁদের চোখে। একেকটা নতুন এলাকায় যখন তাঁরা গিয়ে পৌঁছোন, মানুষের মাথা আপনি নুয়ে আসে তাঁদের দেখে।

    জনসভা করেন না তাঁরা। নিজেদের সর্বসমক্ষে তুলেও ধরেন না। কেবল, একেকটা এলাকায় গিয়ে সঠিক মানুষগুলোকে নির্বাচন করে তাদের দীক্ষাটুকু দিয়ে তাঁদের কাজ শেষ। এরপর সেই দীক্ষিতেরা নিজের আগুনেই পথ চলবে।গড়ে তুলবে স্থানীয় সংগঠন- সাধারণ মানুষের মধ্যে, কোম্পানির সেনাছাউনিতে এখনও বিপুল সংখ্যায় হাজির থাকা দেশভক্ত সেপাইদের মধ্যেও। তারপর, পরের বর্ষায়, দেশ জুড়ে কোম্পানির নজরদারিতে ভাটা পড়লে তাদের নেতাদের কাছেও এসে পৌঁছোবে আপাতনিরীহ ওই টেলিগ্রামগুলো…

    আবার এই দীক্ষিতেরাই তাঁদের খবর দেয় নতুন নতুন এলাকায় তাদের পরিচিত সমধর্মা মানুষজনের। যাঁরা এককালে কোম্পানির সিপাহি ছিলেন। যাঁরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন মহাবিদ্রোহের সময়। তারপর চূড়ান্ত পরাজয়ের পর, বুকে গভীর দুঃখ আর ক্রোধ নিয়ে অপেক্ষায় আছেন আরো একটা সুযোগের।

    এ যেন এক আশ্চর্য শৃঙ্খল বিক্রিয়া। একবার শুরু হয়ে যাবার পর নিজের জোরেই তা ছড়িয়ে পড়ে চলেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। আপাতদৃষ্টিতে শান্ত কোম্পানির শাসনের জমির গভীরে যেন মাটি কেটে নিয়ে চলেছে অদৃশ্য জলধারারা।

    শরৎ গিয়ে হেমন্ত এলো। হেমন্ত গিয়ে শীত। সেবার, ১৮৫৮র ডিসেম্বরের চার তারিখের কুয়াশামাখা ভোরে কলকাতার উপকন্ঠে ডায়মন্ডহারবারের জেটিতে স্টিম ফ্রিগেট ‘এইচএমএস মগর’ এসে নোঙর করল। জাহাজ থেকে কিছুদূরে ভাসমান এক নৌকায় এক দীর্ঘদেহী জেলে ও তার কিশোর ছেলেটা মাছ ধরতে ব্যস্ত ছিল। সেইখান থেকেই তারা দেখল, ভোরের আবছায়ায় জেটি দিয়ে, ব্রিটিশ সৈনিকদের পাহারায় একজন ন্যুব্জ বৃদ্ধ মানুষ তাঁর বৃদ্ধা স্ত্রীকে এনে তোলা হচ্ছে সেই জাহাজে।

    জেটি বেয়ে উঠতে গিয়ে সামান্য হোঁচট খেয়েছিলেন বৃদ্ধ মানুষটা। তখন এগিয়ে এসে তাঁর হাত ধরে একটা রূঢ় ঝাঁকুনি দিয়ে তাঁকে টেনে দাঁড় করিয়ে দিলেন এক তরুণ ব্রিটিশ লেফটেন্যান্ট।

    দৃশ্যটা দূর থেকে দেখে একটু শিউরে উঠলেন দীর্ঘদেহী জেলে। নিচুগলায় বিড়বিড় করে বললেন, “বাদশাহকে এই আঘাত দেবার শাস্তি তোমায় আমি নিজের হাতে দেব লেফটেন্যান্ট এডুয়ার্ড ওমনে। তুমি দেখে নিও মণিকর্ণিকা…”

    তাঁর সঙ্গী কিশোরটি তাড়াতাড়ি একটা হাত বাড়িয়ে তাঁর বাহুতে ছুঁল, “উত্তেজিত হয়ো না। এখনও সময় হয়নি। আর একটা বর্ষার অপেক্ষা। তারপর…”

    তারপর, ।। নির্বাসিত।।শেষ মুঘল বাহাদুর শাহ জাফরকে নিয়ে, ডায়মন্ডহারবার জেটি থেকেই রেঙ্গুনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল ‘এইচএমএস মগর।’ নিশ্চিন্ত হল কোম্পানি বাহাদুর। তাঁতিয়া তোপি কারাগারে। বখ্‌ত্‌ খানকে দেশের উত্তর-পশ্চিম কোণে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। সর্বোপরি বিদ্রোহের প্রধান মস্তিষ্ক- নানাসাহেব আর লক্ষ্মীবাঈ… তারা মৃত। আর অবশেষে, এই বাদশাটাকে দেশ থেকে নির্বাসনে পাঠিয়ে ভারতবর্ষের সৌভাগ্যের সূর্যের শেষ আলোটুকুকেও তারা মুছে দিতে পেরেছে এইবার।

    ধীরগতিতে নৌকাটা এইবার ফিরে চলল পাড়ের দিকে। তার দুই যাত্রী দিগন্তে মিলিয়ে যেতে থাকা জাহাজের ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে দেখে। সে চোখে অশ্রু আর আগুন একসঙ্গে খেলা করে যায়। আর একটা বছর… আর একটা বর্ষার অবসর চাই তাদের। তারপর…

    ৭।মেরা হিন্দোস্তাঁ নহী দুঙ্গী

    ১২ জানুয়ারি ১৮৬০।কলকাতা

    সাগর মেলা। কলকাতা থেকে আশি মাইল দূরের সাগরদ্বীপে কপিল মুনির আশ্রম। যুগ-যুগান্তর ধরে এই পবিত্র তীর্থে
    মকর সংক্রান্তির পূণ্য তিথিতে লাখো পূণ্যার্থী এসে জড়ো হন। ইদানিং কোম্পানির রাজত্বে কলকাতা শহর হয়ে যাতায়াতের সুবিধে বেড়েছে। মকর সংক্রান্তির দিন তিনেক আগে থেকে তাই এখানে গঙ্গার পাড়ে গড়ের মাঠে এই পূণ্যার্থীদের বিপুল সমাগম ঘটে। এইখান থেকেই নৌকাযোগে তাঁরা সাগরের উদ্দেশে রওনা হয়ে যান।

    এ-মাঠের নাম এসেছে তার পাশে দাঁড়ানো কোম্পানির ‘গড়’ বা কেল্লা থেকে। অষ্টভূজ তারার মত চেহারার গড়টার তিনটে বাহু নদীর দিকে মুখ করে থাকে। তাদের সামনে ছড়ানো গঙ্গার বুকে নৌকার ভিড়ে এ-সময়টা তার জল দেখা যায় না।

    এরই ।পাশে। ছড়িয়ে ।থাকা প্রকাণ্ড ‘গড়’-এর মাঠ পূণ্যার্থীদের অস্থায়ী। আস্তানা ।হিসেবে ছেড়ে। দেয়া হয়েছে এ-বছর। ছেড়ে দেয়া হয়েছে কলকাতা শহরের কিছু প্রভাবশালী বিশিষ্টজনের অনুরোধে। তাঁদের অনুরোধ মেনে নিয়েছেন কেল্লার প্রধান। মেনে নিয়েছেন কারণ, মহাবিদ্রোহের পর এদেশের সংখ্যাগুরু হিন্দুদের খানিক খুশি রাখাটা ভালো।

    কেল্লার ভেতর থেকে তার বুরুজ ও দেয়ালের গায়ে সতর্ক প্রহরায় থাকা সান্ত্রীরা এখন বাইরে তাই এক বিপুল জনসমুদ্র ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। বারংবার রাউন্ডে আসছেন তাদের নেতা সুবেদার উসমান আলি। জেনারেলের অতি বিশ্বস্ত এই সুবেদার এই ক’দিনের জন্য কেল্লার প্রহরীর সান্ত্রীদের দলটার নেতৃত্ব নিয়েছেন। নিজেহাতে বেছে নিয়েছেন তাঁর বিশ্বস্ত পাহারাদারদের।

    আজ, বারোই জানুয়ারি, সকাল থেকে এই পুণ্যার্থীদের একে একে নৌকায় সাগরদ্বীপের উদ্দেশে রওনা হয়ে যাবার কথা। আগের রাত্রে কর্তাদের নির্দেশে কেল্লা ঘিরে পাহারাদাররা খানিক সতর্ক ছিল। অবশ্য সতর্কতার কোনো কারণ তারা দেখে না। সে-কথা তারা, আর তাদের সুবেদার উসমান আলিও বারংবার কেল্লার উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ সেনানায়কদের শোনায়। বলে, কেল্লার শত্রুতা করবার কোনো কারণ এই তীর্থযাত্রীদের নেই।

    বৃষ্টি নেমেছিল রাতে। শীতের অকাল বৃষ্টি। কিন্তু তবু, সেই বৃষ্টির মধ্যেও সতর্ক ছিল সুবেদার উসমানের সান্ত্রীরা। কেল্লার চারপাশে তাদের সতর্ক পাহারা বজায় ছিল। মাঝেমাঝেই অন্ধকারে কোনো নড়াচড়ার আভাস পেয়ে হাঁক উঠেছে ‘হু কামস দেয়ার!”

    সেই অকালবৃষ্টির ধারায় ভিজতে ভিজতে আকাশের দিকে হাত তুলে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়েছিলেন সুবেদার উসমান আলি। প্রায় ছ’মাস আগে, ছুটিতে বিহার শরিফের বাড়ি গিয়ে তিনি দেশকে স্বাধীন করবার ব্রতে দীক্ষিত হয়েছিলেন সেখানে এসে উপস্থিত হওয়া নানাসাহেবের কাছে। তারপর ফিরে এসে, কেল্লার ভেতরে গোপনে, সযত্নে নিজের দল গড়ে তুলেছেন তিনি।

    ঠিক দু’দিন আগে পাটনা থেকে আসা একটা আপাতনিরীহ ‘পারিবারিক’ টেলিগ্রাম পাবার পর কাজ শুরু হয়েছে তাঁর। বাইরে জমায়েত হওয়া ওই বিপুল জনসমুদ্রের মধ্যে মিশে থাকা কয়েক হাজার যোদ্ধার কাছেও তাঁর কাছ থেকে খবর চলে গেছে গোপনে। আর দেরি নেই। ১২ জানুয়ারি সকাল আটটায় সেই
    মাহেন্দ্রক্ষণ। কাজেই, একেবারে সঠিক সময়ে এই অকালবৃষ্টি তাঁর কাছে ঈশ্বরের আশীর্বাদের মতই মনে হয়েছিল। বৃষ্টি ঘন হতে, তাঁরই তত্ত্বাবধানে, গভীর রাতের অন্ধকারে বুরুজের কামানদের দায়িত্বে থাকা সান্ত্রীরা নিঃশব্দে কিছুক্ষণের জন্য খুলে দিয়েছিল কামানের বারুদের ওপরকার আবরণ। ঘন বৃষ্টির ধারায় তার বারুদদের ওপরের স্তরটাকে খানিক ভিজিয়ে নিয়ে তারপর ফের সযত্নে ঢেকে দিয়েছিল বারুদের স্তূপদের। কেউ তা খেয়াল করেনি।

    রাত শেষ হয়ে আসছিল। পুব আকাশে সূর্য উঁকি দিচ্ছিল। এইবার, আস্তে আস্তে সাড়া জেগেছে সেই ভিড়ে… কিন্তু…

    কেল্লার বুরুজ থেকে উসমানের নজরে পড়ল, খুব ধীরে ধীরে একটা নড়াচড়া জেগেছে গড়ের মাঠে রাত কাটানো অগুণতি মানুষের মধ্যে। যেন কোনো নিঃশব্দ আদেশ মেনে, সুশৃঙ্খলভাবে তারা ছড়িয়ে যাচ্ছিল গোটা দুর্গ ঘিরে। ছোটো ছোটো দল, একটু একটু করে জায়গা বদলায়। প্রভাতী কুয়াশার মধ্যে সহজে তাতে কোনো বদল ধরা পড়বে না কারো চোখে।

    একই সঙ্গে নড়াচড়া শুরু হয়েছে নদীর বুকে জড়ো হওয়া নৌকোগুলোর ভেতরেও। একটি দুটি করে এদিক-ওদিক নড়েচড়ে দুটো সমান্তরাল অর্ধবৃত্তে তারা ঘিরে ফেলছিল কেল্লার সামনের জেটিটাকে।

    প্রায় সত্তর হাত পুরু সেই অর্ধবৃত্তের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় এবারে একটা দুটো করে নৌকা এগিয়ে যায়। আস্তে আস্তে একটা দুর্ভেদ্য ব্যুহ যেন গড়ে উঠতে থাকে জলের ওপর। একে পেরিয়ে কোনো জাহাজের খুব তাড়াতাড়ি কেল্লার সাহায্যে এগিয়ে আসা সম্ভব হবে না।

    সান্ত্রীরা সেই সবকিছু দেখতে দেখতে নিঃশব্দে অপেক্ষায় রইল। আর তাদের প্রহরায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রইল বাকি কেল্লা। এখনও সকাল হতে দেরি আছে।

    বারাকপুর

    আগের দিন বিকেলে পঞ্চাননের কাছে ফের টেলিগ্রাম এসেছিল ছেলের থেকে। কলকাতার টেলিগ্রাম। তাতে লেখা, “কাল সকাল আটটায় বাড়ি পৌঁছাব।” ডাকিয়া এসে তার হাতে সেটা দিয়ে মিঠাই খাবার পয়সা নিয়ে গেছে। কৃতি ছেলে কলকাতা ছুঁয়ে সুদূর মীরাট থেকে বাড়ি ফিরছে। বড়ো সুখের খবর।

    এরপর সারাটা রাত ঘুম আসেনি পঞ্চাননের। মিরাট, আম্বালা, কলকাতা, মাদ্রাজের পাশে তিরুপতি, দেশের এমন দশটা এলাকায় দশজন প্রধান সংযোগকারী রয়েছেন। নানা বা রানির কাছ থেকে মূল আদেশ টেলিগ্রাফে পৌঁছায় কাঠমাণ্ডুতে জং বাহাদুরের নিজস্ব রাজকীয় টেলিগ্রাফ যন্ত্রে। সেখান থেকে সাংকেতিক ভাষায় বদলে নিয়ে বরদাঘাটের রবিকুমারের হাত ঘুরে গোরক্ষপুর থেকে তা যেকোনো দুজন প্রধান সংযোগকারীর কাছে গিয়ে পৌঁছায়। তাঁদের থেকে দশজন সংযোগকারীর বাকিরা সেগুলো পান এবং সঠিক জায়গায় সর্দারদের যোগাযোগ বিন্দুতে সেগুলোকে পাঠিয়ে দেন। প্রতিবার নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সাংকেতিক শব্দগুলো বদলে যায়। বারংবার হাত ও সঙ্কেতবদলের মধ্যে দিয়ে আসা, আপাতদৃষ্টিতে একেবারেই সাধারণ সেই খবরদের সূত্র উদ্ধার করে তার উৎস খুঁজে বের করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।

    আজকের এই মেসেজটার জন্য তাঁর দীর্ঘ দেড় বছরের সাধনা। রাতের মধ্যেই প্রয়োজনীয় নির্দেশ তিনি পৌঁছে দিয়েছেন তাঁর কর্মীদের হাতে। তিনি জানেন, একলা তিনি নন। সুদূর রেঙ্গুন থেকে নেপাল হয়ে বিভিন্ন টেলিগ্রাফ অফিস ও বিভিন্ন সর্দারের জটিল জাল ছুঁয়ে ছুঁয়ে এই টেলিগ্রাফের খবর এই মুহূর্তে পৌঁছে গেছে দেশের প্রায় সমস্ত ব্রিটিশ ছাউনিকে ঘিরে রাখা গ্রামাঞ্চলগুলোতে। এই মুহুর্তে দিকে দিকে তাঁর মতই বিভিন্ন সর্দারের নেতৃত্বে একযোগে তৈরি হয়ে চলেছে আসমুদ্রহিমাচল ভারতবর্ষের অগুণতি মানুষ।

    ভোর হয়ে আসছিল। ভেতরে ভেতরে একটা উত্তেজনা অনুভব করছিলেন তিনি। সকাল আটটা! সময় নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছে। তিনি জানেন, এই মুহূর্তে বারাকপুর সেনাছাউনিকে ঘিরে হাজারো গ্রামে অজস্র মানুষ তৈরি হচ্ছে। বাড়ির পেছনের উঠান, জঙ্গলের গাছের কোটর, এমন হাজারো জায়গা থেকে বের হয়ে আসছে এতদিন ধরে সযত্নে লুকিয়ে রাখা আগ্নেয়াস্ত্রের দল। সে-অস্ত্রদের পোশাকের আড়ালে লুকিয়ে নিয়ে পথে নামছে সেই মানুষেরা। নিরুদ্বিগ্ন মুখে, ভাগে ভাগে তারা এগিয়ে চলেছে বারাকপুরের সেনাছাউনির দিকে।

    খবর চলে গিয়েছে সেনাব্যারাকের ভেতরে থাকা দেশভক্ত সিপাহীদের কাছেও। একবার তারা যুদ্ধে হেরেছিল। কিন্তু এই দ্বিতীয় সুযোগ তারা ছাড়তে রাজি নয়। তারা জানে, এইবার তারা আর একা নয়। ছাউনির বাইরে হাজারো বন্দুক তাদের সাহায্য করবার জন্য হাজির থাকবে এবার। আর সর্বোপরী তাদের সঙ্গে থাকবেন দুই নেতা, মৃত্যু যাঁদের স্পর্শ করতে পারে না। এই মুহূর্তে কোথায় রয়েছেন তাঁরা সে তারা কেউ জানে না। হয়তো এই বারাকপুরেই! অথবা বম্বে, কিংবা… রেঙ্গুন… কিন্তু যেখানেই থাকুন, এই মুহূর্তে তাঁদের আশীর্বাদ ঘিরে রয়েছে দেশজোড়া দেশভক্তদের। এই দেশভক্তদের বিশ্বাস, মৃত্যুর দেশ থেকে সশরীরে ফিরে এসেছেন রানি লক্ষ্মীবাই ও নানাসাহেব। সেটাই ঈশ্বরের নির্দেশ।

    রেঙ্গুন

    রাত্রেই মার্তাবান উপসাগর পেরিয়ে নদী ধরে বত্রিশ কিলোমিটার উজিয়ে রেঙ্গুন বন্দরে এসে পৌঁছেছিল এইচএমএস কর্নিশ। সুবিশাল এই জাহাজে ষোলোটা কামান। চলে বাষ্পীয় শক্তিতে। তবে উপস্থিত শান্তির সময়ে এ-জাহাজকে যাত্রী এবং মাল পরিবহণের কাজে লাগিয়ে দিয়েছে কোম্পানি। জাহাজের প্রায় তিনশ যাত্রী ভারতবর্ষের সমস্ত জায়গা থেকেই এসে জড়ো হয়েছে। ভোর হয়ে এসেছে। জেটির ধার ঘেঁষে ডাঙায় মানুষজন নামাবার তোড়জোর শুরু হচ্ছিল। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই যাত্রীদের জাহাজ ছেড়ে নামবার কাজ শুরু হয়ে যাবে।

    বেলা সাতটা। ।জেটির ।কাছে একটা ঘোড়া এসে থামল। তাতে সওয়ার একজন রাজপুরুষ। তাঁর বিরাট চেহারা, গম্ভীর আচরণ ও রাজসিক চালচলন দেখে জেটিমাস্টার এসে কোমর নুইয়ে অভিবাদন জানালেন তাঁকে।

    “কোনো সেবা হুজুর?”

    “হ্যাঁ।” বলতে বলতে কোমরে রাখা থলিটি টেনে বের করে তার থেকে কোম্পানির ছাপ মারা চারটে মুদ্রা তুলে নিয়ে জেটিমাস্টারের হাতে গুঁজে দিলেন তিনি, “নৌকা নিয়ে কর্নিশ জাহাজে যাবে। সেখানে আমার ঘনিষ্ট আত্মীয় অমর সিংহ আসছেন। প্রথম শ্রেণীর যাত্রী। তাঁর কাছে আমার একটি সন্দেশ পৌঁছে দিতে হবে।”

    মুদ্রাগুলো কোমরে গুঁজে ফের একবার সেলাম বাজাল জেটিমাস্টার, “হুকম।”

    “তাকে জানাবে, পূজার সময় সকাল নটায় ধার্য হয়েছে। অতএব সে যেন কোনোক্রমেই দেরি না করে।ঠিক আটটার মধ্যে পৌঁছাতে হবে।”

    কাজটা সামান্যই। বন্দরে সদ্য নোঙর করা জাহাজে জেটিমাস্টারকে এমনিতেই বিভিন্ন কারণে যেতে হয়। যাত্রী ও মাল খালাসের আগে ক্যাপ্টেনের কিছু নির্দেশ থাকলে সেগুলো জেনে নিতে হয় তাঁকে। খানিক বাদে সেই কাজের জন্য এমনিতেই তাঁকে রওয়ানা হতে হত। ফাঁকতালে এই অর্থটুকু উপার্জন করে নেয়া গেল।

    আজ তাঁর ভাগ্য সুপ্রসন্ন।কথাটা ভাবতে ভাবতেই নৌকা নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন জেটিমাস্টার। নদীর বুকে ঘন কুয়াশার আস্তর। তার মধ্যে খুব আবছাভাবে কর্নিশ-এর বিরাট, অন্ধকার শরীরটা নজরে আসে।

    জেটিমাস্টারের নৌকো রওয়ানা হয়ে যেতে দেখে যেন নিশ্চিন্ত হলেন মানুষটা। তারপর ঘোড়া ঘুরিয়ে জেটি সংলগ্ন এলাকা পার হয়ে এসে সেখানে ঘোড়ার পিঠে অপেক্ষায় থাকা কিশোরটিকে ইশারায় কাছে ডেকে বললেন, “প্রস্তুতি শেষ। পোশাক বদলে নাও। চলো। আমি স্ট্র্যান্ড রোডের টেলিগ্রাফ অফিস থেকে আমার কাজ শেষ করে ফিরে আসব ঠিক সময়ে।”

    সকাল সাতটা পঞ্চাশ। একটু আগে জেটি মাস্টার এসেছিল। প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সেরে সে ফিরে গেছে খানিক আগে। ক্যাপ্টেন উইলিয়াম ট্রেন্ট তার হাত দিয়েই স্ত্রী মেরির জন্য একটা হাতচিঠি পাঠিয়ে দিয়েছেন। সে খবরটা পেয়ে খুশি হবে। প্রাতরাশ বানিয়ে রাখবে তাঁর জন্য। এই রেঙ্গুনেই মেরি ও দুই ছেলে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার। চারদিনের সমুদ্রসফর শেষে এইবার সেখানে ফিরে কয়েকদিনের বিশ্রাম। জাহাজ ফের কলকাতার দিকে রওনা হবে দিনসাতেক বাদে।

    একটু ফুরফুরে মেজাজেই ডেকের ওপর বেরিয়ে এসে ফের মেজাজটা বিগড়ে গেল ক্যাপ্টেনের। হতচ্ছাড়া নেটিভগুলো পিলপিল করে ঘুরে বেড়াচ্ছে পুরো জাহাজ জুড়ে। যেন তর সইছে না। পারলে জলে ঝাঁপ দিয়ে পাড়ে গিয়ে উঠবে। এদের ফের থার্ড ক্লাসের হোল্ডে নিয়ে ঢোকাবার জন্য সেকেন্ড মেটকে নির্দেশ দিতে যাবেন ট্রেন্ট, ঠিক তখনই একটু থমকাতে হল তাঁকে। উচ্চশ্রেণীর যাত্রীদের কেবিনের বাসিন্দা অমর সিংহ আসছেন করিডোর বেয়ে। সুশিক্ষিত মানুষ। গত চারদিনের যাত্রায় ক্যাপ্টেন জেনেছেন তাতে ইনি মধ্যভারতের সাগর বা এইরকম নামের কোনো একটা খুদে রাজ্যের রাজকুমার। শিক্ষিত, রুচিবান মানুষ। ক্যাপ্টেনের সঙ্গে খানিক ভাবই হয়ে গেছে তাঁর।

    তাঁকে দেখে অমর সিংহ তাঁর পরিচিত হাসিটি হেসে হাত নাড়লেন, “গুড মর্নিং ক্যাপ্টেন।”

    “গুড মর্নিং। দেখুন আপনার দেশোয়ালি ব্রাদারদের কাণ্ড। জাহাজ উলটে দেবার জোগাড় করেছে সব।যাক গে। জেটিমাস্টার আপনাকে একটা চিঠি দিয়ে গেল তাই না?”

    আজ্ঞে হ্যাঁ ক্যাপ্টেন, “ বলতে বলতেই হাতচিঠিটা বের করে এনে ট্রেন্টের সামনে ধরেছেন অমর সিংহ। গোটা গোটা ইংরিজিতে লেখা কাগজটায় একবার চোখ বুলিয়ে ক্যাপ্টেন মাথা নাড়লেন, “ওহ! পুজা! ইউ হিন্দুজ হ্যাভ আ বিলিয়ন গডস বেগিং ফর পুজা এভরিডে… হা হা…”

    “তা ।ঠিকই ।বলেছেন ।ক্যাপ্টেন।” মাথা নাড়লেন অমর সিংহ। তারপর বললেন, “একটা অনুরোধ ছিল সার। আমাদের বন্ধুত্বকে দীর্ঘস্থায়ী করবার ইচ্ছায় আপনাকে সামান্য একটি উপহার দিতে চাই আমি। যদি একটু আপনার কেবিনে আসতেন!”

    একটু ইতস্তত করলেন ক্যাপ্টন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, “চলুন। তবে ঠিক পাঁচ মিনিট।”

    “অবশ্যই। তার বেশি সময় আমি নেব না।”

    আগে আগে কেবিনের ভেতরে ঢুকে এসেই থমকাতে হল ক্যাপ্টেনকে। হঠাৎ করেই তাঁর ঘাড়ের কাছে একটা ছুরির তীক্ষ্ণ ফলা ঠেকেছে। পরক্ষণেই অমর সিংহের শান্ত গলাটা বলে উঠল, “উপস্থিত এই ঘরেই কিছুক্ষণ থাকতে হবে যে আপনাকে!”

    মাথা একেবারে বরফের মত ঠান্ডা হয়ে গেল ট্রেন্টের। প্রতিবাদ করে লাভ নেই। অমর সিংহের হালকা শরীরটা যে ভালোরকম শক্তি ধরে তা তিনি তাঁর ঘাড়টাকে জড়িয়ে ধরা হাতের চাপ থেকেই টের পাচ্ছিলেন। সামান্য নড়াচড়া করলেই ছুরিটা গেঁথে দিতে সে দ্বিধা করবে না।

    খানিক বাদে ঠান্ডা গলায় তিনি বললেন, “মিউটিনি? কিন্তু আমাকে খুন করলেও এ-জাহাজ নিয়ে তুমি কোথায় পালাবে? কীভাবে পালাবে? এ জাহাজের পঞ্চাশজন শিক্ষিত নাবিক ও প্রহরী সেনারা…”

    বাইরের দিকে তাকিয়ে কান পেতে কিছু একটা শুনলেন অমর সিংহ। তারপর হেসে বললেন, “সে বন্দোবস্ত হয়ে গেছে। চলুন দেখে আসি গিয়ে…”

    বাইরে গোটা জাহাজ জুড়ে একটা আশ্চর্য পটপরিবর্তন হয়ে গেছে তখন। জাহাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া প্রায় তিনশো যাত্রীর হাতে হঠাৎ করেই উঠে আসা আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রগুলো ততক্ষণে তার পাহারাদার দিশি সেপাই আর তাদের দশজন ব্রিটিশ কর্তার যুদ্ধের ইচ্ছেটাই ঘুচিয়ে দিয়েছে। সেদিকে একনজর দেখিয়ে অমর সিংহ বললেন, “এই যাত্রীদের অধিকাংশকেই বাছাই করা হয়েছে কোম্পানির বিভিন্ন জাহাজের দেশি নাবিক ও সেপাইদের মধ্যে থেকে। অস্ত্র
    চালাবার বিদ্যেটা ওদের আপনাদের কাছেই শেখা। তবে হ্যাঁ, আপনাদের সঙ্গে কোনো শত্রুতাও আমাদের নেই। আমরা কেবল জাহাজটা চাই।”

    ঠান্ডা মাথায় দ্রুত চিন্তা করছিলেন ট্রেন্ট। রেঙ্গুনের এই বন্দরে এই মুহূর্তে একটা ব্রিটিশ ফ্রিগেট নোঙর ফেলে রয়েছে। এইচএমএস ভিক্টোরিয়া। একবার তাদের কাছে খবরটা কোনোমতে পৌঁছোতে পারলে…

    খানিক বাদে শান্ত গলায় তিনি বললেন, “সেক্ষেত্রে আমাদের পাড়ে নামিয়ে দিয়ে জাহাজ নিয়ে আপনারা…”

    ফের একটু হাসলেন অমর সিংহ, “মজার ব্যাপার কী জানেন ক্যাপ্টেন, আপনার দিশি সি-ম্যানরা ওই দেখুন, এর মধ্যেই আমাদের সঙ্গে গিয়ে ভিড়েছে। তারা তো নামবে না। বাকি রইলেন আপনারা এগারোজন ব্রিটিশ। আপনাদেরও এই জাহাজে খানিক কাজ বাকি রয়েছে যে!”

    বলতে বলতেই তাঁর ইশারায় জনাদশেক মানুষ এগিয়ে এসে ট্রেন্টকে ঘিরে ধরল।

    ***

    বেলা বাড়ছিল। কুয়াশা সরে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। খানিক আগে গতরাতে কলকাতা থেকে এসে নোঙর করা কর্নিশের দিক থেকে কিছু হইহল্লার শব্দ এসেছিল, তারপর তা থেমেও যায়। তবে তাতে কেউ বিশেষ কান দেয়নি। জাহাজের মাল্লাদের মধ্যে অমন ঝামেলা তো লেগেই থাকে। সামলেও যায়।

    আটটা বাজতে পাঁচ। কুয়াশা সরে যাচ্ছে। প্রথম সূর্যের আলোয় জাহাজটাকে এইবার পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। খানিক দূরে নদীর মধ্যে নোঙর ফেলে দাঁড়ানো ভিক্টোরিয়ার ক্যাপ্টেন একনজর সেদিকে দেখে চমকে উঠে চোখে দুরবিন ধরলেন।

    জাহাজটার এগারোটা জায়গায় এগারোজন বৃটিশকে দড়িবাঁধা অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের সামনে দশজন করে বন্দুকধারী সিপাহী, অনেকটা ফায়ারিং স্কোয়াডের ঢঙে বন্দুকের নিশানা নিয়ে প্রস্তুত। জাহাজের একেবারে মাথায় দাঁড়ানো এক ইন্ডিয়ান প্রিন্স পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে ভিক্টোরিয়ার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।

    দৃশ্যটা দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলেন ভিক্টোরিয়ার ক্যাপ্টেন হিউ লরেন্স। ব্যাপারটা কী ও কেন তা না বোঝা গেলেও ইশারাটা পরিষ্কার। জাহাজটার ওপরে কোনো আক্রমণ হলে ওই এগারোজন ব্রিটিশের প্রাণ যাবে।

    আর এই থমকে যাওয়াটাই তাঁর ভুল হয়েছিল। কারণ সেই অবসরে ভিক্টোরিয়ার একশজন দেশীয় যোদ্ধা ও নাবিক ততক্ষণে রেলিং-এর কাছে ভিড় করে এসেছে। একটা গুণগুণ শব্দ উঠছিল তাদের মধ্যে। বিষয়টার দিকে হঠাৎ নজর যেতে সতর্ক হয়েছিলেন লরেন্স। সদ্য একটা বিদ্রোহ শেষ হয়েছে। এই অবস্থায় এই দৃশ্যটা এদের মনে ঠিক কোন প্রভাব ফেলবে কে জানে!

    পেছনে এসে দাঁড়ানো জাহাজের পাঁচ ব্রিটিশ অফিসারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেবার জন্য ঘুরে দাঁড়ালেন লরেন্স। প্রথমে নিজের জাহাজের মাল্লাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়া প্রয়োজন। কিন্তু চড়া গলায় নির্দেশগুলো শেষ করবার আগেই অফিসারদের মুখে ফুটে ওঠা ভয়ের ছাপটা দেখে ফের চারদিকে চোখ ফেললেন তিনি। তাঁদের ঘিরে দাঁড়ানো দেশীয় মানুষগুলোর মুখ কঠিন। তাদের হাতে উঠে এসেছে ব্রিটিশদেরই দেয়া অস্ত্র। তাদের নলগুলো লরেন্স ও তাঁর সঙ্গীদের দিকে ঘোরানো।

    পরের মুহূর্তেই একটা কামানের শব্দ ভেসে এল কর্নিশের ডেক থেকে। দুই জাহাজ থেকেই একটা গর্জনের শব্দ উঠল। হতচকিত লরেন্স দেখলেন, বন্দরের পাশে দাঁড়ানো কাস্টম হাউসটার দেয়ালে বিরাট একটা গর্ত তৈরি করে দিয়েছে কর্নিশের গোলা। ততক্ষণে একরাশ হাত এসে তাঁদের ক’জনকেও বেঁধে ফেলেছে ডেকের রেলিংগুলোর সঙ্গে।

    এইবার কর্নিশের ডেক-এ দাঁড়ানো অমর সিংহের গলাটা ভেসে এল দূর থেকে, “বন্ধুরা, ভারতবর্ষের সম্রাটকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য প্রস্তুত হও।”

    ভারতবর্ষ

    ঠিক সেই মুহূর্তে, ঘড়ির কাঁটার নিখুঁত নির্দেশ মেনে, রেঙ্গুন থেকে বহু দূরে সারা ভারতবর্ষ যেন তার বহুকালের ঘুম ভেঙে জেগে উঠে হুঙ্কার দিয়ে উঠেছিল একযোগে। সুশিক্ষিত হাজারো অস্ত্রধারী জওয়ানের পেছন পেছন লাখো মানুষ তখন এসে ঘিরে ফেলেছে ইংরেজের প্রতিটি সেনাছাউনিকে। ছাউনিগুলোর ভেতরে তখন এক অসম যুদ্ধ চলেছে। সেখানকার দেশি সেপাইদের বন্দুকের শত শত নল একসঙ্গে ঘুরে গেছে তাদের মুষ্টিমেয় ব্রিটিশ কর্তাদের দিকে।

    তবু সহজে বশ মানেনি ব্রিটিশ সিংহ। লড়াই দিয়েছিল তাদের অনেকেই। জবাবে, সিপাইদের হাতে তাদেরই তুলে দেয়া রাইফেলের গুলির পুরস্কার মিলেছিল তাদের। যারা পালাতে চেয়েছিল তাদের কপালে জুটেছিল ছাউনি ঘিরে থাকা অজস্র বন্দুকের নিখুঁত নিশানার গুলি…

    কিছুদিন আগেই বিদ্রোহ দমনে তাদের প্রভু ব্রিটিশদের থেকে শেখা একটা নীতি কাজে লাগিয়েছিল ভারতীয়রা এই যুদ্ধে। কোনো জীবিত বন্দি গ্রহণ করেনি তারা।

    পতন হতে সবচেয়ে বেশি সময় নিয়েছিল কলকাতার গড়। যুদ্ধের ফলাফলও সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হয়েছিল সেখানে। ভেজা বারুদ তাদের কামানগুলোকে নিস্তব্ধ করে দিলেও সেখানে উপস্থিত কয়েক হাজার ব্রিটিশ সেনা মরণপণ লড়াই করে শেষ করে দিয়েছিল তার ভেতরের ভারতীয় সেপাইদের। কিন্তু গঙ্গার বুকে এগিয়ে আসা তাদের রণতরীরা নৌকোর ঘন জালের ভেতর দিয়ে সহজে এগিয়ে আসতে পারেনি কেল্লার সহায়তায়। বাধা পেয়ে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল তারা। জাহাজ থেকে ক্রমাগত গুলিবর্ষণে, জাহাজের ধাক্কায় অগুণতি নৌকার জলসমাধি হয়েছিল। বীরগতি পেয়েছিলেন অজস্র ভারতীয়। একই সঙ্গে দুর্গকে ঘিরে ধরা জনস্রোতের উদ্দেশ্যে ছোঁড়া তাদের কামানের গোলার বেশির ভাগটাই হাজারো মানুষের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে বারংবার আঘাত করেছিল তাদেরই দুর্গকে। আর তাতে দুর্গের দেয়ালে গড়ে ওঠা বিরাট ফাটলগুলো দিয়ে জলস্রোতের মত তার ভেতরে ধেয়ে গিয়েছিল অস্ত্রধারী হাজারো যোদ্ধা। গঙ্গাসাগরের তীর্থযাত্রীর ছদ্মবেশ ছেড়ে তাদের হাতে তখন উঠে এসেছে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। তাদের মুখে একটাই মন্ত্র, “কোম্পানি নিপাত যাক…”

    বেশিক্ষণ অবশ্য যুদ্ধ চালাতে পারেনি জাহাজগুলোও। সামান্য কিছুটা সময় লেগেছিল তার দেশি নাবিক ও যোদ্ধাদের, ব্যাপারটা বুঝে উঠতে। তারপর ব্রিটিশ নাবিক আর সেনাদের নিরস্ত্র করে বেঁধে রেখে জাহাজে আগুন ধরিয়ে দিয়ে নেমে এসে বিদ্রোহীদের দলে মিশে গিয়েছিল তারাও। দাউ দাউ আগুনে বন্দি ব্রিটিশদের নিয়ে পুড়ে ছাই হয়েছিল সেই জাহাজেরাও।

    অবশেষে সে যুদ্ধ যখন শেষ হল, তখন হাজারো মৃতদেহ ছড়িয়েছিল সেই দুর্গ আর তার চারপাশ জুড়ে। শেষ শয্যায় একই সঙ্গে শুয়েছিল সাদা ও বাদামি চামড়ার মানুষরা। মর্মান্তিক মৃত্যু এসে তাদের মধ্যে সব বিভাজন ঘুচিয়ে দিয়েছিল সেদিন।

    রেঙ্গুন

    সকাল ন’টা। জীর্ণ শরীর নিয়ে বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফর তাঁর কাঠের কুটিরটির বারান্দায় বসেছিলেন। আজকাল শীতে বড়ো কষ্ট হয় তাঁর। বুড়ো হাড়গুলোতে তাই সারাটা দিন একটু রোদ লাগান তিনি এই বারান্দায় বসে।

    একপাশে দূরে নদীর দিকে কোনো হল্লার শব্দ উঠছিল। তারপর কামানের আওয়াজ। সামান্য বিরক্ত হলেন বাদশাহ। ওই শব্দে আজকাল তাঁর বড়ো অরুচি। ভালো লাগে না তাঁর। জীবনের শেষলগ্নে এসে পৌঁছে এখন একটু বিশ্রাম, একটু শান্তি…

    চেয়ারটাকে একটু ঘুরিয়ে বিপরীত দিকে মুখ করে বসলেন তিনি। যারা যুদ্ধ করছে তারা যুদ্ধ করুক। সেদিকে তিনি ঘুরে দেখতেও চান না আর।

    এদিকটায় সুবিশাল শেওগাডেন প্যাগোডা যেন আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কতকালের পুরোনো কে জানে! তার শিল্পময় শরীরে নিবিড় শান্তি
    জড়ানো। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আবেশে চোখদুটো বুঁজে আসছিল তাঁর।

    উঠোনের অন্যপাশ থেকে সেদিকে চোখ রেখে চরম বিরক্তিতে মাথা নাড়ছিল তরুণ লেফটেন্যান্ট এডুয়ার্ড ওমনে। বন্দরে কোনো সমস্যা হয়েছে সম্ভবত। কামানের শব্দ উঠল একবার। রক্ত চনমন করে ওঠে সেই শব্দ পেয়ে। কিন্তু সেখানে যাবার অনুমতি নেই তার। এই বৃদ্ধ বাদশাটাকে কলকাতা থেকে এইখানে সঙ্গে করে নিয়ে এসে সে নিজেও যেন নির্বাসনে এসেছে কোনো কবরখানায়। সারাটা দিন ওই মৃত্যুর দোরগড়ায় পৌঁছানো বৃদ্ধের ওপর নজরদারি। একজন ব্রিটিশ লেফটেন্যান্টের এর চাইতে বেশি দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে। মনে মনে সে বারংবার উইলিয়াম হডসনকে অভিশাপ দেয়। কেন সে আত্মসমর্পণের আগে এই আর্ধোন্মাদ বৃদ্ধকে কথা দিতে গিয়েছিল যে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেবে না ব্রিটিশ! তা না হলে আজ…

    পেছনে হালকা একটা পায়ের শব্দ উঠছিল। হঠাৎ, যেন ষষ্ঠেন্দ্রিয় দিয়ে একটা বিপদের সম্ভাবনা টের পেল ওমনে। কোমর থেকে তলোয়ারটা টেনে খুলে নিয়ে বিদ্যুতের মত ঘুরে যেতেই সেখান থেকে উঠে আসা একটা তলোয়ারের ঠোকায় আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে।

    কিন্তু ততক্ষণে আক্রমণকারীর দিকে চোখ ফেলে হঠাৎ কেমন যেন স্তম্ভিত হয়ে গেছে ওমনে। তার গলায় একটা শব্দ উঠে এসেছিল, “রানি লক্ষ্মীবাই… তুমি…”

    কিন্তু সে নিয়ে ভাবনার সময় পেল না সে। আঘাত-পিছিয়ে যাওয়া-প্রত্যাঘাতের নিখুঁত ব্যাকরণ মেনেই ঝলসে উঠেছে মহিলাটির হাতের তলোয়ার। মুহুর্তে নিজেকে সংযত করল ওমনে। একজন ভারতীয় মহিলা, তার সঙ্গে তলোয়ারযুদ্ধে…

    তীব্র একটা রাগ এসে তার মুখটাকে অন্ধকার করে দিচ্ছিল। কতটুকু শক্তি ধরে ওই শরীরটা? নিজের সাড়ে ছফুটি শরীর আর তার অসুরের মত শক্তিকে সংহত করে বিদ্যুতের মত সামনে ঝাঁপ দিয়ে এল সে। তার তলোয়ারের ফলা সজোরে এগিয়ে আসছিল রানির দেহ লক্ষ করে।

    জায়গা ছেড়ে সরলেন না রানি। তাঁর চোখে তখন ভেসে উঠেছে বিঠুরে, নদীর ধারে সেই সন্ধেগুলোর কথা। তার আবছায়া অন্ধকারে আট বছরের বড়ো বিশালকায় নানাসাহেবের হাতের কাঠের তলোয়ার… বিদ্যুতবেগে এগিয়ে আসছে তাঁর পেট লক্ষ করে… “নড়বি না মানু… ডান পা পেছনে নে… ফলাটার দিকে চোখ রাখ… শরীর সামান্য বাঁদিকে সরা… এই তো…

    বিরাট শরীরটা ভারসাম্য হারিয়ে এসে তাঁর ওপরে আছড়ে পড়েছে… শক্তিশালী দুটো হাতের বাঁধন… কী সুখ সেই স্পর্শে…

    “হা হা হা দারুণ… মারতে হলে এই মুহূর্তটায়… অন্যহাতে…

    এখন তাঁর চোখের দৃষ্টি ওই শ্বেতাঙ্গ দানবের তলোয়ারের ফলার দিকে স্থির। সময় যেন ধীরগতিতে চলছিল। সকালের আলোয় ঝিকিয়ে ওঠা ফলা… এগিয়ে আসছে তাঁর পাঁজর লক্ষ করে… এইবার…

    বাঁহাতে কোমর থেকে ছুরিটা খুলে নিতে নিতেই একটা পা বিদ্যুতবেগে পেছনে সরিয়ে নিয়ে দেহের ভারসাম্য ধরে রেখে শরীরটাকে সামান্য বাঁদিকে সরিয়ে নিলেন রানি। আর তারপর ভারসাম্য হারিয়ে তাঁর শরীরের ওপর আছড়ে পড়া দেহটার গলায় একটা নিখুঁত টান দিয়ে গেল তাঁর বাঁহাতে ধরা ছোরাটা…

    বাড়িটার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা সাতজন ব্রিটিশ সেনার ছোটো কম্পানিটা তখন জাহাজ থেকে নেমে মার্চ করে আসা দেড়শ অস্ত্রধারীর বন্দুকের নিশানাবন্দি হয়ে হাতের অস্ত্র নামিয়ে রেখেছে। স্তম্ভিত হয়ে তারা দেখছিল, ছোটোখাটো চেহারার ঐ ভারতীয় মহিলার হাতে জড়িয়ে ধরে থাকা তাদের লেফটেন্যান্টের তখন কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকা শরীরটা। ছেঁড়া গলা দিয়ে ভলকে ভলকে উঠে আসা রক্ত লাল করে দিচ্ছিল রানির শরীরকে।

    ঘন ঘন কামানের শব্দ উঠছিল দূরের বন্দর এলাকা থেকে। দুটো জাহাজের বত্রিশটা কামান এইবার গোলা ওগড়াচ্ছে রেঙ্গুনের ব্রিটিশ ছাউনি, ব্রিটিশদের ফ্যাক্টরি, তাদের বসতি এলাকা লক্ষ করে। শব্দগুলো কয়েক মুহূর্ত শুনে সেদিক থেকে ঘুরে মণিকর্ণিকার দিকে চোখ ফেললেন নানাসাহেব।

    পায়ের কাছে ছটফট করতে থাকা শরীরটার দিকে স্থির চোখে তাকিয়েছিলেন মণিকর্ণিকা। নানাসাহেব তাঁর কাছে এগিয়ে আসতে রানি নিচুগলায় বললেন, “কত বদলে গেলাম, তাই না? মনে পড়ে, সেই তুমি আমি বিঠুরের পথে পথে খেলে বেড়াতাম! কত আনন্দের ছিল দিনগুলো। তারপর… থাকগে সে কথা। বিয়ে হয়ে, তোমাদের ছেড়ে, যেন নির্বাসনে এলাম এলাম ঝাঁসির অন্দরমহলে। তাও তো মেনে নিয়েছিলাম। ওর পর আর খুব বেশি কিছু তো চাইনি জীবনে! একটা ছোট্ট রাজ্য! তার ন্যায্য শাসনের ভারটুকুই তো দাবি করেছিলাম। এদের জাতটা সেইটুকুও দিতে রাজি হল না। একফোঁটা মাটিও ছাড়বে না ওরা। সংসার ছেড়ে তলোয়ার ধরিয়ে দিল আমার হাতে ওরা। আর আজ, তারই শাস্তি পেয়েছে এই ছেলেটা। নিজের দেশ, ঘর, আত্মীয়স্বজনের থেকে বহুদূরে…এভাবে…

    “এই মুহূর্তে, সারা দেশ জুড়ে কত ভারতীয় আর ব্রিটিশ সে পাপের ঋণ চোকাচ্ছে নিজেদের রক্ত দিয়ে বলো তো!”

    নিঃশব্দে মাথা নাড়লেন নানাসাহেব, “এ রক্তের দায় তোমার নয় মণিকর্ণিকা। এখন চলো। অনেক কাজ বাকি আছে।”

    চেয়ারে বসে থাকা সম্রাটের কাছে নতজানু হয়ে বসেছেন তাঁরা দুজন। নির্বাসিত বাদশা এইবার তাদের দিকে ফিরে চাইলেন, “কেন এসছ তোমরা? এই জীর্ণ শরীর আগের বারও ওই শয়তানদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি তোমাদের। এবারেও পারবে না।”

    মৃদু হাসলেন মণিকর্ণিকা, “কামানের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন জাঁহাপনা? কেবল এখানে নয়। এই মুহূর্তে সারা ভারত জুড়ে ওই শব্দ উঠছে। জায়গা থেকে নড়বার সুযোগ পাবে না ওরা। ওদের অস্ত্র, ওদের যন্ত্র দিয়েই ওদের এইবার সমূলে শেষ করে দিচ্ছে এখন আপনার প্রজারা…

    “মেরা হিন্দোস্তাঁ নহি দুঙ্গী ম্যায় উনকো… জান কবুল… এইবার, ফের একবার দিল্লির মসনদে…”

    স্থির হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন শেষ মুঘল। তাঁর ফ্যাকাশে চোখদুটোয় ফের যেন বহু পুরুষ ধরে সঞ্চিত সেই পুরোনো দ্যুতি ফিরে আসছিল। খানিক বাদে, সামনে বসে থাকা মানুষ দুজনের দিকে ফের একবার পূর্ণদৃষ্টিতে তাকালেন তিনি। তারপর প্রশ্ন করলেন, “তোমার নাম কী মা?”

    “আমি মণিকর্ণিকা। ইনি, হিন্দোস্তানের শ্রেষ্ঠ পুরুষ… নানাসাহেব।”

    “কিন্তু তোমরা তো…”

    নানাহাসেব এইবার এগিয়ে এসে তাঁর সামনে নতজানু হলেন, “আমরা মরি না বাদশাহ। এ দেশ যতদিন নিজের পূর্ণ গৌরবে ফিরে যাচ্ছে ততদিন মৃত্যুর অধিকার আমাদের নেই। আমরা আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছি। আপনার সাম্রাজ্যে, আপনার জন্মভূমিতে।”

    স্থির, প্রত্যয়ী দৃষ্টিতে এইবার তাদের দিকে তাকিয়ে দেখলেন বাদশাহ বাহাদুর শা জাফর। তারপর মাথা নেড়ে সস্নেহে বললেন, “জন্মভূমি, হ্যাঁ। কিন্তু সাম্রাজ্য? না মণিকর্ণিকা।তা হয় না নানাসাহেব। আমাদের দিন শেষ। হয়তো ভারতবর্ষের গরিমার প্রতীক হিসেবে দিল্লির তখ্‌তে ফের বসব আমি। কিন্তু সে কেবল প্রতীক হিসেবেই। রাজনীতি আমার রক্তে। সে আমার বংশের দীর্ঘ ঐতিহ্য। তাই, যা তোমরা দেখতে পাও না তা আমি দেখতে পাই। নতুন যুগ এসেছে মণিকর্ণিকা। ঐ বানিয়ার জাত এত দূর থেকে এই দেশে এসে যে সাম্রাজ্যের জাল বিছিয়েছিল, তারা সেই নতুন যুগের প্রতিভূ। সে শক্তির উৎস ছিল তাদের দেশের শাসনপদ্ধতি। সেখানে রাজা থাকেন দেশের প্রতীক হয়ে। শাসন করে প্রজারাই, তাদের যোগ্য প্রতিনিধির নেতৃত্বে। যে-দেশকে তোমরা উদ্ধার করেছ বলে দাবি করছ, তা যদি সত্যি হয় তাহলে সে-স্বাধীনতাকে ধরে রাখবার জন্য তোমাদেরও ওই পথেই এগোতে হবে। ঐ আজকের দুনিয়ার নিয়ম। আমি, ভারতের সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর ঘোষণা করছি…”

    ***

    এবং দুটি যুদ্ধজাহাজ ফিরে চলে কলকাতা বন্দরের উদ্দেশে। তাদের মাস্তুলে এইবার পতপত করে ওড়ে স্বাধীন ভারতবর্ষের পতাকা। কবি, শিল্পী বাদশা বাহাদুর শা স্বয়ং সে পতাকার নকশা করে দিয়েছেন। এদেশের তিন প্রতীক- ত্যাগের গেরুয়া, শান্তির শ্বেত আর তারুণ্যের সবুজ মিলে সেই অসামান্য তেরঙ্গা যেন কোনো স্বর্গের পাখির মত উড়ে চলে জাহাজদুটির মাথায়।

    রেঙ্গুনে থাকাকালিনই সেখানকার স্ট্র্যান্ড রোডের টেলিগ্রাফ অফিসে কলকাতা থেকে খবর পৌঁছেছিল, সম্পূর্ণ সফল হয়েছে এই দ্বিতীয় মহাবিদ্রোহ। দেশের বুক থেকে মুছে গেছে ইংরেজের সমস্ত সেনাছাউনি। সেখানে এখন ভারতীয় সিপাহীদের সুশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ। সেখান থেকে ফিরতি টেলিগ্রাফে খবর পেয়ে নেপালের প্রধানমন্ত্রী জং বাহাদুর রানা কলকাতা বন্দরে এক বিরাট অভ্যর্থনা বাহিনী নিয়ে অপেক্ষা করছেন বাদশাহ এবং তাঁর ঘোষিত ভারতীয় গণরাজ্যের প্রথম প্রধান উজির মণিকর্ণিকা তাম্বে বা লক্ষ্মীবাইয়ের জন্য। অপেক্ষা করছেন স্বাধীন ভারতবর্ষের অংশ হিসেবে নেপালের সংযোজনের চুক্তিপত্র নিয়ে। ইংরেজদের ভূতপূর্ব কলকাতার দুর্গে সে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করবেন জং বাহাদুর এবং হিন্দুস্তানের বাদশাহের প্রতিনিধি, পেশোয়া ধুণ্ডু পন্ত উর্ফ নানাসাহেব।

    বিকেল পড়ে আসছিল। সেদিন সন্ধ্যার মুখমুখ জাহাজ পৌঁছাবে ওই ডায়মন্ডহারবার স্যান্ড হেডে। সেদিকে চোখ রেখে রেলিং-এর ধারে দাঁড়িয়েছিলেন মণিকর্ণিকা। তখন কেউ এসে তাঁর পেছনে দাঁড়াল।

    তারপর একটা হাত এসে সস্নেহে হাতটা ধরল তাঁর। বড়ো আদরে হাতটিতে হালকা চাপ দিয়ে নিজের হাতটা সরিয়ে নিলেন মণিকর্ণিকা। তারপর নীচুগলায় বললেন, “এ-জন্মে নয় গো। বড়ো করলে, শিক্ষা দিলে, ভালোবাসা দিলে, স্বপ্নও দেখালে অনেক। আর তারপর যেদিন আমারই মঙ্গল চেয়ে বিঠুরের বিবাহমণ্ডপে আমাকে অন্যের হাতে তুলে দিলে, এ-জন্মের মত সেই স্বপ্নকে সেদিনই তো মুছে ফেলেছিলাম বুক থেকে।

    “তবে পরজন্ম তো আছে গো। ফের যদি কখনো আমরা এদেশের বুকে জন্ম নিই, হয়তো সেদিন…”

    দূরে, স্বাধীন ভারতবর্ষের তটরেখা চোখে পড়ছিল।

    সময়ের প্রতিটি ধারাকে আমি দেখতে পাই। তার একেক বাঁকেতোমাদের এই দেশ একেক নিয়তির দিকে এগিয়ে যায়। অজস্র নিয়তি তার, ভয়াল, সুন্দর, যন্ত্রণার, আনন্দের… তোমরা যারা সময়ের একটি রেখাতেই বন্দি, তারা , সবচেয়ে অন্ধকার দিনেও মনে রেখো, সামনের বাঁকে ঠিক পথটা বেছে নিতে পারলে, ফের কোনো আলোকিত ভারতবর্ষের পথে হেঁটে যেতে পারো। যেমন এই সমান্তরালে হেঁটে গিয়েছিল দুই অমর বীর, নানাহাসেব ও মণিকর্ণিকা তাম্বে।
    .

    অলঙ্করণ- আশীষ ভট্টাচার্য । শারদীয় অরণ্যমন পত্রিকায় লেখাটির সঙ্গে প্রকাশিত। প্রকাশকের অনুমতিক্রমে ব্যবহৃত।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleনিমফুলের মধু – অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    Next Article পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ১ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026
    Our Picks

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026

    বৈদ্যুতিক চুল্লি – শঙ্কর চ্যাটার্জী

    April 27, 2026

    সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – মিহির সেনগুপ্ত

    April 27, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }