অথ চিত্রকর কথা – রাজা ভট্টাচার্য
প্রায় অর্ধেক পৃথিবী অতিক্রম করে এখানে পৌঁছতে হয়েছে তাঁকে৷ অজস্র বিচিত্র স্থানে, অগুন্তি বিচিত্রতর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছে স্বভাবতই। তৎসত্ত্বেও তিনি মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হলেন— এই মুহূর্তে তিনি মনের গহীনে যে উত্তেজনা বোধ করছেন, তা এর আগে কখনও হয়নি।
১৯৪১ সালের ১৬’ই জানুয়ারি এলগিন রোডের বাড়ি থেকে যে কালো রঙের ওয়ান্ডারার সেডান গাড়িটায় চড়ে সুভাষ রওনা দিয়েছিলেন, সেটাও একটা জার্মান কোম্পানির গাড়িই ছিল। কথাটা মনে পড়ে সূক্ষ্ম হাসির রেখা মুহূর্তের জন্য খেলা করে গেল তাঁর মুখে। সেই মধ্যরাত্রের যাত্রাপথ যে শেষমেশ জার্মানিতে এসে পৌঁছবে, সেদিন তা কষ্টকল্পনা বলেই মনে হচ্ছিল বটে। আর আজ পাঁচ মাস হয়ে গেল তিনি জার্মানিতেই রয়েছেন। ঝড়ের বেগে ছুটে বেরিয়েছেন এই দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে৷ বিশ্বযুদ্ধের আগুন ঝলসে দিচ্ছে গোটা পৃথিবীকে। সেই আগুনেই স্বদেশের হাতের বন্ধনরজ্জুটা পুড়িয়ে ছাই করে ফেলতে হবে, এই সুযোগ ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু তার জন্য যে মানুষটার নাগাল পাওয়া অসম্ভব জরুরি ছিল— এতদিন তিনিই ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। আজ, অবশেষে, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হতে চলেছে৷ সুভাষ আবার অভ্যস্ত ভঙ্গিতে টাইয়ের নটটা ঠিক করে সামনের দেওয়ালে চোখ রাখলেন।
প্রায় দেওয়াল-জোড়া দু’টো মানচিত্র। একটা এশিয়া আর ইউরোপের। ছোটখাটো অজস্র চিহ্ন দেখলে বোঝা যায়, উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক চলাকালীন এই ম্যাপটা বারংবার মার্কার এবং অন্যান্য আক্রমণের শিকার হয়। অন্যটা যুদ্ধক্ষেত্রের জীবন্ত মানচিত্র; অর্থাৎ যেসব জায়গায় জার্মানি এই মুহূর্তে যুদ্ধ করে চলেছে, সেইসব ‘ওয়ার-ফ্রন্ট’-এর মানচিত্র।
মানচিত্র দেখে প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুভাষের মনে পড়ে গেল তাঁর দেশত্যাগের অবিশ্বাস্য বৃত্তান্ত, যেন ম্যাপের মধ্যে আঁকা আছে তাঁর অর্ধেক পৃথিবী অতিক্রম করার রাস্তাটাও৷ মধ্যরাতের সেই গৃহত্যাগ, গোমো স্টেশন, দিল্লি, পেশোয়ার। তারপর কাবুলের আটচল্লিশ দিনের গুপ্তবাস। সেখান থেকে সমরকন্দ, ইতিহাসের শহরে পৌঁছে দিয়েছিল ইতিহাসের পথ৷ সমরকন্দ থেকে বিমানে মস্কো৷ বার্লিন পৌঁছলেন মার্চ মাসে। এখন অগাস্ট চলছে৷ এর মধ্যে দু’বার সাক্ষাৎকারের সময় স্থির হয়েও বাতিল হয়েছে। স্বাভাবিক! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভরকেন্দ্র এই মানুষটির সাক্ষাৎ পাওয়া বরাবরই কঠিন ছিল, সম্প্রতি প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেশ কিছুক্ষণ বসে আছেন সুভাষ। বাড়িতে থাকলে দিনে কুড়ি-ত্রিশ কাপ চা খাওয়া অভ্যাস তাঁর৷ এখন আবার চা খাওয়ার জন্য উশখুশ করছেন তিনি। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে চা চাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। রাজনীতির উচ্চতম ক্ষেত্রটি তাঁর ইতিমধ্যেই চেনা হয়ে গেছে, এখানকার আদবকায়দাও এখন তাঁর পরিচিত। হাঁটুর উপরে হাত দুটি রেখে সোজা হয়ে বসে রইলেন সুভাষ।
আচমকা উল্টোদিকের বন্ধ দরজাটি খুলে গেল। বেশ কয়েকজন জার্মান প্রবেশ করলেন একসঙ্গে। ছোট ঘরটি এবার প্রায় ভরে উঠল। এবং, আগত জার্মানদের মধ্যমণি যে মানুষটি, তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্বের প্রভাবে এমনিতেই যেন ভরে গেল গোটা ঘরটা। সামরিক স্যুট পরিহিত, দৃঢ় ওষ্ঠের রেখা এবং নীলাভ তীক্ষ্ণ দুটি চোখ— সম্মোহক উপস্থিতি একেই বলে। অন্যদের পেরিয়ে সুভাষের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন তিনি, এবং সুভাষ বুঝতে পারলেন, সাধারণ জার্মানদের তুলনায় মানুষটি ঈষৎ খর্বকায়; ইনি সুভাষের প্রায় সমান উচ্চতার মানুষ৷ উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে হাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি, করমর্দন করতে করতে বললেন, “ওয়েলকাম টু কাভিস চেক নেজ, মিঃ বোস!”
সুভাষ প্রত্যাভিবাদন জানালেন ইংরেজিতেই, “ধন্যবাদ, হের ফ্যুহরার। জার্মানি যেভাবে ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রামে পাশে দাঁড়িয়েছে, তার জন্য আমরা, ভারতীয়রা, চিরকৃতজ্ঞ থাকব।”
এই সাক্ষাৎকারটির আয়োজন করতে অসম্ভব পরিশ্রম করেছেন রিবেনট্রপ— জার্মানির বর্তমান বিদেশমন্ত্রী। বার্লিনে যে দুই মহারথীর সাক্ষাৎ প্রায় অসম্ভব, তা বুঝেই শেষ পর্যন্ত এখানে, এই সামরিক ঘাঁটিতে ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। বোসের চৌম্বক আকর্ষণ ইতিমধ্যেই জার্মানিতে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষদের চোখে নতুন স্বপ্ন জ্বালিয়ে দিয়েছে; এমনকি প্রকৃত আর্যরক্তের বিশুদ্ধতায় বিশ্বাসী জার্মানরা পর্যন্ত এই মানুষটির আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় অভিভূত। রিবেনট্রপ তাই মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন শেষবারের মতো। তাতেই আজকের এই মহামিলন সম্ভব হল। এই মুহূর্তে মুখোমুখি হয়েছেন বর্তমান পৃথিবীর সর্বাধিক আলোচিত দুই মানুষ; বৃটেনের দুই সর্বাপেক্ষা বিপজ্জনক শত্রু।
অ্যাডলফ হিটলার এবং সুভাষচন্দ্র বসু পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছেন অবশেষে।
কূটনৈতিক প্রথা অনুযায়ী কোনও রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার সময় তাঁর জন্য কোনও উপহার নিয়ে যাওয়াই রীতি। আজকের এই বিশেষ সাক্ষাৎকারের আগে অবশ্য সুভাষচন্দ্র অসম্ভব দ্বিধার মধ্যে ছিলেন— কী নিয়ে যাওয়া যায়? কী উপহার দেওয়া যায় জার্মানির সর্বাধিনায়ককে? প্রথমে ভেবেছিলেন, কোনও বিরল বই নিয়ে যাবেন। কিন্তু এ’কথা সর্বজনবিদিত— হিটলার কেবলমাত্র সেইসব বই পড়েন, যা তাঁর মতাদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। অন্য কিছুই তাঁর পড়ার তালিকায় থাকে না। তেমন কোনও বই হিটলারের হাতে তুলে দেবার বিন্দুমাত্র বাসনা ছিল না সুভাষের। সুতরাং বিস্তর ভাবনা-চিন্তা করে আজকের বিশেষ দিনটির জন্য বিশেষ উপহার নির্বাচন করেছেন তিনি। উষ্ণ করমর্দন শেষ করার পর সেই ছোট্ট উপহারটি তিনি তুলে দিলেন ফ্যুহরারের হাতে।
ক্ষুদ্রাকার, কিন্তু অসম্ভব নিখুঁত বুদ্ধমূর্তিটির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন হিটলার। তাঁর দৃষ্টি থেকেই সুভাষ বুঝতে পারলেন, হিটলার বুঝতে পারছেন না— এটি কার মূর্তি। অসম্ভব বিস্মিত হয়ে হিটলারের মুখের দিকে তাকালেন সুভাষ।
তাঁর ধারণা ছিল, ধ্যানমগ্ন তথাগতকে সমস্ত বিশ্ব দৃষ্টিপাত করা মাত্র চিনতে পারবে।
ইনি সত্যিই আলাদা। যতটা আলাদা হলে ভালো হত, তার চাইতে অনেক বেশি আলাদা।
বহু কষ্টে। অহিংসা। ও ।করুণার ।অবতারকে ।হিটলারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর তাঁরা আসন গ্রহণ করলেন। হিটলারের পাশে বসলেন হিমলার এবং গোয়েরিং। সুভাষের পাশের সোফাটি নির্দিষ্ট করা হয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত দোভাষী স্মিটের জন্য; ফ্যুহরারের এত ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে তিনি স্পষ্টত বিব্রত হয়ে পড়েছেন, ক্রমাগত হাতে হাত ঘষে চলেছেন। রিবেনট্রপ আসন নিয়েছেন মাঝামাঝি একটি সোফায়৷
কিছুক্ষণের জন্য সুসজ্জিত ঘরটিতে নেমে এল অস্বস্তিকর নীরবতা, যেন প্রত্যেকেই আশা করছেন— অন্য কেউ আলোচনার সূত্রপাত ঘটাক। শেষ পর্যন্ত অবশ্য নীরবতা ভঙ্গ করলেন হিটলার নিজেই। কথাবার্তা শুরু হল ইউরোপীয় ঘরানায়; বার্লিনের বর্তমান আবহাওয়া, জার্মান ধ্রুপদী সঙ্গীত ইত্যাদি বিষয়ে মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে। সুভাষ ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে রইলেন। হিটলার মুল বিষয়ে যাওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে ভদ্রতাসূচক কথাবার্তা সেরে নিচ্ছেন মাত্র।
প্রত্যাশা অনুযায়ী এইবার মূল বিষয়ে এলেন হিটলার। একটি সরু লাঠির সাহায্যে দেওয়ালে ঝোলানো মানচিত্রটির দিকে সুভাষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বললেন, “দেখতেই পাচ্ছেন, হের বোস— ভারত থেকে জার্মানি কত দূরে অবস্থিত। তাছাড়া আমরা এই মুহূর্তে ইউরোপ ফ্রন্টের যুদ্ধ-পরিস্থিতি সামলাতে ব্যস্ত হয়ে আছি। সুদূর ভারতবর্ষে গিয়ে তার জনসাধারণকে স্বাধীনতা যুদ্ধে সামরিক সাহায্য প্রদান করা খুব একটা বাস্তবোচিত আশা বলে মনে হচ্ছে না। তবে হ্যাঁ…”—বলতে বলতে তাঁর হাতের লাঠিটা সরে গেল ভারতের পূর্ব-সীমান্তের দিকে, “জাপান যদি ভারতকে সামরিক সাহায্য দিতে রাজি থাকে, তাহলে এই দূরত্বের সমস্যাটা মিটিয়ে ফেলা যায় বটে!”
নীরবে মাথা নাড়লেন সুভাষচন্দ্র। হিটলার ঠিকই বলেছেন। এশিয়ায় ইংরেজির স্বাভাবিক শত্রু জাপান। জার্মানি সত্যিই বহুদূরে।
“জাপানের রাষ্ট্রদূত ওশিমা খুব শীঘ্রই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন, “ বলে চললেন হিটলার। তাঁর কালো চোখে এই মুহূর্তে ঝলসে উঠছে তীক্ষ্ণ রণপাণ্ডিত্য, “আমি তাঁকে অবশ্যই অনুরোধ করব এই বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য। কিন্তু তার জন্য আপনাকে জাপানে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে আমি আপনাকে পরামর্শ দেব আকাশপথের বদলে জলপথে যাওয়ার জন্য। দুটিতেই অবশ্য অসম্ভব ঝুঁকি আছে। কাজেই যাত্রার পরিকল্পনা করার আগে আমি আপনাকে বারবার সাবধান করে দিচ্ছি— খুব ভালোভাবে বিবেচনা করে তবেই পদক্ষেপ নেবেন।”
সর্বাধিনায়ক নিজে থেকে কিছু বলতে না-বললে তাঁর সামনে কথা বলার প্রশ্নই ওঠে না। হিমলার এবং গোয়েরিং এতক্ষণ তাই নীরবতা পালন করছিলেন। কিন্তু এই শেষ কথাগুলির মধ্যে এমন এক ধরনের ব্যক্তিগত স্পর্শ ঘনিয়ে এল, যা হিটলারের পক্ষে প্রায় অবিশ্বাস্য বললেই হয়। অসম্ভব বিস্মিত হয়ে দৃষ্টি-বিনিময় করলেন হিটলারের দুই নিকটতম পারিষদ। আজ যেন হিটলারের কথায় অন্যরকম এক মননের স্পর্শ পাওয়া যাচ্ছে!
পরক্ষণেই অবশ্য নিজেকে সামলে নিলেন হিটলার। যাঁর বক্তৃতা একটা গোটা দেশকে উন্মাদ করে দিয়েছে, তাঁর পক্ষে এই রকম চিত্তদৌর্বল্য প্রকাশ করা যে শোভা পায় না, তা তাঁর চেয়ে ভালো করে আর কেই-বা জানে! অপ্রতিভ ভঙ্গিতে নিজের প্রিয় টুথব্রাশ মুশটাশের উপর দিয়ে তর্জনী ও বুড়ো আঙুলটা বুলিয়ে নিয়ে তিনি বললেন, “ইতালির পাইলটরা খুবই উচ্চমানের, সন্দেহ নেই। কিন্তু ব্রিটিশ-অধিকৃত এলাকাগুলোর উপর দিয়ে উড়ে যাবার সময় যদি মিত্রশক্তির অ্যান্টি-এয়ারক্রাফ্ট গান আপনার বিমানের নাগাল পেয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। আপনার নিরাপত্তা এই মুহূর্তে ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে সর্বাধিক প্রয়োজনীয় বিষয়— ভুলবেন না।”
এবার স্বয়ং সুভাষচন্দ্র বিস্মিত চোখে তাকালেন হিটলারের দিকে। আজ হিটলারকে অন্য একজন মানুষ বলে মনে হচ্ছে। শোনা যায়, নাৎসি বাহিনীর সর্বাধিনায়কের অনেকগুলি ডামি রয়েছে, যাঁরা হুবহু হিটলারের মত দেখতে এবং স্বয়ং ফ্যুহরারের আচরণ এবং কথাবার্তা হুবহু নকল করে যেতে পারেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ইনি তাঁদের মধ্যে কেউ নন তো?
হিটলার এই অস্বস্তি স্পষ্টভাবেই উপলব্ধি করতে পারলেন। হঠাৎ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন “বোস, অনুগ্রহ করে আমার সঙ্গে একটু এই পাশের ঘরের দিকে আসবেন? আমার কিছু ব্যক্তিগত কথা আছে।”
ক্রমাগত গুপ্তহত্যার ভীতি হিটলারের নিরাপত্তাকে প্রায় অভেদ্য বলয়ে পরিণত করতে বাধ্য করেছে বহুকাল আগেই। তিনি নিজেও অত্যন্ত সাবধানে থাকতে বাধ্য হন। একজন প্রায় অপরিচিত ভারতীয় নেতার সঙ্গে হিটলার একান্তে কথা বলতে চাইছেন— পরিস্থিতির এই অভিঘাত ফ্যুহরারের পার্ষদদের বাকরোধ করে দিল।
নিজের সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন হিটলার। তাঁর স্বভাবতীক্ষ্ণ চোখে আজ যেন ব্ল্যাক ফরেস্টের ছায়াপাত ঘটেছে। ঈষৎ অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে জার্মান ভাষায় তিনি বললেন, “আপনারা কথাবার্তা বলুন। আমাদের কিছুক্ষণের জন্য একান্তে কথা বলতে দিন। আসুন, হের বোস!” বলে হাত তুলে আসতে অনুরোধ করলেন।
তাঁকে অনুসরণ করে সুভাষ ঢুকে পড়লেন পাশের ঘরটায়। বুঝতে পারলেন, তাঁর পেছনে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল নিঃশব্দে। সম্ভবত এই ঘরটা হিটলারের ব্যক্তিগত অফিস, অন্যদের এখানে প্রবেশাধিকার নেই।
ঘরটার পিছনের দেওয়ালে যে আরও একটা দরজা আছে, তা বলে না-দিলে বোঝার উপায় নেই। নিঃশব্দে সেই গুপ্ত-দরজাটি খুলে ধরে হিটলার বললেন, “প্লিজ, হের বোস, আফটার ইউ।”
গোপন কক্ষটিতে ঢুকে সুভাষচন্দ্র আক্ষরিক অর্থেই স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
এটি পারিভাষিক অর্থে একটি অ্যান্টিচেম্বার, কিন্তু হিটলারের নিজস্ব অফিসঘরের সংলগ্ন এই ঘরটির অস্তিত্ব স্পষ্টতই অন্যদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছে। এবং এই গোপনীয়তার কারণ কী, তা বুঝতে সুভাষচন্দ্রের এক মুহূর্তও দেরি হল না।
ঘরটির সর্বত্র এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে ছবি আঁকার সরঞ্জাম, রঙ-তুলি-প্যালেট-ক্যানভাস ইত্যাদি; এবং সবকটি দেওয়ালে ঝুলে আছে ছবি। একটি ছবিতেও শিল্পীর স্বাক্ষর নেই। কিন্তু সুভাষের বুঝতে অসুবিধা হল না— এই অজস্র শিল্পকর্মের চিত্রকর কে।
পাশে দাঁড়িয়ে-থাকা মানুষটির দিকে আড়চোখে তাকালেন সুভাষ। কেবল কথা বলে যে মানুষটি একটা প্রাচীন সুসভ্য জাতিকে উন্মাদনার উত্তুঙ্গতম, ভ্রান্ততম শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন, এখন তিনি কোমল স্বপ্নময় চোখে তাকিয়ে আছেন তাঁর শেষতম ছবিটির দিকে। ভালো করে তাকালে বোঝা যায়— সেটি অসম্পূর্ণ; রঙ লাগানোর কাজ এখনও শেষ হয়নি।
গাঢ় স্বরে হিটলার বললেন, “আমার গোপন স্বপ্নরাজ্যে আপনাকে স্বাগত জানাই, হের বোস!”
২
“ছবি আঁকা আমার আযৌবন স্বপ্ন। বস্তুত, জীবনে যদি কখনও দুটি স্বপ্ন দেখে থাকি, তাহলে তার একটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ঘটে-যাওয়া জার্মানির অপমানের প্রতিশোধ নেওয়া, অপরটি— একজন চিত্রকর হয়ে ওঠা৷ নিয়তি আমাকে সম্পূর্ণ ভিন্নপথে চালনা করে না-দিলে আজ নিও-ক্ল্যাসিসিজম ধারার অন্যতম প্রধান শিল্পী হয়ে ওঠার কথা ছিল আমার।”
“আমি জানি, হের ফ্যুহরার! অন্য সকলের মতো আমিও ‘মেইন কাম্ফ’ বইটি পড়েছি।” বললেন সুভাষচন্দ্র।
এই ঘরটিতে কোনও জানলা নেই। মাথার উপর জ্বলছে একটিমাত্র মৃদু হলুদ আলো। ক্যানভাসের উপর ঝুলে-থাকা আলোটি বর্তমানে নিভিয়ে রাখা আছে৷ একটি সোফার উপর থেকে স্তূপীকৃত কাগজ সরিয়ে দুটি মানুষের বসার মতো জায়গা উদ্ধার করা হয়েছে, সেখানেই বসেছেন হিটলার ও সুভাষচন্দ্র। নিষ্প্রভ হলদে আলোয় প্রবল ব্যক্তিত্ববান মানুষটিকে এখন অন্যরকম দেখাচ্ছে। মুখের প্রখর রেখাগুলি যেন মন্ত্রবলে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। দৃষ্টি কোমল, কণ্ঠস্বর থেকে স্মৃতিমেদুরতা ঝরে পড়ছে৷
“তাহলে আপনি এ’কথাও জানেন— আমার ব্যক্তিত্বের অধিকাংশই গড়ে উঠেছিল বাবার সঙ্গে আমার অহর্নিশ ক্রমাগত লড়াইয়ের ফল হিসেবে। প্রবল ব্যক্তিত্ববান পুরুষ ছিলেন তিনি, অন্যের মত মেনে নেওয়া তাঁর ধাতে ছিল না। শুধু আমার উপর মতামত চাপিয়ে দেওয়ার সময় তিনি ভুলে যেতেন, আমিও তাঁরই সন্তান। তাঁর মতোই জেদি, একরোখা। বাবার হাতে মার খাওয়া, আর তা আটকানোর চেষ্টায় মায়ের ব্যর্থ হওয়া— এই আমার শৈশবের স্মৃতি।”
একটি ক্ষুণ্ণ নিঃশ্বাস ফেললেন সুভাষ। বিধ্বস্ত শৈশব প্রায়শ বিপথগামী মানুষই সৃষ্টি করে৷ ইউরোপীয় ইহুদিদের উপর যে নির্বিচার এবং নির্বিকার অত্যাচার শুরু করেছেন ইনি, তার বীজ উপ্ত হয়েছিল এঁর শৈশবেই।
“কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল, সেই জঘন্য দিনগুলোতে, যখন আমি নিছক বাবার মতের বিরুদ্ধে যাওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে পড়াশুনো করতাম না, তখনও আমার একটা স্থায়ী প্রেম ছিল। উহুঁ! কোনও নারী নয়! শিল্প! সুর এবং ছবি আমাকে আশৈশব সম্মোহিত করে রেখেছে৷ খাঁটি জার্মান রক্তের বিশুদ্ধতা যেমন প্রমাণিত সত্য, ইহুদিদের…বা ধরো কমিউনিস্টদের বর্বরতা যেমন প্রমাণিত সত্য, তেমনই এটাও সত্য— একজন মানুষ এই দুটির প্রেমে পড়তে বাধ্য! নইলে বুঝতে হবে, তাঁর মনুষ্যত্ব সম্পূর্ণ হয়নি।”
এত আশ্চর্য হওয়ার অভিজ্ঞতা সুভাষচন্দ্রের পর্যন্ত খুব বেশি হয়নি। তিনি স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন হিটলারের দিকে৷ ঘৃণার রাজনীতি আর প্রেমের কথকতা কীভাবে একই বাক্যে ঠাঁই পেয়ে যায় অবলীলায়!
“শেষমেশ লিঞ্জ থেকে ভিয়েনায় চলে এলাম আমি। বাবার স্বপ্ন ছিল, আমি তাঁর মতোই সরকারি কর্মচারী হব; তাঁর মতোই কাস্টমসে চাকরি করব, সমাজে মান্যগণ্য মানুষ হিসেবে পরিচিতি হবে আমার৷ এদিকে আমার ভাললাগত সুর আর ছবি! স্কুলের দিনগুলোতে চার্চের কয়্যারে গান গাইতাম আমি, স্বপ্ন দেখতাম— বড়ো হয়ে যাজক হব৷ কিন্তু এই সময়— আমার তখন মাত্র এগারো বছর বয়েস— এডমন্ড মারা গেল৷ আমার ছোট ভাই। বড্ড ভালবাসতাম তাকে৷ বাবার জেদ আর ভাইয়ের মৃত্যু, দুইয়ে মিলে আমাকে।। ধ্বংস ।করে দিল, ।জানেন! খিটখিটে, ।।আত্মবিশ্বাসহীন, বদমেজাজি একটা বাচ্চায় পরিণত হলাম আমি।
“আঠেরো বছর বয়েসে স্কুলের পাট চুকিয়ে চলে এলাম ভিয়েনায়! ভিয়েনা— তখনকার চিত্রশিল্পের রাজধানী— আমার স্বপ্নরাজ্য! সেকালে যারা শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখত, তাদের একটাই গন্তব্য ছিল। ভিয়েনার অকাডেমি অফ ফাইন আর্টস। ভর্তি হওয়ার জন্য পরীক্ষা দিলাম।
“পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছিল না৷ আমি জানতাম, পাশ করবই আমি, কার সাধ্য আমাকে ফিরিয়ে দেয়! চমৎকার আঁকছি তখন, আর লিখিত পরীক্ষা তো আমার কাছে তুচ্ছ! শুক্রবার পরীক্ষার চিঠি এল, মনে আছে এখনও৷ সোমবার পরীক্ষা। শনি-রোববারে সারাদিন বসে গুছিয়ে ফেললাম সেই ছবিগুলো, যা পরীক্ষকদের চোখ ধাঁধিয়ে দেবে অনায়াসে!
“জনা কুড়ি পরীক্ষার্থীর সঙ্গে আমিও বসলাম পরীক্ষায়। চারদিন ধরে চলল পরীক্ষা। নিজেকে উজাড় করে ছবি এঁকেছিলাম আমি। বাইবেলের কোনও প্রসিদ্ধ ঘটনা আঁকতে বলা হয়েছিল আমাকে। আঁকলাম তাই।
“এবং আমাকে ফেল করিয়ে দিলেন পরীক্ষকেরা। জানানো হল— আমার ছবি নাকি তাঁদের ‘সন্তুষ্ট’ করতে পারেনি। ছবিতে নাকি উষ্ণতা নেই, মানুষ বড্ড কম। পঞ্চাশ শতাংশের বেশি সাবজেক্টে আমার পাশ নম্বরটুকুও ওঠেনি।
“বিশ্বাসই করতে পারলাম না প্রথমে। এরকম হতেই পারে না— এটাই মনে হচ্ছিল সারাক্ষণ। জেদ চেপে গেল আমার। আবার পরীক্ষা নেওয়ার জন্য আবেদন জানালাম। দিলাম আবার! এবার আরও কড়া আর দ্বিধাহীন ভাষায় অকাদেমি আমাকে জানিয়ে দিল— এবার তো নয়ই, ভবিষ্যতেও তারা আমাকে ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক নয়।
“ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিলাম আমি। দাবি জানালাম— কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যেন কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয় আমাকে। দরখাস্ত মঞ্জুর হল। রেক্টরের সঙ্গে দেখা করলাম আমি। খাঁটি জার্মান সৌজন্যবোধের সঙ্গে শীতল এবং মোলায়েম ভাষায় ওই একই কথা আবার জানালেন তিনি— প্রাণের স্পর্শ নাকি বড্ড কম আমার আঁকায়। তবে হ্যাঁ, একটা ইতিবাচক কথা অবশ্য শুনতে পেলাম তাঁর মুখ থেকে। তবে পরে শুনেছি, তাঁর নাকি আসলে আমার অবস্থার কথা জানতে পেরে মায়া হয়েছিল।”
“অবস্থা মানে? কীসের অবস্থা?” জিজ্ঞাসা করলেন সুভাষ। যে কারণেই হোক, ইনি আজ কথা বলতে চাইছেন। সেইসব কথাও, যা ইনি আত্মজীবনীতে লেখেননি। যাঁর অনন্ত উচ্চাশা অর্ধেক পৃথিবীতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, আজ কথা বলছেন স্মৃতিমধুর কণ্ঠে।
“তখনকার অবস্থা? আজ ভাবলে অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়।” খুব সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠল হিটলারের বিচিত্র গোঁফজোড়ার নিচে, “ভিয়েনায় এসে পৌঁছেছিলাম পকেটে একেবারে গোনাগুনতি কয়েক টাকা নিয়ে। ভাল কোথাও ভাড়া থাকার প্রশ্নই ওঠে না। খবরের কাগজ খুঁজে যথাসম্ভব কম ভাড়ায় একটা ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম আমি। ঠান্ডা, নোংরা আর অন্ধকার একটা ঘরে থাকতাম। ঘুরে বেড়াতাম ছবির এগজিবিশনগুলোতে, বই পড়তাম উন্মাদের মতো। তারপর সেই টাকা ক’টাও ফুরিয়ে গেল। এমন অবস্থা হয়েছিল, যখন আমাকে রাত কাটাতে হয়েছে বেঘর ভবঘুরেদের আড্ডায়। পরে শুনেছি, সেই পরীক্ষকের নাকি সহানুভূতির উদ্রেক ঘটেছিল আমার এই দশার কথা জানতে পেরে। তিনি তাই আমার ছবির প্রশংসা করলেন খুব; কিন্তু বললেন— আমার উচিত ছবির জগত থেকে সরে এসে আর্কিটেকচারের দুনিয়ায় ভাগ্যপরীক্ষা করা। আমার স্বাভাবিক প্রতিভা নাকি ওটাই।” এবার বেশ স্পষ্ট করে হাসলেন ফ্যুহরার। স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার এক ধরনের তিক্ত হাসি আছে, যা ভারতে আর জার্মানিতে একইরকম দেখতে।
“সেটা করলেন না কেন? সর্বদাই তো মানুষ জানতে পারে না, তার সত্যকার প্রতিভা কোন্ বিষয়ে!” বললেন সুভাষ, “প্রিয় বিষয়টা কিন্তু সবসময় আমার স্বাভাবিক জোরের জায়গা নাও হতে পারে!”
“ঠিকই!” মাথা নাড়লেন হিটলার। আজ বিরুদ্ধতা মেনে নেওয়ার মানসিক অবস্থায় আছেন তিনি, যা তাঁর পক্ষে অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত, “কিন্তু আমার পক্ষে এটা ছিল একটা অর্থহীন প্রস্তাব। প্রথমত, ছবি আঁকা ছেড়ে দিয়ে প্রাসাদের নকশা বানানো আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল। আমার কাছে তা শিল্পীসত্তার মৃত্যুর সামিল। দ্বিতীয়ত, আর্কিটেকচার নিয়ে পড়তে হলে আমাকে ফিরে যেতে হত সেকেন্ডারি স্কুলে। ও আমার দ্বারা হত না। স্কুল ছেড়ে এসেছিলাম আমি, একটা সার্টিফিকেট পর্যন্ত ছিল না।”
“প্রস্তাবটা কিন্তু নিতান্ত মন্দ ছিল না, হের ফ্যুহরার! আপনার কিছু ছবি আমি দেখেছি। ভিয়েনার প্রখ্যাত সৌধগুলো আপনি যে দক্ষতার সঙ্গে এঁকেছেন, তা একজন পাশ-করা আর্কিটেকচারের পক্ষেও নিরতিশয় শ্লাঘার বিষয় হতে পারত।”
সবিস্ময়ে এই বিচিত্র অতিথির দৃঢ় মুখের দিকে একবার তাকালেন হিটলার। ইনি ছবির জগতে নিতান্ত অনভিজ্ঞ রবাহূত নন!
“তা হতে পারে। কিন্তু সেই বয়েসে মনে একধরনের যুক্তিহীন বিশ্বাস থাকে— আমার সিদ্ধান্ত, আমার ধারণা ভুল হতেই পারে না। আমারও তাই মনে হল। ফলে এক অদ্ভুত যুদ্ধ শুরু করলাম আমি। ভিয়েনা তখন পৃথিবীর সবচাইতে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোর অন্যতম। পর্যটকেরা এখানে আসেন, টাকা ওড়ান, ক্ষুধার্তের মতো হাঁ করে দেখতে থাকে চোখে যা-কিছু পড়ে— তার সবটাই। স্বভাবতই, সেই আশ্চর্য ভ্রমণের স্মৃতিচিহ্ন নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার একটা প্রবল ইচ্ছেও তাঁদের মনে থাকেই। আমি এই ইচ্ছেটাকেই টাকা রোজগারের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগালাম। ছোট ছোট ছবি আঁকতাম আমি; ভিয়েনায় যা-কিছু দ্রষ্টব্যস্থল ছিল— বিশেষ করে বিখ্যাত সৌধগুলোর ছবি৷ সেগুলো বিক্রি করে সামান্য পয়সা আসত পকেটে, অন্তত থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হল। এদিকে বাড়িতে মা’র কাছে, বন্ধুদের কাছে নিয়মিতভাবে চিঠি লিখে জানাতাম, আমি অকাদেমিতে চিত্রকলা নিয়ে পড়াশুনো করছি, উন্নতি হচ্ছে ঝড়ের বেগে৷ ক্রিসমাসের ঠিক আগে মা মারা গেলেন— আজ পর্যন্ত আমার একমাত্র শুভানুধ্যায়ী, আমার একমাত্র সত্যিকারের বন্ধু! মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি জেনে গিয়েছেন, আমি ভিয়েনার অকাদেমির ছাত্র।
“এই মিথ্যাচার কোন্ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, একটা ঘটনা বললেই বুঝতে পারবেন, হের বোস! কুবিৎজেক, আমার ছেলেবেলার বন্ধু, স্টুমপারগাসে-র ঘরটায় আমার সঙ্গেই থাকত এই সময়। লিঞ্জে একটা আসবাবের দোকানের কাজ ছেড়ে দিয়ে ও এসে ভর্তি হল ভিয়েনার ‘রয়াল অকাদেমি অফ মিউজিক’-এ। একদিক দিয়ে অবশ্য সুবিধা হল আমার; আগের জঘন্য ঘরটা থেকে একই বাড়ির একটা বড়ো ঘরে সরে এলাম আমরা৷ একটু কম দুর্গন্ধ ছিল এই ঘরটায়। সমস্যা হল, আমি যে অকাদেমিতে চান্সই পাইনি, সেটা স্বীকার করার মতো সাহস হল না আমার। ফলে প্রত্যেকদিন সকালে একই সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম আমরা; হেঁটে যেতাম আন্দাজ এক মাইল পথ, ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম পর্যন্ত, যেখান থেকে মিউজিক আর আর্টসের কলেজের রাস্তা আলাদা হয়ে গিয়েছে৷ তারপর বাঁদিকের রাস্তা ধরে ও ওর কলেজে চলে যেত, জানতেও পারত না, আমি যে ডানদিকের রাস্তাটা ধরতাম— তা কেবল ওকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য।
“যথারীতি ধরা পড়ে গেলাম একদিন! আমায় অবাক করে দেবে ভেবে কুবিৎজেক একদিন সটান চলে গেল অকাদেমি অফ ফাইন আর্টস-এ; এবং জানতে পারল— অ্যাডলফ হিটলার নামের কেউ সেখানে পড়ে না! ফিরে এসে চেপে ধরল আমাকে। খুব এক প্রস্থ চেঁচামেচি হল আমাদের মধ্যে, ঘামে ভিজে গেল আমার জামা৷ ভয় পেয়ে চুপ করে গেল ও।
“মুশকিল হল, মার মৃত্যুর পর অর্থনৈতিকভাবে একেবারে পঙ্গু হয়ে গেলাম আমি। ছবি আঁকা ছাড়া তো আর কিছুই পারি না! টাকা রোজগারের অন্য কোনও পথও মাথায় এল না। ফলে— ওই যে বললাম— ভিয়েনার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে পর্যটকদের কাছে ছবি বিক্রি করা আমার একমাত্র রোজগারের পথ হয়ে দাঁড়াল। তাতে খুব ভালো করে চলত না৷ নিরুপায় হয়ে মাসি জোহানাকে চিঠি লিখলাম— কিছু টাকা পাঠাও, নাহলে পড়া শেষ করতে পারব না৷ তিনি টাকা পাঠালেন কিছুদিনের মধ্যেই, এবং এরপর থেকে নিয়মিত কিছু কিছু করে টাকা পাঠিয়ে দিতেন। এতেই আমার অর্থাভাব মোটের উপর ঘুচে গেল৷ একটু ভালো একটা ঘর ভাড়া নিয়ে উঠে এলাম আমি। কুবিৎজেককে জানালামই না কিছু! ভাড়াও মেটালাম না, জিনিসপত্র নিলাম না; চলে এলাম। নতুন বাড়িতে। ছুটি। কাটিয়ে ফিরে এসে ও দেখল, আমি উধাও হয়ে গেছি!”
সুভাষ বুঝতে পারছিলেন, ফ্যুহরার কোনও কারণে আজ আরও একবার নিজের মুখোমুখি হয়ে চাইছেন। তিনি নীরবে তাকিয়ে রইলেন হিটলারের নীলাভ চোখের দিকে৷ এঁকে আজ বলতে দেওয়া যাক। দেখা যাক, আসলে কী বলতে চাইছেন ইনি।
“এই সময় ছবি আঁকার একটা নতুন দিক আমার সামনে তুলে ধরল আমার মতোই একজন ভাগ্যান্বেষী মানুষ৷ তার নামটা আমার এখনও মনে আছে। রাইনফোল্ড হ্যানিশ। একই সঙ্গে মানারহাইমের বাড়িটায় ভাড়া থাকতাম আমরা। আমি যে সারাদিন ধরে ছবি আঁকি, সেটা ও খেয়াল করেছিল। তা একদিন নিজে থেকেই এসে আলাপ করল। পরিচয় দিয়ে বলল, ও আমার সঙ্গে পার্টনারশিপে একটা ব্যাবসা করতে চায়। ভিয়েনায় নাকি বিজ্ঞাপনের রমরমা চলছে খুব। ফলে ছবির, বিশেষ করে পোস্টারের চাহিদা বেড়ে গেছে প্রচণ্ড, আর সেই কারণে আঁকিয়েদেরও। হ্যানিশের প্রস্তাবটা সহজ৷ ও বিভিন্ন স্টুডিওতে গিয়ে ঘোরাঘুরি করে অর্ডার ধরে আনবে। আমার কাজ হবে চাহিদা অনুযায়ী ছবি এঁকে দেওয়া। সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম। দুটো পয়সা তো আসবে!”
সুভাষ সামান্য অবাক হয়ে বললেন, “রাজি হয়ে গেলেন? এ তো একজন প্রকৃত শিল্পীর পক্ষে অপমৃত্যুর সামিল!”
“হ্যাঁ, কিছুটা তাই!” অনিশ্চিতভাবে মাথা নাড়লেন হিটলার, “অন্তত চিত্রশিল্পীরা তাই বলেন বটে! কিন্তু ক্ষুধার সামনে শিল্পের সম্মান কতটুকু, তা আমি এই সময়ই বুঝতে পেরেছিলাম। অবশ্য তার চাইতে অনেক, অনেক বড়ো একটা ব্যাপার ততদিনে আমাকে ধরে ফেলেছে, গ্রাস করতে শুরু করেছে অল্প অল্প করে।”
“কী রকম?” সাগ্রহে জিজ্ঞেস করলেন সুভাষ। তিনি বুঝতে পারছেন হিটলার এবার কোন্ পথে হাঁটতে চলেছেন।
“আপনি লিওপল্ড পৌশ-এর নাম শুনেছেন?”
বিড়ম্বিত মুখে মাথা নাড়লেন সুভাষ। অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে জার্মান ভাষাটি আয়ত্ত করার চেষ্টা করে চলেছেন তিনি, কিন্তু নামের ক্ষেত্রে তাঁর সেই গতি রীতিমতো থমকে গিয়েছে। অসম্ভব লম্বা লম্বা নাম এখানকার রাস্তাগুলোর, মনে রাখা প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়। মানুষের নামের বানানের ক্ষেত্রে যা লেখা হয়, তা উচ্চারিত হয় না। এই নামটি তাঁর বিপুল স্মৃতির ভাণ্ডারের কোথাও লেখা আছে বলে তিনি মনে করতে পারলেন না।
হিটলারের চোখ আবার স্মৃতিমধুর হয়ে উঠল, “টেকনিক্যাল স্কুলের দ্বিতীয় বছরে তিনি আমাদের জার্মানির রাজনৈতিক ইতিহাস পড়াতেন। অন্য ছেলেমেয়েরা একদম পছন্দ করত না বিষয়টা, তাদের নাকি বেজায় একঘেয়ে লাগত। আমি কিন্তু একেবারে বুঁদ হয়ে গেলাম জার্মানির বৈভবময় ইতিহাসের মধ্যে। জীবনে এই প্রথম প্রবল আক্ষেপ জন্মাল মনের মধ্যে— কেন আমি অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান একটা পরিবারের জন্মেছি? খাঁটি জার্মান তো নই আমি! সেই থেকেই প্রকৃত জার্মান হয়ে ওঠার সাধনা আমার জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠল।”
মনে মনে হাসলেন সুভাষ। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, এই কারণেই পরবর্তীকালে হিটলার রটনা করেছিলেন, বাভারিয়ার সিমবাখ নামের শহরে তাঁর জন্ম হয়েছে। তিনিও খাঁটি জার্মান।
“হের পৌশ আমাকে প্রথম জার্মানির ঐশ্বর্য, তার ঐতিহ্য এবং টিউটনিক জাতির শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছিলেন। সেটা ১৯০৫ সালের কথা। সেই বয়সেই আমার মগজে সেমিটিজম-বিরোধী মনোভাব প্রথম ডালপালা মেলতে আরম্ভ করে। এতদিন জানতাম রিচার্ড ওয়াগনার একজন অসামান্য সুরস্রষ্টা; মনে মনে পুজো করতাম তাঁকে। এইবার লিওপোল্ড আমাকে পড়তে দিলেন তাঁর লেখা বই। পড়লাম কান্ট, নিটশে— এইসব মহান দার্শনিকের লেখা। ক্রমশ জার্মান জাতির শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে আমার একটা স্পষ্ট ধারণা গড়ে উঠছিল।
“এখানে একটা কথা বলি, হের বোস। লিঞ্জে পৌঁছনোর আগে পর্যন্ত আমি বাস্তবে কোনও ইহুদিকে চোখেই দেখিনি। লিঞ্জের রাস্তায় যখন আমি স্কেচবুক হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম কুবিৎজেকের সঙ্গে, তখনই প্রথম আমি খেয়াল করি এদের। লিঞ্জ শহরের ইহুদিরা বেশিরভাগই ছিল ছোট ব্যবসায়ী আর মহাজন, ছোটখাটো অংকের টাকা ধার দিতে তারা। প্রথম থেকেই আমার মনে হয়েছিল, জার্মানির… আর শুধু জার্মানির কেন, সমস্ত পৃথিবীর বুকে এই অদ্ভুত মানুষগুলো যেন বেখাপ্পা, বেমানান। পৃথিবীতে যা কিছু খারাপ, সব এই লোকগুলোর হাত দিয়েই ঘটেছে, ঘটে চলেছে।”
সুভাষ বললেন, “হের ফ্যুহরার, ব্যাপারটা এমন নয় তো যে, তার আগে থেকেই যেহেতু জার্মান জাতির শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে আপনার কোন সন্দেহ ছিল না, আর প্রথম অ-জার্মান মানুষ হিসেবে আপনি ইহুদিদের দেখতে পেয়েছিলেন, ফলে অকারণেই তারা আপনার চোখে হয়ে দাঁড়াল আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু?”
সচকিতে একবার সুভাষের মুখের দিকে তাকালেন হিটলার। তাঁর নীলাভ চোখে গভীর বিস্ময়। স্পষ্টতই এই দিক দিয়ে তিনি ব্যাপারটিকে কখনো বিবেচনা করেননি। কিছুক্ষনের মধ্যেই সেই বিস্ময় অবশ্য মিলিয়ে গেল। ঘন ঘন মাথা নেড়ে তিনি বললেন, “ব্যাপারটা এত সহজ নয়, বোস! জীবনে প্রথম জার্মানিতে পৌঁছে আমি একেবারে তৎক্ষণাৎ মুখোমুখি হয়েছিলাম প্রতারণার; এবং তা করেছিল একজন ইহুদি। ঈশ্বর আমার মাধ্যমে এই জাতিটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন গোপনে।”
“কী রকম?”
“আপনি নিশ্চয়ই জানেন, ১৯১৩ সালের ২৪’শে মে অবৈধভাবে জার্মানিতে ঢুকেছিলাম আমি। ততদিনে আমার কাগজপত্র সমস্ত চুরি হয়ে গিয়েছে, সীমান্ত পার হওয়ার জন্য এগজিট পারমিট জোগাড় করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কাজেই বার্থ সার্টিফিকেট এবং অন্যান্য কাগজপত্র নতুন করে জোগাড় করতে হল আমায়। তারপর সেইসব কাগজ সম্বল করে অস্ট্রিয়া থেকে জার্মানি যাওয়ার একটা ট্রেনে উঠে পড়লাম আমি। ট্রেন যখন সীমান্ত পার হচ্ছে, অন্য যাত্রীরা তাদের কাগজপত্র দেখাতে ব্যস্ত, আমি লুকিয়ে রইলাম ট্রেনের টয়লেটে। জার্মানির আজকের সর্বাধিনায়ক লুকিয়ে ঢুকেছিলেন এই মহান দেশে— ভাবতে পারেন, বোস?” অতি বিরল এক প্রসন্ন হাসিতে ভরে গেল হিটলারের মুখ।
“আর সেই দিনই, মানে জার্মানিতে আমার প্রথম দিনেই, একজন ইহুদি আমাকে প্রতারণা করল।” বলে চললেন আজকের জার্মানির পরাক্রান্ত সর্বাধিনায়ক, “আমার পকেটে ছিল প্রায় পাঁচশ ক্রোন। স্টেশনের বাইরে এক গাদা ছোট ছোট গুমটি ছিল, যেখানে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান ক্রোনের বদলে জার্মান মার্ক দেওয়া হত। জার্মানিতে ঢোকার সময় এখানেই টাকা বদলে নিতেন পর্যটকেরা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই কাজটা করত ইহুদিরা, এবং আমি পড়ে গেলাম এরকমই একজনের পাল্লায়। মাত্র সাড়ে তিনশো মার্ক দিয়ে আমাকে সে তাড়িয়ে দিল। একটা নতুন দেশে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার শিকার হলাম আমি, এবং সেটা অনিবার্যভাবেই একজন ইহুদির হাতে! এটাকে যদি একটা দুর্লক্ষণ না-বলেন, তাহলে পৃথিবীতে ইঙ্গিত বা সঙ্কেত বলে কিছু থাকত না!”
দুঃখিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন সুভাষ। মানুষটি আবার মিথ্যাচার করছেন। মিউনিখ স্টেশনের বাইরে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের জন্য ব্যাঙ্ক ছিল। সরকারি ব্যাঙ্ক। হিটলার সেখানে না-গিয়ে গিয়েছিলেন কোনও ইহুদির কিয়স্কে, কয়েকটা অতিরিক্ত মার্কের লোভে; এবং ইহুদি ব্যবসায়ীটি স্পষ্টতই তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। সেটাকেই তিনি নিজের রাজনৈতিক প্রয়োজনে কাজে লাগিয়েছেন পরবর্তীকালে। অতি লোভে তিনি যে অবৈধ পথ নিয়েছিলেন, তা স্বীকার করার মতো সৎসাহস এখনও হিটলার অর্জন করে উঠতে পারেননি। তিনি বললেন, “কিন্তু মিউনিখে আসার আগেই তো আপনার ইহুদি-বিদ্বেষ সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা হয়ে গিয়েছিল বলেই জানি!”
“আপনি ঠিকই জানেন,” বললেন হিটলার, “আর তার জন্য ইয়োর্গ লানৎজ ফন লিবেনফেলস-এর কাছে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ হয়ে থাকব।”
“ইনিই কি ভিয়েনার সেই…”
“ঠিক তাই। বেশ কয়েক বছর আগে, 1904 সালেই ইনি নিজস্ব ধর্মমত তৈরি করে ফেলেছিলেন; নাম দিয়েছিলেন ‘টেম্পল অফ দ্য নিউ অর্ডার।’” বলে চললেন হিটলার, “ইনি সর্বসমক্ষে স্পষ্ট করে বলতেন— কেবলমাত্র নীল চক্ষুবিশিষ্ট, সোনালী চুলের শ্বেতাঙ্গরাই বিশুদ্ধ মানুষ, প্রকৃত মানুষ। তাঁর সংগঠনে তাই অন্য কোনও জাতির মানুষের— তাঁর ভাষায় ‘অবমানবের’ প্রবেশাধিকার ছিল না। তাঁর সংগঠনের কোনও সদস্য অন্য কোনও জাতির মানুষকে— তা সে কৃষ্ণাঙ্গ হতে পারে, অথবা তার চুল কালো হতে পারে— বিয়ে করতে পারত না। ‘ওস্টারা’ নামে একটা জার্নাল প্রকাশ করতেন তিনি। তারই এক কপি আমি কিনেছিলাম। তারপর পরের সংখ্যাটি। একেবারে সম্মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম এই প্রাক্তন সন্ন্যাসীর মতাদর্শে, মতপ্রকাশের স্পষ্ট ভাষায়। যেন আমি এতদিন ধরে যা মনে মনে ভেবে এসেছি, তাই ছাপার অক্ষরে পড়ছিলাম এইবার। অনেক কষ্টে সাহস সঞ্চয় করে একদিন চলে গেলাম প্রকাশনার সদরদপ্তরে। দেখা হল আমার গুরুর সঙ্গে। অবশ্য আমার চুলের রং কালো, তবু চোখের রং নীল বলে আমি সুযোগ পেয়ে গেলাম তাঁর সংগঠনের সদস্য হওয়ার।”
“এই সময় থেকেই তাহলে আপনার ইহুদি-বিদ্বেষের সূত্রপাত?”
অপ্রত্যাশিত মৃদু গলায় হিটলার বললেন, “বলতে পারেন। ভিয়েনার সেমিটিজম-বিরোধী মেয়র কার্ল লুগারের প্রভাব আমার উপরে আগেই পড়েছিল। লিবেনফেলস তাকে একটা নির্দিষ্ট আকার দিলেন। লিবেনফেলস তাঁর সভাগুলোতে স্পষ্ট করে বলতেন আর্য জাতির শ্রেষ্ঠত্বের কথা, ইহুদিদের ঘৃণ্য চরিত্রের কথা, তাদের জঘন্য ইতিহাসের কথা; আর যা সবচেয়ে জরুরি— এই জাতিটিকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার কথা। তার প্রথম পর্যায়ে থাকবে সমস্ত ইহুদিকে চিহ্নিত করে লেবার ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া, তারপর তাদের নির্বীজকরণ, এবং শেষ পর্যন্ত সামূহিক গণহত্যা!”
সুভাষের সর্বাঙ্গ একবার থরথর করে কেপে উঠল। কোনও মানুষ কীভাবে নিজের ঘৃণ্যতম পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে আরেকজন মানুষের সম্মুখে ব্যক্ত করতে পারেন, তা তাঁর ধারণার বাইরে ছিল। এতদিনে তিনি হিটলার সম্পর্কে যা জেনেছিলেন, তার চাইতে মানুষটি অনেক বেশি নিষ্ঠুর, অবিশ্বাস্য হৃদয়হীন! কারণ, এই শেষ বাক্যটি উচ্চারণ করার সময় তাঁর মুখের একটি রেখাও কেঁপে উঠল না; চোখের পলক পড়ল না। এই ঘৃণ্য পরিকল্পনা সম্পর্কে তাঁর মনে কোনও দ্বিধা নেই, । সংকোচ নেই, লেশমাত্র লজ্জার স্থান নেই সেই হৃদয়ে।
“তারপরের ইতিহাস আপনি ভালোভাবেই জানেন। কীভাবে এই ইহুদিরা জার্মানির পবিত্র ভূমিতে ঘৃণিত কমিউনিস্ট ভাবধারাকে জাগিয়ে তুলেছিল, কীভাবে তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমাদের পিঠে পিছন থেকে গোপনে ছুরিকাঘাত করেছিল— তা আজ সারা পৃথিবী জানে, মেনে নিয়েছে। সত্যি কথা বলতে গেলে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই আমি একেবারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম— পৃথিবী থেকে এই ইহুদি জাতিটিকে আমি চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেব। ইউরোপের যেখানে যে লুকিয়ে থাকবে, তাকে গোপন কোটর থেকে খুঁজে বের করে বিভীষিকাময় আগুনের মধ্যে ঠেলে দেব। আমার সমস্ত চেতনায় এই একটি প্রতিজ্ঞা আগুনের অক্ষরে লেখা হয়ে গিয়েছিল।”
এতক্ষণে সুভাষচন্দ্র খেয়াল করলেন, হিটলার ক্রমাগত অতীতকালের নিরিখে কথা বলে চলেছেন। মানে কী এর? এগুলি কি এই মানুষটির পুরোনো ধারণা? এতদিনে কি তিনি এই ঘৃণ্য পরিকল্পনা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার কোনও কারণ সংগ্রহ করতে পেরেছেন? নিশ্চিতভাবে তা জানতে হলে সুভাষকে এইবার মুখর হয়ে উঠতে হবে। হাতের আড়ালে যে তাস তিনি এতক্ষণ লুকিয়ে রেখেছিলেন, এইবার তা বের করে দেওয়ার সময় এসেছে। এক ক্রান্তিকাল আসন্ন। ঝুঁকি নিতে হবে, তার ফলাফল যদি ভয়ঙ্করতম হয়, তবুও! পৃথিবীর ইতিহাস আর তাঁর প্রিয়তম মাতৃভূমির ইতিহাস বদলে দিতে হলে সেই ঝুঁকি নিতে তিনি বাধ্য।
হিটলারের দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে মৃদুকণ্ঠে সুভাষ বললেন, “নিউমান নামের কোনও মানুষের কথা মনে পড়ে, হের ফ্যুহরার?”
সহসা যেন অদৃশ্য কাচের দেয়ালে বাধা পেয়ে হিটলারের বাক্যস্রোত বন্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ প্রখর দৃষ্টিতে সুভাষের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি বললেন, “নিউমান?”
“ঠিক তাই,” বললেন সুভাষ, “ভিয়েনার বাসিন্দা একজন পুরোনো কাপড়ের ব্যবসায়ী! মনে পড়ে তার কথা?”
মোহাচ্ছন্ন কন্ঠে হিটলার বললেন, “তার কথা আমি ভুলে যাব কী করে? যতদিন জীবন থাকবে, এই মানুষটির কথা আমি ভুলব না। তখন আমি ভিয়েনার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম। ভবঘুরেদের ডেরায় রাত কাটাতাম। প্রচণ্ড ঠান্ডায় কুঁজো হয়ে বসে থাকতাম রাস্তার পাশের বেঞ্চে। সেই সময় নিউমান এগিয়ে এসেছিল দেবদূতের মতো। তার পুরোনো কাপড়ের ঝোলা থেকে আমাকে সে বের করে দিয়েছিল একখানা সাতপুরোনো সেলাই করা ওভারকোট!”
“এবং আপনি তার দাম দিতে পারেননি।” বললেন সুভাষ।
“দাম!” মৃদু হাসলেন হিটলার, “সেই রাতে খেতে পাব কিনা, তাই জানতাম না ঠিকঠাক! হাত পেতে ভিক্ষা নেওয়ার মতো করে গ্রহণ করেছিলাম সেই দান। আজও সে-কথা ভুলিনি আমি। সেই প্রবল শীতের দিনগুলোতে ওই ছেঁড়া ওভারকোট আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিল! প্রাণদাতার নাম কেউ ভুলে যায়, বোস?”
“যে মানুষটা আপনাকে প্রাণ দান করেছিল, তার নাম আপনার মনে আছে। অথচ এ’কথা ভুলে গেলেন যে, সে জাতিতে একজন ইহুদি ছিল! আপনার স্মরণশক্তি আশ্চর্য প্রখর, হের হিটলার! ভাল করে মনে করে দেখুন, সেই মানুষটির জাতিগত পরিচয় আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে!”
ফ্যাকাশে মুখে সুভাষের দিকে তাকিয়ে ফ্যুহরার বললেন, “আছে, আছে বইকি! আপনি ঠিকই বলেছেন। সে একজন ইহুদি ছিল। দয়ালু, ভাল মনের একজন মানুষ।”
“ব্যক্তিগতভাবে একজন ইহুদির কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে আপনার আপত্তি নেই, অথচ জাতিগতভাবে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য আপনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ! এ কেমন কথা!” বিস্মিত কণ্ঠে বললেন সুভাষ।
মুহ্যমান দৃষ্টিতে সুভাষের দিকে তাকালেন হিটলার। বহু বহু বছর হয়ে গেল, এইভাবে তাঁর সঙ্গে কেউ কথা বলার সাহস পায়নি। পরাধীন দেশের এই পলাতক রাজবিদ্রোহীর স্পর্ধা কোনও কারণে আজ তাঁকে বিস্মিত করছে না, ক্রুদ্ধ করছে না। বরং মুগ্ধ করছে!
সুভাষ বললেন, “আমি বুঝতে পারছি, আজ কোনও কারণে আপনার চিন্তার জগতে একটা বিপ্লব দেখা দিয়েছে। কিন্তু সেই মহাতরঙ্গের মুখোমুখি হওয়ার সাহস পাচ্ছেন না আপনি। আমি কি ঠিক বলছি, হের হিটলার?”
খুব ধীরে ধীরে উপরে-নিচে মাথা নাড়লেন হিটলার। জার্মানির একচ্ছত্র অধিপতি, যাঁর ভীম পদচারণার নিচে এই মুহূর্তে পিষ্ট হয়ে গিয়েছে অর্ধেক ইউরোপ, স্বীকার করে নিচ্ছেন— সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সাহস তাঁর নেই!
একইরকম মোলায়েম গলায় সুভাষ বললেন, “এই মুহূর্তে এই ঘরে আর কেউ নেই, হের ফ্যুহরার! আপনি স্বচ্ছন্দে আমাকে বলতে পারেন, আজ কি এমন কিছু ঘটে গিয়েছে, যা আপনাকে এমন বিধ্বস্ত করে দিয়েছে? আমি কথা দিচ্ছি, আমাদের এই বাক্যালাপ কখনও প্রকাশ্যে আসবে না। আপনি বলুন। মনে রাখবেন, নিজের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ মানুষ জীবনে একবারই পায়।”
সত্যই বিধ্বস্ত ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে বসেছিলেন হিটলার। এলোমেলো চুল নেমে এসেছে কপালে। অভ্যাসবশত তা হাত দিয়ে ঠিক করার চেষ্টা করছেন না তিনি! তাঁর সমস্ত মুখ ঘর্মাক্ত। অশ্রুতপ্রায় স্বরে, ফিসফিস করে তিনি বললেন, “শুল্টে স্ট্রাটগাউস এসেছিল কাল দেখা করতে! বহুদিন পর সময় দিতে পারলাম ওকে৷”
বিমূঢ় দৃষ্টিতে হিটলারের দিকে তাকালেন সুভাষ। এই নামটি তাঁর পরিচিত নয়। এই মানুষটির সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে জানতে পারার পর থেকেই তীব্র অনুসন্ধিৎসায় অজস্র সন্ধান করেছেন তিনি, কথা বলেছেন অসংখ্য মানুষের সঙ্গে। কেউ কথা বলেছেন নৈর্ব্যক্তিক ভঙ্গিতে, কেউ উগরে দিয়েছেন নিজের ক্ষোভ, কেউ ব্যক্ত করেছেন নিজের মুগ্ধতা আর সম্মোহন; কেউ-বা অস্বস্তি ভরে চুপ করে থেকেছেন, তাকিয়ে থেকেছেন বাইরের ব্যস্ত রাজপথের দিকে, বোঝা গেছে উত্তর দেবার ইচ্ছা নেই তাঁর। আছে আশঙ্কা, আছে আতঙ্ক।
কিন্তু এই নামটা কার? এ নাম তো সুভাষ আগে শোনেননি!
সেই অব্যক্ত প্রশ্নের উত্তর আপাতত মুলতবি রেখে হিটলার বললেন, “জানেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ছে আজ, হয়তো দ্বিতীয়বার সেই একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি বলেই। মাথার উপর দিয়ে বুলেট উড়ে যাচ্ছে শিস দিয়ে, বোমার ধোঁয়ায় কালো হয়ে আছে দূরের আকাশ; আর আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রয়েছি দূরের কোনও গ্রাম্য কুটিরের দিকে। যে-মুহূর্তে আমার শিফট শেষ হচ্ছে, ট্রেঞ্চের মধ্যেই পা ছড়িয়ে ছবি আঁকতে বসে যাচ্ছি আমি। এঁকে রাখছি চাষীদের খামারবাড়ি, চাষের জমির ওপারে গাছের জটলা। ছবি আঁকার বিষয়, আঙ্গিক— সব বদলে যাচ্ছিল আমার! আমি ধরেই নিয়েছিলাম, এই যুদ্ধ জিতে ফিরব আমরা, জার্মানরা; তারপর যুদ্ধোত্তর শান্ত সমৃদ্ধ পিতৃভূমি আমাকে বরণ করে নেবে একজন উত্তীর্ণ চিত্রকর হিসেবে!
“অথচ আমরা হেরে গেলাম। চরম অপমান হজম করতে হল আমাদের৷ বিশ্বসভায় মাথা হেঁট হয়ে গেল জার্মানির! পৃথিবীর সেরা জাতির! এবং তার জন্য দায়ী কেবল এই ইহুদিরাই!”
তীক্ষ্ণ চোখে ফ্যুহরারের ভাবান্তর লক্ষ করে চললেন সুভাষ। আবার তাঁর বিবর্ণ মুখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে, কপালে জমেছে ঘামের ফোঁটা। খুব সম্ভবত মৃগীরোগ বা ওইজাতীয় কোনও স্নায়বিক অসুখ আছে এঁর, যা সযত্নে গোপন রাখা হয় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে।
রুমাল বের করে মুখ মুছলেন হিটলার, “এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগেও একটা ইন্টারভিউতে আমি বলেছিলাম, পোল্যান্ড নিয়ে সমস্যাটা মিটে গেলে আমি আবার ফিরে যাবো রং-তুলি আর ক্যানভাসের জগতে। পলিটিক্স আমার জন্য নয়। সত্যিই মনস্থির করে ফেলেছিলাম আমি, রাজনীতি ছেড়ে এইবার মন দেব আঁকায়। তারপর যুদ্ধ বেধে গেল। সমস্ত পৃথিবী দুভাগ হয়ে জড়িয়ে পড়ল যুদ্ধে। পিতৃভূমি যখন বিপন্ন, তখন ছবি আঁকা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ার প্রশ্ন ওঠে না; তা কাপুরুষতা মাত্র। একজন খাঁটি জার্মান কখনোই এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন না। আমিও পারিনি। কিন্তু আজ যখন শুল্টে স্ট্রাটগাউস তার রিপোর্ট নিয়ে এল, তখন সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল। সেই থেকেই আমি ভেবে চলেছি— আমি কি ভুল করলাম?”
“স্যামুয়েল মর্গানস্টার্ন?” আচমকাই বলে উঠলেন সুভাষচন্দ্র।
এমন মুহূর্তের মধ্যে যে কারো এমন অবিশ্বাস্য ভাবান্তর ঘটতে পারে, তা জানা ছিল না সুভাষের। ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ালেন হিটলার। তাঁর তীক্ষ্ণ চোখ দুটি এই মুহূর্তে বিস্ফারিত, অপার বিস্ময় নিয়ে তিনি তাকিয়ে রয়েছেন সুভাষের কোমল এবং কবিসুলভ চোখের দিকে। অন্তত এক মিনিট চুপ করে থাকার পর সম্পূর্ণ অন্যরকম এক গলায় তিনি বললেন, “এই নাম আপনি জানলেন কোত্থেকে, বোস?”
সাধারণত মুখোমুখি সাক্ষাৎকারের সময় একপক্ষ উঠে দাঁড়ালে অপর ব্যক্তিরও উঠে দাঁড়ানোই প্রথা। সুভাষ উঠলেন না। শান্ত মুখে হিটলারের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “স্যামুয়েল মর্গানস্টার্ন! অস্ট্রিয়ান একজন ব্যবসায়ী, যদিও জন্মগতভাবে হাঙ্গেরির মানুষ। আপনি যখন ভিয়েনায় ছিলেন, তখন তিনিই আপনার ছবিগুলো কিনে নিয়ে সেগুলোর বিক্রির বন্দোবস্ত করেছিলেন। ডক্টর জোসেফ ফিনগোল্ড নামের এক ভদ্রলোক এবং তাঁর স্ত্রী এঁর কাছ থেকে আপনার আঁকা বেশ কয়েকটি ছবি কিনে নিয়ে গিয়ে নিজের আপিসে সাজিয়ে রেখেছিলেন। স্যামুয়েল আপনাকে আপনার আশাতিরিক্ত অর্থ দিয়েছিলেন ছবিগুলোর বিনিময়ে।”
শূন্য দৃষ্টিতে ভারত থেকে আসা এই অদ্ভুত মানুষটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন হিটলার। ভারতে নাকি সকলেই জাদুকর। ইনিও কি তাই?
“বলতে গেলে একজন চিত্রকর হিসেবে আপনার জীবনের একমাত্র অর্থনৈতিক সাফল্য আপনাকে উপহার দিয়েছিলেন স্যামুয়েল। শুধু অর্থনৈতিক সাফল্যই নয়, তার চাইতেও বেশি করে একজন শিল্পী যা প্রত্যাশা করেন পৃথিবীর কাছ থেকে, স্যামুয়েল আপনাকে সেটাই দিয়েছিলেন। স্বীকৃতি। শিল্পী হিসেবে, একজন প্রকৃত চিত্রকর হিসেবে স্বীকৃতি। আপনার স্বপ্ন এই একবারই সাফল্যের দোরগোড়ায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আন্দাজ করতে পারছি, আপনার ছবিগুলো খুঁজে বের করার কাজে নিযুক্ত কর্মচারী শুল্টে স্ট্রাটগাউস এই কথাগুলোই আপনাকে বহু বছর পর অকস্মাৎ মনে করিয়ে দিয়েছে, তাই না?”
শিথিল শরীরে সোফায় বসে পড়লেন হিটলার, যেন তাঁর দেহে এই মুহূর্তে কোনও শক্তি অবশিষ্ট নেই আর।
এইবার উঠে দাঁড়ালেন সুভাষ। তার ।মুখের ।কোমল রেখাগুলো ক্রমশ লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, গনগনে সূর্যের আঁচ ছড়াচ্ছে তাঁর স্বপ্নদর্শী চোখ, কণ্ঠেও লেগেছে আগুনের ছোঁয়া, “হের ফ্যুহরার! আপনার কি কোনও ধারণা আছে এই স্যামুয়েল মর্গানস্টার্ন এই মুহূর্তে কোথায় আছেন? কেমন আছেন তিনি? কী অবস্থায় রয়েছে তাঁর পরিবার?”
মাথা নাড়লেন হিটলার। এই সংবাদ তাঁর জানা নেই।
“আপনি কি জানেন, ইনিও একজন ইহুদিই ছিলেন? ভিয়েনায় আপনার যে ক’টি ছবি বিক্রি হয়েছিল, তার অধিকাংশই কিনে নিয়েছিলেন ইহুদিরা? আপনার তথাকথিত শত্রুরা? একজন সার্থক চিত্রশিল্পী হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন আপনি। একজন সত্যিকারের চিত্রকর। আর আপনার ছবির প্রকৃত কদর করেছিল এই ইহুদিরাই, আপনার মতে যারা অবমানব। সোনালী চুল নীল চোখের জার্মানরা কখনও আপনার একটি ছবিও কেনেনি। তার প্রশংসা করেনি। আপনার শিল্পীসত্তা প্রশংসা পেয়েছিল কেবলমাত্র ইহুদিদের মধ্যেই।” ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে সুভাষের স্বাভাবিক নম্র কণ্ঠস্বর, “আর সেই ইহুদিদের আপনি এবং আপনার মতাদর্শ ঠেলে দিয়েছে নরকের আগুনে। স্বয়ং স্যামুয়েল তাঁর ব্যাবসা নামমাত্র দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন, কারণ অস্ট্রিয়ার সংযুক্তির পর তাঁর ব্যাবসাটির ‘আর্যায়ন’ বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছিল। সোজা কথায়, একজন খাঁটি আর্য মানুষের কাছে ব্যাবসাটি বিক্রি করে দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। তাঁর ব্যাবসা করার লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া হয়! একটি সচ্ছল পরিবার, প্রকৃত শিল্পী মনের অধিকারী একজন মানুষ ভ্রান্ত রাষ্ট্রীয় নীতির জন্য পথের ভিখারীতে পরিণত হয়েছিলেন! আপনার শিল্পকলার প্রথম এবং শেষ সমঝদার মানুষটি রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষে করে বেরিয়েছেন।”
“বিশ্বাস করুন, আমি কিছু জানতে পারিনি!” অদ্ভুত ফ্যাসফ্যাসে শোনাচ্ছে হিটলারের কণ্ঠস্বর।
“সর্বৈব মিথ্যা!” প্রায় হুংকার দিয়ে উঠলেন সুভাষ, “চিঠি লিখে নিজের অবস্থা আপনাকে জানিয়েছিলেন স্যামুয়েল। আপনার গোয়েন্দাবাহিনী সেই চিঠির পাশে লিখে দিয়েছিল একটি শব্দ। ‘ইহুদি।’ ফলে সেই চিঠি চলে ।গিয়েছিল আস্তাকুঁড়ে। আপনি জানার
চেষ্টা করেননি, তাই জানতে পারেননি— হের ফ্যুহরার!”
আবার রুমাল বের করে মুখ মুছে নিলেন হিটলার। এখনও তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না, পরাক্রান্ত জার্মানির সর্বাধিনায়ককে এ’রকম তীব্র ভাষায় তিরস্কার করতে পারেন কোনো পরাধীন দেশের সাধারণ একজন নাগরিক!
কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে হিটলারের পাশে এসে বসলেন সুভাষ। বললেন, “আমি একজন ভারতীয়। একদিন এই দেশ থেকেই মহামিলনের বাণী ধ্বনিত হয়েছিল সারা পৃথিবীতে। আজও আপনাকে আমি উপহার দিয়েছি তথাগত বুদ্ধের মূর্তি, যাঁর প্রচারিত অহিংসার বাণী যুগ যুগ ধরে বিশ্ববাসীকে পথ দেখাচ্ছে। হিংসা যখন শান্তির পথ, স্বাধীনতার পথ সৃজন করে, তখন তা ন্যায় বৈকি। আমিও তো যুদ্ধ করব বলেই নিশ্চিন্ত আশ্রয় ছেড়ে পথে নেমেছি! প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ঝঞ্ঝার মতো ছুটে বেড়াচ্ছি এক দেশ থেকে অন্য দেশে! কিন্তু সেই যুদ্ধ এক মহান জাতির স্বাধীনতার সংগ্রাম! এক বর্বর অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। কিন্তু যুদ্ধ যদি কেবলমাত্র নিতান্ত নিরপরাধ কিছু মানুষের নির্দয় মৃত্যুর পথ খুলে দেয়, তাহলে তা অন্যায়, চরম অন্যায়! আপনি জ্ঞানত সেই অন্যায়ের পথ নিয়েছেন। অসংখ্য মানুষ সম্পূর্ণ অকারণেই নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছে, ধ্বংস হয়ে গিয়েছে তাদের সাজানো জীবন। এই কি একজন শিল্পীর কাজ? পৃথিবীর ক্যানভাসে রক্তের রঙে এ কোন্ ছবি আপনি আঁকছেন, হের ফ্যুহরার?”
অসহায় দৃষ্টিতে এই বিচিত্র অতিথির দিকে তাকালেন হিটলার। আজ যেন বিধাতা তাঁকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন নগ্ন অবস্থায়। মৃদু গলায় তিনি বললেন, “বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে, বোস! আমি এখন বাঘের পিঠে সওয়ার হয়েছি। মাঝপথে নামার চেষ্টা করলে সেই বাঘই আমায় ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলবে।”
“আদৌ দেরি হয়ে যায়নি!” অকম্পিত স্বরে বললেন সুভাষ, “এখনও সময় আছে। অন্তত ইহুদিদের উপরে নেমে আসা এই অনর্থক বজ্রপাত রুখে দেওয়ার ক্ষমতা আপনার হাতেই আছে। এইবার সময় এসেছে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করার। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলো বন্ধ করার আদেশ দিন। ফিরিয়ে দিন ইহুদিদের সম্পত্তি, সম্মান আর নিশ্চিন্ত জীবন। সারা পৃথিবী চিরকাল সসম্মানে আপনার নাম স্মরণ করবে শান্তির দূত হিসেবে, মহাপুরুষ হিসেবে, একজন সত্যিকারের বিশ্বনেতা হিসেবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য কখনও দেরি হয়ে যায় না, হের ফ্যুহরার! আমিও তো এক প্রকার অন্যায়ের প্রতিবিধানের আশা নিয়েই আপনার দ্বারস্থ হয়েছি!”
“কিন্তু ভারতে তো ইহুদি নেই!” অবাক হয়ে বললেন হিটলার।
“আছেন বৈকি!” বললেন সুভাষ, “কিন্তু তাঁরা নিশ্চিন্তেই আছেন। তবে তাঁদের কথা নয়, আমি বলছি ভারতের পরাধীনতার কথা। আমরাও প্রকৃত আর্য জাতি। জার্মানির মতো আমাদেরও আছে এক পরাক্রান্ত অতীত, সোনালী ঐতিহ্য। ইংরেজরা ভেদনীতির মাধ্যমে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে আমাদের একতা। শতধা বিচ্ছিন্ন হয়ে, পরপদানত হয়ে, অজস্র অপমান সহ্য করে আজ আমাদের জীবন ধারণ করতে হয়। এই মহান অথচ ভূলুণ্ঠিত দেশের পাশে দাঁড়ান, হের ফ্যুহরার! এক প্রাচীন সভ্যতার উত্তরাধিকারী চল্লিশ কোটি মানুষ দু’হাত তুলে আপনার জয়ধ্বনি করবে। লক্ষ লক্ষ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার চাইতে কোটি কোটি মানুষকে স্বাধীনতার আলো দেখানো মানবতার পক্ষে অনেক বড় সাফল্য বলেই ইতিহাসে লেখা থাকবে। মানবসভ্যতার এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। আপনি সেই সন্ধিক্ষণের যুগপুরুষ হয়ে উঠতে পারেন। ইতিহাসের আহ্বান শুনতে পাচ্ছেন না আপনি? এক পরাধীন দেশের কৃষ্ণবর্ণ প্রেক্ষাপটে উজ্জ্বল আলোর ছবি এঁকে দিতে ইচ্ছে হয় না আপনার?”
স্তম্ভিত হয়ে সুভাষের আগুনের রেখায় আঁকা মুখটির দিকে তাকিয়ে রইলেন এক প্রাক্তন চিত্রকর। তাঁর মনে হল, দূর দিগন্ত থেকে যেন এক অমোঘ আহ্বান ভেসে আসছে। তা কোনও দরিদ্রের ভিক্ষার আর্তি নয়। কালের নিয়মে দুর্গত হয়ে পড়া এক মহাসভ্যতার আবাহন-ধ্বনি। বহু যুগ ধরে তা বিশ্বকে দিয়েছে অনেক কিছু— দর্শন, গণিত, সাহিত্য এবং ধর্মের ক্ষেত্রে হাজার হাজার বছর ধরে তা শুধু দিয়ে এসেছে। আজ সময় এসেছে তার ঋণ শোধ করার।
ক্ষণিক পূর্বের। সমস্ত। শিথিলতা ।ত্যাগ। করে দৃঢ় ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালেন জার্মানির সর্বাধিনায়ক। এইবার উঠে দাঁড়ালেন সুভাষও৷ কয়েক মুহূর্ত স্বভাবসিদ্ধ প্রখর ভঙ্গিতে তিনি তাকিয়ে রইলেন সুভাষের অটল উজ্জ্বল মুখচ্ছবির দিকে। তারপর সহসা হাত বাড়িয়ে দিলেন করমর্দনের ভঙ্গিতে। আলোকিত হাসিতে ভরে উঠলো সুভাষের মুখ। নিজের কোমল হাত দুটি বাড়িয়ে তিনি চেপে ধরলেন হিটলারের হাত। উষ্ণ করমর্দনে মিলে গেল প্রাচ্য আর পাশ্চাত্য।
বাইরের ঘরটিতে ফিরে এসে সুভাষ সামান্য অবাক হয়ে লক্ষ করলেন, যাওয়ার সময় তিনি যাঁকে যে আসনে দেখে গিয়েছিলেন, এখনও তাঁরা ঠিক সেই আসনে প্রায় একই ভঙ্গিতে বসে আছেন। জার্মান জাতির মেরুদণ্ড হল শৃঙ্খলা। তারা প্রথমে নিশ্চিত হয়ে নিতে চায়— যে আদেশ দিচ্ছে, সে উপযুক্ত পাত্র কিনা। একবার সে-সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে গেলে তার আদেশ পালন করা এদের মজ্জাগত স্বভাব— মনে মনে ভাবলেন সুভাষচন্দ্র। ভারতীয়রা যদি এই শৃঙ্খলাবোধ নিজেদের চরিত্রে রোপণ করতে পারে, তাহলে অসামান্য উন্নতি করতে পারবে— ভাবলেন তিনি।
নিজের আসনে ফিরে গিয়ে ঋজু ভঙ্গিতে বসলেন ফ্যুহরার। তারপর নিশ্চিত অকম্পিত কন্ঠে আদেশ দিলেন, “আমার প্রিয় সহকর্মীরা! বিবিধ কারণে আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। আমি চার কোটি জার্মানির ফ্যুহরার। আর ইনি, হের বোস, চল্লিশ কোটি ভারতীয় মানুষের ফ্যুহরার। এঁর সঙ্গে আজকের দীর্ঘ আলোচনা-সভার পর আমি কিছু ব্যাপারে আমার মতাদর্শে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হলাম। আপাতত সমস্ত লেবার ক্যাম্প, যেগুলোকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পরিবর্তিত করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল, তা বাতিল করা হল। ‘এরিয়ানাইজেশন’ নামক কর্মসূচিটি, অর্থাৎ ইহুদিদের সম্পত্তি ও ব্যাবসা অধিগ্রহণ করে তা প্রকৃত আর্যদের মধ্যে বণ্টন করার যে নীতি আমরা গ্রহণ করেছিলাম, তাও পরিত্যক্ত হল। লেবার ক্যাম্প থেকে সমস্ত ইহুদি মানুষদের নিজের নিজের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার আদেশ দেওয়া হচ্ছে। তাদের সম্পত্তিও প্রত্যর্পণ করা হবে যত শীঘ্র সম্ভব। এটি আমার আদেশ, এবং এই। বিষয়ে ।ভবিষ্যতে। পুনরায় ।আলোচনার কোনও প্রয়োজন দেখছি না।”
ঘরের মধ্যে বজ্রপাত হলেও হয়তো উপস্থিত নাজি নেতারা এত অবাক হতেন না। মনোভাব গোপন করার বিদ্যা সামরিক পুরুষদের এবং রাজনৈতিক নেতাদের স্বভাবগত। তৎসত্ত্বেও উপস্থিত প্রত্যেকের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল; যেন তাঁরা যা শুনছেন, তা বিশ্বাস করতে পারছেন না।
হিটলার অবশ্য সেই বিস্মিত মুখগুলির দিকে ফিরেও তাকালেন না। পূর্ববৎ কঠিন স্বরে তিনি বলে চললেন, “ইউরোপ ফ্রন্টে আমাদের যুদ্ধ যেরকম চলছিল, তাই চলবে। বিশেষত ইংল্যান্ডের উপর আক্রমণ থামানোর কোন প্রয়োজন এই মুহূর্তে দেখছি না। এই বর্বর দ্বীপবাসীদের প্রকৃত সভ্যতার আলোক প্রদর্শন করা সুসভ্য জার্মানদের একটি কর্তব্য বলেই আমি বোধ করি। কিন্তু জাপানের উপর দায়িত্ব ছেড়ে না-দিয়ে আমরা এশিয়াতে একটি ফ্রন্ট ওপেন করছি। যথাসময়ে জার্মান সেনাবাহিনীর দু’টি দল যথাক্রমে আকাশপথে ও জলপথে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার জন্য। বন্দী ভারতীয় সেনাদের দ্রুত মুক্তি দেওয়া হবে, তারাও এই বাহিনীতে যোগ দেবে।
“এই দলের সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব পালন করবেন আমার সম্মাননীয় বন্ধু, হের বোস।” বলে নাটকীয় ভঙ্গিতে একটি হাত বাড়িয়ে দিয়ে সুভাষচন্দ্র বসুর দিকে ইঙ্গিত করলেন অ্যাডলফ হিটলার।
সুভাষ উঠে দাঁড়িয়ে নতমস্তকে এই দায়িত্ব স্বীকার করলেন। তারপর মন্দ্রকণ্ঠে বললেন, “চল্লিশ কোটি ভারতবাসীর পক্ষ থেকে আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, হের ফ্যুহরার। ধন্যবাদ জানাচ্ছি জার্মান প্রশাসন এবং জার্মানি নামের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী দেশটিকে। শুধু একটি বিষয় আপনাকে মনে করিয়ে দিতে চাইছি সবিনয়ে। আমার ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন। ভারত এই মুহূর্তে পরপদানত। তা ইংল্যান্ডের একটি উপনিবেশ মাত্র। কিন্তু আমরা, ভারতীয়রা, সংগ্রাম করছি সম্পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য। বিশ্বসভায় মাথা তুলে দাঁড়ানোর জন্য। জার্মানির সামরিক সাহায্য আমরা ধন্যবাদের সঙ্গে, কৃতজ্ঞ চিত্তে গ্রহণ করছি। কিন্তু ভবিষ্যতে জার্মানির উপনিবেশ হয়ে থাকার বিন্দুমাত্র বাসনা আমাদের নেই, সে কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছি। সেক্ষেত্রে আমরা আপনাদের বিরুদ্ধে একইভাবে অস্ত্রধারণ করব!”
উপস্থিত নাজি নেতাদের স্তম্ভিত চোখের সামনে হিটলারের সদা গম্ভীর মুখে ফুটে উঠল আশ্চর্য হাসির রেখা। সামান্য তরল কণ্ঠে তিনি বললেন, “সেইদিন কিন্তু জার্মানি আপনাকে সমর্থন করবে না, তা আমি এখনি জানিয়ে দিচ্ছি।”
হিটলার রসিকতা করছেন! গোয়েবলস যদি নীরব থাকেন, তাহলে নাকি তাঁকে মানুষ চিনতে পারবে না— এমন একটি ঠাট্টা প্রচলিত আছে জার্মানিতে। আজ প্রায় তেমনই এক অবাস্তব দৃশ্য দেখলেন কক্ষে উপস্থিত হিমলার, গোয়েরিং এবং অন্যান্য শীর্ষনেতারা। আজ বুঝি সকলই সম্ভব।
অমল হাসিতে ভরে গেল সুভাষের কোমল মুখ। হিটলারের সোফার দিকে এক পা এগিয়ে গিয়ে তিনি আবার হাত বাড়িয়ে দিলেন। এইবার নিজের আসন পরিত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালেন জার্মানির সর্বশক্তিমান একনায়ক। তারপর দুই হাতে চেপে ধরলেন সুভাষের হাত।
হিটলারের চাইতে ভালো করে কে-ই বা জানেন— আজ শুধু যে ইহুদিরা লেবার ক্যাম্প থেকে মুক্তি পেয়ে যাবেন, তাই নয়। আজ দীর্ঘদিনের ভ্রান্ত মতাদর্শের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে গেছেন তিনিও। নররক্তপিপাসু এক রাক্ষস হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ তাঁকে মনে রাখবে এক মহান পরাধীন জাতির মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মহানায়ক হিসাবে।
ঠিক এক মাস পরে, ২৯শে জুন ১৯৪২ তারিখে একটা সংবাদ সমস্ত পৃথিবীকে স্তম্ভিত করে দিল।
একই সঙ্গে তিন দিক থেকে আক্রান্ত হয়েছে ব্রিটিশ-ভারত, যেন তিনখানি জলস্রোত একই সময়ে উত্তাল তরঙ্গভঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে উদ্যত হয়েছে বিদেশি শাসকের মাথার দুর্মূল্যতম মুকুটটিকে৷ জার্মান সেনা এবং জাপানি সেনা একযোগে প্রবেশ করেছে ভারতে৷ মধ্যভাগে আছে প্রাক্তন ভারতীয় সেনাদের দ্বারা গঠিত একটি নতুন সেনাবাহিনী। এর নাম আজাদ হিন্দ ফৌজ। এই বাহিনীটিই সর্বাপেক্ষা ভয়ঙ্কর, বন্যার বেগে সমস্ত ব্রিটিশ বাধা যেন খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে তা এগিয়ে চলেছে দিল্লির দিকে। গোটা দেশ ‘চলো দিল্লি’ ধ্বনিতে মুখরিত।
অবশ্য এই রণোন্মাদ যোদ্ধারা যতদিনে দিল্লি পৌঁছবে, ততদিন তা ইংরেজদের হাতে থাকবে কিনা, তা নিয়েও ঘোর সংশয় দেখা দিয়েছে। কারণ, সংবাদে প্রকাশ, জার্মান-জাপানের যৌথ বিমানবাহিনী দিল্লিতে ভয়াবহ বোমাবর্ষণ শুরু করেছে আজ সকাল থেকে!
.
শীর্ষচিত্র- অ্যাডলফ হিটলার। আত্মপ্রতিকৃতি। ১৯২৬
