ইনকলাব অভি বাকি হ্যায় – সুদীপ চ্যাটার্জী
আহ্বান
বৃষ্টিটা শুরু হল আচমকাই। এঁটেল কাদা আর মাটি ঠেলে কোনোমতে এগোচ্ছিল রাধি, এইবার সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। কাদার ওপর বর্ষার জল পড়ে বগবগ শব্দ হচ্ছে, গর্তের বুদ্বুদ ঠেলে লাফিয়ে উঠে পালাচ্ছে কোলাব্যাঙয়ের দল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাটি নরম হয়ে কোমর অবধি ডুবে যাবে, তার আগেই এখান থেকে বেরিয়ে পড়া দরকার।
শামুকের খোল এড়িয়ে পা ফেলতে লাগল রাধি। তার এক হাতে একটা মাছ ভর্তি চুবড়ি, অন্য হাতে বাঁশের লাঠি। হাঁটু অব্দি তোলা কাপড়ের খুঁটে বেঁধে রাখা নুনের থলি। বৈশাখের এই সময়টা যদিও জোঁকের উৎপাত বড়ো একটা থাকে না, জলাভূমি শুকনো খটখটে হয়ে থাকে। সূর্য মধ্যগগনে ওঠার পর গ্রামের লোক বাড়ি থেকে বেরোতে চায় না, জেলেদের নৌকাও বেলাবেলি ফিরে আসে। দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে পুরুষরা জটলা করে কাঁঠাল বনের ছায়ায়, মেয়েরা তামাকপাতা চিবোতে চিবোতে আড্ডা দেয়।
কিন্তু রাধির কপালে অত সুখ নেই। সবাই যখন জিরোয়, তখন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে চুপিচুপি সমুদ্রের ধারের এই জলাভূমিতে চলে আসে সে। না এসেই বা উপায় কি! গাঁয়ের মুরুব্বি-মাতব্বরদের বাড়িতে খেটে যেটুকু চাল সে পায়, তাতে মা ছেলের পেট চলে না। রাধি দু’একবার গাছ থেকে কাঁঠাল পাড়তে গিয়েছিল, তাতে সকলের সে কী রাগ! মেরেধরে তাদের গাঁ ছাড়া করে আরকি! এদিকের জঙ্গলে প্রচুর কাঁঠাল গাছ, কত কাঁঠাল পড়ে পড়ে নষ্ট হয়ে যায়। তাও রাধি নিতে পারবে না, তাতে নাকি গাছ অপবিত্র হবে, কাঁঠালের ফলন কমে যাবে। একে তো সে নিচু জাত, তারপর বিষ্ণুকুপ্পম গাঁয়ে বহিরাগত, এ তল্লাটের ভাষাও সে ভালো জানে না। সুতরাং মুখ বুজে সব কথা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কি! পেট ভর্তি খিদে নিয়েই সে কাজ করে। গ্রামবাসীদের বাড়ির দালান পরিষ্কার করে, ক্ষেতের সবজি। আর কুমড়োর মাচার পরিচর্চা করে, ঝাঁট দেয় মন্দির চত্বরে। মন্দিরের ভিতরে যাওয়া অবশ্য বারণ, বিষ্ণু তাতে কুপিত হবেন।
তবে নিজে পেটে কিল মেরে রাখলেও ছেলের শুকনো মুখ সহ্য করতে পারে না রাধি। আধপেটা খেয়ে খেয়ে ছেলেটার হাত-পা লিকলিকে হয়ে গিয়েছে, শরীরে অপুষ্টির ছাপ স্পষ্ট। দুপুরের দিকে তাকে সঙ্গে করে সমুদ্রের ধারে চলে আসে রাধি। ঢেউয়ের সঙ্গে বয়ে আসা ছোট ছোট মাছ জলাভূমির কাদার মধ্যে আটকে থাকে। ভাগ্যে থাকলে মাঝেমধ্যে কাঁকড়া, কচ্ছপের ডিম বা ব্যাঙের ছাতাও পাওয়া যায়। সেসব তুলে নিয়ে গিয়ে রান্না করে সে। ছেলেকে খাওয়ায়, নিজেও খায়। জলঢালা ভাত আর মাছ পোড়া হলেই চলে যায় মোটামুটি।
গত কয়েকদিন ধরে বাদলা করেছে, দু’এক পশলা বৃষ্টিও হয়েছে। বৃষ্টিবাদলা হলে কাদামাটির মধ্যে অসুবিধা হয় বটে, কিন্তু অন্যদিনের চেয়ে বেশি মাছ পাওয়া যায় এই সময়। সাম্বু আর রাধি দুজনেরই চুবড়ি প্রায় ভরে গিয়েছে, এমন সময় আবার বৃষ্টি এল।
মাথায় বড়ো বড়ো জলের ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে। জলাভূমি থেকে বেরিয়ে আঁচল দিয়ে মাথা ঢেকে নিল রাধি। সাম্বুকে খুঁজতে গিয়ে সে দেখল ইতিমধ্যে সে চুবড়ি হাতে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে গিয়েছে।
রাধির একটু মায়া হল। তার ছেলেটা একটু ভাবুক প্রকৃতির। ফুল, পাখি বা প্রজাপতি নিয়ে মশগুল হয়ে থাকে। সমুদ্রের কাছে চলে যায় মাঝেমধ্যে, অন্যমনস্ক হয়ে ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। সাম্বুকে ডাকতে এগিয়ে যায় রাধি। এক চিলতে বেলাভূমি, সন্ধ্যার সময় এদিকে বকের পাল দেখা যায় মাঝেমধ্যে। রাধি অবশ্য শুনেছে, কিছুদূরে কুডলুর বলে একটা জায়গায় সাহেবরা প্রকাণ্ড বন্দর বানাচ্ছে, বড়ো বড়ো জাহাজ নাকি সেখানে এসে নোঙর করে।
সাম্বু বালির ওপর উবু হয়ে বসে কী যেন দেখছে। তার দৃষ্টি মাটির ওপর স্থির। অত মন দিয়ে কী দেখছে ছেলেটা? নিশ্চয়ই রঙিন নুড়িপাথর বা ঝিনুক দেখে মেতে আছে। বৃষ্টিতে ভিজে জ্বরজারি বাধালে আর দেখতে হবে না। রাধি বড়ো বড়ো পা চালিয়ে এগিয়ে গেল সাম্বুর দিকে। কিন্তু ।সমুদ্রের ।ধারে পৌঁছাতেই বিস্ময়ে তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল।
ভেজা বালির ওপর পড়ে আছে একটা মানুষ! এদেশীয় নয়, সাহেব বলে চেনা যায় সহজেই। কিন্তু গায়ের ফর্সা রঙ রোদে পুড়ে গিয়েছে অনেকটা। পরনে শতছিন্ন লাল সাদা পোশাক দেখে রাধি অনুমান করল, লোকটা সম্ভবত ইংরেজ নৌবাহিনীতে কাজ করত। বোঝায় যায়, সমুদ্রের ঢেউ শরীরটাকে ভাসিয়ে নিয়ে এসেছে। হয়তো যুদ্ধে আহত হয়েছিল লোকটা! যেভাবে নিস্পন্দ হয়ে পড়ে আছে, দেহে প্রাণ আছে বলে তো মনে হচ্ছে না। সাম্বু তার কাছেই উবু হয়ে বসে আছে, তার একটা হাত লোকটার বুকের ওপর রাখা।
রাধিকে দেখে সাম্বু বলে উঠল, “লোকটার বুক ধুকপুক করছে মা।”
রাধি সাম্বুকে টেনে তুলে দিয়ে নিজে লোকটাকে পরীক্ষা করে দেখল। নাড়ি খুব দুর্বল, কিন্তু সাহেব বেঁচে আছে বলেই মনে হয়। তার বুকে একটা মস্ত জখম, গায়েও অসংখ্য কাটাছেঁড়ার দাগ।
রাধির বুকের ভিতর গুমগুম শব্দ হচ্ছে। এইবার সে কী করবে? লোকটাকে এখানে ফেলে গেলে সে মারা যাবে ঠিক। কিন্তু বাঁচানোর চেষ্টা করলেও বিপদ আছে। এই গ্রামের মানুষ সাহেবদের পছন্দ করে না, একজন সাহেবকে বাড়িতে রাখলে উল্টে তারা রাধিকেই দোষারোপ করবে। এমনিতেই কেউ তাকে সহ্য করতে পারে না। তারপর যদি এই সাহেবের খোঁজে যদি ওর দলবল এসে হাজির হয়, তাহলে তো গোদের ওপর বিষফোঁড়া। অনেক কষ্ট করে সে ওই লালমুখো সাহেবদের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে, আর সে ওদের হাতে ধরা দিতে চায় না। তার চেয়ে লোকটাকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়াই ভালো। একটা বড়ো পাথর বেঁধে দিলেই শরীরটা একেবারে গভীর জলে তলিয়ে যাবে।
“কী ভাবছ মা? একে বাড়ি নিয়ে যেতে হবে তো!”
সাম্বু রাধির আঁচল ধরে টানতেই যেন সম্বিত ফিরে পেল রাধি। সত্যিই এসব সে কী ভাবছে? একটা মানুষ— হোক না সে সাহেব, তাকে সে জলে ডুবিয়ে মেরে ফেলতে চাইছে? এমন পাপ করলে ভগবান তাকে কোনোদিন মাপ করবেন? চার বছরের ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে রাধি বুঝল, ঈশ্বরের ওপর ভরসা রাখা ছাড়া কিছু করার নেই। সাম্বু ঠিক কথাই বলেছে। সাহেবর প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে। তারপর যা হয় হবে! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রাধি। হাত থেকে মাছভর্তি চুবড়ি আর লাঠি নামিয়ে রেখে বলল, “দাঁড়া। আগে ওর পেট থেকে জল বের করতে হবে।”
***
১৯৩০ সাল। ভারতবর্ষে তখন বিপ্লবের দামামা বাজছে। স্বাধীনতা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। গান্ধীজির আহ্বানে দলে দলে মানুষ অসহযোগ আন্দোলনে নাম লেখাচ্ছে। বিদেশি পণ্য বর্জন করা হচ্ছে ঘরে ঘরে, পোড়ানো হচ্ছে বিলিতি কাপড়। গান্ধীজির অনুগামী সি রাজগোপালচারি ডান্ডি মার্চ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ত্রিচোনপলি থেকে সমুদ্র উপকূলবর্তী গ্রাম বেদানারায়ম পর্যন্ত পদযাত্রা করবেন বলে ঠিক করেছেন। তবে শুধু অহিংস আন্দোলন নয়, পাশাপাশি চলছে সক্রিয় বিপ্লবও। মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে বিপ্লবীরা চট্টগ্রামে ব্রিটিশ সরকারের অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করেছে কয়েক সপ্তাহ আগেই। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির এই ঘটনা গোটা ভারতবর্ষের বিপ্লবীদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে, পাশাপাশি চিন্তা বাড়িয়েছে ব্রিটিশ সরকারের। সারা দেশ উত্তাল। খবরের কাগজের বিক্রি বেড়ে গিয়েছে, কলকাতা আর বম্বের আন্ডারগ্রাউন্ড প্রেসের তরফ থেকেও গোছা গোছা লিফলেট আর সান্ধ্য পত্রিকা বিলি করা হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
কিন্তু বিষ্ণুকুপ্পম গাঁয়ে এসব কিছুই জানা যায় না। ঘন জঙ্গল আর জলাভূমি দিয়ে ঘেরা এই ছোট্ট গ্রামটি দেশব্যাপী আন্দোলনের অগ্নিশিখা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে পুরোপুরি। এখানকার বাসিন্দারা অধিকাংশই জেলে, বাকিরা চাষবাস করে উপার্জন করে। কুডলুর থেকে মাসে দু’একবার আড়তদারের গরুর গাড়ি আসে, ফলমূল সবজি নিয়ে চলে যায়। বিনিময়ে দিয়ে চায় চাল, ডাল, মশলাপাতি; কিছু টাকাও দেয় অবশ্য। সেই নিয়েই চলে যায় গাঁয়ের লোকের। এই প্রত্যন্ত গ্রামেই দিব্যি জীবন কেটে যাচ্ছে, দেশের খবর রাখার দরকার কী? মাদ্রাজ বা মাদুরাই গিয়েছে, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না এখানে। সাহেবরাও এদিকপানে বিশেষ নজর দেয় না। ছেলে ছোকরারা আজকাল টাকা হাতে পেলে ফূর্তি করতে শহরে যায় বটে, তবে তাদের দৌড়ও বড়জোর নেভেলি বা কুডলুর পর্যন্ত। এদের মুখেই গ্রামে লোকে জেনেছে, নেভেলিতে নাকি সাহেবরা তাঁবু খাটিয়ে কীসব খোঁড়াখুড়ি চালাচ্ছে। মাটির নিচে কয়লা জাতীয় কিছু একটা পাওয়া গিয়েছে, কয়েক বছর পর নাকি এখানে পুরোদস্তুর একটা খনির কাজ শুরু হবে হবে। আশেপাশের গ্রাম থেকে লোকজনদের নিয়ে যাবে সেখানে কাজ করতে।
কথাটা কানে গিয়েছে রাধিরও। তারপর থেকে ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে সে। জীবনের অনেকখানি সময় সে করনপুরার কোলিয়ারিতে কাজ করে কাটিয়েছে, সেই দুঃসহ অতীতের কথা মনে পড়লে এখনও সে চমকে চমকে ওঠে। রাধির মতো অনেক মেয়েই দিনমজুর হিসেবে খাটত সেই কয়লার খনিতে। কেউ বাউরি বা কাংঘর, কেউ আবার রামোসি বা মাঘয়ার ডোম জাতির আদিবাসী। সাহেবরা তো বটেই, দিশি বাবুদের চোখেও তারা ছিল মানুষের অধম।
তবে প্রয়োজন হলে এই নিচু জাতের শ্রমিকদের কাজে নিতে হয় বইকি। কালিঝুলি মেখে বিনা প্রতিবাদে কাজ করবে, এমন আর কে আছে? ছুটি নেই, পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই, ওষুধপত্র বা চিকিৎসের বালাই নেই, শুধু শুকনো রুটি আর কয়েক আনার বিনিময়ে বছরের পর বছর ধরে প্রাণান্তকর পরিশ্রম করে চলা। বয়লারের ছাই পরিষ্কার করতে হবে, মাটিতে বসানো চুল্লিগুলোর রক্ষণাবেক্ষণও করতে হবে, জলের ছিটে দিতে হবে কয়লার স্তূপে। শুধু তাই নয়, কয়লার ভারী বস্তা পিঠে করে মাইল খানেক চড়াই উঠতে হত রাধিদের, থামলেই চাবুক হাতে তেড়ে আসত সাহেবদের পোষা দারোয়ান। সপাসপ ঘা মারত পিঠে। চামড়া উঠে রক্ত পড়ত, ঘা বিষিয়ে উঠত অচিরেই। যন্ত্রণায় চিৎকার করত শ্রমিকরা।
আধপেটা খাবার ।আর ।অসহ্য পরিশ্রমের ফলে কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছিল সবাই, তারপর প্রতিদিনের বরাদ্দ চাবুক। তাছাড়া কোলিয়ারিতে যক্ষ্মা বা কলেরা ছিল খুবই সাধারণ ব্যাপার। অনেকেই সারা রাত ধরে কাশত, কাশতে কাশতে রক্ত উঠে আসত বুক থেকে। কিন্তু সাহেবদের কড়া হুকুম, যতই শরীর খারাপ হোক, কাজে ফাঁকি দেওয়া চলবে না। কেউ ছুটি নিলে বা পালানোর চেষ্টা করলেই চাবকে গায়ের ছাল ছাড়িয়ে নেওয়া হবে, পাশাপাশি যমের বাড়ি পাঠানো হবে তার পরিবারকেও। অসহ্য গরম আর দমবন্ধ করা আবহাওয়ায় ঘর্মাক্ত শরীরে কাজ করতে করতে রাধির মনে হত, মরে গেলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। সে মরে না কেন? কত মেয়েই তো মরে যায়!
কিন্তু রাধি মরেনি। তার ভাগ্যে বেঁচে থাকা লেখা ছিল। সোমি বাউরির ছেলে মুরারির সঙ্গে তার দেখা হওয়ার পর থেকেই মনে বেঁচে থাকার সাধ জেগে উঠেছিল রাধির। বড়ো সাহসী ছিল মুরারি, সাহেবদের চোখরাঙানিকেও ভয় পেত না। দলবল নিয়ে জঙ্গলে ঘুরত মুরারি, সবাই তাকে চিনত ‘বাগি’ বলে। কোলিয়াড়ির লোকজন চুপিচুপি রাধিকে জানিয়েছিল, মুরারি ক্রান্তিকারীদের সঙ্গে কাজ করে। ওরা নাকি দেশের আজাদির জন্য লড়ছে। রাধি ভয় পেত, কিন্তু করার কিছু ছিল না। তারপর এল সেই দিনটা। গভীর রাতে মুরারি তার কাছে এসেছিল। বলেছিল, সাহেবরা তাকে গ্রেফতার করবে বলে খুঁজছে। তাকে পালাতে হবে। রাধি কি তার সঙ্গে যাবে?
সেদিন এত সাহস রাধি কোত্থেকে পেয়েছিল সে নিজেও জানে না। সেদিন রাত্রেই এক পোশাকে ঘর ছেড়েছিল রাধি। তারপর দৌড় আর দৌড়। কখনও জঙ্গলে, কখন পাহাড়ে, কখনও রেলগাড়ি বা মুসাফিরদের কাফিলায়। এরই মধ্যে তাকে বিয়ে করেছিল মুরারি, তারপর পালিয়ে এসেছিল দক্ষিণের এই গ্রামে। নিজে হাতে ঘর বেঁধেছিল, বানিয়েছিল কাঠের নৌকো। সেই নৌকায় করে মাছ ধরতে যেত মুরারি, মাঝেমধ্যে শহরেও যেত। গাঁয়ের লোকের হম্বিতম্বিকে পরোয়াই করত না সে।
তারপর, একসময় সাম্বু এল। দিব্যি সুখে দুঃখে কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। মুরারি কিছুটা পড়াশোনা জানত, খবরও রাখত নানারকম। চাঁদনি রাতে সমুদ্রের ধারে বসে রাধিকে অদ্ভুত সব কথা বলত সে। চুপ করে শুনে যেত রাধি। গ্রামের কথা, ফল্গু নদীর কথা, জোছনা রাত্তিরে পাহাড়ে বনে ঘুরে বেড়ানোর কথা। আর ইনকলাবের কিসসা। মুরারি বলত, সাহেবরা চিরদিন এখানে থাকবে না। অনেকেই তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। একদিন সাহেবরা ফিরে যাবে আমাদের মুলুক থেকে, তারপর রাধি আর সাম্বুকে নিয়ে সে আবার ফিরে যাবে তার জন্মভূমিতে। রাধিকে পাহাড় দেখাতে নিয়ে যাবে সে। বরফের পাহাড়!
রাধি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। স্বপ্ন! দিনগুলো এখন স্বপ্নের মতোই মনে হয়। বড়ো বেশি স্বপ্ন দেখত তার বরটা। কে জানত, এ সব স্বপ্ন নিয়েই সে একদিন সমুদ্রের বুকে হারিয়ে যাবে! আর ফিরবে না!
“একটু জল দেবে রাধি?”
ভাবনার রেশ ছিঁড়ে গেল। বাস্তবে ফিরে এল রাধি। সাহেব জোর করে তক্তপোষের ওপর উঠে বসার চেষ্টা করছে। সাম্বুর দিকে তাকাতেই সে লাফিয়ে উঠে একটা কাঁসার গ্লাসে করে জল নিয়ে এল। রাধি গ্লাসটা নিয়ে সাহেবের মুখের সামনে ধরতে কষ্ট করে কয়েক ঢোঁক জল খেল সে। নিজস্ব ভাষায় কিছু একটা বলল, বুঝতে পারল না রাধি। এই সাহেব এমনিতে দিব্যি স্থানীয় তামিল ভাষায় কথা বলে, খানিকটা হিন্দিও জানে। বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হয় না। প্রথম প্রথম খুব অবাক হয়েছিল রাধি, কিন্তু এখন তার ব্যাপারটা সয়ে গিয়েছে। সে আর সাম্বু খুব ভাল তামিল জানে না, কিন্তু কাজ চালানোর জন্য খুচরো কিছু শব্দ শিখে নিতেই হয়েছে। রাধি বলল, “আজ ভাত খাবে তো?”
মৃদু হেসে মাথা হেলাল সাহেব। রাধি উঠে পড়ল। প্রায় দু’ সপ্তাহ হয়ে গিয়েছে, সাহেব এখন অনেকটাই সুস্থ। গুলি বের করে দেওয়ার পর প্রথম প্রথম জ্বর এসেছিল, সে জ্বর ছেড়ে গিয়েছে। দুর্বলতা যদিও আছে, সেটা যেতে সময় লাগবে। ইতিমধ্যে রাধি বুঝেছে, এই সাহেবের স্বভাবচরিত্র একেবারেই অন্যরকম। চোখেমুখে একটা নরম ভাব, দৃষ্টিতে কৃতজ্ঞতার আভাস। কিন্তু লোকটা কে, কোথা থেকে এসেছে, সে সব কিছুই সে জানতে পারেনি। জিজ্ঞেস করার সাহসও পায়নি রাধি। ভাগ্য ভালো, গ্রামের মানুষ এদিকে আসে না। তার বাড়িতে একজন সাহেবকে রেখেছে দেখলে মোড়ল ঘরছাড়া করে ছাড়ত রাধিকে।
আরো কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। সাহেব এখন ঘরের বাইরে এসে হাঁটাহাটি করে, সাম্বুর হাত ধরে সমুদ্রের ধারে গিয়ে বসে। রাধি মাঝেমধ্যে ভাবে, এই লোকটার সঙ্গীসাথীরা কোথায়? গ্রামে কাজ করতে গিয়ে কানখাড়া করে রাখে রাধি। কেউ যদি কিছু বলে! হয়তো সেনাবাহিনীর লোকজন তাকে খুঁজছে! নেভেলিতে তো কত সাহেব তাঁবু করে আছে! কিন্তু তেমন কিছু জানতে পারেনি রাধি।
সেদিন বিকেলে সমুদ্রের ধারে বসে থাকার সময়ে রাধি কৌতূহল দমন করতে পারল না। সে সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, “সাহেব, তুমি কে? তোমার কথা তো আমরা কিছুই জানি না। তুমি কি যুদ্ধে গিয়েছিলে?”
সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বলব রাধি। আমি কে, কোত্থেকে এসেছি, সব কথাই একে একে তোমাদের দুজনকে খুলে বলব। আপাতত আমার নামটা তোমাদের জানিয়ে রাখি। আমার নাম হুবার্ট হোয়াইট। আমাকে তোমরা নাম ধরেই ডাকতে পারো। কিন্তু তার আগে বলো, তোমরা এখানে কী করে এলে? তোমরা যে তামিল নও, সে আমি বুঝেছি। খুব সম্ভবত তোমরা উত্তর ভারতের লোক। ভয় পেও না, আমি অন্য সাহেবদের মতো নই। তোমাদের কোনও বিপদ হবে না।”
রাধি প্রথমে ইতস্তত করছিল, কিন্তু শেষমেশ সে সব কথাই খুলে বলল। হুবার্ট মন দিয়ে তার কথা শুনছিল। সে বলল, “দেশটা তো তোমাদের। সাদা চামড়ার মানুষ তোমাদের ওপর জোরজারি করলে তোমরা চোখ বুজে সব সহ্য কর কেন?”
রাধি ঠোঁট কামড়ে বলল, “কী করব সাহেব, আমরা তো জন্ম থেকে অত্যাচার সহ্য করছি। সাদা চামড়া হোক বা কালো চামড়া, আমাদের কাছে তো সবাই এক। মুরারি বলত দেশে ইনকলাব চলছে। গোরারা নাকি চিরদিন এখানে থাকবে না। সে নিজেও নাকি এই স্বাধীনতার জন্য লড়ছে। কিন্তু বিদেশীরা দেশ ছেড়ে চলে গেলেও আমাদের আর স্বাধীনতা কে দেবে সাহেব? আমরা চিরকাল পরাধীন, পরাধীনই থাকব।”
হুবার্ট সাহেব হাসল। তারপর রাধির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “স্বাধীনতা মানে কি শুধু দেশের স্বাধীনতা রাধি? স্বাধীনতার আসল উদ্দেশ্য প্রত্যেক মানুষের ভিতরে বাসা বেঁধে রাখা ভয় আর কুসংস্কারকে দূর করা। যেদিন মানুষের মনের অন্ধকার দূর হবে, কেউ তার মনকে শেকলে আটকাতে পারবে না, কেউ শত অত্যাচার করেও তাকে ভয় দেখাতে পারবে না, সেদিন আসল স্বাধীনতা আসবে। দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়তে হলে আগে নিজের মনকে স্বাধীন করতে হয়। সাদা চামড়া, কালো চামড়া, জমিদার, মোড়ল, মুরুব্বি… কেউ না কেউ তোমাকে চিরকাল ভয় দেখানোর চেষ্টা করবে, শেকলে আটকে রাখতে চাইবে তোমার মনকে। কিন্তু যে স্বাধীন, কোনও কিছুই তাকে আটকে রাখতে পারে না রাধি। তারা স্বপ্ন দেখতে ভয় পায় না। এই পরাধীন দেশে জন্মেও মুরারি স্বাধীন ছিল।”
রাধির চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। শাড়ির খুঁট দিয়ে চোখ মুছল সে। হুবার্ট সাহেব বলল, “রাধি, তোমার সামনে তো একটা গোটা জীবন পড়ে আছে। কত কিছু করার আছে তোমার! আর সাম্বু? তুমি কি চাও সাম্বুও তোমার মতো ভয় পেয়ে সারা জীবন কাটিয়ে দিক? চিরকাল এই গ্রামের মানুষের সামনে চোখ নিচু করে আর ঘাড় হেঁট করে থাকুক?”
রাধি দু’ দিকে মাথা নাড়ল। সজল চোখে হুবার্টের দিকে তাকিয়ে বলল, “না সাহেব। আমি চাই আমার ছেলে বড়ো হয়ে ওর বাবার মতো হোক। যতদিন বাঁচুক, মাথা উঁচু করে বাঁচুক। একটা কাঁঠাল কুড়োতে হলে আমি যেমন ভয় পাই, আমার ছেলের মনে সেরকম ভয় যেন কোনোদিন বাসা না বাঁধতে পারে। আপনি ওকে সাহায্য করবেন সাহেব?”
হুবার্ট সাহেবের মুখে একটা হাসি খেলে গেল। তিনি সাম্বুর চুলে হাত ।বুলিয়ে। দিয়ে। সমুদ্রের দিকে চাইলেন, তারপর বিড়বিড় করে বললেন, “ইনকলাব! ইনকলাব অভি বাকি হ্যায়!”
***
“কী নাম?”
“চন্দ্রসিং গাড়োয়ালি স্যার।’’
“রাজনীতি করে?”
“না স্যার। তবে ১৯২১ সালে গান্ধীজি বাগেশ্বরে জনসভা করতে গেছিলেন, তখন চন্দ্রসিং ওর সঙ্গে দেখা করেছিল। গান্ধীজির ভক্ত কিনা জানি না। কিন্তু রয়্যাল গাড়োয়াল রাইফেলসের সোর্সরা জানিয়েছে, লোকটা গোপনে বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। আন্ডারগ্রাউন্ড মিটিংয়ে যেত। তবে কোনো প্রমাণ নেই। ঘাঘু লোক স্যার।”
সার্জেন্ট স্মিথের মেজাজ খিঁচড়ে গেল। একের পর এক ঝামেলা। নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ারে এমনিতেই হুজ্জুতি লেগে থাকে, তারপর এসব উটকো ঝামেলা হলে কাজকর্ম করতে ভালো লাগে? কিন্তু কিছু করার নেই। ওপরওয়ালার আদেশ, ইনভেস্টিগেট করে রিপোর্ট পাঠাও। মিউটিনির লিডারকে শুলে চড়ানোর জন্য উপযুক্ত প্রমাণ জোগাড় করতে হবে তাকেই। সামরিক বিপ্লব কিছুতেই বরদাস্ত করা হবে না। মাথা থেকে টুপিটা খুলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন স্মিথ। মিউটিনি অ্যাক্টে মামলা না ঠুকলেই হয়তো ভালো হত! কিন্তু কে শোনে কার কথা? বিদ্রোহের কথা শুনে লন্ডন প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কিছু করাও যাবে না। এবার কোথাকার জল কোথায় গড়ায় কে জানে?
পেশাওয়ার পুলিশ দপ্তরের বাইরে তখন হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছে। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বয়ং খান আব্দুর গফফার, যিনি গোটা দেশে সীমান্ত গান্ধী বলে পরিচিত। তাঁর দাবী, চন্দ্রসিং গাড়োয়ালি সহ সাতষট্টিজন জওয়ানকে এক্ষুনি মুক্ত করতে হবে। নায়েক কেতু সিং কিন্তু কিন্তু করে বলল, “কী করব স্যার? লাঠিচার্জ করতে বলি?”
সার্জেন্ট স্মিথ মাথা নেড়ে বললেন, “একদম নয়। পুলিশ অ্যাকশনের নিন্দা করলেও গান্ধী কিন্তু এই বিদ্রোহের সমর্থন করেনি। কিন্তু কংগ্রেস ইতিমধ্যেই গভর্নর অফিসে চিঠি পাঠিয়েছে। এখানে লাঠিচার্জ করলে হিতে বিপরীত হবে। ওই বুড়োর আন্দোলনের ঠেলায় কোম্পানির প্রচুর লোকসান হয়েছে। সর্বক্ষণ নেটিভদের নিয়ে ব্যস্ত থাকলে ব্যাবসা চলে?”
“তাহলে স্যার…!” নায়েক কেতুর গলা শুনে মনে হল সে বড়ই মুষড়ে পড়েছে।
“টাকারকে তলব কর!” আদেশ দিলেন স্মিথ, “লাটসাহেবের নাকি সময়ই হচ্ছে না। ওর জবানবন্দি লিখে রাখা দরকার। বাই দ্য বুক কাজ করতে হবে। নাহলে পড়ে ঝামেলা বাধলে কে সামলাবে?”
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রয়্যাল গাড়োয়াল রাইফেলসের চিফ কম্যান্ডর ফিলিপ টাকার এসে উপস্থিত হলেন পুলিশ স্টেশনে। পুরোদস্তুর সামরিক কায়দায় স্মিথকে অভিবাদন জানিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “বলুন সার্জেন্ট? কী প্রশ্ন করতে চান?”
সার্জেন্ট স্মিথ গলা খাঁকড়ে বললেন, “তেইশ এপ্রিলের ঘটনার সময় তো আপনি কিসসাকাহানি মার্কেটে উপস্থিত ছিলেন? ঠিক কী ঘটেছিল? বুঝতেই পারছেন, একজন বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষীর বয়ান ছাড়া মামলা সাজালে পরে সমস্যা হতে পারে। যা দিনকাল পড়েছে! আপনি তো সব জানেনই।”
কম্যান্ডর টাকার পায়ের ওপর পা তুলে বললেন, “বলার মতো তেমন কিছু নেই। সত্যাগ্রহীদের নিয়ে খান আবদুল গফফার মিছিল করছিলেন, ব্যবস্থা সামলানোর জন্য আমাদের ইউনিটকে মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রায় কয়েক হাজার মানুষ জড় হয়েছিল। ইতিমধ্যে আমাদের একজন সিনিয়র অফিসার মোটর সাইকেল নিয়ে আসতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কয়েকজনকে চাপা দেন। আনফরচুনেট, আই মাস্ট সে! তাতে লোকজন রেগে গিয়ে তাকে মারধর শুরু করে, মোটরসাইকেলটাও জ্বালিয়ে দেয়। কয়েক হাজার মানুষ ক্ষেপে গেলে কী হতে পারে, সে নিশ্চয়ই আপনাকে বলে দিতে হবে না। অবস্থা সামাল দিতে আমি এগিয়ে আসি। জওয়ানদের উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে বলি, “গাড়োয়ালি, ওপেন ফায়ার!”
টাকার এমনভাবে চেঁচিয়ে কথাটা বললেন যেন তার দলের লোকজন সামনে বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সার্জেন্ট স্মিথ বিরক্তি চেপে জিজ্ঞেস করলেন, “তারপর? ওরা আদেশ অমান্য করল?”
“উঁহু।” টাকার চোখ ছোট করে বললেন, “ইউনিটের সকলেই রাইফেল উঁচিয়ে দাঁড়িয়েছিল। গুলি চালাবে, এমন সময় শুনলাম একজন গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল, ‘গাড়োয়ালি, সিজ ফায়ার’! ফিরে দেখি চন্দ্রসিং। তার গলায় এমন কিছু ছিল যে ইন্ডিয়ান সৈনিকরা বন্দুক নামিয়ে নিল একে একে। লোকগুলো যেন সম্মোহিত হয়ে গিয়েছিল। তাদের আর কিছুতেই রাজি করানো যায়নি।”
সার্জেন্ট স্মিথ লিখে রাখছিলেন। কলম তুলে তিনি বললেন, “আপনি চন্দ্রসিংকে এই আচরণের জন্য কিছু বলেননি?”
টাকার জামার কলারটা ঠিক করে নিয়ে বললেন, “অবশ্যই বলেছিলাম। সত্যি বলতে, চন্দ্রসিং খুবই দক্ষ সেপাই। অভিজ্ঞতাও আছে। তাকে জিজ্ঞেস করতে সে বলল, আমরা দেশের নিরাপত্তার জন্য সৈন্যদলে এসেছি, দেশের লোকের ওপর গুলি চালানোর জন্য নয়। খোদ ব্রিটেনের মহারানি এসে এমন নির্দেশ দিলেও নাকি সে শুনবে না। সুতরাং…”
টাকার কাঁধ ঝাঁকালেন। সার্জেন্ট স্মিথ আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। জবানবন্দির লেখাটা টাকারকে দেখিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নিলেন, তারপর তাকে বিদায় জানিয়ে চিন্তা করতে লাগলেন। যা বোঝার তিনি বুঝে গেছেন। ঘোঁট পাকিয়েছিল ওই মোটরসাইকেল আরোহীই। সম্ভবত কম্যান্ডর টাকারের কাছের লোক, উচ্চপদে আসীন। বোঝাই যাচ্ছে, ওই অফিসারকে সামনে আনা চলবে না। তাহলে বিদ্রোহও প্রমাণিত হবে না, ঘটনাটাও আদালতে জনতার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া বলেই গণ্য হবে। সেটা হতে দেওয়া যায় না। দোষ চাপাতে হবে ওই পাহাড়ি লোকটার ওপর। কেতু সিং যা বলল, তাতে লোকটার পলিটিকাল কানেকশন নিয়ে স্টেটমেন্ট দেওয়ার জন্য দু একজন ভুয়ো সাক্ষী ঠিক করা কোনও ব্যাপার নয়। তবে চন্দ্রসিংয়ের কথা শুনে যদি গাড়োয়ালি জওয়ানরা সত্যিই বন্দুক নামিয়ে নিয়ে থাকে, তাহলে লোকটার নেতৃত্ব ক্ষমতা আছে বলতে হবে। এরকম প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে মাথাব্যথা থাকেই।
স্মিথ রিপোর্ট লেখায় মন দিলেন। ভারতীয় সৈনিকরা হাত তুলে দেওয়ার পর গোরা সৈনিকদের গুলি করতে আদেশ দেওয়া হয়। টাকারের কথায়… টু প্রিভেন্ট দ্য রায়ট। তারা কোনোরকম সংকোচ করেনি। চন্দ্রসিং গাড়োয়ালি সহ সাতষট্টিজন ভারতীয় সৈনিককে গ্রেফতার করা হয়েছিল সঙ্গে সঙ্গেই। আগামি দুদিনের মধ্যেই তাদের আদালতে তোলা হবে।
এহেন পরিস্থিতিতে সৈনিক বিদ্রোহের মামলা সাজানো কঠিন হত না, যদি না ওপেন ফায়ারে এতগুলো মানুষ মারা যেত। রাজনৈতিক মহলে ব্যাপারটা নিয়ে প্রচুর জলঘোলা হয়েছে। জার্মানি, প্যারিস আর আমেরিকার সাংবাদিকরাও লেখালিখি করছে। ব্রিটিশ সরকারের মানবদরদী মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন ছাপা হলে লন্ডন প্রশাসন মোটেও খুশি হয় না, সে বলাই বাহুল্য। যাই হোক, চন্দ্রসিংকে আগে তার সঙ্গীসাথীদের কাছ থেকে আলাদা করা দরকার। তারপর দেখা যাবে কী করা যায়?
স্মিথ কেতু সিংকে ডেকে বললেন, “সিং, বাইরে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের জানিয়ে দাও চন্দ্রসিং সহ বেশিরভাগ কয়েদিকে আজ সকালেই রাওয়ালপিন্ডি সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্রিমিনাল প্রসিডিং হবে সেখানই। আমাদের কাছে অত ম্যানপাওয়ার নেই বলেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভ করতে হলে সেখানে যাক। আমাদের কিছু করার নেই।”
কেতু সিং অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু চন্দ্রসিং…”
“এখানেই আছে।” কেতু সিংয়ের কথা কেড়ে নিয়ে স্মিথ বললেন, “কিন্তু এরা সেটা জানবে কী করে? তাছাড়া আজ থাকলেও কাল লোকটা এখানে থাকবে না। কাল সকালেই ওকে রাওয়ালপিন্ডি পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। ওখানে এইসব ঝুঠঝামেলা অনেক কম। যাও, ওই সীমান্ত গান্ধীকে বল এখানে মিছিমিছি ভিড় না করতে।”
কেতু সিং চলে গেল।। সার্জেন্ট। স্মিথ। এসপি। সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করতে লাগলেন। আগেভাগে বন্দোবস্ত করে রাখা দরকার।
পরদিন ভোরে অন্ধকার থাকতেই পেশাওয়ার থানা থেকে একটা পুলিশ ভ্যানকে বেরোতে দেখা গেল। সার্জেন্ট স্মিথ নিজে চন্দ্রসিংকে রাওয়ালপিন্ডি পৌঁছানো দায়িত্ব নিয়েছেন, সঙ্গে নিয়েছেন কেতু সিংকেও। কাল বিক্ষোভকারীদের নিরস্ত করতে কেতু সিং যে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে, তাতে তাকে সঙ্গে নেওয়া দরকারি বলেই মনে করেছেন তিনি। সঙ্গে অবশ্য চারজন সশস্ত্র কনস্টেবলও আছে।
এত ভোরে শহর নিস্তব্ধ। পুলিশ ভ্যানটা সাঁ সাঁ করে ছুটছে। পেশাওয়ার শহরের সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর লোকবসতি নেই, শুধু উন্মুক্ত পাথুরে প্রান্তর। রাস্তার অবস্থাও তথৈবচ। সীমান্ত অঞ্চল বলে মাঝেমধ্যে চেকপোস্ট আছে বটে, কিন্তু সেও অনেক দূরে দূরে। কেতু সিং শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরে আছে, তার চোখ সামনের দিকে নিবদ্ধ। এইসব অঞ্চল এমনিতেও বিপজ্জনক। পাখতুন দস্যুরা মাঝেমধ্যেই গাড়ির ওপর হামলা করে, তাদের হাতে পড়লে প্রাণ নিয়ে ফেরা কঠিন।
কাবুল নদীর সামনে এসে একবার পিছন ফিরে তাকাল কেতু সিং। ঝাঁকুনির চোটে কনস্টেবলগুলো অবস্থা খারাপ, কোনোরকমে বন্দুক হাতে বসে ঢুলছে তারা। চন্দ্রসিংয়ের মধ্যে অবশ্য তেমন কোন লক্ষণ দেখা গেল না, সে পাহাড়ের মানুষ, এসব তার অভ্যেস আছে। গুনগুন করে গাড়োয়ালি গানের সুর ভাঁজছে সে, মুখে চিন্তার আভাসমাত্র নেই।
নদীর ওপর একটা কাঠের ব্রিজ। অনেকদিনের পুরোনো এই সেতু মেরামত করা হয়নি, গাড়ি উঠলে ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ হয়। কাবুল নদীর স্রোতের শব্দে সেই আওয়াজ খানিকটা কমেছে, কিন্তু অন্য বিপদও আছে। লোহার পাত আর পেরেক ঠুকে ভাঙা জায়গাগুলো সারাই করা হয়েছে কাজ চালানোর জন্য, কিন্তু আলগা পেরেক আর লোহার টুকরো ছড়িয়ে থাকে সেতুর ওপর। গাড়ি চালাতে হয় সাবধানে।
ভ্যানটা ব্রিজের ওপর উঠে পড়েছে, এমন সময় ভীষণ একটা শব্দ হল। গাড়িটা টাল সামলাতে না পেরে পিছলে যাচ্ছিল, জোর ব্রেক কষে সেটা দাঁড় করাল কেতু সিং। সার্জেন্ট স্মিথ ব্যস্ত হয়ে বললেন, “কী হল আবার!”
“মনে হয় টায়ার গেছে স্যার!” দরজা খুলে নামতে নামতে বলল কেতুসিং,
“বদলাতে হবে। রাস্তার অবস্থা তো জানেনই! আমি একজন কনস্টেবলকে ডেকে নিচ্ছি। আপনি অপেক্ষা করুন। “
স্মিথ তেতো গলায় বললেন, “যত্ত সব ঝামেলা। জলদি কর কেতু সিং। এসব জায়গায় দাঁড়ানো ডেঞ্জারাস।”
সময় কাটতে লাগল। কেউ কোথাও নেই, শুধু কাবুল নদীর জলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। দূরের পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ছে মাঝেমধ্যে। এই আকস্মিক ঘটনায় চোয়াল ঝুলে গেছে স্মিথ সাহেবের। এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের দিকে সরকারের নজর নেই, নাহলে কবেই এই ব্রিজ সারিয়ে নেওয়া যেত। একদিন বড়োসড়ো দুর্ঘটনা হবে, তারপর টনক নড়বে প্রশাসনের। তার আগেই এখান থেকে বদলি নেওয়া দরকার!
মিনিট দশেক কেটে গেল। স্মিথ বার বার ঘড়ি দেখছেন। একসময় তিনি অতিষ্ঠ হয়ে বললেন, “কী হল কেতু সিং?”
কেউ জবাব দিল না। বাধ্য হয়ে ভ্যানের দরজা খুলে নিচে নামলেন স্মিথ। দু’এক পা এগিয়েছেন, এমন সময় আচমকা পিছন থেকে কে যেন তার মাথায় বন্দুকের নল ঠেকাল। নিমেষে কাঠের পুতুলের মত স্থাণু হয়ে গেলেন স্মিথ। তাঁর শিরদাঁড়া বেয়ে একটা আতঙ্কের স্রোত বয়ে গেল। সর্বনাশ! পাখতুন!
ততক্ষণে তিনি দেখতে পেয়েছেন, কয়েকজন মানুষ তাঁকে ঘিরে ফেলেছে। আপাদমস্তক সালোয়ার আর কম্বলে ঢাকা এই মানুষগুলোর মুখ ঢাকা থাকলেও বোঝা যায়, ব্রিটিশ সরকারকে এরা মোটেও পরোয়া করে না। তাদের প্রত্যেকের হাতে বন্দুক। একজন তার সামনে এসে পশতো ভাষায় বলল, “এক পা নড়লে খুলি উড়িয়ে দেব। হাঁটু গেড়ে বস!”
নীরবে আদেশ পালন করলেন স্মিথ। এমন সময় পিছনদিকে থেকে বেরিয়ে এল কেতু সিং। বিস্ফারিত চোখে তিনি দেখলেন, পাখতুন দস্যুদের মধ্যে একজন এগিয়ে দিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, “শুক্রিয়া প্রাজি! আপ খবর নেহি দেতে তো ইয়ে মানসুবা কভি মুকম্মল নেহি হোতা!”
কেতু সিং লোকটার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, “ইয়ে তো মেরা ফর্জ থা শেখ সাহব।”
স্মিথ বিশেষ কিছু ভাববার অবকাশ পেলেন না। তিনি কিছু বলতেন, তার আগেই একজন তাঁর মুখে একটা রুমাল চেপে ধরল। কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান হারালেন তিনি। ভ্যানের ভিতরে বসে থাকা কনস্টেবলগুলোকে কেতু সিং আগেই বেহুঁশ করে দিয়েছে। স্মিথকে তাদের সঙ্গে ভ্যানের পিছনে শুইয়ে দেওয়া হল। তারপর সেই সালোয়ারধারক চন্দ্রসিংকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আইয়ে জনাব!”
চন্দ্রসিং নির্বিকার মুখে সব ঘটনা লক্ষ করছিলেন। এইবার সে মশকরার সুরে বলল, “আমাকে উদ্ধার করার জন্য এত আয়োজন? ব্যাপার কী শেখসাহব?”
কেতু সিং এগিয়ে এসে বলল, “লাহোর কন্স্পিরেসি কেস রিওপেন করা হয়েছে চন্দু। সরকার হন্স্ বোহরাকে সাক্ষী দিতে রাজি করিয়েছে। ভগতদের ছাড়া পাওয়া কঠিন। আমাদের প্রথম থেকে সব শুরু করতে হবে। তুমি জানো, তোমাকে ছাড়া আমরা এগোতে পারব না।”
চন্দ্রসিংয়ের মুখ কঠিন হয়ে গেল। ধীরে ধীরে ভ্যান থেকে নেমে এল সে। সবাই মিলে পুলিশ ভ্যানটা ঠেলে একপাশে সরিয়ে দিল, তারপর হাঁটতে লাগল সামনের দিকে। ব্রিজের অপর প্রান্তে একটা ট্রাক অপেক্ষা করেছিল তাদের জন্য। কেতু সিং আর চন্দ্রসিং সহ সকলেই উঠে পড়ল সেই ট্রাকে। ট্রাকটা চলতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল সেটা।
***
“কেউ একদিনে লেখক হয় না। কেউ। একদিনে বৈজ্ঞানিক হয় না। কোনও দেশও একদিনে মহান হয়ে ওঠে না। ঠিক সেভাবেই, বিপ্লবও একদিনে আসে না। দ্য রেভোলিউশন গ্রোজ ইনসাইড দ্য রেবেল। দ্য রেবেল ইমার্জেস ফ্রম দ্য রাবলস।”
বক্তৃতা শেষ হতেই ফ্রায়ার্স হলের শ্রোতারা উৎসাহে ফেটে পড়ল। ততক্ষণে মানুষটি এগিয়ে গিয়েছেন প্রেক্ষাগৃহের দ্বারের দিকে। এমন সময় দর্শকবৃন্দের মধ্যে থেকে একজন মহিলা উঠে দাঁড়ালেন। চেঁচিয়ে উঠে বললেন, “আর ইউ জাস্ট শেপিং দ্য রাবলস মিস্টার বোস?”
ভদ্রলোক ঘুরে তাকালেন। শ্রোতাকে দেখে তাঁর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। মৃদুহেসে তিনি বললেন, “ফিনিক্সরা তো ধ্বংসস্তূপ থেকেই জন্মায় মিস বিক্রমাসিংঘে। তাই নয় কী?”
আর কিছু না বলে তিনি এগিয়ে গেলেন। কিন্তু ততক্ষণে ডোরিন বিক্রমাসিংঘে যা জানার জেনে গিয়েছেন। অন্যদের চোখ এড়িয়ে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। সুভাষ অগাস্ট মাসে বার্লিন যাবেন, তার আগেই নিউ বার্লিন কমিটির সঙ্গে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ঠিক করে নেওয়া দরকার।
পরদিন সকালে বার্লিনের শোনেবার্গ অঞ্চলের একটা বইয়ের দোকানে একজন শিখ যুবককে দেখা গেল। পুরোনো বইয়ের সেল্ফের সামনে দাঁড়িয়েছিল সে। একজন অল্পবয়সী জার্মান মেয়ে তার দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “কী বই খুঁজছেন?”
“রণসজ্জায় জার্মানি!” মেয়েটির দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল যুবক, “ইটস আ বেঙ্গলি বুক। লেখকের নাম অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য।”
মেয়েটির মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে একদৃষ্টে যুবকের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “দুঃখিত। বইটা আমাদের কাছে নেই। আপনি কোত্থেকে আসছেন?”
যুবকটি চাপা স্বরে বলল, “ফিনিক্সের কাছ থেকে।”
মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমাদের নিজস্ব সংগ্রহে কিছু বই আছে। সেখানে খুঁজে দেখতে পারেন। ওই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে চলে যান। বাঁ দিকে তিন নম্বর ঘর। এই যে চাবি।”
যুবকটি নিঃশব্দে চাবি নিয়ে উঠে গেল। নির্দিষ্ট ঘরে গিয়ে সত্যিই একটা বুকশেল্ফ্ দেখতে পেল সে। সামনেই অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্যের বইটার জার্মান অনুবাদ রাখা আছে। অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি। সেটা তুলে নিতেই বুকশেল্ফ্টা একপাশে সরে গিয়ে একটা গোপন দরজা দৃশ্যমান হল। সেখান থেকে ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গিয়েছে। মনে মনে হাসল যুবক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘চট্টো’ যে খেল দেখিয়েছিলেন, তার কিছু কিছু চিহ্ন এত বছর পরেও রয়ে গিয়েছে।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে একটা বড়ো ঘর, তার পাশে একটা ছোট্ট রেডিও স্টেশন। তাকে দেখে চারজন উঠে দাঁড়ালেন। এদের প্রত্যেককেই সে চেনে। সামনের ভদ্রলোক সহাস্যে বললেন, “কেতু সিং ওরফে খবরি জট্টা! কী খবর তোমার?”
কেতু সিং হাসতে হাসতে বলল, “ওই নামটা ভুলে যান হরদয়াল সাব। এখন আমি প্রমোশন পেয়েছি।”
লালা হরদয়াল তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আরে পাগল নাকি? নিক নেম ইস ইওর প্রাইড। এই ধরো, বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, রমন পিল্লাই আর অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য বার্লিন কমিটির তিনজন পিলার, ওদের আসল নামই অর্ধেক মানুষ জানে না। আমাদের মতো অনেকেই তাঁদের চট্টো-চম্পক-রাইটার বলেই চেনে।”
“কেমন আছেন ত্রিমূর্তি?”
“ভালোই আছেন,” লালাজি খানিকটা নিভে গিয়ে বলল, “পিল্লাই ছাড়া দুজনের সঙ্গেই মাঝেমধ্যে কথা হয়। পরামর্শও নিতে হয়। নতুন করে সব শুরু করা কি সহজ? তবে এখন সে-সব কথা থাক! জট্টা, তুমি সম্ভবত ইকবাল সাহেবকে চেনো। ইনি ইতালিতে আমাদের কাজকর্ম দেখছেন। ভালো খবর হল, ইন্ডিয়া হাউসের প্রাক্তন সদস্যদের মধ্যে অনেকেই এই মুভমেন্টকে সাপোর্ট করছেন, প্রয়োজনীয় ফান্ডিংও আসতে শুরু করেছে। আমেরিকার নেটওয়ার্ক প্রায় তৈরি, সিঙ্গাপুর ইউথ লিগ আর মালয় রেবেল গ্রুপের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তুমি ডোরিনকে জানাও, শিপমেন্ট ঠিক সময় পৌঁছে যাবে। বাট সি নিডস টাইম। উই অল নিড টাইম। জট্টা, ইট্স্ আ লং শট গেম। গদর ক্রান্তির মতো হুড়োহুড়ি করলে ইনকলাবের পুরো পরিকল্পনা বানচাল হয়ে যাবে।”
কেতু সিং ঘাড় হেঁট করল। তারপর একটু ইতস্তত করে বলল, “হরদয়াল সাব, একটা কথা বলুন। জার্মানিতে তো ন্যাশনালিস্ট সোশ্যালিস্ট পার্টি ক্ষমতায় এসেছে, তাহলে এত গোপনীয়তা অবলম্বন করার প্রয়োজন কী? হিটলার তো ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থনই করেছিল।”
লালাজি কেটলি থেকে চা ঢালতে ঢালতে বললেন, “রাজনীতিতে ওসব করতে হয় জট্টা। এখানে কেউ কারো বন্ধু নয়। হিটলারের মতো হাইপার ন্যাশনালিস্ট তো নয়ই। এখন ব্রিটেনের সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি করছে, কাল হয়তো ওদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করে বসবে। ইংরেজরাও কম যায় না। কী জানো, বিপ্লব আসে সাধারণ মানুষের হাত ধরে। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে আমাদের সেই সব ছেলেমেয়েদের আহ্বান জানাতে হবে, যারা স্বাধীনতা বলতে শুধু দেশের স্বাধীনতা নয়, বরং মানুষের স্বাধীনতার কথা ভাবে। একবার যে ভুল আমরা করেছি, তার পুনরাবৃত্তি করলে কিছুই অর্জন করা যাবে না। সুভাষ সেটা ভালোই জানে, সেইজন্য পকেটে চারটে ব্যাক আপ প্ল্যান রেডি থাকে ওর। যাই হোক, চন্দুর খবর কী? তোমার সঙ্গে পাহাড়িটার দেখা হয়েছে নাকি?”
কেতু সিং হাসতে হাসতে বলল, “প্রাজি, ওই পাহাড়িই এই ইনকলাবের তুরুপের তাস।”
উদযাপন
সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। থেমে থাকে না জীবনও। সাম্বু যে ঠিক কখন বড়ো হয়ে উঠল, রাধি বুঝতেও পারল না। সেই ছোট্ট সাম্বু আজ আরএএফ-এর ফ্লাইট অফিসার সমর শিখর। ঝকঝকে এই তরুণকে এয়ারমেনরা রীতিমত সমীহের চোখে দেখে। সুব্রত মুখার্জি এয়ারফোর্সের প্রথম ভারতীয় পাইলট হিসেবে যে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছিলেন, সাম্বু সেই ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলেই তাদের বিশ্বাস। সাম্বুও যতটা সম্ভব শিখে নিতে চায় সিনিয়র অফিসারদের কাছ থেকে। স্কোয়ার্ডেন লিডার কে কে মজুমদার ওরফে ‘জাম্বো’ এই ইউনিটের প্রাণভোমরা, তিনি সাম্বুকে নিয়ে মাঝেমধ্যেই ‘ফ্লাই’ করতে বেরিয়ে যান। বলেন, “দেশটা চিনতে হবে হে! আমাদের কত সুবিধা, চাইলে আকাশ থেকেও মাতৃভূমিকে দু’ চোখ ভরে নিতে পারি। কী জানো, ট্রেনিং সব কিছুই শেখাতে পারে, শুধু দেশপ্রেম ছাড়া। ওই আবেগটা ভিতর থেকেই আসে। আমি এখনও মাঝেমধ্যে সন্ধেবেলা আরএএফ গ্রাউন্ডের রানওয়েতে গিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে থাকি, বদলে যাওয়া মেঘের রঙ দেখি ককপিটে বসে। কী সুন্দর আমাদের দেশ! কিন্তু মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমরা এই দেশের জন্য আর কী করেছি?”
সাম্বু নীরবে তাঁর কথা শোনে। নিজে বিশেষ কিছু বলে না সে। কিন্তু প্রতিটা দিনের অভিজ্ঞতা সযত্নে সঞ্চিত করে রাখে মনের গভীরে। সে জানে, একদিন এই অভিজ্ঞতার ঝুলি তার কাজে আসবে।
রাধির জীবনও অবশ্য অন্য খাতে বয়ে গিয়েছে। হোয়াইট সাহেবের সংস্পর্শে আসার পর তার জীবনে যে বাঁকবদল ঘটেছিল, তাতে বদলে গিয়েছিল সব কিছু। বিষ্ণুকূপ্পমের সেই গাঁ ছেড়ে কুডলুর, সেখান থেকে মাদ্রাজ। নতুন পরিবেশ, নতুন বাড়ি, নতুন মানুষ। সাম্বুর পাশাপাশি রাধিকেও জোর করে পড়াশুনা শিখিয়েছিলেন হোয়াইট সাহেব, মাদ্রাজ ট্রেডিং কোম্পানিতে কাজও জোগাড় করে দিয়েছিলেন। নিজে যদিও উধাও হয়ে গিয়েছিলেন কয়েকদিন পর, কিন্তু রাধিদের কোনোরকম অসুবিধা হতে দেননি। ধীরে ধীরে রাধি বুঝেছে, হুবার্ট হোয়াইট কী বিশাল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। যত দিন গেছে, তার ওপর ভরসা বেড়েছে রাধির, সঙ্গে বেড়েছে আত্মবিশ্বাসও। হোয়াইট সাহেব যখন আসতেন, তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হত দুজনের।
১৯৩৮ সালে যখন রাধি প্রথম তার সঙ্গে কলকাতায় এসেছিল, এ শহরের কিছুই জানা ছিল না তার। কিন্তু প্রাথমিক সংকোচ কেটে যাওয়ার পর তাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ততদিনে বড়ো হয়ে উঠেছে সাম্বুও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সে রয়্যাল এয়ারফোর্সে ‘হাওয়াই সেপয়’ হওয়ার প্রশিক্ষণ নিতে করাচি চলে যায়, সেখান থেকে ইংল্যান্ডের ক্র্যানওয়েল। আগের বছরেই দেশে ফিরেছে সে। রাধি অবশ্য কলকাতাতেই আছে। মাসের মধ্যে বেশ কিছুদিন তাকে বাইরে বাইরেই কাটাতে হয়, কাজ শেষ হলে সে ফিরে আসে কলকাতায়। মাঝে মাঝে সে অবাক হয়ে ভাবে, এক জীবনে একাধিক জীবন কাটাচ্ছে। মুরারিই যেন আড়াল থেকে তাকে এই নতুন জীবনের সন্ধান দিয়ে গেছে।
করনপুরার কোলিয়াড়ি থেকে বিষ্ণুকুপ্পম, মাদ্রাজ, কলকাতা… একসময় দু’মুঠি অন্নের জন্য আঁকুপাকু করেছে, আর আজ কিনা সে এই বিপ্লবের ভাগীদার। এও তো তার মুক্তি! তার স্বাধীনতা!
আন্ডারগ্রাউন্ড সেন্ট্রাল অর্গ্যানাইজেশনের বা ইউসিও-এর বৈঠকে অংশগ্রহণ করার পর থেকে রাধির খাতিরও বেড়ে গিয়েছে, এখন সে রাধিকা দেবী বলে পরিচিত। অল ইন্ডিয়া মহিলা কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা সুচেতা কৃপলানির সঙ্গে রাধির দীর্ঘদিনের যোগাযোগ, মাদ্রাজ ট্রেডিং কোম্পানিতে থাকাকালীন শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে তারা একসঙ্গে আওয়াজ তুলেছিল। এই সুবাদে বেশিরভাগ মানুষ তাকে সমাজকর্মী বলেই ধরে নিয়েছে, রাধিও আপত্তি করেনি। কয়েকজন আবার মনে করে, হুবার্ট হোয়াইট আর রাধির মতো কয়েকজন গোপনে রাসবিহারী বোসকে খবর পাচার করে। এই প্রবাসী নেতাকে নিয়ে এখন আলোচনা তুঙ্গে, কারণ রাসবিহারী বোস আর মোহন সিং দিনকয়েক আগেই সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ বাহিনীর সূচনা করেছেন।
জল্পনা চলছে সুভাষকে নিয়েও। ব্রিটিশদের চোখে ফাঁকি দিয়ে তিনি কোথায় গেলেন, কীভাবে ফিরে এসে আত্মপ্রকাশ করবেন, সে নিয়ে তুমুল আলোচনা হয় রকের আড্ডায়। এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আঁচ এসে লেগেছে ভারত মহাসাগরেও। জার্মান ইউ বোট আর জাপানি সাবমেরিনের আক্রমণে একের পর এক ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হচ্ছে, কিন্তু অন্যদিকে সোভিয়েত সৈন্যরা ক্রমাগত হিটলারের বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন।
৮ই মার্চ, ১৯৪২ সাল। ইউসিও-র পক্ষ থেকে রসা রোডের জমিদারবাড়িতে একটা গোপন বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে, হোয়াইট সাহেবের নির্দেশে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হল রাধি। পুরোদস্তুর ইউরোপিয়ান কায়দার বাড়ি, জনা তিরিশেক যুবক ও যুবতী বসে আছেন, সকলের হাতেই ডোরাকাটা নীল সাদা রুমাল। এই হল এই গোপন মিটিংয়ে ঢোকার ‘পাস।’ ভুলাভাই দেশাই, অরুণা আসফ আলি, অচ্যুত পটবর্ধনকে দেখতে পেল রাধি, আর এস রুইকর আর হরিসাধন ঘোষালও আছেন। সে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পড়ল। অপেক্ষা করতে হবে।
“রাধিকা দেবী!”
মিনিট কুড়ি পর কাঁধে টোকা পড়তে মুখ ফেরাল রাধি। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক ভদ্রমহিলা। তাঁর ব্যক্তিত্বময় চেহারা আর গলার স্বর শুনেই বোঝা যায়, ইনি কোনও সাধারণ মহিলা নন।
রাধি নমস্কার করে বলল, “রেণুকাদি! কেমন আছেন?”
রেণুকা রায় মিষ্টি হেসে বললেন, “ভালো। সুচেতা বলছিল তোমার কিছু কাজ আছে আমার সঙ্গে।”
রাধি সসঙ্কোচে বলল, “রেণুকাদি, আমার ছেলে সমর এখন কানপুরে পোস্টেড। রয়াল ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সের ফ্লাইট অফিসার।”
রেণুকা কৌতূহলী হয়ে বললেন, “আরে বাহ! আমার ভাই সুব্রতও তো আছে। এখন তো ও উইং কম্যান্ডর হয়ে গেছে। তুমি হয়তো জানবে। আমি তো পরের সপ্তাহেই ওর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।”
“জানি।” রাধি এইবার এক পা এগিয়ে এসে বলল, “রেণুকাদি, আপনি সুব্রতদাকে একটা চিঠি পৌঁছে দিতে পারবেন?”
রেণুকার ভুরু কুঁচকে গেল। তিনি বললেন, “কীসের চিঠি?”
রাধি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “চিঠিটা এসেছে মস্কো থেকে। সেটা সুব্রতদার কাছে পৌঁছানো খুব জরুরি। বুঝতেই পারছেন, আপনি সাহায্য না করলে এই চিঠি পৌঁছানোর কোনও উপায় নেই।”
ডাকে পাঠানো সব চিঠিই যে সেন্সর করা হয়, সেটা রেণুকা জানতেন। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “দাও। চিঠি পৌঁছে যাবে।”
***
দিনটা শুরু হয়েছিল সাধারণ ভাবেই। সকালে উঠে পোষা কুকুরকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন প্যাট্রিক গ্রেগ, তারপর বাড়ি ফিরে ব্রেকফাস্ট করেছেন ধীরেসুস্থে। দুই ছেলেময়ে স্কুলের জন্য বেরিয়ে যাওয়ার পর এক কাপ কফি সহ খবরের কাগজ পড়া তাঁর বহুদিনের অভ্যাস, সে নিয়মেরও অন্যথা হয়নি। পাতা জোড়া যুদ্ধের খবর। হিটলারের নাজি সৈন্যদের গোঁয়ার্তুমি বেড়েই চলেছে, কিন্তু আমেরিকা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার পর খানিকটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। মার্কিন বি-২৫ প্লেনের বোমাবাজিতে জাপানের বেশ ক্ষতি হয়েছে, কোরাল সি-র যুদ্ধেও তাদের হার স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় মহাসাগরে জার্মান-জাপান নৌবহর এখনও অসম্ভব শক্তিশালী, মিত্ররাষ্ট্ররা সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণ করেও তাদের সঙ্গে পেরে উঠছে না। প্রধানমন্ত্রী চার্চিল অবশ্য নিরুৎসাহিত হননি।
কফিতে শেষ চুমুক দেবেন, এমন সময় টেলিফোনটা বেজে উঠল। প্যাট্রিক ফোনটা তুলতেই একজন গম্ভীর স্বরে বলল, “মিস্টার প্যাট্রিক গ্রেগ!”
“বলছি!”
“আমি রেজি উইলসন। মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স থেকে কথা বলছি। আপনি এক্ষুনি ব্লেচলে পার্কের অফিসে চলে আসুন। ওয়েস্টমিন্স্টারের পক্ষ থেকে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। ব্যাপারটা জরুরি।”
তাঁকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোনটা কেটে গেল। প্যাট্রিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হ্যাঙ্গার থেকে কোটটা তুলে নিলেন, তারপর স্ত্রী সারাকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে।
তাঁর বাড়ি থেকে ব্লেচলে পার্ক খুব একটা দূরে নয়। কিন্তু প্যাট্রিককে সচরাচর সেখানে যেতে হয় না। তিনি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার পলিটিকাল ইন্টেলিজেন্স কমিটিতে আছেন, ভারতবর্ষের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখাই তাঁর প্রধান কাজ। ভারতীয় বিপ্লবীদের পরিকল্পনা ঠেকাতে এবং বিদ্রোহ দমন করার উদ্দেশ্যে এককালে এই গুপ্তচর সংগঠন তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনের ধার কমে এসেছে বলে তাকে আর বিশেষ মাথা ঘামাতে হয় না। প্রভাবশীল নেতা আর মিউটিনিয়ারদের মধ্যে অধিকাংশকেই পরলোকে পাঠানো হয়েছে, যারা আছে তাদের সামলানোর জন্য পুলিশই যথেষ্ট। কংগ্রেস আর মুসলিম লিগের নেতারা শান্তিমূলক সমাধানের দাবি করছে, ওদের নিয়ে অত মাথা ঘামানোর কিছুই নেই। ব্যতিক্রম ওই বোস। ওকে নিকেশ করতে পারলেই বিপ্লবীদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেওয়া যাবে।
রেজি অপেক্ষা করছিলেন। কনফারেন্স রুমে আরো কয়েকজন ছিলেন, অধিকাংশই বিভিন্ন সরকারি বিভাগের আধিকারিক। পরিচয় পর্ব শেষ হলে রেজি বললেন, “জেন্টলমেন, দিনকয়েক আগে আমরা কিছু রেডিও মেসেজ ইন্টারসেপ্ট করেছিলাম। ডিসাইফারিংয়ের কাজ চলছিল। আজ সকালে সংকেতের অর্থ উদ্ধার হয়েছে।”
সবাই কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। রেজি বললেন, “ইটস আ প্ল্যান অফ মিউটিনি ইন সিলোন ডিফেন্স ফোর্স। উদ্দেশ্য, কোকো আইল্যান্ডে অবস্থিত ব্রিটিশ গ্যারিসন আর্টিলারির ওপর কব্জা করে অ্যামুনিশান লুট করা।”
প্যাট্রিক ভুরু কুঁচকে বললেন, “রেজি, নাজিরা আমাদের বিভ্রান্ত করার জন্য এমন ভুয়ো সংকেত আগেও পাঠিয়েছে। সিলোনে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে রেজিস্টেন্স প্রায় নেইই। আর ধর যদি থাকেও, একটা আর্টিলারি লুট করে কি স্বাধীনতা আসবে?”
রেজি দু’এক মুহূর্ত প্যাট্রিকের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “মিস্টার গ্রেগ, কোকো আইল্যান্ড থেকে আজ সকালেই খবর এসেছে, বিপ্লবীরা গ্যারিসন আর্টিলারি অধিকার করে নিয়েছে। এই বিদ্রোহে প্রধান ভূমিকা এসডিএফ-এর অফিসার গ্রাতিয়েন ফের্নান্দো। আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরটাও জানিয়ে দিই। আপনারা সবাই হয়তো জানেন, ইন্ডিয়ান ওশানে ব্রিটিশ নৌবহর যে অস্ত্র ব্যবহার করছে, তার অধিকাংশ কয়েকটা ব্রিটিশ কলোনির অন্তর্ভুক্ত কয়েকটা দ্বীপে রাখা হয়েছে। কোকো আইল্যান্ড তার একটা। বুঝতেই পারছেন, অ্যালায়েড। ফোর্সের। কাছে। এই। গ্যারিসনের গুরুত্ব ঠিক কতটা?”
এইবার প্যাট্রিকের চোয়াল ঝুলে গেল। জাপানি যুদ্ধপোতদের মোকাবিলা করতে গিয়ে রয়্যাল নেভি যে পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করছে, তত অস্ত্র নিয়ে যাত্রা করা সম্ভব নয়। অ্যান্টি এয়ারক্রাফট মিসাইল, টর্পিডো, অ্যান্টি সাবমেরিন অ্যামুনিশন, নেভাল মাইন আর নৌযুদ্ধের জরুরি অস্ত্রশস্ত্র ছাড়াও এক একটা যুদ্ধপোতে অসংখ্য যন্ত্রপাতি থাকে; জাহাজডুবি হলে সে-সমস্ত হাতছাড়া হয়ে যায়। তাতে আর্থিক ক্ষতি তো হয়ই, দীর্ঘকালীন যুদ্ধ চালানোর জন্য অস্ত্র সরবরাহ করাও মুশকিল হয়। তাই ভারতীয় মহাসাগরের বিভিন্ন দ্বীপে কয়েকটি গ্যারিসন বা অস্ত্রাগার বানানো হয়েছে। প্রয়োজনে ব্রিটিশ এয়ারক্রাফট সেখান থেকে অস্ত্র তুলে জাহাজে পৌঁছে দেয়। কোকো আইসল্যান্ডে যে পরিমাণ অস্ত্র থাকার কথা, তাতে সিলোনের বিপ্লবীরা কয়েক বছর ধরে ব্রিটিশদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবে। একমাত্র উপায়…
“এয়ার স্ট্রাইক!” উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন প্যাট্রিক।
“ঠিক।” অন্য এক আধিকারিক বললেন, “আরএএফ কী করছে? এয়ারস্ট্রাইক করলেই তো বিপ্লবীদের কোমর ভেঙে যাবে।”
রেজি গম্ভীর হয়ে বললেন, “এই মুহূর্তে প্রায় তিরিশটা যুদ্ধজাহাজ কোকো আইল্যান্ডকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে। নজরদারি চলছে আকাশপথেও। জাপানিজ বোমারু বিমান ঘুরে বেড়াচ্ছে সর্বক্ষণ। তাও চেষ্টা করা হয়েছিল। লাভ হয়নি কিছুই। উল্টে অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গানের আঘাতে বেশ কিছু স্পিটফায়ার বিমান হারিয়েছি আমরা। কিন্তু এটা কিছুই নয়। কাল রাতে আরো কিছু রেডিও মেসেজ ইন্টারসেপ্ট করেছি আমরা। কোডব্রেকাররা যদি ভুল না করে থাকে, তাহলে খুব তাড়াতাড়ি এইরকম হামলা অন্য গ্যারিসনগুলোতেও হতে চলেছে।”
প্যাট্রিক বুঝতে পারলেন, তার কপালের শিরা দপদপ করছে। জাপানিজ নৌবহর সহযোগিতা করছে মানে বোঝাই যায়, সিলোন ডিফেন্স ফোর্সের এই বিদ্রোহ শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক উত্তেজনার ফসল নয়। এর পিছনে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা আছে। বিশ্বযুদ্ধের এই কঠিন সময়ে নৌযুদ্ধে প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র হাতছাড়া হয়ে গেলে কী হবে, সেটা ভেবেই তাঁর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
ঘরে থমথমে নীরবতা, কেউ কোনও কথা খুঁজে পাচ্ছে না। দু’ একজন রুমাল বের করে ঘাম মুছছে।
রেজি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আমাদের জরুরি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ঘটনাটা আপনাদের জানিয়ে রাখতে। বি অ্যালার্ট। ভবিষ্যতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে যেন এরকম কোনও পরিস্থিতির সম্মুখীন না হতে হয়। দ্যাটস অল ফর নাউ। এখন আপনারা যেতে পারেন।”
সবাই একে একে বেরিয়ে যাওয়ার পর রেজি প্যাট্রিকের দিকে ফিরে বললেন, “আপনি আমার সঙ্গে আসুন।”
প্যাট্রিক নীরবে রেজিকে অনুসরণ করলেন। রেজি তাঁর নিজস্ব কামরায় গিয়ে তাঁকে বসতে বললেন, তারপর টেবিলের ওপর থেকে একটা ছবি তুলে প্যাট্রিকের দিকে এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “একে চেনেন?”
প্যাট্রিক ছবিটা হাতে নিয়ে বললেন, “এ তো কেতু সিং। ব্রিটিশ পুলিশে কাজ করত। বিশ্বাসঘাতকতা করে একজন বন্দিকে পালানোর পথ করে দিয়েছিল। তারপর থেকে নিজেও বেপাত্তা। বছর চারেক আগে খবর পেয়েছিলাম, লোকটা ইউরোপেই আছে।”
রেজি ছবিটা ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, “কেতু সিং হ্যাজ বিন ওয়ার্কিং অ্যাজ আ মিডলম্যান ফর রেবেলস। এখনও সেই কাজটা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ভারতের বাইরে থেকে। তার সাহায্য না পেলে ওই উধম সিং কোনোদিনই এ-দেশে এসে ডায়ারকে হত্যা করতে পারত না। আমরা খবর পেয়েছি, সপ্তাহখানেক আগে সে ‘লংকা সমা সমাজ’ পার্টির সদস্য হিসেবে সিলোনেও গিয়েছিল।”
“সিলোনে?” প্যাট্রিক বিস্মিত স্বরে বললেন, “কিন্তু কেন?”
রেজি উত্তেজনায় হাঁটু নাড়াচ্ছিলেন। এইবার টেবিলের ওপর থেকে একটা পেপারওয়েট তুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, “সেটা কেউই জানে না। কিন্তু আমাদের সন্দেহ, কোকো আইল্যান্ডের ঘটনার সঙ্গে কেতু সিং কোনোভাবে জড়িয়ে আছে। গত কয়েক দিন ধরে বার্লিন থেকে পাঠানো কিছু মেসেজ ইন্টারসেপ্ট করেছি আমরা। তাতে ঠিক কী বলা হয়েছে, সেগুলো আমরা এখনও জানতে পারিনি। কিন্তু মেসেজগুলো কোথায় কোথায় পাঠানো হয়েছে সেটা মোটামুটি আন্দাজ করা গেছে।”
“কোথায়?”
“কিনিয়া, ট্যাঙ্গানিকা, উগান্ডা… সংক্ষেপে পূর্ব আর পশ্চিম আফ্রিকার একাধিক জায়গায়। এছাড়াও সিঙ্গাপুর, ব্রিটিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ, বার্মা, সিলোন…”
“মানে যেখানে যেখানে ব্রিটিশ কলোনি আছে?” প্যাট্রিক রেজিকে থামিয়ে দিয়ে বললেন।
“প্রেসাইসলি!” রেজি পেপারওয়েটটা মুঠোয় ধরে জবাব দিলেন, “সেটা বোঝা মোটেও কঠিন নয়। বুঝতেই পারছেন, এই জায়গাগুলো আমাদের মিলিটারি বেস। আফ্রিকা আর ইন্ডিয়া থেকে নিয়োগ করা লক্ষ লক্ষ সৈনিক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে লড়ছে, আরএএফ আর রয়্যাল নেভির অস্ত্রশস্ত্রও আসে এখানে মজুদ অস্ত্রাগার থেকে। পাশাপাশি অনেক জায়গায় অস্ত্র নির্মাণের কারখানাও তৈরি করা হয়েছে। এসব সবাই জানে। কিন্তু মিটিংয়ে যেটা ওপেনলি বলিনি সেটা হল, গত দু’সপ্তাহে প্রায় তেরোটা জায়গায় আমাদের গ্যারিসন আর্টিলারির ওপর হামলা হয়েছে। এই হামলাগুলো সুনিয়ন্ত্রিত পরিকল্পনার অংশ। হয় বিদেশী শক্তির মদত নেওয়া হয়েছে, নয় স্থানীয় রেবেল গ্রুপ আর মিউটিনিয়ারদের ভূমিকা আছে। দু’এক জায়গায় তাদের সরিয়ে পুনর্দখল করলেও দেখা গেছে, গ্যারিসন খালি। সব অস্ত্র লোপাট।”
প্যাট্রিকের মাথায় যেন বাজ পড়ল। তিনি কথা বলতে পারলেন না, তাকিয়ে রইলেন বিস্ফারিত চোখে। রেজি বললেন, “সরকার ইচ্ছে করেই কথাগুলো জনসমক্ষে জানায়নি। যুদ্ধের মাঝে এসব জানাজানি হলে দেশের মুখে চুনকালি পড়বে। নতুন অস্ত্র তৈরির জন্য কনট্র্যাক্ট ইতিমধ্যেই দিয়ে দেওয়া হয়েছে। হ্যাঁ, এই আর্থিক ক্ষতির মাশুল দিতে হয়তো অন্য জায়গায় খরচ কমাতে হবে। কিন্তু উপায় নেই। কিন্তু খটকা অন্য জায়গায়। আর সেইজন্যই আপনাকে ডেকেছি।”
প্যাট্রিক অধৈর্য হয়ে বললেন, “খুলে বলবেন কী হয়েছে?”
রেজি কিছুক্ষণ প্যাট্রিকের চোখের দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর চাপা স্বরে বললেন, “আমাদের সন্দেহ, এই ঘটনার পিছনে ভারতীয় বিপ্লবীদের হাত আছে। সিলোনে কেতু সিংয়ের উপস্থিতি তার প্রমাণ।”
“আর ইউ সিরিয়াস?” প্যাট্রিক বিরক্তি গোপন করলেন না। তেতো স্বরে বললেন, “কেতু সিং মিডলম্যান হিসেবে রেবেলদের সাহায্য করতেই পারে। যুদ্ধের সময় অস্ত্রের দালালি করার মানুষের অভাব হয় না, সেটা আপনিও জানেন। এশিয়ানরা এই কাজটা আরো ভালো পারে। কিন্তু এখানে ভারতীয় বিপ্লবীদের ভূমিকা কী? আপনি বলছেন ভারতের বিপ্লবীরা জাহাজে করে প্যাসিফিক আইল্যান্ড আর সিলোনে গিয়ে গ্যারিসন লুট করেছে?”
রেজি উত্তেজিত হলেন না। ঠান্ডা গলায় বললেন, “মিস্টার গ্রেগ, আপনি ভুলে যাচ্ছেন বোসকে এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। আপনি সম্ভবত জানেন বোস হিটলারের সঙ্গে চুক্তি করতে বার্লিনে গিয়েছিল। ওদিকে তার মেন্টর রাসবিহারী বোস জাপানিরা সিঙ্গাপুর দখল করার পর ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির গোড়াপত্তন করেছে। আমাদের ইন্টারসেপ্ট করা মেসেজগুলোও কিন্তু বার্লিন থেকেই পাঠানো হয়েছে। ইট্স্ টু মাচ অফ আ কোইনসিডেন্স! বার্লিন কমিটির কথা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি। সিক্রেট কমিউনিকেশনে তারা নাজিদের চেয়ে কম যেত না। আমার বিশ্বাস, বার্লিন কমিটি আবার সক্রিয় হয়েছে। কিন্তু, এইবার তারা অনেক সতর্ক। আমি আপনাকে অনুরোধ করছি, পলিটিকাল ইন্টেলিজেন্স কমিটি এখন থেকেই ব্যাপারটা খতিয়ে দেখুক। হয়তো এই আশঙ্কা ভুল, কিন্তু এই মুহূর্তে কোনোরকম ঝুঁকি নেওয়া আমাদের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। আশা করি আপনি আমার কথার গুরুত্ব বুঝেতে পারছেন।”
প্যাট্রিক সম্মতি জানিয়ে উঠে পড়লেন। একটা চাপা উদ্বেগ তাঁকে স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছে না।
নিজের দপ্তরে এসে কেতু সিংয়ের পুরোনো ফাইলগুলো খুঁজে বের করলেন প্যাট্রিক। এই ।লোকটা ।সম্পর্কে সব কিছু তাঁর জানা দরকার।
***
“ওপেন ইওর আইস, ইউ সোয়াইন!”
চোখ খুলতেই বলাই দেখল, হ্যারিস সাহেব জাহাজের রেলিংয়ে ঠেস দিয়ে বসে একটা সিগারেটে টান দিচ্ছেন। তাঁর সারা গা রক্তে ভেসে যাচ্ছে, মুখেও রক্তের ছিটে, বাঁ হাতটা মাঝখান থেকে দু’ আধখানা হয়ে ঝুলছে। কিন্তু মুখে অদ্ভুত একটা হাসি। বলাইয়ের হাতে সিগারেটটা ধরিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, “আরএএফ হ্যাজ অ্যারাইভড। তোমার ভাগ্য ভালো ছোকরা। এ যাত্রা প্রাণে বেঁচে গেলে।”
বলাইয়ের তখন কান ভোঁ ভোঁ করছে। মাটিতে ছিটকে পড়ার সময় তার মনে হয়েছিল আর কোনও আশা নেই। শত্রুপক্ষ তাদের ঘিরে ধরেছে চারদিক থেকে। তাদের মেশিনগানের ম্যাগাজিন খালি করে ৫৭-এমএম গুলির ঝাঁক মৃত্যুবাণের রূপ ধরে তাদের দিকে ছুটে আসছে। বলাইয়ের সামনেই কয়েকজন ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছে, বাকিরা প্রাণ বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে জলে। নৌবহরের সঙ্গে থাকা মোটর লঞ্চারে পর পর বিস্ফোরণ হচ্ছে, জাপানি বোমারু বিমানগুলো গোঁ গোঁ শব্দ করে চক্কর মারছে ক্যায়ুকপু বন্দরের ওপরে। মাঝে মাঝে শিকারি চিলের মতোই গোঁত্তা মেরে এগিয়ে আসছে তারা, বোমা ফেলছে ব্রিটিশ কনভয়ের ওপর। বলাই কিছু বোঝার আগেই একটা বোমা এসে পড়েছিল তার সামনে। তার দেহটাও ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত, যদি না হ্যারিস সাহেব শেষ মুহূর্তে তাকে হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে নিতেন।
সিগারেটে টান দিয়ে কিছুটা ধাতস্থ হল বলাই। সেটা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য মুখ তুলতেই সে দেখল সাহেবের মুখ থেকে ভলকে ভলকে রক্ত বেরোচ্ছে। সেই অবস্থাতেই তার হাত থেকে সিগারেটটা ছিনিয়ে নিলেন তিনি, পর পর কয়েকটা টান দিলেন তাতে। বলাইয়ের দিকে তাকিয়ে একবার হাসলেন, তারপর স্বভাবসিদ্ধ রসিকতার ভঙ্গিতে বললেন, “ডোন্ট গেট কিল্ড্ কিড। দিস ইজ নট ইওর ওয়ার।” এরপরেই তাঁর চোখের পাতা বন্ধ হয়ে গেল ধীরে ধীরে।
যুদ্ধ যে এত ভয়ঙ্কর হতে পারে, বছর কয়েক আগেও সে সম্পর্কে বলাইয়ের কোনও ধারণা ছিল না। সে বাংলার মাটিতে জন্মেছে, শস্যশ্যামলা প্রকৃতির মাঝে বড়ো হয়েছে, রবীন্দ্রনাথ আর বঙ্কিমের গল্প উপন্যাস পড়ে শৈশব আর কৈশোর কেটেছে তার। আর চারজনের মতো ছোটবেলায় নিজেকে শিবাজী আর বীর হাম্বির বলে কল্পনা করত ঠিকই, কিন্তু ছোটখাটো প্যাংলা ছেলেটার এই দিবাস্বপ্ন সত্যি হওয়ার কোনও সম্ভাবনা ছিল না।
কিন্তু বলাই দমেনি। বয়স বাড়ার পাশাপাশি দেশের প্রতি তার টানও বেড়েছিল। সেইজন্যই বিশ্বযুদ্ধের কঠিন সময়ে সরকারি আহ্বানে সাড়া দিয়ে সে নৌবাহিনীতে চাকরির আবেদন করেছিল, নির্বাচিত হওয়ার পর ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফিস্ট হিসেবে যোগ দিয়েছিল রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভিতে। কিন্তু সত্যি বলতে তখনও বলাই জানত না, একদিন তাকে সত্যি সত্যিই যুদ্ধে যেতে হবে।
প্রথমদিকে তার অসুবিধা হয়নি। দেশের কাজে যদি যুদ্ধে যেতেই হয়, সে তো গর্বের কথা। কিন্তু বার্মা অপারেশনে আসার পর থেকেই বলাই ক্রমাগত একটা দ্বন্দের মধ্যে দিয়ে চলেছে। টেকনাফ, কক্সবাজার হয়ে বার্মার দিকে এগোনোর সময় বারবার জাপানিদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বেধেছে, লোকসান হয়েছে দু’পক্ষেরই। শয়ে শয়ে মানুষ মারা গিয়েছে, জলসমাধি ঘটেছে অত্যাধুনিক জাহাজগুলোর। কিন্তু যুদ্ধ থামেনি।
বলাই অবাক হয়ে দেখেছে, অল্পবয়সী গুর্খা আর গাড়োয়ালি সৈন্যরা আরাকানে ঘাঁটি বাঁচানোর জন্য লড়ছে, ফরটিনথ ইন্ডিয়ান ডিভিজনের মারাঠি আর তামিল ছেলেরা জাপানিদের সি-বোর্ন কমিউনিকেশন রুখতে রাত জেগে কাজ করছে, আরএআইএফ-এর বাঙালি পাইলটরা নিরন্তর এয়ার সাপোর্ট দিচ্ছে নৌবাহিনী ও স্থলবাহিনীকে। কিন্তু ব্রিটিশদের চোখে তারা আজ্ঞাবহ দাস ছাড়া আর কিছুই নয়। সেটা কারণে অকারণে বুঝিয়ে দেওয়া হয় তাদের প্রত্যেককে। ব্রিটিশ অফিসার ও ভারতীয় রেটিংদের থাকা ও খাওয়ার জায়গাতেও বিস্তর ফারাক, তাদের মাইনে আর সুযোগসুবিধাতেও পার্থক্য আছে। এই বৈষম্যমূলক আচরণ যেন তাদের প্রাপ্য।
সকলে অবশ্য এমন নয়। হ্যারিস সাহেবের মতো বেশ কিছু ব্রিটিশ আধিকারিক ভারতীয়দের সমকক্ষ বলেই মনে করেন, রেটিংদের সঙ্গে দিব্যি বন্ধুদের মতো ব্যবহার করেন তাঁরা, তাদের সমর্থনে কথাও বলেন… কিন্তু সামগ্রিক ভাবে দেখতে গেলে ব্রিটিশ সরকারের চোখে ভারতীয়রা ক্রীতদাস ছাড়া কিছুই নয়। সাহেবরা আইন করে দাস ব্যাবসা বন্ধ করেছে বটে, কিন্তু নিজেদের মানসিকতায় বদল আনতে পারেনি।
এইসব কথা অনেকদিন ধরেই বলাইয়ের মাথার মধ্যে ঘুরছিল, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে সে নিয়ে মাথা ঘামানোর অবকাশ হয়নি তার। কিন্তু আজ, হ্যারিস সাহেবের প্রাণহীন দেহটা আগলে বসে থাকার সময় বলাই প্রথম উপলব্ধি করল, এই প্রশ্নের উত্তর তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। এই দ্বন্দ না কাটিয়ে উঠতে পারলে সে শান্তি পাবে না। হ্যারিস সাহেবের শেষ কথাটা তাকে এক অমোঘ বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এই যুদ্ধ আসলে কার? এখানে তার ভূমিকা কী? জাপানিরা তাদের দেশের জন্য লড়ছে, সাহেবরা লড়ছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রক্ষার জন্য। কিন্তু ভারতীয়রা লড়ছে কেন? তারা তো ব্রিটিশ সরকারের আজ্ঞাবহ দাসসৈন্য মাত্র! ভারতবর্ষ এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে কি না, সেটা ঠিক করার অধিকার কি দেশের মানুষের কাছে ছিল? তাহলে কেন হাজার হাজার ভারতীয় সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেবে? কেন জাপানিরা কলকাতায় বোমা ফেলবে? কেন দিনের পর দিন বৈষম্যমূলক ব্যবহার সহ্য করেও তাদের ব্রিটিশ সরকারের আদেশ পালন করে যেতে হবে?
সেইদিন সন্ধ্যা পেরোনোর পর বলাই তার বন্ধু সলিলের কাছে গিয়ে উপস্থিত হল। এই জাহাজে ভারতীয় রেটিংদের জন্য আলাদা কামরার ব্যবস্থা নেই, এক একটা ডর্মিটারিতে দশজন পনেরোজন করে থাকে। সলিল বাংক বেডের ওপর শুয়ে আর্থার কোয়েস্টলারের লেখা বই ‘ডার্কনেস অ্যাট নুন’ পড়ছিল, বলাইকে দেখে নেমে এল সে। দুই বন্ধু ডেকের পিছন দিকের একটা জায়গায় গিয়ে বসল। রাতের দিকে কিছু করার থাকে না, মাঝেমধ্যে তারা এখানে বসে গল্প করে। বলাই ছাড়া সলিলই এই জাহাজে একমাত্র বাঙালি। তার পড়াশুনার পরিধি অনেকটাই বিস্তৃত, তার কাছ থেকে অনেক কিছু জানতে পারে বলাই। কিন্তু এছাড়াও সলিলের একটা পরিচয় আছে। রেটিংয়ের ছদ্মবেশ নিয়ে থাকলেও সে আসলে একজন বিপ্লবী। গুপ্তচরও বলা চলে। নৌবাহিনীর খবর গোপনে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই কাজ সে বেশ কয়েক বছর ধরে করে আসছে।
জাহাজটা অসীম অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে চলেছে। সমুদ্র এখন শান্ত, মিঠে হাওয়া দিচ্ছে। আকাশে চাঁদ নেই, কিন্তু তারাদের উজ্জ্বল আলো চোখে পড়ে। দুই বন্ধু সিগারেট জ্বালাল। পরপর কয়েকটা টান দিয়ে বলাই মনস্থির করে নিল। আর দ্বিধা করলে চলবে না। সে সলিলের দিকে তাকিয়ে বলল, “সলিল, আইএনএ-র সঙ্গে তোর এখনও যোগাযোগ আছে?”
সলিল চোখ ফিরিয়ে ঠাট্টার স্বরে বলল, “কী ব্যাপার ভাই?”
বলাই সলিলকে সব কথাই খুলে বলল। সলিল একটু হেসে বলল, “বলাই, তুই যে দ্বন্দের কথা বলছিস, সেটাই তো স্বাভাবিক। যে চুপ করে রাজার নির্দেশ পালন করে যায়, ঠিক ভুল নিয়ে প্রশ্ন করে না, তাকে কি দেশপ্রেমিক বলা যায়?”
বলাই ছটফট করে উঠে বলল, “তুই আমাকে আজাদ হিন্দ ফৌজের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিবি?”
সলিল একটু হতাশ হয়ে বলল, “আমার সঙ্গে ওদের কথা হয়নি অনেকদিন। কিন্তু খবর পেয়েছি, আইএনএ-এর জওয়ানরা মনে হয় শেষরক্ষা করতে পারবে না। ওদের কাছে না আছে অস্ত্রশস্ত্র, না আছে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র। যারা যারা সাহায্য করবে বলে জানিয়েছিল, তাদের অধিকাংশই কথা রাখেনি। না খেয়ে না দেয়ে কাঁহাতক লড়াই চালানো যায়?”
বলাই হতাশ হয়ে সলিকের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সলিল বলল, “কিন্তু তুই। যদি। সত্যিই। এই। লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করতে চাস, তাহলে আমার কাছে একটা উপায় আছে।”
“কী?” বলাই প্রশ্ন করল।
সলিল বলল, “বলছি। তার আগে বল, তুই তো ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফিস্ট। ঠিকানা দিলে একটা খবর পাঠাতে পারবি?”
বলাই মাথা নাড়ল। এটা এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। সলিল আর দেরি করল না, পুরো ব্যাপারটা তাকে খুলে বলল।
চারদিন পরের কথা। বিকেল নাগাদ আরএএফ-এর তিনটে ফাইটার প্লেন এইচডিএমএল জাহাজের ল্যান্ডিং এরিয়ায় এসে দাঁড়াল। সেখান থেকে নেমে এল তিনজন পাইলট। নৌবাহিনীকে জরুরি বার্তা বা রেশন দেওয়ার জন্য এয়ারফোর্সের প্লেন মাঝেমধ্যেই ল্যান্ড করে, নৌবাহিনীর আধিকারিকদের বার্মা অপারেশনের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে মিটিংও হয়। কনফারেন্স রুমে ক্যাপ্টেন থেকে শুরু করে রেডিও কমিউনিকেশন টিমের অনেক কর্মীই উপস্থিত থাকে।
হ্যারিস সাহেব টেলিগ্রাফিস্টদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করতেন, তিনি মারা যাওয়ার পর বলাইয়ের দায়িত্ব বেড়ে গিয়েছে। মিটিং শুরু হওয়ার আগে অন্যান্য আধিকারিকের সঙ্গে সারবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে বলাই পাইলটদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করছিল। দুজন চলে গেছে, তিন নম্বর পাইলট তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। হ্যান্ডশেক করার সময় বলাইয়ের হাতে ঝাঁকুনি দিয়ে সে বলল, “বি আর দত্ত?”
বলাই সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে ঘাড় হেলাতেই সে বলল, “হ্যারিস সাহেব আপনার খুব প্রশংসা করতেন। আমার নাম ফ্লাইট অফিসার সমর শেখর। একদিক সময় করে আপনার সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার ইচ্ছে রইল।”
বলাই হাসল। সবাই একে একে এগিয়ে যেতে সে হাতের মুঠো খুলে দেখল। সেখানে একটা ছোট্ট চিরকুট। গিজগিজে সাঙ্কেতিক চিহ্নে কাগজটা ভর্তি। বলাইয়ের অবশ্য সেই সঙ্কেত বুঝতে অসুবিধা হল না। মর্স কোড বোঝা তার কাজের অভিন্ন অংশ। চিরকুটের ওপর গোটা গোটা অক্ষরে লেখা আছে: মিশন ইনকলাব!
আক্রমণ
“ইনকলাব জিন্দাবাদ!”
“আংরেজো, ওয়াপস যাও!”
“বন্দেমাতরম!”
হেন্ডরসন সাহেবের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে। তিনি এখনও ঘটনাটা বিশ্বাস করতে পারছেন না। এই অভুক্ত নেটিভগুলো কয়েক শতাব্দী ধরে বিনা প্রতিবাদে ব্রিটিশদের অধীনে কাজ করছে, স্বদেশ বা স্বাধীনতার মতো বিষয় নিয়ে এদের কোনও ধ্যানধারণাই নেই। বিপ্লব তো অনেক দূরের কথা! দু’মুঠো ভাত বা পোড়া রুটি খেয়ে বেঁচে থাকাটাই তাদের কাছে অনেক। আচমকা কোন জাদুবলে তারা এত সাহসী হয়ে উঠল?
হেন্ডরসন সাহেব খনির তত্ত্বাবধায়ক ড্যানিয়েল বার্কের দিকে রক্তচক্ষে তাকিয়ে বললেন, “ড্যান, এসব কী মশকরা হচ্ছে? তিনদিন ধরে কাজ বন্ধ, সব শিপমেন্ট আটকে আছে। এই কালা আদমিগুলোকে কী করে সোজা করতে হয়, সেটা কি তোমাকে শেখাতে হবে?”
ড্যানিয়েল বার্ক চুপসে গিয়ে বললেন, “সব চেষ্টাই করেছি স্যার। কোনও লাভ হয়নি। উল্টে লাঠিচার্জ করতে গিয়ে আমাদের লোকজন এমন মার খেয়েছে যে তিনজনের হাড় ভেঙে গেছে। নেটিভগুলো পাগল হয়ে গেছে স্যার।”
হেন্ডরসন সাহেব কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ড্যানিয়েল বার্ক তাঁকে থামিয়ে নিচু গলায় বললেন, “এই মুভমেন্টের পিছনে পলিটিক্যাল সাপোর্ট আছে স্যার। সোশ্যালিস্ট কংগ্রেস পার্টির কয়েকজন ভলান্টিয়ারকে আমি ওদের সঙ্গে দেখেছি।”
শয়ে শয়ে নারীপুরুষ তখনও করনপুরা কোলিয়াড়ির ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছে। সেনা ব্যারাকের তাঁবুগুলোয় আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েক হাজার টন কয়লা আর মাইনিংয়ের সমস্ত যন্ত্রপাতিও এখন শ্রমিকদের অধিকারে। ওরা নাকি ভয় দেখিয়েছে, জোর। করে। ওদের। সরাতে। গেলে সব কয়লায় আগুন লাগিয়ে দেবে।
হেন্ডরসন সাহেবের মুখে রাগে লাল হয়ে গেল। শালা জংলি আদমি, ব্লাডি ইন্ডিয়ান ট্রাইবস! এদের এত সাহস হয় কোত্থেকে? তিনি হুঙ্কার দিয়ে বললেন, “দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছ কী? গুলি চালাও। কয়েকটা লাশ পড়লেই এদের বাঁদরামো বেরিয়ে যাবে। ফায়ার!”
কোম্পানির সেপাইরা বন্দুক উঁচিয়ে ধরল। কিন্তু গুলি করার আগেই দুটো জ্বলন্ত আগুনের বল কামানের গোলার মতো উড়ে এল তাদের দিকে। পরমুহূর্তেই প্রচন্ড এক বিস্ফোরণের শব্দে কানে তালা লেগে গেল সকলের।
আগুনের ঝলক আর ধোঁয়ায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না, শুধু শোনা যাচ্ছে ব্রিটিশ সৈন্যদের আর্তনাদ। হেন্ডরসন সাহেব ছিটকে পড়েছেন, তাঁর ডান হাতের দুটো আঙুল উড়ে গেছে। রক্তমাখা আঙুলগুলো বাঁ হাত দিয়ে চেপে তিনি সভয়ে সামনের দিকে তাকালেন। ততক্ষণে সামনের কয়লার ঢিবির ওপর এসে দাঁড়িয়েছে কয়েকজন লোক। তাদের হাতে ডিনামাইট স্টিক। এইবার তাদের সামনে এসে উপস্থিত হল এক নারীমূর্তি। তাঁর পরনে নীল পাড় সাদা শাড়ি, হাতে একটা মাইক। রাধি!
রাধি মাইকটা মুখের সামনে ধরে বলল, “হেন্ডরসন সাহেব, আমি দীর্ঘ বারো বছর এই খনিতে কাজ করেছি। ডিনামাইট দিয়ে বোমা বানানোর বিদ্যাও আমরা আপনাদের থেকে ভালো করেই জানি। ভারতীয় ইঞ্জিনিয়াররা মুখে ঘাস দিয়ে চলে না। আর কাঁচামালেরও অভাব নেই আমাদের। এযাত্রা শস্তায় ছেড়ে দিলাম। পরেরবার সাদা চামড়ার রোযাব দেখাতে এলে ওই চামড়া ছাড়িয়ে নেব। এখন যান, গিয়ে ওপরওয়ালাকে খবর দিন।”
হেন্ডরসন সাহেব খবর দেওয়ার আগেই অবশ্য সেন্ট্রাল প্রভিন্সের অফিসে খবর পৌঁছে গিয়েছে। শুধু মধ্য ভারত নয়, খবর পৌঁছেছে আগ্রা, পাঞ্জাব আর রাজপুতানাতেও। ব্রিটিশ প্রশাসনের প্রতিটা দপ্তরেই তখন ভূমিকম্প চলছে। টেলিগ্রাফ অপারেটরদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে, গলদঘর্ম হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন গভর্নর অফিসের কর্তারা। সাড়া ভারতবর্ষ জুড়ে এরকম ধর্মঘট আর মিউটিনি আগে কেউ দেখেনি। কিন্তু সেই অবিশ্বাস্য ঘটনাই ঘটছে এখন। দেশীয় রাজ্য বাদেও বেঙ্গল, বরোদা, বোম্বে, পাঞ্জাব সহ দেশের প্রতিটা প্রান্ত থেকে পরপর শ্রমিক বিক্ষোভ আর সরকারি কর্মচারীদের ধর্মঘটের খবর আসছে। এই ধর্মঘট শুধু বেতন বা সুযোগসুবিধা নিয়ে নয়, শ্রমিকরা সম্পূর্ণ স্বরাজের দাবী করেছে। ইতিমধ্যে দিল্লি সহ ব্রিটিশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিলের সমস্ত দপ্তরে সংবাদ পাঠানো হয়েছে, খবর পৌঁছে গিয়েছে লন্ডনেও।
বিকেলের আগেই গভর্নর জেনারেল আর্চিবল্ড ওয়েভেলের অফিসে জরুরি মিটিংয়ের আয়োজন করা হল। সামরিক বিভাগের অধ্যক্ষ ছাড়াও পুলিশ ও সরকারি বিভাগের কর্তারা উপস্থিত হয়েছেন এই মিটিংয়ে।
আর্চিবল্ড ওয়াভেল গতানুগতিক আদবকায়দার পরোয়াই করলেন না। মিটিং শুরু হতেই টেবিলে একটা প্রচন্ড ঘুষি মেরে বললেন, “এইসব হচ্ছেটা কী, অ্যাঁ! কেউ আমাকে দয়া করে বুঝিয়ে বলবে, আমরা এই ধর্মঘট বন্ধ করার জন্য কী করছি?”
ঘরের মধ্যে একটা চাপা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। কিন্তু কেউই সরাসরি এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। ওয়াভেলের রাগ সপ্তমে চড়ে গেল। তিনি চিৎকার করে বললেন, “ডু ইউ থিংক আই অ্যাম আ ব্লাডি ফুল? তোমাদের কি আমি চুপ করে থাকার জন্য ডেকেছি? হোয়াট শুড উই ডু?”
ওয়াভেল সাহেবের তর্জন-গর্জন চলতে লাগল বেশ কিছুক্ষণ ধরে। অবশেষে তিনি হাঁফাতে লাগলেন। এমন সময় একজন আর্মির পোশাক পরা লোক হাত তুলে বললেন, “অভয় দিলে আমি কিছু কথা বলতে চাই মিস্টার গভর্নর জেনারেল!”
“তুমি কে?” টেবিলের ওপর থেকে জলের গ্লাস তুলে নিয়ে প্রশ্ন করলেন ওয়াভেল।
“ফিলিপ টাকার! নর্দার্ন কম্যান্ডের দায়িত্বে আছি স্যার।”
ওয়াভেল বললেন, “ওয়েল মিস্টার টাকার। তুমি বল, হাউ টু ডিল উইথ দিস সিচুয়েশন?”
টাকার স্পষ্ট স্বরে বললেন, “অপরাধ নেবেন না স্যার। কিন্তু সত্যি বলতে, আমাদের কিছুই করার নেই। উই কান্ট ডিল উইথ ইট!”
ওয়াভেল ফেটে উঠতে যাচ্ছিলেন, টাকার তার আগেই বললেন, “রেগে যাওয়ার আগে আমার কথাটা শুনুন স্যার। কোনোরকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের প্রথমে জানা দরকার, বাস্তবে ঠিক কী ঘটছে? সেটা জানলেই আপনি বুঝতে পারবেন, এরকম পরিস্থিতির মোকাবিলা করার ক্ষমতা আমাদের নেই। আমি স্যার আপনাকে সংক্ষেপে ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করছি।”
ওয়াভেল একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। টাকার বললেন, “প্রথমত, এই মুহূর্তে ভারতবর্ষের সমস্ত শ্রমিক একসঙ্গে ধর্মঘট ডেকেছে। হ্যাঁ, অবিশ্বাস্য হলেও কথাটা সত্যি। সরকারি কোম্পানি তো বটেই, বেসরকারি কোম্পানির শ্রমিকরাও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। টেক্সটাইল, মাইনিং, জুয়েলারি, যন্ত্রপাতি সহ যে সমস্ত প্রোডাক্ট আমরা ভারতে উৎপাদন করে বিদেশে রপ্তানি করি, সব কিছুই তিন চারদিন ধরে বন্ধ। কাজ বন্ধ করে দিয়েছে ব্যাঙ্কের কর্মচারীরাও। এমনকি দার্জিলিং আর অসমের চা বাগানের শ্রমিকরাও বিদ্রোহ করেছে। বিদ্রোহ করেছে কৃষকরাও। রপ্তানির জন্য তুলে রাখা চা, কফি, খনিজ-আকর, কটন, মশলাপাতি, খাবারদাবার কিছুই এখন আমাদের হাতে নেই। এই ধর্মঘট বন্ধ না হলে ব্রিটিশ সরকার বেইজ্জত তো হবেই, সরকারের আয়ও কমে যাবে উল্লেখযোগ্য ভাবে। বিশ্বযুদ্ধের পর কোষাগারের কী অবস্থা, সে কথা তো সকলেই জানে।”
ওয়াভেল সাহেব উত্তেজিত হয়ে বললেন, “এদের থামানোর জন্য আমরা কী করছি? ইউজ দ্য ফোর্স। জমিদারদের সাহায্য নিয়ে লেঠেল পাঠাও, প্রয়োজনে পুলিশকে ফায়ারিং করতে বলো!”
টাকার বললেন, “উই ডোন্ট হ্যাভ এনাফ পিপল স্যার! তাছাড়া, শ্রমিকরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এত মানুষকে কে সামলাবে? যদি জোর করে মেরেধরে শ্রমিকদের উচ্ছেদ করার চেষ্টা হয়, তাহলেও কিন্তু সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। ভারতীয় শ্রমিকরা না থাকলে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করবে কে? দ্বিতীয়ত, রেলের কর্মীরা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে বলে পরিবহন ব্যবস্থা বানচাল হয়ে গেছে। স্টিম রেলের জ্বালানি তো কয়লা। কিন্তু কয়লা খনিগুলোতে সবচেয়ে আগে কাজ বন্ধ হয়েছে। বিপুল পরিমাণ কয়লা আটকে দেওয়া হয়েছে। কয়লার অভাবে স্টিম রেল চলবে কী করে? তারপর খবর পাচ্ছি দেশের বিভিন্ন জায়গায় রেললাইনও আটক করা হয়েছে।”
ওয়াভেল সাহেব ঘেমে উঠেছেন। তিনি ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ে বললেন, “আমাকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে হবে। আরো কিছু আছে? “
“আছে স্যার!” টাকার বললেন, “সাধারণত এমন কোনও সমস্যা হলে আমরা গান্ধী বা নেহরুর সঙ্গে কথা বলে তাদের মাধ্যমে কর্মীদের সঙ্গে নেগোশিয়েশনের চেষ্টা করি। কিন্তু যেহেতু এই ধর্মঘটের পিছনে কয়েকজন নেতা বা কোনও বিশেষ রাজনৈতিক দল নেই, ফলে ওই পন্থা কাজে আসবে কিনা ঠিক নেই। তাছাড়া ক্যাবিনেট মিশন ভারতের স্বাধীনতা সংক্রান্ত যে বিধেয়কের প্রস্তাব করেছে, তাতে কংগ্রেস আর মুসলিম লিগ এমনিতেও ক্ষেপে আছে। তাহলে আপনিই বলুন মিস্টার গভর্নর জেনারেল, আমাদের কিছু করার আছে কি?”
গর্ভনর ওয়াভেল কিছু বলতে পারলেন না। টাকার আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই একজন আর্দালি এসে ওয়াভেলের কানে কানে কিছু বলল। কথাটা শোনামাত্র ওয়াভেলের মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল। তিনি দু’ হাতে মাথা চেপে ধরে বসে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর মুখ তুলে বললেন, “উই হ্যাভ উইটনেসড অ্যানাদার মিউটিনি। রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভির সৈন্যরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে।”
***
ওয়াভেল সাহেব যখন প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলির সঙ্গে জরুরি বৈঠক করছেন, বোম্বের ক্যাসল ব্যারাকের ভিতর তখন বিপ্লবের পরবর্তী পদক্ষেপের ছক কষছে ভারতীয় রেটিংরা। এইচএমএস তলওয়ারে নেভল সেন্ট্রাল স্ট্রাইক কমিটির সদস্যরা জড় হয়েছে, সিগন্যালম্যান এম এস খান আর টেলিগ্রাফিস্ট সহ অনেকেই যোগ দিয়েছে এই মিটিং। আর যে ছেলেটি গত দু’ বছর ধরে একটু একটু করে এই আন্দোলনের জমি গড়ে তুলেছে, সেই বলাই চন্দ্র দত্তও আজ এখানে উপস্থিত।
নৌবিদ্রোহের সূচনা ঘটেছিল ছোটখাটো কিছু ঘটনা থেকেই। বরং বলা ভালো, বলাই সহ ইউসিও-র নিয়োগ করা কিছু সৈনিক সুকৌশলে সেই ঘটনাগুলোকে ব্যবহার করে রেটিংদের চাগিয়ে তুলেছিল। ভারতীয় সৈনিকদের সঙ্গে করা দুর্ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাবার ও ব্রিটিশদের সঙ্গে তাদের বেতনের ফারাক নিয়ে রেটিংরা আগে থেকেই ক্ষুব্ধ ছিল, আজাদ হিন্দ বাহিনীর বন্দিদের ট্রায়াল আর ভারতের স্বাধীনতা সম্পর্কে ক্যাবিনেট মিশনের হাস্যকর মনোভাব সেই রাগ ফুলেফেঁপে উঠল। ক্যান্টিনের খাবার না খাওয়া, ব্রিটিশ আধিকারিকদের বয়কট করা, আর স্লোগান দেওয়া রোজকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আগুনে ঘি পড়ল, যখন দেওয়াললিখনের জন্য বলাইকে অভিযুক্ত করে দু সপ্তাহের জন্য সামরিক জেলে পাঠানো হল। কফিনের শেষ পেরেকটা মারলেন খোদ কম্যান্ডর ইন চিফ আউচিনলেক সাহেব। এইচএমএস তলোয়ারে এসে ভারতীয়দের যথেচ্ছ ভাষায় অপমান করলেন তিনি, শাসিয়ে গেলেন রেটিংদেরও। কয়লা চাপা আগুনের আগ্নেয়গিরি হয়ে উঠতে আর সময় লাগেনি।
এমনটা যে হতে চলেছে, সেটা অবশ্য বলাইরা আগে থেকেই জানত। সব জেনেশুনেই যে ব্রিটিশদের হাতে ধরা দিয়েছিল। যাওয়ার আগে পরিকল্পনা বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছিল বিশ্বস্ত সঙ্গীদের। ব্রিটিশরা তাকে বন্দি করে ভাববে রেটিংদের খুব শাসানি দেওয়া হয়েছে, বিদ্রোহ দমনের কথা ফলাও করে ছাপা হবে খবরের কাগজে। এই খবরই ছিল ইউসিও-র গ্রাউন্ড টিমের কাছে গ্রিন সিগন্যাল।
গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নড়ে গেছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাজকর্ম শিকেয় উঠেছে, পরিবহন ব্যবস্থা কাজ করছে না, তার ওপর এই নৌবিদ্রোহ। টেলিগ্রাফিস্টদের পাঠানো বার্তায় সাড়া দিয়ে রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভির একশোটারও বেশি জাহাজ বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছে, বিপ্লবে নাম লিখিয়েছে তিরিশ হাজার ভারতীয় সৈনিক। বোম্বের পাশাপাশি কলকাতা, ভাইজাগ, কোচিন, করাচি, জামনগর, মাদ্রাজ, রেঙ্গুন বন্দরে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে, এমনকি ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার্সে ভেসে থাকা জাহাজ থেকেও বিদ্রোহের খবর আসছে। ব্রিটিশ রেটিংদের বন্দি করা হয়েছে, নয় খেদিয়ে দেওয়া হয়েছে বন্দরে। ভারতীয় রেটিংদের সঙ্গে ব্রিটিশ সৈনিকদের যুদ্ধে দু’পক্ষেরই কিছু সৈনিক প্রাণ হারিয়েছেন, কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক রেটিংদের সামলানোর ক্ষমতা সাহেবদের নেই। রেললাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রি-এনফোর্সমেন্ট আসতে পারছে না, এদিকে বোম্বে সহ পঞ্চাশটা শহরে সাধারণ মানুষ নৌসেনার সমর্থনে পথে নেমে মিছিল করছে। ব্রিটিশদের ধমকানিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্লোগান দেওয়া হচ্ছে, ঘেরাও করা হচ্ছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দপ্তরগুলো। নেভল স্ট্রাইক কমিটি থেকে ব্রিটিশদের স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এক মাসের মধ্যে দেশ ছেড়ে বিদায় হও। তাই বলে বিদেশিদের প্রতি আলাদা করে কোনও রাগ নেই রেটিংদের। আমজনতাকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, সিভিলিয়ানদের যেন কেউ আক্রমণ না করে। যদি ব্রিটিশ পক্ষ আক্রমণ করে, উত্তর দেওয়া হবে তখনই। আর উত্তর দেওয়ার মতো রসদ এখন তাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণে আছে।
কিন্তু বলাই জানে, শতরঞ্জের দান যে কোনও মুহূর্তে পাল্টে যেতে পারে। ব্রিটিশরা সর্বশক্তি দিয়ে লড়বে, তাদের ঠেকিয়ে রাখতে হলে পদক্ষেপ মেপে ফেলতে হবে। কিন্তু সুবিধা হল, মিশন ইনকলাবের এই স্ট্র্যাটেজি একদিনে করা হয়নি। এই মুহূর্তে ব্রিটিশরা ঠিক কী ভাবছে, তার ইঙ্গিত তাদের কাছে আগে থেকেই আছে। বলাইয়ের ভাবনা যে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি, সেটা কিছুক্ষণের মধ্যেই বোঝা গেল। অদেখা বন্ধুদের পাঠানো রেডিও মেসেজটা পেতেই চঞ্চল হয়ে উঠল সবাই। বলাই এম এস খানকে উদ্দেশ্য করে বলল, “ফেজ ফোর হ্যাজ বিগিন। মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এইবার আমাদেরও কাজে নেমে পড়তে হবে।”
বোম্বে থেকে অনেক দূরে, লন্ডনের রিচমন্ডে অবস্থিত সিকিওরিটি সার্ভিসের গোপন দপ্তরে তখন কয়েকজন মানুষ জমায়েত হয়েছে। তাদের মধ্যে রেজি উইলসন আর প্যাট্রিক গ্রেগ তো আছেনই, সঙ্গে সামরিক বিভাগের তাবড় তাবড় আধিকারিকরাও উপস্থিত। এমআই সিক্স-এর তরফ থেকে হেনরিকে জোন্স বললেন, “মিস্টার গ্রেগ, রেজি যা বলছেন সেটা সত্যি?”
প্যাট্রিক সম্মতি জানালেন। জোন্স উত্তেজিত হয়ে বললেন, “আপনি আগে আমাদের জানাননি কেন?”
প্যাট্রিক গ্রেগ উত্তর না দিয়ে তাকিয়ে রইলেন। রেজি বলল, “মিস্টার গ্রেগ চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখেননি। বিশদ রিপোর্ট লিখে সরকারের কাছে জমা দিয়েছেন, এই বিষয়টার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য সামরিক বিভাগে অনুরোধ করেছেন বারবার। আমি নিজেও কম চেষ্টা করিনি। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। তখন সবাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত। হিটলারের সেনাবাহিনীকে রুখতে না পারলে গোটা ইউরোপ ছারখার হয়ে যেত। অস্ত্র উৎপাদন আর ব্রিটিশ কলোনির গ্যারিসনগুলো উদ্ধার করাটাই প্রায়োরিটি ছিল, এর মাঝে কে আর এই উদ্ভট থিওরিতে বিশ্বাস করতে চাইবে? তাও যখন এই সন্দেহের পুরোটাই অনুমানের ওপর নির্ভর?”
জোন্সের মুখ কালো হয়ে গেল। তিনি বুঝলেন, তাঁদের সামনে সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গ্যারিসনগুলো হাতছাড়া হওয়ার সময় থেকেই কলোনিগুলো থেকে প্রভাব কমতে শুরু করেছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন রয়্যাল নেভির যুদ্ধপোতগুলোকে সেখানে পাঠানো সম্ভবত ছিল না। এয়ারস্ট্রাইক করলে হয়তো কিছুটা লাভ হত, কিন্তু আমেরিকার সঙ্গে চুক্তির ফলে ব্রিটিশ কলোনিতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধের পর আমেরিকা বিশ্বশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তুলনায় ব্রিটেনের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। সিজফায়ারের পরই আমেরিকা আর কানাডার কাছে বিশাল অঙ্কের দেনা হয়েছে ব্রিটেনের, কিন্তু আমেরিকার রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, ব্রিটিশ কলোনিগুলোতে অত্যাচারের খবর পেলে সেই ঋণ দেওয়া হবে না। আসলে আমেরিকা যে ব্রিটেনকে সরিয়ে নিজে বিশ্ব রাজনীতির দখল নিতে চায়, সে-খবর গুপ্তচর মারফত এমআই সিক্স আগে থেকেই জানে। কিন্তু ভারতের মতো দেশও যে তাদের মুখে ঝামা ঘষে দেবে, সেটা কে আন্দাজ করেছিল?
কিন্তু হাতি যখন কাদায় পড়েই গেছে, তখন আর কী করা যাবে? ব্রিটিশ গুয়ানা, বর্মা আর সিলোন পুরোপুরি হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে, অন্তত ভারতবর্ষে কলোনি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করতেই হবে।
জোন্স দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আপনারা আমার সঙ্গে আসুন।”
রেজি আর প্যাট্রিক যখন প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থিত হলেন, তখন রাত বারোটা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ব্যক্তিরা অপেক্ষা করেছিল তাদের জন্য। বোর্ড অফ ট্রেডের অধ্যক্ষ স্যার স্ট্যানফোর্ড ক্রিপস বললেন, “ওয়েল। আপনাদের যা বলার বলতে পারেন। হয়তো পুরো ব্যাপারটা জানলে এই সমস্যার কোনও সমাধান হলেও হতে পারে।”
রেজি প্যাট্রিকের দিকে চাইলেন। প্যাট্রিক একটা দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করলেন।
“ঘটনার সূত্রপাত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। যুদ্ধ চলাকালীন ইউরোপ জুড়ে একদল মানুষের উদয় হয়, যারা প্রবলভাবে রাজতন্ত্র আর ঔপনিবেশবাদের বিরোধিতা করে। এরা কিন্তু কেউ বিশেষ কোনও রাজনৈতিক ভাবনায় দীক্ষিত ছিল না। কমিউনিস্ট আর সোশ্যালিস্টদের পাশাপাশি ঈশ্বর বিশ্বাসী আর মধ্যপন্থীরাও ছিল সেই দলে। তারা মনে করত, ইউরোপিয়ানদের নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করাই তাদের পতনের কারণ হবে। ধর্ম, দেশ আর জাতির ঊর্ধ্বে আমরা সবাই মানুষ আর মানুষে মানুষে কোনও ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়। ইতিহাসের পাতায় এদের নাম র্যাডিক্যালস অফ ইউরোপ। সে সময় ভারত ও অন্যান্য দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের দাবী শক্তিশালী হচ্ছে, ইউরোপেও বার্লিন কমিটি, ইন্ডিয়ান লিগ বা সিলোন রেভোলিউশন আর্মির মতো সংগঠন গড়ে উঠছে। র্যাডিক্যালদের সঙ্গে এই সংগঠনের কিছু মানুষের ঘনিষ্ঠতা হয়। সে সময় অনেক জায়গাতেই বিপ্লব হয়েছিল, কিন্তু সাংগঠনিক দুর্বলতা আর অনভিজ্ঞতার কারণে সেই বিপ্লবরা সফল হয়নি। গদর ক্রান্তি আর ব্রিটিশ গুয়ানার শ্রমিকদের ব্যর্থ অভূথ্যান এই পরিকল্পনারই সফল।
র্যাডিক্যালদের সংখ্যা কিন্তু ক্রমেই বাড়তে থাকে। এরা প্রধানত ছিল কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড, হাইডেলবার্গ বা প্যারিসের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সঙ্গে যোগ দিয়েছিল শিক্ষকরাও। কুড়ির দশকে যখন ইতালি আর অন্যান্য জায়গায় ফ্যাসিবাদি সরকার ক্ষমতায় আসছে, র্যাডিক্যালদের মধ্যে অনেকেই সামরিক বাহিনীতে নাম লিখিয়ে এশিয়ায় চলে যায়। মনের মিল হওয়ায় এশিয়ায় অনেকের সঙ্গেই তাদের বন্ধুত্ব হয়েছিল। ট্রেড ইউনিয়ন, বুদ্ধিজীবী আর বিপ্লবী দলের নেতা… যাই হোক! র্যাডিক্যালদের উদ্দেশ্য ছিল সামরিক বিপ্লব ঘটিয়ে কলোনিগুলোকে ব্রিটিশ শাসনের হাত থেকে উদ্ধার করা, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে উদ্দেশ্য সফল হয়নি। এরকম দু’একটা ঘটনা ঘটেছিল ঠিকই, কিন্তু ইতিহাসে সে ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় না। আমি রয়্যাল নেভির পুরোনো ফাইল ঘেঁটে দেখেছি, ভারতীয় মহাসাগরের ব্রিটিশ নৌবহরে একটা ছোট্ট মিউটিনি হয়েছিল, সেখানে হুবার্ট হোয়াইট বলে একজন ব্রিটিশ সৈনিক নিহত হয়েছিলেন। এই হুবার্ট হোয়াইট ছিলেন কেমব্রিজের শিক্ষক, তাঁর সঙ্গে বার্লিন কমিটি আর ইন্ডিয়া হাউসের প্রাক্তন সদস্যদের গভীর যোগাযোগ ছিল। মিউটিনির সময় তিনি গুলি খেয়ে জলে পড়ে যান, কিন্তু তাঁর লাশ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
“এর পরের ঘটনা অনেকটাই অনুমানভিত্তিক। পলিটিকাল ইন্টেলিজেন্স কমিটির ইনফর্মারদের মারফত আমি জানতে পারি, হুবার্ট হোয়াইট কোনোভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে বিপ্লবী ভগত সিংয়ের ঘনিষ্ঠতাও ছিল। ১৯৩২ সালে ভগত সিংয়ের পার্টি এইচএসআরএ র্যাডিক্যালদের সঙ্গে মিলে দেশব্যাপী বিপ্লবে পরিকল্পনাও করছিল, কিন্তু ভগত সিং আর অন্যান্য বিপ্লবীদের অকালমৃত্যুতে সেই পরিকল্পনা পিছিয়ে যায়। ভারতের বিপ্লবীরা ততদিন বুঝতে পেরেছে, ঐক্যবদ্ধ না হলে ব্রিটিশদের হারানো সম্ভব নয়। একজন ভগত সিং, একজন আজাদ, একজন ক্ষুদিরাম দিয়ে হবে না। ইট্স্ আ মাইন্ড গেম। দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা চাই, সঙ্গে চাই দেশবাসীদের সহযোগ। এমন কিছু নেতা চাই যারা গ্রাসরুট লেভেলে গিয়ে নিম্নবর্গ আর মধ্যবিত্তদের উজ্জীবিত করবে, তাদের সাহস দেবে। এছাড়াও চাই আন্তর্জাতিক সহযোগ।”
“তারপর?” প্রশ্ন করলেন প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলি।
প্যাট্রিক বললেন, “হুবার্ট এই কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন। রাজনৈতিক পার্টি নির্বিশেষে ভারত ও ইউরোপের র্যাডিক্যাল নেতারা মিলে একটা গোপন দল তৈরি করল, যার নাম ইউসিও বা আন্ডারগ্রাউন্ড সেন্ট্রাল অরগ্যানাইজেশন। ইউসিওর কর্মীরা ধীরে ধীরে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ল। কাপড়ের মিল, কয়লার খনি, নৌবাহিনী, সামরিক বিভাগে। বছরের পর বছর ধরে তারা ব্রিটিশদের কাজকর্ম লক্ষ করেছে, সচেতন করে তুলেছে অশিক্ষিত শ্রমিক ও সৈনিকদের। সম্ভবত তারা নিজেরাও এই ব্যাকগ্রাউন্ড থেকেই উঠে এসেছিল, ফলে দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে কানেক্ট করা তাদের পক্ষে সহজ ছিল। এই কাজ একদিনে হয়নি, দীর্ঘ সময় লেগেছে। সেই সময় দিতে তৈরি ছিল বিপ্লবীরা। ধীরে ধীরে সকলের অলক্ষ্যে শ্রমিকদের মনোবল বেড়ে উঠল, তাঁদের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল এক একজন নেতা। বিপ্লবীরা জানত, ব্রিটিশদের প্রধান শক্তি হল অর্থ ও অস্ত্র। এই দুটোর জোগান বন্ধ হয়ে গেলে আমরা অচল হয়ে পড়ব। কিন্তু আঘাত হানতে হবে একসঙ্গে। একই সময়ে। সবচেয়ে ভালো হয়, যদি প্রতিটা ব্রিটিশ কলোনিতে একসঙ্গে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এই দায়িত্ব নেবে কে?”
“বোস?” অস্ফুটে বলে উঠলেন জোন্স।
প্যাট্রিক মৃদুহেসে বললেন, “হ্যাঁ। হুবার্ট হোয়াইটের সঙ্গে সুভাষ চন্দ্র বোসের পরিচয় অনেক আগে থেকেই ছিল। ভগত সিং যে কাজটা শুরু করেছিল, সেটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা এমনিতেও বোস ছাড়া কারো ছিল না। নো ওয়ান আন্ডারস্টুড জিওপলিটিক্স বেটার দ্যান দিস ম্যান। ধীরে ধীরে বার্লিন কমিটি আর ইন্ডিয়া লিগের প্রাক্তন সদস্যদের সাহায্য নিয়ে বোস ওভারসিজ সংগঠনগুলো আবার সক্রিয় করে তুলল, যোগাযোগ করা হল সিলোন আর অন্যান্য ব্রিটিশ কলোনির বিপ্লবীদের সঙ্গেও। শত্রু যখন এক, তাহলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই তো বুদ্ধিমানের কাজ। এই ধরুন, সিলোন গ্যারিসন অধিকার করতে হলে রাসবিহারী বোস ডোরিন বিক্রমাসিংহের সঙ্গে মালয় রেবেল গ্রুপ আর জাপানিদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন, ভারতের নৌবিদ্রোহের সময় সিলোন ডিফেন্স ফোর্সের যুদ্ধজাহাজরা ব্রিটিশ নৌবহরকে ইন্ডিয়ান ওশানে আটকে রেখে তার প্রতিদান দিচ্ছে। মোদ্দা কথা, এই বিদ্রোহকে থামানোর কোনো বিকল্প আমাদের কাছে নেই। সামরিক বাহিনী যদিও বা কিছু সাহায্য করতে পারত, কিন্তু বিপ্লবীরা আগেই পরিবহন ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। ভুলে যাবেন না, আমাদের আয়ের সিংহভাগই তো কলোনিগুলো থেকে আসছে। এমনকি ব্রিটেনের বেশিরভাগ কারখানাতেও তো অধিকাংশ ভারতীয় বা আফ্রিকার শ্রমিক কাজ করছে। যত দিন যাবে, আমাদের কোষাগারের অবস্থা তত খারাপ হবে। আমাদের মাথায় কত ঋণ আছে সে তো আমরা জানিই। এরকম অবস্থা চলতে থাকলে দেউলিয়া হয়ে যেতে বেশিদিন লাগবে না। আমরা শুধু ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে পারি। বিপ্লবীদের দাবী মেনে নেওয়া ছাড়া আমাদের কাছে কোনও উপায় নেই।”
প্রধানমন্ত্রীর অ্যাটলির রগ বেয়ে ঘাম ঝরছে। তিনি মাথার চুল খামচে বসে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর বিকৃত স্বরে চিৎকার করে বললেন, “আমি মরে গেলেও ঐ নেটিভদের সামনে সারেন্ডার করব না। যা হয় হোক। আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব।”
প্যাট্রিক হতাশ হয়ে রেজির দিকে তাকালেন। প্রধানমন্ত্রী এখনও বুঝতে পারছেন না, কী হতে চলেছে!
***
কংগ্রেস হাইকমান্ডের বৈঠকে সচরাচর এমন উত্তপ্ত আলোচনা হয় না। মতপার্থক্য হলেও সবাই ভদ্রতা বজায় রাখে। আনুষ্ঠানিক আদবকায়দার ঊর্ধ্বে গিয়ে কেউই চেঁচামেচি করে না, বরং কোনও সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলে পার্টি অধ্যক্ষকে ব্যক্তিগতভাবে চিঠি লিখে অসন্তোষ ব্যক্ত করে।
কিন্তু আজ এ-নিয়মের হেরফের হয়েছে। অবশ্য এটা শুধু কংগ্রেস কোর কমিটির বৈঠক নয়, এখানে ভারতের প্রতিটা রাজনৈতিক দলকে আহ্বান করা হয়েছে। অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ আর ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতারা যেমন আছেন, কমিউনিস্ট পার্টি আর ইউনিয়নিস্ট পার্টির সমর্থকরাও উপস্থিত।
জওহরলাল নেহেরু আর মুহাম্মদ অলি জিন্নাহ উত্তেজিত স্বরে কথা বলছেন, তর্কে জড়িয়ে পড়েছেন অরুণা আসফ আলি আর বল্লভ ভাই প্যাটেলও। গোলমালে কারও কথাই ঠিক করে বোঝা যায় না। গান্ধীজী চুপ করে এক কোণে বসে আছেন, তাঁর মুখে চিন্তার ছায়া স্পষ্ট। তিনি মন থেকে এই সিদ্ধান্ত মানতে পারছেন না, কিন্তু অস্বীকার করাও তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। একসময় নেহরু হাত তুলে বললেন, “এরকম করে কোনও সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। আমি অল হ্যান্ডস ভোটিংয়ের আহ্বান করছি। কিন্তু তার আগে সংক্ষেপে এই ব্যাপারটার গুরুত্ব সম্পর্কে সকলকে অবগত করা দরকার। জিন্নাহসাহেব, বাপু, আপনাদের আপত্তি না থাকলে আমি রেণুকাজিকেই ব্যাপারটা খুলে বলার অনুরোধ করব।”
জিন্নাহ মাথা নাড়লেন। গান্ধীজী শান্ত চোখে রেণুকার দিকে তাকালেন। নেহরু ভালোই জানেন, রেণুকা কথা বললে শ্রোতারা শুনতে বাধ্য। বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও কংগ্রেসের সক্রিয় কর্মী হিসেবে জনপ্রিয় এই মহিলার বাচনভঙ্গি ও বক্তৃতা দেওয়ার ক্ষমতা অসাধারণ, সকলেই তাঁকে সমীহ করে চলে।
রেণুকা এইবার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “সময় নষ্ট না করে আমি মূল বক্তব্যে চলে যাচ্ছি। আপনারা জানেন, এই সময় দেশ জুড়ে ভারতীয় শ্রমিকরা ধর্মঘট ডেকেছে, বিদ্রোহ ঘটেছে নৌসেনাতেও। এত বড়ো মাপের বিদ্রোহ ভারতে আগে হয়নি। ব্রিটিশ সরকারের কাছে এ ব্যাপারটা একেবারেই আকস্মিক। আজ সকালে গর্ভনর জেনারেল আমাদের সকলের কাছে একটা চিঠি পাঠিয়েছেন, তাতে তিনি অনুরোধ জানিয়েছেন আমরা প্রত্যেকে যেন এই বিদ্রোহের সঙ্গে অসম্মতি জাহির করি। ক্যাবিনেট মিশন ইন্ডিয়ান ইন্ডেপেনডেন্স বিল নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন, এমন। সময় ।এরকম। ঘটনা ।ঘটলে সে প্রক্রিয়া পিছিয়ে যেতে বাধ্য।”
জিন্নাহ তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন, “হুঁহ! অনুরোধ না ছাই, আসলে হুমকি! ভারতের স্বাধীনতা বা পাকিস্তানের গঠন, কিছু নিয়েই এদের তাপ-উত্তাপ নেই। আসলে ব্রিটিশরা চায়, আমাদের নাম কে ওয়াস্তে স্বাধীনতা দিয়ে নিজে সরকার চালনা করতে। পাপেট গভর্নমেন্টের বসানো ব্রিটিশদের পুরোনো চাল।”
নেহরু বিরক্তির ভঙ্গিতে বললেন, “আহ জিন্নাসাহেব! রেণুকাজিকে আগে কথাটা শেষ করতে দিন।”
জিন্নাসাহেব চুপ করে গেলেন। রেণুকা বললেন, “কিন্তু এ ছাড়াও একটা চিঠি আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে। সেটা সঙ্গে করে এনেছেন মিস্টার হুবার্ট হোয়াইট। যাঁরা জানেন না, তাঁদের জন্য বলি মিস্টার হোয়াইট দীর্ঘদিন ধরে ‘মুভমেন্ট ফর কলোনিয়াল ফ্রিডম’-এর সঙ্গে যুক্ত আছেন। মিস্টার হোয়াইট, আপনি যদি এই চিঠির বক্তব্যটা পড়ে শোনান!”
ভিড়ের ভিতর থেকে এইবার একজন সৌম্যদর্শন চেহারার বৃদ্ধ উঠে এলেন। তার পরনে খাদির কাপড়, মাথা নেড়া। তিনি প্রথমে এগিয়ে এসে গান্ধীজিকে প্রণাম করলেন। গান্ধীজী তাঁকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, “আপনি… আপনি বিনোবা ভাবের সঙ্গে কাজ করেন না?”
হুবার্ট সাহেব বিনীত গলায় বললেন, “হ্যাঁ, আমি বিনোবাজির সর্বোদয় আন্দোলনের সঙ্গে বহুদিন ধরে জড়িয়ে আছি। এই দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পিছনে তাঁর অবদান বড়ো কম নয়।”
গান্ধীজী বেশ অবাক হয়েছেন বোঝা গেল। তিনি বিনোবা ভাবেকে খুবই স্নেহ করেন, আদর্শগত ভাবেও তাঁদের মিল আছে। তিনি ভুরু কুঁচকে বললেন, “তা সত্ত্বেও আপনি এই হিংস্রতাকে সমর্থন করছেন?”
হুবার্ট সাহেব মৃদুহেসে বললেন, “আমি হিংস্রতাকে মোটেও সমর্থন করছি না গান্ধীজী। তবে আপনি নিজেই বলেছিলেন, ভায়োলেন্স আসলে ভয়ের বহিঃপ্রকাশ। গত দুশ বছর ধরে কলোনিয়াল পপুলেশনের মনের মধ্যে যে ভয় বাসা বেঁধে আছে, মিশন ইনকিলাবের মাধ্যমে আমরা সেই ভয়টাকে উপড়ে ফেলতে চাইছি। নাহলে এই ভয় তাদের দিন দিন আরও হিংস্র করে তুলবে। এই হিংস্রতার প্রকাশ দেখা যাবে সমাজের প্রতিটা স্তরে। সন্ত্রাস আর অপরাধের ঘটনা বাড়তেই থাকবে। এই ভয়ই একদিন আরও বড়ো শয়তানকে জন্ম দেবে। জার্মানিতে কী হয়েছে, সেটা তো আপনিও জানেন।”
গান্ধীজী আর কিছু বললেন না, মুখ নিচু করে বসে রইলেন। হুবার্ট হোয়াইট সকলকে নমস্কার করে বললেন, “রেণুকাজিকে অনেক ধন্যবাদ। এই চিঠির বক্তব্য খুবই সংক্ষিপ্ত। আমি আপনাদের উদ্দেশে সেটা পড়ে শোনাচ্ছি।
প্রিয় ভারতবাসী,
এই চিঠি যখন লেখা হচ্ছে, তখন ভারত শুধুই একটা ভূখন্ড, কোনও দেশ নয়। পরাধীনতার শেকল আজ ভারতবাসীকে জড়িয়ে রেখেছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কিন্তু এই পরাধীনতার জন্য দায়ী নয়, এর জন্য দায়ী আমরা নিজেরা। আমরা চিরকাল ভেবে এসেছি, স্বদেশ মানে শুধুই আমাদের বাসস্থান। ভারতবর্ষ একটা উপমহাদ্বীপ, ব্রিটিশরা সেই ভূখন্ড অধিকার করেছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন শুধুই এই ভূখন্ডের মুক্তির জন্য। যেদিন স্বাধীনতা আসবে, ইংরেজরা এই জায়গা ছেড়ে চলে যাবে। ব্রিটিশরা একটা আইন করবে, কাগজে সই করবে, আমাদের দেশের নেতারাও সই করবে সেই কাগজে। অতীতকে ভুলে আমরা এগিয়ে যাব। পিছনে পড়ে থাকবে সেই সব মানুষ, যারা জালিয়ানওয়ালায় মারা গিয়েছিল, যারা পেশাওয়ারে মারা গিয়েছিল, তেতাল্লিশের মন্বন্তরে যাদের মুখ থেকে ভাত ছিনিয়ে নিয়ে তিলে তিলে হত্যা করা হয়েছিল।
এই স্বাধীনতাই কি আমাদের চাই?
বন্ধুগণ, স্বাধীনতার এই যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ তরুণ তরুণী প্রাণের আহুতি দিয়েছেন। কেউ পুলিশি বর্বরতায় মারা গিয়েছেন, কাউকে ফাঁসিতে চড়ানো হয়েছে, কেউ বা অন্যায়ের প্রতিবাদে অনশন করে আত্মহত্যা করেছেন। ১৮৫৭ থেকে ১৯৪৫, গদর ক্রান্তি থেকে আজাদ হিন্দ ফৌজের সংগ্রাম, এই প্রতিবাদ চলছে। চলবে। এই ইনকলাবের উদ্দেশ্য শুধু একটা ভূখন্ডকে স্বাধীন করানোর জন্য নয়, বরং সেখানকার মানুষের মন ও মস্তিস্ককে স্বাধীন করানো। তাঁদের নির্ভীক করে তোলা, তাঁদের আত্মসম্মানবোধকে জাগিয়ে তোলা। তাঁদের এই ছোট্ট সত্যিটুকু বোঝানো, যে ভারতবর্ষকে আমরা স্বদেশ বলে স্বীকার করি, সেটা শুধুমাত্র একটা ভূখন্ড নয়, ভারতবর্ষ মানে সেখানকার মানুষ। ভারতবর্ষ মানে আপনি, আপনারা। আমাদের নিয়েই এই দেশ। আমাদের স্বাধীনতা মানেই দেশের স্বাধীনতা। স্বদেশ প্রেমের অর্থ আর কিছুই নয়, দেশের মানুষকে ভালোবাসা, প্রয়োজনে তাঁদের সঙ্গে দাঁড়ানো। ধর্ম, জাতি, ভাষা নির্বিশেষে তাঁদের আপন করে নেওয়া।
আপনারা যখন এই চিঠি পড়বেন, ততদিনে মিশন ইনকলাবের স্ফুলিঙ্গ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আপনারা যে দেশের স্বাধীনতা নিয়ে ব্রিটিশদের সঙ্গে আলোচনা করছেন, সেই দেশ আজ আপনা থেকেই স্বাধীনতা অর্জন করেছে। হ্যাঁ, স্বাধীন ভারতবর্ষ। কারণ দেশের প্রতিটা প্রান্তে, প্রতিটা পেশায় যুক্ত এই ভূখন্ডের মানুষ তাঁদের স্বাধীনতা খুঁজে পেয়েছেন। আজ তাঁদের মনে কোনও ভয় নেই, কোনও দ্বিধা নেই, আছে শুধু আত্মবিশ্বাস। এই ইনকলাবে যদি শেষ পর্যন্ত মৃত্যুও বরণ করতে হয়, তাঁরা স্বাধীন ভারতবাসী হয়ে মরবেন। এইবার সিদ্ধান্ত আপনাদের। আপনারা স্বাধীন ভারতবাসী হয়ে মরতে চান, না ভিক্ষেয় দেওয়া স্বাধীনতার দলিল হাতে নিয়ে পরাধীন জীবন কাটাতে চান? আমি জানি, আপনারা ঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন।
জয় হিন্দ।
ইতি, সুভাষ
হোয়াইট সাহেব চুপ করলেন। সারা ঘর নিস্তব্ধ হয়ে আছে। কারও মুখে কথা নেই। নেহরু এইবার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “কোনোরকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সুভাষের এই চিঠির বক্তব্য সরাসরি আপনাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি ছিল বলেই আমি মনে করি। তাঁর সঙ্গে আমার যতই মতভেদ হোক না কেন, এই বক্তব্যের সত্যতা আমি অস্বীকার করতে পারি না। যাই হোক, এইবার আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। আমাদের সামনে দুটো বিকল্প খোলা। এক, শ্রমিক বিক্ষোভ ও নৌবিদ্রোহকে সমর্থন না করা ও ভারতের স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে নেগোশিয়েশন চালিয়ে যাওয়া। এই পথে স্বাধীনতা লাভের সম্ভাবনা প্রবল, যদিও সময় খানিক বেশি লাগতে পারে। দুই, শ্রমিক ও ভারতীয় নৌবাহিনীর সিদ্ধান্তকে সমর্থন দেওয়া ও ভারতবাসীদের সঙ্গে নিয়ে এই বিদ্রোহকে ফলপ্রসূ করার চেষ্টা চালানো। এই পথে সাফল্যলাভের সম্ভাবনা কম, ব্রিটিশদের সঙ্গে ভবিষ্যতে আলোচনার কোনও জায়গাই থাকবে না। বাকি যা বলার সুভাষ তাঁর চিঠিতেই বলে দিয়েছে। প্রথমে, যারা দ্বিতীয় বিকল্পের পক্ষে মত দিচ্ছেন, তাঁদের আমি হাত তুলতে অনুরোধ জানাব।
নেহরু চিরকাল পলিটিকাল ডিসকোর্সের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজার পক্ষপাতী। তিনি আইন নিয়ে পড়াশুনা করেছেন, একটা হুজুগে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিণতি কী হতে পারে, তাঁর চেয়ে ভালো আর কেউই জানে না। তিনি যে প্রথম বিকল্পের দিক ঝুঁকবেন সেটা জানাই ছিল। কিন্তু সকলকে তাজ্জব করে দিয়ে নেহরু প্রথমেই দ্বিতীয় বিকল্পের সমর্থনে হাত উঁচু করে দিলেন। তারপর চিৎকার করে বললেন, “ইনকলাব জিন্দাবাদ!”
প্রথম কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বলতে পারল না। তারপর উদঘোষ করে উঠল সকলে। একে একে হাত উঠতে লাগল। ‘লং লিভ রেভোলিউশন’ আর ‘বন্দেমাতরম’-এর উদ্দীপ্ত বাণী প্রতিধ্বনিত হতে লাগল সভায়। নেহরুর কোনোদিকে মন নেই। তিনি একদৃষ্টে গান্ধীজির দিকে তাকিয়ে আছেন। গান্ধীজির মুখ নিচু, হাতও নিচু। এদিকে নব্বই শতাংশ মানুষ হাত তুলে উদঘোষ করছেন। নেহরু চোখ বুজলেন। যদি সুভাষ এখানে থাকত! তাঁর মুখে ‘জয় হিন্দ’ শুনলে যে কী হয়, সেটা যে না শুনেছে সে বুঝতেও পারবে না।
“জয় হিন্দ!”
নেহরু চকিতে পিছন ফিরে তাকালেন। পরক্ষণেই তাঁর সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে উঠল। গান্ধীজী উঠে দাঁড়িয়েছেন, তাঁর ডানহাতটা মুষ্টিবদ্ধ করে মাথার ওপর তোলা। হলভর্তি মানুষ তখন গান্ধীজির সঙ্গে গলা মেলাচ্ছেন। নেহরুর চোখ জলে ভিজে উঠল। তিনি কোনও কথা বলতে পারলেন না।
***
প্রায় পনেরো বছর পর পেশাওয়ারে পা রাখল চন্দ্রসিং। এই দীর্ঘ সময়ের অনেকটাই হিমালয়ের বিভিন্ন জায়গায় কেটেছে তার। মাঝে বার্মা আর আফ্রিকাতেও যেতে হয়েছিল। কত বিপদ এসেছে, কতবার সে মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছে, কত আশ্চর্য অভিজ্ঞতা, কত স্বার্থত্যাগ, কত বেদনা বুকে নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছে, কিন্তু কর্তব্যে একদিনের জন্যও গাফিলতি করেনি। আগামি দিনে সাফল্য আসুক অথবা ব্যর্থতা, তার এই জীবনের কথা দেশের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে না। কেউ জানবে না। জানবে শুধু চন্দ্রসিং নিজে। কিন্তু এ নিয়ে কোনও আফসোস নেই তার। দেশের জন্য অসংখ্য মানুষ প্রাণের আহুতি দিয়েছে, সাধারণ মানুষ আর কতজনের কথা মনে রাখে? শত শত চরিত্রের মধ্যে সেও একজন চরিত্র। স্বাধীনতার এই লড়াইয়ে কাঠবেড়ালির মতো খানিকটা মাটি বয়ে দিতে পেরেছে, সেটাই বা কম কি!
কেতু সিং নির্দিষ্ট জায়গায় অপেক্ষা করেছিল। চন্দ্রসিংকে দেখেই সে এগিয়ে এসে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। রুদ্ধ স্বরে বলল, “চন্দু, তু তো বুঢঢা হো গয়া ইয়ার!”
চন্দ্রসিং হেসে বলল, “পর তু অভি ভি জওয়ান হ্যায় জট্টা।”
দুই বন্ধু শহরের পুরোনো রাস্তা ধরে হেঁটে এগোতে লাগল। এই শহরে দুজনেই বেশ কয়েক বছর কাটিয়েছে, সেইসব স্মৃতি মনে পড়ে যায়। কিন্তু পনেরো বছর আগের পেশাওয়ারের সঙ্গে এই শহরের আকাশ পাতাল তফাত। পাখতুন বিপ্লবীরা এই শহর অধিকার করে নিয়েছে বেশ কয়েক বছর আগেই। ১৯৩৭ সালে খুদা-ই-খিদমদগার আন্দোলনের পর থেকেই নর্থ ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টিয়ারে ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণ কমে আসছিল, ক্রমে সঙ্কুচিত হচ্ছিল ব্রিটিশ অধ্যুষিত এলাকাগুলো। একদিকে খান আবদুল গফফারের সত্যাগ্রহ, অন্যদিকে দুর্ধর্ষ পাঠান যোদ্ধাদের আক্রমণ- জোড়া আক্রমণের মুখে ব্রিটিশরা এই অঞ্চল থেকে পাততাড়ি গোটানো শুরু করেছিল। একে তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, গ্যারিসন লুট হওয়ার ফলে অস্ত্রভাণ্ডারও সীমিত, তারপর এই পাণ্ডববর্জিত অঞ্চল নিয়ে তাদের খুব একটা উৎসাহও ছিল না। তারা বুঝেছিল, ভূরাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখানে রাজ্য বিস্তার করা প্রায় অসম্ভব। যেটা বোঝেনি, সেটা হল প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবীরা পরিকল্পিতভাবে পাখতুনদের এই বিদ্রোহকে সমর্থন দিয়ে গেছে প্রথম থেকেই।
গলির মোড়ে মোড়ে আগুন জ্বালানো হয়েছে, কাওয়া-র দোকানে ভিড় করেছে পাঠান সর্দাররা। পাঞ্জাবি মিশ্রিত ঊর্দু আর পশতু ভাষার সম্ভাষণ, রুবাবের সুর, কাবাব আর বিরিয়ানির গন্ধ, আর দিলখোলা হাসির শব্দ পেরিয়ে চন্দ্রসিংরা একটা পুরোনো বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়ল। কেতু সিং বলল, “এই হল তোমার ডেরা! অনেক ধকল গেছে, এইবার কিছুদিন বিশ্রাম নাও।”
চন্দ্রসিং উশখুশ করে বলল, “জট্টা, মিশন ইনকলাবের খবর কী?”
কেতু সিং একটা মোড়া টেনে এনে বসল। তারপর চন্দ্রসিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “গান্ধীজির আহ্বানে সারা দেশের মানুষ পথে নেমে পড়েছে। কংগ্রেস সহ সমস্ত রাজনৈতিক পার্টি যে এই দেশব্যাপী বিপ্লবের সমর্থন করবে, ব্রিটিশরাও সে কথা স্বপ্নেও ভাবেনি। বিশেষ করে গান্ধী আর নেহেরুকে নিয়ে ওরা বেশ নিশ্চিন্তেই ছিল। কিন্তু বেচারারা জানত না, এটা ভারতবর্ষ।”
চন্দ্রসিংয়ের চোখ ভিজে উঠল। সে আবেগ চেপে বললেন, “তারপর?”
কেতু সিং মুচকি হেসে বলল, “ঠিক যা আমরা ভেবেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলি বিপ্লবীদের দাবী মানতে রাজি হননি, উল্টে আর্মি ডেপ্লয় করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বিদ্রোহ দমন করার জন্য। কিন্তু দেশে রেললাইন বন্ধ। দেশে যত ব্রিটিশ সৈন্যসামন্ত আছে, তারা যথেষ্ট নয়। এদিকে সিলোন ডিফেন্স আর্মি ব্রিটিশ নৌজাহাজকে আটকে রেখেছে, রিএনফোর্সমেন্ট আসতে পারছে না। তাহলে আর কী বিকল্প থাকে?”
চন্দ্রসিংয়ের মুখে এতক্ষণে একটা হাসির রেখা দেখা গেল। ব্রিটিশ মিলিটারি যে সামরিক শক্তি নিয়ে এত গর্ব করে, তার সিংহভাগ সৈনিকই ভারতীয় মূলের। প্রধানত শিখ, গুর্খা ও গাড়োয়ালি রেজিমেন্টের এই সৈনিকরা সবচেয়ে দক্ষ ও সাহসী, প্রাণ হাতে নিয়ে ফ্রন্টলাইনে এগিয়ে যেতে তাদের দু’বার ভাবতে হয় না। ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের এই ব্যাটেলিয়ানগুলোকে ব্রিটিশরা সারা দুনিয়ায় নিয়োগ করেছে। আফ্রিকা হোক বা সিঙ্গাপুর, বার্মা হোক বা ব্রিটিশ গুয়ানা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হোক বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তিন লক্ষ নির্ভীক ভারতীয় সেপাইদের সাহায্য নিয়েই সাহেবরা যুদ্ধে জয়ী হয়েছে বারবার। কিন্তু প্রয়োজনে তাদের নিজের দেশের জনতার বিরুদ্ধেই ব্যবহার করেছে। সেপাইদের বাধ্য করেছে বিপ্লবী আর সত্যাগ্রহীদের ওপর ফায়ারিং করতে, রাজনৈতিক মিছিলের ওপর লাঠি চালাতে। রয়্যাল গাড়োয়াল রাইফেলসে মোতায়েন থাকার সময়েই চন্দ্রসিং দেখেছিল, এরকম এক একটা ঘটনা সেপাইদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিত। আদেশপালন করতে বাধ্য হলেও দীর্ঘদিন ধরে অপরাধবোধ ও মানসিক সমস্যায় ভুগত তারা। ভারতীয় হয়েও দেশবাসীদের বিরুদ্ধাচরণ করা বিশ্বাসঘাতকতার শামিল! তারা বিশ্বাসঘাতক! এই ভাবনা দিনরাত তাদের কুরে কুরে খেত। অনেকেই একসময় আত্মহত্যা করত। কিন্তু ভারতীয় সৈনিকদের আত্মহত্যা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় ব্রিটিশদের কাছে ছিল না।
চন্দ্রসিং জানত, একদিন আসবে, যখন এই ইনকলাবে ভারতীয় সৈনিকদের সাহায্যের প্রয়োজন হবে। তাই একটু একটু করে তাদের বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত করতে শুরু করেছিল সে। সে নিজে গাড়োয়ালি, নেপালি আর পাঞ্জাবি ভাষাও জানত, ফলে তার পক্ষে গুর্খা, গাড়োয়ালি আর শিখ রেজিমেন্টের সৈনিকদের নিয়ে একটা গোপন আন্দোলন শুরু করা সহজ ছিল। তাছাড়া চন্দ্রসিংয়ের মধ্যে একটা সহজাত নেতার ব্যক্তিত্বও ছিল, সে কথা বললে লোকে তার কথা শুনত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ভারতীয়দের প্রতি ভেদাভেদ এই চোরা বিপ্লবের পথ আরো সহজ করেছে। কিন্তু বিপ্লব একদিনে গড়ে ওঠে না, সাফল্য আসতে প্রায় এক দশক সময় লেগেছে। ছদ্মবেশের পর ছদ্মবেশ, এক আর্মি ব্যারাক থেকে অন্য আর্মি ব্যারাক, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা, একটু একটু করে সৈনিকদের মনে দেশপ্রেমের ভাবনাকে জাগিয়ে তুলতে হয়েছে তাকে। একসময় তারা নিজেরাই এই আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে গেছে। কফিনের শেষ পেরেক মারার দিনে চন্দ্রসিং তাদের সঙ্গে নেই ঠিকই, কিন্তু তার বলা কথাগুলো রয়ে গেছে।
কেতু সিং হাসতে হাসতে বলল, “আর্মি ডেপ্লয় করার নির্দেশ দেওয়ার পরেই বাজি উল্টে যায়। তোমার ছেলেপুলেরা ঠিক এই সময়ের জন্য অপেক্ষা করে বসেছিল। প্রথম বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল জবলপুর ব্যারাক থেকে। তারপর মধ্যভারত, একসময় সারা ভারতের সৈনিকরা এই বিদ্রোহে শামিল হয়েছে। গাড়োয়াল আর গুর্খা রেজিমেন্টের জওয়ানরা অস্ত্রাগার অধিকার করেছে, বন্দি করেছে ব্রিটিশ আধিকারিকদের। তাদের অবশ্য কোনও ক্ষতি করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলিকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ব্রিটিশরা দেশ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হবে। চন্দু, এই সবই তোমার জন্য। তুমি যা করেছ, আর কেউ সেটা করতে পারত না। আজ ভগত জিন্দা হোতা তো বহুত খুশ হোতা।”
চন্দ্রসিং কেতুর হাত জড়িয়ে ধরে বলল, “মুল্ক্ কে জজবাতো কা হিসাব অভি বাকি হ্যায়…”
কেতু সিং তার চোখে চোখ রেখে বলল, “ওয়াক্ত আনে দে ইয়ারা, ইনকলাব অভি বাকি হ্যায়।”
***
ভারতীয় নৌবাহিনীর সতেরোটা জাহাজ সারবদ্ধ হয়ে এগিয়ে চলেছে। ভারতীয় প্রতিটা জাহাজের মাথায় তেরঙ্গা পতাকা উড়ছে। এই নৌবহরে ফ্রিগেট, মাইনসুইপার আর ডেসট্রয়ার জাহাজ যেমন আছে, এইচএমআইএস হিন্দের মতো ওয়ারফেয়ার শিপ আর পেট্রোল বোটও আছে। প্রায় দশ হাজার ভারতীয় সৈনিক— তাতে নৌবাহিনীর সৈনিক ছাড়াও গাড়োয়াল রাইফেল আর গুর্খা ব্রিগেডের জওয়ানরা মজুদ আছে— এগিয়ে চলেছে গন্তব্যের দিকে। এই গন্তব্য হল ভারত মহাসাগরে অবস্থিত দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপ, যেখানে ভারতীয় প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। ভারতীয় স্বাধীনতার দাবী স্বীকার করে নিলেও প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলি ভারতে আসতে পারেননি, পাওয়ার ট্রান্সফারের এই লৌকিক প্রক্রিয়ার জন্য তাঁরা ভারত মহাসাগরের এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপকে বেছে নিয়েছেন। ব্রিটিশ প্রতিনিধিরা আগেই সেখানে পৌঁছে গিয়েছেন, আজ ভারতীয় দলও পৌঁছে যাবে। প্রতিনিধি দলে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস ও অন্যান্য দলের অনেক সদস্যই আছেন। মধ্যস্থকারীর ভূমিকা দেওয়া হয়েছে অরুণা আসফ আলি, বিনোবা ভাবে আর হুবার্ট হোয়াইটকে।
এই দলের সঙ্গে রাধিও আছে। সে প্রথমে আসতে চায়নি, কিন্তু হোয়াইট সাহেবের জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত রাজি হতেই হয়েছে। হাজার হোক, এই বিপ্লবে তার ভূমিকা বড়ো কম নয়। মাদ্রাজ ট্রেডিং কোম্পানিতে কাজ করার সময় থেকে করণপুরার বিদ্রোহ… রাধি যেভাবে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করার কাজ করে গিয়েছে, হোয়াইট সাহেব সেটা ভুলে যাননি।
হোয়াইট সাহেবের সঙ্গে ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল রাধি। সমুদ্রের নীল জলে ভেসে ওঠা অতীতের কিছু দৃশ্য ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছিল তার চোখে। এই সমুদ্র একদিন মুরারিকে তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু এই সমুদ্রই আবার হোয়াইট সাহেবের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছে। আজ, যখন মুরারির স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে, তখনও সমুদ্র সেই ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকবে।
“আপনি রাধিকা দেবী?”
অপরিচিত গলা শুনে মুখ তুলতেই রাধি দেখল, হুবার্ট সাহেবের
পাশে একজন অল্পবয়সী যুবক এসে দাঁড়িয়েছে। রাধি মাথা নাড়তে ছেলেটি নমস্কার করে বলল, “আমার নাম বলাই চন্দ্র দত্ত। আমি আপনার ছেলে সমর শেখরের বন্ধু। আমিই ইউসিও-র বার্তা তাঁর কাছে পৌঁছে দিতাম।”
রাধি উৎফুল্ল হয়ে বলাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। হুবার্ট সাহেব একসময় তাদের বিদায় জানিয়ে চলে গেলেন। এদিকে যাত্রা প্রায় শেষের দিকে। দূরে দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপের অস্পষ্ট আদল চোখে পড়ছে।
এমন সময় আচমকা আকাশে গুম গুম শব্দ শোনা গেল। বলাই ভুরু কুঁচকে আকাশের দিকে তাকাল। অনেক দূরে কয়েকটা কালো বিন্দু দেখা যাচ্ছে। বলাই ভালো বুঝতে পারল না, সে তার দূরবীন বের করে চোখে লাগাল। কালো বিন্দুগুলো ততক্ষণে বাজপাখির মতো চেহারা নিয়েছে!
স্পিটফায়ার বম্বার্স!
প্রায় দশটা ব্রিটিশ বোমারু বিমান এয়ারস্ট্রাইক করতে এগিয়ে আসছে। বলাই আর দাঁড়াল না, সে লাফিয়ে উঠে কন্ট্রোল রুমের দিকে ছুটতে শুরু করল। ব্রিটিশরা কেন এই প্রত্যন্ত দ্বীপে তাদের ডেকে পাঠিয়েছে, সেটা এখন স্পষ্ট। তারা বেপোরোয়া হয়ে উঠেছে। নৌবাহিনীর প্রতিরোধ ভেঙে দিতে হলে এর চেয়ে ভালো জায়গা হয় না। ভারতের সীমানা থেকে তারা বহু দূরে। এখানে এয়ারস্ট্রাইক করলে প্রতিনিধি মণ্ডলের সদস্যরা তো মারা পড়বেনই, এই নৌবহরকে ধ্বংস করে দিলে ভারতবর্ষের বিপ্লবীদের মনোবল ভেঙে দেওয়াও অনেক সহজ হয়ে যাবে।
মিনিট কয়েকের মধ্যে রেডিও মেসেজ মারফত সব জাহাজে খবর ছড়িয়ে পড়ল। প্রতিনিধি মণ্ডলের সদস্যদের ভিতরে পাঠিয়ে ডেকের ওপর চলে এল সৈনিকরা। যুদ্ধজাহাজের অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গানের মুখ ঘুরে গেল আকাশের দিকে। ততক্ষণে বোমারু বিমানগুলো একেবারে সামনে এসে পড়েছে। গুম গুম শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। কিছু বোঝার আগেই তারা বোমাবর্ষণ শুরু করে দিল।
প্রথম বিস্ফোরণটা হল আইএনএস বোম্বেতে। এর ঠিক পরেই পর পর দুটো বোমা ফাটল নৌবহরের সামনে এগিয়ে চলা পেট্রোল ভেসেলে। এদিকে রেটিংরা অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গানের সামনে পজিশন নিয়ে গুলি চালাতে শুরু করেছে, কিন্তু বিমানগুলো অনেক ক্ষিপ্র। তারা এক এক রাউন্ড বোমাবর্ষণ করে ফিরে যাচ্ছে, তারপর নতুন এয়ার ফর্মেশনে ফিরে আসছে বম্বিং করতে করতে। এই জাহাজে অটোমেটিক ক্যানন নেই, পজিশন চেঞ্জ করে নিশানা নেওয়ার আগেই প্লেনগুলো দ্রুত অবস্থান বদলে রেঞ্জের বাইরে চলে যাচ্ছে। এদিকে পর পর বিস্ফোরণে নৌবহরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ধ্বসে গেছে, পেট্রোল ভেসেলগুলোতে ইতিমধ্যেই জল ঢুকতে শুরু করেছে। প্রাণ হারিয়েছে অনেকে, আহতদের সংখ্যাও কম নয়। বলাই কিন্তু দাঁতে দাঁত চিপে নিশানা নিয়ে যাচ্ছে, তাকে সঙ্গ দিচ্ছে টেলিগ্রাফিস্ট, নেভল ইঞ্জিনিয়ার আর নেভিগেটররা। এই যুদ্ধে তাদের একটাই পরিচয়, তারা স্বাধীনতা সংগ্রামী। যতক্ষণ নিশ্বাস চলবে, এই যুদ্ধ থামবে না।
এমন সময় বলাইয়ের পিছনে একটা বোমা এসে পড়ল। প্রচন্ড জোরে বিস্ফোরণ ঘটল, বলাই ছিটকে গিয়ে পড়ল কুড়ি হাত দূরে। বোমার টুকরোগুলো ছিটকে তার বুকে বিঁধে আছে, গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। বলাই মুখ তুলে দেখল, চারটে বিমান আবার বোমা ফেলতে ফেলতে ধেয়ে আসছে এই জাহাজের দিকে। যেন শিকারি পাখির দল!
তাহলে কি শেষরক্ষা হল না? হতাশ চোখে আকাশের দিকে চেয়ে রইল বলাই। তার বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। চোখ বুজে ফেলল বলাই। শেষবারের মতো তার প্রিয় দেশের ছবিগুলো তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। তার শৈশব, পল্লীগ্রামের টুকরো টুকরো স্মৃতি, বোম্বে বন্দরের সেই দিনগুলো… আহা! প্রিয় ভারতবর্ষ! তার দুর্ভাগা দেশ!
এমন সময় আচমকা প্রচন্ড জোরে শব্দ হল। বলাই চোখ খুলে দেখল, রেটিংরা চিৎকার করতে শুরু করেছে। তাদের আঙুলগুলো আকাশের দিকে প্রসারিত। সেদিকে তাকাতেই বলাইয়ের সারা শরীরে রোমাঞ্চ হল।
চারটের। মধ্যে ।দুটো স্পিটফায়ার বিমান অদৃশ্য। তার জায়গায় যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছে আটটা নতুন বিমান। সেগুলো তাড়া করেছে ব্রিটিশ বম্বারগুলোকে। বলাইয়ের চোখের সামনেই নতুন লড়াকু বিমানের ফোর বাই ফোর মেশিনগান থেকে নিক্ষিপ্ত গুলির ছররা গিয়ে আঘাত করল দুটো স্পিটফায়ারকে। নিমেষের মধ্যে সেগুলোর গায়ে আগুন ধরে গেল। দু’এক মুহূর্তের মধ্যেই বিস্ফোরণে নাস্তানাবুদ হয়ে গেল শিকারি পাখির দল।
বলাই টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল। সারা গা রক্তে মাখা, শুধু মুখে একটা শান্তির হাসি। ব্রিটিশরা জানত না, আরএআইএফ প্রথম থেকেই এই পরিকল্পনায় বিদ্রোহীদের সহযোগী ছিল। খোদ নেতাজি রয়্যাল ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সের উইং কম্যান্ডার সুব্রত মুখার্জিকে এই বিপ্লবে আহ্বান করেছিলেন। সে-আহ্বানে সানন্দে সম্মতি জানিয়েছিলেন সুব্রত। গত কয়েক বছর ধরে আরএআইএফ-এর অপারেটররা ব্রিটিশ সামরিক বিভাগের সমস্ত যাবতীয় খবর ইউসিও-র কাছে পাঠাত, বলাইরাও প্রয়োজনে টেলিগ্রাফের মাধ্যমে সাম্বু আর অন্যান্য এয়ারফোর্স বেসে যোগাযোগ করত। ক্ষমতা হস্তান্তরণের জন্য এই দ্বীপে আসার কথা শুনেই তারা আশঙ্কা করেছিল, ব্রিটিশরা এয়ারস্ট্রাইক করার চেষ্টা করতে পারে। আরএআইএফ-এর ফ্লাইট অফিসাররা কলম্বো বেসে অপেক্ষা করছিল, রেডিও মেসেজ পাওয়া মাত্র সেখান থেকে রওনা দিয়েছিল তারা।
বলাই আকাশের দিকে চাইল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রের চেহারা পাল্টে গেছে। এখন শিকারিরা শিকার, আর শিকার অবতীর্ণ হয়েছে শিকারির ভূমিকায়। অন্য বিমানগুলো পালানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পালানোর কোনও পথ খোলা নেই। ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সের উইং কম্যান্ডার সুব্রত মুখার্জি যখন খোদ এয়ার কমব্যাটের নেতৃত্ব দেন, আরএআইএফ-এর সেরা ফাইটার ‘জাম্বো’ মজুমদার যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘোষণা করেন, দেশের মানুষ যখন প্রাণের ভয় না করে অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তখন শত্রুপক্ষের পালানোর পথ থাকে না।
এত দূর থেকেও বলাই দেখতে পেল, একজন পাইলট হাত নাড়ছে তার উদ্দেশে। তার সারা মুখে হাসি ছড়িয়ে গেল। ফ্লাইট অফিসার সমর শেখর! তার বন্ধু সাম্বু। এই ইনকলাবের তরুণ তুর্কি। সহসা বলাইয়ের চোখ ভিজে উঠল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই সমস্ত তরুণ-তরুণী, যারা দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে, যারা বুক ফুলিয়ে ফাঁসির দড়ির দিকে এগিয়ে গিয়েছে, যারা শত ঝুঁকি, শত বিপদ সত্ত্বেও যুদ্ধ করতে পিছপা হয়নি। রবীন্দ্রনাথের গানের কথা মনে ভিড় করে এল বলাইয়ের।
ঘোরতিমিরঘন নিবিড় নিশীথে পীড়িত মূর্ছিত দেশে
জাগ্রত ছিল তব অবিচল মঙ্গল নতনয়নে অনিমেষে
কত আশা, কত আকাঙ্খা, কত স্বপ্ন জড়িয়ে আছে এই দেশের সঙ্গে। এবারে ব্রিটিশরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হবে। ভারতবর্ষ স্বাধীন দেশ রূপে আত্মপ্রকাশ করবে। কিন্তু এই স্বপ্নগুলো বেঁচে থাকবে তো? দেশের মানুষ এই ইনকলাবকে মনে রাখবে তো?
বলাইয়ের চোখ থেকে জল গড়াতে লাগল। আকাশের দিকে চেয়ে উচ্চৈঃস্বরে গেয়ে উঠল সে:
রাত্রি প্রভাতিল, উদিল রবিচ্ছবি পূর্ব-উদয়গিরিভালে–
গাহে বিহঙ্গম, পুণ্য সমীরণ নবজীবনরস ঢালে।
তব করুণারুণরাগে নিদ্রিত ভারত জাগে
তব চরণে নত মাথা।
জয় জয় জয় হে, জয় রাজেশ্বর ভারতভাগ্যবিধাতা!
জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয় জয় হে…
.
অলঙ্করণ- সুলতা কুণ্ডু
