সান জু-এর যুদ্ধবিদ্যা – পার্থ দে
প্রাককথন
২১২২ সাল, রাজারহাট, কলকাতা
হরিপদর মনে আজ খুব আনন্দ। পুত্রের অ্যাস্টেরয়েড মাইনিং পড়ার পিছনে যা টাকা ঢেলেছে তা আজ সার্থক হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম মাইনিং কোম্পানি রিও টিন্টোর চাকরি পেয়েছে পুত্র গঙ্গাপদ। মঙ্গলগ্রহ পেরিয়ে অ্যাস্টেরয়েড বেল্টের সেরিসে ফার্স্ট পোস্টিং হয়েছে। সিটিসি বাহাত্তর কোটি, আনলিমিটেড হেলথ বেনিফিট, পাঁচ বছর পেরোলে এক বছরের পেইড লিভ। ওটাই একটু মনখারাপের। পাঁচ বছর পুত্রের মুখ দেখতে পারবে না। তা হোক, পুত্র গঙ্গাকে তো তার মতো সময়যাত্রীর কাজ করতে হবে না! এটুকু ভেবেই সে আনন্দিত। তার নিজের চাকরিজীবনের অর্ধেকের বেশি কেটে গেছে বড়োবাজারের ‘বিয়ন্ড টাইম’ ক্যুরিয়ার সার্ভিসের চাকরি করে। মালিক পবন আগরওয়াল তাকে গাধার মতো খাটিয়ে নিয়ে চীনেবাদাম খাওয়ার মতো স্যালারি দিত। প্রায়ই ডিএ, টিএ মেরে দিত লোকটা। শেষে একদিন তো রাগটাগ করে চাকরিটা ছেড়েই দিল হরিপদ। ভাগ্যিস তার টাইম ট্রাভেলারের লাইসেন্সের মেয়াদটা তখন আরও দশ বছর বাকি ছিল! নাহলে কি আর পঞ্চাশ বছর বয়সে রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের এই চাকরিটা জুটত!
এখন হরিপদ তিপ্পান্ন। আর সাত বছর চাকরি, প্রায় মেরে এনেছে। সামনের বছর মেয়ে অন্নপূর্ণারও Mach10 ফ্লাইট অ্যাটেন্ড্যান্টের ডিপ্লোমা শেষ হয়ে যাবে। তখন হরিপদ কিছুটা স্বস্তি পাবে। মেয়ের ইচ্ছে আরও হায়ার স্টাডি করে, স্পেস ফ্লাইট অ্যাটেন্ড্যান্টের কোর্সটায় মাস্টার্স করতে চায়। একবিংশ শতকের শেষ দশক থেকেই স্পেস ট্যুরিজমের বুম শুরু হয়েছে, মেয়ের তাই খুব ইচ্ছে ওই কোর্সটা করে ‘মাস্ক স্পেস ট্যুরিজম’-এর মতো বড়ো কোনো কোম্পানিতে ঢোকার। প্রায় একশ বছর আগে ইলন মাস্ক নামে এক ব্যবসায়ী কোম্পানিটা খুলেছিল, এখন তাদের স্পেস ট্যুরিজমের ব্যাবসা ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। মেয়ের মা অবশ্য এতে গররাজি। মেয়েমানুষ হয়ে স্পেসটেসে যাওয়ার দরকারটা কী! এই নিয়ে মেয়ে-মায়ে নিত্যি খিটিমিটি লেগে আছে।
অফিসে আজ সবাইকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে হরিপদ। ছেলের সাফল্যে গর্বিত বাপ! মিষ্টির হাঁড়ি নিয়ে মুখার্জিসাহেবের ঘরে ঢুকতেই তিনি বললেন, “আরে হরিপদ, এখুনি তোমার কথা ভাবছিলাম! তুমি একশ বছর বাঁচবে।”
হরিপদ রসগোল্লার হাঁড়িটা মুখার্জিসাহেবের দিকে বাড়িয়ে ধরে কিঞ্চিৎ অভিমানী কন্ঠে বলল, “হঠাৎ এই গরিবের কথা মনে পড়ল, স্যার? দোষ নেবেন না, স্যার, কিন্তু মনোতোষ তো আপনার প্রিয় পাত্র, ওকে ছেড়ে আমাকে স্মরণ করছেন শুনে একটু অবাক হলাম।”
“ওভাবে বলছ কেন, হরিপদ। তোমরা দুজনেই আমার প্রিয় পাত্র। এই অফিসে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এলে আমি তোমাদের দুজনকেই একমাত্র ভরসা করে দিতে পারি। তবে অভিজ্ঞতার দিক থেকে তুমি মনোতোষের চেয়ে অনেক এগিয়ে। যাইহোক কাজের কথাটা শোনো।”
“বলুন স্যার।”
“গতকাল ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট ফর ইটারনাল জাস্টিসের অ্যারন হেমসওয়ার্থ ও সারা ইয়োহানসনের ডিভিশন বেঞ্চ একটা রায় দিয়েছে। এবার প্লেইনটিফ ছিল ভারতের চার-পাঁচটা বামপন্থী দলের একটা ফোরাম। তুমি তো জানো, লেনা হিডির চেয়েও মিস ইয়োহানসন কত কড়া। অর্ডার এগজিকিউট করার জন্য তিন হপ্তা মাত্র সময় দিয়েছেন। প্রায় একশ বছর আগে মিসটেকেন আইডেন্টিটির জন্য একটা অপরাধ ঘটে গিয়েছিল। খুবই দুঃখজনক ঘটনা। কোর্ট অর্ডারে হেমসওয়ার্থ আর ইয়োহানসন লিখেছেন—‘আ মিসটেকেন আইডেন্টিটি লিডিং টু আ হেইনাস ক্রাইম মে বিল্ড আ ফল্টি টাইমলাইন ইন হিস্ট্রি বাট দ্যাট ইজ নট অ্যাক্সেপ্টেবল। ইট অলওয়েজ ডিজার্ভস আ সেকেন্ড চান্স টু মেন্ড দ্য ফল্টি টাইমলাইন!’”
কথাটা বলে হাঁড়ি থেকে একটা রসগোল্লা তুলে মুখে পুরে মুখার্জিসাহেব বললেন, “অতএব বুঝতেই পারছ, হাতে একদম সময় নেই। আদাজল খেয়ে লেগে পড়ো, পড়াশোনা যা করার করে নাও। আমি কোর্ট অর্ডারের কপি, স্টাডি মেটেরিয়ালস সবকিছু তোমায় মেইল করছি।”
“আচ্ছা স্যার। আমি তাহলে আমার কাজের টেবিলে যাই?”
“যাও, তবে তোমার কোয়ান্টাম কম্পিউটারে ডেটা ফিড করে একবার সুপারপোজিশন, ইন্টারফেয়ারেন্স, এনট্যাঙ্গলমেন্ট চেক টেক করে নিও। আর হ্যাঁ, মোডাস অপারেন্ডিটা একবার আমাকে ফাইনালি দেখিয়ে নিও।”
“কপি দ্যাট, স্যার।” বলে হরিপদ মুখার্জিসাহেবের ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তার মনের ভিতর আজ লাড্ডু ফুটছে। ছেলের চাকরির সুসংবাদের পর আজ এত ভালো একটা অ্যাসাইনমেন্ট দিলেন মুখার্জিসাহেব। এই কাজটায় দারুণ টিএ, ডিএ পাওয়া যাবে। হরিপদ প্রায় লাফাতে লাফাতে মনোতোষের টেবিলের সামনে গিয়ে রসগোল্লার হাঁড়িটা বাড়িয়ে বলল, “মনোতোষ, মিষ্টি খাও, ছেলের চাকরি হয়েছে।”
মনোতোষ মুচকি হেসে বলল, “ছেলের চাকরি তো হয়েছে, কিন্তু আপনিও তো আজ ভাল দাঁও মেরেছেন।”
হরিপদ ঈষৎ বিরক্ত হল। উফ, আপদটা ঠিক খবর পেয়ে গেছে! “যার যেমন কপাল, ভাই। তবে দুঃখ পেও না, তুমিও যেমন মুখার্জিসাহেবকে তেলেজলে রেখেছ, তোমার ভাগ্যেও শিকে ছিঁড়বে।” বলে নিজের টেবিলের দিকে পা বাড়াল হরিপদ।
১
১৭ ডিসেম্বর, ১৯২৮, লাহোর
লাহোরে এবার হাড়কাঁপানো ঠান্ডা পড়েছে। বেলা তিনটে, কিন্তু এর মধ্যেই রোদটা পড়ে এসেছে। চারপাশে ঝিম ধরানো আমেজ। একটু পরেই আরও জাঁকিয়ে ঠান্ডা নামবে। পুলিশ সুপারিন্টেনডেন্ট জেমস স্কটের সেরেস্তা থেকে আশি মিটার দূরে একটা বহেড়া গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়েছিল দুই তরুণ—ভগত সিং আর শিবরাম রাজগুরু। একজন একুশ, অন্যজন কুড়ি। বয়সে নবীন হলেও তাদের রক্ত ফুটছে, মাথায় যেন আগুন ধরে আছে।
মাসখানেক আগে সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে লাহোরের চৌকে একটা গণডেপুটেশন ছিল। ব্রিটিশ সরকার ভারতের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতি ও সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য স্যার জন সাইমনের নেতৃত্বে ক্লিমেন্ট এটলি সহ সাতজনের একটা কমিটি গড়েছিল, অথচ সেই কমিটিতে একজনও ভারতীয় নেই! ভারতকে নাকি ডমিনিয়ন স্টেটাস দেবে! অথচ কোনো ভারতীয় নেতৃত্বকে কমিটিতেই রাখেনি, কি ভয়ংকর প্রতারণা! এই ঘটনার প্রতিবাদেই পাঞ্জাব কেশরী লালা লাজপত রায় প্রতিবাদ মিছিল সংঘটিত করেছিলেন। সেই মিছিল ‘সাইমন দূর হঠো’ শ্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে চলেছিল পুলিশের প্রশাসনিক কার্যালয়ের দিকে। তখনই পুলিশ সুপারিন্টেনডেন্ট জেমস স্কট সেই মিছিলের উপর নির্বিচারে লাঠি চালানোর আদেশ দেন। পুলিশের এলোপাতাড়ি লাঠির আঘাতে পুরুষ-নারী সহ বহু মানুষ আহত হয়ে পথে লুটিয়ে পড়ে। পুলিশ সুপারিন্টেনডেন্ট স্কট স্বয়ং লালাজীর মাথায় নির্মমভাবে লাঠির আঘাত করেন। বাষট্টি বছরের লালা লাজপত রায় সংজ্ঞাহীন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তার দু-সপ্তাহ পর লালাজী প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে মারা যান। ইংরেজ সরকার লালাজীর মৃত্যুর দায় নিতে অস্বীকার করে জানায়, লালাজীর মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ। কিন্তু ভগত সিং, রাজগুরু, চন্দ্রশেখর আজাদ, জয়গোপাল আর শুকদেবের মতো হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান এসোসিয়েশনের (HSRA) সদস্যরা বিলক্ষণ জানে লালাজীর মৃত্যুর আসল কারণ তাঁর মাথায় জেমস স্কটের লাঠির আঘাত। লালা লাজপত রায়ের মৃত্যুর দিনই ভগত, রাজগুরু, শুকদেবরা অঙ্গীকার করেন জেমস স্কটকে সমুচিত শাস্তি দিতে হবে। আর সেই শাস্তি হল স্কটের মৃত্যুদণ্ডাদেশ।
ভগতের গায়ে পশমের কোট, রাজগুরুর গায়ে একটা আলোয়ান জড়ানো। পকেটে লুকোনো কোল্ট রিভলবারের ঠান্ডা ইস্পাতের বাঁটে হাত বুলিয়ে ভগত বলল, “তুমি স্কটসাহেবকে চেনো তো, শিবরাম?”
“চিনি,” খানিক দ্বিধাগ্রস্ত গলায় শিবরাম রাজগুরু ।বলল, “তবে লালমুখো সায়েবগুলোকে তো সব একরকমই লাগে। চিন্তা নেই, স্কট রোজ সোয়া তিনটে নাগাদ ওই সেরেস্তার দরজা দিয়ে বেরিয়ে তার বাংলোর দিকে যায়।”
সোয়া তিনটে নাগাদ পুলিশ কার্যালয় থেকে খাকি উর্দি পরা এক শ্বেতাঙ্গ যুবক বেরিয়ে এসে দাঁড়াল তার মোটরসাইকেলের সামনে। রাজগুরু উশখুশ করে উঠল, “ওই তো জেমস স্কট। এবার মোটরসাইকেল চেপে রওনা দেবে দক্ষিণ দিক বরাবর। চলো, এখনই কাজটা সারতে হবে, মোটরসাইকেল চড়ে বেরিয়ে গেলে আর নাগাল পাওয়া যাবে না।”
“তুমি নিশ্চিত?” ভগত বলল।
“মাফ করনা, ভিরেজী, তুসি গলত হো! ও মুন্ডা স্কট নেহি, ইয়ে তো অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার সন্ডার্স হ্যায়।”
পিছন থেকে ভেসে আসা অচেনা কন্ঠস্বর শুনে ভগত সিং আর শিবরাম রাজগুরু দুজনেই চমকে পিছনে তাকাল। কাঁধে ঝোলা ব্যাগ নিয়ে এক মধ্যবয়সী মানুষ, সাদামাটা চেহারার কিন্তু পরনে অদ্ভুত পোশাক-আশাক। পায়ের জুতোটাও বিচিত্র।
প্রত্যুত্তরে ভগত কিছু বলার আগেই লোকটা বলল, “মাইসেল্ফ হরিপদ, স্যার, আমি খবর নিয়ে জেনেছি, আজ জেমস স্কট সায়েব অনেক আগেই সেরেস্তা ছেড়ে চলে গেছেন। ওই ইংরেজ যুবকটিকে হত্যা করে লালাজীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়া যাবে না। ভিরেজী, পরে কখনও সুযোগ সুবিধামতো…”
হরিপদকে মাঝপথে থামিয়ে ভগত সিং বলল, “কিন্তু আপনি কে? এত কিছু জানলেন কী করে?”
“আমি কেউ নই, স্যার, জাস্ট আ সিমপ্যাথাইজার অফ ফ্রিডম ফাইটার্স।”
অদূরে তখন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার জে পি সন্ডার্স সেরেস্তা থেকে বেরিয়ে এসে তার মোটরসাইকেলে স্টার্ট দিচ্ছে। ভগত অবিশ্বাসী চোখে হরিপদকে দেখে নিয়ে রাজগুরুর দিকে তাকিয়ে বলল, “শিবরাম, এই লোকটা কিন্তু ঠিকই বলছে, ভাল করে দেখো ওই শ্বেতাঙ্গ যুবক কিন্তু স্কটসায়েব নয়। নির্দোষ মানুষকে মারা আমাদের মিশন নয়, চলো ফিরে যাই। হয়ত আবার সুযোগ আসবে।”
হরিপদ মৃদু হেসে তার কাঁধের ঝোলা থেকে একটা বই বের করে ভগত সিংয়ের হাতে দিয়ে বলল, “ভিরেজী, ম্যায়নে সুনা থা কি আপকো কিতাব পড়না আচ্ছা লগতা হ্যায়, এক কিতাব লায়া থা আপকে লিয়ে।”
ভগত সিং হাতের বইটার দিকে তাকিয়ে দেখল মলাটে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা—’দ্য টেল অফ মাই এক্সাইল’ রিটন বাই বারীন্দ্র কুমার ঘোষ।
২
স্কট হত্যার মিশন এবর্ট করে দিতে হল। সণ্ডার্সও ইংরেজ এবং পুলিশের সহকারী প্রশাসক, কিন্তু লালাজীর মৃত্যুর সঙ্গে তার কোনো প্রত্যক্ষ যোগ নেই। ভগতের অন্তরাত্মা কোনোদিনই নির্দোষ মানুষের মৃত্যু মেনে নিতে পারে না। প্রায় দশ বছর আগে ঘটে যাওয়া অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যকাণ্ডের পর সে একবার ঘটনাস্থলে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তখন তার বয়স মাত্র বারো বছর। কিন্তু ওই বয়সেই তার ন্যায়-অন্যায় বোধ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সেই শূন্য প্রাঙ্গনে গিয়ে দাঁড়াতেই তার চোখের সামনে যেন ভেসে উঠেছিল মৃত মানুষের স্তুপ। আহত, ভীতসন্ত্রস্ত নারী আর শিশুদের কান্না। তার মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে সেনাবাহিনীর গোর্খা রাইফেলস ও সিন্ধ্ রাইফেলসের বন্দুকধারী জওয়ানেরা গুলি করে মেরেছিল প্রায় চারশ জন নির্দোষ নারী পুরুষ শিশুকে। বৈশাখী তেওহারের আগের রাতে রক্তে রাঙা হয়েছিল জালিয়ানওয়ালাবাগের মাটি। সেই মাটি স্পর্শ করে ভগত সেদিন শপথ নিয়েছিল, একদিন রেজিনাল্ড ডায়ারকে হত্যা করে প্রতিশোধ সে নেবেই। কিন্তু পরের বছরই জেনারেল ডায়ার অবসরগ্রহণ করে দেশে ফিরে গিয়েছিল। অপূর্ণ রয়ে গিয়েছিল ভগতের প্রতিশোধের স্পৃহা।
বছর দশেক পরে পুলিশ সুপারিন্টেনডেন্ট জেমস স্কটকে হত্যার সুযোগ হারিয়েও ভগত একইরকম মুষড়ে পড়েছিল। কিন্তু সে জানে, সময় সুযোগ বুঝে স্কটকে হত্যা করার পরিকল্পনা আবার তারা নেবেই। হয়ত এইচএসআরএ-র আগামি সভাতেই সেই অমোঘ সিদ্ধান্ত উঠে আসবে, আবার ছকে ফেলা হবে পরিকল্পনা। কিন্তু মাঝের তিন-চারদিন সে বাড়িতে বসে পড়ে ফেলল বারীন্দ্র কুমার ঘোষের ‘দি টেল অফ মাই এক্সাইল’ বইটা। আর পড়তে পড়তেই তার সারা শরীর জুড়ে রোমাঞ্চ জাগল, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
বারীন ঘোষ আর তাঁর দাদা অরবিন্দ ঘোষের কথা ভগত আগে ভাসা-ভাসা শুনেছিল, বইটি পড়ে আলিপুর বোমা মামলার বিচারের ঘটনাও সে জানতে পারল।
অরবিন্দ ও তাঁর কনিষ্ঠ ভাই বারীন দুজনেই ছিলেন বিলেতের ডিগ্রিধারী উচ্চশিক্ষিত বাঙালি যুবক। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ আইন প্রণয়নকে কেন্দ্র করে যখন বাংলা তথা গোটা ভারতের রাজনীতি উত্তাল, ঔপনিবেশিক শাসকদের ষড়যন্ত্রমূলক দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল, তখনই অরবিন্দ ঘোষ ও বারীন ঘোষের মতো উচ্চশিক্ষিত বাঙালি যুবকেরা সশস্ত্র বিপ্লবের পথে নেমে পড়েছিলেন। বারীন ঘোষ বঙ্গভঙ্গ আইনের বছর তিনেক আগেই বিলেত থেকে ফিরে এসেছিলেন। ঢাকার অনুশীলন সমিতির কলকাতার মানিকতলা শাখার স্বদেশী আন্দোলনের কাজকর্মের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। যুগান্তর পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক ইংরেজ শক্তির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলছিলেন।
ইতিমধ্যে দ্বিজাতিতত্ত্বের বিষাক্ত বীজ ছড়িয়ে পড়েছিল মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে। ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুহম্মদ আলি জিন্না, আগা খান আর সলিমুল্লাহদের নেতৃত্বে জন্ম হল সর্বভারতীয় মুসলিম লিগের। এদিকে বারীন আর বাঘা যতীনের পৃষ্ঠপোষকতায় অনেক উচ্চশিক্ষিত বাঙালি যুবক দীক্ষিত হচ্ছে সশস্ত্র স্বদেশী আন্দোলনের মন্ত্রে। মানিকতলার গুপ্ত সমিতির ঘাঁটিতে ব্রিটিশ সরকারের অলক্ষ্যে জড়ো করা হচ্ছে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র। যুবকদের দেওয়া হচ্ছে সোরা-গন্ধক ঠেসে হাতবোমা বানানোর প্রশিক্ষণ।
সশস্ত্র বিপ্লবের সেই অগ্নিযুগের ভিতর থেকে জন্ম নিয়েছে ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকীর মতো নির্ভীক তরুণ। এই দুই যুবক ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস কিংসফোর্ডের গাড়ির উপর বোমা নিক্ষেপ করল, কিন্তু ভুলবশত মারা গেল দুজন নিরীহ ইংরেজ মহিলা। তখন থেকেই ইংরেজদের পুলিশ-প্রশাসন কলকাতা ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে ব্যাপক খানাতল্লাশি শুরু করল।
মে-মাসের শুরুতেই মানিকতলার গোপন আস্তানা থেকে ধরা পড়লেন অরবিন্দ ঘোষ, বারীন ঘোষ সহ বহু বাঙালি বিপ্লবী যুবক। তাদের বিরুদ্ধে ইংরেজ পুলিশ শুরু করল আলিপুর বোমা মামলা। প্রাথমিকভাবে আলিপুর আদালতের জজসাহেব বারীন ঘোষ ও উল্লাসকর দত্তকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলেন। বিখ্যাত ব্যারিস্টার চিত্তরঞ্জন দাশ তখন ইংরেজ সরকারের আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালতে সওয়াল-জবাব করে বারীন ও উল্লাসকরের মৃত্যুদণ্ড রদ করলেন। কিন্তু ইংরেজ জজসাহেব বারীন ঘোষকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে আন্দামানে দ্বীপান্তরে পাঠালেন।
ভগত সেই বারীন ঘোষের লেখা বইটি পড়ে তিনটি বিষয় বুঝল। এক, বিংশ শতকের প্রথম দশকের চরমপন্থী সশস্ত্র আন্দোলনের রাজনীতি ব্রিটিশ সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সেই আন্দোলনের লাইন থেকে বিচ্যুত হয়ে মহাত্মা গান্ধীর পরামর্শে কংগ্রেসের নরমপন্থী আন্দোলনের লাইন গ্রহণ করা মোটেই সঠিক হয়নি। এই নরমপন্থী দ্বিপাক্ষিক আলোচনাভিত্তিক আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতাকে আরও বিলম্বিত করবে।
দুই, বারীন ঘোষের মতো সশস্ত্র আন্দোলনের পুরোধাকে আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা দরকার।
তিন, বারীন, উল্লাসকর দত্ত প্রমুখদের মতো ইংরেজ প্রশাসনের হাতে ধরা পড়ে জীবনের মূল্যবান বছরগুলি কারাগারের অন্তরালে কাটানো চলবে না। আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে তার নিজের দল এইচএসআরএ-কে আরও মজবুত করে গড়ে তুলতে হবে। কংগ্রেসের ভ্রান্ত পথের আন্দোলনের বিপরীতে দাঁড়ানো ডাঙ্গে, মানবেন্দ্রনাথ রায় প্রমুখদের দল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে তার নিজের দলের সহযোগী করে নিতে হবে। সশস্ত্র আন্দোলনে বিশ্বাসী বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষদের এক ছাতার তলায় আনতে হবে।
ভগত বইটা বন্ধ করে গভীর চিন্তায় ডুব দিল। সম্প্রতি দুটি বই ভগতের চিন্তাজগতকে গভীরভাবে আচ্ছন্ন করেছে। বারীন ঘোষের এই বইটি তো বটেই, তবে এর আগে যে বইটি সে পড়েছে সেটাও তাকে চমৎকৃত করেছে। এক জার্মান রাজনীতি-বিশ্লেষক মহিলা ক্লারা জেটকিনের লেখা ‘রেমিনিসেন্সেস অফ লেনিন।’
বারো বছর আগে যেভাবে রাশিয়ার জারতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে বলশেভিক বিপ্লবীরা সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়ে তুলেছে তা ভগতকে প্রবলভাবে উদ্দীপিত করেছে। তার শয়নে-স্বপনে এখন ইংরেজ ঔপনিবেশিক শক্তিকে উচ্ছেদ করে স্বাধীন ভারত গড়ে তোলার স্বপ্ন, যে স্বাধীন ভারতে হিন্দু, মুসলমান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন সহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো বিভেদ থাকবে না।
হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভাজনের রাজনীতির প্রকৃত উদ্দেশ্য মানুষকে বোঝাতে হবে। ভগত, শুকদেব, চন্দ্রশেখর আজাদ সহ এইচএসআরএ-র সদস্যরা বিলক্ষণ বোঝে যে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে না দেওয়ার চক্রান্ত করতেই বাংলার বিভাজন করা হয়েছে। কংগ্রেস দল ও মুসলিম লিগের মধ্যে ফাটল তীব্র করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু দরিদ্র, অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ভারতবাসী এই সত্যটা বুঝতে অপারগ। দেশের মানুষকে বোঝাতে হবে দুটি ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ পরষ্পরের শত্রু নয়। শত্রু হল ঔপনিবেশিক শক্তি এবং তাদের পদলেহনকারী উচ্চবিত্ত ভারতীয় ও সামন্ত প্রভূরা। এরা দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র জনসাধারণকে শোষণ করে আসছে। তারা শোষক, আর সাধারণ ভারতীয়রা শোষিত। এই সঠিক রাজনৈতিক চেতনা দেশের মানুষের মধ্যে প্রচার করতে পারলেই মানুষ ঐক্যবদ্ধ হবে, গর্জে উঠবে ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে, যেভাবে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় গর্জে উঠেছিল।
ক্লারা জেটকিনের ।বইটা ।পড়ে ভগত চিনেছিল ভ্লাদিমির ইলিচ
লেনিনকে। সেই মহাজীবন তাকে এতটা উৎসাহিত করেছিল যে ভগত সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়ে সচক্ষে লেনিনের বাসস্থান, সমাধি দেখার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। চেয়েছিল লেনিনের উত্তরসূরী জোসেফ স্ট্যালিনের সঙ্গে দেখা করে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য সাহায্য চাইতে। ভগতের বিশ্বাস বলশেভিক পার্টির আদলে তার এইচএসআরএ-কে গড়ে তুলতে পারলে বিপ্লব আরও ব্যাপকতর করে তোলা সম্ভব। কিন্তু রুশদেশে গিয়ে স্ট্যালিনের কাছ থেকে সাহায্য চাওয়ার বিষয়টা অত সহজ নয়।
হঠাৎ ভগতের মাথায় একটা অন্য চিন্তা এল। তার সামনে পড়ে থাকা ‘দি টেল অফ মাই এক্সাইল’ বইটার দিকে তাকিয়ে সে মুচকি হাসল।
৩
পঞ্চাশ ছুঁয়ে যাওয়া মানুষটার দিকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ভগত সিং। সমুদ্রতটের সোনালি বালির উপর বসে আছে তারা দুজনে। সামনে অসীম নীল বঙ্গোপসাগরের বিস্তার, একের পর এক ঢেউ ভেঙে পড়ছে পণ্ডিচেরীর সমুদ্রতটে। অবিরাম ঘটে চলা ঢেউয়ের ভাঙাগড়ার এই দৃশ্য অনন্তকাল ধরে ঘটে চলেছে। ভগতের পাশে বসা মানুষটির শান্ত চোখদুটি দেখে বোঝা মুশকিল তিনি পঁচিশ বছর আগে এক অগ্নিবর্ষী বিপ্লবী ছিলেন। ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে তোলার শাস্তিস্বরূপ বারো বছর আন্দামানের সেলুলার জেলে কাটিয়ে এসেছেন।
মানুষটি সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখ ভগত, তোমার সামনে এই যে অনন্ত জলধি, তরঙ্গের ওঠাপড়া, তার নাদ, এই সবই ধ্রুব। শাশ্বত। কিন্তু ভারতে ঔপনিবেশিক ইংরেজ-শাসন, পরাধীন ভারতবাসীর এই দুর্ভোগ, এগুলো কিন্তু পরিবর্তনশীল। একদিন ইংরেজদের ভারত ছাড়তেই হবে। কিন্তু, এই যে আমরা সমুদ্রের দিকে বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছি, এমন বিহ্বল হয়ে ইংরেজদের দেশ ছাড়ার অপেক্ষায় বসে থাকলে কিন্তু ওরা যাবে না। বরং তাতে ঔপনিবেশিক শাসনের মেয়াদ দীর্ঘায়িত হবে। আবেদন-নিবেদন, আলোচনা-প্রস্তাবের মাধ্যমে তাদের অপসারণ দাবি করেও কোনো লাভ নেই। একমাত্র সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের মনে ভয় ঢোকাতে পারলে, তবেই তারা দেশ ছেড়ে যাবে।”
“আমি জানি বারীনজী, সেজন্যই আমি আপনার কাছে এসেছি। আপনি আমাদের পথ দেখান।”
“কিন্তু আমি যে দাদাকে কথা দিয়েছি সশস্ত্র আন্দোলনের পথ পরিত্যাগ করব। শ্রীমা মীরা আলফাসার কাছেও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে আমি আর কোনোদিন অস্ত্র হাতে তুলে নেব না। দাদার প্রতিষ্ঠিত এই পণ্ডিচেরীর আশ্রমে আমি আধ্যাত্মিকতার পাঠ আর যোগাভ্যাসের মাধ্যমে হয়ত মানসিক শান্তি পেয়েছি, কিন্তু এখনও পরাধীন ভারতের মানুষের দুঃখ আমাকে কাতর করে। ইংরেজ প্রশাসনের দমণপীড়ন আমার মনকে অশান্ত করে, রক্তকে উত্তপ্ত করে। এই দুঃখ-কাতরতা আমার অন্তরের আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলকেও মেঘাচ্ছন্ন করে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি খুব দ্রুত সাংবাদিকতায় ফিরে যাব। ফের যুগান্তরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারি অথবা নতুন কোনো ইংরেজি সাপ্তাহিকী প্রকাশ করতেও পারি। তবে আমি তোমাদের এইচএসআরএ-র কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গোপনে সহযোগিতা করে যাব, এটুকু কথা দিতে পারি।”
“অনেক ধন্যবাদ, বারীনদা। আপনার মতো মানুষকে পেলে আমাদের সশস্ত্র বিপ্লব ফের উজ্জীবিত হবে।” ভগতের মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
“মনে রেখো, ভারতকে ইংরেজ শাসন থেকে মুক্ত করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ও কর্তব্য। আজও আমি স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখি, কিন্তু এবার আমাদের রণনীতি বদলাতে হবে। তুমি সান জু-এর লেখা ‘দি আর্ট অফ ওয়ার’ পড়েছ?”
ভগত নেতিবাচক মাথা নাড়ে। বইটির নাম সে শোনেনি কখনও। সশস্ত্র বিপ্লবকে সমর্থন করে এমন কোনো বইয়ের হদিশ পেলে সে কখনও ছাড়ে না।
“এই বইটি খুব প্রাচীন বই। খ্রীস্টপূর্ব ছয় শতকে এই বই লিখে যান সান জু। চীনের ঝাউ বংশের রাজত্বকালে তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ সমরকুশলী সেনাপতি। সান জু-এর বইটি একটি শীর্ণকায় বই হলেও তা আবহমানকাল ধরে মিলিটারি জেনারেলদের অবশ্যপাঠ্য হয়ে গিয়েছে। তুমি চাইলে আমি এই বইটির একটি সংক্ষিপ্ত সারমর্ম তোমায় শোনাতে পারি।”
প্রবল উৎসাহে ভগত বালুতটে নড়েচড়ে উঠে বসল। তার শরীরে এক দারুণ উত্তেজনা, “বারীনদা, শিগগিরই বলুন।”
‘দি আর্ট অফ ওয়ার’-এ সান জু মূল যে ধারণাগুলি দিয়ে গেছে তা হল-
১) সেই যোদ্ধাটিই যুদ্ধে জয়লাভ করে যে জানে কখন যুদ্ধ করতে হয় আর কখন যুদ্ধ করতে নেই। বুঝতেই পারছ, যুদ্ধ ঘোষণার জন্য সঠিক সময়টি চিনে নিতে হবে।
২) সেই যোদ্ধাটিই জয়ী হয় যে বৃহৎ ও ক্ষুদ্র শত্রুশক্তির মধ্যে ভেদ না করে সমরে অবতীর্ণ হয়, কারণ যুদ্ধে কোনো শত্রুপক্ষই ছোটো বা বড়ো হয় না। উভয়ই সমান গুরুত্বের।
৩) যুদ্ধে সেই পক্ষই জয়লাভ করে যাদের সেনাপতি থেকে শুরু করে নিম্নবর্গের একজন পদাতিক সৈনিকও সমরকুশলতায় সমান দক্ষ ও সমান যুদ্ধজয়ের মানসিকতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
৪) সেই যোদ্ধাটিই জয়ী হয় যে নিজেকে কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে প্রস্তুত করেছে এবং আক্রমণের পূর্বে শত্রুপক্ষের অপ্রস্তুত মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করে।
ভগত সিং চমৎকৃত হয়ে ওঠে। এ তো শুধুমাত্র এক যুদ্ধবাজ সেনাপতির ভাষ্য নয়, এ যেন এক দার্শনিকের উক্তি! সমরবিদ্যার কতটা গভীরে গেলে এমন উপলব্ধিগুলো তৈরি হয়!
“এ তো অসাধারণ!” বিস্মিত ভগত বলল।
“সান জু তাঁর নিজের উক্তিতে কয়েকটি কথা বলেছিলেন—‘বিশৃঙ্খলার মধ্যেই হয়ত লুকিয়ে থাকে সুবর্ণ সুযোগ।’
“আবার তিনি বলছেন, ‘জয়ী যোদ্ধা জয় সুনিশ্চিত করেই যুদ্ধে যায়, অন্যদিকে পরাজিত যোদ্ধা আগে যুদ্ধে যায়, তারপরে জয়ের সন্ধান করে।’
“আবার সান জু বলছেন, ‘একজন যোদ্ধার পরিকল্পনাটি অন্ধকারের মতো গোপন ও দুর্ভেদ্য হতে হবে। তার গতিবিধি আগাগোড়া শত্রুদের অগোচরে থাকবে, তাই যখন সে অতর্কিতে আক্রমণ শানাবে তখন তা শত্রুপক্ষের মাথায় বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো আঘাত হানবে।’ ”
প্রতিটি শব্দ ভগত নিবিষ্ট চিত্তে শুনছে আর মস্তিষ্কের ভিতর লিপিবদ্ধ করে রাখছে। ভগবান তাকে সাহস ও শক্তির সঙ্গে অসম্ভব শ্রুতিধর করে গড়েছেন। সে অনুধাবন করতে পারছে তার দল এইচএসআরএ-র সাংগঠনিক গঠনতন্ত্রটিকে সংশোধন ও পরিমার্জন করে ফের ঢেলে সাজাতে হবে। ভারতীয় যুবকদের ফের সশস্ত্র আন্দোলনের ধারায় আকৃষ্ট করে তুলতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে ভাইসরয় লর্ড আরউইনের প্রস্তাবিত ভারতের ডমিনিয়ন স্টেটাস আসলে এক ছলনা। কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে কোনোরকম গোলটেবিল বৈঠকের মাধ্যমে এমন মিথ্যা চুক্তিতে সই করে নেওয়ার অর্থ হল ভারতের পূর্ণ স্বরাজ বা স্বাধীনতার দাবিকে আরও পিছনে ঠেলে দেওয়া।
ভগত উঠে দাঁড়িয়ে মানুষটির পা ছুঁয়ে বলল, “বারীনদা, এবার আমাকে বিদায় নিতে আজ্ঞা দিন। আমি দিল্লি ফিরে যাব। আমার দল এইচএসআরএ-কে ঢেলে সাজাব।”
“ভগত, তুমি যাওয়ার আগে একজনের কথা বলি, সম্ভব হলে তাঁর সঙ্গে দেখা কোরো। আমার বিশ্বাস সেই ব্যক্তিও তোমাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন।”
“কার কথা বলছেন?”
“সুভাষ চন্দ্র বোস।”
“সুভাষজী!” ভগত কিঞ্চিৎ বিরক্তি ঝরানো কন্ঠে বলল, “কিন্তু উনি তো সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেসের সভাপতি, হরেদরে সেই কংগ্রেস নেতাই তো হল। আমার কংগ্রেস নেতাদের উপর একেবারেই ভরসা নেই, বারীনদা।”
“সুভাষ কংগ্রেসের অন্য নেতাদের থেকে অনেক পৃথক, তুমি জানো না। সে সহিংস স্বদেশী আন্দোলনে বিশ্বাসী। ওর কাছে গেলে তোমার লাভই হবে।”
৪
তিনি সন্ধে সাতটা নাগাদ সবেমাত্র তাঁর এলগিন রোডের বাড়িতে ফিরেছেন। সকাল থেকে সারাদিন যুব কংগ্রেসের অনেকগুলি সাংগঠনিক কাজ সেরেছেন। মাঝখানে দুপুরবেলা ধর্মতলার কর্পোরেশন স্ট্রিটের লালবাড়িতে যেতে হয়েছিল একবার। কলকাতার মেয়র যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত ডেকে পাঠিয়েছিলেন। যতীনদা তাঁকে বড়ো স্নেহ করেন, তাছাড়া অগ্রজ কংগ্রেস নেতা, তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে উপায় নেই। পাঁচ বছর আগে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মেয়র থাকাকালীন তিনি সিইও হিসেবে কলকাতা কর্পোরেশনের বেশ কিছু ভাল কাজ করেছিলেন, সেই কাজের সুবাদেই যতীনদা তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন উন্নয়ন সংক্রান্ত একটি মিটিংয়ে। মধ্য কলকাতার পথঘাটের কার্বন আর্ক ল্যাম্পের পরিবর্তে টাংস্টেন ফিলামেন্টের ইলেকট্রিক ল্যাম্প লাগানো যায় কিনা, সেই সংক্রান্ত আলোচনা। সদ্য ফিলিপস ইলেকট্রিক কোম্পানির অফিস খুলেছে চৌরঙ্গীতে। এই পথবাতি সুবিধাজনক হলে তাদের কাছ থেকে কোটেশন চাওয়া যেতে পারে।
ক্লান্তি আর কলকাতার আর্দ্র আবহাওয়ায় শরীরটা ঘর্মাক্ত হয়েছিল। তাই বাড়ি ফিরেই তিনি স্নানে ঢুকেছিলেন। স্নানটান সেরে দোতলার ঘরের আরামকেদারায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এমন সময় বাড়ির একজন পরিচারক এসে জানাল এক পাঞ্জাবী যুবক এসেছে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। তিনি কোনো সাক্ষাতপ্রার্থীকে অদ্যাবধি ফেরাননি, সে যত রাতই হোক। পরিচারককে বললেন, যুবকটিকে উপরের ঘরে পাঠিয়ে দিতে।
যে যুবকটি তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল, সে শিখ যুবকদের মতোই দীর্ঘকায় ও স্বাস্থ্যবান কিন্তু বয়সে নবীন। বাইশ-তেইশের বেশি হবে না। কিন্তু যুবকের মুখটি যেন বড়ো চেনা চেনা লাগে। কোথায় দেখেছেন এই মুখ?
তাঁর স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। ঠিক মনে পড়ে গেল! এই যুবকের ছবি তিনি সংবাদপত্রে দেখেছেন। পাঞ্জাব-কেশরী লালা লাজপত রায়ের অন্তিম যাত্রাকালের আলোকচিত্রে এই যুবকটিকে একেবারে প্রথমের সারিতে। তিনি আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে অভ্যর্থনা করলেন।
শিখ যুবকটি কিঞ্চিৎ লজ্জিত বোধ করল, সম্ভবত তার চেয়ে বয়সে বছর দশেকের বড়ো কারও কাছ থেকে এতটা সম্মান ও বিনয়ী আচরণ আশা করেনি। সেও তড়িঘড়ি হাতজোড় করে এগিয়ে এসে বলল, “আপ বৈঠিয়ে সুভাষজী। আমি ভগত সিং।”
“আমি তোমাকে চিনি। বয়সে ছোটো, তাই তুমি বললাম। তুমি লালা লাজপত রায়ের সঙ্গী ছিলে। লালাজীর অন্তিম যাত্রাতেও তুমি ছিলে। বোসো, আমরা বসে কথা বলি।”
ভগত গদি আঁটা একটা চেয়ারে বসে পড়ল। প্রথম দেখায় মানুষটাকে ভাল লেগেছে তার। মোহনদাসজীর মতো জ্ঞানবৃদ্ধ নন, তরুণ বিপ্লবীদেরও শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখেন, উৎসাহের সঙ্গে কথা বলতে চান।
“শ্রদ্ধেয় বারীনজী আপনার সঙ্গে দেখা করতে বলেছেন। বলেছেন আপনি আমাকে সাহায্য করতে পারবেন।”
“বারীনবাবু, মানে বারীন্দ্র কুমার ঘোষ! উনি ঋষিতুল্য মানুষ, উনি আমাকে স্নেহ করেন বলেই হয়ত আমার উপর বিশ্বাস করে বলেছেন। কিন্তু সাহায্যটা কী?”
ভগত তার অটল দৃষ্টি সুভাষ চন্দ্র বসুর চোখে রেখে আচমকা প্রশ্ন করল, “সুভাষজী, আপনি কংগ্রেসে আছেন কেন? ওই বৃদ্ধদের দলে আপনাকে একটুও মানায় না। কংগ্রেস নেতারা কেন যে বোঝেন না ওইসব আবেদন-নিবেদন আর আলোচনার টেবিলে বসে অনুনয় বিনয় করে স্বাধীনতা আসবে না! পূর্ণ স্বরাজ আমাদের অধিকার, আর প্রয়োজনে অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয়। কংগ্রেসের ওই জ্ঞানবৃদ্ধের দল স্বাধীনতার জন্য ততদিন অপেক্ষা করে যাবে যতদিন না ভারতের সাম্প্রদায়িক ঐক্য ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। আপনি ভেবে দেখুন, ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের দ্বিজাতিতত্ত্ব ভিত্তিক বাংলা বিভাজনের পরের বছরেই অল ইণ্ডিয়া মুসলিম লিগ গঠিত হল, ।তারপর। ১৯১৫।। সালে হিন্দু মহাসভা গঠিত হল, এই কংগ্রেস নেতারা আটকাতে পারল? পারেনি। কারণ তারা চায়নি।”
সুভাষ বসু তাঁর সামনে বসা শিখ যুবকের গলায় আগুনের ছোঁয়া পেলেন। এমন দৃপ্ত উচ্চারণটি করতে গেলে একই সঙ্গে সততা ও সাহসের দরকার। এই তরুণের সেই সৎ সাহস ও নির্ভীক উচ্চারণটি তাঁর বড়ো ভাল লাগল। পূর্ণ স্বরাজকে দেশবাসীর জন্মগত অধিকার গণ্য করে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনেক সিনিয়র নেতার যে জড়তা আর সংশয় রয়েছে তা তিনিও জানেন।
“তোমার কি মনে হয় আমার কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে আসা উচিত? কিন্তু আমাকেই তা বলার কারণটা কী? অন্য আরও অনেক বড়ো নেতাই তো কংগ্রেসে আছেন, তাদের কাছে এই প্রস্তাব কি রেখেছ?” ঈষৎ কৌতুকের সুরে সুভাষ বললেন।
“আর কাউকে এই প্রস্তাব দিইনি, কারণ আপনার মতো আর কেউ নেই কংগ্রেসে। তাছাড়া, আমি জানি, আপনিও আমার মতো ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনে বিশ্বাস করেন।”
সুভাষ শিখ যুবকটির কথায় চমকিত হন। এ-কথা তো যুবকের জানার কথা নয়! মোহনদাসজী, জওহরলাল ছাড়া কংগ্রেসের ভিতরে সামান্য কয়েকজন নেতাই জানেন। তাই নিয়ে কংগ্রেসের ভিতরেই এক অন্তঃসলিলা দ্বন্দ্বের আভাসও তিনি পেয়েছেন ইদানীং। তবে তাঁর অভিভাবকস্থানীয় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ একমাত্র তাঁর চরম আন্দোলনের পন্থাটিকে ফেলে দেননি, এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে মত বিনিময়ও করেছেন।
সুভাষ তাঁর আরামকেদারাটি ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। হাঁটতে হাঁটতে ঘরের কোনের দেরাজ খুলে হ্যাঙ্গারে ঝোলানো জলপাই রঙের একটি সামরিক উর্দি বের করে এনে ভগতের দিকে বাড়িয়ে বললেন, “এই দেখো, কংগ্রেসের ভলান্টিয়ার কর্পসের জেনারেল অফিসার কম্যান্ডিং হওয়ার পর এটা বানিয়েছিলাম। কলকাতার বিখ্যাত ইংরেজ দর্জির দোকান হারমান’স থেকে বানানো। এটা গত জানুয়ারিতে কলকাতায় কংগ্রেসের যে অধিবেশন হয়েছিল, সেখানে পরার জন্য বানিয়েছিলাম। মতিলাল নেহরু সভাপতিত্ব করেছিলেন। কেমন দেখছ?”
“বাহ, খুব ভাল, একেবারে সামরিক উর্দির মতো!”
“এটা তোমাকে কেন দেখালাম জানো? এটা দেখে গান্ধীজী কী মন্তব্য করেছিলেন, সেটা মনে পড়ে গেল।”
ভগত কথাটা বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকল। কিন্তু উৎসুক হয়ে তাকাল।
বিষণ্ণ হেসে সুভাষ বললেন, “উনি বলেছিলেন, এই পোশাক পরে আমি নাকি কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনকে ইংরেজদের বিখ্যাত বার্ট্রাম মিলের সার্কাস বানিয়ে ছেড়েছি। প্রচুর বিনোদনের উপকরণ জুগিয়েছি! সেই কথা শুনে আমার তো খারাপ লেগেছিলই, কলকাতার বুদ্ধিজীবী বাঙালি মহলও প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন বাপুজীর ওপর।”
তরুণ ভগতের রক্ত এমনিতেই গরম, সে বলে উঠল, “এত অপমান সহ্য করে কংগ্রেসে আছেন কেন?”
“তোমাদের মতো তরুণ রক্তের বিপ্লবী যুবকদের আগে পাশে পাইনি বলে।” সুভাষ হাসেন।
“আপনি এলে স্বাধীনতার সশস্ত্র আন্দোলন আরও মজবুত হবে। আপনার মতো পথপ্রদর্শককেই তো আমরা পাশে চাইছি। বলুন, আপনি আমাদের সঙ্গে আছেন তো?”
“তুমি কি আজই রেলপথে পাঞ্জাব থেকে এসেছ? অনেক রাত হয়েছে, আজ আমার বাড়িতেই থেকে যাও। এখানে অতিথিদের থাকার সুব্যবস্থা আছে।”
“আপনি কিন্তু আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলেন না।”
সুভাষ মৃদু হাসেন। “ভগত, আমাকে একটু ভাবার সময় দাও।”
বাড়ির পরিচারকেরা এসে ভগত সিংকে তার রাত্রিবাসের ঘরখানিতে নিয়ে যায়। খানিক বাদে সুভাষ ও ভগত একসঙ্গে নৈশাহার করতে বসেন। সুভাষ পরিমিত আহার করেন, তবে ভগতের জন্য অঢেল খাবারের আয়োজন। সে আহার শেষে সুভাষের দিকে তাকিয়ে বলেন, “সুভাষজী, আমি কাল প্রাতেই পাঞ্জাব রওনা দেব, তার পূর্বে আপনার সঙ্গে দেখা করে যাব… তবে আপনার সদুত্তরের জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করব।”
সুভাষ ঈষৎ অন্যমনস্কভাবে ঘাড় নেড়ে বলেন, “শুভরাত্রি।”
রাত গভীর হয়েছে। জানলার বাইরে শুক্লাদ্বাদশীর বর্তুলাকার চাঁদ রূপোর থালার মতো জ্বলজ্বল করছে। এলগিন রোডের বাড়ির দোতলার বারান্দায় সুভাষ দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখেচোখে জ্যোৎস্নার ছিটেফোঁটা লেগে। বর্তমানে কংগ্রেসের নেতৃত্বের মধ্যে তাঁর ক্রমেই উত্থান হয়ে চলেছে। মানুষের সঙ্গে জনসংযোগ বেড়েছে। তবু কংগ্রেসের মধ্যেও তাঁর পরিচয় এক ভিন্নতর নেতা হিসেবে। মধ্যপন্থী বর্ষীয়ান নেতারা অনেকেই তাঁকে খুব ভাল চোখে দেখেন বলে মনে হয় না।
তবে কংগ্রেসের যুবা সদস্যদের কাছে তিনি ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন তাঁর ইস্পাত কঠিন মনোভাবের জন্য। কিন্তু এই জনপ্রিয়তা, এই নেতৃত্বের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা সবই তাঁর কাছে অর্থহীন। দেশের স্বাধীনতার পথটি সুগম করে ত্বরান্বিত করা ছাড়া তাঁর কাছে সবকিছুই গুরুত্বহীন।
পরাধীন দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করার ব্রত নিয়েই তিনি বিলেতের বৈভবশালী জীবনের হাতছানি উপেক্ষা করে দেশে ফিরে এসেছিলেন। গান্ধীজীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন, কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর প্রায় দশ বছর ধরে কংগ্রেসে থেকে তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য কতটুকু করতে পেরেছেন? আন্দোলনের যে পথটি তিনি বিশ্বাস করেন না, সেই পথে গান্ধী, জওহরলালের সহযাত্রী হয়ে লাভ কী? অযথা সময় নষ্ট ছাড়া আর কী! তিনি যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে এতদিন দুলছেন, আজ এই অল্পবয়সী শিখ যুবকটি স্পষ্ট উচ্চারণে তা বলে দিল! যদি তিনি কংগ্রেসেই থেকে যান, কংগ্রেসের অনড় মনোভাবের এই বর্ষীয়ান নেতাদের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত পথ চলতে পারবেন তো? মাঝপথে এই আপোসের পথ পরিত্যাগ করতে হবে না তো? তাই যদি হয়, তবে সেই ভ্রান্ত পথ এখনই পরিত্যাগ করলে ক্ষতি কী?
দীর্ঘক্ষণ জ্যোৎস্নাভেজা বারান্দায় পায়চারি করেন সুভাষ। কখনও হতাশায় মাথা নাড়েন, কখনও পূর্ণ শশীর দিকে তাকিয়ে মুখ। তুলে তাকান। কোথায় যেন এক রাতচরা পেঁচা ডেকে ওঠে।
ঘরের গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটায় ঢং ঢং শব্দে রাত দুটো ঘোষণা হতেই সুভাষ ঘরে ফিরে আসেন। জানলাঘেঁষা পড়ার টেবিলটায় চেয়ার টেনে বসেন। টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে কাগজ কলম নিয়ে বসেন। হঠাৎ সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে খসখস করে কলম চলে-
শ্রদ্ধেয় মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী,
প্রায় দশ বছর যাবদ আমি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কর্মকান্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থেকেছি। আপনার কাছেই দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে কংগ্রেস দলের পথে সামিল হয়েছি। আপনার প্রশ্রয়েই সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেসের সভাপতি হয়ে দলের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছি। এই পথে দশ বছর অতিক্রান্ত হল, কিন্তু যে ব্রত ও উদ্দেশ্য নিয়ে দেশের কাজে নেমেছিলাম সেই উদ্দেশ্য কি কিঞ্চিৎ হলেও সফল হয়েছে, এই প্রশ্ন নিজেকে বারবার করি। কিন্তু বারবার উত্তর আসে—’না’! তাই একধরণের আত্মগ্লানি আমাকে গ্রাস করে নেয়। আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারি না। অনেকে না জানলেও, আপনি তো জানেন, আপনাদের এই নরম মনোভাবাপন্ন মধ্যপন্থী পথে আমার আস্থা নেই, আমি বিশ্বাস করি সশস্ত্র আন্দোলনের চরমপন্থী পথে।
তাই, আর আত্মপ্রতারণা করব না, দ্বিধাগ্রস্ত মন নিয়ে আপনাদের পথের বোঝাও আর বাড়াব না। ভারতকে পূর্ণ স্বরাজ দেওয়ার পরিবর্তে লর্ড আরউইনের ডমিনিয়ন স্টেটাস দেওয়ার ধোঁকাবাজিতেও আমি বিশ্বাস করি না। আমি ইংরেজ সরকারের সঙ্গে কোনোরকম আপোসেই আগ্রহী নই।
আজ, ১২ মার্চ, ১৯২৯, রাত ২:৩০ ঘটিকা থেকেই আমি জাতীয় যুব কংগ্রেসের সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে আপনার নিকটে এই পদত্যাগপত্র পাঠাচ্ছি। আমার ত্যাগপত্রটির প্রাপ্তিস্বীকার ও গ্রহণ করে আমাকে বাধিত করবেন। জানি, আমি যে পথে অগ্রসর হব, সে পথে আপনার বিশ্বাস নেই, তবুও আপনার অবগতির জন্য জানাই আমি একটি নতুন রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করছি, যার নাম অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক। যারা আমার রাজনৈতিক মতাদর্শে ও পথে বিশ্বাস করবে তারা এই সংগঠনে সামিল হবে। অন্যদিকে আমার সম্পাদনায় ‘স্বরাজ’ পত্রিকা যেমন চলছিল, তেমনই চলবে, স্বরাজ আমার মানসপুত্র তাই এর দায়িত্ব আমারই, কোনো কংগ্রেস নেতার ভরসায় একে ছেড়ে যেতে পারলাম না। শুধু স্বরাজের লেখালিখির ভাষা ও বয়ান বদলাবে, আগামিদিনে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে স্বরাজ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আক্রমণ শানাবে।
ইতি আপনার আশীর্বাদ প্রার্থী
সুভাষ চন্দ্র বসু
৫
দিল্লির জামা মসজিদ থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে ঐতিহাসিক এলাকা শাজাহানাবাদের এক সংকীর্ণ গলির ভিতর বাড়িটা। নাসিম মির্জা চাঙ্গেজি নামে এক তরুণ তার বাড়িতে ভগত সিংদের লুকোনোর জায়গা করে দিয়েছে। এখানে দিনকয়েক ধরে এইচএসআরএ-র সদস্য ভগত সিং, বটুকেশ্বর দত্ত, শুকদেব থাপার আর শিবরাম রাজগুরু লুকিয়ে রয়েছে।
এখানেই আজ আসছেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস। ভগতদের হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক অ্যাসোসিয়েশন মিশে গেছে সুভাষ চন্দ্র বোসের অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লকের সঙ্গে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবে বিশ্বাসী ছোটবড়ো সমস্ত স্বদেশী শক্তি এখন থেকে এক ছাতার তলায় থেকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাবে। এই গুপ্ত সভায় সুভাষবাবুর সঙ্গে উপস্থিত থাকছেন ঋষি অরবিন্দের কনিষ্ঠ ভাই বারীন্দ্র কুমার ঘোষ। আজকের সভা থেকেই প্রস্তাবিত নতুন কর্মসূচী গৃহীত হবে। আগামি ৮ এপ্রিল সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে প্রবেশ করে বোমা ছোঁড়ার কর্মসূচী পাস করানো হবে।
বারীন ঘোষ আর সুভাষ বোস একইসঙ্গে এসে পৌঁছলেন। বারীন ঘোষের সভাপতিত্বে মিটিং শুরু হতেই ভগত সিং সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলিতে বোমা নিক্ষেপের প্রস্তাব আনল। বটুকেশ্বর দত্ত জানাল, “ভারতীয় বিপ্লবীদের দমনপীড়নের উদ্দেশ্যে ইংরেজ সরকার ১৯১৫ সালের ডিফেন্স অফ ইণ্ডিয়া অ্যাক্টকে ফের কঠোরভাবে বলবৎ করতে চাইছে সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলির সভা থেকে। ফলে এই আইনবলে যে কোনো সময় কাউকে কারণ না দর্শিয়ে পুলিশ আটক করতে পারে। তাছাড়া এই আইনের দ্বারা ভারতীয়দের স্বাধীন বক্তব্য রাখার অধিকার, লেখালিখির অধিকার এমন কি স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকারও খর্ব করা যাবে। তাই ভগত সিংহ আর আমি ওই সভার মাঝখানে বোমা নিক্ষেপ প্রতিবাদ জানাতে চাই।”
“কিন্তু এই কর্মসূচী গ্রহণ করে তোমাদের লাভ কী?”
“আমরা তীব্রভাবে প্রতিবাদ জানাতে পারব। ইংরেজশক্তিকে বুঝিয়ে দিতে পারব যে আমরা এ অন্যায় মেনে নেব না।”
বটুকেশ্বরের কথা শুনে সুভাষ বারীন ঘোষের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।
বারীন বললেন, “তোমরা সুভাষের প্রশ্নটা কি বুঝতে পারোনি?”
বটুকেশ্বর খানিকটা বোকার মতো হাসল।
সুভাষ বললেন, “এই কর্মসূচিতে কোনো মানুষের মৃত্যু হবে না। অথচ তোমরা সবার চোখের সামনে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যাবে। তারপরে ডিফেন্স অফ ইণ্ডিয়া অ্যাক্টেই রাজদ্রোহিতার দোষে তোমাদের ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট হবে। যাকে বলে লঘু পাপে গুরুদণ্ড। মাঝখান থেকে তোমরা জেলে চলে গেলে আমাদের সংগঠনের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে।”
বারীন বললেন, “ইংরেজ সরকার দেশদ্রোহিতার দোহাই দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি দিয়ে দ্বীপান্তরে পাঠালে একটা গোটা জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। তখন দেশমাতৃকার কোন কাজে লাগবে এ গোটা জীবন? আমি নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছি।”
ভগত, রাজগুরু, শুকদেব এবং বটুকেশ্বর ধীরে ধীরে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করল। শুধুমাত্র আবেগসর্বস্ব উগ্র রাজনীতি ফলদায়ী নাও হতে পারে। বরং তা সংগঠনের শক্তিক্ষয় করবে। ভগতের মনে পড়ে গেল সান জুয়ের দি আর্ট অফ ওয়ারের রণনীতিগুলি। একজন
দক্ষ যোদ্ধাকে জানতে হবে যুদ্ধ ঘোষণার সঠিক সময়টা।
সুভাষ বললেন, “আমাদের অল ইণ্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লককে আরও সুসংগঠিত করে গড়ে তুলতে হবে, যাতে সর্বস্তরের ভারতীয়দের জনসমর্থন নিয়ে আমরা কংগ্রেসের চেয়েও কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করতে পারি, ব্রিটিশ সরকার যাতে আমাদের শক্তিকে সমীহ করতে শুরু করে। সেজন্য আমাদের বেছে বেছে এমন কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে, যা জনমানসে তরঙ্গ তুলতে পারে। প্রথমত, আমি এই সভা থেকে প্রস্তাব রাখছি, আমাদের দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধকে আরও কার্যকরী করে তুলতে সামরিক আদলে একটি ফৌজি বাহিনী তৈরি করা হোক, যার নাম হবে আজাদ হিন্দ ফৌজ। পাঞ্জাব, বাংলা, সিন্ধ্, মহারাষ্ট্র, এবং উত্তর-পূর্ব উপজাতির নওজোয়ানদের সেই ফৌজে সামিল করে অস্ত্রশিক্ষা ও গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশল শিখিয়ে প্রশিক্ষিত করে তোলা হোক। তারপর আমরা ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে কর্মসূচী নেব, যুদ্ধ ঘোষণা করব। মনে রেখো, এই ব্রিটিশদের আগ্রাসনের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভের জন্য আয়ারল্যান্ডের বিপ্লবী দল আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি ১৯১৯ থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে তাদের নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে। এইরকম গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের আক্রমণ শানাতে হবে। ভারতের ইংরেজ প্রশাসন ও শক্তির কেন্দ্র দিল্লি আমাদের এইভাবেই দখল করতে হবে।
ভগত, শুকদেবরা তন্ময় হয়ে শুনছিল সুভাষ চন্দ্র বোসের ঐন্দ্রজালিক ভাষণ। হঠাৎ ভগত সিং ঘোষণা করে উঠল, “ইনক্লাব জিন্দাবাদ। আজাদ হিন্দ ফৌজ জিন্দাবাদ। হমারা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস জিন্দাবাদ।”
এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়ে অল ইণ্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লকের তরুণ সদস্যরা সকলে সোল্লাসে জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল— “নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস জিন্দাবাদ। আজাদ হিন্দ ফৌজ জিন্দাবাদ।”
স্লোগান শেষ হলে বারীন ঘোষ বললেন, “সুভাষ এবং আমি আলোচনা করে একটা প্রস্তাব রাখতে চাই। আগামি ২ মে আমাদের দেশের সিপাহী বিদ্রোহের তিয়াত্তর বছর পূর্ণ হবে, ওই দিনটাকে উপলক্ষ করে আমরা বিশেষ কর্মসূচি পালন করব। আমাদের হাতে মাসখানেক সময় এখনও আছে। এর মধ্যে আজাদ হিন্দ বাহিনীর সদস্যভুক্তির কাজ শুরু করতে হবে।”
“গুরুসদয় দত্ত নামে এক উচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারিকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। উনি বাঙালি যুবকদের দেশমাতৃকার প্রতি আরও মনোযোগী করে তোলার জন্য স্বাস্থ্যচর্চা, সংযম, সত্যনিষ্ঠা, আত্মনির্ভরতার মতো গুণাবলী সঞ্চারিত করতে চান। এই আন্দোলনের নাম দিয়েছেন ব্রতচারী আন্দোলন। আমরা তাঁকেও আমাদের কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করতে পারি,” নেতাজী বললেন।
৬
মূল রাজনৈতিক দল ফরওয়ার্ড ব্লকের অ্যাকশন স্কোয়াড হিসেবে গঠন করা হয়েছে আজাদ হিন্দ ফৌজ বাহিনী। ফৌজকে অনেকগুলি রেজিমেন্টে ভাগ করা হয়েছে। রানি লক্ষ্মী বাঈ রেজিমেন্ট, মঙ্গল পাণ্ডে রেজিমেন্ট, বাহাদুর শাহ জাফর রেজিমেন্ট। এছাড়া তাঁতিয়া টোপি আর নানা ফড়নাবিশের নামেও দুটি রেজিমেন্ট খোলা হয়েছে। খুব গোপনে সদস্য অন্তর্ভুক্তির কাজ চলছে। সারা দেশ জুড়ে গ্রামেগঞ্জে ঘুরে সুভাষচন্দ্র নিজে বিভিন্ন রেজিমেন্টের ক্যাডেট হিসেবে সাহসী ছেলেমেয়েদের রিক্রুট করছেন। এই সফরে তাঁর সঙ্গী হয়েছেন মঙ্গল পাণ্ডে রেজিমেন্টের কম্যান্ডার ভগত সিং। এই আয়োজনে আহ্বান করা সত্ত্বেও সিপিআই দলের ডাঙ্গে প্রমুখেরা যোগ দেননি। সুভাষ জানেন মানবেন্দ্রনাথ রায় থাকলে এমন একটা উদ্যোগে তাঁকে পাশে পাওয়া যেত। উনিও কংগ্রেস নেতাদের বিভ্রান্তিকর নরমপন্থী আন্দোলনে বিশ্বাস করতেন না, কিন্তু ঘটনাচক্রে মানবেন্দ্রবাবু দেশের বাইরে আছেন। শেষ পর্যন্ত যা খবর আছে তা হল মানবেন্দ্র রায় সোভিয়েত ইউনিয়নের স্ট্যালিনের কাছে সাহায্য চাইতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন।
সুভাষ জানেন, । তাঁর ।প্রধান সহকারী ভগত বামপন্থায় বিশ্বাসী অত্যন্ত উদ্যোগী তরুণ। সে বহুবার বলেছে মার্ক্সবাদ ও লেনিনের বলশেভিক দলের রুশ বিপ্লবের পন্থায় সে খুবই আস্থাশীল। দু-একবার ভারতের স্বাধীনতার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রপ্রধান স্ট্যালিনের কাছ থেকে সাহায্য চাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে, কিন্তু সুভাষ তাকে বুঝিয়েছেন, তিনি নিজেও মার্ক্সবাদে আগ্রহী ও আস্থাশীল, কিন্তু পরাধীন ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিটি ভিন্ন। জারতন্ত্রের রাশিয়ার মতো এখানে প্রলেতারিয়েত (কৃষক, শ্রমিক শ্রেণী) এবং বুর্জোয়া (পুঁজিপতি) থাকলেও, ভারতের মূল শত্রু বিদেশী ঔপনিবেশিক শক্তি, যাদের দ্বিজাতিতত্ত্বের বিষে ভারতীয় সমাজে সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে চায়। এই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নির্মূল করে ঔপনিবেশিক ইংরেজদের বিতাড়িত করে দেশকে স্বাধীন করাই ফরওয়ার্ড ব্লক তথা আজাদ হিন্দ ফৌজের মূল উদ্দেশ্য। তারপরে স্বাধীন দেশে ধীরে ধীরে মার্ক্সের মতবাদ প্রয়োগ করে দারিদ্র্য দূরীকরণ করতে হবে, শক্তিশালী দেশ গড়ে তুলতে হবে।
বছরের শেষদিকে গ্রামগঞ্জ শহর মিলিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাডেটের সংখ্যা দাঁড়াল লক্ষাধিক। এরা নিয়মিত গুরুসদয় দত্তের ব্রতচারীর আঙ্গিকে শরীরচর্চা, সমাজসেবামূলক কাজ এবং গ্রামগঞ্জের কৃষক-শ্রমিক সহ সাধারণ মানুষদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগটা অক্ষুণ্ণ রাখল। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় দুর্গত মানুষদের উদ্ধারকার্য, ত্রাণদান সহ অন্যান্য সামাজিক কাজকর্মে আজাদ হিন্দ ফৌজিরা যুক্ত হতে শুরু করল। সাধারণ মানুষের বাড়িতে আত্মীয় বিয়োগ সহ অন্যান্য দুঃখের দিনেও তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা আস্থা অর্জন করে নিল। এক বছরের মধ্যে ফরওয়ার্ড ব্লক দলও কংগ্রেস দলের জনপ্রিয়তা ছুঁয়ে ফেলল। সাধারণ মানুষের চর্চায় বারবার উঠে আসতে লাগল ফরওয়ার্ড ব্লক ও আজাদ হিন্দ বাহিনীর নাম। সশস্ত্র আন্দোলনে বিশ্বাসী এই ফৌজ এক বছরের মধ্যে বড়ো কোনো বড়ো নাশকতামূলক কাজে লিপ্ত না হলেও। তাদের ইন্ধনে বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন জায়গায় রাতের অন্ধকারে ইংরেজ সরকারের পোস্ট অফিস, বন বাংলোয় অগ্নিসংযোগের ঘটনা চলতে লাগল। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই রাতের অন্ধকারে কে বা কারা এমন নাশকতামূলক কাজগুলি করছে তার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেল না। কিন্তু আজাদ হিন্দ বাহিনী তার ক্যাডেটদের শারীরিক ও মানসিকভাবে তৈরি করার কাজটি গোপনে এবং আরও ব্যাপকভাবে চালিয়ে যেতে লাগল।
সর্বভারতীয় কংগ্রেসের কার্যকরী কমিটির এক সভায় গান্ধীজী খুব চিন্তিত মুখে জওহরলাল নেহরুকে বললেন, “সুভাষ কংগ্রেস ছেড়ে এক বছরের মধ্যে তাঁর দল ফরওয়ার্ড ব্লককে বেশ গুছিয়ে নিয়েছে। ১৯২৯ সালে গড়ে তোলা ওঁর দল আজ অর্ধশতক প্রাচীন কংগ্রেস দলকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিচ্ছে। এই শতকের প্রথম দশকে যে হিংসার আন্দোলনকে আমি ঘৃণার চোখে দেখেছি, সেখান থেকে কংগ্রেসকে এক নরমপন্থী পথের সন্ধান দিয়েছি, সুভাষ সেই পথেই আবার ভারতের নওজোয়ানদের নিয়ে চলেছে। শুধু তাই নয় জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে। জওহর, তুমি এর বিপদটা বুঝতে পারছ?”
“বুঝতে পারছি বাপু। জনগণের আমাদের ওপর থেকে এমনকি কংগ্রেস দলের ওপর থেকে আস্থা উঠে যাবে।” নেহরু অপ্রতিভ গলায় বললেন।
“শুধু তাই নয়, কংগ্রেস দলের ভিতর তোমাকে যে নেতৃত্বের জায়গায় প্রতিষ্ঠা করেছি সেটাও নষ্ট হয়ে যাবে।”
“মানুষ কিন্তু এখনই বলছে, কংগ্রেসের পথটা ভ্রান্ত, সে পথে স্বাধীনতা অর্জন বিলম্বিত হবে। এমন অবস্থায় কী করা যায়?”
“শোনো জওহর, আমি ঠিক করেছি, লর্ড আরউইনের চুক্তিতে আমি সই করব…”
“কিন্তু বাপু, সেটা কি ঠিক হবে? উচ্চশিক্ষিত থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সকলেই বুঝতে পারছে, ওই চুক্তিতে যেভাবে ভারতকে ডমিনিয়ন স্টেটাস দিতে চাইছে তা আসলে ভাঁওতা, আই ওয়াশ।”
“কিন্তু পার্টিকে একটু ইম্পেটাস দেওয়ার জন্য এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আমি অন্য একটা মতলব ভেবেছি।”
“কী বাপুজী?”
“সামনের জানুয়ারি থেকে একটা অসহযোগ আন্দোলন শুরু করব। সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স। গুজরাটের ডান্ডি যাত্রা দিয়েই শুরু করব বছরভরকার অসহযোগ আন্দোলন। এর ফলে লর্ড আরউইন হয়ত তাঁর চুক্তির শর্তগুলো সামান্য অদলবদল করতে পারেন। সেটা কিন্তু আমাদের পক্ষে উইন উইন সিচ্যুয়েশন হবে। মানুষের কাছেও একটা পজিটিভ বার্তা যাবে।”
দিল্লির ফরওয়ার্ড ব্লকের দপ্তরে তখন ভগত তার সহকারীদের সঙ্গে বসেছেন সিপাই বিদ্রোহের তিয়াত্তর বছর পূর্তি উৎসবের প্রস্তুতি নিয়ে। রাজগুরু বলল, “ভগত নতুন খবর আছে। গান্ধীজী সামনের মার্চ মাস থেকেই অসহযোগ আন্দোলন শুরু করছে হেঁটে ডান্ডি অভিযানের মাধ্যমে। সবরমতী আশ্রম থেকে ৩৮৫ কিলোমিটার হেঁটে ডান্ডি যাবে। শুনছি বহু মানুষ তাঁর অভিযানকে সমর্থন করে এই লবণ সত্যাগ্রহে অংশ নেবে।”
ভগত হাসল, “তাহলে আমাদের সিপাহী বিদ্রোহ বর্ষপূর্তির উৎসবকেও এগিয়ে আনি, কী বলো, রাজগুরু? শুধু একবার নেতাজীর অনুমতিটা নিয়ে নিই।”
১২ মার্চ, ১৯৩০ সাল, সকালে সবরমতীর আশ্রম থেকে বেরিয়ে গান্ধীজী সমুদ্রতীরের ডান্ডি গ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন। সঙ্গে জনা সত্তর স্বেচ্ছাসেবক ও আশ্রমিক রয়েছেন। কংগ্রেস সদস্যদের উপর প্রচারের দায়িত্ব রয়েছে। ঠিক হয়েছে বিভিন্ন জায়গা থেকে সাধারণ মানুষ এসে তাঁর পদযাত্রায় যোগ দিয়ে একসঙ্গে হাঁটবেন। কিন্তু প্রায় তিন ঘণ্টা হাঁটার পর গান্ধী হতাশ চোখে চারদিকে তাকিয়ে দেখেন, প্রত্যাশা মতো মানুষ এসে তাঁর পদযাত্রায় যোগ দিচ্ছে না। রাস্তার দুধারেও মানুষের ঢল নামার কথা ছিল, কিন্তু কোথায় গেল সব মানুষ! তিনি খানিকটা বিমর্ষভাবে চতুর্দিকে তাকিয়ে নিচুগলায় সঙ্গী প্রভাশঙ্কর পাটানিকে বললেন, “লোক এত কম এসেছে কেন? প্রচার কি কম হয়েছে, নাকি কংগ্রেসের কর্মসূচীর উপর থেকে, কংগ্রেস থেকে মানুষের আস্থা চলে যাচ্ছে।”
প্রভাশঙ্করজী খানিক ইতস্তত করে বললেন, “আজ সুভাষ চন্দ্র বোস তাঁর দলের সদস্যদের নিয়ে নতুন কর্মসূচী পালন করছেন। সিপাহী বিদ্রোহের তিয়াত্তর বছর পূর্তি, আগামি দু বছর ধরে বিভিন্ন ছোটোবড়ো কর্মসূচী পালন করে ।১৯৩২ ।সালে সিপাহী। বিদ্রোহের পঁচাত্তর বছর পূর্তি পালিত হবে।”
“এগুলো কী ধরণের কর্মসূচী?”
“ব্রতচারী, মল্লক্রীড়া, মেয়েদের অস্ত্রশিক্ষা, এছাড়া গ্রামের ভিতর বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সিপাহী বিদ্রোহের উপর বিভিন্ন আলোচনা সভা সংঘটিত করা…”
প্রভাশঙ্করজীকে মাঝপথে থামিয়ে বললেন, “এগুলো তো সাধারণ শিক্ষামূলক কর্মসূচী, কিন্তু, আজকের দিনে সুভাষ কী কর্মসূচী গ্রহণ করেছে যার ফলে আমাদের ডান্ডি পদযাত্রার কর্মসূচীতে জনসমাগমে ভাটা পড়েছে?”
“বাপুজী,” খানিক দ্বিধা করে প্রভাশঙ্করজী মাথা নিচু করে বললেন, “সিপাহী বিদ্রোহের তিয়াত্তর বর্ষপূর্তির সূচনা করে আজ সুভাষজী দিল্লি থেকে লখনৌ পর্যন্ত হাঁটছেন প্রায় ৫৭০ কিলোমিটার। ওঁদের যাত্রা শেষ হবে সিপাহী বিদ্রোহের অন্যতম তীর্থক্ষেত্র লখনৌ রেসিডেন্সিতে। ওঁর সঙ্গে হাঁটছেন ভগত সিং আর বারীন্দ্র কুমার ঘোষ।”
৭
দশ বছরের ফুটফুটে মেয়েটার ঠাকুরদা পঞ্চম জর্জ মারা গেছেন দিনকয়েক আগে। মৃত্যুর দিন ইংল্যান্ডে প্রচন্ড ঠান্ডা পড়েছিল, বাইরে অবিরাম তুষারপাত হচ্ছিল। সেই তুষারপাতের দিকে তাকিয়ে মেয়েটা একা একা ঠাকুরদার জন্য খুব কেঁদেছিল। ঠাকুরদা তার ছ’ বছরের বোন মার্গারেট আর তাকে খুব স্নেহ করতেন। মার্গারেটের অবশ্য মৃত্যুর গুরুত্ব বোঝার মতো বয়স হয়নি, সে বেচারা একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সারাদিন রাজপরিচারিকাদের জিম্মাতেই কাটাল।
তারপর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হলেও রাজপরিবারের নিয়ম অনুযায়ী শোকপালন চলছে। পাথরের তৈরি সুবিশাল বাকিংহাম রাজপ্রাসাদের ঘরগুলির ভিতরেও এক অদ্ভুত নীরবতা ছড়িয়ে আছে। তবে মন্ত্রণাকক্ষে রাজপরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য ও রাজ-অমাত্যদের মন্ত্রণা চলছে প্রায় সারাদিন ধরেই। হাউস অফ উইন্ডসরের সিংহাসনের নতুন উত্তরাধিকারী কে হবে তাই নিয়েই যত জল্পনা-কল্পনা। তবে মেয়েটি জানে রাজপরিবারের ঐতিহ্য মেনে হাউস অফ উইন্ডসরের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত পঞ্চম জর্জের জ্যেষ্ঠপুত্র অষ্টম এডওয়ার্ড সিংহাসনে বসবেন। অষ্টম এডওয়ার্ড সম্পর্কে মেয়েটির জ্যাঠা। তবে মেয়েটি খুব খুশি, কারণ যুবরাজের রাজ্যাভিষেক বা করোনেশন উপলক্ষে খুব জাঁকজমক আর উৎসব হবে গোটা দেশ জুড়ে। আর সেই সুযোগে তার জ্ঞাতি ভাইবোনেদের সঙ্গে মেয়েটির দেখা হবে।
আজ বেশ কয়েকদিন পর আবহাওয়াটা পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। প্রাসাদের কাচ জানালায় নাক ঠেকিয়ে সে দেখল বাইরে কাঁচা সোনার মতো ঝলমলে রোদ উঠেছে। প্রাসাদের সবুজ বাগানে ফুলগুলো যেন হাসছে আর তার মধ্যেই উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে রঙবেরঙের প্রজাপতি। বাগানের গাছগাছালির ভিতর লুকিয়ে থেকে একটা মিসল থ্রাশ ডাকছে কি মিষ্টি করে!
মেয়েটির বুকের ভিতরটা ছটফট করে উঠল। এমন একটা দিনে বাইরের জগত তাকে টানছে। রাজপ্রাসাদের বিষণ্ণতা ছেড়ে বেরোনোর জন্য তার মনটা আকুল হয়ে উঠল। প্রাসাদের দোতলার ঘর ছেড়ে নিচে নামার জন্য মেয়েটি সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই পিছন থেকে ভেসে এল তার মায়ের ডাক, “এলিজাবেথ, হোয়্যার আর ইউ গোয়িং?”
“আয়াম ওয়েরিড, এক্সহস্টেড মাদার! গোয়িং টু গেট সাম ফ্রেশ এয়ার!”
“ওল রাইট, হানি। কিন্তু বেশিদূর যাবে না। টেক টু রয়্যাল গার্ডস উইদ ইউ।”
দশ বছরের এলিজাবেথ দুপুরবেলা বাকিংহাম প্যালেস লাগোয়া বাগানে বেরিয়ে এসে মনের আনন্দে রোদ্দুর মাখল গায়ে। উড়ন্ত প্রজাপতির পিছনে খানিক ছুটোছুটি করল। এই বাকিংহামের রাজপ্রাসাদ, মাঝেমধ্যে উইন্ডসর ক্যাসল, কেনসিংটন প্যালেস কিংবা স্কটল্যান্ডে বেড়াতে গেলে বালমোরাল ক্যাসলে যাওয়া হয়, এর বাইরের সাধারণ মানুষের জগতটা এলিজাবেথের অচেনা। সারাদিন পরিচারিকাদের কাছে থাকে ছোট বোন মার্গারেট আর সে। মায়ের কাছে ইংরেজি আর পিয়ানো বাজানোটা শেখে, অবশ্য ইংল্যান্ডের ইতিহাস আর ফরাসি ভাষা শেখার জন্য প্রাসাদে একজন শিক্ষিকাও আছেন। এই রাজপ্রাসাদেই তার সারাদিন কেটে যায়। খুব ইচ্ছে করে বাইরের জগতটা একবার দেখতে। যেমন একটু আগে মিসল থ্রাশটার মিষ্টি ডাক শুনে সে বেরিয়ে এলেও এখন মনে হচ্ছে ওটা উডলার্কের ডাক ছিল। ভীষণ মিষ্টি ডাকে পাখিটা। পাখিটার ডাক শুনে তার আজ খুব ইচ্ছে করছে বাকিংহাম রাজপ্রাসাদের পিছনের ছোট জঙ্গলটায় একটু প্রবেশ করতে।
রয়্যাল গার্ডদের চোখে ধুলো দিয়ে সে প্রাসাদের চৌহদ্দির বাইরে এসে দাঁড়াল। জানুয়ারি মাসের শেষের দিক। এই বছরটা শুরুই হল ঠাকুর্দা পঞ্চম জর্জের মৃত্যু দিয়ে। কেমন কাটবে বাকি বছরটা কে জানে। আকাশ আজ ভীষণ নীল। টুকরো টুকরো সাদা মেঘ তরীর মতো ভাসছে। এপাশে পপলার আর সভার ওকের ছোট বনানী। ওপাশে আদিগন্ত সবুজ চারণক্ষেত্র। বহু দূরে ক্রাউন এস্টেটের জমিজমার বাইরে গাঁয়ের গোচারক রাখালেরা গরু চরাচ্ছে। এলিজাবেথ পায়ে পায়ে জঙ্গলের পথ ধরে এগিয়ে যায়। সবুজ গাছগাছালির ভিতর দিয়ে কখনও ভেসে আসে থ্রাশ, রবিন, উডলার্কের ডাক।
সেই উডলার্কটা ফের ডাকছে। পাখিটাকে দেখার জন্য এলিজাবেথ এদিক ওদিকে আঁতিপাঁতি করে খুঁজছিল। ঠিক তখনই আচমকা সে লোকটাকে দেখতে পেল। এমন উদ্ভট চেহারার মানুষ সে আগে দেখেনি। প্রথমে ভয় লাগলেও তার পরেই এক অদম্য কৌতুহল তাকে লোকটার কাছে এগিয়ে নিয়ে গেল।
একটা লম্বা গেরুয়া রঙের গাউনের মত পোশাক পরে লোকটা একটা সিলভার ওকে গাছের তলায় দাঁড়িয়েছিল। গায়ের রঙ কালো, নেটিভ ইন্ডিয়ানদের মতো। এলিজাবেথ কখনও ইন্ডিয়ায় যায়নি, কিন্তু নেটিভদের ছবি দেখেছে। তারা চুল কাটে না, নখ কাটে না, অশিক্ষিত—তার ন্যানি বলেছে। তবে এই লোকটাকে অত ভয়ংকর মনে হচ্ছে না। মুখচোখে একটা আলগা আমুদে হাসি লেগে আছে। এলিজাবেথ ধীরে ধীরে লোকটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল, “হেই, হু আর ইউ।”
“মাইসেলফ হরিপদ জোগানদার, প্রিন্সেস।”
“হোয়াট! হ্যা-রি-পো-ডো জো…জো…হোয়াটএভার। আর ইউ আ সেইন্ট, আই মিন, ইন্ডিয়ান সাঢু?”
“সর্ট অফ,” হরিপদর ঠোঁটের কোণে হাসি।
“আই হ্যাভ হার্ড ইন্ডিয়ান সাঢুস আর ফরচুন টেলার্স অ্যান্ড ক্লেয়ারভয়েন্ট। ক্যান ইউ টেল মাই ফরচুন? আর ইউ আ পামিস্ট?”
“আই ক্যান রিড ইওর ফোরহেড! তুমি একদিন ইংল্যান্ডের রানি হবে, মা। বাই এন্ড অফ দিস ইয়ার ইওর ফাদার সিক্সথ জর্জ উইল বি দ্য কিং অফ হাউস অফ উইন্ডসর।”
“হেই সাঢু, ইউ মাস্ট বি জোকিং। আমার বাবা রাজা হবে না। বিয়িং দ্য এল্ডার সন, আমার জ্যাঠা অষ্টম এডওয়ার্ড খুব শিগগিরই সিংহাসনে বসবে। হাউ ক্যান ইট বি পসিবল!”
“আমার কথা মিলিয়ে নেবেন, মা জননী। আপনার বাবা প্রিন্স অ্যালবার্ট ষষ্ঠ জর্জ উপাধি ধারণ করে যেমন রাজা হবেন, তেমনই আপনিও একদিন রাজসিংহাসনে বসে সুদীর্ঘকাল ধরে ইংল্যান্ডের রানি হয়ে থাকবেন।”
“ইউ আর আনবিলিভেবল, হ্যারিপোডো সাঢু!” গালে হাত দিয়ে অবাক চোখে লোকটার দিকে তাকাল এলিজাবেথ।
ঠিক তখনই একজন রয়্যাল গার্ডের গলা ভেসে এল পিছন থেকে, “প্রিন্সেস এলিজাবেথ, আপনি জঙ্গলের মধ্যে একা কী করছেন? শিগগিরই ফিরে চলুন, আপনাকে প্রাসাদের সবাই খোঁজাখুঁজি করছে।”
এলিজাবেথ ইন্ডিয়ান সাঢু হ্যারিপোডোকে বিদায় জানাবার জন্য ফের সামনে তাকাতেই দেখল লোকটা ভোজবাজির মতো যেন হাওয়ায় উবে গেছে। গেল কোথায় লোকটা! এত তাড়াতাড়ি কোথায় মিলিয়ে গেল! কিন্তু লোকটা যে অবাস্তব ভবিষ্যৎবাণী করে গেল, সেটা কি সত্যি নাকি বুজরুকি। তবে এলিজাবেথ শুনেছে ভারতীয় সাধু-সন্ন্যাসীদের নাকি অনেক ক্ষমতা। তারা চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে।
রয়্যাল গার্ডের সঙ্গে জঙ্গলের দিক থেকে এলিজাবেথ প্রতীয়মান হতেই হরিপদ ফের সময়যন্ত্রের বোতাম টিপে প্রতীয়মান হল। তার ঠোঁটের কোণে এক দুষ্টুমিভরা হাসি খেলে গেল। সে এলিজাবেথের ফিরে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে স্বগতোক্তি করল, “হে রাজকুমারী দ্বিতীয় এলিজাবেথ, হে ইংল্যান্ডের ভাবীকালের রানি, আপনি ভবিষ্যৎবাণী তো শুনে নিলেন, কিন্তু ভবিষ্যৎ জানার জন্য যথোচিত মূল্যটিও আপনাকে দিতে হবে। সময়মতো ইতিহাসই সেই মূল্যটুকু নিয়ে নেবে!”
প্রাসাদে ফিরে আসার পর থেকে হরিপদ নামের সাধুটির কথাগুলো যেন এলিজাবেথের পেটের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য গুড়গুড় করতে শুরু করল। ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে তার। বোন মার্গারেটকে বলাই যায়, কিন্তু সে এত ছোট যে কথাটার অর্থই বুঝবে না হয়ত।
সান্ধ্যকালীন ডিনারের পর দুই বোনের বিছানায় যাওয়ার আগে বাবা-মা তাদের সঙ্গে দেখা করে কপালে চুম্বন এঁকে দেন। সেই বিশেষ ক্ষণটির অপেক্ষায় ছিল এলিজাবেথ। সে বলল, “পিতা, আজ দুপুরে এক ইন্ডিয়ান সাঢু আমাকে একান্তে বলেছেন, আপনি রয়্যাল থ্রোনে এই বছরেই রাজা হয়ে বসবেন।”
“হোয়াট?” চমকে তাকালেন ষষ্ঠ জর্জ। ভুল বকছে নাকি মেয়েটা, শরীর খারাপ করেনি তো!
“ইয়েস। আই ওয়াজ গবস্ম্যাকড বাই হিজ ক্লেয়ারভয়েন্স!” দশ বছরের এলিজাবেথ বলল।
মনে মনে হাসলেন ষষ্ঠ জর্জ। এলিজাবেথের দশ বছর বয়স, সবেমাত্র শৈশব থেকে কৈশোরে পা রাখছে। এই বয়সেই তার কল্পনাশক্তি প্রবল, হয়ত তার স্বপ্নে এখনও মনস্টার, গবলিন, ফেয়ারি, হিন্ডু সাঢু, ফকিরেরা রাজত্ব করছে! তাই সে আকাশকুসুম কল্পনায় ডুবে আছে। অথচ সে বুঝতেও পারছে না হাউস অফ উইন্ডসর রাজপরিবারের ঐতিহ্য ও নিয়ম অনুসারে তাঁর পিতা পঞ্চম জর্জের মৃত্যুর দিন থেকেই, তাঁর জ্যেষ্ঠভ্রাতা অষ্টম এডওয়ার্ড সিংহাসনের প্রকৃত দাবিদার হিসেবে উত্তরাধিকারী চিহ্নিত হয়েছেন।
রাজকুমার অ্যালবার্ট তাঁর কন্যা এলিজাবেথের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “মাই চাইল্ড, গো টু স্লিপ, অ্যান্ড ডোন্ট ওভারবার্ডেন ইওর হেড উইথ সাচ ওয়াইল্ড ফ্যান্টাসি।”
এলিজাবেথ তার বোন মার্গারেটের হাত ধরে শয়নকক্ষে চলে যেতেই এলিজাবেথের মা, ডাচেস অফ ইয়র্ক, তাঁর স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “ডু ইউ থিংক এলিজাবেথ ইজ গোয়িং ইনসেন?”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ষষ্ঠ জর্জ বললেন, “থিংস হ্যাপেন অ্যাট সাচ ইয়ং এজ। টেক কেয়ার অফ হার।”
পঞ্চম জর্জের মৃত্যুর পর রয়্যাল থ্রোনে বসলেন অষ্টম এডওয়ার্ড, কিন্তু মাসখানেক পেরোতেই রাজসিংহাসনকে ঘিরে এক অভূতপূর্ব সংকট তৈরি হল যখন অষ্টম এডওয়ার্ড বান্ধবী ও প্রণয়ী ওয়ালি সিম্পসনকে বিয়ে করতে চাইলেন। জন্মসূত্রে মার্কিন ওয়ালিস সিম্পসন, রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর পূর্বে দু-বার বিবাহবিচ্ছিন্না হয়েছেন। রাজপরিবারের রাজতন্ত্রের ভিত নৈতিকতার নিগড়ে বাঁধা। সেখানে রাজা-রানির অটল সম্পর্কটি যেমন বিচার্য, তেমনই রানি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিবেচিত হয় রানির অতীত জীবনের ইতিহাসটি। তাই দু-বার বিবাহবিচ্ছিন্না ওয়ালিসকে রাজপরিবার রানি হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করে।
ফলে ১৯৩৬ সালের শেষদিকে অষ্টম এডওয়ার্ডের সামনে মাত্র দুটি পথ খোলা পড়ে থাকে—হয় ওয়ালিস সিম্পসনকে পরিত্যাগ করে আজীবন ইংল্যান্ডের রাজা হয়ে থেকে যাওয়া অথবা রাজসিংহাসন পরিত্যাগ করে ওয়ালিকে বিয়ে করা। সেক্ষেত্রে এডওয়ার্ড ইংল্যান্ডের রাজা হতে পারবেন না কিন্তু আজীবন ডিউক অফ উইন্ডসর হিসেবেই কাটাবেন। অষ্টম এডওয়ার্ড তাঁর ভাই ষষ্ঠ জর্জের হাতে সিংহাসনকে সঁপে দিলেন।
রাজসিংহাসন নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে নাটকের শেষে ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বরে পঞ্চম জর্জের কনিষ্ঠ পুত্র ষষ্ঠ জর্জ যেদিন রাজসিংহাসনে বসবেন তার আগের দিন রাতে তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা দশ বছরের এলিজাবেথকে ডেকে পাঠালেন। বন্ধ কক্ষের ভিতর তখন মাত্র তিনজন মানুষ— প্রিন্স। অ্যালবার্ট ।তথা ।রাজা ।ষষ্ঠ জর্জ, কন্যা এলিজাবেথ এবং এলিজাবেথের মা ডাচেস অফ ইয়র্ক।
“বেথ, নাউ আয়াম অ্যাকচুয়ালি গবস্ম্যাকড। দি ইন্ডিয়ান সাঢু ইউ মেট ওয়াজ রাইট! আই ওয়ান্ট টু গো টু ইন্ডিয়া অ্যান্ড মিট দ্যাট সাঢু। দিস ইজ অ্যামেজিং! কিন্তু বেথ, সেই হিন্ডু সাঢুর রহস্য যেন কাউকে বোলো না। এ রহস্য আমাদের তিনজনের বাইরে যেন না যায়! কিপ ইট সিক্রেট ইভেন ফ্রম ইওর লিটল সিস্টার মার্গারেট।” ষষ্ঠ জর্জ ফিসফিস করে তাঁর মেয়েকে বললেন।
এলিজাবেথের ভিতর তখন ভারত ভ্রমণের আগ্রহ তীব্র হয়ে উঠেছে, সে ভারতে গিয়ে সেই হিন্ডু সাঢুকে খুঁজে বের করতে চায়। সে উৎসুক হয়ে বলে উঠল, “ফাদার আই ওয়ান্ট টু অ্যাকম্প্যানি ইউ ইন ইন্ডিয়া ট্যুর। আমি সেই হিন্ডু সাঢুকে চিনি, তাকে খুঁজে বের করবই।”
“ইয়েস, অফকোর্স ডিয়ার, আগামি বছর মে মাস নাগাদ আমার করোনেশনের ব্যবস্থা করছে ক্রাউন এস্টেট। তারপরেই জুন মাসে আমি ইন্ডিয়ার ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগো-কে বলে দিল্লি দরবারের ব্যবস্থা করব। তখন ভারতের মাটিতে পা রাখব, তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব, বেথ।”
এলিজাবেথ বাবার কথা শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। সে ভারতে যাবে, যেখানে রয়েছে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ, মন্দির, মসজিদ, হিন্ডু সাঢু, মুসলিম ফকির। তারা ফরচুন টেলার, ক্লেয়ারভয়েন্ট, আর জানে অনেক মন্ত্রতন্ত্র ও ব্ল্যাক ম্যাজিক। এছাড়া দিল্লী গেলে সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম তাজমহল দেখা হবে। আর তার মধ্যেই সে খুঁজে বের করবে সেই হিন্ডু সাঢুকে। সেদিন থেকেই এলিজাবেথ উত্তেজনায় দিন গুনতে শুরু করল।
৮
দিল্লি দরবার। ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতের সর্বোচ্চ প্রধান ইংল্যান্ডের রাজা বা রানির রাজ্যাভিষেককে কেন্দ্র করে তাঁকে বা তাঁর প্রতিনিধিকে বরণ করে নেওয়ার এই শাহী আদবকায়দাটি প্রথম চালু হয়েছিল দিল্লিতে। ১৮৭৭ সালে যখন ইংল্যান্ডের রাজসিংহাসনে হাউস অফ হ্যানোভারের সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়া বসেন তখন প্রথমবারের জন্য দিল্লিতে বসেছিল দিল্লি দরবার। ইংল্যান্ডের রাজতন্ত্রের প্রতিনিধি হিসেবে তখন ভারতের বড়োলাট লর্ড লিটনকে বিশেষ সম্মাননা জ্ঞাপন করা হয়েছিল। ১৯০১ সালে মহারানি ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর প্রথম সন্তান সপ্তম এডওয়ার্ড ইংল্যান্ডের রাজসিংহাসনে বসেন। তাঁর সম্মানার্থে ফের ১৯০৩ সালে দিল্লি দরবারের আয়োজন করেন তৎকালাইন ভাইসরয় লর্ড কার্জন। শাহী দরবারের আয়োজনে কোনো কার্পণ্য করেননি বড়োলাট কার্জন। ভারতের বিভিন্ন ছোটবড়ো রাজ্যগুলির মহারাজাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। দিল্লি দরবারের মাত্র মাসখানেক আগে থেকে প্রস্তুতি শুরু করেও ঊষর এক প্রান্তরে রেল যোগাযোগ, অতিথি আবাসন, মণিমানিক্যের প্রদর্শনী সহ সমস্ত ব্যবস্থাপনা করে ফেলা হয়। তা সত্ত্বেও লর্ড কার্জনকে আশাহত করে সপ্তম এডওয়ার্ড নিজে ভারতে না এসে দিল্লি দরবার উপলক্ষে পাঠিয়েছিলেন তাঁর ভাই, ডিউক অফ কনট, রাজকুমার আর্থারকে। ১৯১০ সালে রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র পঞ্চম জর্জ সিংহাসনে বসেন। দরবারে তাঁকে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানান তৎকালীন বড়োলাট লর্ড হার্ডিঞ্জ। প্রত্যাশা মতো পঞ্চম জর্জ তাঁর করোনেশনের পর দিল্লি দরবারে হাজির থাকার জন্য ১৯১১ সালে জাহাজে করে বোম্বাই সমুদ্রবন্দরে পৌঁছান এবং বোম্বাই থেকে রেলগাড়িতে চেপে দিল্লি আসেন।
ষষ্ঠ জর্জ ১৯৩৬-এ রাজসিংহাসনে বসার পরই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছিলেন তিনি ১৯৩৭ সালের মাঝামাঝি ভারতে দিল্লি দরবারে সংবর্ধনা গ্রহণ করতে সস্ত্রীক ও সকন্যা আসবেন। চতুর্থবার দিল্লি দরবার আয়োজনের দায়িত্ব পড়ে ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগোর উপরে। ভারতের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল—জাতীয় কংগ্রেস এবং ফরওয়ার্ড ব্লক দুরকম প্রতিক্রিয়া জানায়। কংগ্রেস নেতারা চান না সম্রাট ষষ্ঠ জর্জ ভারতে আসেন। এলে কংগ্রেস দলের সদস্যরা তার চলার পথে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাবে, রাজার কুশপুত্তলিকা দাহ করবে। অন্যদিকে, ফরওয়ার্ড ব্লকের আন্দোলনের পথ সহিংস হলেও তাদের নেতৃত্বের তরফে জানানো হয়েছে রাজার ভারত সফরের কোনো কঠিন বিরুদ্ধাচারণ করা হবে না। বিবৃতিতে তারা জানায়—রাজা রাজড়ার প্রমোদ ভ্রমণ নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। তাদের একমাত্র স্বপ্ন ও ব্রত হল ভারতের স্বাধীনতা। দ্রুত পূর্ণ স্বরাজ চায় তারা।
ষষ্ঠ জর্জ পূর্বেই ঘোষণা করেছিলেন তিনি ভারত সফরে যাবেন, কোনও রাজনৈতিক দলের হুঙ্কার তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। আসলে তিনি যে সেই ফরচুন-টেলার হিন্ডু সাঢুকে খুঁজে বের করতে চান এই গোপন কারণটি তিনি প্রকাশ্যে আনেননি। সময়মতো ভারতের বড়োলাট ও পুলিশ প্রধানকে জানিয়ে তাকে ঠিক ধরে বেঁধে আনা যাবে। আর সেই সাধু যখন বিলেতে গিয়েছেন, তার মানে তিনি পরিচিত মুখ বা প্রতিপত্তিশালী কোনো সাধুই হবেন। ফলে তাঁর খোঁজ পেতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
সম্রাট ষষ্ঠ জর্জ আসল সমস্যায় পড়লেন ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রার তিনদিন পূর্বে। দিল্লি দরবার উপলক্ষে তাঁর সস্ত্রীক ও সকন্যা ভারতের মাটিতে পা-রাখার কথা। এগারো বছরের এলিজাবেথ ধুম জ্বর নিয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ল। এলিজাবেথের স্বাস্থ্য ভাল, সাধারণত জ্বরজারি বিশেষ হয় না, কিন্তু সেই মেয়ে এবার জ্বর আর পেটের সমস্যায় একেবারে নেতিয়ে পড়ল। রাজ পরিবারের চিকিৎসক সন্দেহ করলেন মেয়ের ক্রয়ডন টাইফয়েড হয়েছে। অগত্যা জর্জকে ভারতে একা আসার সিদ্ধান্ত নিতে হল। এলিজাবেথ থাকলে ভাল হত, কারণ একমাত্র সে দেখেছে সেই হিন্ডু সাঢুকে।
৮ জুন, ১৯৩৭, জষ্ঠি মাসের এক ভয়ংকর গরমের দিনে রাজ-তরণী ‘দ্য উইন্ডসর’স এসে পৌঁছাল বোম্বাইয়ের বন্দরে। তখন মধ্যাহ্ন। ষষ্ঠ জর্জ প্রথমবার ভারতে পা রাখছেন, তাও জুন মাসের ভয়ংকর গরমে। ইংল্যান্ডে থাকতে তিনি শুনেছেন ভারতবর্ষ ক্রান্তীয় অঞ্চলের দেশ, যেমন প্রচন্ড গরম তেমনই বৃষ্টিপাতের মাত্রাও প্রচুর। আর এই কারণেই মশা-মাছি সহ বিভিন্ন রোগের জীবাণু এখানকার বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যদিও তাঁর ক্রাউন এনভয়ের টিমে মন্ত্রীসান্ত্রী, কূটনীতিজ্ঞ, ডাক্তার, পাচক, নাপিত, আইনজ্ঞ সহ ছত্রিশ জন রয়েছে, তা সত্ত্বেও ভারতের নানারকমের রোগবালাই থেকে সাবধান থাকতে হবে। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গি, প্লেগ, যক্ষ্মা, উদরাময়, সান্নিপাতিক, ভেদবমি সহ হাজার একটা রোগের জীবাণু ভারতের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
বোম্বাই বিমান বন্দর থেকে একটি ফোর্ড গাড়িতে চেপে জর্জ বোম্বাইয়ের ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস রেলস্টেশনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। দু’বছর আগে গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট প্রণয়ন হয়েছে। সেই আইন অনুযায়ী ভারতে এগারোটা প্রদেশ তৈরি হয়েছে, যাদের নির্বাচনও সদ্য সমাপ্ত হয়েছে। বোম্বাই প্রভিন্সের পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেলের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন রাজা ষষ্ঠ জর্জ। তিনি বন্দর থেকে বোম্বাইয়ের ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস রেলস্টেশন যাওয়ার পথে দেখতে পেলেন বহু ভারতীয় নরনারী তাঁকে সংবর্ধনা জানাতে পুষ্পস্তবক হাতে রাস্তার ধারে অপেক্ষারত। তবে ইংরেজ পুলিশের চাপে পড়ে যে তারা রাস্তার ধারে ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই সত্যটি তাঁর কাছে অজ্ঞাত রয়ে গেল।
ভিক্টোরিয়া টার্মিনাসটি মহামান্য রাজা জর্জের আগমনের উপলক্ষে সাজানো হয়েছে। রেলের উচ্চতম পর্যায়ের ব্রিটিশ আধিকারিক থেকে শুরু করে নিম্নতম পর্যায়ের ভারতীয় রেল-কর্মচারীরা রাজাকে স্বাগত জানাতে এসেছে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে একটি সুসজ্জিত রেলগাড়ি, যার বাইরের ও ভিতরের সজ্জা অতুলনীয়। শুধুমাত্র সম্রাট ষষ্ঠ জর্জের জন্যই তৈরি হয়েছে এই মহার্ঘ্য রেলের কামরাটি, যার নাম ‘প্যালানকিন অন হুইলস।’
রাজা ও তাঁর ক্রাউন টিমের সদস্যদের জন্য সুনির্দিষ্ট কামরা, পাচক-খানসামাদের রান্নাবান্নার জন্য প্যান্ট্রি-কার, শৌচালয়ের জন্যও আলাদা একটি কামরা। সব মিলিয়ে এই আশ্চর্য রেলগাড়ির পাঁচটি বগি। বোম্বাই থেকে দিল্লির যাত্রাপথে রেলের খণ্ডাংশের বিদ্যুতায়ন সম্ভব হয়েছে, ফলে গোটা যাত্রাপথের বিভিন্ন স্টেশন থেকে রেলগাড়ির ইঞ্জিন পরিবর্তন হবে। কখনও বিদ্যুৎচালিত ইঞ্জিন, কখনও বা বাষ্পচালিত ইঞ্জিন জুড়বে রেলগাড়ির বগিগুলোর সঙ্গে।
রেলগাড়ি দ্বিপ্রহরে তার যাত্রা শুরু করল। ষষ্ঠ জর্জের জন্য একটি বিলাসবহুল কামরা, তাতে শয্যার জন্য নরম গদি পাতা। একধারে পড়াশোনার জন্য টেবিল পাতা। অন্যদিকে ভোজনের জন্য একটি টেবিল জানালা ঘেঁষে। মাথার উপর বৈদ্যুতিক পাখা, তবে বিদ্যুৎ না থাকলে হাতে টানা পাখাও আছে, একজন পাঙখাপুলার বাইরে থেকে দড়ির টানে পাখাটাকে চালায়।
প্রথমবার এসে ভারতের গরমে রাজা জর্জের গা-হাত-পা যেন জ্বলে যাচ্ছে। এখন আফশোস হচ্ছে, এদেশে শীতকাল ছাড়া আসা ঠিক নয়। মাঝেমধ্যে জানলার খড়খড়িটা তুলে দিয়ে তিনি বাইরের হাওয়া উপভোগ করছেন। কিন্তু সে উপায়ও নেই। বাতাসে আগুনের হলকা। রেলগাড়ি যাবে নাসিক, ভোপাল হয়ে দিল্লির দিকে। রাজা এই কামরাটিতে একাই রয়েছেন, নিজের কামরায় অন্য লোক তিনি পছন্দ করেন না। দরজার বাইরে অবশ্য দুজন বন্দুকধারী সান্ত্রী রয়েছে কড়া পাহারায়। পাশের কামরায় ইনস্পেকটর জেনারেল। তিনি জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন, এখানকার মাটি ঈষৎ কৃষ্ণবর্ণ। রুখু শুখু মাঠঘাট। তার মধ্যেই সবুজ চারণক্ষেত্র খুঁজে নিয়ে গ্রাম্য রাখাল বালকেরা বেরিয়েছে গরু চরাতে। দূরে দূরে দেখা যায় গ্রামের বিবর্ণ সব মাটির ঘরবাড়ি। ভারতের গ্রামগুলির চূড়ান্ত দারিদ্র্যের করুণ রূপটি যেন তাদের সর্বময় কর্তা রাজাটির সামনে উন্মোচিত হচ্ছে।
ঘণ্টাখানেক আগে রেলগাড়ি ছেড়েছে। মধ্যাহ্ন গড়িয়ে দিন চলেছে অপরাহ্নের দিকে। দিনের আলো কমে আসছে। পড়ন্ত বিকেলে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার থলঘাট পেরিয়ে রেলগাড়ি ইগতপুরী নামে ছবির মতো একটি স্টেশনের দিকে চলেছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াল রাজার রেলগাড়ি। এই ট্রেন এখানে অল্পসময়ের জন্য দাঁড়ানোর কথা। তবে এই ট্রেনে সাধারণ জনসাধারণের ওঠার কোনো সুযোগ নেই। প্রচুর নেটিভ যাত্রী প্ল্যাটফর্মে বাক্সপ্যাটরা নিয়ে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছে। রাজা কাচজানলা দিয়ে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো তাঁর গরিব প্রজাদের দিকে তাচ্ছিল্যভরে তাকালেন। হঠাৎ দেখলেন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো জনতার ভিড়ের মধ্যে থেকে এক গেরুয়াধারী গুম্ফশ্মশ্রুসমন্বিত সাধু তার জানলার ঠিক বাইরে এসে দাঁড়াল। সবার অলক্ষ্যে আঙুল দিয়ে ঘষে ঘষে জানলার কাচের গায়ে যেন কী লিখল!
রাজা জর্জ বিস্মিত নেত্রে দেখলেন কাচের গায়ে ফুটে উঠছে কয়েকটি শব্দ—‘আই অ্যাম হরিপদ। মেট উইথ এলিজাবেথ। কাম টু দ্য ডোর সাইলেন্টলি।’
শব্দগুলো পড়ামাত্র জর্জ এক অদ্ভুত আনন্দে পুলকিত হয়ে উঠলেন। মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! যে ইন্ডিয়ান সাঢু হরিপদর খোঁজে তিনি এসেছেন এই পোড়া দেশে, স্বয়ং সে নিজেই হাজির হয়েছে তাঁর সামনে! এভাবেই বুঝি পর্বত স্বয়ং মহম্মদের সামনে হাজির হয়! প্রাচ্যের প্রবাদখানি রাজার মনে পড়ে গেল। তিনি তখনই রক্ষী-সান্ত্রীদের দৃষ্টি এড়িয়ে রেলকামরার দরজা দিয়ে প্ল্যাটফর্মে পা রাখলেন। সামনে কয়েক হাত দূরেই সেই গেরুয়াধারী ইন্ডিয়ান সাঢু দাঁড়িয়ে। তিনি কয়েক পা এগোতেই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো বাক্সপ্যাঁটরা হাতে নেটিভ যাত্রীদের ভিড়টা যেন তাঁকে ঘিরে ধরল।
ঠিক এই সময় রেলের সিগন্যাল লাল থেকে বদলে সবুজ হল। প্ল্যাটফর্মের যাত্রীদের ভিড়ের মধ্যেই মিশে গিয়ে রাজার মনে হল তাঁর চারপাশের দৃশ্যাবলী আচমকা ফিকে হয়ে আসছে। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে তাঁর। ক্রমেই যেন তিনি এক কালঘুমে ঢলে পড়ছেন। তখন সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসছে।
জ্ঞান হারানোর পূর্বে রাজা জর্জ শেষবারের মতো শুনতে পেলেন ইগতপুরী স্টেশন ছেড়ে-যাওয়া রেলগাড়িটির হর্নের ক্ষীণ শব্দ। তারপর তাঁর চোখের সামনে ঘন অন্ধকার নেমে এল। ঘুমের মধ্যেই রাজা স্বপ্ন দেখলেন, উঁচুনিচু পাহাড়-পর্বত, ঊষর প্রান্তর পেরিয়ে তিনি যেন ঘোড়ার পিঠে চেপে চড়ে কোথায় চলেছেন। তাঁর দুপাশে একদল অস্বারোহীও ছুটে চলেছে সেই অজানা গন্তব্যের দিকে।
৯
রাজা ষষ্ঠ জর্জের যখন জ্ঞান ফিরল, তখন সহ্যাদ্রি তথা পশ্চিমঘাট পর্বতমালার বুকে রাতের আঁধার নেমে এসেছে। চোখ মেলে তাকাতেই তাঁর মনে হল তিনি যেন এক অন্ধকার পর্বতগুহার ভিতরে বসে আছেন। প্রায়ান্ধকার গুহার অন্দরে কয়েকটি মশাল জ্বলছে। সেই মশালের আলোয় তিনি দেখলেন তাঁর সামনে দশ-বারোটি অশরীরী শরীর দাঁড়িয়ে আছে। স্বল্পালোকে দেখা যাচ্ছে তাদের পোশাক জলপাই রঙের, হাতে রাইফেল। তবে কি রাজা সহ্যাদ্রির কুখ্যাত অশ্বারোহী দস্যুদের খপ্পরে পড়লেন! বোম্বাই প্রভিন্সের পুলিশের ইনস্পেকটর জেনারেল ট্রেনে একবার এই দস্যুদের কথা বলছিল বটে!
কথা বলতে গিয়ে রাজা ষষ্ঠ জর্জ খেয়াল করলেন একটা কাঠের চেয়ারের সঙ্গে তাঁকে দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়েছে। তাঁর গলা কেঁপে উঠল, “আমি কোথায়?”
তাঁর হাতখানেক দূরে, উল্টোদিক থেকে ভেসে এল শান্ত অথচ বজ্রকঠিন কন্ঠস্বর, “ইউ আর অন আ চেস বোর্ড, কিং জর্জ। অ্যান্ড ইটস চেকমেট!”
“আ হোয়াট?” ফ্যাসফ্যাসে ভয়ার্ত কন্ঠে রাজা প্রশ্ন করলেন। তার সামনে জলপাই পোশাক-পরা, স্বল্পকেশ, চশমা পরিহিত সৌম্যদর্শন একজন মানুষ বসে আছেন, বাকি সাত-আটজন তার পিছনের আধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে। তাদের ছায়া-ছায়া অশরীরীর মতো লাগে।
“আই অ্যাম সুভাষ চন্দ্র বোস, দ্য চিফ কম্যান্ডার অফ আজাদ হিন্দ ফৌজ! বলছিলাম, এই দাবা খেলার অন্তিম পর্যায়ে এখন কিস্তিমাত, কারণ আপনি এখন আমাদের হাতে বন্দী, কিং সিক্সথ জর্জ।” ফের বজ্রকঠিন কন্ঠে সামনে বসা মানুষটা বললেন। অমন সৌম্যকান্তি মানুষের কন্ঠস্বর যে রক্ত-হিম-করা হতে পারে না শুনলে রাজা বিশ্বাস করতেন না।
“বাট হোয়্যার ইজ দ্যাট হিন্ডু সাঢু হু ব্রট মি হিয়ার?”
সুভাষ বোসের পাশের অন্ধকার থেকে ত্রিশ বছরের এক পাঞ্জাবী যুবক এগিয়ে এসে আলোর তলায় দাঁড়াল। তাকে দেখে রাজা চমকে উঠলেন। এই তো সেই হিন্ডু সাঢু!
যুবকটি হেসে বলল, “আয়াম ভগত সিং। দ্য কম্যান্ডার অফ মঙ্গল পাণ্ডে রেজিমেন্ট ইন আজাদ হিন্দ ফৌজ।”
“দেন হোয়্যার ইজ হ্যারিপোডো?”
“হরিপদ বলে কেউ নেই এখানে। আপনি এখন আমাদের হাতে বন্দী।”
“হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট? ইউ ওয়ান্ট র্যানসম মানি, জুয়েলারি অর… প্লিজ মেক মি ফ্রি…” বিপন্ন গলায় বললেন রাজা।
গুহার ভিতর গমগম করে বেজে উঠল নেতাজী সুভাষের গলা—“উই ওয়ান্ট পূর্ণ স্বরাজ। নো ব্রিটিশ কন্ট্রোল, নো ইন্টারভেনশন। আমাদের ইন্ডিপেনডেন্ট ডমিনিয়নের স্টেটাস দিতে হবে। আমরা নিজেদের জাতীয় পতাকা নিজেরা ঠিক করব, সংবিধান নিজেরা রচনা করব।”
“বাট দিস ইজ অ্যাবসোলিউট টেররিজম। দিস অ্যামাউন্টস টু অ্যান আর্মড রিভোলিউশন এগেইন্সট দ্য থ্রোন।”
“হ্যাঁ, রাজাসাহেব, আমরা সশস্ত্র ও সহিংস আন্দোলনেই বিশ্বাসী।” সুভাষ হাসতে হাসতে বলেন, “আমাদের আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রতিটি পুরুষ ও নারী সদস্য তাই বিশ্বাস করে। স্বাধীনতা আমাদের অধিকার, সেই স্বাধীনতা তোমাদের কাছ থেকে ভিক্ষা করে নেবো না। ছিনিয়ে নেব, প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে বা সুকৌশলে। মনে রেখো, যুদ্ধে শত্রুপক্ষের রাজাকে বন্দী করা বা হত্যা করাই যুদ্ধের শেষ পরিণতি, তার উপরে যুদ্ধের ফলাফল—জয়-পরাজয় নির্ভর করে।”
“তোমরা কি আমাকে হত্যা করতে চাও? ইউ হ্যাভ কিডন্যাপড দ্য ব্রিটিশ কিং। দিস ইজ অ্যান অ্যাক্ট অফ কাওয়ার্ডিস।”
“কাপুরুষোচিত! অ্যান অ্যাক্ট অফ কাওয়ার্ডিস! কারা কাপুরুষ, কারা ছলনাশ্রয়ী? আমরা না তোমরা? ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বনিকের ছদ্মবেশে এ দেশে এসে আমাদের দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে কারা আমাদের পরাধীন করে রেখেছে? কারা ছলচাতুরীর দ্বারা মীরজাফরকে বশীভূত করে সিরাজদৌল্লার পিছনে ছুরি মেরেছিল। কারা এদেশের স্বার্থপর রাজনৈতিক নেতাদের মনে দ্বিজাতিতত্ত্বের বীজ বুনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চাইছে? কাপুরুষ তোমরা, রাজাসাহেব। আমরা শুধু আমাদের স্বাধীন দেশ ফিরে পেতে চাই, যে দেশ হবে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ—সবার দেশ।”
“কিন্তু তোমাদের এই দাবি যদি আমি মেনে না নিই…”
এবার সুভাষের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, “আগেই বলেছি, আমরা সহিংস আন্দোলনে বিশ্বাস করি। সেক্ষেত্রে, আজাদ হিন্দ বাহিনী তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দিতেও কুন্ঠা করবে না, কারণ স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধের শেষ অঙ্কে পরাজিত রাজাকে বন্দী করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।”
“কিন্তু আমাকে হত্যা করে তোমাদের লাভ কী হবে?” রাজা জর্জের কন্ঠস্বর কেঁপে ওঠে।
“আমাদের লাভ তো অবশ্যই। আমরা স্বাধীনতার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাব। আপনার মৃত্যু এ-দেশে হলে সম্ভবত ভাইসরয় নিজেও ভয়ে পাততাড়ি গুটিয়ে সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে এ-দেশ ছেড়ে পালাবেন। কিন্তু সবচেয়ে বড়ো সংকট হবে ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের। আপনার মৃত্যু হলে সম্ভবত আবার সিংহাসনে ফিরে আসবেন আপনার বড়দা, অষ্টম এডওয়ার্ড। তখন আপনার পরিবার—এলিজাবেথ, মার্গারেট, আপনার রানি—তাদের কী হবে ভেবে দেখেছেন?”
এ কথায় রাজা ষষ্ঠ জর্জ ভয়ে কেঁপে উঠল, যা সুভাষ, ভগত, বারীন ঘোষের চোখ এড়াল না। রাজাকে ভাবনাচিন্তা করার জন্য খানিক সময় দিয়ে ফৌজের সকলে কেল্লার বন্দীশালা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেল। যাওয়ার আগে ভগত বলল, “রাজাসাহেব, আপনার উপযুক্ত মহার্ঘ্য খাদ্যের ব্যবস্থা করতে পারিনি। কিন্তু আমাদের শর্ত মেনে স্বাধীনতার চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করে দিলে আপনার জন্য সুখাদ্য ও মুক্তির ব্যবস্থা শিগগিরই করা হবে।”
“বাট হোয়াট অ্যাবাউট দোজ বাইল্যাটেরাল ডিসকাশনস উইদ গ্যান্ডি, নেরু, পটেল, কলাম অ্যান্ড আদার কংগ্রেস লিডার্স…”, রাজাসাহেব মিনমিন করে বলে উঠতেই নেতাজী সুভাষ বসু গম্ভীর গলায় ধমক দিয়ে বললেন, “ফরগেট কংগ্রেস লিডার্স। দে আর স্ট্রেচিং দিজ ইস্যু অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লাইক আ রাবার ব্যান্ড ফর লাস্ট কোয়ার্টার অফ সেঞ্চুরি!”
***
প্যালানকিন অন হুইলস ট্রেন থেকে সম্রাট ষষ্ঠ জর্জের নিখোঁজ হওয়ার খবর ৯ জুন সংবাদপত্রসহ বিভিন্ন মাধ্যমের দ্বারা গোটা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই রাতেই বোম্বাই প্রভিন্সের ইনস্পেকটর জেনারেল গোপনে টেলিগ্রামের মাধ্যমে দিল্লিতে ভাইসরয় লিনলিথগোকে খবরটা দেন। তবে ইংরেজ পুলিশ এও জানায় যে রাজা জর্জের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তারা কোনো সূত্র খুঁজে পায়নি। রাজা ইগতপুরী স্টেশনে নেমে কোথায় গেছেন, কিভাবে গেছেন, সে সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ অন্ধকারে। রাজা যদি নিজেই কোথাও চলে গিয়ে থাকেন তবে সেক্ষেত্রে তদন্তে সমস্যা হবে। কিন্তু যদি কোনো স্বদেশী বিপ্লবী সংগঠন রাজাকে কিডন্যাপ করে থাকে তবে পুলিশ তদন্ত করে বের করবেই, তবে সেক্ষেত্রে কিছুটা সময় লাগবে।
এই ঘটনা কিভাবে প্রেসের কাছে একরাতের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল সেটা ভাইসরয়ের কাছে যথেষ্ট বিস্ময়ের কারণ। তবে খবর ছড়িয়ে পড়ায় ভারতীয় ঔপনিবেশিক শাসকদের মাথায় হাত। লর্ড লিনলিথগোর মুখ দেখানোর জায়গা নেই। গান্ধী, নেহরু, প্যাটেল সহ কয়েকজন কংগ্রেস নেতা এই ঘটনায় সন্ত্রাসবাদী সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন আজাদ হিন্দ ফৌজের যোগসূত্র আছে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এবং তাদের নেতৃত্ব সুভাষ বোস, ভগত সিং, বারীন ঘোষ প্রমুখদের তীব্র নিন্দা করেছেন। এই কংগ্রেস নেতারা এও বলেছেন রাজা ষষ্ঠ জর্জকে খুঁজে বের করার জন্য যতরকমের সাহায্য প্রয়োজন, তাঁরা ব্রিটিশ সরকারকে করবেন।
দ্বিতীয় রাতে ভাইসরয়ের অফিসে একটি তার এল-
“রয়্যাল প্যাকেজ ইন আওয়ার সেফ কাস্টডি। বাই ইট উইথ দ্য প্রাইস অফ ইন্ডিয়ান ইণ্ডিপেন্ডেন্স।”
প্রেরক- এ এইচ এফ
স্থান- নাসিক পোস্ট অফিস
ব্রিটিশ এম্পায়ারের সর্বময় কর্তা ইংল্যান্ডের ষষ্ঠ জর্জকে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের নেতৃত্বে অপহরণ করে ইংরেজ সরকারকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেওয়ার সংবাদে দেশবাসী উল্লসিত হয়ে পড়েছে। গোটা দেশের সাধারণ মানুষ যেন এক চাপা উত্তেজনায় ফুটছে। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে উল্লাস শুরু করছে। ইংরেজ পুলিশ ও প্রশাসন উল্লসিত ও উৎসবমুখর জনতার প্রতি কোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছে না, কারণ সুভাষ চন্দ্র দেশের ভাইসরয়কে জানিয়েছেন সাধারণ মানুষের প্রতি গ্রেফতার বা গুলিচালনার ঘটনা ঘটলে বন্দী রাজা জর্জকেও ছেড়ে দেওয়া হবে না। ফলে ইংরেজ প্রশাসন তটস্থ হয়ে আছে।
চতুর্থ দিনে নাসিক ফোর্ট থেকে বেতার তরঙ্গে সুভাষের কন্ঠ শোনা গেছে। তিনি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে জানিয়েছেন, “কংগ্রেস নেতাদের অহিংস স্বাধীনতা আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে এতদিন যে দীর্ঘসূত্রিতা দেখা গেছে, তাকে ফরওয়ার্ড ব্লক দলের আর্মড রেবেলিয়ন উইং আজাদ হিন্দ ফৌজ ঘৃণা করে। আমরা সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে সমস্যার দ্রুত সমাধানে বিশ্বাসী। তাই চরমপন্থী পথ অবলম্বন করে ব্রিটিশ এম্পায়ারের সম্রাট ষষ্ঠ জর্জকে অপহরণ করা হয়েছে। তিনি আজাদ হিন্দ বাহিনীর জিম্মায় সুস্থ ও স্বাভাবিক আছেন। তাঁর মুক্তিপণ হিসেবে আমরা চাই ভারতের আজাদি। একমাত্র ভারতের স্বাধীনতার মূল্যেই তাঁকে মুক্ত করা হবে। এই দাবি মানা না হলে রাজার কোনো শারীরিক ক্ষতির জন্য আজাদ হিন্দ ফৌজ দায়ী থাকবে না।”
বেতার তরঙ্গে ভেসে আসা সুভাষের সেই বিবৃতি শুনে দেশের সাধারণ মানুষ উল্লসিত। দেশমাতৃকার যোগ্য সন্তান সুভাষকে তারা ধন্য ধন্য করছে।
চতুর্থ দিনে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার অতি দুর্গম স্থানে রাজা জর্জকে বন্দী রাখার কেল্লাটি ব্রিটিশ পুলিশ খুঁজে পেলেও সেখানে অগ্রসর হওয়ার উপায় নেই, কারণ সুভাষ জানিয়েছেন, পুলিশের তরফে একটি গুলি চললেও বন্দী রাজাসাহেবের প্রাণসংশয় ঘটতে পারে। ফলে নিষ্ক্রিয় পুলিশ একটা গোটা দিন নাসিক ফোর্টের দশ কিলোমিটার দূরে অপেক্ষায় কাটিয়ে দিল। একমাত্র ভাইসরয় বড়োলাটই এই পরিস্থিতি থেকে বেরোনোর সূত্র দিতে পারেন।
পঞ্চম। দিন ।লর্ড ।লিনলিথগোর কাছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেইনের চিঠি এসেছে, যেকোনো শর্তে ষষ্ঠ জর্জকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে হবে। চেম্বারলেইন মাত্র দশদিন আগে ইংল্যান্ডের নির্বাচনের মাধ্যমে পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী হয়ে এসেছেন। তাঁর শপথ গ্রহণের পর পরই এত বড়ো সংকটে পড়ে তিনি দিশেহারা। প্রয়োজনে অর্ডন্যান্স জারি করে ভারতের স্বাধীনতার বিল আনতে হবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে। ইংল্যাণ্ডের রাজতন্ত্রকে রক্ষা করতে না পারলে জার্মানী, ফ্রান্স, ইতালির মতো ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলির কাছে ইংল্যান্ড হাস্যাস্পদ হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে বাকিংহাম রাজপ্রাসাদের ক্রাউন এস্টেটের তরফে ব্রিটেনের প্রিন্স, প্রিন্সেস, ডিউক, ডাচেস, ব্যারন, আর্ল সহ যত রাজন্য বর্গ আছেন তাঁরাও স্বাক্ষরিত চিঠি দিয়ে জানিয়েছে অবিলম্বে ষষ্ঠ জর্জকে চরমপন্থী বিপ্লবীদের হাত থেকে রক্ষা করে তাঁদের হাতে প্রত্যার্পণ করা হোক।
আজাদ হিন্দ বাহিনীর মুখপাত্র সুভাষ বসুর সঙ্গে দীর্ঘ একসপ্তাহ টানাপোড়েনের পর সপ্তম দিনে ভাইসরয় লিনলিথগো ঘোড়ায় চেপে হাজির হলেন সহ্যাদ্রির সেই দুর্গম অঞ্চলে। তাঁর চোখ বেঁধে ঘোড়ায় চাপিয়ে আজাদ হিন্দ বাহিনীর কম্যান্ডার ভগত সিং তাঁকে নিয়ে চললেন সেই ফোর্টে।
সপ্তম দিনে রাজা ষষ্ঠ জর্জ, ভাইসরয় লিনলিথগো, সুভাষ চন্দ্র বসু, বারীন্দ্র কুমার ঘোষ এবং ভগত সিংয়ের উপস্থিতিতে ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতার চুক্তি স্বাক্ষরিত হল। দেশের সংবিধান রচনা, রাজনৈতিক ক্ষমতার হস্তান্তর সহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য ভারতের অফিসিয়াল স্বাধীনতার তারিখটি আরও মাসদুয়েক পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হল।
উত্তরকথন
১৫ আগস্ট, ১৯৩৭
১৪ আগস্ট মধ্যরাতের পর দিল্লির সংসদ ভবনের দরবার হলে স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন হচ্ছে। মাসখানেক আগে দিল্লির করোনেশন উদ্যানে ব্রিটিশ এম্পায়ারের রাজা ষষ্ঠ জর্জের জন্য শাহী দরবার আয়োজন হওয়ার কথা ছিল। তার পরিবর্তে দরবার হলে গণতান্ত্রিক মতে ভারতের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে তিরঙ্গা পতাকা উত্তোলন করে। পতাকার রশিতে একই সঙ্গে হাত লাগিয়েছেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস, রাষ্ট্রপতি জওহরলাল নেহরু, কংগ্রেস দলের থিংক ট্যাঙ্ক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী এবং প্রাক্তন ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগো।
অদূরে দাঁড়িয়ে আছেন দেশের তরুণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভগত সিং, বিদেশমন্ত্রী বারীন ঘোষ, অর্থমন্ত্রী মহম্মদ আলি জিন্না প্রমুখেরা। সামনে দাঁড়িয়ে বিশাল সংখ্যক জনতা ও প্রাক্তন ইংরেজ আধিকারিকেরা। জনতার মধ্যে বহু প্রতিষ্ঠিত উকিল, শিক্ষক, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী হাজির হয়েছেন। অনেক সাধারণ মানুষও আছেন।
ভগত সিং ঈষৎ অন্যমনস্ক হয়ে আছেন। হঠাৎ সামনে দাঁড়ানো দর্শকদের পিছনের সারিতে তাঁর চোখে পড়ল একটা চেনা মুখ। লোকটার সঙ্গে গত দশ বছরে তাঁর মাত্র দু-বার দেখা হয়েছে। ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর মাসে লাহোরে যখন ভগত সিং রাজগুরুকে নিয়ে সন্ডার্স সাহেবকে পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট জেমস স্কট মনে করে গুলি চালিয়ে হত্যা করতে যাচ্ছিল তখন। লোকটা না এলে এক মারাত্মক ভুল হয়ে যেত।
লোকটার সঙ্গে ভগতের দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল এই বছর মে মাসের শেষ সপ্তাহে। একদিন আচমকা রাস্তায় লোকটা তার সামনে এসে বলেছিল, “স্যার, মাইসেল্ফ হরিপদ জোগানদার, চিনতে পারছেন? ১৯২৮ ।সালের ।ডিসেম্বরে ।আপনার সঙ্গে লাহোরে দেখা হয়েছিল সন্ডার্স সাহেবের সেরেস্তার বাইরে…”
ভগতের মনে পড়ে গিয়েছিল সেদিনের ঘটনা। লোকটা থাকলে কী কাণ্ডটাই না হত সেদিন!
ততক্ষণে হরিপদ নামের লোকটা ভগতের হাতে একটা চিরকুট
ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল, “স্যার, খামোখা মানুষ খুন করে কী লাভ, তার চেয়ে আরও বড়ো পরিকল্পনা করুন। ইংল্যান্ডের নতুন রাজা ষষ্ঠ জর্জ আগামি ৮ জুন এদেশে আসছেন দিল্লি দরবারে যোগ দিতে। ওঁকে অপহরণ করে ব্রিটিশ সরকারের ভাইসরয়ের কাছ থেকে মুক্তিপণ হিসেবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা চেয়ে নিন। বলুন স্যার, ভাল প্ল্যান দিলাম না?”
ভগত হতভম্ব হয়ে লোকটার দিকে তাকিয়েছিল। এমন একটা পরিকল্পনা উদ্ভট হলেও কার্যকরী হয়ে উঠতে পারে। ভগত যখন ভাবছিল এরকম পরিকল্পনা কি আদৌ নেতাজী কিংবা বারীনজী মেনে নেবেন, তখনই লোকটা একটা ছোট চিরকুট এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, “স্যার, এই চিরকুটে লেখা কথাগুলো রাজাসাহেব ষষ্ঠ জর্জকে বলতে পারলেই উনি সুড়সুড় করে স্বেচ্ছায় আপনার সঙ্গে চলে আসবেন।”
ভগত ভাবছিল, সত্যি, সেই অদ্ভুত পরিকল্পনাটা কার্যকর করতে পারার জন্য ভারতের স্বাধীনতা পাওয়া সম্ভব হল। লোকটা খুব আশ্চর্যের! নামটা কী যেন বলেছিল…হ্যাঁ, হরিপদ জোগানদার… অথচ লোকটার সঙ্গে ভাল করে আলাপ করাই হল না। স্বাধীনতা প্রাপ্তির এই সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান শেষ হলেই লোকটাকে ডেকে আলাপ করে নিতে হবে, সম্ভব হলে নেতাজী আর বারীনজীর সঙ্গেও আলাপ করিয়ে দিতে হবে।
ভগত ফের জনতার পিছনের সারির দিকে তাকাল। কিন্তু লোকটাকে দেখা যাচ্ছে না কেন! চলে গেল নাকি! ভগত গলা উঁচু করে ভিড়ের মধ্যে লোকটাকে খুঁজল কিন্তু পেল না।
সংসদ ভবনের বাইরে রাতের অন্ধকারে দুজন লোক হাঁটছে। একটু পরেই তারা সময়যন্ত্রের বোতাম টিপে ফিরে যাবে। সত্যি বলতে আজ তাদের দুজনের কোনো কাজ ছিল না। ১৯৩৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হওয়ার ঐতিহাসিক মুহূর্তটার সাক্ষী থাকার জন্য হরিপদ তার চিরশত্রু ও চিরবন্ধু মনোতোষকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল।
মনোতোষ বলল, “দাদা, তুমি এবার যা কেরামতি দেখালে তার তুলনা নেই। এক ধাক্কায় ভারতের স্বাধীনতা দিবস দশ বছর এগিয়ে দিলে। একটু পায়ের ধুলো দাও দিকি দাদা!”
হরিপদ ঈষৎ লজ্জা পেয়ে বলল, “ওরে মনোতোষ, এই যে নতুন টাইমলাইনে আরও দশ বছর আগে স্বাধীনতা পেয়ে গেলাম, তাতে ভারতের নাগরিক হয়ে কেমন গর্ব হচ্ছে না, বল?”
“গর্ব তো হচ্ছেই, কিন্তু তার সঙ্গে কিঞ্চিৎ ঈর্ষাও হচ্ছে।”
“কেন রে?”
“দশ বছর এগিয়ে দিয়েছ, তার মানে তুমি দশটা এক্সট্রা প্ল্যাটিনাম পয়েন্ট পাচ্ছ। এবার তোমার ‘বেস্ট টাইম ট্রাভেলার অফ দ্য ইয়ার’-এর পুরস্কারটা কে আটকায় বলো তো!
এই কথায় দুজনেই রাতের স্তব্ধতা কাঁপিয়ে হো হো করে হেসে উঠল। রাতের আকাশে তখনও স্বাধীনতা লাভের উদযাপনের আতসবাজি ফেটে চলেছে।
.
সান জু-এর যুদ্ধবিদ্যার আদি পুথির চিত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
