অভ্যুদয়ের পথে – কৃষ্ণেন্দু দেব
১৯১২ সালের ১৩ ডিসেম্বর সকাল। গোটা দিল্লি জুড়ে সাজ সাজ রব। হবে নাই বা কেন। কলকাতার বদলে সদ্য এই শহর ভারতের রাজধানী হয়েছে যে! আর আজ ভারতের বড়োলাট লর্ড হার্ডিঞ্জ দিল্লির দরবারে নিজের দায়িত্বভার নেবেন। বিশাল শোভাযাত্রা চলেছে দিল্লির রাজপথ ধরে। সামনে সুসজ্জিত হাতির পিঠে সস্ত্রীক লর্ড হার্ডিঞ্জ। তাঁর পিছনে সব হোমরা-চোমরা রাজ-কর্মচারী আর দেশীয় রাজা মহারাজারা। শোভাযাত্রা দেখতে রাস্তায় ভিড় উপচে পড়েছে। অনেকে আবার বহুতল বাড়ির ছাদে, বারান্দাতেও জড়ো হয়েছে।
শোভাযাত্রা কুইন্স গার্ডেন পেরিয়ে ঢুকে পড়েছে চাঁদনী চকে। এখানে ভিড় যেন আরও বেশি। পথের দুধারে তো বটেই, প্রতিটা বাড়ির ছাদেই কত লোক! হাতির পিঠে সওয়ার বড়লাটকে দেখার জন্য তাদের উৎসাহের অন্ত নেই। পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের তিনতলা বাড়িটার দোতলায় পুরুষ প্রবেশ নিষিদ্ধ। দোতলার বারান্দায় শুধু মহিলারাই দাঁড়িয়ে আছেন অধীর আগ্রহে। তাঁদের মধ্যে একজন কম বয়সী গৃহবধূ। ওঁর ডান হাতটা আচঁলে ঢাকা। হাতির পিঠে হার্ডিঞ্জকে দেখতে পেয়েই উনি মনে মনে দারুণ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। একটু পড়েই বীভৎস শব্দ… বুম্!!! কেঁপে উঠল গোটা চাঁদনী চক। সাদা ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে চারদিক। কী হয়েছে বোঝাই যাচ্ছে না। ধোঁয়া সরতে দেখা গেল ভয়ঙ্কর কাণ্ড! বোমার আঘাতে বড়োলাট গুরুতর আহত, পিঠের মাংস খুবলে গেছে, শরীরে আরও অনেক আঘাত। আর ওঁর হাতির মাহুত তো মারাই পড়েছেন।
শোভাযাত্রায় আছেন কর্নেল ম্যাক্সওয়েলও। তিনি রানির বংশের লোক, রাজপুরুষ! সব দেখে কর্নেল তো একেবারে হতভম্ব, তড়িঘড়ি হার্ডিঞ্জকে নিয়ে ছুটলেন হাসপাতালে। একেই বলে নিয়তি। যাঁর একটু বাদে দিল্লির সিংহাসনে বসার কথা, তাঁর স্থান হল হাসপাতালের বেডে।
এখন সবার মুখেই একটাই প্রশ্ন, এমন ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটাল কে?
যিনি বোমাটা ছুঁড়েছেন, সেই মহিলা অবশ্য ততক্ষণে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের দোতলা থেকে নেমে হাঁটা লাগিয়েছেন দ্রুত পায়ে। বেশ অনেকটা পথ হেঁটে উনি পৌঁছলেন পুরোনো দিল্লির একটা মসজিদের সামনে। সেখানে অপেক্ষা করছেন এক যুবক। চোখে চোখে কথা হল দুজনের। এবার ডান দিকে সরু গলিটা ধরে ধীরপায়ে চলতে লাগলেন দুজনে।
গলির শেষে একটা ছোট্ট বাড়ি। এদিক ওদিক ভালো করে দেখে দুজনেই ঢুকে পড়লেন ঐ বাড়ির ভিতর। মহিলাটি এবার একটা ঘরে ঢুকে একে একে শাড়ি, গয়না, পরচুলা খুলে ফিরে এলেন নিজের বেশে। বোঝা গেল উনি আসলে বছর উনিশের এক রূপবান যুবক। নাম বসন্ত বিশ্বাস। কদিন আগেই রাসবিহারী বসু ওঁকে নিয়ে এসেছেন দিল্লিতে, দিয়েছেন কিছু কাজের ভার। তারই একটা সমাধা করলেন আজ। সফল হলেন কিনা কে জানে।
বসন্ত বিশ্বাসের সঙ্গীটির নাম বালমুকুন্দ। দিল্লিতে এসে ওঁর ঠিক করা বাসাতেই এতদিন থেকেছেন বসন্ত। এখানকার আরও কয়েকজন বিপ্লবীর সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়েছে। তাদের মধ্যে অবোধবিহারী, আমিরচাঁদ আর দীননাথ বসন্তের খুবই ঘনিষ্ঠ।
গুলি-বোমা দিয়ে ইংরেজ তাড়াবার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বছর তিনেক আগে লালা হরদয়াল বিলেত থেকে পড়াশোনা ছেড়ে পাঞ্জাবে ফিরে এসে একটা বিপ্লবী দল তৈরি করেছিলেন। বালমুকুন্দ, আমিরচাঁদ, অবোধবিহারী আর দীননাথ সেই দলেরই সদস্য। কিন্তু হরদয়াল কিছুদিন আগে গদর পার্টিকে শক্তশালী করার আশা নিয়ে চলে গেছেন আমেরিকায়। এদিকে দেরাদুন ছেড়ে রাসবিহারী বসু পাঞ্জাব-লাহোরে যাতায়াত বাড়িয়ে দেওয়ার পর ওঁদের চারজনের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে। ওঁরা সবাই এখন ‘বাসুজি’র পরামর্শ মেনেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে গোপনে বিপ্লবী কার্যকলাপ চালিয়ে
যাচ্ছেন। কদিন আগে বসন্ত বিশ্বাস জুটেছেন ওঁদের সঙ্গে।
বালমুকুন্দ বসন্তকে বললেন, “পুলিশ এখনও মনে হয় তোমার পরিচয় জানতে পারেনি। তবে আজকের পরে ওরা কে বড়োলাটের ওপর বোমা ছুঁড়ল তা জানতে দিন-রাত এক করে দেবে। এই সময় তোমার কদিন গা-ঢাকা দেওয়াই ভালো। এই বাড়ি এখন আর মনে হয় তোমার জন্য নিরাপদ নয়। তাই আজ রাতেই তুমি বেরিয়ে পড়ো।”
“আমি আজ রাতে তাহলে অবোধবিহারীর কাছে যাব?”
“হ্যাঁ, পানিপথের দিকে ও তোমার জন্য একটা নতুন আস্তানা ঠিক করে রেখেছে। সাবধানে যেও। সময় এলে আবার দেখা হবে।”
২
দু’দিন বাদের ঘটনা। হার্ডিঞ্জের ওপর বোমা ছোঁড়ার ঘটনায় সরকারি মহলে নিন্দার ঝড় উঠেছে। বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ সভা হচ্ছে। শুধু ইংরেজরা নয়, অনেক ভারতীয় রাজকর্মচারীও প্রতিবাদে সোচ্চার।
তবে এই ঘটনার প্রতিবাদে সবচেয়ে বেশি গলা ফাটাচ্ছেন দেরাদুনের ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বাঙালি হেড ক্লার্ক রাসবিহারী বসু। দেরাদুনের একটা সভায় উনি রীতিমত এই হামলার বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন। বললেন, “আমি বড়োলাট বাহাদুরের ওপর এই জঘন্য আক্রমণকে ধিক্কার জানাচ্ছি। যে বা যারা এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত, আমি বিশ্বাস করি, তারা নরপিশাচ। জেনে রাখুন, তারা কোনোমতেই রেহাই পাবে না। পুলিশ তাদের অচিরেই গ্রেফতার করবে। আমি অপরাধীদের চরম শাস্তি চাই। রাজধানীর বুকে স্বয়ং লাটবাহাদুরের যে এই অবস্থা হতে পারে, আমি কল্পনাও করতে পারছি না। উনি এখন কি কষ্টটাই না পাচ্ছেন! ওঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করি।” শেষ কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদেই ফেললেন রাসবিহারী।
সভামঞ্চ থেকে নামার পর স্বয়ং মিলিটারি সেক্রেটারি পিঠে হাত রেখে রাসবিহারীকে সান্ত্বনা জানালেন। নেটিভ মানুষ হলেও রাসবিহারীকে উনি বেশ শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। বাংলা শেখেন ওঁর কাছে। বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শও করেন ওঁর সঙ্গে।
একটু ।বাদেই।। সুশীল। ঘোষ ।।এলেন রাসবিহারীর সঙ্গে কথা বলতে। উনি ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর প্রধান স্যার চার্লস ক্লিভল্যান্ডের যাকে বলে ডান হাত। হার্ডিঞ্জের চিকিৎসা দেরাদুনে হচ্ছে। তাই উনিও দেরাদুনে হাজির হয়েছেন। রাসবিহারীকে উনি বললেন, “এই চক্রান্তের সঙ্গে বাংলার একটা যোগ আছে বুঝলেন তো!”
“একথা বলছেন কী ভাবে?”
“যে বোমাটা লাটবাহাদুরের ওপর ফেলা হয়েছে, অমন বোমা আগে চন্দননগরে তৈরি হয়েছে।”
“তাই নাকি?”
“না হলে আর বলছি কী। আপনার বাড়িও তো চন্দননগরে? আমাদের সঙ্গে চলুন। আপনি থাকলে আমাদের তদন্তে সুবিধা হবে।”
রাসবিহারী তো এই প্রস্তাবে এক কথায় রাজি। গোয়েন্দা বিভাগের নির্দেশে রাসবিহারীর ছ’মাসের ছুটি মঞ্জুর হয়ে গেল। দরকার হলে ঐ ছুটি আরও বাড়ানো হবে। সুশীল ঘোষের সঙ্গে রাসবিহারী চলে এলেন কলকাতায়।
কিন্তু অনেক খোঁজখবর করেও হার্ডিঞ্জ আক্রমণের কোনো কিনারা হল না। গোয়েন্দা বিভাগ যে তিমিরে ছিল, ছ’মাস বাদেও সেই তিমিরেই রয়ে গেল।
এরপর ১৯১৩ সালের ১৭ মে ঘটল আরেক ভয়ঙ্কর ঘটনা। এবার লাহোরের লরেন্স গার্ডেনে খোদ পুলিশ ক্লাবে বোমা ছোঁড়া হয়েছে শ্রীহট্টের প্রাক্তন এসডিও মিঃ গর্ডনকে লক্ষ করে। তিনি এখন পাঞ্জাবের সহকারী পুলিশ কমিশনার। আগেও একবার বাংলাদেশে ওঁকে মারার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু কপালজোরে বেঁচে গিয়েছিলেন। এবারও কপাল সঙ্গ দিল। উনি অক্ষতই রয়েছেন, অবশ্য বোমার আঘাতে ঘায়েল হয়ে ওঁর এক চাপরাশির মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এবারেও যারা বোমা ছুঁড়েছে, তাদের কোনো হদিশ নেই। গোয়েন্দাদের তো এখন মাথার চুল ছেঁড়ার হাল, কিন্তু কোনো সূত্রই মিলছে না।
৩
১৯১৩ সালের ২১ নভেম্বর। রাত্রিবেলা কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রিট দিয়ে হেঁটে চলেছেন মণীন্দ্রনাথ নায়ক। বসন্ত বিশ্বাস যে বোমাটা হার্ডিঞ্জকে লক্ষ করে ছুঁড়েছিলেন, সেটা ওঁরই বানানো। মণীন্দ্রের গন্তব্য এখন রাজাবাজারের এক গোপন আস্তানা। কিন্তু একটা বাচ্চা ছেলে হঠাৎই ওঁর জামা টেনে ধরল। তারপর ফিসফিস করে বলল, “তুমি এক্ষুনি চন্দননগরে ফিরে যাও। একদম দেরি কোরো না।”
মণীন্দ্র আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করলেন না, ফিরে গেলেন চন্দননগর। ওদিকে রাজাবাজারের ১৯৬/১ আপার সার্কুলার রোডের বাড়িখানা তখন পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। তাদের লক্ষ অমৃতলাল হাজরা নামের এক বিপ্লবী। পুলিশের উদ্দেশ্য সফল হল। অমৃতলালকে তো তারা গ্রেফতার করলই,
সঙ্গে ওই বাড়িতে তারা আবিষ্কার করে ফেলল একটা বোমা কারখানাও। বোমার খোল, মশলা, আরও কত কী! কিন্তু অমৃতলালের মুখ দিয়ে একটাও কথা বের করতে পারল না। তবে তল্লাশির সময় হিজিবিজি লেখা এক টুকরো কাগজ পাওয়া গেছে। অনেক কষ্টে পুলিশের ডিআইজি ডেনহ্যাম সেই লেখার মর্মোদ্ধার করে ফেললেন। তাতে লেখা আছে—দিল্লির সেন্ট জোসেফ স্কুলের শিক্ষক আমিরচাঁদ। পুলিশ পরের দিনই তাঁকে গ্রেফতার করল। কিন্তু ওঁর মুখ থেকেও কোনো কথা বের করা যাচ্ছে না। তবে ওঁর বাড়ি থেকে পাওয়া গেল আরেকটা নাম- দীননাথ তলোয়ার।
এই দীননাথ কিন্তু ধরা পড়ার পর পুলিশি অত্যাচারের মুখে আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। বলে দিলেন সব কিছু। হার্ডিঞ্জের ওপর বোমা ছুঁড়েছিলেন বসন্ত বিশ্বাস। গর্ডনের ওপর বোমা হামলায় আবার ঐ বসন্ত বিশ্বাসই, সঙ্গে অবোধবিহারী। বালমুকুন্দও এই ষড়যন্ত্রে সমানভাবে যুক্ত। আর ওঁদের সকলের মাথা যিনি, তাঁর নাম রাসবিহারী বসু।
ইংরেজ গোয়েন্দা থেকে শুরু করে সরকারি আমলা, এই শেষ নামটা কেউ বিশ্বাসই করতে পারছে না। রাসবিহারী বসু! ইংরেজদের কাছের মানুষ সেই রাসবিহারী? ইংরেজ পুলিশের চর রাসবিহারী এত বড়ো চক্রান্তের কারিগর?
এই রাজদ্রোহী রাসবিহারীকে ধরতেই হবে। আদাজল খেয়ে লেগে গেছে পুলিশ। কিন্তু আজব ব্যাপার, কোথাও মানুষটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ইংরেজ সরকারও হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। কাগজে, রেলস্টেশনে, বাজারে, রাস্তার মোড়ে—সব জায়গায় রাসবিহারী বসুর ছবি তারা ছড়িয়ে দিয়েছে। ধরিয়ে দিতে পারলেই লাখ টাকা পুরস্কার!
কিন্তু তাও কেটে গেল কয়েক মাস। লোকটা কি উবে গেল নাকি?
রাসবিহারী উবে যাননি। তবে এক জায়গায় তিনি কখনোই বেশি দিন থাকছেন না। চরকির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন সেই লাহোর থেকে অমৃতসর, কাশী থেকে কলকাতা। বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন বেশে। যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানকার ভাষাতেই কথা বলছেন অবলীলায়। গুপ্তদলগুলোর সঙ্গে কথাবার্তা চালাচ্ছেন। যোগাযোগ হয়েছে শচীন সান্যাল, দামোদর স্বরূপ প্রমুখ বিপ্লবীদের সঙ্গে। ছদ্মবেশও একেবারে নিখুঁত। কখনো উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসার, কখনো কাবুলিওয়ালা, কখনো পাঞ্জাবি গাড়িচালক। অমৃতসরে শচীন্দ্রনাথ দত্ত নাম নিয়ে বেমালুম ঘুরে বেড়াচ্ছেন। স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে দিব্যি আলাপও জমিয়ে নিয়েছেন। ওরা রাসবিহারীকে ছুছুন্দর দত্ত নামে ডাকে। আবার কেউ কেউ বলে ‘ফ্যাটবাবু’।
গোয়েন্দারাও অবশ্য বসে নেই। খোঁজ তারাও চালিয়ে যাচ্ছে। বেশ ক’দিন টানা নজর রেখে কাশীর থানায় পাক্কা খবর আনল এক গোয়েন্দা। দশাশ্বমেধ ঘাটের পাশের একটা বাড়িতে দু’দিন ধরে আছেন রাসবিহারী। থানার বড়োবাবু আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করলেন না। বেরিয়ে পড়লেন দলবল নিয়ে। সেই গোয়েন্দা বাড়িটা চিনিয়ে দিল। দারোগবাবুর নির্দেশে পুলিশ ঘিরে ফেলল গোটা বাড়ি। আর কোনোভাবে পালাবার পথ নেই।
ওদিকে দোতলার জানলা থেকে পুলিশের গতিবিধি লক্ষ করেছেন রাসবিহারীও। তিনি আর সময় নষ্ট করলেন না। নিমেষে বদলে নিলেন নিজের রূপ। পুলিশ এবার দরজায় কড়া নাড়ছে, “এক্ষুনি দরজা খোলো, নাহলে ভেঙে ফেলব দরজা।”
না, দরজা ভাঙতে হল না, এক উড়ে ঠাকুর একরকম কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে এল। দারোগবাবু হুঙ্কার দিলেন, “তোমার বাবু কোথায়?”
ঠাকুর ইশারায় দোতলার ঘরটা দেখিয়ে দিল। দারোগবাবু এবার ফোর্স নিয়ে উঠে গেলেন উপরে। কিন্তু দোতলা শুনশান, কেউ নেই। নেমে একতলাতেও তন্ন তন্ন করে খুঁজলেন। কিন্তু কোথায় রাসবিহারী। রাসবিহারী তখন উড়ে ঠাকুরের বেশে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছেন দশাশ্বমেধ ঘাট পেরিয়ে আরও অনেক দূর, তাঁর দ্বিতীয় গোপন আস্তানায়। তিনি তখন পুলিশের ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
ক’দিন বাদের ঘটনা। সুশীল ঘোষের কাছে পাক্কা খবর। শিয়ালদায় পাওয়া যাবে রাসবিহারীকে। শিয়ালদা স্টেশন থেকে সেই ধর্মতলা পর্যন্ত পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। অনেকে আবার আছে সাদা পোশাকে। আজ আর পালাবার পথ নেই।
শিয়ালদা পোস্ট অফিসের সামনেও একগাদা পুলিশ। খানিক আগেই এই চত্বরে নাকি দেখা গেছে আসামীকে। দুজন পুলিশ উঠে গেল দোতলায়। সাহেবের নির্দেশ, কোনো জায়গা বাদ দিলে চলবে না। চোখ গেল এক বুড়ো অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের দিকে। এক মনে লোকটা বেহালা বাজাচ্ছে। সুরের ঝংকার ছড়িয়ে পড়ছে দোতলা থেকে এক তলাতেও।
এই সময়েই নিচে হট্টগোল। একজন সন্দেহভাজনকে আটক করেছে পুলিশ। লোকটা রাসবিহারী না হয়ে যায় না। তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে স্টেশনের দিকে। সুশীল ঘোষ ওখানেই আছেন। তিনিই সনাক্ত করবেন। দোতলার পুলিশ দুজন নেমে দ্রুত নেমে গেল নিচে। ওদিকে দোতলার অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মানুষটি তখনও বেহালায় সুর তুলেই চলেছেন। তবে এখন ওঁর মুখের কোণায় মুচকি হাসি। খানিক বাদে উনি ধীরে ধীরে নেমে এলেন রাস্তায়। তারপর উদাস মনে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় পৌঁছে গেলেন বাদুড়বাগান বস্তির একটা খোলার ঘরে। সেখানে অপেক্ষা করছেন প্রতুল গাঙ্গুলি। প্রিয় নেতা রাসবিহারী বসু পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে এই আস্তানায় চলে আসতে পেরেছেন দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন উনি।
৪
হাওড়া গ্যাং কেসের রায় বেরিয়েছে। বাঘাযতীন খালাস পেয়েছেন বটে, কিন্তু তাঁর সরকারি চাকরিটা গেছে। কিছুদিন বাদে হরিকুমার চক্রবর্তী, নরেন ভট্টাচার্য, অতুল ঘোষ, অমরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়রা তাঁদের বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে হাজির হলেন যতীন মুখোপাধ্যায়ের কাছে। সেদিনই বাঘাযতীনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠল একটা গুপ্ত সমিতি। যতীন মুখোপাধ্যায় এবার বেরোলেন উত্তরভারতের পরিস্থিতিটা বুঝে নিতে। গুরুজি (ভোলাগিরি মহারাজ) দর্শন করবেন বলে সোজা চলে গেলেন হরিদ্বার। তারপর এলেন বৃন্দাবনে, সাক্ষাৎ করলেন যতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের (নিরালম্ব স্বামী) সঙ্গে। তারপর গেলেন বেনারসে সতীশ মুখার্জির (স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ) সঙ্গে দেখা করতে। ওঁরা দুজনেই গোপনে আশ্রমের আড়ালে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে মদত যোগান। অনেক বিপ্লবীরই ওঁদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। সকলের সঙ্গে কথা বলে যতীন মুখোপাধ্যায় ঠিক করলেন পূর্ব, উত্তর ও পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন ভেঙে যাওয়া দলগুলোকে একত্রিত করে বিপ্লবের কাজকে সংহত করবেন।
বাংলায় ফিরে এসেই স্বাধীন কনট্রাক্টারি ব্যাবসা শুরু করেছেন বাঘাযতীন। যশোরের ঝিনাইদায় হেড অফিস। ব্রাঞ্চ অফিস একটা যশোর শহরে আরেকটা মাগুরায়। এখানকার নদীর ওপর পুল, লাইট রেলওয়ের কাজ, স্ক্রু-পাইপ পুল, মুন্সেফি আদালত বানানো—এরকম অনেক অর্ডার পাচ্ছেন যশোরের পূর্ত বিভাগ থেকে। ব্যাবসা ফুলে ফেঁপে উঠছে। ঘোর সংসারী হয়ে উঠেছেন। জমি কিনেছেন, সেখানে বাড়ি বানাচ্ছেন, ফলের বাগান, খেতখামার কিনছেন। এসব দেখে ইংরেজ পুলিশ খুশি। যাক, বিপ্লবের। ভূত ।তাহলে। লোকটার মাথা
থেকে নেমেছে।
কিন্তু ব্যাবসার ফাঁকে ফাঁকে যতীন্দ্রনাথ সাইকেল চালিয়ে বা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে চলে যান, যোগাযোগ করেন সেখানকার গুপ্ত সমিতিগুলোর সঙ্গে। যতীন মুখোপাধ্যায় ধীরে ধীরে বাংলার ভেঙে যাওয়া গুপ্তদলগুলোর মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলছেন। তিনিই যে হয়ে উঠেছেন বাংলার বিভিন্ন দলগুলোর অবিসংবাদী নেতা, সেই খবর ইংরেজ পুলিশ রাখে না।
চন্দননগরে মতিলাল রায়ের গোপন আড্ডা। সেখানে গতকালই এসে পৌঁছেছেন রাসবিহারী বসু। আর আজ সকালে এলেন যতীন মুখোপাধ্যায়। নিভৃতে আলোচনায় বসলেন দুজনে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ইংরেজরা এখন জার্মানদের নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। এদেশের বহু ফিরিঙ্গি সেনাকে তারা দেশে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। সুতরাং এটাই মোক্ষম সময় ওদের ওপর আঘাত হানার। আর এই আঘাত আনার উপায় হল গণ অভ্যুত্থান।
রাসবিহারী বললেন, “এই কাজে আমরা দেশের অনেক সাহসী তরুণকে হাতে পাব। তাদের দেশপ্রেম, বীরত্ব নিয়েও কোনো প্রশ্ন নেই।
কিন্তু শুধু সাহস, শৌর্য, বীর্য দিয়ে তো আর গণ অভ্যুত্থান সম্ভব নয়। ঐ কাজে দরকার অস্ত্র। আর ঐ অস্ত্র প্রচুর পরিমাণে আছে সেনাবাহিনীর হাতে। তাই এই কাজে আমাদের দেশীয় সেনাদের সাহায্য অবশ্যই নিতে হবে। ভারতীয় সেনাদের আমাদের দলে টানতে হবে।”
“দেশীয় সেনাদের আমাদের দলে টানা তো সোজা কথা নয়। ওরা যে আসলে ইংরেজদের দাসত্ব করছে, সেটা আগে ওদের বোঝাতে হবে। আর সেই বোঝানোর দায়িত্বটা নিতে হবে বিপ্লবীদেরই।” বাঘাযতীন মন্তব্য করলেন।
রাসবিহারী জবাবে বললেন, “সে তো বটেই। ইতিমধ্যেই নানা জায়গার অনেক বিপ্লবীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। শচীন তো আছেই, তাছাড়া দামোদর স্বরূপ, বিনায়ক রাও কাপলে, বিষেন সিং, বিভূতি হালদার, দিল্লা সিং, নলিনী মুখার্জি, আউধবিহারী, ভাই পরমানন্দ, অনুকূল চক্রবর্তী সমেত আরও অনেকে আমার ডাকে সাড়া দিয়েছে। আমি দেখে এসেছি, পাঞ্জাবের যুবকেরা এখন ইংরেজদের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসছে। আমার কাছে খবর, কিছু দিনের মধ্যেই আমেরিকা থেকে গদর পার্টির কয়েক হাজার শিখ যুবক এদেশে চলে আসবে।”
“বাঃ! এ তো খুব ভালো খবর! বাংলায় গণ অভ্যুত্থানের দায়িত্ব আমি সামলাব। ইতিমধ্যেই আমি বেশ কিছু ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছি। তারা নানা জায়গায় যোগাযোগ করছে। আমার আশা, জার্মানির কাছ থেকে আমরা প্রচুর অস্ত্র সাহায্য পাব। সেই অস্ত্র আমরা পৌঁছে দেব বিপ্লবীদের হাতে। ভারতমাতাকে আমরা স্বাধীন করবই।”
আরও কিছুক্ষণ রাসবিহারী বসুর সঙ্গে মধ্যে আলোচনা করে যতীন মুখোপাধ্যায় সেই রাতেই বেরিয়ে পড়লেন কলকাতার উদ্দেশে। কলকাতায় ফিরে তাঁর এখন অনেক কাজ। যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়, নরেন ভট্টাচার্য, অনুকূল মুখার্জিদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। যে করেই হোক জার্মান অস্ত্র এদেশে আনতেই হবে। নাহলে ইংরেজদের ওপর চরম আঘাত হানা যাবে না।
ওদিকে দিল্লিতে দায়রা জজ হ্যারিসনের আদালতে শুরু হয়েছে ‘দিল্লি ষড়যন্ত্র মামলা।’ আসামী বসন্ত বিশ্বাস, আমিরচাঁদ, অবোধবিহারী, বালমুকুন্দ এবং আরও সাতজন। বোমা তৈরি, বড়োলাট আর গর্ডনের ওপর হামলা, অস্ত্র আইন ভঙ্গ—হাজারো অভিযোগ ওঁদের বিরুদ্ধে। চলুক বিচার। গণ অভ্যুত্থানের সময় জেল ভেঙে বের করে আনা হবে ওঁদের। শুধু ওঁরা কেন, দেশের আরও নানা জেলে যে বিপ্লবীরা আটক আছেন, সবাইকে মুক্ত করা হবে। মুক্ত হয়েই তাঁরা সবাই অংশ নেবেন অভ্যুত্থানে।
৫
১৯১৪-র নভেম্বর। পরিকল্পনা মতোই সব ঠিকঠাক এগোচ্ছে। আমেরিকা থেকে দেশে ফিরেছেন গদর পার্টির কর্তার সিং। সঙ্গে এনেছেন প্রায় তিন হাজার শিখ যুবক। ওঁরাও সবাই গদর পার্টির সদস্য। আরও হাজার বিশেক শিখ তরুণ কিছুদিনের মধ্যেই চলে আসবেন। সেই ব্যবস্থা করে এসেছেন কর্তার সিং। আরও একজন এসেছেন ঐ জাহাজে চেপে, বিষ্ণু গণেশ পিংলে। আদতে মহারাষ্ট্রের মানুষ তিনি। এই কর্তার সিং আর পিংলেকে পেয়ে রাসবিহারী অভিভূত। ওঁদের সাহস আর উদ্যম তুলনাহীন। তাই আর দেরি করা ঠিক নয়।
পরের বছরের শুরুতেই সবাইকে একসঙ্গে ডেকে নিলেন রাসবিহারী। কাশীতে শচীন সান্যালের ডেরায় বসল গোপন সভা। আলোচনায় ঠিক হল, একুশে ফেব্রুয়ারি সমস্ত ক্যান্টনমেন্টগুলোতে ভারতীয় সৈন্যরা ইংরেজ সৈন্যদের আক্রমণ করবে। যারা আত্মসমর্পণ করবে তাদের বন্দি করা হবে, আর যারা তা করবে না, তাদের করা হবে হত্যা। সমস্ত টেলিগ্রাফের তার কেটে দেওয়া হবে, লুঠ করা হবে ট্রেজারিগুলো। জেলখানাগুলো ভেঙে বন্দিদের মুক্ত করে দেওয়া হবে। তারপর সমস্ত বিপ্লবী লাহোরে সমবেত হয়ে নিজেদের সরকার ঘোষণা করবে।
পরিকল্পনাটার মধ্যে অবাস্তবতা কিন্তু কিছুই নেই। বিশ্বযুদ্ধের প্রয়োজনে ভারতীয় ব্রিটিশ সৈন্যদের অধিকাংশই এখন দেশের বাইরে, তাঁদের সংখ্যা প্রায় দু’ লক্ষ দশ হাজার। ভারতবর্ষকে রক্ষার দায়িত্বে মাত্র বারো হাজার ব্রিটিশ সেনা এদেশে মোতায়েন আছে এবং তারাও মোটেই দক্ষ নয়। বাকি সবই ভারতীয় সেনা। তাই এই মুহূর্তে প্রতিটা ক্যান্টনমেন্টেই ইংরেজ সৈন্যের সংখ্যা ভারতীয়দের তুলনায় নেহাতই কম। তাই তারা কখনোই ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবে না।
রাসবিহারী এবার সকলের উদ্দেশে বললেন, “এই মুহূর্তে আমাদের সকলের প্রধান কাজ বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টের ভারতীয় সৈন্যদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ তৈরি করা। ওঁদের হাতে অস্ত্র আছে। তাই ওঁদের দলে টানতে না পারলে কিন্তু আমরা গোটা দেশে একসঙ্গে কখনোই অভ্যুত্থান ঘটাতে পারব না। এলাহাবাদের সেনাছাউনির ভার নেবে দামোদর স্বরূপ। ওখানের অনেকের সঙ্গে স্বরূপের আগে থেকেই পরিচয় আছে। তাই ওই ছাউনির দেশীয় সেনাদের আমাদের দলে টানতে কোনো অসুবিধা হবে না। কী তাই তো?”
দামোদর স্বরূপ দায়িত্ব পেয়ে প্রচণ্ড খুশি। তিনি বললেন, “নিশ্চয়ই পারব।”
“বিভূতি হালদার আর প্রিয়নাথের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ওরা নেবে বেনারস ক্যান্টনমেন্টের দায়িত্ব। শচীন সান্যাল এখন আমার সঙ্গে লাহোর যাবে। কদিন বাদে ও-ও এই বেনারসের সেনাশিবির দেখাশোনা করবে। আর রামনগর সিক্রলের সেনাছাউনির দায়িত্ব থাকছে তিনজনের ওপর—বিশ্বনাথ পাঁড়ে, মঙ্গল পাণ্ডে আর দিল্লা সিং। তোমাদের কোনো অসুবিধা নেই নিশ্চই?”
কারো কোনো অসুবিধা নেই। গুরুদায়িত্ব পেয়ে সবাই খুশি। রাসবিহারী আবার বলতে শুরু করলেন, “হির্দেরামের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ও নিচ্ছে জলন্ধরের সামরিক ছাউনির দায়িত্ব আর হরিচরণ হারার ও পিয়ারা সিং যাবে কোহাটের সেনা শিবিরে। সন্ত গোলাব সিং আর হরনাম সিং নেবে বান্নুর ৩৫ নম্বর রেজিমেন্টের দায়িত্ব। আর দিল্লির সেনাবাহিনীকে আমাদের দলে টানার ভার নেবে সন্ত বাসাখা সিং।”
“আমি কোথায় যাব?” প্রশ্নটা মূলা সিংয়ের।
“আপনি গ্রামে গিয়ে কাজ করুন, কৃষকসমাজকে ইংরেজদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে একজোট করুন। সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ শুরু হলেই আপনি ওদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বেন লাহোর আর অমৃতসরের ওপর।”
“আর বাংলা?”
“বাংলা নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। ওখানে যতীন মুখোপাধ্যায় আছেন। তিনিই সব ব্যবস্থা করে রাখবেন, আমার সঙ্গে কথা হয়ে গেছে। উনি জার্মানি থেকে অস্ত্র আমদানির ব্যাপারে অনেকটা এগিয়েছেন। সেই অস্ত্র একবার এসে পড়লে বাংলায় প্রতিটা বিপ্লবীর হাতে বন্দুক-পিস্তল পৌঁছে যাবে। তাই বাংলা নিয়ে আমাদের ভাবনার কোনো কারণ নেই।”
রাসবিহারী এবার কর্তার সিং আর পিংলের দিকে তাকালেন। তারপর সকলের উদ্দেশে বললেন, “আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব পড়েছে দুজনের ওপরে। কর্তার সিং আর পিংলে। ওঁরা দুজন একসঙ্গেই থাকবেন আর আম্বালা, ফিরোজপুর, রাওয়ালপিন্ডি, মীরাট—এইসমস্ত সেনাছাউনিগুলোতে ঘুরে ঘুরে প্রচার চালাবেন। লাহোরে হবে আমাদের হেডকোয়ার্টার। আমি সেখানেই থাকব। আপনারা সবাই পিংলে আর কর্তার সিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ করবেন। কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে ওদের জানাবেন। মনে রাখবেন, আগামি একুশে ফেব্রুয়ারি আমরা গোটা দেশে একসঙ্গে অভ্যুত্থান ঘটাব। বুঝতেই পারছেন, হাতে আমাদের কিন্তু খুব কম সময়। এর মধ্যেই যা করার করে ফেলতে হবে। আর হ্যাঁ, বিশ্বাসঘাতকদের থেকে সদা সতর্ক থাকতে হবে। কোনও বেইমানকে রেয়াত করার দরকার নেই। মনে রাখবেন, তারা সব ভারত মায়ের শত্রু।”
যেহেতু লাহোর হেড কোয়ার্টার, অতএব সেখানেই রাসবিহারী বসুকে একটা নিরাপদ আস্তানা বেছে নিতে হবে। কিন্তু পুলিশ কড়া নির্দেশ জারি করেছে, অচেনা অজানা কোনো লোককে ওখানে হুটহাট বাড়ি ভাড়া দেওয়া যাবে না। তাহলে কী হবে?
দলের অত্যন্ত বিশ্বস্ত কর্মী রামশরণ দাস। তিনি লাহোরেরই বাসিন্দা। তাঁর স্ত্রীও বিপ্লবের প্রবল সমর্থক, রাসবিহারীর প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা। ভদ্রমহিলা নিজেই বললেন, “কোনো চিন্তা নেই আপনাদের। আমি রাসবিহারীজির সঙ্গে তাঁর স্ত্রী-র পরিচয়ে এই আস্তানায় থাকব। এলাকার লোকের মনে কোনও সন্দেহই হবে না। পুলিশ ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতে পারবে না।”
অতঃপর লাহোরে থাকার সমস্যা মিটল। হেড কোয়ার্টার থেকে বাকিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার ভার দেওয়া হয়েছে বিনায়ক রাও কাপলেকে। দেশের কোন কেন্দ্রে কাজ কতটা এগোচ্ছে, সেই সমস্ত রিপোর্ট নিয়ম করে কাপলে-ই রাসবিহারী বসুকে জানাবেন।
৬
ক’টা দিন যেতে না যেতেই বিভিন্ন সেনানিবাস থেকে খবর আসছে লাহোরের হেড কোয়ার্টারে। প্রাথমিক রিপোর্ট মন ভালো করে দিয়েছে রাসবিহারীর। প্রতিটা সেনা ছাউনি থেকেই দারুণ সাড়া পাওয়া গেছে। অভ্যুত্থানের জন্য ভারতীয় সৈন্যরা মানসিকভাবে একেবারে প্রস্তুত।
বার্লিনে আছেন রাজা মহেন্দ্রপ্রতাপ, সুফি অম্বাপ্রসাদ। ওঁরাও লোকজন আর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তুরস্ক আর কাবুল হয়ে দেশে ফেরার তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছেন। লাহোরে বসে এই খবর পেয়ে রাসবিহারী তৃপ্ত হলেন। উনি এবার আরও তৎপরতা বাড়ালেন। রাসবিহারী ভেবে দেখেছেন, শুধু দেশের ভিতর থেকে আঘাত করলেই চলবে না। বাইরে থেকেও আঘাত হানা জরুরি। তাহলে ইংরেজদের কোমর একেবারে ভেঙে যাবে। ওদের সমূলে উৎখাত করে ফেলে দিতে হবে বঙ্গোপসাগরের জলে। তাই উনি যোগাযোগ করেছেন বার্মা, মালয় ও সিঙ্গাপুরের ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গেও। অভ্যুত্থানের কথা শুনে তাঁরাও এক কথায় রাজি। এবার লড়াই হবে ভারতের স্বাধীনতার জন্য। শুধু একুশে ফেব্রুয়ারির প্রতীক্ষা।
এদিকে বাংলাদেশেও তৎপরতার অভাব নেই। একদিন সন্ধ্যা গড়াতেই দক্ষিণেশ্বরে পঞ্চবটীর তলায় একে একে হাজির হলেন যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়, চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী, অতুলকৃষ্ণ ঘোষ, অনুকূল মুখার্জিরা। চিত্তপ্রিয় বললেন, “দাদার কাছ থেকে জানলাম, ময়মনসিংহ ও রাজশাহীর সুরুলের জঙ্গলে কম বয়সী ছেলেদের যুদ্ধ করার ট্রেনিং দেওয়া শুরু হয়ে গেছে।”
“হ্যাঁ, পার্বত্য ত্রিপুরার বিলোনিয়া আর উদয়পুরেও ঐ ট্রেনিং চলছে বলে শুনেছি।”
“এখন আমাদের আরও বেশি করে বন্দুক, রাইফেল দরকার। ‘দাদা’ তাই জার্মান অস্ত্র এদেশে আনার জন্য একেবারে উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন। বিদ্রোহের সময় সমস্ত বিপ্লবীর হাতে অস্ত্র তুলে দিতে হবে।”
একদিন এক শিখ বিপ্লবী বাঘাযতীনের কাছে চুপিসারে একটা চিঠি পৌঁছে দিয়ে গেলেন। চিঠিটা লিখেছেন লাহোর ক্যান্টনমেন্টের শিখ সেনানায়ক, ঢাকার শিখ বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে। তাতে পরিষ্কারভাবে বলা আছে, আমরা অভ্যুত্থানে অংশ নিচ্ছি। ইংরেজদের গোলামি আমরা করব না। আপনারাও বিদ্রোহে অংশ নিন। বাঘাযতীন অনুকূল মুখার্জির হাতে চিঠিটা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “তুমি এটা নিয়ে এখনই ঢাকা রওনা দাও। কথা বলো শিখ রেজিমেন্টের সঙ্গে। আশা করি, ওরা আমাদের নিরাশ করবে না।”
এতটুকু সময় নষ্ট না করে অনুকূল ছুটলেন ঢাকায়। শিখ রেজিমেন্ট চিঠিটা পড়ে এক কথায় রাজি। এখন শুধু ডাক পাওয়ার অপেক্ষা। ওঁরাও ঝাঁপিয়ে পড়বেন এদেশ থেকে ইংরেজদের উৎখাত করতে।
কলকাতাতেও অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা সারা। ফোর্ট উইলিয়ামের সেনানায়ক মনসা সিং-এর সঙ্গে সব কথা হয়ে গেছে। বিপ্লব শুরু হওয়ার ইঙ্গিত পেলেই বিপিনবিহারী-নরেন ভট্টাচার্যরা দুর্গ আক্রমণ করবেন। আর তক্ষুনি মনসা সিং-ও অন্য ভারতীয় সেনাদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বেন দুর্গে থাকা ইংরেজ সেনাদের ওপর। হয় আত্মসমর্পণ করো, নয় মরো। বিদ্রোহ যে শুরু হয়েছে তা বোঝা যাবে হাওড়া স্টেশনে গিয়ে। যদি পাঞ্জাব মেল সময়ে না ঢোকে তাহলেই বুঝতে হবে পাঞ্জাবে ইতিমধ্যেই জ্বলে উঠেছে বিপ্লবের আগুন। ওখানকার বিপ্লবীরাই পাঞ্জাব মেল আটকে দেবেন।
কমাস আগেই হাবু মিত্র খবর এনেছিলেন যে শিগগিরিই রডা কোম্পানি অনেক মাউজার পিস্তল আমদানি করছে তিব্বতের দলাই লামার জন্য। শ্রীশ পাল এই ব্যাপারে খুব উৎসাহী ওঠেন। মূলত তাঁর উদ্যোগে অনেক প্ল্যান কষে ৫০খানা মাউজার পিস্তল আর ছেচল্লিশ হাজার রাউন্ড কার্তুজ বিপ্লবীরা গায়েব করে দিয়েছিলেন। তারপর ‘দাদা’ যতীন মুখার্জি সেই পিস্তলগুলো ভাগ-বাটোয়ারা করে পৌঁছে দিয়েছেন বাংলার বিভিন্ন গুপ্তদলের মধ্যে।
কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী এই কটা আগ্নেয়াস্ত্র মোটেই যথেষ্ট নয়। তাই বাঘাযতীনের চোখ অস্ত্র-বোঝাই জার্মান জাহাজের দিকে। ব্যবস্থা প্রায় পাকা। সুন্দরবনের রায়মঙ্গলে জাহাজ থেকে অস্ত্র নামিয়ে তিন জায়গায় পাঠানো হবে। একভাগ যাবে কলকাতায় বিপিন গাঙ্গুলি-নরেন ভট্টাচার্যদের কাছে। দ্বিতীয়ভাগ যাবে হাতিয়ার বরিশাল গ্রুপের কাছে। আর বাকিটা যাবে উড়িষ্যার বালেশ্বরে স্বয়ং বাঘাযতীনের কাছেই। উনি এই মুহূর্তে বালেশ্বরেই গা ঢাকা দিয়ে আছেন।
ঠিক হয়েছে, হাতিয়ার দল পূর্ববাংলা দখল করে কলকাতায় যোগ দেবে বিপিন গাঙ্গুলিদের সঙ্গে। কলকাতায় অন্তত হাজার পাঁচেক বিপ্লবী থাকবেন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেবেন আরও হাজার বিশেক ছাত্র-যুব। কলকাতায় ওঁরা ফোর্ট উইলিয়াম দখল করে এগিয়ে যাবেন উত্তর আর পশ্চিম দিকে। ওদিকে বাঘাযতীনের নেতৃত্বে উড়িষ্যা বা ছোটনাগপুরের বিপ্লবী আর কৃষকেরাও এসে যোগ দেবেন এঁদের সঙ্গে। সাঁওতালরাও বাদ যাবেন না।
সেই পেশোয়ার থেকে সিঙ্গাপুর, বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বিপ্লবের বীজ রোপণ হয়ে গেছে। সবাই যেন ফুটছে। একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটার অপেক্ষায়। বিপ্লবের অন্যান্য প্রস্তুতিও জোর কদমে চলছে। প্রতিটা সৈন্যের জন্য বানানো হচ্ছে ইউনিফর্ম। পাঞ্জাবে বানানো হয়েছে স্বাধীন ভারতের পতাকাও। চতুষ্কোণ সেই পতাকায় চারটি রঙ—হলুদ-লাল-নীল-সাদা, শিখ-হিন্দু-মুসলিম ও বাকি সব ধর্মের প্রতীক হিসেবে। যুদ্ধ ঘোষণার খসড়াও প্রায় প্রস্তুত। লিখেছেন রাসবিহারী নিজেই। ওদিকে পিংলে আর কর্তার সিং সেনা ছাউনিগুলোতে এতটাই প্রভাব খাটিয়ে ফেলেছেন যে তাঁরা দুজনে রীতিমতো সেনা-পোশাকে সেজে একটা শিবির থেকে আরেকটাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বেসামরিক লোক হলেও তাঁদের আগমন নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তুলছে না।
৭
১৯১৫ সালের ফেব্রুয়ারির আট তারিখ। কর্তার সিং আম্বালা ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছতেই সৎপাল সিং নামের এক বিপ্লবী ওঁর কাছে হাজির হলেন, “আপনার সঙ্গে একটু কথা আছে।”
“কী কথা বলে ফেলো সৎপাল।”
“এখানে নয়, আলাদা করে বলব।”
কর্তার সিং সৎপালকে ভালোই চেনেন। একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক মানুষ। সে যখন আলাদা করে কিছু বলতে চাইছে, তার মানে ব্যাপারটা গুরুতর। কর্তার তাই আর সময় নষ্ট করলেন না। ক্যান্টনমেন্টের পুবে যে ফাঁকা ঘরটা আছে, সেখানে চলে গেলেন সৎপালকে নিয়ে। কোনো ভণিতা না করে জানতে চাইলেন, “কী ব্যাপার বলো তো?”
“কৃপাল সিং নামে একটা নতুন ছেলে কাল আমাদের দলে ঢুকেছে। ও আমাদের এই আম্বালা ক্যান্টনমেন্টের সিপাই হনুমন্ত সিং-এর চাচার ছেলে। কৃপাল দলে ঢুকেই দেখছি একে-ওকে নানা কথা জিজ্ঞাসা করছে। আমার ওকে ঠিক সুবিধার মনে হচ্ছে না।”
“হুঁ। তা ওই কৃপাল সিং এখন আছে কোথায়?”
“একটু আগে ওকে হিম্মত সিং-এর সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি। এখনও মনে হয় ওর সঙ্গেই আছে।”
“বেশ। তুমি একটা কাজ করো। ওকে গিয়ে এখনই বলো, আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে চাই। খুব গোপন কথা আছে। ওকে এখন থেকে সর্বক্ষণ চোখে চোখে রাখবে আর ঘণ্টাখানেক বাদে গুরুদুয়ারের পাশে আমাদের যে ডেরাটা আছে, সেখানে নিয়ে যাবে। আমি ওখানেই যাচ্ছি।”
“ঠিক আছে, আমি এক্ষুনি যাচ্ছি।”
কর্তার সিং আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন না। ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে দ্রুত হাঁটতে শুরু করলেন। পিংলে একটু বাদেই এসে পড়বেন। পুলিশ কিছু একটা সন্দেহ করেছে। সত্যিটা জানবার জন্য ওরা বিপ্লবীদের মধ্যেই গুপ্তচর ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এখন যদি একুশে ফেব্রুয়ারির ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যায়, তাহলে এত পরিকল্পনা, এত প্রস্তুতি সব মাঠে মারা যাবে। না না, এরকম কিছু ঘটতে দেওয়া যাবে না।
গুরুদুয়ারের পাশে একটা ছোট্ট দোতলা বাড়ি। কর্তার সিং আর পিংলে ওখানে অপেক্ষা করছেন। সঙ্গে দলের আরও চার যুবক। এমন সময় সৎপাল সিং ঢুকলেন কৃপালকে সঙ্গে নিয়ে। কর্তার সিং আর পিংলের দিকে তাকিয়ে সৎপাল বললেন, “এই হল কৃপাল সিং। কাল ও আমাদের দলে যোগ দিয়েছে। ও হনুমন্ত সিং-এর চাচাতো ভাই।”
“হনুমন্তের সঙ্গে একটু আগে আমার কথা হল। ও বলল, ছেলেবেলা থেকেই নাকি তোমার বড়োলোক হবার খুব শখ। টাকা পেলে তুমি নিজের দেশের সঙ্গেও বেইমানি…” কর্তার কৃপালের দিকে ঘুরে কেটে কেটে কথাগুলো বললেন।
“এসব এক্কেবারে ঝুটা বাত। আমি কখনও কারোর সঙ্গে বেইমানি করিনি।” কৃপাল জবাব দিল।
“তাই? তাহলে গত কদিন ধরে রাতের অন্ধকারে তুমি কোতোয়ালিতে যাতায়াত করছ কেন? তুমি কি দারোগাবাবুর রিস্তেদার নাকি?”
এই প্রশ্ন শুনেই কৃপালের মুখ শুকিয়ে গেল। সে আমতা আমতা করে বলল, “আসলে…বাড়ির একটা ঝামেলা মেটানোর জন্য আমাকে দুদিন কোতোয়ালিতে যেতে হয়েছিল। আমি সত্যি বলছি…”
কৃপাল তার কথা শেষ করার আগেই কর্তার সিং একটা চকচকে ছোরা ধরলেন ওর গলায়। বললেন, “আর একটা মিথ্যা বললে নলি কেটে দেব। দারোগাবাবু তোকে কী জানতে আমাদের দলে ভিড়িয়েছে সত্যি করে বল।”
এই অবস্থায় কৃপাল আর সত্যি ঢাকতে পারল না। বলে ফেলল অনেক কথা। জানা গেল কদিন ধরেই আম্বালা পুলিশ সন্দেহ করছে যে এই সেনা শিবিরে কিছু একটা ঘটছে। তারা নিজেরা কয়েকজন সিপাইয়ের সঙ্গে কথাও বলেছে, কিন্তু কিছুই জানতে পারেনি। তাই এখন টাকা আর খেতাবলোভী কৃপাল সিং-কে পাঠিয়েছে সত্যিটা জানার আশায়। এবং কৃপাল ইতিমধ্যে জেনেও ফেলেছে যে আগামি একুশ তারিখ দেশ জুড়ে অভ্যুত্থানের ছক হয়েছে।
“একজন শিখ হয়ে কিছু টাকা আর খেতাবের জন্য তুই দেশের মানুষের সঙ্গে গদ্দারি করতে রাজি হয়ে গেলি? ছিঃ! তুই তো শিখ সম্প্রদায়ের কলঙ্ক।” সৎপাল সিং মন্তব্যটা করলেন।
কৃপাল সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আমি খুবই লজ্জিত। আমাকে ক্ষমা করে দিন। একটা সুযোগ দিন আমাকে প্রায়শ্চিত্ত করার। আমি কথা দিচ্ছি, আমি যা জেনেছি তা কিছুই কোতোয়ালিতে জানাব না।”
কর্তার সিং একথা শুনেই গর্জে উঠলেন, “খামোশ! আমাদের তুই কি বুদ্ধু পেয়েছিস? বাসুজি আমাদের বলে দিয়েছেন, গদ্দারকে কখনো বিশ্বাস না করতে।”
কর্তারের কথা শেষ হতে না হতেই পিংলে সজোরে আঘাত করলেন কৃপালের ঘাড়ে। সে তৎক্ষণাৎ জ্ঞান হারাল। কর্তার সিং এবার বাকি সহযোগীদের উদ্দেশে বললেন, “এখন লোকটাকে হাত-পা-মুখ ভালো করে বেঁধে দোতলায় ঘরে ফেলে রাখো। রাতে আমাদের একটা গাড়ি অমৃতসর যাবে। ওকেও এই অবস্থাতেই ঐ গাড়িতে চুপচাপ তুলে নিয়ে চলে যেতে হবে। খুব সাবধান, কাকপক্ষীও যেন টের না পায়।”
সৎপাল একথা শুনে বললেন, “সে নয় হল। কিন্তু দু’দিন বাদে কৃপালের তো কোতোয়ালিতে গিয়ে সব জানানোর কথা ছিল। ও যখন যাবে না, তখন দারোগাসাহেব তো ওর খোঁজ শুরু করবেন। তাতে পুলিশের সন্দেহ হয়ত আরও বেড়ে যাবে।”
“একথা তুমি ঠিকই বলেছ। আজ বিকালেই আমরা কাপলের সঙ্গে এই ব্যাপারে কথা বলব। দেখি কী করা যায়। তোমরা সবাই কিন্তু খুব সজাগ থেকো। আরও গুপ্তচর আমাদের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে। সকলে এই ক’টা দিন চোখ-কান খোলা রাখবে। জয় আমাদেরই হবে।”
একদিন পর কৃপাল সিং-এর মৃতদেহ পাওয়া গেল আম্বালার কাছে বড়ো রাস্তার ধারে। লোকজন জানল সে মদ খেয়ে একেবারে বেহেড হয়ে রাস্তা পার হচ্ছিল। একটা গাড়ি তাকে চাপা দিয়ে চলে গেছে।
হনুমন্ত সিং তাঁর চাচাতো ভাইয়ের এই দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে চলে গেলেন। দেখলেন, সেখানে দারোগাসাহেব গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। হনুমন্ত চাচাতো ভাইয়ের জন্য দারোগাবাবুর সামনে তো কেঁদে-কেটে একশা। তারপর চোখের জল মুছতে মুছতে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলেন হাসপাতাল থেকে। একটু দূরেই ওঁর জন্য পিংলে অপেক্ষা করছেন। ওঁরা দুজন এবার হাসিমুখে চললেন সেনা ছাউনির দিকে। পরিকল্পনা সফল হয়েছে। কৃপাল সিংয়ের মৃত্যুটা যে নিছক দুর্ঘটনাজনিত, তা দারোগাবাবুও বিশ্বাস করে নিয়েছেন। এবার লোকটা আরেকজন গুপ্তচর খুঁজুক। ততদিনে ২১ ফেব্রুয়ারি চলে আসবে।
৮
২১ ফেব্রুয়ারি সকাল। সিঙ্গাপুরের ফিফথ লাইট ইনফ্যানট্রিতে আছেন শিখ আর পাঠান সেনারা। ঐ সিপাইরা কুচকাওয়াজে আসতে অনেক দেরি করলেন। সুবেদার মেজর ডান্ডি সিং একেবারেই এলেন না। অতঃপর বড়ো অফিসারের ঘরে ডান্ডি সিং-এর ডাক পড়ল। ডান্ডি সিং অফিসারের ঘরে ঢুকলেন বুক ফুলিয়ে, সেলাম-টেলামের ধার ধারলেন না। ঐ ঘরে তখন দুজন মিলিটারি অফিসার। দুজনেই রেগে আগুন। প্রথমেই অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে একজন জিজ্ঞাসা করল, “তুম আজ প্যারেড মে কিউ নেহি আয়া?”
ডান্ডি সিং শান্তস্বরে জবাব দিলেন, “মেরি মর্জি।”
এই কথা শুনে সাহেব দুজনের তো রাগে ফেটে পড়ার অবস্থা। একজন চিৎকার করে বলল, “জানো, তোমাকে আমরা কী করতে পারি?”
ডান্ডি এবার নিজের রিভালবারটা বের করে বললেন, “তোমরা আমার আর কিছুই করতে পারবে না। কারণ তোমরা আর বেঁচেই থাকবে না।”
পরক্ষণেই গর্জে উঠল ডান্ডি সিং-এর রিভলবার। দুই ইংরেজ অফিসার মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ডান্ডি চকিতে বাইরে এসে ফল্-ইন-এর হুকুম দিলেন। ওঁর নেতৃত্বে ভারতীয় সিপাইরা এবার অস্ত্রাগারে হানা দিলেন। সেই অস্ত্র ভাগ করে দেওয়া হল সিপাইদের মধ্যে। দেশীয় সিপাইরা এবার ঐ ছাউনির সমস্ত ব্রিটিশ অফিসারকেই একে একে হত্যা করলেন।
এরপর রাস্তায় বেরিয়ে এলেন প্রায় আড়াইশ সেনা। তাঁরা বেছে বেছে সাহেবদের আক্রমণ করতে লাগলেন। সাধারণ মানুষের ওপর কিন্তু কোনো আঁচ পড়ল না। চারদিকে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গেল।
বেলা বাড়তে না বাড়তেই বার্মাতেও শুরু হয়ে গেছে বিদ্রোহ। অংশ নিয়েছে প্রায় পনের হাজার ভারতীয় মিলিটারি পুলিশ। কয়েকদিন আগে একদল বালুচ সৈন্য বোম্বাই থেকে রেঙ্গুনে পৌঁছেছিল। সেই দলের সোহনলাল, আলি মহম্মদ, কাশেম আলি প্রমুখের চেষ্টায় ঐ ১৩০ নম্বর বালুচ সৈন্যরাও বিদ্রোহে অংশ নিয়েছে। যে অল্প কজন ব্রিটিশ অফিসার আছে, তারা এখন নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত। কে কোথায় যে লুকিয়ে পড়ছে, তার ঠিক নেই। ভারতীয় সৈন্যরা তাদের খোঁজে চিরুনি তল্লাশি শুরু করেছে।
এদিকে দেশের অন্দরে পূর্ব-পরিকল্পনা মতো ২১ তারিখ প্রথম বিদ্রোহ করলেন পাঞ্জাবের ২৩ নম্বর ক্যাভালরির সেনারা। তারপর ২৬ নম্বর ক্যাভালরির সিপাইরা। রোল কলের সময় ভারতীয় সেনারা ব্রিটিশ অফিসার আর সেনাদের দিকে বন্দুক উঁচিয়ে ধরলেন। হয় আত্মসমর্পণ করো, নয় মরো। দু
’একজন বীরত্ব দেখাতে যেই না রুখে দাঁড়াবার চেষ্টা করল, সঙ্গে সঙ্গে রাইফেলের গুলি ফুঁড়ে দিল ওদের বুক। বাকিরা আর কোনোরকম প্রতিরোধের চেষ্টা করল না, মেনে নিল বশ্যতা। তাদের সকলকে বন্দি করা হল ।
এই দুটো ক্যাভালরিতে বিদ্রোহের সূচনাই ছিল দেশের ভিতরে অভ্যুত্থান শুরুর সংকেত। আর এই সংকেত পেয়ে দিল্লি ও লাহোরেও ঘটল সেনা বিদ্রোহ। এরপর একে একে অমৃতসর, মীরাট, সাহারানপুর, বেনারস—সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে লাগল বিদ্রোহের আগুন। কিছু জায়গায় ইংরেজ সেনারাও বন্দুক হাতে নিয়ে বিদ্রোহীদের লক্ষ করে গুলি চালাতে শুরু করল। কিন্তু সংখ্যায় কম হওয়ায় বেশিক্ষণ তারা টিকতে পারল না। বিপ্লবীরা ওদের একেবারেই রেয়াত করলেন না, ঝাঁঝরা করে দিলেন গুলিতে।
দিল্লিতে বিদ্রোহ শুরু হওয়ার খানিক পরেই বিপ্লবীরা হাওড়ামুখী পাঞ্জাব মেল আটকে দিলেন। সেটাই ছিল সঙ্কেত। যথাসময়ে পাঞ্জাব মেল কলকাতায় না পৌঁছতেই বাংলার বিপ্লবীরা বুঝে নিলেন উত্তরভারতে সেনা অভ্যুত্থান শুরু হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি আর নরেন ভট্টাচার্য সদলবলে তাঁদের কাছে যা অস্ত্রশস্ত্র আছে সেসব নিয়ে ফোর্ট উইলিয়াম আক্রমণ করলেন। এই দুর্গ ইংরেজদের দম্ভের প্রতীক। অতএব বিদ্রোহের শুরুতেই সেই দম্ভ চুরমার করে দিতে হবে।
দুর্গের শিখ সেনাপ্রধান মনসা সিং-এর সঙ্গে আগেই কথা হয়ে গিয়েছিল। এবার বিপ্লবীদের সঙ্গে তিনিও নিজের বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ইংরেজ সেনাদের ওপর। দশম জাঠ রেজিমেন্টও বিদ্রোহের শরিক হয়েছে।
ব্রিটিশ অফিসার বা সেনারা এই আকস্মিক আক্রমণে এতটাই হকচকিয়ে গেল যে তারা সেই অর্থে কোনো প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারল না। বিপিনবিহারী-নরেন ভট্টাচার্যরা ফোর্ট উইলিয়ামে উড়িয়ে দিলেন সেই চতুষ্কোণ স্বাধীনতার পতাকা যার মাঝখানে জ্বলজ্বল করছে ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরীয়সী।’
৯
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গোটা বাংলা জুড়ে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ল। বিদ্রোহের সেই আঁচ গিয়ে পড়েছে আসাম, বিহার, উড়িষ্যাতেও। রাঁচি-ছোটনাগপুরের ওঁরাও সম্প্রদায়ের যুবকেরাও রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে। বাঘাযতীনও তাঁর চার সঙ্গী চিত্তপ্রিয়, মনোরঞ্জন, নীরেন আর জ্যোতিষকে নিয়ে কাপ্তিপদার জঙ্গল ছেড়ে চলে এসেছেন বালেশ্বরে। উনি দেখছেন, গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে দলে দলে সাধারণ মানুষ এবার রাস্তায় উঠে আসছে। তাদের সকলের মুখে ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি। এই দৃশ্য দেখে বজ্রকঠিন মানুষটার চোখও ভিজে উঠল জলে। উনি সঙ্গীদের নিয়ে মিশে গেলেন সেই মানুষের ভিড়ে।
ওদিকে দিল্লির রাস্তাও তখন বিপ্লবী ও বিদ্রোহী সেনাদের দখলে চলে গেছে। ইতিমধ্যেই জেল ভেঙে মুক্ত করা হয়েছে বসন্ত বিশ্বাস, আমিরচাঁদ, বালমুকুন্দ, অবোধবিহারীদের। ওখানেও এবার বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। গ্রাম থেকে কৃষকের দল আসছেন মিছিল করে। কর্তার সিং আর পিংলের এই সাধারণ
খেটে
-খাওয়া মানুষগুলোকে দেখে মনে পড়ে যাচ্ছে তাঁদের নেতা রাসবিহারী বসুর কথা। উনি মাঝেমধ্যেই রবীন্দ্রনাথ উদ্ধৃত করে সহযোদ্ধাদের উদ্দেশে বলতেন, “ঘণ্টা যখন উঠবে বেজে / দেখবি সবাই আসবে সেজে।”
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। এই মুহূর্তে দিল্লির রাজপথ মানুষে মানুষে ছয়লাপ। সেনা-বিপ্লবীদের থেকে ছাত্র-যুব-শ্রমিক-কৃষকদের আর আলাদা করা যাচ্ছে না। তাঁদের কারো হাতে চতুষ্কোণ পতাকা, আবার কারোর মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশের দিকে তুলে ধরা। ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে দিল্লির আকাশ-বাতাস। আরেকটু আঁধার নামতেই ঐ মানুষগুলোর হাতে উঠে এল জ্বলন্ত মশাল। তাঁরা এবার মাথা উঁচু করে চলতে শুরু করলেন লাহোরের পথে। সেখানে তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছেন রূপকথার এক নায়ক। হাতে তাঁর নতুন জাতীয় সরকারের ঘোষণাপত্র।
লেখার শুরুতে ব্যবহৃত অলঙ্করণটি হার্ডিঞ্জের ওপরে বোমা ফেলবার ছবি। ১৯১৩ সালে ইতালিয়ান পত্রিকা লা ট্রিবুনা ইলাসট্রাটা পত্রিকায় এটি প্রকাশিত হয়। শিল্পীর নাম অজানা।
