বাবাকে না পাঠানো চিঠি
বাবা,
এই চিঠি তোমায় লেখার কথা ছিল ২০১১ সালে। কিন্তু সেই বছরের মে মাসের ঐ যুক্তি বুদ্ধি লোপাট করে দেওয়া ঘটনাগুলোর ধাক্কা সামলাতে অনেকগুলো দিন লেগে গেল। আমরা সকলেই ভেতরে ভেতরে জানতাম বামফ্রন্ট পড়ে যাবে। মৃত্যুপথযাত্রীর প্রাণপণে টানা শেষ নিশ্বাসটাও শুনতে পাচ্ছিলাম অনেকেই। তবুও বুকের ভেতরটা এক লহমায় খালি হয়ে গিয়েছিল সেদিন। মনে হয়েছিল, পায়ের তলার মাটি খুঁজতে গেলে হাওয়ায় ভর করে ভেসে বেড়ানো ছাড়া আর কিছু করার নেই বেশ অনেকটা সময় জুড়ে। তখনই ভেবেছিলাম, এ চিঠি লিখব তোমায় ।
কাকেই বা লিখতে পারি, তোমাকে ছাড়া? যে তুমি প্রতিটা নিঃশ্বাসের সঙ্গে বলে ওঠো পার্টির কথা।যে বিশ্বাস করত যে কখনও না কখনও লাল কেল্লায় লাল নিশান উঠবেই। সেই লাল ঝান্ডার ব্যর্থতার কথা ভাগ করে নিতাম কার সঙ্গে? আমার বিশ্বাসের ভিত্তিটা এতই দুর্বল, যে এই কঠিন সময়েও তাই মুখ ফেরাতে হচ্ছে তোমার দিকেই। আবার অন্য দিক দিয়ে দেখতে গেলে, এই চিঠি লেখার তো কোনও মানেই হয় না, তাই না? কারণ তুমি সারাজীবনের পার্টি-অন্ত প্রাণ এক রাজনৈতিক কর্মী। আর আমি নিজের বিশ্বাস, আস্থা সব কিছু নড়বড়ে হতে হতে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন এক প্রান্তবাসী যুবক, এই পশ্চিমবঙ্গের কোনও রাজনৈতিক দলেই যার প্রশ্নহীন স্থান হয়নি। সে কী করেই বা প্রশ্ন করবে তোমাকে, অভিযোগের আঙুল তুলে ধরবে সব ভুলের জন্য, অপরাধের বিচার করবে উত্তরপুরুষের কাঠগড়ায়? তবুও, কিছু কিছু কথা লিখে রাখতে হয়। না হলে হারিয়ে যায়। আঙুলটাকেও তুলে ধরতে হয়, নাহলে কোথায় যাবে আমাদের ব্যক্তিগত গাদাবন্দুক প্রচেষ্টা,হোক না সে যতই তুচ্ছ, এই সংকটকালে?
***
‘কৌন সা ঝান্ডা বে?
*
লাল ঝান্ডা!
ভাগ শালা! ঠিক সে বোল!
হালাল ঝান্ডা!’
তোমাকে কখনও বলা হয়ে ওঠেনি, আমার প্রথম তোমার সঙ্গে স্মৃতি বেহালার কে এফ আর মাঠে। বামফ্রন্টের মিটিং হয়েছিলসেই আশির দশকের গোড়ায়। জ্যোতি বসু ছিলেন। আমি তোমার কাঁধে চেপে গিয়েছিলাম। আর মিটিং শেষে সকলে তাদের হাতে পাকানো খবরের কাগজে আগুন জ্বালিয়ে মশালের মত তুলে ধরেছিল গোটা মাঠ জুড়ে। যেন লক্ষ লক্ষ আগুনপাখি উড়ে বেড়াচ্ছে। তুমিও করেছিলে। সেই শিশু বয়েসে দেখা অত আগুন আমি কোনওদিন ভুলতে পারিনি। আমার ভয় লেগেছিল। শক্ত করে মুখ গুঁজে দিয়েছিলাম তোমার কাঁধে। আর তুমি হাসতে হাসতে বলেছিলে “ধুর পাগল, ভয় কিসের? এরা সকলে বন্ধু লোক”। সেদিন মনে হয়েছিল, আমাদের এত এত বন্ধু? মজা হয়েছিল না অবাক হয়েছিলাম, আর মনে নেই। কিন্তু আমার সব গল্পগুলোর শুরু ঐ দিনটার থেকেই।
তোমার কি মনে আছে সেই দিনগুলোর কথা? ভুলে যাবার কথা নয় অবশ্য, যদি না সময়ের পলি তোমায় আচ্ছন্ন করে দেয়। সেই যুব সংগঠনের দিনগুলো? আমায় কাঁধে নিয়ে মিটিং মিছিল যাওয়া? ব্রিগেড? পার্টির বুক স্টলে আমায় বসিয়ে রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা? সত্তরের একটার পর একটা কিলিং, হানাহানি, খোঁচড়বাজি আর হিমেল সন্ত্রাসের ক্ষত আস্তে আস্তে শুকোতে শুরু করেছে। গোটা সত্তর বাড়িছাড়া থেকে, নব যুব কংগ্রেসের সংগে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে এবং তাদের বুলেট শরীরে ধারণ করে ঘরে ফিরছে স্বপন চক্রবর্ত্তী (বাবলু), মানব সান্যালের (অমু) মত কমরেডরা। কংগ্রেসিরা মুখ লুকোতে ব্যস্ত। বেহালার হিরো তখন নিরঞ্জন মুখার্জি, যিনি ঐ দুঃসময়েও কাউন্সিলার থেকে বুক দিয়ে পার্টিটাকে আগলেছেন। হিরো হলেন রঘুনাথ কুশারী, যাঁর টালির চালের ছোট্ট ঘরের সঙ্গে কিছুতেই মেলানো যেত না তাঁর হৃদয়ের পরিসর। হিরো তখন হরিদাস মালাকার। ঊষা কোম্পানির সংগ্রামী শ্রমিক নেতা। কোর্টে তাঁর বিরুদ্ধে রাশি রাশি জঙ্গিপনার কেস। সেই কমরেড মালাকার এরকমই একটা কেসে আসামির কাঠগড়ায় উঠে অবলীলায় পকেট থেকে বিড়ি বার করে কোর্টের মধ্যেই ধরালেন। উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল মানুষ। কারণ কোর্ট বা পুলিশ তখনও ঘূণিত। মানুষের চোখে কংগ্রেসের তল্পিবাহক।
ভোলা মুখার্জিদের গুন্ডারাজ নিমেষে উধাও। বেশিরভাগ কংগ্রেসি গুন্ডা পাড়া ছাড়া। বাস্তবে জ্যোতিবাবুরা প্রতিহিংসার রাজনীতি না নেওয়ার কথা বললেও অনেকেই সেই কথায় আস্থা রেখে ফিরতে পারেনি। পার্টিকর্মী অমল হোম স্কুল খুলছেন দুঃস্থ বাচ্চাদের জন্য। সেই স্কুল পরে হোম’স কেজি নামে প্রসিদ্ধ হবে। পার্টি নাগরিক কমিটি তৈরি করছে। ঢোলা পাজামার উৎপল দত্ত সেখানে এসে বলছেন নাটক দেখাবেন। তারপর ভুলে যাচ্ছেন। মাঠে নামছেন গোপাল ঘোষ, অজয় ভট্চাজের মত পুরনো ও দীক্ষিত কর্মীরা। এঁরা সত্তরের একটা বড় সময় জুড়ে পাড়া ছাড়া ছিলেন। গোটা বেহালা জুড়ে সেই সময় কাজ চলছে। বিজ্ঞান মঞ্চ, মেলা, ছোটখাট বইমেলা, সব কিছুর মধ্যে পার্টির উপস্থিতি প্রবল। সমর রায়চৌধুরী প্রাচীন বটের মত আঁকড়ে আছেন সখেরবাজার। পর্ণশ্রীর যুক্তিবাদী শাখার অনুষ্ঠানে এসে গেয়ে যাচ্ছেন সলিল চৌধুরী। পথশিশুদের নিয়ে জোছন দস্তিদার নাটক করলেন। রবিবারের দুপুরে ডায়মন্ড হারবার রোড থামিয়ে সেই নাটক মঞ্চস্থ হল। সভায় তখন নির্মল মুখার্জি, জনার্দন বিশ্বাস। ফোটো থেকে মুচকি হাসিতে সদ্যপ্রয়াত প্ৰমোদ দাশগুপ্ত৷
আর এই সব কিছুর মধ্যে প্রবল হয়ে থাকছে তোমার মত মানুষজনের উপস্থিতি। সেটাই স্বাভাবিক ছিল, কারণ পূর্ববঙ্গ থেকে সব কিছু হারিয়ে আসার রিফিউজি বেদনার আকাশে ছাতা হয়ে আর দাঁড়াতে পারত কেই বা, পার্টি ছাড়া? নিম্নমধ্যবিত্তের শ্রেণীচেতনায় তাই পার্টি আর বেঁচে থাকা সমার্থক হয়ে উঠেছিল। প্রশান্ত শূর যখন আজাদগড় যেতেন, বাঙাল বাড়ির মহিলারা শুনেছি তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতেন শাঁখ বাজিয়ে। পার্টি স্টলে রুটি আলুর দম বিক্রি থেকে শুরু করে ব্রিগেডের মাঠে পত্রিকা নিয়ে বসে যাওয়া অন্য কমরেডদের সাথে, আবার নাগরিক কমিটির মিটিং, সবেতেই তখন তুমি এবং তোমরা।
শুনেছি, তখন আমার জন্ম হয়নি, নিরঞ্জন মুখার্জিরা যখন সত্তরের সেই রক্তাক্ত দিনগুলোতে প্রকাশ্যে মিটিং করতে পারছেন না, পার্টি অফিসগুলো বন্ধ, তখন রাতের পর রাত মিটিং হত আমাদের ঐ একচিলতে ভাড়াবাড়ির উঠোনে। সাতাত্তরের ভোটের আগে স্থানীয় ক্লাবের উদ্যোগেই গোপনে প্রচার চালানো হয়েছিল বাড়ি বাড়ি গিয়ে, ছড়ানো হয়েছিল লিফলেট। লোকাল কংগ্রেসিরা জানত। বিশেষ ঘাঁটায়নি।
আশি নব্বইয়ের দশকে ভোট মানে আমার কাছে উৎসব। সারাদিন তোমার সঙ্গে বসে থাকা লাল পতাকা জড়ানো বুথে। তোমাদের দমকে দমকে চা, রুটি আলুরদমের মধ্যেই আমি এই কাকু ঐ জেঠুর হাত ধরে গুটিয়ে কখনও পাশের পাড়া, কখনও বা সাইকেলের ক্যারিয়ারে চেপে গোটা পূর্ববেহালা টইটই। সেদিন কেউ বকার নেই।পড়তে বসতে বলার নেই। কারণ, উৎসবের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে যে! দুদিন বাদেই তো রেজাল্ট! আর তখন মোড়ে মোড়ে সস্তা কাগজে হাতে লেখা ‘লাল সেলাম’ পোস্টার অথবা মিছিলের ধুমধাড়াক্কা ।
এবং গোটা বেহালা অঞ্চলে নকশাল বনাম সিপিআইএম দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক বিষয়ে আমার আরেকটা স্মৃতি আছে। সেটা একটু অদ্ভুত। কিন্তু পরে ভেবে দেখেছি হয়ত সমস্ত তত্ত্ব এবং পুঁথিগত নির্যাসের পরেও ওটুকু স্মৃতিই সত্য। নব্বইয়ের শুরুতে আমাকে নিয়ে এক বিকেলে তুমি বেড়াতে গিয়েছিলে সেনহাটি কলোনির ধারে। সেখানে এক মস্ত ঝিল আছে। সেই ঝিলের পাশে বসে তুমি কাঁদছিলে।কারণ এখানে তোমরা আড্ডা মারতে রাতের পর রাত। আর সেই সব বন্ধুরা হারিয়ে গেছে। এখানেই একটা ব্যায়াম সমিতি ছিল, যেখানে তোমার সঙ্গে ব্যায়াম করতে আসত বেহালার নাম করা নকশাল নেতা এবং পরে কংগ্রেসিদের হাতে নিহত অনিল মুখার্জি (নীল)। তোমরা খুব গরিব ছিলে। পকেটে সবসময় টাকাপয়সা থাকত না। নীল একবার তোমাকে ক্লাবের পিকনিকে যাবার জন্য দশ টাকা ধার দিয়েছিল। সেটা ফেরত দেওয়া হয়নি। কারণ তার কিছুদিনের মধ্যেই ও খুন হয়। তুমি নীলের নাম করে কাঁদছিলে সেদিন। কাঁদছিলে আরেক নিহত নকশাল বন্ধু সাগরের (অমিয় চট্টোপাধ্যায়) কথা মনে করে, যে যাবার আগে তোমাকে বলে গিয়েছিল “আবার দেখা হবে বন্ধু”। সাগরকে পুলিশ আলিপুর জেলে পিটিয়ে মারে। একজন বয়স্ক মানুষ তাঁর শিশুপুত্রের সামনে তাঁর নিহত বন্ধুর জন্য কাঁদছেন এটা যত না আশ্চর্যের, তার থেকেও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল যে সেই নিহত ব্যক্তিরা প্রতিপক্ষ রাজনীতির ছিলেন। আজকাল ভেবে দেখলে মনে হয়, ভ্রাতৃহত্যার রাজনীতি নিয়ে যতই মনস্তাপ করি না কেন, ‘হত্যা’র আগে অবধারিতভাবেই ‘ভ্রাতৃ’শব্দটাই বসে। এই পৃথিবীর কোথাও কোনওদিন শত্রুহত্যার রাজনীতি নিয়ে মানুষ হাহাকার করে নি।
আর এরই মধ্যে দিয়ে একটা একটা করে দিন এগোচ্ছিল বেইমানির বেনোজলস্রোতের দিকে। তোমরা কেউ বোঝোনি। বাতাসে তখন ফিসফিস করে মমতা ব্যানার্জী বলে একটা বাচ্চা মেয়ের নাম উচ্চারিত হচ্ছে এখানে সেখানে, তা সেই বা কতটুকু! মেয়েটা নিজেই তো আমাদের মালিনীদির কাছে যাদবপুরে হেরে ভূত হয়ে গেল! পাড়ায় পাড়ায় তখনও উত্তাল স্ট্রিট কর্নার, রোড শো। নিরঞ্জন মুখার্জি বৃদ্ধ হচ্ছেন। উঠে আসছে নতুন ছেলেমেয়েরা। তুমি বিড়ি ছেড়ে সিগারেটের দিকে যাচ্ছ। মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলের ট্রেড ইউনিয়ন নেতা অজয় চৌধুরী (পরে পার্টি থেকে এক্সপেলড হবেন) তোমার কাছে বিড়ি চাইলে একটু সংকোচের সাথে জানাচ্ছো যে বিড়ি খাও না। অমর হাঁ করে চেয়ে থেকে বলছেন ‘তাহলে পার্টি করছিস কেন?’
একানব্বই সালে যেদিন লালু আলম লাঠির বাড়ি মেরে মমতার মাথা ফাটাল, আমার মনে আছে তোমার মত অনেকেই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছিল। কারণ লালু ছিল বাদশাদার ভাই। সেই বাদশা আলম, গোটা দক্ষিণ কলকাতায় যার মত সংগঠকের জুড়ি খুঁজে পাওয়া ভার ছিল। সেই বাদশা, মেঠো ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা বাদশাদা যে কখনও কোনও লড়াইতে পিঠে মার খায়নি। কংগ্রেসিদের ছুরি খেয়েও যে লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে পালায়নি কখনও। তখন জেলা কমিটির সদস্য সেই বাদশার ভাই এবার অভিযুক্ত। জ্যোতি বসু বিধানসভায় দাঁড়িয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন “এত বড় অডাসিটি? কী ভেবেছে কী? কে লালু? এখনই ওকে গ্রেপ্তার করুন”। জ্যোতি বসুর পক্ষে সম্ভব ছিল না লালু আলমকে চেনা। পার্টি বাধ্য হয় এক্সপেল করতে।
এর কিছুদিনের মধ্যেই বাদশাও এক্সপেলড হবে। কসবার সিপিএম নেতা বাবলু (স্বপন) চক্রবর্ত্তী,কংগ্রেসিদের হাতে মার খেয়ে এবং মেরে যে প্রায় গোটা সত্তর জুড়ে হয়ে উঠেছিল বেহালার কিংবদন্তী, যার ভুল মৃত্যু টিভিতে প্রচার করার পর প্রিয়রঞ্জনের গুন্ডারা হাসপাতালে হানা দিয়েছিল খবর যাচাইয়ের জন্য, এবং পাঁচখানা গুলির একটা এখনও যার শরীরের মধ্যে রয়ে গেছে, সেই বাবলুও এক্সপেলড হবে খুব তাড়াতাড়ি। বাদশা, সুমন্ত হীরা এবং বাবলু মিলে তৈরি করবে মার্ক্সবাদী মঞ্চ, যার সভার দিনে সিপিএমের ছেলেরা গিয়ে সভা ভাঙচুর করে যখন বাদশাকে এক ধাক্কায় মাটিতে ফেলে দেবে, বাদশা অবাক আহত বিস্ময়ে পুরনো কমরেডদের দিকে তাকিয়ে বলবে “তোরা আমায় মারলি?” কিন্তু সেসব পরের কথা। ততদিনে এক্সপেলড বাদশাদা কমিউনিস্ট পার্টির পরম্পরা বহন করেই তোমাদের কাছে ভিলেন হয়ে গেছে।
বাবলুদা এখন তৃণমূল করে। যাদের পিস্তল থেকে ছোঁড়া গুলিটা এখনও শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছে,আজকাল তাদের সভাতেই বক্তৃতা দেয়৷ বাদশাদা কী করে, জানি না। হয়ত কিছুই না। হয়ত অনেক পার্টি। যাদের কারোর কারোর নাম বিজেপি!
সময়ের পলি জমছে, খুব মারাত্মক, বিশ্বাসঘাতক পলি, যা অনেক ত্যাগ, অনেক লড়াই ভুলিয়ে দেয়।
***
‘বিংশতি কংগ্রেস, না কি আরও আগে শুরু অধঃপাত?
কেন্দ্রের চক্রান্ত আছে, সেই সংগে বিদেশের হাত।
এসব প্যাচাল ভাল, বিশ্লেষণে খুলে যায় পথ।
তা বলে কি দেখব না পচে যাচ্ছে নিজেরই শপথ?”
ভেবে অবাক লাগে, গোটা নব্বই জুড়ে তোমরা কি কিছুই বোঝোনি, কোথায় কোথায় লুকিয়ে ছিল দক্ষিণী চোরাস্রোত? আস্তে আস্তে পুরনো মুখগুলো সরতে শুরু করেছিল। ঢুকে পড়ছিল নতুন,অচেনা মুখ, যাদের জীবনে কখনও কেউ পার্টির ধারেকাছে দেখেনি। প্রোমোটার ঠিকাদারদের মুখের হাসি তখন আস্তে আস্তে কান এঁটো করার দিকে এগোচ্ছে। এঁটো হয়ে যাচ্ছে গোটা পার্টিটাই। সত্তরের পালিয়ে থাকা নেতার তিনতলা বাড়ি উঠছে। স্ত্রীয়ের গলায় তিনভরি সোনার হার। অটো ইউনিয়নের সংগ্রামী নেতার নামে বেনামি ফ্ল্যাট। সত্তরের ঘূর্ণিত পুলিশ তখন খুব কাছের ভরসা করার মতন মিত্র। সালকিয়া প্লেনামের সূত্র ধরে তখন পাড়ায় পাড়ায় ক্লাব পুজো কমিটি লাইব্রেরি থেকে সর্বত্র ইনফিলট্রেট করার প্রবল চেষ্টা। তখনও তোমরা বোঝোনি, এটা করতে গিয়ে উল্টে পাৰ্টিটাই ইনফিলট্রেটেড হয়ে যেতে পারে! বিরানব্বই ডিসেম্বরের মানববন্ধনের দিন যখন বেহালারই কিছু উঠতি নেতা মিলে দল পাকালো পাশের পাড়ার মুসলিম ছেলেটিকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য, সেদিনকেও তাদের শুধুমাত্র ধমকেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তাড়িয়ে দেওয়া হয়নি। চিহ্নিত করে দেওয়া হয় নি সকলের সামনে। ঠিক কোথায় লুকিয়ে ছিল দুর্বলতা?
এই সব কিছুর জন্যই আমি তোমাকে এবং তোমাদের দায়ী করছি। পার্টির বিপর্যয় কোনও সিঙ্গুর বা নন্দীগ্রাম থেকে আসেনি। এসেছে অনেক আগে থেকে। সেই নব্বইয়ের মারণব্যাধি থেকেই। মোড়ে মোড়ে গজিয়ে ওঠা শনিমন্দিরের পাশে চোলাই আর সাট্টার ধুম, আর সেখান থেকে নিয়মিত বখড়া পার্টি অফিসে চলে যাবার সময় থেকে। সালকিয়া প্লেনামের বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত থেকে। এসবের মধ্যে দিয়েই শপথ পচে গেছে তোমাদের। আর এ সবই হয়েছে রাজনীতির নামে।সেই রাজনীতি, যা করতে গিয়ে নর্দমার ধারে লাশ হয়ে থাকা যাদের ভবিতব্য ছিল তারাই সময়ের সঙ্গেসঙ্গে মাফিয়া হয়ে উঠেছিল!
মুশকিল বাধে শপথ ভুলে যাওয়া দেখে নয়। কারণ ভুলে গেলে মনে করানো যায়। মুশকিল হয় যখন দেখি শপথ পচে যাচ্ছে। পচা মৃতদেহে প্রাণসঞ্চার করা অসম্ভব ব্যাপার। যদি দেখি, ক্ষমতা আমূল পরিবর্তন করে দিচ্ছে সর্বত্যাগীদের, আর সব থেকে বিপজ্জনক, যদি দেখি যে যারা ক্ষমতায় না থাকার কারণে এখন সন্ন্যাসী তারাও ক্ষমতায় গেলে একইভাবে বিপজ্জনক হয়ে উঠবে, তখন সব গুলিয়ে যায়। বিশ্বাস চেতনা যুক্তি এগুলো সরল এবং নিখুঁত ক্লাসিফিকেশনের খোপে আর আটকা পড়ে থাকতে চায় না। তখন কোন অস্মিতার কাছে রাখব নিজের আস্থা? কোন সে লুটেপুটে খাবার মাধ্যাকর্ষণহীন পরিসর, যেখানে আমরা নিরাপদ?
কোনও উত্তর নেই তোমার কাছে, জানি। কারণ তুমি আমার থেকেও বেশি হতাশ। ভেঙে পড়েছ ভেতরে ভেতরে। রেজাল্ট বেরোবার দিন সারাদিন কিছু খাওনি তুমি শুয়েছিলে চুপচাপ নিজের ঘরে, চোখে হাত রেখে আজ পার্টির পরাজয় মানে শুধু তো একটা রাজনীতির পরাজয় নয়৷ পাৰ্টি হেরে যাওয়া মানে তোমার লড়াই, আমার বেড়ে ওঠা, আমার ছোটবেলা এবং আমার নব্বই এই সবকিছু মিথ্যে হয়ে যাওয়া। আমার বামপন্থার গল্পটা আসলে তোমার গল্প, কারণ আমার কাছে সিপিএম মানে তুমিই। আর তাই, সেই বামপন্থার ব্যর্থতার জন্যও আমি দায়ী করব তোমাকে। কোনও উত্তর তোমার কাছে নেইএটা জেনেও।
অনেকবার ভাবার চেষ্টা করেছি, তোমাকে না পাঠানো এই চিঠি শুধুই কি নব্বইয়ের পার্টি এবং বিগত বামপন্থা নিয়ে হাহুতাশ হবে? তোমাকে দায়ী করেছি মনে মনে। কাঠগড়ায় তুলেছি। আবার সান্ত্বনাহীন আঘাতে উদ্বেল হয়ে কলম তুলে নিয়েছি তোমারই উদ্দেশ্যে। মানসচক্ষে বেশ দেখতে পাচ্ছি এখন তোমাকে। এক কাপ চা নিয়ে হয়ত বসে আছ বারান্দায়। দৃষ্টি দূরে নিবদ্ধ। চুলগুলো আরেকটু পেকেছে। মুখের বলিরেখার সংখ্যা আরেকটু বাড়ল। চশমার পাওয়ার বেড়েছে। বেশ কষ্ট করেই কাগজ পড়তে হয়। লুংগিটা ছিঁড়ে গেছে। সেলাই করতে দিতেও মন উঠছে না। আর বিশেষ বেরোও না বাইরে। মিটিং মিছিলেও যাও না। নিজেকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছ অন্য এক প্রান্তের দিকে, যেখানে শুধু চাপ চাপ অন্ধকার জমে নিস্তব্ধতা।
– যেরকম হয় তাহলে নব্বইয়ের বেহালা টালিগঞ্জ যাদবপুরের এই পার্টির পরিবৃত্তের গল্পটা আসলে কী ছিল?কেমন ছিল তোমার এবং তোমাদের গল্পটা? কেউ দলছুট, কেউ নিরলস, কেউ বা ক্লান্ত, কেউ নিস্পৃহ ইতিহাসে। যেরকম ভাবে মাকন্দো গড়ে উঠেছিল, এবং ভেঙ্গে গিয়েছিল। কলেজের গণ্ডী না ডিঙোনো রিফিউজি জীবন। ঘোর দারিদ্রের মধ্যে সবকিছু ছেড়ে ঝান্ডা হাতে পথে নামা। আবার হয় তো শান্তিকল্যাণ এলে নিশ্চুপে কোটরে ফিরে আসা। কংগ্রেসি গুণ্ডাদের আক্রমণে ফেলে আসা ধ্বস্ত ঘরদুয়ার। সাদা লাল মলাটে দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন। পার্টি অফিসে জড়ো হতে থাকা ফড়ে দালালদের ছায়াপুঞ্জ। এই যৌথ ইতিহাসের উত্তরাধিকার, এই অতিকথা, কাহিনি এবং প্রবাদ আমি তুমি আমরা, এই পরিবৃত্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রত্যেকে বহন করি। আপাতত উল্টোপথে চলা প্রাক্তন কর্মী, বা ক্রমশ নির্জন অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া বৃদ্ধ কমরেড,কিম্বা ইদানীং ডান বা বাম কোনওদিকেই না থাকা সফল পুরুষটি, কেউই এই উত্তরাধিকার থেকে মুক্ত হতে পারি না ।
বাবা, পিতৃপ্রেম এবং পিতৃদ্রোহ হাত ধরাধরি করে চলে কি? কারামাজভ ভাইয়েরা মনে হয় সেটাই শিখিয়ে গিয়েছিল। এই চিঠিতেও হয়ত ধরা থাকল সেটুকুই। আর পিতার আসনে যখন পার্টিকে বসানো হয়, তখন সেই পিতৃদ্রোহই কি বদলে যায় পার্টিদ্রোহতে? আমি বা তুমি, কেউই কি আসলে কিছুই বদলাতে পারি না? শুধু প্রতিকারহীন ক্ষোভ জানিয়ে যাওয়া ছাড়া আমার যেমন কিছুই করার নেই, তোমারও কি তাই? নীরব হয়ে থাকা ছাড়া বলার নেই কিছুই? আসলে যে কিছুই পারি না, দ্রোহের শেষে সেই নতজানু হয়ে দাঁড়াতে হয় অভ্যাসের সামনেই, তার কথাই কি ধরা পড়ে গেল এই চিঠিতে? থাক, ধরা থাক!
