নিশিরাত জোড়াচাঁদ আকাশে
সে ছিল আমাদের কিশোর বয়েস। উঁচু ক্লাস, যাকে বলে টিনকাল গিয়ে যৌবনকাল আসার সময়। সে বয়েসে কত কী ঘটে! ঢাকুরিয়া লেকে হঠাৎ খুচরো চুমুর দ্বিধা থরথর অমরাবতীর পাশেই সযত্নে লুকনো থাকে রঙিন চটির ছেঁড়াখোঁড়া মলাট। প্রথম সিগারেট টানার রোমাঞ্চ। হঠাৎ করে নারীশরীরে উন্মুক্ত ব্রায়ের স্ট্র্যাপ দেখে শিরশিরানি জলে ভাসিয়ে দেয় সোনার যৈবন। এই সেই বয়েস, নব্বইয়ের শেষভাগ, যখন অনায়াসে বিশ্বাস করা যায় যে মড়ার খাটের নিচে বোমা রেখে আসলে তা একদিন গোটা শ্মশান উড়িয়ে দেবে। সেই বয়েসে রিটা হেওয়ার্থের অর্ধ অনাবৃত পোস্টার পরম মমতায় আগলে লুকিয়ে রেখেছিল আততায়ীর পালানোর সুড়ঙ্গপথ। আমাদের রিটা হেওয়ার্থ ছিলেন মুনমুন সেন, যিনি আদরে মমতায় একটা গোটা জেনারেশনের অপরাধী কৌতুহলের গোপন সুড়ঙ্গপথ আগলে রেখেছিলেন। শরীরী বিভঙ্গে এবং ঘিরে থাকা মিথ-মিথ্যের আলোছায়ার জটিল কাটাকুটির নকশা আমাদের চোখের সামনে মেলে ধরেছিলেন। আমরা বিশ্বাস করতাম পৃথিবীর কোনও এক হারিয়ে যাওয়া সিনেমার আর্কাইভে একদিন না একদিন খোঁজ মিলবেই মুনমুন সেনের ব্লু ফিল্মের।
মাঝেমাঝেই স্কুল বা কলেজের অফ পিরিয়ডের আড্ডায় কথাটা উঠত এরকমভাবে, যে আমাদের কোনও এক বন্ধুর দাদার রুমমেটই নাকি সেই পানু দেখেছে। সন্দেহ প্রকাশ করলে কেউ একজন নাক কুঁচকে জানাত “আরে জর্জ বেকারের সংগে, জানিস না?” কিন্তু কোথায় পাওয়া যাবে সেই জিনিস? দক্ষিণ কলকাতার গলিঘুঁজি দোকান তন্নতন্ন করে খুঁজে পাওয়া যায়নি। মাঝে মাঝেই গড়িয়াহাট মোড়ে গিয়ে আধবুড়ো দোকানদারকে ঢোঁক গিলে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে “ইয়ে, মানে মুনমুন সেনের কিছু, ওই ইয়ে আছে নাকি?” দোকানদার শিওরলি ততদিনে এরকম কয়েক হাজার কাস্টমার সামলেছে যারা একই জিনিসের খোঁজ করেছে। সে বিড়ি টেনে উদাস কন্ঠে অন্যদিকে তাকিয়ে বলত “ফরেন জিনিস আছে, নেবেন?” নিরাশ হয়ে ফিরে আসার সময় অন্য এক বন্ধু বলত, “বেলঘরিয়ার গলিতে একজন বসে। তার কাছে রেয়ার কালেকশন থাকে। সে নাকি বলেছে জোগাড় করে দেবে”। তো, চালাও পানসি বেলঘরিয়া! ছুট ছুট ছুট এবং আবার ব্যর্থমনোরথ হয়ে ফিরে আসা।
ততদিনে কিন্তু সেক্স জিনিসটা আমাদের জীবনে আর অত ট্যাবু নয়। বাজিগরে কাজলের ক্লিভেজ বা বেটাতে মাধুরীর সেই দ্বিধাথরথর দুলুনি আমরা দেখে ফেলেছি। সুপারহিট মুকাবিলার মাধ্যমেই হোক অথবা রাত্রে বিদেশী সিনেমায়, শরীর ব্যাপারটা আর অচেনা নয়। সত্যি বলতে কী আঠেরোয় পৌঁছনোর আগেই আমাদের অনেকেরই শরীরী অভিজ্ঞতা হয়ে গিয়েছিল। আর মুনমুন সেন কোনওদিনই এমনকিছু হিট নায়িকা ছিলেন না যাঁকে নিয়ে ক্রেজ তৈরি হবে। কিন্তু এটা মনে হয় সেই নব্বইয়ের ম্যাজিক মোমেন্ট, যা ইঁদুর দৌড়ে থাকা নায়িকাদের সাইডলাইনে সরিয়ে জনমানসে পাকাপাকি প্রতিষ্ঠা দিয়ে দেয় মধ্যবয়স্ক, ঈষৎ পৃথুলা এবং খুব একটা ভাল অভিনয় করতে না জানা এক মহিলাকে। দুই হাতের দশ আঙুল গুণে হয়ত বলে দেওয়া যায় মুনমুন সেনের মনে রাখার মতন সিনেমা কী কী। হিট সিনেমার অবস্থাও তথৈবচ। বাংলা উচ্চারণ খারাপ ছিল। ইন ফ্যাক্ট, মুনমুনের আধো আধো গলায় বলা বাংলাকেও প্রচুর ক্যারিকেচার করা হয়েছে এককালে। কিন্তু সেসব পেরিয়েও একটা জেনারেশন বড় হয়ে গেল এই দোলাচলে থেকেই যে সত্যিই মুনমুন সেনের পানু ছিল না নেই। আর এভাবেই মুনমুন সেন আরবান লেজেন্ডের অংশ হয়ে গেলেন। আশি বা নব্বইতে যে জেনারেশন কৈশোর কাটিয়ে যৌবনে ঢুকেছে তাদের সসময়সীমায় তর্কযোগ্যভাবে সবথেকে বড় আরবান লেজেন্ড।
সমাজবিজ্ঞানীরা আজকাল বলেন গুজব তখনই আরবান লেজেন্ডে রূপান্তরিত হয় যখন তার পেছনে এক বৃহৎ জনগোষ্ঠীর হিস্টেরিয়া, আকাঙ্ক্ষা অথবা ঘৃণা কাজ করে। মুনমুনের ব্লু ফিল্মের ক্ষেত্রে মনে হয় নিঃশব্দে খেলা করে গিয়েছিল সময়। আমরা সাবালক হয়েছিলাম মুনমুনদের হাত ধরে। আশির দমচাপা রাজনৈতিক বাস্তবতা নব্বইয়ের শুরুতে বার্স্ট করেছিল বিকেন্দ্রীকরণ মন্ডল কমিশন বাবরির হাত ধরে। সুপারহিট মুকাবিলা সেই সময়তেই এসেছে। হিন্দি সিনেমাতে নায়িকাদের ড্রেস প্যাটার্ন পালটাচ্ছে একটু একটু করে। ক্লিভেজ দেখানো পোষাক পরছেন অনেকে। গোপন অপরাধবোধকে সোচ্চারে সগর্বে একটু একটু করে চিনে নেওয়া হচ্ছে তখন।আমাদের নাগরিক সত্ত্বা উন্মুখ হয়ে ছিল এই খোলা হাওয়ার মধ্যে থেকে নিজেদের ব্যক্তিগত খোলা হাওয়াগুলোকে চিনে নিতে। সেখানে আমাদের নিজস্ব একজন, সুচিত্রা সেনের মেয়ে,বরাবরই আলো আঁধারিতে ঢাকা জীবন, তাঁর এরকম একটা স্ক্যান্ডাল, ছিল অথবা নেই সেটা বড় কথা নয়, সেটাকে আমরা ভালবেসেছিলাম। সেটা ছিল আমাদের নিজস্ব গোপন অপরাধবোধের স্বীকৃতি। আজ স্বীকার করতে বাধা নেই আমরা সকলেই মুনমুন সেনের প্রেমে পড়েছিলাম। শুধু তাঁর শরীরের প্রেমে নয়। তাঁর রহস্যের প্রেমে। তাঁর বিভঙ্গের প্রেমে। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম এই শহরে হয়ত কোনও এক আন্ডারগ্রাউন্ড ধূলিধূসরিত ভাঙা ঘর আছে যেখানে হারিয়ে যাওয়া সিনেমাদের সযত্নে সঞ্চিত করে রাখা হয়। সেখানে যাবার পথ কেউ জানে না, কিন্তু কোনও এক আর্কাইভিস্ট সেখানে সংগোপনে রেখে দিয়েছেন মুনমুন সেনের ব্লু ফিল্ম। শ্যাডো অফ দ্য উইন্ড উপন্যাসের হারিয়ে যাওয়া বইদের কবরখানায় দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ লাইব্রেরিয়ান বলেছিলেন, কোনও বই যখন হাতবদল হয় তখন নতুন পাঠকের আত্মার একটা টুকরোকে সেই বই শুষে নেয়। মুনমুন সেনের সেই সিনেমা আমরা দেখিনি। কিন্তু তবুও আমাদের মতন অদর্শকদের আত্মার একটা টুকরোকে শুষে নিয়ে সেই কল্পিত অথবা বাস্তব ফিল্মটি দীর্ঘজীবী হয়ে গেছে।
আজ ২০১৬তে এসে এসব রোমান্টিকতার মানে হয় না। এখন অ্যাডাল্ট ফিল্মের নায়িকারা মেইন্সট্রিমে অভিনয় করেন। ইন্টারনেটে ক্লিক করলেই নায়িকাদের এমএমএস সহজলভ্য। প্যারিস হিলটন বা কিম কারদাশিয়ানদের জগতে ঘুরপাক খাওয়া আজকের টিন বুঝবেই না আজ থেকে কুড়ি বছর আগে এক অনাঘ্রাত পর্ন সিনেমা কতটা মহার্ঘ্য্য ছিল। মুনমুন সেনের পানু তাই আসলে এক হারিয়ে যাওয়া সময়কে ধরে রাখে। এই লেখা তাই শুধু সেই পানুকে নয়, সেই হারিয়ে যাওয়া সময়কে এক অক্ষম হোমেজ। আলটিমেটলি আমরা জানি যে শ্মশান উড়ে যাবেনা। রিটা হেওয়ার্থের পোস্টার ছিঁড়ে ফর্দাফাই হয়ে গিয়ে আবিষ্কার হয়ে যাবে আততায়ীর সুড়ঙ্গপথ। আজ সেই সুড়ঙ্গপথে মাটিচাপা পড়ে গেছে। সন্ধ্যেবেলার দূরদর্শনে বিশেষ বিশেষ খবর আর কেউ দেখে না। আশিকি বাজিগর ডরের রোমাঞ্চ অথবা ডবলিউ ডবলিউ এফ খেলাটির স্টিকার জমানোর আদিখ্যেতার আজকাল কোনও মূল্য নেই। তবু আমরা যারা সদ্য তিরিশ থেকে সদ্য চল্লিশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছি, তাদের আকাশে কোথাও একটুকরো মেঘের মতন লুকিয়ে থেকেই যাবে আমাদের নিজস্ব বড় হয়ে ওঠার গোপন ব্যাথার দাগ। আকাশ অংশত মেঘলা ছিল। আকাশ অংশত মেঘলা থাকবে।
