হারবার্ট সরকার যেখানে যেতেও পারত
প্রতিবছর শীতকাল পড়লেই দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জ এলাকার নব্বইয়ের সন্তানদের অনেকের চোখেই অবধারিতভাবে সিরিটি শ্মশানের ছবি ভেসে উঠবে। এই শ্মশান ছিল আমাদের অনেকের আড্ডা মারার জায়গা। আমার আরও বেশি করে মনে পড়ে যায় তার কারণ এখানে শেষনব্বইয়ের ডিসেম্বরের সন্ধ্যেবেলায় আমি প্রথম লাশ দেখেছিলাম। পুড়তে নয়, ভেসে যাচ্ছিল আদি গঙ্গার গা বেয়ে। তখন কুয়াশা জড়ানো সন্ধ্যে। দুই পাশের মেয়ে বউরা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে বলছিল “আহা গো, কার বডি?” লাশ “আমি স্বেচ্ছাচারী” বলেছিল কি না খবরে প্রকাশ নেই।
বস্তুত আমাদের পাড়ায় এই জীবিত মৃতের কথোপকথন, কুয়াশার মনোরম মনোটনাস ম্যাজিক মোমেন্ট, রহস্য কথকতা প্রবাদ এসব জিনিস শুরু হয়ে যায় সত্তরের দশকের বহু নকশাল ছেলে খুন হয়ে যাবার পর থেকেই। শোনা যায়, তারা নাকি ভূত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং এখনও।
এই মাকোন্দোতে কেমনভাবে আসতে হবে? একটু শিবের গীত গাওয়া যাক। টালিগঞ্জ ফাঁড়ির লাগোয়া মহাবীরতলার অটোস্ট্যান্ডটি পেরনোর পর ডানদিকে দুখানা রুটি তড়কার দোকান (খাবেন না, খেলেই পেট খারাপ অনিবার্য। কলেজে পয়সা কম থাকার কারণে এসব হাবিজাবি খেয়ে আমি অনেক ভুগেছি)। অটোতে আসতে একটু সমস্যা হবে কারণ রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে বাতিল অথবা সচল লরি। তারপরেই ভাটিখানার দিশি মদের ঝাঁঝ বাতাসে ভাসে। ভাতের হোটেল, কয়লার গুদাম, কাঠচেরাইয়ের দোকান পেরিয়ে এগিয়ে গেলে বাপুজিনগর টাউন কংগ্রেসের অফিস। উল্টোদিকে ইন্দিরা গান্ধীর স্মরণে শহিদ বেদী যেখানে কয়েকটি শুকনো গাঁদা ফুল এখনও দেখা যায় কিন্তু ঝড় জল রোদে মহিয়সীর মুখটি বড়ই বিবর্ণ। তার পাশেই খালি বস্তার গোডাউন। ময়লা ডাম্প করার সিমেন্টের বড় জায়গা যেখান থেকে দিনেরাত্রে বিকট গন্ধ।
কলাবাগান আসার আগে বাঁদিকে মোষ রাখার বিশাল খাটাল যা বহুদিন পরিত্যক্ত হয়ে আছে। এই খাটাল থেকেই নকশাল খুনের কিংবদন্তী শুরু। সত্তরের দশকে খাটালে কয়েকটি ছেলে লুকিয়ে ছিল এবং গোয়ালারা পুলিশে খবর দিয়ে দেয়। খাটাল থেকে বার করে এনে সিরিটি শ্মশানের পাশের ঝিলে নিয়ে গিয়ে পুলিশ বলেছিল “যা”। পালাতে শুরু করলেই পেছন থেকে গুলি। ঝিলেই ডুবিয়ে দিয়েছিল বডি। শোনা যায়, সেই ঝিলে নাকি এক লুকনো কালী মূর্তিও আছে যা বিশেষ বিশেষ অমাবস্যার রাতে জলের উপর উঠে আসে। জলের নিচে কে কাকে দেখভাল করছে জানা নেই।
তো, খাটাল পেরনোর পর ঠাকুর তৈরির শেড, সেখানে এখন কাজের অভাবে বিশ্বকর্মা বানানো হচ্ছে। বাঁদিকে দুখানা মিষ্টির দোকান থেকে আসা টিউবের আলোয় কুয়াশা জড়ানো কালো রাস্তা ডুবে যাচ্ছে। স্থানীয় ক্লাব, ‘বসে আঁকো প্রতিযোগীতা’র বিজ্ঞাপন। তারপর বিজলী গ্রিলের কোল্ড ড্রিংক্সের কারখানা যা বহুদিন ধরেই বন্ধ হওয়া এবং আবার খোলা এই দ্বিমেরুতত্ত্বের মধ্যে পড়ে পিংপং বলের মত ক্লান্ত। তার হলুদ দেওয়ালে অরবিন্দ ও বিবেকানন্দের রঙিন মুখ। নিচে বাণী –’আমি সিংহের হৃদয় ধ্যান করি’।
শ্মশান আসার আগে বাঁদিকেই সেই লুকনো কালী এবং মার্ডারড নকশালদের দীঘি। অর্ধেক দীঘি বুজিয়ে এখন ফ্ল্যাট উঠেছে। বাকি অর্ধেকটায় এখনও উথালপাথাল মাছ শিকার। জমা জলে মেঘের ছায়া, পাখির ডানার রঙ। কচুরিপানার দংগলের মধ্যে দিয়ে আচমকা উঁকি মারে পানকৌড়ির কেউটে গলা। সিরিটি শ্মশানে ঢোকার রাস্তায় ‘সাক্ষাৎ বামদেবের শিষ্য’, কোনও প্রাচীন জাদুকরের নাম আছে। বড় চৌকো টিনের বোর্ডে তাঁর নাম, এই শ্মশানে গড়ে ওঠা তারা মন্দিরের কথা আর উৎসবের যাবতীয় বিধি লেখা আছে। তার নিচে ফুলের দোকান। বড় রাস্তার গায়ে একটি চায়ের দোকান, আনন্দমার্গীদের বন্ধ স্কুল, স্টেশনারি দোকান, একটি মোবাইল ফোন সারানোর দোকান। উল্টোদিকে মন্দির। এখানেই আছে আনন্দময়ী হিন্দু হোটেল, যেখানে এখনও ১০ টাকায় ডিমের কারি, ভাত ডাল তরকারী। একটা রুটি এক টাকা। এই ঝুপড়িতে এই অঞ্চলের মধ্যে প্রথম ফ্রিজ এসেছিল। সেখানে কোল্ডড্রিংক্স রাখা থাকে। দেওয়ালে ঝোলানো থাকে বামাক্ষ্যাপা ও তারাপীঠের মূর্তির ছবি। উল্টোদিকে বঙ্গলক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, যার গা ঘেঁসে একটি একলা ফাঁকা মাঠ। রিয়েল এস্টেট এখনও এই মাঠের হদিশ পায়নি। গত কুড়ি বছর ধরে সেখানে নিঃঝুম হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ফোর সি রুটের একটি বাসের কংকাল। কেউ তার খোঁজ রাখে না।
সাইকেল নিয়ে শ্মশানে চলে গেলেই পোড়া অশ্বত্থ। লাগোয়া তান্ত্রিকদের ঝুপড়ির রেডিও থেকে এখনও আকাশবাণী ভেসে আসে। ইলেকট্রিক শ্মশান হবার পর থেকে তান্ত্রিকদের বাজার নেই আর। আমাদের সাথে বসে গাঁজা খেতে খেতে একজন দুঃখ করে বলেছিল “সব পাব্লিক চলে যাচ্ছে করুণাময়ীর জৈনদের বড় মন্দিরের দিকে। শালাদের যদি অভিশাপ দিই গলায় রক্ত উঠে মরবে তো তাতেও গায়ে মাখে না কেউ। ছেলেপুলে নিয়ে ঘর করি, এসব ইলেকট্রিক এসে আমাদের বিজনেস লাটে তুলে দিল দাদা!” ফলতঃ শ্মশানের লাগোয়া মন্দির নিষ্প্রভ, বিবর্ণ। তার নিঃসঙ্গ কালীঠাকুর আছে না পালিয়ে গেছে সেটাও কেউ খেয়াল করে দেখার আগেই অভ্যেসসবশত কপালে হাত ঠেকিয়ে পয়সা ছুঁড়ে বেরিয়ে যায়। জাগ্রত কালীমূর্তি দিবারাত্র ড্যাবড্যাবে চোখ মেলে থাকলে কী হবে, মন্দিরের গা ঠিক প্যাচড়া রুগির গাল। গিরগিটি তক্ষক কেউটের মেহফিল বসে রোজ রাত। দাঁত খিঁচোনো ভাঙা ইঁটের দেওয়াল হুমড়ি খেয়ে যে কোনওদিন পড়বে মায়ের পায়ে জবা হয়ে। শ্মশানে তান্ত্রিক হবার থেকে তাই হোমিওপ্যাথি বা নিদেনপক্ষে স্মাগলিং করা বেটার অপশান৷
শীতকাল মানে আমার পাড়ায় আদিগঙ্গার কুয়াশা। অন্ধকার নির্জন রাতে পাড়ার মোড়ে ক্যারম। বোর্ডের ওপরের নিশ্চুপ হলদেটে বাল্বের গা ঘিরে পোকাদের ভিড়। শীতকাল মানে নিভে যাওয়া বাজারের শেষ আলোয় যতটুকু পারা যায় জমিয়ে রাখা দোকানির পকেটের এককোণের ম্লান পাঁচটাকার নোট, যা বহু যত্নে পরম সংকোচে রেখে দেওয়া হয়েছে সন্ধ্যের শেষ মুড়ি তেলেভাজাটুকুর জন্য। আর শীতকাল মানে সিরিটি শ্মশানে সুইসাইডের লাশ একটু বেশি আসা। শীতে ডিপ্রেসন বাড়ে।
ডোমেরা সুইসাইডের লাশের বিছানা বা জামাকাপড় নেয় না। ঠাকুর কুপিত হয়। দেখেওছি সেই বিছানা চাদর সব গঙ্গায় ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে। বঙ্গলক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভান্ডারে শ্মশানবন্ধুদের ফ্যালফেলে চোখের দিকে তখন একঠায় তাকিয়ে থাকে মিয়োনো হতে থাকা সিঙারা জিলিপি। এখানেই দাহ হয়েছিল নীলের। নীল, বেহালার নকশাল নেতা। পুলিশ মার্ডার করেছিল। বডি কেওড়াতলায় পাঠানো রিস্কি ছিল কারণ হুজ্জতি হত খুব পাব্লিক রেগে ছিল। চুপিসাড়ে তাই এখানে নিয়ে এসে পোড়ানো। নীলকে নিয়ে নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতা আছে। হিমেল সন্ত্রাসে কলকাতার নাভিমূল তখন বরফ হয়ে ছিল। শ্মশানের পুরনো দেওয়ালের গায়ে এখনও এখানে ওখানে লেখা, ‘বদলা! বদলা!’
ডোমেদের মুখে শোনা, ইলেকট্রিক চুল্লি আসার আগে বহু শীতের রাতে একলা লাশ পুড়তে পুড়তে উঠে বসেছিল। আর পুড়তে ইচ্ছে করেনি তাদের। ধরে বেঁধে আবার শুইয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমি মিনমিন করে বলতে গেছিলাম “ওসব না, আসলে এটা বিজ্ঞান” । মাতাল ডোম দাবড়ে দিয়েছিল“আরে রাখুন আপনার বিজ্ঞান। কত অতৃপ্ত শোক জ্বালা নিয়ে মানুষ সুইসাইড করে জানেন? সেসব শোকতাপ শান্তিতে পুড়তে দেয়না তাদের। তাই উঠে বসে”।
শীতকালে সিরিটি শ্মশানের উদ্যানে গিয়ে আপনি যদি বসেন তো দেখবেন কিছু কিছু ভাঙাচোরা মানুষ যারা উদ্ভ্রান্ত চোখে বসে আছে। তাদের কোনও উদ্দেশ্য নেই। কেন এসেছে নিজেরাও জানে না। একলা মনে বিড়বিড় করে, কখনও এর ওর কাছে বিড়ি চেয়ে খায়। বারবার চাইলে মানুষ বিরক্ত হয়। আবার কোনও শোকসন্তপ্ত পুত্রহারা দম্পতি অথবা সদ্যবিধবা দয়াপরবশ হয়ে তাদের হাতে দশটা টাকা গুঁজে দিলে তারা ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকে। বোঝে না কী ঘটছে। আমি এদের অনেক দেখেছি। কেউ বন্ধ কারখানার লেবার। কেউ বউকে হারিয়ে এখানে এসেছে। অথবা কেউ হয়ত এসবের কিছুই নয়। ছোটবেলা থেকেই যাকে ইংরিজিতে বলে ডিমউইট। হাবাগোবা ধরণের। কেউ সম্মান দেখায় না। তাচ্ছিল্য করে। হয়ত মাথাতেও সামান্য গণ্ডগোল আছে। কাজকম্ম করে না। সারাদিন এখানে এসে বসে থাকে আর মড়া পোড়ানো দেখে। ডিসেম্বর আসলে এদের আসা বেড়ে যায় আমি খেয়াল করে দেখেছি। সম্ভবত এক স্থায়ী কুয়াশা এদের ভেতরে এমনভাবে গেড়ে বসে গেছে যে সেই ভ্যাবাচ্যাকা অস্তিত্ব অন্যসময়ে পৃথিবীর সঙ্গে নিজেকে আইডেন্টিফাই না করতে পারলেও ডিসেম্বরের নিঃসঙ্গ ঝাপসা চরাচরে এদের বাহির ও ঘর এক হয়ে যায়। এই স্থান সম্ভবত তাদের শেষ মাকোন্দো, যা পুড়ে যাবার পর আর এই পৃথিবীর বুকে তাদের জন্য দ্বিতীয় সুযোগ নেমে আসেনি আর।
তো, এই আমার নব্বইয়ের শীতকাল। নিঃঝুম ভুতুড়ে বাড়ি, বন্ধ কারখানার গেট, মরে যাওয়া চুল্লির আগুন, অতৃপ্ত মৃতদেহ, ভাঙা বাস। এসবই জীবন্ত হয়ে উঠত ডিসেম্বরের কুয়াশায়। মজলিশ আরা রোডের মসজিদের কবর থেকে জেগে উঠে আসত ভূত। শ্মশান, পদ্মপুকুর, ডাক্তারের বিশাল বাগান জুড়ে তারা ঘুরে বেড়াত। কখনও অন্ধকার রংকলের মাঠে গিয়ে বসে থাকত একলা ছায়ামূর্তি। তার সারা গায়ে ব্যান্ডেজ জড়ানো, কিন্তু ভাল করে কাছে গিয়ে দেখলে খেয়াল পড়বে যে মাথাটা নেই।
নব্বই বুড়ো হয়ে মরে গেছে। তার সমস্ত রোমান্টিকতাও বিগতদিনের চর্বিতচর্বণে এসে থিতু হয়েছে। কিন্তু তবুও অবশেষ রয়ে যায়। শ্মশান থাকে এবং থাকবে। পাড়ার নিঃঝুম ডাক্তারের বাগানের নিমডাল থেকে ঝুলবে গলায় দড়ি বাঁধা নকশাল ভূত। অন্ধকার কুয়াশামাখা ফাঁকা রাস্তায় সারারাত একলা খোলা থাকবে বঙ্গলক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, শ্মশানবন্ধুদের আগমনের প্রত্যাশায়। কেউ ফিরেও তাকাবে না। সুইসাইডের বডি আসতে থাকবে। নিঃশব্দে। একে একে। শ্মশান থাকবে। শ্মশান পুড়বে।
(স্মৃতি সর্বদাই ব্যক্তিগত। তবে সেইসঙ্গে এটাও ঠিক যে সমষ্টির সম্মিলিত অভিজ্ঞতার ইতিহাস সেই স্মৃতিকে লালন করে সযত্নে। এই লেখাটির ক্ষেত্রেও অনেক ভুলে যাওয়া কথা এবং রাস্তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেবার জন্য কিন্নর রায়ের ‘প্রকৃতিপাঠ’ উপন্যাসটির সাহায্য নেওয়া হয়েছে। উপন্যাসটির বিষয়বস্তু ছিল এই সিরিটি মুচিপাড়া অঞ্চলে নব্বইয়ের দশকে কেমনভাবে প্রকৃতি ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে, গাছ কেটে জলাজমি বুজিয়ে। পরিবেশ বিষয়ে আগ্রহীজনদের বলব, উপন্যাসটি অবশ্যই পড়ুন। আশি নব্বইতে কেমন ছিল দক্ষিণ কলকাতার শহরতলি জলাভূমি শ্মশান, আর কেমনভাবে তা ধ্বংস করা হতে থাকল, তার গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টেশন হয়ে থাকবে এই বইটি।)
