খাদক – আল-মারুফ
খাদক
এক
‘আমার ভীষণ ভয় করছে!’ স্বামীর কাছে শেষ পর্যন্ত নিজের ভয়ের ব্যাপারটা অকপটে স্বীকার করে ফেলল মিথি।
‘দেখো, তোমার এ ধরনের কথা-বার্তা আমার একদম ভাল লাগছে না। আমি তোমাকে এখানে আসতে বলিনি। জোরও করিনি। শুধুমাত্র তোমার সীমাহীন আগ্রহেই আমরা এখানে এসেছি।’
‘কিন্তু তখন কি বুঝেছি-এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হবে আমাকে?’
‘তুমি শুধু-শুধু কথা বাড়াচ্ছ। তোমাকে স্পষ্টভাবে আমার গ্রামের বাড়িটা সম্পর্কে বলেছি। কী তোমাকে বলিনি-গত পাঁচ বছর ধরে গ্রামের বাড়িতে কেউ থাকে না? খালি পড়ে আছে। নতুন একজন কেয়ারটেকার রাখা হয়েছে। গ্রামে ইলেকট্রিসিটি দূরের কথা, আধুনিক সভ্যতার তেমন ছিটেফোঁটাও নেই। স্টেশন থেকে গ্রামের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে প্রায় দশ মাইলের মত যেতে হয়। এসবের কিছুই গোপন করিনি। এরপর তুমিই জেদ ধরেছ গ্রামের বাড়িতে আসবে। আর এখন বলছ ভয় করছে-এটা করছে-সেটা করছে।’
এবার মিথিও জেদের সাথে জবাব দিল, ‘দেখো, হাসান, দু’বছর আমাদের বিয়ে হয়েছে অথচ এখন পর্যন্ত কোথাও বেড়াতে যাইনি। কখনও গ্রাম দেখিনি বলে তোমার গ্রামের বাড়িটা দেখতে এসেছি। কিন্তু এখন তুমি রাতের ট্রেনে এসে কোথাকার কোন্ কেয়ারটেকারের জন্য রাত দুটোর সময় স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখবে আর আমি একটু ভয়ের কথা বলেছি বলে আমার উপর তেজ দেখাবে-এটা ঠিক না।’ কথাগুলো বলে মিথি অন্য দিকে ফিরে বসল।
হাসান কিছুক্ষণ চুপ থেকে শেষে শান্তি স্থাপনের সুরে বলল, ‘আসলে বুঝতেই পারছ-টেনশনে আছি। কেয়ারটেকারকে বলেছিলাম ভ্যান-ট্যান নিয়ে স্টেশনেথাকতে-তারও কোন দেখা নেই। রাস্তা-ঘাট প্রায় সবই ভুলে গেছি-তার উপর গভীর রাত। একটা মানুষও তো দেখলাম না। কী যে করি…’
হাসান কথা শেষ করতে পারেনি এমন সময় খুব কাছ থেকে কে যেন ভয়ার্ত গলায় চিৎকার করে উঠল। রক্ত হিম করা সে চিৎকার রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে খান খান করে দিল। মিথি প্রায় উড়ে এসে হাসানকে জড়িয়ে ধরল। ভীত গলায় ফিফিসিয়ে বলল, ‘ও-ও-ওখানে কে-এ-এ? হা-সা-আ-আন?’
হাসানও প্রথমে হক্চকিয়ে গিয়েছিল। একটু পরেই ব্যাপারটা বুঝতে পেরে হেসে উঠল। ‘হাঃ হাঃ হাঃ ও কিছু না। এরকম ‘ডাকডুক’ গ্রামে রাতের বেলা সবসময়ই শোনা যায়। কত ধরনের প্রাণী আছে! খাটাস, শিয়াল, পেঁচা—কত কী! তুমি দেখছি ভয়ে একেবারে আধমরা হয়ে গেছ। হাঃ হাঃ-আরে এত ভয় পেলে গ্রামে থাকবে কী করে!’
হাসানের কথা শুনে ওকে ছেড়ে দিয়ে মিথি কিছুটা স্বাভাবিক হলো।
‘আসলে-আমি ঠিক….
হাসান হেসে বলল, ‘ওকে, আমি বুঝতে পেরেছি-তবে আবার ওভাবে একটু জড়িয়ে ধরো না!’
‘উঁহ, শখ কত!’
আবার কিছুক্ষণ নীরবতা। দু’জনেই চুপচাপ। শেষে মিথিই কথার খেই ধরে, ‘তোমাদের এখানে কারেন্ট নেই বলেই জানতাম-কিন্তু ওই যে লাইটপোস্ট দেখতে পাচ্ছি।’
‘শুধু স্টেশনে—আর ওই উত্তরে আছে।’
হাসানের কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ওদেরকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়ে বালবটা ‘ঠাস্’ করে শব্দ করে ভেঙে গেল। হঠাৎ আলো থেকে অন্ধকার হওয়ায় হাসান কিছুই দেখতে পেল না। শুধু বুঝতে পারল মিথি আবারও আগের চেয়ে শক্ত করে ওকে জাপটে ধরেছে। জড়িয়ে ধরার সময় ছোটখাট একটা চিৎকারও দিয়ে ফেলেছে।
সবকিছু শান্ত। মিথি কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে ফিফিসিয়ে বলল, ‘হাসান-এটা কেন হলো, বলো তো?!’
হাসান আশ্চর্য হলেও তৎক্ষণাৎ যুক্তি দাঁড় করিয়ে ফেলল। ‘কোন বাদুড়- টাদুড় হবে।’
‘উঁহু, অসম্ভব! বাদুড় চোখে দেখতে না পেলেও ওদের পথ চলা মানুষের চেয়েও নির্ভুল। এটা বাদুড়ের কাজ হতেই পারে না। নিশ্চয়ই ভূত-ভূতের কাজ! হা-সা-আ-আন! …আমার ভয় কর-ছে-এ-এ!’
‘আরে! ধ্যেৎ। যুক্তি দিয়ে ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করো। সম্ভবত অন্য কোন প্রাণী, কিংবা হয়তো বালবটা ঠিক মত লাগানোই হয়নি!’
‘কিন্তু তাই বলে আমরা বালবের কথা বলা মাত্র এরকম ঘটল কেন?’
‘তাই বলে এটা ভূতের কাজ বলতে চাচ্ছ?! আশ্চর্য! স্রেফ কাকতালীয় ব্যাপার।’
মিথি আর কিছু বলল না। আবার খানিকক্ষণ নীরবতা। হঠাৎ মিথি বুঝতে পারল হাসান কিছু একটা করছে। অন্ধকারে ঠিক মত ঠাহর হচ্ছে না।
‘কী করছ?’
‘অ্যা-কিছু না। পেয়েছি। টর্চ লাইট। যাক বুদ্ধি করে এনেছিলাম।’
মিথি শান্ত সুরে বলল, ‘বুদ্ধিটা তোমার না জনাব, আমার। শুধু টর্চই ভ নিনি। এক্সট্রা এক ডজন ব্যাটারিও এনেছি। আর টর্চ একটা নয়, দুইটা।’
‘বাহ! তোমার তো অনেক বুদ্ধি। তোমার মার এত বুদ্ধি কেন ছিল না বলো তো?’
‘কেন?! এ কথা কেন বলছ?’
প্রশ্নটা শুনে হাসান মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, ‘না মানে, তোমার বাবা তো এখনও দেউলিয়া হয়নি, তাই!’
হাসান ভেবেছিল মিথি হয়তো রাগে ফেটে পড়বে। কিন্তু আসলে তা হলো না। মিথি হেসে উঠল। হাসানও মিথির সাথে হেসে ফেলল। হাসান টর্চটা জ্বালতে যাবে-এসময় মিথি ফিফিসিয়ে বলে উঠল, ‘হাসান, শুনতে পাচ্ছ?’
‘কী শুনব?!’
‘ওই যে, শব্দটা শুনতে পাচ্ছ?’
হাসানও শুনতে পেল। ‘হুঁ; সম্ভবত কেউ আসছে এদিকে।’
অন্ধকারে দু’জনেই শব্দের উৎসের দিকে তাকিয়ে থাকল। শব্দটা আস্তে আস্তে জোরাল হচ্ছে। মিথি চাঁদের আবছা আলোয় একটা মানুষের অবয়ব বুঝতে পারছে। এমন সময় হাসান সরাসরি লোকটার মুখে টর্চের আলো ফেলল।
দাড়ি ভর্তি কালো একটা মুখমণ্ডল। নাকটা ভোঁতা। চোখ দু’টি বড় বড়। মুখে একধরনের হাসি। ধরনটা কী রকম হাসান ঠিক বুঝতে পারছে না। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে তীব্র আলোতেও লোকটার মুখ এতটুকু কুঁচকায়নি। লোকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। হাসান টর্চের আলো অন্য দিকে সরিয়ে নিল।
‘তুমি কে?’
প্রশ্নের উত্তরে লোকটা গা জ্বালানো হাসি দিয়ে বলল, ‘হেঃ হেঃ হেঃ, সার, আমি। আপনেগোর নতুন কেয়ারটেকর।’
হাসান টর্চের আলোয় ঘড়ি দেখে বলল, ‘তোমাকে কয়টায় থাকতে বলেছি আর তুমি কয়টায় এলে?’
‘হেঃ হেঃ হেঃ, সার, আইতে আইতে দিরং অইয়া গেল, হেঃ হেঃ হেঃ…’
‘দেরি হয়েছে তো হাসছ কেন?’ রাগ রাগ গলায় বলল হাসান।
‘হেঃ হেঃ হেঃ, সার, ভুল অইয়া গেছে। হেঃ হেঃ, ভুল তো মাইনষেরই অয়, হেঃ হেঃ হেঃ।’
হাসান এবার উচ্চস্বরে ধমকে উঠল, ‘আবার হাসছ? Nonsense.’
লোকটা এবার কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে চুপচাপ মাটির দিকে তাকিয়ে থাকল। হাসান শান্ত স্বরে জানতে চাইল, ‘ভ্যান-ট্যান কিছু এনেছ?’
লোকটা আবারও আগের মত হেসে বলল, ‘হেঃ হেঃ হেঃ, সার; আর কইয়েন না। ওই হালারপুতের লাইগ্যাই তো দিরংটা অইল। হাইন্দার হময় গেছি ভ্যানের লাইগ্যা-হেঃ হেঃ, গিয়া দেহি হালায় বউয়ের লগে ইস্টিংফাইট করতাছে। হালায় মারে এডা-তয় বউয়ে মারে চাইড্ডা, হেঃ হেঃ! এইডা এডা দিরিশ্য! আফনে না দেহলে বুঝবার পাইতেন না। হগলের লগে খাড়য়ে খাড়য়ে দেহলাম। হময় বুইজ্যা বাড়ির পিছেথ্যে রশি খুইল্যা আমি নিজেই ভ্যান লইয়া আইয়া পড়ছি-হেঃ হেঃ।’
অবাক হয়ে মিথি জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার তো পায়ে সমস্যা। ভ্যান চালালে কী করে!’
‘হেঃ হেঃ হেঃ, মেমসাব-এইডা অইল আরেক হিস্টরি। আমার ডাইন পাওডা বায়েরডার চাইতে এট্টু খাড়া। হেঃ হেঃ হেঃ!’
মিথি বুঝতে পারল না, এর মধ্যে হাসির কী আছে!
‘হেঃ হেঃ, সার, দেন-ব্যাগ দুইডা আমারে দেন,’ বলেই লোকটা যেদিক থেকে এসেছিল ব্যাগ দুটো দু’হাতে নিয়ে সেদিকে রওনা হলো। ‘হেঃ হেঃ, সার, আয়েন। আমার লগে লগে আয়েন, সার।’
লোকটার গমন পথের দিকে হাসান বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল। এও কি সম্ভব! ওই ব্যাগ দুইটা এত ভারী যে ট্রেন থেকে নামানোর সময় আরেক লোকের সাহায্য লেগেছিল। অথচ লোকটা অবলীলায় ব্যাগ দুইটা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছে। যেন এটা কোন বোঝাই না।
‘অবিশ্বাস্য!’ মৃদু স্বরে বলে উঠল হাসান।
.
দুই
‘হেঃ হেঃ হেঃ, সার, আফনের টর্চ মারুন লাগত না। এই সড়ক আমার চোউক্কের হামনে বাসতাছে। অ্যান্দারেই বালা দেহি। হেঃ হেঃ হেঃ।’
লোকটার কথা শুনে হাসান টর্চ নেভাল। পাশ থেকে মিথি তীব্র স্বরে বলে উঠল, ‘না-না; টর্চ জ্বালাও। অন্ধকারে কখন কোন্ গাছের সাথে ধাক্কা খায়।’
হাসান আবার রাস্তায় টর্চের আলো ফেলল।
রাত ক্রমেই বাড়ছে। আকাশে তারা খুব একটা নেই। একফালি চাঁদ দেখা যাচ্ছে শুধু। মিথি এসব যতই দেখছে ততই মুগ্ধ হচ্ছে। মাঝে মাঝে রাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে ভেঙে দিচ্ছে খাটাস কিংবা শিয়ালের ডাকে। ঝিঁঝি পোকার এলোমেলো পথচলায় রাতের পরিবেশটা মিথির কাছে আরও সুন্দর লাগছে। ‘রাতের এই পরিবেশে হাসান অভ্যস্ত হলেও মিথির কাছে অভিজ্ঞতা একেবারেই নতুন।
হাসান কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে অনেকটা সময় কাটানোর উদ্দেশ্যেই লোকটার সাথে কথা বলতে শুরু করল। ‘আচ্ছা তোমার নামটা যেন কী?’
লোকটা ভ্যান চালাতে চালাতেই উত্তর দিল, ‘হেঃ হেঃ হেঃ, আমার নাম হাসেম আলী। হগলে ডাহে হাসু। হেঃ হেঃ, জইন্মের হময় বইলে আমার কান্দুনডা হাসির লাহান লাগছিন। হেঃ হেঃ, হেল্যাইগ্যাই হগলে আমার নাম রাখছে হাসু। হেঃ হেঃ হেঃ।’
হাসান স্পষ্টই বুঝতে পারছে হাসুকে একটা প্রশ্ন করলে দশটা উত্তর দেয়। অবশ্য এখন শুনতে খারাপ লাগছে না। তবে পরে অবশ্যই খারাপ লাগবে। খারাপ লাগারই কথা। অতিরিক্ত কথা বলা লোক হাসানের একেবারেই সহ্য হয় না। লোকটাকে ধমক দিতে হবে কথা কম বলার জন্য। তবে এখন না। পরে।
‘শুনেছি, আমাদের আগের কেয়ারটেকারটার নাকি অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল। তুমি কিছু জানো?’
‘হেঃ হেঃ হেঃ, জাইনতাম না কেন? বালামতই জানি। হেঃ হেঃ, রাইতের বেলায় একলা পিসাব কইরবার বাইরোছিন। কেয়া বলে হেরে মাইরা বুকমুক চিইরা কইলজা খাইয়া আলাইছিন। একদিন বাদে লাশ পাওয়া গেছিন। হেঃ হেঃ, পিসাবটা শেষ কইরবার পায় নাইকা। হেঃ হেঃ হেঃ।’
‘কইলজা খেয়ে ফেলেছে মানে?!’
‘হেঃ হেঃ হেঃ, এইডা তো হগলেরই পরশ্ন। খাইলে তো হগল কিছুই খাইব, খালি কইলজা খাইব কেন? তয় আমার মন কয় যিডা খাইছে ওইডা খালি কইলজাই খায়।’
‘লাশ একদিন পরে পাওয়া গেল কেন?’
‘হেঃ হেঃ বাড়িত তো হে একলা থাকত। বউ বাফের বাড়িত গেছিন।’
‘তা হলে তুমি জানলে কী করে সে প্রস্রাব করতে গিয়েছিল?’
‘হেঃ হেঃ হেঃ, হেরে পিসাবখানার কাছাকাছি পাওয়া গেছিল কিনা হেল্যাইগ্যা। হেঃ হেঃ হেঃ।
হাসান বুঝতে পারছে কলিজা-লাশ প্রসঙ্গ উঠতেই মিথি কেমন যেন ভীত হয়ে পড়ছে। সে দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টাল, ‘তুমি আগে কী কাজ করতে?’
‘হেঃ হেঃ, এইডা না হুনাই বালা। হগলে সউয্য কইরতে পায় না। হেঃ হেঃ তয়’ আফনেরা শহরের মানুষ, শিক্ষিত-হগলের লাহান না। আমি মানুষ কাডাছিড়ার কাম করতাম। হেঃ হেঃ হেঃ।’
হাসান চমকে উঠল, ‘মানে?!’
‘হেঃ হেঃ, হাসপাতালের ডোমের চাহরি, হেঃ হেঃ। লাশগরে ডাহতারের কতা মত লাশ কাটতাম, হেঃ হেঃ হেঃ।’
মিথি ঝট্ করে হাসানের দিকে তাকাল। হাসান চাঁদের আলোয় মিথির চোখের ভাষা বেশ ভালই বুঝতে পারল। মিথি যেন বলছে, ‘তোমার আক্কেল দেখে আমি হতবাক। এই রকম একটা লোককে তুমি কেয়ারটেকার বানিয়েছ?!
হাসান জিজ্ঞেস করল, ‘আগের চাকরিটা ছাড়লে কেন?’
‘হেঃ হেঃ হেঃ, হাসপাতালে লাশের শইলের অনেক কিছু চুরি অইয়া যাইত। হেল্যাইগ্যা ডাহতার আঙ্গর হগলের চাহরি নট্ কইরা দিছে। হেঃ হেঃ হেঃ।’
হাসান মিথির দিকে তাকাল। সাথে সাথে অবাক হয়ে গেল। এ কী! ভয়ে মেয়েটা ফোঁপাচ্ছে। হাসান ভ্যান থামাতে বলল। হাসু ভ্যান থামিয়ে অবাক হয়ে ওদেরকে দেখতে লাগল।
‘হা-সা-আন, পানি খাব।’
হাসান দ্রুত পানির বোতলটা বের করল। এহহে, হে! পানি তো ট্রেনেই শেষ হয়ে গেছে। বোতল খালি। হাসুর দিকে তাকাতেই হাসু বোতলটা ছোঁ মেরে নিয়ে বলল, ‘কাছেই এডা কুয়া আছে। বালা পানি পাওয়া যায়। হেঃ হেঃ, আফনে বহেন, আমি লইয়া আইতাছি। হেঃ হেঃ হেঃ…’
হাসু জঙ্গলের ভেতর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে অদৃশ্য হয়ে গেল। এদিকে মিথি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। হাসান মিথিকে সাহস দেয়ার জন্য বলল, ‘তুমি এত বোকা! এত ভয় পেলে হয়? আরে, মানুষই তো ডোমের চাকরি করে নাকি?
কথাটা বলার সাথে সাথেই কাছেই কোথাও থেকে হাসুর গলার স্বর শোনা গেল, ‘হেঃ হেঃ হেঃ, সার, কুয়ার বালতিটা এট্টু দরুন লাগব। একলা বতুল বরুন যায় না। হেঃ হেঃ, সার, জলদি আইয়েন, আমি বালতি দইরা রাখছি। হেঃ হেঃ।’
হাসান মিথিকে ছেড়ে টর্চটা নিয়ে নামতে যাবে এমন সময় মিথি ওর হাতটা খপ্ করে ধরে ফেলল।
‘না, তুমি যাবে না। আমি পানি খাব না।’
‘আরে! পাগলামি কোরো না, লক্ষ্মীটি। পানি এখন না লাগলেও পরে তো লাগবে। তুমি শান্ত হয়ে বসো। আমি এখনি আসছি।’
.
তিন
হাসান যাওয়ার কিছুক্ষণ পর একটা চিৎকার শুনেছে মিথি। কিন্তু বুঝতে পারছে না-এটা কীসের চিৎকার। একটা বিশ্রী সন্দেহ মনে উঁকি দিয়েছে বটে কিন্তু সেটাকে গুরুত্ব দিল না। ভয় আর আঁধার ওকে দারুণভাবে গ্রাস করে ফেলছে। দ্রুত ব্যাগ হতে অপর টর্চটা বের করে ফেলল। একা একা ভয় লাগছে। হাসান যেদিকে গেছে সেই মেঠো পথে পা বাড়াল মিথি। টর্চের অল্প আলোতে চারদিকটা কেমন যেন অন্যরকম লাগছে মিথির। এ-এক ভিন্ন ধরনের রোমাঞ্চ। এখানে না আসলে এই অনুভূতিটা কখনোই বুঝতে পারত না মিথি। দু’ধারে প্রচুর নাম না জানা গাছপালা-ঝোপঝাড়। হঠাৎ সামনেই কী যেন একটা শব্দ শুনল মিথি। যেন কেউ কিছু একটা শব্দ করে খাচ্ছে। ‘গজ-গজ-কচ্-কচ্-সরুপ-সরুপ’ এ ধরনের একটা শব্দ। শব্দের উৎসের দিকে আলো ফেলতেই রক্ত হিম করা আর্তচিৎকার দিয়ে উঠল মিথি।
হাসান মাটিতে পড়ে আছে-আর বুকের উপর বসে হাসু লাল একটা মাংসপিণ্ড টেনে বের করে চিবিয়ে খাচ্ছে। হাসুর মুখমণ্ডল, কাপড়-চোপড় লাল রক্তে মাখামাখি। বীভৎস দৃশ্য! হাসুর মুখ থেকে লালার মত রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। টর্চের আলো ফেলতেই মিথির দিকে লোভাতুর চোখে তাকাল নরপিশাচটা।
‘হেঃ হেঃ, মেমসাব, শহরের মাইনষের কইলজা, আফনে না খাইলে বুঝবেন না। হেঃ হেঃ হেঃ।’
কখন দৌড় দিয়েছে মিথি নিজেও জানে না। শুধু বুঝতে পারছে পেছনে নরপিশাচটাও আসছে। ধাওয়া করেছে ওকে। মিথি দৌড়াচ্ছে আর দু’চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু ঝরছে। বাবা-মার অতি আদরের সন্তান ও। কোন দিন বাবা-মা কোন কষ্ট দেয়নি ওকে। হাসানও ওকে খুব ভালবাসত। হাসানের কথা মনে আসতেই চোখের অশ্রু আরও দ্বিগুণ বেগে ঝরতে লাগল। হাসান, আমার হাসান। কোন দিন জানতে পারবে না ওর সন্তান এসেছে আমার গর্ভে। কোথা দিয়ে দৌড়াচ্ছে কিছুই বলতে পারবে না মিথি। পায়ের শক্তিও যেন লোপ পেয়ে যাচ্ছে। আর দৌড়ানো সম্ভব না। চারদিকে গাছপালা, মানুষের কোন চিহ্নমাত্রও নেই কোনদিকে। আর দৌড়াতে পারছে না ও। কিন্তু তবুও দৌড়াতে হবে। হাসানের সন্তানের জন্য দৌড়াতে হবে। বাঁচতে হবে নরপিশাচটার হাত থেকে। কিন্তু বেঁচে কী হবে! হাসান তো আর নেই। হাসান, আমি তোমাকে খুব ভালবাসতাম।
হঠাৎ করে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল মিথি। পেছনে কোন শব্দ নেই। মাটিতে পড়া অবস্থায় পেছনে তাকাল মিথি। নেই, পেছনে কেউ নেই। নরপিশাচটা নেই। কিন্তু মিথি স্পষ্ট বুঝতে পারছে-পেছনে কেউ না থাকলেও সামনে কেউ একজন আছে। আস্তে আস্তে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ওর দিকেই এগিয়ে আসছে…
আল-মারুফ
