কবর – কাজী মায়মুর হোসেন
কবর
ঘুম ভাঙতেই চোখ মেলল জন।
চারপাশে চাপ চাপ কুচকুচে কালো ঘন অন্ধকার। কোথাও কোনও শব্দ নেই। থমথমে নীরবতা।
ঢোক গিলতে গিয়ে বুঝল ভীষণ তেষ্টা পেয়েছে। উঠে বসতে গিয়ে শুয়ে পড়ল আবার। সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা। মাথাটা ছিঁড়ে পড়তে চাইছে।
কপাল টিপে ধরল ও। বুড়ো আঙুলের নীচে দপদপ করে লাফাচ্ছে কপালের শিরা।
দাঁতে দাঁত চেপে বসার চেষ্টা করল। কীসে যেন ঠুকে গেল মাথা।
কীসে?
শরীরের নীচে নরম একটা স্পর্শ। গদির। সন্দেহ নেই বিছানায় রয়েছে সে। কিন্তু না, এ অসম্ভব, ছাদ এতখানি নেমে আসবে কী করে!
হাত তুলে ছাদে ঠেকাল ও। কেমন যেন মসৃণ আর নরম। চাপ দিলেই বেঁকে যাচ্ছে। যতদূর সম্ভব হাতড়ে দেখল জন। ছাদের শেষ সীমা পেল না। দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করল। একই রকম নরম দেয়ালের বাধা দু’পাশে!
আতঙ্কে শিউরে উঠল সে, মনে হলো দম আঁকড়ে আসছে।
ঘসটে ঘসটে পেছানোর চেষ্টা করল। যেভাবে হোক বেরতে হবে এখান থেকে। বদ্ধ জায়গায় ওর ভীষণ ভয়। সিডার স্প্রিঙসের ডাক্তার বলেছিল ক্লস্ট্রোফোবিয়া আছে ওর! এই রোগীরা কোথাও আটকা পড়লে আতঙ্কিত হয়ে মারাও যেতে পারে। ও মরতে চায় না।
পেছন দিকেও সেই নরম দেয়াল!
মাথা ঠেকে গেছে ওর!
পায়ের দিকে নিশ্চয়ই দেয়াল নেই?
শরীর এগিয়ে নিল ও। হাঁপাচ্ছে। পাগলা ঘোড়ার মত লাফ শুরু করেছে হৃৎপিণ্ড। বুকে তীক্ষ্ণ একটা যন্ত্রণা।
আছে!
পায়ের দিকেও আছে ওই দেয়াল!
পায়ের পাতায় নরম মৃত্যুর মত ঠেকে গেছে শীতল প্রাচীর
থরথর করে কেঁপে উঠল জন। আঁধারের দিকে চেয়ে রইল। ঘামছে দরদর করে। বড় একটা বাক্সে পুরে ওকে আটকে দিয়েছে উইলবার স্মিথ!
‘প্রতিশোধ নিতে হবে,’ ফিসফিস করে নিজেকে শোনাল জন। শান্ত থাকার চেষ্টা করল। গতি কমিয়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এল শ্বাসপ্রশ্বাস। ভাবতে হবে ওকে, বুদ্ধি করে বেরতে হবে এই ফাঁদ থেকে। শোধ নিতে হবে।
হঠাৎ মনে পড়তেই প্যান্টের পকেট হাতড়াল জন। চাবির গোছার ধাতব স্পর্শ আঙুলে পেল ও। আছে! দিয়াশলাইটাও আছে! কাঁপা হাতে কয়েকবারের চেষ্টায় একটা কাঠি জ্বালল সে। লালচে আভায় চারপাশে তাকাল।
বুক ফাটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল ওর গলা চিরে।
কফিন!
একটা কফিনে ওকে আটকে রেখেছে উইলবার!
কতক্ষণ হলো আছে সে এখানে?
কয়েক মিনিট?
কয়েক ঘণ্টা?
কয়েক দিন?
উইলবার তা হলে ওকে খুন করতে চায়?
এখন ধীরে ধীরে মনে পড়ছে। র্যাঞ্চে ফেরার পথে ওর বুকে গুলি করেছে ওরই একমাত্র কর্মচারী, উইলবার। অথচ লোকটাকে বিশ্বাস করেছিল ও। বিয়ে করলে আজ উইলবারের বয়সী ছেলে থাকত ওর। সেই উইলবার…
জনের বুকের মাঝে কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠল একরাশ অভিমান। বয়স হয়েছে, আর ক’দিনই বা বাঁচবে সে? এটুকু ধৈর্য ধরতে পারল না উইলবার! কিছুই গোপন করেনি সে ওর কাছে। উকিলের সামনে উইল করে জানিয়ে দিয়েছিল তার মৃত্যুর পর র্যাঞ্চ, রুপোর খনি সবই পাবে উইলবার। এইভাবে স্নেহের প্রতিদান দিল লোকটা!
ভয় সরে গিয়ে মনে স্থান করে নিল প্রচণ্ড রাগ, প্রতিজ্ঞা করল জন, শেষ রক্তবিন্দু থাকতে মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করবে না সে।
আরেকটা কাঠি জ্বালল জন। এখন আর হাত কাঁপছে না ওর। চারপাশটা খুঁটিয়ে দেখল। কফিনে জায়গা খুব একটা বেশি নেই। তারমানে ভেতরের অক্সিজেনে বেশিক্ষণ চলবে না। এরইমধ্যে কতখানি খরচ হয়ে গেছে কে জানে। ফুঁ দিয়ে আগুন নেভাল জন। যতরকম ভাবে সম্ভব অক্সিজেন সাশ্রয় করতে হবে।
দু’হাতে কফিনের ডালায় ধাক্কা দিল। বিন্দুমাত্র নড়ল না ঢাকনি, শুধু ফোমের তৈরি গদিটায় টোল পড়ল।
চাবির গোছা বের করে বড় একটা চাবি বেছে নিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ফোমের গায়ে গর্ত করল জন। ছোট্ট, এক আঙুলের একটা গর্ত হলো। এবার গর্তটা বড় করতে লাগল সে, দু’হাতে কুটি কুটি করে ছিঁড়তে লাগল ফোম। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাথার ওপরে অনেকখানি জায়গার ফোম খসিয়ে ফেলল সে। খানিক বিশ্রাম নিয়ে দিয়াশলাই জ্বালল। হলদেটে লাল কাঁপা আলোয় দেখল কফিনের ঢাকনির কাঠ বেরিয়ে পড়েছে, ছেঁড়া তুলোর মত দু’এক টুকরো ফোম শুধু এখনও লেগে রয়েছে কাঠের গায়ে।
তর্জনী বাঁকা করে কাঠে টোকা দিল জন।
ঠক! ঠক! ঠক!
কম দামী পলকা কাঠ!
সস্তা একটা কফিনে ওকে জীবন্ত কবর দিয়েছে উইলবার!
ভয়ঙ্কর একটুকরো নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠল জনের ঠোঁটে। টাকা অপচয় করতে চায়নি উইলবার। মাতাল বুড়ো ডাক্তারের কাছ থেকে ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে সবচেয়ে সস্তা কফিনে ওকে পুরেছে লোকটা! ডাক্তার হয়তো ওর লাশ দেখতেও যায়নি, উইলবারের কথা বিশ্বাস করেই ঘাড় থেকে দায়িত্বের বোঝা নামিয়েছে একখানা সার্টিফিকেট লিখে! নিশ্চয়ই দাঁত বের করে হেসেছে উইলবার।
জনও হাসল। সবাইকে দেখে নেবে সে। অন্তত উইলবারের ক্ষমা নেই। একটা জ্বলন্ত কাঠি ঢাকনির সিকি ইঞ্চির মধ্যে নিয়ে ধরে রাখল জন। ওটা নিভে যেতেই আরেকটা জ্বালল। তারপর আরেকটা। ঢাকনিটা ভাঙতে হলে পুড়িয়ে মুচমুচে করতে হবে কাঠ।
গোটা বারো কাঠি শেষ করার পর হঠাৎই কাঠের ওপর একজায়গায় আগুন ধরল। পোড়া কাঠের সাদা ধোঁয়া নাকে যেতে কেশে উঠল জন। কফিনের অক্সিজেন কমে আসছে। বুক ভরে শ্বাস টানলেও আগের মত ফুসফুস ভরে উঠছে না। জ্ঞান হারাবে বলে মনে হলো ওর। অসাড়, নির্জীব হয়ে আসছে শরীর গায়ের চামড়ায় একটা তীব্র জ্বলুনী।
ছটফট করে উঠল জন। দু’হাতে টেনে ছিঁড়ে ফেলতে চাইল গায়ের শার্ট। পটাপট ছিঁড়ে গেল কয়েকটা বোতাম। শরীর মোচড়ামুচড়ি করে শার্টটা খুলে ফেলল সে। একটা ফালি ছিঁড়ে জড়িয়ে নিল ডানহাতে। তারপর দমাদম ঘুসি মারতে লাগল ঢাকনির গায়ে।
কাঠের একটা অংশে এখনও আগুন জ্বলছে। অঙ্গারের মত লালচে আবছা আভা ছড়াচ্ছে জায়গাটা। ওই জায়গাটাই জনের লক্ষ্য। কাপড় জড়ানো হাতে ঘুসি মেরে চলল সে।
কতক্ষণ পর ও জানে না, জ্বলন্ত কাঠের কয়েকটা টুকরো খসে পড়ল ওর বুকে। পুড়িয়ে দিল চামড়া। দিশেহারা ব্যস্ত হাতে ওগুলোকে শরীরের ওপর থেকে ঝেড়ে ফেলল সে। যন্ত্রণায় গুঙিয়ে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে আরেকবার শপথ করল। উইলবারের ক্ষমা নেই। দরকার হলে দোজখ পর্যন্ত ধাওয়া করে যাবে সে লোকটাকে।
ঢাকনির গোল একটা অংশে ভালমতই ধরেছে আগুন। ধীরে ধীরে কয়লা হচ্ছে এখন। গনগনে তাপ এসে লাগছে জনের মুখে।
শরীর কুঁকড়ে সরে যেতে চাইল সে। পারল না। কফিনের ভেতরে পর্যাপ্ত জায়গা নেই।
ধোঁয়ায় ভরে গেছে কফিন। দম বন্ধ করা পোড়া কাঠের কটু গন্ধে শ্বাস আটকে আসতে চাইছে।
যক্ষ্মা রোগীর মত একটানা কাশছে জন। অসম্ভব জ্বলছে ওর গলা। কিন্তু থেমে নেই সে, দুর্বল হাতে ঘুসি মারছে এখনও। প্রতি আঘাতে উড়ছে ধুলোর মত মিহি ছাইয়ের কণা, ওর বুকে, মুখে ছিটে এসে পড়ছে গুঁড়ো কয়লার আগুন।
অনেক… অনেকক্ষণ, যেন অনন্তকাল; ঢাকনির গায়ে আঘাত করে চলেছে জন। সময়ের কোনও হিসেব নেই ওর। ঘোরের মধ্যে অতি ধীরে পেরুচ্ছে প্রতিটা দীর্ঘ, প্রলম্বিত মুহূর্ত।
হঠাৎ ঢাকনির পোড়া অংশটা ভেঙে পড়ল জনের গায়ে। টুকরো টুকরো হয়ে গেছে কাঠ। জ্বলছে এখনও।
ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল জন। পাগলের মত মুখে, বুকে, ঘাড়ে চাপড় মেরে টুকরোগুলোকে ফেলতে চাইল। গনগনে অঙ্গার হিসহিস শব্দে পুড়িয়ে দিচ্ছে ওর পা। আগুনের স্পর্শে বড় বড় ফোস্কা পড়ল চামড়ায়।
জবাই করা মুরগির মত ছটফট করতে লাগল জন। গলা চিরে বেরিয়ে এল তীক্ষ্ণ আর্তচিৎকার। তীব্র যন্ত্রণায় বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেয়েছে। কফিনের ভেতর পাগলের মত এপাশ ওপাশ করতে লাগল সে বারবার।
অবশেষে একসময় নিভল কয়লার আগুন।
অনেক… অনেকক্ষণ পর সচেতন হলো জন। অন্ধকারে হাতড়ে দিয়াশলাইটা খুঁজে বের করল।
চমকে উঠল একটা কাঠি জ্বেলে।
ঢাকনি যেখানে ফুটো হয়ে গেছে সেজায়গায় দেখা যাচ্ছে গাছের শিকড়ে বুনট দেয়া কালচে রঙের মাটি।
হাত বাড়িয়ে জমাট ভেজা মাটির ঠাণ্ডা আঠাল স্পর্শে শিউরে উঠল জন। হাতটা সরাল না। এই মাটি খুঁড়েই উঠতে হবে ওকে যে করে হোক। থেমে গেলেই মৃত্যু। অক্সিজেন শেষ হয়ে আসছে।
দু’হাতে মাটি খামচাতে লাগল জন। মাঝে মাঝে কাঠি জ্বেলে দেখছে কাজ কতদূর এগোল। প্রতিবারই সরসর করে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ওর ঘাড়ের কদমছাঁট চুলগুলো।
অজস্র মাংসাশী কীট আর সাদা-খয়েরী কেঁচো কিলবিল করছে কবরের মাটিতে। যখন তখন খসে পড়ছে কফিনের ভেতরে। ওর গায়ে নড়ছে চড়ছে ওগুলো। অসম্ভব ধীর গতি। জেলির মত আঠাল আর ভেজা।
কেঁপে উঠছে জন, টোকা মেরে শরীর থেকে ফেলে দিচ্ছে ওগুলোকে। ভয়ে ঘৃণায় গোঙাচ্ছে সে, কিন্তু কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। নোঙরা মাটি ঝরে পড়ছে কফিনের ভেতর। ওর চারপাশে ধীরে ধীরে স্তূপের মত উঁচু হয়ে জমছে।
ছোট, পাথরে খোঁচা খেয়ে আঙুলের চামড়া ছিলে গেছে ওর। তর্জনীর নখ উল্টে ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে মাংস। বুকের সার্বক্ষণিক ব্যথাটা বেড়ে গিয়ে অসহ্য অত্যাচারে পরিণত হয়েছে। হরিণ শাবকের মত বুকের খাঁচায় লাফ দিচ্ছে হৃৎপিণ্ড। হাঁপাচ্ছে জন। ফুসফুসে বাতাসের বড় অভাব। শ্বাস টানতে গিয়ে ভয় হচ্ছে: বাতাসে অক্সিজেন আছে তো? এখন যদি জ্ঞান হারায়, তা হলে বাঁচবে তো সে?
রক্ত ঝরছে জনের দু’হাত থেকে। ব্যথায় টনটন করছে আঙুলগুলো, যেন যাঁতাকলে চেপে অনেকক্ষণ ধরে পিষছে কেউ ওগুলোকে। প্রতি সেকেন্ডে বাড়ছে শ্বাসকষ্ট, সেই সঙ্গে মরে যাবার ভয়। আতঙ্ক মাথাচাড়া দিচ্ছে মনের গভীর গহন থেকে, মগজ কাজ করতে চাইছে না। আহ্, একমুঠো তাজা বাতাস যদি পাওয়া যেত!
শরীরটাকে ভাঁজ করে বুকের কাছে দু’হাঁটু নিয়ে এল জন। ঢাকনির গায়ে হাঁটু দিয়ে গায়ের জোরে ঠেলা দিল। মাটি খুঁড়ছে দু’হাতে। আপন মনে বিড়বিড় করছে, ‘একটু! আর একটু! প্রতিশোধ! প্রতিশোধ নিতে হবে তোকে, জন! খবরদার, জন! হাল ছাড়বি না!’
ওর চারপাশে মাটির স্তূপ জমে কফিনের ঢাকনি প্রায় ছুঁই ছুঁই করছে। নোঙরা, আঠাল মাটি চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলছে ওকে। ফুসফুস দুটো যেন ফেটে যাবে বেশি ফোলানো বেলুনের মত! না, বাঁচতে হবে ওকে, শ্বাস নিতে হবে।
শেষবার কখন দম নিয়েছে ভাবতে চেষ্টা করল জন। মনে পড়ল না। বুক ভরে দম নিল। কিন্তু অক্সিজেন অতি কম। ফুসফুসের চাহিদা মিটল না। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছে শরীর। মনটা চলে যাচ্ছে অনেক দূরে কোথাও। ব্যথার বৌধ ভোঁতা হয়ে গেছে। কৃতজ্ঞ বোধ করল জন। অদ্ভুত একটা প্রশান্তিভরা ঝিমানি ঘিরে ধরছে ওকে গভীর ঘুমের মত।
এটাই কি তবে মৃত্যু?
এখানেই সব শেষ?
উইলবারের চেহারা মনে পড়তেই দাঁতে দাঁত চাপল জন। না, উইলবার বেঁচে থাকতে সে মরতে পারে না। প্রতিশোধ নিতে হবে। ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ!
হাত চালাল জন। উপড়ে যাওয়া নখের ব্যথায় আঙুলগুলো দপ দপ করছে। নুড়ি পাথরে ঘষা খেয়ে জায়গায় জায়গায় উঠে গেছে চামড়া আর মাংস। তীব্র ব্যথা। দম নেই। শ্বাস নিতে হাঁ করল জন। মুখে মাটি ঢুকে গেল। জিভ ঢেকে দিয়ে জমা হলো গলার কাছে, আলজিভের গোড়ায়। লালায় মিশে চটচটে কাদা হয়ে যাচ্ছে পোকামাকড় ভরা ভিজে মাটি। মুখের ভেতরে নড়ছে কীটের দল। দম আটকে যাওয়ায় বমি পেল ওর। হড়হড় করে বমি করল। গুলাচ্ছে গা, যেন উত্তাল বিক্ষুব্ধ সাগরে ছোট্ট একটা নৌকায় আছে সে।
একদলা মাটি গলায় ঢুকে আটকে গেল।
ক্ষোভে, হতাশায় ফুঁপিয়ে উঠল জন। হেরে যাচ্ছে… হেরে যাচ্ছে সে। জীবন কেড়ে নিতে ছুটে আসছে হিমশীতল ভয়াল মৃত্যু!
শেষ চেষ্টা হিসেবে প্রাণপণে মাটি খুঁড়ল। হঠাৎ টের পেল, মাটি ভেদ করে ওপরে উঠেছে একটা তর্জনী। রক্ত ভেজা আঙুলে বাতাসের ঠাণ্ডা একটা স্পর্শ। অনুভূতিটা ওকে পাগল করে তুলল।
আশা আছে! সব শেষ হয়ে যায়নি!
সমস্ত মনোযোগ একত্র করে খুঁড়তে লাগল সে। একটু একটু করে বড় হচ্ছে গর্তটা। তাজা বাতাস ঢুকছে কফিনে। শিশিরে-ভেজা-ঘাসের মিষ্টি গন্ধে ভরা সতেজ বাতাস। উদ্যম ফিরে পেল জন। খানিক পরই মাটির ওপর হাত দুটো বের করতে পারল সে। শরীরে পিচ্ছিল কাদা লেগে থাকায় ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিল।
বেরতে সুবিধা হবে।
চেষ্টা করে দেখল। আটকে গেল কাঁধ।
না, হয়নি, আরও বড় করতে হবে গর্তটা।
আবার কাজ শুরু করল জন। মাথাটা স্থির হয়েছে ওর। ধীরেসুস্থে মাটি খুঁড়ছে।
মিনিট দুয়েক পর গর্তটা যথেষ্ট প্রশস্ত হলো। কফিন থেকে শরীর মুচড়ে বেরিয়ে এল জন। হাসছে সে। হাসির দমকে কাঁপছে সারা শরীর। তবে দু’চোখ জ্বলছে তীব্র বিদ্বেষে। হ্যাঁ, এবার সময় এসেছে, খারাবি আছে উইলবারের কপালে।
একটু সুস্থির হয়ে চারপাশে তাকাল জন। কবরের এপিটাফে লেখা: জন র্যাচেল। অপঘাতে মৃত্যু। জানুয়ারি, এক। সিডার স্প্রিঙসের বুটহিলে আছে সে। তারমানে অপঘাতে মৃত্যুর সার্টিফিকেট লিখেছে ডাক্তার। উইলবার কী বুঝিয়েছে ডাক্তারকে? আততায়ীর হাতে জন র্যাচেল নিহত হয়েছে?
কাঁধ ঝাঁকাল জন। কিছু যায় আসে না। একবার র্যাঞ্চে পৌঁছতে পারলে হয়, কোনওদিন আর কাউকে কিছু বলার সুযোগ হবে না উইলবারের। আর মিথ্যে বোঝাবে না কাউকে। ক্ষতি করতে পারবে না কারও।
র্যাঞ্চটা মাইলখানেক দূরে। পা বাড়াল জন। ঘুমন্ত সিডার স্প্রিঙস পার হওয়ার সময় ধন্যবাদ দিল ভাগ্যকে।
এখন গভীর রাত না হয়ে দিন হলে হুলস্থুল পড়ে যেত গোটা শহরে। খবরটা কানে গেলেই পালাত উইলবার।
নিজের বিছানার কথা মনে পড়ল জনের। এখন নিশ্চয়ই হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করে তার খাটে ঘুমাচ্ছে উইলবার।
‘আমি আসছি,’ মনে মনে বলল জন, ‘ঘুমিয়ে নাও, এই ঘুম তোমার শেষ ঘুম, উইলবার!’
কীভাবে উইলবারকে খুন করবে ভেবে রেখেছে জন। লোকটা ওর অর্ধেক আকারের। প্রথমে উইলবারের হাত-পা বাঁধবে সে। তারপর মুখে রুমাল গুঁজে দুধের বাচ্চার মত নাক টিপে মারবে। উপভোগ করবে প্রতিটা মুহূর্ত। কাছ থেকে তারিয়ে তারিয়ে দেখবে শ্বাসকষ্টে কেমন ছটফট করে উইলবার। বেজন্মাটা এভাবেই ওকে মারতে চেয়েছিল, না হলে জীবিত অবস্থায় কফিনে পুরে দিত না।
হাঁটার গতি দ্রুত হলো জনের।
পুব আকাশ ফরসা হয়ে আসছে। ডেকে উঠে চুপ হয়ে যাচ্ছে দু’একটা কাক। তারাগুলো একেবারেই ঝাপসা। উইলবার ঘুম থেকে ওঠার আগেই পৌঁছতে হবে ওকে। কোনও ঝুঁকি নেয়া চলবে না। মনে রাখতে হবে সে নিজে অসুস্থ, আহত এবং দুর্বল।
পুবের নীলচে পাহাড়গুলোর ওপরের আকাশ লাল হয়ে উঠেছে, দিকচক্রবালে মুখ তুলেছে সূর্য, এমন সময় র্যাঞ্চে পৌঁছে গেল জন।
র্যাঞ্চহাউসের গেট হাঁ করে খুলে রেখেছে উইলবার। নিশ্চিন্তে উঠানে পা রাখল জন। কেউ দেখে ফেলবে সে-ভয় নেই। ছোট্ট র্যাঞ্চ। উইলবার ছাড়া আর কোনও কর্মচারী রাখার কোনও প্রয়োজন বোধ করেনি কখনও সে।
কয়েক কদম এগিয়েই থমকে দাঁড়াল জন। ভ্রূ কুঁচকে গেল।
উঠানে একটা নতুন কবর!
কবর এল কোত্থেকে!
এখানে কোনও কবর তো ছিল না!
কার কবর?
কবরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল জন। ভোরের আলো অনেকটা উজ্জ্বল হয়েছে। সেই আলোয় ঝুঁকে পড়ে চারকোনা এপিটাফটা দেখল। ওতে লেখা:
উইলবার স্মিথ, ফোরম্যান,
র্যাঞ্চার জন র্যাচেলকে হত্যার অপরাধে
মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত।
জুন মাস, এক তারিখ।
অপরাধ স্বীকার করেছিল উইলবার? অনুশোচনা? পাপ বোধ আর সহ্য করতে পারেনি? কী ঘটেছিল জানার কোনও উপায় আপাতত নেই। শহরে গিয়ে জানতে হবে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল জন। আবার এপিটাফে মন দিল। তারিখটা চোখে পড়তেই চমকে উঠল সে। অবিশ্বাসে থরথর করে কাঁপতে লাগল সারা শরীর
জুন মাসের এক তারিখ? তা কী করে হয়?
স্পষ্ট মনে আছে ওর, জানুয়ারির এক তারিখে বিকেলবেলা ওকে গুলি করেছে উইলবার!
আজ কত তারিখ?
কবরের মাটির দিকে তাকাল জন। মাটি এখনও চেপে বসেনি। তারমানে কবরটা অল্পদিন আগে খোঁড়া হয়েছে। বেশিদিন হয়নি মরেছে উইলবার।
দপদপ করছে জনের মাথা। মগজটা ছিঁড়ে পড়তে চাইছে। তারিখটায় কোনও ভুল নেই তো? আবার এপিটাফে চোখ বুলাল সে।
জুন মাস, এক তারিখ!
তা হলে?
নিজের কবরের এপিটাফে দেখেছে জন, জানুয়ারির এক তারিখেই ওকে কবর দেয়া হয়েছে।
পাগলের মত মাথা ঝাঁকাল জন। ভয়ঙ্কর একটা সন্দেহ উঁকি দিচ্ছে ওর মনে। কী যেন মনে থাকার কথা… কী যেন মনে হবে… অথচ কিছুতেই মনে পড়ছে না!
পাহাড়ের মাথায় উঁকি দিয়েছে রক্তভরা পাকা টুসটুসে আঙুরের মত সূর্যটা। ধীর পায়ে চৌবাচ্চার সামনে গিয়ে দাঁড়াল জন। স্থির পানি আয়নার মতই প্রতিফলিত করল ওর চেহারা। নিজেকে স্পষ্ট দেখতে পেল জন।
এই জনকে সে চেনে না। বিকৃত একটা আধপচা লাশ তাকিয়ে আছে ওর চোখের শূন্য কোটরের দিকে। মুখ থেকে গলে খসে পড়েছে মাংস। পোকা কিলবিল করছে। নাকের নরম হাড্ডি কুরেকুরে খাচ্ছে ওগুলো। মাড়িহীন দাঁত ভেঙচি কাটছে।
ছয় মাসের পচা গলা বিকৃত একটা লাশ সে!
দীর্ঘশ্বাস ফেলল জন। বুঝতে পেরেছে সবই।
‘চলে এসো, যা জানতে চেয়েছিলে জানতে পেরেছ, তোমার কাজ পৃথিবীতে শেষ হয়েছে,’ দূর, বহু দূর থেকে ভরাট মিষ্টি গলায় কে যেন ডাকছে ওকে।
ঘুরে দাঁড়াল জন। শহরটাকে এড়িয়ে ছুটতে ছুটতে বুটহিলে এল। শুয়ে পড়ল নিজের কবরে। এক সময় অনেক নীচে দেখতে পেল নীল রঙের গোল পৃথিবীটাকে। ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাচ্ছে সেই পৃথিবী
কাজী মায়মুর হোসেন
(বিদেশী গল্পের ছায়া অনুসরণে)
