পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ১.১০
১০
রাধাগোবিন্দের মন্দিরে গদাধর এবার পূজারী হল। আর হৃদয় হল কালীর সাজনদার।
কিন্তু এ কেমনতরো পূজো! সমস্ত বিশ্বসংসার থেকে চক্ষের পলকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধ্যানবিলীন হয়ে বসে থাকা। মূর্তিকে প্রতীক না ভেবে প্রাণধারী বলে ব্যবহার করা। এমন পূজা দেখেননি কোনো দিন মথুরবাবু।
এমন তন্ময় পূজা দেখবার জন্যে কারা ভিড় করেছে তাদের দিকে লক্ষ্য নেই। সে তো অল্প কথা, স্বয়ং মথুরবাবুকে পর্যন্ত দেখছে না।
দেখছে, মন্ত্র বলবার সময় মন্ত্রের উজ্জল বর্ণ কি করে তার দেহের সঙ্গে মিশে-মিশে যাচ্ছে। কি করে সর্পিণী কুণ্ডলিনী সুষুন্মা দিয়ে সহস্রারে উঠছে ধীরে-ধীরে। শরীরের যে-যে অংশ ত্যাগ করে যাচ্ছে তাই অসাড় হয়ে যাচ্ছে, আর যে-যে অংশ ভেদ করে যাচ্ছে তাতে ফুটে উঠছে বিকচ পদ্ম। পূজার জায়গায় চারদিকে জল ছিটিয়ে দিচ্ছে আর বহিঃপ্রাকার তৈরি হয়ে যাচ্ছে সঙ্গে-সঙ্গে। তন্মনস্ক হয়ে মন্ত্র পড়ছে আর সমস্ত শরীর হয়ে উঠছে জ্বলিত-তেজম্বান। যে দেখছে সেও তন্ময় হয়ে যাচ্ছে।
ধ্যানের অবস্থা কি রকম জানো? মন হবে ঠিক তেলের ধারার মত। এক ঈশ্বর-চিন্তা ছাড়া আর কোনো চিন্তা নেই। পাখি মারবার জন্যে ব্যাধ তাগ করছে। সামনে দিয়ে বর চলে গেল মিছিল করে, কত গাড়ি-ঘোড়া কত বাজনা কত হট্টগোল। ব্যাধের হুঁস নেই। জানতেও পেল না বর গেল চতুর্দোলায়। বুঝলে,স্পর্শবোধ পর্যন্ত থাকে না। গায়ের উপর দিয়ে সাপ হেঁটে যাবে, সাপও বুঝতে পারবে না. কিসের উপর দিয়ে হেঁটে গেল। মনের বা’র-বাড়িতে কপাট দিয়ে বোসো। কপাটের বাইরে পড়ে থাকবে তোমার রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ আর স্পর্শ–তোমার পঞ্চেন্দ্রিয়ের পাঁচ উপচার। বন্ধ ঘরে তুমি আর তোমার মন। প্রতীক্ষা আর অন্ধকার। বিশ্বাস আর ব্যাকুলতা। বারুদ আর বহ্নিকণা। প্রথম প্রথম সব ভোগের থালা আসবে ভারে ভারে। পঞ্চেন্দ্রিয়ের পাঁচ প্রবঞ্চনা। বিচলিত হবি না, তলিয়ে যাবি, তলিয়ে যাবি।
অন্ধকার থেকে চলে আসবি শুভ্রতায়। দেখবি, আর ওরা আসবে না। আর কার কাছে আসবে?
‘ধ্যান করতে-করতে প্রথম-প্রথম আমার কি দর্শন হতো জানিস?’ বললেন এক দিন ঠাকুর, ‘স্পষ্ট দেখলুম, সামনে টাকার কাঁড়ি, শাল-দোশালা, এক থালা সন্দেশ, দুটো মেয়ে আর তাদের ফাঁদী নথ। মনকে শুধোলুম, মন তুই কি চাস, কোনটা চাস? মন বললে কোনোটাই চাই না। ঈশ্বরের পাদপদ্ম ছাড়া আমার আর কিছুই চাইবার নেই।’
রামকুমার খুশি। মন্দিরে এবার মন দিয়েছে গদাধর। কিন্তু যার জন্যে পূজো সেই রোজগার হচ্ছে কই? ফিরছে কই সংসারের অবস্থা? চাকরি করতে বসে টাকার প্রতি টান না হলে চলবে কেন? টাকা ছাড়া উপায়ান্তর কি?’ ‘আচ্ছা, এটা তোমার কী মনে হয় বলতে পারো?’ ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন ডাক্তারকে—নাম ভগবান রূদ্র। ‘টাকা ছুঁলেই হাত আমার এঁকে-বেঁকে যায়। নিশ্বাস পড়ে না।’
বলেন কি। ডাক্তার একটা টাকা বের করে ঠাকুরের হাতে রাখলেন। কি আশ্চর্য, দেখতে-দেখতে ঠাকুরের হাত বেঁকে গেল। রুদ্ধ হয়ে গেল নিশ্বাস। তা ছাড়া—চিন্তিত মনে ভাবছেন রামকুমার—ছেলেটার কেমন উদাস উদাস ভাব। পঞ্চবটীর জঙ্গলে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকে একলা। কখনো বা সকাল-সন্ধ্যেয় গঙ্গার পাড় ধরে দীর্ঘ পথ হেঁটে বেড়ায় আপন-মনে। কারুর সঙ্গে মেশে না,
হাসে না, কি চায় কি ভাবে, কে জানে। বাড়িতে মা’র জন্যে মন কেমন করছে হয়তো।
একদিন ডেকে প্রশ্ন করলেন। ‘মা’র জন্যে মন কেমন করছে রে গদাই? বাড়ি যাবি?’
‘মা’র জন্যে?’ কি বলবে ঠিক করতে পারল না গদাধর।
বললে, ‘না, বাড়ি যাব কেন?’
তবে এমনি ঘুরে বেড়াস কেন বনে-বাদাড়ে? কেন নির্জনে গিয়ে বসে থাকিস? কী হয়েছে?
নির্জন না হলে ভগবানচিন্তা হয় কই। সোনা গলিয়ে গয়না গড়াব, তা যদি গলাবার সময় পাঁচ বার ডাকে, তা হলে গয়না গড়াবো কি দিয়ে? ধ্যান করবো মনে বনে কোণে। ঈশ্বরচিন্তা যত লোকে টের না পায় ততই ভালো। হয়তো এ মেজাজ চলে যাবে গদাধরের। এ একটা ক্ষণিক ঔদাস্য ছাড়া কিছু নয়। তেমনি ভাবলেন রামকুমার। কালীকে বললেন, মা, গদাধরকে সুমতি দাও। শরীর ক্রমশ ভেঙে পড়ছে রামকুমারের। চলে যাবার আগে ছেলেটাকে মানুষ করে দিতে হয়। যাতে দাঁড়াতে পারে নিজের পায়ে। যাতে দু’পয়সা ঘরে এনে খাবার যোগাড় করতে পারে সংসারের। অন্তত তাঁর চাকরিটা সে ধরতে পারে সহজে।
তাই ভেবে গদাধরকে তিনি চণ্ডীপাঠ শেখাতে লাগলেন। শেখাতে লাগলেন কালীপুজোর বিধি-নিয়ম। বিস্তীর্ণ অনুশাসনের রীতি-নীতি।
কিন্তু শক্তিমন্ত্রে দীক্ষা না নিয়ে পূজো করা যাবে না কালীকে। দীক্ষা নেব তো শক্তিসাধক কোথায়? আছে—বৈঠকখানার কেনারাম ভট্চাজ। দক্ষিণেশ্বরে আসে-যায়, রামকুমারের জানা-শোনা। একজন নামজাদা তান্ত্রিক। গদাধরের পছন্দ হল। বললে, এঁকেই তবে গুরু করি।
শক্তিমন্ত্রে দীক্ষা নিল গদাধর। যেই তার কানে মন্ত্র পড়ল, চীৎকার করে উঠল গদাধর, ডুবে গেল গভীর সমাধিতে। গুরু তো হতবুদ্ধি। তাঁর নিজের মন্ত্রের এত শক্তি তা তাঁর নিজেরই অজানা।
‘এক কাজ কর এখন থেকে।’
বললেন রামকুমার ‘তুই কালীঘরে আয়, আমি রাধাগোবিন্দের ভার নিই।’
মথুরবাবুও পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন।
‘আমি শাস্ত্রের কি জানি? না জানি তন্ত্রমন্ত্র, না জানি আইনকানুন। কোথায় কি ত্রুটি করে ফেলব তার ঠিক নেই।’
‘তোমাকে মানতে হবে না শাস্ত্র।
দরকার নেই জেনে। বললেন মথুরবাবু,
‘তোমার ভক্তি আর আন্তরিকতাই শাস্ত্র হয়ে দাঁড়াবে। ভক্তিভরে যাই তুমি দেবে দেবীকে তাই তিনি গ্রহণ করবেন।’
একের ভিতরটা নড়ে উঠল গদাধরের। এক কথায় রাজি হয়ে গেল।
একটা বড় মানুষ জুটিয়ে দাও—মা’র কাছে প্রার্থনা করেছিলেন ঠাকুর। বড়লোক নয় শুধু বড় মানুষ। মা মথুরবাবুকে জুটিয়ে দিলেন।
‘মাকে বললাম, মা, এ দেহরক্ষা কেমন করে হবে? সাধু ভক্ত নিয়েই বা কেমন করে থাকব? একটা বড় মানুষ জুটিয়ে দাও। মা সেজবাবুকে পাঠিয়ে দিলেন। চোদ্দ বছর ধরে সেবা করলে সেজবাবু।
রামকুমার বললেন, এবার একটু বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। হৃদয় এল রামকুমারের জায়গায়। ছুটি পেল রামকুমার। বাড়ি যাবার আগে মূলাজোড় গিয়েছিল কি কাজে, সেখানেই চোখ বুজলে।
বাবার স্থলে দাদা—দাদার মৃত্যুতে বিহ্বল হয়ে পড়ল গদাধর। তখন তাকে ঈশ্বরতৃষ্ণা পেয়ে বসেছে। পেয়ে বসেছে মৃত্যুর রহস্য ছেদন করবার আকুলতা। তাই দাদার জন্যে শোক মিশে গেল ঈশ্বরাকাঙ্ক্ষার তীব্রতায়। যদি ঈশ্বর বুঝি তা হলে মৃত্যুকেও বুঝব। থাকেন যদি ঈশ্বর, তাহলে আর মৃত্যু নেই। কচ নির্বিকল্প সমাধিতে রয়েছেন। সমাধি ভাঙবার পর একজন প্রশ্ন করলে, এখন কী দেখছ? কচ বললেন, তখন যা দেখেছি, এখনো তাই। দেখছি, জগৎ যেন তাঁতে জুড়ে রয়েছে। তিনিই পরিপূর্ণ, তিনিই সর্বময়। যা কিছু হয়েছে, তিনিই হয়েছেন। কিছু নেবার কিছু ফেলবার এমন কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
মা যেন আলো করে বসে আছেন! মা’র পূজার ভার নিয়েছে গদাধর। ভার নিয়েই নিজেকে ঢেলে দিয়েছে, বিকিয়ে দিয়েছে। মা’র কোলে চড়ে বসেছে।
নিজে মা’র হাত ধরেনি—বলছে, তুই আমার হাত ধরে নিয়ে চল। আমি যদি তোর হাত ধরি, পড়ে যেতে পারি হাত ফসকে। কিন্তু তুই যদি একবার আমার হাত ধরিস আমার আর ভয় নেই৷
ভগবানকে কে জানবে?
জানবার চেষ্টাও করি না। আমি মাকে জানি, তাই মা বলে ডাকি। যা ভালো বুঝবেন, করবেন। বেড়াল-ছানার মত হেঁসেলে রাখলে তিনিই রাখবেন, আবার বাবুদের বিছানায় এনে শোয়ালে তিনিই শোয়াবেন। আমি কেন বলতে যাব? ইচ্ছা হয় জানাবেন, না-হয় নাই জানাবেন। মা হয়ে বুঝবেন না তিনি সন্তানের ব্যাকুলতা?
ছোট ছেলে, মা’র ঐশ্বর্যের সে কী বোঝে? তার মা আছে এই তার পরম ঐশ্বর্য।
মা গো, তুই যেন তিন-ভুবন আলো করে বসেছিস।
মা’র মূর্তি রোজ ফুলে আর চন্দনে সাজায় গদাধর। মূর্তির গায়ে হাত লাগে আর চমকে-চমকে ওঠে। মনে হয় এ যেন নিশ্চল পাষাণ নয়, প্রাণময়ী জননী। পাথুরে শৈত্য নেই, এ যেন প্রফুল্ল প্রাণতাপ। যেন এখনি চোখের পালক নড়ে উঠবে, কথা কয়ে উঠবেন, হাত বাড়িয়ে টেনে নেবেন কোলের কাছে। কই, অনুভবে-অনুমানে নয়, সত্যরূপে প্রত্যক্ষ হবি কবে?
রাতে, সবাই যখন ঘুমিয়েছে, তখন শয্যা ছেড়ে একা একা বেরিয়ে পড়ে গদাধর। সকাল হলে ফেরে। দু চোখ ফোলা, জবাফুলের মত লাল। যেন সমস্ত রাত নির্জনে বসে সে কেঁদেছে, দু’চোখের পাতা মুহূর্তের জন্যেও এক করেনি। কেমন উদ্ভ্রান্ত, উন্মাদের মত চেহারা।
‘কোথায় যাও রোজ রাত্তিরে?’ হৃদয় ধরে পড়ল একদিন।
‘ঘুম আসে না। তাই ঠাণ্ডায় ঘুরে বেড়াই।’ পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল গদাধর।
‘ঘুম আসে না মানে? না ঘুমালে শরীর যে ভেঙে পড়বে একেবারে।’ শুষ্ক-শুভ্র চোখে তাকিয়ে রইল গদাধর ‘ঘুম না এলে আমি করব কি!’
তখনকার মত চেপে গেল হৃদয়। নিশ্চয়ই কোনো রহস্য আছে। হৃদয় ঘুঘু ছেলে, ঠিক বার করে ফেলবে।
অশ্বত্থ, বিল্ব, বট, ধাত্রী বা আমলকী আর অশোক এই পাঁচ বৃক্ষের সমাহারের নাম পঞ্চবটী। তখন পঞ্চবটীর চার পাশে ঘোর জঙ্গল, ঘোরালো অন্ধকার। দিনের বেলায়ও ওদিকে মাড়াতে গা ছমছম করে। একে গোরস্থান তায় অন্ধকারের জড়িপটিতে গাছপালার গোলকধাঁধা—রাত্রে সেখানে ভূত-প্রেতের মাতামাতি চলে। কারুর সাহস নেই ওদিকে পা বাড়ায়।
যেমন-কে-তেমন রাত নিবিড় হয়ে আসতেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছে গদাধর। পিছু-পিছু হৃদয়ও বেরিয়ে পড়েছে সন্তর্পণে। দেখি কি করে। কোথায় যায়। কি সর্বনাশ! সেই সর্বগ্রাসী জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়েছে গদাধর।
মা গো, মন্দির এখন বন্ধ, কিন্তু তোর এই আকাশ-ভুবন-জোড়া চিরসুন্দরের মন্দিরে তো দরজা পড়ে না। আমি চুপি-চুপি তাই চলে এসেছি তোর কোলের কাছে। এই অন্ধকারে তোর হাতের স্পর্শ, এই স্তব্ধতায় তোর নিশ্বাস, এই প্রতীক্ষায় তোর পদধ্বনি৷ আমাকে দেখা দে।
বাইরে হৃদয় দাঁড়িয়ে রইল কাঠ হয়ে। হাঁকডাক দিলে শুনতে পাবে না গদাধর, হয়তো গ্রাহ্যও করবে না। তবে কি উপায়ে তাকে নিরস্ত করা যায়। টেনে আনা যায় ঐ জঙ্গল থেকে। শেষকালে সর্পাঘাতে মারা যাবে বুঝি।
একের পর এক ঢিল ছুঁড়তে লাগল হৃদয়। ভূতের আস্তানা, নিশ্চয় ভূতেই ঢেলা মারছে। যদি হুঁস হয়, যদি বা একটু ভয় পায়! কা কস্য পরিবেদনা! একটি পাতারও চাঞ্চল্য নেই। যেমন নিরেট স্তব্ধতা তেমনি নীরন্ধ্র অন্ধকার। ভয় পেয়ে হৃদয়ই পিছু হটল।
ফিরে এল বিছানায়। ঘুমুতে পারল না।
পরদিন ফাঁকায় পেয়ে পাকড়াল গদাধরকে। বললে, ‘রাত্রে জঙ্গলে ঢুকে কর কী?’
‘ধ্যান করি।’
‘ধ্যান কর? কার?’
‘আমার মা’র। মা’র মন্দির বন্ধ হয় না দিনে-রাত্রে।’
‘কিন্তু, জঙ্গলে কেন?’
‘নির্জন না হলে ধ্যান করবার জোর আসে না মনের মধ্যে। ঐ আমলকী গাছের তলায় বসে ধ্যান করি। আমলকী গাছের তলায় বসে ধ্যান করলে কামনা সিদ্ধ হয়।’
তোমার আবার কামনা কী?’
‘একমাত্র কামনা-মাকে দেখব, মাকে পাব, মা’তে মিশে থাকব।’
কিন্তু এ সব কাজ ঠিক হচ্ছে না। মন্দিরে সেবা-পূজার পরিশ্রমেই তুমি যথেষ্ট কাহিল হয়ে পড়েছ। তার উপর আহারে তোমার রুচি নেই, দেহের কোনো আরাম নেই। শেষ কালে রাতের ঘুমটকুও যদি বিসর্জন দাও তুমি পাগল হয়ে যাবে। এ সব ছাড়ো।
মাকে তো তাই বলি—আমাকে পাগল করে দে। ‘আমায় দে মা পাগল করে,
আমার কাজ নেই জ্ঞানবিচারে।’
কিন্তু জায়গাটা তুমি ভালো বাছোনি।
ওখানে ভূতের আড্ডা। রাতদিন দাপা-দাপি করে। লোফালুফি করে ঢিল নিয়ে। টের পাও না?
গায়ের উপর দিয়ে সাপ হেঁটে গেলেও টের পাই না।
ঢিল ছুঁড়ে নিরস্ত করা গেল না গদাধরকে। একদিন শেষ কালে সাহস সঞ্চয় করল হৃদয়। মামার ভাগ্নে সে—কিসের ভয়? গভীর রাত্রে অন্ধকারে ঢুকে পড়ল সে বনের মধ্যে। চলে এল আমলকী গাছের কাছাকাছি।
কিন্তু গাছের তলায় সে কী দেখছে? সর্বাঙ্গে শিউরে উঠল হৃদয়। মামা সত্যি- সত্যি পাগল হয়ে গেছে না কি?
দেখছে নিরবকাশ নগ্ন হয়ে ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছে গদাধর। নিবাত দীপ-শিখার মত নিষ্কম্প। গিরিশৃঙ্গের মত সমাহিত ।
ধ্যান করবে তো করো, কিন্তু এ কী পাগলামী! শুধু পরনের ধুতিই ত্যাগ করেনি, গলার পৈতে পর্যন্ত খুলে রেখেছে।
হৃদয়ের সহ্য হল না। এগিয়ে এসে ধমকে উঠল ‘এ কি হচ্ছে? পৈতে-কাপড় ফেলে দিয়ে উলঙ্গ হয়ে বসেছ যে?’
‘ও, তুই! হৃদে? এ সব ফেলে দিয়েছি কেন জিজ্ঞেস করছিস? এরা হচ্ছে ছেলের মুখে চুষি-কাঠির মত। ছেলে চুষি নিয়ে যতক্ষণ চোষে মা আসে না। যখন চুষি ফেলে চীৎকার করে তখন মা ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে ছুটে আসে। অহং-এর মায়ার রং-চং আমি মুছে ফেলে দিয়েছি, অন্তরের অরণ্যে বসে ডাকছি মাকে চেঁচিয়ে। মা, ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে ছুটে আয় আমাকে কোলে নিতে।’ উত্তর মনের মত হল না হৃদয়ের। যত খুশি ডাকো, কিন্তু দিগ্বসন হবার কী হয়েছে!
‘তুই কী জানিস!’ ঝলসে উঠল গদাধর ‘অষ্ট পাশে বদ্ধ হয়ে আছে মানুষ। ঘৃণা লজ্জা ভয় কুল শীল মান জাতি আর অভিমান-এই অষ্ট-পাশ। মাকে ডাকতে হলে পাশমুক্ত হয়ে ডাকতে হয়। অহং-এর আঁশটি থাকলেও তিনি আসেন না। তাই ও-সব খুলে রেখেছি।
ধ্যানের পর ফিরব যখন আবার অজ্ঞানের মেলায়, তখন আবার ও-সব পরে নেব।’
গোপীদের বস্ত্রহরণ হয়েছিল জানিস? তার মানে কি? তার মানে আর কিছুই নয়—গোপীদের সব পাশই গিয়েছিল, শুধু লজ্জা বাকি ছিল। তাই তিনি ও-পাশটাও ঘুচিয়ে দিলেন।
পরিধেয় আর পৈতে—এ দুটো উপাধি ছাড়া কিছু নয়। অভিমানের চিহ্ন। আমি বামুন, জাতে-জন্মে সকলের চেয়ে বড়, এই অহংকার।
এই অহংকার বর্জন না করলে দীনতা আসে না। দীনতা না এলে সরলতা আসে না। আমার মা’র আরেক নাম সরলতা।
আমি কী? আমি কি বস্ত্র না উপবীত? আমি কি হাড় না মাংস? রক্ত না নাড়ীভুড়ি? খোঁজো। খুঁজে কী পাচ্ছ দেখতে? দেখছ, আমি নেই, শুধু তিনি। আমার কিছুই উপাধি নেই, শুধু তাঁর ঐশ্বর্য।
রামচন্দ্রকে বললেন হনুমান, ‘রাম, কখনো ভাবি তুমি পূর্ণ, আমি অংশ। কখনো ভাবি তুমি সেবা, আমি সেবক। কখনো ভাবি তুমি প্রভু, আমি দাস। কিন্তু, রাম, যখন তত্ত্বজ্ঞান হয়, তখন দেখি তুমিও যা আমিও তাই। তুমিই আমি, আমিই তুমি।’
যা সোহহং তাই তত্ত্বমসি।
হৃদয় মামাকে বকতে এসেছিল, সব অন্য রকম হয়ে গেল। বললে, ‘অহংকার যায় কই? এই যায় আবার এই আসে।’
তাই তো বলি, আমি যখন যাবে না, তখন থাক শালা দাস-আমি হয়ে। আমি ঈশ্বরের দাস, আমি ঈশ্বরের ভক্ত, আমি ঈশ্বরের ছেলে এ অহংকার ভালো। হাজার বিচার করো, আমি যায় না, চায় না যেতে। ভাবো একবার, চারদিকে অনন্ত জল, উপরে-নিচে সামনে-পিছনে ডাইনে-বাঁয়ে জলে জলময়। সেই জলের মধ্যে একটি কুম্ভ আছে। কুম্ভের বাইরে যেমন জল তেমনি ভিতরেও জল। জলে জল। তবু কুম্ভটি তো তখনো আছে। ঐটি হচ্ছে আমিরূপী কুম্ভ। যতক্ষণ কুম্ভ আছে ততক্ষণ আমি-তুমি আছে। তুমি ঠাকুর আমি ভক্ত। তুমি প্রভু আমি দাস। তুমি আকাশ আমি পৃথিবী। ‘কিন্তু কুম্ভ যখন থাকবে না? ভেঙে যাবে?’
গদাধর আবার ধ্যানস্থ হল ।
তখন রাম আর হনুমান এক। তখন সে এক অন্য কথা। তখনকার কথা তখন।
১১
‘মা গো, তুই কই? আমাকে কৃপা কর্ আমাকে দেখা দে। রামপ্রসাদকে দেখা দিয়েছিস,আমায় তবে কেন দেখা দিবি নে? আমি কি দোষ করেছি জানিয়ে যা।এত কান্নায়ও কি সব দোষ ধুয়ে গেল না? আমি ধন জন ভোগ বিভব কিছুই চাই না, মা। শুধু তোকে চাই। তুই দয়া কর্। দেখা দে।’
চোখের জলে বুক ভেসে যায় গদাধরের। অশ্রুভরা গলাতেই ফের গান ধরে,
আদিভূতা সনাতনী শূন্যরূপা শশীভালী
ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যবে মুণ্ডমালা কোথা পেলি!
পরের দিন আবার কান্না ‘মা গো, আরেক দিন চলে গেল। বৃথাই গেল। তুই এলি না। এই তো সামান্য আয়ু তার মধ্যে আরো একদিন নিয়ে নিলি, মা। আমার কান্না কি তুই শুনিস না? আমার কান্নায় কি জোর নেই? আমি কি পারছি না কাঁদতে?’ নুয়ে পড়ে ঘাসের মধ্যে মুখ ঘষে গদাধর। বলে – ‘মা, তুই কোথায়? তুই কি সত্যি আছিস? না, সব মায়া, মিথ্যা, সব মনের ভুল? যদি তুই আছিস, তোর জন্যে যখন এত আলো এত অন্ধকার, তখন তোকে আমি দেখতে পাচ্ছি না কেন? রামপ্রসাদ তো তোকে দেখেছে। তোকে তবে ছলনা বলি কি করে? তুই আয়। দেখা দে। চোখের সামনে দাঁড়া।’ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাঁদছে গদাধর। চুল ছিঁড়ছে। মাটিতে মুখ ঘষছে। চোখের জলে কাদা করে ফেলছে। ‘আহা, ছোকরার মা মরেছে বুঝি।’ পথ-চলতি লোক দাঁড়িয়ে পড়ে কৌতূহলে।
‘কিসে ম’ল? কবে? মাকে খুব ভালোবাসত, তাই না?’
চার পাশে ভিড়, তবু গদাধরের লজ্জা নেই, লৌকিকতা নেই। এক বিন্দু বিরতি নেই কান্নার।
‘এক-এক করে দিন চলে যাচ্ছে, মা। এক-পা এক-পা করে এগুচ্ছি মৃত্যুর দিকে। আর দেরি সহ্য হচ্ছে না! নরজন্ম যে ফুরিয়ে যাচ্ছে। শাস্ত্রে বলে, তুই-ই সত্য, তুই-ই একমাত্র অধিগম্য। শাস্ত্র কি সব গাঁজাখুরি? তুই কি ভাঁওতা? সমস্ত একটা ভেল্কিবাজি? সমস্ত জগতের কি কেউ জননী নেই? যদি থাকে তবে সে কি আমারো জননী নয়?’
যন্ত্রণায় ছটফট করছে গদাধর। মনে হচ্ছে এক ঘরে আছে একতাল সোনা, অন্য ঘরে ঢুকেছে এক চোর। মাঝখানে শুধু একটা পাতলা যবনিকা। সোনা নেবার জন্যে চোর কি পাগল হয়ে ফিরবে না? চাইবে না সে পর্দাটা দুই হাতে ছিঁড়ে ফেলতে? টুকরো-টুকরো করে ফেলতে? গুরু নেই, সাধু বা সিদ্ধ পুরুষ কেউ নেই যে, রীতি-নীতি বা পদ্ধতি-প্রকরণ শেখায়। এমন কেউ স্বজন-বন্ধু নেই যে অভিজ্ঞতার কথা বলে। শাস্ত্রপুঁথি তো চিরকালের জন্যে শিকেয় তোলা। কোনোই সহায়-সম্বল নেই গদাধরের। শুধু আছে উত্তুঙ্গ বিশ্বাস আর উদ্দাম ব্যাকুলতা। পূজোয় নিয়ম মত আর বসতে পারে না গদাধর। কেমন যেন সে হয়ে গিয়েছে। মূর্তির সামনে নিশ্চল হয়ে বসে থাকে। কখনো কখনো, ঘুমের মধ্যে শিশু যেমন কাঁদে তেমনি করে কেঁদে ওঠে। পূজো করতে করতে হঠাৎ কখনো ফুল নিয়ে নিজের মাথার উপর রাখে আর পূজো ভুলে ডুবে যায় সমাধিতে। ফুল দিয়ে দেবীকে সাজাচ্ছে তো সাজাচ্ছেই, শেষ আর হচ্ছে না। আরতি করছে তো করছেই, দীপ থেকে ঘণ্টায়, আবার ঘণ্টা থেকে দীপেই ফিরে আসছে। দেরি করছে, প্রতীক্ষা করছে। এই বুঝি মা জেগে উঠবেন।
‘আমার কথা তুই কেন শুনেছিস না মা? আমি তোর অযোগ্য ছেলে বলে কি তোর স্নেহেরও অযোগ্য? আমি বেদ-বেদান্ত কিছ জানি না বলে কি তোর স্নেহও জানব না?’
সবাই বিদ্রূপ করছে। বলছে, আহা মরি! কী পূজোই না হচ্ছে!
গদাধরের ভ্রূক্ষেপ নেই। লোকের মুখের দিকে সে চাইবে না। সে চেয়ে আছে মা’র মুখের দিকে। ঘুম নেই। খাবার গলছে না গলা দিয়ে। সমস্ত মুখ আর বুক লাল।
তবু কোথায় মা! কোথায় জগদীশ্বরী!
যেমন করে ভেজা গামছা নিংড়োয় তেমনি করে কে বুকের মধ্যিখানটা নিংড়োচ্ছে গদাধরের। মনে ভয় ঢুকেছে, হয়তো ইহজীবনে মা’র দর্শনলাভ হবেই না। মা থাকতেও মাকে যদি না পাই তবে কী হবে বেঁচে থেকে? জীবনের আর তবে মূল্য কি?
হঠাৎ কালী-ঘরে যে খাঁড়া ঝুলছিল তার উপরে নজর পড়ল। গদাধর শিশুর মতন ছুটে গিয়ে পেড়ে আনলে সেই খড়্গা৷ এই মুহুতেই জীবনের সে অবসান করে দেবে। আত্ম-রক্তপাতে জননীর নিষ্ঠুরতার প্রতিশোধ নেবে।
‘গলায় আঘাত করতে যাচ্ছে, অমনি সামনে মা এসে দাঁড়ালেন।
মা! তুই মা? তুই এলি এত দিনে?
মেঝের উপর মূর্ছিত হয়ে পড়ল গদাধর।
কোথাও কিছু নেই। ‘দেখলুম—কী দেখলুম–যেন ঘর-বাড়ি ছাদ-দেয়াল আবডাল জানলা-দরজা আড়াল-সব এক নিমেষে কোথায় উড়ে গেল, মিশে গেল। শুধু এক সীমাহীন উজ্জ্বল সমুদ্র। চৈতন্য-সমুদ্র। যেদিকে তাকাই, দেখি তার জ্বলন্ত ঢেউ আমাকে গ্রাস করবার জন্যে ছুটে আসছে। চার দিক থেকে ছুটে আসছে। চোখের পলকে আমাকে আচ্ছাদন করে ফেলল, ভেঙে গুঁড়িয়ে মিশিয়ে দিল একাকার করে। কোথায় নিশ্চিহ্ন হয়ে তলিয়ে গেলাম।
কিন্তু ঐ কি তোমার মা? ঐ তোমার মাতৃরূপ? শুধু, চৈতন্যময়ী জ্যোতি? তোমার মা হাসে না, কথা বলে না, খায় না, হাঁটে না?
কি জানি। ঢেউয়ে-ঢেউয়ে আমাকে ডুবিয়ে নিয়ে গেল অতলে। আমি আনন্দে ‘মা’’মা’ বলে কেঁদে উঠলাম৷ মনে হল ও তো ঢেউ নয়, মা-ই আমাকে টেনে নিলেন কোলের মধ্যে।
জল আর বরফ, বরফ আর জল। যাই জল তাই বরফ, যাই বরফ তাই জল। নির্জনে গোপনে বসে কাঁদতে লাগল গদাধর – ‘মা গো, তুই যে কেমন তাই আমাকে দেখিয়ে দে। তুই সাকার কি নিরাকার বুঝতে পারি না। তুই কালী না ব্রহ্ম তা তুই-ই জানিস। তুই যা হ, আমায় কৃপা কর্, দেখা দে।’
পরে আবার বলতে লাগল আকুল হয়ে – ‘ভক্তের কাছে একবার ব্যক্তি হয়ে দেখা দে মা! একবার বরফ হয়ে ওঠ। তারপর যখন জ্ঞানসমূর্য উদয় হবে তখন না-হয় বরফ গলে আগেকার যেমন জল তেমনি জল হয়ে যাবি। আমি তোর মা-রূপটি ভালোবাসি। আমায় তুই মা হয়েই দেখা দে। আমি তোর সন্তান, আমার সন্তানভাব।’
একবার দেখে কি তৃপ্তি আছে গদাধরের? সে বহুবার, অনন্ত বার দেখতে চায়। মায়ে পূর্ণ হয়ে থাকতে চায়, লীন হয়ে থাকতে চায়। যা পূর্ণ তাই লীন। চাই সেই অবিরাম যোগ। অবিচ্ছিন্ন আনন্দ।
লোক দাঁড়িয়ে থাকে চার দিকে, কত কি মন্তব্য করে, গদাধর কান পাতে না, চোখে দেখে না। মনে হয় সব পটে-আঁকা ছায়ামূর্তি। অবস্তু, অসত্য। মনে হয় সংসারে শুধু মা আর মা’র জন্যে এই কাতর কাকুতি ছাড়া আর কিছু নেই। তাই কে কি বলবে বা ভাববে কিছু আসে-যায় না গদাধরের।
শুধু আসে যায়, মা কবে আবার দেখা দেবেন, কবে থাকবেন চিরদ্যুতি হয়ে!
একমাত্র হৃদয়ের দুশ্চিন্তা। এ যে কঠিন রোগ হয়ে পড়ল মামার। কাজের বার হয়ে পড়ল ক্রমে ক্রমে। সাধনা করতে বসে স্নায়ুবিকার হল। চিকিৎসা করতে হয়। ভূকৈলাসের রাজার যে কবরেজ ছিল, নামজাদা বদ্যি, তাকে খবর পাঠাল। কবরেজ এসে নাড়ী টিপলে। ওষুধ দিলে। এ রোগের ওষুধ নেই। এ রোগের ওষুধ মাতৃদর্শন। মাতৃস্পৰ্শন!
হৃদয় ভাবলে, কামারপুকুরে খবর পাঠাই। মা’র ছেলে ফিরে যাক মা’র কাছে।
১২
শুধু একবার দেখা দিয়েই পালিয়ে গেলে চলবে না। চোখের সামনে দাঁড়াতে হবে স্থির হয়ে। শুধু একটু হাত বাড়িয়ে দিলি, বা দু’টি চোখ নাচালি, বা ছুটে পালিয়ে গেলি চুল এলিয়ে, তাতে হবে না। শান্ত হয়ে সর্বসম্পূর্ণ হয়ে দাঁড়াতে হবে। উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে থাকতে হবে সঙ্গে-সঙ্গে। পায়ে-পায়ে, চোখে-চোখে, নিশ্বাসে-নিশ্বাসে। পৃথিবীকে ঘিরে যেমন বাতাসের প্রাণ-স্পর্শ তেমনি আমাকে ঘিরে তোর অচঞ্চল অঞ্চল।
‘মন রে, ঐ দ্যাখ।’
কি দেখব?
ভৈরবকে দ্যাখ, মা’র নাটমন্দিরের ছাদের আলসেয় ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে আছে। অমনি নিশ্চল ষড়ভাবশূন্য হয়ে বসবি, চোখ রাখবি মা’র পদ্মপদের উপরে।
শরীরে ঝড় বয়ে যাবে, ভেঙে পড়বে সব ছাদ-দেয়াল। তুই নড়বি না। তুই নড়বি কেন? যার নাড়ীর টান সে নড়ুক।
আমার কি হচ্ছে, কিছুই বুঝছি না। কিংবা কিছুই হচ্ছে না মাথামুন্ডু। মন রে, মাকে তাই তুই বল কেঁদে-কেঁদে,
বল, আমাকে শিখিয়ে দে মা, কি করে তোকে দেখতে পাব। আমি একেবারে নিরেট, আমি না জানি তন্ত্রমন্ত্র, না জানি যাগযজ্ঞ, তুই না বলে দিলে কে বলে দেবে? তুই-ই বল, তুই ছাড়া আমার কি আর কেউ আছে?
মনকে এ কথা বলতে বলে দিয়ে চোখ বুজল গদাধর। ধ্যানে নিশ্চিহ্নচেতন হয়ে গেল। মনে হল কে যেন শরীরের হাড়ে হাড়ে জোড় খাইয়ে তালা মেরে দিচ্ছে। একটু যে নড়বে-চড়বে, বা আসন বদলাবে তার সাধ্য নেই। আবার যতক্ষণ না গ্রন্থিগুলি খুলে দিচ্ছে ততক্ষণ এমনি স্থাণু হয়ে বসে থাকো জড়পুত্তলির মত। মন রে, বসে থাক। ভালোই তো, থাক বসে৷ যে তোকে বসিয়ে রেখেছে, সে কতক্ষণ বসে থাকতে পারে দেখি।
কি দেখছিস?
জ্যোতির্বিন্দু দেখছি।
সর্ষেফুল দেখছিস। তার মানে কিছুই দেখছিস না। না। এখন আর বিন্দু নেই। পুঞ্জ-পুঞ্জ হয়ে উঠেছে। তার পর?
গলানো রূপোর স্রোত চলেছে পৃথিবীতে। সব কিছু জ্যোতির্ময় হয়ে উঠেছে। উঠেছে? তবে ধৈর্য ধর্। এবার দেখা দেবেন জ্যোতির্ময়ী। জগদ্ভাসিনী। ঘরে স্তব্ধ হয়ে অপেক্ষা করছে গদাধর। সমাধি হয়েছে। সম্যক প্রকারে ধারণ করার ভাবই তো সমাধি। মা আগে আংশিক ছিলেন, কখনো প্রসারিত একখানি হাত, কখনো স্থির-স্থিত দু’টি পা, কখনো বা হাসির ঝিলিক দেওয়া একটি ক্ষণচকিত চাহনি—এখন মা সম্যকসম্পূর্ণ হয়ে উঠছেন। সমগ্র, সর্বাঙ্গসম্পন্ন। অষ্টৈশ্বর্যে সৌষ্ঠবান্বিত। ঝমঝম শব্দে পাঁয়জোর বাজিয়ে কে উঠছে রে মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে? গভীর রাতে নির্জন মন্দিরের চাতালে কে এমন ছুটোছুটি করছে? ক্ষিপ্র পায়ে বেরিয়ে এল গদাধর। দেখল, চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পেল, মা মহামায়া মুক্তকেশে মন্দিরের দোতলার বারান্দার উপরে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রলয়-ঘনঘটা ঘোররূপা প্রচণ্ডা। দিগবস্ত্রা নবনীল-ঘনশ্যামা। পূবে একবার কলকাতার দিকে তাকাচ্ছেন, আরেক বার তাকাচ্ছেন গঙ্গার দিকে, পশ্চিমে। সর্ববর্ণময়ী, পরব্রহ্মস্বরূপিণী। মা আমার কালো কেন বলতে পারিস? যার আদিও নেই অন্তও নেই তাকে তুই কোন রং দিয়ে বোঝাবি? যার কোনো রং-ই নেই, সে কালো ছাড়া আর কি? মা আমার উলঙ্গিনী কেন? মা যে অদ্বিতীয়া। যেখানে দ্বিতীয় বলে কেউ নেই, সেখানে আবরণের কথা ওঠে না! যে অন্তহীন তাকে তুই আবরণ দিয়ে ঢাকবি কি করে?
মন্দিরে ঢুকল গদাধর। মন্দিরে মূর্তি নেই, তার বদলে সশরীরে মা আছেন।
বসে। গদাধর তাঁর নাকের নিচে হাত রাখল, হাতে স্পষ্ট নিশ্বাসের স্পর্শ। মন্দিরে ভোগ সাজিয়ে রেখেছে, দেখল, গায়ের রঙে ঘর আলো করে মা খেতে বসেছেন। এক-এক দিন মন্ত্র বলবার পর্যন্ত ফুরসৎ দেন না, নৈবেদ্যের জন্যে হাত বাড়িয়ে বসেন।
‘দাঁড়া, আগে মন্ত্রটা বলি, তার পর খাস।’ চেঁচিয়ে উঠল গদাধর।
হৃদয় ছুটে এল। দেখল, জবা-বেলপাতা নিবেদন করবার আগেই মামা নৈবেদ্যের থালা নিবেদন করছে মাকে। ‘এ কি মামা, এ কি করছ?’
‘কি করব। রাক্ষুসির যে তর সইছে না। খিদের জ্বালায় নোলা সকসক করছে।’ শুধু তাই নয়। নৈবেদ্যের থালা থেকে এক গ্লাস ভাত নিয়ে মামা সিংহাসনে উঠে মা’র মুখে ঠেকিয়ে বলছে, ‘খা, খা, বেশ করে খা— হঠাৎ সুর বদলে বলছে, ‘কি, আমাকে খেতে হবে?
আমি না খেলে খাবি নে? বেশ, খাচ্ছি—’বলে গ্রাসের খানিকটা নিজের মুখের মধ্যে পুরে দিলে। পরে উচ্ছিষ্টাংশ মা’র মুখে দিয়ে বললে, ‘নে, এবার খা। আমি তো খেলাম—’ হৃদয় স্তম্ভিত। নিঃসন্দেহ, বদ্ধ পাগল হয়েছে মামা। ফুল-বেলপাতা মায়ের পায়ে না দিয়ে নিজের পায়ে রাখছে। মাকে পূজা না করে নিজেকে পূজা করছে। সর্বনাশ! সেজবাবু দেখতে পেলে আর রক্ষে থাকবে না। এক ধমকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দেবেন। হৃদয়েরও অন্ন উঠবে সঙ্গে-সঙ্গে। শুধু পাগল নয়, কাঁধে ভূত চেপেছে মামার। নইলে দেবতাকে নিয়ে এ কী শুরু করেছে ছেলে-খেলা! মা’র চিবুক ধরে আদর করছে, কথা কইছে, ঠাট্টা-তামাশা করছে। মা যেন সসম্ভ্রম দূরত্বের জিনিস নয়, একেবারে কোলে চড়ে বসবার জিনিস। যেন অনম্য প্রণম্য নয়, আদর-ভালোবাসার কাঙাল। যেন বিধির বাঁধনে দরকার নেই, যেন গুটি-গুটি পায়ে আর এগুতে হবে না ভয়ে ভয়ে, মাকে সিংহাসনে বসিয়ে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাতে লুটোতে হবে না আর চৌকাঠের বাইরে। সটান সিংহাসনে উঠে তার কোলে চড়ে বসতে হবে। সেই মা—যে ত্রিজগৎ-প্রসবিনী—সেই মা’র কোলে কোলের শিশু হয়ে চড়ে বসব। আমি উঠবন্দী রায়ত না হয়ে ক্ষেমংকরীর খাস তালুকের প্রজা হব। এই যে মা’র কোলে চেপে বসেছি—এ হচ্ছে ‘ক্ষেমার খাসে আছি বসে, আমার মহালে নাই শুখা-হাজা।’ যিনি জগৎরঙ্গিণী তাঁর সঙ্গে ঘরের ভাষায় রঙ্গ-রহস্য করব। মা যে আমার সহজ মানুষ। সহজ না হলে সহজ মানুষকে চিনব কি করে?
গদাধরের মুখ-চোখ লাল। যেন মদ খেয়েছে আকণ্ঠ। টলে-টলে নাচছে আর গান গাইছে – ‘সুরাপান করি নে রে, সুধা খাই রে কুতূহলে। আমার মন মাতালে মেতেছে আজ, মদ-মাতালে মাতাল বলে।’ সরাসরি গান শোনাচ্ছে মাকে। মা’র হাত ধরে নেচে বেড়াচ্ছে-
‘আর ভুলালে ভুলব না গো,
ভয়ে হেলব না গো দলব না গো—
প্রসাদ বলে, দুধ খেয়েছি
ঘোলে মিশে ঘুলব না গো৷৷’
রাত্রে ঘুম নেই। ভাবের ঘোরে কার সঙ্গে কথা কয়। কখনো বা গান শোনায়।
‘ঘুমুবে না মামা?’
দুই চোখে ধারা, গান ধরে গদাধর:
‘ঘুম ছটেছে, আর কি ঘুমাই,
যোগে যাগে জেগে আছি।
এবার যার ঘুম তারে দিয়ে
ঘুমেরে ঘুম পাড়িয়েছি।
যে দেশে রজনী নাই,
সেই দেশের এক লোক পেয়েছি৷’
কোনো দিন বা মন্দিরে মাকে শয়ন দিচ্ছে, হঠাৎ সেই শূন্যরূপাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল গদাধর – ‘আমাকে তোর কাছে শুতে বলছিস? আচ্ছা, শুচ্ছি তোর বুকের কাছে।’ মা’র সর্ব অঙ্গে বাৎসল্য, দুই চোখে স্নেহসিঞ্চিত লাবণী। হাত-পা গুটিয়ে ছোট্টটি হয়ে মা’র রূপোর খাটে শুয়ে পড়ল গদাধর। নীল-নিবিড় মেঘমণ্ডলের কোলে ক্ষীণ শশিকলা।
ভোগ নিবেদন করছে, কালীঘরে এক বেড়াল এসে উপস্থিত। ঘুরছে আর মিউ-মিউ করছে। ওমা, মা এসেছিস? খাবি মা? খা। ভোগের অন্ন বেড়ালকে খাওয়াতে বসল গদাধর।
গণেশ একবার মেরেছিল একটা বেড়ালকে। ভগবতী বললেন, তুই আমাকে মেরেছিস। আমার সর্ব অঙ্গে যন্ত্রণা। সে কি কথা? গণেশ তো হতবুদ্ধি। মাকে সে মারবে? এই দ্যাখ, তোর মারের দাগ আমার গায়ে ফুটে রয়েছে। লজ্জায়, অনুশোচনায় মাটির সঙ্গে মিশে গেল গণেশ। যা মার্জারী তাই ভগবতী। রাত্রিতে তো মন্দিরে আলো জ্বলে। মা যদি আসেন, ঘরের মধ্যে চলাফেরা করেন, তবে দেয়ালে তাঁর ছায়া পড়ে না কেন? ভাবে হৃদয়। মাকে দেখার পুণ্য করিনি কিন্তু দেয়ালে তাঁর ছায়া দেখতে দোষ কি!
দিব্য অঙ্গের ছায়া থাকবে কি? সে অচক্ষু হয়েও দেখে, অকর্ণ হয়েও শোনে। অস্পর্শ হয়েও কোলে নেয়।
বিশুদ্ধ পাগলামো। তাই বলে হেসে উড়িয়ে দেওয়া চলে না এ কেলেঙ্কার। দেব-দেবী নিয়ে এই চপল ছেলেমানুষি। আগে নিজের পায়ে ঠেকিয়ে পরে মায়ের পায়ে ফুল দেওয়া। আগে নিজে খেয়ে মাকে এঁটো খাওয়ানো। খাটের উপর মা’র পাশেই শুয়ে পড়া। মা’র চিবুক ধরে ফস্টিনস্টি করা। অসম্ভব এই অনার্যতা। একটা বিহিত করতে হয়। জানাতে হয় সেজবাবুকে।
কালীঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়ায় এসে সব মন্দিরের আমলারা। খাজাঞ্চি আর গোমস্তা, নায়েব আর আটপ্রহরী। কি-রকম যেন আবিষ্টের মতন চেয়ে থাকে। গদাধরের ধরন-ধারণ সব কিম্ভূত তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু আন্তরিকতায় ভরা। যা কিছু করছে যেন অকপটে করছে। বিশ্বাস বেশি বলেই যেন এত সাহস। আর ঐ যে উন্মনা ভাব ও যেন ঠিক উন্মাদের ভাব নয়।
সবাই শাসন-বারণ করতে এসেছিল। মুখস্ফূট করতে পেল না। দপ্তরে ফিরে পরামর্শে বসল-কি করা! আর কি করা! জানবাজারে খোদ মালিকের দরবারে দরখাস্ত দিতে হয়। যাই বলো, না হচ্ছে বিধিমত পূজা, না হচ্ছে ভোগরাগ। অশাস্ত্রীয় অকাণ্ডের জন্যে শেষকালে না কোনো অঘটন ঘটে!
মথুরবাবু লিখে পাঠালেন, দাঁড়াও, আমি নিজে গিয়ে সব ব্যবস্থা করছি। এবার তল্পি বাঁধো। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও। অনাচারের দণ্ড নাও। কাউকে কিছু না বলে পূজোর মধ্যে মন্দিরে এসে উপস্থিত হলেন মথুরবাবু, সটান ঢুকে পড়লেন কালীঘরে। ঢুকে যা দেখলেন, তা নরদেহে দেখবেন বলে কল্পনা করেননি। গদাধর তনুমনোময় হয়ে পূজা করছে। কোনো দিকে লক্ষ্য নেই, লজ্জা নেই। যে মথুরবাবুর নিশ্বাসের আভাসে আর সবাই শশব্যস্ত, সে মন্দিরে এল বা চলে গেল, ভ্রুক্ষেপ করে না গদাধর। তার সমস্ত নিবেশ-নিক্ষেপ মা’র উপরে। কখনো কাঁদছে আকুল হয়ে, কখনো বা চেঁচিয়ে উঠছে আনন্দে। তন্ময় হয়ে গান গাইছে কখনো, কখনো বা ধ্যানে নিঃসংজ্ঞ হয়ে যাচ্ছে। মা’র সঙ্গে কথা কইছে নির্ভয়ে। অভিমান করছে, আবদারে ছেলের মত আখখুটেপনা করছে।
এ কি দেখছেন মথুরবাবু!
তাঁর দুই হাতে কি কোনো শাসনের উদ্যতি ছিল? হঠাৎ সেই দুই হাত তাঁর অঞ্জলিবদ্ধ হল কেন?
ঘুমঘোর ভাঙবে এবার মা’র। পাষাণী এবার প্রাণময়ী হয়ে উঠবে। আর ভাবনা নেই। মিলেছে ওস্তাদ বাজীকর। ঘুম-ভাঙানে বাঁশিওয়ালা।
যেমন এসেছিলেন তেমনি ফিরে গেলেন চুপি-চুপি। জানবাজার থেকে ফরমান পাঠালেন, গদাধরকে যেন বাধা দেওয়া না হয়। যেমন তার খুশি তেমনি ভাবেই পূজো করুক মাকে৷
সীমা ছেড়ে চলে এসেছে সে অসীমায়। মাটির উপরকার বাঁধা-ধরা লাইন-ফেলা রাস্তা ছেড়ে সে চলে এসেছে আকাশের অনাবৃতিতে। ক্রিয়াকর্মের শাস্ত্র থেকে সর্বার্পণের অশাসনে। বৈধীভক্তি থেকে পরমপ্রেমরূপা ভক্তিতে। শুধু সন্তরণে নয়, নিমজ্জনে। ইন্দ্রিয়বিষয়ে অবিবেকীর যেমন আগ্রহ সেই ‘পরানুরক্তিরীশ্বরে।’ সর্ব বন্ধনবিমোচনে।
‘মা-মা যে করো, মাকে দেখতে পাও তুমি?’ নরেন্দ্রনাথ জিজ্ঞেস করল ঠাকুরকে। জিজ্ঞাসার মধ্যে যেন বা একটা অবিশ্বাসের রহস্য।
‘দেখতে পাই কি রে! মা’র সঙ্গে বসে কথা কই, খাই, মা’র পাশটিতে শুয়ে ঘুমুই—
নরেন্দ্রের স্বরে তখনো প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপ – ঈশ্বরকে দেখা যায় কখনো? কোথায় সে?’ নিচে, উপরে, পিছনে, সামনে, দক্ষিণে, উত্তরে—স এবেদং সর্বমিতি। ভিতরে বাইরে—বহিরন্তশ্চ ভূতানাম্। আব্রহ্মস্তম্ব পর্যন্ত তিনি। অশরীরং শরীরেষু অনবস্থেষু অবস্থিতং। দেখবি বৈ কি, নিশ্চয়ই দেখবি। তোর এমন চক্ষু তুই দেখবি নে?
প্রতাপ হাজরা দক্ষিণেশ্বরে আস্তানা গেড়েছে। সে হচ্ছে নগদ-বিদায়ের সাধু। তার মানে, ধর্ম-কর্ম করে কিন্তু সব সময়েই প্রত্যাশা করে কিছু চাল-কলা। যদি কিছু পার্থিব উপকার না হয় তবে কি হবে এ-সব জপতপে? সব খাটনিরই মুনাফা আছে আর এর বেলায়ই শুধু লবডঙ্কা! যদি জপতপ করে কিছু সিদ্ধাই হয় তবে হয়তো সংসারের অবস্থাটা ফেরানো চলে। মনে-মনে এই কামনা নিয়েই বসেছে পূজার্চনায়।
‘হাজরা শালার ভারি পাটোয়ারি বুদ্ধি। ঠাকুর সাবধান করে দিতেন ভক্তদের, ‘ওর কথা শুনিস নে তোরা কেউ।’
কিন্তু হাজরার কথা নরেনের মন্দ লাগে না। এই লাভ-লোকসান খতিয়ে দেখার কথা। যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে স্পর্শসহ সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছুনো। স্তবের সঙ্গে- সঙ্গে বাস্তবেরও হিসেব নেওয়া। দেহ যতক্ষণ আছে ততক্ষণ সন্দেহ তো থাকবেই। হাজরার কথা তাই একেবারে ফেলনা নয়৷
‘যো কুছ হ্যায় সো তুহি হ্যায়—এ গানটা গা তো রে, নরেন। ঠাকুর ফরমাস করলেন।
নরেন গান ধরল। তাকে দিয়ে গান গাইয়ে ছাড়লেন ঠাকুর।
সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম। যা কিছ, তুই দেখছিস তোর চোখের সামনে, সব তিনি। গাছ পাখি মানুষ পশু সব। আকাশ মাটি বাতাস আগুন জড় চেতন—সমস্ত। নিত্যো নিত্যানাং চেতনশ্চেতনানাম্। তিনি সর্বব্যাপী। সর্বাতীত। স্বয়ংপ্রকাশ। কে ঈশ্বর?
কে ঈশ্বর! অল্পতার শেষ সীমা পরমাণু আর বৃহতের শেষ সীমা আকাশ। তেমনি জ্ঞান ক্রিয়াশক্তির অল্পতার পরাকাষ্ঠা ক্ষুদ্র জীব আর তার আতিশয্যের পরাকাষ্ঠা—ঈশ্বর।
সহজ করে বলুন ।
সহজ করে বলব! ঈশ্বর কে তাই জানতে চেয়েছিস? সহজ করেই বলি।’তত্ত্বমসি’। অর্থাৎ তুই-ই সেই। হাসতে লাগলেন ঠাকুর তবু সংশয় যায় না নরেনের। সংশয় থাকলেই মীমাংসা। নির্ণয় তো সংশয়সাপেক্ষ। সংশয় আছে বলেই সংসারবিচার। আত্মবিচার। থাক, থাক তুই সংশয়ে।
নরেন বারান্দায় এসে বসল হাজরার কাছে। তামাক সাজছে হাজরা। হুঁকোটা বাড়িয়ে দিল নরেনের হাতে। এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে নরেন বললে, ‘বলে কি অসম্ভব কথা! এ কখনো হতে পারে?’
‘কি বলে?’ হাজরা কটাক্ষ করল।
‘বলে কি না, ঘটি বাটি থালা গ্লাশ সব কিছু, ঈশ্বর। যা কিছু দেখছি চোখ মেলে তাই না কি তাই। এমন কি আপনি আমি— আমরাও না কি—’
হাসির রোল তুলল হাজরা।
পাগল আর কাকে বলে! সে ব্যঙ্গের হাসিতে নরেনও যোগ দিলে ।
ঘরের মধ্যে ঠাকুরের তখনো অর্ধবাহ্যদশা। সে সব্যঙ্গ হাসির শব্দ তাঁর কানে এল। তিনি নিমেষে বালকের মতন হয়ে গেলেন। পরনের কাপড়খানি বগলে নিয়ে বেরিয়ে এলেন বারান্দায়।
‘কি বলছিস রে, নরেন?’ হাসতে হাসতে কাছে এসে নরেনকে ছুঁয়ে দিলেন ঠাকুর। ছুঁয়েই সমাধিস্থ হয়ে গেলেন।
আর নরেন? নরেনের কি হল?
কি যে হল কে বলবে। চোখের সমুখ থেকে একটা পর্দা উঠে গেল। যেন চেতনান্তর হল। নিম্নস্থ দুই চোখ বুজে গিয়ে জেগে উঠল ললাটোর্ধ্ব তৃতীয় নয়ন।
চেয়ে দেখল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ঈশ্বর ছাড়া আর কিছু নেই।
ধূলিকণা থেকে আকাশ-বিকাশ সূর্য পর্যন্ত সব কিছু ঈশ্বর।
এ কি, চোখে ঘোর লাগল না কি? চোখ বুজল নরেন। অন্ধকারেও সেই ঈশ্বর। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল নরেন ।
বাড়িতে এসেও সেই ভাব। ইট কাঠ দরজা চৌকাঠ সব প্রাণময়। খেতে বসল, মনে হল, থালা-বাটি, ভাত-ডাল সব কিছুর মধ্যে ঈশ্বর বসে আছেন। যিনি পরিবেশন করছেন আর যে খাচ্ছে দুই-ই তিনি। ভাতের থালার সামনে নিস্পন্দের মত বসে রইল নরেন। ‘কি রে, বসে আছিস কেন? খা।’ মা মনে করিয়ে দিলেন। খেতে শুরু করল নরেন। কিন্তু যে খাচ্ছে সে কে! যা খাচ্ছে তাই বা কি! ভোর হল তবুও ঘোর গেল না। কলেজে চলেছে, রাস্তায় বেরিয়েও সেই বিচিত্র অনুভূতি। সর্বানন্দপ্রদাতা ঈশ্বর সমস্ত কিছুর মধ্যে জাগ্রত হয়ে আছেন। প্রায় গায়ের উপর গাড়ি এসে পড়ছে, তবু সরবার প্রবৃত্তি হয় না, মনে হয় গাড়িও যা সেও তাই, দুই-ই ঈশ্বরপূর্ণ। বিকেলে হেদোর ধারে বেড়াতে বেরিয়ে লোহার রেলিঙে মাথা ঠুকছে নরেন, বল্, তুই কে? তুই কি ঈশ্বর?
কোথাও কি রন্ধ্র নেই, অন্ত নেই? জাগরণে যে আছে সে কি স্বপ্নেও আছে? সুষুপ্তিতেও কি সেই? আর সব কিছুর অন্তরালেও কি সেই এক অখণ্ড-স্বরূপ?
সব সেই এক। সাপ চুপ করে কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকলেও সাপ, আবার তির্যক-গতি হয়ে এঁকে-বেঁকে চললেও সাপ। নিত্যেও যিনি লীলায়ও তিনি। সব একাকার।
শুধু ঈশ্বর দেখছি এ হলেই চলবে না। তাঁকে ঘরে আনতে হবে, তাঁর সঙ্গে আলাপ করতে হবে। রাজাকে তো অনেকেই দেখে পথে দাঁড়িয়ে। কিন্তু বাড়িতে এনে খাওয়াতে-দাওয়াতে পারে দু’-এক জন।
নরেন আকুল হয়ে উঠল। আমি কি পথে দাঁড়িয়ে রাজা দেখব? আমি কি তাকে টেনে আনতে পারব না ঘরের মধ্যে?
১৩
গদাধরের সমস্ত শরীরে ভীষণ জ্বালা। প্রায় ছ’মাস ধরে ভুগছে। নানান ধরনের কবরেজি তেল এনে দিলে হৃদয়।
গায়ে-মাথায় মাখিয়ে দিলে। কিছুতেই কিছু হল না।
পঞ্চবটীতে বসে ধ্যান করছে গদাধর, হঠাৎ তার শরীর থেকে কে একজন বেরিয়ে এল। ঘুটঘুটে কালো, চোখ দু’টো লাল, ভয় পাওয়াবার মতন চেহারা। নেশা-খোরের মত টলে-টলে পড়ছে। আরো একজন বেরিয়ে এল পিছন পিছন। পরনে গেরুয়া, হাতে ত্রিশূল, প্রশান্ত মূর্তি। সেই ঘোরদর্শন কদাকারকে সে আক্রমণ করলে, নিপাত করলে। পাপ-পুরুষ ভস্ম হয়ে গেল। মথূরের কাছে রানি শুনলেন সব কাণ্ড-কারখানা। ঠিক করলেন একদিন গদাধরকে দেখে আসবেন নিজের চোখে। তাই এসেছেন।
গঙ্গায় স্নান করে ঢুকেছেন মন্দিরে। মা’র মূর্তির কাছে বসেছেন শান্ত হয়ে। গদাধরের গান বড় ভালো লাগে। তাই বললেন, একটা গান ধরো।
গান ধরল গদাধর। রানি ধ্যানে চোখ বুজলেন ৷
হঠাৎ, বলা-কওয়া নেই, গদাধর রানির গালে এক চড় বসিয়ে দিল। ধমকে উঠল, ‘এখানেও ঐ চিন্তা?’
রানি হকচকিয়ে উঠলেন। এস্টেট নিয়ে একটা কঠিন মামলা চলছে, তারই কথা ভাবছিলেন ধ্যানে বসে। কিন্তু, তাই বলে সামান্য একজন মন্দিরের পুরোত তাঁর গায়ে হাত তুলবে না কি?
মন্দিরের খাজাঞ্চি-গোমস্তারা উৎসুক হয়ে উঠল। এবার নির্ঘাৎ বরখাস্ত হবেন বাছাধন।
কথাটা মথুরবাবুর কানে তুললে। বিরক্ত হলেন অত্যন্ত। এ কি অশোভন ব্যবহার!
হৃদয় ছুটে এল মামার কাছে।
গদাধরের মুখে নির্মল প্রশান্তি।
ভীতকণ্ঠে বললে, ‘এ তুমি কি করেছ!
‘আমি তার কি জানি! মা বললেন, এখানে এসেও ও বিষয়সম্পত্তি ভাবছে, এক ঘা বসিয়ে দে পিঠের উপর। তাই বসিয়ে দিলাম। মা’র কথা অমান্য করি কি করে?’
মথুরবাবুকে ডেকে পাঠালেন রাসমণি। বললেন, ‘ঠিকই করেছে গদাধর। ওর হাত দিয়ে মা আমাকে শাসন করেছেন।’
সত্যি?
‘হ্যাঁ, আর সেই আঘাতে হৃদয় আলো করে দিয়েছেন।
ভক্তি-ভাবের পাঁচটি প্রদীপ। শান্ত দাস্য সখ্য বাৎসল্য আর মধুর। পঞ্চ-ভাবেই সাধনা করছে গদাধর।
শান্ত হচ্ছে ঐকাত্মজ্ঞান। নির্গুণ সাধন। স্বস্থ, নির্লিপ্ত, ব্রহ্মনিষ্পন্ন হয়ে বসে থাকো। আরগুলো গুণাত্মক, রাগরঞ্জিত। দাস্য হচ্ছে শ্রীরামচন্দ্রের প্রতি হনুমানের ভাব। সখ্য হচ্ছে বাসুদেবের প্রতি অর্জুনের। বাৎসল্য হচ্ছে গোপালের প্রতি যশোদার। আর মধুর হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি গোপিনীর।
যার যেমন ভাব সে তেমনি দেখে। তমোগুণী ভক্ত নিজে মাংস খায়, তাই ভাবে মা-ও পাঁঠা খাবে—তাই বলিদান দেয়। রজোগুণীর বিস্তারে-বিলাসে বিশ্বাস, তাই সে নানান ব্যঞ্জনে ভোগ সাজায়। সত্ত্বগুণীর জাঁক নেই জৌলুস নেই। তার পূজো লোকে জানতেও পারে না। ফুল নেই তো বেলপাতায় আর গঙ্গা-জলে পূজো করে। শীতল দেয় দু’টি মুড়কি কি বাতাসা দিয়ে।
আর আছে ত্রিগুণাতীত ভক্ত। যে শুধু নাম করে। ঈশ্বরের নাম করাই তাঁকে পূজো করা।
শান্ত হচ্ছে ঋষিদের ভাব। স্বানন্দভাবে পরিতুষ্ট। ভিক্ষান্নমাত্রে খুশি, ছেঁড়া কাঁথাই যেন লক্ষ্মীর ঐশ্বর্য। শব্দ মূল তরুতে আশ্রয়। শুধু আদি নিয়ে আছে, অন্ত-মধ্যের ধার ধারে না।
‘অহর্নিশং ব্রহ্মণি যে রমন্তঃ’—সেই যোগীর ভাব।
আর দাস্য হচ্ছে বলবানের ভাব। রামের কাজ করছে হনুমান, শত সিংহের শক্তি তার শরীরে। কে অত বাছ-বিচার করে, গোটা গন্ধমাদনই নিয়ে এল। দ্বারকায় এসে হনুমান বললে, আমি সীতারাম দেখব। শ্রীকৃষ্ণ বললেন, এখানে সীতা পাবে কোথায়? তা জানি না। তুমি যখন আছ তখন সীতাকেও চাই। শ্রীকৃষ্ণ তখন রুক্মিণীকে বললেন, ‘তুমি সীতা হয়ে বোস, তা না হলে হনুমানের কাছে রক্ষে নেই।’ সীতার পাতালপ্রবেশের সময় এমন অবস্থা, রামকেই প্রায় মারতে যায়।
ধনমান দেহসুখ কিছুই চায় না, শুধু ঈশ্বরকে চায়। স্ফটিক স্তম্ভ থেকে ব্রহ্মাস্ত্র নিয়ে পালাচ্ছে, মন্দোদরী অনেক রকম ফল দেখিয়ে লোভ দেখাতে লাগল। ভাবলে ফলের লোভে যদি অস্ত্রটা ফেলে দেয়। কিন্তু হনুমান কি ভোলবার ছেলে? বললে, আমার শ্রীরামই কল্পতরু, আমার কি ফলের অভাব? লঙ্কাজয়ের পরে অযোধ্যায় ফিরেছেন রাম-সীতা। কত মিলন-উৎসব, কত আনন্দ-কোলাহল, পরিত্যক্তের মত এক কোণে পড়ে আছেন কৈকেয়ী। কই কই, আমার কৈকেয়ী-মা কই? হনুমান এসে তাঁকে সংবর্ধনা করলে। ভাগ্যিস তুমি রামকে পাঠিয়েছিলে! বনের মানুষ হয়ে তাই মনের মানুষকে পেলাম।
ঈশ্বরের আনন্দে মগ্ন হলে ভক্তের আর হিসেব থাকে না। একজন এসে হনুমানকে জিজ্ঞেস করলে, ‘আজ কোন্ তিথি?’ হনুমান বললে, ‘কে তোমার বার-তিথির খোঁজ রাখে। রাম ছাড়া আর কিছু জানি না।’
আর সখ্যভাব কেমন জানো? এই–এসো ভাই এসো, কাছে এসে বোসো।
অনেক দূর থেকে এলে বুঝি, বোসো, পাখার হাওয়া করি। হাত-মুখ ধোও, খাও পেট ভরে। গল্প করো।
বাৎসল্য ভাবে যশোদা ননী হাতে করে বেড়াতেন কখন গোপাল খেতে চাইবে। বলতেন, আমি না দেখলে গোপালকে দেখবে কে? তার অসুখ করবে। উদ্ধব বললে, ‘মা, তোমার কৃষ্ণ সাক্ষাৎ ভগবান, তিনি জগৎচিন্তামণি।’ যশোদা বললেন, ‘ওরে তোদের চিন্তামণিকে চিনি না, আমার গোপাল কেমন আছে তাই বল।’ কার কি জানি না, আমার গোপাল!
আর মধুর ভাব শ্রীমতীর ভাব, গোপিনীর ভাব। মেঘ কি ময়ূরকণ্ঠ দেখছেন আর কৃষ্ণময় হয়ে যাচ্ছেন। চৈতন্যদেব মেড়গাঁ দিয়ে চলেছেন, শুনলেন এ গাঁয়ের মাটিতে খোল হয়। যেমনি শোনা অমনি ভাবাবেশ। এ ভাব মহাভাব।
কি নিষ্ঠা গোপিনীদের! মথুরায় দ্বারীকে অনেক কাকুতি-মিনতি করে তো সভায় ঢুকল। কিন্তু কৃষ্ণ কোথায়? দ্বারী নিয়ে গেল কৃষ্ণের কাছে। কৃষ্ণ পাগড়ি মাথায় দিয়ে বসে আছে। গোপিনীরা মুখ নামিয়ে রইল-এ আবার কে! এর সঙ্গে কথা কয়ে আমরা কি শেষে দ্বিচারিণী হব? চল ফিরে যাই। আমাদের সেই পীতধড়া মোহনচূড়া-পরা কৃষ্ণ কোথায়? আমরা তাকে চাই। দক্ষিণেশ্বরে প্রায়ই আসত এক পাগলি। কি নাম কোথায় থাকে কেউ জানে না। এসে ঠাকুরকে শুধু গান শোনাবে। বাধা দিলে বড় জ্বালাতন করে। ভক্তরা তাই ত্রস্ত থাকে সব সময়। একদিন কাছে এসে কান্না শুরু করল। সে কি কান্না! ঠাকুর জিগগেস করলেন, ‘কাঁদছিস কেন? ‘
পাগলি বললে, ‘মাথা ধরেছে।’ এই অজুহাতে কাছটিতে বসে রইল।
আরেক দিন, ঠাকুর খেতে বসেছেন, কোত্থেকে হঠাৎ পাগলি এসে হাজির। বললে, ‘দয়া করলেন না? মনে ঠেললেন কেন?’
ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোর কি ভাব?’
পাগলি বললে, ‘মধুর ভাব।’
‘ওরে, আমার যে সন্তান ভাব। আমার যে সব মেয়েরা মা হয়।’
‘তা আমি জানি না। সে খবরে আমার কাজ নেই।’
গিরীশ ঘোষ শুনছিলেন ঠাকুরের মুখে। বললেন, ‘পাগলি ধন্য, কৃতার্থ জন্ম! পাগলই হোক আর মারই খাক ভক্তদের হাতে, সর্বক্ষণ তো আপনাকেই চিন্তা করছে। আপনাকে চিন্তা করে—আমিই বা কি ছিলাম আর কি হলাম!’ গদাধরের এখন দাস্য ভাব।
হনুমানের ভাব। রঘুবীরের সেবক মহাবীর। অহং তো যাবে না সহজে। তাই বলি, থাক, দাস-আমি হয়ে থাক। তুমি প্রভু আমি দাস। তুমি সেব্য আমি সেবক। তুমি রাজাধিরাজ আমি অকিঞ্চন। হনুমানের ধ্যানে ডুবে গিয়ে হনুমানের মতই হয়ে গেল গদাধর। পরনের কাপড়টা কোমরে বেঁধেছে আর পিছনের দিকে লেজ দিয়েছে ঝুলিয়ে। হাঁটে না, লাফিয়ে লাফিয়ে চলে। বেশির ভাগ সময়ই গাছে উঠে বসে থাকে। খোসা না ছাড়িয়ে না কেটে আস্ত-আস্ত ফল খায়। আর আওয়াজ করে, রঘুবীর, রঘুবীর।
হনুমানের সাধনায় মেরুদণ্ডের প্রান্তভাগটা এক ইঞ্চি বেড়ে গিয়েছিল গদাধরের। সে ভাব চলে যাবার পর আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।
পঞ্চবটীতে শূন্যমনে চুপচাপ বসে আছে গদাধর, হঠাৎ জায়গাটা আলো হয়ে গেল। চেয়ে দেখল এক অপূর্ব সন্দরী নারী সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে অপরূপ লাবণ্য, বেদনা করুণা ক্ষমা ও ধৃতির স্নিগ্ধতা। কে তুমি? উত্তরদিক হতে গদাধরের দিকে এগিয়ে আসছে দক্ষিণে। চোখে সেই প্রসন্ন দাক্ষিণ্য। কে তুমি?
সহসা কোত্থেকে এক হনুমান উপ করে লাফিয়ে পড়ল সেখানে।
চিনতে আর দেরি হল না। রামময়জীবিতা সীতা-দেবী এসেছেন।
‘মা’ ‘মা’ বলে পায়ে লুটিয়ে পড়তে যাচ্ছে গদাধর, অমনি সেই মূর্তি তার দেহের মধ্যে ঢুকে পড়ল। গদাধর লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
পঞ্চবটীর কাছেই হাঁসপুকুর। সে পুকুর ঝালাতে গিয়ে বাড়তি মাটি ফেলা হয়েছে এই পঞ্চবটীর গর্ভে। ফলে আমলকী গাছটা আর রইল না। মারা পড়ল।
ওরে হৃদে, আমার বসবার জায়গার একটা বন্দোবস্ত কর।
গদাধর নিজেই অশ্বত্থের চারা লাগাল। হৃদয় নিয়ে এল বট অশোক বেল আর আমলকী। তুলসী আর অপরাজিতার চারা পুঁতে জায়গাটা ঘিরে দিলে। ক’দিনেই ঘন ঝোপ হয়ে উঠল। ভিতরে ধ্যানে বসলে কেউ দেখতে পায় না বাইরে থেকে।
ওরে হৃদে, ছাগলে-গরুতে ঝোপঝাড় সব খেয়ে ফেললে যে। নতুন লাগানো গাছের চারাতেও দাঁত বসিয়েছে। ওরে, কাঠ-বাঁশ দিয়ে শক্ত করে বেড়া লাগা—কাঠ-বাঁশ কই? হৃদয় ফাঁপরে পড়ল। দড়ি-পেরেক কই?
কোথা থেকে কি হয়ে গেল কেউ টের পেল না।
প্রবল জোয়ারের জলে গঙ্গার এ-পারে ঠিক মন্দিরের ঘাটের সামনে এক বোঝা কাঠ-বাঁশ আর দড়ি-পেরেক ভেসে এসেছে।
যে ঠিক রাজার বেটা সে মাসোয়ারা পায়।
তবে, যদি মুখে রাম নাম বলতে বলতে হাত দিয়ে ফের কাপড় সামলাস, তাহলে হবে না। জানিস নে গল্পটা?
চারদিক অন্ধকার করে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। বুড়ি গয়লানির নদী পার হয়ে দুধ যোগাতে যেতে হয়। সেদিন দূর্যোগে পারাপারের নৌকো পেল না। রাম-নামের কথা মনে পড়ল। ভাবলে, রাম-নামে ভবসমুদ্র পার হয়, আর আমি এই ছোট্ট নদীটা পার হতে পারব না? নিশ্চয়ই পারব। রাম-নাম করতে করতে নদী পার হয়ে গেল বুড়ি। যে বাড়িতে দুধ দেয় সে এক পণ্ডিত। সে তো অবাক, এ দুর্যোগে বুড়ি নদী পার হল কি করে? কেন বাবা ঠাকুর, রাম-রাম করে পার হয়ে এলাম। ওপারে কি কাজ ছিল পণ্ডিতের। বললে, বলিস কি রে? আমিও অমনি রাম-রাম করে পার হতে পারব? কেন পারবে না?
নিশ্চয়ই পারবে। দুজনে এল নদীর ধারে। বুড়ি রাম-রাম করে পার হতে লাগল। পণ্ডিতও রাম-রাম করে এগতে লাগল, কিন্তু জলে নেমেই কাপড় গুটিয়ে নিলে। বুড়ি বললে, ঠাকুর, রাম-রামও করবে আবার কাপড়ও সামলাবে-তা হবে না। পণ্ডিত পড়ে রইল পিছনে। দিব্যি পার হয়ে গেল বুড়ি।
যদি ধরবি তো এমনি আঁকড়ে ধরবি।
বিশ্বাস চাই। সরল বিশ্বাস। অন্ধ বিশ্বাস। হাজরা টিপ্পনি কাটল, অন্ধ বিশ্বাস? নিশ্চয়ই। বিশ্বাসের তো সবটাই অন্ধ। বিশ্বাসের আবার চোখ কি! ছিদ্র কি! হয় বল, বিশ্বাস, নয় বল, জ্ঞান। জ্ঞান দূরূহ, বিশ্বাস সোজা। মা’র কাছে কেঁদে কেঁদে বল, মা, আমাকে ভক্তি দে, বিশ্বাস দে।
১৪
দিনে-দিনে পাগলামি বেড়েই চলেছে গদাধরের।
মথুরবাবু পর্যন্ত বিচলিত হলেন। নিশ্চয়ই কিছু স্নায়ুবিকার ঘটেছে। কলকাতার সেরা কবিরাজ গঙ্গাপ্রসাদ সেনকে ডেকে আনালেন।
কা কস্য পরিবেদনা। গঙ্গাপ্রসাদ বিফল হল। তবু গঙ্গাপ্রসাদকে ধন্বন্তরি বলেই মানতেন ঠাকুর। ঈশ্বরের বিভূতি না থাকলে কি অত বড় চিকিৎসক হয়? যেখানেই গুণের বিকাশ, সেখানেই ঈশ্বরের বিভূতি। সেখানেই নত হবি।
‘গঙ্গাপ্রসাদ বললে, আপনি রাতে জল খাবেন না। আমি ঐ কথা বেদবাক্য বলে ধরে রেখেছি। আমি জানি ও সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি।’
ধন্বন্তরিতে যখন কিছু হল না তখন নিজেই নিজেকে সামলে চলুন। আইন-কানুনের মধ্যে নিয়ে আসুন নিজেকে। ছাড়ুন এ সব খেয়ালিপনা।
ঈশ্বর যে ঈশ্বর—সে পর্যন্ত তার নিজের আইন মেনে চলে।’ বললেন মথুরবাবু। ‘নিজের নিয়মকে লঙ্ঘন করার তাঁর ক্ষমতা নেই।’
গদাধর থমকে গেল। সে কি কথা? যে আইন তৈরি করেছে সে ইচ্ছে করলে তা রদ-বদল করতে পারে না? সে কি স্বাধীন নয়?
কি করে হবে? নিজে নিয়ম করে নিজেই আবার তা ভাঙলে নিজের কাছে কি জবাবদিহি দেবেন?
বা, সব তাঁর খেলা যে। ভাঙা-গড়ার খেলা। তাঁর কাছে আবার নিয়ম কি! তিনি সমস্ত নিয়মের বাইরে।
কিছুতেই মানলেন না মথুরবাবু। বললেন, ‘লাল ফুলের গাছে লাল ফুলই হয়, শাদা ফুল হয় না। কই ফুটুক দেখি তো শাদা ফুল।’
ইচ্ছাময়ের ইচ্ছা হলে হতে পারে না এটুকু? অখিললোকনাথের হাত-পা কি নিয়মের নিগড়ে বাঁধা? তিনি কি খর্ব না পঙ্গু?
পরদিন সকালে মন্দিরের বাগানে লাল জবাফুলের গাছে এ কী দেখছে গদাধর! একই ডালে দু’টো ফেঁকড়িতে দু’টি ফুল রয়েছে ফুটে—একটি টকটকে লাল, আরেকটি ধবধবে শাদা।
উল্লাসে অধীর হয়ে গদাধর ডালটা ভেঙে ফেলল হাত বাড়িয়ে। চলল মথুরের কাছে। এই দেখ। ঈশ্বর কি অল্প না অক্ষম না আবদ্ধ? কুপানিধি কি কখনো কৃপণ হতে পারেন?
মথুরবাবু হার স্বীকার করলেন। চেয়ে দেখলেন তাঁর চোখের সামনে তাঁর গুরু দাঁড়িয়ে। যিনি অন্ধকার থেকে আলোকে নিয়ে যান তিনিও গুরু। যিনি অন্ধকার দেশে আলোর সংবাদ নিয়ে আসেন তিনিও।
যদি তাপ বা আলো চাও, উদ্দীপিত আলোর আশ্রয় নিতেই হবে। যে আধারে জ্ঞান উজ্জ্বল হয়ে জলছে সেই গুরু। গদাধর প্রজ্বলিত অগ্নি৷
কিন্তু, যাই বলো, একটু পরীক্ষা করে দেখা যাক৷
শরীর ভেঙে পড়ছে গদাধরের, এর কারণ হয়তো ইন্দ্রিয়নিগ্রহ। নিবৃত্তির কাঠিন্য থেকে যদি ক্ষণিক মুক্তি পায় তাহলে হয়তো সে একট, স্বস্থ-সুস্থ হতে পারে। কিন্তু সরাসরি প্রস্তাব করতে গেলে মুখের উপর প্রত্যাখ্যান করে দেবে গদাধর। এ একেবারে দিবালোকের মত স্পষ্ট। তাই গোপনে ফাঁদ পেতে তাকে বাঁধতে চাইলেন মথুরবাবু।
শহর থেকে দু’টি পতিতা মেয়ে নিয়ে এসে দক্ষিণেশ্বরে গদাধরের ঘরে পাঠিয়ে দিলেন চুপি-চুপি।
গদাধর মুগ্ধের মতন তাকিয়ে রইল তাদের দিকে। সরল আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে বলে উঠলঃ ‘মা, মা এসেছিস?’ বলেই তাদের পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়ল। ওরা তখন পালাতে পারলে বাঁচে!
আরো একদিন চেষ্টা করলেন মথুরবাবু। গদাধরকে নিয়ে কলকাতায় বেড়াতে গেলেন। মেছুয়াবাজার ষ্ট্রীটে থামলেন এক বাড়ির কাছে। দোরগোড়ায় অনেক-গুলি সাজগোজ করা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটা ঘরে তাদের মাঝখানে গদাধরকে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে গেলেন মথুরবাবু। পালিয়ে গেলেন মানে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালেন।
আর গদাধর?
‘স্ত্রিয়ঃ সমস্তাঃ সকলা জগৎসু –’ সকল স্ত্রীলোকের মধ্যেই তিনি, জগজ্জননী। গদাধর মাতৃস্তব শুরু করল। শিশুর মত হয়ে গেল। লোপ পেল বাহ্যসংজ্ঞা। কোলাহল শুরু করল মেয়েগুলো। কান্নার কোলাহল। আত্ম-তিরস্কার। পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে কাতর কণ্ঠে বলতে লাগল, আমাদের ক্ষমা করো। আমরা অভাজন, অকিঞ্চন—
গদাধরের মুখে শুধু মাতৃনাম। মা-ই সব হয়েছেন। রাজেশ্বরী হয়েছেন আবার পণ্যাঙ্গনাও হয়েছেন।
গোলমাল শুনে উঁকি মারলেন মথুরবাবু। দেখলেন, শম-দম শৌচ-মৌনের সৌম্য প্রতিমূর্তি গদাধর। সেদিন তিনি যা একবার দেখেছিলেন, তাই। ধুমর্স্পর্শহীন প্রজ্বলিত বহ্নি।
মেয়ের দল মথুরবাবুর উপর ঝাঁজিয়ে উঠল, ‘আপনি বাবাকে এইখানে নিয়ে এসেছেন, এই আস্তাকুঁড়ের মাঝখানে? আপনার কি কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই?’ লজ্জায় ম্লান হয়ে গেলেন মথুরবাবু। গুরু প্রাপ্তির গরিমায় অন্তরে লাল হয়ে উঠলেন।
পানিহাটিতে ফি-বছর মহোৎসব হয়। বাইশ বছর বয়েস, সেখানে গিয়েছে গদাধর। সেবার সেখানে বৈষ্ণবচরণ গোস্বামীর সঙ্গে তার প্রথম দেখা। বৈষ্ণবচরণ যেমন পণ্ডিত তেমনি সাধক। ঠাকুরবাটিতে বসে আছে গদাধর, বৈষ্ণবচরণ তাকে দেখে লাফিয়ে উঠলেন। চিনে নিলেন এক নিমেষে।
অলোকসুন্দর দিব্যপুরুষ।
পাঁচটা টাকা হঠাৎ দিতে চাইলেন গদাধরকে। কি করে আনন্দ জানাবেন যেন বুঝতে পারছেন না। বললেন, ‘আম কিনে খাও।’
না, না, টাকা দিয়ে কি হবে? আম না খেলে কি হয়!
বৈষ্ণবচরণ ছাড়বার পাত্র নন। হৃদয়কে গছালেন। আম কেনালেন। বললেন, ভোগ হবে।
তারপর গদাধরকে মাঝখানে বসিয়ে কীর্তন শুরু করলেন।
দেখতে-দেখতে সমাধি হয়ে গেল গদাধরের।
সমাধিভঙ্গের পর ভোগের দ্রব্য খেতে দেওয়া হল তাকে। আশ্চর্য, গলা দিয়ে কিছুই গলে না।
এক হাতে মাটি আরেক হাতে কটা টাকা নিয়ে গঙ্গাতীরে বসেছে গদাধর। মনে-মনে ওজন নেবার চেষ্টা করছে, কোনটা ভারি! কোনটার বেশি দাম! টাকা না মাটি, মাটি না টাকা! বিচার করতে-করতে উন্মেষ হল মনের মধ্যে, দুই-ই তুল্যমূল্য, দুই-ই সমান অসার। মাটি আর টাকা দুই-ই একসঙ্গে ছুঁড়ে ফেলল গঙ্গায়। নিঃশেষে নির্মুক্ত হয়ে গেল।
তাঁকে যদি একবার পাই তবে সব কিছুই পেয়ে যাব।
‘সব কিছুই পেয়ে যাব।’ বললেন ঠাকুর, ‘টাকা মাটি, মাটিই টাকা—সোনা মাটি, মাটিই সোনা—এই বলে গঙ্গার জলে ফেলে দিলাম। তখন ভয় হল মা লক্ষ্মী যদি রাগ করেন! লক্ষ্মীর ঐশ্বর্য অবজ্ঞা করলাম। যদি খ্যাঁট বন্ধ করে দেন! অমনি বললুম, মা, খোদ তোমায় চাই, আর কিছুই চাই না। তোমাকে পেলেই সব কিছু পেয়ে যাব।’
ভবনাথ চাটুজ্জে কাছেই বসে ছিল। হাসতে হাসতে বললে, ‘এ পাটোয়ারি।’ ‘হ্যাঁ, ঐটুকু পাটোয়ারি।’ ঠাকুরও হাসলেন। ঈশ্বরানন্দ পেলে কোথায় বা বিষয়ানন্দ, কোথায় বা রমণানন্দ!’ বললেন, ‘ভক্তের তপস্যায় প্রসন্ন হয়ে ভগবান দেখা দিলেন। বললেন, বর নাও। ভক্ত বললে, বর দিন যেন সোনার থালায় বসে নাতির সঙ্গে ভাত খাই। পাটোয়ার ভক্ত—এক বরে অনেকগুলি মেরে দিলে। ঐশ্বর্য হল, ছেলে হল, নাতি হল- আয়ুও পেল মন্দ নয়।’
তাই তেমন জিনিস সন্ধান করো যা চরম যা চূড়ান্ত, যার আর পরতর নেই। নারাণ বড়-ঘরের ছেলে। অল্প বয়স, ছাত্র, কিন্তু ভগবানে অর্পিতচিত্ত, দক্ষিণেশ্বরে লুকিয়ে-লুকিয়ে আসে। দক্ষিণেশ্বরে আসে বলে অভিভাবকেরা মারে। তবু না এসে পারে না। ঠাকুরের কোলের কাছটিতে তার স্থান। ‘মাস্টার,’ মহেন্দ্র গুপ্তকে জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর, ‘একটি টাকা দেবে?’কাকে?
‘নারাণকে। দেবে? না কালীকে বলব?’
‘আজ্ঞে বেশ তো, দেব।’
‘ঈশ্বরে যাদের অনুরাগ আছে তাদের দেওয়া ভালো। তাহলে টাকার সদ্ব্যবহার হয়। সব সংসারে দিলে কি হবে?’
অধরচন্দ্র সেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট—মাইনে তিনশো টাকা।
কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটির ভাইস-চেয়ারম্যান হবার জন্যে দরখাস্ত করেছে—মাইনে হাজার টাকা! অনেক চেষ্টা-চরিত্র করছে যাতে চাকরিটি হয়। সই-সুপারিশ যোগাড় করেছে অনেক।
তবু যেন এগোয় না। প্রতাপ হাজরা এসে বললে ঠাকুরকে, ‘অধরের কাজটি হবে, তুমি মাকে একটু বলো।’
অধরও বললে, ‘একবারটি বলুন।’
ঠাকুর রাখলেন ওদের অনুরোধ। মাকে একটি বার, একটু খানি বললেন। বললেন, ‘মা, অধর তোমার কাছে আনাগোনা করছে, যদি হয় তো হোক না।’ বলেই সেই সঙ্গে-সঙ্গেই আবার বললেন, ‘কী হীনবুদ্ধি মা! জ্ঞান ভক্তি না চেয়ে তোমার কাছে এই সব চাচ্ছে!’
টাকা গঙ্গায় ফেলে দিয়ে সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে গেল গদাধর। ‘সমলোষ্ট্রামকাঞ্চন’ হয়ে গেল। আরো কত অভিমান না জানি আছে! কাঙালীরা খেয়ে গেছে, মাথায় করে তাদের পাত ফেলে নিজে ঝাঁটা ধরে জায়গা পরিষ্কার করে দিলে। মেথরের কাজ করতে লাগল স্বচ্ছন্দে। শুধু তাই? কাঙালীদের উচ্ছিষ্টান্ন গ্রহণ করলে প্রসাদজ্ঞানে। শুধু তাই! জিভ দিয়ে চন্দন আর বিষ্ঠা স্পর্শ করলে! সর্বত্র ব্রহ্মস্বাদ।
ভাবাবেশে সর্বদা বিভোর গদাধর। পূজো-সেবার রীতিনীতি দূরস্থান, কালা-কালই ঠিক থাকছে না। পূজা না করেই ভোগ দিয়ে দিলে। পূজার ফুল-চন্দন দিয়ে নিজেকেই সাজিয়ে রাখলে! বেলা বয়ে যাচ্ছে, হয়তো ধ্যানই ভাঙল না!
ক্রমে ক্রমে কর্ম ত্যাগ হয়ে যাচ্ছে গদাধরের। আসন্নপ্রসবা গর্ভিনীর মত। একদিন ভাবাবেশে গদাধর বলে উঠল মথুরবাবুকে -’আজ থেকে হৃদে পূজো করবে।’
মথুরবাবুর কাছে দৈবাদেশের মত শোনাল। হৃদয় বসল পূজার আসনে। গদাধরের ছুটি। ছুটি মানে মা’র জন্যে ছুটোছুটি। মা’র জন্যে কান্না৷ মাকে দেখতে যদি কখনো একটু দেরি হয় আথাল-পাথাল করে গদাধর। আছাড় খেয়ে পড়ে যায়। কোথায় পড়ল, আগুনে না জলে, তার জ্ঞান নেই। দম আটকে-আটকে আসে, কাটা ছাগলের মত ছটফট করে। সমস্ত গা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়, ভ্রক্ষেপ করে না। মাটিতে মুখ ঘষতে ঘষতে কাঁদে আর চেচাঁয়, মা, মা গো—
পথ-চলতি লোক বলে, ‘আহা শূলব্যথা উঠেছে বুঝি—’
