পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ১.১৫
১৫
এ আবার কে এল দক্ষিণেশ্বরে?
গদাধরের খুড়তুতো দাদা, রামতারক চাটুজ্জে। গদাধর নাম রেখেছিল হলধারী। হৃদয়ের মত চাকরির খোঁজে এসেছে। তবে হৃদয়ের মত সে মাঠো নয়। পণ্ডিত-প্রধান। ভাগবত আর গীতা, বেদান্ত আর অধ্যাত্ম রামায়ণ তার নখমুকুরে। মস্ত বড় বৈষ্ণব।
‘একটা কাজকর্ম যদি কিছু দেন—’হলধারীর মধ্যে লুকোছাপা কিছু নেই, সরাসরি দাঁড়াল গিয়ে মথুরবাবুর দরবারে।
পরিচয় পেয়ে মোহিত হয়ে গেলেন মথুরবাবু। এ তো চাওয়ার মতই পাওয়া হয়ে গেল দেখছি। ঈশ্বরের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে গদাধর। পূজো-আচ্চার আর ধার ধারে না আজকাল। কি যে করে আর কি যে করে না সে জানে আর তার মা-ই জানে। ‘ভালোই হল।’ মথুরবাবু সহজ মানুষের মত নিশ্বাস ফেললেন, ‘তুমি কালীঘরের পূজোর ভার নাও।’
প্রথম পংক্তির বৈষ্ণব, শক্তিপুজার ভার নেবে! এক মুহূর্ত দ্বিধা করল হলধারী। আপত্তি কি! শক্তিও যা মধুরতাও তাই। ‘ত্বং বৈষ্ণবীশক্তিরনন্তবীর্যা, বিশ্বস্য বীজং পরমাসি মায়া।’ আবার শোনো, ‘শঙ্খচক্রগদাশাঙ্গরগৃহীত পরমায়ুধে, প্রসীদ বৈষ্ণবীরূপে নারায়ণি নমোহস্তু তে৷৷’ ‘না’ বলবার কিছু নেই।
কিন্তু আর যাই বলুন, গঙ্গাতীরে স্বপাকে রান্না করে খাব।
‘কেন, গদাধর তো মা’র প্রসাদ খাচ্ছে আজকাল। তোমার আবার খুঁতখুঁতুনি কেন?’ টিপ্পনি কাটলেন মথুরবাবু।
হলধারী হাসল। কার সঙ্গে কার তুলনা! মনে করুন, গোড়ায় গদাধরও গঙ্গা-তীরেই রান্না করে খেয়েছে। এখন সে উঠে এসেছে সাধনার উচ্চস্তরে। এখন সে ইচ্ছে করলে ঠাকুরবাড়ির প্রসাদ কেন, ছোটজাত কাঙালীরও উচ্ছিষ্ট খেতে পারে। তার সইবে, সে এখন সহিষ্ণুতার সমুদ্র। কিন্তু আমার সইবে না। যেটকু বা নিষ্ঠা আছে তাও যাবে নষ্ট হয়ে।
তার স্পষ্টতার সারল্যে খুশি হলেন মথুরবাবু।
কিন্তু, এ তো এক রকম হল—এদিকে আবার বলি বন্ধ করবার বায়না ধরলে হলধারী। বহু কালের প্রথা, বললেই কি আর বন্ধ করা যায়? ক্ষুণ্ন হল হলধারী, পূজায় সেই প্রাণঢালা আনন্দ যেন খুঁজে পেল না। খোলা হাওয়ায় না থাকলে মন খোলসা হয় কি করে?
একদিন, সন্ধ্যা করছে হলধারী, দেবী ভবতারিণী তার সামনে এসে দাঁড়ালেন, ক্রুদ্ধ হয়েছেন মা, মা’র এখন উল্লাসিনী মূর্তি নয়, প্রচণ্ডিকা মূর্তি। বললেন, ‘তোকে আর আমার পূজো করতে হবে না। এমনি আধাখেঁচড়া পূজো যদি করিস তো ছেলের মরা-মুখ দেখবি।’
হলধারী গ্রাহ্য করলে না। ভাবলে, চোখে বুঝি ঘোর দেখেছে। হয়তো বা মাথার খেয়াল!
কিন্তু, আশ্চর্য, ক’দিন পরেই খবর এল, মারা গেছে হলধারীর ছেলে।
হলধারী গদাধরের শরণাপন্ন হল। গদাধর বললে, দেবীপূজা ছাড়ান দিন। যেমন করছিল হৃদয়, হৃদয়ই করুক, আপনি যান রাধাগোবিন্দজীর মন্দিরে। রাধাগোবিন্দজীর মন্দিরে এসে হলধারী মধুর ভাবের পরিচর্যায় পরকীয়া নিয়ে মেতে উঠল। বৈষ্ণব মতে এও এক রকম সাধনা বটে, কিন্তু অপকৃষ্ট, অধোগত সাধনা। ক’দিনেই নানান কথা রটতে লাগল হলধারীর নামে শুরু হল নানা কানাকানি। কিন্তু কারু সাধ্য নেই, মুখের উপর বলে কিছু পষ্টাপষ্টি। বিরুদ্ধতা করে। হলধারীকে সক্কলকার ভয়। তার মুখে বড় খারাপ। কথায় কথায় শাপ দেয়। আর সে-শাপ ভীষণ ফলে। বাকসিদ্ধ হলধারী।
কিন্তু গদাধরের কানে এলে গদাধর বরদাস্ত করতে পারল না। দাদাই হোক আর যাই হোক, চলবে না এমন কদাচার। হলধারীকে কড়কে দিল গদাধর। ‘কি? তোর যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা!’ হলধারী হুমকে উঠল, ‘আমার ভাই হয়ে, আমার চেয়ে বয়সে ছোট হয়ে তুই আমাকে শাসন করতে এসেছিস? তোর মুখ দিয়ে রক্ত উঠবে।’
আপনি চটছেন মিছিমিছি। আমি আপনার ভালোর জন্যেই বলছিলাম। পাঁচ জনের কান-কথা থেকে রেহাই পান তারি জন্যে।
হলধারী গুম হয়ে রইল। কথা ফিরিয়ে নিলে না কিছুতেই। যা বলেছি তো বলেছি।
ক’দিন পরে, একদিন সন্ধ্যের পরে গদাধরের মুখ দিয়ে রক্ত উঠতে লাগল সত্যি-সত্যি। কালো, ঘন রক্ত। কতক বেরিয়ে আসছে, কতক জমে থাকছে মুখের মধ্যে। কতক বা দাঁতের গোড়া থেকে ঝুলছে সুতোর মত।
এ কি হল? রক্ত থামছে না যে! ঝলকে ঝলকে বেরচ্ছে। মুখের মধ্যে কাপড় গুঁজে দিল গদাধর। তবু রক্তের নিবৃত্তি নেই। এ কি হল? মা, তুই এ কি করলি?
সবাই ছুটে এল আশ-পাশ থেকে। দ্রুতপায়ে হলধারীও।
‘দাদা, শাপ দিয়ে তুমি আমার এ কি করেছ দেখ।’ডুকরে উঠল গদাধর।
চোখে দেখে সহ্য করতে পারল না হলধারী। কাঁদতে লাগল। কথা ফিরিয়ে নেবার কথা ওঠে না আর। হাতের তীর আর হাতে নেই। কান্নার মধ্যেও একটু গর্ব মিশে আছে হলধারীর। অব্যর্থবাক সে ৷
চারদিকে হাহাকার পড়ে গেল। সমস্ত বলিদানের রক্ত বুঝি গদাধর দিলে!
‘তুমি কি হঠযোগ করো?’
গদাধর চোখ তুলে তাকাল। দক্ষিণেশ্বরে ক’দিন থেকে আছে যে প্রাচীন সাধু সে।
‘দেখি রক্তের রং। দেখি মুখের কোনখানটা থেকে আসছে? নিশ্চয়ই, সাধু জোর দিয়ে বললে, ‘নিশ্চয়ই তুমি হঠযোগ করো। তাই না?’
‘করি।’
তবে আর ভয় নেই। সাধনায় সুষুন্মাদ্বার খুলে গিয়েছে। দেহের রক্ত সব মাথায় গিয়ে উঠছিল। আপনা থেকে যে মুখের মধ্য দিয়ে পথ করে নিতে পেরেছে সেটা সৌভাগ্য বলতে হবে। জানো তো, হঠযোগে জড়সমাধি হয়ে যায়। রক্ত যদি সব মাথায় গিয়ে একবার জমতে পারত তাহলে তোমার সমাধি আর ভাঙত না।
সবই মা’র ইচ্ছা।
‘একশো বার। মা’র ইচ্ছেতেই তুমি আজ বেঁচে গেলে। তোমাকে দিয়ে মা’র কত না জানি কাজ আছে।’
হৃদয়কে কাছে ডেকে নিল হলধারী। বললে, ‘আচ্ছা হৃদু তুই বল এটা কি ঠিক হচ্ছে?’
কোনটা?
‘এই যে কাপড় ফেলে পৈতে ফেলে সাধন করা?’
হলধারীকে হৃদয়ের বড় ভয়। বললে,’কখনো না। ব্রাহ্মণ হয়ে ব্রাহ্মণত্ব বিসর্জন দিলে চলে কি করে?’
‘বল, সেই কথা।’ উৎফুল্ল হল হলধারী। ‘কত জন্মের পুণ্যে ব্রাহ্মণের ঘরে জন্ম। সেই ব্রাহ্মণত্বকে উনি এক কথায় নস্যাৎ করে দেবেন? ‘
এক কথায় আর সবাইর মত হৃদয়ও নস্যাৎ করে দিল। বললে, ‘পাগল! বন্ধ পাগল!’
‘তবু তোর কথাই যা হোক কিছু শোনে। তুই দৃষ্টি রাখবি, বাধা দিবি, যেন ও-সব অনাচার না করে। দরকার হয় তো বেঁধে রাখবি দড়ি দিয়ে।’
পাগল বলে কেটে পড়তে চাইল হৃদয়। কিন্তু মুখে যাই বলুক, তুড়ি দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারে না হলধারী। অন্তত যখন পূজা দেখে গদাধরের। দেখে উৎসর্গের উন্মাদনা। ঈশ্বরের আবেশ না হলে কেউ কি এমন বিভোর হয়ে পূজা করতে পারে?
ছুটে যায় হৃদয়ের কাছে। ‘ওরে হৃদু পাগল নয়। অলৌকিক।’
তাই না কি? হৃদয় বোকা সাজে।
‘অলৌকিক না হলে এমন কখনো হতে পারে? কেউ পূজো করতে পারে এমন ভাবে? তুই বল দেখি সত্য করে ওর মধ্যে তোর কিছু আশ্চর্য দর্শন হয়েছে?’‘আমার কী দর্শন হবে! আমি দর্শনের জানি কী!
‘নইলে ওকে তুই রাত-দিন এমন চাকরের মতন সেবা করিস কেন?
‘তবু মনে হয় আরো কেন করতে পারি না।’ তবু, হৃদয়ের মুখে তৃপ্তির তন্ময়তা। চিনতে পেরেছে হলধারী। আর তার ভুল হবে না।
‘এবার আমি তোকে ঠিক চিনতে পেরেছি। নিশ্চয়ই তোর মাঝে দিব্যাবেশ হয়েছে। হিসেবে আর ভুল হবে না আমার।’
গদাধর হাসে। আবার কখন ‘গোলেমালে চণ্ডীপাঠ’ হবে তার ঠিক কি।
মন্দিরের কাজ সেরে পাঁজি-পুঁথি নিয়ে পড়তে বসে হলধারী। মাথা পরিষ্কার করবার জন্যে এক টিপ নস্যি নেয়। সেই এক টিপ নস্যিতেই খুলে যায় বুদ্ধি। ভাবে, এত শাস্ত্র-শাসন কিছু পড়েছে গদাধর? বোঝে কিছু?
ডাকো গদাধরকে।
‘তুই এ সব কিছু, জানিস? বুঝতে পারবি?’ ‘খুব।’
‘কি করে পারবি? তুই তো আকাট মূর্খ—’
‘আমি মূর্খ হলে কি হয়, আমার ভেতরে যিনি আছেন তিনি সর্বজ্ঞান। তিনিই সকল কথা বুঝিয়ে দেন আমাকে।’
‘ইস, মস্ত বড় পণ্ডিত এসেছিস! সব যে তুই বুঝবি, তুই কি অবতার?’ হলধারী গরম হয়ে ওঠে।
‘এই যে বলেছিলে, আর গোল হবে না হিসেবে—’ মনে করিয়ে দেয় গদাধর। ‘রাখ, তোর কথায় আমার গা জ্বলে। শাস্ত্র পড়িসনি যখন, আমার সঙ্গে কথা বলতে আসিস নে। কলিতে কল্কি ছাড়া আর অবতার নেই। যা, চলে যা। ঠিক চিনেছি তোকে। আর ভুল হবে না। তুই আস্ত আকাট—’ছুটে গিয়ে হৃদয়কে ধরে এনেছে হলধারী। ঐ দ্যাখ। তুই বলিস পাগল হয়েছে, আমি বলি ব্ৰহ্মদৈত্যে পেয়েছে। তা না হলে এমন দশা হয়?
তাকিয়ে দেখল হৃদয়। দেখল বস্ত্র ত্যাগ করে গদাধর গাছের মগডালে বসে আছে স্তব্ধ হয়ে।
ছেলে মারা যাবার পর থেকে কালীকে হলধারী তমোময়ী বলে মনে করত। তমোময়ী মানে তমোগুণান্বিতা। যে তামসিক কর্মের ফল মূঢ়তা তার যে অধিষ্ঠাত্রী। অবিবেক বা প্রমাদমোহের যে উৎপাদিকা। যে ‘জঘন্যগুণবৃত্তস্থা’। একদিন মুখোমুখি বললে তাই গদাধরকে। ‘তুই ওই তামসী মূর্তির পূজো করিস কেন? ওতে কি কখনো আধ্যাত্মিক উন্নতি হতে পারে? বরং ও তোকে অধো-
গামী করবে। জানিস না গীতায় কি বলেছে? অধো গচ্ছন্তি তামসাঃ।
ইষ্টনিন্দা শুনে বিমর্ষ হয়ে গেল গদাধর। কিন্তু সাধ্য কি হলধারীর সঙ্গে সে তর্ক করে? শাস্ত্র থেকে উদ্ধৃতি দেবারই বা তার বিদ্যা কোথায়? সে সোজাসুজি মাকেই গিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারে, মা, তুই কী! অন্ধকারের ঐশ্বর্য সে কি অজ্ঞানের অন্ধকার? মাকে সে তাই বললে সরল ভাবে। বল, তুই কী, তুই কে। তুই না বলে দিলে আমি বুঝব কি করে? আমি কি শাস্ত্র জানি না ব্যাকরণ জানি? যখন তুই আমাকে তা শেখালি না তখন নিজে থেকে আমাকে সব দেখিয়ে দে। নইলে হলধারীর সঙ্গে আমি লড়ব কি দিয়ে? ও শাস্ত্র-জানা পণ্ডিত, কত শত বচন ওর মুখস্থ। ওর সঙ্গে আমি পারব কেন? তুই যদি কিছু না বোঝাস, তবে বুঝব হলধারীর কথাই ঠিক। তুই তামসী, তুই-
মা দেখিয়ে দিলেন। বুঝিয়ে দিলেন।
বললেন, আমি ত্রিগুণাতীত, আবার সর্বগুণাশ্রয়ী। স্বরূপতঃ নির্গুণ আবার মায়ারূপে সগুণ। নির্গুণ সগুণের অধিষ্ঠান। সগুণ নির্গুণের উদ্ঘাটন। সমুদ্রকে আশ্রয় করেই তরঙ্গের লীলা। তরঙ্গকে আশ্রয় করে সমুদ্রের উন্মোচন। আবার আমি আকাশ। সমস্ত গুণের অতীত। প্রবৃত্তি-নিবৃত্তি-শূন্য। ‘তবে রে—দ্রুত বেগে ছুটল গদাধর। হলধারী পূজো করছিল, একেবারে তার ঘাড়ে চেপে বসল। ‘তবে রে, তুই আমার মাকে তামসী বলিস? মা আমার সর্ব-বর্ণময়ী আবার ত্রিগুণাতীতা! এত শাস্ত্র পড়িস আর তুই এটকু জানিস না?’
মুহ্যমানের মত তাকিয়ে রইল হলধারী। কোথা থেকে কি হয়ে গেল বুঝতে পেল না। মনে হল এ যেন গদাধর নয়, তার মাঝে সাক্ষাৎ জগদম্বার আবির্ভাব। ফুল-বেলপাতা হঠাৎ গদাধরের পায়ে অঞ্জলি দিয়ে বসল।
হৃদয় কাছেই ছিল। শুনিয়ে দিল টাস-টাস।
‘কি গো মামা, বলতে না গদাধর পাগল হয়েছে? এখন? এখন যে নিজেই বড় পায়ে ফুল দিয়ে পূজো করছ?’
‘কি জানি, আমিই বুঝি পাগল হয়ে গেলাম! বিহ্বলের মত বললে হলধারী!’ তোর মাঝে আমার স্পষ্ট ঈশ্বরদর্শন হল।’
কর্ম ত্যাগ হয়ে যাচ্ছে গদাধরের।
গঙ্গাজলে তর্পণ করতে গিয়ে দেখে আঙ্গুলের ভিতর দিয়ে জল গলে পড়ে যাচ্ছে।
ছুটে গেল হলধারীর কাছে। শুধোলে, ‘দাদা, এ কি হল?’
‘একে গলিতহস্ত বলে।’ বললে হলধারী, ‘তোর ঈশ্বরদর্শন হয়েছে, ঈশ্বর- দর্শনের পর তর্পণ থাকে না।’
কোনো কর্মই থাকে না সমাধি হলে।
ঠাকুর বললেন শিবনাথ শাস্ত্রীকে, ‘যতক্ষণ তুমি সভায় আসনি, ততক্ষণ তোমাকে নিয়ে কত কথা। কত গুণোগুঞ্জন। যেই তুমি এসে পড়েছ অমনি সব কথা বন্ধ হয়ে গেছে। তখন তোমার দর্শনেই সুখ’
যতক্ষণ হাওয়া না পাওয়া যায় ততক্ষণই পাখা চালানো। যখন হাওয়া আপনি আসে তখন আর পাখার দরকার কি। তখন তার স্পর্শনেই আনন্দ।
১৬
রাসমণির কালীমন্দিরে গদাধর আর পূজো করছে না—কামারপুকুরে চন্দ্রমণির কানে খবর পৌঁছলো।
কেন করছে না রে পুজো? কী হয়েছে আমার গদাধরের?
মাথা খারাপ হয়েছে। হারিয়েছে সমস্ত মাত্রাজ্ঞান। এমন কাণ্ডকারখানা সব করছে যা সব সময় পাগল-ছাগলেও করে না। তোমার ছেলেকে বাড়ি আসতে বলো।
চন্দ্রমণি অস্থির হয়ে উঠলেন। চিঠির পর চিঠি লেখাতে লাগলেন রামেশ্বরকে দিয়ে। তুই আমার কাছে চলে আয়। ছেলেবেলায় তোর যে রকম অসুখ হত, তাই বোধ হয় আবার শুরু হয়েছে। এখানে গাঁয়ের জল-হাওয়ায় তোর শরীর ভালো হবে। ভালো হবে আমার যত্ন-আত্তিতে। ঘরের ছেলে তুই ঘরে ফিরে আয়। তোকে না দেখে-দেখে আমার দুই চোখ ক্ষয় হয়ে গেল।
কামারপুকুরে, মা’র অঞ্চলের ছায়ায় ফিরে এল গদাধর।
কিন্তু এ কী হয়ে গেছে সে! কখনো জড়ের মত উদাসীন হয়ে বসে থাকে, কখনো আপন মনে হাসে, কখনো বা ‘মা’ ‘মা’ বলে কেঁদে আকুল। এই ব্যাকুল-করা মা-ডাকেই বেশি কাতর হন চন্দ্রমণি। কি ভাবে প্রতিকার করবেন বুঝতে পারেন না। প্রাণের সমস্ত স্নেহ আর আশীর্বাদ দুই করতলে ডেকে এনে ছেলের বুকে-পিঠে হাত বুলিয়ে দেন। একটু বা স্থির হয় গদাধর। হাসি-খুশি হয়ে স্বাভাবিক স্বাস্থ্যে সকলের সঙ্গে আলাপ-গল্প করে।
কিন্তু কতক্ষণ সেই স্বভাবস্থিতি! কিছুক্ষণ পরেই আবার সেই ভাবাবেশ। সেই বহিজ্ঞানশূন্যতা। আচরণে না আছে লজ্জা, না আছে ঘৃণা, না আছে ভয়লেশ। একেবারে নির্মুক্ত-নিঃসীম। ঘর-সংসার বলে কিছু আছে, সে সম্বন্ধে চেতনা নেই। লোকলজ্জা বলে কিছু আছে, নেই সেই সংকীর্ণ সংস্কার। ঠিক পাগল হয়নি। পাগল হলে মাকে, চন্দ্রমণিকে, এত ভালোবাসে কি করে, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গেই বা কেন এত ঠাট্টা-ইয়ার্কি। আসল কথা, উপদেবতা ভর করেছে। ওঝা ডাকাও।
পাঁচ জনের পরামর্শে ওঝা ডাকালেন চন্দ্রমণি। ওঝা এসে অনেক ঝাড়ফুঁক করলে, মন্তর আওড়ালে। একটা পলতে পুড়িয়ে শুঁকতে দিলে গদাধরকে। বললে, ভূত যদি হয় এতেই পিঠটান দেবে। আর যদি না হয়—মনে মনে হাসল গদাধর।
ওতে কিছু হবে না। চণ্ড নামাতে হবে।
এল চণ্ডর ওঝা। মস্ত বড় গুনিন। তন্ত্রে-মন্ত্রে নিপুণ।
চণ্ড নামবে—গ্রাম্য লোকজন এসে ভিড় করেছে। এবারে অব্যর্থ ব্যাধি-শান্তি হবে গদাধরের। যথাবিধি পূজো হল, বলি দেওয়া হল চণ্ডকে। চণ্ড এসে অধিষ্ঠান হল শূন্যে। ওঝাকে উদ্দেশ করে বললে, ‘ওকে ভূতে পায়নি, ওর কোনো আধি- ব্যাধি নেই—’
পরে সম্বোধন করলে গদাধরকে, ‘কি হে সাধু, সাধুই যদি হবে, তবে অত সুপারি খাও কেন?’
সময় নেই অসময় নেই, সুপারি খেত গদাধর। কথা শুনে সে তো হতবাক। ‘বেশি সুপারি খেলে কাম বাড়ে। ও খাবে না।’ সুপারি ত্যাগ করল গদাধর।
গ্রামের দুই ধারে দুই শ্মশান—ভূতির খাল আর বুধুই মোড়ল। দিন-রাতের বেশির ভাগ সময়ই শ্মশানবাস করে গদাধর। হাঁড়ি করে মেঠাই নিয়ে যায়, শিবা আর প্রমথদের ভোগ দেয়। যে হাঁড়ি শেয়ালের জন্যে, কোত্থেকে দলে দলে এসে খেয়ে যায় নিশ্চিন্তে। আর যে হাঁড়ি ভূত-প্রেতের জন্যে তা হঠাৎ শূন্যে উঠে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। আধার বা আধেয় কিছুরই পাত্তা পাওয়া যায় না। কোনো-কোনো দিন বা স্পষ্ট সাক্ষাৎ হয় পিশাচদের সঙ্গে। রঙ্গ-রহস্যও হয় কিছু-কিছু।
একদিন নিশীথ রাত্রেও গদাধরের বাড়ি ফেরার নাম নেই। মা’র কাছে ছোট ছেলে চিরকালই ছোট ছেলে, চন্দ্ৰমণি শ্মশানে পাঠিয়ে দিলেন রামেশ্বরকে। গদাধরকে গিয়ে ধরে নিয়ে আয়। ও কি মা’র ঘর শ্মশান করে শ্মশানেই বসতি করবে?
শ্মশানের প্রান্তে এসে নিঃসাড় অন্ধকারে ডাকতে লাগল, গদাই, গদাই, ওরে গদাই আছিস্?
‘যাচ্ছি গো দাদা—’প্রতিধ্বনি করল গদাধর। চেঁচিয়ে বললে, ‘এদিক পানে আর এগিয়ো না। আমার সঙ্গে তো এঁটে উঠছে না, তাই তোমার এরা অনিষ্ট করবে। তুমি ফিরে যাও।’
শ্মশানে বসতে পেয়ে অনেক শান্ত হয়েছে গদাধর। একটি বেলগাছ পুঁতেছে। আর বুড়ো যে অশ্বত্থ গাছ ছিল ডাল-পালা ছড়িয়ে, তারই তলায় সে আসন নিলে। সেখানে ঘন ঘন কালীদর্শন হতে লাগল তার। দেখতে লাগল সে কর্ত্রীকারয়িত্রী সংসারৈকসারাকে। যে সাকারশক্তিস্বরূপা দিগন্তবসনা খড়্গা- মুণ্ডাভিরামা। আগম-নিগম-ফলময়ী, বাঞ্ছিতার্থপ্রদায়িনী।
শান্ত হয়েছে বটে কিন্তু ঔদাসীন্য যায় না। যায় না সংসার-অস্পৃহা। বসনেই আঁট নেই, আর কোথায় তবে আটা থাকবে? কি করে সংসারে একটু মন পড়বে? মনে কি করে আসবে একটু মোহ-মমতা?
বিয়ে দাও গদাধরের।
রামেশ্বরে আর চন্দ্রমণিতে লুকিয়ে লুকিয়ে পরামর্শ হচ্ছে। পাছে গদাধরের কানে গেলে সে সব ভণ্ডুল করে দেয়। কিন্তু তুমি দেয়ালের কান এড়াতে পারো, গদাধরের কান এড়াতে পারো না। ঠিক সে শুনে ফেললে।
শুনে তার কেমনতরো ভাব হল না জানি!
‘ওরে, আমার বিয়ে হবে! উল্লাসে উথলে উঠল গদাধর। শিশুর মত উল্লাস। শিশুর মতই নৃত্যানন্দ। বাড়িতে কোনো উৎসব হলে বা প্রিয় আত্মীয়ের আসার সম্ভাবনা ঘটলে শিশু যেমন মাতামাতি করে তেমনি। যেন সব চেয়ে প্রিয়, সব চেয়ে প্রয়োজনীয় কে আসছে তার সংসারে। তার সমস্ত প্রার্থনার প্রতীক, প্রত্যক্ষ মাহেশ্বরী।
বিয়েতে মন আছে গদাধরের। নিশ্চিন্ত হলেন চন্দ্রমণি, নিশ্চিন্ত হলেন রামেশ্বর। ঘটক লাগালেন। ঘটক আর কেউ নয়, হৃদয়ের দাদা লক্ষ্মী মুখুজ্জে।
শিয়ড়ে, হৃদয়দের বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছে গদাধর। যাচ্ছে পাল্কিতে চড়ে। মুক্ত নীল আকাশ আর ঢেউ-খেলানো অঢেল ধান-খেত দেখতে দেখতে গদাধরের ভাবাবেশ হল। তার ভিতরে যে আদিকবি ধ্যানস্থ ছিলেন, তিনি যেন তার প্রজ্ঞানময় তৃতীয় চক্ষু উন্মীলন করলেন। গদাধর দেখল তার দেহ থেকে দু’টি কিশোর বয়সের ছেলে বেরিয়ে এসে মাঠময় ছুটোছুটি করে খেলা করছে। কখনো যাচ্ছে অনেক দূরে চলে, কখনো বা এসে পড়ছে পাল্কির কাছটিতে। নীরব ছায়ার মত ভাসছে না, দস্তুরমত হাসছে, কথা কইছে, গান গাইছে। কারা এই দু’টি ছেলে? কোন দেশের? তার শরীরের মধ্যে বাসা নিল কি করে?
অনেক দিন এ প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি। বছর দেড় বাদে দক্ষিণেশ্বরে বামনিকে প্রশ্ন করেছিল গদাধর, ‘ঐ দু’টি ছেলে কে বলতে পারো? আমি ভুল দেখিনি তো?’
‘না বাবা, ভুল দেখনি। এবার নিত্যানন্দের খোলে চৈতন্যের আবির্ভাব। তোমার মাঝে এবার চৈতন্য আর নিত্যানন্দ দুই-ই এসে বাসা নিয়েছেন। ঐ দুটিতেই খেলছিল ছুটোছুটি করে।
শিয়ড়ে হৃদয়ের বাড়িতে গান হচ্ছে। তাই শুনতে এসেছে গদাধর। ভিড় হয়েছে বিস্তর। পুরুষ মেয়ে—আর, সর্বত্রগামী অনুষঙ্গ, ছেলেপিলেও অনেক এসেছে। এক স্ত্রীলোকের কোলে তিন-চার বছর বয়সের এক খুকি। ড্যাবডেবে চোখে চেয়ে আছে সভার মধ্যে। স্ত্রীলোকটি তাকে রঙ্গ করে জিজ্ঞেস করছে, বিয়ে করবি? সম্মতিতে ঘাড় হেলায় মেয়ে। এত লোকের মধ্যে কাকে বিয়ে করবি? কাকে তোর পছন্দ? হাত তুলে নিকটে-বসা গদাধরকে দেখিয়ে দিল স্বচ্ছন্দে।
ঐ যে স্ত্রীলোকটি মেয়ে কোলে নিয়ে বসে আছে সে শিয়ড়ের হরিপ্রসাদ মজুমদারের কন্যা শ্যামাসুন্দরী। জয়রামবাটির রামচন্দ্র মুখুজ্জের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে। এসেছে বাপের বাড়িতে বেড়াতে। কোলে প্রথম সন্তান সারদা। বাপের বাড়িতে শ্যামাসুন্দরীর তখন অসুখ। একদিন এল্লা-পুকুরের পাড়ে বাইরে গেছে—ঠাহর নেই—বসে পড়েছে এক বেল গাছের তলায়। কাছেই গাঁয়ের কুমোরদের পোয়ান, যেখানে পোড়ানো হয় হাঁড়িকুড়ি। সেখানে হঠাৎ ছোট ছোট পায়ে নূপুর বেজে উঠল রুনুঝুনু। দেখতে দেখতে ছোট একটি মেয়ে ছুটে এল নাচতে নাচতে। শ্যামাসুন্দরীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে গলা জড়িয়ে ধরলে। মাথা ঘুরে পড়ে গেল শ্যামাসুন্দরী। মনে হল সেই মেয়ে তার পেটে ঢুকেছে। তেমনি রামচন্দ্র একদিন দুপুরে ঘুমাচ্ছে, স্বপ্ন দেখল একটি ছোট্ট মেয়ে তার পিঠের উপর পড়ে দু’হাতে তার গলা জড়িয়ে ধরছে। হাতে-গায়ের গয়নায় মেয়ের রূপ যেন আরো খুলেছে। এই গরিবের ঘরে কে মা তুমি? এখানে কি করতে এলে? মেয়েটি বললে, ‘এই এলুম তোমার কাছে।’
আটই পৌষ, বারোশো ষাট সাল, গদাধরের জন্মের প্রায় আঠারো বছর পর, জয়রামবাটিতে শ্যামাসুন্দরীর মেয়ে হল। নাম রাখলে সারদা।
ঠাকুর বললেন, ‘ও সরস্বতী। ও সারদা। ও জ্ঞান দিতে এসেছে।’
ভক্তির পথও সত্যি, জ্ঞানের পথও সত্যি। ভক্তি মানে ঈশ্বরে পরানুরক্তি। ‘সুখানুশয়ী রাগঃ’। বিষয় যত সুখকর তত তীব্র তাতে অনুরাগ। আর যাতে অনুরাগ পরম বা নিরতিশয় তাই ঈশ্বর। অনুরাগের ধর্মই হচ্ছে স্মরণ-চিন্তন-অনধ্যান। সূতরাং অনুরাগের বস্তুতে নিয়তচিত্ত হয়ে থাকাই ভক্তি। যোগ-শাস্ত্রের ভাষায় তাই সমাধি। তাই ভক্তি আর যোগে কোনো ভেদ নেই। জ্ঞানও অভিন্ন। যখন পরমাত্মবোধ জেগে থাকবে তখনই জ্ঞান। যোগশাস্ত্রে তাকে বলে ‘অবিপ্লবা বিবেকখ্যাতি’। অন্য বিষয় ত্যাগ করে পরমাত্মাকেই সর্বদা বোধগম্য রাখাই প্রকৃত জ্ঞানের লক্ষণ৷
ভক্তিই বলো, যোগই বলো আর জ্ঞানই বলো, অভীষ্ট বস্তুতে অনন্যচিত্ততাই মুখ্যবৃত্তি।
কিন্তু যতই বিচার-আচার করো, মা’র কৃপা না হলে কিছুই হবার জো নেই। মানুষের কতটুকু শক্তি? কতটুকু সে চেষ্টা করতে পারে? কাম-কাঞ্চন ঠিক ঠিক মিথ্যে, জগৎ তিন কালেই ঠিক ঠিক অসৎ, মনে-জ্ঞানে এ ধারণা করা কি যে-সে কথা? মা’র দয়া না হলে কি হয়? কথায় বলে, এক একটি জোয়ানের দানায় একেকটি ভাত হজম করিয়ে দেয়, কিন্তু যখন পেটের অসুখ হয় তখন একশোটি জোয়ানের দানাও একটি ভাত হজম করাতে পারে না। শুধু মাকে প্রসন্ন করো, মা’র কৃপার জন্যে বসে থাকো। ‘সৈষা প্রসন্না বরদা নৃণাং ভবতি মুক্তয়ে।’
জয়রাম মুখুজ্জের মেয়ে কালীর সঙ্গে সম্বন্ধ এনেছে ঘটক। কিন্তু জয়রাম বেঁকে বসল ভাঙড় না হোক, ক্ষ্যাপা তো বটে—তাকে জামাই করব কি। তাছাড়া কোনো কোনো জায়গায় রামেশ্বরই নিজে এগোতে চাইল না। তখনকার দিনে কন্যা-পক্ষেরই পণ নেবার প্রথা। একেক জায়গায় এমন দর হাঁকল, যা রামেশ্বরের নাগালের বাইরে। তবে? এখন ইতিকর্তব্য কি?
খুব সোজা। চাষাদের শশার খেত দেখেছ?
বিরস ও বিষণ্ন মুখে বসে আছেন চন্দ্রমণি। পাশে রামেশ্বর। দুজনেই চমকে উঠলেন।
যে শশাটি ভালো ফলেছে তাতে চাষা একটি কুটো বেঁধে রাখে। কুটো বেঁধে চিহ্ন দিয়ে রাখে ভগবানকে ভোগ দেবে বলে। যাতে ভুলে বা গোলমালে না বিক্রি হয়ে যায়। তেমনি–
তেমনি কি? মা-দাদা উৎসুক হয়ে উঠলেন।
‘তেমনি আমার বিবাহের পাত্রী জয়রামবাটি গাঁয়ের রাম মুখেুজ্জের বাড়িতে কুটোবাঁধা হয়ে আছে।’ বললে গদাধর, ‘মিছে তোমরা এখানে ওখানে খোঁজাখুঁজি করছ। এতে ভাবনারও কিছু নেই, হয়রানিরও কিছু নেই।’
জয়রামবাটিতে লোক পাঠালেন চন্দ্রমণি। কিন্তু খবর যা এল তা বিশেষ উৎসাহ-বর্ধক নয়। আর সব মিলেছে বটে কিন্তু পাত্রীর বয়স মোটে পাঁচ বছর।
হোক পাঁচ বছর! গুপ্তভাবেই আপ্তলীলা জগন্মাতার। হয়তো এই জনকনন্দিনী সীতা। এই কৃষ্ণ-উন্মাদিনী রাধিকা। শিবভাবভাবিনী ভগবতী। চন্দ্রমণি মত দিলেন।
কন্যা-পক্ষের পণ তিনশো টাকা। তা হোক, যোগাড় করলেন রামেশ্বর। বিয়ের দিন ঠিক হল ১২৬৬ সালের বোশেখ মাসের শেষ বরাবর। গদাধর চব্বিশ বছরে পা দিয়েছে, সারদা ছ’ বছরে।
জয়রামবাটিতে বিয়ে। জয়রামবাটি কামারপকুর থেকে মাইল চারেকের পথ-পশ্চিমে। বরবেশে গদাধরকে না-জানি কেমন দেখাচ্ছে! শক্ত করে কসি-বাঁধা সুন্দর ধুতি পরনে, গায়ে কুর্তা, গলায় ফুলের মালা, কপালে চন্দনলেপ। প্রতিবেশিনীরা এসে সাজিয়ে দিয়েছে গদাধরকে কিন্তু মেজ বৌঠানের মনে দুঃখ, বাজনা নেই। অন্তত ঢোল আর কাঁসর না হলে বিয়ে কি!
দাঁড়াও, আমিই ঢোল বাজিয়ে দিচ্ছি।
দু’হাতে পাছা বাজিয়ে নাচতে লাগল গদাধর। মুখে বোল তুললে ঢোলের। রঙ্গ দেখে সকলে হেসে খুন। মেজ বৌঠানের মনেও আর খেদ নেই। বিয়েতে চলেছে—এমন সময় ঢোলের বাজনা!
বাল্যভাব না ধরলে গদাধরকে বুঝতে পারবে না কেউ।
খালি পায়ে, খোলা গায়ে বরযাত্রী চলেছে সব। কোমরে চাদর, কাঁধে গামছা, হাতে লাঠি। যেন শিবের বিয়েতে চলেছে সব তাল-বেতাল, ভূত-প্রেতের দল। মধ্যে চলেছেন কন্দৰ্পদর্শনাশী ব্যোমকেশ৷
সারদার সঙ্গে কেমন না-জানি শুভদৃষ্টি হল গদাধরের। অপর্ণার সঙ্গে মহাদেবের। শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে শ্রীমতীর।
রাধাকৃষ্ণের যুগল-মূর্তির মানে কি? পুরুষ আর প্রকৃতি অভেদ, তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। পুরুষ-প্রকৃতির যোগই যোগমায়া। বঙ্কিম ভাব ঐ যোগের জন্যে। এই যোগ দেখার জন্যেই শ্রীকৃষ্ণের দৃষ্টি শ্রীমতীর দিকে, শ্রীমতীর দৃষ্টি শ্রীকৃষ্ণের দিকে। শ্রীমতীর নাকে নীল পাথর, শ্রীকৃষ্ণ শ্যামবর্ণ বলে। শ্রীকৃষ্ণের নাকে মুক্তো যেহেতু শ্রীমতীর গৌর বরণ মুক্তোর মত উজ্জ্বল। শ্রীমতীর বসন নীল বলে পীতাম্বর হয়েছেন শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীমতীর পায়ে নূপুর বলে শ্রীকৃষ্ণের পায়েও নূপুর। তার মানে প্রকৃতির সঙ্গে পুরুষের অন্তরে-বাহিরে মিল। যেমন ধরো আবার শিব-কালীর মূর্তি। শিবের উপর দাঁড়িয়ে আছেন কালী, শিব শব হয়ে পড়ে আছেন পদতলে। আর কালী তাকিয়ে আছেন শিবের দিকে। প্রকৃতি কত্রী, পুরুষ অকর্তা। তাই শিব শব হয়ে আছেন। কিন্তু পুরুষের যোগেই প্রকৃতির লীলা-সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের রাসোৎসব। শিব আর শক্তি ভিন্ন সংসারে আর কিছু নেই।
শিব আর শক্তির চারি চক্ষুর মিলন হল।
সাতাশ কাঠি জেলে এয়োরা বরকে প্রদক্ষিণ করছে, হঠাৎ জ্বালা-কাঠি লেগে গদাধরের হাতে-বাঁধা হলদে-মাখানো মাঙ্গলিক তো পুড়ে গেল।
এটা কি হল?
অবিদ্যা বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেল। অবিদ্যা-মুক্ত শক্তিকে গ্রহণ করল গদাধর।
ঠাকুর বললেন, ‘এই অবিদ্যাকে জয় করবার জন্যেই তো শক্তির পূজা-পদ্ধতি। তাকে প্রসন্ন করবার জন্যেই দাসী ভাবে, বীর ভাবে, সন্তান ভাবে আরাধনা৷ রমণ দ্বারা প্রসন্ন করার নাম বীর ভাব। সে বড় উৎকট সাধনা। আমার সন্তান ভাব। স্ত্রীলোকের স্তন আমি মাতৃস্তন মনে করি। মা’র দাসী ভাবে, সখী ভাবে ছিলাম দু’বছর। মেয়েরা এক-একটি শক্তির রূপ। বিয়ের সময় বাঙলা দেশে বরের হাতে জাঁতি থাকে, পশ্চিমে থাকে ছুরি। তার মানে, ঐ শক্তিরূপা কন্যার সাহায্যে বর মায়া-পাশ ছেদন করবে। এটিও বীর ভাব। কন্যা শক্তিরূপা। বিয়েতে বর-বোকাটি পিছনে বসে থাকে। কন্যা কিন্তু নিঃশঙ্ক।’
বাসর সাজাচ্ছে মেয়েরা। ওদিকে পাত পড়েছে নিমন্ত্রিতদের।
রঙ্গিনীরা ধরলে গদাধরকে, গান ধরো একখানা।
কত রসরঙ্গই যে করছে মেয়েরা, কত লীলা-চাপল্য। দেখতে দেখতে ভুবন-রঙ্গিনীর কথা মনে পড়ে গেল গদাধরের। হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, গান গাইবে বৈ কি। মুক্ত-উদার গলায় শ্যামাগুণোগান শুরু করলে।
যারা খাচ্ছিল, খাওয়া ভুলে স্তব্ধ হয়ে শুনতে লাগল। রঙ্গিনীরা রঙ্গ ভুলে পাষাণবৎ তাকিয়ে রইল মুখের দিকে। গদাধর তন্ময়, বিভোর, বাহ্যজ্ঞানহীন। লুটিয়ে পড়ে রঙ্গিনীদের প্রণাম করতে ব্যস্ত। মা, মা গো, সর্বত্রই তুই, সর্বত্র তোর আনন্দের ছড়াছড়ি।
মধুর স্বরে নামোচ্চারণ করছেন ঠাকুর। আর বলছেন মাকে, ‘ও মা, ব্রহ্মজ্ঞান দিয়ে বেহুঁস করে রাখিস নে। ব্রহ্মজ্ঞান চাই না মা। আমি আনন্দ করব, বিলাস করব! শুঁটকে সাধু আমি হব না।
১৭
ঘর-আলো-করা বউ এসেছে সংসারে।
বরবধূকে দেখবার জন্যে কত লোক এসেছে আনন্দ করে। কত শান্তির দিন আজ চন্দ্রমণির! কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও একটা দুঃখের কাঁটা তাঁর মনের মধ্যে খচখচ করছে। বউয়ের গা থেকে গয়নাগুলো খুলে নিতে হবে।
বউকে গয়না গড়িয়ে দেবেন এমন সঙ্গতি নেই চন্দ্রমণির। লাহা বাবুদের বাড়ি থেকে চেয়ে নিয়ে এসে বিয়ের দিন সাজানো হয়েছিল বউকে। ফিরিয়ে দেবার দিন আজ। লাহা বাবুদের কাছে মুখ থাকবে না নইলে। কিন্তু কোন মুখেই বা ঐ কচি গা থেকে গয়নাগুলো খুলে নেব?
মা’র মনের ব্যথাটা বুঝতে পেরেছে গদাধর। বললে, তুমি কিচ্ছু ভেবো না। আমিই খুলে নিতে পারব।
ঘুমিয়ে পড়েছে সারদা। শৈশবশান্তিতে ঘুমিয়েছে।
ডান হাতখানি আলগোছে আলতো করে তুলে ধরছে গদাধর, সন্তর্পণে খুলে নিচ্ছে গয়না। তেমনি এক সময়ে আবার বাঁ হাত থেকে। রুমে-ক্রমে একে-একে আর সবগুলিই। সারদা যেমন ঘুমে তেমনি ঘুমে।
টের পেল ঘুম থেকে জেগে উঠে। এ কি, তার গায়ের গয়না কি হল? কে নিল? কাঁদতে বসল সারদা।
চন্দ্রমণির বুক ফেটে যাচ্ছে। সারদাকে কোলে বসিয়ে আদর করতে লাগলেন। বললেন, ‘গেলে গেছে। তুমি কেঁদো না, এর চেয়ে ঢের ভালো গয়না কত দেবে তোমাকে গদাই।’
সারদা শান্ত হল বটে, কিন্তু তার খুড়ো মেনে নিতে চাইলেন না ঘাড় পেতে। নতুন বালিকা-বধূকে একেবারে বৈরাগিনী সাজিয়ে দেওয়া। যা নয় তাই দিয়ে সাজিয়ে ফের সেই সাজ লুকিয়ে খুলে নিয়ে যাওয়া। এ প্রবঞ্চনা ছাড়া আর কি। ঘোর বিরক্ত হলেন। সারদাকে নিয়ে সোজা ফিরে গেলেন জয়রামবাটি।
‘কোথায় আর যাবে?’ পরিহাসচ্ছলে মাকে প্রবোধ দিল গদাধর। ‘ও ফিরে না আসুক কিন্তু বিয়ে তো আর ফিরবে না।’
শ্রীমা যখন দক্ষিণেশ্বরে ছিলেন, ঠাকুর তাঁকে সোনার গয়না গড়িয়ে দিয়েছিলেন। উপর-হাতে তাবিজ আর নিচের হাতে বালা।
ওরে, বালা কিন্তু ডাইমন-কাটা হবে।
ঠাকুরের দেখি গয়নার নক্সার উপরেও নজর,
ওরে, পঞ্চবটীতে যখন সীতা দেবীকে দেখেছিলাম তখন তাঁর হাতে ডাইমন-কাটা বালা ছিল। সেই রকম বালা দেব ওকে।
বিষ্ণুঘরের যখন গয়না চুরি গেল, মথুরবাবু ঠাকুরকে খোঁটা দিলেন, ‘ছি ঠাকুর, তুমি তোমার গয়না রক্ষা করতে পারলে না!’
ঠাকুর বললেন, ‘তোমার বুদ্ধিকে বলিহারি। স্বয়ং লক্ষ্মী যাঁর দাসী তাঁর কি ঐশ্বর্ষের অভাব? তুমি কী ঐশ্বর্য তাঁকে দিতে পারো? ও গয়না তোমার পক্ষেই একটা ভারি জিনিস, মস্ত জিনিস, কিন্তু ঈশ্বরের কাছে মাটির ড্যালা।’ সেই কথাই আবার বলছিলেন কেশব সেনকে। ‘তোমরা অত ঐশ্বর্য বর্ণনা কর কেন? হে ঈশ্বর, তুমি সূর্য করেছ, চন্দ্র করেছ, আকাশ করেছ—এ সব বলার কী দরকার? শুধু বাগান দেখেই তারিফ করে লাভ কি? বাগানের মালিক বাবুকে দেখবে না? বাগান বড় না বাবু বড়? নরেন্দ্রকে যখন আমি দেখলাম, তখন আমি শুধু তাকেই দেখলাম—তার কোথায় বাড়ি, বাবার কি নাম, কি করে, তারা ক’টি ভাই ভুলেও একদিন জিজ্ঞেস করলাম না। আমার অত খবরে কাজ কি? আমি আম খেতে এসেছি, আম খেয়ে যাব। বাগানে ক’টা গাছ, ক’টা তার ডাল-পালা, কত তার পাতা–ও খোঁজে আমার কি হবে? মদ খাওয়া হলে শুঁড়ির দোকানে কত মণ মদ আছে তার হিসেবে আমার কী দরকার? আমার এক বোতলেই কাজ হয়ে গেছে।’
তবে কি জানো? মানুষ নিজে ঐশ্বর্য ভালোবাসে বলে ভাবে ঈশ্বরও বুঝি তাই ভালোবাসেন। ভাবে ঈশ্বরের ঐশ্বর্য প্রশংসা করলে তিনি খুশি হবেন। ঈশ্বরের কাছে ও-সব বাজিকরের বাজি। পঞ্চভূতের কুহক-কৌশল ।
ঠাকুর যখন কলকাতায় আসতেন হৃদয় তাঁকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শহর দেখাত। একদিন বললে ‘এই দেখ মামা, লাট সাহেবের বাড়ি। দেখেছ? কত বড় বড় থাম!’
ঠাকুর মাকে দেখলেন। মা-ই সব দেখিয়ে দিলেন ঠাকুরকে। দেখিয়ে দিলেন কতগুলি মাটির চাক থাক থাক করে সাজানো।
শম্ভু মল্লিক মস্ত বড়লোক—মা-অন্ত প্রাণ। মথুরবাবুর মারা যাবার পর মা’র নির্দেশে তিনিই হলেন ঠাকুরের রসদদার। ঠাকুরকে বললেন, ‘এখন এই আশীর্বাদ করো, যাতে আমার যা-কিছু ঐশ্বর্য সব তাঁর পাদপদ্মে দিয়ে মরতে পারি।’ ঠাকুর হাসলেন। বললেন, ‘এ তোমার পক্ষেই ঐশ্বর্য। তাঁকে তুমি কী দেবে? কী আছে তোমার দেবার? তাঁর কাছে এ সব ধুলো-মাটি।’
যদি কিছু দিতে চাও ভক্তি দাও, প্রাণঢালা ভক্তি। ঈশ্বর কি ঐশ্বর্যের বশ? তিনি ভক্তির বশ, তিনি ভাবের বশ। তিনি কি তোমার কাছে টাকা-কড়ি ধন- দৌলত চান? তিনি চান ভাব, ভক্তি, ভালোবাসা।
গদাধর সেবার প্রায় বছর দুই ছিল কামারপুকুরে। শরীর ভালো করে না সারলে চন্দ্রমণি তাকে কিছুতেই আর যেতে দেবেন না কলকাতায়। এদিকে সারদা সাত বছরে পা দিল। এবার একবার গদাধরকে শ্বশুরবাড়ি যেতে হয়। ‘জোড়ে’ ফিরতে হয় বউ নিয়ে। তাই গেল গদাধর।
সাত বছরের মেয়ে সারদা—তাকে কে বলে দিলে কে জানে—ঘটি করে জল নিয়ে এল। নিয়ে এল পাখা। রূপের পুতলি সেই মেয়ে, মাথাভরা এক রাশ কালো চুল পিঠের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। জল ঢেলে গদাধরের পা ধুয়ে দিতে লাগল সারদা। জল-ভরা ছোট ছোট দু’টি হাত বুলিয়ে দিতে লাগল পায়ের উপর। শেষে হাঁটু মুড়ে নিচু হয়ে মাথার চুলে পা মুছে দিতে লাগল।
পা-ধোয়ানোর পর কাছে এসে দাঁড়াল সারদা। ছোট হাতে পাখা নেড়ে নেড়ে হাওয়া দিতে লাগল গদাধরকে।
বৈকুণ্ঠে লক্ষ্মী বসেছেন বিষ্ণুর পদসেবায়। কিংবা, সারদা গদাধরের।
এই সেবাতেই নিয়তস্থিতা সারদা। বারো শো একাত্তর সালে দূর্ভিক্ষ লেগেছে গ্রামে-গ্রামান্তরে। সারদার তখন এগারো বছর বয়েস, আছে বাপের বাড়িতে। খিদের তাড়নায় কত লোকই যে আসছে কাতারে কাতারে। রামচন্দ্র, সারদার বাবা, চালে-ডালে খিচুড়ি রাঁধিয়ে রাখছেন হাঁড়ি-হাঁড়ি। বলছেন, ‘বাড়ি আর বাড়ির বাইরের সবাই খাবে এ খিচুড়ি। যে আসবে সে। শুধু আমার সারদার জন্যে দু’টি ভালো চালের ভাত করবে—’
তাকে তো শুধু খাওয়ানো নয়, তাকে একটু ভোগ দেওয়া!
একেক দিন এত লোক এসে পড়ে যে রাঁধা খিচুড়িতে কুলোয় না। আবার চড়ানো হয় তক্ষুনি। আর সেই গরম খিচুড়ি ঢেলে দেয় ক্ষুধার্তদের পাতায়। যেমন তপ্ত খিদে তেমনি তপ্ত খিচুড়ি। সারদা পাখা নিয়ে এসে দুই হাতে বাতাস করে। আহা, শিগগির করে জুড়োক, খিদের অন্ন কতক্ষণ মুখে না দিয়ে থাকা যায়!
এগারো বছরের বালিকা নয়, স্বয়ং বিশ্বমাতা। দুঃখার্ত জীবের ক্ষুধাহরণ করতে এসেছেন।
তার আগে, পাঁচ বছরের যখন মেয়ে, তখন থেকে সে সংসারের কাজে সাহায্য করছে। খেত থেকে তুলো তুলে এনে চরকায় পৈতে কাটছে। মুনিষদের মুড়ি গুড় দিয়ে আসছে মাঠে। একবার পঙ্গপাল এসে সমস্ত ধান নষ্ট করে দিলে। মাটি থেকে ধান কুড়োবার পালা পড়ল। সারদার ছোট ছোট দুটি মাঠিতে কি কম জায়গা? সেও লেগে গেল ধান কুড়োতে। আকণ্ঠ জলে নেমে গরুর জন্যে দলঘাস কাটছে। একবার দলঘাস কাটবার সময় দেখলে, তারই সমবয়সী আরেকটি মেয়ের হাতে দা, সেও কাটছে দলঘাস। কে মেয়ে, কেন কাটছে, কে বলবে। কাটছে বটে কিন্তু নিচ্ছে না। একটি দল কেটে উপরে রেখে এসে সারদা দেখছে আরেকটি দল কেটে রেখেছে মেয়েটি, সারদাকে আর কাটতে হচ্ছে না।
এমনি আরো কত দেখেছে সারদা। তেরো বছর বয়সে যখন সে আবার কামারপুকুরে যায় তখন হালদার-পুকুরে একা একা নাইতে যেতে তার ভয় হত। নতুন বউ, একলা ঘাটে যাবে কি! খিড়কির দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে দেখে, আটটি মেয়েছেলে দাঁড়িয়ে। তারাও নাইতে চলেছে। আর তবে কিসের ভয়! রাস্তায় নামল সারদা, মেয়েছেলেদের চারজন তার আগে, চারজন তার পিছনে।
তার সঙ্গে তারাও আগে-পিছে হয়ে স্নান করলে। তেমনি করে পৌঁছে দিয়ে গেল বাড়ি। এমনি শুধু একদিন নয়, নিত্যি।
কিন্তু কারা এরা, গ্রামের নতুন ছুটুলে বউ সারদা, তার সে কি জানে!
এবার, সাত বছর বয়সে, স্বামীর সঙ্গে ‘জোড়ে’ এসেছে সে কামারপুকুরে। কিন্তু মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হবার পরেই গদাধর জেদ ধরল, দক্ষিণেশ্বরে ফিরে যাব।
চন্দ্রমণি আর পীড়াপীড়ি করতে পেলেন না। গদাধর এখন অনেক সুস্থ হয়েছে, শান্ত হয়েছে। তারপর বিয়ে করেছে সজ্ঞানে। চন্দ্রমণির এখন অনেক আশ্বাস, অনেক জোর। সারদাই তাঁর সেই বল-ভরসা।
কিন্তু দক্ষিণেশ্বরে ফিরেই গদাধর আবার যে-কে-সে। কোথায় তার মা-ভাই, কোথায় তার স্ত্রী-সংসার! আবার, দেখতে দেখতে, বুক তার লাল হয়ে উঠল,
শুরু হল দুঃসহ গাত্রদাহ। আর চোখের কোণ থেকে ঘুম গেল অদৃশ্য হয়ে। আবার দেখা দিল সেই অসাধ্য রোগ।
আবার শুরু হল মা’র জন্যে কান্না।
‘তোকে ডাকার এই ফল হল, মা? শরীরে এই বিষম ব্যাধি দিলি? যায়-যাক এই শরীর, তবু তুই আমাকে ছাড়িসনি। তুই আমাকে দেখা দে, আমায় শুধু তুই এইটুকু কৃপা কর। আমার কেউ নেই, আমার কেউ নেই তুই ছাড়া।
১৮
দেখুন দেখি আবার কি হল।
গঙ্গাপ্রসাদ সেনের কাছে গদাধরকে আবার নিয়ে এসেছেন মথুরবাবু। ক্রমশই বৃদ্ধির মুখে। এ কি উন্মাদ না মূর্চ্ছারোগ? রাতে এক ফোঁটা ঘুম নেই, একটা বাঁশ কাঁধে করে মন্দিরের চারদিকে ঘুরে বেড়ায়। কুকুরকে খেতে দিয়ে তার ভুক্তাবশেষ মুখে পোরে। সর্বাঙ্গে জ্বালা, বুক-পিঠ লাল। আগের ওষুধে তো কিছু হল না। অন্য কিছু ব্যবস্থা করুন। গঙ্গাপ্রসাদ ভাবতে বসলেন। পাশেই উপস্থিত ছিলেন আরেক জন কে কবিরাজ। কেউ বলেন, গঙ্গাপ্রসাদের ভাই দূর্গাপ্রসাদ, কেউ বলেন, পূর্ববঙ্গের এক নামী বৈদ্য। তিনি বললেন, এ রোগ ওষুধে মালিশে সারবার নয়। এ হচ্ছে দিব্যোন্মাদের অবস্থা। এ ব্যাধি যোগজ ব্যাধি-
দিব্যদ্রষ্টা আয়ূর্বেদী। ইনিই প্রথম বুঝতে পারলেন রোগের মূল কোথায়৷ কিন্তু তাঁর কথা কে শোনে। বাইরের শাখা-পল্লব নিয়েই সকলের মাথাব্যথা। তেল-বড়ি, ভস্ম-চূর্ণ।
আস্তে আস্তে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় গদাধর। নিজের চোখ দেখে। স্থির, বদ্ধ, নিশ্চল চোখ। আঙুল দিয়ে চোখের পাতা দুটো টানতে চেষ্টা করে, নড়াতে চেষ্টা করে।
নড়ে না, পলক পড়ে না চোখের। কাঁচের চোখের মত নিস্পন্দ হয়ে আছে। চোখে খোঁচা মারে আঙুলের। তবু নিষ্পলক। চন্দ্রমণির কানে খবর পৌঁছল। নিরুপায় হয়ে বুড়ো শিবের মন্দিরে হত্যে
দিয়ে পড়লেন। আমার গদাধরকে ভালো করে দাও। তার চোখে ঘুম দাও, তার গায়ের দাহ নিবারণ করো। যতক্ষণ পর্যন্ত না শুনছ আমার প্রার্থনা, জলস্পর্শ করব না আমি।
মকুন্দপুরের শিবের কাছে যা। সেখানে গিয়ে হত্যে দে!
প্রত্যাদেশ পেলেন চন্দ্রমণি। ছটলেন মকুন্দপুরে। দু’-তিন দিন পড়ে রইলেন ধর্ণা দিয়ে, নিরম্বু নিরশনে। স্বপ্নে দেখা দিলেন মহাদেব। পরনে বাঘছাল, মাথায় জটাজুট, হাতে ত্রিশূল। শুদ্ধ-স্ফটিক-সঙ্কাশ চন্দ্রশেখর। বললেন, কিচ্ছু ভয় নেই, তোর ছেলে পাগল হয়নি। তার মাঝে ঈশ্বরের সঞ্চার হয়েছে, তাই তার ঐ বৈলক্ষণ্য। বাড়ি যা, মন ঠাণ্ডা করে থাক—
চন্দ্রমণি আশ্বস্ত হলেন। শিবের পূজো দিয়ে মন খাঁটি করে ঘরে ফিরলেন। ঘরে ফিরলেন তাঁর কুলদেবতা রঘুবীরের আশ্রয়ে। সেবা করতে লাগলেন প্রাণ ঢেলে। আমার গদাধরকে দেখো। রেখো তাকে বাঁচিয়ে।
কিন্তু গদাধরের মন ঠাণ্ডা হয় না। নিয়তজাগ্রত নিষ্পলক দুই চক্ষু দিয়ে দীর্ঘ ধারায় তার জল পড়ে। বলে, মা, মা গো, দুই চোখ আমার নিশ্চল করে দিয়েছিস চোখের সামনে চিরন্তনী হয়ে থাকবি বলে। যাতে এক নিমেষও তোকে না হারাই। যাতে পলক ফেলতে না ফেলতে পালিয়ে না যাস ফাঁকি দিয়ে। কিন্তু তুই কই? এমনি করে আমাকে জাগিয়ে রেখে তুই শেষে ঘুমিয়ে পড়বি নিশ্চিন্ত হয়ে? এই তোর বিচার? তোর বিবেচনা? রোগের যন্ত্রণায় বিনিদ্র সন্তান ছট্ফট্ করলে তার মা কি ঘুমোয়? না, তার ঘুম আসে? এমনি ছ’ বছর চোখের পাতা একত্র করেনি গদাধর। ছ’ বছর সে পলক ফেলেনি। ঘুমোয়নি এক বিন্দু। দিনে-রাত্রে, আলোতে-অন্ধকারে, নির্জনে-জনতায় সর্বক্ষণ দুই চোখ সে খুলে রেখেছে। একটি তীব্র দৃষ্টিতে আবিদ্ধ করে রেখেছে। স্থির-নিবদ্ধ তীব্র দৃষ্টি।
মা কি পারেন না এসে? ঐ দৃষ্টির আহবান, ঐ দৃষ্টির আকর্ষণ এড়াতে পারেন এমন তাঁর সাধ্য নেই। ঐ পাথুরে কান্নাই মমতার নির্ঝরিণীকে ডেকে আনে৷ বসেন এসে পাশটিতে। বলেন, ওরে আর কাঁদিস নে। আমি এসেছি। ডাকার মত ডাকলে আমি কি না এসে থাকতে পারি? এখন কি বলবি আমাকে বল। তাকা, কথা ক–
চাই এই একগুঁয়ে ব্যাকুলতা। অবাধ্য উন্মাদনা। যদি দেখা না দিবি তো রাত-দিন চোখ চেয়ে থাকব। দাঁতে কুটোটিও কাটব না। অনশনে দেহপাত করব। যদি বেশি দেরি করিস নিজের গলা কাটব। দেখি তুই টলিস কি না। চাই এই একবগ্গা গোঁ।
‘মাগ-ছেলের জন্যে লোকে এক ঘটি কাঁদে, টাকার জন্যে এক গামলা, কিন্তু ঈশ্বরের জন্যে কে কাঁদছে? ঈশ্বরের জন্যে কাঁদতে বাবুদের লজ্জা হয়!’ বললেন ঠাকুর, ‘টাকার জন্যে খুব ছটফটানি। কিন্তু টাকায় হয় কি? ভাত হয়, ডাল হয়, কাপড় হয়, থাকবার জায়গা হয়—এই পর্যন্ত। ভগবান লাভ হয় না। ভগবান লাভ হবে না তো মানুষ হয়ে জন্মালাম কেন? ‘
কিন্তু কি করে পাবো ঈশ্বরকে?
নায়মাত্মা প্রবচনেন লভ্যো ন মেধয়া ন বহুনা শ্রুতেন। পড়ে-বুঝে-শুনে কিছুতেই পাবি না। যদি তিনি কৃপা করেন তবেই পাবি। তবে এই কৃপা উদ্রেক করবি কি করে? খুব খানিকটা ছটোছুটি করে। ছেলে অনেক ছুটোছুটি করছে দেখে মা’র দয়া হয়। খেলায় এসে মা লুকিয়েছিলেন, এসে দেখা দেন। তাঁরই ইচ্ছে বেশ খানিকটা ছুটোছুটি হোক। তাঁর এ সংসার যে লীলার সংসার। তিনি যে ইচ্ছাময়ী।
চাই ব্যাকুলতা, চাই আনন্দসান্দ্রা ভক্তি, চাই অচল-অনল বিশ্বাস। তিন টান হলেই তবে দেখা দেন ভগবান। বিষয়ের উপর বিষয়ীর টান, পতির উপর সতীর টান আর সন্তানের উপর মা’র টান। এই তিন টান যদি মেশাতে পারিস তবে ভগবান সটান এসে মিশে যাবেন।
মা’র আঁচল ধরে ছেলে পয়সা চাচ্ছে, ঘুড়ি কিনবে। মা পাড়াবেড়ানীদের সঙ্গে গল্পে মত্ত, লক্ষ্যও নেই ছেলের দিকে। ছেলেও তেমনি নাছোড়, নাকী সুরে শুরু করে কাকুতি-মিনতি। মা তখন ওজর আপত্তি তোলে, না, উনি বারণ করে গেছেন। ঘুড়ি কিনে শেষে একটা কাণ্ড বাধাবি আর কি। বলে আবার ছেঁড়া গল্পের সুতো ধরে। ছেলেও তেমনি ধুরন্ধর। কাকুতি-মিনতিতে যখন কিছু হল না, তখন সে স্রেফ কান্না জোড়ে। গল্প করা মাথায় ওঠে। তখন পাড়াবেড়ানীদের মা বলে, তোমরা একটু বোস ভাই, ছেলেটাকে আগে শান্ত করে আসি। বলে ঘরে ঢুকে বাক্স খুলে পয়সা ফেলে দেয়। বিরক্ত হয়েছে মা, কিন্তু ব্যাকুলতার কাছে হার মেনেছে।
অনুরক্ত না করতে পারিস বিরক্ত করে মা’র থেকে আদায় করে নে। যা বিরক্তি তাই তাঁর অনুরক্তি।
তার জন্যে এক অস্ত্র ব্যাকুলতা। তিনি যেকালে জন্ম দিয়েছেন আমাদের, সেকালে তাঁর ঘরে আমাদের হিস্যা আছে। বিষয়ের ভাগের জন্যে ব্যতিব্যস্ত করে তোল তাঁকে, আগেই দেখিস তোর হিস্যা ফেলে দেবেন। মা’র উপর জোর খাটবে না তো কার উপর খাটবে? আগে আমার হিস্যা ফেলে দাও তো দাও, নইলে গলায় ছুরি দেব।
নে বাবা নে তোর হিস্যা, শান্ত হ।
ঈশ্বরকে কেমন করে পাওয়া যায়? এক শিষ্য জিগগেস করলে গুরুকে।
গুরু বললে, এস দেখিয়ে দিই। বলে এক পুকুরের কাছে নিয়ে গেল। এই জলের মধ্যে ঢোকো। জলের মধ্যে ডুবিয়ে রাখল শিষ্যকে। কতক্ষণ পরে টেনে তুললে হাত ধরে। জিজ্ঞেস করলে, কেমন লাগছিল? শিষ্য হাঁফ নিয়ে বললে, প্রাণ আটুবাটু করছিল, যেন প্রাণ যায়। গুরু বললে, যখন ভগবানের জন্যে প্রাণ এমনি আটুবাটু করবে, তখন জানবে দর্শনের আর দেরি নেই।
তোমার ব্যাকুলতা, তাঁর কৃপা। কিন্তু ব্যাকুলতা হয় কি করে? অনুরাগে। পরম প্রেমভাবে। সে প্রেমভাব কোত্থেকে আসবে? শুধু নামে। নামানন্দে।
‘তবে কি জানো? ভোগান্ত না হলে ব্যাকুলতা হয় না। কাম-কাঞ্চনের ভোগ যেটুকু আছে সেটুকু তৃপ্তি না হলে জগতের মাকে মনে পড়ে না। ছেলে যখন খেলায় মাতে তখন মাকে চায় না। খেলা সাঙ্গ হয়ে গেলে তখন বলে, ‘মা যাবো’। হৃদের ছেলে পায়রা নিয়ে খেলা করত, পায়রাকে ডাকত, আয় তি-তি, তি- তি! যাই তৃপ্তি হল খেলা, অমনি কান্না ধরল, মা যাবো। কত ভোলাতে চেষ্টা করতুম, সে ভুলত না। খেলা-টেলা আর তার কিছুই ভালো লাগছে না, সন্ধ্যা হয় হয়, তার এখন মাকে চাই। তাকে কাঁদতে দেখে আমিও কাঁদতুম। এমনিই তো ঈশ্বরের জন্যে কান্না। ছেলে আমার কাছে যাবে না, কিন্তু যেই এক জন অচেনা লোক এসে বললে, চল তোকে তোর মা’র কাছে দিয়ে আসি, অমনি তার কোলে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল।’
আসলে যত দিন ভোগান্ত না হয় তত দিনই ভোগান্তি।
তার পর আবার উপাধি আছে না? এদিকে পিলে-রূগী, পরেছে কালোপেড়ে কাপড়, অমনি নিধুবাবুর টপ্পা ধরেছে। রোগা লোকও যদি বা-জুতো পরে, অমনি শিস দিতে আরম্ভ করে, মুখ দিয়ে ফুটফাট ইংরিজি কথা বেরোয়। সামান্য একটু আধার হয়েছে, গেরুয়া পরেছে, অমনি অহংকারে ডগমগ। একটু ত্রুটি হলেই ক্রোধ, অভিমান।
টাকা একটা বিলক্ষণ উপাধি। টাকা হলেই মানুষ আরেক রকম হয়ে যায়, সে আর মানুষ থাকে না। সেই ব্রাহ্মণের কথা মনে আছে রে তোর হৃদে? এখানে আসা-যাওয়া করত, বাইরে বেশ বিনয়ী, বেশ সরল-কোমল। সেবার কোন্নগর যাচ্ছি, তুই সঙ্গে আছিস। নৌকো থেকে যেই নামছি, দেখি সেই ব্রাহ্মণ বসে আছে গঙ্গার ধারে। বোধ হয় হাওয়া খাচ্ছে। আমাকে দেখে বলছে, কি ঠাকুর! বলি আছ কেমন? আমি থমকে গেলাম। তার কথার স্বর শুনেই তোকে বললুম, ওরে হৃদে ওর নিঘঘাৎ টাকা হয়েছে, নইলে গলা দিয়ে অমন সুর বেরোয়? তুই হাসতে লাগলি।
কেশব সেনকে বললেন ঠাকুর, ‘যতক্ষণ উপাধি আছে, ততক্ষণ তিনি নেই। উপাধি যতই যাবে ততই তিনি কাছে হবেন। উঁচু ঢিপিতে বৃষ্টির জল জমে না, খাল জমিতে জমে। তাই যেখানে অহংকার, সেখানে জমে না তাঁর কৃপাবারি। তাই দীনহীনের ভাব ভালো, নিঃস্ব-নিষ্কিঞ্চনের ভাব।’
ডাক দেখি মন ডাকার মত কেমন শ্যামা থাকতে পারে!
সেই শ্যামা এসেছেন গদাধরের কাছে। দুধের ছেলেকে কোলে নিয়ে বসেছেন।
মা গো, কেন এত ছুটোছুটি করিয়ে বেড়াস? তুই যখন হাতের এত কাছে কেন তোকে ছুঁতে দিস না?
বুড়িকে যদি আগে থাকতেই সকলে ছুঁয়ে ফেলে, তা হলে খেলা কেমন করে হয়? খেলা চললেই তো বুড়ির আহ্লাদ। তার মায়াতেই বদ্ধ, তার দয়াতেই আবার মুক্ত। সব যে তার ইচ্ছা, তার খেলা। তার যে খুশি এমনি করেই খেলা হোক। একবার মায়ার খেলা, তার পর আবার দয়ার খেলা।
মা যখন আসেন না তখন গদাধরের শরীর থেকে আরেক জন কে বেরিয়ে আসে। অবিকল আরেক জন গদাধর। পবিত্র-পাবক সন্ন্যাসীমূর্তি। তার যে আত্ম-স্বরূপ, সে। সেই তার সচ্চিদানন্দ গুরু।
যখন পূর্ণজ্ঞান হয় তখন কে বা গুরু কে বা শিষ্য। তখন নিজেই গুরু নিজেই শিষ্য। বা, তখন গুরুও নেই শিষ্যও নেই। সে বড় কঠিন ঠাঁই, গুরু-শিষ্যে দেখা নাই। তাই শুকদেব যখন ব্রহ্মজ্ঞানের জন্যে জনকরাজার কাছে গিয়েছিলেন, জনকরাজা বললেন, আগে দক্ষিণা দাও। শুকদেব বললেন, আগে জিনিস না পেলে কি করে দক্ষিণা হয়? জনকরাজা হাসতে লাগলেন। বললেন, ব্রহ্মজ্ঞান পেলে কি আর গুরু-শিষ্য বোধ থাকবে? তখন কে বা জনক, কে বা শুক, আর কী বা দক্ষিণা! তাই বলি, বাপু দক্ষিণাটি আগে দাও ।
একদিন এক শিবমন্দিরে ঢুকে গদাধর ‘মহিম্ন স্তোত্র’ পড়ছে। পড়তে-পড়তে সেই শ্লোকে এসেছে যেখানে বলেছে শিবমহিমার আর পারাপার নেই। হিমালয় যদি হয় কালির বড়ি, সমুদ্র হয় দোয়াত, কল্পতরুশাখা কলম, সমস্ত পৃথিবী কাগজ আর স্বয়ং সরস্বতী লেখিকা, তবু সেই কালির দোয়াতে সেই কলম ডুবিয়ে সেই বিস্তীর্ণ কাগজে অনন্ত কাল ধরে লিখে-লিখেও শিবমহিমার কথা সে লেখিকা শেষ করতে পারবেন না। পড়তে-পড়তে বিহ্বল হয়ে পড়ল গদাধর। দরদরধারে কাঁদতে লাগল। কথা আর পাঠ সব গুলিয়ে যেতে লাগল। চেঁচিয়ে উঠল আকুল হয়ে- মহাদেব গো, তোমার গুণের কথা কেমন করে বলব! শুধু নীরবে অশ্রু-বিসর্জন নয়, একেবারে কান্নার রোল তুলল গদাধর। মুক্তকণ্ঠের কান্না। আন্তরিকতার আর্তনাদ। মন্দিরের আমলা-ফয়লারা ছুটে এল চার দিক থেকে। ওরে, ছোট ভটচাজ আবার পাগলামি শুরু করেছে। সেই পেটেন্ট পাগলামি। ভাবলাম বুঝি অন্য রকম কিছু হবে। না রে, আজ কিছু বাড়াবাড়ি দেখছি। ঐখানে দাঁড়িয়ে আছিস কি, সেজবাবু আছেন আজ ঠাকুরবাড়িতে, পাগলাকে বেঁধে রাখ। নইলে বলা যায় না শেষ কালে হয়তো শিবের ঘাড়ে গিয়ে চেপে বসবে। টেনে রাখ, হাত ধরে রাখ কেউ গোলমাল শুনে স্বয়ং মথুরবাবু এসে উপস্থিত। দৃশ্য দেখে মোহিত হয়ে গেলেন। শিব-ভাবে বিভোর হয়ে আছে গদাধর। উদাসীন আর উপশান্ত। আত্মবিভূতিতে বৈভবময় ৷
কিন্তু ওরা ওদিকে সবাই গোলমাল করছে কেন?
‘বলছি কি, বিগ্রহের থেকে ওকে দূরে সরিয়ে রাখুক কেউ। কি অঘটন করে বসে তার ঠিক কি।
‘খবরদার।’ গর্জে উঠলেন মথুরবাবু, কার ঘাড়ে দুটো মাথা ছোট ভটচাজের গায়ে হাত দেয়!’
জোঁকের মুখে নুন পড়ল। সবাই চুপ হয়ে গেল।
মুগ্ধ নেত্রে মথুরবাবু তাঁর গুরুকে দেখতে লাগলেন। দুস্তর ভব-সমুদ্রের নিপুণ কর্ণধারকে।
দেবতার চেয়েও গুরু গরীয়ান। ‘শিবে রুষ্টে গুরুস্ত্রাতা গুরৌ রূষ্টে ন কশ্চন।’
কতক্ষণ পরে জ্ঞান ফিরে এল গদাধরের। চোখ চেয়ে দেখল এখানে-ওখানে ভিড় জমে আছে—মাঝখানে সেজবাবু।
বেসামাল হয়ে কিছু অঘটন করে ফেলেছে হয়তো। গদাধর শিশুর মত ভয় পেল। বললে সেই শিশুর মত সারল্যে ‘কিছু, অন্যায় করে ফেলেছি না কি?’
গদাধরকে প্রণাম করলেন মথুরবাবু। বললেন, ‘না বাবা, তুমি স্তব পাঠ করছিলে, তাই সকলে শুনেছিলাম।’
আরেক দিন।
তার ঘরের উত্তরের বারান্দায় পায়চারি করছে গদাধর, কাছেই ‘বাবুদের কুঠি’ বা কাছারি-ঘরে কাজ করছেন মথুরবাবু। গদাধরকে দিব্যি দেখতে পাওয়া যায় সেখান থেকে। কাজ করছেন আর একবার তাকাচ্ছেন ওদিকে। গদাধরের সেদিকে লক্ষ্যও নেই। এক বার পশ্চিম থেকে পুবে, আরেক বার পুব থেকে পশ্চিমে টহল দিয়ে ফিরছে। কে তাকে দেখছে বা না-দেখছে তা কে দেখে!
হঠাৎ এ কী অভাবনীয় কাণ্ড! মথুরবাবু পাগলের মত হন্তদন্ত হয়ে ছটে এলেন। এসেই গদাধরের পা জড়িয়ে ধরে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে। কাঁদতে লাগলেন অঝোরে।
গদাধর তো হতবুদ্ধি!
‘এ কি, তুমি এ কী করছ! তুমি রানির জামাই, একটা গন্নিমান্নি লোক, তোমায় এমন করতে দেখলে লোকে বলবে কী? ওঠো, ঠাণ্ডা হও আর কি সে কথা শোনেন মথুরবাবু!
কান্না কি আর থামে! বললেন, ‘অপরূপ এক দর্শন হল আজ তোমার মধ্যে। পুব থেকে পশ্চিমে আসছ, স্পষ্ট দেখছি, তুমি নও, মন্দিরের মা আসছেন। আবার যেই পিছন ফিরে পুবে যাচ্ছ, দেখছি, সাক্ষাৎ মহাদেব চলেছেন। ভাবলাম বুঝি চোখের ভুল। চোখ মুছে আবার তাকালাম। আবার সেই শিবকালী – আবার—যত বার দেখি তত বার—’ কান্নায় গলে যেতে লাগলেন মথুরবাবু।
‘কই বাপু আমি তো কিছু টের পেলাম না। ও সব ধোঁকা—’ উড়িয়ে দিতে চাইল গদাধর।
কিন্তু সে-কথা আর কানে নেন না মথুরবাবু। পা ছাড়েন না। তিনি পেয়ে গেছেন তাঁর জগৎগুরুকে। ভবভয়বৈদ্য সর্বকারণকারণকে।
ভড়কে গেল গদাধর। শেষে এ ব্যাপার কেউ দেখে ফেলে রানির কাছে গিয়ে লাগাক। রানি হয়তো ভাববেন, জামাইকে ছোট ভটচাজ গুন করেছে!
অনেক করে ঠাণ্ডা করল মথুরবাবুকে। আমি কে, আমি কি, মা-ই সব দেখিয়ে দিচ্ছেন তোমাকে। নইলে আমারটা তুমি এত করবে কেন, সর্বস্ব দিয়ে কেন ভালোবাসবে আমাকে?
গদাধরের শখ হল মাকে পাঁয়জোর পরাবে, মথুরবাবু অমনি গড়িয়ে দিলেন পাঁয়জোর। সখীভাবে সাধন করবার সময় স্ত্রীলোকের বেশ ধরবে গদাধর, মথুরবাবু বেনারসী শাড়ি, ওড়না আর এক সেট ডায়মণ্ডকাটা গয়না কিনে দিলেন। শুধু তাই নয়, পানিহাটির উৎসবে যাচ্ছে গদাধর, দারোয়ান নিয়ে গুপ্ত ভাবে সঙ্গে চলেছেন মথুরবাবু। ভিড়ে-ভাড়ে গদাধরের না কষ্ট হয় সেই তদারকে।
ভৃত্য, ভক্ত আর ভাণ্ডারী। মথুরবাবু এক আধারে ত্রিমূর্তি।
বললেন, ‘আমার ঠিকুজির কথা ফলল এত দিনে।’
কি আছে তোমার ঠিকুজিতে?’
‘আমার ইষ্টের এত কৃপা থাকবে আমার উপর যে, সে শরীর ধারণ করে আমার সঙ্গে-সঙ্গে ফিরবে। তুমিই আমার সেই ইষ্ট, আমার অভিলষিত—আমার পরম প্রার্থনার চরম পুরস্কার।’
তুমি কৃপানিধি ।
তুমি আগে মায়া, পরে দয়া। আগে মায়ারূপে এসে মনোহরণ কর, পরে দয়ারূপে এসে কর মায়ামোচন। মায়ার পারে এসে তোমার দয়ার জন্যে বসে আছি।
১৯
‘পদ্ম সই দিলে না?’ রানি রাসমণি কাতর চোখে তাকালেন চার দিকে ‘কেন এমন হল?’
শেষ শয্যায় শুয়েছেন রাসমণি। কিন্তু মনে শান্তি নেই।
এত বড় কীর্তি করে গেলেন জীবনে, তবু মৃত্যুতে নেই কেন শান্তি? দেবী-সেবার জন্যে দু’লাখ ছাব্বিশ হাজার টাকায় তিন লাট জমিদারি কিনেছেন কিন্তু এখনো দেবোত্তর করেননি সম্পত্তি। চার মেয়ের মধ্যে দুজন শুধু এখন বেঁচে আছে। প্রথমা পদ্মমণি আর সব চেয়ে ছোট জগদম্বা। দেবতার নামে দানপত্র সম্পাদন করেছেন রানি, সেই সঙ্গে মেয়েরাও একটা একরারনামা দস্তখত করে দিক, ঐ সম্পত্তিতে তাদের কোনো দাবি-দাওয়া নেই। জগদম্বা সই করে দিল একবাক্যে। কিন্তু কলম স্পর্শ করল না পদ্মমণি।
সেই ভেবে রানি বড় অসুখী। মা গো, তোর খেলা তুই জানিস। তোর মনে কি আছে যার জন্যে পদ্মমণির মনে এই নেওয়ালি!
আঠারো শো একষট্টি সালের আঠারোই ফেব্রুয়ারী দানপত্রে সই করলেন রাসমণি। আর তার পরের দিনই স্বস্থানে প্রস্থান করলেন।
মৃত্যুর কিছু দিন আগে থেকেই তাঁর কালীঘাটের বাড়িতে অপেক্ষা করছিলেন। সময় আসন্ন হয়ে এলে আদি গঙ্গার পারে তাঁকে নিয়ে আসা হল। অনেকগুলি আলো জ্বলছিল সামনে। হঠাৎ রাসমণি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘সরিয়ে দে, নিবিয়ে দে ও সব রোশনাই। অন্ধকার করে দে। এখন আমার মা আসছেন, তাঁর অঙ্গের আলোয় দশ দিক উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে!’
রাত্রি দ্বিতীয় যাম৷ রানি সহসা আকুল হয়ে উঠলেন, ‘এসেছিস মা? নে, টেনে নে কোলের কাছে। কিন্তু শেষ কথাটা তোকে বলি—পদ্ম যে সই দিলে না!’
মা হাসলেন। তাতে তোর কি। হয়তো ঢের মামলা-মোকদ্দমা হবে তোর দৌহিত্রদের মধ্যে, হয়তো দেবোত্তর সম্পত্তি তছনছ হয়ে যাবে। তার জন্যে তোর ভাবনা কেন? যা থাকবার নয় তা যাক না। তুই থাকবি আর তোর গদাধর থাকবে।
‘এ আমার কি স্বভাব হলো বলো দেখি।’ গদাধর বললে গিয়ে হলধারীকে ‘জপ করতে বসে কেউ অন্যমনস্ক হয়েছে অমনি তাকে এক চড় মেরে বসি। সেই কালী-ঘরে রাসমণিকে এক চড় মেরেছিলাম, আজ আবার বরানগরের ঘাটে জয় মুখুজ্জেকে দুই চড় মেরে বসেছি। ঠাট করে জপ করতে বসেছেন, কিন্তু মন রয়েছে অন্য দিকে।’
তুই উন্মাদ। বললে হলধারী।
তাই হবে। তাই হক কথা বেরিয়ে আসে মুখ থেকে। কাউক্কে মানি না। বড়লোককে কেয়ার করি না কানাকড়ি।
দক্ষিণেশ্বরে যদু মল্লিকের বাগানে যতীন্দ্র ঠাকুর বেড়াতে এসেছেন। ঠাকুরও গিয়েছেন সেখানে। যতীন্দ্র বললেন, ‘আমরা সংসারী লোক, আমাদের কি আর মুক্তি আছে? স্বয়ং যুধিষ্ঠিরই নরকদর্শন করেছিলেন তো আমরা কোন ছার।’ করেছিলেন তো করেছিলেন। কথা শুনে ঠাকুরের রাগ হল।
বললেন, যুধিষ্ঠির বুঝতে শুধু ঐ নরকদর্শনটুকুই মনে করে রেখেছ?
তার সত্য, ক্ষমা, ধৈর্য, বৈরাগ্য—তার কৃষ্ণভক্তি এ সমস্ত ভুলে যাবে? আরো কত কি বলতে যাচ্ছিলেন ঠাকুর, হৃদয়ের বড়লোককে বড় ভয়, তাড়াতাড়ি ঠাকুরের মুখ চেপে ধরল।
আর, যতীন্দ্র করলেন কি?
যতীন্দ্র বললেন, ‘আমার একটু কাজ আছে।’ বলে সরে পড়লেন।
আরেক দিন নিয়েছিলেন সৌরীন্দ্র ঠাকুরের বাড়ি। তাঁকে দেখেই বললেন, ‘দেখ বাপু তোমাকে কিন্তু রাজা-টাজা বলতে পারব না। তুমি যা নও তাই তোমাকে বলি কি করে?’
রজোগুণী লোক সৌরীন্দ্র, রাজা না বলাতে ষোলো আনা খুশি হলেন না হয়তো। একা-একা কি আলাপ করবেন, যতীন্দ্রকে খবর পাঠালেন। যতীন্দ্র বলে পাঠালেন, ‘আমার গলা-ব্যথা হয়েছে, যেতে পারব না।’
তুমি উন্মাদ। বললে কৃষ্ণকিশোর। এঁড়েদার কৃষ্ণকিশোর। সর্বশাস্ত্রে পারঙ্গম। উন্মাদ নও তো পৈতে-ধুতি উড়িয়ে দিলে কেন?
ঠাকুর বললেন, ‘তোমার একবার উন্মাদ হয় তা হলে বোঝ।’
হলও তাই। কৃষ্ণকিশোরের উন্মাদ হল। একা এক ঘরে চুপ করে বসে থাকে আর কেবল ওঁ-ওঁ করে। সকলে বললে, মাথা খারাপ হয়েছে, কবরেজ ডাকো। কবরেজ এল নাটাগড় থেকে। কৃষ্ণকিশোর বললে, ‘আমার রোগ আরাম করো আপত্তি নেই, কিন্তু দেখো যেন আমার ওঁ কারটির আরাম করো না।’
নদীয়ায় ন্যায় পড়তে এসেছিল নারায়ণ শাস্ত্রী। বাড়ি রাজপুতানায়, গুরু গৃহে পঁচিশ বছর ব্রহ্মচর্য পালন করে এসেছে। জয়পুরের মহারাজা বড় চাকরিতে বাঁধতে চেয়েছিলেন তাঁকে, কিন্তু তিনি ভ্রূক্ষেপ করলেন না। জ্ঞানের মতন আনন্দ নেই। শাস্ত্র-দর্শন সব তিনি মন্থন করে দেখবেন কোথায় সেই বিজ্ঞানানন্দ ব্রহ্মের ঠিকানা। কিন্তু বই পড়ে মন ভরল না নারায়ণ শাস্ত্রীর। অস্তি—তিনি আছেন, শুধু এইটুকুই বলা যায়, তার বেশি আর উপলব্ধি হয় না। ‘অস্তীতি ব্রুবতোহন্যত্র কথং তদুপলভ্যতে।’
শুনলেন দক্ষিণেশ্বরে সেই উপলব্ধির অব্ধি বিরাজমান। ছুটলেন সেখানে। বুঝলেন আহারের চেয়ে আস্বাদ বড় জিনিস। ঠিকানা জানার চেয়ে একখানা চিঠি পাওয়ার বেশি দাম।
কিন্তু এসে দেখলেন কি? গদাধর বাঁশ ঘাড়ে করে বেড়াচ্ছে। কাঙালীরা খেয়ে গেলে তাদের পাতা চাটছে, মাথায় ঠেকাচ্ছে। কোথাকার কে নিচু জাতের স্ত্রীলোক, খাচ্ছে তার হাতের শাকান্ন। সবাই বলছে, উন্মাদ। কিন্তু নারায়ণ শাস্ত্রী দেখল, জ্ঞানোন্মাদ। পরে দেখল, শুধু, জেনে উন্মাদ নয় পেয়ে উন্মাদ।
কিন্তু হলধারী এল মুখসাট মেরে ‘তুই এ-সব করছিস কি? কাঙালীদের এঁটো খাচ্ছিস তোর ছেলেমেয়ের বিয়ে হবে কেমন করে?’
কথা-শুনে ক্ষেপে গেল গদাধর ‘তবে রে শালা, তুমি না গীতা-বেদান্ত পড়ো? তুমি না শেখাও জগৎ মিথ্যে ব্রহ্ম সত্য আর সর্বভূতে ব্রহ্মদৃষ্টি? ভেবেছ আমি জগৎ মিথ্যে বলব আর ছেলেপিলের বাপ হব? তোর শাস্ত্রপাঠের মুখে আগুন! কি হবে শাস্ত্র পাঠে? ভাবল নারায়ণ শাস্ত্রী। বাজনার বোল মুখস্থ বলা সোজা, হাতে আনাই দুষ্কর।
রানির মারা যাবার পর সম্পত্তির এক্সিকিউটর হলেন মথুরবাবু।
এক দিন গদাধরকে বললেন, ‘তোমার নামে কিছু জমি-জায়গা লিখে দি, কি বলো? গদাধর রেগে টং। কি, আমাকে তোমার বিষয়ী করবার মতলব? আমিও কি কলাইয়ের ডালের খদ্দের?
ভগবানের আনন্দের কাছে আর কিছু আনন্দ আছে? ভগবানের স্বাদ পেলে সংসার আলুনি লাগে। শাল পেলে আর বনাত ভালো লাগে না ।
এ আনন্দ কি বলে বোঝানো যায়? বিয়ের পর অনেক দিন বাদে মেয়ের কাছে তার স্বামী এসেছে।
রাত্রিশেষে সখীরা ঘিরে ধরল মেয়েকে। হ্যাঁ লো, কেমন আনন্দ করলি কাল?
মেয়েটি বললে, কি করে বোঝাই বল। সে বলে বোঝানো যায় না। যখন তোদের স্বামী আসবে তখনই বুঝতে পারবি, তার আগে নয়। তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে চাতকের! সাত সমুদ্র তেরো নদী খাল-বিল পুকুর-দিঘি সব জলে ভরপুর। অথচ সে-জল সে খাবে না। ছাতি ফেটে যাচ্ছে, তবু না। স্বাতী নক্ষত্রের জলের জন্যে হাঁ করে আছে। ‘বিনা স্বাতী কি জল সব ধুর’।
মিছরির পানা যে খেয়েছে সে কি আর চিটে গুড়ের পানা খাবে?
‘কিন্তু সংসারে থাকতে গেলে টাকাও তো চাই—’ ত্রৈলোক্য সান্যাল বললেন, ‘সঞ্চয়ও দরকার। পাঁচটা দান-ধ্যান—
‘রাখো। কত তোমাদের দান-ধ্যান! নিজের মেয়ের বিয়েতে হাজার-হাজার খরচ, আর পাশের বাড়িতে খেতে পাচ্ছে না। তাদের দুটি চাল দিতে কষ্ট হয়—দিতে-থুতে অনেক হিসেব! খেতে পাচ্ছে না—তা আর কি হবে! ও শালারা মরুক আর বাঁচুক—আমি আর আমার বাড়ির সকলে ভালো থাকলেই হল। এদিকে মুখে বলে, সর্বজীবে দয়া!
আগে ঈশ্বর লাভ করো, পরে সংসারে থাকো। ঈশ্বর লাভের পর যে সংসার সে বিদ্যার সংসার। তখন ‘কলঙ্ক সাগরে ভাসি, কলঙ্ক না লাগে গায়।’
এই দেখ না জয়গোপাল সেনকে। বিস্তর টাকা, কিন্তু আঙুল দিয়ে জল গলে না।
‘গাড়ি করে আসে। গাড়িতে ভাঙা লণ্ঠন, ভাগাড়ের ফেরৎ ঘোড়া, হাসপাতাল ফেরৎ দারোয়ান। আর এখানের জন্যে নিয়ে এল দুটো পচা ডালিম!
এই তো টাকার কেরামতি!
মথুরবাবুর সঙ্গে ঠাকুর কাশীতে তীর্থ করতে এসেছেন, উঠেছেন রাজাবাবুর বাড়িতে। সেখানেও সর্বক্ষণ বিষয়-আশয়ের কথাবার্তা। ঠাকুর কাঁদতে লাগলেন, ‘মা, এ কোথায় আনলে? আমি যে রাসমণির মন্দিরেই খুব ভালো ছিলাম। সেখানে বিষয়ের কথা শুনতে হয়নি।’
ছাদের উপর ঠাকুর-ঘর, নারায়ণ পূজো হচ্ছে। বাড়ির গিন্নি-বান্নিরা চন্দন ঘষছে, নৈবেদ্য সাজাচ্ছে, করছে নানান রকম আয়োজন। কিন্তু মুখে একটিও ঈশ্বরের কথা নেই। কি রাঁধতে হবে, আজ বাজারে কিছু ভালো পেলে না, কাল অমুক রান্নাটি বেশ হয়েছিল—এই সব কথাবার্তা।
মথুরবাবু কথা ফিরিয়ে নিলেন। কত লোক তাঁকে আশ্রয় করে ফিরিয়ে নিল অবস্থা। আর এ এমন এক গুণী-গুরু যে তাঁরই অবস্থান্তর ঘটালেন। ‘বাবা, তোমার জন্যে এই শাল এনেছি দেখ।’
হাজার টাকা দাম দিয়ে কিনে এনেছেন মথুরবাবু। গদাধরের গায়ে নিজেই পরিয়ে দিলেন আদর করে।
শাল গায়ে দিয়ে শিশুর মত সরল আনন্দে নেচে উঠল গদাধর। ডেকে দেখাতে লাগল সকলকে। ওরে শুনেছিস হাজার টাকা দাম!
পরক্ষণেই অন্য চিন্তা মনে এল। এই শালের মধ্যে আছে কি? কতগুলো ছাগলের লোম বই কিছু নয়। তারই এত চটকদারি! শীত ঠেকাতে সামান্য একখানা কম্বলই তো যথেষ্ট। বলি, এই শালে ঈশ্বরস্পর্শ পাওয়া যাবে? বরং বিকার বাড়বে, মনে হবে আমি এক জন মস্ত এলেমবাজ। আর সকলের চেয়ে বড়, এক জন কেষ্ট-বিষ্টু। আর জানো না, বিকার হলে কি বলে? বলে, আমি পাঁচ সের চালের ভাত খাবো রে, আমি এক জালা জল খাবো।
বদ্যি বলে, বেশ তো খাবি, নিশ্চয় খাবি৷ বলে বদ্যি নিজে তামাক খায়। বিকারের পর কি বলবে তারি জন্যে অপেক্ষা করে। হঠাৎ গা থেকে শালখানি খুলে নিয়ে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলল গদাধর। থুতু ফেলতে লাগল তার উপর, পা দিয়ে মাড়িয়ে ঘষতে লাগল ধূলোয়। তাতেও ক্ষান্তি নেই, আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলব এই জঞ্জাল।
কে এক জন ছুটে এসে উদ্ধার করে শালখানি। জানালে গিয়ে মথুরবাবুকে। মথুরবাবু বললেন, ‘বেশ করেছে। ঠিক করেছে। যেমনটি চেয়েছিলাম তাই করেছে।’
এ চমৎকার পরিহাস ঈশ্বরের। গদাধরকে কয়েক দিনের জন্যে নিজের কাছে জানবাজারের বাড়িতে নিয়ে এসেছেন মথুরবাবু। সোনার থালায় করে ভাত খেতে দেন, রূপোর বাটিতে করে পঞ্চ ব্যঞ্জন। যে খাচ্ছে তার কিন্তু থালা-বাটির দিকে নজরও নেই, খাওয়া শেষ হলে চেয়েও দেখে না এঁটো বাসনের কি হল। মথুরবাবুরই যত গরজ দেখ, ঠিকমত মাজা-ঘষা হল কি না, ভাঙা-ফুটো হল কি না, চোরে নিয়ে গেল না কি চুরি করে! তাঁরই যত হাঙ্গামা পোয়ানো। আর যে ভোজন করে গেল তার কাছে সব কিছুই একটা অসার ভোজবাজি। চন্দ্র হালদার মথুরবাবুদের কুল-পুরোহিত। আছে বাবুদের আশ্রয়ে কিন্তু গদাধরের প্রাধান্য দেখে হিংসেয় ফেটে পড়ছে। কী কৌশলে যে বাবুকে হাত করল তাই বুঝে উঠতে পারছে না। কোথাকার কে বিদেশী, তার কিনা এত প্রতাপ! যাই বলো, আর আস্কারা দেওয়া চলে না। একটা হেস্তনেস্ত করতে হয়। বাইরের ঘরে একা বেহুঁস হয়ে বসে আছে গদাধর, চন্দ্র হালদার কাছে গিয়ে তার গায়ে ঠেলা মারতে লাগল, ও বামুন, বল্ না বাবুকে কি করে বশে আনলি?’
গদাধর নিঃসাড়।
‘আহা, ঢং দেখ না! ঝিমুচ্ছে বসে-বসে! বল্ না সত্যি করে, কি করে বাগালি বাবুকে?’
গদাধর নিঃসংজ্ঞ।
‘উঃ, খুব ফুটানি হয়েছে!’ বলেই গদাধরকে সে লাথি মারলে। একবার নয়, তিন-তিনবার।
গদাধর চোখও মেলল না। পৃথিবী সকলের চেয়ে বড়, সাগর তার চেয়ে বড়, আকাশ তারও চেয়ে বড়। কিন্তু ভগবান বিষ্ণু, এক পায়ে স্বর্গ-মর্ত-পাতাল তিন ভুবন আবৃত করেছেন। সাধুর হৃদয়ের মধ্যে সেই বিষ্ণু পদ। আর সেই পদচ্ছায়ে অনন্ত সহ্যশক্তি! সহ্য করে গেল গদাধর। মথুরবাবুকে বললে চন্দ্র হালদার আর আস্ত থাকত না।
ঠাকুর তাই বলতেন হৃদয়কে ‘তুই আমার কথা সহ্য করবি, আমি তোর কথা সহ্য করবো—তবে হবে। তা না হলে তখন খাজাঞ্চীকে ডাকো।’ যে সয় সেই রয়। যাকে রাখো সেই রাখে।
