পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ১.৪০
৪০
সতেরো বছরের সুরূপ ছেলে এই অক্ষয়। মা-বাপ-মরা ছেলে। বসেছে বিষ্ণু-মন্দিরের পূজারি হয়ে। ধ্যানে নিষ্পন্দ হয়ে বসে থাকে দু-তিন ঘণ্টা। নিজের হাতে রান্না করে খায়। সারা দিন গীতা পড়ে।
শুধু ভাইপো বলে নয়, ভক্তির জোর দেখে তাকে বড় ভালোবাসে রামকৃষ্ণ।
সেই অক্ষয়ের বিয়ে হল। বিয়ের পরেই অসুখে পড়ল। ডাক্তার বললে, সামান্য জ্বর, সেরে যাবে।
কিন্তু হৃদয়কে ডেকে নিয়ে বললে রামকৃষ্ণ, হৃদু লক্ষণ বড় খারাপ। ছোঁড়া বাঁচবে না।’
‘ছি মামা! তোমার মুখ দিয়ে এ কথা বেরুলো কেন?’
‘তার আমি কি জানি! মা যেমন বলান তেমনি বলি। নইলে, বল, আমার কি ইচ্ছা অক্ষয় চলে যায়?’
হৃদয় উঠে-পড়ে লাগল কি করে ভালো করা যায় অক্ষয়কে। যত ডাক্তার আছে কাউকে বাদ দিলে না। কিন্তু যার ডাক পড়েছে ডাক্তার তার কী করবে।
মাস খানেক ভুগে এমন জায়গায় এসে ঠেকল যখন সলতে আর উস্কে দেওয়া যায় না। এল সেই অন্তিম মুহূর্ত। রামকৃষ্ণ পাশে বসে অক্ষয়কে সম্বোধন করে বললে গাঢ়স্বরে, ‘অক্ষয়, বলো, গঙ্গা, নারায়ণ, ওঁ রাম।’ ঐ মন্ত্র তিন-তিন বার আবৃত্তি করল অক্ষয়। তার পর ধীরে-ধীরে লীন হয়ে গেল।
মাটিতে আছাড় খেয়ে কাঁদতে লাগল হৃদয়। রামকৃষ্ণ চলে গিয়েছে ভাবভূমিতে। হৃদয় যত কাঁদে, তত হাসে রামকৃষ্ণ। নাচে, গান গায়। অমৃততীর্থে এসে উত্তীর্ণ হয়েছে অক্ষয়। ক্ষয়হীন আনন্দধামে। এ দেখে যদি আনন্দ না হয় তবে কী দেখে হবে!
দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে বেশ স্পষ্ট দেখল চোখের উপর। দেখল কি করে মানুষ মরে, কি করে আত্মা বেরিয়ে আসে দেহ থেকে, কোথায় যায় সে আত্মা। দেখল খাপের ভিতর থেকে ঝকঝকে তরোয়াল এল বেরিয়ে। তরোয়ালের কিছু হল না, শুধু খাপটা পড়ে রইল। সেই উজ্জল নিৰ্ভীক তরোয়াল এই মায়া-মিথ্যার তমসা ভেদ করে চলে গেল লোকাতীত আলোকতীর্থে।
কিন্তু সেই ভাবলোক ছেড়ে নেমে আসতে হল ফের স্থূল মাটিতে। পর দিন কালীবাড়ির উঠোনের সামনের বারান্দার উপর দাঁড়িয়ে আছে রামকৃষ্ণ, দেখল, অক্ষয়ের নর-দেহ পুড়িয়ে ঝুড়িয়ে ফিরে আসছে শ্মশানযাত্রীরা। যেমনি দেখা অমনি বুকফাটা কান্না পেল রামকৃষ্ণের। গামছা যেমন নিঙড়োয়, মনে হল বুকের ভিতরটা তেমনি কে নিঙড়োচ্ছে। সমস্ত দুঃখ অবুঝ অশ্রুর উচ্ছাসে উথলে উঠল।
সে জলতরঙ্গ কে রোধ করে।
‘মা, এখানে পরনের কাপড়ের সঙ্গেই সম্বন্ধ নেই, তা ভাইপোর সঙ্গে তো কতই ছিল। এখানেই যখন এ রকম হচ্ছে তখন গৃহীদের শোকে কী না হয়! তাই দেখাচ্ছিস বটে।’
কখনো আমি-আমার বলে না রামকৃষ্ণ। সব ‘এখানে’, ‘এখানকার’।
‘আমি গেলে ঘুচিবে জঞ্জাল।’
‘কৃষ্ণকিশোরের ভবনাথের মত দুই ছেলে। দুটো-আড়াইটে পাশ। মারা গেল। অতো বড়ো জ্ঞানী। প্রথম-প্রথম সামলাতে পারলে না! আমায় ভাগ্যিস ঈশ্বর দেননি।’ ঠাকুর বললেন আত্মগতের মত।
কে এক জন ভক্ত বললে, ‘ঈশ্বরে খুব ভক্তি হয় তো বেশ হয়। শোক-টোক থাকে না।’
‘উঁহু। শোক ঠেলে দেয় ভক্তিকে।’
বিধবা ব্রাহ্মণী–তার একমাত্র মেয়ে, নাম চণ্ডী। খুব বড় ঘরে বিয়ে দিয়েছে মেয়ের। জামাই প্রকাণ্ড জমিদার, খেতাব পেয়েছে রাজা বলে। থাকে কলকাতায়, জাঁক-জমকের সংসার। মেয়েটি যখন বাপের বাড়ি আসে, সামনে-পিছে সেপাই-শান্ত্রী নিয়ে আসে। মায়ের বুক দশ হাত হয়। কিন্তু পলতের বাতি নিবে গেল এক ফুঁয়ে। কি একটা সামান্য অসুখে অল্প কদিন ভুগে মেয়েটি চোখ বুজল।
বিধবা থাকে সেই বাগবাজার। কি করে এই অসাধ্য শোক শান্ত করবে তারই জন্যে বাগবাজার থেকে মাঝে-মাঝে ছুটে আসে পাগলের মত। যদি ঠাকুর কিছু উপায় বলে দেন! যদি সেই শীতল শান্তমূর্তি দেখে বুক জুড়োয়।
ব্রাহ্মণীর দিকে তাকালেন একবার ঠাকুর। বললেন, ‘সেদিন একজন মজার লোক এসেছিল। খানিকক্ষণ বসে থেকে বললে, যাই এখন একবার ছেলের চাঁদমুখটি দেখি গে। আমি আর থাকতে পারলাম না। বললাম, তবে রে শালা! ওঠ এখান থেকে। ঈশ্বরের চাঁদমুখের চেয়ে ছেলের চাঁদমুখে?
বাগবাজারে নন্দ বোসের বাড়ি বেড়াতে এসেছেন ঠাকুর। কথা আছে নন্দ বোসের বাড়ি থেকে যাবেন ব্রাহ্মণীর বাড়ি।
সেই ঠাকুর আর আসেন না। ব্রাহ্মণী কেবল ঘর-বার করছে। বোধ হয় আর এলেন না। অভাগিনীর অঙ্গনে কি ভগবানের পদার্পণের স্থান আছে?
শেষকালে উচাটন হয়ে বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। গেল সটান নন্দ বোসের বাড়ির দিকে। খবর নিতে, চলে গেলেন না কি দক্ষিণেশ্বর? না কি নন্দ বোসের আনন্দ-ভবন পেয়ে ভুলে গেলেন দুঃখিনীর শোকম্লান ঘরের কোণটি?
ব্রাহ্মণীও গেছে, আর অমনি ঠাকুর এসে পড়লেন ভক্তদের নিয়ে।
বাড়িতে ব্রাহ্মণীর ছোট বোন, সেও বিধবা। বললে, ‘দিদি এই গেলেন নন্দ বোসের বাড়ি খবর নিতে। এই এলেন বলে।’
ছাদের উপর সবাইকে নিয়ে বসেছেন ঠাকুর। ছেলে বুড়ো পুরুষ মেয়ে কাতার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাণে-প্রাণে বয়ে চলেছে ভক্তির স্রোতস্বতী। এত লোক, তবু মনে হচ্ছে, এক জন কে নেই ।
‘ঐ দিদি আসছেন।’ ছোট বোন উছলে উঠল।
ছাদে উঠে ঠাকুরকে দেখে ব্রাহ্মণী কি বলবে কি করবে কিছুই ঠিক করতে পারছে না। অস্থিরের মত এদিক-ওদিক করছে। বলছে, ‘আমি নিশিদিশি কাঁদি, কিন্তু, ওগো, আমি যে এখন আহ্লাদে আর বাঁচি না। তোমরা সব বল গো আমি কেমন করে বাঁচি। ওগো, আমার চণ্ডী যখন এসেছিল—সঙ্গের সেপাই-শান্ত্রী পাহারা দিচ্ছিল বাড়ির দরজায়, তখনো যে আমার এত আহ্লাদ হয়নি গো। আমার এ কি হল, চণ্ডীর শোক আর আমার এখন একটুও নেই গো! মনে করেছিলাম তিনি যেকালে এলেন না, যা আয়োজন করেছি সব গঙ্গার জলে ফেলে দেব। আর ওঁর সঙ্গে আলাপ করব না, যেখানে আসবেন একবার অন্তর থেকে দেখে আসব। তাই, সকলকে বলি, আয় রে আমার সুখ দেখে যা, আমার ভাগ্যি দেখে যা। দেখে যা আমার ঘরে আজ কে এসেছে! ওগো, আমি মরে যাব, আমার এত সুখ সইবে না। তোমরা সবাই মিলে আশীর্বাদ করো আমাকে, নইলে মরে যাব সত্যি-সত্যি—
‘অক্ষয়ের মৃত্যুর পর থেকে রামকৃষ্ণ কেমন বিষণ্ণ। মথুরবাবু বললেন, চলো একবার আমার জমিদারিটা ঘুরে আসবে।
তাই চলো। ওরে হৃদু, জমিদারি দেখবি চল।
চূর্ণীর খালে নৌকোয় করে বেড়াচ্ছে তিন জন। রানাঘাটের কাছাকাছি কলাইঘাটায় এসে রামকৃষ্ণের চোখ পড়ল দারিদ্র্যদলিত জনগণের উপর। রামকৃষ্ণ বললে, ‘এই তোমার জমিদারির চেহারা? এই হাল তোমার মহালের?’
কেন, কী হল?
দেখ দেখি ঐ লোকগুলোর দিকে। পরনে ট্যানা, পেট-পিঠ এক হয়ে রয়েছে। শোনো, সবাইকে একখানা করে কাপড় দাও, আর খাইয়ে দাও এক বেলা।
যেমন চিরদিনের অভ্যেস, তা-না-না-না করতে লাগলেন মথুরবাবু।
তবে তোমার জমিদারি জাহান্নমে যাক। চল রে হৃদু আর জমিদারি দেখে না। ফিরে চল দক্ষিণেশ্বর।
মথুরবাবুকে আবার তাঁর থলের মুখ ফাঁদালো করতে হল। গ্রামের লোকদের অন্নবস্ত্র বিতরণ করলেন।
সাতক্ষীরার কাছে সোনাবেড়ে গ্রামে মথুরবাবুর পৈত্রিক ভিটে। তারই কাছাকাছি তালামাগরো গ্রাম। সে-গ্রামে তাঁর গুরুঘর। গুরুবংশে শরিকি অংশ নিয়ে ঝগড়া বেধেছে। আপোষনিষ্পত্তি করবার জন্যে তলব পড়েছে মথুরবাবুর।
এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা। রামকৃষ্ণ আর হৃদয় চলেছে পালকিতে। আর মথুরবাবু হাতির হাওদায়।
সহসা শিশুর মত হয়ে গেল রামকৃষ্ণ। বললে, ‘আমি হাতি চড়ব।’
মথুরবাবু বাহন বদলালেন। রামকৃষ্ণ আর হৃদয়কে হাতিতে চাপিয়ে নিজে এলেন পালকিতে। হাতিতে চড়ে রামকৃষ্ণের আনন্দ তখন দেখে কে!
সর্বভূতে নারায়ণের গল্প জানিস তো? গুরু, শিখিয়ে দিয়েছে শিষ্যকে, শিষ্যকে আর পায় কে। পথ দিয়ে হাতি চলেছে, উপর থেকে মাহুত বললে, সরে যাও। শিষ্যের তখন সর্বভূতে নারায়ণ—সে ভাবলে, সরব কেন? আমিও নারায়ণ, হাতিও নারায়ণ, আমাদের মধ্যে বিরোধ নেই। সরাসরি হাতির সামনে এসে দাঁড়াল, সরল না এক চুল। হাতি তাকে শুঁড়ে করে ধরে দূরে ছুঁড়ে ফেললে। ঘা-ব্যথা সারবার পর গুরুর কাছে এসে নালিশ করলে। গুরু বললে—ভালো কথা, তুমিও নারায়ণ হাতিও নারায়ণ, আর মাহুতটি নারায়ণ নয়? মাহুত নারায়ণের কথা শুনবে না?
দক্ষিণেশ্বরে ফিরে এল দলবল। কলুটোলায় কালী দত্তর বাড়ি বৈষ্ণবদের প্রকাণ্ড হরিসভা বসে। সেখানে এক দিন নেমন্তন্ন হল রামকৃষ্ণের। আর, যেখানেই রামকৃষ্ণ, সেখানেই তরুচ্ছায়ার মত হৃদয়রাম।
ভাগবত পাঠ হচ্ছে। তন্ময় হয়ে শুনছে সবাই ভাগবত। রামকৃষ্ণও বসে পড়ল একধারে।
সামনে মহাপ্রভুর আসন। তার মানে বেদীতে যে আসন বিছানো তা হচ্ছে শ্রীচৈতন্যের আসন। বৈষ্ণবদের পূজা-পাঠের সময় থাকে এমনি আসন বিছানো। কল্পনা করা হয় সেখানে গৌরাঙ্গ দেব এসে বসেছেন, শুনছেন হরিকথা। ভক্তের মধ্যেই ভগবানের অধিষ্ঠান এই ভাবটিরই প্রতীক ঐ আসনখানি।
রামকৃষ্ণকে পেয়ে ভক্তির স্রোত আরো উত্তরঙ্গ হয়ে উঠল। হরিকথায় এল আরো অতলতরো অরক্তি।
কোথা থেকে কি হয়ে গেল কেউ টের পেল না, রামকৃষ্ণ হঠাৎ সেই চৈতন্যাসনের উপর গিয়ে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়িয়েই সমাধিস্থ। একখানি হাত ঊর্ধ্বে তোলা আর তার আঙুলে সেই বাক্যাতীত ভাবলোকের নির্দেশ। সর্বাঙ্গ নির্বায়ু-নিশ্চল দীপশিখার মত স্থির, মুখে প্রেমপূর্ণ প্রসাদ-শান্তি। চৈতন্যদেবের সমস্ত চিহ্ন অঙ্গে-ভঙ্গে দেদীপ্যমান।
শ্রোতা-বক্তা সকলেই স্তম্ভিত হয়ে রইল। ভালো-মন্দ কোনো কথাই কারু মুখ দিয়ে বেরুল না। ভয়ে-বিস্ময়ে কাঠ হয়ে রইল সবাই। এ কি অঘটন! জনতার উগ্র দৃষ্টি শান্ত হয়ে এল ক্রমে ক্রমে। বিমূঢ় দৃষ্টিতে এল কোমল মুগ্ধতা।
যেই নাম শুনে সমাধি সেই নাম শুনেই আবার বহিজ্ঞান।
সুতরাং কীর্তন লাগাও। কীর্তন নিয়ে প্রভুর ধ্যান ভাঙাও।
বৈষ্ণবের দল কীর্তন শুরু করল। নাম-ঝংকারে সংজ্ঞা এল রামকৃষ্ণের। দু হাত তুলে শুরু করল নাচতে। মাধুর্যে উচ্ছল আবার উদ্দামতায় উত্তাল সেই যে নৃত্য সে-নৃত্য নটশ্রেষ্ঠ মহাদেবের। সবাই নামসৌরভে বিভোর হয়ে উঠল, নয়নরঞ্জনকে দেখে হয়ে রইল নিষ্পলক।
চৈতন্যদেবের আসন অধিকার করা রামকৃষ্ণের পক্ষে ন্যায় হয়েছে কি অন্যায় হয়েছে এ প্রশ্নের বাষ্পটুকুও কারু মনে রইল না।
কিন্তু ভাবের গিরিচূড়ায় কতক্ষণ থাকবে। নেমে আসতে হল দৈনন্দিন জীবনের সমতলতায়। তখন তর্ক উঠল এই আসন-অধিকারের ঔচিত্য নিয়ে। এক দল বললে, ঘোরতর অন্যায় হয়েছে। শুধু অন্যায় নয়, আস্পর্ধা। আরেক দল বললে, প্রাণ যেমন চায় ঠিক তেমনটি হয়েছে। শুধু ন্যায্য নয়, বাঞ্ছনীয় ।
মীমাংসা হল না। সমস্ত বৈষ্ণব সমাজে বিষম আলোড়ন উঠল। এ যে ধর্মের কলঙ্কীকরণ। এর প্রতিকার কি?
সবাই গেল তখন কালনায়, ভগবানদাস বাবাজীর কাছে। ঘটনা শুনে ভগবানদাস তো রেগে কাঁই৷
‘ভণ্ড, ধূর্ত কোথাকার।’ রামকৃষ্ণের উদ্দেশে তপ্ত-অঙ্গার গালাগাল ছুঁড়তে লাগল বাবাজী। পারে তো নখে-দাঁতে ছিড়ে ফেলে। বললে, ‘আর কোনো দিন ঢুকতে দিও না ওকে হরিসভায়।’
এ কি অঘটন!
আর যে অঘটনের ঘটয়িতা, রামকৃষ্ণ, সে সাতেও নেই পাঁচেও নেই। সে কিছু জানতেও পেল না।
সে এখন বসে আছে তৃণাসনে। সমস্ত তৃণাসনই তার চৈতন্যাসন।
৪১
‘আশ্রমে কে এল বল দেখি।’ ভগবানদাস বাবাজী তাকাতে লাগলেন চার দিকে।
কে আবার আসবে!
‘না, একজন কে মহাপুরুষ এসেছেন আশ্রমে। নিশ্বাসে তাঁর সুগন্ধ টের পাচ্ছি। তোরা সব একটু দ্যাখ দেখি এগিয়ে।’
কত লোকই তো আসছে-যাচ্ছে আশ্রমে। কালনার সিদ্ধবাবাজীর নাম ভারত-প্রসিদ্ধ। এমন কৃষ্ণভক্ত থাকতে আবার কার গায়ের গন্ধে বাতাস আমোদিত হবে।
কত ঢঙের মানুষই আসে আজকাল। কে একজন দেখ এসেছে একেবারে কাপড়ে মুড়িসুড়ি দিয়ে। মুখ-হাত-গা কিছুই দেখবার উপায় নেই। পুরুষমানুষের আবার এ কোন ছিরি! কোনো অসুখ-বিসুখ নাকি?
‘না, এটা ওঁর ভয়-লজ্জার ভাব।’ সঙ্গের লোকটি বললে। ওঁর বালকস্বভাব কিনা। অচেনা নতুন জায়গায় এলে এমনি ওঁর ভাব হয়।’
‘তোমার কে হন?’ জিজ্ঞেস করলেন বাবাজী।
‘আমার মামা। সারাক্ষণ ঈশ্বরভাবেই আছেন।
আপনার এ আশ্রম ঈশ্বরভাবের আশ্রম-আপনার নামটিও ভগবান। দেখতে এসেছেন আপনাকে।’
বোসো এক পাশে। কত ভাবের লোকই আসে আজকাল। কী-না-কী একটু ভাব হল, অমনি ঈশ্বরভাব! মোগল-পাঠান হদ্দ হল ফারসি পড়ে তাঁতী!
‘কিন্তু কে এল বল তো আশ্রমে! এমন দিব্যসৌরভ টের পাচ্ছি কেন?’ বাবাজী উন্মনা হয়ে উঠলেন।
কোথায় কে! তেমন আবার কে আসবে আচমকা!
বাবাজীকে প্রণাম করে এক পাশে বসল দুজনে। হৃদয় আর রামকৃষ্ণ। বসল একান্ত দীনভাবে। বিনম্র-বিনত হয়ে।
দিব্য গন্ধের উৎস কোথায় বুঝতে পারলেন না বাবাজী।
যাক, উপস্থিত প্রসঙ্গেই নেমে আসা যাক। হ্যাঁ, যা নিয়ে কথা চলছিল এতক্ষণ সেই বৈষ্ণব সাধুটির কথা। যে গর্হিত কাণ্ড সে করে বসেছে তার সম্বন্ধে এখন কি করা উচিত। কোন শাস্তিটি বিধেয়?
‘আমি বলি কি,’ ভগবানদাসের কণ্ঠে শাসক-রোষ গর্জে উঠল, ‘আমি বলি কি, ওর গলার কণ্ঠি কেড়ে নিয়ে ওকে দল থেকে বার করে দাও।’
বাবাজীর যা অভিমত, তাই প্রত্যাদেশ।
মালা ফেরাচ্ছেন বাবাজী।
‘আপনি আর অকারণ মালা রেখেছেন কেন?’ জিজ্ঞেস করলে হৃদয়, ‘আপনার সিদ্ধিলাভ তো কবেই হয়ে গেছে।’
এ প্রশ্ন কি হৃদয় করল, না, আর কেউ করাল তাকে দিয়ে?
‘নিজের জন্যে কি আর করি? লোকশিক্ষা তো দিতে হবে আমাকে।’
‘লোকশিক্ষা?’
তা ছাড়া আবার কি। তারি জন্যেই তো আছি। আমাকে দেখে আর সবাই যদি অমনি মালা-তিলক ছেড়ে দেয় তবে দল-কে-দল গোল্লায় যাবে।’
ওরে, এ যে সোহহং বলছে। কী সর্বনাশ! ওরে, দা লাগা! দা বসা! সোহহং-এর আগে দা জুড়ে দে। বল দাসোহহং। দেহবুদ্ধিতে দাসোহহং ছাড়া পথ নেই। বল আমি দাস, আমি ভক্ত, আমি বালক। জ্ঞান হলে আবার অহং কি! সূর্য যদি ঠিক মাথার উপর থাকে তবে আর ছায়া কোথায়? কিন্তু অন্য সময়? সূর্য যখন এদিকে-ওদিকে? যখন চলছে দেহের ছায়াবাজি? যখন আর জ্ঞান নেই? তখন? তখন ভক্তি, তখন প্রেম, তখন সেবা। সেবা-প্রেম না নিয়ে মানুষ কী নিয়ে থাকবে? কী করে তবে তার দিন কাটে?
যার অটল আছে তার আবার টলও আছে। এই আছিস স্থির হয়ে অমনি আবার তুই কাজ করছিস। তোর স্থিরতা কতটুকু? তোর চাঞ্চল্যই বেশি। সূর্য মাথার ওপর কতক্ষণ? বেশিক্ষণই সে ডাইনে-বাঁয়ে। তাই জ্ঞান নিয়ে কতক্ষণ বসে থাকবি? ভক্তিতে ছুটে চল। ভক্তিতে গলে যা। ওরে যা জ্ঞান তাই ভক্তি। জ্ঞান বলে, এ জল, ভক্তি বলে, জানি না কে-এ শুধু, শীতলতা। একে ছুঁতে ঠাণ্ডা, খেতে ঠাণ্ডা।
জ্ঞান বস্তু, ভক্তি স্বাদ। কিন্তু যেখানে একা-একা নয়, জীব-জগৎ নিয়ে থাকবি সেখানে স্বাদ দিয়ে যা জনে জনে। স্বাদ নিয়ে যা ক্ষণে-ক্ষণে।
তাই বলে এই অহঙ্কার! এত প্রতপ্ততা! নিমেষে কি হয়ে গেল কে বলবে। মুখের কাপড় খসে পড়ল রামকৃষ্ণের। রাগের ঝঙ্কার দিয়ে উঠে দাঁড়াল আগুনের মত৷ বললে, ‘তুমি লোকশিক্ষা দেবে? তুমি লোক তাড়াবে? তুমি ধরবে-ছাড়বে? কে তুমি? যাঁর এই জগৎসংসার তিনি যদি না শেখান, তিনি যদি না তাড়ান, তিনি যদি না ধরেন-ছাড়েন, তোমার সাধ্য কি! কেন, কিসের এত অহঙ্কার?
কটিতট থেকে খসে পড়ল বস্ত্রখণ্ড। মুখে দিব্য জ্যোতি, দেহে দিব্য ভেজ, কণ্ঠে দিব্য বাণী। সমাধিস্থ রামকৃষ্ণ।
চোখ মেলে তাকালেন একবার বাবাজী। নিশ্বাস নিলেন বুক ভরে। বুঝলেন সেই দিব্য গন্ধের উৎস কোথায়।
এ সংসারে কেউ কোনো দিন তাঁর মুখের উপর কথা বলেনি। সাহস পায়নি প্রতিবাদ করতে। তিনি যা বলেছেন তাই সবাই মেনে নিয়েছে হেঁটমুণ্ডে। কিন্তু কে এ উদ্যতদণ্ড মহাশাসন? অথচ এর প্রতি সেই স্বাভাবিক ক্রোধ হচ্ছে না কেন? কেন জাগছে না প্রতিহিংসার প্রবৃত্তি? আমি কি বদলে গেলাম নিমেষে? কিন্তু এ কে?
এ সেই বিশ্বভুবনের তমোহর। তোমার অভিমানের তমোনাশ করতে এসেছেন। এসেছেন তোমার অন্তশ্চক্ষু ফুটিয়ে দিতে। বুঝিয়ে দিতে তুমি কে, তুমি কতটুকু! তোমাকে ঠাণ্ডা করে দিতে।
ভাবমোহিত হয়ে গেলেন ভগবান। বললেন, কণ্ঠে বিনয়নম্র মধুরতা, ‘আমার এমনি নাম ভগবান বটে কিন্তু আজ থেকে আমার আসল নাম ভাগ্যবান। ভাগ্যবান বলেই আমি আপনাকে পেয়েছি, আমাকে দেখা দিয়েছেন—’
সত্যিই দেখা দিয়েছেন! বাবাজী দেখলেন, মহাপ্রভুর মহাভাবের যে লীলাবর্ণন আছে তাই ওঁর দিব্য অঙ্গে প্রকাশিত।
বন্দনার আনন্দস্রোত বইতে লাগল আশ্রমে।
কে এ? কে এ বন্ধনমুক্ত বিভাবসু? অহঙ্কারের সংহত তুষারকে গলিয়ে দিলেন ভক্তির স্রোতস্বিনীতে!
উনিই সেই দক্ষিণেশ্বরের পরমহংস। কলুটোলার হরিসভায় উনিই সেদিন ভাবা-বেশে দাঁড়িয়েছিলেন চৈতন্যাসনে।
করজোড়ে ক্ষমা চাইলেন বাবাজী। বহু কটু-কাটব্য করেছি সেদিন।
বুঝতে পারিনি। যিনি সমস্ত জীবের চৈতন্য এনে দিয়েছেন চৈতন্যাসনে তো তাঁরই একমাত্র অধিকার।
মথুরবাবু আর হৃদয়কে সঙ্গে নিয়ে কালনায় বেড়াতে এসেছিল রামকৃষ্ণ। এসেছিল নৌকো করে। কেন এসেছিল কেউ জানেনি। মথুরবাবু গেলেন বাসা দেখতে, রামকৃষ্ণ বললে, চল রে হৃদু শহরটা একবার ঘুরে আসি। কত দূরে এসেই পথের লোককে ডেকে জিজ্ঞেস করলে, ‘আচ্ছা মশাই, ভগবানদাস বাবাজীর আশ্রমটি কোন দিকে?’
সেই আশ্রমে এসে এই কাণ্ড।
তোতাপুরীকে ক্রোধ জয় করতে শিখিয়ে দিয়েছিল, ভগবানদাস বাবাজীকে শিখিয়ে দিল অহঙ্কার জয় করতে, প্রতিহিংসা জয় করতে।
মথুরবাবুকে বললে, ‘এইখানে একটি মচ্ছব লাগিয়ে দাও।’
মথুরবাবু বললেন, ‘তথাস্তু।’
সেখান থেকে চলো এবার নবদ্বীপ। চলো একবার দেখে আসি নিমাইয়ের জন্মভূমি।
কেউ বলে নিম গাছের নিচে জন্মেছিল বলে নিমাই। কেউ বলে যমের মুখে তেতো লাগবে বলে নিমাই। কেউ বলে আট-আটটি কন্যা মরে যাবার পর নবম গর্ভে জন্মেছিল বলে নিমাই।
কিন্তু এমন কাঁদুনে ছেলে, কিছুতেই শান্ত হতে চায় না। পাড়ার স্ত্রীলোকদের কত জনের কত রকম চেষ্টা, কিছুতেই নিবৃত্তি নেই। অগত্যা অনুপায় হয়ে হরিনাম শুরু করে দেয় সবাই। ব্যস, শিশুর মুখে খিলখিল হাসি। পরম সঙ্কেত পেয়ে গেল সকলে। শিশু কাঁদলেই হরিনাম করতে হবে। আর শিশুও এমনি দুঁদে, তার কেবল থেকে-থেকে কান্না।
কিন্তু নেড়া-নেড়ীদের এ সব কী কাণ্ড বলো দেখি? সত্যিই কি চৈতন্য অবতার? না, নেড়া নেড়ীরাই টেনে-বুনে বানিয়েছে একটা? চলো নিজে গিয়ে দেখে আসি। হ্যাঁ, নিজে সেখানে গেলেই ঠিকঠাক বোঝা যাবে। চৈতন্য যদি অবতার হয়ই তবে সেখানে কিছু-না-কিছু প্রকাশ থাকবেই, আর ইশারা ঠিক মিলে যাবে চট করে।
রামকৃষ্ণ এল নবদ্বীপে। বড় গোঁসাইয়ের বাড়ি, ছোট গোঁসাইয়ের বাড়ি দেখতে লাগল ঘুরে-ঘুরে। হেথা-হোথা হেন-তেন কত ঠাকুর-দেবতার থান। কোথাও কিছু দেখতে পেল না। সর্বত্রই শুকনো হাঁড়ি ঠনঠন করছে। কোথাও দেবভাব নেই। সব জায়গাতেই এক-এক কাঠের মুরদ হাত তুলে খাড়া হয়ে আছে শুধু। দূর! এখানে তবে এলাম কী করতে! চল, ফিরে চল্ নৌকোয়। তাই সই। ফিরে চলো।
কিন্তু নৌকোয় যেই উঠেছে রামকৃষ্ণ, অমনি বদলে গেল দৃশ্যপট। অলৌকিক দর্শন হল তার। ঐ এলো, ঐ এলো—বলতে বলতে চকিতে সমাধিস্থ হয়ে গেল। জলে পড়ে যাচ্ছিল, হৃদয় ধরে ফেললে।
কী দেখলে অকস্মাৎ?
‘দেখলম দুটি সুন্দর ছেলে-আহা এমন রূপ কখনো দেখিনি, তপ্ত কাঞ্চনের মত রঙ, কিশোর বয়স, মাথায় একটা করে জ্যোতির মণ্ডল, হাত তুলে আমার দিকে চেয়ে হাসতে-হাসতে আকাশপথ দিয়ে ছুটে আসছে। এসেই একেবারে এই খোলটার মধ্যে ঢুকে গেল, আর আমার কিছু হুঁস রইল না। ওরে, ওরাই হচ্ছে নিমাই-নিতাই। নিমাই যে অবতার, তাতে কি কোনো সন্দেহ আছে?’ কিন্তু এ ভাব নবদ্বীপে না এসে এই গঙ্গাবক্ষে এল কেন?
মথুরবাবু বললেন, ‘যে নবদ্বীপে মহাপ্রভুর জন্ম তা গঙ্গায় ভেঙে গেছে। এই যে বালুর চড়া দেখতে পাচ্ছ এই ছিল আসল নবদ্বীপ। তাই হালের শহরে না হয়ে এই বালুর চড়ার কাছে এসে তোমার ভাব হল।’
তুমি ভাৰাম্বুনিধি। তুমি সর্বগুণেশ্বর।
আমি কেউ নই। আমি আবার কে!
৪২
কর্মযোগে অঙ্গারও হীরক হয়।
মথুরবাবুও ভক্তিতে-বিশ্বাসে অত্যুজ্জ্বল হয়ে উঠলেন।
সকাতরে বললেন রামকৃষ্ণকে, ‘বাবা, আমাকে ভাবসমাধি দাও।’
হাসল রামকৃষ্ণ। বললে, ‘দিব্যি তো আছিস। সুখে থাকতে ভূতের কিল খাবি কেন?’
‘না, ও সব শুনেছি না আমি—’
‘না শুনলে চলবে কেন? তোর এদিক-ওদিক দুদিক চলছে। ভাব হলে যে অথৈ জলে পড়বি। সংসার থেকে মন যে তখন উঠে যাবে। তখন তোর বিষয়-আশয় কে দেখবে-শুনবে? বারো ভূতে যে লুটে খাবে সর্বস্ব।’
মথুরবাবু তবুও নাছোড়বান্দা।
‘ওরে কালে হবে, কালে হবে। একটা বিচি পুঁততে-পুঁততেই কি গাছ হয়? আর গাছ হয়েই কি ফল পাওয়া যায়?’
ভক্ত, ভৃত্য আর ভাণ্ডারী এই মথুরবাবু। কখনো প্রভুজ্ঞানে ইষ্টপূজা, কখনো বা ‘সন্তানভাবে স্নেহশ্রাবণ। কখনো অভিভাবক জ্ঞানে সতর্ক সম্মান, কখনো বা মিত্র-বুদ্ধিতে সমতা-মমতা। আর যিনি বিশ্বজনক, যিনি আত্মীয়ের চেয়েও আত্মীয়, সর্বত্র যাঁর ক্ষমা, দয়া, বিশ্বাস আর আশীর্বাদ তাঁকেই মাঝখানে রেখে দুই পাশে শুয়েছেন দুই জনে। মথুরবাবু আর জগদম্বা। একই ধৈর্যের শয্যায়।
রামকৃষ্ণ ভাব দিতে রাজি হল না বলে মরমে মরে রইলেন মথুরবাবু। মাকে বললেন, মা, আমাকে বঞ্চনা করে তোর লাভ কি।
কি খেলা দেখাবার জন্যে মথুরবাবুকে মা নিয়ে এসেছিল রামকৃষ্ণের কাছে তা কি মথুরবাবু জানেন? বারে বারে রামকৃষ্ণকে যাচাই করে দেখবার জন্যে। সাধে কি আর মথুরবাবু লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে? দেখলেন যতই আগুন আনেন ততই সোনা টকটকে রঙ ধরে। একলা ঘরে সুন্দরী মেয়েমানুষ এনে দিলেন, রামকৃষ্ণ দুর্গাস্তব শুরু করলে। শাল-দোশালা চাপিয়ে দিলেন গায়ে, তার গায়ে থুতু ছিটোতে লাগল। রূপোর সাজ আর গড়গড়া দিলেন কিনে, বললে গামছা পরে ডাবা হুঁকো খেতে দোষ হল কি! বিষয় দিতে চাইলেন, এই মারে তো সেই মারে! তাঁর নিজের সংসারের উপরে দিলেন তাকে অপ্রতিহত প্রভুত্বের অধিকার, এক নজর তাকিয়েও দেখল না। কামারপুকুরের সংসারের জন্যে কত অর্থ ব্যয় করলেন, এতটুকু কাতরতা-কৃতজ্ঞতা নেই!
এ কে তুমি বৈরাগ্যবারিনিধি! আমি অনেক দুষ্কার্য করেছি, জমিদারি বজায় রাখতে খুনখারাপি করতেও কসুর করিনি, এবার দাও আমাকে নৈষ্কর্মের নিষ্কৃতি। আমাকে ভাব দাও।
তদ্ভাবে তদ্ভাবঃ, তদভাবে তদভাবঃ।
‘ওরে ঠিক-ঠিক যে ভক্ত সে কি তাঁকে দেখতে চায়? সে শুধু তাঁর সেবা করে।’ প্রবোধ দিল রামকৃষ্ণ। ‘তাঁর সেবাতেই তার পরমানন্দ। তার বেশি আর সে কিছু চায় না।’
তবু মন ওঠে না মথুরবাবুর।
‘তা কি জানি বাপু! মাকে তবে গিয়ে বলি! দেখি তাঁর কি ইচ্ছে!’
এর দিন কয়েক পরেই হঠাৎ একদিন মথুরবাবুর ভাবসমাধি উপস্থিত। তিন দিন ধরে ঠায় জড় অবস্থা।
ডেকে পাঠালেন রামকৃষ্ণকে। দেখে যাও কোথায় এসে উঠেছি শেষ পর্যন্ত।
রামকৃষ্ণ দেখল, আশ্চর্য এ কী হয়ে গিয়েছে মথুর! যেন আরেক দেশের মানুষ। চেনা যায় না চট করে। দু’ চোখ লাল, কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছে। মুখে শুধু ঈশ্বরের কথা। শুধু অধ্যাত্মরতি।
কিন্তু রামকৃষ্ণকে দেখেই দু পা জড়িয়ে ধরলেন মথুরবাবু। আকুল কণ্ঠে বললেন, ‘বাবা, ঘাট হয়েছে। তোমার ভাব তুমি ফিরিয়ে নাও।’
‘কেন কি হল?’
‘সব তছনছ হয়ে গেল। তিন দিন ধরে এই অবস্থা, বিষয়কর্মে মন দিতে পারছি না, চেষ্টা করলেও মন উঠে-উঠে যাচ্ছে। তিন দিনই বারো ভূত ছেড়ে তেত্রিশ ভূত এসে লেগেছে—’
‘কেন, তখন যে খুব ভাব চেয়েছিলে শখ করে? এখন ফেরৎ দিলে চলবে কেন?’
‘এদিকে সব যে যায়!
‘কেন, আনন্দ নেই?
‘আছে, কিন্তু সে আনন্দ, যিনি নিত্যানন্দ, তোমারই সাজে। আমাদের ও সবে কাজ নেই। আমাদের পদসেবা। পর-জ্ঞানে পরা-সেবা।’
হাসতে লাগল রামকৃষ্ণ। বললে, ‘তাই তো বলেছিলাম আগে।’
‘তখন কি অতশত বুঝেছি? তখন কি জানতাম যে ভাবের গোঁয়ে চব্বিশ ঘণ্টাই ফিরতে হবে? ইচ্ছে করলেও আর কিছুতেই মন দিতে পারব না?’
তখন আর রামকৃষ্ণ কি করে। মথুরবাবুর বুকে স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলে। ধাতস্থ হলেন মথুরবাবু।
ওরে, কী হবে ও সব ভাব-টাবে। শুধু তাঁর নাম কর, তাঁর দয়ায় বিশ্বাস কর। ব্যাকুল হয়ে প্রার্থনা কর তাঁর কাছে। কী চাইবি? শুধু আশ্রয়, শুধু শান্তি, শুধু প্রসন্নতা। ওরে ধেয়ান ধর, প্রেম লাগা।
সাধন-ভজন কেবল ডানা বেদনা করবার জন্যে। আকাশে উড়তে-উড়তে ডানার ব্যথা হলেই পাখি কোথাও কোনো উঁচু জায়গায় এসে বসে। সেই উঁচু জায়গাটিই তিনি। আর তাঁরই জন্যে সাধন।
চিঁড়ে কোটো, মন রেখো ঢেঁকির মুষলের দিকে। তুলসীদাস পড়েছিস? তুলসী, অ্যায়সা ধেয়ান ধর, য্যায়সা বিয়ানকা গাই। মু মে তৃণ চানা টুটে চেৎ রাখয়ে বাছাই। প্রসূতি গাভী মুখে ঘাস খেলেও যেমন তার মন পড়ে থাকে বাছুরের উপর, তেমনি সংসারকর্মে লেগে থাকলেও মন ফেলে রাখ ঈশ্বরে।
মথুরবাবুর অসুখ, ফোঁড়ার যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। হৃদয়কে দিয়ে বলে পাঠালেন, বাবা যেন একবারটি আসেন।
রামকৃষ্ণ বললে, ‘আমি গিয়ে কি করব! আমি কি তার ফোঁড়া ভালো করতে পারব?’ গেল না রামকৃষ্ণ।
মথুরবাবু আবার লোক পাঠালেন। বাতাসে পাঠালেন তাঁর যন্ত্রণার কাতরতা। অগত্যা যেতে হল রামকৃষ্ণকে।
অনেক কষ্টে তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে উঠে বসলেন মথুরবাবু। বললেন, ‘বাবা এসেছ? আমাকে একটু পায়ের ধুলো দাও।’
‘তুমি কি ভেবেছ আমার পায়ের ধূলোয় তোমার ফোঁড়া ভালো হবে?’
সারা অন্তরে ছি-ছি করে উঠলেন মথুরবাবু। বললেন, ‘বাবা আমি কি এমনি? আমি কি আমার ফোঁড়ার জন্যে তোমার পায়ের ধুলো চাই?’ দুই চোখ দিয়ে অশ্রুধারা নেমে এল। ‘আমার ফোঁড়ার জন্যে তো ডাক্তার আছে। আমি তোমার শ্রীচরণের ধূলো চাই এই ভবসাগর পার হবার জন্যে।’
শুনতে শুনতেই ভাবাবেশ হল রামকৃষ্ণের। স্বচ্ছ ভক্তির স্পর্শে উথলে উঠল ভাবতরঙ্গ।
সেই সযোগে মথুরবাবু রামকৃষ্ণের যুগ্মপদে মাথা ঠেকালেন। দেহের চিকিৎসার জন্যে আয়ুর্বেদী আছে, তুমি ভবরোগবৈদ্য।
তুমি অতীন্দ্রিয় রাজ্যের স্বরাট-বিরাট সম্রাট হয়ে আবার এই ক্ষুদ্র হৃদয়ের অধিপতি। তুমি স্নেহে মাতা, পালনে পিতা, জীবনের খেলার সাথী।
একেক সময় একটা গোঁ আসে মথুরবাবুর।
যেমন সেইবার এসেছিল। বিজয়াদশমীর দিন বলে বসলেন, প্রতিমা বিসর্জন দেব না, নিত্যপূজা করব।
কারু কথায়ই কান পাতেন না। স্ত্রীর কথা পর্যন্ত উড়িয়ে দিলেন। বিপদ বুঝে রামকৃষ্ণকে ডেকে পাঠালেন জগদম্বা। স্বামীর নিশ্চয় মাথা বিগড়েছে। নইলে এমনতরো চেহারা হয় আকস্মিক?
মুখ-চোখ লাল, কেমন একটা উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এদিক-ওদিক। না, কিছুতেই ফেলে দিতে পারব না মাকে। মাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না।
রামকৃষ্ণের অনুরোধ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করে দিলেন।
‘মাকে ছেড়ে বাঁচতে পারব না। যতক্ষণ আমার প্রাণ আছে ততক্ষণ কেউ নিয়ে যেতে পারবে না মাকে।
রামকৃষ্ণ তখন তাঁর বুকে হাত বুলাতে লাগলেন। বললেন, ‘মাকে ছেড়ে তোমাকে থাকতে হবে এ কথা কে বললে? আর বিসর্জন দিলেই বা মা যাবেন কোথায়? ছেলেকে ছেড়ে মা কি থাকতে পারেন কখনো? তিন দিন বাইরের দালানে বসে পুজো নিয়েছেন, আজ থেকে একেবারে ভিতরের দালানে বসে পুজো নেবেন। হ্যাঁ, ভিতরের দালান। তোমার অন্দর মহল। আরো নিকট হবেন তিনি। বসবেন এসে তোমার অন্তরের অন্দরে।’
ব্যস, হাতের ছোঁয়ায় নরম হয়ে গেলেন মথুরবাবু। সত্যদৃষ্টির সৌম্য শান্তি নেমে এল দু চোখে।
‘কথা কইতে-কইতে অমন করে ছুঁয়ে দি কেন জানিস?’ ভক্তদের বললেন এক দিন ঠাকুর। ‘যে শক্তিতে ওদের ওই গোঁ-টা থাকে, সেইটের জোর কমে গিয়ে ঠিক-ঠিক সত্য বুঝতে পারবে বলে।’
১২৭৮ সালের আষাঢ় মাসের শেষ দিকে মথুরবাবু জ্বরে পড়লেন। দেখতে-দেখতেই বিকারে দাঁড়িয়ে গেল জ্বর।
রামকৃষ্ণ গিয়েছে দেখা করতে।
মথুরবাবু বললেন, ‘আচ্ছা বাবা, সেই যে তুমি বলেছিলে তোমার অনেক ভক্ত আসবে, কই তারা তো আজো এল না? ‘
‘কি জানি বাপু কত দিনে আসবে সব।
মা যত কিছু দেখিয়েছেন সব ফলেছে, শুধু এইটেই বুঝি ফলল না!’ রামকৃষ্ণের মুখে পড়ল ঈষৎ বিষাদ-ছায়া।
জানো না সেই ভূতের সঙ্গী খোঁজা। ভূত একা-একা ঘোরে, সঙ্গী-সাথী জুটছে না একটাও। শনি-মঙ্গলবারে কেউ যদি অপঘাতে মরে, তাকে ধরে আনবার জন্যে দৌড়ে যায়। ভাবে যেহেতু শনি-মঙ্গলবারে মরেছে ভূত হবে নির্ঘাৎ। সঙ্গী পাওয়া যাবে এত দিনে। কিন্তু যেই সামনে ছুটে যায়, দেখে হয় লোকটা শেষ পর্যন্ত মরেনি, নয়তো বার গুনতে ভুল হয়েছে। ভূতের আর সঙ্গী মেলে না।
আমারো হয়েছে সেই দশা। আমার কথা নেবে কে? আমি তাই সঙ্গী খুঁজছি—খুঁজছি আমার ভাবের লোক। খুব ভক্ত দেখলে মনে হয় এই বুঝি আমার ভাব নিতে পারবে। কিন্তু, না, কত দিন হতেই সে আরেক রকম হয়ে যায়। তরোয়াল দিয়ে সে দাড়ি চাঁছে।
‘মনের কথা কইব কি সই, কইতে মানা। দরদী নইলে প্রাণ বাঁচে না।’
কথায় কেমন যেন একটা করুণ বেদনা।
মথুরবাবু বললেন, ‘তারা আসুক আর না আসুক, আমি আছি। আমি একাই একশো ভক্তের সমান। তাই মা হয়তো আমাকে দেখিয়েই তোমাকে বলেছিলেন অনেক ভক্ত আসবে’
‘কে জানে বাপু মা-ই জানেন।’
কিন্তু রামকৃষ্ণ বুঝতে পারল মা-ই এবার নিজে এসেছেন মথুরকে নিয়ে যেতে। যা, মা’র কাছেই যা। দেখ গে সেই দেবীলোক।
নিজে আর এল না রামকৃষ্ণ। খোঁজ নিতে রোজ পাঠায় হৃদয়কে।
কাশীতে রামকৃষ্ণের অনুরোধে মথুরবাবু কল্পতরু সেজেছিলেন। যে যা চাইল তাই দান করলেন অকাতরে!
রামকৃষ্ণকে বললেন, ‘তুমি কিছু চাও।’
চন্দ্রমণি এক আনার দোক্তা চেয়েছিলেন। রামকৃষ্ণ বললে, ‘আমাকে একটি কমণ্ডলু দাও।’
সেই কমণ্ডলু করে আমাকে একটু এখন গঙ্গাজল দেবে না? কৃপণ মথুরকে মুক্তহস্ত করে দিয়ে, হে কৃপানিধি, তুমি আজ নিজে কৃপণ হয়ে গেলে?
কোনো দরকার নেই। স্বয়ং গঙ্গা আসছেন তোকে নিয়ে যেতে। আসছেন সেই বেদময়ী শব্দময়ী গঙ্গা। তৃপ্তিকর্ত্রী ভবতারিণী। তাঁর এগিয়ে আসার শব্দ শুনতে পাচ্ছিস না?
পয়লা শ্রাবণ, আজ মথুরবাবুর শেষ দিন। আজো রামকৃষ্ণ গেল না জানবাজারে। তোর ভক্তিব্রত উদযাপন হয়েছে, মা তোকে কোলে তুলে নিতে নিজে এসেছেন। কালীঘাটে নিয়ে গেল মথুরবাবুকে। ঘনিয়ে এসেছে জীবনের অন্তিমা।
রামকৃষ্ণ তখন দক্ষিণেশ্বরে সমাধিস্থ। তার সুক্ষ দেহ জ্যোতির পথ ধরে চলে এল মথুরের শয্যাপার্শ্বে। চোখের পাতা শেষ বারের মত বোজবার আগে মথুরবাবু দেখলেন রামকৃষ্ণকে।
বিকেল পাঁচটার সময় ধ্যান ভাঙল। হৃদয়কে ডেকে বললে, ‘ওরে, মথুর রথে উঠল। খুব বেগে উড়ে গেল সেই রথ। চলে গেল দেবীলোকে।’
অনেক রাতে খবর এল দক্ষিণেশ্বরে, বিকেল পাঁচটার সময় মথুরবাবু লোকান্তরিত হয়েছেন।
‘আমাকে দেখে সে কী বলত জানিস?’ ঠাকুর এক দিন বললেন ভক্তদের। ‘বলত, বাবা, তোমার ভেতরে আর কিছু নেই—শুধু সেই ঈশ্বর আছেন। দেহটা একটা খোল, বাইরে কুমড়োর আকার, কিন্তু ভেতরের শাঁস-বিচি কিছু নেই। তোমায় দেখলাম, যেন কেউ ঘোমটা দিয়ে চলে যাচ্ছে।’
তবু তুমি মনে করো না, সেজবাবু তুমি একটা বড় মানুষ আমায় মানছ বলে আমি কৃতার্থ হয়ে গেছি। মানুষ কী করবে! ঈশ্বরই তাকে মানাবেন। ঈশ্বরীয় শক্তির কাছে মানুষ খড়-কুটো।
কী জ্বলন্ত বিশ্বাসই ছিল! কী উর্জী ভক্তি! কর্ম করতে গেলে আগে একটি বিশ্বাস চাই। একটি আনন্দময় বিশ্বাস। মাটির নিচে মোহরের ঘড়া আছে এই আনন্দময় বিশ্বাস থাকলেই তো মাটি খুঁড়ব। খুঁড়তে-খুঁড়তে যদি ঠং করে একটা শব্দ হয়, বুকের ভিতরটাও আনন্দে টং করে ওঠে। তার পর যদি ঘড়ার কানা দেখা যায়, তা হলে তীব্রতর আনন্দ। খোঁড়ার বেগ তখন আরো বাড়ে। সাধু গাঁজা সাজছে, তার সাজতে সাজতে আনন্দ। টানবার আগে থেকেই আনন্দ৷ হনুমানের রাম নামে বিশ্বাস। বিশ্বাসের গুণে সে সাগর লঙ্ঘন করলে। আর স্বয়ং রামচন্দ্র, তাঁকে সাগর বাঁধতে হল!
‘আচ্ছা, মশাই, মৃত্যুর পর মথুরের কী হল?’ এক দিন কে এক জন জিজ্ঞেস করল ঠাকুরকে।
‘তার নিশ্চয়ই আর জন্মাতে হবে না।’
‘কে বললে? সে নিশ্চয়ই কোথাও একটা রাজাটাজা হয়ে জন্মেছে। তার মধ্যে যে ভোগবাসনা ছিল!’
যোগভ্রষ্ট হলে ভাগ্যবানের ঘরে জন্ম হয়—তার পরে আবার ঈশ্বরের জন্যে সাধনা করে। পূর্বজন্মে ঈশ্বর চিন্তা করতে-করতে হঠাৎ হয় তো ভোগ করবার লালসা হয়েছে। তাকেই বলে যোগভ্রষ্ট। কামনা থাকতে, লালসা থাকতে মুক্তি নেই৷
‘ওরে বাসনায় আগুন দে।’ এই কথা শুনেই বেরিয়ে গিয়েছিলেন লালাবাবু সাত লাখ টাকার আয়ের সম্পত্তি ছেড়ে চলে গেলেন বৃন্দাবনে।
ধর্মের সুক্ষ গতি। ছুঁচে সুতো পরাচ্ছ, সুতোর মধ্যে একটু আঁশ থাকলে ছুঁচের ভিতর আর ঢোকে না। কামনা থাকলে আর ভগবান নেই ।
কী চাইবি ভগবানের কাছে? ভক্তি-মুক্তি, জ্ঞান-বৈরাগ্য—ও সব কিছু নয়। শ্ৰীমা বললেন, ‘চাইবি শুধু নির্বাসনা।’
৪৩
‘তোমরা সব কোথায় চলেছ?
কলকাতায় গঙ্গাস্নানে যাচ্ছি।
‘কলকাতায়?’
‘হ্যাঁ, ফাল্গুনী পূর্ণিমায় প্রকাণ্ড যোগ সেখানে। ঐ দিন জন্মেছেন গৌরাঙ্গদেব।’
‘আমাকে তোমাদের সঙ্গে নিয়ে যাবে?’
‘ও মা, স্নানে যাবি তুই?’ আত্মীয়া বয়স্কা মহিলারা কৌতূহলী হয়ে উঠল।
‘না, একবারটি দক্ষিণেশ্বরে যাব। তাঁকে দেখতে বড় মন কেমন করছে।’
‘তোর বাবাকে গিয়ে বল। তোর বাবা না বললে যাবি কি করে?
লজ্জায় মরে গেল সারদা। একটু বা ভয়-ভয় করতে লাগল। যদি বাবার কানে ওঠে! ছি ছি, বাবার কানে গেলে তিনি কি ভাববেন।
সেই কত দিন আগে দেখা হয়েছে তাঁর সঙ্গে। চার বছর আগে। গেল পৌষে সারদার আঠারো বছর পূর্ণ হয়েছে। ভরন্ত বয়সের চটুল চাপল্য নেই, স্বভাবটি প্রশান্ত গম্ভীর। হৃদয়ের মধ্যে সব সময়ে আনন্দের একটি পূর্ণঘট বসানো। উল্লাসটি উচ্ছলিত নয়, উল্লাসটি নিয়তনিশ্চল।
সত্যি-সত্যি বাবার কানে উঠল কথাটা। সারদা দক্ষিণেশ্বরে যেতে চায়। মিলতে চায় তার স্বামীর সঙ্গে। তার পুরুষের সঙ্গে।
লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছে করল। মনে-মনে বললে, তোমার কাছে যেতে চাই, তুমিই আমাকে রক্ষা করো।
রামচন্দ্র ডেকে পাঠালেন সারদাকে। বললেন, ‘বেশ তো। যাবে। আমিই তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব। গোছগাছ করে নাও চট করে।’
হৃদয়স্থ আনন্দঘটের দিকে সারদা তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে। কৃতজ্ঞকরুণ চোখে প্রতীক্ষার প্রশান্তি।
কোথায় জয়রামবাটি আর কোথায় কলকাতা! পায়ে-হাঁটা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। সাত রাজ্যে ইঞ্জিনের বাঁশি শোনেনি কেউ। এদিকে বিষ্ণুপর, ওদিকে তারকেশ্বর—সব ঝাঁঝাঁ করছে। ঘাটালের যে নদী সেখানেও ইস্টিমার আসেনি। সর্বদিকে একটা স্থান আর সময়ের বিস্তীর্ণ হাহাকার। কোথা দিয়ে কোথায় যাব, কত দিনে কোন দিকে গিয়ে পৌঁছব—সমস্ত একটা ধূসর অস্পষ্টতা। কিছুই ধরা-ছোঁয়ার নেই, সব যেন ঐ দিগন্তের কাছাকাছি।
তবু চলো। চলা ছাড়া অনুপায়ের আর উপায় কি। শুধু এগিয়ে চলো। যেমন পদে-পদে বিপদ, তেমনি পায়ে-পায়ে উপায় ।
সারদা শুধু স্বামীদর্শনে যাচ্ছে না, সে যাচ্ছে তীর্থদর্শনে। হিমালয় ডিঙিয়ে মানস সরোবরে।
কোনো দিন পথে বেরোয়নি সারদা। হাঁটেনি কোনোদিন দূরের পাড়িতে। তব ভয় পাবে না সে। থাকবে না পিছিয়ে পড়ে। যিনি তীর্থপতি তিনিই তীর্থ-পথিককে টেনে নেবেন।
কোথাও-কোথাও রাস্তার খেই হারিয়ে গেছে। ধান কাটা হয়ে গিয়েছে মাঠে, কোথাও বা সেই শুকনো মাঠ ভাঙো। ঢেলা মাড়িয়ে মাড়িয়ে চলো। গাছের ছায়া পাও তো, জিরিয়ে নাও একটু। তালপুকুর মিলেছে কোথাও, জল খেয়ে নাও পেট ভরে। সূর্যদেব গো, তোমার রশ্মিজাল একটা স্তিমিত করো। কমলকোমল পা ফেলে-ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে সারদা। মুখখানি রোদে আমলে গেছে, আর যেন পারছে না চলতে। পা ভেঙে পড়ছে পথশ্রমে। শরীর ঝিমিয়ে পড়ছে।
‘চলতে কষ্ট হচ্ছে রে সারু?’ জিজ্ঞেস করেন রামচন্দ্র।
‘না, বাবা।’ মুখে হাসি আনে সারদা, পা দুটোকে টানে জোর করে।
‘তবে অমন পিছিয়ে পড়ছিস কেন?’
‘এই একটু দেখতে দেখতে চলেছি সব—’
মেয়ের মুখের দিকে তাকান রামচন্দ্র। ঝামরে গেছে মুখ-চোখ। যেন টলে-টলে পড়ছে। দু-তিন দিনেই এই, এখনো আছে আরো কত দিনের দীর্ঘ শ্রম। উপায় কি, এমনি করেই চটি থেকে চটিতে বিশ্রাম নিতে-নিতে এগুতে হবে। বিশ্রামটা না-হয় আরো একটু বড় করা যায়, কিন্তু পথ তো আর ছোট করা যাবে না।
হু-হু করে জ্বর এসে গেল সারদার। মেয়ে পথের মধ্যেই এলিয়ে পড়ল। চোখে আঁধার দেখলেন রামচন্দ্র। মেয়েকে নিয়ে এখন করি কি।
আর সব সহযাত্রীরা থামতে চাইল না। তোমার মেয়ের জন্যে আমাদের গঙ্গাস্নান মারা যাক আর কি। আমরা চললাম এগিয়ে। তুমি তোমার মেয়েকে নিয়ে সামনের চটিতে গিয়ে ওঠো।
তা ছাড়া আর পথ নেই। রুগী মেয়ে হাঁটবে কি করে? পালকি কই এ অঞ্চলে? অগত্যা রামচন্দ্র সারদাকে নিয়ে সামনের এক চটিতে গিয়ে আশ্রয় নিলেন।
দুঃখের আর অবধি নেই সারদার। নিজে তো অসুখে পড়লুমই, বাবাকেও বিপদে ফেললাম। তোমাকে দেখবার দিনটিও পিছিয়ে গেল।
গ্রাম্য বধূ লজ্জা-সরমের কত ছিরিছাঁদ। এখন জ্বরে বেহুঁস হয়ে বিদেশের চটিতে সব জলাঞ্জলি গিয়েছে। লজ্জানিবারণ হরি, তাঁর স্নেহদৃষ্টির ছায়ায়ই তার আচ্ছাদন।
সারদা দেখল, কে একটি মেয়ে তার পাশে এসে বসল।
গায়ের রঙটি কালো, কিন্তু কালো অমন অপরূপ হয়, কালোর যে অমন আলো থাকে, স্বপ্নেও কোনো দিন দেখেনি সারদা। মেয়েটি পাশে বসে ঠাণ্ডা স্নেহে সারদার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। নরম হাতের ছোঁয়ায় মুছে দিতে লাগল তপ্ত গায়ের দাহ। দুটি টানা-টানা বিশাল চোখের মমতাটিও কত ঠাণ্ডা!
সারদা জিজ্ঞেস করলে, ‘তুমি কোথা থেকে আসছ গা?’
‘দক্ষিণেশ্বর থেকে আসছি।’
‘বলো কি? দক্ষিণেশ্বর থেকে? আমিও ভেবেছিলাম দক্ষিণেশ্বরে যাব। সেই আশা করেই বেরিয়েছিলুম বাড়ি থেকে। তায় রাস্তায় এই জ্বর। আচ্ছা, তুমি দক্ষিণেশ্বরে তাঁকে দেখেছ? ঠাকুরকে? ‘
‘দেখেছি বই কি।’
‘বড় সাধ ছিল, তাঁকে দেখব, তাঁর সেবা করব। আমার ভাগ্যে সে আশা আর মিটল না। জ্বর এসে আমার সমস্ত স্বপ্ন ভেঙে দিলে।’
মেয়েটি ব্যস্ত হয়ে বললে, ‘না, না, তুমি দক্ষিণেশ্বরে যাবে বই কি। তুমি ভালো হবে, সেখানে গিয়ে দেখবে তাঁকে। তোমার জন্যেই তো তাঁকে আটকে রেখেছি সেখানে।’
‘বটে? ভালো হয়ে সেখানে গিয়ে তাঁকে দেখব?’ সারদা তাকাল একবার সেই মমতাময়ীর দিকে। ‘তুমি আমাদের কে হও গা?’
‘আমি তোমার বোন হই।’
‘সত্যি? তাই বুঝি তুমি এসেছ আমার অসুখ শুনে? বাঃ, বেশ! বলতে ঘুমিয়ে পড়ল সারদা ।
সকালে ঘুম ভেঙে দেখল বোন কোথায় চলে গেছে। বোনের সঙ্গে-সঙ্গে জ্বরও অন্তর্হিত।
আবার শুরু হল পথ হাঁটা। কত দূর এসে, কি আশ্চর্য, একটা পালকি মিলে গেল। বোনটিই হয় তো পাশের কোনো গাঁ থেকে পাঠিয়ে দিয়েছে পালকি।
আবার জ্বর এল দুপরের দিকে।
‘কেমন আছিস রে সারু?’
‘বেশ ভালো আছি বাবা।’
পালকি পেয়েছে, আবার রোগ-বালাই কী সারদার! চলেছি তো এখন সর্বরোগপাবনের কাছে।
পথের শেষ হল এক সময়। রাত নটার সময় দক্ষিণেশ্বরের ঘাটে নৌকো লাগল।
রামকৃষ্ণের কাছে খবর পৌঁছল। রামকৃষ্ণ ডেকে পাঠাল হৃদয়কে। বললে, ‘ও হৃদু বারবেলা নেই তো? প্রথম বার আসছে।’
এ কথা হয়ে গেছে আগেই। সারদা গঙ্গার উপরেই নৌকোতে বারবেলা কাটিয়ে এসেছে।
কত দূর থেকে আসছে।
আর সকলে এদিক-সেদিক গেল—নহবতের ঘরে চন্দ্রমণি আছেন, সেখানে কেউ-কেউ। সারদা সটান চলে এল রামকৃষ্ণের ঘরে। মুখে সেই সলজ্জ ঘোমটা। ‘তুমি এসেছ?’ উৎফুল্ল হয়ে উঠল রামকৃষ্ণ। ‘বেশ করেছ।’ বলেই ব্যস্ত হয়ে উঠল ‘ওরে, ওকে একখানা মাদুর পেতে দে। তার পরে আবার অসুখ করে এসেছে।’ বলেই নিজের মনে খেদ করতে লাগল ‘এখন কি আর আমার সেজবাবু আছে যে, তোমাকে যত্ন করবে? আমার ডান হাত ভেঙে গেছে। তোমাকে আমি এখন কোথায় রাখি? আমার সেজবাবু হলে তোমাকে অট্টালিকায় রাখতেন। এলে তো এত দেরি করে এলে। আমার সেজ-বাবুকে দেখতে পেলে না।’
মাদুর বিছিয়ে দিল হৃদয়। জড়সড় হয়ে বসল তাতে সারদা।
চোখ-কানের বিবাদ ভঞ্জন করল। কত কি শুনেছিল দেশে থাকতে।
পাগল হয়ে গিয়েছেন, পরনে কাপড় নেই, মাখে শুধু অসম্বদ্ধ প্রলাপ। তাঁর সম্বন্ধে এই বিবরণটাই তো পাগলের বিবরণ। একেবারে পরমানন্দ মহাপুরুষের মত বিরাজ করছেন। আশ্চর্য, সারদাকে তিনি ভোলেননি, ঠিক মনে করে রেখেছেন। শুধু মনে করে রাখেননি নয়, তার প্রতি করুণায় অজস্র হয়ে আছেন।
ঘর ছেড়ে উঠে যেতে ইচ্ছে করে না সারদার। তবু বললে, ‘আমি মা’র কাছে নবতের ঘরেই যাই।’
‘না, না, ওখানে ডাক্তার দেখাতে অসুবিধে হবে। রামকৃষ্ণ ব্যস্ত হয়ে উঠল। ‘তুমি এ ঘরেই থাকো। আমি নইলে ওষুধ-পথ্য দেবে কে?’
চন্দ্রমণি আগে কুঠিঘরের একটি কোঠায় থাকতেন, অক্ষয়ও থাকত তাঁর সঙ্গে। সেই ঘরেই অক্ষয় মারা যায়। অক্ষয় মারা গেলে চন্দ্রমণি ছেড়ে দিলেন সেই কুঠিঘর। বললেন, ‘আর আমি ওখানে থাকব না। আমি নিচে এই নবতের ঘরেই থাকব। গঙ্গা পানে মুখ করে রইব। কুঠিতে আর আমার দরকার নেই।
তখন রাতের খাওয়া-দাওয়া হয়ে গিয়েছে। দু-তিন ধামা মুড়ি নিয়ে এল হৃদয়। যেমন অসময়ে এসেছ তেমনি মুড়ি চিবোও বসে-বসে।
রাত্রে সেই ঘরেই শুলো সারদা। শুলো ভিন্ন শয্যায়, সঙ্গে আরেকটি মেয়ে নিয়ে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ভাবল সারদা, এ কি ঘুম, না জাগরণ!
পর দিনেই ডাক্তার আনালো রামকৃষ্ণ। তিনচার দিন সারদাকে রাখল তার খবর-দারিতে। নিজের হাতে খাওয়াতে লাগল পথ্য। ঘড়ি ধরে ওষুধ। নিজের সেবা-যত্নে ভালো করে তুলল। বললে, ‘এবার তুমি যেতে পারো মা’র কাছে। নহবতে চলে এল সারদা। লাগল শাশুড়ির সেবায়। যতটুকু উনি নেন ততটুকু রামকৃষ্ণের সেবায়৷
সেবার মত আনন্দ আর কী আছে! সেবা ছাড়া আর কী আছে জীবনের কবিতা! রামচন্দ্র দেখে বড় শান্তি পেলেন। ফিরে গেলেন স্বস্থানে।
কিন্তু সারদাকে নবতে পাঠিয়েই রামকৃষ্ণের মনে হল, কেন, কেন ওকে দূরে সরিয়ে রাখব। ওকে কি আমার ভয়, না ঘৃণা? ও কি আমার তাচ্ছিল্যের, না অনুকম্পার? প্রতিমায় ঈশ্বর পূজা হয় আর জীয়ন্ত মানুষে হবে না? আমি কি ফুটো কলসী যে জল রাখলে জল সব বেরিয়ে যাবে? আমি কি বালির বাঁধ যে আষাঢ়ের বন্যাকে রোধ করতে পারব না?
মনে পড়ল তোতাপুরীর কথা। তোতাপুরী বলেছিল, ‘তুমি যে কাম জয় করেছ তার প্রমাণ কি?
স্ত্রীকে দেশের বাড়িতে রেখে এখানে বনবাসে থেকে কামজয়ের কথা বলা সোজা। স্ত্রীকে কাছে রেখে বলতে পারো তবে বুঝি।’
এবার তো সেই পরীক্ষার সুযোগ এসেছে। জোর করে নিজের বীরত্ব জাহির করবার জন্যে তো তিনি করছেন না, তাঁর কাছে সুযোগ এসেছে বলেই তিনি পরীক্ষা করছেন। সমস্তই মহামায়ার ইঙ্গিত৷
রামকৃষ্ণ বলে পাঠালো, ‘সারদা আমার ঘরে এসে শোবে।’
সারদার ভয় করতে লাগল। এ আবার কী হল রামকৃষ্ণের! কিন্তু ‘না’ বলবার উপায় নেই। শাশুড়ী বললেন, ‘যাও যখন ও বলছে।’
ঘরের মধ্যে একান্তে ডেকে এনে রামকৃষ্ণ জিজ্ঞেস করলে সারদাকে, ‘তুমি কি আমাকে সংসার পথে টেনে নিতে এসেছ?’
ঘোমটা-ঢাকা মুখে হেঁট হয়ে দাঁড়াল সারদা। বললে, ‘না। তোমাকে সংসার পথে কেন টানতে যাব? তোমাকে ইষ্ট পথেই সাহায্য করতে এসেছি।’
তবে বোস পাশটিতে, শোনো।
খই ভাজবার সময় যে খই-টি খোলার উপর থেকে ঠিকরে বাইরে পড়ে তাতে কোনো দাগ লাগে না, কিন্তু গরম বালির খোলায় থাকলে কোনো না কোনো জায়গায় কালো দাগ লাগবেই। যা ঈশ্বরের পথে বিঘ্ন বলে বোধ হবে তা মা-ই হোক আর স্ত্রী-ই হোক, তৎক্ষণাৎ ত্যাগ করতে হবে। ঈশ্বরের মতন কিছু নেই।
রাবণ সীতার জন্যে মায়ার নানা রূপ ধারণ করছে, তবু সীতা টলে না। এক জন বললে, ‘একবার রামরূপ ধরে যাও না কেন?’
রাবণ বললে, ‘রামরূপ একবার হৃদয়ে ধরলে ব্রহ্মপদই তুচ্ছ হয়, পরস্ত্রী তো কোন ছার! তা রামরূপ কি ধরবো!’
‘কিন্তু আমি তোমার কে?’ গভীর-সরল অন্তরে জিজ্ঞেস করলে সারদা।
‘তুমি আমার বিদ্যা। তুমি সারদা, সরস্বতী। তুমি রূপ নিয়ে আসোনি, বিদ্যা নিয়ে এসেছ। রূপ থাকলে পাছে অশুদ্ধ মনে দেখে লোকের অকল্যাণ হয় তাই এবার রূপ ঢেকে এসেছ। এসেছ বিদ্যার আলো জ্বালিয়ে। তুমি জ্ঞানদাত্রী।
অত-শত কি বোঝে সারদা? বুঝে কাজ নেই কানাকড়ি। তার চেয়ে সেবা করি। জ্ঞান বুঝি না, বুঝি ভক্তি, বুঝি সেবা। রামকৃষ্ণের পা টিপতে বসল সারদা। পা টেপবার পর সারদাকে রামকৃষ্ণ প্রণাম করল।
ও কি! ছি! সর্বাঙ্গে কুণ্ঠিত হল সারদা। বললে, ‘আমি তোমার দাসী।’
‘তুমি আমার আনন্দময়ী। যে মা মন্দিরে আছেন তিনিই এই শরীরের জন্ম দিয়েছেন। তিনিই সম্প্রতি আছেন নবতে আর তিনিই এখন আমার পদসেবা করছেন। তুমি কি শুধু এই ঘরের মধ্যে আছ? তুমি আছ আমার বিশ্বব্যাপিনী হয়ে।’
৪৪
‘মন রে, চেয়ে দ্যাখ। দেখছিস?’
বড় তক্তপোশটিতে বসে আছে রামকৃষ্ণ! একসঙ্গে লাগানো ছোট খাটটিতে শুয়ে আছে সারদা। শুয়ে আছে লজ্জায় জড়সড় হয়ে। আগাগোড়া গা ঢেকে। শুধু পদতল দুটি অনাবৃত। পদ্মদলের মত পদতল। তাতে পদ্মরাগের আভা।
ঘরে দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। দরজায় খিল দেওয়া।
থমথম করছে নিশুতি মধ্যরাত। এটা বসন্ত কাল না? ‘ঋতুণাং কুসমাকরঃ’ সেই মধু-ঋতু না এখন? দক্ষিণেশ্বরের বাগানে গঙ্গদ-গন্ধ ফুল ফুটেছে অনেক। গঙ্গার উপরে বাতাস মন্থর হয়ে এসেছে।
‘দ্যাখ চোখ ভরে। দেখছিস?’
ঘরের কোণে প্রদীপ জ্বলছে না একটা? জানলা দিয়ে জ্যোৎস্না এসে পড়েনি? দেখতে পাচ্ছিস না তোর অনুভূতির অন্তর্গুঢ় অন্ধকারে!
‘পাচ্ছি।’
‘কী দেখছিস?’
‘একটি অমল ও অনুপম সৌন্দর্য। একটি অনাঘ্রাত কুসুম। একটি সর্বতো-মুখী শ্ৰী।’
‘চোখে কাব্যের অঞ্জন লাগিয়ে দেখতে হবে না। চেয়ে দ্যাখ চর্মচক্ষে। কী দেখছিস?’
‘একটি উদ্ভিন্নযৌবনা নারী। লাবণ্য-ঊর্মিলা স্রোতস্বতী।’
‘শুধু তাই?’
‘স্বাস্থ্য সারল্য আর পবিত্রতার সমাবেশ। অস্পৃষ্ট, অনুপভুক্ত। বিরজ-বিশুদ্ধ বিশদ-বিশোক।’
‘কে হয় বল দেখি তোর?’
‘স্ত্রী হয় । যার সম্বন্ধে কোনো নিষেধ নেই, নিবারণ নেই। বরং যার পক্ষে শাস্ত্র, যার পক্ষে সংসারসৃষ্টি।’
‘সেই স্ত্রী আজ তোর নিভৃত শয্যায় এসে শুয়েছে। যে বেষ্টন করে দীপ্তি পায় সে-ই স্ত্রী। যাতে নতুন করে নিজেকে জন্মগ্রহণ করানো যায় সেই জায়া। চেয়ে দ্যাখ। সদ্য-প্রাণকরা স্ত্রী। এ সম্পূর্ণ তোর। তোর আয়ত্তের মধ্যে।’
দেখছি। অনিন্দ্যকান্তি। অপরূপ-সুন্দর।
‘হ্যাঁ, একেই বলে স্ত্রী-শরীর।’ রামকৃষ্ণ মনের কাছে আরো উন্মুক্ত হল। বললে, ‘লোকে বলে এর চেয়ে ভোগ্য এর চেয়ে উপাদেয় কিছু আর নেই পৃথিবীতে। কি, গ্রহণ করবি?’
‘কিন্তু’ উন্মনা মন বিমনা হয়ে রইল।
‘হ্যাঁ, তবে ঐ দেহেই যদি আবদ্ধ হয়ে থাকিস তবে আর সচ্চিদানন্দঘন ঈশ্বরকে পাবি না। দ্যাখ বিবেচনা করে। নারী চাস না নারায়ণী চাস?’
মন খুঁতখুঁত করে। তৃষ্ণার কুয়াশা সঞ্চিত হতে-না-হতেই জেগে ওঠে বৈরাগ্যের ত্বিষাস্পতি। বললে, ‘কিন্তু কাম ভোগ করে কি কামের নিবৃত্তি হবে?’
‘তা হবে না। সেই জানিস না যযাতি কী বলেছিল? পুত্রের যৌবন চেয়ে নিয়েও তার কামের উপশম হল না। ন জাতু কামঃ কামানামুপভোগেন শাম্যতি। যতই আহুতি ততই আকূতি।’
‘আর ঈশ্বরানন্দ?’
ঈশ্বরানন্দ! এখানেও যত পান তত পিপাসা। তফাৎ এই, ওখানে ক্ষয়, গ্লানি, ক্লান্তি, খেদ, আর এখানে নিরংশ, নিরন্তর, নিরতিশয় আনন্দ। সেই যা বলেছিস বিরজ-বিশোক, বিশদ-বিশুদ্ধ–
‘আমি ঈশ্বরানন্দ চাই।’ মন মুখ ফেরাল।
‘দেখিস, ভাবের ঘরে চুরি করিস নে। পেটেমুখে এক হ। মুখে বাহাদুরি মারবি আর পেটে খিদে থাকবে তা হতে পারবে না। যদি চাস সোজাসুজি টেনে নে স্বচ্ছন্দে। তোর হাতের নাগালের মধ্যেই তো আছে। আছে তোর অধিকারের গণ্ডিতে। লুকোচুরির দরকার নেই।’
মন উসখুস করে উঠল। সারদার অঙ্গ স্পর্শ করবার জন্যে হাত বাড়াল রামকৃষ্ণ। সেই উদ্যতিতেই মন বেঁকে বসল। ধীরে-ধীরে কোথায় ডুব দিল অতলে। লীন হয়ে গেল আত্মস্বররূপে। দেহমনোহীন অনাদ্যন্ত সচ্চিদানন্দে।
যে হৃদয়োৎসবরূপা সমানমনোরমা, সে কি এতই অল্প, এতই লঘু, এতই সহজ-লভ্য? তাকে আমি কী মূল্য দিলাম, তার পরীক্ষা হবে কিসে? তাকে আমি কোথায় এনে প্রতিষ্ঠিত করলাম—তাতে। তার মূল্যেই আমি মূল্যবান। তার মহত্ত্বেই আমি মহনীয়।
ধড়মড় করে উঠে বসল সারদা। কে যেন তাকে তুলে দিলে জোর করে।
এ কি! তিনি এখনো শোননি? বিছানার উপরে ঠায় বসে আছেন? বসে আছেন নিশ্চল, নিঃসংজ্ঞ হয়ে। রাত এখন কটা হল না-জানি। কতক্ষণ এমনি বসে থাকবেন! ভোর হতে বাকি কত? এমন ভাবারূঢ় কূটস্থ মূর্তি আর দেখেনি সারদা। তার ভয় করতে লাগল। জ্যোতিঃপুঞ্জময় দিব্যমূর্তি স্পর্শ করতে তার সাহস হয় না। কিন্তু কি করে এই ভাব ভাঙাবে রামকৃষ্ণের? কি করে নিয়ে আসবে তাকে তার স্বচ্ছ স্বাভাবিকতায়? এমনি বসে থেকে-থেকেই চলে যাবেন নাকি শেষকালে?
ব্যস্ত হয়ে ঘরের বার হল সারদা। ঝি কালীর মাকে কাছেই পাওয়া গেল। আকুল হয়ে বললে, ‘শিগগির ভাগ্নেকে ডেকে আনো। উনি যেন কেমন হয়ে গিয়েছেন। ‘কালীর মা গিয়ে ডাকাডাকি করে তুললে হৃদয়কে।
কেমন আর হবেন! ভাবের ঘরে বাস করেন, ভাবের ঘোরে ভব হয়ে গিয়েছেন। নিজে ভবানী হয়ে এত ভাবিনী হবার কি দরকার!
হৃদয় গিয়ে রামকৃষ্ণকে নাম শোনাতে বসল।
যে নামে টান, সেই নামে জ্ঞান। আবার সেই নামেই পরিত্রাণ।
‘আমার প্রাণ-পিঞ্জরের পাখি, গাও না রে,
ব্রহ্মকল্পতরুশাখে বসে রে পাখি, বিভুগুণগান গাও দেখি,
ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ সুপক্ব ফল খাও না রে।’
কাশীপুরের মহিমাচরণ চক্রবর্তী ঠাকুরের ভক্ত। কিন্তু পাণ্ডিত্যাভিমানই সব পণ্ড করেছে। ভক্তির চেয়ে শাস্ত্রের প্রতি বেশি পক্ষপাত। খুব পড়াশোনা করেছে এমনি একটা ভাব দেখাতে সদা ব্যস্ত। ইংরিজি আর সংস্কৃত বুকনি সর্বদা তার মুখে ফুটছে। শব্দাড়ম্বরের প্রতি তার মুগ্ধ দৃষ্টি। সে এক ইস্কুল করেছে, তার নাম প্রাচ্য-আর্য-শিক্ষা-কাণ্ড-পরিষৎ। তার ছেলের নাম রেখেছে মৃগাঙ্কমৌলি পতিতুণ্ডি। হরিণের নাম রেখেছে কপিঞ্জল। আর তার গুরুর নাম আগমাচার্য ডমরুবল্লভ।
দক্ষিণেশ্বরের ঠাকুরের ঘরে আসতে ঠাকুর বলে উঠলেন, ‘এ কি! এখানে জাহাজ এসে উপস্থিত! এখানে ছোটখাটো ডিঙি-টিঙি আসতে পারে। এ যে একেবারে জাহাজ!
এ শুধু তার পণ্ডিতম্মন্যতার প্রতি কটাক্ষ। সকলে হেসে উঠলেও মহিমাচরণ হয়তো খুশিই হল। সে নৌকো নয়, সে জাহাজ!
এ জাহাজকে সহজ করে দিতে চাইলেন ঠাকুর। বললেন, নাম করো। নাম করলে অহঙ্কার দূরে যাবে। পাণ্ডিত্যের বাইরে সুধাভাণ্ডটিকে দেখতে পাবে তখন।
গেরুয়া আর রুদ্রাক্ষ পরে একেক দিন চলে আসে মহিমাচরণ। বাঘের ছাল পেতে বসে পঞ্চবটীতে। রুদ্রাক্ষের মালা ফিরিয়ে জপ করে। কখনো একটা তানপুরা নিয়ে গান গায়। যেন কত বড় একজন তন্ময় সাধক!
বাড়ি যাবার আগে বাঘের ছালটি ঠাকুরের ঘরের দেয়ালে টাঙিয়ে রাখে।
‘এ কেন রাখে জানিস? দেখলেই লোকে জিজ্ঞেস করবে এ বাঘের ছাল আবার কার! তখন আমি বলব, মহিমাচরণের, আর তাতেই ওর মান বাড়বে!
কেবল নিজের নাম, নিজের মান। ওরে, তাঁর নাম কর। তাঁর মান রাখ।
তাঁর নামেই বন্ধনমোচন হবে। বটের বীজ দেখেছিস? লাল শাকের বীজের চেয়েও ছোট। তা, ভগবানের নামের বীজ কতটুকু? হয় একটি অক্ষর নয় দুটি অক্ষর। তা থেকেই কালে ভাব, ভক্তি, প্রেম কত কি!
সেই নামের মন্ত্রই দিলেন মহিমাচরণকে। সহজ হবার সহজ নিয়ম। মুক্ত হবার সরল সুক্ত।
‘শুধু এগিয়ে পড়ো। আরো এগোও। পাবে চন্দন কাঠ, কিন্তু ওখানে থামলে চলবে না, আরো এগোও। পাবে রূপোর খনি, থামলে চলবে না, আরো এগোও। তার পরে, সোনার খনি, পাবে হীরে-মানিকের খনি—তবু থামা নেই। এগিয়ে পড়ো। এহ বাহ্য, আগে কহ আর—’
মহিমাচরণ কাতর স্বরে বললে, ‘আজ্ঞে, টেনে রাখে যে। এগুতে দেয় না।
‘কেন, লাগাম কাটো। ঘোড়া ছুটিয়ে দাও ।’
‘কি ভাবে কাটব?’
‘শুধু তাঁর নামের গুণে কাটো। কালীর নামে যে কালপাশ কাটে।
আর কিছু নয়, শুধু তাঁর নাম করো। একটু স্থির হয়ে বসে তাঁকে স্মরণ করো, আহ্বান করো।
যে নাম-দাতা সেই আবার নাম-শ্রোতা। হৃদয় নাম শোনাতে লাগল ।
ভাবভূমি থেকে সারা রাত আর নামল না রামকৃষ্ণ। নামধ্বনিতে সমাধি ভাঙল শেষকালে। প্রভাতের সীমানায় এসে।
সারদাকে কাছে ডেকে নিল রামকৃষ্ণ।
‘একা-একা ঘরে আমাকে অমনি কাঠ হয়ে বসে থাকতে দেখে তোমার খুব ভয় করছিল, না?’
তা আর বিচিত্র কি! কোথায় শান্তিতে একটু ঘুমুবে, তা নয়, তোমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছি। কিন্তু আসলে ভয় নয়, আসলে আনন্দ!
‘শোনো, আরো অনেক রকম হয়তো ভাব হবে রাত্রে। ভয় পাবে না। কোন ভাবে কোন মন্ত্র শুনিয়ে আমার বাহ্যজ্ঞান আনতে হবে তোমাকে সব শিখিয়ে দিচ্ছি।’
সারদা যেন ভরসা পেল।
কিন্তু জানো, ভাব ছাড়া লাভ নেই। ‘সে যে ভাবের বিষয় ভাব ব্যতীত অভাবে কি ধরতে পারে? হলে ভাবের উদয় লয় সে যেমন লোহাকে চুম্বকে ধরে।
আমি লোহা, তিনি চুম্বক। তিনিই আমাকে ধরেছেন। মর্ত্যশয়ন থেকে নিয়ে যাচ্ছেন সেই অনন্তশয়নে। যেখানে অনন্তনাগের উপরে বিষ্ণু শয়ান।
