Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আদিবাসী লোককথা : ১ম খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    May 1, 2026

    ৫৭ থেকে ৪৭ (স্বাধীনতা সংগ্রামের কল্পিত বিকল্প ইতিহাস)

    May 1, 2026

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 1, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ১ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত এক পাতা গল্প321 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ১.২৫

    ২৫

    তুমি যেমন আমার মা তেমনি আবার তুমি আমার মেয়ে। তুমি যেমন ‘পিতেব পুত্রস্য’ তেমনি আবার তুমি সন্তান। তোমার রসের কি আর শেষ আছে? তুমি যেমন ভক্তিতে আছ প্রেমে আছ তেমনি আছ আবার বাৎসল্যে। শীতল স্নেহরসে।

    তুমি গুরুর চেয়েও গরীয়ান। তুমি বিশ্বচরাচরের পিতা। তুমি গুহাহিতং, গহ্বরেষ্ঠং। আবার তুমি বুকে-জড়ানো ছোট্ট অপোগণ্ড শিশু। অবলা দুধের ছেলে।

    ‘আমি একঘেয়ে কেন হব? আমি পাঁচ রকম করে মাছ খাই। কখনো ঝোলে কখনো ঝালে কখনো অম্বলে কখনো বা ভাজায়।’

    আমার নিত্য-নতুন আস্বাদন। তিনি যে রসের অপার পারাবার। রসো বৈ সঃ।

    ‘তাই রামকে সেবা করবার জন্যে হনুমান সাজি। আবার তাকে স্নেহ করবার জন্যে সাজি কৌশল্যা।

    ভক্তের যেমন ভগবান চাই ভগবানেরও তেমনি ভক্ত ছাড়া চলে না। ভক্ত হন রস, ভগবান হন রসিক। সেই রস পান করেন। তেমনি ভগবান হন পদ্ম, ভক্ত হন অলি। ভক্ত পদ্মের মধু খান। ভগবান নিজের মাধুর্য আস্বাদন করবার জন্যেই দু’টি হয়েছেন। প্রভু আর দাস। মা আর ছেলে। প্রিয় আর প্রিয়া।

    দক্ষিণেশ্বরের কালীমন্দিরে অনেক সব সাধু-সন্নেসীর আনাগোনা বেড়েছে। পেট-বোরেগীর দল নয়, বেশ উঁচু-থাকের লোকজন। হয়তো গঙ্গাসাগরে চলেছে নয়তো পুরী—মাঝখানে ক’টা দিন দক্ষিণেশ্বরে ডেরা করে যাচ্ছে। স্বচক্ষে দেখে যাচ্ছে গদাধরকে। সর্বতীর্থসারকে।

    গদাধর কোথাও নড়ে না। সে স্থির হয়ে বসে আপন-মনে গান গায়,

    ‘আপনাতে আপনি থেকো

    যেয়ো না মন কারু ঘরে।

    যা চাবি তাই বসে পাবি

    খোঁজো নিজ অন্তঃপুরে৷’

    এক দিন এক অদ্ভুত সাধু এসে হাজির। সঙ্গে জল খাবার একটা ঘটি আর একখানা পুঁথি। সেই পুঁথিই তার একমাত্র বিত্ত। রোজ ফুল দিয়ে তাকে পুজো করে, আর সময় নেই অসময় নেই থেকে-থেকে তাই পড়ে একমনে।

    ‘কি আছে তোমার বইয়ে? দেখতে পারি?’ গদাধর এক দিন তাকে চেপে ধরল।

    দেখল সে বই। বইটির প্রত্যেক পৃষ্ঠায় লাল কালিতে বড়-বড় অক্ষরে দু’টি মাত্র শব্দ লেখা, ওঁ রাম! আর কিছু নয়, আর কোনো কথা নয়৷ পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা শুধু ঐ একই পুনরাবৃত্তি।

    ‘কী হবে এক গাদা বই পড়ে? আর, কথাই বা আর আছে কী?’ বললে সেই বাবাজী, ‘ঈশ্বরই সমস্ত বেদ-পুরাণের মূল, আর তাঁতে আর তাঁর নামেতে কোনোই তফাৎ নেই। তাঁর একটি নামেই সমস্ত শাস্ত্র ঘুমিয়ে আছে। কি হবে আর শাস্ত্র ঘেঁটে? ঐ একটি রাম-নামেই প্রাণারাম।’

    এ সাধু বৈষ্ণবদের রামায়েৎ সম্প্রদায়ের লোক। তেমনি আমাদের জটাধারী। গদাধরের তন্ত্রসিদ্ধ হবার পর ১২৭৯ সালে চলে এসেছে ঘুরতে-ঘুরতে। সঙ্গে অষ্টধাতুর তৈরি বালক রামচন্দ্রের বিগ্রহ। আদরের নাম রামলালা।

    আর কিছুই ধ্যানজ্ঞান নেই জটাধারীর। অষ্টপ্রহর তাকে নিয়েই মেতে আছে। যেখানে যাচ্ছে সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছে। এক মুহূর্ত কাছ ছাড়া নেই। যা পায় ভিক্ষে করে তাই রেঁধে-বেড়ে খাওয়ায় রামলালাকে। শুধু নিয়ম রক্ষার নিবেদন নয়। জটাধারী দস্তুরমত দেখে, রামলালা খাচ্ছে, শুধু খাচ্ছে না চেয়ে নিচ্ছে, বায়না করছে। মনে-মনে স্বপ্ন দেখছে না জটাধারী, প্রসারিত চোখের উপরে

    দেখছে প্রত্যক্ষ। তার রামলালা মূর্তি নয়, মানুষ। বালগোপাল।

    আর সারাক্ষণ বসে-বসে তাই দেখছে গদাধর।

    কয়েক দিনেই, কি আশ্চর্য, তারই উপর রামলালার টান পড়ল। জটাধারীর কাছে যতক্ষণ বসে আছে ততক্ষণ রামলালা ঠিকই আছে, আপন মনে খেলাধূলো করছে। কিন্তু যেই গদাধর নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ায় অমনি রামলালা তার পিছু নেয়।

    ‘কি রে, তুই আমার সঙ্গে চলেছিস কোথা?’ ধমকে ওঠে গদাধর, ‘তোর নিজের লোকের কাছে, জটাধারীর কাছে, ফিরে যা।’

    কথা কানেই তোলে না। নাচ শুরু করে রামলালা। কখনো আগে-আগে কখনো পিছে-পিছে নাচতে-নাচতে সঙ্গে চলে।

    মাথার খেয়ালে ধাঁধা দেখছে না কি গদাধর? নইলে জটাধারীর পূজা-করা চিরকেলে ঠাকুর, সে জটাধারীকে ফেলে গদাধরের সঙ্গ নেবে কেন? প্রাণে-মনে কী নিবিড় নিষ্ঠায় জটাধারী তাকে সেবা করছে। সেই জটাধারীর চেয়ে গদাধর তার বেশি আপন হল?

    কিন্তু রামলালা যদি ধাঁধা হয় তবে চোখের সামনে এই গাছ-পালা বাড়ি-ঘর লোক-জন সবই ধাঁধা।

    এই দেখ! দু হাত তুলে কোলে ওঠবার জন্যে আবদার করছে রামলালা।

    উপায় নেই। সত্যি-সত্যি কোলে নিতে হয় গদাধরকে।

    তার পর এক দিন হয়তো চুপচাপ কোলে বসে আছে, হঠাৎ খেয়াল ধরল, এক্ষুনি কোল থেকে নেমে যাবে। ছুটোছটি করবে রোদ্দূরে, নয়তো ফুল তুলবে গিয়ে কাঁটা বনে, নয় তো গঙ্গায় নেমে হুটোপাটি করবে।

    ছেলের সে কি দূরন্তপনা! কিছুতেই বারণ শুনবে না। ওরে যাসনি, রোদ্দুরে পায়ে ফোস্কা পড়বে, হাতে-পায়ে কাঁটা ফুটবে, সর্দি হবে ঠাণ্ডা লেগে। কে কার কথা শোনে! দূরে দাঁড়িয়ে ফিক-ফিক করে হাসে রামলালা, কখনো বা ঠোঁট ফুলিয়ে দিব্যি মুখ ভেঙচায়।

    ‘তবে রে পাজি রোস, আজ তোকে মেরে হাড় গুঁড়ো করে দেব।’ দৌড়ে তার পিছু নেয় গদাধর।

    জলের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে রামলালা।গদাধরও নাছোড়বান্দা। জল থেকে তাকে জোর করে টেনে নিয়ে আসে। এটা-সেটা দিয়ে তাকে ভোলাবার চেষ্টা করে। বলে, ঘরের মধ্যে খেলা কর্, বাইরে কেন? তবুও যদি কথা সে না শোনে, দুষ্টুমি না থামায়, সটান চড়-চাপড় বসিয়ে দের গদাধর।

    সুন্দর ঠোঁট দুটি ফালিয়ে জল-ভরা টলটলে চোখে চেয়ে থাকে রামলালা। তখন আবার গদাধরের কষ্ট। তখন আবার বুকের মধ্যে মোচড় খাওয়া। তখন আবার তাকে কোলে নাও, আদর করো, মিষ্টি-মিষ্টি বুলি শোনাও। ভাবের ঘোরে ছায়াবাজি দেখছে না গদাধর, দেখছে অবিকল রক্তে-মাংসে। তার নিজের ব্যবহারেও সেই অবিকল বাস্তবতা।

    একদিন নাইতে যাচ্ছে গদাধর, রামলালা বায়না ধরল সেও যাবে। বেশ তো চল, দোষ কি। কিন্তু সবাইর নাওয়া শেষ হয়, ওর হয় না। কিছুতেই উঠবে না জল থেকে। যত বলো, কানও পাতে না। শেষকালে চটে গিয়ে গদাধর তাকে জলের মধ্যে চুবিয়ে ধরল। বললে, নে, তোর যত খুশি জল ঘাঁট্। কিন্তু তা আর কতক্ষণ! গদাধর লক্ষ্য করল জলের মধ্যে রামলালা শিউরে উঠছে। তখন তাড়াতাড়ি হাতের চাপ ছেড়ে দিয়ে রামলালাকে বুকে তুলে নিয়ে পাড়ে উঠে এল গদাধর।

    আরেক দিন কি আখখুটেপনা করছে রামলালা। তাকে ভোলাবার জন্যে গদাধর তাকে ক’টি খই খেতে দিল। দেখেনি, খইএর মধ্যে ধান ছিল আটকে। এখন দেখে, খই খেতে ধানের তুষ লেগে রামলালার নরম জিভ চিরে গেছে। কষ্টে বুক ফেটে গেল গদাধরের। রামলালাকে কোলে নিয়ে সে ডাক ছেড়ে কাঁদতে লাগল। যে মুখে লাগবে বলে ননী-সর-ক্ষীরও মা কৌশল্যা অতি সন্তর্পণে তুলে দিতেন, সে-মুখে সে তুলে দিলে কি না ধানশুদ্ধে খই! তার এতটুকুও কাণ্ডজ্ঞান নেই?

    গদাধর আকুল হয়ে কাঁদে। তার কোলে রামলালাকে কেউ দেখতে পায় না, কিন্তু সবাই দেখে তার এই কান্নার আন্তরিকতা। শোনে তার এই কান্নার কাতরিমা।

    যে দেখে যে শোনে তারই চোখে জল আসে।

    রান্না হয়ে গেছে, জটাধারী খুঁজছে রামলালাকে। ওরে খাবি আয়, কোথায় রামলালা! খুঁজতে-খুঁজতে এসে দেখে গদাধরের ঘরে গদাধরের সঙ্গে খেলা করছে।

    অভিমান হল জটাধারীর। বললে, ‘বেশ ছেলে তুমি! আমি সব রেঁধে-বেড়ে রেখে তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি আর তুমি নিশ্চিন্ত হয়ে এখানে বসে খেলা করছ!

    সে-অভিমান বেদনায় গলে পড়ল, ‘জানি না? তোমার ধরনই ঐ রকম। দয়ামায়া বলে কিচ্ছু নেই। বাবা-মাকে ছেড়ে দিব্যি বনে গেলে, বাবা কেঁদে-কেঁদে মরে গেল তবু একবার তাকে দেখা দিলে না! এমনি তুমি পাষাণ! বলে জোর করে ধরে নিয়ে গেল রামলালাকে।

    কিন্তু গা-জোয়ারি করে কত দিন তাকে ঠেকিয়ে রাখবে? ঘুরে-ঘুরেই আবার ফিরে আসে গদাধরের কাছে। দক্ষিণেশ্বর ছেড়ে জটাধারীর আর যাওয়া হয় না-কি করে যায়? রামলালা যে ছাড়তে চায় না গদাধরকে। আর রামলালাকেই বা জটাধারী কি করে ছাড়ে?

    প্রেমাস্পদের চেয়েও প্রেম বড়–শেষ পর্যন্ত বুঝল তাই জটাধারী। সজল চোখে এক দিন তাই দাঁড়াল এসে গদাধরের দোরগোড়ায়৷

    বললে, ‘আমি আজ চলে যাব।’

    ‘যাবে?’ চমকে উঠল গদাধর, ‘তোমার রামলালা?’

    ‘সে এখান থেকে কিছুতেই যাবে না। তাকে তাই তোমার কাছে রেখে যাব।’ ‘রেখে যাবে?’ খুশিতে উছলে উঠল গদাধর,

    ‘হ্যাঁ, তাইতেই ওর আনন্দ। ও আজকে আমাকে আমার মনোমত মূর্তিতে দেখা দিয়েছে, বলেছে এখান থেকে ও নড়বে না এক পা। তাই একা-একা আমিই চলে যাচ্ছি। ও তোমার কাছে কাছে, তোমার সঙ্গে খেলাধূলো করছে এই ভেবেই আমার সুখ। ও সম্মুখে আছে এই ধ্যানই আমার শান্তি। ওর যাতে আনন্দ তাইতে আমারও আনন্দ। তাই তোমার কাছেই রইল আমার রামলালা।

    ‘রামলালাকে দক্ষিণেশ্বরে রেখে রিক্ত হাতে চলে গেল জটাধারী।

    সে এমন প্রেমের সন্ধান পেয়েছে, যে প্রেমে স্বার্থবোধ নেই, তাই বিচ্ছেদও নেই, বেদনাও নেই। যে প্রেমে পরম পূর্ণতা। যে প্রেম সকল ভাবের বড়—মহাভাব। পূজার চেয়ে জপ বড়। জপের চেয়ে ধ্যান বড়। ধ্যানের চেয়ে ভাব বড়। ভাবের চেয়ে মহাভাব বড়। মহাভাবই প্রেম। আর প্রেমও যা ঈশ্বরও তাই।

    একটি ধাতব মূর্তি এই রামলালা। তাই সবাই দেখত চর্ম চোখে। সবারই কাছে সে শুষ্ক প্রতীক, গদাধরের কাছে পূর্ণ প্রাণবান। এর আগে রঘুবীরকে সে প্রভুরূপেই আরাধনা করে এসেছে, জটাধারীই তাকে গোপালমন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে দেখিয়ে দিল তার বালকমূর্তি। যিনি প্রভু যিনি আরাধনীয়, তিনিই আবার শিশু, আদরণীয়। সম্পর্ক শুধু একটা সেতু। সেই সেতু ধরে চলে আসতে হবে এ পার থেকে ও-পারে, প্রতীক থেকে প্রত্যক্ষে, মূর্তি থেকে ব্যাপ্তিতে, বিশ্বময়তায়। যে বাইরের দুর্লভ নিধি তাকে নিয়ে আসতে হবে অন্তরে, অন্তরের অন্দরমহলে—আর যে অন্তরের ধন তাকে দেখতে হবে বাইরে এনে, সর্ব জীবে, সমস্ত বিশ্বসৃষ্টিতে। সম্পর্ক থেকে চলে আসতে হবে বিরাট বন্ধন-হীনতায় ৷

    ‘মধুর ভাবসাধনের এই তো আসল তাৎপর্য।’ বললে ভৈরবী।

    ‘যো রাম দশরথকি বেটা, ওহি রাম ঘট-ঘটমে লেটা। ওহি রাম জগৎ পশেরা, ওহি রাম সবসে নেয়ারা।’

    রাম শুধু দশরথের ছেলে নয়, সে সমস্ত জীবদেহে প্রকাশিত। আবার অমনি প্রকাশিত হয়েও জগতের সব কিছুর থেকে সে পৃথক, মায়াহীন, নির্গুণ৷

    ঈশ্বর সর্বব্যাপী, সর্বানুভূ। তিনি যেমন ঘটে তেমনি আকাশে। স্থানে কোথাও তাঁর বিচ্ছেদ নেই, কালে কোথাও তাঁর বিরাম নেই, পাত্রে কোথাও তাঁর বিভেদ নেই। তবু আবার তিনি স্থান-কাল-পাত্রের অতীত।

    তাঁর অসীম ক্ষমতা, অনন্ত ঐশ্বর্য, অসামান্য প্রতাপ। কিন্তু আমাদের কাছে তাঁর সত্য পরিচয় কোথায়? তিনি সুন্দর, তিনি সরস, তিনি মধুর। তিনি আনন্দ-আকর।

    ২৬

    বাৎসল্য রসের সাধনায় বসে গদাধরের অনুভব হল সে স্ত্রীলোক হয়ে গিয়েছে। সমস্ত স্ত্রীলোকে সে যে মা দেখছে সেই এখন সে-মা। মা কৌশল্যা। অন্তরে বিগলিত স্নেহ, অঙ্গে করুণার্দ্র কোমলতা।

    স্নিগ্ধ থেকে চলে এল সে মধুরে। ধরল সে নারীর আরেক রূপ। সম্পর্কের আরেক সেতু। সাধনের আরেক সোপান। সে এখন প্রিয়া, প্রেমিকা, প্রেমোৎসুকা। সে এখন কৃষ্ণকামিনী গোপাঙ্গনা।

    কে বলবে সে মেয়ে নয়! রেশ-বাস সব কিনে দিয়েছেন মথুরবাবু। শাড়ি-ঘাগরা ওড়না-কাঁচুলি থেকে শুরু করে মাথার পরচুলা পর্যন্ত। গায়ে এক সেট সোনার ‘গয়না, পায়ে রূপোর নুপূর। শুধু তাই? চলনে-বলনে চেষ্টায় কটাক্ষে ভঙ্গে-রঙ্গে সে একেবারে হুবহু মেয়ে। সে সখী, সে দাসী, সে সেবিকা।

    দুর্গা পূজার সময় জানবাজারে এসেছে গদাধর মথুরবাবুদের বাড়িতে। গদাধরের আনন্দের অন্ত নেই। সে মা’র দাসী সেজেছে। শুধু মনে-মনে নয়, বেশে বাসে ইঙ্গিতে-ভঙ্গিতে। অন্তরের এক জন হয়ে মিশে গিয়েছে অন্তঃ-পুরিকাদের সঙ্গে।

    কিন্তু সন্ধ্যায় যখন মা’র আরতি হবে তখন গদাধর কোথায়? মথুরবাবুর স্ত্রী, জগদম্বা, খুঁজতে এসে দেখেন গদাধর সমাধিস্থ হয়ে বসে আছে। সখীরূপে সমাধিস্থ। তাকে ঐ অবস্থায় ফেলে কি করে যান তিনি আরতি দেখতে? ভাবে বিহ্বল হয়ে কোথাও পড়ে-টড়ে যান কি না ঠিক নেই। কিছু কাল আগেই এ বাড়িতে অমনি টলে পড়ে গিয়েছিলেন। আর কোথাও নয়, একেবারে গুলের আগুনের মধ্যে। কী করবেন তা হলে?

    হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি এল জগদম্বার। জগদম্বা তার দামী-দামী গয়না-গাঁটি নিয়ে এলেন। একের পর এক পরিয়ে দিতে লাগলেন গদাধরকে। কানের কাছে মুখ এনে বলতে লাগলেন, ‘মা’র এখন আরতি হবে। চলো, মাকে চামর করবে না?’ মা’র নামে ধ্যান ভাঙল গদাধরের। দ্রুত পায়ে চলল সে ঠাকুর দালানের দিকে। সেও পৌঁচেছে অমনি আরতি আরম্ভ হল। আর-আর মেয়েদের সঙ্গে সেও চামর দোলাতে লাগল।

    দু লাইনে ভাগ হয়ে সবিস্ময়ে আরতি দেখছে সব মেয়ে-পুরুষ। কিন্তু মথুরবাবুর বিস্ময়েরই আর শেষ নেই। তাঁর স্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে চামর করছে আরেক জন যে স্ত্রীলোক, সে কে? কার স্ত্রী? এত আশ্চর্য সাজ, আশ্চর্য রূপ—সে কোন ঘরের ঘরণী? তাঁর স্ত্রীর বন্ধুদের মধ্যে এত সুন্দরী কেউ আছে না কি?

    আরতির শেষে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন মথুরবাবু ‘তোমার পাশে দাঁড়িয়ে তখন কে চামর করছিল? বাড়ি কোথায়? কার স্ত্রী?’

    ‘ওমা, তুমি চিনতে পারোনি? উনি বাবা, আমাদের ঠাকুর গদাধর।’

    মূক হয়ে গেলেন মথুরবাবু। আশ্চর্য, এত যে কাছের মানুষ, দিন-রাত একসঙ্গে থেকেও তাকে চেনা যায় না!

    হৃদয়কে এক দিন অন্তঃপুরে নিয়ে গেলেন।

    মেয়েদের মধ্যে মেয়ে সেজে বসে আছে গদাধর। মথুরবাবু জিগগেস করলেন, ‘বলো দেখি ওই মেয়েদের মধ্যে তোমার মামা কোনটি?’

    অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকেও চিনতে পারল না হৃদয়।

    ভৈরবী বললে, ‘আমি চিনিয়ে দিতে পারি। যে রাধারানির মত দেখতে সেই আমাদের গদাধর। গদাধর যখন সকালে ফুল তুলত দক্ষিণেশ্বরে, কত দিন ওকে আমার রাধারানি বলে ভুল হয়েছে।’

    গোপিনীদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী কাত্যায়নী। গোপিনীরা তারই পুজো করে আর কৃষ্ণ-বর ভিক্ষে চায়। গদাধরও তাই ভবতারিণীর কাছে গিয়েই সর্বাগ্রে প্রার্থনা করল। মা গো, তোর শক্তিবলে সেই মধুরকে এনে দে। তুই শ্যামা, তুই-ই আবার শ্যাম হ।

    কিন্তু সেই মধুরের যে সর্বস্বত্বাধিকারিণী, সেই মহাভাবভাবিনী রাধারানিকে তুষ্ট না করলে চলবে কেন? রাধারানির কৃপা না হলে হবে না কৃষ্ণদর্শন। রাধারানির জন্যে ধ্যানে বসল গদাধর। নিত্য স্মরণ-মনন করতে লাগল সেই অকাম-প্রেমমমূর্তির। আকুল আবেগে অবিরাম বলতে লাগল তাকে, আমাকে দেখা দাও। আমি তোমারই সখী, তোমারই সঙ্গিনী। আমাকে বঞ্চনা কোরো না। অদর্শনের বিরহ যে কি তা তো তুমি জানো-

    রাধারানি দেখা দিল। নাগকেশরের মত গায়ের রং। সে এক গৌরগৌরবোজ্জল মূর্তি। সে মূর্তি ধীরে-ধীরে এসে মিলিয়ে গেল গদাধরের শরীরে। গদাধর রাধারানি হয়ে গেল৷

    যা রাধা তাই ধারা। যা ধারা তাই রাধা।

    কেঁদে আকুল হচ্ছে শ্রীমতী। ওলো, আমার কৃষ্ণকে এনে দে। না এনে দিবি তো আমাকে সেখানে নিয়ে চল। দিন গুণতে-গুণতে নখের ছন্দ ক্ষয় হয়ে গেল—আমার সেই কৃষ্ণচন্দ্রের উদয় হল কই? সেই কৃষ্ণ মেঘকে কবে দেখতে পাব? আর দেখবই বা কি দিয়ে? মোটে দু’টি মাত্র তো চোখ—তায় তাতে আবার নিমিখ, তাতে আবার বারিধারা। ওলো নিমিখে নিমিখ নাহি সয়। আমি দেখব কি করে?

    সুচির-বিরহের নায়িকা। নিরুপাধি প্রেম, অথচ অনির্ণেয় বিরহ। এত যেখানে যন্ত্রণা, সেখানে তাকে ভুলে থাকলেই তো হয়! হায় হায়, তাকে ভুলব কি করে? যখন জল-আহরণে যাই, তখন যমুনা দেখি। যদি গৃহে থাকি, দূরে দেখি সেই গিরি-গোবর্ধন। যদি বনে যাই দেখি সেই কুঞ্জকুটির। শুনি সেই বেণুধ্বনি। তাকে ভুলব কি করে? তাকে বাইরে পাই না বলে অন্তরে অনুসন্ধান করি। সেইখানেই তাকে দেখি, শুনি, ছুঁই, আঘ্রাণ করি। সেই তো আমার মানস-সাক্ষাৎকার। আমার মানস-মহোৎসব। বল সই, যিনি অন্তরের অন্তরতম, তাঁর সঙ্গে কি সর্বাংশে বিরহ হতে পারে?

    তবু, কেন, কেন এই বিরহ? যাকে অন্তরে পাই তাকে বাইরে পাব না কেন? যে নিরাধার সে কেন হবে না আধারভূত? কেন দাঁড়াবে না এসে চোখের সামনে?

    ওলো, শুনেছিস, তাকে গভীর-নিবিড় করে পাব বলেই না কি এই বিরহ। বিরহই হচ্ছে প্রেমরূপা ভাবনা। প্রেমরূপা জীবিকা। মিলনে মন প্রিয়তমে অভিনিবিষ্ট হতে চায় না, সে কেবল এক লীলা ছেড়ে আরেক লীলার সন্ধান করে, এক বিলাস ছেড়ে আরেক বিলাস। কিন্তু বিরহে সমস্ত সৃষ্টিই যে তদ্‌গত-সমাহিত। মিলনে সে সংক্ষিপ্ত, বিরহে পরিব্যাপ্ত। মিলনে আমি একা, বিরহে ত্রিভুবন আমার সহচর। তাই তো কৃষ্ণ বললেন গোপিনীদের, আমাকে কাছে পেয়ে যত স্বাদ তার চেয়ে বেশি স্বাদ আমাকে ধ্যান ক’রে। মধুধারার মতই এই ধ্যানধারা।

    প্রেমের মত আছে কি! এই বিশ্বসংসার ভগবানের অধীন, কিন্তু ভগবান প্রেমের অধীন। সর্বস্বাধীন ভগবান প্রেমের কামনায় ভক্তের দুয়ারে এসে হাত পাতেন৷ তিনি তো আপ্তকাম, তাঁর কি কিছু অভাব আছে? তবে তিনি ভক্তের কাছে প্রেম ভিক্ষা চান কেন? চান, এ তাঁর অভাব বলে নয়, এ তাঁর স্বভাব বলে।

    প্রেমই পুরুষার্থ। বাইরে বিষজ্বালা, ভিতরে অমৃতময়। শীতও আছে আবার আচ্ছাদনও আছে। আচ্ছাদন আছে বলে শীত সুখকর, আবার শীত আছে বলে আচ্ছাদন আরামপ্রদ। তেমনি মিলনের আকাঙ্ক্ষায় বিরহ আনন্দময়, আবার বিরহের উৎকণ্ঠায় মিলনও আনন্দময়। তবু মিলনের চেয়ে বিরহ অধিকতর। মিলনে শুধু সঙ্গ, বিরহে যেমন স্মৃতি তেমনি আবার আশা। প্রথমে যদি বা

    দুঃখ, পরিপাকে আনন্দ। আর সেই আনন্দই পরাকাষ্ঠা।

    গদাধর এখন সেই আনন্দময়ী বিরহিণী।

    প্রেমের যে এই আনন্দ, এ কি ভক্তের নিজের আস্বাদের জন্যে?

    না গো না, এ ভগবানের আস্বাদের জন্যে। এ রস তত মিঠা যত এর জ্বাল বেশি। এতে যত আর্তি তত আপ্তি।

    চার রকম প্রেম। এক দিক থেকে ভালোবাসা, তার নাম একাঙ্গী। তার মানে এক পক্ষ চায়, অন্য পক্ষ গ্রাহ্যও করে না। যেমন হাঁস আর জল। হাঁস জলকে ভালোবাসে, জল হাঁসকে চায় না। আরেক রকম প্রেম আছে, তার নাম সাধারণী, যেখানে শুধু নিজের সুখ চায়। তুমি সুখী হও বা না হও, বয়ে গেল। এখানে নায়িকা শুধু আত্মসুখের জন্যে নায়ককে প্রিয়জ্ঞান করে। যেমন চন্দ্রাবলী। তৃতীয় হচ্ছে সমঞ্জসা। সমান সমান। আমারও সুখ হোক তোমারও সুখ হোক। নায়কের সুখ চাই বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে নিজের সুখের দিকে সমান লক্ষ্য। সর্বশেষ, বা সর্ব-উচ্চ প্রেমের নাম সমর্থা। আত্মসুখ চাই না, শুধু তোমার সুখ হোক আমার যাই হোক না-হোক, তুমি সুখে থাকো। এই হচ্ছে শ্রীমতীর ভাব। শ্রীমতীর তাই সমর্থা রতি। শুধু কৃষ্ণ সুখে সুখী। কৃষ্ণৈ কনিষ্ঠা। কৃষ্ণময়ী বলেই তো সে শ্রীমতী। মূর্তিময়ী মাধুরী।

    তোমাকে সব দেব। কুল আর শীল, ধৈর্য আর লজ্জা, দেহ আর আত্মা, ইহকাল আর পরকাল। কিছু চাই না বিনিময়ে। আমার প্রেম ধর্মাধর্মের অতীত। ধর্মের অতীত, কেননা তোমার সঙ্গে আমার বিবাহ নেই। অধর্মেরও অতীত, কেননা আমি তোমারই স্বরুপশক্তি। তাই, ‘যে ধন তোমারে দিব সেই ধন তুমি।’ আমি ছাড়া তুমি নেই। আবার তুমি ছাড়াও আমি নেই। আর সকল সম্বন্ধে একে-একে দুই, শুধু প্রেমেই দুইয়ে মিলে এক।

    কে বলবে গদাধর রাধিকা নয়? রূপ যেন ফেটে পড়ছে। শুধু বেশবাসে বা হাবভাবে নয়, মহাভাবে। রাধিকার মতই সে জয়শ্রীমূর্তিধারিণী। তার দেহ যেন অমৃতবর্তিকা। কিন্তু যতই কেননা রূপ দেখছ, সব সেই কৃষ্ণের প্রতিচ্ছায়া। ‘তোমার গরবে গরবিণী আমি, রূপসী তোমার রূপে।’

    মনই শরীরকে তৈরি করে। মনে যেমন ভাব মুখে তেমনি আভা। হনুমানের ভাবে থেকে ল্যাজের সূচনা হয়েছিল গদাধরের। এখন স্ত্রী-ভাবে থেকে তার রোমকূপ থেকে নিয়মিত সময়ে রক্তক্ষরণ হতে লাগল।

    পদ্মলোচন প্রসিদ্ধ পণ্ডিত। বললেন, ‘এ সব উপলব্ধি বেদ-পুরাণকে ছাড়িয়ে গেছে।’

    সে কেন মেয়ে হয়ে জন্মাল না, প্রথম কৈশোরে মনে-মনে আক্ষেপ করেছে গদাধর। মেয়ে হলে গোপিনীদের মত দিব্যি ভজনা করতে পারত কৃষ্ণকে। এক দিন তাকে পেয়েও যেত শেষ পর্যন্ত। এই পুরুষ জন্মটাই তার সে সাধনার বাধা। যদি আরেক বার জন্ম নিতে হয়, সে ঠিক মেয়ে হয়ে জন্মাবে। ব্রাহ্মণের ঘরের সুন্দরী বালবিধবা হয়ে। কৃষ্ণ ছাড়া আর কাউকে পতি বলে জানবে না। ছোট্ট একটি কুঁড়ে ঘরে সে থাকবে আর থাকবে তার দূর সম্পর্কের বুড়ো পিসি বা মাসি। ঘরের পাশে সামান্য একটু জমি, তাতে শাক-সব্জি ফলাবে। দিন গুজরাবে চরকা কেটে। গোয়ালে থাকবে একটি গরু, দুধ দুইবে নিজের হাতে। সেই দুধে ক্ষীর-সর করে গলা ছেড়ে কাঁদতে বসবে। ওরে আমার কৃষ্ণ, খাবি আয়। তোকে নিজের হাতে খাওয়াব বলে এ সব করেছি আমি, বসে আছি কখন থেকে। এত সেবা এত কান্না–সে কি নিষ্ফল হতে পারে? কৃষ্ণ গোপবালকের বেশে এসে দেখা দেবে, তার হাতের থেকে খেয়ে যাবে চুপি-চুপি। এমনি এক-আধ দিন নয়, প্রত্যহ।

    কিশোর কালের সে ইচ্ছা পূর্ণ হয়নি বটে, কিন্তু এখন, সাধনার আরো উচ্চ ভূমিতে এসে গদাধরের শ্রীকৃষ্ণ দর্শন হল। আর, ভগবানের ভাবই হচ্ছে এই মধুর ভাব। এই ঘনানন্দময় মধুর ভাবেই তাঁর মতি, রতি, অবস্থিতি। এই মধুর ভাবের সাধনায় শেষ শিখরে এসে গদাধর দেখলে, ঘাস থেকে আকাশ পর্যন্ত সমস্ত কৃষ্ণ। এমন কি, সে নিজেও বাসুদেব। যে রাধা সেই মাধব। কৃষ্ণই দুই অংশে সমান ভাবে বিভক্ত হয়েছেন—প্রিয় আর প্রিয়া, ভগবত্তা আর ভক্তি।

    মাটির থেকে একটা ঘাসফুল ছিঁড়লেন ঠাকুর।

    বললেন ভক্তদের, ‘তখন যে কৃষ্ণমূর্তি দেখতাম, এই রকম তার গায়ের রঙ।

    সামান্য ঘাসফুলেও তাঁর লাবণ্যলিখন।

    ভাগবত পাঠ শুনেছে গদাধর। হঠাৎ জ্যোতিময়মূর্তি শ্রীকৃষ্ণকে দেখল সামনে। দেখল তাঁর পা থেকে জ্যোতির একটা ছটা বেরিয়ে এসে প্রথমে ভাগবত স্পর্শ করলে, পরে এসে লাগল তার নিজের বুকে। এর তাৎপর্য কি? বুঝতে দেরি হল না। ভাগবত, ভক্ত আর ভগবান এক। একেই তিন, তিনেই এক৷

    ২৭

    ও কে স্নান করছে রে গঙ্গায়? কালী-মন্দিরে পূর্বমুখ হয়ে ধ্যান করছে গদাধর, তার মনশ্চক্ষে এক সন্ন্যাসীর মূর্তি ভেসে উঠল। নাগা সন্ন্যাসী। কটিতে একটা কৌপীন পর্যন্ত নেই। মাথায় দীর্ঘ জটা, তেজঃপুঞ্জ কলেবর। গঙ্গায় নেমে স্নান করছে।

    ধ্যানে এ সে কী দেখল? গদাধর চলল ঘাটের দিকে।

    ঠিকই দেখেছে। দীর্ঘকায় জটাজুটধারী উলঙ্গ এক সন্ন্যাসী তার সামনে এসে দাঁড়াল। দহনোত্তীর্ণ স্বর্ণের মতো উজ্জ্বল।

    ‘আরে, এই তো পাওয়া গেছে যোগ্য লোক।’ গদাধরকে দেখে উৎফুল্ল হয়ে উঠল সন্ন্যাসী। বললে, ‘সাধন-ভজন কিছু করবে?’

    গদাধর তো অবাক। কিসের সাধন-ভজন?

    ‘ভাবাতীত অরূপের সাধন। বেদান্তসাধন। যাকে বলে ব্রহ্মবিদ্যা লাভ। করবে?’

    ‘তার আমি কী জানি!’

    ‘তুমি কী জানো মানে? তবে কে জানে?’

    ‘আমার মা জানে।’

    ‘কে তোমার মা?’

    মন্দিরের দিকে ইঙ্গিত করল গদাধর। বললে, ‘ঐ পাষাণময়ীই আমার মা।

    ‘বিদ্রূপের সুক্ষ একটু হাসি খেলে গেল সন্ন্যাসীর মুখে। ও তো একটা মূর্তি, একটা পুত্তলিকা। ও আবার মা হয় কি করে? ঈশ্বর এক, সত্য। দেবদেবী সব ভ্রম।

    মুখের উপর কিছু বললে না স্পষ্ট করে। বললে, ‘বেশ, যাও, তোমার মাকে জিজ্ঞেস করে এস। শোনো, বেশি যেন দেরি করে ফেলো না। বড় জোর তিন দিন এখানে থাকব। তিন দিনের বেশি থাকি না কোথাও এক দণ্ড। এরই মধ্যে দীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।’

    গদাধর কতক্ষণ তাকিয়ে রইল সন্ন্যাসীর দিকে। বললে, ‘আচ্ছা, আপনি কি তোতাপুরী?’

    ‘কি আশ্চর্য! তুমি আমার নাম জানলে কি করে?’

    হ্যাঁ, আমি তোতাপুরী। পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় আমার মঠ ছিল। চল্লিশ বছর ধরে সাধনা করেছি। নর্মদাতীরে দুশ্চর তপস্যায় নির্বিকল্প সমাধি হয়েছে আমার। হয়েছে ব্রহ্ম সাক্ষাৎ। ব্রহ্মজ্ঞ হবার পর তীর্থ ভ্রমণে বেরিয়েছি। গঙ্গাসাগর আর শ্রীক্ষেত্র দর্শন করে আমি এসেছি দক্ষিণেশ্বরে। মাত্র তিন দিনের জন্যে। আমি শক্তি-ভক্তি মানি না। আমি আছি বিশুষ্ক জ্ঞানের কাণ্ডে। আমি বেদান্তবাদী। আমার নিরাকার ব্রহ্মসাধনা ।

    গদাধর চলে এল ভবতারিণীর দুয়ারে। বললে, ‘মা, তোতাপুরী বলছে নিরাকার সাধনা করতে। করব?’

    ‘করবে বৈ কি।’ আদেশ হল মা’র। ‘তোমাকে শেখাবার জন্যেই সে এসেছে।’ কিন্তু বামনির বড় আপত্তি। সে বলে, ওই ন্যাংটার কাছে তুমি ঘেঁষো না। ও তোমার সমস্ত ভাব-টাব নষ্ট করে দিয়ে শুকনো দড়ি বানিয়ে ছাড়বে।

    বানাক না। ভাবরাজ্যের চরম ভূমিতে এসেছি। এবার ভাবাতীত অদ্বৈতভূমিটা বেড়িয়ে আসি একবার।

    মেয়েরা তত দিনই পুতুল খেলে, যত দিন তাদের বিয়ে না হয়। বিয়ে হয়ে যখন স্বামী পায় তখন পুতুলগুলি প্যাঁটরায় পুঁটলি বেধে তুলে রাখে। তেমনি ঈশ্বর লাভ হলে আর প্রতিমার দরকার হয় না।

    সাকার-নিরাকার দুই-ই লাগে। কেউ সাকার থেকে নিরাকারে আসে। কেউ নিরাকার থেকে সাকারে। রসুনচৌকিতে দুই-ই লাগে। পোঁও লাগে, সানাইও লাগে। পোঁ-এর শুধু এক সুর-সে যেন নিরাকার। আর সানাইয়ে বাজছে কত রাগ-রাগিণী। ঈশ্বরকে নানা ভাবে সম্ভোগ।

    তা ছাড়া, মা’র আদেশ হয়েছে। গদাধর সটান চলে এল তোতার কাছে। বললে, ‘হ্যাঁ, মা মত দিয়েছে। দীক্ষা নেব। আমাকে চেলা করুন আপনার।’

    ‘গুরু মিলে লাখ তো চেলা মিলে এক।’ উল্লসিত হয়ে উঠল তোতা। বললে, ‘প্রথমে শিখা-সূত্র ত্যাগ করে যথাশাস্ত্র সন্ন্যাস নিতে হবে তোমাকে।’

    ‘নেব। কিন্তু গোপনে।

    ‘গোপনে কেন?’

    ‘বছর খানেক হল আমার মা এখানে এসে রয়েছেন। এ মা আমার গর্ভধারিণী মা। সব সংস্কার বিসর্জন দিয়ে যদি পাকাপাকি ভাবে সন্ন্যাস নিই, আর মা যদি জানতে পারেন তবে বড় আঘাত পাবেন।’

    এ হচ্ছে বারশো একাত্তর সালের কথা। বছর খানেক আগে থেকেই এখানে আছেন চন্দ্রমণি। যে সংসারে গদাধর নেই সে সংসার তাঁর কাছে অসার। তাই তিনি বাকি জীবন গদাধরের কাছেই কাটিয়ে দিতে চান গঙ্গাতীরে। আছেন নহবৎখানায়। গদাধরকে দেখতে পাচ্ছেন চোখের উপর-এর বেশি আর কিছু তাঁর চাইবার নেই ।

    মথুরবাবু এমনিতে খুব ‘হাত-টান, অথচ গদাধরের বেলায়, কেন কে জানে, তাঁর উদারতার অন্ত নেই। সে উদারতা চন্দ্রমণির দুয়ার পর্যন্ত এগিয়ে এল। একদিন মথুরবাবু বললেন, ‘আচ্ছা ঠাকুমা, তুমি তো কোনো সেবা নিলে না আমার থেকে? ‘

    ‘আমার অভাব কোথায়?’ হাসলেন চন্দ্ৰমণি।

    ‘তবু কিছু নাও না চেয়ে। যা তোমার খুশি।’ ‘কি চাইব? চাইবার আমার কি আছে! খাবার-পরবার এতটুকু কষ্টও তো তুমি রাখোনি।’

    তবু মথুরবাবু পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন। আমার বুঝি কিছু দিতে ইচ্ছে করে না তোমাকে? যা মন চায় একটা কিছু নাও না।

    যার গদাধর আছে তার আবার চাইবার আছে কি? তবু মথুরবাবুর পীড়াপীড়িতে কিছু একটা না চেয়ে থাকতে পারলেন না। বললেন, যদি নেহাৎ দেবেই তবে আমাকে চার পয়সার দোক্তা কিনে দাও।

    এমন নির্লোভ মা না হলে এমন নিষ্কাম ছেলে হয়! সেই মা যদি টের পান ছেলে সমস্ত সংসার-সম্পর্ক ঘুচিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে যাচ্ছে তবে সইবেন কি করে?

    তোতাপুরী বললে, ‘বেশ, গোপনেই দীক্ষা দেব। কেউ জানতে পাবে না।

    সর্বাগ্রে নিজের প্রেত-পিণ্ড দাও। শ্রাদ্ধাদি করে সংযত হয়ে অবস্থান করো। পঞ্চবটীর সাধন-কুটিরে জড়ো করো সব উপচার। শুভ-মুহূর্তের উদয় হলে খবর দেব।

    এল সেই ব্রাহ্ম মুহূর্ত। সপ্ত শিখা মেলে জলে উঠল হোমাগ্নি।

    সম্যক প্রকার ত্যাগের নাম সন্ন্যাস। এ সর্বস্বত্যাগ ঈশ্বরার্থে। কিন্তু কী তোমার আছে যে ত্যাগ করবে? দেহ-মন-ইন্দ্ৰিয় কিছুই তোমার আপনার নয়।

    যার নিজের বলতে কিছু নেই, সে ত্যাগ করবে কী?

    তাই ত্যাগ করবার জন্যে অর্জন দরকার।

    আগে অর্জন কর—অর্জন কর আত্ম-বিভূতি। সকল জগৎকে আত্মবোধে প্রাণময় করে তোলো।

    এই বিশ্বরূপকে নিজের রূপ বলে অনুভব করো। সেই অনন্ত অনভূতির মধ্যে নিজেকে বিসর্জন দাও। এই-ই ত্যাগ, এই-ই সন্ন্যাস।

    যার সেই ঐশ্বর্য নেই বিভূতি নেই, সে ত্যাগ করবে কী? সে তো দীনহীন ভিক্ষুক।

    কী যে প্রার্থনীয় তাই মানুষ জানে না, তাই ধন-জন কাম-যশ চেয়ে বসে। চাওয়া আর পাওয়া দুই-ই ভ্রান্তিবিলাস—কেন না পেলেও অভাব মেটে না।

    কী পেলে যে তার শান্তি হয় তা সে জানে না বলেই ওসবের পিছু নেয়। শুধু খবর পায় না বলেই অলিতে-গলিতে ঘোরে। যদি একবার আনন্দময় ঈশ্বরসত্তার খবর পেত, প্রহ্লাদের মত যদি স্ফটিক-স্তম্ভেও হরি দেখত, তা হলে আর মণি ফেলে কাচ কুড়োত না। মধুর জ্ঞান নেই বলেই গুড় খোঁজে।

    সর্বদেশে সর্বদিকে সর্বাবস্থায় নিয়ত মধু ক্ষরণ হচ্ছে এই উপলব্ধিই ঈশ্বরোপলব্ধি।

    তোতাপুরী মন্ত্র পাঠ করতে লাগল।

    দৃঢ়াসীন হয়ে বোসো। তদ্গত মনে শোনো। সমিদ্ধ হুতাশনে আহুতি দাও। প্রার্থনা করো।

    হে যজ্ঞপতি, হে পরমাত্মন, আমার সমস্ত প্রাণবৃত্তি তোমাকে আহুতি দিচ্ছি, তুমি আমাতে প্রকাশিত হও। তুমি তো নিত্যকালের প্রকাশ, একবার আমার হয়ে প্রকাশ পেয়ে ওঠো। অখণ্ডৈকরস ব্রহ্মবস্তু আমাতে দীপ্যমান করো। বুঝতে দাও তুমিও যা আমিও তা। কোনো দ্বৈত নেই, সর্বত্র এক অখণ্ড চৈতন্য মাত্র বিদ্যমান। জীব আর ঈশ্বর একই অদ্বিতীয় পরম তত্ত্বের দুইটি পৃষ্ঠা। দাও আমাকে সেই একাত্ববোধের চেতনা।

    তার পর শুরু হল বিরজা হোম।

    আমার দেহ যে পঞ্চভূতে তৈরি সে ভূতপঞ্চ শুদ্ধ হোক। শুদ্ধ হোক আমার কোষ-পঞ্চ, অন্নময় প্রাণময় মনোময় বিজ্ঞানময় আনন্দময় কোষ। শুদ্ধ হোক পঞ্চবায়ু—প্রাণ, অপান, সমান, উদান আর ব্যান। পঞ্চেন্দ্রিয়কে আকর্ষণ করে যে পঞ্চবিষয়—শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস আর গন্ধ, তাও শুদ্ধ হোক। শুদ্ধ হোক আমার দেহ আর মন, বাক্য আর কর্ম, শুদ্ধ হোক আমার নিরোধ-সমাধি। হে জ্বালামালী, হে সর্বদেবমুখ বৈশ্বানর, আমার মধ্যে জাগ্রত হও। হে সর্বার্থসাধক, আমার অভীষ্টলাভের পথে যত বাধা আছে সব বিনাশ করো। দাও আমাকে সেই সম্যক প্রজ্ঞা, যাতে গুরুদত্ত জ্ঞান নিরন্তর জাজ্বল্যমান থাকে। আমি স্ত্রী-পুত্র ধন-মান রূপ-যৌবন কিছুই চাই না। আমার সমস্ত পার্থিব বাসনা তোমাতে আহুতি দিয়ে নিঃশেষে ত্যাগ করছি। আমি নিজেই এখন সচ্চিদানন্দময় ব্রহ্ম। যে ভাবে ঈশ্বর সমাহিত আমিও এখন সেই সর্বতো-নিরাবরণ সর্ব-প্রশান্ত পরমানন্দময়, মহদাত্মভাবে নিমগ্ন। হে অর্চিষ্মান, আমি এখন শিখাহীন বিশুদ্ধ জ্যোতি। নিরবয়ব আভা।

    নবজন্মে দীক্ষা হল গদাধরের।

    রূপ থেকে চলে এল অরূপে। অল্প থেকে ভূমায়। পরিমিত থেকে নিরতিশয়ে।

    আকার থেকে অকায়ে।

    শিষ্যকে নতুন কৌপীন আর কাষায় দিল তোতাপুরী। বললে, এবার তোমাকে নতুন নাম দেব।

    ‘আমার নামও বদলে যাবে?’

    শুধু নাম নয়, পদবীও বদলে যাবে। তুমি এখন সম্পূর্ণ নতুন। নতুন দেশে তুমি নতুন জন্মালে।’

    গদাধর তাকিয়ে রইল আবিষ্টের মত।

    ‘হ্যাঁ, এখন থেকে তোমার নাম রামকৃষ্ণ। সন্ন্যাসে যখন দীক্ষা নিলে, অর্থাৎ কি না, যখন শ্রী-তে অধিষ্ঠিত হলে, তুমি শ্রীরামকৃষ্ণ। আর পদবী? আর পদবী? পদবী পরমহংস। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস। পরমহংস কাকে বলে জানো তো?

    ‘জানি।’ আবিষ্টের মতই বললে গদাধর, ‘দুধে-জলে একসঙ্গে থাকলেও যিনি হাঁসের মত জলটি ছেড়ে দুধটি নিতে পারেন। বালিতে-চিনিতে একসঙ্গে থাকলেও যিনি পিঁপড়ের মত চিনিটুকু নিতে পারেন।

    ঠিক বলেছ। তিনিই পরমহংস। খোসাটি ছেড়ে সারটি নাও। খণ্ড ছেড়ে অখণ্ডকে। উপাধি ছেড়ে নিত্যবস্তুকে।

    ‘জানিস, পরমহংস দুই রকম।’ ঠাকুর এক দিন বললেন গিরিশ ঘোষকে, ‘জ্ঞানী পরমহংস আর প্রেমী পরমহংস। যিনি জ্ঞানী পরমহংস, তিনি আপ্তসার- ভাবখানা, একলা আমার হলেই হল। কিন্তু যিনি প্রেমী পরমহংস, তাঁর একলার হলেই সুখ নেই—ঈশ্বরকে পেয়ে তার সংবাদ দিয়ে যেতে চান জনে-জনে। কেউ আম খেয়ে মুখটি পুঁছে ফেলে, কেউ বা আর পাঁচজনকেও দেয়। পাতকো খোঁড়বার সময় যে সব ঝুড়ি-কোদাল আনা হয়, খোঁড়া হয়ে গেলে কেউ সেগুলো ঐ পাতকোতেই ফেলে দেয়, কেউ বা তুলে রেখে দেয় যদি পাড়ার লোকের কারুর দরকারে লাগে। নারদ-শুকদেব ওঁরা পরের জন্যে ঝুড়ি-কোদাল তুলে রেখেছিলেন।

    গিরিশ ঘোষ বললে, ‘আপনিও তেমনি। আপনি তবে আমাকে আশীর্বাদ করুন।

    ‘আমি কে? আমি কেউ নয়। তুমি মাকে বলো, মাকে ডাকো, হয়ে যাবে।

    ‘হয়ে যাবে? কিন্তু আমি যে পাপী, ঘোরতর পাপী।’

    ঠাকুর বিরক্ত হলেন। বললেন, ‘ও কথা মুখেও এনো না। যে নিজেকে সব সময়ে কেবল পাপী-পাপী বলে সে পাপীই হয়ে যায়। বলো, আমি মা’র সন্তান, আমি মাকে ধরেছি—আমার আবার পাপ কী!

    ‘বলছি। কিন্তু আপনি আমার হয়ে একটু বলুন—’

    ‘আমি বলব কি! আমি কে! আমি কেউ নয়। আমি খাই-দাই তাঁর নাম করি। তোমার যদি আন্তরিক হয়—’

    ‘সেই তো কথা। ঐ আন্তরিকটুকুই তো নেই। ঐটুকু যদি দেন–

    ‘আমি কে! নারদ-শুকদেব ওঁরা হতেন, তাহ’লে না-হয়—’

    ‘নারদ-শুকদেবকে পাব কোথায়! আমরা পাচ্ছি শ্রীরামকৃষ্ণকে।

    ঠাকুর হাসতে লাগলেন। বললেন, ‘যো-সো করে একটা কিছু ধরলেই হয়।  আসল হচ্ছে বিশ্বাস, আসল হচ্ছে শরণাগতি।’

    ২৮

    এবার ব্রহ্মযোগযুক্তাত্মা হও। বললেন তোতাপুরী।

    বললেন, নাম আর রূপের সীমার মধ্যে মায়া খণ্ডিত হয়ে আছে, সে সীমা লঙ্ঘন করে চলে এস নিজ লোকে, ব্রহ্মসাধর্মে। তোমার নিজের মধ্যে অবস্থিত যে আত্মতত্ত্ব তাকে আবিষ্কার করো। তোমার সীমিত আমিকে ব্রহ্মানুভূতিতে প্রতিষ্ঠিত করো। স্বসত্তাবোধের লোপ নয়, স্বসত্তাবোধের প্রতিষ্ঠা।

    এই অদ্বৈতবাদ। ‘এই আত্মবোধ জাগানোতেই অদ্বৈতবাদের সার্থকতা। আমি ক্ষুদ্র নই আমি নীচ নই, আমি মহান আমি ভূমা এই উদার উচ্চবোধই আত্মবোধ। আত্মবোধই আনন্দ। আর আনন্দই সৎ।

    আবার বললেন, বোঝো ভালো করে। জীব মাত্রই ঈশ্বরের আভাস। জীব প্রতিবিম্ব, ঈশ্বর বিশ্বস্থানীয়। আসলে জীব আর ব্রহ্ম অভিন্ন। জীব ব্রহ্মের পরিণাম। আবার জীবের পরিণাম ব্রহ্ম। এই জ্ঞানেই আত্মস্বরূপের স্ফূর্তি। এই জ্ঞানই মোক্ষ।

    এখন তুমি চার দিকে ঈশ্বরকে দেখছ, কিন্তু এ সাধনায় তুমি আর চার দিকে তাকাবে না, দিকবিদিকের ভাব ভুলে কেবল এক দিকে, একমাত্র ঈশ্বরের দিকেই তাকাবে। চার দিকে ফিরে-ফিরে চার দিকে ঈশ্বরকে দেখাও তো চঞ্চলতা। কিন্তু এ সাধনায় চিত্ত নিশ্চল হয়ে একাগ্র হয়ে কেবল সেই এক-কেই দেখবে। তখন আর তোমার পৃথকত্ব থাকবে না। ঈশ্বরের ভিতরেই তোমার অস্তিত্ব সম্পূর্ণ হবে। ঈশ্বরে যে শাশ্বতী শান্তি তাই অবস্থিতি করবে তোমাতে৷

    কিন্তু আমাকে কী করতে হবে তাই বলো না। প্রশ্ন করলেন শ্রীরামকৃষ্ণ।

    তোমাকে বসতে হবে এখন নির্বিকল্প সমাধিতে। সেই গুণাতীত নির্বিশেষের তপস্যায়।

    যার চেয়ে দূরবর্তী কিছু নেই, যার চেয়ে নেই কিছুই নিকটবর্তী, যার চেয়ে সুক্ষতর কিছ, নেই, যার চেয়ে নেই কিছুই মহত্তর, আকাশে বৃক্ষের মত যিনি স্তব্ধ ভাবে বিরাজমান, যিনি একদেশ, কাল ও বস্তু এই ত্রিবিধ পরিচ্ছেদশূন্য-অদ্বিতীয়, সেই অসঙ্গ পুরুষের ধ্যান করো। বলো, আমার এই ক্ষীণ প্রাণস্পন্দন তোমার মহান প্রাণের সঙ্গে যোজনা করে দাও, এই ক্ষুদ্র প্রাণ তোমার বিরাট প্রাণে প্রতিষ্ঠিত হোক। তোমার অন্তরের স্বভাবের সঙ্গে আমার অন্তরের পরিচয় করিয়ে দাও। তোমার নামে আমার কাজ নেই, তোমার রূপে আমার কাজ নেই, তোমার স্বভাবটি আমার স্বভাব হোক।

    সমাধিতে বসল রামকৃষ্ণ।

    শরীর আর ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে মনের চরম স্থিরতার নামই সমাধি। যখন ধ্যাতা নিজেকে ভুলে গিয়ে কেবল ধ্যেয় বিদ্যমানতা উপলব্ধি করে তখনই সে সমাহিত। কিন্তু রামকৃষ্ণ চিত্ত একবার স্থির করছে কি, ধ্যানচক্ষে জগদম্বা এসে উদয় হয়েছেন। কিছুতেই নামের বা রূপের গণ্ডি পেরিয়ে বেরিয়ে আসতে পারছে না। যেই মনকে একাগ্র ভূমিতে নিয়ে আসছে অমনি মন রূপময় হয়ে উঠছে। আমি ভোক্তাও নই ভোজ্যও নই, আমি শুধু ভোজন, এই নির্বিতর্ক চেতনায় মন নিশ্চল হচ্ছে না।

    ‘ও আমার হবে না।’চোখ মেলল রামকৃষ্ণ।

    ‘কেঁও হোগা নেহি?’ ধমকে উঠল তোতাপুরী। হতেই হবে। রূপের পদ্ম-সরোবর পেরিয়ে চলে আসতে হবে অরূপের মহাসমুদ্রে।

    এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল তোতা। কুটিরের বাইরে এক টুকরো ভাঙা কাঁচ চোখে পড়ল। তাই কুড়িয়ে এনে রামকৃষ্ণের কপালের উপর, ঠিক ভুরু দুটির মাঝখানে, টিপে ধরল সজোরে। বললে, ‘মনকে ঠিক এই বিন্দুতে গুটিয়ে আনো।

    ‘আবার সংকল্পহীন হবার সংকল্প নিয়ে ধ্যানে বসল রামকৃষ্ণ। আবার জগদম্বা আবির্ভূত হলেন। কিন্তু এবার আর রামকৃষ্ণ অভিভূত হবে না। স্বস্থানে নিয়তাবস্থ থাকবে। যেই জ্ঞান নিরংশ, নিরবিচ্ছিন্ন, সেই জ্ঞানে সমাসীন থাকবে। মূর্তি থেকে চলে আসবে সে ভাবে, আকার থেকে একাকারে। মূর্তি অদৃশ্য হয়ে গেল আস্তে-আস্তে-আর কোথাও কোনো বিকল্প বা বিশেষের লেশ রইল না। নিষ্কল-নির্মল, শান্ত ও সর্বাতীত এক রাজ্যে এসে রামকৃষ্ণ স্তব্ধ হয়ে গেল। এই অদ্বৈত-সাধনার সমাধি।

    তোতা চুপচাপ বসে রইল পাশে। এক মনে দেখতে লাগল শিষ্যকে। বিন্দুমাত্র কম্পন নেই, নিশ্বাসও পড়ছে না বোধ হয়। এক জ্যোতির্ময় মৌনে আবৃত হয়ে আছে। আরূঢ় হয়ে আছে এক জ্যোতির্ময় উপলব্ধিতে।

    দরজায় তালা লাগিয়ে বেরিয়ে এল তোতাপুরী। পঞ্চবটীতে নিজ আসনে নিশ্চল হয়ে বসে অপেক্ষা করতে লাগল। সাড়া পেলেই খুলে দেবে দরজা। কিন্তু সাড়াও নেই শব্দও নেই। থাক, যতক্ষণ পারে, থাক ঐ ব্রহ্মস্বাদে তন্ময় হয়ে। কিন্তু কতক্ষণ থাকবে? দিন শেষ হল, রাতও প্রায় যায় যায়। তোতাপুরী ভাবলে, এখন কী করি! ‘ইহাসনে শুষ্যতু মে শরীরং, ত্বগস্থিমাংসং প্রলয়ঞ্চ যাতু’– তাই হল না কি রামকৃষ্ণের? না, ভয় কিসের? ঐ দিব্য দীপাধার যার দেহ তার সম্বন্ধে ভুল হবে কী! তোতাপুরী আরো এক দিন—আরো এক রাত অপেক্ষা করল। তবু রামকৃষ্ণের ডাক এসে পৌঁছলো না। দেহ কোনো প্রয়োজনেরই জানান দিল না। ব্যাপার কি, বেঁচে আছে তো? দরজা খুলে একবার দেখবে না কি অবস্থাটা? কিন্তু, কে জানে, কী অবস্থায় না-জানি দেখতে হবে। যাক আরো এক দিন–হয়তো এরই মধ্যে ডাক এসে পড়বে। সেই দিনও এখন যেতে চলেছে। তবুও কুটির তেমনি নিঃসাড়, নিশ্বাসশূন্য। তোতাপুরী আর নিশ্চেষ্ট থাকতে পারল না। নিজের আসন ছেড়ে উঠে পড়ল। স্তব্ধীভূত

    রামকৃষ্ণ শিলীভূত হয়ে গেল না কি? এখনো বেঁচে আছে তো? না, কি–জোর করে খুলে ফেলল দরজা। কোথায় রামকৃষ্ণ?

    যেমন বসিয়ে গিয়েছিল তেমনি বসে আছে স্থির হয়ে। দেহে প্রাণের প্রকাশ পর্যন্ত নেই। নেই নিশ্বাসের আভাস-লেশ। অথচ শরীরে তপ্ত দীপ্তি, মুখে জ্যোতির্ময় প্রসন্নতা। নিরুদ্ধাবস্থায় প্রশান্ত হয়ে বসে আছে। বসে আছে নিবাত-নিষ্কম্প দীপশিখার মত। বসে আছে আত্মজ্ঞানে আত্মদর্শনে বিভোর হয়ে। ব্রহ্মে ল’ন, লিপ্ত, লীন হয়ে।

    সংমূঢ়ের মত তাকিয়ে রইল তোতাপুরী। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে চাইল না। চল্লিশ বছর সাধনা করে সে যে সমাধিতে উত্তীর্ণ হয়েছে, রামকৃষ্ণের পক্ষে তা তিন দিনেই সম্ভব হল? নাকের নিচে হাত রাখল, রামকৃষ্ণের নিশ্বাস পড়ছে না। বুকের উপর হাত রাখল, হৃৎস্পন্দন হচ্ছে না। বারংবার স্পর্শেও বিকার জাগছে না চেতনার। যেন ঊর্ধ্ব-অধঃ-মধ্য সমস্ত আত্মবোধে পরিপূর্ণ হয়ে আছে।

    আর এরই নাম তো নির্বিকল্প সমাধি।

    ‘ঊর্ধ্বপূর্ণমধঃপূর্ণং মধ্যপূর্ণং যদাত্মকং,

    সর্বপূর্ণং স আত্মেতি সমাধিস্থস্য লক্ষণম্।’

    ‘ইয়ে ক্যা দৈবী মায়া!’ বিস্ময়ে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল তোতাপুরী।

    দেবতার এ কী আশ্চর্য মায়া, শুধু একবারের চেষ্টায়, মাত্র তিন দিনের মধ্যেই, রামকৃষ্ণের নির্বিকল্প সমাধি হয়ে গেল!

    এখন সমাধিভূমি থেকে নামিয়ে আনতে হয়। তোতাপুরী রামকৃষ্ণের কানে ‘হরি ওম’ মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগল। রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল পঞ্চবটী। রামকৃষ্ণ চোখ মেলল।

    তিন দিন থাকবার কথা, একটানা এগারো মাস থেকে গেল তোতাপুরী। এমন আধার পেয়েছে, তাকে সহজে ছেড়ে যেতে মন উঠল না। ঠিক করল তাকে নির্বিকল্প ভূমিতে দৃঢ়াসনে বসিয়ে দিয়ে যাবে।

    রামকৃষ্ণ তাকে ডাকত ‘ল্যাংটা’ বলে। তোতাপুরীর যেমন বালকত্ব উলঙ্গতায়, রামকৃষ্ণেরও তেমনি বালকত্ব ঐ সম্বোধনে।

    সর্বক্ষণ ধুনি জ্বালিয়ে বসে থাকে তোতাপুরী। বর্ষা হোক বাদল হোক ধুনির নির্বাণ নেই। খাওয়া বলো, শোওয়া বলো, সব এই ধুনির ধারটিতে। ধুনিকেই আরতি করে সকাল-সন্ধ্যা, ভিক্ষার অন্ন ধুনিকেই প্রথমে অর্ঘ্য দেয়। ধুনির পাশেই সমাধিতে বসে, ধুনির পাশেই ঘুমোয়। উলঙ্গ আকাশের নিচে এই উলঙ্গ অগ্নিই তার দেবতা।

    সম্পত্তির মধ্যে একটি লোটা আর চিমটা আর একটি চর্মাসন। আর, সত্যি যখন ধ্যান করছে তখন লোকে ভুল করে ভাবুক যে সে লম্বা হয়ে ঘুমোচ্ছে, তার জন্যে গা মুড়ি দেবার চাদর।

    লোটা আর চিমটা রোজ মাজা চাই তোতাপুরীর। তাই ব্রহ্মলাভ হবার পরও তার নিত্যি ধ্যানাভ্যাস চাই। চাই যম-নিয়ম-আসন-প্রাণায়াম।

    রামকৃষ্ণ এক দিন বললে, ‘ব্রহ্ম লাভের পর আবার নিত্যি এই ধ্যানাভ্যাস কেন?’ ঝকঝকে করে মাজা লোটার দিকে ইঙ্গিত করল তোতাপুরী। বললে, ‘নিত্যি মাজি বলেই ওর অমন উজ্জ্বল চেহারা। যদি না মেজে ফেলে রাখি তবে ময়লা ধরে যাবে। মনও সেই রকম। অভ্যাসযোগে নিত্যি তার মার্জনা চাই। মেজে-ঘষে না রাখলেই তা মলিন হয়ে যাবে।’

    কথাটা মনের মত, সন্দেহ নেই। কিন্তু এরও পরে আরও কথা আছে। রামকৃষ্ণ তীব্র চোখে তাকাল গুরুর দিকে। বললে, ‘কিন্তু লোটা যদি সোনার হয়?

    ‘ঠিকই তো, তা হলে আর মাজতে লাগবে কেন? নিকৃষ্ট ধাতুর পিতলের ঘটিই মাজতে হয় প্রত্যহ।

    তোতাপুরী হাসল। বললে, ‘কিন্তু সংসারে সোনার লোটা ঐ একটিই।’

    দু’জনে ধুনির ধারে বসে আছে। অদ্বৈত ধ্যানে প্রায় অচেতন হয়ে। কে একটা লোক কলকেতে তামাক ধরাবার জন্যে আগুন খুঁজছিল। সে হঠাৎ ধুনির কাঠ টেনে আগুন নিতে বসল। তোমরা চোখ বুজে ধ্যান করছ তা করো, আমার একটু চোখ বুজে তামাক খেতে দোষ কি।

    আরামে তামাক খাবার উপায় নেই। তোতাপুরীর সব চেয়ে যে পবিত্র জিনিস সেই ধুনিতে সে হাত দিয়েছে।

    এত বড় অনাচার সইতে পারবে না তোতা। মুহূর্তে টুটে গেল তার ধ্যান। পাবকের মতই সে ক্রোধে জলে উঠল, গালিগালাজ করতে লাগল। তাতেও ক্ষান্তি নেই, মারতে গেল চিমটে তুলে।

    ‘দূর শালা! দূর শালা!’ অর্ধবাহ্যদশায় হেসে উঠল রামকৃষ্ণ।

    লোকটাকে বলছে না—যেন তাকে বলছে, এমনি মনে হল তোতাপুরীর। আর, সেই লোকটা এখন কোথায়? তাড়া খেয়ে সটকান দিয়েছে ।

    কিন্তু এতে এত হাসবার আছে কী? অন্যায় দেখলে হাসি?

    হেসে একেবারে গড়াগড়ি দিচ্ছে রামকৃষ্ণ।

    ‘এত হাসছ কেন? লোকটার অন্যায়টা একবার দেখলে না?’

    তবে আবার

    ‘দেখলুম। সেই সঙ্গে তোমার ব্রহ্মজ্ঞানের দৌড়টাও দেখলুম। এই বলছিলে, ব্রহ্ম ছাড়া দ্বিতীয় সত্তাই নেই—জীব মাত্রই ব্রহ্মের প্রতিবিম্ব৷ সেই ব্রহ্মরূপী জীবকেই মারতে উঠেছ? তাই হাসছি, মায়ার কী প্রভাব!

    তোতাপুরী গম্ভীর হয়ে গেল। ভেবে দেখল, কাম ত্যাগ করলেও ক্রোধ ত্যাগ হয়নি। তাই বললে, ‘তুমি ঠিক বলেছ। ক্রোধ ত্যাগ হয়নি। আজ থেকে ত্যাগ করলাম ক্রোধ।’

    গুরু মিলে তো লাখ, চেলা মিলে এক–ঠিকই বলেছে তোতাপুরী। সকল গুরুর গুরু এই রামকৃষ্ণ।

    একটা ফড়িঙের পাখায় কে একটা কাঠি ফুঁড়ে দিয়েছে। নিশ্চয়ই কোনো দুষ্টু ছেলের কাজ।

    রামকৃষ্ণের মন ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল। পরক্ষণেই সে হাসির রোল তুললে। বললে, ‘তুমিই তোমার দুর্দশা করেছ। তুমিই ফড়িং, তুমিই সেই দুষ্টু ছেলে।’

    কালীবাড়ির বাগানে নতুন ঘাস উঠেছে। রামকৃষ্ণ অনুভব করলে ও যেন তার নিজের অঙ্গ। কে-একটা লোক হেঁটে যাচ্ছিল ওখান দিয়ে, যন্ত্রণায় চেঁচিয়ে উঠল রামকৃষ্ণ, ‘ওরে যাসনি, যাসনি, আমার বুক ফেটে যাচ্ছে, সইতে পারছি না—’

    গঙ্গার ঘাটে ঝগড়া করছে মাঝিরা। ঝগড়া থেকে হাতাহাতি। এক জন আরেক জনের পিঠে সজোরে চড় মেরে বসল। রামকৃষ্ণ দাঁড়িয়েছিল ঘাটে, চেঁচিয়ে কেঁদে উঠল হঠাৎ। ভয়ের কান্না নয়, যন্ত্রণার কান্না।

    কালীঘর থেকে শুনতে পেল হৃদয়। কি হয়েছে? ছুটে এল ঘাটের চাঁদনীতে। দেখল রামকৃষ্ণের পিঠ ফুলে লাল।

    ‘এ কি, কে তোমাকে মেরেছে? বলো, তাকে একবার আমি দেখে নিই। কিছুই বলে না, রামকৃষ্ণ শুধু কাঁদে।

    অনেক পরে শান্ত হয়ে বললে, ‘এক মাঝি আরেক মাঝিকে মেরেছে, আমাকে নয়। কিন্তু সেও তো আমাকেই মারা। নইলে আমার লাগল কেন? কাঁদলাম কেন এতক্ষণ?

    এই অদ্বৈত ভাব। সে ভাবে তুমিও নেই আমিও নেই। একও নেই দুইও নেই। অর্থাৎ সীমাও নেই সংখ্যাও নেই। শুধু একটি বিমল বোধের ঘনতা। এইটিই আত্মবোধ। নিরবধি গগন থেকে ক্ষুদ্র ধূলিকণা পর্যন্ত পরিব্যাপী আত্মময়তা। এই ভাবনাতীত ভাবসমূদ্র দূর থেকে দেখেই কেউ ফিরে আসে, কেউ ছোঁয় কি না-ছোঁয়, আর কেউ যদি তার জল খেতে পায় এক চুমুক তার যে কী হয় তা সে নিজেও জানে না ।

    নারদ দূর থেকে দেখেই ফিরেছিল। শুকদেব শুধু ছুঁয়েছিল। আর শিব তিন গণ্ডুষ জল খেয়েছিল সাহস করে। খেয়ে অবধি কি হয়েছে কে জানে। শব হয়ে পড়ে আছে।

    সেই অদ্বৈত ভাবের ভূমিতে যদি এক মুহূর্তের জন্যেও কেউ পৌঁছতে পারে তবেই তার নির্বিকল্প সমাধি৷

    এক-আধ দিন নয়, একটানা ছয় মাস রামকৃষ্ণ ছিল এই নির্বিকল্প অবস্থায়। খুব-বেশি একুশ দিন থাকলেই শরীর নস্যাৎ হয়ে যায়—সেখানে ছয় মাস! কি দেখছে কি শুনছে কেউ জানে না। নুনের পুতুল যেন সমুদ্র মাপতে নেমেছে। যেই নামা অমনি গলে যাওয়া!

    বিচার যেখানে এসে থেমে যায় তাই ব্রহ্ম। যাকে দেখে আর দেখবার নেই, যাকে জেনে আর জানবার নেই, যা হয়ে আর হবার নেই। কিন্তু কী তুমি দেখলে কী তুমি জানলে কী তুমি হলে বোঝাও তোমার সাধ্য কি। সংসারে আর সব জ্ঞেয় বস্তু এঁটো হয়ে গেছে। বেদই বলো আর পুরাণই বলো, কত পঠন-পাঠন কত বিচার-বিতর্ক হয়ে গেছে মুখে-মুখে। কত উচ্চারণ, কত বিশ্লেষণ। কিন্তু ব্রহ্ম? ব্ৰহ্মই একমাত্র অননুচ্চারিত। ব্রহ্মই একমাত্র অনুচ্ছিষ্ট।

    কখন কোন দিক দিয়ে দিন আসছে, কোন পথ দিয়ে চলে যাচ্ছে রাত, খেয়াল থাকছে না রামকৃষ্ণের। আগে-আগে সমাধিতে ‘মা’-’মা’ বলে কাঁদত, এখন বাক্য-মনের পরপারে চলে এসেছে। জাগরণও নয়, স্বপ্নও নয়, সুষুপ্তিও নয়—চলে এসেছে স্বরূপবোধের স্তব্ধতায়। নাকে-মুখে মাছি ঢুকছে, তবু সাড় আসছে না শরীরে। ধূলোয়-ধূলোয় চুলে জট পাকিয়ে যাচ্ছে। অসাড়ে শৌচাদি হয়ে যাচ্ছে তবু চেতনা নেই। শূন্যও নয়, অশূন্যও নয়, সর্ব জগতে চিন্মাত্রবিস্তার।

    আর সেই চেতনায় শিব শবীভূত।

    শরীর ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল রামকৃষ্ণের। কিন্তু কোত্থেকে এক সাধু এসে হাজির তখন দক্ষিণেশ্বরে। হাতে একগাছা মোটা লাঠি, তাই দিয়ে থেকে-থেকে মারতে শুরু করল রামকৃষ্ণকে।

    ‘কি, খাবি না কি? একশো বার খেতে হবে। মারে আর শাসায় সেই সাধু। বলে, ‘ওই দেহ অমনি করে নষ্ট করতে দেব না। ওই দেহে মা’র এখনো অনেক কাজ আছে। বাকি আছে অনেক লোক-কল্যাণ। নে, ওঠ, খা—’ বলে আবার মার।

    এমনি করে হুঁস আনবার চেষ্টা করছে। মারের চোটে যেই একটু হুঁস আসছে, অমনি খাবার গুঁজে দিচ্ছে মুখের মধ্যে। এমনি করে বাঁচিয়ে রাখছে। এমনি করে এক-আধ দিন নয়, ছয় মাস।

    তার পর এক দিন জগদম্বা দেখা দিলেন। বললেন, ‘এবার নেমে আয়। এখন থেকে ভাবমুখে থাক। লোকশিক্ষার জন্যে ভাবৈশ্বর্য ধারণ কর।

    রামকৃষ্ণের রক্ত-আমাশা হল। সেই রোগে ভুগে ভুগে ক্ৰমে-ক্রমে দেহে মন নামল। ‘ছাদে কতক্ষণ লোক থাকতে পারে? তারপর আবার নেমে আসে।

    সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি—নি-তে কতক্ষণ থাকা যায়? আবার সা-তে নেমে আসে। সমাধিস্থ হয়ে যে ব্রহ্মকে দেখে, নেমে এসে সে আবার দেখে জীব-জগৎ সব তিনিই হয়েছেন। যিনি ব্রহ্ম তিনিই ভগবান। ব্ৰহ্ম গুণাতীত, ভগবান ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ। এই জীব জগৎ মন বুদ্ধি ভক্তি জ্ঞান ত্যাগ বৈরাগ্য সব তাঁরই ঐশ্বর্য। ব্রহ্ম জ্ঞান-মুখে, ভগবান ভাব-মুখে। আমাদের ভাব-মুখের ভগবানটিই ভালো। তার ঘর-দুয়ার আছে, ধন-দৌলত আছে—তাই তার এত নাম-ডাক। আর ব্রহ্মটি দেউলে, বাউণ্ডুলে। যে বাবুর ঘর-দুয়ার নেই সে বাবু আবার কিসের বাবু!

    বাবুরাম ঘোষ, পরে যিনি স্বামী প্রেমানন্দ নামে প্রসিদ্ধ, এক রাতে দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের সঙ্গে এক ঘরে শুয়ে আছে। হঠাৎ কিসের শব্দে বাবুরামের ঘুম ভেঙে গেল। কান খাড়া রেখে শুনল কে যেন হাঁটছে ঘরের মধ্যে। আর কে? ঠাকুরই অস্থির হয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করে বেড়াচ্ছেন। পরনের কাপড় বগলের নিচে গুটানো। পায়চারি করছেন আর বলছেন উত্তেজিত হয়ে, ‘ও সব আমি চাই না। ও সব তুই ফিরিয়ে নিয়ে যা। ছিঃ, ও দিয়ে আমার কী হবে?

    তরুণ শিষ্য বাবুরাম বিস্ময়ে কাঠ হয়ে আছে।

    আবার পায়চারি। আবার সেই সঘৃণ প্রত্যাখ্যান।

    কতক্ষণ পরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এল রামকৃষ্ণ। বাবুরাম জিজ্ঞেস করলে, ‘তখন ও রকম করছিলেন কেন?’

    ‘ও! তুই দেখে ফেলেছিস না কি?

    মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে যেতে দেখি ঘরে মা এসেছেন। হাতে একটা থলে। বললেন, থলের মধ্যে যা-কিছু আছে, সব তোর, তোর জন্যে এনেছি। নে, হাত পাত। কি এনেছিস? তাকিয়ে দেখি, থলের মধ্যে নাম-যশ, লোকমান্য। থলের থেকে মুখ বার করে রয়েছে। উঃ, সে কী বীভৎস দেখতে! চেঁচিয়ে উঠলাম, তুই ও-সব ফিরিয়ে নিয়ে যা, ফিরিয়ে নিয়ে যা। আমি ও-সব চাইনে। আমাকে লোভ দেখাসনে, তোর পায়ে পড়ি—’তার পর?’

    ‘তার পর আর কি। মা একটু হাসলেন। চলে গেলেন থলে নিয়ে।’

     ২৯

    ‘আরে, কেঁও রোটি ঠোকতে হো?’

    হাততালি দিতে-দিতে হরিনাম করছে রামকৃষ্ণ। সকাল সন্ধ্যেয় যেমন চিরকালের অভ্যাস। হয় হরিবোল, হরিবোল, নয় তো হরি গুরু, গুরু হরি। হয় আমি যন্ত্র তুমি যন্ত্রী, নয় তো মন কৃষ্ণ প্রাণ কৃষ্ণ।

    নির্বিকল্প সমাধি লাভ করে এ সব আবার কী ছেলেমানুষি!

    বিরক্ত হল তোতাপুরী। ঠাট্টা করে বললে, ‘হাত চাপড়ে চাপড়ে রুটি তৈরি করছ না কি?’

    ‘দূর শালা! আমি ঈশ্বরের নাম করছি—শুনতে পাচ্ছ না?’

    ঈশ্বরের নাম করছ তো তালি দিচ্ছ কেন?’

    কেন দিচ্ছে কে জানে। বেশি ঘাঁটিয়ে লাভ নেই। ও-সব ভাবের ব্যাপার কিছুই বুঝবে না তোতাপুরী।

    সে ব্রহ্ম নিয়েই মশগুল। তার সঙ্গিনী যে মায়া, যে ভাবরূপিণী শক্তি, তার সে খবর রাখে না। বিচারে-বিতর্কে ঈশ্বরকে শুধু সন্ধানই করা যায়, তাকে যে ভালোবাসা যায়, তার জন্যে যে কেউ কাঁদতে পারে, নাচতে পারে—এ তার ধারণার অতীত। সে মনন-চিন্তন বোঝে, কীর্তন-ভজন বোঝে না। শম-দম বোঝে, বোঝে না বাৎসল্য-মাধুর্য। ভক্তি তার কাছে নিছক প্রলাপোচ্ছাস। বুদ্ধির বিক্লিন্ন বিকার।

    সে অভীঃ। তার ধুনির আগুনের মত সে মায়াশূন্য, নিষ্কলঙ্ক।

    গভীর রাত্রে ধ্যানে বসবার উদ্যোগ করছে তোতাপুরী। মন্দিরচূড়ায় একটা পেঁচা ডাকছে। থমথম করছে চার পাশ।

    হঠাৎ দীর্ঘাকার একটা লোক গাছ বেয়ে নিচে নেমে এল। দাঁড়াল এসে সামনে। এ কি, এ যে তারই মত উলঙ্গ।

    ‘কে তুমি?’ জিজ্ঞেস করল তোতাপুরী।

    ‘আমি ভূত—ভৈরব। গাছের উপর থাকি। এই দেবস্থান রক্ষা করি। কিন্তু ‘তুমি কে?’

    বিন্দুমাত্র বিচলিত হল না তোতা। বললে, ‘তুমিও যা, আমিও তা।’

    ‘আমি তো ভূত।’

    ‘হলেই বা। তুমিও ব্রহ্মের প্রকাশ, আমিও ব্রহ্মের প্রকাশ। আমাতে-তোমাতে কোনো তফাৎ নেই। বোসো এসে পাশে। ধ্যান করো।’

    নিমেষে মিলিয়ে গেল ভূত৷

    পরদিন তোতা বলল সব রামকৃষ্ণকে।

    ‘জানি। অনেক বার দেখেছি তাকে।’ রামকৃষ্ণ উদাসীনের মত বললে।

    বলো কি? দেখেছ? ভয় পাওনি?’

    ‘ভয় পাব কেন? আমাকে কত সে ভবিষ্যৎ বলে দিয়েছে। সে বার কি হয়েছিল জানো না বুঝি?’

    বারুদ-ঘর করবার জন্যে কোম্পানি পঞ্চবটীর জমি নেবে ঠিক করেছিল। একটু নির্জনে বসে মাকে ডাকি, তাও উঠে যাবে? কোম্পানির বিরুদ্ধে মথুর খুব লড়লে একচোট। মামলায় কে হারে কে জেতে তখন সেটা একটা সঙিন অবস্থা। এমন সময় একদিন রাত্রে দেখি ভৈরবটি পা ঝুলিয়ে বসে আছেন গাছে। ‘কি খবর?’ ইশারায় বললে, ভয় নেই। মামলায় হেরে যাবে কোম্পানি।

    হলও তাই। কোম্পানি ডিসমিস খেয়ে গেল।

    তুমি জ্ঞানে নির্ভয়, আমি ভালোবাসায় নির্ভয়। তুমি ব্রহ্ম পেয়ে ব্রহ্ম নিয়েই থাকো। আমি ব্রহ্ম পেয়ে জীব নিয়ে থাকব। তোমার আগেও জ্ঞান পরেও জ্ঞান। আমার ভক্তি থেকে জ্ঞান। আবার জ্ঞান থেকে ভালোবাসা। আমার কখনো পূজা কখনো জপ কখনো ধ্যান কখনো শুধু নামগুণগান৷ কখনো বা দু’হাত তুলে নৃত্য। আমি শাক্তদেরও মানি, বৈষ্ণবদেরও মানি, আবার বেদান্তবাদীদেরও মানি। আজকালকার ব্রহ্মজ্ঞানীদেরও মানি। তুমি একরোখা, একঘেয়ে৷ আমি বিচিত্র। আমি বহুল। আমার সর্বসমন্বয়।

    ভক্তি-ভালবাসা না মানলে কি হয়, তোতাপুরী যখন রামকৃষ্ণের গান শোনে, কেঁদে ফেলে।

    ভক্তির বীজ আর যায় না। যতই জ্ঞান-চাপা দাও, আঁকুর থেকে ফুল-ফল হবেই। হাজার জ্ঞান বিচার করো, আবার ঘুরে-ফিরে ‘মা-’মা’, আবার ঘুরে-ফিরে হরিবোল, হরিবোল!

    তুমি অদ্বৈতজ্ঞান নিয়ে নিশ্চল হয়ে বসে থাকো। আমি অদ্বৈতজ্ঞান আঁচলে বেঁধে কাজ করি। আমার কত কাজ, কত কথা। আমি না বললে শুনবে কে?

    আমি না করলে করবে কেন? আর এই আমিটি আমি নয়, কেউ নয়। সকলই তিনি, সকলই তুমি।

    তিনিটি জ্ঞান। আর তুমিটি ভালোবাসা।

    অদ্বৈতভাব কেমন জানিস? যেমন, ধরো, অনেক দিনের পুরোনো চাকর।

    মনিব তার উপর খুব খুশি। তাকে সকল কথায় বিশ্বাস করে, সব বিষয়ে পরামর্শ করে। একদিন করলে কি—তার হাত ধরে নিজের গদিতেই বসাতে গেল। কি কর, কি কর—চাকর তো সঙ্কোচে এতটুকু। আঃ, বোস না–মনিব তাকে জোর করে টেনে বসিয়ে দিল। বললে, তুইও যে, আমিও সে। অদ্বৈত-ভাব এই রকম।’

    পদ্মলোচন প্রকাণ্ড বৈদান্তিক। দেশজোড়া প্রসিদ্ধি। বর্ধমান-রাজার সভাপণ্ডিত হয়ে আছে। রামকৃষ্ণ ধরল মথুরবাবুকে। বললে, আমাকে একবার বর্ধমান নিয়ে চলো। পণ্ডিতকে একবার দেখে আসি।

    যেখানে পাণ্ডিত্য আর ভক্তি একসঙ্গে মিশেছে, সেখানে তো ভগবানের অধিষ্ঠান। সেই তো তীর্থক্ষেত্র। সেইখানেই তো হাতির দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধানো।

    যেতে হল না রামকৃষ্ণকে। পদ্মলোচনই চলে এল কামারহাটি। দক্ষিণেশ্বরের কাছে। শরীর সারাবার জন্যে রয়েছে গঙ্গাতীরে।

    ‘একবার গিয়ে পণ্ডিতের খোঁজ নিয়ে আয় তো।’ হৃদয়কে বললে রামকৃষ্ণ।

    ‘সে আবার কে?’

    জানিস না বুঝি? প্রকাণ্ড সাধক। ঈশ্বরপ্রেমিক। বিদ্যেবুদ্ধিতে প্রচণ্ড, আবার ভক্তিতে মেদুর। যেমন সদাচার ইষ্টনিষ্ঠা তেমনি আবার ঔদাসীন্য আর ঔদার্য। যেমন সরল তেমনি স্পষ্টবাদী। একবার রাজসভায় তর্ক উঠল, শিব বড় না বিষ্ণু বড়? মীমাংসা হচ্ছে না, ডাকো পদ্মলোচনকে৷ পদ্মলোচন এসে বললে, তার আমি কি জানি! আমার চৌদ্দ পুরুষে কেউ শিবও দেখেনি বিষ্ণু ও দেখেনি। বড়-ছোট বলব কি করে? যার কাছে যে বড় তার কাছে সেই বড়।

    ‘গিয়ে কি করতে হবে?’ জিজ্ঞেস করল হৃদয়।

    ‘গিয়ে দেখে আয় তার মধ্যে অভিমান আছে কি না।

    ‘হৃদয় গিয়ে দেখে এল পদ্মলোচনকে।

    বললে, ‘সে তোমার জন্যে বসে আছে। আমাকে তোমার ভাগ্নে জেনে কত খাতির।’

    তক্ষুনি চলল রামকৃষ্ণ। জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে, যা কিছু সৎসঙ্গ করবার করে নাও। দিন থাকতে-থাকতে দেখে নাও দিনমণিকে।

    পদ্মলোচন দেখল তার দুয়ারে পদ্মপলাশলোচন এসেছে।

    পরস্পরকে দেখে গলে গেল দু’জনে। শুরু হল কথার হোলিখেলা। রামকৃষ্ণ গান করলে। পদ্মলোচন কেঁদে আকুল।

    এত জ্ঞানী আর পণ্ডিত,’ বললেন একদিন ঠাকুর, ‘তবু আমার মুখে রামপ্রসাদের গান শুনে কান্না! জানিস, কথা কয়ে এমন সুখ আর পাইনি কোথাও৷

    আর পদ্মলোচন বললে, ঝুড়ি-ঝুড়ি বই পড়ে যা জেনেছি ও এক পৃষ্ঠা না উলটিয়েও তার চেয়ে বেশি জেনেছে।’

    বেদান্তবাদী হলে কি হয়, পদ্মলোচন তন্ত্রসাধনায় সিদ্ধ। ইষ্টদেবীর শক্তিবলে তর্কে সে সর্বজয়ী। কিন্তু এর মধ্যে প্রচ্ছন্ন একটু রহস্য ছিল। সব সময়েই তার কাছে থাকত একটি জলে ভর্তি গাড়ু আর একখানি গামছা। তর্কে প্রবৃত্ত হবার আগে সেই জলে সে মুখে ধুয়ে নিত। ব্যস, একবার মুখ ধুয়ে নিতে পারলেই সে কেল্লা মেরে দিয়েছে। কেউ আর হারাতে পারবে না তাকে। তার প্রাধান্যই অক্ষুণ্ণ থাকবে।

    একটা অত্যন্ত সাধারণ আচরণ। বাগদেবীকে জিহবাগ্রে আনবার আগে এই একটু মুখ-ধোওয়া।

    কিন্তু বিষয়টা কি, রামকৃষ্ণ বুঝতে পারল। জগদম্বা বলে দিলে।

    সেদিন তর্কে প্রবৃত্ত হবার আগে পদ্মলোচন যথারীতি মুখ ধুতে উঠেছে। কিন্তু কোথায় গাড়ু-গামছা? বা, তার গাড়ু-গামছা কি হল? মুখ না ধুয়ে সে শাস্ত্রালোচনা শুরু করে কি করে? সে কি কথা? তার গাড়ু-গামছা কে নিল? এইখানেই তো ছিল-

    আর কে নেবে! রামকৃষ্ণই লুকিয়েছে।

    ‘কি, আরম্ভ করো মীমাংসা!’ রামকৃষ্ণ হাসতে লাগল মৃদু-মৃদু।

    ‘কি আশ্চর্য!’ পদ্মলোচন তো হতবাক, ‘তুমি জানলে কি করে? তবে তুমি কি অন্তর্যামী?’

    পদ্মলোচনের দুই চোখ জলে প্লাবিত হয়ে গেল। করজোড়ে স্তব করতে লাগল রামকৃষ্ণকে। পরে বললে, ‘আমি নিজে এক সভা বসাব। ডাকাব সব পণ্ডিতদের। বলব তুমি ঈশ্বরাবতার—দেখি কে কাটতে পারে আমার কথা।’

    সে-সভা আর বসাতে পারেনি পদ্মলোচন। তার অসুখ ক্রমশই বৃদ্ধির মুখে।

    একদিন বললে রামকৃষ্ণকে, ‘ভক্তির সঙ্গ করব এ কামনা ত্যাগ কোরো, নইলে নানা রকমের লোক এসে তোমায় পতিত করবে।’

    রামকৃষ্ণ হাসল। বললে,’পতিত-অভাজনদের মধ্যেই তো এখন ঠাঁই নেব। আমাকে আবার পতিত করবে কে?

    দক্ষিণেশ্বরে মথুরবাবু বিরাট ব্রাহ্মণ-বিদায়ের আয়োজন করেছেন। এক হাজার মণ চাল বিলোনো হবে, সঙ্গে বহু বিচিত্র খাদ্যসম্ভার, সোনা-রূপোও যথেষ্ট। গাইয়েও নিমন্ত্রিত হয়েছে অনেক, যার গানে যত বেশি ভাব হবে রামকৃষ্ণের তাকে তত বেশি টাকা দেবেন—শয়ে শয়ে টাকা, সঙ্গে শাল, ক্ষৌমবস্ত্র। মথুরবাবুর ইচ্ছে পণ্ডিত পদ্মলোচনকে নিমন্ত্রণ করে। কিন্তু সে যেমন গোঁড়া, হয়তো নেবে না নিমন্ত্রণ। রামকৃষ্ণকে বললে, ‘তুমি একবার দেখ না বলে।’

    ‘হ্যাঁ গা, তুমি যাবে না দক্ষিণেশ্বর?’ পদ্মলোচনকে জিগগেস করল রামকৃষ্ণ।

    পরম নিষ্ঠাচারী ব্রাহ্মণ। অশুদ্রপ্রতিগ্রাহী। বললে, ‘তোমার সঙ্গে হাড়ির বাড়িতে গিয়ে খেয়ে আসতে পারি। কৈবর্তের বাড়িতে সভায় যাব, এ আর কি বড় কথা!’

    কিন্তু শরীরে শেষ পর্যন্ত কুলোল না। রামকৃষ্ণের থেকে বিদায় নিয়ে কাশী চলে গেল। আর ফিরল না।

    সিঁতির বাগানে আরেক পণ্ডিত এসেছে। নাম দয়ানন্দ সরস্বতী। আর্য-সমাজের প্রতিষ্ঠাতা।

    রামকৃষ্ণ গেল তার সঙ্গে দেখা করতে। যেখানে প্রসিদ্ধি সেখানেই ঈশ্বরের বিভূতি। আর যেখানেই ঈশ্বরের বিভূতি সেখানেই রামকৃষ্ণের স্বীকৃতি। ‘কেমন দেখলেন সরস্বতীকে?’

    ‘দেখলাম শক্তি হয়েছে—বুক লাল। কথা কইছে খুব, যাকে বলে বৈখরী অবস্থা। ব্যাকরণ লাগিয়ে শাস্ত্রবাক্যের ব্যাখ্যা করছে। নিজে একটা কিছু করব, একটা মত চালাব, এই অহঙ্কার ষোলো আনা।

    আর জয়নারাণ পণ্ডিত?’

    আহা, তার কথা বোলো না। এত বড় বিদ্বান, এক বিন্দু অহঙ্কার নেই। নিজের মৃত্যুর কথা টের পেয়েছিল আগে থেকে। টের পেয়ে বললে, কাশী চললাম।’

    আর এঁড়েদার কৃষ্ণকিশোর বিশ্বাসে একেবারে আগুন। কি? একবার তাঁর নাম করেছি, আমার আবার পাপ? অসম্ভব।

    ‘যে গরু বাচকোচ করে খায় সে ছিড়িক-ছিড়িক করে দুধ দেয়। আর যে গরু শাক-পাতা খোসা-ভূষি যা দাও গবগব করে খায়, সে হুড়হুড় করে দুধ দেয়।

    কৃষ্ণকিশোরের ডাকাতে বিশ্বাস। তেষ্টা পেয়েছে, পথশ্রমে অত্যন্ত ক্লান্ত। কুয়োর কাছে কে একজন দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে বললে একটু জল তুলে দিতে। সে বললে, আমি মুচি, ছোট জাত। হলেই বা । একবার শিব নাম নাও, অমনি সুচি হয়ে যাবে। একবার নাম নিলেই হবে? হ্যাঁ, বলছি কি, একবার নিলেই হবে। একবারই যথেষ্ট। লোকটা তাই একবার ‘শিব’ বললে। জল তুলে দিল কৃষ্ণ

    কিশোরকে। কৃষ্ণকিশোর পরম তৃপ্তিতে জল খেল।

    কৃষ্ণকিশোর বলে, তোমরা রাম নাম করো, আমি বলি ‘মরা’-’মরা’।

    রামের চেয়েও ‘মরা’ বেশি শক্তিশালী। মরাতেই রত্নাকরের উদ্ধার, মৃতের পুনর্জীবন। তোমাদের কী মন্ত্র জানি না, আমার এই মরা মন্ত্র।

    বিষয়ীসঙ্গ সহ্য হত না, রামকৃষ্ণ প্রায়ই আসত কৃষ্ণকিশোরের কাছে। কৃষ্ণকিশোরের ঈশ্বর ছাড়া বাক্য নেই, ঈশ্বর ছাড়া স্তব্ধতাও নেই। কৃষ্ণকিশোর সচল তীর্থ, উদ্ঘাটিত শাস্ত্র।

    হলধারীকে দেখতে পারত না দু’চোখে।

    একবার রামকৃষ্ণ আর কৃষ্ণকিশোর এক সাধুদর্শনে চলেছে। তুমি যাবে? জিগগেস করল হলধারীকে। হলধারী বললে, ‘পঞ্চভূতের একটা খাঁচাকে দেখে লাভ কি?’

    খেপে উঠল কৃষ্ণকিশোর। যে লোক ঈশ্বরের নাম করে, ঈশ্বরের ধ্যান করে, ঈশ্বরের জন্যে সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে এসেছে, সে খাঁচা? সে জানে না যে ভক্তের হৃদয় চিন্ময়?’

    কচু! তা হলে অজামিলকে আর দুশ্চর তপস্যা করতে হত না। একবার ‘নারায়ণ’ উচ্চারণ করেই তরে যেত।

    কিন্তু কিছুতেই মানবে না কৃষ্ণকিশোর। তার ভক্তির তমঃ মারো-কাটো-বাঁধো জবরদস্ত ভক্তি। আবার কতবার বলবে? একবার বলেছি, এতেই হয়েছে। এতেই ছিনিয়ে নেব জোর করে। আমি কি ভিখিরি? আমি ডাকাত।

    দক্ষিণেশ্বরে ফুল তুলতে আসত, হলধারীর সঙ্গে দেখা হলেই ফিরিয়ে নিত মুখ। অমন ক্ষুদ্র যার বিশ্বাস, যে ছিড়িক-ছিড়িক করে দুধ দেয়, তার সে মুখ দর্শন করবে না।

    একদিন রামকৃষ্ণ গিয়ে দেখে, কৃষ্ণকিশোর কি ভাবছে বসে-বসে। কি হয়েছে? আনমনা কেন?

    ‘ট্যাক্সওয়ালা এসেছিল। বললে, টাকা না দিলে ঘটি-বাটি বেচে লবে।

    ‘তাই ভাবছ?’ রামকৃষ্ণ হেসে উঠল, ‘নিক না ঘটি-বাটি। চাই কি, বেঁধে লয়েই যাক না। কিন্তু তোমাকে তো নিয়ে যেতে পারবে না। তুমি তো ‘খ’ গো। তুমি তো আকাশবৎ। ‘

    ঠিকই তো। আমাকে কে নেয়! আমাকে কে বাঁধে! কিন্তু তুমি যে এ-কথা বললে, তুমি কে?

    তুমি ‘অ’। ‘অক্ষরাণাং অকারোঽস্মি’। তুমি সেই অ-কার। তুমি প্রণবের আদ্য অক্ষর।

    এ হেন কৃষ্ণকিশোরের পুত্রশোক হল। দুই উপযুক্ত পুত্র মারা গেল পর-পর। কোন জ্ঞানেই কিছু কুলোল না। শোকে উদ্ভ্রান্ত হয়ে গেল।

    তা অর্জুনই অধীর, এ তো কৃষ্ণকিশোর। যার জন্যে এত গীতা, যার জন্যে এত আত্মার বিশ্লেষণ সে-ই কি না অভিমন্যুর শোকে মূর্ছিত। সঙ্গে কৃষ্ণ, কৃষ্ণের এত সব শিক্ষা-দীক্ষা। কিছুতেই কিছু হল না। চোখের জলে সব ভেসে গেল। বশিষ্ঠ যে এত বড় জ্ঞানী, সেও পুত্রশোকে অস্থির। তখন লক্ষ্মণ বললে, এ কি আশ্চর্য! ইনিও এত শোকার্ত। রাম বললে, ‘ভাই, যার জ্ঞান আছে তার অজ্ঞানও আছে। যার সুখবোধ আছে তার দুঃখবোধও আছে। তাই তোকে বলি, তুই দুইয়ের পার হ। সুখ-দুঃখের জ্ঞান-অজ্ঞানের পারে যা।’

    রাবণ যখন বধ হল, লক্ষ্মণ দৌড়িয়ে গেল দেখতে। দেখে হাড় শতশ্ছিদ্র হয়ে গেছে। এমন জায়গা নেই যেখানে ছিদ্র নেই। রামকে বললে, রাম! তোমার বাণের কি মহিমা! রাবণের দেহে এমন জায়গা নেই যেখানে ছিদ্র না হয়েছে। রাম বললে, ও সব ছিদ্র বাণের জন্যে নয়। শোকে তার হাড় জর-জর করেছে। ও সব ছিদ্র শোকের চিহ্ন।

    তেলির ছেলে গোবিন্দ, থাকে বরানগর। ছোকরা বয়স, প্রায়ই দক্ষিণেশ্বরে আসে। আর রামকৃষ্ণর কথামৃত শোনে।

    একদিন বললে, ‘গোপালকে আনব এখানে?’

    কে গোপাল?

    ‘আমার এক বন্ধু। আমারই সমবয়সী।’

    ‘বেশ তো। নিয়ে আসিস একদিন।’

    গোপাল এল গোবিন্দর সঙ্গে। রামকৃষ্ণের মুখে কথা শুনেই কেমন বেহুঁস হয়ে গেল। রামকৃষ্ণের যেমন সমাধি হয়, প্রায় তেমনি।

    একদিন গোপাল এসে রামকৃষ্ণের পায়ের ধুলো নিলে। বললে, ‘চলে যাচ্ছি।’

    ‘সে কি? কোথায় যাচ্ছিস?’ জিজ্ঞেস করল রামকৃষ্ণ।

    ‘জানি না। এ সংসার আর ভালো লাগছে না তাই আর থাকছি না এখানে।

    কত দিন আর ছেলে দুটোর কোনো খবর নেই। এদিকে আর আসে না। কি হল কে জানে।

    এক দিন গোবিন্দ এসে হাজির।

    ‘আরে! কি খবর?’

    ‘গোপাল মারা গেছে।’

    মারা গেছে? রামকৃষ্ণ কাতর হয়ে পড়ল।

    ক’দিন পরে খবর এল গোবিন্দও চলে গিয়েছে ওপারে।

    ভাগ্যিস ওরা আমার কেউ নয়। ওরা আমার কে। রামকৃষ্ণ বলে আর চোখ মোছে।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Article৫৭ থেকে ৪৭ (স্বাধীনতা সংগ্রামের কল্পিত বিকল্প ইতিহাস)
    Next Article অনুষ্ঠান প্রচারে বিঘ্ন ঘটায় দুঃখিত – শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আদিবাসী লোককথা : ১ম খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    May 1, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আদিবাসী লোককথা : ১ম খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    May 1, 2026
    Our Picks

    আদিবাসী লোককথা : ১ম খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    May 1, 2026

    ৫৭ থেকে ৪৭ (স্বাধীনতা সংগ্রামের কল্পিত বিকল্প ইতিহাস)

    May 1, 2026

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 1, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }