পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ১.৩০
৩০
তোতাপুরী জগদম্বাকে মানে না, কিন্তু তোতাপুরীর উপর জগদম্বার অপার করুণা। করুণাবলেই তার সাধনার পথ সহজ করে দিয়েছেন। দেখাননি তাকে তাঁর রঙ্গিণী মায়ার খেলা। অবিদ্যারূপিণী মোহিনী মায়ার ইন্দ্রজাল। দেখাননি তাকে তাঁর সর্বগ্রাসিনী করালী মূর্তি। প্রকটিতরদনা বিভীষিকা। বরং তাকে দিয়েছেন সুদৃঢ় স্বাস্থ্য, সরল মন আর বিশুদ্ধ সংস্কার। তাই নিজের পুরুষ-কারের প্রয়োগে সহজ পথে উঠে গিয়েছে শিখরে। আত্মজ্ঞানে, ঈশ্বরদর্শনে, নির্বিকল্প সমাধিভূমিতে। এখন মহামায়া ভাবলেন, ওকে এবার বোঝাই আসল অবস্থাটা কী!
লোহার মত শরীর, লোহা চিবিয়ে হজম করতে পারে তোতাপুরী—হঠাৎ তার রক্ত আমাশা হয়ে গেল।
সব সময়ে পেটে অসহ্য যন্ত্রণা। কি করে মন আর ধ্যানে বসে! ব্রহ্ম ছেড়ে মন এখন শুধু শরীরে লেগে থাকে। মনের সেই শান্তির মৌন চলে গিয়ে দেখা দেয় শারীরিক আর্তনাদ।
ব্রহ্ম এবার পঞ্চভূতের ফাঁদে পড়েছেন। এবার মহামায়ার কৃপা না হলে আর রক্ষে নেই।
তোতাপুরী ভাবলে এবার পালাই বাঙলা দেশ থেকে। কিন্তু শরীর ভালো থাকছে না এই অজুহাতে পালিয়ে যাব? হাড়-মাসের খাঁচা এই শরীর, তাকে এত প্রাধান্য দেব? তার জন্যে ছেড়ে যাব এই ঈশ্বর-সঙ্গ? যেখানে যাব সেখানেই তো শরীর যাবে, শরীরের সঙ্গে-সঙ্গে রোগও যাবে। আর রোগকে ভয়ই বা কিসের? শরীর যখন আছে তখন তো তা ভুগবেই, শেষও হয়ে যাবে এক দিন। সেই শরীরের প্রতি মমতা কেন? যাক না তা ধূলায় নস্যাৎ হয়ে। ক্ষয়হীন আত্মা রয়েছে অনির্বাণ। রোগ, জরা বা মৃত্যু তাকে স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারে না। সে প্রদীপ্ত চৈতন্য শরীর-বহির্ভূত।
নানা তর্ক করে মনকে স্তব্ধ করলে তোতাপুরী।
কিন্তু রোগ না শোনে ধর্মের কাহিনী। ক্রমেই তা শিখা বিস্তার করতে লাগল—যন্ত্রণার শিখা। ঠিক করল, আর থাকা চলবে না দক্ষিণেশ্বরে—রামকৃষ্ণর থেকে শেষ বিদায় নিতেই হবে। কিন্তু মুখ ফুটে রামকৃষ্ণকে তা বলে এমন তার সাধ্য নেই। কে যেন তার মুখের উপর হাত চাপা দিয়ে কথা কইতে বাধা দিচ্ছে। আজ থাক, কাল বলব—বারে বারে এই ভাব এসে তাকে নিরস্ত করছে। আজ গেল, কালও সে পঞ্চবটীতে বসে রামকৃষ্ণের সঙ্গে বেদান্ত নিয়েই আলোচনা করলে, অসুখের কথা দন্তস্ফূট করতে পারল না।
কিন্তু বুঝতে পারল রামকৃষ্ণ। মথুরবাবুকে বলে চিকিৎসার বন্দোবস্ত করালে। মনকে সমাধিস্থ করে যন্ত্রণা থেকে ত্রাণ খুঁজছে তোতাপুরী। আমি দেহ নই আমি আত্মা, আমি জীব নই আমি ব্রহ্ম এই দিব্যবোধে নিমগ্ন হয়ে থাকছে। শরণ নিচ্ছে যোগজ প্রজ্ঞার।
কিন্তু কত দিন?
এক দিন রাতে শুয়েছে, পেটে অসহ্য যন্ত্রণা বোধ হল। উঠে বসল তোতাপুরী। এ যন্ত্রণার কিসে নিবারণ হবে? মনকে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে পাঠাতে চাইল সেই অদ্বৈতভূমিতে। কিন্তু মন আর যেতে চায় না। একটু ওঠে আবার পেটের যন্ত্রণায় নেমে পড়ে। শরীরবোধের আর বিচ্যুতি ঘটে না। ভীষণ বিরক্ত হল তোতাপুরী। যে অপদার্থ শরীরটার জন্যে মনকে বশে আনতে পারছি না সে শরীর রেখে আর লাভ কী? তার জন্যে কেন এত নির্যাতন? সেটাকে বিসর্জন দিয়ে মুক্ত, শুদ্ধ, অসঙ্গ হয়ে যাই।
তোতাপুরী স্থির করল ভরা গঙ্গায় ডুবে মরবে।
গঙ্গার ঘাটে চলে এল তোতা। সিঁড়ি পেরিয়ে ধীরে-ধীরে জলে নামতে লাগল। ক্রমে-ক্রমে এগুতে লাগল গভীরের দিকে, মাঝ-নদীতে। কিন্তু এ কি! গঙ্গা কি আজ শুকিয়ে গেছে? আদ্ধেক প্রায় হেঁটে চলে এল, তবু এখনো কি না ডুব-জল পেল না? এ কি গঙ্গা, না, একটা শিশে খাল? প্রায় ও-পারের কাছাকাছি এসে পড়ল, এখন কি না ফের হাঁটু-জলে এসে ঠেকেছে। এ কি পরমাশ্চর্য! ডুবে মরবার জল পর্যন্ত আজ গঙ্গায় নেই।
‘এ ক্যা দৈবী মায়া!’অসহায়ের মত চীৎকার করে উঠল তোতাপুরী।
হঠাৎ তার চোখের ঠুলি যেন খসে পড়ল। যে অব্যয়-অদ্বৈত ব্রহ্মকে সে ধ্যান করে এসেছে তাকে সে এখন দেখলে মায়ারূপিণী শক্তিরূপে। যা ব্রহ্ম তাই ব্রহ্মশক্তি। ব্রহ্ম নির্লিপ্ত, কিন্তু শক্তিতেই জীব-জগৎ। ব্রহ্ম নিত্য, শক্তি লীলা। যেমন সাপ আর তিৰ্য্যক গতি। যেমন মণি আর বিভা।
সেই বিভাবতী জ্যোতির্ময়ীকে দেখল এখন তোতাপুরী। দেখল জগজ্জননী সমস্ত চরাচর আবৃত করে রয়েছেন। যা কিছু দৃশ্য দর্শন ও দ্রষ্টা সব তিনি। শরীর-মন রোগ-স্বাস্থ্য জ্ঞান-অজ্ঞান জীবন-মৃত্যু—সব তাঁর রূপচ্ছটা! ‘একৈব সা মহাশক্তিস্তয়া সর্বমিদং ততম্।’
মা’র এই বিরাট বিশ্বব্যাপ্ত রূপ দেখে তোতা অভিভূত হয়ে গেল।
লুপ্ত হয়ে গেল ব্যাধিবোধ। নদী ভেঙে ফের সে ফিরে চলল দক্ষিণেশ্বরে।
পঞ্চবটীতে ধুনির ধারে বসল গিয়ে সে চুপচাপ। ধ্যানে চোখ বোজে আর দেখে সে জগদম্বাকে। চিৎসত্তাস্বরূপিণী পরমানন্দময়ীকে ।
সকাল বেলা তোতাকে দেখে রামকৃষ্ণ তো অবাক। শরীরে রোগের আভাসলেশ নেই। সর্বত্র প্রহর্ষ-প্ৰকাশ ৷
‘এ কি হল তোমার? কেমন আছ?’
‘রোগ সেরে গেছে।’
‘সেরে গেছে? কি করে?’
‘কাল তোমার মাকে দেখেছি।’ তোতার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।
‘আমার মাকে? ‘
‘হ্যাঁ, আমারো মাকে। জগতের মাকে। সর্বত্র তাঁর আত্মলীলার স্ফূর্তি–চিদৈশ্বর্যের বিস্তার-
‘কেন, বলেছিলাম না?’ রামকৃষ্ণ উল্লসিত হয়ে উঠল, ‘তখন না বলেছিলে, আমার কথা সব ভ্রান্তি? তোমায় কী বলব, আমার মা যে ভ্রান্তিরপেও সংস্থিতা—’
‘দেখলাম যা ব্রহ্ম তাই শক্তি। যা অগ্নি তাই দাহিকা, যা প্রদীপ তাই প্রভা, যা বিন্দু তাই সিন্ধু। ক্রিয়াহীনে ব্রহ্মবাচ্য, ক্রিয়াযুক্তেই মহামায়া।’
‘দেখলে তো, দেখলে তো? রামকৃষ্ণের খুশি আর ধরে না। ‘আমার মাকে না দেখে কি তুমি যেতে পারো?
যোগে বসে এত দেখছ আর আমার মহাযোগিনীমাকে দেখবে না?
যা মন্ত্র তাই মূর্তি। এক বিন্দু বীর্য থেকে এই অপূর্ব সুন্দর দেহ, এক ক্ষুদ্র বীজ থেকে বৃহৎ বনস্পতি, এক তুচ্ছ স্ফুলিঙ্গ থেকে বিস্তীর্ণ দাবানল। তেমনি ব্রহ্ম থেকে এই শক্তির আত্মলীলা।
‘এবার তোমার মাকে বলে আমাকে ছুটি পাইয়ে দাও।’
‘আমি কেন? তোমার মা, তুমি বলো না।’ হাসতে লাগল রামকৃষ্ণ।
তোতা চলে এল ভবতারিণীর মন্দিরে। সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলে মাকে। প্রসন্ন মনে মা তাকে যাবার অনুমতি দিলেন। রামকৃষ্ণকে বিদায় জানিয়ে কালীবাড়ি ছেড়ে চলে গেল কোন দিকে। কোন দিকে গেল কেউ জানে না।
৩১
তোতাপুরী গেল, এল গোবিন্দ রায়।
গোবিন্দ রায় জাতে ক্ষত্রিয়, কিন্তু আরবি-ফার্সিতে পণ্ডিত। ইসলামের এক-ভ্রাতৃত্বের আদর্শে মুগ্ধ হয়ে মুসলমান হয়েছে৷
ঘুরতে-ঘুরতে চলে এসেছে দক্ষিণেশ্বর। আস্তানা গেড়েছে কালীবাড়ির বাগানে। তখন এমনি উদার ব্যবস্থা। রানি রাসমণির পণ্যের আকর্ষণে হিন্দু সন্নেসির মত মুসলমান ফকিররা এসেও জমায়েত হচ্ছে। যেখানে ভক্তির রাজ্য, ভাবের রাজ্য, সেখানে আবার জাত বিচার কি! তা ছাড়া রানি যেখানে অন্নপূর্ণা। গোবিন্দ রায় দরবেশ। সূফী-পন্থী। প্রেমভাবে মাতোয়ারা। ভাবের পশরা মাথায় নিয়ে ভবের হাটে কেনা-বেচা করে।
রামকৃষ্ণর চোখ পড়ল গোবিন্দর উপর। ভাবেশ্বরীই তাকে পথ দেখালেন।
‘কি হে, এসেছ?’ ছুটে গেল রামকৃষ্ণ।
‘তুমি ডাকলে যে! না এসে কি পারি?’ গোবিন্দ রায় মহানন্দে হাসল।
চুম্বকের ডাকে লোহা চলে এসেছে ।
যেখানেই অনুভূতির গভীরতা সেখানেই স্বচ্ছ সারল্য। যেখানে জ্ঞানের বিস্তৃতি সেখানেই প্রেমের সদানন্দ৷
গোবিন্দ রায়ের বিতর্কহীন বিশ্বাস আর প্রশ্নহীন প্রেমে মুগ্ধ হয়ে গেল রামকৃষ্ণ। দেখল, এও তো একটা পথ ঈশ্বরের কাছে পৌঁছবার। এই পথেই তো মা লোককে টেনে নিয়ে চলেছেন, পৌঁছে দিচ্ছেন বিশ্বনিয়ন্তার পাদপদ্মে। এই পথটা একবার দেখে এলে কেমন হয়? পথ যখন আরেকটা আছে তখন সেটাই বা তার কাছে রুদ্ধ থাকবে কেন? সমস্ত রসের রসিক সে। সমস্ত পথের সে পর্যটক।
যত মত তত পথ। নদী নানা দিক দিয়ে আসে, কিন্তু পড়ে গিয়ে সেই সমুদ্রে। তেমনি ছাদে নানা উপায়ে ওঠা যায়। পাকা সিঁড়ি, কাঠের সিঁড়ি, বাঁকা সিঁড়ি, ঘোরানো সিঁড়ি। ইচ্ছে করলে শুধু একটা দড়ি দিয়েও উঠতে পারো। তবে যে ভাবেই ওঠো, একটা কিছু ধরে উঠতে হবে। দু সিঁড়িতে পা দিলে পড়ে যাবে মুখে থুবড়ে। যখন যেটা ধরেছ সেটা ধরেই উঠে যাও। দেখ ঠিক উঠছ কি না। ধর্ম তো আর ঈশ্বর নয়। ধর্ম হচ্ছে শুধু একটা কিছু ধরবার জন্যে। যেটা ধরে উঠতে পারবে উপরে, পর্বতচূড়ায়, যেখানে ঈশ্বর বিরাজ করছেন। যা তুমি ধরবে, তা বাপু একটু শক্ত করে ধোরো। পা পিছলে পড়ে না যাও।
কালীঘাটে যাবার নানান রাস্তা। নানান বাহন। তোমার গাড়ি-ঘোড়া না জোটে, না জুটুক, তোমার খুব দূরের পাড়ি হয়, হোক যত দূর খুশি৷ তুমি পায়ে হেঁটেই চলে এস মন্দিরে। সোজা ভক্তি-বিশ্বাসের পথ দিয়ে।
রামকৃষ্ণ ধরল গিয়ে গোবিন্দ রায়কে। বললে, ‘আমি মুসলমান হব।
চিত্রাপিতের মত তাকিয়ে রইল গোবিন্দ রায়। দেখল সে কী মহাভাববিদ্যুতি রামকৃষ্ণের চোখে-মুখে খেলে যাচ্ছে। দেখল ভক্তি-ভালোবাসার বিশাল ঝঞ্ঝা-বাতে উড়ে গেছে সব বিধি-নিষেধ, সব সংস্কার-সংকীর্ণতা। অভিমানের জঞ্জালস্তুপ।
তবু নিজের কানকে যেন বিশ্বাস হল না গোবিন্দর।
জিজ্ঞাসা করলে, ‘কি হবে?
‘মুসলমান হব। ইসলামের পথও তো একটা পথ। এই পথে কত সাধকই তো বাঞ্ছিত ধামে গিয়ে পৌঁছচ্ছেন। আমি সে পথটাই বা বাদ দেব কেন?’
‘সত্যি বলছ মুসলমান হবে?’
‘হ্যাঁ, তুমি আমাকে দীক্ষা দাও। আমার আর দেরি সইছে না—খিদের মুখেই আমার আস্বাদন চাই।’
গোবিন্দ রায় যথাবিধি দীক্ষা দিল রামকৃষ্ণকে।
রামকৃষ্ণ কাছা খুলে ফেলল। লুঙ্গির মতন করে পরল দু’গজি কাপড়। মুখে আর ‘মা’ ‘মা’ নেই, শুধু ‘আল্লা’, ‘আল্লা’। মন্দিরের ধারে-কাছেও যায় না। যে শ্যামা তার চক্ষুর চক্ষু ছিল তাকে দেখবার জন্যে আর এক বিন্দু ব্যাকুলতা নেই। বরং দেবদেবীর নাম শুনলে জ্বলে ওঠে। সেই একেশ্বর খোদাতাল্লার ভজনা করে।
থাকে মথুরবাবুর কুঠির এক পাশে। চোখের উপর এত বড় যে একটা মন্দির সেটা চোখে পড়ে না। শোনে না সকাল-সন্ধ্যার ঘণ্টার আওয়াজ।
পাঁচ বেলা নামাজ পড়ে তদ্গত মনে। নামাজের আগে পুকুরে ওজু করে নেয়। এক দিন বললেন মথুরবাবুকে, ‘মুসলমানের রান্না খাব।’
‘সে কি কথা?’
‘হ্যাঁ, খুব ঝাল-পেঁয়াজ-রশুন দেওয়া উগ্র রান্না। রান্নার গন্ধ বাতাসে টের পাওয়া যাবে।’
মথুরবাবু রাজি হন না। কিন্তু রামকৃষ্ণের দাবি দৃঢ়তর।
বেশ, মুসলমান বাবুর্চি দেখিয়ে দেবে, রাঁধবে হিন্দু বামুন। তাই সই। শিগগির-শিগগির চাপিয়ে দাও রান্না। খিদেয় পেট চোঁ-চোঁ করছে।
আমাশায় ভোগা রূগী, আঝাল ঝোল-ভাত যার পথ্য, তার জন্যে ঐ উগ্রচণ্ড রান্না। কিন্তু উপায় নেই৷ রামকৃষ্ণ যখন গোঁ ধরেছে তখন মানতেই হবে। মসলমান-বাবুর্চি বলে দিচ্ছে, আর তার কথামত রাঁধছে হিন্দু বামুন। কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাই দেখছে রামকৃষ্ণ। বাতাসে ঘ্রাণ নিচ্ছে।
হঠাৎ ডাকিয়ে আনলেন মথুরবাবুকে। বললেন, ‘এ ঠিক হচ্ছে না। বামুনকে বলো কাছা খুলে ফেলতে। ওতে আর ঐ বাবুর্চিতে কিছু তফাৎ নেই আমাকে ভাবতে দাও সেই কথা।’
মথুরবাবুর নির্দেশে বামুন কাছা খুলে ফেলল।
সানকিতে করে ভাত খেল রামকৃষ্ণ। জল খেল বদনাতে করে।
এ কি ভাব হল রামকৃষ্ণের—মথুরবাবু ভাবনায় পড়লেন। কিন্তু হৃদয় এল তেড়েফুঁড়ে, ভীষণ চোটপাটের সঙ্গে।
এ সব কী হচ্ছে পাগলামি? নিষ্ঠাচারী ব্রাহ্মণের ছেলে হয়ে এ কী ব্যবহার? পৈতে ফেলে দিয়েছ বলে কাছাও ফেলে দেবে? কাছা ফেলে দিয়েছ বলে নামাজ পড়বে ওঠ-বোস করতে-করতে? পাগলামি ছাড়ো। যাও, মন্দিরে যাও। মন্দিরে গিয়ে মা’র কাছে বোসো। তাকে ভজনা করো।
ধরে টেনে ঠেলে রামকৃষ্ণকে পাঠিয়ে দিল মন্দিরের দিকে। কতক্ষণ পরে হৃদয় মন্দিরে এসে দেখে রামকৃষ্ণের টিকিটিও কোথাও নেই। কোথায় গেল মামা? ব্যস্ত হয়ে ছুটোছুটি করতে লাগল হৃদয়। মথুরবাবুর কুঠির বারান্দাতেও নেই, নেই বা গঙ্গার ধারে-কাছে। বাগান-পঞ্চবটীও শূন্য। তবে কোথায় অদৃশ্য হল? খুঁজতে খুঁজতে চলে এল রাস্তায়। রাস্তা ছেড়ে সামনের মসজিদে।
দেখল মসজিদে নামাজ পড়ছে রামকৃষ্ণ।
দুষ্টুমি করার সময় ছোট ছেলে যেন ধরা পড়েছে অভিভাবকের কাছে। হৃদয় যেন রুদ্রচক্ষু গুরুজন আর রামকৃষ্ণ অবোধ অপোগণ্ড শিশু।
বললে, ‘আমি কি করব বল, আমার কোনো দোষ নেই। আমাকে কে যেন জোর করে এখানে টেনে এনেছে।’
সক্কাল বেলা। আজান দিয়েছে মসজিদ থেকে। রামকৃষ্ণ দে-ছুট ।
‘এ কি, তুমি কে?’ প্রথম দিন জিজ্ঞেস করেছিল মুসলমানেরা।
ওদের থেকেই কে একজন বললে, ‘ওকে চেন না? ও মন্দিরে থাকে, পুজো-টুজো করে—’
‘করে না করত। আমি এখন ইসলামের দীক্ষা নিয়েছি। আমার ভাইদের সঙ্গে একত্র উপাসনা করব।
সকলে ভাবলে পাগল হবে বা। কিন্তু সাধ্য নেই তাকে কেউ তাড়িয়ে দেয়। নামাজের প্রত্যেকটি কৃত্য-করণ তার মুখস্থ। আর সব চেয়ে মর্মস্পর্শী হচ্ছে তার মুখস্থ ভাবটি। যে ভাবটি আসে শুধু সরলতা থেকে, ব্যাকুলতার সরলতা।
তিন দিন ছিল এই ইসলামভাবে।
একদিন হঠাৎ এক জ্যোতির্ময় পুরুষ তার সামনে আবির্ভূত হল। মসজিদে যখন নামাজ পড়তে এসেছে। বৃদ্ধ ফকিরের বেশ, মাথার চুল সব শাদা, গোঁফদাড়িও তাই। গলায় কাঁচের মালা, হাতে লাঠি। বললে, ‘তুমি এসেছ? বেশ–বলে হাসল, হাত নেড়ে আশীর্বাদ করল। সেই পুরুষ-প্রবর বিরাট ব্রহ্মেরই প্রতিভাস। পরে আরো এক দিন দেখেছিলেন তাকে ঠাকুর। বললেন, ‘মা ভেদবুদ্ধি সব
দূর করে দিলেন। বটতলায় বসে ধ্যান করছি, দেখলেন এক জন বুড়ো মুসলমান সানকি করে ভাত নিয়ে সামনে এল। সানকি থেকে ম্লেচ্ছদের খাইয়ে আমাকে দুটি দিয়ে গেল। মা দেখালেন এক বই দুই নেই—’
মা’র মন্দিরে বসে তোরা চোখ বুজে কেন ধ্যান করিস বল তো? সাক্ষাৎ মা চিন্ময়ী বিরাজ করছেন, আশ মিটিয়ে দেখে নে। দ্যাখ তাঁর আয়ত-শান্ত চোখ দুটি, দ্যাখ তার পাদপদ্ম দুখানি। যখন আপন মা’র কাছে যাস মাকে দেখতে, তখন কি চোখ বন্ধ করে মা’র কাছে বসিস, না, মালা ফেরাস বসে-বসে?
চেয়ে দ্যাখ দেখি—এ তোর আপনার মা নয়?
‘শিখেরা বলেছিল, ঈশ্বর দয়ালু। আমি বললাম, তিনি আমাদের মা-বাপ, তিনি আবার দয়ালু কি! ছেলের জন্ম দিয়ে বাপ-মা লালন-পালন করবে না, করবে কি বামুন-পাড়ার লোকেরা?’
কালীমন্দিরের চাতালে বসে স্তব করছে রামকৃষ্ণ,
‘ও মা, ও মা ওঁকাররূপিণী মা!
এরা কত কি বলে মা, কিছু বুঝতে পারিনি। কিছু জানি না মা । শুধু শরণাগত! শরণাগত! কেবল এই কোরো মা তোমার শ্রীপাদপদ্মে যেন শুদ্ধা ভক্তি হয়।
আর যেন তোমার ভুবনমোহিনী মায়ায় মুগ্ধ কোরো না। শরণাগত! শরণাগত!’
৩২
এই সেই যদু মল্লিক।
তুমি বড্ড হিসেবী লোক। অনেক হিসেব করে কাজ করো, তাই না? সেই বামুনের গরু খাবে কম, নাদবে বেশি, আর হুড়হুড় করে দুধ দেবে-
কি বললেন?
তুমি বড় অন্যমনস্ক। ঈশ্বরচিন্তায় নয়, বিষয়চিন্তায়। কোন ব্যঞ্জনে নুন হয়েছে কোন ব্যঞ্জনে হয়নি এ তুমি বুঝতে পারো না।
কেউ যদি বলে দেয়, এ ব্যঞ্জনে নুন হয়নি, তখন এ্যাঁ-এ্যাঁ করে বলো, হয়নি না কি? তখন তোমার হুঁস হয়। কেউ না বলে দিলে-
আপনি বলে দিন।
তুমি সেই রামজীবনপুরের শিলের মত – আধখানা গরম, আধখানা ঠাণ্ডা। ঈশ্বরেও মন আছে, আবার সংসারেও মন আছে—
ষোলো আনা গরম করে দিন।
অসম্ভব। কথা দিয়ে কথা রাখো না কেন? বাড়িতে যে চণ্ডীর গান দেবে বলেছিলে, তা হল কই? কত দিন কেটে গেল—
অনেক ঝঞ্ঝাট—নানান ঝামেলা।
তুমি পুরুষ-মানুষ তো বটে? তবে কথা রাখবে না কেন? পুরুষ-মানুষের এক কথা। কি, মানো?
তা মানি বৈ কি।
তা যদি মানো, সেই মান সম্বন্ধে যদি হুঁস থাকে, তবে তো মানুষই হয়ে যেতে। মান-হুঁস—মানুষ। আর পুরুষ কাকে বলে? পুরুষের সম্পদ কোথায়?
যদু মল্লিক তাকাতে লাগল এদিক-ওদিক।
কথায়।
হাতির দাঁত, আর পুরুষের? পুরুষের বাত। এক কথার মালিক যে সেই পুরুষ।
এই সেই যদু মল্লিক।
এই যদু মল্লিকের বাগান-বাড়িতে এক দিন বেড়াতে এসেছে রামকৃষ্ণ। বৈঠকখানায় বসে গল্প করছে যদুর সঙ্গে। হঠাৎ দেয়ালে-টাঙানো একখানা ছবির দিকে তার নজর পড়ল। বড় মধুর ভাবের ছবিখানি।
মা আর ছেলে। মা’র নধর বাহুর বেষ্টনীতে পবিত্র একটি শিশু, ঊষার আকাশে প্রথম উদয়ভানু। মা’র দুটি বড়-বড় বিভোর চোখে দ্রবীভূত স্নেহ, মুখে তৃপ্তি-পূর্ণ হাসি। আর শিশুর মুখে সে যে কি নিষ্পাপ সারল্য তা রামকৃষ্ণ যেমন বুঝছে তেমন কি কেউ বুঝবে?
‘ওরা কারা হে?’
এক মেমসাহেব আর তার ছেলে।
তাই হবে বা। অন্য দিকে চোখ ফেরাতে চাইল রামকৃষ্ণ।
কিন্তু চোখ ফেরায় এমন সাধ্য নেই। বলো না সত্যি করে। ওরা কে? ও তো দেখছি জ্যোতির্ময় দেবশিশু। আর ওর মা তো পুণ্যময়ী পবিত্রতা।
‘মা মেরী আর তার ছেলে যীশু খৃষ্ট।’
একদৃষ্টে চেয়ে রইল রামকৃষ্ণ। দেখল যশোদা আর তার কোলে বালগোপাল। সোজা শম্ভু মল্লিকের কাছে গিয়ে হাজির হল। বললে, ‘যীশু খৃষ্টের গল্প শোনাও আমাকে।’
এই সেই শম্ভু মল্লিক ।
হাসপাতাল করা, ডিসপেনসারি করা, রাস্তা বানানো, কুয়ো কাটানো—এই সবে বড় ঝোঁক। এ সব কাজ অনাসক্ত হয়ে করতে পারো তো বুঝি। নইলে ও-সবের পিছনে তো শুধু নামের পিপাসা, ঢাকের বাদ্যি। কালীঘাটে এসে যদি শুধু দানই করতে থাকো তো কালীদর্শন হবে কখন? আগে যো-সো করে ধাক্কাধুক্কি খেয়েও কালীদর্শন করে নাও, তার পর দান যত করো আর না-করো। ঈশ্বর যদি তোমার কাছে এসে বলেন, কী বর চাও, তখন তুমি কী বলবে? বলবে, কতগুলি হাসপাতাল-ডিসপেনসারি করে দাও, না, স্থান দাও, আশ্রয় দাও, তোমার পাদপদ্মে?
গৌরবর্ণ পুরুষ, মাথায় তাজ। ভাবে তাকে দেখেছিল রামকৃষ্ণ। দেখেছিল সেবায়েৎ বলে। সেজোবাবুর পরে রসদদার এই শম্ভু মল্লিক। বাগবাজার থেকে হেঁটে চলে আসে বাগানে। আসে সটান পায়ে হেঁটে। কেউ যদি বলে, অত রাস্তা গাড়ি করে আস না কেন? যদি কোনো বিপদ হয়। শম্ভু মুখ লাল করে বলে, মা’র নাম করে বেরিয়েছি, আমার আবার বিপদ! ‘আমি বই-টই কিছু পড়িনি, কিন্তু দেখ দেখি মা’র নাম করি বলে আমায় সবাই মানে।’শম্ভু মল্লিককে বলেছিল এক দিন রামকৃষ্ণ।
‘আহা, তা আর জানি না?’সহাস্য সারল্যে বললে শম্ভু মল্লিক, ‘ঢাল নাই তরোয়াল নাই, শান্তিরাম সিং।’
জানোই তো আমার বিদ্যেবুদ্ধি। তবে এবার একটু বাইবেল শোনাও দিকি। শম্ভু মল্লিক বাইবেল নিয়ে বসল। আবিষ্টের মত শুনতে লাগল রামকৃষ্ণ। ভূমাভিমুখী মন নামল অবগাহনে।
পরে এক দিন উন্মনার মত চলে এল যদু মল্লিকের বাগান-বাড়িতে। যদু মল্লিক বাড়ি নেই। বৈঠকখানা খুলে দিলে চাকররা। শিশষুতা মাতৃচিত্রের কাছে বসল রামকৃষ্ণ।
‘মা গো, তুই আমাকে এ কী দেখাচ্ছিস?’
রামকৃষ্ণ দেখল সেই ছবি যেন জীবনায়িত হয়ে উঠেছে। মা আর ছেলের দিব্য অঙ্গের জ্যোতিতে ভেসে যাচ্ছে দশ দিক। তার অন্তর-বাহির ধুয়ে যাচ্ছে সেই জ্যোতিস্নানে। এত দিনের দৃঢ়মূল সংস্কার উন্মুলিত হয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব-সংসারে আর কেউ বিরাজমান নয়—শুধু পীযূষপ্রেমময় যীশু। কৃষ্ণ নয়, খৃষ্ট। ঈশান নয়, ঈশা।
দেখল এ ঘর যেন গির্জা হয়ে গিয়েছে। নানা ধূপ দীপ মোমবাতি জেলে ব্যাকুলতার মূকমূর্তি হয়ে প্রার্থনা করছে পাদরিরা। সামনে ক্লেশভারক্লিষ্ট অথচ অক্লিষ্টকান্তি দেবতা।
কে তুমি পরম যোগী পরম প্রেমিক? কে তুমি ‘আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ?’ সংসারদুঃখগহন থেকে জীবের উদ্ধারের জন্যে বুকের রক্ত ঢেলে দিলে। যাকে ত্রাণ করতে এলে তারই হাতে প্রাণ দিলে হাসিমুখে। এলে যে যন্ত্রণার নিবারণে সেই যন্ত্রণাই ক্ষমা হয়ে প্রেম হয়ে শান্তি হয়ে উদ্ভাসিত হল।
হাঁটতে-হাঁটতে চলে এল এক গির্জার সামনে। বড় রাস্তার পারে বড় গির্জা। সব বিদেশী-বিজাতীয়দের ভিড়। ‘রাজার বেটা’ না হোক, সব রাজার জাতের লোক। ভিতরে ঢুকতে সাহস পেল না রামকৃষ্ণ। কে জানে, হয়তো বা কালী-ঘরের খাজাঞ্চি বসে আছে।
‘মা গো, খৃষ্টানরা গির্জেতে তোমাকে কি করে ডাকে একবার দেখিও। কিন্তু ভিতরে গেলে লোকে কি বলবে? যদি কিছু হাঙ্গামা হয়? আবার কালী-ঘরে ঢুকতে না দেয়! তবে মা, গির্জের দোরগোড়া থেকেই দেখিও।’
গির্জার দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াল রামকৃষ্ণ। চক্ষু মেলে তাকাল একবার ভিতরে। সর্বতশ্চক্ষু রামকৃষ্ণের চোখে এখন ‘পরম পশ্যন্তী দৃষ্টি।’ দেখল সত্যি-সত্যিই এ কালী-ঘর। ভিতরে, বেদীতে, মা বসে আছেন। মা জগদম্বা। মা ভবতারিণী। সব্যে খড়্গামুণ্ডকরা, অসব্যে বরাভয়দাত্রী—সেই মা, যিনি করালী হয়েও কৈবল্য-দায়িনী। আনন্দধারায় দুই চোখ ভেসে গেল রামকৃষ্ণের।
সর্বত্রই এই মা’র ভজন। সর্বস্থানই মাতৃস্থান। কাজলের ঘরে বাস করলে গায়ে কালি লাগবেই, কিন্তু কোথাও আর কাজলের ঘর নেই—সর্বত্র কালী-ঘর। যিনি যীশু খৃষ্ট তিনিই মোক্ষকরী শিবকরী মাহেশ্বরী।
তিন দিন থাকল এই খৃষ্টান ভাবে। চার দিনের দিন পঞ্চবটীতে বেড়াচ্ছে রামকৃষ্ণ, দেখল কে এক জন গৌরবর্ণ পুরুষ হঠাৎ তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বুঝতে দেরি হল না, বিদেশী, বিজাতি। কিন্তু সৌম্য আননে কী অপার সৌন্দর্য, সর্বাঙ্গে দেবদ্যুতি। কে তুমি? তুমিই কি সেই পরুষোত্তম যীশু? তুমিই কি সেই তমালশ্যামল বনমালী?
সেই দেবমানব আলিঙ্গন করল রামকৃষ্ণকে। এক দেহে লীন হয়ে গেল দুজনে। লীন হয়ে গেল ব্রহ্মাত্মবোধে।
‘আচ্ছা তোরা তো সবাই বাইবেল পড়েছিস, এক দিন ভক্তদের জিজ্ঞাসা করলেন ঠাকুর, ‘সেইখানে যীশুর চেহারার কোনো বর্ণনা আছে?’
না, বাইবেলে তার উল্লেখ নেই।
‘আচ্ছা, যীশু কেমন দেখতে ছিল বল তো?’
কে জানে! তবে ইহুদি ছিলেন যখন তখন রং গৌর চোখ টানা আর নাক টিকলো ছিল নিশ্চয়ই।
‘কিন্তু আমি যখন দেখেছিলাম, দেখলাম নাক একটু চাপা। কেন দেখলাম কে জানে।’
ভাবে-দেখা মূর্তি কি বাস্তব মূর্তির অনুরূপ হয়? কিন্তু যীশু খৃষ্টের আকৃতির যে বর্ণনা পাওয়া গেছে তাতে তাঁর নাক চাপা বলেই লেখা আছে।
‘মা গো, সবাই বলছে আমার ঘড়ি ঠিক চলছে। হিন্দু মুসলমান খৃষ্টান ব্রহ্মজ্ঞানী সকলেই বলে আমার ধর্মই ঠিক। কিন্তু মা, কারুর ঘড়িই তো ঠিক চলছে না। তোমার ঘড়ির সঙ্গে কেউই তো মিলিয়ে নিচ্ছে না ঠিক-ঠিক। সবাই ঘড়ির কাঁটা দেখে, কেউই তোমাকে দেখে না।’
মিশ্র এসেছে ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে। ধর্মে খৃষ্টান, বাড়ি পশ্চিমে। ভাই গিয়েছিল বিয়ে করতে, সেখানে বরের সভায় শামিয়ানা চাপা পড়ে মারা যায়। একা নয়, সঙ্গে আরো একটি ভাই—গিয়েছিল বরযাত্রী। সেই থেকেই মিশ্র সন্ন্যাসী। পরনে প্যান্ট কোট বটে, কিন্তু ভিতরে গেরুয়ার কৌপীন৷
‘ইনিই ঈশ্বর, ইনিই রাম, ইনিই কৃষ্ণ—’ বলতে লাগল মিশ্র।
ঠাকুর হাসছেন। বলছেন, ‘পুকুরে অনেকগুলি ঘাট। এক ঘাটে হিন্দুরা জল খাচ্ছে, বলছে জল। আরেক ঘাটে খৃষ্টানরা খাচ্ছে, বলছে ওয়াটার। মুসলমানেরা আরেক ঘাটে খাচ্ছে, বলছে পানি।’ মিশ্রের দিকে তাকালেন ঠাকুর। বললেন, ‘কিছু দেখতে-টেকতে পাও?’
শুধু আপনাকে দেখি। আপনি আর যীশু, এক।’
ঠাকুরের বুঝি যীশুর ভাব হল। দাঁড়িয়ে পড়লেন। সমাধিস্থ হয়ে গেলেন। ভাবাবেশে মিশ্রের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলেন। সেকহ্যাণ্ড করতে লাগলেন। সবাইর সঙ্গে মিশে এক হয়ে যাবে। তার পরে আবার নিরালায় ফিরে যাও নিজের ঘরে। সেখানে গিয়ে ফের শান্তিতে থাকো। রাখালেরা এক-এক বাড়ি থেকে গরু চরাতে নিয়ে যায়, কিন্তু মাঠে গিয়ে সব গরু মিলে-মিশে একাকার। আবার সন্ধ্যের সময় ফিরে যায় নিজের-নিজের ঘরে, আপনাতে আপনি থেকে। গড়ের মাঠে বেড়াতে গিয়েছে রামকৃষ্ণ। বেলুন উঠবে, বেজায় ভিড়। জায়গা নিয়েছে এক পাশে। হঠাৎ নজরে পড়ল, একটি সাহেবের ছেলে গাছে হেলান দিয়ে ত্রিভঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যাই দেখা, শ্রীকৃষ্ণের উদ্দীপন হয়ে গেল। সমাধি হয়ে গেল রামকৃষ্ণের।
উলোর বামনদাস ঠিকই বলে। বলে, ‘বাবাঃ, বাঘ যেমন মানুষ ধরে তেমনি ঈশ্বরী একে ধরে রয়েছেন।
৩৩
মধুসূদন এসেছে দক্ষিণেশ্বরে—মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
এসেছে ব্যারিস্টার হিসাবে। মথুরবাবুদের বড় ছেলে দ্বারিক ডেকে এনেছে। বারুদ ঘরের সাহেবদের সঙ্গে যে মামলার যোগাড় হয়েছে সেই উপলক্ষ্যে। দপ্তরখানার পাশে বড় ঘর। সেই ঘরে বসেছে মাইকেল। বললে, ‘শ্রীরামকৃষ্ণকে একবার দেখব।’
খবর গেল রামকৃষ্ণের কাছে। রামকৃষ্ণ যেতে চায় না। অত বড় গণ্যমান্য লোক, দুর্দান্ত সাহেব, তার কাছে গিয়ে দাঁড়াবে কি! হৃদয়কে বললে, ‘তুই যা!’ হৃদয় গেলে হবে কেন? দ্বারিক বিশ্বাস আবার তাগিদ পাঠাল।
নারায়ণ শাস্ত্রী ছিল সামনে, রামকৃষ্ণ বললে, তুমিও সঙ্গে চল। ইংরিজি-টিংরিজি জানি না-কি বলতে কি বলব তার ঠিক নেই—’
দুজনে এসে দাঁড়াল মাইকেলের মুখোমুখি। রামকৃষ্ণ ঠেলে দিল নারায়ণ শাস্ত্রীকে। বললে, ‘তুমিই কথা কও।’
নারায়ণ শাস্ত্রী সংস্কৃতে আলাপ চালাল।
মাইকেল বললে, ‘বাংলাতেই কথা বলুন—’
নারায়ণ শাস্ত্রী বললে, ‘তুমি নিজের ধর্ম কেন ছাড়লে?’
মাইকেল পেট দেখাল। বললে, ‘পেটের জন্যে।’
পেটের জন্যে? চটে উঠল নারায়ণ শাস্ত্রী, পেটের জন্যে তুমি ধর্ম ছাড়লে? তোমার বাপ-পিতেমোর ধর্ম? যে পেটের জন্যে ধর্ম ছাড়ে তার সঙ্গে কী কথা কইব!’ ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিলে।
কিন্তু আপনি কিছু বলুন—মাইকেল মিনতি করলে রামকৃষ্ণকে।
এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল রামকৃষ্ণ। বললে, ‘আশ্চর্য, আমি কিছুই বলতে পারছি না। কে যেন আমার মুখ চেপে ধরছে।’
রামকৃষ্ণের চাইতে মাইকেল বয়সে বারো বছর বড়। তা হলে কি হয়, করজোড় করল মাইকেল। বললে, আমাকে কেন আপনার কৃপা হবে না? আমি আপনার ‘ভক্ত’–
‘সে কথা নয়। আমি তো চাই কথা বলতে, কিন্তু বারে বারে কে যে আমার মুখে চেপে ধরছে, কথা কইতে দিচ্ছে না।’
মরমে মরে গেল মাইকেল। সে কি এত অভাজন? এত পরিত্যাজ্য?
বাজল বুঝি রামকৃষ্ণের। বললে, ‘গান শোনো। গান শুনলে শান্তি পাবে।
রামপ্রসাদী গান ধরল রামকৃষ্ণ। রক্তাক্ত ক্ষতে যেন প্রলেপ পড়ল। শান্তিতে চোখ বুজল মাইকেল।
কিন্তু নারায়ণ শাস্ত্রীর রাগ যাবার নয়। রামকৃষ্ণের ঘরের সামনেকার দেয়ালে কয়লা দিয়ে বড়-বড় অক্ষরে বাংলায় সে লিখলে, পেটের জন্যে ধর্ম ছাড়া মূঢ়তা ৷
মথুরকে বামনি বলত, প্রতাপরুদ্র। কত কি করলেন প্রাণ ঢেলে। আলাদা ভাঁড়ার করে দিলেন সাধু সেবার জন্যে। গাড়ি পালকি যাকে যা দিতে বলেছে রামকৃষ্ণ, দিয়ে দিলেন। একবার সাধ হল ভালো জরির সাজ পরবে, আর রূপোর গুড়গুড়িতে তামাক খাবে। সব কিনে পাঠিয়ে দিলেন মথুরবাবু। জরির সাজ পরে গুড়গুড়ি বাগিয়ে নানারকম করে টানতে লাগল রামকৃষ্ণ—একবার এ পাশ থেকে, একবার ও পাশ থেকে, উঁচু থেকে নিচু থেকে। মনকে বোঝাল, মন, এরই নাম সাজ আর এরই নাম রূপোর গুড়গুড়িতে তামাক খাওয়া। অমনি খুলে ফেলল সাজ, ছুঁড়ে ফেলল গুড়গুড়ি।
‘কামনা থাকতে, ভোগলালসা থাকতে মুক্তি নেই। আমি তারি জন্যে যা-যা মনে উঠত অমনি করে নিতাম। বড়বাজারের রং-করা সন্দেশ খেতে ইচ্ছে হল। খুব খেলুম। তার পর অসুখ। ধনেখালির খইচুর, কৃষ্ণনগরের সরভাজা—তাও খেতে সাধ হয়েছিল। ছাড়িনি একটাও—’
মথুরবাবু এসে বললেন, তাঁর স্ত্রী জগদম্বার মরণাপন্ন অসুখ। ডাক্তার-কবরেজরা জবাব দিয়ে দিয়েছেন। স্ত্রী তো চলেছেই, সঙ্গে-সঙ্গে তাঁর এই বিষয়-আশয়ও শেষ হয়ে যাবে।
পাগলের মতো হয়ে গিয়েছেন। তাঁকে ধরে পাশে বসাল রামকৃষ্ণ। কি হয়েছে? এত উতলা হবার আছে কী!
রামকৃষ্ণের পায়ের উপর পড়লেন। বললেন, আমার যা হবার তা তো হবেই। কিন্তু, বাবা, তোমার সেবা আর করতে পাব না। ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন মথুরবাবু।
করুণায় মন বুঝি ভরে গেল রামকৃষ্ণের। বললে, ‘যাও, বাড়ি যাও। তোমার স্ত্রী দিব্যি ভালো হয়ে উঠেছেন।’
উৎফুল্ল মনে বাড়ি ফিরলেন মথুরবাবু। দেখলেন, এ কি ইন্দ্রজাল, স্ত্রীর দেহে আর রোগ নেই।
‘ইন্দ্রজাল নয়। ঐ রোগ এই দেহের মধ্যে টেনে এনেছি।’ বললে রামকৃষ্ণ।
ছয় মাস ভুগল এক নাগাড়ে।
বর্ষা আসতেই মথুরবাবু ভাবিত হলেন। গঙ্গার জল এখন লোনা হয়ে উঠবে। আর, খাবার জল বলতে তো ঐ গঙ্গাজলই। নির্ঘাৎ তবে ফের পেটের অসুখ করবে রামকৃষ্ণের। এখানে থেকে তবে আর কাজ নেই। কয়েক দিন বরং দেশের বাড়িতে গিয়ে থেকে এস৷
মন্দ কি। দেখে আসি একবার জন্মভূমি। আট বছর এই দেশ ছাড়া। দেখে আসি একবার সারদাকে।
‘মা গো, তুমি যাবে কামারপকুর?’ চন্দ্রমণিকে শুধোল রামকৃষ্ণ।
‘না বাবা, গঙ্গাতীর আর ছাড়ব না। এইখানেই কাটিয়ে যাব বাকি জীবন। তুমি বামনিকে নিয়ে যাও।’
না-বলতেই প্রস্তুত বামনি।
আর কে যাবে সঙ্গে?
কেন, হৃদয়? দেশে-গাঁয়ে রটে গেছে, পাগল হয়ে গিয়েছে রামকৃষ্ণ। কাছা খুলে ফেলে আল্লা-আল্লা করছে। স্ত্রীবেশ ধরে গয়না-গাটি পরে ঢপ গাইছে। একবার চোখে আঙুল দিয়ে সবাইকে দেখিয়ে আসি।
মথুরবাবু আর তাঁর স্ত্রী দুজনে মিলে সব গোছগাছ করে দিচ্ছেন। যাতে দেশে গিয়ে রামকৃষ্ণের তৃণমাত্র না অসুবিধে হয়। কামারপুকুরের সংসার তো শিবের সংসার। জানতেন তা দুজনে—তাই ‘ঘর-বসত’ সঙ্গে দিয়ে দিচ্ছেন। মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠাবার সময় বাপ-মা যেমনটি করে দেয় সাজিয়ে-গুছিয়ে প্রদীপের সলতেটি থেকে দাঁতের খড়কে কাঠিটি পর্যন্ত।
গ্রামে আনন্দ-বাজার বসে গেল। ওরে, শুনেছিস, রামকৃষ্ণ এসেছে। সঙ্গে কে এক ভৈরবী। হাতে মস্ত ত্রিশূল। চল দেখবি চল।
জয়রামবাটিতে সারদাকে খবর পাঠাল রামকৃষ্ণ। ব্রাহ্মণী এসেছেন, তুমি এস। তুমি নইলে কে ওঁর সেবা করবে? সঙ্গে মা আসেননি, কিন্তু উনিই তোমার শ্বশ্রুমাতা।
সত্যিকারের এই প্রথম স্বামিসন্দর্শন সারদার। চৌদ্দ পেরিয়ে সে এখন পনেরোয় পা দিয়েছে। সে এখন স্বভাবসুন্দরাঙ্গা কিশোরী। শুভাননা। সর্বকল্যাণকারিণী। কীর্তির্লক্ষ্মীধৃতির্মেধাপুষ্টিঃশ্রদ্ধাক্ষমামতিঃ -র সমাহার।
স্বামীকে প্রথম দেখেছে ছ-সাত বছর বয়সে। ভালো করে কিছু মনে পড়ে না। পা ধুয়ে চুল দিয়ে মুছে দিয়েছিল—এই একটু মনে পড়ে ঝাপসা ঝাপসা। বিয়ের সময় লোকে বলেছিল, পাগলা-জামাই হয়েছে। শিব গেল শ্বশুরবাড়ি, সবাই বলতে লাগল, ‘ও মা উমা, তোর এই ছিল কপালে! শেষে একটা ভাঙড়ের হাতে পড়লি? এখন তো শুনি আরো কত কি কথা! কে জানে এখন গিয়ে না-জানি কি রকম দেখব!
বাড়ির মধ্যে কোথায় গিয়ে লুকিয়েছে সারদা। কিন্তু হৃদয়ের চোখ এড়াবে এমন তার সাধ্য নেই। খুঁজে বার করে ফেলেছে সারদাকে। বলছে, ‘এই দেখ তোমার জন্যে কত পদ্মফুল যোগাড় করে এনেছি।’ সারদা তো লজ্জায় এতটুকু। ‘দাঁড়াও, পদ্মফুল দিয়ে তোমার পাদপদ্মদুখানি পূজা করি।’
কিন্তু যাঁর পাদপদ্মের লোভে সারদা ছুটে এসেছে তিনি কোথায়?
দূর থেকে দেখল রামকৃষ্ণকে। কী রূপ, কী রঙ! সৌন্দর্য যেন স্থির হয়ে বসে নেই, আনন্দে লীলা করে বেড়াচ্ছে।
ঘরের বার হলেই মেয়ে-পুরুষ হাঁ করে দেখে রামকৃষ্ণকে। সঙ্গে হৃদয়, ভূতির খালের দিকে বেড়াতে চলেছে এক দিন। মেয়েরা জল ভরছে খাল থেকে। আর জল-ভরা! চার পাশ থেকে দেখছে সবাই একদৃষ্টে। বলাবলি করছে, ওরে, ঐ ঠাকুর—ঐ রামকৃষ্ণ। আঙুল তুলে দেখাচ্ছে পরস্পরকে। —ও হৃদু, আমায় ঘোমটা দিয়ে দে, আমায় ঘোমটা দিয়ে দে, হৃদয় তো অবাক।
‘ওরে, ওরা আমার বাইরের রূপ দেখছে! কী সর্বনাশ! শিগগির আমায় ঘোমটা দিয়ে দে। নইলে আমি এক্ষুণি ন্যাংটা হব।’
‘না মামা, এখানে ন্যাংটা হয়ো না।’ হৃদয় গম্ভীর হয়ে বললে, ‘এখানে ন্যাংটা হলে লোকে কী বলবে!’
‘নইলে যে পালাবে না মেয়েগুলো।’
‘দাঁড়াও, আমি তোমার মুখ ঢেকে দিচ্ছি। কেউ আর তোমার রূপ দেখবে না।’ খালি গায়ে চাদর ছিল রামকৃষ্ণের, তাই দিয়ে হৃদয় তার মুখ ঢেকে দিলে।
রাত থাকতেই ওঠে রামকৃষ্ণ। উঠেই ফরমাস করে সারদাকে আর লক্ষ্মীর মাকে, আজকে এই-এই সব খাব। এই-এই সব রেঁধো। সব যোগাড় করে রাঁধে দুজনে। এক দিন পাঁচফোড়ন ছিল না, লক্ষ্মীর মা বললে, ‘তা অমনিই হোক, নেই তার কি হবে?’ শুনতে পেয়েছে রামকৃষ্ণ। বললে, ‘সে কি গো, পাঁচফোড়ন নেই, এক পয়সার আনিয়ে নাও না। যাতে যা লাগে তা বাদ দিলে হবে কেন? তোমাদের এই ফোড়নের গন্ধের বেন্নন খেতে দক্ষিণেশ্বরের মাছের মুড়ো আর পায়েসের বাটি ফেলে এলাম, আর তাই তোমরা বাদ দিতে চাও?’ দুই জা’ তখন লজ্জা রাখবার জায়গা পায় না।
কিন্তু পরক্ষণেই আবার আরেক রকম সুর ধরে রামকৃষ্ণ। ‘আঃ, আমার এ কি হল? সকাল থেকে উঠেই কি খাব! কি খাব! রাম রাম!’
এক দিন খেতে বসেছে দুজনে—রামকৃষ্ণ আর হৃদয়। রেঁধেছেও দুজনে—লক্ষ্মীর মা আর সারদা।
লক্ষ্মীর মা পাকা রাঁধুনি, তার রান্নায় তার বেশি। আর সারদা ছেলেমানুষ বউ, তার রান্না অখাদ্য!
লক্ষ্মীর মা যেটা রেঁধেছে সেটা মুখে তুলে রামকৃষ্ণ বললে, ‘ও হৃদু এ যে রেঁধেছে সে রামদাস বদ্যি।’ আর সারদা যেটা রেঁধেছে সেটা মুখে ঠেকিয়ে বললে, ‘আর এ যে রেঁধেছে সে ছিনাথ সেন।
রামদাস ভালো চিকিৎসক আর শ্রীনাথ সেন হাতুড়ে।
রামকৃষ্ণ বুঝি একটু ঠেস দিলে সারদাকে!
হৃদয় বললে, ‘তা হোক। তবে তোমার এ হাতুড়ে তুমি সব সময়ে পাবে—গা টিপতে, পা টিপতে পর্যন্ত। ডাকলেই হল। এক পায়ে খাড়া।
আর রামদাস বদ্যি? তার অনেক টাকা ভিজিট, সব সময়ে পাবেও না তাকে। লোকে আগে হাতুড়েকেই ডাকে—সে তোমার সব সময়ের বান্ধব!’
তা বটে, তা বটে। হাসতে লাগল রামকৃষ্ণ। ও সব সময়ে আছে।
বৃষ্টি হয়ে গেছে সেদিন, ভূতির খালের দিক থেকে একা-একা ফিরছে রামকৃষ্ণ। পায়ে কি যেন একটা ঠেকল। চেয়ে দেখল মস্ত একটা মাগুর মাছ। পকুর থেকে রাস্তায় কখন উঠে এসেছে। পায়ে করে ঠেলে-ঠেলে এনে মাছটাকে রামকৃষ্ণ পুকুরে ছেড়ে দিলে। বললে, ‘পালা, পালা! হৃদে দেখতে পেলে তোকে আর আস্ত রাখবে না।’
পরে বললে হৃদয়কে, ‘ওরে এই এত বড় একটা মাগুর মাছ—হলদে রং—রাস্তায় উঠে এসেছিল পুকুর থেকে—’
‘কই? কী করলে?’ চার দিকে তাকাতে লাগল হৃদয়।
‘পুকুরে ছেড়ে দিলাম।
‘ও মামা, তুমি করলে কি গো! এত বড় মাছটা তুমি ছেড়ে দিলে! আঃ, আনলে কি রকম ঝোল হত—
জয়রামবাটিতে এক দিন ভোর রাতে একটা বাছুর খুব চেঁচাচ্ছে। গরু দুইছে এ-সময়, মা’র কাছে বাছুরটাকে ঘেঁষতে দেওয়া হচ্ছে না। দূরে বেঁধে রেখেছে খুঁটিতে। প্রবোধ মানছে না বাছুর, মা’র স্তন্যের জন্যে আর্তনাদ করছে। ‘যাই মা যাই, ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে সারদা, করুণারূপিণী কিশোরী, বলছে, ‘আমি এক্ষুনি তোকে ছেড়ে দেব, এক্ষুনি তোকে ছেড়ে দেব দ্রুত পায়ে এসে বাছুরের বন্ধন মুক্ত করে দিলে সারদা।
৩৪
ও মামি, ও কী হচ্ছে? সারদা হকচকিয়ে উঠল।
সঙ্গে-সঙ্গে লক্ষ্মীও। বর্ণপরিচয় পড়ছিল দুজনে। পিছন থেকে হুমকে উঠল হৃদয়, ‘বই পড়া হচ্ছে?’
সারদার হাত থেকে কেড়ে নিল বই। বললে, ‘মেয়েছেলের লেখাপড়া শিখতে নেই। শেষে কি নাটক নভেল পড়বে?’
লক্ষ্মীর বইও কাড়তে গেল, পারলে না। ঝিয়ারি মানুষ, তার সঙ্গে আঁটবে কে! সটান গেল সে পাঠশালায় পড়ে আসতে।
লুকিয়ে সারদাও আরেকখানা কিনে আনাল বর্ণপরিচয়। লক্ষ্মী শিখে এসে পড়াতে লাগল সারদাকে।
এক ফোঁটাই পড়, তাও না।’
‘কী হবে লিখে-পড়ে? পাঁজিতে লিখেছে বিশ আড়া জল, কিন্তু পাঁজি টিপলে এক ফোঁটাও পড়ে না।
পড়ার চেয়ে শোনা ভালো। শোনার চেয়ে দেখা ভালো। গুরুমুখে বা সাধুমুখে শুনলে ধারণা বেশি হয়। আর শাস্ত্রের অসার ভাগ চিন্তা করতে হয় না। শোনার চেয়ে দেখা আরো ভালো।
দেখলে আর সন্দেহ থাকে না। শাস্ত্রে অনেক কথাই তো আছে। কিন্তু ঈশ্বরদর্শন না হলে, তাঁর পাদপদ্মে ভক্তি না হলে, চিত্তশুদ্ধি না হলে—সবই বৃথা।
তোতাপুরী বলে দিয়েছিল, স্ত্রীকে কাছে-কাছে রাখবি। স্ত্রী কাছে রেখেও যার ত্যাগ-বৈরাগ্য-বিবেক-বিজ্ঞান অক্ষুণ্ণ থাকে, সেই আসল ব্রহ্মজ্ঞ।
সারদাকে কাছে ডেকে নিল রামকৃষ্ণ। শোনাতে লাগল ঈশ্বরের কথা।
চাঁদ মামা সকল শিশুর মামা। তেমনি ঈশ্বর সকলের আপনার। তুমি ডাকো তো তোমাকেও তিনি দেখা দেবেন।’ কাছে বসিয়ে স্নেহস্বরে বলছে রামকৃষ্ণ, ‘বই-শাস্ত্র ঈশ্বরের কাছে পৌঁছবার পথ বলে দেয়।
পথ জানা হয়ে গেলে আর বই-শাস্ত্রের দরকার কি? তখন নিজে কাজ করতে হয়।
কুটুম্ববাড়ি তত্ত্ব করতে হবে। কি-কি জিনিস কিনবে তারই ফর্দ-সমেত চিঠি এসেছে। কিন্তু চিঠি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক পরে পাওয়া গেল চিঠি। তখন আনন্দ আর ধরে না। দেখ, দেখ, কি লিখেছে চিঠিতে। কি পাঠাতে হবে। পাঁচ সের সন্দেশ আর একখানা কাপড়। ব্যস, হয়ে গেল। এখন আর চিঠির কি দরকার! উড়েই যাক বা পুড়েই যাক, কিছু আসে যায় না। আসল খবর জানা হয়ে গিয়েছে। চিঠির ততক্ষণই দরকার, যতক্ষণ তত্ত্বের খবরটুকু জানা যায়নি। জানার পর শুধু পাবার চেষ্টা।
কৃপা হলেই পাবে। কিন্তু কৃপা পাবে কি করে? কৃ আর পা, দুয়ে মিলে কৃপা। করলেই পাবে। সুতরাং কাজ করো। কর্তব্য করো। ‘শরীরং কেবলং কর্ম।’ ‘তুমি হবে আমার বিদ্যারূপিণী স্ত্রী।’ সারদাকে বললে রামকৃষ্ণ।
বিদ্যারূপিণী স্ত্রী ভগবানের দিকে নিয়ে যায়। আর অবিদ্যারূপিণী স্ত্রী ঈশ্বরকে ভুলিয়ে দেয়, সংসারে ডুবিয়ে রাখে। বিদ্যার সংসারে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ঈশ্বরের ভক্ত। ঈশ্বরই তাদের একমাত্র আপনার লোক, অনন্ত কালের আপনার। তারা পাণ্ডবদের মত। সুখ হোক দুঃখ হোক কখনো তাঁকে ভোলে না।
কিন্তু অবিদ্যাতে যদি অজ্ঞান, তবে ঈশ্বর অবিদ্যা করেছেন কেন? তাঁর লীলা। মন্দটি না থাকলে ভালোটি বুঝবে কি করে? আবার খোসাটি আছে বলেই আম বাড়ে আর পাকে। আমটি তৈরি হলেই তবে খোসা ফেলে দিতে হয়। মায়ারূপে ছালটা আছে বলেই ক্রমে ক্রমে ব্রহ্মস্বাদ।
কিন্তু বামনির মোটেই ইচ্ছা নয় সারদার সঙ্গে রামকৃষ্ণের ঘনিষ্ঠতা ঘটে। সে বলে এতে ব্রহ্মচর্যের হানি হবে।
সরলা সারদা ভয় পায়। ঠাকুর রামকৃষ্ণ হাসে।
একদিন রামকৃষ্ণকে গৌরাঙ্গ সাজাল বামনি। সাজাতেই ভাব হয়ে গেল রামকৃষ্ণের।
বামনি সারদাকে ডেকে আনল। বললে, ‘কেমন হয়েছে?’
ভাবাবেশ দেখে ভয় পেল সারদা। কোনো রকমে একটা প্রণাম সেরে ছুটে পালাল।
বামনির এমন একটা ভাব, রামকৃষ্ণের যা কিছু দিব্যচেতনা সমস্ত তার জন্যে। অন্ধজনকে সেই যেন দৃষ্টিদান করেছে!
মহামায়ার কি লীলা, বামনির মধ্যে অহঙ্কার ঢুকে গেল। কি থেকে কী যে হয়ে গেল কেউ কিছু বুঝতে পারল না।
চিনু শাঁখারি তখনো বেঁচে আছে। বুড়ো, অথর্ব। রামকৃষ্ণের কাছে এসেছে প্রসাদ নিতে। তার ভক্তি দেখে বামনি বেজায় খুশি। প্রসাদ পাবার পর এঁটো পরিষ্কার করতে যাচ্ছে চিনু, বামনি বললে, থাক, এ এঁটো আমি তুলব। চিনু তা মানতে রাজি নয়, কিন্তু বামনির রূঢ় নিষেধের কাছে তার আর হাত উঠল না। কিন্তু হৃদয় এল চোটপাট করে। এ কী অনাচার!
গাঁয়ের বামুনের মেয়ে যারা সেখানে ছিল তারাও বামনির বিরুদ্ধে। এখানে চলবে না এ সব অনাসৃষ্টি।
‘চিনু ভক্ত লোক, তার এঁটো নেব, তাতে কি? ‘বামনিও ফণা বিস্তার করলে।
‘শাঁখারির এঁটো নেবে, থাকবে কোথা?’ হৃদয় এল মুখ খিঁচিয়ে, ‘বলি, কে তোমাকে জায়গা দেবে? শোবে কোথা?’
বামনি গর্জন করে উঠল, শীতলার ঘরে মনসা শোবে।’
এই থেকে লেগে গেল বিষম ঝগড়া। যেখানে যেমন সেখানে তেমন—এই নীতি-বাক্যের ভুল হয়ে গেল বামনির। আর হৃদয়ও কাঠ-গোঁয়ার, দিশপাশের জ্ঞান নেই। মুখের ঝগড়া না মারামারিতে এসে পৌঁছয়। বামনি বুঝি আসে এই ত্রিশূল উঁচিয়ে।
কোথা থেকে কী হয়ে গেল, হৃদয় কি-একটা ছুঁড়ে মারলে বামনিকে। জোরে ছুটে এসে লাগল ঠিক কানের কাছাকাছি। রক্ত পড়তে লাগল। কাঁদতে বসল বামনি।
রামকৃষ্ণ কাতর হয়ে পড়ল। ‘ওরে হৃদু তুই কেন এমন করলি? ওরে,ও যে ভক্তিমতী যশোদা। এমন হলে যে লোক জড় হবে, কেলেঙ্কারি হবে—
এখন উপায় কি। রামকৃষ্ণই ঠিক করল উপায়। বামনিকে ভাব দিয়ে দিলে। ভয় পাবার ভাব।
থেকে-থেকে উপরের দিকে তাকায় আর ভয় পায়। লাহাদের প্রসন্নময়ীকে সম্বোধন করে বলে, ‘ওরে প্রসন্ন, আমার এ কী হল? আমি এখন কি করি, কোথা যাই! জগন্নাথ যাই না বৃন্দাবন যাই।’
এক দিন সত্যি-সত্যি কোথায় চলে গেল বামনি কেউ টের পেল না। ছ বৎসরের নিরন্তর-বাসের মায়া কেটে গেল এক মুহুর্তে।
চাতুর্মাস্যের সময় প্রায়ই এখন কামারপুকুরে আসে রামকৃষ্ণ। সেবার এসে অসুখে পড়েছে। পেটের অসুখ। পথ্যি সাবু-বার্লি।
রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে পাট চুকিয়ে শুতে গেছে মেয়েরা। ভাবে টলমল করতে-করতে দরজা খুলে বাইরে হঠাৎ বেরিয়ে এল রামকৃষ্ণ। লক্ষীর মাকে উদ্দেশ্য করে বললে, ‘সে কি গো, তোমরা যে সব শুতে গেলে! আমাকে খেতে দেবে না?’
সকলে তো হতবুদ্ধি। লক্ষ্মীর মা বললে, ‘সে কি কথা? এই যে তুমি খেলে দুধ-বার্লি –
‘কই খেলাম! আমি তো এই দক্ষিণেশ্বর থেকে আসছি। কই খাওয়ালে! বুঝতে কারু বাকি রইল না, ভাবাবেশ হয়েছে রামকৃষ্ণের। কিন্তু উপায়? ঘরে তো কিছুই তেমন খাবার নেই। কি দেব এই পেট-রোগা মানুষকে?
ঘরে তো তেমন কিছু নেই। শুধু মুড়ি আছে।’ বললে লক্ষীর মা। ‘তা, খাবে মুড়ি? তাই দুটি খাও না। পেটের অসুখ করবে না তাতে। থালায় করে মুড়ি আনল। কিন্তু মুখ ফিরিয়ে রইল রামকৃষ্ণ। বললে, ‘শুধু মুড়ি আমি খাব না।’
কিন্তু ঘরে আর কিছু নেই যে। তোমার এই পেটের অসুখে অন্য-কিছুই বা আর কি দেওয়া যায়? দোকান-পসার এখন বন্ধ। সাধ্য নেই সাবু-বার্লি কিনে এনে তোমাকে এখন জ্বাল দিয়ে দি।
ও আমি খাব না। অভিমানে মুখ ভার করে রইল রামকৃষ্ণ।
ভাইপো রামলালকে তখন বেরতে হল বাজারে। ঝাঁপ ফেলে ঘুমিয়ে পড়েছে দোকানি, ডাকাডাকি করে তার ঘুম ভাঙালে। মিষ্টি কিনলে এক সের। বাড়িতে এসে মুড়ির থালার পাশে নামিয়ে রাখল মিষ্টির হাঁড়ি। রামকৃষ্ণের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললে, আরো দুটি মুড়ি দাও।
থালায় আরো মুড়ি ঢেলে দিলে লক্ষ্মীর মা। আনন্দে খেতে লাগল রামকৃষ্ণ। কী সর্বনাশ যে হবে কল্পনা করতেও ভয় পেল সকলে । মাসের অর্ধেক দিন সাবু বার্লি খেয়ে যে কোনো মতে বেঁচে আছে তার এই রাক্ষুসে খাওয়া! ‘এত রাত্রে, পেটের এই অবস্থায়! ডাক্তার-বদ্যিতে আর কুলোবে না।
ভয়ে ভয়ে রাত কাটাল সারদা। সঙ্গে-সঙ্গে লক্ষ্মীর মা।
কিন্তু পর দিন দিব্যি সুস্থ আছে রামকৃষ্ণ দেহে কোনো রোগ-উদ্বেগ নেই। তার দেহে বসে ঐ খাওয়া কে খেয়েছে কে বলবে।
সেবারে এসে শ্বশুরবাড়ি গেছে। কি একটা ক্রিয়াকর্ম ছিল সেদিন, অনেক লোক-খাওয়ানো হয়েছে। রাতের খাওয়া চুকে গিয়েছে অনেকক্ষণ, শুতে গিয়েছে সবাই। হঠাৎ রামকৃষ্ণ বিছানা থেকে উঠে পড়ল। বললে, ‘আমি খাইনি না কি? ভীষণ খিদে পেয়েছে যে। কিছ, খেতে দাও—’
কি হবে! ঘরে যে এখন কিছুই নেই। মেয়েরা মাথায় হাত দিয়ে বসল।
খুঁজে-পেতে দেখা গেল হাঁড়িতে কতগুলো পান্তা ভাত শুধু পড়ে আছে। ওমা, তা কি দেওয়া যায় জামাইকে!
তবু ভয়ে-ভয়ে, তাই বলতে গেল সারদা। বললে, ‘হাঁড়িতে পান্তা ভাত ছাড়া আর কিছু নেই।’
‘তাই নিয়ে এস।’ হুঙ্কার ছাড়ল রামকৃষ্ণ।
তবু কুণ্ঠা যায় না সারদার। বললে, ‘সঙ্গে তো আর কোনো তরকারি নেই।’ ‘আছে।’ রামকৃষ্ণ আবার গর্জন করল। ‘মাছ-চাটুই যে করেছিলে দেখ এক-আধটু পড়ে আছে কি না—’
সারদা ছুটে গেল রান্নাঘরে। দেখল বাটির এক কোণে ছোট্ট একটি মৌরলা মাছ পড়ে আছে। আর তার আশে-পাশে একটু খানি কাই। তাই রাখলে ভাতের পাশে।
উল্লাস আর ধরে না রামকৃষ্ণের। ছোট্ট ঐ একটি মাছের সহযোগে এক রেক চালের ভাত খেয়ে ফেলল৷
দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল সারদা। এ কি আহার না আহুতি!
এ নিছক পাগলামি। মনে-মনে আপশোষ করতে লাগল সারদার মা। শুধু মনে-মনেই বা কেন? স্পষ্টাস্পষ্টিই দুঃখ করলে এক দিন। বললে, কী পাগল জামাইয়ের সঙ্গেই আমার সারদার বে দিলাম!
আহা! ঘর-সংসারও করলে না, ছেলেপিলেও হল না, মা বলাও শুনলে না—
শুনতে পেল রামকৃষ্ণ ।
বললে, ‘শাশুড়ি ঠাকরুণ, সে জন্যে দুঃখ করবেন না।
আপনার মেয়ের এত ছেলেমেয়ে হবে যে শেষে দেখবেন মা ডাকের জ্বালায় অস্থির হয়ে উঠেছে—
‘তা যা বলে গেছেন তাই ঠিক হয়েছে, মা।’ শ্রীমা এক দিন তাই বললেন, স্ত্রী-ভক্তদের। ‘আমার নরেন, বাবুরাম, রাখাল, শরৎ। আমার দুর্গাচরণ নাগ—’ ভক্ত মেয়েরা ঘিরে বসল শ্রীমাকে।
মঠে যেবার প্রথম দুর্গাপূজা করালে নরেন, আমাকে নিয়ে গেল। আমার হাত দিয়ে পঁচিশ টাকা দক্ষিণা দেওয়ালে। মোট চৌদ্দশ টাকা খরচ করেছিল নরেন। চারদিকে লোকারণ্য, ছেলেদের খাটা-খাটুনির অন্ত নেই। হঠাৎ নরেন এসে আমাকে বললে, ‘মা, আমার জ্বর করে দাও।’ ওমা, খানিক বাদে সত্যি-সত্যি তার হাড় কাঁপিয়ে জ্বর এসে গেল। সে কি কথা? এখন কি হবে। ‘সেধে জ্বর নিলুম মা। ছেলেগুলো প্রাণপণে খাটছে বটে, তবু কখন কি ভুলচুক করে বসবে আর আমি রেগে উঠে কখন থাপ্পড় মেরে বসব ঠিক নেই। তাই ভাবলুম কাজ কি, থাকি কিছুক্ষণ জ্বরে পড়ে।’ কাজকর্ম চুকে আসতেই বললাম, ‘ও নরেন, এখন তা হলে ওঠো।’ হ্যাঁ মা, এই উঠলাম আর কি। ঝটকা মেরে যেমন তেমনি উঠে বসল নরেন।’
