পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ১.৪৫
৪৫
শুধু প্রথম রাত্রি নয়, প্রতি রাত্রি।
ঘোমটাতে মুখখানি ঢেকে সর্বাঙ্গে কুণ্ঠিত হয়ে নিঃশব্দে শুয়ে থাকে সারদা। শুয়ে থাকে তরলিত সরলতায়। সমর্পিত প্রশান্তিতে। স্পৃহা নেই প্রতিবাদ নেই, প্রতীক্ষা করে আছে ধৈর্যের মত, তিতিক্ষার মত। তপস্যার মত।
নিদ্রাহীন নিশীথ ঝাঁ-ঝাঁ করছে। শোনা যাচ্ছে গঙ্গার কলস্বর ।
হাত বাড়িয়ে ধরলেই হয়। টেনে নিলেই হয় আলিঙ্গনে। বৃন্ত থেকে কুসম-চয়নে এতটুকু কণ্টক নেই। স্নানাবতরণে নেই এতটুকু পদস্খলন।
কিন্তু আমি তো জৈব প্রয়োজনে নয়, আমি দৈব প্রয়োজনে। আমি ষোলো আনা করলে মানুষে যদি এক পয়সা করে।
তাই বলে গোঁ ধরে কিছু করে না। করে না কোনো অন্ধ একরোকোমি। সদসৎ বিবেচনা ক’রে করে। সারাক্ষণ মনের সঙ্গে চলে কঠিন বোঝাপড়া। চলে জটিল বাদানুবাদ, সুক্ষ বিচারমীমাংসা। মনকে সম্পূর্ণ ছুটি দেয়, নিষ্ঠুর হাতে তার টুঁটি টিপে ধরে না! বল না কি বলবি, যা না কোথায় যাবি, নে না যা তুই চাস। কিন্তু তার আগে আমার পাশে বোস একটু শান্ত হয়ে। আমার সঙ্গে দুটো কথা ক। গোঁয়ারের মতন অমন গোঁজ হয়ে থাকিস নে। স্ফুর্তি করে তর্ক কর আমার সঙ্গে। মামলায় যদি তুই জিতিস আমাকে তুই বেঁধে নিয়ে যাস জেলখানায়।
জানি, তুই কি বলবি। কিন্তু কত দিন ধরে করতে পারবি এই দেহস্তব, তাই শুধু আমাকে বল। লতাপাতাঘেরা শান্তশীতল মাটির কুটিরে যে যেতে চাস তার মাধুর্য কি আমি জানি না? কিন্তু তার চেয়ে—তাকিয়ে দ্যাখ দেখি এই রাত্রির আকাশের দিকে, এই অবিচ্ছিন্ন অন্ধকারের দিকে—এই মহামৌনের মধ্যে ঈশ্বরের মন্দিরটি কি বেশি রমণীয়, বেশি মোহনীয় নয়? আর কী তুই চাস এই শ্মশাননাট্যের রঙ্গশালায়? যুবতীর চর্ম-মাংস-রক্ত-বাষ্প? যোগবাশিষ্ঠ পড়িসনি? রামচন্দ্র কী বলছেন? বলছেন, যুবতীর চর্ম-মাংস-রক্ত-বাষ্প যদি আলাদা-আলাদা করে রেখে সৌন্দর্য দেখতে পাও, তবে দেখ তাই একদৃষ্টে। নইলে মিছে আর কেন মুগ্ধ হওয়া?
জোয়ারের জলের মতন এই যৌবন। অল্পোচ্ছাসিত, অচিরস্থায়ী। কিন্তু ভুবন-ব্যাপী এই ঈশ্বরসিন্ধু। এ চিরকাল সমানস্রোত, অচ্ছিন্নপ্রবাহ। বল, স্নানের জন্যে কোন ঘাটে তুই অবতরণ করবি?
তোর উপরে আমি জোর খাটাতে চাই না। তুই জাগ্রত, বুদ্ধিমান, কুশাগ্রতীক্ষ। তুই নিজেই হিসেব করে দ্যাখ। ক্ষয়দ্বারে যাবি, না, যাবি অক্ষয় মন্দিরে?
বুদ্ধদেবের সংসারত্যাগের আগে কতগুলি সুন্দরী যুবতী এসেছিল তাঁকে প্রলুব্ধ করতে, প্রতিনিবৃত্ত করতে। দীর্ঘ রাত প্রমোদোৎসবে মাতামাতি করে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে এতক্ষণে। তাদের দিকে তাকালেন বুদ্ধদেব। নিদ্রার বিকৃতিতে কী কুৎসিত দেখাচ্ছে মেয়েগুলোকে। বুদ্ধদেব দেখলেন এ তো শ্মশান, এখানে আবার প্রমোদলীলা কোথায়!
মন, তাই বলি, তুই কি এক বেলার কাঙালীভোজনে যাবি, না, যাবি চিরন্তন অমৃতের নিমন্ত্রণে?
ভিক্ষু মহাতিস্স পর্বতচূড়ায় বসে তপস্যা করেন। পাহাড় থেকে নেমে সেদিন চলেছেন অনুরাধাপুর গ্রামের দিকে। সেই গ্রামের এক সুন্দরী যুবতী স্বামীত্যাগ করে সেদিন পথে বেরিয়েছে। সহসা দেখা হল সেই সৌম্যদর্শন ভিক্ষুর সঙ্গে। যুবতী বিলোল কটাক্ষ করে মদির অধরে হেসে উঠল। ভিক্ষু তাকালেন তার দিকে। দেখলেন বিকশিত মল্লিকার মত সুন্দর দন্তপঙক্তি। কিন্তু মনে হল যেন কঙ্কালের হাসি। এক অস্থিসার কঙ্কাল তাঁর দিকে চেয়ে বিকটবদনে হাসছে। কিছুক্ষণ পরে সেই যুবতীর স্বামীর সঙ্গে দেখা। স্বামী জিজ্ঞেস করলে, ‘এই পথে কোনো নারীকে আপনি দেখেছেন?’
‘নারী?’ভিক্ষু উদাসীনের মত বললেন, ‘নারী না পুরুষ বলতে পারব না। দেখলাম একটা কঙ্কাল হেঁটে যাচ্ছে।’
মন বল, নারীকে কঙ্কালে নিয়ে যাবি, না তাকে মনোময়ী প্রতিমা করে বসাবি হৃদয়ের পদ্মাসনে?
যুবতীর মাথার খুলিটি একবার কল্পনা কর। সেই তো তোর মহামোহের ফাঁদ। কিন্তু সেই যে মুখারবিন্দ সে এখন কোথায়? কোথায় সেই অধরমধু? কোথায় সেই আয়ত কুটিল কটাক্ষ? কোথায় সেই দন্তরুচিকৌমুদী? কোথায় বা সেই মঞ্জুগুঞ্জ আলাপন? কোথায় বা সেই মদনধনুর মত ভঙ্গুর ভ্রুবিলাস? এই করোটির বাটিতে তুই আর কী মদিরা পান করবি?
মন, শোন একটু অমৃত-মদ খাবি? পাত্র খুঁজছিস? খুরি-খুলি লাগবে না।
সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডই সেই অমৃতের ভান্ড।
রামকৃষ্ণ আবার সমাধিতে বিলীন হল।
নিস্তব্ধতারও বুঝি ডাক আছে। সেই মৌনের ডাকে জেগে উঠল সারদা।
দেখল যেন কর্পূরেগৌর মহাদেব বসে আছেন। পর্বতের মধ্যে মহামেরু সরোবরের মধ্যে মহাসাগর।
তুমি সর্বধাত্রী ধরিত্রী। আমি ঋত, সত্য, ধৈর্য, শ্রেয়, শৌচ, সন্তোষ। তুমি দয়া ক্ষমা নীতি কান্তি লজ্জা সহিষ্ণুতা। আমি বিগত-বিষয়-রসরাগ। তুমি সর্বরাগস্বরূপিণী।
তুমি দিব্যাম্বরা, আর আমি দিগম্বর।
ঠিক-ঠিক নামটি মনে আছে সারদার। এই ভাবে কোন মন্ত্রটি পাঠ করতে হবে স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। তাই সে নিষ্ঠার সঙ্গে ভক্তির সঙ্গে উচ্চারণ করতে লাগল। সেই উচ্চারণে মিশল এসে তার ধৈর্যের মাধুর্য তার সম্মতির স্নিগ্ধতা। তুমি স্মৃতি তুমি মেধা তুমি বাক্য।
আমি উপলব্ধি আর তুমি উচ্চারণ।
সমাধি ভাঙল রামকৃষ্ণের। ঘোমটা সরিয়ে পরিপূর্ণ চোখে দেখছিল বুঝি সারদা। রামকৃষ্ণের ধ্যান ভাঙতেই ত্রস্ত হাতে মুখের উপর আবার ঘোমটা টেনে দিলে। রামকৃষ্ণ বললে, ‘এবার তুমি একটু শোও। রাত পোহাতে এখনো খানিক দেরি আছে।’
কিন্তু এমনি করেই কি কাটবে রাতের পর রাত?
কে একজন স্ত্রীলোক ধরে বসল সারদাকে। তুমি কি ন্যাকা না বোকা? ‘কেন, কী হয়েছে?’ সারদা অবাক হয়ে রইল।
‘তুই কি ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানিস না?’স্ত্রীলোকটি বিদ্রূপ করে উঠল, ‘গাঁয়ের মেয়ে বলে কি তুই এমনি আহাম্মক হবি? গাঁয়ের মেয়ে কি আর বিয়ে করে না? স্বামী নিয়ে ঘরসংসার করে না? তাদের ছেলেপুলে হয় না?’
‘তা, আমি কী করলাম!
‘তুমি হাঁদী, তুমি আবার কী করবে? বলি, তোর স্বামীকে কি তুই ভেসে যেতে দিবি? সংসারে তার মন নেই, সে মন তুই জাগিয়ে দিবি নে? ভোগের দিকে তাকে টেনে আনবি নে? তোর কপাল তুই চিবিয়ে খাবি? ধর্মপত্নী হয়ে এমন অধর্ম ঘটাবি তুই?’
বিমূঢ়ের মত তাকিয়ে রইল সারদা। অধর্ম! তার ঠাকুর তাকে দিয়ে অধর্মের অভিনয় করিয়ে নিচ্ছেন?
‘তা ছাড়া আবার কি? তোকে বিয়ে করেছে অথচ তোকে তোর সংসারধর্ম করতে দিচ্ছে না, এ তো ঘোরতর অধর্ম! তুই স্ত্রী হয়েছিস, তুই এবার মা হবি নে? তুই তোর পাওনা-গণ্ডা ছাড়বি কেন? স্বামীর কাছ থেকে আদায় করে নিবি ষোলো আনা। বলবি গিয়ে সোজাসুজি—আমি সন্তান চাই। আমি মা হব।’
সরলতার প্রতিমূর্তি সারদা।
রামকৃষ্ণকে সেই রাত্রে বললে তাই সে স্পষ্ট করে। ঘোমটা-ঢাকা মুখের মধ্য থেকে কেমন অদ্ভুত শোনাল কথাগুলি।
সবাই বলছে, আমার একটাও ছেলেপুলে হবে নি? বিয়ে হয়েছে আমার, তা নইলে সংসারধর্ম বজায় থাকবে কিসে? ‘
কথা শুনে চমকে উঠল রামকৃষ্ণ। সারদার মুখে এ কী কথা!
সারদা উপযাচিকা হয়ে পা টিপতে লাগল রামকৃষ্ণের। ছোট খাটটিতে তার শোবার কথা, বড় তক্তপোশটিতে এসে বসল।
মহামায়ার চাতুরী বুঝতে পেরেছে রামকৃষ্ণ। সে হাসল মনে-মনে। মন্দিরের ভবতারিণীকে উদ্দেশ করে বললে, ‘তোর চালাকি ধরতে পেরেছি। তুই এত দিন নিজের মূর্তিতে এখানে ছিলি, আজ তোর কী খেয়াল হল, স্ত্রীর মূর্তি ধরে এলি আমার কাছে। তুই যদি তাই আসতে পারিস আয় আমার কাছে। তুই আসতে পারলে আমার ভয় কী!
সারদা আড়ষ্ট হয়ে রইল। চকিতে কেমন যেন হয়ে গেল আরেক রকম।
রামকৃষ্ণ বললে, ‘তুমি মা হতে চাও? তা মোটে একটি ছেলে খুঁজছ কি গো? দেশ-দেশান্তর থেকে তোমার কত ছেলে আসবে, সব মাতৃমন্ত্রে মাতোয়ারা। তুমি যে তখন মা-ডাকে তিষ্ঠোতে পারবে না।’
সারদার মুখে আর কথা নেই। দেহে আর দেহবোধ নেই।
ঠিকই হয়েছে। মহামায়া ঠিক ভাবটিই এনে দিয়েছেন তোমার মধ্যে। তুমি জীবের জননী হবে। যে বিশ্বজনের জননী হবে তার মধ্যে এই সন্তানকামনাটি না এলে চলবে কেন?
তোমার তো এ শুধু দেহসুখের ছলনা নয়, তোমার এ শুধু মাতৃত্বভাতি। ঈশ্বরের এই সংসারে, এই পরমানন্দের মন্দিরে, তুমি লীলা-লাবণ্যকল্যাণী শ্রীমতী মাতা।
সারদা সরে গেল নিজের খাটে। আত্মানন্দে ঘুমিয়ে পড়ল।
রাতের পর রাত চলতে লাগল এই রতিহীন বিরতির পরীক্ষা। এই বিরতি দিয়ে ঈশ্বরের আরতি।
একেই বলে সহজ-অটুট অবস্থা। সহজ, কেননা স্বস্থানে নিয়তস্থিত, আর অটুট, কেননা ব্রহ্মচর্য থেকে বিচ্যুতি নেই এক বিন্দু।
এ হচ্ছে সেই অবস্থা—’রমণীর সঙ্গে থাকে না করে রমণ।’
ঈশ্বর দর্শন হলে রমণ-সুখের কোটি গুণ আনন্দ হয়। গৌরীচরণ বলত, মহাভাব হলে শরীরের রোমকূপ পর্যন্ত মহাযোনি হয়ে যায়। একেকটি রোমকূপে আত্মার সহিত মহারমণ হয়।
পতঞ্জলি বলেছে, ব্রহ্মচর্য প্রতিষ্ঠাতেই বীর্য লাভ। যার বীর্য আছে তারই ভক্তি আছে। যার বীর্য আছে তারই আছে বজ্রবন্ধন। তারই আছে অনন্যচিত্ততা। রামকৃষ্ণ উত্তীর্ণ হল সেই বীর্যের পরীক্ষায়। সেই স্থৈর্যের পরীক্ষায়।
‘রাঁধুনি হইবি ব্যঞ্জন রাঁধিবি হাঁড়ি না ছুঁইবি তায়,
সাপের মুখেতে ভেকেরে নাচাবি সাপ না গিলিবে তায়।
অমিয় সাগরে সিনান করিবি কেশ না ভিজিবে তায়॥ ‘
উত্তীর্ণ হলেন সেই নির্বিকল্পের সাধনায়।
তুমি বীর্যবতী বিদ্যা। তুমি বলবতী মেধা। তুমি ধারণাবতী স্মৃতি।
সারদাকে ডেকে তুলল রামকৃষ্ণ। বললে, ‘তোমাকে আবার সেই কথা জিজ্ঞেস করছি, সারদা! তুমি কি আমাকে সংসারপথে টেনে নিতে চাও?’
‘না।’সারদা বললে, ‘তোমাকে তোমার ইষ্টপথেই সাহায্য করতে চাই।’
‘বেশ।’ তৃপ্তির প্রসাদে বুক ভরে গেল রামকৃষ্ণের। বললে, ‘এবার তবে ঘুমোও নিশ্চিন্ত হয়ে।’
কতক্ষণ পরে আবার ডেকে তুলল সারদাকে। বললে, ‘সত্যি করে বলো তো, তোমার কী মনে হয়, আমি কি তোমাকে ত্যাগ করেছি?’
‘বা, তা কেন মনে হবে? আমাকে তুমি গ্রহণ করেছ।’ শান্ত সমর্পণে ঘুমুল সারদা। এ অর্পণ কে বলে? এ অৰ্চনা।
রামকৃষ্ণ বললে, তুমি বাণী। তুমি করুণা। তুমি আমার নামস্বাদময়ী ভিক্ষা।
যোগেন-মা বড়লোকের ঘরের বউ, কিন্তু সংসারের জ্বালায় বড় জ্বলছে। তাপ-হরণের খবর পেয়ে সটান চলে এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। রামকৃষ্ণ তাকে স্থান দিলে। বললে, সারদার কাছে যাও। শান্তির স্পর্শটি ওর কাছে।
দুদিনেই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল যোগেন-মা। যেখানে একনিষ্ঠ সেখানেই ঘনিষ্ঠ!
তার কাছে সারদা আক্ষেপ করল, ‘ওঁর কেমন ভাব হয় দেখলে!
‘দেখলুম৷’
‘আমার ইচ্ছে হয় আমারো এমনি ভাব হোক। তুমি ওঁকে গিয়ে একটু বলবে?’
‘কি বলব?’ যোগেন-মা তো অবাক।
‘যাতে আমাকে একটু ভাব-টাব দেন। আমার নিজের বলতে বড় লজ্জা করে।’
একা তক্তপোশে বসে আছে রামকৃষ্ণ, যোগেন-মা প্রণাম করে দাঁড়াল এক পাশে। সারদা কি বলেছে বললে সরলের মত।
রামকৃষ্ণ কথা বলল না। গম্ভীর হয়ে রইল।
নহবতে ফিরে এল যোগেন-মা। দেখল সারদা পূজায় বসেছে। সন্তর্পণে দরজাটা একটু ফাঁক করল। দেখল আপন মনে হাসছে সারদা। কতক্ষণ পরেই আবার দরবিগলিতধারে কান্না! কতক্ষণ পরে একেবারে সমাধিস্থা।
‘তবে না তোমার নাকি ভাব হয় না? সমাধিশেষে সানন্দ কণ্ঠে প্রশ্ন করল যোগেন-মা।
সলজ্জ মুখে হাসল একটু সারদা। বললে, ‘কি জানি যোগেন, কেমনতর হয়ে গেল। একটা মহানন্দের মধ্যে গিয়ে পড়লুম। তাঁর ভাবের ঢেউ এসে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। তিনি আমার চর্মস্পর্শ করেননি বটে, কিন্তু তিনি যে আমার মর্মস্পর্শ করেছেন।’
তুমিই নিতে পারবে আমার ভাব। তুমিই ভবভয়শমনী সর্বসিদ্ধিপ্রদাত্রী।
৪৬
আর আমাকে ছলনা করিস নে মা। আমি তো কামজয় করেছি, কিন্তু ওর মধ্যে কামভাব আনিস নে৷
আকুল হয়ে প্রার্থনা করে রামকৃষ্ণ। ও যদি কামময়ী কামিনী হয়ে ওঠে, তা হলে, কে জানে আমার এই তেজ-বীর্য ধুয়ে যাবে কি না। কে জানে, সংযমের বাঁধ ভেঙে জাগবে কি না দেহবুদ্ধি।
তাই মা, আমি তোর দুয়ার ধরে পড়ে আছি, আমাকে কৃপা কর। সারদাকে তুই সারভূতা করে দে। আমি যদি মা প্রেম, সারদা পবিত্রতা!
সংসাররঙ্গমঞ্চে এ কী অদ্ভুত প্রার্থনা। নবীনযৌবনা স্ত্রীকে সামনে রেখে এক জন সমর্থ-সুস্থ বীর্যবান যুবকের অসাধারণ আরাধনা! আমার স্ত্রীকে কামমোহিনী করিস নে, কালমোহিনী করে দে।
আমি আর কিছু চিনি না। আমি শুধু তোকে চিনি। ‘আমার মা আছেন আর আমি আছি।’ আমাকে কে টলায়? ‘ঝড়ে গাছ নড়ে যত, তরু বদ্ধমূল তত।’
মা কৃপা করলেন। ধরা দিলেন সেই ঘরে এসে। ধরা দিলেন সারদার মধ্যে।
লবকুশ হনমানকে খুব কষে বাঁধলে দড়ি দিয়ে। ছোট্টটি হয়ে হনুমান বাঁধন নিলে সর্বাঙ্গে। দেখে লবকুশের মহাখুশি। মহাবীর ধরা পড়েছে। তখন হনুমান বললে,
‘ওরে কুশীলব করিস কি গৌরব
ধরা না দিলে কি পারিস ধরিতে?’
কৃপা করে মা-ই ধরা দিয়েছেন। করালেনও তিনি, পাওয়ালেনও তিনি। তিনিই সারদার মধ্যে দেখালেন জগদীশ্বরীকে।
আট মাস এক শয্যায় রাত কাটাল দুজনে। সে এক বিচিত্র সাধনা। শবসাধনার চেয়ে ভীষণতরো কঠিনতরো সাধনা—এই সজীব সাধনা।
আগুন যত জলে ঘি তত জমাট হয়। সূর্য যত জ্বলে তত সংহত হয় তুষার। চন্দ্র যত পূৰ্ণ হয় তত শান্ত হয় সমুদ্র। এ এক অভিনব সাধনা। শবসাধনা নয়, নব সাধনা ।
‘আমার অন্তরে আনন্দময়ী সদা করিতেছেন কেলি,
আমি যে ভাবে সে ভাবে থাকি নামটি কভু নাহি ভুলি।
আবার দু আঁখি দিলে দেখি অন্তরেতে মুণ্ডমালী॥’
সাধন শেষে রামকৃষ্ণ ঠিক করল সমারোহে একবার কালীপুজো করব। জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা—১২৮০ সাল—ফলহারিণী কালীপুজোর দিন। সেই দিনটিই প্রশস্ত।
কিন্তু কালীপূজো মন্দিরে হবে না! কালীর যে ‘গুপ্ত ভাবে আপ্তলীলা।’তাই তার পুজোও হবে গুপ্ত ভাবে। রামকৃষ্ণের নিজের ঘরে। পুজো হবে স্ত্রীর। ষোড়শীরূপিণী সারদার।
‘মা বিরাজে ঘরে ঘরে,
জননী তনয়া জায়া সহোদরা কি অপরে।’
মন্দিরে জাঁকজমক করে মামূলি পুজো হচ্ছে। সে পুজোর পূজারি হৃদয়। তাই নিয়ে সে শশব্যস্ত। রামকৃষ্ণ বললে, ‘এ দিকে একটু দৃষ্টি রাখিস।’
ঠিক আছে। সব যোগাড়যন্ত্র করে দিয়েছে হৃদয়। দীনু বলে একটি ছেলে, জ্ঞাতিসম্পর্কে ভাইপো হয়, রাধাগোবিন্দের মন্দিরে পুজো করে, ফুল-বেলপাতা যোগাড় করে আনলে। জিজ্ঞেস করলে, এ কেমনতরো পূজা?
রামকৃষ্ণ বললে, ‘এ রহস্যপূজা।’
রাত নটা। কালীবাড়িতে নানা গান-বাজনা হচ্ছে, সর্বত্র হৈ-রৈ। রামকৃষ্ণের ঘর বন্ধ। রামকৃষ্ণ অনুপস্থিত।
তার খোঁজ আর কে নেয়!
সারদাকে বলা ছিল আগের থেকে।
যেমন-কে-তেমন সাধারণ বেশে মুখে ঘোমটা টেনে রাত নটার সময় ঠিক এসে ভেজানো দরজায় ঘা দিলে। রামকৃষ্ণ তাকে এনে বসাল পিঁড়ির উপর।
পিঁড়ির উপরে আলপনা-আঁকা৷ সামনে-পাশে পূজার সমস্ত উপকরণ সাজানো।
রামকৃষ্ণ বললে, ‘বোসো। পশ্চিমমুখো হয়ে বোসো।’ বলতে-বলতেই বন্ধ করে দিলে দরজা।
রামকৃষ্ণের তক্তপোশের উত্তর পাশে গঙ্গাজলের যে জালা ছিল তার দিকে মুখ করে বসল সারদা। রামকৃষ্ণ বসল পুবমুখো হয়ে। যেখানে পশ্চিম দিকের দরজা তার কাছে।
প্রথমে সারদার পায়ে আলতা পরিয়ে দিল রামকৃষ্ণ । কপালে মাথায় সিঁদুর মাখিয়ে দিল।
স্পর্শনেই সারদার অর্ধবাহ্যদশা হয়ে গেল।
তার পর পরনের শাড়ি ছাড়িয়ে নিয়ে পরিয়ে দিল নববস্ত্র। থালায় করে মিষ্টি দিল খেতে। বললে, খাও। খাবার পরে পান দিল মুখে।
ষোড়শোপচারে পূজা হচ্ছে ষোড়শীর’। পূজার উপকরণগুলি সংশোধিত হল। মন্ত্রপূত জল ছিল সামনের কলসে, যথাবিধানে অভিষিক্ত করল সারদাকে। ইহাগচ্ছ, ইহতিষ্ঠ—প্রার্থনা-মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগল রামকৃষ্ণ,
‘হে কালিকা, হে সর্বশক্তির অধীশ্বরী জননী, হে ত্রিপুরসুন্দরী, সিদ্ধিদ্ধার উন্মুক্ত করো। এর দেহমন পবিত্র করে এতে আবির্ভূত হও, এতে বিরাজিত থাকো। জগৎসংসারের সর্বকল্যাণকরণ সম্পূর্ণ করো।’
হে কপালিনী, আমাকে ভার্যা দাও মনোরমা। শুধু মনোরমা নয়, মনোবৃত্তি-অনুসারিণী। আমি যদি ভাবাতীত হই, ও-ও হোক তদ্ভাবভাবিত। আমাদের দৈহিক বিবাহ নয়, আত্মিক বিবাহ। আমাদের আত্মানন্দ।
পূজার চরম উপচার প্রণাম। জপ ধ্যান প্রার্থনা উপাসনা—সমস্ত কিছুই এই শেষ প্রণামটির জন্যে। এ প্রণিপাতটিই শেষ অর্ঘ্য। রামকৃষ্ণ বিল্বপত্রে নাম লিখল। আগে-আগে যত সাধন-ভজন করেছে তার সব বেশবাস তোলা ছিল সযত্নে—তাই নামিয়ে একসঙ্গে করলে। রুদ্রাক্ষের মালা, কবচ, যা কিছু সাজ-সরঞ্জাম ছিল, তাও বাদ দিলে না। সকল আবরণ-আভরণ, সকল সাধনসিদ্ধির ধন একত্র করে সারদার পায়ে অঞ্জলি দিলে। বললে, ‘যত জপ-তপ সাধন-ভজন যত আচার-বিচার, যত কর্মকাণ্ডের মালা—সব তোমার দুটি পায়ে অর্পণ করলাম। এ পূজাতেই আমার সমস্ত পূজার ইতি হল।’
বলে সারদাকে প্রণাম করল রামকৃষ্ণ।
সারদা দেখছে সব চোখ মেলে। কিন্তু সাড় নেই, মুখে কথা ফুটছে না।
মৃন্ময়ীকে চিন্ময়ী করেছিল এক দিন।
আজ আবার অপ্রমেয়াকে প্রতিমায় নিয়ে এল।
সারদা শঙ্খকঙ্কণধারিণী লোকমাতা।
‘হে সর্বমঙ্গলস্বরূপা সর্বার্থ সাধিকা, হে শরণদায়িনি ত্রিনয়নী, সনাতনী নারায়ণী, তোমাকে প্রণাম৷’
আত্মনিবেদন করে রামকৃষ্ণ সমাধিস্থ হয়ে গেল৷
রাত্রি প্রায় তিন প্রহর, ধ্যান ভাঙল রামকৃষ্ণের। সারদা তখনো নিশ্চল হয়ে বসে আছে পিঁড়িতে। তদগত তন্ময় হয়ে। রামকৃষ্ণ বললে, ‘পূজা শেষ হয়েছে। এবার যেতে পারো নবতে।
সারদা তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল পিঁড়ি ছেড়ে। উঠেই নবতের দিকে ছুট দিলে। একটা প্রণাম করে আসা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারল না। ছি, ছি, নিশ্চয়ই ঠিক ছিল। মনে-মনে তাই এখন প্রণাম করলে রামকৃষ্ণকে।
পুজ্য-পুজকে ভেদ নেই সেই ভাবাতীতের রাজ্যে।
লক্ষ্মী বললে, ‘তোমার এত লজ্জা, তুমি কাপড় পরাতে দিলে কি গো!’
‘কি জানি, আমি তখন যেন কি রকম হয়ে গিয়েছিলাম!’
‘তার পর উনি তোমাকে মিষ্টি খাওয়ালেন, পায়ে ফুল দিলেন, হাত দিলেন, তুমি ঠায় বসে রইলে?’
‘কি জানি বাপু বসে রইলুম। সব দেখছি বটে, কিন্তু কথা বলতে পারছি না, নড়তে-চড়তে পারছি না।’
‘আর কেউ টের পেল না?’
‘কি করে পাবে! দরজা বন্ধ যে।’
‘তুমি মহাশক্তি। মহাশক্তি না হলে এ পূজা গ্রহণ করে এমন শক্তি কার?’
সেই থেকেই ভাব হয় সারদার।
নবতের ঘরটিতে শুয়ে আছে সারদা, তারই বিছানার এক পাশে যোগেন-মা ঘুমুচ্ছে। রাত্রে কোথাও হঠাৎ বাঁশি বেজে উঠল।
বাঁশির স্বরে ভাব হল সারদার। যেন সে বেণুবিনোদিনী রাধিকা হয়ে গেল। থেকে-থেকে হাসতে লাগল আপন-মনে। দেখতে লাগল বুঝি বা সেই বংশী-বটবিহারীকে।
বিছানার এক কোণে তাড়াতাড়ি সরে বসল যোগেন-মা। বসেই রইল যতক্ষণ না ভাব ভাঙে। ভক্তিমতী হলে কি হয়, সংসারের মধ্যে তো আছে, যোগেন-মা ভাবল যদি তার ছোঁয়া লেগে সারদার ভাব কেটে যায়!
সেই ভাবের চরম হল নীলাম্বরবাবুর বাড়িতে। ছাদে বসে ধ্যান করছিলেন শ্রীমা, পাশে গোপাল-মা, যোগেন-মা বসে। ধ্যানের পর আর সমাধি ভাঙে না শ্রীমা’র। অনেক নাম শোনাবার পর হুঁস যদি বা হল, শ্রীমা উদ্ভ্রান্তের মত বলতে লাগলেন, ‘ও যোগেন, আমার হাত কই, আমার পা কই? আমি কি করে ঢুকবো এই শরীরের মধ্যে?’
স্ত্রী-ভক্তেরা শ্রীমা’র হাত-পা টিপে দিতে লাগল—এই যে পা, এই যে হাত। তবু দেহটা যে কোথায় পড়ে রয়েছে, চট করে খুঁজে পাচ্ছেন না।
সারদা চলে গেল নবতে। রামকৃষ্ণ বললে, এবার শান্তিতে ঘুমোও গা মেলে। আমার কাছে থাকতে, আর সারা রাত বসে থাকতে জেগে, কখন কী ভাব হয় আমার আর কখন কী নাম-মন্ত্র বলে আমাকে সচেতন করো! এতে কী কারু সুখ থাকে না শরীর থাকে? তুমি মা’র কাছে নবতে গিয়ে ঘুমোও।
তাই যাব। তুমি যেমন নাচাও তেমনি নাচি। যাব বিরহের মন্দিরে, সেখানেই বিশ্বনাথের আরতি করব। আমার বসন নিয়েছ, তুমি নাও আমার সমস্ত বাসনা। বিদুরের স্ত্রী স্নান করছে, ঘরের বাইরে কৃষ্ণের ডাক শোনা গেল, বিদুর! বিদুর! কৃষ্ণকণ্ঠের স্বর শুনে বিহ্বল-ব্যাকুল হয়ে বিদুর-পত্নী ছুটে এল গৃহদ্বারে। কিন্তু, কি লজ্জা, ব্যাকুলতায় বসনখানিই ফেলে এসেছে ভুল করে। তখন আর পিছু সরবার পথ নেই, কৃষ্ণের কাছে সে সম্পূর্ণ উন্মোচিতা। কৃষ্ণ তক্ষুনি তার নিজের উত্তরীয় বিদুর-পত্নীর গায়ে ছুঁড়ে দিল। ত্রস্ত হাতে তাই দিয়ে কোনো রকমে গা ঢাকবার চেষ্টা করলে, কিন্তু কৃষ্ণের চেয়ে লজ্জা তার বেশি নয়। কৃষ্ণকে ঘরে নিয়ে এল। কিন্তু কী যে খেতে দেবে ভেবে পেল না। দেখল বাড়িতে শুধু পাকা কলা ছাড়া কিছু নেই। তাই একটা ছিঁড়ে খেতে দিল কৃষ্ণকে। কিন্তু ভাবে-ভক্তিতে এমনি বিবশ হয়ে গিয়েছে যে, কলা না দিয়ে খোসা দিয়ে ফেলেছে। আর তাই কৃষ্ণ খাচ্ছে তৃপ্তি করে। ভক্তের কলা আর খোসা দুই-ই সমান ভগবানের কাছে।
আমারও তেমনি ভক্তি, তেমনি প্রীতি, তেমনি ব্যাকুলতা। হয়তো তোমাকে খোসা দিয়ে ফেলেছি, কিন্তু তুমি সর্বস্বাদগ্রাহী, তুমি দেখ তা ভাবের রসে স্বাদু কিনা। প্রভু, তুমি যদি নাও, তবেই আমি পূর্ণ হব। তুমি যদি খাও তবেই আমার খিদে মিটবে।
গোলাপ-মা’র ভালো নাম অন্নপূর্ণা। মাঝবয়সী বিধবা। একটি মাত্র মেয়ে মারা যাবার পর দক্ষিণেশ্বরে এসে ঠাকুরের পায়ের কাছে কেঁদে পড়ল।
ঠাকুরের ভাব হল। বললেন, ‘তুমি তো মহা ভাগ্যবতী।’ গোলাপ-মা থমকে রইল। ‘সংসারে যাদের কেউ নেই কিছু নেই ঈশ্বর তো তাদেরই সহায়৷
‘অশরণের আশ্রয়স্থল তুমি। গোলাপ-মা বসে পড়ল পদচ্ছায়ে। ঠাকুরের তখন অসুখ, গোলাপ-মা বললে, কলকাতায় তার এক জানাশোনা ডাক্তার আছে, সে নির্ঘাৎ সারিয়ে দিতে পারবে। ছোট ছেলের মত লাফিয়ে উঠলেন ঠাকুর, বললেন, কালই চলো। পর দিন ভোরেই রওনা হলেন নৌকো করে, সঙ্গে গোলাপ-মা, লাটু আর কালী। সারা দুপুর কেটে গেল এই ডাক্তারির ধান্দায়। ফেরবার পথে বেজায় খিদে পেল সবাইকার। সেই কোন সকালে বেরিয়েছে সকলে। এখন দুপর প্রায় গড়িয়ে গেছে। ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন, কারু কাছে পয়সা আছে কি না। কেবল গোলাপ-মা’র কাছে আছে। তাও, চারটি মোটে পয়সা! তাই সই। ঠাকুর কালীকে বললেন, বরানগরের বাজার থেকে মিষ্টি কিনে নিয়ে আয়।
ঠোঙায় করে তাই নিয়ে এল কালী। কিন্তু, কি আশ্চর্য, কাউকে কিছু না দিয়ে সমস্ত মিষ্টিটা ঠাকুর একাই খেয়ে ফেললেন। তার পরে গঙ্গার জল খেলেন অঞ্জলি ভরে। বললেন, ‘আঃ, খিদে মিটল।’
অবাক কাণ্ড। আর তিন জনেরও খিদে মিটে গেল সেই সঙ্গে। কিছু নিল না, খেল না, অথচ কারু খিদে নেই এক ফোঁটা। সেই বন্য ক্ষুধা মুহূর্তে তৃপ্ত হল কি করে?
তুমি কি সেই মহাভারতের কৃষ্ণ? তুমি তৃষাহর। তুমি তৃপ্তিকর।
নবতের সরু বারান্দায় চিকের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকে সারদা। অতৃপ্ত চোখে চেয়ে থাকে যদি কখনো কোনো ফাঁকে দেখা যায় সেই তৃপ্তিকরকে!
রামকৃষ্ণের প্রতি ভক্তি দেখে সারদাকে ঠাট্টা করে হৃদয়। বলে ‘সবাই তো মামাকে বাবা বলছে। তুমিও তবে বাবা বলে ডাকো না।’
এতটুকু রুষ্ট বা অপ্রতিভ হল না সারদা। নিবিড় ভক্তির সঙ্গে গভীর প্রীতি মিশিয়ে বললে, ‘উনি বাবা কী বলছ! উনি বাবা মা বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন, সমস্ত। যেখানে যে সম্পর্কে যতটুকু আনন্দ আছে, সমস্তই উনি! উনি আনন্দময়।’
সেই গান্ধারীর কথা মনে করো,
‘ত্বমেব মাতা চ পিতা ত্বমেব
ত্বমেব বন্ধুশ্চ সখা ত্বমেব।
ত্বমেব বিদ্যা দ্রবিণং ত্বমেব
ত্বমেব সর্বং মম দেবদেব৷’
তুমি আমাকে দূরে সরিয়ে রেখেছ, কিন্তু জেনো, আমি তোমার দুয়ারেই পড়ে আছি।
.
৷৷ প্ৰথম খণ্ড সমাপ্ত।।
প্রথম খণ্ড লিখতে নিম্নলিখিত পুস্তকাবলীর উপর নির্ভর করেছি
স্বামী সারদানন্দকৃত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলা প্রসঙ্গ Life of Sri Ramakrishna (Advaita Ashrama)
শ্রীম-কথিত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত
অক্ষয়কুমার সেন প্রণীত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-পুঁথি
ব্রহ্মচারী অক্ষয়চৈতন্যকৃত শ্রীশ্রীসারদা দেবী
অশ্বিনীকুমার দত্তকৃত ভক্তিযোগ
শ্রীশ্রীমায়ের কথা (উদ্বোধন)
