ডায়েন – কৌশিক সামন্ত
ডায়েন
দিল্লি রোড ধরে হু হু করে এগিয়ে চলেছিল আমাদের টাটা সুমো।
জানলা দিয়ে বেশ ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছিল বলে কাচটা উঠিয়ে দিলাম। পাশে তাকিয়ে দেখলাম, প্রফেসরের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই সেদিকে। বরং তাঁর সবটুকু মনোযোগ ছিল হাতে ধরা একটা চিঠির দিকে।
গাড়িতে আমি, প্রফেসর সোম, তাঁর ড্রাইভার নবীন— এই তিনজন ছাড়া এক আগন্তুকও রয়েছেন। প্রফেসর তাঁর সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই বলেননি। শুধু এটুকু জানতে পেরেছি যে ভদ্রলোকের নাম শম্ভু হেমব্ৰম।
অন্যদিনের তুলনায় প্রফেসর আজ অনেকটাই গম্ভীর। আমিও প্রশ্ন করতে খুব একটা ভরসা পাচ্ছিলাম না।
প্রতি সপ্তাহের রুটিন আনুযায়ী ঠিক শনিবার বিকেলে প্রফেসর সোমের বাড়িতে হাজির হয়েছিলাম নতুন গল্প শোনার আশায়। কিন্তু প্রফেসর সেখানে ছিলেন না। প্রহ্লাদ বলেছিল, বাবু নার্সিংহোমে গেছেন তাঁর খুব কাছের এক আত্মীয়কে দেখতে। সেই মানুষটির অবস্থা নাকি খুবই সিরিয়াস। অগত্যা আমি ফিরে এসেছিলাম।
প্রফেসরকে ফোন করাটা ঠিক হবে কি না— সেটাই ভাবছিলাম। তখনই মোবাইলটা বাজতে শুরু করল। প্রফেসরই ফোন করেছিলেন।
আমার মামুলি কুশল প্রশ্নের উত্তরে প্রফেসর বললেন, “আজ তোমাকে ডেকেও থাকতে পারলাম না, কৌশিক। কিছু মনে কোরো না।”
“আরে না-না। আচ্ছা, প্রহ্লাদ বলল, আপনি নাকি কাকে দেখতে নার্সিংহোম গেছেন। তিনি কেমন আছেন এখন?”
“ফাদার ডি’সুজা। নাহ্, খুব একটা ভালো নেই উনি।”
“কী হয়েছে ওঁর?”
“সব সময়মতো বলব, কৌশিক। তুমি কি ক-দিন ছুটি ম্যানেজ করতে পারবে?”
“কতদিনের ছুটি, প্রফেসর? কোথাও যেতে হবে?”
“হুঁ। যেতে হবে পুরুলিয়া। দু-দিনও লাগতে পারে, আবার এক সপ্তাহও। তুমি কি ম্যানেজ করতে পারবে?”
“অবশ্যই!”
“বেশ। তুমি কাল সকালে অল্প কিছু জামাকাপড় নিয়ে রেডি হয়ে থেকো। আমি পিক আপ করে নেব।”
ফোন রেখে দিয়েছিলেন প্রফেসর সোম।
আমিও ভাবতে শুরু করেছিলাম, ওঁকে কথা তো দিয়ে দিলাম; কিন্তু ছুটিটা ম্যানেজ করব কী করে? একদিকে ম্যানেজারের গালাগাল, আর অন্যদিকে প্রফেসর সোমের সঙ্গে লাইভ এক্সপিডিশানে যাওয়া— একেবারে সোফিজ চয়েস! তবে শেষ অবধি, অনেক কষ্টে, ছুটি মঞ্জুর হল। তারপরেই এই বেরিয়ে পড়া।
“জানি তোমার মনে অনেক প্রশ্ন ভিড় করে আসছে।” প্রফেসর সোমের গলার আওয়াজে আমার চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেল, “কিন্তু আমি এই মুহূর্তে ঠিক উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। তুমি এই চিঠিটা নাও, সব বুঝতে পারবে।”
হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নিলাম। হয়তো অব্যক্ত আশঙ্কাটা মুখে একটু বেশিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। প্রফেসর মৃদু হেসে আবার বলে উঠলেন, “ফাদার ডি’সুজা আমার পিতৃসম। বলতে পার, হাতে ধরে আমাকে উনিই কাজ শিখিয়েছেন। আজ সেই মানুষটি মৃত্যুশয্যায়। আমার হাতে সময় খুব অল্প। দাবার অনেক চাল সাজাতে হবে। একটু ভুল হলেই অনেক দেরি, অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে কৌশিক।”
কথা না বাড়িয়ে চিঠিটা খুললাম। প্রচুর কাটাকাটি আর জড়ানো হাতের লেখা দেখে বোঝাই যায়, লেখক বেশ তাড়াহুড়োয় ছিলেন চিঠিটা লেখার সময়।
‘স্নেহের রুদ্র,
এই চিঠি যখন তোমার হাতে পৌঁছোবে, তখন আমি হয়তো কথা বলার অবস্থায় থাকব না। হয়তো থাকবই না; তাই সবটা লিখে গেলাম। সময় বেশি নেই আমার হাতে। তাই লেখাটা হয়তো কিছুটা অগোছালো হয়ে গেল।
আমাদের দেরাদুন অনাথ আশ্রমের অরিন্দম মাহাতোকে নিশ্চয় তোমার মনে আছে। ছোটো থেকেই সে কীরকম মেধাবী ছিল বলো তো! পরে বড়ো হয়ে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বাইরে বাইরে থাকত।
সেদিন হঠাৎ ফোন পেলাম অরিন্দমের; সে ফরেস্ট রেঞ্জার হয়েছে। পোস্টিং হয়েছে পুরুলিয়াতে। আমাকে যেতেই হবে! কোনো কথা সে শুনতে চাইল না। পুরুলিয়ার জঙ্গল সে নিজে ঘুরিয়ে দেখাবে আমাকে। তুমি তো জানই, অরিন্দম ছোট্ট থেকেই কীরকম জেদি। আমি না গেলে হয়তো সে দেরাদুনেই এসে হাজির হত জোর করে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তাছাড়া এমনিতেও বয়সের ভারে আমার স্বাস্থ্য বেশ ভেঙে পড়েছে। ডাক্তার প্রায়ই বলেন, বাইরে কোথাও থেকে হাওয়া বদল করে আসতে। ভাবলাম এই সুযোগে দুই কাজ সেরে ফেলি।
তোমাকে কী বলব রুদ্র! অরিন্দম সেই আগের মতোই ছেলেমানুষ রয়েছে। সে যে আমাকে পেয়ে কী করবে না করবে, বুঝে উঠতে পারছিল না। ‘ফাদার এটা খান’, ‘ওটা করুন’, ‘ওদিকে চলুন, ঘুরে আসি’— এই চলছিল আসার পর থেকে। আদর আর আপ্যায়নের আতিশয্যে আমার প্রাণ তো ওষ্ঠাগত।
অরিন্দমের পক্ষে রোজ আমাকে সঙ্গ দেওয়া সম্ভব ছিল না। তাই ফরেস্টে ডিপার্টমেন্টের একটা জিপ, ড্রাইভার, আর একজন ফরেস্ট গার্ড আমার জন্য রোজ বরাদ্দ ছিল। জিপ নিয়ে আমি খুশিমতো এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াতাম।
একদিন সেরকমই বেরিয়ে পড়েছিলাম। সেদিন অবশ্য গার্ড পিটার সঙ্গে ছিল না; ছিলাম শুধু আমি আর ড্রাইভার শম্ভু। জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ গভীর জঙ্গলের ভেতরে গাছগাছালির মধ্যে উঁকি মারা একটা প্রাচীন প্রাসাদ গোছের কিছু দেখতে পেলাম। মনে হল, যেন অদ্ভুত একটা বিষণ্নতা ঘিরে রেখেছে গোটা জায়গাটা।
‘রোখকে!” বলে আমি গাড়ি থামাতে বললাম। জায়গাটা দেখার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু শম্ভু তো কিছুতেই গাড়ি থামাবে না। শেষে আমি চলন্ত গাড়ি থেকে প্রায় লাফিয়ে পড়ার উপক্রম করতে শম্ভু গাড়ি থামাল। গাড়ি থেকে নামলাম। তক্ষুনি শম্ভু ছুটে এসে আমার হাত-পা জড়িয়ে ধরল— যেন কী একটা সাংঘাতিক অপরাধ করে ফেলেছি আমি!’
.
।। ২।।
“আরে বাবু ই আপনি কী করছেন? সাহেব আমার জান লিয়ে লিবে!”
“কী মুশকিল! এই জঙ্গলের ভেতর বাঘ-ভাল্লুক আছে নাকি যে এরকম করছ?” ড্রাইভার শম্ভুর এ হেন অস্বাভাবিক আচরণে বিরক্তই হচ্ছিলেন ফাদার ডি’সুজা। “ওখানে যাবেন না সাহেব। ওই ঘরে ডায়েন আছে। শাপ লেগে যাবে, শাপ! কেউ যায় না ও বাড়িতে।”
ডায়েন! শাপ! অনেকদিন পর কথাগুলো কানে এল ফাদার ডি’সুজার। সেই কবে বয়সজনিত কারণে এসব রোমাঞ্চকর কাজ ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। আজ একবার পুরোনো সিলেবাস ঝালিয়ে নিলে ক্ষতি কী? ডায়েন থাকুক বা না-থাকুক, বহুদিন বাদে সেই আগের রোমাঞ্চটা তো পাওয়া যাবে। পকেট থেকে সিলভার ক্রশটা বার করলেন তিনি সেটা শম্ভুকে দেখিয়ে বললেন, “চিন্তা কোরো না শম্ভু। স্বয়ং ঈশ্বর আছেন আমার সঙ্গে। কোনো ডায়েন-ফায়েন আমার কিছু করতে পারবে না, বুঝলে! তাছাড়া এ-সব তোমাদের গ্রামের কুসংস্কার। আমি নিশ্চিত যে ওখানে ধূলিধূসরিত ইতিহাস আর ক-টা ভাঙা আসবাব ছাড়া আর কিছুই নেই।”
“না সায়েব! আপনি জানেন না, আগেও বহুত লোকের জান লিয়েছে ওই বাড়ি। আপনি দয়া করে ওই ঘরে পা দিবেন না। জঙ্গলের আরও অনেক সুন্দর জায়গা আছে। আমি আপনাকে সব দিখাব। কিন্তু ওইটা ছেড়ে দেন।”
“ওই বাড়িটা আমি দেখতে যাবই শম্ভু। তোমার ইচ্ছে হলে এসো, না হলে এখানেই অপেক্ষা করো আমার জন্য।”
শম্ভুকে রীতিমতো ধাক্কা দিয়ে একপাশে সরিয়ে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চললেন ফাদার ডি’সুজা। তবে তাঁর মনে প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছিল— কাজটা কী ঠিক হল?
হয়তো ঠিক হল না। আসলে ডাক্তারের শাসনে বাঁধা রুটিনমাফিক জীবনে বড্ডো হাঁফিয়ে উঠছিলেন তিনি। এটা খাওয়া যাবে না, ওটা করা যাবে না— এ কোনো জীবন হল? অন্তত আজ একটা দিনের জন্য তো অতীতে ফিরে যাওয়া যাবে। কিছুটা হলেও ফেলে আসা জীবনের স্বাদ ফিরে পাওয়া যাবে।
বুনো ঝোপ-ঝাড় পেরিয়ে সাবধানে এগিয়ে চললেন ফাদার ডিসুজা। যদিও শীতকাল, কিছুই বেরোনোর কথা নয়, তবুও সাবধানের তো মার নেই।
ঘড় ঘড়াৎ!
বিশাল সেগুনের পাল্লাটা খুলতে বেশ বেগ পেতে হল ফাদারকে। তবে শেষ অবধি সেটা খোলা গেল। খুলতেই একরাশ জমে থাকা ধুলো, বদ্ধ বাতাস, প্রাচীন পরিবেশের গন্ধ— সব বেরিয়ে এসে তাঁকে ঘিরে ধরল।
বাড়িটা দোতলা। সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই এক প্রকাণ্ড ঘোরানো সিঁড়ি। দুই তলা মিলিয়ে প্রায় খান বিশেক ঘর।
নীচের তলার ঘরগুলোয় ঢুকে সব দেখতে শুরু করলেন ফাদার। তবে তখনও পর্যন্ত এমন কিছু তাঁর নজরে পড়েনি যা থেকে এখানে অতীত ছাড়া আর কোনো অলৌকিক শক্তিধরের অস্তিত্ব অনুভব করা যায়।
সবটাই কি তাহলে গ্রামবাসীদের কুসংস্কার?
তবে মাটিতে জমে থাকা পুরু ধুলোর স্তর বলে দেয় যে এখানে বহুদন কেউ আসেনি। অযত্নে পড়ে থাকা অটুট অথচ মূল্যবান আসবাব, ভাস্কর্য— এ-সব দেখে বোঝা যায় যে চোরডাকাতরাও এই বাড়িকে এড়িয়ে চলে। তবু খানিকটা নিরাশই হলেন ফাদার ডি’সুজা। ডায়েন না থাকলেও অন্তত একটু রোমাঞ্চকর ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার আশা করেছিলেন তিনি।
একতলার ঘরগুলো দেখা শেষ। বেশি দেরি হলে শম্ভুও ভয় পাবে। ঝটপট দোতলাটা দেখে নেওয়ার ইচ্ছে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলেন ফাদার ডি’সুজা।
সিঁড়ি দিয়ে উঠেই প্রথম পরিবর্তনটা টের পেলেন ফাদার। বাতাস এখানে বেশ ঠান্ডা আবহাওয়ার এই হঠাৎ পরিবর্তন কোনোমতেই স্বাভাবিক হতে পারে না। একটা বড়ো শ্বাস নিয়ে দোতলার প্রথম ঘরে ঢুকলেন তিনি। দৃশ্যটা তাঁকে থমকে দাঁড় করিয়ে দিল। সারা ঘরের দেয়াল জুড়ে আগুনে পোড়ার চিহ্ন এত বছরেও সেগুলো ম্লান হয়নি।
প্রথম ঘরটা থেকে বেরিয়ে এলেন ফাদার। দ্বিতীয় ঘরেও একই অবস্থা। সারা ঘরজুড়ে চাপ-চাপ পোড়া দাগ— যেন কেউ জ্বলন্ত অবস্থায় সারা বাড়ি জুড়ে ছুটে বেড়িয়েছে। কী হয়েছিল এখানে? কথাটা ভাবতে-ভাবতে ঈষৎ অন্যমনষ্ক হয়ে পড়েছিলেন ফাদার ডি’সুজা। হঠাৎ একটা বিশ্রি পোড়া গন্ধ নাকে এল তাঁর, কিছু যেন একটা পুড়ছে, পেছনে ফিরে তাকালেন ফাদার।
এ কী!
ফাদার ডি’সুজা’র শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমস্রোত নেমে এল যেন। তিনি দেখলেন, মাত্র কয়েক ফুট দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটা জমাট বাঁধা অন্ধকার। দাঁড়িয়ে আছে বললে ভুল হবে। মাটির আধফুট ওপরে ভাসছে একটা আধপোড়া নারী শরীর। গন্ধটা ঠিক সেখান থেকেই আসছে।
শতাব্দী প্রাচীন এলোমেলো চুল, আধপোড়া শাড়ি, গলে খসে পড়া হাড়-মাস, পুড়ে যাওয়া বিশ্রী একটা মুখ আর দুটো জ্বলন্ত চোখ— এগুলো সেই অন্ধকারের মধ্যেই খুঁজে পেলেন ফাদার। বিশেষত ওই জ্বলন্ত চোখজোড়া তাঁকে স্থির করে দিল। চরম ঘৃণা ছিল সেই চোখ জুড়ে।
ডায়েন!
অদ্ভুত একটা চিৎকার করে সেই অন্ধকার ছুটে এল ফাদারের দিকে। ফাদার হাতের সিলভার ক্রশটা উঁচু করে ধরে, পবিত্র জল ছুড়ে মারলেন সেই ধাবমান বিভীষিকার দিকে। বাতাসে বিশ্রী রব তুলে, সেটা মিলিয়ে গেল। জোর বাঁচা বেঁচে গেছেন! ফাদার মনে-মনে স্বীকার করলেন, ডাক্তার ঠিকই বলেছেন। বয়সের সঙ্গে-সঙ্গে সত্যিই আগের রিফ্লেক্স আর নেই। এতদিন এ-সব কাজ ছেড়ে থাকার পর আজ দুম করে এখানে, অপ্রস্তুত অবস্থায় চলে আসা উচিত হয়নি। এতদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, এই ডায়েন বেশ শক্তিশালী। দীর্ঘদিন ধরে, বহু মানুষের প্রাণরস শোষণ করেছে এ। এখন এই বাড়ি ছেড়ে পালাতে হবে— যেভাবে হোক। পরে না হয় তাঁর ছাত্র রুদ্র সোমকে নিয়ে এখানে আসবেন। সে তো এখনও কাজের মধ্যেই আছে। আপাতত শক্তিশালী শত্রুর থেকে নিরাপদ দূরত্বে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
এইসব ভাবতে-ভাবতে হুড়মুড় করে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন ফাদার ডি’সুজা। সিঁড়ির শেষধাপে নেমে পায়ে পা জড়িয়ে হোঁচট খেলেন তিনি। মুখ থুবড়ে মেঝের ওপর আছড়ে পড়লেন ফাদার। তাঁর হাতে ধরা ক্রুশ আর পবিত্র জলের পাত্র ছিটকে পড়ল দূরে।
সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায়, অসহায়ের মতো পড়ে রইলেন ফাদার ডি’সুজা। নিমেষে সেই বীভৎস নারীমূর্তি কোথা থেকে যেন আবার আবির্ভূত হল। একটা অন্ধকার ঝড়ের মতো সে ছুটে এসে প্রবেশ করল ফাদারের শরীরে। একটা বুক ফাটানো আর্তনাদ করে সংজ্ঞা হারালেন ফাদার।
.
।।৩।।
সারা শরীর জুড়ে অসম্ভব একটা যন্ত্রণা— কেউ যেন শত-সহস্ৰ ছুঁচ ফুটিয়ে দিচ্ছে প্রতি মুহূর্তে! ধড়ফড় করে উঠে বসতে চাইলেন ফাদার ডি’সুজা; কিন্তু পারলেন না। কেউ যেন তাঁকে মেঝের সঙ্গে আটকে দিয়েছে।
হঠাৎ একটা চিৎকার চেঁচামেচি কানে এল তাঁর। তাহলে কী অরিন্দম আর শম্ভুরা তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে এদিকে চলে এসেছে? অবশেষে মুক্তি পাবেন তিনি!
কিন্তু এরা কারা? ফাদার দেখলেন, দু’জন মানুষ বেশভূষা দেখে যাদের বেশ সম্ভ্রান্ত ঘরের বলেই মনে হয়। হিড়হিড় করে টেনে আনছে এক মহিলাকে। মহিলাটা কাঁদছে। আকুতি-মিনতি করছে। তার প্রার্থনায় বুঝি পাষাণও গলে যায়। কিন্তু কে শোনে তার কথা! সেই দু’জন চুলের মুঠি ধরে টানার পাশাপাশি তাকে নির্মমভাবে মারতে থাকে। তারপর একজন তাকে শক্ত করে ধরে রাখে। অন্য একজন একটা টিনের পাত্র খুলে কী যেন ঢালতে থাকে মেয়েটার সারা গায়ে।
গন্ধে ফাদার ডি’সুজা বুঝতে পারলেন, তরল বস্তুটা কেরোসিন। তিনি আবারও চিৎকার করে উঠতে চাইছিলেন। ছুটে যেতে চাইছিলেন মেয়েটাকে বাঁচাতে। কিন্তু শরীর তো দূরের কথা, জিভটাকেও নাড়াতে পারছিলেন না তিনি।
মেয়েটার গায়ে দেশলাই জ্বেলে দিল একটা লোক। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকল মেয়েটা। যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে, জলের সন্ধানে, এদিকে-সেদিকে ছুটে বেড়াল সে। লোকগুলো তাই দেখে পাগলের মতো হাসছিল। একটা সময় ফাদার দেখলেন, মেয়েটা ছুটে আসছে তাঁর দিকেই— শেষ অবলম্বন হিসাবে বুঝি তাঁকেই জড়িয়ে ধরবে সে।
মাংস আর চামড়া পোড়ার কটু গন্ধ তাঁর নাকে এল। জ্বলন্ত সেই শরীরের উত্তাপে তার নিজের শরীরই বুঝি ঝলসে গেল। আতঙ্কে, যন্ত্রণায় চোখ বুজে ফেললেন ফাদার ডি’সুজা।
কতক্ষণ এভাবে পড়ে ছিলেন, তা তিনি জানেন না। চোখ খুলে দেখলেন, চারদিকে অন্ধকার। কেউ কোথাও নেই। তখন আস্তে-আস্তে দেহে বল ফিরে পাচ্ছিলেন তিনি। মেঝেতে উঠে বসে ফাদার সিদ্ধান্ত নিলেন, এই বাড়ি ছেড়ে তাঁকে বেরোতেই হবে। বেশিক্ষণ এই নারকীয় যন্ত্রণা সহ্য করা যাবে না।
হঠাৎ ফাদার দেখলেন, কোথা থেকে একটা ফুটফুটে বাচ্চা কাঁদতে-কাঁদতে ছুটে আসছে তাঁর দিকে! বাচ্চাটার পেছনে আসছিল আগেরবার দেখা যণ্ডা লোকদুটো। তাদের ছায়াগুলোও একসময় অন্ধকারে মিশে গেল।
ফাদার বুঝলেন, এটাই সেই ডায়েনের ইতিহাস কিংবা অভিশাপ।
হঠাৎ দরজায় একটা শব্দ হল। কে যেন সদর দরজাটা খুলে ফেলল।
“কে?”
জিজ্ঞেস করেও নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করলেন চেষ্টা ফাদার। আবার হয়তো কোনো নতুন নারকীয় দৃশ্য দেখতে হবে। আর কত যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে তাঁকে?
“ফাদার! ফাদার, আপনি কোথায়?”
একটা টর্চের আলো এসে পড়ল তাঁর ওপরে। এই গলা… এ তো তিনি চেনেন! অরিন্দম এসেছে।
“অরিন্দম! তুমি এখানে এসো না। পালাও!” হাত তুলে পাগলের মতো চিৎকার করতে লাগলেন ফাদার।
.
।।৪।।
ফাদার ডি’সুজার চিঠিটা এতদূর পড়ার পর আমি একটু থামলাম। বোতল খুলে খানিকটা জল খেলাম।
“কী বুঝছ কৌশিক?” প্রফেসর সোম প্রশ্ন করলেন।
“কিছুটা ধোঁয়াশা রয়েছে, বাকিটা পড়ি।”
“বেশ।” মাথা নাড়লেন প্রফেসর। আমিও বাকি চিঠিটা পড়া শুরু করলাম।
“রুদ্র, আমি অরিন্দমকে বারবার হাত নেড়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, যে সে যেন কিছুতেই এই ঘরের মধ্যে না ঢোকে। চিৎকার করে বলেছিলাম, সে যেন আমাকে না ছোঁয়। কিন্তু সে আমার কথা শোনেনি। তার ফলেই সর্বনাশের সূত্রপাত হয়েছে।
আমার বয়স হয়েছে। আমি চলে গেলে কারও কোনও ক্ষতি হত না। কিন্তু ও যে টগবগে তরুণ! ও কীভাবে সহ্য করত ওই যন্ত্রণার অভিশাপ? কিন্তু সেটাই হল। আমার শরীরে ডায়েনের একটা অংশ প্রবেশ করেছিল। তার মধ্যেই ধরা ছিল তার ওপর হওয়া অত্যাচার আর যন্ত্রণা— যার সাক্ষী হয়েছিলাম আমি। পরমপিতার আশীর্বাদে দীর্ঘদিনের আলো আর অন্ধকারের যুদ্ধের সাক্ষী হতে হতে আমাদের শরীর আর মন কিছুটা হলেও অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে গেছে— এ-কথা তো তুমি জানোই, রুদ্র। তাই আমাকে সেই অভিশাপ খুব একটা কাবু করতে পারেনি। কিন্তু অরিন্দম আমাকে তুলতে যেতেই সেটা তার শরীরে প্রবেশ করে!
মুহূর্তের মধ্যে সে বেচারি পাগল হয়ে যায়। আমি তাকে আটকানোর আগেই সে চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে যায়। জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে এলোপাথাড়ি দৌড়োতে থাকে সে মেনরোডের দিকে। কীভাবে উঠতে পেরেছিলাম, জানি না। তবু, এই অশক্ত শরীর নিয়েও আমি অরিন্দমের পিছু ধাওয়া করি। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি, রুদ্র। অসহায়ের মতো দূর থেকে দেখতে থাকি, অরিন্দমের জোয়ান তাজা শরীরটা চিৎকার করতে করতে মেন রোডের উপরে উঠল। পরক্ষণেই একটা কাঠবোঝাই লরি উন্মত্তের মতো ছুটে এসে তাকে থেঁতলে দিল! অরিন্দম মারা যায়নি রুদ্র। সে খুন হয়েছে! আর তাকে খুন করেছি আমি! এই যন্ত্রণা বুকে নিয়ে মরতে বসেছি। বুঝতে পেরেছি, হাতে আর সময় বেশি নেই। তাই তোমাকে আমার একটা কথা রাখতে হবে বাবা। মৃত্যুপথযাত্রী এক বৃদ্ধের শেষ ইচ্ছে এটা।
নিজের অপরাধবোধ থেকেই আমি অরিন্দমকে বারবার আহ্বান করেছিলাম। ওর আত্মার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলাম। কিন্তু ওপার থেকে কোনোও সাড়া আসেনি। একবার নয়, বারবার, বিভিন্ন পন্থায় আমি চেষ্টা চালিয়েছি; কিন্তু প্রতিবারই ব্যার্থ হয়েছি। অরিন্দমের মৃত্যুর পর সে ওপারে যায়নি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ওই ডাইনি এভাবেই লোকের প্রাণরস সিঞ্চন করে দিনের পর দিন শক্তিশালী হয়ে উঠছে। অরিন্দম তো বটেই, এতদিনে ওর যত শিকার, তাদের সবার আত্মা ওরই কবজায় আছে।
তুমি ওদের উদ্ধার করো রুদ্র। নয়তো যাদের বিরুদ্ধে সারাটা জীবন আমি লড়লাম, মৃত্যুর পরে আমিও সেই অপূর্ণতার প্রেতযোনিতে আবদ্ধ থেকে যাব। শুধু অরিন্দমই নয়, জেনে রেখো আমার মুক্তিও তোমার হাতেই রইল।
এই চিঠিটা তোমার হাতে পৌঁছে দেবে শম্ভু। ও সবটাই জানে। বাকিটা ওর থেকেই শুনে নিয়ো। পরমপিতা তোমার সহায় হোন।
ইতি,
ফ্রান্সিস ডি’সুজা
চিঠিটা শেষ করে আমি প্রফেসরকে জিজ্ঞেস করলাম, “তাহলে আমরা কি এখন সেই বাড়িতেই যাচ্ছি?”
“সেখানে যাব; তবে আজ নয়। আজ অন্য একটু কাজ আছে। জমিদার রণেন্দ্রনারায়ণের কাছে যেতে হবে।”
“তিনি কে?”
“তাঁর পিতামহ রুদ্রনারায়ণই ছিলেন ওই পরিত্যাক্ত বাগানবাড়ির মালিক।” ঠান্ডা গলায় বললেন প্রফেসর।
বাইরে তাকিয়ে বুঝলাম, আমরা ইতিমধ্যেই আসানসোল পেরিয়ে এসেছি।
.
।।৫।।
“কী হল? আপনারা তো কিছুই খাচ্ছেন না!” রাশভারি গলায় বলে উঠলেন রণেন্দ্রনারায়ণ।
পুরোনো দিনের উঁচু আর বিশাল থামওয়ালা দালান, তাদের সর্বাঙ্গে কারুকার্য, প্রকাণ্ড ঝাড়বাতি— সব মিলিয়ে অতীতের গৌরবের কথা জানান দেয়। তারই সঙ্গে চোখে পড়ে জায়গায়-জায়গায় রংচটা তাপ্পি মারা দেয়াল, কোণে জমে থাকা ঝুল, অপরিষ্কার ফরাস— এগুলো বলে দেয় যে জমিদারির সুবর্ণযুগ অস্তাচলে গেছে অনেক আগেই। সেই সত্যিটাকে মেকি আভিজাত্যের আড়ালে লুকিয়ে রাখতে যথাসম্ভব চেষ্টা করেছেন বৃদ্ধ রণেন্দ্রনারায়ণ। তাঁর গায়ের শৌখিন কাপড়, আতরের তীব্র সুবাস, আর আমাদের সামনে খাওয়ার টেবিলে সাজিয়ে রাখা বিশাল খাদ্যসম্ভার সেটাই তুলে ধরছে।
“আমার আতিথেয়তায় কি কোনও ত্রুটি থেকে গেছে, সোম সাহেব?” আবার প্রশ্ন করলেন রণেন্দ্রনারায়ণ।
পুরুলিয়া পৌঁছে আমরা প্রথমে হোটেলে ঢুকেছিলাম। সেখানে স্নান-টান সেরেই সোজা রণেন্দ্রনারায়ণের বৈঠকখানায় এসেছিলেন প্রফেসর, আমাকে নিয়ে।
“নাহ্, আসলে এই পরিস্থিতিতে এমন ভোজ খাওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব। অনুগ্রহ করে মার্জনা করবেন।” উত্তর দিলেন প্রফেসর সোম।
“হ্যাঁ, সবটাই শুনেছি শম্ভুর মুখে।” দুঃখিত ভঙ্গিতে বললেন রণেন্দ্রনারায়ণ, “কী আর করা যাবে? সবটাই ভবিতব্য। তা না হলে এখানে সবাই জানে ওই অভিশপ্ত বাড়ির কথা। মানুষ তো দূর, কাকপক্ষীও ওই দালানের ছায়া মাড়ায় না। রেঞ্জার সাহেবও জানতেন সবটা। তা সত্বেও উনি কেন যে এভাবে ছুটে গেলেন মৃত্যুর দিকে, কে জানে!”
“আচ্ছা, আপনার পরিবারের তরফ থেকে আগে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বাড়িটার শান্তি স্বস্ত্যয়নের জন্য?”
“যথাসাধ্য চেষ্টা হয়েছে, সোম সাহেব। বিভিন্ন সাধু, পুরোহিত, গুণিন, ওঝা কাউকে বাদ রাখা হয়নি। সবাই চেষ্টা করেছেন; কিন্তু ফলাফল শূন্য। শেষে হরিদ্বার থেকে এক তেজস্বী কাপালিক এসে ওই ডাইনিকে জব্দ করেন। তাকে সম্পূর্ণ নষ্ট তিনি করতে পারেননি। তবে ওই পিশাচিনীর গতিবিধি আর ক্ষমতা বেঁধে দিয়েছিলেন ওই বাড়ির মধ্যেই।” গমগমে গলায় বলে ওঠেন রণেন্দ্রনারায়ণ।
“আমার এই পুরো ইতিহাসটা জানা প্রয়োজন। তবেই হয়তো কিছু বিহিত করতে পারব।”
“বেশ তো। আমার যতটা জানা আমি সবটাই জানাব আপনাদের।”
টেবিল থেকে উঠে পড়লাম আমরা। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলাম। উলটোদিকের একটা আরামকেদারায় বসে মুখ খুললেন রণেন্দ্রনারায়ণ।
“এই ঘটনা আমার পিতামহ রুদ্রনারায়ণের সময়কার। সেই সময় এখানে বড়ো মেলা বসত। দূরদূরান্ত থেকে অনেকে খেলা দেখাতে আসত সেই মেলায়। বানজারা মহিলাদের একটা দলও আসত এখানে। তারা খতরনাক সব ভোজবাজির খেলা দেখাত। এমনিতে লোকে তাদের ডাইনি বলে সন্দেহ করলেও তাদের খেলা দেখতে বিরাট ভিড় হত।
এই পরিবারের বড়ো ছেলে ছিলেন দর্পনারায়ণ— রুদ্রনারায়ণের দাদা। তিনি এক বানজারা মেয়ের প্রেমে পড়ে যান। মেয়েটির নাম ছিল শেফালি। সবাই তাকে বারণ করেছিল। কিন্তু দর্পনারায়ণ পরিবার, এমনকি সমাজের বিপক্ষে গিয়ে শেফালিকে ঘরের বউ করে এনেছিলেন।
ফুলশয্যার পরদিন দর্পনারায়ণ আর ঘরের দরজা খুলছিলেন না। অনেক ডেকেও সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে ফেলা হল। দেখা গেল, দর্পনারায়ণ বিছানার ওপর নিঃস্পন্দ অবস্থায় বস্ত্রহীন হয়ে পড়ে আছেন। তাঁর সারা শরীর নীল হয়ে গেছিল। এও দেখা গেল যে দর্পনারায়ণের পায়ের বুড়ো আঙুল কামড়ে শেফালি শুয়ে আছে মেঝেতে। সারা ঘর জুড়ে ছড়িয়ে ছিল লেবু, কালো নুন, শুকনো লংকা, সূচ ইত্যাদি আরো একগাদা জিনিস— যেগুলো কালোজাদুর সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে।
ব্যস! শেফালি ডাইনি বলে সাব্যস্ত হল। দর্পনারায়ণের মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করে, গ্রামের মাঝে, একেবারে সর্বসমক্ষে, জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হল। শেফালি’র আত্মাই আজকের ওই ডায়েন। এই ঘটনার কয়েকদিন পরেই বাড়িতে আক্রমণ শুরু করে ওই ডায়েন। অনেকের মৃত্যু হয়। শেষ পর্যন্ত ওই বাড়ি পাকাপাকিভাবে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন আমার পূর্বপুরুষেরা। এই হল ডায়েনের ইতিহাস, সোম সাহেব।”
“বুঝলাম।” চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন প্রফেসর, “কিন্তু একটা ধোঁয়াশা থেকে গেল যে।”
“কীরকম?”
“আপনি বলছেন, শেফালিকে গ্রামের মাঝে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। কিন্তু ফাদার ডি’সুজার চিঠিতে জানতে পারছি, আপনাদের ওই বাড়িতে আরও এক মহিলাকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। সেখানে মাত্র দু’জন পুরুষ উপস্থিত ছিল। তারা কারা? সেই হতভাগ্য মহিলাই বা কে?”
“একটা কথা স্পষ্ট করেই বলি, সোম সাহেব। আপনারা অনেক দূর থেকে আসছেন। তায় আপনারা রেঞ্জারবাবুর বন্ধু। এই জন্যই আপনাদের এন্টারটেইন করলাম। কিন্তু আপনার ফাদার ডায়েনের ফাঁদে পড়ে কী দেখতে কী দেখেছেন, তারপর কী গল্প ফেঁদেছেন— তার জবাব তো আমার দেওয়ার কথা নয়।” হঠাৎ রেগে উঠলেন রণেন্দ্রনারায়ণ।
“অযথা উত্তেজিত হবেন না। আপনার উত্তরের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তাই বিনীত অনুরোধ…”
প্রফেসর সোমকে কথা শেষ করতে দিলেন না রণেন্দ্রনারায়ণ। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলেন, “এই, কে আছিস? শহরের বাবুদের বাইরের পথটা দেখিয়ে দে। আমার ভদ্রতাকে আমার দুর্বলতা বলে ভুল করবেন না প্রফেসর। আগুন নিয়ে খেললে হাত তো জ্বলবেই। সব জেনে-শুনেও আগুনে হাত দিয়েছিলেন আপনার ফাদার আর আমাদের রেঞ্জার। ওঁদের পরিণতির জন্য আমি বা আমার পরিবার কোনোভাবেই দায়ী নই। এবার আপনারা আসুন!”
কয়েকটা ষণ্ডাগুন্ডা লোককে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে প্রমাদ গণলাম। ঠিক তখনই প্রফেসর সোম লাফিয়ে উঠলেন চেয়ার থেকে। চিতার গতিতে তিনি এগিয়ে গেলেন রণেন্দ্রনারায়ণের দিকে। তিনি কিছু বোঝার আগেই তাঁর গলা চেপে ধরে অদ্ভুতদর্শন একটা লম্বা লকেট লাগানো হার সেই গলায় পরিয়ে দিলেন। কিছু বোঝার আগেই প্রফেসর বিড়বিড় করে কী একটা মন্ত্র পড়লেন। গোটা ঘটনাটা আধ মিনিটের ও কম সময়ের মধ্যে ঘটে গেল।
“এটা কী ধরনের অসভ্যতা? জানেন, এর জন্য আপনাকে আমি পুলিশে দিতে পারি!” চিৎকার করে উঠলেন রণেন্দ্রনারায়ণ।
প্রফেসর যেন শুনতেই পেলেন না কথাটা। বরং ঠান্ডা গলায় বললেন, “ভালো করে দেখুন তো আপনার চারপাশে। কিছু দেখতে পাচ্ছেন কি?”
“আপনাদের মতো অভদ্র দু’জন ছাড়া আর কাউকেই দেখছি না। এই নোংরা লকেটটা আমি…! ওটা কী? ওই কালো ছায়ামূর্তি কোত্থেকে এল? ওটা আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন?”
“আপনি বোধহয় আমার পরিচিতিটাকে বিশেষ গুরুত্ব দেননি।” মৃদু হেসে বললেন প্রফেসর, “ওই লকেটটা যতক্ষণ আপনার গলায় আছে, ততক্ষণ ও শুধু আপনার দিকে তাকিয়েই থাকবে। ওই লকেটটা খুললেই ও আপনার টুটি ছিঁড়ে নেবে।”
রণেন্দ্রনারায়ণ বাদে আমরা সবাই পাগলের মতো এদিকওদিক তাকাচ্ছিলাম। কিন্তু কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না! তা হলে রণেন্দ্রনারায়ণ ঘরের কোণে কাকে দেখতে পাচ্ছেন? কী আছে প্রফেসরের লকেটে?
“ওকে দূরে সরান! আমি ওর চোখের আগুন সহ্য করতে পারছি না।” চোখ ঢেকে যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠলেন রণেন্দ্রনারায়ণ।
“আপনি সত্যি কথাটা বলুন। ও ঠিক সরে যাবে।”
কান্নায় ভেঙে পড়লেন রণেন্দ্রনারায়ণ।
.
।। ৬।।
“নিজের পরিবারের কেচ্ছার ইতিহাস কে নিজের মুখে স্বীকার করে, বলুন প্রফেসর?” জল খেয়ে কিছুটা শান্ত হয়ে বললেন রণেন্দ্রনারায়ণ। নিজের চোখদুটো কিন্তু তিনি তখনও বন্ধই রেখেছিলেন। একটু আগের সেই দম্ভ আর ক্রোধ এখন কোথায়?
“আপনি নিশ্চিন্তে আমাদের বলতে পারেন। আপনার পরিবারের সম্মান যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে— তা আমি দেখব।” বললেন প্রফেসর সোম।
“আমার পিতামহ রুদ্রনারায়ণ ছিলেন বাড়ির ছোটো ছেলে। বড়ো ছেলে দর্পনারায়ণের জমিদার হওয়া ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। রুদ্রনারায়ণ ভালো মানুষ ছিলেন না। তিনি সবসময় সুযোগ খুঁজতেন, কীভাবে বড়ো ভাইকে পরিবারের সামনে অযোগ্য প্রমাণ করা যায়— যাতে জমিদারিটা তাঁর বদলে রুদ্রনারায়ণের হাতে আসে। ভাগ্যের ফেরে তিনি সেই সুযোগ পেয়েও যান। বানজারা শেফালিকে বিয়ে করে দর্পনারায়ণ পরিবারের বাকিদের চোখের বিষ হয়েই গেছিলেন। তার সঙ্গে যুক্ত হল বানজারা মহিলাদের নিয়ে চলে আসা নানা অন্ধবিশ্বাস। সেই সুযোগটা কাজে লাগালেন রুদ্রনারায়ণ। সেই বানজারা দলেরই অন্য একটি মহিলাকে কাজে লাগালেন রুদ্রনারায়ণ। সে তুকতাক করতে পারত।”
“কিন্তু সেই মহিলা রাজি হলেন কেন?”
“তার একমাত্র সন্তান— একটি বাচ্চা মেয়েকে রুদ্রনারায়ণ বন্দি করে রেখেছিলেন। ফলে মহিলা বাধ্য হয়ে এইসব করেছিলেন।
“তারপর?”
“তারপর আর কী? সেই মহিলাকে দিয়ে প্রথমে শেফালিকে সম্মোহিত করা হয়েছিল। তারপর দুধের গ্লাসে বিষ মিশিয়ে দর্পনারায়ণকে হত্যা করা হয়েছিল। ঘরের মেঝেতে কালো জাদুর নানা উপকরণ ছড়িয়ে রেখে শেফালিকে ডাইনি সাজিয়ে পুড়িয়ে মারাও হয়েছিল।”
“আর ওই বানজারা মহিলার কী হল? তাকে নিশ্চয় আপনার পিতামহ ছেড়ে দেননি?”
“ঠিক বলেছেন। আপনার ফাদারের চিঠিতে যে মহিলাকে পুড়িয়ে মারার কথা বলা হয়েছে, তিনিই ছিলেন সেই বানজারা। তাঁরই অতৃপ্ত আত্মা ডায়েন হয়ে আজও ওই বাড়িতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এগুলো আমরা অনেক পরে জেনেছি। মৃত্যুশয্যায় রুদ্রনারায়ণ অনুশোচনার আগুনে জ্বলে এই কথাগুলো আমার বাবাকে বলেছিলেন।”
“সেই বাচ্চা মেয়েটার কী হল, যাকে রুদ্রনারায়ণ বন্দি করে রেখেছিলেন?”
“ওই বাচ্চাটার ব্যাপারে আমরা কিছুই জানতে পারিনি।” অসহায় ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালেন রণেন্দ্রনারায়ণ।
“ওই বানজারা মহিলার কোনো ছবি আছে আপনার কাছে?”
“তা নেই। তবে শেফালি আর দর্পনারায়ণের একটা জয়েন্ট পোর্ট্রেট আছে- বিয়ের পর তোলা ছবির ভিত্তিতে বানানো হয়েছিল। কেন যেন, রুদ্রনারায়ণ ওটা নষ্ট করতে সাহস পাননি।”
“ওটা আমাকে দেখান প্লিজ।”
।।৭।।
প্রফেসর সোম বড়ো বড়ো পা ফেলে এগিয়ে চলেছিলেন। আমি তাঁর পেছনেই ছিলাম। দু’জনের হাতেই ছিল দুটো বড়ো এমার্জেন্সি লাইট। তবু, রাতের জঙ্গল তো এত সহজে কাউকে এগোতে দেয় না। প্রতিমূহূর্তে হোঁচট খাচ্ছিলাম। বুনো লতাপাতা, মাটির গর্ত, গাছের ডাল, বা নিছক ভয়— এগুলো সবই বাধা দিচ্ছিল আমাকে।
রণেন্দ্রনারায়ণের বাড়ি থেকে ফেরার পর আমাকে হোটেলে একা রেখে প্রফেসর কোথায় জানি উধাও হয়ে গেছিলেন। ফিরে এসে জানিয়েছিলেন, একটা জরুরি কাজ ছিল। তার পরেই এই নৈশ অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। অবশেষে দেখলাম রুদ্রনারায়ণের সেই পরিত্যক্ত বাগানবাড়িকে।
শম্ভু খুব একটা বাড়িয়ে বলেনি। এই পরিবেশে বাড়িটাকে বাইরে থেকে দেখেই ভয়ে বুক কাঁপছে। ভেতরে না জানি কী অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য! ভাগ্যিস প্রফেসর সঙ্গে আছেন। অবশ্য আমাকে এখানে নিয়ে আসতে প্রফেসর একেবারেই রাজি হননি। অনেক সাধ্য-সাধনা করে তবেই মিলেছে অনুমতি।
একটা জোরালো ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুলে ফেললেন প্রফেসর। রাতের নিস্তব্ধতা খান-খান হয়ে গেল। বাড়িতে ঢুকলাম আমরা।
এমার্জেন্সি লাইটের আলোয় আর কতটুকু দেখা যায়? বাকি সবটাই তো নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ডুবে ছিল। বুকটা দুরুদুরু করতে শুরু করল। মনে মনে বলতে শুরু করলাম, প্রফেসরের সাবধানবাণী শুনে হোটেলে থেকে গেলেই ভালো হত। গল্পে যে জিনিস শুধুই রোমাঞ্চকর, সামনা-সামনি সে যে কতখানি আতঙ্কের- তা অভিজ্ঞতা না হলে তো বোঝানোও যায় না!
হঠাৎ খপ করে আমার হাত ধরে প্রফেসর আমাকে টেনে ঘরের একটা কোণে নিয়ে গেলেন। তারপর আমাকে মাঝখানে দাঁড় করিয়ে, নিজের ব্যাগ থেকে কোনো একটা মিশ্রণ বের করে, অদ্ভুত একটা নকশা আঁকতে শুরু করলেন।
“কথাটা আগেও বলেছি, কৌশিক। আবারও বলছি। যাই হয়ে যাক, যেটাই ঘটুক, দরকার পড়লে তুমি চোখ বুজে, কান বন্ধ করে থাকবে। কিন্তু এই গণ্ডি পেরোবে না। এই গণ্ডি ভেদ করে ডায়েন কেন, স্বয়ং শয়তানও তোমাকে ছুঁতে পারবে না।” চাপা স্বরে বললেন প্রফেসর। আমিও বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ালাম।
আমার মুখ চোখের অবস্থা দেখে প্রফেসর মুচকি হাসলেন। তারপর আমার গলায় একটা সিলভার ক্রুশ পরিয়ে দিলেন। বললেন, “চিন্তা কোরো না, কৌশিক। পরমপিতার আশীর্বাদে সব ঠিকঠাক হবে।”
ঘরের মাঝে গিয়ে মেঝের ওপর বসে পড়লেন প্রফেসর। সঙ্গে আনা কালো রঙের দেশি মুরগির রক্ত দিয়ে একটা পেন্টাগন আঁকলেন তিনি। তার পাঁচটা বিন্দুতে পাঁচটা কালো মোমবাতি রেখে জ্বালিয়ে দিলেন। পেন্টাগনের একদম কেন্দ্রে রাখলেন একটা তামার পয়সা।
তৎক্ষণাৎ একটা বিশ্রী পোড়া গন্ধ নাকে এল। তারপরেই দেখলাম, একটা কালো জমাট বাঁধা অন্ধকারকে দেখলাম তির বেগে প্রফেসরের দিকে এগিয়ে আসছে।
“প্রফেসর!” আমি চিৎকার করে উঠলাম।
আমার গলার আওয়াজ পেয়ে প্রফেসর পিছু ফিরলেন। ঠিক তাঁর ঘাড়ের কাছে শূন্যে ভেসে ছিল সেই বিভীষিকা। আধপোড়া শাড়ি, গলা-পচা মাংস, আর তীব্র ঘৃণা ভরা একজোড়া চোখই বলে দিচ্ছিল, এই সেই ডায়েন। সে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল প্রফেসরের ওপরে।
ছিটকে একপাশে সরে গেলেন প্রফেসর। হাতে ধরা জলের পাত্র তিনি ছুড়ে মারলেন সেই ভয়াবহ অস্তিত্বের দিকে। একটা পৈশাচিক আর্তনাদ করে মিলিয়ে গেল সেই অন্ধকার। প্রফেসর দ্রুত ফিরে এলেন পেন্টাগনের কাছে; আবার শুরু করলেন বাকি নকশাটা আঁকা।
কয়েক সেকেন্ড পেরিয়েছিল বোধহয়। তারপরেই একটা ভারী টেবিল হঠাৎ ছিটকে এসে প্রফেসরের গায়ে আছড়ে পড়ল। টাল সামলাতে পারলেন না তিনি; মুখ থুবড়ে ছিটকে পড়লেন একপাশে। তাঁর হাতে ধরা ক্রশটাও ছিটকে গেল অন্ধকারে।
হা ঈশ্বর!
একটা তীব্র, তীক্ষ্ণ অট্টহাসি শোনা গেল। মনে হচ্ছিল, বাড়ির দেয়ালগুলো যেন ফেটে পড়বে সেই আওয়াজে। দেখলাম, অন্ধকার আবার জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। প্রফেসর উঠে বসতে চাইলেন, কিন্তু পারলেন না। মনে হল, কোনো এক অমোঘ শক্তি যেন তাঁকে মেঝেতে আটকে দিয়েছে।
এই প্রথমবার প্রফেসরের চোখে অসহায় ভাবটা স্পষ্ট হতে দেখলাম। ডায়েন আবার এগিয়ে আসছিল প্রফেসরের দিকে। ভয়ে দু-হাত দিয়ে দু-চোখ চেপে ধরলাম আতঙ্কে। হঠাৎ প্রচণ্ড আওয়াজ করে সদর দরজা খুলে গেল।
অন্য একটা জমাট ছায়া এবার ঢুকল এই বাড়িতে।
এ কী! একে তো আমি। ওই চিকনের কাজ, রেশমি ঝালরে মুখ ঢাকা ওড়না, তার আড়ালে ওই ধারালো মুখ— দু’দিন আগেই তো রণেন্দ্রনারায়ণের বাড়িতে আমি একে দেখেছি।
“শেফালি!” আমার মুখ দিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বেরিয়ে এল নামটা।
দেখলাম, সেই ডায়েন থেমে গেছে বিস্ময়ে। একটু-একটু করে সে পিছিয়ে যাচ্ছিল। “কীসের প্রতিশোধ চাই, দিদি?” ভাষাটা অচেনা, তবু মাথার মধ্যে কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম, “তোকে ওরা পুড়িয়ে মেরেছিল বলে প্রতিশোধ চাস? নাকি তোর মেয়েকে ধরে রেখেছে বলে? কিন্তু তুই যে আমার সুখের সংসার শুরুর আগেই শেষ করে দিলি— তার কী হবে? আমি তো তোর কোনো ক্ষতি করিনি। এর শোধ কী করে হবে দিদি?” হঠাৎ দেখলাম, প্রফেসর সোম নিঃশব্দে পেন্টাগনের পেছনে চলে গেছেন।
“এবার চিরতরে ঘুমোও, ডায়েন!” প্রফেসর সোমের নীচু গলাটাও গর্জনের মতো শোনাল। ডায়েন নিমেষে ঘুরে গেল প্রফেসরের দিকে। প্রবল আক্রোশে সে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল প্রফেসরের ওপর; কিন্তু পারল না। কোনো এক দুর্ভেদ্য দেয়াল যেন তাকে আটকে ফেলেছে।
দেখলাম, ডায়েন নিজের অজান্তেই প্রফেসরের আঁকা সেই পেন্টাগনের ওপর চলে এসেছে।
প্রফেসর একটা তরল ছুড়ে দিলেন ডায়েনের দিকে। তৎক্ষণাৎ লাফিয়ে উঠল সেই পাঁচটা জ্বলন্ত মোমবাতির শিখা। দাউ দাউ করে তারা গ্রাস করে নিল ডায়েনের গোটা শরীরটাকে। একটা মর্মভেদী আর্তনাদ ভরিয়ে দিল বাড়িটাকে।
আমি সংজ্ঞাহীন হলাম।
।। ৮।।
জ্ঞান ফিরতে দেখলাম, হোটেলের বিছানায় শুয়ে আছি।
“কী কৌশিক, শরীর কেমন এখন?” প্রফেসর সোম বলে উঠলেন।
আমি ধড়ফড় করে উঠে বসতে চাইলাম। তিনি আমাকে আবার শুইয়ে দিয়ে বললেন, “উঁহু। তুমি বিশ্রাম নাও। অনেক ধকল গেছে কাল রাতে।”
“কিন্তু প্রফেসর, আমার মনে যে অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে এখনও।”
“বেশ তো। করো প্রশ্ন; আমি যথাসাধ্য উত্তর দেব। তবে তার আগে একজনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই! রিমা? ভেতরে এসো তো।”
বছর চব্বিশ-পঁচিশের একটি মেয়ে এগিয়ে এসে, মৃদু হেসে হাত নেড়ে ‘হাই’ বলল। আমিও উত্তরে হাত নেড়ে প্রফেসরকে বললাম, “এঁকে খুব চেনা-চেনা লাগছে। কোথায় দেখেছি যেন….”
“অবশ্যই দেখেছ। একটু মাথা খাটাও।” মুচকি হাসলেন প্রফেসর।
“মনে পড়ছে না তো।”
“কাল রাতের শেফালি এই রিমাই!”
“মানে?” আমি প্রায় চিৎকার করে উঠলাম।
“ওই মহিলা জীবিত অবস্থাতেই অত্যন্ত শক্তিশালী ছিলেন। অপঘাতে মৃত্যু এবং মেয়েকে নিয়ে প্রতিশোধের স্পৃহা, তারপর একের পর এক শিকারের অস্তিত্বকে গ্রাস করা— সব মিলিয়ে সে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল। তার বিরুদ্ধে লড়তে গেলে আমার দরকার ছিল এমন কিছু… বা কাউকে— যে ওই ডায়েনকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও দুর্বল করে তুলবে।
সেদিন শেফালি’র ছবি দেখেই আমি পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলি। রিমা আমারই স্টুডেন্ট— ইন্ডিয়ান প্যারানর্মাল সোসাইটির সক্রিয় সদস্য। ওর আরও একটা মস্ত বড়ো সুবিধা হল, রাজস্থান আর মধ্যপ্রদেশ সীমান্তের যে অঞ্চলের বানজারা ছিল শেফালি আর ওই মহিলা – রিমা সেখানে কাজ করেছে। তাই ও সেই আঞ্চলিক ভাষাটা বলতে পারে! ওকে আনিয়ে শেফালি’র মতো করে সাজালাম। ডায়েনের প্রতিশোধের আগুনকে ক্ষণিকের অনুশোচনার জলেও স্তিমিত করে দেওয়ার জন্য ওকে আমার দরকার ছিল। সেটা না হলে যে কাল কী হত, তা তো তুমি বুঝতেই পারছ”।
“তা পারছি।”
“আরও একটা সুসংবাদ আছে। কৌশিক। নার্সিংহোম থেকে ফোন এসেছিল। ফাদার ডি’সুজার শারীরিক অবস্থার উন্নতি ঘটছে।”
“দারুণ!” আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলাম, “কিন্তু আরও একটা প্রশ্ন রয়ে গেল, প্রফেসর।”
“কী প্রশ্ন?”
“সেদিন রণেন্দ্রনারায়ণের গলায় আপনি কী পরিয়েছিলেন? তিনি কাকেই বা দেখতে পাচ্ছিলেন— যাকে আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম না?”
“একজন নেপালি কাপালিকের থেকে পেয়েছিলাম ওই লকেট।” প্রফেসর সোম ক্লিষ্ট কণ্ঠে বললেন, “তবে কী জানো, কৌশিক? যার লোভে এতগুলো মানুষের ইহকাল- পরকাল ছারখার হয়ে গেল, তাকেই শাস্তি দেওয়া গেল না। এই পুরো ঘটনায় আসল ডায়েনকে যদি ওই আগুনে অনন্তকাল রেখে দিতে পারতাম….!”
