Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026

    বৈদ্যুতিক চুল্লি – শঙ্কর চ্যাটার্জী

    April 27, 2026

    সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – মিহির সেনগুপ্ত

    April 27, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    প্রফেসর সোম আবার! – কৌশিক সামন্ত

    কৌশিক সামন্ত এক পাতা গল্প137 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    রুদ্র ভৈরব – কৌশিক সামন্ত

    রুদ্র ভৈরব

    মরণহাটির জঙ্গলে

    অন্ধকার, চাপ চাপ অন্ধকার।

    মধ্যগগনে, সূর্যের প্রখর উপস্থিতি সত্ত্বেও এত অন্ধকার, কল্পনাতীত। বাইরের কেউ এ-কথা বিশ্বাসই করবে না যে এই খাঁ-খাঁ দুপুরেও মরণহাটির জঙ্গল পেরোতে লণ্ঠনের প্রয়োজন হয়। শুধু লণ্ঠনই নয়, এই যাত্রার জন্য চাই দুর্জয় সাহস আর অগাধ আত্মবিশ্বাস। তবেই সেই অভিযাত্রী পারে এই ভয়ংকর জঙ্গল পার করতে।

    খুব বিপদে না পড়লে কেউ এদিক মাড়ায় না। ফলে জঙ্গলের মাটি ঢেকে গেছে উঁচু ঘাস আর নাম-না-জানা বুনো ঝোপের সমারোহে। ওপরেও গড়ে উঠেছে সুউচ্চ সব মহিরুহের দুর্ভেদ্য আচ্ছাদন। তাই এই জমাট বাঁধা অন্ধকার— দিনের বেলাতেও।

    হাতের লণ্ঠন উঁচু করে তুলে ধরে বটুক। এই জঙ্গল তার একেবারে অচেনা জায়গা নয়। তবুও সাবধান হতে হয় বইকি। পিশাচসিদ্ধ জায়গা বলে কথা! কত-শত বিদেহীর অধিষ্ঠান, কত অতৃপ্ত দীর্ঘশ্বাস এই জঙ্গলের প্রতিটা কোণে। মরণহাটি— নামটা তো এমনি-এমনি তৈরি হয়নি। বটুক জানে মুহূর্তের অসতকর্তা দেখালে তারও পরিণতি হবে বাকিদের মতোই।

    গুরুদেবের দেওয়া মন্ত্রপূত সুরক্ষা তাবিজ আর নিজের মন্দভাগ্য শোধনের তীব্র নেশাই তাকে এই জঙ্গলে বারবার এনে ফেলে। এই মরণহাটির জঙ্গল পেরোলেই অম্বিকাপুরের মহাশ্মশান। সেটিই বটুকের আজকের গন্তব্য।

    বন্ধু পেল্লাদের কাছ থেকে সে শুনেছিল, এই অম্বিকাপুরের মহাশ্মশানে নাকি এক কাঁচাখেগো দেবতা এসে থাকছেন। তিনি নাকি বিশেষ একজনকে খুঁজছেন। যে তাঁকে সেই মানুষটির সন্ধান দিতে পারবে, তাকে দুনিয়ার সব থেকে ধনী মানুষ বানিয়ে দেবেন সেই দেবতা।

    আর পাঁচটা শ্মশানের থেকে অম্বিকাপুরের এই মহাশ্মশান অনেকটাই আলাদা। এখানে আগে মড়া পোড়ানো হলেও আজ এটি পরিত্যক্ত। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনো অসমসাহসী ব্যাক্তি মরণহাটির দুর্ভেদ্য জঙ্গল পেরিয়ে এখানে এলেই দেখতে পায়, এখানে অনেকগুলো চিতা জ্বলছে। সেগুলো কাদের, তা কেউ জানে না। অনন্তকাল ধরে নাকি ওগুলো জ্বলছে। লোকে বলে, ওই চিতা থেকে নাকি কাঁচাখেগো দেবতারা প্রাণরস শুষে খায়। জঙ্গল পেরোনোর পর বটুকের চোখেও ধাক্কা মারল সেই জ্বলন্ত চিতাদের সারি। ওদিকে নজর না দিয়ে সোজা এগিয়ে তলায় ঝুরঝুরে চলল বটুক। পায়ের ছাই আর হাড়গোড়ের অবশেষ। বাতাসে চামড়াপোড়ার বিশ্রী কটু গন্ধ— দম যেন ক্রমশ ফুরিয়ে আসে তার। কিন্তু জ্ঞান হারালে চলবে না। সারা জীবনে অনেক কষ্ট করেছে বটুক। আজ তাকে নিজের ভাগ্য ফেরাতেই হবেযেভাবে হোক, যেমন করে হোক।

    শ্মশানের ধোঁয়ায় চোখ কিছুটা সইয়ে নেওয়া পর বটুক একটা উঁচু টিলা দেখতে পেল। তার ওপরে কে যেন ধ্যানের ভঙ্গিমায় বসে আছে। এ নিশ্চয় সেই দেবতা! সময় নষ্ট না করে বটুক দৌড় লাগায় সেদিকে।

    কী সাংঘাতিক দৃশ্য! নেহাত দিনের বেলা, না হলে অতি সাহসী বটুকেরও প্রাণপাখি ফুড়ুৎ হয়ে যাচ্ছিল আর একটু হলেই।

    সেই কাঁচাখেগো দেবতা একটি মৃতদেহের ওপরে বসে ছিলেন। গভীর সাধনায় রত তিনি। কিন্তু কী ভয়ংকর সেই শব! এ-রকম বিকৃত মৃতদেহ বটুক শেষ কবে দেখেছে সে মনে করতে পারে না। সেই দেবতার চেহারাও এমন ভয়ানক যে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। দীর্ঘ, পেশিবহুল শরীর; মাথায় প্রকাণ্ড এক জটা। ছাইমাখা দেহে ফুটে উঠেছে বিচিত্র সব নকশা। বিশাল দাড়িগোঁফের আড়ালে দুটো বন্ধ চোখ শুধু দেখা যায়।

    ডাকবে না অপেক্ষা করবে— এই দোটানায় পড়ে যায় বটুক। বেশিক্ষণ এ জায়গায় অপেক্ষা করতে মন চায় না। আবার সাধনায় ব্যাঘাত ঘটালে দেবতা যদি কুপিত হন? চিন্তায় পড়ে যায় বটুক।

    কে তুই? কী চাস এখানে?”

    “কেঁপে ওঠে বটুক— যেন তার কানের সামনে দুটো বাজ পড়েছে। চোখ খুলে গেছে দেবতার। কী ভয়ংকর লাল চোখ দুটো! সেই ভীষণ দৃষ্টিতে বটুকের সারা শরীরে যেন তীব্র জ্বালা শুরু হয়।

    “দোহাই প্রভু! কুপিত হবেন না। আমি চাইনি আপনার সাধনার ব্যাঘাত ঘটাতে।”

    “ভণিতা না করে কাজের কথাটা বল। না হলে কপালে ঘোর বিপদ আছে তোর।”

    “প্রভু, আমি বটুক। আপনি যার সন্ধান করছেন, আমি তার খোঁজ এনেছি।”

    “কোথায় সে?”

    “বাহাদুরপুরের জমিদার বাড়িতে!”

    “ঠিক বলছিস তুই?”

    “আমার মরা বাপের নামে দিব্যি কেটে বলছি, প্রভু।”

    “যদি সত্যি হয় তাহলে পুরষ্কার পাবি। আর যদি ভুল হয়, তাহলে… ওই চিতাগুলো দেখছিস? ওতেই অনন্তকাল ধরে তোকে জ্বলতে হবে, মনে রাখিস।”

    “আমি রাজি, প্রভু। আপনি একটিবার আমার কথায় বিশ্বাস করে দ্যাখেন। বাহাদুরপুরের জমিদারবাড়িতে আমি তাকে দেখেছি ছোটোবেলায়। মাঝে অনেকসময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু ওই চিহ্ন আমি আজও ভুলিনি। আপনি যাকে খুঁজছেন সে ওই জমিদার বাড়িতেই আছে।”

    “বাহাদুরপুর! আমার অনুমান খুব একটা ভুল নয় তাহলে…”

    সাধকের মধ্যে কেমন যেন বিহ্বলতা লক্ষ করে বটুক। কাঁচাখেগো দেবতাদেরও তাহলে দীর্ঘশ্বাস পড়ে!

    “শোন বটুক!”

    “বলুন প্রভু।”

    “তোকে আমার একটা কাজ করতে হবে।”

    .

    ।। ২।।

    রুদ্র কথা

    “রুদ্র! উফ্, আবার কোথায় গেল ছেলেটা? একে নিয়ে হয়েছে আমার মহাজ্বালা!”

    কালাচাঁদের ছোট্ট মন্দির। সেখানে, সৌম্যদেব চট্টোপাধ্যায়ের গমগমে গলার আওয়াজে পাথরের দেয়ালগুলো যেন কেঁপে উঠতে থাকে। সেই কম্পন বুঝি সঞ্চারিত হয়, প্রদীপ শিখাতেও। টলোমলো হাতে কেঁপে ওঠা প্রদীপের শিখাকে আগলাতে ব্যস্ত হলেন সৌম্যদেব।

    মদনমোহনের সন্ধ্যারতির সময় বয়ে যাচ্ছে, এদিকে রুদ্রের দেখা নেই।

    আজ কত পুরুষ ধরে যে তাঁরা কালাচাঁদের সেবায় নিযুক্ত আছেন, জীবনের সীমান্তে এসে সে-কথা আর মনে পড়ে না। তবে শুরুর দিনটার কথা তাঁর মনে আছে। বাবা, ঈশ্বর কান্তিদেব চট্টোপাধ্যায়, তাঁর হাত ধরে কালাচাঁদের চরণে এনে বসিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “সব কাজ শিখে নে। এবার থেকে তোকেই কিন্তু প্রভুর সেবা করতে হবে, আমি আর ক-দিন আছি!”

    তাঁর বাবা পেরেছিলেন। তিনি কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন এই একটা ব্যাপারে। পরবর্তী প্রজন্মকে এই দায়িত্বের জন্য তিনি প্রস্তুত করে যেতে পারবেন না। রুদ্রের মা কবেই তাঁর হাতে ছেলে আর সংসারের সব দায়িত্ব তুলে দিয়ে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তারপর থেকে রুদ্রের ভালো-মন্দ— সবই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। এমনকি রুদ্রের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে ভেবে, সবার জোরাজুরি সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিবাহে মত দেননি সৌম্যদেব। নিজের জীবনের চব্বিশ ঘণ্টাই তো কালাচাঁদ আর রুদ্রের জন্য বেঁধে দিয়েছিলেন তিনি। তারপরেও কোথায় যে ত্রুটি রয়ে গেল!

    শুরু থেকেই সৌম্যদেব বুঝতে পারতেন, রুদ্র তার বয়সি অন্য ছেলেপুলের মতো নয়। সে অনেকটাই আলাদা। তার দৃষ্টি বহির্মুখী— সংসার সীমার বেড়া-ছাড়ানো। অন্যরা পাঠশালার পাকদণ্ডি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ছটফট করত। আর রুদ্র? তার প্রশ্নবাণে জর্জরিত পণ্ডিতমশায় নিজে ছটফট করতেন ছুটির আশায়। বাকিরা যখন মাঠে-ঘাটে খেলে বেড়াত, রুদ্র তখন একা বসে থাকত কোনো নির্জন নদীর তীরে, বা কোনো গাছতলায়— যেখানে অন্য কেউ নেই।

    দূর থেকে অনেকদিন দেখেছেন সৌম্যদেব, রুদ্র নির্জন জায়গায় বসে একমনে কী যেন ভেবে চলেছে। সৌম্যদেব তাকে অনেকবার জিজ্ঞেসও করেছেন, “সারাদিন কী এত ভাবিস তুই বাবা?”

    “ও কিচ্ছু না, তুমি বুঝবে না।”

    “আরে বলেই দ্যাখ্। হয়তো আমিই তোর প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিতে পারি।”

    “নাহ্ বাবা, এর উত্তর তোমার কাছে নেই।” প্রতিবার এই কথা বলে খিলখিলিয়ে হেসে উঠত রুদ্র।

    মা-মরা ছেলেকে শুরু থেকেই খুব আদরে আর ভালোবাসায় মানুষ করেছিলেন সৌম্যদেব। শাসনের বালাই ছিল না। নিজে সামান্য সেবায়েত ব্রাহ্মণ হলেও উপার্জনের সবটুকু উজাড় করে দিতেন রুদ্রের ওপরে।

    তবে এখন তাঁর মনে হয়, শাসনটা শক্ত হাতে করলেই বোধহয় ভালো হত।

    রুদ্র আজকাল সময়মতো বাড়িতে ফিরছে না। প্রায়ই সে বাড়িতে খায় না; জিজ্ঞেস করলে বলে, বন্ধুদের বাড়ি থেকে খেয়ে এসেছে। গ্রামবাসীদের মুখেও তিনি শুনেছেন, সে নাকি আজকাল পুবদিঘির পোড়ো শ্মশানে গিয়ে বসে থাকে; বাইরের লোকজনের সঙ্গে মেশে।

    তাই ইদানীং রুদ্রের ওপরে বেশ জোর খাটাতে শুরু করেছিলেন সৌম্যদেব। প্রায় জোর করে, একরকম হাত ধরে তিনি রুদ্রকে নিয়ে আসতেন মদনমোহনের মন্দিরে। পুজোর কাজ শেখাতেও শুরু করেছিলেন। সব কিছু ভালোই চলছিল। কিন্তু বাদ সাধল সৌম্যদেবের শরীর। হঠাৎ করেই একদিন মদনমোহনের কাছে আসার সময় তিনি মাথা ঘুরে রাস্তায় পড়ে যান। গ্রামের লোকেরা ধরাধরি করে বৈদ্য’র কাছে তাঁকে নিয়ে যায়। ওষুধ ও পথ্যের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বৈদ্য স্পষ্টভাবে বলে দেন যে সৌম্যদেবের শরীর ভালো নেই। তিনি যেন শরীরের বিশেষ যত্ন নেন।

    আর যত্ন! হেসে উঠেছিলেন সৌম্যদেব। যার মাথায় রুদ্রর মতো বয়সি ছেলের চিন্তা, সে নিজের যত্ন নেবে কীভাবে? সেদিন থেকেই রুদ্রের ওপর জোর কমে গেছিল সৌম্যদেবের। তিনি আর পারতেন না রোজ ওই একবজ্ঞা কিশোরকে ধরে বেঁধে কালাচাঁদের কাছে নিয়ে আসতে।

    তবে এক-একদিন কিন্তু রুদ্র নিজের খেয়ালবশতই আসত। সৌম্যদেব খেয়াল করতেন, সেই দিনগুলোতে রুদ্র একদৃষ্টিতে কালাচাঁদের নীল চোখদুটোর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছে। সে যেন হারিয়ে গেছে সেই চোখের মধ্যে।

    ছোটোবেলা থেকেই রুদ্রের এই অভ্যাসের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন সৌম্যদেব। প্রথমে একে শৈশবের বিস্ময়ভরা দৃষ্টি বলে মনে হত। কিন্তু ক্রমে রুদ্রের চোখে লোভের স্ফুলিঙ্গ দেখতে পেয়েছিলেন সৌম্যদেব। তার পর থেকেই, রুদ্রকে কালাচাঁদের চোখে হারিয়ে যেতে দেখলেই সৌম্যদেবের আতঙ্ক হত। তাঁর মনে হত, যেন অদ্ভুত এক লালসায় ভরে উঠছে রুদ্র’র দুচোখ।

    জমিদারের পরিবার আর মদনমোহনের সেবায়েতরা শুধু জানতেন এক গোপন কথা। রুদ্রও তা জেনেছিল বংশানুক্রমে। মদনমোহনের চোখদুটো কোনো সাধারণ পাথরের নয়। বরং দু’টি অত্যন্ত দুর্লভ রক্তমুখী নীলা ওই অবস্থানে দেবতার শোভাবর্ধন করছিল! জমিদার বংশের এক পূর্বপুরুষ হিমালয় থেকে আসা এক সাধকের কাছ থেকে ওগুলো পেয়েছিলেন।

    দূর থেকে ভেসে আসা শিয়ালের ডাকে হুঁশ ফিরে আসে সৌম্যদেবের। নাহ্, রুদ্রের জন্য আর অপেক্ষা করে লাভ নেই। কথা দিলেও সে আজ আর আসবে না।

    কালাচাঁদের সন্ধ্যারতি শুরু করে দিলেন সৌম্যদের চট্টোপাধ্যায়।

    .

    ।। ৩ ।।

    মুক্তির অভিলাষ

    “আবার এসেছিস তুই? তোকে না এতবার করে অপমান করলাম!”

    অন্যজন নিরুত্তর থাকে। বেশ অবাক হন নিগমানন্দ।

    সাধনার প্রয়োজনে বহুকাল ধরে তিনি বহু জায়গায় হেঁটে চলেছেন। বহু মানুষের সংস্পর্শে এসেছেন তিনি। এ তাঁর অভিজ্ঞতা যে অধিকাংশ মানুষ সন্ন্যাসীর কাছে আসে স্বার্থের তাড়নায়– মারণ, উচাটন, বশীকরণ ষট্‌কর্মের দাওয়াই নিতে। সত্যিকারে সাধন মার্গের সন্ধান পেতে আসা মানুষের সংখ্যা খুবই কম! স্বার্থপর মানুষদের তিনি একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। এই কিশোরকেও তিনি দুর দুর করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এ বোধহয় সত্যিই আলাদা।

    এই গ্রামে আসার পর থেকেই এই বিশেষ কিশোরের উপস্থিতি তাঁর নজর এড়ায়নি। ছেলেটির সু-উচ্চ ললাট, দৃপ্ত দৃষ্টি, অকুতোভয় জিজ্ঞাসা- এগুলো ভবিষ্যতের এক সার্থক সাধকের আগমনের জানান দিচ্ছে। তবুও নিগমানন্দ স্থির করলেন, আরও কিছুটা যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন।

    “কী রে? কথার জবাব দিচ্ছিস না যে বড়ো। কে পাঠিয়েছে তোকে? গ্রামের লোকেরা আমার ওপর নজর রাখতে বলেছে বুঝি?”

    “না।” মাথা নীচু রেখেই জবাব দেয় সেই কিশোর।

    “তবে কেন আসছিস বারবার? কীসের এত ঔৎসুক্য তোর?”

    “আমি জানতে চাই, বুঝতে চাই সব!”

    “তুই সব জেনে যাবি, বুঝে যাবি? এই বয়সেই?” হাসতে শুরু করেন নিগমানন্দ।

    নিগমানন্দের অট্টহাসিতে পুবদিঘির নীরবতা চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে থাকে। কিশোরের দু- কানে তালা লেগে যায়। সে দু-কান শক্ত হাতে চেপে ধরে। তার মনে হয়, এই বুঝি শ্মশানের ধুলোতে মিশে থাকা নীরব বিদেহীরা একে-একে উঠে আসবে। অনভিপ্রেত অনুপ্রবেশের জন্য তারা বুঝি ভয়ংকর শাস্তি দেবে সেই কিশোরকে।

    জীবনে প্রথমবার ভয় লাগতে শুরু করে তার। এক মুহূর্ত আগেও জটাজুটোধারী যে ব্যাক্তিকে সে মুক্তির অবলম্বন বলে ভাবছিল, তাকেই সবচেয়ে আতঙ্কজনক বলে মনে হয়।

    বাবার কথাই কি তাহলে ঠিক? সে কি সত্যিই ভুল পথে চলেছে?

    কিশোরের অবস্থা দেখে বোধহয় কিছুটা মায়া লাগল নিগমানন্দের। হাসি থামিয়ে তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, “কী জানতে চাস বল?”

    “তন্ত্র, মন্ত্র— সব কিছু!” কাঁপা কাঁপা স্বরে জবাব দেয় সেই কিশোর।

    “তন্ত্র, মন্ত্র— সব? বেশ। মন্ত্র মানে হল গিয়ে মনন করে শব্দ উচ্চারণ করলে যা ‘ত্র’— অর্থাৎ তারণ করে। আর তন্ত্র হল, ‘শ্রুতিশ্চ দ্বিবিধা বৈদিকী তান্ত্রিকী চ।’ নে, এবারে খুশি তো? যা, ভাগ এখান থেকে!”

    “আক্ষরিক অর্থ আমারও জানা প্রভু, আমি এর গভীরে যেতে চাই।”

    “গভীরে যাবি? কেন?”

    “আমাকে আপনার শিষ্য বানিয়ে নিন প্রভু। আমার মন বড়ো অস্থির। কিছুতেই শান্তি পাই না; আমাকে মুক্তির সন্ধান দিন প্রভু।”

    আমাকে গুরু বানাতে চাস? আচ্ছা বল তো, গুরু মানে কী?”

    “গু কে যদি অন্ধকার ধরি, আর রু কে আলো, গুরু হলেন সেই ব্যক্তি যিনি অজ্ঞানতার তিমির থেকে শিষ্যকে আলোর মধ্যে নিয়ে আসেন।”

    “কে শিখিয়েছে তোকে এ-সব?”

    “এক বাউল—এই গ্রামেই এসেছিলেন ঝুলন মেলায়।”

    “বুঝলাম। সংসারে মন নেই, বাইরের টান। কিন্তু তুই কি পারবি? এ পথে ব্যাক্তিত্বের সীমানা লঙ্ঘন না করতে পারলে কিছুই জানা যায় না।”

    “পারব, প্রভু। আমাকে একবার শরণে নিন।”

    মৃদু হাসলেন নিগমানন্দ, তারপর মুখের বিড়িতে একটা শেষ টান দিয়ে বিড়ির জ্বলন্ত মুখটা পেটের মধ্যে চেপে ধরলেন। এভাবে বিড়ি নেভানো দেখে শিউরে উঠল সেই কিশোর।

    “অবাক হওয়ার কিছু নেই রে ছোঁড়া। শরীরকে কষ্ট সইয়ে সইয়ে শব করতে হবে। যাতনা না এলে যতন হবে কী করে?”

    “কীসের যতন প্রভু?”

    “শরীরের!”

    “সূক্ষ্ম শরীর?”

    বেশ প্রসন্ন হলেন নিগমানন্দ। তিনি বুঝলেন, এই কিশোরের বুদ্ধিসুদ্ধিও আছে। ঠিকঠাক কাজে লাগালে কিছু হবে।

    “মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে পারবি? বিদ্যা নষ্ট করতে পারবি? এসব করতে না পারলে কিন্তু কুণ্ডলিনী জাগ্রত হবে না। শক্তি অনুভূত হলেও তা বশীভূত করতে পারবি না কিন্তু!

    অষ্টম্যাঞ্চ চতুৰ্দশ্যাং পক্ষয়োরুভয়োরপি,
    ভৌমবারে তামিস্রায়াং সাধয়েৎ সিদ্ধিমুত্তমাম।।

    কৃষ্ণ বা শুক্লপক্ষের অষ্টমী আর চতুর্দশ তিথিতে রাতে শবসাধনা করলে সাধকের উত্তম সিদ্ধি আসবে। পারবি শবের ওপর বসে সাধন করতে? ভয় পাবি না তো?”

    “না প্রভু। ভয় পাব না। আমি পারব। আপনি একটিবার আমাকে সুযোগ দিয়ে দেখুন।”

    “বেশ দিলাম। কিন্তু আমার গুরুদক্ষিণা লাগবে। দেখি তোর ইচ্ছাশক্তির জোর কতটা। তোর সব থেকে প্রিয় জিনিসকে আমার কাছে নিয়ে আসতে হবে। যদি পারিস, তাহলেই তোকে আমি দীক্ষা দেব।”

    “আমি প্রস্তুত, গুরুদেব। আমাকে দু-দিন সময় দিন।”

    “বেশ, দিলাম। কিন্তু ওই দু-দিনই— মনে রাখিস! আচ্ছা, তোর নামটাই তো জিজ্ঞেস করা হয়নি। কী নাম তোর?”

    “আজ্ঞে, রুদ্রদেব চট্টোপাধ্যায়!”

    .

    ।।৪।।

    কালাচাঁদের রুদ্রনয়ন

    কাল রাত থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হয়ে চলেছে। আজ সকালে বৃষ্টির প্রাবল্য কিছুটা কমলেও, আকাশের মুখ কিন্তু একইরকম ভার, ফলে যতটা আলো থাকা দরকার ততটা নেই, সামান্য দু-হাত দূরের জিনিসও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না, একটা অদ্ভুত অন্ধকার যেন গ্রাস করেছে বাহাদুরপুরের ছোট্ট গ্রামটাকে। কাল রাতেই বুড়ো কর্তা আশঙ্কার কথা শুনিয়ে গেছে— শিলাইচরের বাঁধের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়।

    বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে রুদ্র। আর দেরি করা চলবে না। বাবা জেগে যাওয়ার আগেই সব কাজ সেরে ফেলতে হবে। অতি সন্তর্পণে সে ঘুমন্ত সৌম্যদেবের মাথার কাছের লোহার দেরাজ খুলে চাবির গোছা বের করে নেয়। তার থেকে দরকারি চাবিটা আলাদা করে নিয়ে আবার একইভাবে চুপিসারে বাকি চাবির গোছা সে দেরাজেই রেখে দেয়।

    নিঃশব্দে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে রুদ্র। কাদামাখা মেঠো পথ দিয়ে হাঁটতে শুরু করে দ্রুতবেগে। পুরো গ্রাম এখনও অকাল-বৃষ্টির মৌতাতে ঘুমিয়ে আছে। আশা করা যায় যে বাকি কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে— এমনটাই ভাবে রুদ্র।

    আচমকা একটা বাজ পড়ার শব্দ ঘুম ভেঙে যায় সৌম্যদেবের। ধড়ফড় করে উঠে বসেন তিনি। “হে ঈশ্বর! এ কেমন সকাল তুমি দেখালে? এ তো রাতের চেয়েও অন্ধকার।” আপনমনে বলে ওঠেন তিনি।

    বাইরে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি শুরু হল তখনই। “রুদ্র রুদ্র, কোথায় গেলি তুই?” উদবিগ্ন কণ্ঠে বলে ওঠেন সৌম্যদেব। কোথায় গেল ছেলেটা? বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন সৌম্যদেব। পাশের ঘরে গিয়ে দেখলেন, সেখানে কেউ নেই। এই দুটো ঘরের বাইরে, এমন ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে কোথায় যেতে পারে ছেলেটা?

    আচমকা সৌম্যদেবের বুক কেঁপে উঠল এক অজানা আশঙ্কায়। ছুটে ঘরে গেলেন তিনি। মাথার কাছের লোহার দেরাজ খুলতেই তিনি বুঝলেন, যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গেছে। এতদিন ধরে মনের মাঝে গোপনে জমতে থাকা বিন্দু-বিন্দু ভয় আজ সমুদ্র হয়ে আছড়ে পড়েছে তাঁরই উপর। দেরাজের চাবির গোছার মধ্যে কালাচাঁদের মন্দিরের চাবিটা অনুপস্থিতি তাঁর নজর এড়ায়নি। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে পাগলের মতো ছুটলেন সৌম্যদেব কালাচাঁদের মন্দিরের উদ্দেশে। মন্দিরের সামনে পৌঁছে সৌম্যদেব দেখলেন, দরজা হাট করে খোলা। সিঁড়ি পেরিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করে কালাচাঁদের মুখের দিকে তাকালেন তিনি। তারপরেই বজ্রাহত হওয়ার মতো করে স্থির হয়ে গেলেন তিনি।

    আশঙ্কা ছিল। কিন্তু সত্যিই রুদ্র এই কাজ করল! বুকের মধ্যে পুঞ্জীভূত যন্ত্রণা, হতাশা, সন্তানকে মানুষ করতে না পারার গ্লানি ক্রমশ রোষানল হয়ে উঠল। ঠাকুরের সামনে রাখা কুশপত্র থেকে হাতের মুঠোয় কিছুটা গঙ্গাজল নিলেন সৌম্যদেব। তারপর নিজের উপবীত বাঁ হাতে স্পর্শ করে কাঁপতে-কাঁপতে চিৎকার করে বলে উঠলেন, “হে কালাচাঁদ, হে মদনমোহন! এত বছরে যদি একটা দিনের জন্য তোমার মনে হয়ে থাকে যে এই গরীব ব্রাহ্মণ নিষ্ঠাভরে তোমার সেবা করেছে, তাহলে এই মহাপাপের শাস্তি তুমি নিজে হাতে তাকে দিও প্রভু। এই আকাশ, বায়ু, অগ্নি, পৃথিবী, আর জল-কে সাক্ষী রেখে আমি সৌম্যদেব চট্টোপাধ্যায় এই অভিশাপ দিচ্ছি। আমার পুত্র রুদ্র যদি কোনোদিন এই গ্রামে আবার ফিরে আসে, গ্রামের সীমানায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই যেন তার মাথা চুর-চুর হয়ে যায়।”

    কালাচাঁদের পায়ে লুটিয়ে পড়লেন সৌম্যদেব।

    ক্রমাগত দৌড়োতে-দৌড়োতে বুক যেন হাপরের মতো ঠেলে বেরিয়ে আসছিল তার। পা দুটোও আর সাড়া দিচ্ছিল না। তবু থামতে পারছিল না রুদ্র। গ্রামের সীমানা অনেকক্ষণ আগেই পার হয়ে এসেছে সে। তবু নিজেকে থামাতে ভরসা পাচ্ছিল না সে।

    আজ সে যা করেছে, তারপর আর ভরসা পাওয়ার কথাও নয়।

    ওই তো পুরোনো শ্মশান! নিগমানন্দের অস্থায়ী ডেরাটাও দেখতে পাচ্ছিল রুদ্র। হাঁফাতে হাঁফাতে সে বলে উঠল, “আমি এসে গেছি।”

    “জানতাম, তুই আসবি।” মুচকি হেসে বলে ওঠেন নিগমানন্দ “আমি আপনার গুরুদক্ষিণা এনেছি, প্রভু।”

    “তাই নাকি? কই, দেখি।”

    এতক্ষণ ধরে নিজের ডান হাতে চেপে রাখা জিনিসটা রুদ্র সন্তর্পণে তুলে দেয় নিগমানন্দের হাতে। হাতের মধ্যে জিনিসটা নিয়ে হো-হো করে হেসে ওঠেন নিগমানন্দ। “আরে! করেছিস কী? এটা তো তোদের সেই কালাচাঁদের একটা চোখ মনে হচ্ছে!”

    “হ্যাঁ, বাঁ চোখ।” মাথা নামিয়ে বলল রুদ্র।

    “মানতে বাধ্য হলাম। তোর এলেম আছে। এ-পথে তুই অনেকদূর যাবি। তোর কপাল দেখেই তা অবশ্য আমি প্রথম দিনই বুঝেছি! তবে একটা কথা মনে রেখে দিস সারাজীবনের জন্য। ধরে নে, এটাই গুরুর প্রথম উপদেশ তথা আদেশ।”

    রুদ্র’র কানের কাছে মুখ নিয়ে যান নিগমানন্দ। ফিশফিশিয়ে বলে ওঠেন, “সারা জীবন আর যাই করিস না কেন, একচোখা মানুষদের থেকে খুব সাবধান থাকিস।”

    “আমি… ঠিক বুঝতে পারলাম না।”

    “একদিন ঠিকই বুঝবি।” মুচকি হেসে বলে উঠলেন নিগমানন্দ, “এবার ওঠ। এখানে থাকা তোর আর আমার— দু’জনের জন্যই আর নিরাপদ নয়। বেলা থাকতে-থাকতেই রওনা দিই। আমাদের দু’জনকেই অনেকটা পথ হাঁটতে হবে যে।”

    .

    ।।৫।।

    প্রফেসর সোমের সঙ্গে ট্রেনে

    শনিবারের সকাল— নটা বেজে পাঁচ। সচরাচর এই সময়ে আমি প্রফেসর সোমের বাড়ির আরাম কেদারায় বসে, নানা লোভনীয় সুখাদ্য আস্বাদনের ফাঁকে ওঁর কোনো হাড়- হিম করা অভিজ্ঞতার মৌতাত নিই। কিন্তু আজ, এই মুহূর্তে আমি বসে আছি মেদিনীপুর লোকালের একদম শেষ কামরার জানালার ধারে।

    শুক্রবার রাতেই ফোন করে প্রফেসর বলেছিলেন “কৌশিক, কাল কী করছ? তেমন কোনো কাজ না থাকলে চলো। একটা নতুন জায়গা থেকে বেড়িয়ে আসি।” এরপর কি ‘না’ করা যায়?

    “নাও!” চটকা ভেঙে আবিষ্কার করলাম প্রফেসর দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর হাতে ধরা ছিল দুটো শালপাতার ঠোঙা। তার একটা আমার দিকে বাড়িয়ে বললেন, “খেয়ে বলো দেখি, ভুলুর চপের দোকান এ-রকম কিছু বানাতে পারে কিনা?”

    ট্রেন আবার দুলতে দুলতে রওনা দিল। আমি ঠোঙা নিয়ে কিন্তু-কিন্তু করে বললাম, “সকাল সকাল এসব তেলের জিনিস খাব?”

    “পাঁশকুড়ার চপ ওয়ার্ল্ড ফেমাস, বুঝলে হে ছোকরা। বেশি না ভেবে, মুখে চালান করো দেখি।”

    অগত্যা একটুকরো ভেঙে মুখে চালান দিলাম। আহা!

    “তাহলে, চার চাকার এসি গাড়িতে কি আর এসব পেতে? জানালা দিয়ে ধেয়ে আসা উন্মুক্ত বাতাস, হকারদের হট্টগোল, চপ-মুড়ি— এ-সব ছাড়া কি আর সফর হয়?” পা ছড়িয়ে বসে বললেন প্রফেসর।

    “না, আসলে… গরম পড়ে গেছে। আপনার শরীরেও কি ভাজাভুজি…?”

    “এই বয়সেও কবজির জোরে আমার সঙ্গে তুমি পেরে উঠবে না। তাই আমার শরীর নিয়ে ভাবতে হবে না। খাও!”

    মৃদু হেসে ঠোঙায় মনোযোগ দিলাম। যোগব্যায়ামই হোক বা জীবনশৈলী— ভদ্রলোক এখনও অন্তত আমার থেকে অনেকটাই ফিট।

    চপমুড়ি চিবোতে চিবোতে, ট্রেনের কামরায় সাঁটা একটা হ্যান্ডবিলের দিকে নজর পড়ে গেছিল। অনেকক্ষণ ধরে সেটাই দেখছিলাম।

    “কী দেখছ কৌশিক ও-রকম করে?”

    প্রফেসরের কথায় সম্বিত ফিরল। ওঁকে দেখালাম হ্যান্ডবিলটা। তাতে লেখা ছিল ‘অঘোরী বাবা ভীষণানন্দ। পাঁচ মিনিটে পঞ্চবান, বশীকরণ, শত্রুনাশ, সন্তানের চাকরি, রোগ নিরাময়। বিফলে মূল্য ফেরত।’

    “হ্যাঁ। সস্তার জেরক্সে এখন সবাই অঘোরী, সবাই ভীষণ তান্ত্রিক বটে!” হেসে উঠলেন প্রফেসর সোম।

    “আচ্ছা প্রফেসর, অঘোরী মানে আসলে কারা?” শনিবারের দিনটা মাঠে মারা যাবে ভেবে আমি একরকম মরিয়া হয়ে প্রশ্নটা করেই ফেললাম।

    “লোকে তিনজন্ম পার করে ফেলেও কিছুই বুঝতে পারে না। সেখানে তুমি সামান্য তিন ঘণ্টার ট্রেন-যাত্রায় অঘোরীদের জেনে ফেলবে, কৌশিক?” মুচকি হাসলেন প্রফেসর। “তা না। তবে এই বিষয়ে আপনার কোনো অভিজ্ঞতা থাকলে শোনা কথা আর বাস্তবের ফারাকটা বুঝতে পারতাম আর কি।”

    “শনিবারের গল্প মার যাবে বলে চিন্তা হচ্ছে বুঝি?” মুচকি হেসে আমার পিঠে একটি থাবড়া জুড়লেন প্রফেসর সোম। আমিও একটু লাজুক মুখে হাসলাম।

    জানালা দিয়ে আসা এলোমেলো হাওয়ায় প্রফেসরের কাঁচাপাকা চুলগুলো উড়ছিল। শালপাতার ঠোঙা ফেলে দিয়ে, রুমালে হাতটা ভালো করে মুছে নিলেন ভদ্রলোক। তারপর শক্ত হাতে চুলগুলোকে ব্যাকব্রাশ করতে লাগলেন তিনি। আরও একবার মানতে বাধ্য হলাম, প্রফেসরের এই টানটান করে ব্যাকব্রাশকরা সাদাকালো চুল আর দীর্ঘদেহী চেহারা দেখলে বেশ সম্ভ্রম জাগে।

    “তাহলে কৌশিক, তুমি অঘোরীদের সম্পর্কে জানতে চাও, তাই তো?”

    মাথা নেড়ে সায় দিলাম।

    “অঘোরী সম্পর্কে সবটা বলা বা বোঝানো এই স্বল্প পরিসরের যাত্রাপথে সম্ভব নয়। উচিতও নয়। তন্ত্র-মন্ত্র-যন্ত্র ছেলেখেলা নয় যে দু-লাইন বললাম আর সবটা তুমি বুঝে গেলে। এই কঠিন বৈতরণি পার হতে গেলে সঠিক মাঝির প্রয়োজন; প্রয়োজন সঠিক গুরুর। আমি তোমাকে বরং ওই মাধ্যমিকে পাঁচ বা দশ নাম্বারের ‘সারাংশ’- মানে পুরো ব্যাপারটার কিঞ্চিত সারমর্ম, দিতে পারি। তাতে কাজ চলবে?”

    “অবশ্যই চলবে!”

    “আচ্ছা ‘অঘোরী’ নামটা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ঠিক কী ভেসে ওঠে, বলো তো কৌশিক?”

    “হাতে নরকপাল নিয়ে ঘোরা, চিতাভস্ম মাখা উৎকট সাজের কিছু বদমেজাজি, পচা আর নোংরা খাবারে অভ্যস্ত শ্মশানচারী সাধক।”

    “ঠিক। জনসাধারণের চোখে অঘোরী বলতে ঠিক এই রূপটাই ধরা দেয়। ‘যুগল সাধনা’র নামে অঘোর-অঘোরিণীদের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন, সর্বদা মদ-মাংসে ডুবে থাকা, পায়খানাপেচ্ছাপ গায়ে মাখা, অশ্রাব্য ভাষার প্রয়োগে জনসাধারণের মনে ভীতির উদ্রেক করা, মহামাংসের নামে নরমাংসের প্রতি লোভ, শবসাধনা— এই ব্যাপারগুলোই জনমানসে গভীরভাবে চেপে বসেছে। এ-কথা ঠিক যে এই সাধনায় এর অনেকগুলোই অনুষঙ্গ। কিন্তু প্রকৃত সত্য এর থেকে অনেকটাই আলাদা।

    ‘আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা,
    তার মধ্যে ঝলকা কাটা,
    তার ওপর আছে সদর কোঠা,
    আয়না মহল তায়।’

    “লালনের এই গানটা মনে পড়ে?”

    সায় দিলাম এবারেও। এমন আরও কত গান শুনেছি এককালে— যখন আমাদের মফস্সলের শরীরে গ্রামের বাতাস বইত আরও বেশি করে। এখন সে-সব কোথায়?

    “অঘোরী বুঝতে হলে, আগে কিন্তু ঘোর কাটাতে হবে।”

    “আমি রাজি, প্রফেসর।”

    “বেশ। শুরুতেই লালনের গানটা বললাম কেন জানো? আসলে সাধনের জন্য,

    এমনকি সত্যিকে পাওয়ার জন্য দূরে কোথাও যেতে হয় না। মন্দির, মসজিদ, চার্চ— এ-সব জায়গাও তার জন্য জরুরি নয়। সমস্ত কিছু, সমগ্র জগৎ-সংসার আমাদের এই শরীরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। সেটাকে খুঁজে বের করাই হল সাধনার আসল উদ্দেশ্য। প্রকৃত সাধকেরা সেটা করতে পারেন; আমরা সাধারণ মানুষেরা পারি না। প্রতিটি সাধক তাঁর অভীষ্টে পৌঁছোতে বিভিন্ন সাধনপন্থা ব্যাবহার করে থাকেন। একইভাবে অঘোরীরাও এক বিশেষ ধরনের সাধন-প্রণালী ব্যাবহার করে থাকেন- যার নাম অঘোরপন্থা। আচ্ছা বল তো, এই ‘অঘোর’ শব্দের মানে কী?”

    “ঠিক জানা নেই প্রফেসর।” আমি স্বীকার করে নিলাম।

    “অঘোর শব্দের অর্থ হল, অন্ধকারের বিলয় বা ভয়হীনতা। অঘোরী কথার অর্থ হল, যার ঘোর কেটে গেছে। তন্ত্রে বলা হয়েছে, ‘অঘোরান্নঃ পরো মন্ত্র’— অর্থাৎ অঘোর মন্ত্রের পর আর কোনও মন্ত্র নেই। অঘোরপন্থী সাধনাই শ্রেষ্ঠ সাধনা।”

    “কিন্তু এই সাধকদের শুধু শ্মশানেই দেখা যায় কেন?”

    “শ্মশান আসলে বৃত্তিনাশের জায়গা। শ্মশানে সাধনার মাধ্যমে শরীর শব হয়ে যায়। অঘোরীদের সাধনার পথ বড়ো ভয়ংকর। জীবন-মৃত্যুর প্রবহমান চক্র পেরনোটাই অঘোরী’র সাধনা। তাই চিরবিরাজমান মৃত্যুর নিজস্ব ভূমি— শ্মশানই তাঁদের সাধনার ক্ষেত্র। তন্ত্রসাধনার প্রধান ক্ষেত্রভূমিও তাই শ্মশান। যিনি হৃদয়কে কামনা-বাসনা থেকে মুক্ত করে শ্মশানের মতো করে নিতে পারেন, তিনিই তন্ত্র সাধনার সেই মহাশক্তির রহস্য বুঝতে পারেন।

    অঘোরীরা সমগ্র বিশ্বকেই শ্মশানভূমি বলে ভেবে নেন। মৃত্যুকে একটি স্বতন্ত্র রূপের মধ্যে ধরে নিয়ে তাঁরা পুজো করেন। কুণ্ডলিনীকে জাগ্রত করে চক্রে-চক্রে তার সাধনা করেন। অঘোরীরা যেমন শক্তির উপাসক হন, আবার সাধন ভেদে তাঁরা শিবেরও উপাসনা করে থাকেন।”

    “একটা প্রশ্ন আছে প্রফেসর। হয়তো একটু বোকা-বোকা শোনাতে পারে, আগেই বলে রাখি।”

    “নির্দ্বিধায় বল কৌশিক। কোনো জিজ্ঞাসাই ফেলনা নয়।”

    “লোকমুখে শুনেছি, টিভি আর সিনেমাতেও দেখেছি, অঘোরী সাধক মাত্রেই অত্যন্ত বদমেজাজি। এটা কেন হয়?”

    “দেখো, এঁদের বাহ্যিক আবরণটাই এমন যে প্রীতিপূর্ণ সম্ভাষণে অভ্যস্ত সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজে এঁদের সঙ্গে মেশা সম্ভব নয়। যেহেতু এঁরা শ্মশানচারী, তাই অন্যের সৎকারে আসা কিছু গুটিকয়েক নেশাচ্ছন্ন মানুষই এঁদের অনাবশ্যক সাথি হয়ে ওঠে নেশার ঘোরে, নিজের ভাগ্য ফেরানো বা মারণ-উচাটন ইত্যাদির অনুরোধ নিয়েই লোকজন বিরক্ত করে এঁদের। মুক্তির সাধনায় রত প্রকৃত অঘোরী, অমাবস্যার নির্জন রাতে শবসাধনায় লিপ্ত অঘোরী এ-সব সাংসারিক বিষ নেবেনই বা কেন? স্বাভাবিক ভাবেই ওঁরা এ-সব প্রশ্নে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তখনই এঁদের মুখে অশ্রাব্য ভাষার ফুলকি ছোটে। বলা চলে যে এইসব ঝামেলার হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতেই সর্বদা এমন একটা বীভৎস আবেশে নিজেদের আবিষ্ট করে রাখেন এঁরা।”

    “আর শবসাধনা? সেটা কি এই পন্থায় অত্যাবশ্যক?”

    “আরে অঘোরীদের মূল সাধনাই তো শবসাধনা! এর উদ্দেশ্য একটাই— ব্যাক্তিত্বের সীমাকে লঙ্ঘন করে যাওয়া।”

    “ঠিক বুঝলাম না।”

    “ব্যক্তিত্ব অর্থাৎ পার্সোনালিটি— যা মানুষের আসল সত্তাকে আড়াল করে রাখে। পার্সোনালিটি শব্দটা এসেছে ল্যাটিন শব্দ পার্সোনা থেকে— যার অর্থ অভিনেতার মুখোশ। বুঝতেই পারছ, আমাদের ব্যক্তিত্বই কিন্তু আমাদের অভিনয় করতে শেখায়। এই ব্যক্তিত্বই হল অহং। ভারতীয় আধ্যাত্মবাদের মূল লক্ষ্যই হল সেই অহংকে অতিক্রম করা। অঘোরীরা এই ব্যক্তিত্ব বা অহং-কেই নষ্ট করেন প্রথমে। তার জন্যই শবসাধনা করতে হয়।

    শব হল এমন একটি বস্তু— যার কোনো বৃত্তি নেই। শ্মশান হল বৃত্তিনাশের জায়গা। তাই সেই শ্মশানেই, শবকে প্রতীক করে অঘোরী শবসাধনার নামে নিবৃত্তির সাধনা করেন। শবের উপর বসে ধ্যানযোগে তিনি মনের উপর থেকে নীচের সর্বস্তরের কামনাকে আগাছার মতো টেনে ওপরে তোলেন। তাতেই ঈশ্বরের প্রতি সমর্পণ আসে। এঁরা কোনো কিছুতেই ভয় পান না। সৃষ্টিকর্তার কাছে কায়মনোবাক্যে নিজেকে যে সমর্পণ করে, তার কীসের ভয়? এইভাবে, নানা যোগের মাধ্যমে শরীর শব হয়।”

    “মানে পুরো ব্যাপারটা রূপকার্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তাই না প্রফেসর?”

    “একদম ঠিক কৌশিক। শবসাধনার মূল অর্থ হল নিজের শরীর-মনের স্থূলতাকে নাশ করে কুলকুণ্ডলিনীর সাহায্যে শক্তির জাগরণ এবং তার মাধ্যমে চিরন্তন অতীন্দ্রীয়বোধকে স্পর্শ করা।

    অঘোরী সাধনার সর্বাপেক্ষা কঠিন স্তর হল খণ্ডমণ্ড যোগ— যেখানে অঘোরী তাঁর হাত-পা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে জ্বলন্ত অগ্নিতে ছুড়ে ফেলেন। যদি তিনি সঠিক সাধনায় সিদ্ধ হন, তবে বারো ঘণ্টা পর সেগুলো আবার বেরিয়ে এসে অঘোরীর শরীরে পুনঃস্থাপিত হয়। এটাও কিন্তু একটা মেটাফর! এখানে আসলে সাধককে তাঁর হাত-পা গুটিয়ে কূর্মাসনে বসতে বলা হয়েছে। কচ্ছপের মতো নিজের খোলের মধ্যে হাত পা গুটিয়ে নিয়ে, সব ইন্দ্রিয় ও বৃত্তিকে গুটিয়ে নিয়ে সাধনা করতে হয় এই স্তরে। কাম, ক্রোধ, লজ্জা, ক্ষুধা, নিদ্রা, ভয়— এই ইন্দ্রিয় তথা বৃত্তিকেই টুকরো-টুকরো করে আগুণে পুড়িয়ে ফেলার প্রক্রিয়াকে রূপকার্থে বলা হয়েছে।

    কিছু অঘোরী আবার একখণ্ড যোগে সাধনা করেন। এর অর্থ একটি প্রত্যঙ্গ হেঁটে ফেলা। এও একটা প্রতীক— যার আক্ষরিক অর্থ, এক পায়ে দাঁড়িয়ে সাধনা করা।

    কেউ-কেউ আবার নবখণ্ড সাধনার কথাও বলেন— অর্থাৎ শরীরের নটা অংশই ছেঁটে ফেলা হয়, এমনকি মুণ্ড পর্যন্ত! আদতে এতে হেঁটমুণ্ড হয়ে সাধনার কথা বলা হয়েছে। প্রাচীনকালে অসুররা নাকি হেঁটমুণ্ড হয়েই অধিকাংশ সাধনা করত, তাই তারা দ্রুত সিদ্ধিলাভ করত।”

    “অনেক কিছুই বুঝলাম প্রফেসর!” দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।

    “বুঝতে পারছি, একটু নীরস তত্ত্ব আলোচনা হয়ে যাচ্ছে। তুমিই কিন্তু জানতে চেয়েছিলে!” মুচকি হাসলেন প্রফেসর সোম।

    “না-না। অনেক কিছুই জানতে তো পারলাম। কিন্তু একটা বিষয়ে খটকা থেকে গেল।”

    “বুঝতে পেরেছি। আমার আধ্যাত্মিক শিক্ষা-দীক্ষার সমস্তটা ক্যাথলিক চার্চের হাত ধরে হলেও এগুলো সম্পর্কে আমি বিশদে জানলাম কী করে— তাই তো?”

    “ঠিক তাই।”

    “সাধে কি আর জেনেছি? জানতে বাধ্য হয়েছি ভায়া। সেই গপ্পোটাই তাহলে তোমাকে বলি।”

    গুছিয়ে বসতে যাচ্ছিলাম লাম গল্পের আশায়। তখনই লোকজনের তোড়জোড় দেখে বুঝলাম, আমাদের গন্তব্য আগতপ্রায়।

    .

    ।।৬।।

    শ্যামা কথা

    প্রফেসর ঠিকই বলেছিলেন। যতটা গরম লাগবে ভেবেছিলাম, ততটা কিন্তু লাগছিল না। ট্রেন থেকে নেমেই স্টেশনের মুখে পায়ে-টানা ভ্যানগাড়ি পেয়ে গেছিলাম। ধু-ধু প্রান্তরের বুক চিরে এগিয়ে গেছে রাস্তা। তার দু-পাশে লম্বা গাছেদের সারি। মৃদুমন্দ হাওয়া আর আলোছায়ার। সব মিলিয়ে এই ভ্যান-ভ্রমণটা খারাপ লাগছিল না। প্রফেসর সোম বোধহয় মনের ভাবটা ধরতে পারলেন।

    “কী বলেছিলাম, কৌশিক? আমার কথা মিলল তো?”

    “তাই তো দেখছি প্রফেসর। কিন্তু আমার গল্পটা যে শুরু হচ্ছে না।”

    “হবে-হবে।” মুচকি হাসলেন প্রফেসর, “আমি যে সময়ের কথা বলছি তখনও মেদিনীপুর অবিভক্ত ছিল। পূর্ব আর পশ্চিমে ভাগ হয়নি। কাঁসাই নদীর তীরে একটা ছোট্ট গ্রাম ছিল— বাহাদুরপুর। সেই গ্রামে এক ব্রাহ্মণ বাস করতেন। তাঁর নাম অমিয়ভূষণ চক্রবর্তী। ভদ্রলোক ওই গ্রামেরই কৃষ্ণ মন্দিরের পুরোহিত ছিলেন। অত্যন্ত নিষ্ঠাবান মানুষ ছিলেন তিনি। চারবেলা মদনমোহনকে সেবা না দিয়ে অন্নজল গ্রহণ করতেন না। সামর্থ্য অনুযায়ী গরিবদের পাশে থাকতেন। মানে এক কথায় বলতে গেলে, ও-রকম ভালো লোক খুব একটা দেখা যেত না। কিন্তু ঘটনাক্রমে সেই অমিয়ভূষণের জীবন এই এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটে যায়।”

    “কীরকম?” আমি প্রশ্ন করলাম।

    “অমিয়ভূষণের এক মেয়ে ছিল— নিজের নয়, পালিত। নাম শ্যামা। এক দুর্যোগের রাতে শ্যামের মন্দিরের চাতালে মেয়েটাকে পেয়েছিলেন তিনি, তাই ওই নাম। কিন্তু পালিত হলেও শ্যামা কোনো অংশেই নিজের মেয়ের থেকে কম ছিল না অমিয়ভূষণের কাছে। এমনকি শ্যামা’র ওপর যাতে কোনো বিরূপ প্রভাব না পড়ে, তাই সারাজীবন আর বিয়েই করেননি তিনি। ছোটো থেকেই তাকে নিজের মতো করে গড়ে তুলেছিলেন অমিয়ভূষণ। শ্যামা ছিল তাঁর মতোই সৎ, পরিশ্রমী, আর শ্রদ্ধাবান।

    বাপ-বেটি দুটিতে মিলে সুখে-দুখে ভালোই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। বাহ্যিক আড়ম্বরের অনুপস্থিতি কোনোদিনই অভ্যন্তরীণ আনন্দের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। কিন্তু একদিন…

    গ্রামের জমিদারবাড়িতে এক বিশাল অনুষ্ঠান ছিল—সম্ভবত তাঁর মেয়ের জন্মদিন। এমনিতে এক মুহূর্তও শ্যামাকে চোখের আড়াল করতেন না অমিয়ভূষণ। কিন্তু স্বয়ং জমিদারের অনুরোধে তিনি শ্যামাকে সেখানে পাঠাতে রাজি হন। সেই অনুষ্ঠান থেকে ফিরতে-ফিরতে শ্যামার অনেক রাত হয়ে যায়। তখনই রাস্তায় কিছু একটা দেখে শ্যামা প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায়।”

    “তারপর?”

    “তারপরেই শুরু হয় আসল বিপদ। পরদিন সকাল থেকেই শ্যামা’র ধুম জ্বর আর ভুল বকা শুরু হয়। মেয়েটির আচরণ এতই অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে যে অমিয়ভূষণের বাড়িতে রীতিমতো ভিড় লেগে যায়। ভর হয়েছে কিংবা ভূতে পেয়েছে— এমনটাই ছিল অধিকাংশের অভিমত। গ্রামের অভিজ্ঞ লোকেরা নানা বিধান দেন। মদনমোহনের চরণামৃত, ঘরোয়া টোটকা, কবিরাজের পাঁচন, এমনকি শেষ অবধি ওঝা-গুণিন— কিছুতেই কিছু লাভ হয়নি। শ্যামার পাগলামি উত্তোরোত্তর বাড়তেই থাকে। রীতিমতো হিংস্র হয়ে ওঠে সে। বাধ্য হয়ে মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতে হয় শ্যামাকে।

    নিজের মেয়ের এই অবস্থা সহ্য করা কোনো বাবার পক্ষেই সম্ভব ছিল না। অমিয়ভূষণও আর থাকতে পারেননি। সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যেতে দেখে তিনি ফিরে যান তাঁর আরাধ্য দেবতার কাছেই— মদনমোহনের মন্দিরে।”

    .

    ।।৭।।

    শ্যামার শমন

    কাঁসাই নদীর তীরে গড়ে ওঠা ছোট্ট একটা গ্রাম বাহাদুরপুর। ছবির মতো সাজানো- গোছানো, আম-জাম-বট-হিজলের ছায়ায় ঘেরা, জনা চল্লিশেক হিন্দু ঘর নিয়ে গড়ে উঠেছে

    এই গ্রাম। তার মাঝখানে বিরাজ করছেন স্বয়ং মদনমোহন। পোড়া মাটি আর পাথরের নিবিড় বাঁধনে তৈরি হয়েছে এই ছোট্ট মন্দির। শোনা যায়, বহু দিন আগে বাহাদুরপুরের বর্তমান জমিদার দীপেন্দ্রনারায়ণ মজুমদারের পিতামহ উপেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার এক স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। সেই আদেশ অনুসরণ করে পাওয়া এক বিশেষ শিলা থেকে এই মন্দিরের বিগ্রহের সৃষ্টি— খুব জাগ্রত। অদ্ভুত ব্যাপার হল, এই বিগ্রহের দুটো চোখ দু-রকমের।

    মন্দিরে সান্ধ্য পুজো সারছিলেন অমিয়ভূষণ। আজ মদনমোহনের প্রতি তাঁর মনোযোগ কিঞ্চিৎ কম। তার জন্য তিনি ইতিমধ্যে মদনমোহনের কাছে বারবার ক্ষমাপ্রার্থনাও করেছেন। আসলে অন্যদিনের মতো আজ তাঁর পাশে শ্যামা নেই যে। অন্যদিনের মতো সে হাতে-হাতে বাবার দিকে পুজোর উপকরণ এগিয়ে দিচ্ছে না।

    সেই ছোটো থেকেই শ্যামাকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন তিনি। খুব বেশি সময়ের জন্য কখনোই তাকে চোখের আড়াল হতে দেননি। তাঁর এই অতিরিক্ত সতর্কতা নিয়ে গ্রামবাসীরা হাসিঠাট্টা করলেও তিনি সে-সব গায়ে মাখেন না। মেয়েটা তাঁর, তাই তার ভালো-মন্দ তাঁকেই দেখে নিতে হবে। নেহাত স্বয়ং জমিদারবাবু অনুরোধ করলেন বলেই অমিয়ভূষণ ‘না’ করতে পারেননি। দীপেন্দ্রনারায়ণের মেয়ের জন্মদিন, সেই উপলক্ষ্যে ঘটা করে ভোজ হচ্ছিল। শ্যামা আর জমিদারবাবুর মেয়ে প্রায় পিঠোপিঠি— গলায় গলায় বন্ধুত্ব। তাই শ্যামাকে অনুষ্ঠানের দিন সকাল থেকেই চাই মেয়ের পাশে— এই ছিল দীপেন্দ্রনারায়ণের অনুরোধ। রাত হয়ে গেলেও তিনি, তেমন হলে, নিজে এসে শ্যামাকে ফিরিয়ে দিয়ে যাবেন। অমিয়ভূষণ তাই ভোর-ভোর শ্যামাকে জমিদারবাড়িতে দিয়ে এসেছেন। অনুষ্ঠান বাড়িতে তিনি কিছুই খান না; তাই বেলাবেলি ফিরেও এসেছেন। আসার সময়ও শ্যামার কথা আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে এসেছেন।

    দীপেন্দ্রনারায়ণের কর্তব্যপরায়ণতা নিয়ে অমিয়ভূষণের কোনো সংশয় ছিল না। তাঁর শঙ্কা ছিল শুধু মূল গ্রামের সীমানা আর জমিদারবাড়ির মাঝের বিস্তীর্ন শূন্য ভূখণ্ডটি নিয়ে রাত হয়ে গেলে যে ফাঁকা জায়গা দিয়ে যেতে তাঁর নিজেরই গা ছমছম করে!

    যাইহোক, মদনমোহন আছেন। উনিই এতদিন দেখেছেন, আগামীতেই নিশ্চয়ই দেখবেন। সাষ্টাঙ্গে প্রণাম সেরে আজকের মতো পুজা শেষ করলেন অমিয়ভূষণ।

    মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে বাড়ি ভরতি লোকজন, গান-বাজনার আয়োজন। নিরামিষ- আমিষ নানা পদের গন্ধে চারদিক ম-ম করছিল। জমিদারের একমাত্র মেয়ে বলে কথা! তাই উৎসবে কোনো খামতি রাখেননি দীপেন্দ্রনারায়ণ।

    এমন আলোর উৎসব ছেড়ে আপাতত তিনি চলছেন— তাও একেবারে একা! কাউকে কিছু না জানিয়েই তাঁকে আসতে হয়েছে। গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে পোড়োদিঘির শ্মশান। সন্ধ্যা হলে সেখানে একা আসতে হবে এই ছিল শর্ত। অন্য সময় কেউ এমন উদ্ভট শর্ত চাপালে দীপেন্দ্রনারায়ণ লেঠেল দিয়ে সেই ‘রসিক’ ব্যক্তিটির উপযুক্ত আদরযত্ন করতেন। কিন্তু আজ তিনি নিরুপায়। এই শর্ত মানা আর না-মানার উপর তাঁর আদরের মেয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

    দূর থেকে ভেসে আসছিল মদনমোহনের মন্দির থেকে কাঁসর ঘণ্টার আওয়াজ। অমিয় ঠাকুর নিশ্চয়ই সন্ধ্যারতি করছেন। অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিয়ে হাঁটার গতি বাড়ান দীপেন্দ্রনারায়ণ, অনেকটা পথ যেতে হবে।

    .

    ।। ৮।।

    পোড়াদিঘির পোড়া ছায়া

    “পা চালা খুকি। এখনও অনেকটা রাস্তা।”

    “উফ ধীরেন কাকা, তুমি একটু রোসো তো! সেই সকাল থেকে কত কী খেয়েছি জানো? এত জলদি জলদি হাঁটা যায় নাকি?”

    “ওরে পাগলি, জলদি পা না চালালে চলবে? রাত কত হয়েছে জানিস? রাত আরো ঘনালে, ওদিকে তোর বাবা আর এদিকে জমিদারবাবু দু’জন মিলে আমার পিণ্ডি চটকে দেবে।”

    “তুমি খুব ভিতু! যাও দেখি, বাড়ি ফিরে যাও। লণ্ঠন তো আমার আছেই। আমি ঠিক নিজের বাড়ি পৌঁছে যাব।”

    “উফ্, কথার ফুলঝুরি হয়েছে একটা। মুখের মতো পাটাও যদি চালাতে পারতি, আমার চিন্তা থাকত না। নে বাপু, আর কথা না বাড়িয়ে পা চালা দিকি।”

    জমিদারবাড়ির অনুষ্ঠান শেষ হতে অনেক রাত হয়েছিল। দীপেন্দ্রনারায়ণ এবং তাঁর মেয়ে দু’জনেরই ইচ্ছে ছিল যে শ্যামা আজ রাতে সেখানেই থেকে যাক। কিন্তু জ্ঞান হওয়া অবধি শ্যামা অমিয়ভূষণকে ছেড়ে এক রাতও বাইরে কাটায়নি। বাধ্য হয়ে দীপেন্দ্রনারায়ণ বিশ্বস্ত ধীরেনকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন শ্যামাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসার। শ্যামা অবশ্য বলেছিল, সে একাই চলে আসতে পারবে; এ রাস্তা তো তার হাতের তালুর মতোই চেনা। তবু দীপেন্দ্রনারায়ণ ধীরেনকে শ্যামার সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

    কিন্তু তার কথা শুনলেই ভালো করতেন দীপেন্দ্রনারায়ণ।

    যাঁর ভরসায় শ্যামকে পাঠানো হয়েছে, সেই ধীরেন কাকা নিজেই যে একটা ভীতুর ডিম— এটা শ্যামা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল।

    অন্যদিন আকাশ তারায় ভরা থাকে, সেদিন তা ছিল না। ঘন কালো মেঘে আকাশের মুখ ভার হয়ে ছিল। ঠান্ডা হাওয়াও মনে হচ্ছিল, বৃষ্টি এল বলে। মাঝে-মাঝে রাতচরা পাখিদের কর্কশ ডাক শুনে ধীরেন কাকার চমকে ওঠা, ঝিঁঝিঁদের বিরামহীন গান— সব মিলিয়ে বেশ লাগছিল শ্যামা’র। আসলে রাতের এই রূপ সে আগে দেখার সুযোগই পায়নি অমিয়ভূষণের শাসনে। তার নিজের খুব একটা ভয়ও করছিল না। ছোটো থেকেই সে সাহসী। শুধু এই গ্রামে ঢোকার আগে পোড়াদিঘির শ্মশান এলেই কেমন যেন গা শিরশির করে ওঠে। বাবা অবশ্য শিখিয়ে দিয়েছেন, মন দুর্বল হলেই কালাচাঁদের নাম তিনিই সব বিপদ বুকে টেনে নেবেন!

    “এমন সময়ে এই অলুক্ষণে জায়গা দিয়ে যেতে হচ্ছে। রাম রাম রাম!” কাতরে উঠলেন ধীরেন ।

    ধীরেন কাকার অবস্থা দেখে হাসি পেয়ে গেল শ্যামার। সে বলল, “ও কাকা! তুমি ফিরে যাও। এখন তো তাও আমি আছি; ফেরার সময় এই রাস্তা দিয়ে তোমাকে একা- একা ফিরতে হবে— মনে আছে তো?”

    “রাম রাম রাম রাম!” শ্যামার কথা শুনে ধীরেনের রামনাম আরো বৃদ্ধি পায়।

    “আরে মহা মুশকিল! বললাম তো, এই মোড় পেরোলেই তো গ্রাম। এটুকু আমি নিজে চলে যেতে পারব। তুমি এবার যাও।”

    “না-না! কিছু একটা হয়ে গেলে জমিদারবাবু আমার শূলে দেবেন।”

    “আমি কাউকে কিছু বলব না। দু-পা গেলেই তো গ্রামের রাস্তায় উঠে যাব। তুমি নিশ্চিন্তে ফিরে যাও কাকা। সারাদিন অনেক খাটাখাটনি করেছে। জলদি ফিরে গিয়ে এট্টু বিশ্রাম নাও দেখি।”

    শ্যামার মমতায় ভরা মুখটা দেখে আশ্বস্ত হয় ধীরেন। কতটুকুই বা বয়স? জন্ম থেকে মায়ের আঁচলও পায়নি। অথচ অমিয় ঠাকুর কী সুন্দর করে মেয়েটাকে নিজের মতো বানিয়েছেন। এই বয়স থেকেই গরিব-দুঃখীদের নিয়ে কেমন ভাবনা। কৃতজ্ঞতায় চোখ ছলছল করে ওঠে ধীরেনের

    ধীরেন কাকাকে চলে তো যেতে বলল বটে, কিন্তু শ্যামারনিজেরই যেন এবার ভয় করতে শুরু করল। অথচ এই সামনের বাঁকটা পেরিয়ে গেলেই তাদের গ্রামের রাস্তা। আরো জোরে পা চালাতে শুরু করল শ্যামা।

    হঠাৎ পোড়াদিঘির স্থির জলে তীব্র একটা আলোড়ন শুরু হল। জল থেকে কী যেন একটা জীব তীব্র বেগে পারের দিকে ধেয়ে এল। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না শ্যামা। সে কালাচাঁদের নাম নিয়ে প্রাণপণে দৌড়োতে শুরু করল সামনের দিকে ।

    বেশ কিছুদূর আসার পর শ্যামা থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হল। গ্রামে ঢোকার রাস্তার মুখেই কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। নিশ্চয় অমিয়ভূষণ— মেয়ের দেরি দেখে এগিয়ে এসেছে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল শ্যামা। বাবাহ্! কী ভয়টাই না সে পেয়েছিল আজ।

    “বাবা, তুমি এসেছ? আজ সত্যিই ভয় পেয়ে গেছিলাম গো!”

    হাতের লণ্ঠন উঁচু করে ধরতেই শ্যামার ভুল ভেঙে গেল। স্তব্ধবাক, স্থির হয়ে সে তাকিয়ে রইল। বাবা নয়! তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল এক মূর্তিমান বিভীষিকা।

    .

    ।। ৯।।

    জমিদারের খাসমহল

    দীপেন্দ্রনারায়ণের সুসজ্জিত বৈঠকখানায় সেদিন অনেকেই ছিলেন— গ্রামের পাঁচ মোড়ল, অমিয়ভূষণ, তিনি নিজে। কিন্তু সেদিন পরিবেশ থমথমে হয়ে ছিল। সবার মুখেই ঘন হয়ে ছিল চিন্তার কালো মেঘ।

    “তাহলে কী ভাবলেন, ঠাকুরমশাই?”

    “আমি জানি না, হুজুর! আশেপাশের সব গ্রামের ওঝা, গুণিন, কবিরাজ, বৈদ্য- সবাই ব্যর্থ হয়েছে। এমতাবস্থায় কী করা উচিত আপনারাই বলুন। আমার আর মাথা কাজ করছে না!”

    “দেখুন, শ্যামা শুধু আপনার একার মেয়ে নয়; ও আমাদের গ্রামের মেয়ে। চোখের সামনে মেয়েটাকে তো অকালে ঝরে যেতে দিতে পারি না। সত্যি বলতে কি, শ্যামার আজকের এই পরিস্থিতির জন্য আমিও অনেকাংশে দায়ী। তবে আমি নিজেকে যতই দুষি, বা ধীরেনকে তার দায়িত্বজ্ঞানহীনতার জন্য যতই শাস্তি দিই, তাতে শ্যামা তো আগের অবস্থায় ফিরে আসবে না। বাকিরা কী বলবেন, তা আমি জানি না। তবে আমার মতে শ্যামাকে নিয়ে আপনি এই মুহূর্তে শহরের দিকে যাত্রা করুন। সেখানে অনেক বিলেত-ফেরত ভালো মাথার ডাক্তার রয়েছে। যত টাকা লাগুক, আমি দেব।”

    “মা… মাথার ডাক্তার! জমিদারবাবু, আপনিও কি মনে করছেন যে আমার শ্যামা পাগল হয়ে গেছে?”

    “আপনি তো জানেনই ঠাকুরমশাই, অলৌকিকের ওপর আমার বিশ্বাস নেই। আমি শ্যামাকে একবারের জন্যও পাগল বলছি না। কিন্ত শ্যামার সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য সঠিক চিকিৎসার প্রয়োজন— এটাই আমার বক্তব্য।”

    “কিন্তু শহরে শ্যামাকে নিয়ে গেলে ওরা যদি ওকে আটকে রেখে দেয়, আমি কী নিয়ে, কাকে নিয়ে বাঁচব? আপনি তো জানেন, ওই একরত্তি মেয়ে ছাড়া আমার আর কেউই নেই।”

    “বেশ। তাহলে শুধুমাত্র একটা আশঙ্কার কথা ভেবে মেয়েটাকে তিলে-তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিন আপনি।”

    দীপেন্দ্রনারায়ণের কথায় এবারে ডুকরে কেঁদে ওঠেন অমিয়ভূষণ।

    “ঠাকুর, এখানে কান্নাকাটি করে কোনো লাভ আছে কি?” বলে ওঠেন নিধু মোক্তার, “বরং হুজুর যদি অভয় দেন, আমি একটা কথা বলি।”

    “বেশ তো, বলুন। এখানে তো মতামত দেওয়ার জন্যই সবাইকে ডাকা হয়েছে।”

    “অপরাধ নেবেন না, হুজুর। আমি জানি, অলৌকিক বিষয়ের ওপরে আপনার কোনো বিশ্বাস নেই। কিন্তু আপনি তো জানেন, আমি সেই শৈশবকাল থেকেই সাধুসঙ্গ করে বেড়াই। বাউলের আখড়ায় গিয়ে পড়ে থেকেছি অনেকদিন। সেভাবেই শুনেছি, এই ক’দিন আগে অম্বিকাপুরের পরিত্যক্ত শ্মশানে এক ভয়ংকর অঘোরী সাধক এসে থাকছেন। যে যা দুরারোগ্য ব্যাধি নিয়ে যাচ্ছে, নিমেষে সারিয়ে দিচ্ছেন।”

    “সে তো ভালো কথা। সাধকটিকে ভয়ংকর বলছেন কেন?”

    “সে বড়োই সাংঘাতিক লোক। কারও মনে পাপ থাকলেই সেটা ধরে ফেলে সে। তারপর তার রোগ তো সারাবে নাই; উলটে এমন করে দেবে যে তার হয়তো আর ফেরাই হবে না।”

    “আপনি এগুলো নিজের চোখে দেখেছেন?”

    “হুজুর, সব তো দেখা নয়। কিছু দেখেছি, কিছু শুনেছি।”

    “বেশ তো। সব কিছু যখন পরখ করা হয়ে গেছে, ভৈরব বাবাই বা বাদ যাবেন কেন? কী বলেন ঠাকুরমশাই?”

    নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন অমিয়ভূষণ। নিধু মোক্তারই বললেন, “কিন্তু একটা সমস্যা আছে, হুজুর।”

    “আবার কী সমস্যা হল?”

    “অম্বিকাপুরের শ্মশানে যাওয়ার পথে মরণহাটির জঙ্গল পড়ে। আর মরণহাটির জঙ্গল পার হওয়া যে দিনের আলোতেও কতটা বিপজ্জনক— তা আপনি জানেন হুজুর। অমিয়ঠাকুর শ্যামাকে নিয়ে একা ওই পথে যাবেন?”

    “অমিয়ভূষণ একা যাবেন কেন? মরণহাটির দায়িত্ব না হয় আমিই নিলাম। আপনি প্রস্তুত হোন, ঠাকুরমশাই। বাছাই করা দশজন লেঠেল যাবে আপনার সঙ্গে। দেখি কোন বিপদ সামনে আসে!”

    .

    ।। ১০।।

    একচোখার আবির্ভাব

    “এত করে যে তোমাকে ডাকছি, তুমি কি কিছুই শুনতে পাও না, প্রভু? নাকি তুমি শুনতেই চাও না! যুগে যুগে ভক্তের চোখের জল মুছিয়ে এসেছে যে ভগবান, আজ সে এত পাষাণ হল কেন?’ কালাচাঁদের নিশ্চল মূর্তির চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করলেন অমিয়ভূষণ!

    পাথরের মূর্তির হৃদয়ও বুঝি পাথরেরই হয়, না হলে অমিয়ভূষণের কান্নায় তিনি ঠিকই সাড়া দিতেন। মেঝেতে পড়ে থাকা ফুল আর বেলপাতা সরাতে লাগলেন অমিয়ভূষণ। পুজোর নৈবেদ্যের থালা পরিষ্কার করে, প্রদীপে আরো কিছুটা তেল ঢেলে শিখাটা বাড়িয়ে দিলেন তিনি।

    “তোমার পূজো না করে, তোমাকে না খাইয়ে আমি আজ পর্যন্ত অন্নজল স্পর্শ করিনি প্রভু। এই নিয়মের বদল ঘটবে কাল। চললাম আমি ভৈরব বাবার কাছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, উনি আমাকে ফেরাবেন না। তুমি তো আর সাড়া দিলে না ঠাকুর!” সাষ্টাঙ্গে শেষ একবার প্রণাম সেরে, মন্দির বন্ধ করার প্রস্তুতি নিতে লাগলেন অমিয়ভূষণ।

    হঠাৎ বাইরে একটা শব্দ হল, তারপর শব্দটা হয়েই চলল— মন্দিরের ঘণ্টা কেউ যেন একনাগাড়ে বাজিয়ে চলেছে! এত রাতে আবার মন্দিরে কে এল? দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন অমিয়ভূষণ। প্রদীপের কম্পিত আলোয় দেখলেন, একটা বাচ্চা ছেলে সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনের পোশাক দেখে মনে হচ্ছিল, এ কোনো দুঃস্থ রাখাল। ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন তিনি।

    হা ঈশ্বর! এই শিশু’র সঙ্গে এমন বর্বর আচরণ কে করল?

    ছেলেটার একটা চোখ নেই— সে জায়গায় স্থান পেয়েছে গাঢ় অন্ধকার।

    “কে রে তুই? কাদের ঘরে থাকিস? এত রাতে মন্দিরে কী করছিস? তোকে তো আগে দেখিনি বাপু এই গ্রামে।” একনাগাড়ে কথাগুলো বললেন অমিয়ভূষণ।

    “খুব খিদে পেয়েছে ঠাকুর। দু-দিন ধরে কিছু খাইনি। আমাকে একটু প্রসাদ দেবে?” অন্যদিন হলে কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি আলাদা। রাত্রির শেষ প্রহরেই বেরিয়ে পড়তে হবে, নইলে ভৈরব বাবার থানে পৌঁছোতে অনেক বেলা হয়ে যাবে। তাই বাড়ি যাওয়ার তাড়া ছিল অমিয়ভূষণের। এই সময়েই ছোঁড়াকে আসতে হল? “আর আসার সময় পেলি না বাপু? দাঁড়া এখানে চুপটি করে। আমি নিয়ে আসছি।” প্রসাদ আনতে মন্দিরের ভেতরে গেলেন তিনি।

    ভেতর থেকে একটা পেয়ারা আর একটা আপেল এনে ছেলেটার হাতে ধরিয়ে দিলেন তিনি। পেয়ারাটা কোঁচড়ে পুরে আপেলটা খেতে শুরু করল ছেলেটা। ছেলেটার অদ্ভুত খাওয়া দেখার আর বিশেষ সময় ছিল না অমিয়ভূষণের। তিনি ভেতরের ঘরের দরজা বন্ধ করতে শুরু করলেন।

    “ও ঠাকুর, ভৈরব বাবার কাছে গিয়ে কিসু লাভ হবে না কিন্তু! বরং ঊষাকালে রায়দিঘির জলে শ্যামাকে ভালো করে স্নান করিয়ো। তারপর এই আপেলটা খাইয়ো। ও ঠিক সেরে উঠবে।”

    “তবে রে ভেঁপো ছোড়া! রাত-বিরেতে আমার সঙ্গে ফাজলামো করতে আসা?” রেগে মন্দির থেকে বেরিয়ে এলেন অমিয়ভূষণ। কিন্তু বাইরে কেউ ছিল না। শুনসান মন্দিরের উঠানে পড়ে ছিল শুধু সেই একচোখা ছেলের খাওয়া এঁটো আপেলের অবশিষ্ট অংশটা।

    .

    ।। ১১।।

    অম্বিকাপুরের পথে

    কুয়াশার ঘন আস্তরণ ভেদ করে মরণহাটির জংলী পথে কিছু মানুষকে হাঁটছিল। সেই ভিড়ে ছিল একটা পালকি, পালকিবাহক চারজন, ছ-জন তাগড়াই চেহারার লেঠেল, আর একজন শীর্ণকায় মাঝবয়সি পুরুষ।

    দিনের আলো ফুরোনোর আগেই গন্তব্যে পৌঁছোনোর উদ্দেশ্যে খুব ভোর-ভোর বেরিয়েছেন অমিয়ভূষণ। শ্যামা আছে পালকিতে। কিছু লেঠেল দিয়েছেন দীপেন্দ্রনারায়ণ। গতরাতে অসম্ভবরকম উগ্র আচরণ করেছিল। বাধ্য হয়ে অমিয়ভূষণ বৈদ্যের থেকে বিশেষ এক শিকড়-বাটা নিয়ে এসে শ্যামাকে জোর করে খাইয়েছিলেন। গত রাত থেকেই সে ঝিমিয়ে রয়েছে।

    “আর কতটা পথ রবি সর্দার?”

    “সঠিক সময় তো বলতে পারব না ঠাকুর। এই পিশাচসিদ্ধ জায়গায় আমরাও প্রথমবার যাচ্ছি। তবে আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা একদম সঠিক লোকের কাছ থেকে পথনির্দেশ নিয়ে এসেছি। বেলা থাকতে থাকতেই আমরা অম্বিকাপুরের শ্মশানে পৌঁছে যাব।”

    “তোমরাই এখন ভরসা সর্দার। না হলে এই গভীর জঙ্গলে আমাদের বাপ বেটির যে কী হত!”

    “ভরসা রাখুন ঠাকুর। আমরা যখন আছি, আপনার কোনো চিন্তা নেই। যেকোনো বিপদে আমরা প্রাণ দিয়ে রক্ষা করব আপনাদের। শুধু কালাচাঁদের কাছে প্রার্থনা করুন, সামনে এমন কিছু যেন এসে না-পড়ে যার মোকাবিলা করা আমাদের সাধ্যের বাইরে।”

    এতদিন লোকের মুখে শুনেছিলেন, আজ স্বচক্ষে মরণহাটির জঙ্গলকে দেখছিলেন অমিয়ভূষণ। কেউ বিশ্বাসই করবে না যে এই দিনের বেলাতেও তাদের মশাল হাতে এগিয়ে চলতে হচ্ছে। একটা জমাট বাঁধা অন্ধকার যেন সবসময় ঘিরে রয়েছে জঙ্গলকে; বাহর্বিশ্বের থেকে তার অস্তিত্ব যেন আলাদা!

    রবি সর্দারের কথায় অমিয়ভূষণের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরো গভীর হল। এখানে কোন বিপদ কী রূপ ধরে যে কোথা দিয়ে সামনে এসে হাজির হবে তা অনুমান করা মুশকিল। তেমন কিছু হলে তার সামনে লেঠেলদের লাঠি যে কতটা কাজ করবে— তাই নিয়েও সন্দেহ আছে তাঁর। মনে মনে কালাচাঁদকে স্মরণ করেন তিনি।

    হঠাৎ দূরে একটা আওয়াজ হয়। ডালপালা আর শুকনো পাতার মধ্য দিয়ে কী যেন একটা দ্রুতবেগে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। অমিয়ভূষণ সভয়ে রবি সর্দারের দিকে তাকালেন। অভিজ্ঞ লেঠেলরা বিপদের গন্ধ পেয়ে ইতিমধ্যে লাঠি বাগিয়ে প্রস্তুত হয়েছে; তাদের সবার দৃষ্টি সেই শব্দের উৎসের দিকে। তবু তাদের দৃষ্টিতে দোদুল্যমান ভয় দেখতে পেলেন অমিয়ভূষণ।

    “আমার কথায় বিশ্বাস হল না, ঠাকুর? তুমি সেই চললে ভৈরব বাবার কাছে!”

    এ কী অদ্ভুত ব্যাপার! অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন অমিয়ভূষণ এ তো সেই একচোখা ছেলেটা। এই গভীর জঙ্গলে এমন একটা বাচ্চা ছেলে কী করে এল? লেঠেলরাও স্তব্ধ হয়ে গেছিল এই খুনে জায়গার মধ্যে এই ছোট্ট ছেলেটিকে দেখে।

    “তুই… তুই এখানে কী করছিস?”

    “আমি তো রাখাল। জঙ্গলে গরু চরাচ্ছি।”

    “ফাজলামো করছিস আমার সঙ্গে? যে জঙ্গলের ধারেকাছে বড়ো মানুষরাও আসতে ভয় পায়, তুই সেখানে গরু চরাচ্ছিস!”

    “ভয় পাও তো তোমরা এখানে কী করে এলে? এখনও সময় আছে ঠাকুর। ফিরে যাও। আমার কথা শোনো।”

    হঠাৎ একটা চাপা জান্তব শব্দ আসে পালকির মধ্য থেকে। অমিয়ভূষণ বোঝেন, শ্যামার ঘুম ভেঙে গেছে।

    “আমি জানি না তুই কে। কিন্তু তুই কাল রাতে আসার পর থেকেই শ্যামার পাগলামি আরও বেড়ে গেছে। এখনও তুই আসামাত্র শ্যামা জেগে উঠেছে। চলে যা! চলে যা এক্ষুনি। না হলে এই লেঠেলদের দিয়ে তোর মাথা ফাটিয়ে দেব।” চিৎকার করে ওঠেন অমিয়ভূষণ।

    “বেশ। আমি চলে যাচ্ছি ঠাকুর। আর আসব না। তবে যাওয়ার আগে একটা জিনিস রেখে যাচ্ছি তোমার জন্য। শত বিপদে পড়লেও এটাকে কখনও হাতছাড়া কোরো না।” অন্ধকারে মিলিয়ে যায় সেই ছেলেটা। অমিয়ভূষণ খেয়াল করেন, ছেলেটা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে একটা অদ্ভুত সুন্দর ময়ূরের পালক পড়ে আছে।

    .

    ।। ১২।।

    মহাশ্মশানের শমন

    ঝুরো ছাই উড়ছিল। পোড়া মাংসের গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে এখানে। কালো ধোঁয়ার বিষবাষ্পে আকাশ-বাতাস ভরপুর। নিস্তব্ধ শ্মশানে শুধু কয়েকটা চিতা জ্বলার পটপট শব্দ উঠছিল। অতি সন্তর্পণে পা ফেলে এগিয়ে চলেছেন অমিয়ভূষণ।

    পায়ের তলায় হাড় ফুটছিল। কাঁধের ওপর অসাড় শ্যামার শরীরটা ক্রমশ যেন ভারী হয়ে উঠছিল।

    রবি সর্দার আর তার দলবল আগেই নাক-কান কেটে জানিয়ে দিয়েছিল, জমিদারবাবু যতই বলে দিন, শ্মশানের মধ্যে তারা প্রবেশ করতে অপারগ। এখানেই তারা অমিয়ভূষণের জন্য অপেক্ষা করবে। বাকি রাস্তাটা অমিয়ভূষণকে একাই যেতে হবে।

    একাই চলেছেন অমিয়ভূষণ। জীবনের এই মোড়ে এসে তাঁর কোনো কিছুকেই আর নতুন করে ভয় লাগছে না। স্বয়ং কালাচাঁদ যখন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, তখন একা চলাই তো ভবিতব্য।

    অম্বিকাপুরের শ্মশান যে প্রকৃতপক্ষে কতটা বড়ো, ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মাঝে ভৈরব বাবার আরাসই বা কোথায়— এ-সব কিছুই জানেন না অমিয়ভূষণ। তিনি শুধু জানেন, শ্যামাকে নিয়ে তাঁকে এগিয়ে যেতে হবে অন্ধকার থেকে আলোর উদ্দেশে।

    “ওকে মাটির ওপরে শুইয়ে দে।”

    চমকে উঠলেন অমিয়ভূষণ। তাঁর কানের কাছে যেন একটা বাজ পড়েছিল। চকিতে পেছনে ফিরে তিনি দেখতে পেলেন, জটাজুটধারী, ছাইভস্মে ঢাকা এক অঘোরী তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার টকটকে লাল জবার মতো চোখদুটো এক দৃষ্টিতে শ্যামাকে দেখে চলেছে— যেন কত বছরের অন্তহীন অপেক্ষা সবে মাত্র শেষ হতে চলেছে।

    “কথাটা কানে গেল না? ওকে মাটিতে নামিয়ে রাখ!” আবার বজ্রকন্ঠে নির্দেশ এল। ইতস্তত করলেন অমিয়ভূষণ। এতদূর প্রাণ হাতে করে এসেছেন। যে জন্য যার কাছে এসেছেন— সেই স্বয়ং সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তা হলে মনের মধ্যে এত কু-ডাক আসছে কেন? নিজেকেই প্রশ্ন করলেন অমিয়ভূষণ। তারপর থেমেথেমে বললেন, “বাবা, আমার মেয়ে শ্যামা…”

    “জানি। তোর কী মনে হয়? আমার ইচ্ছে ছাড়া এই শ্মশানে তুই দম নিতে পারতি? ওকে আমি সারিয়ে দেব। তুই মাটিতে শুইয়ে দে।”

    “দোষ নেবেন না বাবা। আমার এই একটিই অবলম্বন। ওর কিছু হয়ে গেলে…..”

    “তোর মেয়েকে মরতে হবে।”

    “বাবা!” আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠেন অমিয়ভূষণ। “হ্যাঁ, ঠিক শুনছিস। তোর মেয়েকে মরতে হবে অমিয়।”

    “সবাই যে বলেছিল, আপনি সবার শেষ সম্বল। শ্যামাকেও আপনি সারিয়ে তুলবেন।” কাঁদতে শুরু করলেন অমিয়ভূষণ।

    “কাঁদিস কেন পাগল, সেরে ওঠার জন্যই তো তোর শ্যামাকে মরতে হবে!”

    ভৈরব বাবার মুখে অদ্ভুত একটা হাসির ঝিলিক দেখতে পান অমিয়ভূষণ। শ্যামাকে মাটিতে নামিয়ে রাখেন অমিয়ভূষণ।

    “তোর মেয়ের মতো মানুষ হাতে গোনা দু-একজনই জন্মায় সৃষ্টির খেয়ালে। প্রকৃতির নিয়মে এই আধারের টান এতটাই প্রবল হয় যে ডাকিনী, যোগিনী, যক্ষিণীরা প্রতিনিয়ত আকৃষ্ট হতে থাকে তার প্রতি। সেটাই হয়েছে এক্ষেত্রে। এক প্রবল শক্তিধর যক্ষিণী বাসা বেঁধেছে তোর মেয়ের শরীরে।” শ্যামার শরীরের দিকে জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন ভৈরব বাবা।

    “তা হলে উপায়, বাবা?” দু-হাত জোড় করে প্রশ্ন করলেন অমিয়ভূষণ।

    “ওই যে বললাম। তোর মেয়েকে মরতে হবে, তবেই যক্ষিণীর নিষ্ক্রমণ ঘটবে। তার পরে তোর মেয়ের আত্মাকে আমি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করব তার শরীরে।”

    “আর কোনো উপায় নেই প্ৰভু?”

    “নাহ্! তোকেই এই কাজটা করতে হবে!”

    “কী বলছেন বাবা?” ডুকরে কেঁদে উঠলেন অমিয়ভূষণ।

    “হ্যাঁ।। তোকেই এই অবস্থার থেকে মুক্তি দিতে হবে। ব্রহ্মহত্যার পাপ তো আমি নেব না অমিয়। এই শ্মশানের শ্যামাকে পেছনে যে মরা নদীটা এসে মিশেছে, তার জলেই শ্যামাকে ডুবিয়ে মারতে হবে তোকে।”

    ভৈরব বাবার কথাগুলো যেন তিরের মতো এসে বিঁধছিল অমিয়ভূষণের কানে। তিনি আর সহ্য করতে পারছিলেন না। এত আশা-ভরসা নিয়ে এখানে ছুটে এসে এই বিধান শুনতে হল!

    অসম্ভব! অনেকদিন ধরে অনেকের কথা শুনেছেন তিনি। এবার নিজের মনের কথা শুনবেন; নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন।

    না বাবা আমার পক্ষে এ কাজ সম্ভব নয়।” তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে দৃঢ় গলায় বলে উঠলেন অমিয়ভূষণ।

    “বেশ তো। তুই না পারলে অন্য কেউ পারবে।” অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন ভৈরব বাবা। চিতার আবছা আলোয় তার প্রকাণ্ড শরীরটা আরো বিশ্রী দেখাল।

    “আপনি আমার ওপর জোর খাটাতে পারেন না। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে ফিরে যাব বাহাদুরপুরে। দরকার নেই তার সেরে ওঠার। সে এভাবেই পাগলি হয়ে থাকুক। তবু বাঁচুক সে!”

    “তোর কী মনে হয় অমিয়? আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তুই এখান থেকে শামাকে নিয়ে ফিরে যেতে পারবি?” হিসহিসিয়ে ওঠেন ভৈরব বাবা।

    .

    ।। ১৩।।

    চেনা মুখ অচেনা আচরণ

    “তারপর?” আমি প্রশ্ন করলাম!

    প্রফেসর সোম অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে কী যেন একটা ভাবছিলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আবার তিনি বলতে শুরু করলেন।

    “অন্ধকারের প্রকোপ ক্রমেই বেড়ে উঠল। সেই ছেলেটার দেওয়া ময়ূরের পালক হাতে ধরে ভৈরব বাবার কাছ থেকে পালিয়ে আসতে পেরেছিলেন অমিয়ভূষণ। শ্মশান থেকে বেরিয়ে এসে দেখেন সেখানে লেঠেলরা নেই— তারা আগেই পালিয়ে গেছে। কিন্তু দমে যাওয়ার লোক অমিয়ভূষণ নন। ততক্ষণে রাত নেমেছে। শ্যামাকে কাঁধে নিয়ে, একহাতে লণ্ঠন আর অন্যহাতে ময়ূরের পালক ধরে মরণহাটির জঙ্গল পেরিয়ে গেছিলেন তিনি মদনমোহনের নাম জপতে জপতে। কিন্তু…”

    “কিন্তু?”

    “কিন্তু গ্রামে ফিরে এসে অমিয়ভূষণ দেখতে পেয়েছিলেন, কারা যেন তাঁর বসতবাটি জ্বালিয়ে দিয়েছে। শুধু তাঁরই না, আশপাশের বহু বাড়ি ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। শেষ আশ্রয় হিসাবে তিনি ছুটে গেছিলেন মদনমোহনের মন্দিরে। সেই ছেলেটার দেওয়া আধ-খাওয়া আপেলটা তিনি ফেলেননি। সেটা তখনও মন্দিরে ছিল। শ্যামাকে কাঁধ থেকে মন্দিরের চাতালে শুইয়ে অমিয়ভূষণ আপেলটা কেটে শ্যামাকে জোর করে খাইয়ে দিয়েছিলেন। কী আশ্চর্য ঘটনা! মুহূর্তের মধ্যে শ্যামার ঘোর কেটে গেছিল। বহুদিন বাদে সে ‘বাবা” বলে ডেকে জড়িয়ে ধরেছিল অমিয়ভূষণকে।”

    “যাক, তাহলে মধুরেণ সমাপয়েৎ!” আমি বললাম।

    “সেটা হলে তো ভালোই হত, কৌশিক। কিন্তু বাস্তব তো এমন ছক মেনে চলে না। শ্যামাকে বুকে জাপটে ধরে কাঁদছিলেন অমিয়ভূষণ। হঠাৎ তিনি শুনতে পান, কারা যেন এগিয়ে আসছে মন্দিরের দিকে। তিনি প্রথমে সেই নিয়ে ভাবেননি। যত বড়ো শক্তিই আসুক, মদনমোহনের চৌকাঠ পার করে কার এমন সাধ্য আছে? কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ভুলটা ভেঙে গেল তাঁর। প্রচণ্ড কোলাহল দেখে বেরিয়ে এসে অমিয়ভূষণ দেখলেন, গ্রামের

    অধিকাংশ নারী ও পুরুষ হাজির হয়েছে মন্দিরের সামনে। তাদের হাতে রয়েছে আগুন আর লাঠিসোটা।”

    “কেন?”

    “গ্রামের লোকের বক্তব্য, অমিয়ভূষণের অপয়া মেয়ের জন্যই নাকি এমন সব অশুভ কাণ্ড ঘটছে বাহাদুরপুরে। তাই তাঁকে আর তাঁর মেয়েকে সেই মুহূর্তেই গ্রাম ছাড়তে হবে।”

    “বাহ্, বাহাদুরপুরে ভালোই বাহাদুরেরা বাস করে তো!”

    “অমিয়ভূষণ অনেক কাকুতি-মিনতি করেছিলেন। তিনি করজোড়ে গ্রামবাসীদের বলেছিলেন, শ্যামার শরীরের ওপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। আজ রাতটা অন্তত এই মন্দিরের চাতালেই তাঁদের থাকতে দেওয়া হোক। সকাল হলেই তাঁরা বেরিয়ে যাবেন। কিন্তু গ্রামবাসীদের মন গলেনি। শ্যামা’র হাত ধরে সেই অন্ধকারেই বাহাদুরপুর ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন অমিয়ভূষণ। অসহায়, ক্লান্ত আর দিশাহীন বাপ-বেটি বুঝতে পারেনি, তারা কোনদিকে যাবে। শেষ অবধি অমিয়ভূষণের হাতে ধরা লণ্ঠনের আলো একসময় বিন্দু হয়ে মিশে যায় অন্ধকারে।”

    “তাহলে কী বুঝলে সোম?”

    .

    ।। ১৪।।

    রুদ্র সোমের আগমন

    “আমার এখনও কিছুই শেখা হয়নি ফাদার। এখনও অনেক কিছু শিখতে হবে।” ফাদার লিওনার্ডের প্রশ্নে সম্বিত ফিরে পেয়ে, নীচু গলায় বললেন রুদ্র সোম।

    “দ্যাখো সোম, শেখার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। তার কোনো শেষও নেই। আমরা শুধু নম্র হতে পারি। প্রতিটা বিদ্যাকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে পারি। আর পারি সময়ের সঙ্গে নতুন-নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে। অন্ধকারের যেমন প্রকারভেদ আছে, তেমন তাদের সঙ্গে লড়ার উপায়ও ভিন্নভিন্ন। যত বেশি জানব, লড়তে ততই সুবিধা হবে।”

    “ঠিক বলেছেন ফাদার। সেজন্যই মোক্তারের বাড়িতে আমি ব্যর্থ হলাম। এতদিন ধারণা ছিল, এক ওষুধেই বোধহয় সব রোগ সেরে যায়– কারণ রোগের ধরণটা তো একই।”

    “ভালো বললে। কিন্তু সোম, ম্যালেরিয়ার ওষুধে কি কালাজ্বর সারবে? তুমিই বলো, দুটোই তো অসুখ— তাই না?”

    ফাদার লিওনার্ডের কথার জবাব দেয় না রুদ্র সোম। সে আজ বড়োই অনুতপ্ত। বিদেশে থাকাকালীন প্রতিটি কেসের সাফল্য নিজের অজান্তেই হয়তো তার অহং-এ ছাপ ফেলেছে। অজান্তেই নিজের ক্ষমতা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়েছিল তার মনে। সেজন্যই দেশে ফিরে তার লজ্জাজনক হার হয়েছে। ফাদার লিওনার্ড না থাকলে মোক্তারবাড়িতে আজ তার যে কী করুণ পরিণতি হত, তা পরমপিতাই জানেন। এই শিক্ষাটা তার দরকার ছিল। সোমের মনের ভাব বুঝতে পারলেন লিওনার্ড। সোমের পিঠে আলতো চাপড় দিয়ে তিনি বললেন, “চিন্তা কোরো না তোমার নিষ্ঠা আর কর্মদক্ষতার ওপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে। সেজন্যই এই জগতের খুঁটিনাটি সবটা জানাতে আমি তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি।”

    “এই নদীর তীরে?”

    “একদম তাই। নদী পারাপারের গুরুত্ব জানো? সফলভাবে জীবনের নদী পেরোতে ক-জন পারে, বলো?” মুচকি হাসলেন লিওনার্ড।

    সোম দেখতে পেল, সামনে এক বিপুলা নদী আর একটা ক্ষুদ্র অস্থায়ী খেয়াঘাট। ঘাটের একধারে একটা ছোট্ট ডিঙি নৌকো— তাতে বসে আছে এক শীর্ণকায় মাঝি।

    “এই নদী আমাদের পেরোতে হবে সোম। নদী পার হওয়ার পর কিছুটা দূরত্বেই স্বামী দিব্যানন্দের আশ্রম। সাধক মানুষ। তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্কও বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ। আমার অনেক কেসে উনি সাহায্য করেছেন। আমি চাই তোমার নতুন জিনিস শেখার শুরুও ওঁর হাত ধরেই হোক। এই দেশে অন্ধকারের অলিগলি আর তাদের থেকে উত্তরণের পথ— দুটোর কোনোটাই ওঁর অজানা নয়। আমার স্থির বিশ্বাস, উনিই তোমার সঠিক পথপ্রদর্শক হতে পারবেন।”

    “বেশ। তাই হবে, ফাদার।” বাধ্য ছাত্রের মতো মাথা নাড়ল সোম।

    “বাঁচান! আমার মেয়েকে বাঁচান!”

    আর্ত চিৎকারে সহসাই ভরে গেল চারপাশ। চকিতে পেছনে ফিরে সোম দেখতে পেল, একজন মধ্যবয়ষ্ক, ভদ্র চেহারার শীর্ণকায় মানুষ একটি বাচ্চা মেয়ের হাত ধরে ছিল। মেয়েটি কাঁদছিল। তাদের ঘিরে ছিল একদল দুর্দান্ত চেহারার লোক। তারা মেয়েটার হাত ধরে টানাটানি করছিল— তাকে কেড়ে নিতে চাইছিল মধ্যবয়সি মানুষটির কাছ থেকে। শত্রুরা সংখ্যায় অনেক বেশি হলেও মানুষটি কিছুতেই হাতের মুঠি আলগা করেননি এতক্ষণ। কিন্তু লোকগুলোর মারের সামনে তিনি ক্রমেই অবসন্ন হয়ে পড়ছিলেন। হাতের মুঠি আলগা হয়ে যাওয়া ছিল স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।

    সোম আর নিজেকে সামলাতে পারল না। নৌকো থেকে এক লাফে নেমে সে এগোল সেই বাপ-মেয়ের দিকে।

    “সোম!” ফাদারের ডাক শুনে পিছু ফিরে তাকাল সে।

    “ওদের চোখগুলো খেয়াল করেছ? দে আর পজেসড, সোম। খুব সাবধান!” সত্যিই তো! উত্তেজনার বশে সোম খেয়াল করেনি; দস্যুধাঁচের লোকগুলোর চোখ তো স্বাভাবিক নয়। তারা সবাই যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। তাদের মুখে কোনো কথা ছিল না। শুধু কাঁকড়ার মতো দাঁড়া দিয়ে বাপ-মেয়েকে খুবলে আলাদা করার চেষ্টা করছিল তারা। ফাদারের অভিজ্ঞ চোখ ঠিক ধরে ফেলেছিল ব্যাপারটা।

    “এটা নিয়ে যাও!” পবিত্র জলে ভরা পাত্রটা সোমের দিকে ছুড়ে দিলেন ফাদার। সেটা হাতে নিয়ে জটলার দিকে দৌড়ল সোম।

    .

    ।। ১৫।।

    নীলকুঠির দানব

    ভাগ্যিস নদীর ধারে এই পরিত্যক্ত নীলকুঠিটা পাওয়া গেছিল! না হলে এই জনহীন নদীর তীরে যে কী হাল হত?

    ঘাটে ওইরকম মারামারি দেখে মাঝিও কখন যেন পালিয়ে গেছিল। ফলে কাল সকালের আগে এখান থেকে বেরোনোর অন্য কোনো উপায় নেই। এমনিও সন্ধে নেমে আসছিল; তাই নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান পাওয়াটা জরুরি হয়ে পড়েছিল আরও বেশি করে।

    ফার্স্ট এইড বক্স খুলে সেই ভদ্রলোক আর তার মেয়ের ক্ষত নিরাময়ের চেষ্টা করছিল সোম। ভদ্রলোক শক্ত থাকলেও মেয়েটা তখনও ভীষণ শকের মধ্যে ছিল। সে কোনো বলছিল না; শুধু মাঝে-মাঝে ডুকরে কেঁদে উঠছিল।

    সঙ্গে যা শুকনো খাবার ছিল, ফাদার সবটাই বের করে মেয়েটার বাবার হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

    টুকরো-টাকরা কথায় জানা গেছিল, ভদ্রলোকের নাম অমিয়ভূষণ আর তাঁর মেয়ের

    নাম শ্যামা। ভদ্রলোক বাহাদুরপুর গ্রামে থাকতেন; পেশায় সেবায়েত ব্রাহ্মণ। অনেক করে ফাদার বোঝানোর পরে অমিয়ভূষণ মেয়েকে কিছু খাওয়াতে পারলেন। নিজেও সামান্য কিছু খেলেন।

    চোখের ইশারায় সোমকে ঘরের বাইরে ডেকে নিলেন ফাদার। জিজ্ঞেস করলেন, “কী বুঝেছ সোম?”

    “এরা দু’জনেই এমন শক পেয়েছে যে গুছিয়ে কিছুই বলতে পারছে না। তবে একটু আগে যে লোকগুলোর সঙ্গে আমাদের মোকাবিলা হল, তাদের দেখে কিছুটা অনুমান করেছি। তার সঙ্গে এদের এই আপাত অসংলগ্ন কথাগুলো জুড়লে একটা জিনিস পরিষ্কার হয়, ফাদার। খুব বড়ো কোনো অপশক্তি এদের পেছনে লেগেছে।”

    “একদম তাই! ঠিক বলেছ তুমি। সে-শক্তি খুব একটা সাধারণ অপশক্তি নয়। কেন জানি না, আমার অন্তর বলছে যে এই শক্তির মোকাবিলা আমাদের সাধ্যাতীত!”

    “তাহলে উপায় কী, ফাদার? এই অবস্থায় এদের দু’জনকে তো আমরা ছেড়ে যেতে পারি না।”

    “একেবারেই পারি না সোম। শরীরের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত এদের রক্ষা করব আমরা। সেই শিক্ষাই আমাদের দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যে শক্তি এদের শত্রু, সে সামনে এসে উপস্থিত হলে আমরা এদের কতটা রক্ষা করতে পারব— সেটাই একটা বড়ো প্রশ্ন।”

    “কাল সকালে তাহলে আমরা এখান থেকে শহরের দিকে রওনা দিই ফাদার?”

    “না, সোম। আমার মতে এদের আশ্রয় দিয়ে রক্ষা করতে পারেন একজনই। এই অন্ধকার থেকে মুক্তির উপায়ও বাতলে দেওয়ার ক্ষমতা আছে তাঁরই। দিব্যানন্দ!”

    “তাহলে বলছেন, আমাদের যাত্রাপথ আগের মতোই থাকবে?”

    “ঠিক তাই। আজ রাতটা কোনোভাবে পার করে দিতে হবে। কাল সকালে আলো ফুটলেই আমরা নদী পার হব। অন্ধকার রাতে অজানা নদী পেরোবার ঝুঁকি নিতে পারি না। কাল মাঝি না এলে আমরা নিজেরাই নৌকো নিয়ে নেমে পড়ব। দিনের আলোয় সে-রকম বিপদের শঙ্কা আছে বলে মনে হয় না।”

    “তাই হবে, ফাদার।” সম্মতি দেয় সোম।

    “এবার তোমার কাজটা বুঝে নাও। এই ঘরের চারপাশ, জানালা-দরজার চৌকাঠ, আর ফাটল গোছের যা কিছু আছেসেগুলো চিহ্নিত করো। তারপর পবিত্র তেল আর বালির মিশ্রণ, সঙ্গে কালো লবণ দিয়ে সেগুলো সব অবরুদ্ধ করে দাও। এতে কতটা কী কাজ হবে, জানি না। কিন্তু চেষ্টা তো আমাদের করতেই হবে। আমি ভেতরে যাচ্ছি অমিয়বাবুদের কাছে। ওদেরও পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাব; নিজেও কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে নেব। ততক্ষণ তুমি সদর দরজার মুখে, তোমার যাবতীয় অস্ত্র এবং সতর্কতা নিয়ে পাহারা দেবে। আমি ফিরে এলে তুমি যাবে বিশ্রাম নিতে।”

    ফাদারের কথায় সায় দিয় সোম প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থাগুলোতে মনোযোগী হল। অবিরাম ঝিঁঝিঁর ডাক, নদীর ছলাৎ ছল, ভাঙা চাঁদের আলো— সবকিছু মিলিয়ে সোমের মনেই হচ্ছিল না যে এত সুন্দর পৃথিবীতে কোনো বিভীষিকা থাকতে পারে। কয়েক ঘণ্টা আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নেহাতই গল্প বলে মনে হচ্ছিল তার। নদী থেকে ভেসে আসা শীতল বাতাসের স্পর্শে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছিল সোমের।

    “এবার তুমি ভেতরে গিয়ে বিশ্রাম নাও। তোমার ওপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে আজ।” ফাদারের ডাকে সংবিৎ ফিরে পেল সোম। মৃদু হেসে ফাদার বললেন, “তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ো সোম। আমার জন্য ভেবো না। হ্যাঁ, বয়সের কারণে রিফ্লেক্স কিছুটা কমে যেতে পারে; কিন্তু অভিজ্ঞতা এখনও তোমার থেকে অনেকটাই বেশি।”

    সত্যিই আর শরীর চলছিল না। একটু ঘুমের বড়ো প্রয়োজন ছিল। ঘরের ভেতর ঢুকে সোম দেখতে পেল, মেঝেতে এক ফালি কাপড়ের ওপরে অমিয়বাবু তার মেয়েকে বুকে চেপে ধরে অঘোরে ঘুমাচ্ছেন। অতি সন্তর্পণে সোম নিজের জন্য একটু জায়গা খুঁজে শরীরটাকে এলিয়ে দেয়। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল, তা সোম জানে না। হঠাৎ একটা চাপা গর্জনে তার ঘুম ভেঙে গেল।

    ধড়ফড় করে উঠে বসে সে দেখতে পেল অমিয়বাবু আর শ্যামাও ইতিমধ্যে উঠে বসে পড়েছে। তারা ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছিল। তাদের বিস্ফারিত দৃষ্টি অনুসরণ করে দরজার দিকে তাকিয়ে সোম দেখতে পেল, বিশালাকার একটা শরীর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার হাত-পা কিছুই নেই, সে জায়গায় আছে শুঁড়ের মতো কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। মাথার জায়গায় রয়েছে একটা বিশালকায় মুখ – যাকে শুধু গ্রাস করার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। অদ্ভুত সেই জীবটা এই ঘরে ঢোকার চেষ্টা করছে। প্রাণপণে তাকে আটকে রাখছিলেন ফাদার লিওনার্ড।

    কী বীভৎস সেই বিভীষিকার রূপ! যেন নরকের অন্তিম প্রকোষ্ঠ থেকে উঠে এসেছে সে। জ্বলন্ত চিতার মাঝখান থেকে উঠে আসা কোনো পিশাচও বুঝি তার কাছে লজ্জা পাবে। ফাদারের বলশালী চেহারাও সেই দানবের সামনে খেলনার মতোই ঠেকছিল।

    ক্ষণিকের বিহ্বলতা কাটিয়ে নিজেকে সামলে নিল সোম। দেরি না করে নিজের বন্দুক বের করে পুরো ম্যাগাজিন সে খালি করে দিল দানবটার ওপরে। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হল না। লিওনার্ডকে এক ঝটকায় ছিটক ফেলে দানবটা ঢুকল ঘরের মধ্যে। শ্যামাই যে তার লক্ষ্য— এ-কথা বুঝতে দেরি হল না সোমের। কোমর থেকে রূপোর বড়ো ছুরিটা বের করে সে সজোরে গেঁথে দিল দানবটার শরীরে। তাতে ভ্রূক্ষেপও করল না সে। বরং সোমকেও একপাশে প্রায় ছুড়ে দিয়ে দানবটি এগিয়ে গেল শ্যামার দিকে।

    অমিয়ভূষণ মেয়েকে পেছনে ঠেলে সরিয়ে নিজে এগিয়ে এলেন সেই দানবের সামনে। তীব্র আক্রোশে তাঁকে জাপটে ধরল সেই দানব। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় তিনি চিৎকার করে উঠলেন। মনে হল, যেন তাঁর শীর্ণ শরীরের প্রতিটি পেশি ও অস্থি ছিন্ন করে দিতে চাইছে ওই দানব।

    যন্ত্রণায় নয়, বরং অসহায়তার জন্যই সোমের চোখের সামনে একটা কালো পর্দা নেমে আসতে চাইছিল। ঘোলাটে চোখে সে দেখল, অমিয়ভূষণকে দূরে ছুড়ে দিয়ে সেই দানব শ্যামার কাছে পৌঁছে গেল। তখনই পেছন থেকে ছুটে এসে পবিত্র জলের গোটা পাত্রটা সেই দানবের মুখে সজোরে ছুড়ে দিলেন লিওনার্ড।

    এইবার কিছুটা কাজ হল। অদ্ভুত স্বরে আর্তনাদ করে উঠল সেই জীবটি। তার মুখ দিয়ে ধোঁয়া বেরোতে শুরু করল।

    “কুইক সোম! তোমাকে এখনই উঠতে হবে। আমাদের হাতে সময় খুব কম।” প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে সোমকে সোজা করে তুলে ধরলেন লিওনার্ড। তার হতভম্ব দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে দাঁতে-দাঁতে চেপে লিওনার্ড বলে উঠলেন, “বাইরে আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। এই মুহূর্তেই তুমি অমিয়বাবু আর শ্যামাকে নিয়ে নৌকাতে চাপো।”

    “আর আপনি?” অস্ফুট স্বরে প্রশ্ন করল সোম।

    “আমি একে সামলাব। তোমরা দিব্যানন্দের কাছে যাও। উনি ঠিক কিছু একটা উপায় বের করবেন।”

    অমিয়ভূষণের জ্ঞানহীন দেহ আর শ্যামা’র প্রায় অজ্ঞান শরীরকে কোনোরকমে সোজা করে দাড় করাল সোম। তাদের প্রায় ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিলেন লিওনার্ড। মৃদু হেসে বললেন, “পরমপিতা চাইলে আমাদের আবার দেখা হবে।”

    ততক্ষণে দানবটি আবার নিজেকে সামলে উঠে পড়েছিল। সে আবার ছুটে আসছিল ওদিকেই।

    “হে ঈশ্বর! জীবনে যদি এতটুকু পুণ্য করে থাকি, তাহলে এই দানব যেন আমার বন্ধনী আজ ছিন্ন না করতে পারে!” এই বলে লিওনার্ড নিজের গলার রুপোর ক্রশ- লাগানো বড়ো মালাটা ল্যাসো ছোড়ার মতো করে ছুড়ে দেন দানবটির দিকে। নিজের অজান্তেই ওটা গলায় পরে রুদ্ধকণ্ঠে গর্জন করে ওঠে দানবটি।

    সোম তখন ঠেলা, টানা, ধাক্কা— সব কিছু প্রয়োগ করে অমিয়বাবু আর শ্যামাকে নিয়ে ডিঙিতে বসে নদীতে ভেসে পড়েছে।

    .

    ।। ১৬।।

    দিব্যানন্দের আশ্রমে

    তুষারে ভরে আছে চারপাশ। যতদূর চোখ যায়, ঝুরঝুরে সাদা বরফে দিগন্ত ঢাকা। কেউ কোথাও নেই।

    ‘কী আশ্চর্য! এখানে কী করে এলাম?’ গায়ে লেগে থাকা বরফ পরিষ্কার করতে করতে ভাবছিল সোম।

    “সোম!” দূর থেকে একটা ক্ষীণ ডাক এসে পৌঁছোল সোমের কানে। এ কণ্ঠস্বর সোম চেনে! ফাদার লিওনার্ড ডাকছেন। কিন্তু কোথায় তিনি? গলার স্বর লক্ষ করে সোম দেখতে পেল, বহুদূরে সাদার মধ্যে কালো এক বিন্দুর মতো দাঁড়িয়ে আছেন ফাদার।

    “ফাদার, আপনি ওখানে কী করছেন?”

    “আমার এখানে কাজ শেষ হয়েছে সোম।”

    “মানে? কোন কাজ? আপনি ওখানেই থাকুন। আমি আসছি ফাদার!”

    ঝুরঝুরে বরফের মধ্যে দিয়ে দৌড়োনো অসম্ভব। তবু যথাসম্ভব দ্রুত দূরত্বটা পার হওয়ার চেষ্টা করছিল সোম। সে বুঝতে পারছিল, কিছু একটা বিশাল গণ্ডগোল হয়ে গেছে। কিন্তু সেটা কী?

    এই প্রবল শীতের মধ্যেও ঘামতে শুরু করল সোম। দমে ঘাটতি দেখা দিল। বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছিল। কিন্তু তার যাবতীয় শ্রম বিফলে যাচ্ছিল। বরফের স্তর ভেঙে সে যতই এগিয়ে যাক, লিওনার্ড আর তার মধ্যে দূরত্ব যেন কিছুতেই কমছিল না। লিওনার্ড এগিয়ে যাচ্ছিলেন সমানতালে।

    “ফাদার, আপনি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করছেন?” চিৎকার করে উঠল সোম।

    “আমাদের সম্পর্ক কি রসিকতা করার মতো, সোম?” ফাদারের গলাটা এবার যেন বেশ ক্লান্ত শোনাল।

    “আপনি কী বলছেন, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, ফাদার।”

    “ফিরে যাও সোম। আমাকে এগিয়ে যেতে দাও।”

    “কেন ফাদার?”

    “আমাদের সবার যাত্রা সুনির্দিষ্ট, সোম। এ-কথা তোমারও অজানা নয়। আমার সেই যাত্রা আজ শেষ হয়েছে। এবার আমার ফিরে যাওয়ার পালা। তবে তোমাকে এগিয়ে যেতে হবে। কিন্তু। আমাকে কথা দাও, সোম— আলোর পথ ছেড়ে তুমি বিন্দুমাত্র সরে আসবে না!”

    “সে আমি না হয় আপনাকে কথা দিলাম। কিন্তু এভাবে আমাকে একা ছেড়ে আপনি

    যেতে পারেন না ফাদার!” সোমের গলা ভেঙে এল।

    “ইউ আর অন ইউর ওন, সোম। পরমপিতা তোমার সহায় হোন।”

    “ফাদারররররর!”

    চিৎকারে করে উঠে বসল সোম। এতক্ষণ সে তাহলে সব স্বপ্ন দেখছিল? ধীরে-ধীরে কাল রাতের সব কথা মনে পড়তে থাকল তার। অমিয়ভূষণ, শ্যামা, নীলকুঠির দানব, ফাদার লিওনার্ড!

    কিন্তু সে এখন কোথায়?

    ছোটো একটা দরমার বেড়া দেওয়া ঘর। সেখানে একটা তক্তপোশের ওপর সে শুয়ে ছিল। মাথা এখনও খুব ভার হয়ে ছিল। আরে! তার হাতে-পায়ের ক্ষতগুলোতে জড়িবুটির লেপপটিই বা দিয়েছে কে? সোমের মনের মধ্যে অজস্র প্রশ্ন ভিড় করে আসছিল। কিন্তু তাদের উত্তর দেবে কে?

    বিছানা থেকে উঠতে চাইল সোম। কিন্তু তার শরীর যে কতটা দুর্বল— তা সে এর আগে বুঝতে পারেনি। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল সে।

    “ধীরে বৎস, ধীরে। তোমার এখনও অনেকটা বিশ্রামের প্রয়োজন। চিন্তা কোরো না। তুমি নিরাপদ আশ্রয়েই এসে পৌঁছেছ।”

    সোমের সামনে এসে দাঁড়ালেন শ্বেতবস্ত্র পরিহিত এক ঋষিতুল্য বৃদ্ধ। তাঁর দেহ থেকে যেন একটা দ্যুতি বেরিয়ে আসছিল— ঠিক স্বপ্নে দেখা বরফের প্রাচীরটার মতোই।

    “সুপ্রভাত, আমি দিব্যানন্দ।”

    “আমার নাম রুদ্র সোম। ফাদার লিওনার্ড আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন।”

    “আমি জানি, সোম। অমিয়বাবুর মুখ থেকে আমি সবটা শুনেছি। তোমরা কাল নদী পেরিয়ে এসে সামনের মাঠে জ্ঞান হারিয়ে পড়েছিলে। আমার আশ্রমিকেরা দেখতে পেয়ে তোমাদের নিয়ে এসেছে এখানে।”

    “অমিয়বাবু কেমন আছেন? আর শ্যামা?”

    “সবাই ক্লান্ত, আহত, কিন্তু সুস্থ। ওঁরা পাশের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন। তোমারও বিশ্রামের খুবই প্রয়োজন।”

    “কিন্তু মহারাজ, ফাদার কোথায়?”

    “তুমি অত্যন্ত সাহসিকতার কাজ করেছ, সোম। ওই বিপদের মধ্যে, যেভাবে মাথা ঠান্ডা রেখে তুমি দু’জন শরণাগতকে নিয়ে এখানে এসেছ, তাতে ফাদার তোমার কাজে খুবই খুশি হবেন।”

    সোম বুঝতে পারল, দিব্যানন্দ কিছু একটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

    “আমাকে দয়া করে সত্যি কথাটা বলুন, মহারাজ। ফাদারের কী হয়েছে? উনি ফিরে এসেছেন তো?”

    একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন দিব্যানন্দ, “অমিয়ঠাকুরের মুখে সব শুনে আমি লোক পাঠিয়ে ছিলাম নদীর ওপারে। কিন্তু নীলকুঠির মধ্যে কাউকে পাওয়া যায়নি, সোম— না সেই দানব, না বন্ধুবর লিওনার্ড। সবাই যেন কপূরের মতো উবে গেছে।”

    সোম বুঝতে পারল, বহুবছর বাদে তার যেন হঠাৎ করে খুব কান্না পাচ্ছে। দুপুরে ভাত-ঘুমের পর খারাপ স্বপ্ন দেখে উঠে বসলে অনেকসময় এ-রকম হত। তখন বাবা এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলত, ‘কাঁদছিস কেন পাগল? এই তো আমি!’ এখন সেই কথাটা কে বলবে?

    সোমের মনের ভাব বুঝতে পারলেন দিব্যানন্দ। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “দুঃখ কোরো না, সোম। সবার যাত্রা সুনির্দিষ্ট; সবার সময়ও তাই। তবে আমি লিওনার্ডকে চিনি। ও অন্ধকার থেকে ঠিক আলোর পথ ধরে ফিরে আসবে কোনোদিন।”

    সোমের মাথায় আলগোছে হাত রাখলেন দিব্যানন্দ। একটু শান্ত হলে তিনি বললেন, “তুমি এখন বিশ্রাম করো। আমাকে কিছু কাজ করতে হবে।”

    “কী কাজ, মহারাজ? আমাকে বলুন, যদি কিছু সাহায্য করতে পারি।”

    “তুমি পারবে না, বাবা। এই কাজ আমাকেই করতে হবে। অমিয়ঠাকুরের কাছে যা শুনেছি তাতে এটুকু বুঝেছি যে কোনো এক প্রচণ্ড শক্তিশালী অঘোরীর বিরুদ্ধে লড়তে হবে আমাদের। কতটা সফল হব এ ব্যপারে, তা আমি নিজেও জানি না। যিনি অঘোরী, তিনিই তো ব্রহ্ম, তিনিই রুদ্র। তাঁকে আর আটকাব কী করে?”

    “তাহলে উপায়, মহারাজ? আমাদের এত চেষ্টা, ফাদারের আত্মবলিদান— সবই কি ব্যর্থ হবে?”

    চেষ্টা তো করতেই হবে। অমিয়ঠাকুরকেও বলেছি, তোমাকেও বলছি, মদনমোহনকে স্মরণ করো। রুদ্র শিবের তেজ নারায়ণই পারেন শান্ত করতে।” মৃদু হেসে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন দিব্যানন্দ।

    বিছানায় তার শরীরটা শুয়ে থাকলেও সোমের মন সেই মুহূর্তে ছিল উত্তাল সাগরের মতো। সে জানত, শুধু প্রার্থনার ওপর নির্ভর করে নিশ্চেষ্ট হয়ে সে থাকতে পারবে না।

    ।।১৭।।

    জমিদারের প্রত্যাবর্তন

    দিব্যানন্দ ঠাকুরের কঠোর বারণ সত্ত্বেও সোম উঠে পড়ল বিছানা থেকে। সে আর নিজেকে শান্ত রাখতে পারছিল না। অদ্ভুত একটা অস্থিরতার আগুন যেন ধিকিধিকি জ্বলে গ্রাস করছিল তাকে।

    ঘরের বাইরে বেরিয়ে সোম দেখল, পাশাপাশি আরো চারপাঁচটা কুটির, একটা ছোটো বাগান, সবজি খেত, ছোটো একটা গো-শালা, হরিমন্দির— সবমিলিয়ে বেশ সাজানো- গোছানো একটা গ্রাম্য আশ্রম। বেলা পড়ে আসছিল। সেই লালচে কমলা আলোয় পরিবেশটা খুব সুন্দর লাগছিল। সে মেনে নিল, ফাদার ঠিকই বলেছিলেন; আশ্রমের প্রতিটি জিনিসে দিব্যানন্দ ঠাকুরের রুচি আর পরিশ্রমের ছাপ স্পষ্ট।

    আশ্রমের মাঝখানে একটা বিশাল বটগাছ ছিল। তার গম্ভীর ঝুরি নেমেছে চারদিকে ঠিক তার তলায় একটা বাচ্চা মেয়ে খেলছিল আপন মনে।

    আরে! ওটা শ্যামা না? দ্রুত পায়ে সোম সেদিকে এগিয়ে গেল।

    কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী রে শ্যামা! ঘুম হয়েছে তোর? খেয়েছিস কিছু?”

    শ্যামা শুধু মাথা নাড়ল; উত্তর দিল না। সোম ভাবল, পোড় খাওয়া লড়াকু হয়েও কাল রাত থেকে দেখা ওই ঘটনাগুলো তাকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। শ্যামা’র মতো একটি শিশুর কী অবস্থা হতে পারে? ওর মাথায় হাত বুলিয়ে সোম এগিয়ে গেল। বটগাছ থেকে খানিকটা দূরেই অমিয়ভূষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। একদৃষ্টিতে তিনি কী যেন একটা দেখছিলেন। “কী দেখছেন অমিয়বাবু?”

    অমিয়বাবু মৃদু হেসে আঙুল তুলে সামনের দিকে দেখিয়ে দিলেন। সেখানে, ধ্যানের মুদ্রায় বসে দিব্যানন্দ একটা মন্ত্রপাঠ করছিলেন। সোমকে দেখতে পেয়ে দিব্যানন্দ চোখের ইশারায় অপেক্ষা করতে বললেন। সোম মন দিয়ে মন্ত্রটা শুনল—

    “ওঁ ক্লীং হ্রীং কুরু কুরু পুরু পুরু দম্ভেবরি আগচ্ছ
    আগচ্ছ অবতর অবতর ইন্দু মিন্দু ইন্দুলি মিন্দুলি
    ভীরুণ্ড বন্দ দান বন্দ দৈত্য বন্দ কাল বন্ধ প্ৰেত বন্দ
    যক্ষিণী বন্দ ডাকিনী বন্দ ভূত বন্দ পিশাচ বন্দ বাণ
    বন্দ কৃত্য বন্দ তাল বন্দ শাকিনী বন্দ ডাকিনী বন্দ
    দশ দিশা বন্দ আকাশ বন্দ পাতাল বন্দ হস্ হস্
    কহ কহ সর্ব বন্দং হুং স্বাহা।।”

    মন্ত্রপাঠ শেষ করে দিব্যানন্দ বললেন, “সোম, এটা ভূতাদিরা শরীর বন্ধন মন্ত্র। এই মন্ত্র ১০৮ বার পাঠ সম্পন্ন করে, আবাসের চতুর্দিকে সাতবার গণ্ডি দিতে হবে। এই প্রকার গণ্ডি দিলে সেই গণ্ডির মধ্যে, বিশেষত সেই আবাসে যে ব্যাক্তি অবস্থিতি করবে, তাকে ভূত, প্রেত, দৈত্য, দানব, পিশাচ, বেতাল, যক্ষিণী, ডাকিনী, যোগিনী— এরা কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। আমি আশ্রম বন্ধন করছি। পরবর্তী পরিস্থিতি বুঝে কর্মপদ্ধতি স্থির করার জন্য আমার কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। এদিকে বেলাও পড়তে শুরু করেছে। অন্ধকার নামার আগেই কাজটা শেষ করতে হবে।”

    “এতে কি আর অঘোরীকে আটকানো যাবে?”

    অমিয়ভূষণের কণ্ঠে উপহাসের সুর শুনে সোম অবাক হল। ভীত, সন্ত্রস্ত এই মানুষটি এক রাতের মধ্যে এমন বদলে গেলেন কীভাবে? আশ্রমের আলোকজ্জ্বল নিরাপদ পরিবেশের প্রভাব? নাকি দীর্ঘদিন অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকার অসহায়তা মানুষটির মধ্যে চাপা ক্রোধের জন্ম নিয়েছে?

    দিব্যানন্দ মুচকি হেসে অমিয়ভূষণের কথাটা উড়িয়ে দিলেন, “চেষ্টা করেই দেখা যাক না, অমিয়ঠাকুর। অঘোরীকে আটকাতে না পারি, তার চ্যালা-চামুণ্ডাদের আসা তো আটকাতে পারব— অবশ্য যদি না ইতিমধ্যে তারা প্রবেশ করে গিয়ে থাকে!”

    দিব্যানন্দ ঠাকুরের দীর্ঘশ্বাস সোমের নজর এড়ায়নি। সে প্রশ্ন করল, “ইতিমধ্যে! আপনি কী বলতে চাইছেন, মহারাজ?”

    “তেমন কিছু না, সোম। তুমি অযথা চিন্তা করবে ভেবে তোমাকে আগে বলিনি তোমরা এখানে আসার কিছুক্ষণ পরে আমার বহুদিনের পোষা তোতাপাখিটি মারা গেছে।”

    “কিন্তু তাতে কী প্রমাণ হয়, মহারাজ?”

    “তোতাটাকে আমি বেনারস থেকে এনেছিলাম। সে স্পষ্ট কথা বলতে পারত। তোমাদের কাছে অদ্ভুত লাগলেও ব্যাপারটা সত্য। সে যা অনুভব করত, মুখে স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতে পারত। কাল রাতেও সে খাবার খেয়েছে আমার হাতে, আমার সঙ্গে কথাও বলেছে। আজ অনেকক্ষণ ধরে কোনো ডাকাডাকির আওয়াজ না পেয়ে আমি খাঁচার কাছে গিয়েছিলাম। দেখি, সে আর নেই! আমার এতদিনের প্রাণচঞ্চল পোষ্য মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে; খাঁচার তারে রক্তের ছাপ।”

    দিব্যানন্দের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে সোম আর কথা বাড়াল না। তার নিজেরই মাথার ঠিক ছিল না। দিব্যানন্দও আশ্রম বন্ধনের কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন।

    কিছুক্ষণ পর হঠাৎ আশ্রমে ঢোকার মুখে কোলাহল শোনা গেল। “কীসের গোলমাল, মহাদেব?” দিব্যানন্দ উচ্চস্বরে প্রশ্ন করলেন।

    “দেখুন না প্রভু! কারা যেন এসে জোর ঢুকতে চাইছে।”

    সোম সজাগ হয়ে উঠলেন। সন্ধে নামার মুখে কারা করে আশ্রমে ঢুকতে চাইছে? তবে কি সেই দানব ফিরে এল? নিজের কোমরে আটকানো পিস্তলটা শক্ত করে চেপে ধরল সোম।

    এ কী!

    মানুষটির বেশভূষা দেখে বেশ ভদ্র ও অবস্থাম্পন্ন মনে হয়। কিন্তু তার এমন ভগ্নদশা কে করেছে? দেখে মনে ভদ্রলোকের এক দুর্যোগের ঝড় বয়ে গেছে।

    “ওই গণ্ডি যখন অতিক্রম করতে পেরেছে এ আর যাই হোক, আমাদের বিপদের হতে পারবে না। মহাদেব, ওঁকে দাও।”

    “শ্যামা! মা রে, তুই কেমন আছিস? তোর হয়নি তো?”

    সেই ভদ্রলোক মহাদেবের বেষ্টনী পেরিয়ে পাগলের মতো ছুটে এসে শ্যামাকে জড়িয়ে ধরলেন। তার গালে-মাথায় চুমু খেয়ে তিনি হাউ-হাউ করে কেঁদে ফেললেন, “ক্ষমা করিস, মা! আমাকে ক্ষমা করিস। আমি চরম অন্যায় করেছি তোর সঙ্গে আর অমিয়ঠাকুরের সঙ্গে।”

    শ্যামাকে ছেড়ে গিয়ে অমিয়ভূষণের পায়ে পড়লেন সেই ব্যাক্তি। লাফিয়ে পিছিয়ে গেলেন অমিয়ভূষণ। বলে উঠলেন, “এ কী করছেন, জমিদারবাবু! আমার পাপ হবে যে।”

    “আমাকে ক্ষমা করুন, ঠাকুরমশাই। আমি চরম পাপ করেছি।”

    “এসব তুমি কী বলছ, দীপকাকা?” শ্যামা সেই ভদ্রলোকের গাল বেয়ে নেমে আসা চোখের জল মুছে দিল।

    এই প্রথম শ্যামাকে কথা বলতে শুনে সোমের মনে হল, অবশেষে মেয়েটা স্বাভাবিক হচ্ছে। কিন্তু এই ভদ্রলোক কে? তিনি এ-রকম পাগলের মতো আচরণই বা করছেন কেন? এর ব্যাপারে তো অমিয়ভূষণ কিছু বলেননি।

    “আমাকে বলতে দে, মা। আমার পাপের শাস্তিও পেতে শুরু করেছি, জানিস! তোর বোনটা আর নেই। দু-দিনের জ্বরে আমার মেয়ে মারা গেছে। শুধু আমার পাপের ফলে মেয়েটা এই অকালে চলে গেল। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি ঠাকুরমশাই। অন্যের বলিদান দিয়ে নিজেকে কখনও রক্ষা করা যায় না। ভৈরব বাবার মতো লোকেরা বিষাক্ত সাপের মতো, এদের সঙ্গে আর যাই হোক চুক্তি করা চলে না।”

    কথা বলতে-বলতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন মানুষটি। অমিয়ভূষণ আর শ্যামা— দু’জনের মিলিত চেষ্টাতেও তিনি শান্ত হচ্ছিলেন না।

    “আপনি যদি এই বিষয়ে কিছু জানেন, তাহলে আমাদেরকে সব খুলে বলুন। সঠিক তথ্য না পেলে শ্যামাকে আমরা বাঁচাতে পারব না।” দিব্যানন্দ গম্ভীরভাবে বললেন।

    “বলব। সব বলব আজ যাতে আর কোনো মেয়ের বাপকে আমার মতো জ্বলে-পুড়ে মরতে না হয়। আমার নাম দীপেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার। আমি বাহাদুরপুর গ্রামের জমিদার।”

    .

    ।। ১৮।।

    সুজাতা’র স্বপ্ন

    ঝনঝন শব্দে ভাঙা কাচের টুকরোগুলো ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে।

    “হা ঈশ্বর! এতদিনের সাধের আয়নাটা ভেঙে গেল! এ কোন অমঙ্গলের আভাস তুমি দিলে ঠাকুর?” মনে মনে বিড়বিড় করে উঠলেন সুজাতা। আজ দীপেন্দ্রনারায়ণকে যে করে হোক আটকাতেই হবে। সুজাতা ছুটে গেলেন বৈঠকখানায়।

    “শুনছেন, আজ কি না বেরোলেই নয়? হাত থেকে আয়নাটা পড়ে ভেঙে গেল এইমাত্র।”

    “কেন এমন কথা বলছ? প্রতিমাসের এই দিনটার কথা তো তোমার অজানা নয়।”

    “আমি আপনাকে শিকার করতে যেতে বারণ করছি না। শুধু আজ যেতে বারণ করছি।”

    “সেটা আর সম্ভব নয় সুজাতা। শহর থেকে বন্ধুরা সব এসে গেছেন। নায়েবমশাই লোকলস্কর প্রস্তুত করে ফেলেছেন। এমনকি নয়াচরের ধারে তাঁবুও ফেলা হয়ে গেছে। এতসব উদ্যোগ তো সামান্য একটা দুর্ঘটনার জন্য নষ্ট করে দেওয়া যায় না। আর তাছাড়া তুমি তো জানোই, আমি ও-সব কুসংস্কার একেবারেই মানি না। আমি চাইব, আমার স্ত্রী হিসাবে তুমিও যেন এ-সব কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে থাক।”

    “শুধু আয়নার জন্য আমি এ-কথা বলছি না।” অনুনয়ের সুরে বললেন সুজাতা, “ভোররাতের একটা বিশ্রী স্বপ্নও…”

    “থাক! আমি এই ব্যাপারে আর কোনো কথা বলতে চাইছি। না।” সুজাতাকে কথার মাঝেই থামিয়ে দিলেন দীপেন্দ্রনারায়ণ। তারপর দোনলা বন্দুকটা হাতে নিয়ে হুঙ্কার দিলেন, “এই, কে আছিস? শিকারের পোশাক বার কর। ভালো করে আমার জুতো পালিশ কর— যেন মুখ দেখা যায়।”

    হাল ছেড়ে দিলেন সুজাতা। দীপেন্দ্রনারায়নকে বোঝাবে কার সাধ্যি? উনি নিজে যেটা বুঝবেন, সেটাই করবেন। এখন জমিদারির খুব একটা অবশিষ্ট না থাকলেও মেজাজটা সেরকমই ধরে রেখেছেন। প্রতিমাসের শুক্লপক্ষ তিথিতে নয়াচর বিলে নিশাচর পাখি শিকার করার নামে শহর থেকে একদল লোক হুল্লোড় করতে এই বাহাদুরপুরের অজপাড়াগাঁয় আসেন। দীপেন্দ্রনারায়ণ তাঁদের নিজের কলেজ জীবনের বন্ধু বললেও সুজাতা জানেন, তাঁদের এখানে আসার পেছনে বন্ধুত্বের কোনো টান নেই। বরং শহুরে একঘেয়েমিকে বিনামূল্যে দূর করার জন্য তাঁরা দর্পনারায়ণের কাঁধে বন্দুক রাখেন। সেজন্যই এক রাতে পাখি শিকার ক’টা হয়— তাই নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়। তবে নয়াচর বিলের ধারে মখমলি তাঁবুর পাশে মদের আর উচ্ছিষ্ট মাংসের একটা বড়ো স্তূপ থাকেই।

    সুজাতা তাঁর স্বামীকে এই কথাটা অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু জমিদারি মেজাজ বলে কথা! তাই সুযোগ পেলেই অতীতের গৌরব শহুরে বন্ধুদের চোখের সামনে তুলে ধরতে নিজেকে প্রায় কপর্দকশূন্য করে ফেলেন দীপেন্দ্রনারায়ণ। শুধু বৃদ্ধ, বিচক্ষণ নায়েব নিশিকান্ত আছেন বলেই আজও নিজের পূর্বপুরুষের খামখেয়ালি কিছুটা হলেও ধরে রাখতে পেরেছেন দীপেন্দ্রনারায়ণ।

    সুজাতা পুজোর ঘরে চললেন। একমাত্র মুরারিমোহনই পারেন তাঁর মনের অস্থিরতা দূর করতে।

    ভোররাতে বিশ্রী একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন সুজাতা। সেই স্বপ্নে দীপেন্দ্রনারায়ণ নয়াচর বিলের পাশ দিয়ে একা ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছিলেন। পূর্ণিমার আলোয় দীপেন্দ্রনারায়ণের প্রিয় ঘোড়া তুফান একটা সাদা ঝড়ের মতোই এগোচ্ছিল। হঠাৎ জমাট বাঁধা কালো ছায়ার মতো একটা লোক দীপেন্দ্রনারায়ণের যাত্রাপথে দাঁড়িয়ে দু-হাত তুলে তাঁকে এগোতে বারণ করল। কিন্তু তুফানের গতিতে মত্ত দীপেন্দ্রনারায়ণ থামার চেষ্টাই করলেন না। তিনি তীব্র বেগে সেই লোকটার উপর দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে দিলেন। লোকটা ছিটকে গিয়ে পড়ল বালির উপরে।

    হুঁশ ফিরে পেয়ে দীপেন্দ্রনারায়ণ ঘোড়া থামিয়ে পিছনে ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গেছে। লোকটার একটা চোখ ঘোড়ার খুরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছিল। সেখান থেকে কালো রক্তের ধারা বেরিয়ে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছিল নয়াচরের শুকনো বালি।

    “তুই আমার কথা শুনলি না তো! মরবি। তুই মরবি!” পাগলের মতো হাসতে শুরু করেছিল সেই লোকটা। ঘুম ভেঙে গেছিল সুজাতার।

    তখন থেকেই তাঁর মনটা কেমন হয়ে গেছিলো। হাজার হোক, ভোররাতের স্বপ্ন বলে কথা! তার ওপরে এতদিনের সাধের আয়না আজই ভাঙল।

    “হে মুরারি, আমার স্বামীকে তুমি রক্ষা কোরো। তুমিই আমার ভরসা, প্রভু।” হাতের শাঁখা-পলা সিঁথির সিঁদুরে ঠেকিয়ে সর্বশক্তিমানের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালেন সুজাতা।

    .

    ।। ১৯।।

    নয়াচরের রাত

    নয়াচরের মরা গাঙে জোছনার যেন বান দীপেন্দ্রনারায়ণের মনে হচ্ছিল, সহস্র বছর ধরে বালির নীচে ডেকেছিল। চাপা পড়ে থাকা ইতিহাস যেন বাতাসের তোড়ে যেকোনো মুহূর্তে জেগে উঠতে পারে। স্তব্ধ হয়ে বসে প্রকৃতির সেই অপূর্ব রূপ প্রত্যক্ষ করছিলেন তিনি।

    সেদিন শিকার বেশ ভালোই হয়েছিল। আসরও জমে টইটম্বুর— তাঁবুর ভেতরে ছড়িয়ে থাকা মাংসের হাড় আর পানীয়র বোতল সেটাই স্পষ্ট করে দিচ্ছিল। সবাই গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন; শুধু একা জেগে রয়েছেন দীপেন্দ্রনারায়ণ। তিনি কোনোকালেই পানীয় স্পর্শ করেননি। সত্যি কথা বলতে কি, শুধুমাত্র কলেজের বন্ধুদের সামনের নিজের পরিবারের অতীত গৌরব বজায় রাখতেই প্রতিবার এই শিকারের ব্যাপারে সায় দেন তিনি। সবই তো ওই মরা গাঙের বালির নীচে চাপা পড়ার মতো করে হারিয়ে যাচ্ছে। এই একটা রাজকীয় ঐতিহ্য অন্তত বজায় থাকুক। সুজাতার বিশ্বাসে তিনি আঘাত দিতে চাননি। কিন্তু এই একটা কার্যক্রম থেকে পিছিয়ে আসা তাঁর পক্ষে অসম্ভব।

    হঠাৎ একটা মৃদু গোঙানি ভেসে আসে দীপেন্দ্রনারায়ণের কানে। এ তো কোনো বাচ্চার গলা বলে মনে হচ্ছে! এত রাতে এই চরে কোনো বাচ্চা কী করছে?

    পূর্ণিমার আলোয় বহুদূর অবধি স্পষ্ট দেখা যায়। শব্দের উৎস অনুমান করে তাঁবু থেকে দূরবীন এনে তাতে চোখ রাখলেন দীপেন্দ্রনারায়ণ। ওই তো! দূরের পশ্চিমপারের চরে কিছু যেন নড়ছিল তখন। আবার গোঙানির শব্দ ভেসে এলঅবিকল যেন কোনো বাচ্চার গলা।

    আর দেরি করলেন না দীপেন্দ্রনারায়ণ। লেঠেল সর্দারকে ধাক্কা দিয়েও তোলা গেল না— পানাহারের ধাক্কায় তার এমনই দশা হয়েছিল! বন্দুক নিয়ে তিনি নিজেই এগিয়ে চললেন শব্দের দিকে।

    “ভৈরব বাবা, এত লোক থাকতে এই বাচ্চা মেয়েটাই কেন?”

    “প্রশ্ন করে সময়ের অপব্যয় করিস না পেল্লাদ। মুখ বন্ধ করে চুপচাপ চল। বাতাসেরও কান আছে। কে কোথায় দেখে ফেলবে, বেঘোরে মরবি যে!”

    চাঁদের আলোয় দুটো মূর্তিকেই ঘন কালো দেখাচ্ছিল। চোরের মতো করে তারা কাঁধে বস্তা জাতীয় কী যেন একটা বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।

    “কুপিত হবেন না, প্রভু। এত বছর আপনার সঙ্গে আছি। আমারও তো মনে কিছু প্রশ্ন জাগতে পারে।”

    “মূর্খ! এত বছরের সাধনায় আমি নিজেই তল পেলাম না এখনও। আর এই সময়েই তোর মনে এত ‘জানার ইচ্ছে’ জাগল!”

    “অনুগ্রহ করুন, প্রভু। এত লোক থাকতে এই মেয়েটাকেই কেন চুরি করে আনালেন আমাকে দিয়ে?”

    “এই মেয়েটি অত্যন্ত সুলক্ষণা। বহুযুগের সন্ধিক্ষণে এ-রকম সুলক্ষণযুক্ত মেয়ের জন্ম হয়। একে দেবীই বলা চলে। এর উপরে বহুলোকের নজর আছে— আমারও ছিল। আজ সুযোগ বুঝে তুলে নিলাম। আমার সাধনা সম্পূর্ণ হতে একে চাই-ই চাই!”

    “আচ্ছা প্রভু, আমিও সাধনা করতে পারব আপনার মতো?”

    “তুই করবি সাধনা!” অতি কষ্টে অট্টহাসির ইচ্ছে দমন করেন ভৈরব, “ওরে নরকের কীট, শুনে রাখ, পুরশ্চরণসম্পন্নো বীরসিদ্ধিং সমাচরেৎ, পুত্রদারাধনস্নেহ লোভমোহবিবর্জিত’। অর্থাৎ, পুরশ্চরণসম্পন্ন যে সাধক স্ত্রী-পুত্রের স্নেহে আসক্ত নন এবং ধন সম্পদের মোহ যার নেই, তিনিই এই সাধনার অধিকারী। তুই করবি সাধনা! আমার উচ্ছিষ্ট চেটে বেঁচে আছিস, ওটাই থাক, বেশি উড়তে যাসনি।”

    “এই, কে তোরা? এখানে কী করছিস এত রাতে?” বাঘের মতো অতর্কিতে ছায়ামূর্তি দুটোর সামনে এসে দাঁড়ালেন দীপেন্দ্রনারায়ণ। ছায়ামূর্তি দুটো তাঁকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল।

    “কী হল? কথার জবাব দিচ্ছিস না কেন? কী আছে তোদের ওই বস্তার মধ্যে? বস্তা নীচে রাখ। খুলে দেখা, কী আছে এর মধ্যে।”

    “কাজটা তুই ভালো করছিস না, আমাদের যেতে দে!” গর্জে ওঠে এক ছায়ামূর্তি!

    “চোপ, তোর এতো বড়ো স্পর্ধা? আমি বাহাদুরপুরের জমিদার দীপেন্দ্রনারায়ণ, আমার অনুমতি ছাড়া এখান থেকে এক কণা বালিও তুই নিয়ে যেতে পারবি না! খোল বস্তাটা খোল!” বন্দুকটা বাগিয়ে চিৎকার করে ওঠেন দীপেন্দ্রনারায়ণ।

    উদত্য বন্দুকের নল দেখে কিছুটা কাজ হয়, বস্তাটা নামিয়ে বালির ওপর রাখে তারা। “এবার বস্তার মুখ খোল!”

    দীপেন্দ্রনারায়ণের উদ্যত বন্দুকের সামনে সময় নষ্ট করতে সাহস পায় না দু’জন। তারা নীরবে বস্তার মুখ খোলে।

    এ কী! এ তো একটা বাচ্চা মেয়ে— দুধের শিশু বললেই হয়! একে নিয়ে তোরা কী করতে যাচ্ছিলি, অমানুষের দল?”

    “আমার কথা শোন। বস্তা নিয়ে আমাদের চলে যেতে দে। বিনিময়ে একদিন তোকে রাজা বানিয়ে দেব।”

    “তবে রে শয়তান!” নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না দীপেন্দ্রনারায়ণ। তিনি ট্রিগার টিপলেন। গুলির বিকট শব্দে নয়াচরের নির্জনতা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।

    “কাজটা ভালো করলি না জমিদার। এর প্রতিদান তোকে দিতে হবে।”

    দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলো বলতে-বলতে একজন দৌড়ে অন্ধকারে হারিয়ে গেল। অন্যজন ততক্ষণে লুটিয়ে পড়েছিল বালির মধ্যে। তার নিথর শরীর থেকে বেরিয়ে আসা রক্তের ধারা নয়াচরের জ্যোৎস্না-ধোয়া দুধসাদা বালির সঙ্গে মিশে কালচে দেখাচ্ছিল।

    ।।২০।।

    শেষ অধ্যায়

    “সেদিনের নয়াচরে বস্তার মধ্যে কাঁদতে থাকা ছোট্ট মেয়েটা আর কেউ নয়— আমাদের এই শ্যামা।” এতক্ষণ একটানা বলে দম নেওয়ার জন্য থামলেন দীপেন্দ্রনারায়ণ। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন।

    “আজ পর্যন্ত এই ঘটনার কথা আমি আর সুজাতা ছাড়া আর কেউ জানতে পারেনি। তবে প্রথম অপরাধ আমি সেই রাতেই করেছিলাম। শ্যামাকে নিজের কাছে না রেখে, সুজাতার কথায়, তাকে মদনমোহনের মন্দিরের চাতালে শুইয়ে রেখে এসেছিলাম। আমার স্থির বিশ্বাস ছিল, অমিয়ঠাকুর ওকে বাপের ভালোবাসাই দেবেন। তিনি পেরেছিলেন। আমি কিন্তু ভালো বাবা হয়ে উঠতে পারিনি। আমার বোঝা উচিত ছিল, সেই রাতে বন্দুকের সামনে পালিয়ে যাওয়া ছেলেধরা নিতান্ত সামান্য লোক ছিল না। পরে সে-ই ভৈরব বাবা হয়ে ফিরে এসেছিল আমাদের সবার জীবনে।”

    “জমিদারবাবু, ভৈরব কবে যোগাযোগ করেছিল আপনার সঙ্গে?” সোম প্রশ্ন করে।

    একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে দীপেন্দ্রনারায়ণ বললেন, “ভৈরব কীভাবে শ্যামার খোঁজ পেল, তা আমি জানি না। এক দূত মারফৎ সে আমাকে গ্রামের বাইরে ডেকে পাঠিয়েছিল আমি বাধ্য হয়েছিলাম যেতে। তার একটাই কারণ ছিল। সেসময় আমার এমন অবস্থা ছিল যে ‘না’ বলার কোনো উপায় ছিল না।

    মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষ্যে আমি এক বিরাট ভোজের আয়োজন করেছিলাম। বাড়ি ভরতি লোকজন, বাইরে-ভেতরে পাহারা— তারই মধ্য থেকে আমার মেয়ে যেন কপূরের মতো উবে গেল! ভৈরবের দূত জানিয়েছিল, তার সঙ্গে দেখা করলেই আমি আমার মেয়েকে ফেরত পাব। ভৈরবের সামনাসামনি হতেই সে আমাকে সব কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল। সে বলেছিল নয়াচরের রাতের কথা; বলেছিল শ্যামার কথা! ভৈরবের সেই ভয়ংকর রূপ আর ক্ষমতা দেখে আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম। সে আদেশ দিয়েছিল, যে করে হোক শ্যামাকে তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। না হলে সে আমার মেয়েকে অক্লেশে মেরে ফেলবে! এরপরেই আমি ভৈরবের ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়লাম।”

    “বাহ্! তাই আপনি পরিকল্পনা করে সবটা করলেন, তাই না? আমার মেয়েকে রাত করে বাড়ি পাঠিয়ে তার শরীর খারাপ করালেন। আবার নিজেই তাকে সারানোর নাম করে ভৈরবের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। এখন আবার এখানে কী জন্য এসেছেন? আমাদের বাপ-বেটির আর কী সর্বনাশ করা বাকি আছে আপনার?” এতক্ষণে চিৎকার করে উঠলেন অমিয়ভূষণ। উত্তেজনায় তিনি কাঁপছিলেন।

    “আমি জানি, ঠাকুরমশায়। যে দোষ আমি করেছি, তার কোনো ক্ষমা নেই। সব ছেড়ে এসেছি শুধু এটা দেখার জন্য যে আপনি আর শ্যামা ঠিক আছেন কি না।”

    ‘কী করে ভাবলেন যে এত কিছুর পর আমরা আপনাকে আবার বিশ্বাস করব? ভৈরবের হয়ে তার অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে আপনি আসেননি এমন ভরসা করি কী করে?”

    “আমি কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে আসিনি। শুধু চেয়েছিলাম সত্যিটা জানিয়ে দিয়ে ভৈরবের হাত থেকে তোদের রক্ষা করতে। আমার মেয়েকে হারিয়েছি। শ্যামাকে হারাতে চাই না।” শ্যামাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন দীপেন্দ্রনারায়ণ।

    “না।” পাথুরে মুখে বললেন অমিয়ভূষণ, “আপনি ফিরে যান। আমরা আর ওই বাহাদুরপুরের দিকে পা বাড়াব না।”

    “এক মিনিট, অমিয়বাবু।” ঠান্ডা গলায় বলে সোম, “জমিদারবাবু ঠিক কথাই বলেছেন। আপনাদের সবারই বাহাদুরপুরে ফিরে যাওয়া উচিত। ওখানেই আপনি আর শ্যামা সব থেকে বেশি সুরক্ষিত থাকবেন।”

    “মানে! আপনি কি পাগল হয়ে গেলেন, রুদ্রবাবু? যেখানে থেকে আমাদের বাপ- মেয়েকে কুকুরের মতো দূরদূর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বিপদের দিনে– সেখানেই ফিরে যাব আমরা!”

    “হ্যাঁ, ওখানেই আপনারা সবথেকে নিরাপদ থাকবেন বলে আমার বিশ্বাস। পুরো ঘটনাগুলো শুরু থেকে পরপর সাজালে একটা জিনিস কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যায়। ভৈরব অত্যন্ত ক্ষমতাধর হলেও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সে বাহাদুরপুরের সীমানার মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। তাই নিজের ক্ষমতার বদলে প্রতিবারই তাকে বাইরের অনুঘটকের সাহায্য নিতে হয়— কখনও সেটা দূত, আবার কখনও দীপেন্দ্রনারায়ণ।”

    সোম চুপ করে গেল। পুরো আশ্রমজুড়ে অদ্ভুত একটা নীরবতা ছড়িয়ে পড়ল। কথাগুলোর সত্যতা সবার মাথায় ঢুকছিল একটু-একটু করে।

    “আপনার কী মত মহারাজ?” সোম আবার প্রশ্ন করে।

    “কথাটা খারাপ বলোনি সোম। গণ্ডি ইতিমধ্যেই বিঘ্নিত হয়েছে। বাহাদুরপুরেই যেতে হবে আমাদের সবাইকে। হয়তো ভৈরবকে আটকানোর মতো কোনো সূত্র আমরা ওখানেই পেয়ে যাব।”

    “নাহ্।” কঠোর মুখে মাথা নাড়লেন অমিয়ভূষণ, বাহাদুরপুরে আমি আর ফিরে যাব না।”

    “কিন্তু কেন, অমিয়বাবু? আমি থাকব। মহারাজ থাকবেন। জমিদারবাবু নিজে থাকলে বাকি গ্রামবাসীরাও খুব একটা আপত্তি করতে পারবে না। হ্যাঁ, এ-কথা মানছি যে দীপেন্দ্রনারায়ণ চরম অপরাধ করেছেন। কিন্তু তার শাস্তি তো উনি পেয়ে গেছেন। একটা শেষ সুযোগ তো ওঁকে দেওয়াই যায়, তাই না?”

    “তুমি, না তোমার দিব্যানন্দ— কে আটকাবে ভৈরবকে?” হঠাৎ হাসতে শুরু করলেন অমিয়ভূষণ। তারপর একটা ঝটকা দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমিও ক্লান্ত হয়ে পড়েছি খেলতে-খেলতে, বুঝলে সোম। তাছাড়া তোমাদের পেয়ারের জমিদার যখন গল্পের যবনিকা তুলেই দিয়েছে, তখন আর খেলা চালিয়ে কী লাভ?”

    অমিয়ভূষণের চেহারাটা একটু-একটু করে বদলে গেল। ধুতি আর ফতুয়া পরা নিরীহ ব্রাহ্মণের পরিবর্তে দেখা দিল এক জটাজুটধারী, ছাইভস্ম-মাখা বিশাল উলঙ্গ শরীর। তার চোখদুটো যেন লোভ আর ক্রোধের আগুনে ধিকিধিকি জ্বলছিল।

    “ভৈরব বাবা!” অস্ফুটস্বরে বলে উঠলেন দীপেন্দ্রনারায়ণ।

    “হ্যাঁ, আমিই রুদ্র ভৈরব। তোদের এলেম কতদূর—সেটা জানা দরকার ছিল। শুরু থেকেই তোদের ওপর নজর রেখেছিলাম। নীলকুঠির বারান্দায় তুই আর তোর সেই ফাদার তোদের ভূত ধরার খেলনাগুলো দিয়ে আমাকে আটকানোর পরিকল্পনা করছিলি। দিব্যানন্দকে দিয়ে আমাকে মারার ফন্দি আঁটছিলি। সবটাই শুনেছিলাম। চাইলে সেদিনই শ্যামাকে কেড়ে নিয়ে আসতে পারতাম। কিন্তু আমি তোদের মূর্খামির সীমাটা দেখতে চেয়েছিলাম। তাই নীলকুঠির দানব যখন একটু একটু করে তোর ফাদার আর অমিয়ভূষণের প্রাণরস চুষে খাচ্ছিল, আমিই অমিয়ভূষণ সেজে নৌকায় গিয়ে বসেছিলাম। সোম তখন বিভ্রান্ত; নইলে সে হয়তো কিছু বুঝতে পারত।”

    পরপর কয়েকটা গুলির শব্দ হল। প্রচণ্ড আক্রোশে সোম পিস্তলের সব কটা সিলভার বুলেট উগরে দিয়েছিল ভৈরবের ওপর। কিন্তু তাতে কিছুই হয়নি; বরং ভৈরবের অট্টহাসি আরও বেড়ে গেছিল।

    “মূর্খ! তোদের এইসব খেলনা শয়তানের ওপর কাজ করতে পারে। কিন্তু ভগবানের একচুলও ক্ষতি করতে পারবে না এরা। বন্ধ কর তোদের এই ছেলেখেলা।”

    ভৈরবের হাতের ইশারায় একদিকে ছিটকে পড়ল সোম। অসহায়ভাবে সে দেখল, দিব্যানন্দকেও একটা পুতুলের মতো ছুঁড়ে ফেলে দিল কোনো অদৃশ্য শক্তি। যন্ত্রণা আর হতাশায় চিৎকার করে উঠলেন দিব্যানন্দ।

    আশ্রমের বাকি আশ্রমিকেরা এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে সব দেখছিল। দিব্যানন্দের আর্তনাদ দেখে তারা ‘রে-রে’ করে ভৈরবের দিকে ছুটে এল। তখনই হঠাৎ এক ভয়ংকর অগ্নিকুণ্ডলী জেগে উঠল ভৈরবকে ঘিরে। দিব্যানন্দ, সোম, দীপেন্দ্রনারায়ণ আর শ্যামা— এই কটি মানুষ বন্দি হল সেই জ্বলন্ত কারাগারে।

    আশ্রমের বাকিরা সেই অগ্নিকুণ্ডকে অতিক্রম করতে পারছিল না। তারা অসহায়ের মতো বাইরে থেকে দেখছিল ভেতরের ঘটনাক্রম।

    সোম ততক্ষণে মাটি থেকে উঠে পড়েছিল। সে আবার ছুটে গেছিল ভৈরবের দিকে। কিন্তু বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতোই প্রচণ্ড এক ঝটকায় সে আবার আছড়ে পড়ল মাটিতে। পড়ে থাকা একটা গাছের ডাল তার শরীরে গেঁথে গিয়ে ঝরিয়ে দিল রক্ত।

    দিব্যানন্দ একটা মন্ত্র পড়তে শুরু করলেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর শুরু হয়েই স্তিমিতি হয়ে গেল— যেন কোনো অদৃশ্য হাত তাঁর কণ্ঠনালি চেপে ধরেছে।

    ভৈরব ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন শ্যামার দিকে। আবেগবিহ্বল ভঙ্গিতে তিনি বলে উঠলেন, “আয় মা, আয়! তোর জন্য কতকাল ধরে অপেক্ষা করে আছি, জানিস? আমার সাধনা সম্পূর্ণ কর মা। এই পৃথিবীর অধিপতি আমাকে বানিয়ে দে মা!”

    দীপেন্দ্রনারায়ণ ভৈরবের পায়ের ওপরে ঝাঁপ দিয়ে তার দু-পা চেপে ধরতে চেষ্টা করলেন। তাঁর দু-হাতে যেন দাউদাউ আগুন জ্বলে উঠল ভৈরবের সংস্পর্শে আসামাত্র আর্তনাদ করে তিনি ভৈরবের পা ছেড়ে দিলেন।

    নিজের বিশাল হাত বাড়িয়ে শ্যামাকে তখন প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছিল ভৈরব। হঠাৎ সোম ঝড়ের মতো এসে দু’জনের মধ্যে প্রাচীর হয়ে দাঁড়াল।

    “তোর মূর্খামির সীমা নেই, সোম!” ব্যঙ্গভরে বললেন ভৈরব, “বারবার দয়া করে আলতো ছুঁয়ে তোকে ছেড়ে দিচ্ছি। এদিকে তুই মরার জন্য ঘুরে ঘুরে আসছিস! আয়, এবার তোকে তোর ফাদারের কাছেই পাঠিয়ে দিচ্ছি। ও কী? নতুন কোনো খেলনা নাকি ওটা?”

    একটা অদ্ভুত নকশা কাটা লম্বাটে ছুরি ছিল সোমের হাতে। শক্ত হাতে সেটা সে বাগিয়ে ধরেছিল ভৈরবের দিকে।

    “বেশ। মরার আগে শেষ সুযোগ দিচ্ছি তোকে। দ্যাখ, এই দুনিয়ার কোনও ছুরি ভৈরবকে মারতে পারে কি না।”

    ভৈরবের পেটে সজোরে ছুরিটা ঢুকিয়ে দিল সোম।

    “আহহ্!”

    এই প্রথম ভৈরবের মুখ থেকে যন্ত্রণাসূচক একটা শব্দ বের হল। যন্ত্রণার থেকেও বেশি করে তার মুখে ফুটে উঠল অবিশ্বাসের ছাপ। তিনি যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে কোনো ছুরি তাঁর শরীরকে ভেদ করতে পেরেছে। থরথর করে কেঁপে উঠল তাঁর শরীর।

    “ঠিক বলেছিলি, ভৈরব।” সোমের গলা থেকে হিসহিসিয়ে বেরিয়ে আসে শব্দগুলো, “এই দুনিয়ার কোনো ছুরিই তোকে মারতে পারবে না। কিন্তু ভালো করে তাকিয়ে দ্যাখ, তোকে আমি ছুরি মারিনি। ছুরি তো এখনও আমার হাতেই।”

    হতবাক ভৈরব নিজের পেটের দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এ কী! এ তো ছুরি নয়। বরং গাছের একটা শুকনো ডালে জড়ানো একটা ময়ূরের পালক— সেটাই আমূল গেঁথে গেছে তাঁর শরীরে! সেখান থেকে বেরিয়ে আসছে কালচে রক্তের ধারা।

    “ক্ষমতার মোহে তুই অন্ধ হয়ে গেছিলি। নীলকুঠির সব কথা তুই শুনেছিলি। কিন্তু ওই ময়ূরের পালকটা যে অমিয়ভূষণ আমাকে দিয়েছিলেন— এই কথাটাকে তুই গুরুত্বই দিসনি, তাই না?”

    সোমের কথাগুলো আর রুদ্র ভৈরবের কানে পৌঁছোচ্ছিল না। তঁর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শিথিল হয়ে আসছিল। অনেক সাধনা, অনেক জ্ঞান আর ক্ষমতা দিয়ে গড়ে তোলা তাঁর সাম্রাজ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু-পরমাণুতে বিলীন হয়ে যাচ্ছিল।

    চারপাশের অগ্নিকুণ্ড ক্রমশ নিভে আসছিল। সেই ধোঁয়া আর নিভন্ত শিখাদের মধ্য দিয়ে বাইরের দৃশ্য তখনও দেখতে পাচ্ছিলেন ভৈরব। তাঁর চোখে পড়ল, দূরে দাঁড়িয়ে থাকা জটলার মধ্যে খাটো ধুতি-পরা একটা বাচ্চা ছেলেও ছিল; সে মুচকি মুচকি হাসছিল। ভৈরবের হঠাৎ মনে হল, ওই হাসিটা যেন তাঁর বড়ো চেনা। কিন্তু এমন একচোখো কালো ছেলেকে তিনি কোথায় দেখেছিলেন?

    আর কিছু মনে করতে পারলেন না রুদ্র ভৈরব। তাঁর পৃথিবী অন্ধকারে আচ্ছন্ন হল।

    .

    ।। ২১।।

    গল্পটা শেষ করে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন প্রফেসর সোম। বুঝতে পারছিলাম, শ্যামা, অমিয়ভূষণ, ভৈরব – অতীতের সেই বিচিত্র আবর্তে তিনি যেন হারিয়ে গেছেন। ভ্যানে বসে যাওয়ার বাকি সময়টা আমি তাঁকে আর বিরক্ত করিনি। বরং দূরে কালচে সবুজ গাছের ছায়া, পথের পাশে বন্ধ স্কুলের সামনের মাঠে একঝাঁক কিশোরের ফুটবল নিয়ে ছুটোছুটি, ঝুড়িমাথায় হেঁটে যাওয়া এক মেয়ের অবাক দৃষ্টি, দূরে কোথাও খঞ্জনি হাতে একমুখ হাসি নিয়ে এক বাউল— এদের মধ্যেই ডুব দিয়েছিলাম।

    শান-বাঁধানো একটা জায়গার কাছে এসে ভ্যান-রিকশা থামল। লোকজনের ব্যস্ততা, কথা, একটা চায়ের গুমটির ভিড়— এ-সব দেখে প্রফেসর যেন সম্বিত ফিরে পেলেন। “এসো।” বলে তিনি নেমে পড়লেন ভ্যান থেকে। চালকের প্রাপ্য মিটিয়ে তিনি এগোলেন সামনের দিকে।

    আমিও তাঁর পিছু-পিছু হাঁটছিলাম। একটা খেয়াঘাটের সামনে এসে দাঁড়ালেন প্রফেসর।

    দেখলাম, এক বিপুলা নদীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা। সে-নদীর মাঝে-মাঝে চর জেগে উঠলেও বোঝা যায়, বর্ষায় এর রুদ্ররূপ দেখলে সমীহই শুধু নয়, ভয়ও হতে বাধ্য। একটা ছোট্ট খেয়াঘাটের একধারে একটা ডিঙি নৌকা বাঁধা ছিল। তাতে বসে ছিল এক মাঝি।

    এক মিনিট! এই দৃশ্য আমি আগে কোথায় দেখেছি? না! দেখিনি; তবে শুনেছি— কিছুক্ষণ আগেই, প্রফেসরের মুখে।

    “আমাদের কি নদী পার হতে হবে? আর… আমরা কি সেই দিব্যানন্দ মহারাজের আশ্রমে যাচ্ছি প্রফেসর?” আমি উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠলাম।

    “নদী পারাপারের গুরুত্ব জান, কৌশিক?” মুচকি হাসলেন প্রফেসর সোম, “সফলভাবে সার্থকভাবে জীবনের নদী পেরোতে ক-জন পারে? চলো, এগিয়ে যাই।”

    ⤶ ⤷
    1 2 3
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleধূসর আতঙ্ক – অনীশ দাস অপু সম্পাদিত
    Next Article মেলানকোলির রাত – কৌশিক সামন্ত

    Related Articles

    কৌশিক সামন্ত

    প্রফেসর সোম – কৌশিক সামন্ত

    April 25, 2026
    কৌশিক সামন্ত

    মেলানকোলির রাত – কৌশিক সামন্ত

    April 25, 2026
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026
    Our Picks

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026

    বৈদ্যুতিক চুল্লি – শঙ্কর চ্যাটার্জী

    April 27, 2026

    সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – মিহির সেনগুপ্ত

    April 27, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }