Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026

    বৈদ্যুতিক চুল্লি – শঙ্কর চ্যাটার্জী

    April 27, 2026

    সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – মিহির সেনগুপ্ত

    April 27, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    প্রফেসর সোম আবার! – কৌশিক সামন্ত

    কৌশিক সামন্ত এক পাতা গল্প137 Mins Read0
    ⤶

    শিকার – কৌশিক সামন্ত

    শিকার

    ছেলেধরা

    জানলাটা আলতো হাতে খুলে দিতেই একফালি চাঁদের মিষ্টি আলো ছড়িয়ে পড়ল গোটা ঘর জুড়ে।

    আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল ছোট্ট রুবি। চাঁদের আলো তার কী যে ভালো লাগে! শুধু ইচ্ছে করে লম্বা-লম্বা গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে একছুটে ওই নীল পাহাড়ের বুকে পৌঁছে যেতে— যার ঠিক গায়ে লেগে আছে ওই লালচে চাঁদ।

    তারপরেই সে মুঠো-মুঠো চাঁদের আলো মেখে নেবে সারা শরীরে। পকেটে করে খামচে নিয়ে আসবে বাড়তি আলোটুকু। কিন্তু হায়!

    “রুবি, একদম দুষ্টুমি করবে না। এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও বেরোবে না। আমি যাব আর আসব। ভালো মেয়ে হয়ে থাকবে, কেমন? জান তো, সেই রডরিগেজ আঙ্কেলের ছেলের সঙ্গে। কী হয়েছিল? তুমি এক পাও ঘরের বাইরে বেরোবে, আর ছেলেধরা অমনি খপ করে ধরে নেবে তোমায়।”

    ঠাকুমার কথায় আঁতকে উঠে মাথা নেড়ে সায় দেয় রুবি। তার মা-বাবা নেই। দিনের পর দিন এইভাবেই চলে আসছে। সে ঠাকুমা’র চোখের মণি। কিন্তু ঠাকুমা একটু বেশিই সতর্ক থাকেন— কিছুতেই চোখের আড়াল হতে দেন না রুবিকে।

    সকাল বেলা তো ওর একদমই বের হওয়া বারণ। ঠাকুমা নিজেও বেরোন না। রাতে ঠাকুমা বেশিরভাগ দিন একাই বেরোন খাবার নিয়ে আসতে। কোনো-কোনোদিন খুব কান্নাকাটি করলে তবেই রুবির ভাগ্যে বাইরে বেরোনোর সুযোগ আসে। তাও ঠাকুমা সর্বক্ষণ হাত ধরেই রাখে তার।

    আজও সে খুব বায়না করেছিল— এমনকি মিছিমিছি কেঁদেও ছিল খুব। কিন্তু ঠাকুমার সেই এক গোঁ।

    “না রে, রুবি। সোনা আমার, ছেলেধরাদের উৎপাত আজকাল বড্ড বেড়ে গেছে। তোকে বাইরে নিয়ে বেরোলে যদি কিছু হয়ে যায়, আমি বাঁচব কেমন করে, বল? জুলি আর শেফার্ড যাওয়ার পর তুই আমার শেষ সম্বল। মন খারাপ করিস না সোনা। দেখিস তোর জন্য আজ অনেক ভালো ভালো খাবার নিয়ে আসব।”

    ঠাকুমা গেছে অনেকক্ষণ হল। আর আসছেই না! কই, এত দেরি তো হয় না। ভাবছিল রুবি।

    রাগ হয়ে যায় রুবি’র। উঁহু, আজ আর সে কারও কথা শুনবে না। ও-সব ছেলেধরা- টেলেধরা বাজে কথা। আসলে ঠাকুমা ভাবে, একবার বাইরে গিয়ে নীল পাহাড়ে চাঁদের দেখা পেলে, সে যদি আর এই বদ্ধ অট্টালিকায় ফিরে না আসে? যদি রুবি তাকে ভুলে যায়!

    আর নয়। রুবি বেরিয়ে পড়ে, চুপিসাড়ে!

    দ্রুত পায়ে ফিরছিলেন ভিক্টোরিয়া।

    .

    ।।২।।

    রক্তবীজ

    নাহ্, আজ সত্যিই বড্ড দেরি হয়ে গেছে। আসলে এই জঙ্গলেও যে খাবার এত দ্রুত শেষ হয়ে আসবে— এ-কথা ভাবতে পারেননি তিনি। খাবারের জন্য তাঁকে হন্যে হয়ে ঘুরতে হয়েছে এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত। আবার নতুন কোনো আবাস খুঁজে নিতে হবে তাঁর আর একরত্তি নাতনিটার জন্য। এই জঙ্গল ক্রমে ফ্যাকাসে হয়ে উঠছে।

    ঘরে ফিরে ভূত সদর দরজা হাট করে খোলা; কেউ কোথাও নেই! দেখার মতো চমকে উঠলেন ভিক্টোরিয়া।

    হায় সর্বশক্তিমান! কোথায় গেল একরত্তি রুবি? ঠাকুমার দেরি দেখে চঞ্চল কিশোরী কি আজ একাই বেরিয়ে পড়েছে এই ভয়ংকর জঙ্গলে? আতঙ্কে কেঁপে ওঠেন ভিক্টোরিয়া। নীল পাহাড়ের প্রতি রুবি’র প্রীতির কথা তাঁর অজানা নয়। তিনি ছুটে বেরিয়ে আসেন— যেভাবে হোক রুবিকে খুঁজে পেতেই হবে!

    গাঢ় অন্ধকার নেমে এলেও চাঁদের আলোয় পথ চিনতে অসুবিধে হচ্ছিল না রুবি’র। ভয়ও করছিল না তার। করবেই বা কেন?

    এই পথ বা জঙ্গল তো তার কাছে অজানা নয়। ঠাকুমা যে কেন শুধু-শুধু এত ভয় পায়, কে জানে! বরং ঠাকুমার সামনে আচমকা উপস্থিত হয়ে সে প্রমাণ করে দেবে, সে আর ছোট্টটি নেই।

    দেখতে-দেখতে অনেকটা পথ পেরিয়ে আসে রুবি। চাঁদ আরও কাছে নেমে এসেছে যেন। নীল পাহাড় খুব কাছেই মনে হচ্ছে। তবে কি সে পৌঁছে গেছে?

    আরে! ওটা কীসের শব্দ হল? কাদের যেন পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল রুবি। ঠাকুমার পায়ের আওয়াজ সে চেনে। এটা সে-রকম নয়। তাহলে এরা কারা? তবে কি ঠাকুমার কথাই সত্যি হবে?

    কান খাড়া করে রাখল রুবি। তার চোখ চারদিকে সবকিছু লক্ষ করার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ কিছু বুঝে ওঠার আগেই, একটা কালো লোমশ কী যেন তার গায়ের ওপর লাফিয়ে পড়ল। রুবি প্রস্তুত হয়েই ছিল। সে একপাশে সরে গিয়ে লাফিয়ে উঠল সেটার বুকের ওপর।

    এ তো একটা মানুষ! এক কামড়ে তার গলার নলিটা ছিঁড়ে ফেলতে চাইল রুবি। কিন্তু পারল না সে।

    একঝটকায় কে যেন ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল রুবিকে। মাটিতে আছড়ে পড়ে পরবর্তী আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হল সে। তখনই সে দেখল, পেছনের জমাট-বাঁধা অন্ধকার থেকে একটা কালো আলখাল্লা পরা লোক এগিয়ে আসছে। তার হাতে একটা বড়ো সিলভার ক্রুশ— যার ছুঁচল মুখটা থেকে কালো রক্তের ধারা চুইয়ে নেমে আসছে।

    “মারো সোম! মারো ওটাকে। বাচ্চা বলে রেয়াত কোরো না। সাক্ষাৎ শয়তানের বাচ্চা ওটা!” মাটিতে পড়ে থাকা মানুষটা চিৎকার করে উঠল। তবু ক্রুশধারী আলখাল্লা-পরা লোকটা কিছুক্ষণের জন্য যেন থম মেরে গেল। কী যেন ভাবছিল সে।

    সুযোগের অপেক্ষায় ছিল রুবি। লাফিয়ে উঠে এক ধাক্কায় সে আলখাল্লা-পরা লোকটিকে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর তার বুকে চেপে বসল। কিন্তু আর কিছু করার আগেই সে তীব্র, জান্তব আর্তনাদ করে উঠল।

    মাটিতে পড়ে থাকা লোকটা কখন উঠে এসেছে— তা সে লক্ষই করেনি। রুবি’র অজান্তে তার পিঠে সিলভারের একটা খণ্ড আমূল গেঁথে দিল লোকটা।

    আকাশের দিকে মুখ করে ঢলে পড়ে রুবি। তার মুখের দু’পাশ থেকে কুকুরের মতো দুটো ছেদক দাঁত চাঁদের আলোয় ঝলসে উঠছিল তার পরেও।

    “তোমাকে কামড়াতে পারেনি তো, সোম?” মাটিতে পড়ে থাকা মানুষটির হাত ধরে তোলার ফাঁকে প্রশ্ন করল অন্যজন।

    “নাহ্, টরাস। আসলে বয়স হয়ে যাচ্ছে তো। তাই রিফ্লেক্সগুলো আর কাজ করে না আগের মতো।” মুচকি হেসে বললেন সোম।

    “বয়স না বন্ধু। তোমার ওজনটা একটু কমাও এবার। দেখবে, সব ঠিক কাজ করবে।”

    “এনিওয়ে, আমাদের নেক্সট স্টেপ কী টরাস? আমার তো মনে হয়, এখানে আমাদের কাজ শেষ!” সোম প্রশ্ন করলেন।

    “এ তো সামান্য বীজ ছিল সোম। এইবার আসল গাছটা ওপড়ানোর পালা।”

    “পুরো পরিবার আগেই গেছে। শেষ সম্বল নাতনিকেও হারিয়ে ফেলল এবার। আমার মনে হয় না ওই বুড়ি আমাদের আর কিছু ক্ষতি করতে পারবে।”

    “ভুল করছ, সোম। ভ্যাম্পায়ারদের শেষ করতে হলে তাদের পুরো ফ্যামিলি চেইনটা শেষ করতে হয়। না হলে, কে বলতে পারে যে ওই সামান্য গাছই একদিন জঙ্গল হয়ে আমাদের ঘিরে ফেলবে না?”

    একটা ধারালো সিলভার ক্রুশ রুবির বুকে হাতুড়ি দিয়ে সজোরে গেঁথে দিলেন টরাস। আর্ত চিৎকার আর একটা বিশ্রী গন্ধে ভরে যায় চারপাশ। রুবি’র শরীর থেকে বের হওয়া ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্য দিয়ে হেঁটে যান রুদ্র সোম আর টরাস। কিন্তু তাঁরা খেয়াল করেননি যে দূরের অন্ধকারে গাছের ফাঁকে একজোড়া হলদেটে চোখ তাঁদের লক্ষ করছিল। বিষাদ আর প্রতিশোধের এক অদ্ভুত আগুন ধিকধিক করে জ্বলছিল সে দু-চোখ জুড়ে!

    .

    ।।৩।।

    প্রফেসর সমীপেষু

    “জিনিসটা কিন্তু খাসা হয়েছে। কী বল, কৌশিক?”

    মুখ ভরতি খাবার ছিল, তাই নীরবে মাথা নাড়ালাম প্রফেসর সোমের কথায়। ফোর্থ স্যাটারডে, তাই ব্যাংক বন্ধ। সুযোগ পেতেই চলে এসেছি প্রফেসরের বাড়ি।

    আজ সারাদিন খাব-দাব আর গপ্পো শুনব— এই রুটিনের নড়চড় নেই।

    “কচুরি জিনিসটা সারাবছর খেলেও, শীতের মুখে মুখে কচি কড়াইশুটির সঙ্গে ব্যাপারটা জমে এক্সট্রিম পয়েন্টে গিয়ে দাঁড়ায়। তার সঙ্গে আলুর দম! উফ্, যেন ব্রায়ান মে’র লিডের সঙ্গে ফ্রেডি মারকিউরির ভোকাল। যেন গ্যারি মুরের গিটারের সঙ্গে…”

    প্রফেসর অন্য টপিকে ঢুকে গেলে গল্প শোনা মাঠে মারা যাবে। তাই প্রফেসরকে মাঝপথে থামিয়েই আমি বলে উঠলাম, “প্রফেসর, ওই কথাটা কিন্তু শেষ হয়নি।”

    “কোন কথাটা? আসলে বয়স হচ্ছে তো, একটু খেই হারিয়ে যায়।” হেসে উঠলেন প্রফেসর।

    “ঠিক। তবে গোস্ট-হান্টারদের ব্যাপারে জানতে হলে তোমাকে কিন্তু আগে গোস্ট- হান্টিং সম্পর্কে জানতে হবে।”

    “বলুন “বেশ-বেশ। তবে দেখো, আজ কিন্তু গপ্পো না হয়ে নীরস প্রবন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন আবার আমাকে দোষ দিও না বাপু।” মুচকি হেসে বলে উঠলেন প্রফেসর।

    “কম দিন তো হল না আপনার সঙ্গে আলাপের। দিনের শেষে আপনি যে গল্প বলবেনই— এ আমার স্থির বিশ্বাস।” আমিও হেসে জবাব দিলাম।

    “বেশ। তবে শুরু করি।

    দেখো কৌশিক, এই ভূত বা প্রেতের অস্তিত্বে বিশ্বাসী আর অবিশ্বাসী— মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রায় শুরু থেকেই দু’পক্ষকে পাওয়া যায়। তবে, এই তথাকথিত গোস্ট-হান্টার বা ভূত শিকারি কিন্তু বেশ রিসেন্ট ফেনোমেনন। সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকে অলৌকিক বা অতিলৌকিক ঘটনার তদন্তের কিছু উদাহরণ পাওয়া যায়। তবে যুক্তি আর প্রযুক্তি— দুইয়ের সমন্বয় ঘটানো গোস্ট-হান্টার বা প্যারানর্মাল ইনভেস্টিগেটরদের সংখ্যাটা হু-হু করে বাড়ে বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক থেকে। তবে হ্যাঁ, গোস্ট হান্টিং-এর বীজ বোনা হয়েছিল ‘স্পিরিচুয়ালিজম’ নামক মুভমেন্টের মধ্যে দিয়ে।”

    “স্পিরিচুয়ালিজম?”

    “হ্যাঁ, কোনো একজন মিডিয়াম বা মাধ্যমের সাহায্যে মৃত ব্যক্তির স্পিরিট বা আত্মার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভবঅষ্টাদশ শতকের একেবারে গোড়াতেই এক সুইডিশ মিস্টিক এইরকম একটা ধারণা দিয়েছিলেন। ১৮৪৮ সালে নিউইয়র্কের হাইডসভিলের বাসিন্দা ফক্স পরিবারের মাধ্যমে এই ব্যাপারটা হঠাৎই অনেক বেশি সংখ্যক মানুষের আগ্রহ, উত্তেজনা, ভয়এ-সবের কারণ হয়ে উঠেছিল। সেই বছর ফক্স পরিবার নতুন একটি বাড়িতে থাকতে শুরু করেছিল। শুরু থেকেই বাড়িটার হন্টেড হাউস হিসাবে বদনাম ছিল। একেবারে প্রথম দিন থেকেই ফক্স পরিবারের প্রায় সকলেই সেই বাড়িতে বিদেহীর অস্তিত্ব কম-বেশি টের পেয়েছিলেন। তবে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছিল পরিবারের দুটি ছোটো মেয়ে— কেট ফক্স আর মার্গারেট ফক্স, এই দুই বোন।”

    “কী দেখেছিল… বা বুঝেছিল তারা?” আমি প্রশ্ন করলাম।

    “কেট বলেছিল, সে যখন ঘুমোয়, কে নাকি ঠান্ডা হাতে তাকে বারবার ছুঁয়ে যায়। মার্গারেট বলেছিল, ঘুমের মধ্যে তার কম্বল নাকি বারবার কে টেনে সরিয়ে দেয়।”

    তার পরের ব্যাপারটা অনেকটাই আনুমানিক। সেই ধারণা অনুযায়ী, দুই বোন মিলে নাকি এমন কিছু একটা জিনিস বানিয়ে ফেলেছিল— যেটা বিদেহীদের মনোভাবকে প্রথমে আওয়াজ, তারপর সেই আওয়াজকে বর্ণমালায় রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়। সেই থেকেই তারা সেই হানাবাড়ির প্রেতাত্মার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছিল। সেই প্রেতাত্মা তাদের কাছে নিজের পরিচয় দিয়েছিল। সেই সূত্র ধরে বেসমেন্ট খুঁড়ে একটা মানুষের খুলিও উদ্ধার হয়েছিল। বলাই বাহুল্য, এরপর ফক্স বোনেদের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মিডিয়াম হিসাবে তারা বিখ্যাত হয়ে ওঠে। বিদেহী প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলার জন্য, বা তাদের ছেড়ে যাওয়া সূত্রের নাগাল পাওয়ার জন্য মানুষ মিডিয়ামদের খুঁজতে থাকে। ফলে ফক্স বোনেদের মতোই প্রচুর মিডিয়াম গজাতে থাকে এই সময়— মানুষ যাদের ওপর রীতিমতো নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।”

    “স্পিরিচুয়ালিজম শুরু থেকেই তাহলে খুব জনপ্রিয় ছিল, তাই না?”

    “হ্যাঁ, জনপ্রিয়তা যে শুরু থেকেই ছিল— এ-কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে হ্যাঁ, জনপ্রিয়তার পাশাপাশি স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর প্রশ্নও উঠতে শুরু করে এই গোটা ব্যাপারটাকে কেন্দ্র করে।”

    “মিডিয়াম ঠিক কে, প্রফেসর? তার কাজটা কী?”

    “স্পিরিচুয়ালিস্টরা বিশ্বাস করেন যে বিদেহীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম। তার জন্য কোনো বিশেষ পুরুষ বা মহিলা মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারেন। এঁরাই মিডিয়াম— যাঁরা সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে, মানে যাকে লোকে ট্রান্সস্টেট বলে সেই অবস্থায়, ওপারের বার্তা এপারে আনতে সমর্থ হন। মিডিয়ামরা বিভিন্ন ধরনের পরিবেশ আর উপকরণ ব্যবহার করতেন। অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘর, একটা টেবিল, তার চারপাশ ঘিরে কিছু চেয়ারে কিছু মানুষ, আর মধ্যমণি মিডিয়াম নিজে— এই সামগ্রিক ব্যাবস্থাটাকে বলা হতো séance। কখনও উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে যন্ত্রসঙ্গীতের সাহায্যও নেওয়া হত। আলো-আঁধারি ভুতুড়ে হাতের সঞ্চালনা, বিকৃত কণ্ঠস্বর এগুলো সবই seance-এর অঙ্গ ছিল। মার্কিন গৃহযুদ্ধের পর ও-দেশে, ক্রমে ইউরোপ জুড়েও স্পিরিচুয়ালিজমের সাংঘাতিক প্রসার ঘটেছিল। আসলে সহসা এত মানুষের মৃত্যু হওয়ার ফলে একটা অদ্ভুত মানসিক… বা আত্মিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল বহু মানুষের মধ্যে। তাঁরা সবাই চাইতেন প্রয়াত প্রিয়জনের সঙ্গে না-বলা কথাগুলো সেরে নিতে। কিন্তু মিডিয়ামের সাহায্যে ইচ্ছেটি পূরণ করতে গিয়েই আসল সমস্যা দেখা দিল।”

    “কী সমস্যা প্রফেসর?”

    “অল্প সময়ে প্রচুর চাহিদা তৈরি হলে যা হয় আর কী। ফ্রড মিডিয়াম আগেও ছিল; এইসময় তাদের সংখ্যা বাড়ল হু-হু করে। অর্থ আর খ্যাতির লোভে তারা মানুষের বিশ্বাসকে অপব্যবহার করতে শুরু করেছিল। প্রতিক্রিয়া হিসেবে আর একটি দলের আবির্ভাব ঘটে— যারা এই গোটা সিস্টেম নিয়েই প্রশ্ন তোলে। শুধু ধাপ্পাবাজ মিডিয়ামদের ধরে ফেলাই নয়, তারা প্রেতাত্মার সঙ্গে যোগাযোগ, বা তাদের উপস্থিতির পুরো বিষয়টাকেই সন্দেহের চোখে দেখেছিল।

    ছোটো, অথচ প্রভাবশালী বেশ কিছু সংগঠন তৈরি হল এই সময়। তাদের কাজই ছিল বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীর মাধ্যমে এই ঘটনাগুলোর ব্যাখা খোঁজা। সেই সময়কার এক প্রখ্যাত দার্শনিক উইলিয়াম জেমস বলেছিলেন, ‘বিজ্ঞানের আলোয় আমরা যদি সব অতিপ্রাকৃতকেই অসৎ মানুষের স্বার্থান্বেষী কার্যকলাপ বলে দেগে দিই, তাহলে আমরা সেই সত্যটাকে শুরুতেই উপেক্ষা করে ফেলব— a natural kind of fact of which we do not yet know the full extent.’

    কবি ফ্রেডরিক মায়ারস, মনস্তাত্ত্বিক এডমন্ড গার্নি এবং দার্শনিক হেনরি সিজউইক মিলিতভাবে ১৮৮২ সালে গ্রেট ব্রিটেনে ‘সোসাইটি ফর ফিজিকাল রিসার্চ’- সংক্ষেপে SPR প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শুরুতেই তাঁরা প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যটি একেবারে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছিলেন— To examine without prejud।ce or prepossession and In a scientific spirit those faculties of man, real or supposed, which appear to be inexplicable on any generally recognized hypothesis.

    আজ গোস্ট-হান্টারদের যে রূপ তুমি দেখতে পাচ্ছো, বা চাইছ সেটা আসতে তখনও অনেক দেরি। কিন্তু তার শুরু মোটামুটি এখান থেকেই হয়ে গেছিল। তবে… শিকারের পেছনে অনেকরকম স্বার্থই তো থাকে, তাই না?”

    .

    ।।৪।।

    মার্গারেট

    “একজ্যাক্টলি করে থেকে এই ঘটনাগুলো শুরু হয়েছে, ম্যাম?”

    “নিশ্চিত করে দিনক্ষণ বলা মুশকিল। তবে দুর্ঘটনার প্রায় দু’মাস পর, একরকম হঠাৎ করেই এটা শুরু হয়েছিল।”

    অকাল্ট ডিটেকটিভ সেবাস্টিয়ান মুরের চেম্বারে বসে ছিলেন মার্গারেট ব্রিগেঞ্জা। গত কয়েকদিন ধরে তাঁর ওপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে গেছে; দুঃস্বপ্নের কালো রাত যেন আর কাটতেই চাইছে না। অসময়ে মিস্টার ব্রিগেঞ্জা যাওয়ার পর সবে যখন তিনি একটু গুছিয়ে উঠতে শুরু করেছেন, তখনই আবার শুরু হয়েছে এক নতুন বিপদ। এমন কিছু ঘটনা ঘটছে— যেগুলো যেমন সবাইকে বলাও যাবে না, তেমন চেপে রাখাও যাবে না।

    উপায় না দেখে শেষ অবধি তিনি সেবাস্টিয়ান মুরের কাছে এসেছেন। যাদের যাওয়ার, তারা চলে যায়। কিন্তু যারা রয়ে যায়, তাদের তো বেঁচে থাকতে হবে নিজের মতো করে।

    “যদি কিছু মনে না করেন…. দুর্ঘটনা ঘটল কীভাবে?”

    “সেদিন আমাদের বিবাহবার্ষিকী ছিল। বরিস সকাল-সকাল বেরিয়ে পার্কারসন বেকারি গেছিল— আমার ফেভারিট ব্লুবেরি ফ্রুট-কেক আনার জন্য। অপেক্ষায় ছিলাম, কখন কলিং বেল বাজবে, আর আমাকে কেকের সঙ্গে একটা সারপ্রাইজ দেবে বরিস। প্রতিবারই সে এটা করত। কিন্তু সেদিন কলিং বেলটা আর বাজেনি! পুলিশের গাড়ির সাইরেন শুনতে পেয়ে ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিয়েছিলাম। ওরাই বলেছিল, ব্রেক ফেল করে বরিসের গাড়ি নিম্ফা ভ্যালির খাদে…” ডুকরে কেঁদে উঠলেন মার্গারেট।

    “নিজেকে শক্ত করুন, ম্যাম। আমরা বাইরে থেকে সামান্য কিছু সাহায্য করতে পারি। কিন্তু আগামী ক’দিন আপনাকেই সব সামলাতে হবে।”

    সেবাস্টিয়ানের কথায় নিজেকে সামলে নিলেন মার্গারেট।

    “আচ্ছা, মিস্টার ব্রিগেঞ্জা’র সম্পূর্ণ দেহ কি পাওয়া গেছিল? প্রশ্নটা আপত্তিকর শোনালে মাফ চাইছি।”

    “মাফ চাওয়ার কিছু নেই। আমি বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি। প্রশ্নের উত্তর দিতে আপত্তি হবে কেন? তবে… প্রশ্নের উত্তরটা আমি নিশ্চিতভাবে দিতে পারব না। পুলিশ, আর ডিজাস্টার ম্যানেজম্যান্ট টিম যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল। কিন্তু অত উঁচু থেকে পড়া এবং তারপরের বিস্ফোরণে গাড়িটা নাকি টুকরো-টুকরো হয়ে গেছিল। সেই সঙ্গে বরিসও…! ওরা একটা কাপড়ে মোড়া ছিন্নভিন্ন দেহ আমার হাতে তুলে দিয়েছিল শুধু।” কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে এল মার্গারেটের। মাথা ঝাঁকিয়ে সেবাস্টিয়ান বুঝিয়ে দিলেন, এই বিষয়ে আর কিছু বলতে হবে না।

    “এবার বলুন, এই সমস্যা কবে থেকে ও কীভাবে শুরু হল?”

    সেবাস্টিয়ানের প্রশ্নে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন মার্গারেট। মুখের ভাব দেখে বোঝা যাচ্ছিল, বলা আর না-বলার এক অদ্ভুত দোলাচলে ভুগছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মার্গারেট বলতে শুরু করলেন।

    “বরিস চলে যাওয়ার পর থেকে আমি একাই থাকি। কোনো অসুবিধা হয় না। বাড়িও এমন কিছু বড়ো নয় যে একাকিত্ব আমার মনে বিভ্রম ঘটাবে। একেবারে লাগোয়া না হলেও কাছাকাছি আরও অনেকের বাড়ি আছে। অথচ গত সপ্তাহ থেকে… আমার সবসময়ই মনে হচ্ছে, ও যেন আমাকে দেখছে! বিশেষত যখন যখন আমি খুব খুশি থাকছি, তখনই এটা আরও বেশি করে মনে হচ্ছে।”

    “খুশি থাকছেন– মানে? আপনি নির্দ্বিধায় আমাকে বলতে পারেন। কথাগুলো আর কেউ জানবে না।”

    “বেশ।” নিজেকে শক্ত করে নিলেন মার্গারেট, “যখনই আমি বাড়ির মধ্যে কারও সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছি, বা নিজের মতো করেই যখন থাকছি, তখনই মনে হচ্ছে, ও যেন আমাকে দেখছে। সেই সময়গুলোতে আমি ওর প্রিয় পারফিউম ল্যাভেন্ডারের গন্ধও পাই।”

    “বুঝতে পেরেছি। এক কাজ করুন। আমি কিছু নোটস দেব আপনাকে। সেখানে কিছু উপকরণের নাম লেখা থাকবে, আর সেগুলো প্রয়োগের উপায় বলা থাকবে। এগুলো মেনে চলতে হবে আপনাকে। আশা করছি আপনার সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এক সপ্তাহ পরে আপনার বাড়ি গিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের ব্যাপারে জানিয়ে আসব। পরমপিতা আপনার মঙ্গল করুন।”

    মার্গারেট চলে যাওয়ার পর উঠে গিয়ে সদর দরজাটা বন্ধ করে দেয় সেবাস্টিয়ান। তারপর দৃঢ় গলায় পেছনে ফিরে বলে ওঠে, “সোফার পেছন থেকে বের হয়ে আসুন— যিনি লুকিয়ে আছেন। অনেকক্ষণ আগেই দেখেছি আপনাকে।”

    সেবাস্টিয়ানের হুংকারের চোটে সোফার পেছন থেকে এক দীর্ঘকায় মূর্তি বেরিয়ে এল এবার।

    .

    ।।৫।।

    সেবাস্টিয়ানের বিচার

    শান্তি!

    সারাদিন কাজের শেষে বাড়ি ফিরে এই একটা জায়গাই সব চিন্তাভাবনা ভুলিয়ে দেয়।

    বাথটবের জলে নিজের শরীর ডুবিয়ে দিলেন মার্গারেট। বাথসল্টের প্রতিটি কণা যেন তাঁর শরীরের অণু-পরমাণুর সঙ্গে মিশে শান্তি নিয়ে আসছে। তারই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুবাসিত মোমের মোহময় আবেশ। তাঁর দু’চোখ যেন জুড়িয়ে আসছে।

    ক’দিন আগেও এমন একক অথচ আনন্দমুখর পরিবেশ মার্গারেটর কল্পনারও অতীত ছিল। প্রতিমুহূর্তে তাঁর মনে হত, বরিসের বিদেহী দৃষ্টি তাঁকে দেখছে। সঠিক সুযোগ পেলেই সেই বিদেহী যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে তার সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নেবে। আর কেউ না জানুক, মার্গারেট তো জানেন। দুর্ঘটনার আগের রাতে তাঁর প্রেমিক রবার্ট নিজের মেকানিকের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে বরিসের গাড়ির ব্রেকটা অচল করে দিয়েছিল!

    মার্গারেটের ভ্রান্তিই হোক বা অপরাধবোধ— এই ঘটনার পেছনে যেটাই কাজ করে থাকুক, আপাতত সব শান্ত হয়ে গেছে। সেবাস্টিয়ানের টোটকা দারুণ কাজ দিয়েছে। গত একসপ্তাহ ধরে ভালো আছেন মার্গারেট। একবারের জন্যও তাঁর মনে হয়নি যে মৃত বরিসের রক্তচক্ষু তাঁকে অনুসরণ করছে। তাঁর গায়ের সেই ল্যাভেন্ডার গন্ধটাও স্থায়ীভাবে বিদায় হয়েছে।

    বরিসকে এভাবে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে মার্গারেটের ছিল না। কিন্তু তাঁর কাছে আর উপায় ছিল না। রবার্ট ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠছিল। এই অবৈধ সম্পর্কের কথা সে বরিসকে জানিয়ে দেবে— এমন হুমকিও দিচ্ছিল। যাইহোক, সেই অতীত ভুলে এবার এগিয়ে যেতে হবে মার্গারেটকে। তার আগে একটাই কাজ সারার আছে। পরশু সেবাস্টিয়ান এসেছিলেন। কালো কাপড়ে বাঁধা ছোট্ট একটা পুঁটলি মার্গারেটকে দিয়ে তিনি বলে গেছেন, এই শেষ উপাদানটা স্নানের জলে একদিন মিশিয়ে দিলেই বরিসের হাত পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া যাবে। বাথটবে বসেই পুঁটলিটা নিয়ে দু’হাতে খুলতে শুরু করলেন মার্গারেট।

    হা ঈশ্বর! এ জিনিস কোথায় পেলেন সেবাস্টিয়ান?

    কাপড়ের পুটলির মধ্যে ছিল একটা ছোট্ট আঙুলের টুকরো। জিনিসটা পচে উঠলেও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তার থেকে দুর্গন্ধ আসছিল না। তার বদলে ভেসে এল তীব্র ল্যাভেন্ডারের গন্ধ!

    চিৎকার করে উঠে মার্গারেট বাথটবের মধ্যেই ছুড়ে দিলেন মাংসের টুকরোটা।

    অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে আঙুলের টুকরোটা জলের মধ্যে মিশে গেল। তারপর সেটা একটা আস্ত হাতে রূপান্তরিত হল কিছু বুঝে ওঠার আগেই। হাতটা অক্ষত ছিল না। দুর্ঘটনার স্বাক্ষর সে বহন করছিল সদর্পে। কিন্তু সেই অবস্থাতেও মার্গারেটের শরীরটাকে এক ঝটকায় জলের গভীরে টেনে আনল সেটা।

    চোখ মুখ দিয়ে জল ঢুকছিল। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন মার্গারেট; কিন্তু পারছিলেন না। বরিসের শক্তির সামনে তিনি আগেও অসহায় ছিলেন। সেদিনও…

    জল ঝাপ্টানোর প্রবল শব্দে ঘুম থেকে জেগে উঠলেন সেবাস্টিয়ান। তাঁর মাথা দপদপ করছিল।

    স্বপ্ন? তাই হবে। উঠে জল খেলেন সেবাস্টিয়ান। তখনই তাঁর নাকে ভেসে এল ল্যাভেন্ডারের তীব্র গন্ধ।

    গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে স্টাডি টেবিলের ওপর একটা খাম দেখতে পেলেন সেবাস্টিয়ান। তাতে ছিল নোটের বান্ডিল। আর কিছু ছিল না সেখানে; তার দরকারও ছিল না। ক্লায়েন্ট যে তৃপ্ত— তার প্রমাণ হিসেবে আর কীই বা প্রয়োজন?

    প্রথম-প্রথম এই টাকা নিতে কুণ্ঠা হত। কিন্তু এখন আর সেবাস্টিয়ানের সংকোচ হয় না।

    মানুষকে সাহায্য করার জন্য কত ব্যবস্থা রয়েছে। এমনকি প্রেতেদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্যও রয়েছে গোস্ট-হান্টার। কিন্তু অতৃপ্ত, অন্যায়ের বিচারপ্রার্থী বিদেহীদের ন্যায়বিচার দেওয়ার মতো কেউ নেই। তাই এই দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। প্রণালী শঠতা আর হিংস্রতায় ভরা হলেও সেবাস্টিয়ান বিচারই করছেন।

    .

    ।। ৬।।

    হন্টিং আর হান্টিং

    “বল তো কৌশিক, গোস্ট-হন্টিং আর গোস্ট-হান্টিং— এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কী?”

    “দুটোই এক তো!” আমি বললাম।

    “একেবারেই নয়।” মুচকি হেসে বলে উঠলেন প্রফেসর সোম, “দুটো বানান খেয়াল করে দেখো। একটা হান্টিং (ghost hunt।ng), আর একটা হন্টিং (ghost haunt।ng) হান্টিং ব্যাপারটা কিছুটা আমাকে দেখে, কিছুটা নানা জিনিস পড়ে জেনেছ। এবার হন্টিং- টা বোঝাই।

    বিখ্যাত প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর এবং অকাল্ট বিশেষজ্ঞ জ্যাক ব্যাগনস বলেছেন, ‘a haunt।ng ।s the repeated man।festat।on of strange and ।nexpl।cable sensory phenomena at a certa।n locat।on’, অর্থাৎ, হন্টিং হল কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় ঘটে চলা এমন কিছু অদ্ভুত এবং ব্যাখ্যাবিহীন ঘটনার সমষ্টি, যেগুলোর উত্তর সাধারণ মানুষের কাছে অজানা। স্বাভাবিকভাবেই তারা এ-সব ঘটনায় বিচলিত হয়ে পড়ে এবং অলৌকিক কিছুর উপস্থিতি কল্পনা করে ফেলে।”

    “অদ্ভুত আর ব্যাখ্যাবিহীন বলছেন। তার মানে এমন সব ঘটনাই অলৌকিক নাও হতে পারে?”

    “একজ্যাক্টলি, কৌশিক! প্রতিটি অদ্ভুত ঘটনার সঙ্গে কোনো বিদেহী শক্তিই জড়িত থাকবে— এমন কিছুতেই বলা যায় না। তবু, ব্যবহারিক অর্থে আমরা এদের সাধারণত গোস্ট-হন্টিংই বলে থাকি। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক।

    ধরো, তুমি কোনো কাজ সেরে গভীর রাত্রে একা-একা বাড়ি ফিরছ। নির্জন রাস্তা, কেউ কোথাও নেই। হঠাৎ তোমার মনে হল, তোমাকে কে যেন পেছন থেকে অনুসরণ করছে। পেছন ফিরে কিন্তু কাউকে দেখতে পেলে না। এর দুটো কারণ থাকতে পারে।”

    “কী রকম?” আমি প্রশ্ন করলাম।

    “প্রথম কারণ, কোনো চোর বা বদমাইশ দুষ্ট অভিপ্রায়ে তোমার পিছু নিয়েছে। তুমি তাকানো মাত্রই সে নিজেকে গোপন করে ফেলছে— যাতে তোমার ওপর নির্দিষ্ট সময়ে আঘাত হেনে তার কার্যসিদ্ধি করতে পারে।

    দ্বিতীয় কারণ, ওই পেছনে আসা পায়ের আওয়াজ তোমার শোনার ভুল, বা দুর্বল মনের কল্পনা।

    প্রথম কারণটা ঘোরতর লৌকিক। এক্ষেত্রে তোমাকে সাহায্য করতে পারে পুলিশ বা প্ৰশাসন।

    দ্বিতীয় কারণটিও লৌকিক হবে যদি সেটি মাত্র একদিনই ঘটে থেমে যায়।

    কিন্তু এমনও হতে পারে যে প্রতিরাতেই যখন তুমি অফিস থেকে ফিরে আস, ওই একই জায়গায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। প্রতিরাতেই তুমি পেছনে ফিরে কাউকে দেখতে পাও না। চোর-ডাকাতের ব্যাপারটাও সেক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না।”

    “তখন?”

    “তখনই চলে আসে গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্নটা। এই যে গোটা ঘটনা— এটা তোমার মনের বাঘ, না বনের বাঘ? মনের বাঘ হলে তো মিটেই গেল। সেক্ষেত্রে তোমার উপযুক্ত চিকিৎসার প্রয়োজন।

    কিন্তু যদি বনের বাঘ হয়, অর্থাৎ এমনটা যদি সত্যিই হয়ে থাকে, তখনই প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর বা গোস্টহান্টারের আগমন হয়। তারাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ঠিক করে, তোমার সঙ্গে যা ঘটছে সেটা প্রাকৃতিক বা ন্যাচারাল, নাকি সুপারন্যাচারাল।”

    “কিছুটা অন্তত বুঝলাম।”

    “বুঝলে কৌশিক, এই গোস্ট-হন্টিং-এর গোটা ব্যাপারটাই অত্যন্ত আনপ্রেডিক্টেবল। কখনও সেটা রোজই ঘটতে পারে।

    কখনও সেটা কোনো নির্দিষ্ট তিথিতে অনুভূত হয়। আবার কখনও কয়েক দশক অন্তর বোঝা যায় তাকে। আর কী না ঘটে এর মধ্যে? কাউকে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। লাইট আপনা-আপনি জ্বলছে-নিভছে। হঠাৎ অদ্ভুত গন্ধ নাকে আসছে। চামড়ায় আচমকা ফুটে উঠছে পোড়া দাগ। প্রচণ্ড আক্রোশে আসবাবপত্র উলটে ফেলা হচ্ছে— কিন্তু আশেপাশে কেউ নেই! এইরকম অসংখ্য ঘটনা হন্টিং-এর সঙ্গে জড়িত। তাই এককথায় এদের সবাইকে গোস্ট-হন্টিং বলা হলেও প্যারানরমাল বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিনের গবেষণা আর পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এদের বিশেষ কিছু প্যাটার্ন আর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী একাধিক শ্রেণিতে ভাগ করেছেন।”

    “কী-কী শ্রেণি?”

    “রোসো বাপু। গোস্ট-হান্টিং-এর চেয়েও তো বেশি খাটিয়ে নিচ্ছ এইসব প্রশ্ন করে। একটু কফি খেয়ে নিজেকে চাঙ্গা করে নিই আগে।”

    .

    ।।৭।।

    হন্টিংচরিত

    “সামান্য কিছু মতবিভেদ থাকলেও, বিশেষজ্ঞরা হন্টিংকে মোটামুটি এই ক’টা শ্রেণিতে বিন্যস্ত করেছেন- ট্র্যাডিশনাল, রেসিডুয়াল, পোল্টারজাইস্ট, ডেমনিক, আর পোর্টাল হন্টিং। সারা দুনিয়া জুড়ে যা কিছু সুপারন্যাচুরালের ঘটনা ঘটে, তাদের মোটামুটি এতেই ফেলা যায়।

    ট্র্যাডিশনাল হন্টিং-কে অনেকে ইন্টালিজেন্ট হন্টিংও বলে থাকেন। অপঘাত মৃত্যু সেটা দুর্ঘটনা বা খুন যাই হোক—

    এক্ষেত্রে ফ্যাক্টর হয়ে দাড়ায়। জীবদ্দশায় যেখানে থাকত, প্রেতাত্মা মৃত্যুর পরেও সেখানেই আটকে থাকে- জেনে বা না-জেনে।”

    “মানে?”

    “অপঘাতে মৃত্যুর ফলে অনেক প্রেতই বুঝতে পারে না যে তাদের মানবশরীরের মৃত্যু ঘটেছে। এই জগতে যে তাদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে— তা তারা বুঝতে পারে না। একবার শরীর চলে গেলে পড়ে থাকে শুধু শক্তি। তার তারতম্যেই প্রেতাত্মার স্বভাবের বহিঃপ্রকাশের তারতম্য ঘটে। যিনি জীবদ্দশায় ভালো ছিলেন, মানে পজিটিভ ছিলেন, তাঁর প্রেতের আচরণে পজিটিভ এনার্জি দেখা যায়। জীবদ্দশাতেই যিনি খারাপ স্বভাবের ছিলেন, তাঁর ট্র্যাডিশনাল হন্টিঙে নেগেটিভ এনার্জির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তেমন প্রেতাত্মার মধ্যেই মানুষের অনিষ্ট করার ইচ্ছে দেখা যায়। দরজা-জানালায় ধাক্কা দেওয়া, জিনিসপত্র ফেলে দেওয়া, লাইট অফ-অন করা, বিকৃত শব্দ করে ভয় দেখানো, তাপমাত্রার অস্বাভাবিক হেরফের করা— এ-সবই ট্র্যাডিশনাল হন্টিং-এর অংশ। বেশিরভাগ হন্টেড হাউসে এইসবই দেখা যায় আর কি। তবে জীবিত মানুষের খুব বেশি ক্ষতি এরা করতে পারে না। মানুষ আচমকা চরম ভয় পেয়ে নিজের ক্ষতি নিজেই করে ফেলে।

    গোস্ট-হান্টার এমন অবস্থায় কী করেন? তিনি প্রেতাত্মাকে চিহ্নিত করে সেই বিশেষ জায়গাটির সঙ্গে তার যোগসূত্র খুঁজতে থাকেন। সেটা পাওয়া গেলেই সেই প্রেতাত্মাকে তিনি বোঝাতে চেষ্টা করেন যে সে আর এই জগতে নেই।”

    “আচ্ছা!”

    “হ্যাঁ, এবার রেসিডুয়াল হন্টিং-এর কথায় আসি। তবে তার আগে…

    পাইপে অগ্নিসংযোগ করলেন প্রফেসর। মিঠে তামাকের সুগন্ধী ধোঁয়ায় ভরে উঠল ঘর। মুখ থেকে পাইপ সরিয়ে প্রফেসর বললেন, “রেসিডুয়াল হন্টিং-ই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এক্ষেত্রে প্রেতাত্মার নিজস্ব কোনো ভূমিকাই থাকে না, বলা চলে। A residual haunting is a playback of a past event. The apparitions involved are not spirits, they are ‘recordings’ of the event. প্রেতাত্মা বা তেমন কোনো এন্টিটি এখানে কিছু করে না। কিন্তু তার পেছনে ফেলে যাওয়া শক্তির প্রকাশ ঘটে অতীতের ঘটনার লুপ-আকারে পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে।

    ধর, কোনো ভিডিও কিম্বা অডিও একটা বিশেষ উপাদান দিয়ে তৈরি ফিল্মের উপর রেকর্ডিং করা হত। সেটাকে অক্সিডাইজড করার মধ্যে দিয়ে প্রক্রিয়াটা সম্পূর্ণ হত। প্যারানর্মাল রিসার্চাররা পরীক্ষা করে দেখেছেন, কিছু কিছু বিল্ডিং মেটেরিয়াল, যেমন ধর পুরোনো প্রাসাদ বা দুর্গে ব্যবহৃত শ্লেট-পাথর, এইরকম ভূমিকা নেয়। তাদের গঠনে ঠিক কী বিশেষত্ব আছে, তা ব্যাখ্যা করা মুশকিল। আবার এও দেখা গেছে নিত্য-ব্যবহৃত ধাতব বস্তু, এমনকি দেওয়ালে পুঁতে রাখা সামান্য পেরেকও কখনওসখনও ফিল্মের মতো আচরণ করে।

    সবসময় নয়; কিন্তু কোনো-কোনো ক্ষেত্রে একটা মর্মান্তিক ঘটনার প্রভাব একটা অন্যরকম শক্তির জন্ম দিতে পারে। সেই শক্তি ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে, বা কোনো একটা রাস্তার মোড়ে কোনোভাবে বন্দি হয়ে যেতে পারে। একেই বলা হয় রেসিডুয়াল এনার্জি। সময়ের একপেশে লুপ তৈরি হয় এই শক্তির প্রভাবে। ঠিক সেই দিনের সেই সময় এলেই অতীতে ঘটে যাওয়া সেই দুর্ঘটনা, বিশেষত মৃত্যুকে সে প্লেব্যাক করতে থাকে।”

    “আপনি বললেন, এটা নাকি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কোথায় এদের দেখা যায়, প্রফেসর?”

    “অনেক জায়গায়। সেগুলো বেশ বিখ্যাত… বা কুখ্যাত যা বলবে। এর উদাহরণ হিসেবে টাওয়ার অফ লন্ডন-এ অ্যান বোলেন-এর ছায়ামূর্তি, ব্রাউন লেডি অফ র‍্যানহ্যাম হল-এদের কথাই বলা যায়। এমনকি, এই যে তুমি আর আমি প্রতি শনিবার গল্পের আসর জমাই, এতে আমাদের দুজনেরই ইমোশনাল এনার্জি জড়িয়ে থাকে, তাই না?”

    “হ্যাঁ, প্রফেসর।”

    “শনিবারের নির্দিষ্ট টাইম-লুপেই আমরা আলোচনাগুলো করে থাকি। কে বলতে পারে, এই ঘরে রাখা সোফা, চেয়ার, কিম্বা এই টেবিলে রাখা সামান্য অ্যাশট্রেও রেসিডুয়াল এনার্জি স্টোর করে রাখছে না? হয়তো আজ থেকে একশো বছর পর কেউ এখানে এসে আমাদের গল্প করতে দেখবে। কিন্তু আমরা তখন সশরীরে এখানে থাকব কি? প্রত্যক্ষভাবে থাকব না; তবে ওই রেসিডুয়াল এনার্জি তো থেকেই যাবে।”

    “বুঝলাম। আমরাও যে হন্টিং-এর চরিত্র হয়ে উঠতে পারি— এটা ভেবেই বেশ… রোমাঞ্চ হচ্ছে, প্রফেসর। কিন্তু এর সমাধান কীভাবে হয়?”

    “স্থান আর কালের পরিবর্তন আমাদের হাতে নেই। তাই পাত্রের পরিবর্তন ঘটাতে হয়। অর্থাৎ যেখানে রেসিডুয়াল হন্টিং ঘটছে, সেখানকার রেসিডুয়াল এনার্জির অনুঘটক উপাদান খুঁজে বের করতে হয়। তারপর সেটাকে নিশ্চিহ্ন করতে পারলেই কেল্লা ফতে। এবার পোল্টারজাইস্ট হন্টিং-এর কথায় আসি।”

    আবার একটু বিরতি নিলেন প্রফেসর সোম, তারপর শুরু করলেন..

    “এই শব্দটা জার্মান— যার অর্থ হল ‘no।sy ghosts.’ আগে লোকে একে ট্র্যাডিশনাল হন্টিং-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলত। পরে বিশ্লেষণ করে বোঝা যায়, এই ধরনের হন্টিং-এ প্রেতাত্মা বা কোনও অতিপ্রাকৃত এন্টিটির কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্কই নেই।”

    “মানে?”

    “মানে এখানে অনুঘটক হলো মানুষ।”

    “মানুষ! কীভাবে?”

    “সাইটোকাইনেসিস! এর অর্থ হল ~ The power to move th।ngs by energy generated ।n the bra।n, এই ধরণের কাইনেটিক এনার্জির অস্তিত্বের কথা পদার্থবিজ্ঞানে স্বীকৃত না হলেও প্যারাসাইকোলজিতে এর ভূরি-ভূরি উদাহরণ ডকুমেন্টেড হয়েছে। গোস্ট-হান্টাররা লক্ষ করেছেন, বিশেষত মেয়েরা শৈশবে বা বয়ঃসন্ধির দোরগোড়ায় জ্ঞানত বা অজ্ঞানত এই ধরনের ক্ষমতার অধিকারী হয়। কেউ কোথাও নেই, কিন্তু দরজায় নক করা বা জিনিসপত্র ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে তাদের সামনে। গলা টিপে ধরার অনুভূতি হয়, অথচ কাছেপিঠে কেউ নেই! এমন কিছু ঘটতে দেখলে অন্য কেউ ভয় পেয়ে যায়; ভাবে ভৌতিক উপদ্রব। অথচ শুধুমাত্র মস্তিষ্কে উৎপন্ন তরঙ্গের সাহায্যেই কিছু কিছু মানুষ এমন ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে— সেও তাদের অজান্তে।”

    “অজান্তে! কীভাবে?”

    “শুধুমাত্র অভিমান বা রাগের বশে, হয়তো খুব কাছের লোকের ওপরেই তারা এমন শক্তি প্রকাশ করে ফেলে।

    হান্টারের কাজই হল সাসপেক্টেড পোল্টারজাইস্ট এজেন্ট-কে চিহ্নিত করার পর তাকে তার ক্ষমতা সম্পর্কে বোঝানো। দরকার হলে তাকে হাতে-নাতে ধরে বোঝাতে হয়, সে কী করছে এবং তার কী ফল হতে পারে। ওটা না করা হলে এই হন্টিং অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।”

    এই পর্যন্ত বলে প্রফেসর উঠলেন। রান্নাঘরের দিকে গেলেন দেখে উৎসাহ বেড়ে গেল— অস্বীকার করব না। গল্পের সঙ্গে প্রহ্লাদের পেশ করা সুখাদ্য যুক্ত হলে পুরো ব্যাপারটা অন্য মাত্রা পেয়ে যায়!

    “আচ্ছা কৌশিক,” পাইপটা ধরানোর ফাঁকে প্রফেসর জানতে চাইলেন, “তোমাদের প্রজন্ম তো সুপারহিরো মুভি-টুভির খুব ভক্ত বলে মনে হয়। তাহলে পোর্টাল জিনিসটা নিয়ে নিশ্চয় তোমার একটা ধারণা আছে?”

    “খুব একটা পরিষ্কার ধারণা নেই, প্রফেসর।” অকপটে স্বীকার করলাম, “এটুকু বলতে পারি যে প্রমাণিত না হলেও এই পোর্টালের ধারণাটা দাঁড়িয়ে আছে প্যারালাল ইউনিভার্সের সম্ভাবনার ওপর। মাল্টিভার্সের ধারণায় এমন প্রতিটি সম্ভাবনার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে অন্য কোনো মহাবিশ্ব – যা অন্য মাত্রা বা ডাইমেনশনে থাকতে পারে, বা অন্য কোথাও … যেটা অঙ্ক দিয়েই শুধু ব্যাখ্যা করা যায়। এমন মহাবিশ্বের সঙ্গে আমাদের দুনিয়ার এমনিতে কোনো যোগাযোগ নেই। কিন্তু সেইরকম অন্য কোনো মহাবিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করার মতো কোনো দরজা হঠাৎ করে আমাদের এই দুনিয়াতেই খুলে যেতে পারে। সেই দরজাই হল পোর্টাল।”

    “একসেলেন্ট!” একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে পাইপ হাতে নিয়ে আমার পিঠ চাপড়ে দিলেন প্রফেসর সোম। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, “বিশেষজ্ঞদের মতে, The idea of a portal, possibly to another dimension, is not a new one. It has been suggested that there exist places all over the world that serve as doorways from our world to another. These doorways may provide access for entities to come into our world. ব্যাপারটা বুঝলে? ভিন্ন বিশ্বের ভিন্ন-ভিন্ন এন্টিটি— যারা তাদের ডাইমেনশানের জন্য স্বাভাবিক হলেও আমাদের ডাইমেনশানে একেবারেই অস্বাভাবিক, এখানে এসে পড়লে তাদের প্রভাব রীতিমতো ক্ষতিকর হতে পারে। একেই পোর্টাল হন্টিং বলা হয়। এর উদাহরণ বহুযুগ ধরেই রেকর্ড করা হচ্ছে।”

    “কীরকম?”

    “ক্রপ সার্কেল জিনিসটা তো জানই। অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তু দেখতে পাওয়া, নানাধরনের দৈত্য-দানব জাতীয় জীবের মুখোমুখি হওয়া— এগুলো সবই পোর্টাল হন্টিং-এর উদাহরণ। এই মহাবিশ্বের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় বারবার এই অতিপ্রাকৃতিক ঘটনাগুলো ঘটেছে! বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো কারণে সেই অঞ্চলগুলোতেই শক্তির হেরফের হয়ে সাময়িকভাবে পোর্টাল তৈরি করে। অনেকে এও মনে করেন যে প্রাচীন যুগে কেউ-কেউ কোনোভাবে এমন পোর্টালের নাগাল পেয়েছিলেন। সেইভাবে দেখা-শোনা নানা অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে নানা কাব্য বা সাহিত্যে ধরা পড়েছিল।”

    “কিন্তু প্রফেসর, এই পোর্টাল কোনো মানুষের পক্ষে কি খুলে ফেলা বা অ্যাক্সেস করা সম্ভব?”

    “অবশ্যই সম্ভব। বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট পন্থা এবং আচারের মাধ্যমে যে অন্য জগতের বাসিন্দা এন্টিটি-কে আহ্বান করা সম্ভব— এ তো আমি দেখেইছি। সেটা এই ধরণের পোর্টাল ওপেনিং ছাড়া আর কী? সবচেয়ে বড়ো কথা, আমার ধারণা যে পোর্টাল খোলার পর ঠিকঠাক বন্ধ না করা হলে ওই জায়গা বছরের পর বছর সক্রিয় থাকে। পোর্টাল হন্টিং-এর অনুঘটক হিসেবে সেটাই কাজ করে চলে তারপরেও।”

    “আর ডেমনিক হন্টিং?”

    “ডেমনিক হন্টিং-এর সিলেবাস বিশাল বড়ো।” বিরসবদনে বললেন প্রফেসর। তারপরেই তাঁর চোখ কৌতুকে চকচক করে উঠল, “তার ওপর রান্নাঘর থেকে যা সুগন্ধ আসছে, তাতে এ-সব আর মাথায় আসছে না। পরে হবে না হয়।”

    “ছোটো করে হলেও বলে যান, প্রফেসর।” আকুল হয়ে বলে উঠলাম, “আবার দুম্ করে কখন অন্য গল্পে চলে যাবেন! এটা আর শেষ হবে না।”

    “ছাড়বেই না যখন, তাহলে ছোটো করেই বলি।” বসে পড়লেন প্রফেসর। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন।

    “প্রায় সব সভ্যতার কিংবদন্তি, সাহিত্যে, মিথলজিতে এই ডেমন বা অপদেবতার সন্ধান পাওয়া যায়। শুধু খ্রিস্টান ভাবনার উদাহরণই দিই। নিউ টেস্টামেন্ট অনুযায়ী লুসিফারের সঙ্গে ঈশ্বরের যুদ্ধে কিছু দেবদূত লুসিফারের পক্ষ নিয়েছিল। ঈশ্বর ক্রুদ্ধ হয়ে লুসিফার এবং তার সমস্ত সহযোগী বিদ্রোহীদের স্বর্গ থেকে চিরতরে বিতাড়িত করেছিলেন। সেইসব পথভ্রষ্ট দেবদূতই হল ডেমন। তাদের দলপতি লুসিফার- যাকে আমরা ডেভিল বা শয়তান নামেও চিনি।

    অজস্র ডেমনের কথা শোনা ও পড়া যায়। এরা সাধারণত মানুষকে বিভিন্ন খারাপ কাজে প্ররোচিত করে থাকে। ডেমনিক হন্টিং যে-সব কারণে দেখা যায় তাদের মধ্যে থাকবে শয়তানের সাধনা, ব্ল্যাক ম্যাজিকের ভুল প্রয়োগ, উইজা বোর্ডের ভুল সঞ্চালনা, আর অতি অবশ্যই ডেমনকে বিশেষভাবে ডেকে আনার ঘটনা।

    এক-একটি ডেমন এক-এক ধরনের ক্ষমতার অধিকারী হয়। মানুষ যখন মানসিকভাবে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় থাকে, তাকে সহজ অথচ ভুল রাস্তা দেখিয়ে অন্ধকারের পথে টেনে নিয়ে যায় এই ডেমনরা। ঈশ্বরের সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টি হল মানুষ তাকেই বিপথগামী করে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে সেই আদসিম যুদ্ধটা তারা আজও চালিয়ে যাচ্ছে। অকস্মাৎ অথচ অকারণে শরীর ও মনের কষ্ট, হঠাৎ দুর্গন্ধে কাবু হওয়া, বিকট আওয়াজ শুনতে পাওয়া, দুঃস্বপ্ন, নিজের ক্ষতি করার ইচ্ছে— এগুলো সবই ডেমনিক হন্টিং-এর নিদর্শন। তাই এমন জিনিসের শিকার হওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধার করার জন্য গোস্ট-হান্টাররা সাধারণত উপযুক্ত এক্সোরসিস্টের সাহায্য নেন! এক্সোরসিজম নিয়ে নিশ্চয়ই কিছু জিজ্ঞাসা করবে না, কৌশিক। হাজারটা সিনেমা দেখে ফেলেছো— আমি জানি।”

    নীরবে হেসে মাথা নাড়লাম শুধু।

    .

    ।। ৮।।

    অতীতের কড়া নাড়া

    “তখন আমি হোলি ট্রিনিটি চার্চের সঙ্গে একটা কাজ করছি।” প্রফেসরের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল, “একদিন ঘরে ফিরে দেখলাম, আমার নামে একটা চিঠি এসেছে। টাসের চিঠি।”

    “টরাস?”

    “ওহো, তোমাকে এত কথা বললাম; টরাসের কথাই বলা হয়নি। সে না থাকলে তো এ গল্পের শুরুই হবে না। টরাস রেজমন্ড ছিল একজন স্থানীয় গোস্ট হান্টার। একটা কেস সলভ করতে গিয়ে তার সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল। কেসটা রীতিমতো জটিল ছিল। সে-সব সামলানোর ফাঁকে আমাদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্বও গড়ে উঠেছিল। আমরা দু’জন মিলে অনেকগুলো কেস সলভ করি। বেশ চলছিল, জান। কিন্তু একদিন হঠাৎ টরাস দুম করে হারিয়ে গেল।”

    “হারিয়ে গেল মানে?” আমি প্রশ্ন করি!

    “টরাস নিরুদ্দেশ হয়ে গেছিল। আমি তো বটেই, অ্যাসোসিয়েশানের লোকেরাও চারদিকে খবর নিয়ে ওর কোনো হদিশ পাইনি। শেষ অবধি পুলিশ আর প্রশাসনের সাহায্যও নেওয়া হয়। কিন্তু টরাস যেন বেমালুম উবে গেছিল। ধরেই নিয়েছিলাম যে টরাসের সঙ্গে খারাপ কিছু একটা ঘটেছে। সেটাও নিশ্চয় এমনই— যা ট্রেস করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব।”

    “তার মানে?”

    “আমরা কেউই তো খুব একটা স্বাভাবিক কাজ-কর্ম করি না, কৌশিক। তাই আমাদের কাজের একটা প্রতিক্রিয়াও থেকেই যায়। যতই সাবধানে কাজ করি না কেন, কোনো না কোনো সময়ে, কোনো এক অসাবধান মুহূর্তে অতীত এসে ব্যাকফায়ার করতেই পারে। এই চরম সত্য জেনে আর মেনেই আমি, টরাস, বা আমাদের মতো প্রতিটি যোদ্ধা… বা শিকারি কাজে নামি। যাইহোক, এতদিন পরে সেই টরাসের চিঠি পেয়ে মনটা আনন্দে ভরে উঠেছিল। ভেবেছিলাম, যাক মানুষটা বেঁচে আছে তাহলে।”

    “টরাসের চিঠিতে কী ছিল প্রফেসর?”

    “দাঁড়াও। চিঠিটা তোমাকে পড়ে শোনাই।”

    .

    ।। ৯।।

    টরাসের চিঠি

    ‘প্ৰিয় সোম,

    চিঠির শুরুতেই তোমার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। অবশ্য যেমন আচরণ আমি তোমাদের সঙ্গে করেছি, তার বোধহয় ক্ষমা হয় না। তবু, বিশ্বাস করো বন্ধু, আমার আর কোনো উপায় ছিল না। ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। দমবন্ধ হয়ে আসছিল। আলো আর অন্ধকারের ওই অন্তহীন দ্বন্দ্ব থেকে আমি পালাতে চেয়েছিলাম। চেয়েছিলাম নতুন করে সব কিছু শুরু করতে, সাধারণ মানুষের মতো করে বাঁচতে। অতীতের কোনো ছায়াই যাতে আমাকে আর স্পর্শ করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করার জন্যই তোমাদের কিচ্ছুটি না জানিয়ে এইভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছিলাম। কারও সঙ্গে সম্পর্ক রাখিনি। নতুন পরিচয়ে নতুন করে সবটা শুরুও করেছিলাম।

    তুমি শুনলে খুশি হবে, যা চেয়েছিলাম, তা পেয়েওছিলাম। একটু-একটু করে গড়ে উঠছিল আমার স্বপনীড়। আগের মতো কড়া তামাক আর অ্যালকোহলের গন্ধে নয়, আমার সকাল হত সুন্দরী স্ত্রীর হাতে গড়া প্যানকেকের মিঠে গন্ধে। স্নান করে, ব্রেকফাস্ট সেরে, বউয়ের কপালে চুমু দিয়ে আমি কাজে যেতাম। সারাদিন কাজ সেরে আবার ফিরে আসতাম বাড়িতে। কখনও হাতে অপ্রত্যাশিত উপহার থাকলে তাই দেখে বউ দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরত। তার শরীরের মিষ্টি গন্ধ আমার সন্ধেটা সার্থক করে তুলত, সোম।

    সত্যিই বড্ড খুশি ছিলাম! গোস্ট-হান্টার হিসেবে জীবনে যা কোনোদিন পাইনি, সেই অনাবিল শান্তিই পেয়েছিলাম। সব ভালো চলছিল। কিন্তু একদিন…! একদিন এক বিষম কালো ঝড় এসে আমার সাজানো সংসারটা তছনছ করে দিয়ে গেল। তিলে-তিলে গড়ে ওঠা স্বপনীড় নিমেষে শশ্মানে পরিণত করে সেটা। আমি কিছুই করতে পারলাম না।

    অস্বীকার করব না, সুখের দিনেও এমন কিছু হওয়ার আশঙ্কা আমার সঙ্গী ছিল। অতীতের অন্ধকার যে কোনো এক দিন এসে আমার বর্তমানকে কালিমা লিপ্ত করে দিতে পারে— এ-কথা আমার অজানা ছিল না। সেই বুঝে যথাসম্ভব সতর্কতা অবলম্বনও করেছিলাম। তবু তাকে ঠেকাতে পারলাম না।

    বিশ্বাস করো, এই মুহূর্তে আমার কাছে আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। বাকিদের কথা আমি জানি না, কিন্তু তুমি যে আজও আমার কথা ভাব— সে-কথা আমি জানি। তাই অসহায়ভাবে বলছি, একবার এসো, সোম। একবার এসো আমার কাছে। জানি, এ আমার একার লড়াই। কিন্তু লড়ার মতো মানসিক দৃঢ়তা আমার আজ আর নেই। অর্ধমৃত হয়েও এখনও বেঁচে আছি শুধু এটুকু জানার জন্য যে আমার এত বড়ো সর্বনাশটা কে করল।

    আমার এখনকার নাম আর ঠিকানা রইল চিঠিতে। পারলে এসো সোম— আর একবার, শেষবারের মতো।

    ইতি,

    তোমার বন্ধু টরাস’

    .

    ।। ১০।।

    হেলেনা’র শ্যাওলা

    অদ্ভুত ব্যাপার!

    কালকেই পুরো বেসমেন্ট পরিষ্কার করে দিয়ে গেল লোকটা। একদিনের মধ্যেই এগুলো এতটা বেড়ে গেল কীভাবে? অস্বাভাবিক কাণ্ড! বেসমেন্টের দেওয়ালে লেগে থাকা চাপ-চাপ শ্যাওলার ছাপ দেখে গা গুলিয়ে উঠল হেলেনা’র। কীরকম বিশ্রি একটা গন্ধও বেরিয়ে আসছিল ওগুলো থেকে।

    এদিকে টরাসও নেই; দু’দিন ধরে বাড়ি ফেরেনি। স্থানীয় অফিসে খোঁজ নিয়েছিল হেলেনা। তারা জানিয়েছে, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে রাস্তায় ধ্বস নেমেছিল। ফলে টরাসের টিম রাস্তা সারাইয়ের কাজে গিয়ে দূরের পাহাড়ে আটকে গেছে। এদিকে বৃষ্টিরও বলিহারি চারদিন ধরে চলছে তো চলছেই। এতদিন আছে এখানে, কিন্তু নীচের বেসমেন্টে কোনোদিন জল জমতে দেখেনি হেলেনা। এবার তাও দেখা হল। পইপই করে সে টাসকে বারণ করেছিল, যাতে এই নির্জন জায়গায় এত বড়ো একটা বাড়ি ভাড়া না নেয়। সে-কথা সে শুনলে তো! লোকচক্ষু থেকে নিজেকে আর তাকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য টরাস কেন যে এত চেষ্টা করে… কে জানে।

    ভাগ্যিস নতুন প্লাম্বার ভদ্রলোককে পাওয়া গেল। না হলে জল বোধহয় এতক্ষণে ওপরেই উঠে আসত। চেনা প্লাম্বার বৃষ্টির জন্য আসতে পারেনি। তবে এই নতুন লোকটির সঙ্গেই আবার যোগাযোগ করতে হবে মনে হচ্ছে। এই বিশ্রী শ্যাওলার উৎপাত একেবারেই বরদাস্ত করা যাবে না।

    বেসমেন্টের লাইট নিভিয়ে বেরিয়ে এল হেলেনা। অন্ধকার বেসমেন্ট আর শ্যাওলার ছাপগুলো মিশে কেমন যেন অপার্থিব কিছুর মতো ঠেকছিল। বুকে ক্রশ এঁকে বেসমেন্টের দরজা বন্ধ করে দিল হেলেনা।

    ডিনার সেরে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল হেলেনা। হঠাৎ একটা আওয়াজে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল।

    কেউ যেন দরজায় আঘাত করছিল!

    ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সজাগ হয়ে উঠল হেলেনা। এত রাতে কে এল? তবে কি টরাস ফিরে এসেছে?

    গাউন গায়ে চাপিয়েই সে বেরিয়ে পড়ল রুম ছেড়ে; তারপর সদর দরজার কি-হোলে চোখ রাখল। কিন্তু বাইরে তো কেউ নেই। তবে কি কেউ বদ রসিকতা করছে তার সঙ্গে?

    আবার আওয়াজ হল— এবার একেবারে কাছে।

    মেরুদণ্ড দিয়ে হিমস্রোত বয়ে গেল হেলেনা’র। আওয়াজটা আসছিল বেসমেন্টের দরজা থেকে— কেউ যেন প্রবল আক্রোশে দরজায় আঘাত করে চলেছে।

    কী করবে বুঝে উঠতে পারল না হেলেনা। সে কি এই মুহূর্তেই বাড়ি ছেড়ে দৌড়ে পালাবে? নাকি সে বেসমেন্টের যে… বা যা আছে, তার মুখোমুখি হবে?

    ইষ্টনাম জপতে-জপতে বেসমেন্টের দরজার দিকে এগিয়ে গেল হেলেনা। দরজা খুলতেই একটা তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ পেল সে। কাঁপা কাঁপা হাতে সুইচ বোর্ডের দিকে হাতড়াতেই ভেজা-ভেজা কী যেন একটা লাগল হেলেনা’র হাতে। ঘেন্নায় হাত সরিয়ে নিতে চাইল হেলেনা – কিন্তু পারল না! ততক্ষণে শ্যাওলা ঢাকা একটা হাত হেলেনা’র হাতকে শক্ত করে ধরে ফেলেছিল।

    .

    ।। ১১।।

    সূত্রের সূচনা

    “কোনো সন্ধান পাওনি?”

    “না।” রুদ্র সোমের প্রশ্নের উত্তরে মাথা নেড়ে জানালেন টরাস। তাঁরই স্টাডিরুমে বসে ছিলেন তাঁরা দু’জন।

    প্রাথমিক ঝড়-ঝাপ্টা সামলে নিলেও টরাসের মুখে বিষাদের ছাপ স্পষ্ট ছিল। সেটা দেখেই ঈষৎ নরম গলায় সোম জানতে চাইলেন, “পুলিশকে খবর দিয়েছ?”

    “সেটা তো করতেই হয়।” দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোজা হলেন টরাস, “কিন্তু তুমি-আমি ভালো করেই জানি, এ-সব ব্যাপারে তাদের কিছুই করা থাকে না। বেসমেন্টের দেওয়ালের ছাপগুলো তো তুমিও দেখেছ, সোম। তোমার কী মনে হয়?”

    “তুমি যা ভেবেছ— সেটাই ঠিক। প্রতিহিংসার বশে কোনো ডেমনিক স্পেল কেউ প্রয়োগ করেছে। হেলেনাকে টেনে নিয়ে…”

    “নরকের অন্ধকারে অনন্তকাল ধরে পুড়িয়ে মারবে।” সোমের কথা শেষ করতে না দিয়েই ডুকরে কেঁদে উঠলেন টরাস।

    “নিজেকে সামলাও টরাস। যা হয়ে গেছে, তাই নিয়ে আর আমাদের কিছু করার নেই। বরং এই ঘৃণ্য অপরাধ যে করেছে, তাকে শাস্তি দিয়ে হেলেনা’র যন্ত্রণা কিছুটা হলেও লাঘব করাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।”

    প্রফেসরের কথায় নিজেকে সামলে নিলেন টরাস। নিচু গলায় বললেন, “এতবছর ধরে আত্মগোপন করে ছিলাম। তারপর কে আমার ওপর শোধ তুলতে গিয়ে হেলেনা’র এই সর্বনাশ করল, সোম? আমি তো সব ছেড়ে দিয়েছিলাম!”

    “এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়, টরাস। তবে এমন স্পেল যে কাস্ট করেছে, সে নিতান্ত সাধারণ লোক নয়। আর হ্যাঁ, সরাসরি তোমাকে শাস্তি দিলে এর সাধ মিটত না। বরং হেলেনাকে টার্গেট করে সে তোমাকে তিলে-তিলে যন্ত্রণা দিতে চেয়েছে— এটা বলাই যায়। ভালো কথা, এর মধ্যে তোমাদের বাড়িতে নতুন কেউ এসেছিল?”

    “আমি তো কয়েকদিন ধরে বাড়িই ফিরতে পারিনি। তবে পড়শিদের জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছি, এই ঘটনার একদিন আগে নাকি প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও এক প্লাম্বার এসেছিল এ-বাড়িতে। বুড়ি সামান্থা তাকে দেখে হেলেনা’র কাছে জানতে চেয়েছিলেন, এত বৃষ্টির মধ্যে কে এল। তখন হেলেনাই তাকে জানিয়েছিল।”

    “প্লাম্বারের সঙ্গে কথা বলেছিলে?”

    “বলেছিলাম। সে নাকি কিছুই জানে না।”

    “আমার মন বলছে, সেই সব জানে, টরাস। ওকে চেপে ধরলেই সবটা জানা যাবে।” দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলেন প্রফেসর সোম।

    .

    ।। ১২।।

    আগন্তুক প্লাম্বার

    “সত্যি বলছি, স্যার।” টরাসের চোখ দেখে একঝুড়ি মিথ্যে বলতে আর সাহস পায়নি তার প্লাম্বার, “যে পাবে আমি যাই, সেখানেই লোকটা যেচে আমার সঙ্গে আলাপ করেছিল। আমি কিছু করতে চাইনি।”

    “তারপর?”

    “লোকটা আমাকে একগাদা টাকা দিয়ে বলেছিল, কোনোদিন যদি আপনার বাড়ি থেকে কোনো কাজ আসে, তাহলে যেন তাকেই কাজটা করার সুযোগ দিই। লোকটা বলেছিল, আপনাকে খুশি করলে নাকি আরও কাজ পাবে সে। এদিকে টাকার পরিমাণ এত বেশি ছিল যে আমি আপত্তি করতে পারিনি। বুঝতেই পারছেন, জুয়ার আড্ডা আর বারে বিস্তর ধারদেনা হয়ে গেছিল। তারপর ওই বৃষ্টির দিন আমার বেরোনোর অবস্থা ছিল না। এদিকে আপনার বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল। বাধ্য হয়ে ওই পাবের ওপরের যে সরাইয়ে লোকটা থাকছিল, সেখানে খবর দিয়ে দিই। এর বেশি কিছু জানি না, স্যার। বিশ্বাস করুন!”

    ভ্যাপসা, অন্ধকারাচ্ছন্ন, অ্যালকোহলের গন্ধে নিমজ্জিত সরাইখানায় গিয়ে অবশ্য হতাশ হতে হল দু’জনকেই। সেই লোকটি আর সেখানে ছিল না।

    “আপনারা যেই হোন, কাস্টমার সম্পর্কে আপনাদের কিচ্ছু জানাতে আমি বাধ্য নই।” সরাইখানার মালিক কার্টার ব্যাজার মুখে কথাগুলো বলল। হতাশভাবে টরাস সোমের দিকে তাকালেন। কিন্তু রুদ্র সোম কিছু বলার আগেই কার্টার বলে উঠল, “কিন্তু আপনারা যাঁর বর্ণনা দিয়েছেন, সেই ভদ্রলোক এই সরাইখানা ছেড়ে যাওয়ার সময় একটা চিঠি দিয়ে গেছেন। তিনি বলে গেছেন, ওঁর সম্পর্কে কেউ খোঁজ করতে এলে এই চিঠিটা যেন তাকে দিয়ে দেওয়া হয়।”

    টরাসের হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিল কার্টার। তার ভেতরের চিঠিতে লেখা ছিল-

    ‘প্রিয় টরাস,

    তুমি আমাকে চিনবে না। কিন্তু আমি তোমাকে চিনি, তোমার গল্প জানি। আমি জানি, ঠিক এই মুহূর্তে তোমার মনের মধ্যে কী প্রবল ব্যথার ঝড় উঠেছে। এর সবটাই আমি জানি, কারণ তোমার জীবনে নেমে আসা এই অন্ধকারের অনুঘটক আমি নিজেই।

    এই মুহূর্তে আমাকে সামনে পেলে আমার টুটি চেপে ধরতে, তাই না? দীর্ঘদিনের অব্যবহারে জং-ধরা ক্রশটা খুঁজে বের করে আমার বুকে আমূল গেঁথে দিতে। একসময় ধারালো, আজ ভোঁতা ছুরিটা বের করে আমার শরীর থেকে মুণ্ড আলাদা করতে ব্যস্ত হতে। কিন্তু তুমি এর কিছুই করতে পারবে না। যখন এই চিঠি তোমার হাতে পড়বে, তখন আমি অনেক দূরে চলে গেছি।

    আমি কে? ধরে নাও, আমিও তোমাদের মতোই আলো আর অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এক ক্ষুদ্র সৈনিক। কিন্তু তোমাদের সঙ্গে আমার একটা সামান্য পার্থক্য আছে। আসলে আলো আর অন্ধকারের এই লড়াইতে তোমরা এতই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছ যে দুইয়ের মাঝে সূক্ষ্ম ব্যবধানগুলো প্রায়ই তোমাদের নজর এড়িয়ে যায়। সেখানেই শুরু হয় আমার কাজ। সেই সূক্ষ্ম ব্যবধানের জায়গায় দাঁড়িয়ে ন্যায় আর অন্যায়ের ভারসাম্য রক্ষা করি আমি।

    এত কথা বলার কোনো প্রয়োজন ছিল না। ভেব না যে তোমার প্রতি আমার কোনো সহানুভূতি বা দুর্বলতা আছে। আসলে কাক কাকের মাংস খায় না, অন্তত খেতে পছন্দ করে না। আমি পেশাদার; ক্লায়েন্টের দেওয়া কাজ পূরণ করায় কোনো খামতি আমি রাখিনি। ক্লায়েন্টের পরিচয়ও আমি প্রকাশ করব না। কিন্তু ওই যে বললাম, দিনের শেষে ন্যায়-অন্যায়ের সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার একটা ছোট্ট দায়ভার আমার ওপর এসে পড়ে। তাই টরাস, আমি একটা সূত্র রেখে যাচ্ছি তোমার জন্য। জানি না তার মাধ্যমে তুমি তোমার মনে ভেসে আসা হাজার প্রশ্নের ভিড়ে কোনো উত্তর পাবে কি না। তবে আমি আশা রাখব যে তুমি পারবে।

    বহু বছর আগে ঘটে যাওয়া একটা দৃশ্য তোমাদের মনে করিয়ে যেতে চাই। একটা গভীর জঙ্গলের মধ্যে এক পাগলাটে বুড়ি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তার বংশের শেষ প্রদীপটিকে দমকা হাওয়ায় নিভে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সে দু’জন মানুষের সঙ্গে একটা চুক্তি করতে চাইছে। কিন্তু সেই চুক্তি তারা কোনোদিনও মানতে পারেনি, মানেওনি।

    ইতি

    তোমার বন্ধু…’

    চিঠিটা রেখে গুম হয়ে বসে রইলেন টরাস।

    “বুঝতে পারছ কার কথা বলা হচ্ছে এখানে?” সোম প্রশ্ন করলেন।

    “বুঝতে পারছি, সোম। সেই রাতে ওই রক্তবীজের ঝাড়টাকে শেষ না করার ফল আমাকে আজ চুকোতে হচ্ছে।”

    “কিন্তু চিঠিতে কোন চুক্তিভঙ্গের কথা বলা হয়েছে?”

    “এটা তোমার জানার কথা নয়, সোম।” দীর্ঘশ্বাস ফেললেন টরাস, “ভ্যাম্পায়ারদের গ্রামটাকে আমাদের দল তখন চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছিল। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বাড়িগুলোতে। সেই চরম বিশৃংখলার মধ্যে এদিকওদিকে ছুটতে গিয়ে তুমি একটা পুরোনো, পরিত্যক্ত কুয়োয় পড়ে গেছিলে— মনে পড়ে?”

    “হ্যাঁ, মনে আছে। পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। পরে জেনেছিলাম, তুমি আমাকে উদ্ধার করেছ।”

    “একা পারিনি, সোম। ওই বুড়ি ভ্যাম্পায়ার না থাকলে তোমাকে ফিরে পেতাম না সেদিন। সে সাহায্য করেছিল বলেই তোমাকে খুঁজে পেয়ে তুলে আনতে পেরেছিলাম আমি।”

    “তাই তুমি ভিক্টোরিয়াকে কথা দিয়েছিলে?”

    “হ্যাঁ। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তাকে আর তার অন্তিম বংশধর নাতনির কোনো ক্ষতি করব না আমরা। বিনিময়ে তারা আজীবন লোকচক্ষুর আড়ালেই থাকবে। মানুষের নয়, বুনো পশুর রক্তপান করেই টিকে থাকবে— এই শর্ত ছিল তাদের ওপর। তবু…”

    “কথার খেলাপ করে ভালো করনি, টরাস।” গম্ভীর গলায় বললেন সোম, “অন্তত আমাকে এ-কথা জানানো উচিত ছিল। আমরা ভগবান নই। অপরাধের দায় আমাদের নিতেই হয়।”

    গ্লানিময় দু’চোখ নামিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন টরাস।

    .

    ।। ১৩।।

    স্ট্রেচউডের গহীনে

    ‘কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এখানে কারও প্রবেশ নিষিদ্ধ। তারপরেও কেউ সীমানা পেরিয়ে প্রবেশ করলে তার দায়িত্ব নিয়মভঙ্গকারীর।’

    লোহার পাতে লেখা সতর্কবার্তা সময়ের ধারে আর মরচের ভারে জরাজীর্ণ হয়ে প্রায় অদৃশ্য। তার সামনে দাঁড়িয়ে সোম আর টরাস কিছু একটা দেখছিলেন— হয়তো বা অতীতকেই।

    “কিছুই বদলায়নি, তাই না সোম?”

    “হ্যাঁ।” সায় দিলেন সোম, “তারের বেষ্টনীতে আবৃত স্ট্রেচউড ফরেস্ট, সরকারের সতর্কবাণী— এগুলোর কোনোটাই বদলায়নি।”

    সোমের মনে হচ্ছিল, ওপাশের ঘন অন্ধকার জঙ্গল যেন দু’ হাত তুলে তাদের সাদরে আহ্বান জানাচ্ছে— পনেরো বছর আগে যেমনটি জানিয়েছিল। ভারি অদ্ভুত এই জঙ্গল! দিনের বেলাও এখানে সূর্যরশ্মির প্রবেশাধিকার নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোম মাথা নাড়লেন। এই অন্ধকার জঙ্গলেই যে অন্ধকারের জীবেরা ঠাঁই নেবে— এ আর আশ্চর্য কী?

    “পনেরো বছর আগের ভুলটা শোধরাতে হবে আমাকে।” টরাস সোজা হয়ে দাঁড়ালেন এবার।

    “আমাকে নয়, টরাস। আমাদের দু’জনকেই এবার ভুল শোধরাতে হবে।”

    “না, সোম। এই লড়াই আমার। তুমি এবার ফিরে যাও। আমাকে একা যেতে দাও। আমার তো হারানোর আর কিছু নেই। কিন্তু তোমার এখনও অনেক লড়াই বাকি। মানুষের

    এখনও প্রয়োজন আছে তোমাকে।”

    “একার লড়াই হলে আমাকে ডাকতে গেলে কেন? প্রতিশোধ তো একাই নিতে পারতে।”

    “তুমি পাশে না থাকলে মাথা তোলার শক্তিটুকুও পেতাম না। পাশে ছিলে বলেই তো এতদূর এসেছি। কিন্তু এবার…”

    “এবার আমাদের পালা, টরাস!” টরাসের দু’ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে উঠলেন সোম, “এই গল্পের শুরুতে আমরা দু’জনে ছিলাম। শেষেও আমরা দু’জনেই থাকব। বুঝেছ? আর সময় নষ্ট কোরো না বা করিও না।”

    দীর্ঘশ্বাস ফেলে টরাস পুরু দস্তানা দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া তুলে ধরে কাটার দিয়ে তার একটা অংশ কেটে ফেললেন। তারপর পরমপিতার নাম নিয়ে তাঁরা দু’জন ঢুকলেন স্ট্রেচউড ফরেস্টের গভীরে।

    দিনের আলো পুরোমাত্রায় থাকলেও জঙ্গলের ভেতর জমাট বাঁধা অন্ধকার। নিজের ব্যাকপ্যাক থেকে হাই পাওয়ারের টর্চখানা বের করলেন সোম— জঙ্গলের মধ্যে এটি কাজে লাগবে।

    “থামুন! জঙ্গলের ভেতরে যাবেন না।”

    বাজখাঁই গলার হুঙ্কারে থেমে গেলেন দু’জনেই। পেছনে ফিরে দেখলেন, জলপাই রঙের জ্যাকেট পরা, টুপি মাথায় একজন লোক বন্দুক তুলেছে তাঁদের দিকে। চড়া গলায় সে বলে উঠল, “কে আপনারা? এখানে কী করতে এসেছেন? জঙ্গলে ঢুকতে চাইছেন কেন?”

    “জঙ্গলের ভেতরে কাজ আছে। আপনি আমাদের বাধা দিচ্ছেন কেন?”

    “ভারসাম্য বজায় রাখার দায়িত্ব আমাকেই দেওয়া আছে।” লোকটা চিবিয়ে-চিবিয়ে বলল, “বাইরে থেকে কেউ জঙ্গলে ঢুকবে না। জঙ্গল থেকেও কিছু বাইরে বেরিয়ে আসবে না। তবেই বজায় থাকবে চুক্তি। তাহলেই বজায় থাকবে শান্তি।”

    “রাখুন আপনার চুক্তি! কাজ আছে বলেই ভেতরে যেতে হচ্ছে আমাদের। সময় নষ্ট করবেন না।” ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলে উঠলেন টরাস।

    “তা হলে মরার জন্য তৈরি হোন। এতদিন ধরে চলে আসা এই শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থাকে নষ্ট করার অধিকার কারও নেই। এমনকি তারা পাগল হলেও ছাড় পাবে না!” টরাস আর সোমকে বন্দুকের নিশানায় নিয়ে বলল লোকটা।

    ।।১৪।।

    রক্তবীজের পুনরুত্থান

    এবড়ো-খেবড়ো রুক্ষ জমি, অন্ধকার ঝোপঝাড়, নাম-না-জানা পাহাড়ি ফুল, খাদের কিনারায় পাহারাদার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা লম্বা ঝাউ— এইসব নিয়েই স্ট্রেচউড ফরেস্ট। মাটির মতো এখানে আকাশও ঘোলাটে। দিবারাত্রি ধূসর কুয়াশার আস্তরণ যেন বাইরের দুনিয়ার সরল সমীকরণ থেকে এই জায়গাটাকে আলাদা করে রাখে। প্রতিনিয়তই সে যেন বুঝিয়ে দেয়, বাইরের মানুষের এখানে আসা বারণ।

    অদ্ভুত ব্যাপার! এমন জঙ্গলের মধ্যেও পায়ে হাঁটা একটা পথের রেখা আজও দৃশ্যমান। সেটা ধরে সন্তর্পণে এগিয়ে চলেছিলেন টরাস আর সোম।

    “আগের কথা মনে পড়ছে, তাই না সোম?”

    “তা তো পড়ছেই, টরাস। এই জঙ্গলের রাস্তা, সেই রাত— এদের ভুলব কী করে, বল?”

    “তবে তুমি কিন্তু আগের থেকে অনেক কঠোর হয়ে গেছ, সোম। এককালে তুমি একটা ভ্যাম্পায়ারকেও মারতে দ্বিধাবোধ করতে। সেই তুমি আজ এক নিরীহ বনরক্ষীকে ওভাবে জন্তুর মতো পিঠমোড়া করে বাঁধলে!”

    “ভুল করছ। সেদিনের ভ্যাম্পায়ারটা ছিল স্রেফ একটা বাচ্চা মেয়ে। তাই আমার হাত থমকে গেছিল। আর আজকের ওই রক্ষীটিকে না বাঁধলে সে কি আমাদের যেতে দিত? এই জঙ্গলের মুখে এসে ফিরে যাবার লোক আমি নই; তুমিও নও।”

    ক্ষণিকের জন্য হলেও টরাসের মুখে একটা চওড়া হাসি ফুটে উঠল। পরক্ষণেই সেটা মুছিয়ে দিল একটা আওয়াজ। কেউ যেন শুকনো পাতার মধ্যে দিয়ে দৌড়ে গেল!

    সজাগ হয়ে উঠলেন টরাস আর সোম। সিলভার বুলেট ভরা রিভলবার ছিল দু’জনের হাতেই। কান পেতে আশপাশটা বুঝতে চাইলেন তাঁরা।

    তখনই দূরে কোথাও যেন একসঙ্গে হাজার নেকড়ে ডেকে উঠল। সেই গর্জনের প্রাবল্য এতটাই তীব্র ছিল যে সোম আর টরাস বাধ্য হলেন দু’কান সজোরে চেপে ধরতে। আওয়াজটা একটু থিতিয়ে এলে তাঁরা শব্দের উৎস আন্দাজ করে সেদিকে এগোলেন। একটা জরাজীর্ণ প্রাসাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন তাঁরা। বিশাল বাড়িটা সময়ের কঠোর শাসনে ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত হয়েও অতীতের গৌরব আঁকড়ে যেন কোনোমতে টিকে ছিল।

    দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান দুই শিকারিকেই বুঝিয়ে দিল, তাঁরা গন্তব্যের কাছে পৌঁছে গেছেন। নিজেদের ব্যাগ খুলে প্রয়োজনীয় সামগ্রী বের করে নিলেন তাঁরা। জোরে চাপ দিতেই খুলে গেল দরজা। অতীত আর অন্ধকার মেশানো গুমোট একটা গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা মারল তক্ষুনি।

    এই গন্ধ চেনেন তাঁরা দুজনেই। সোম দেখলেন, আগ্রহ আর উত্তেজনায় টরাসের চোখ থেকে শোক মুছে গিয়ে ফিরে এসেছে শিকারের উন্মাদনা।

    “টরাস? সোম? তোমরা এসে গেছ! তোমাদের দেখার জন্যই তো বেঁচে আছি এখনও। অন্তহীন এই অপেক্ষা আজ শেষ হবে। নির্দ্বিধায় ওপরে উঠে এসো তোমরা।”

    ফ্যাশফ্যাশে একটা কণ্ঠ ভেসে এল ওপরের তলা থেকে। সোম আর টরাস সতর্কভাবে সিঁড়ি ধরে দোতলায় উঠতে শুরু করলেন।

    .

    ।। ১৫।।

    শোধ বোধ

    চোখ সইয়ে নেওয়ার জন্য টর্চ নিভিয়ে দিয়েছিলেন দু’জনেই। তবু সোমের মনে হচ্ছিল, আশেপাশের অন্ধকার যেন নির্জীব নয়। সেও যেন ওঁদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চেহারা বদলে সঙ্গে চলেছে।

    দোতলার একটা ঘরে পৌঁছোলেন সোম আর টরাস। ঘরে মাত্র একটা মোমবাতি জ্বলছিল। সেই কম্পমান শিখার আলো দরজার ওপাশে একটা ছোট্ট আলোকিত বৃত্ত তৈরি করেই থেমে গেছিল। তাতে বোঝা যাচ্ছিল, ওপাশে একটা প্রকাণ্ড খাট আছে। কিন্তু সেখান থেকে বাকি সবটাই জমাট অন্ধকারে ঢাকা।

    “দুরে কেন, টরাস? কাছে এস, সোম। ভয় পাচ্ছ নাকি তোমরা?” গলাটাতে ব্যঙ্গ আর ক্রোধ মিশে ছিল। নিজেদের আড়ষ্ট ভাব কাটিয়ে এগিয়ে গেলেন সোম আর টরাস। বিছানার ওপর, একটা প্রায় মিশে যাওয়া কালচে শরীর, খুব কাছ থেকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন যে সেটা এখনও… বেঁচে আছে— যদি এই অবস্থাকে ‘বাঁচা’ বলা যায়।

    “আমি জানতাম, তোমরা আসবে! তোমাদের ওপর ভরসা আছে এখনও।” ক্ষীণ কণ্ঠেও তীব্র বিষ মিশে ছিল। ওই গল, অন্ধকারের মধ্যেও জ্বলতে থাকা লালচে চোখ— এগুলো চিনতে ভুল হয়নি দু’জনের।

    “আমরাও তোমাকে ভুলিনি, ভিক্টোরিয়া। সেই রাতে এই জঙ্গলে যে গল্পটা বাকি থেকে গেছিল, আজ তা শেষ হওয়ার পালা। কিন্তু তোমার তো আমাদের সঙ্গে হিসেব মেটানোর ছিল। শুধু-শুধু একজন নিরপরাধকে এভাবে অন্ধকারের বুকে ঠেলে দিলে কেন?” শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন সোম।

    “নিরপরাধ! কে নিরপরাধ? ওই টরাস, না তার বউ? সেই রাতে একটা বাচ্চা মেয়েকে যখন টরাস কুপিয়ে-কুপিয়ে মারছিল, তার নিষ্পাপ মুখটা একবারের জন্যও তোমার চোখে ভাসেনি? কথা দিয়েও কথা রাখনি তোমরা। এই পাপের ক্ষমা হয় না, সোম। তার শাস্তি টরাস ইতিমধ্যেই পেয়েছে। এবার তোমার পালা, সোম।”

    “তোমার প্রতিশোধের স্পৃহা এতটাই তীব্র ছিল! তাহলে নিজে হাতে আমাকে শাস্তি দিলে না কেন, ভিক্টোরিয়া? এক ভাড়াটে খুনির কেন দরকার হল একদা কিংবদন্তি ভ্যাম্পায়ারের?” টরাসের মুখেও তীব্র তাচ্ছিল্য ফুটে উঠল এতক্ষণে।

    “হা-হা! আমার এই শয্যাশায়ী অবস্থা দেখে পরিহাস করছ, টরাস? ঠিক বলেছ। নিজে হাতে তোমাদের ক্ষতি করার মতো ক্ষমতা আজ আর আমার মধ্যে অবশিষ্ট নেই। তোমাকে খুঁজতে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছিল। ততদিনে কালগ্রাসে জরাজীর্ণ হয়ে গেছিল আমার শরীর। তাই তোমাদেরই এক জাতভাইকে ভাড়া করে তোমাকে এই যন্ত্রণার স্বাদ দিলাম। এখন তুমিও বুঝছ তো, স্বজন হারানোর যন্ত্রণা কতটা তীব্র!” খলখল করে হেসে উঠল ভিক্টোরিয়া।

    “চোপ, শয়তান বুড়ি! অনেক কথা বলেছিস। এবার তোর চুপ হওয়ার পালা।” গর্জে উঠলেন টরাস। এক ছুটে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে রিভলভারটা তুললেন তিনি। ভিক্টোরিয়ার নারকীয় শরীরটা রুপোলি মৃত্যুর ছোবলে ছিন্নভিন্ন হওয়া সময়ের অপেক্ষাই ছিল। কিন্তু…

    একটা জান্তব গন্ধ নাকে এল সোম আর টরাসের। তারপরেই ভিক্টোরিয়া’র খাটের পেছনের জমাট বাঁধা অন্ধকারে জ্বলে উঠল রক্তলাল অজস্র চোখ। হিংস্র, ক্ষুধিত গর্জনে নেকড়েরা ভরিয়ে তুলল আকাশ-বাতাস। এত কাছ থেকে আসা সেই আওয়াজে যেন কানের পর্দা ফেটে যেতে চাইল তাঁদের।

    হতভম্ব টরাস কিছুটা পিছিয়ে এলেন। অন্ধকারের বুক চিরে এগিয়ে এল একঝাঁক নেকড়ে।

    “এই জঙ্গলের অন্ধকারের সন্তানদের চিনতে পারছ, টরাস? এরা আমারও সন্তান। কখনও আমার রক্তে এরা ক্ষুধা মিটিয়েছে, কখনও এদের রক্তে আমি! আমার রক্ত আজ প্রায় নিঃশেষিত। এবার তোমরাই এদের ক্ষিদে মেটাবে।” পাগলের মতো হাসতে শুরু করল ভিক্টোরিয়া।

    ততক্ষণে সোম বন্দুক নিয়ে তৈরি ছিলেন। কিন্তু মাত্র দুটো বন্দুকের জোরে এই রক্তলোলুপ নেকড়ের পালকে নিরস্ত করা অসম্ভব— এ-কথা তাঁরা দু’জনেই বুঝতে পারছিলেন।

    “তুমি যাও, সোম!” চিৎকার করলেন টরাস, আমি সামলে নেব।”

    “তুমি কি পাগল টরাস?” সোমও উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, “এই অবস্থায় তোমাকে ছেড়ে চলে যাব আমি! দু’জনেই মোকাবিলা করব। যা হওয়ার দু’জনেরই হবে!”

    “বোকামো কোরো না, সোম। আমার জীবনে আর কিছুই নেই। এটাই আমার শেষ লড়াই; আমাকে লড়তে দাও। তোমার এখনও অনেক যুদ্ধ বাকি আছে। তাছাড়া এই গল্পের শেষ হিসেবটা তোমাকেই মেলাতে হবে। না হলে আরও অনেকের অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে যে।”

    সোম তবু অনড় হয়ে ছিলেন। টরাস চিৎকার করে উঠলেন আবার, “বিশ্বাস করো, আমি এই যুদ্ধের ইতি টানতে পারব।”

    নিজের ওভারকোর্টের বোতামগুলো একটানে খুলে ফেললেন টরাস। বিস্ফারিত চোখে সোম দেখলেন, টরাসের বুকের জ্যাকেটে আটকানো রয়েছে বিভিন্ন ধরণের বিস্ফোরক, কাচের ভায়াল, আর আরও অনেক কিছু।

    “আমি প্রস্তুত হয়েই এসেছিলাম।” এক ধাক্কায় সোমকে বাইরে ফেলে দিলেন টরাস। তারপর চিৎকার করে বললেন, “বিদায়, সোম! ওপারে আবার দেখা হবে কোনোদিন। পরমপিতা তোমার সহায় হোন!”

    ভিক্টোরিয়া’র শরীরের ওপর দিয়ে লাফ দিয়ে এগিয়ে এল একটা নেকড়ে। তখনই ঘরের দরজাটা দড়াম করে বন্ধ করে দিলেন টরাস।

    রুদ্র সোম বুঝতে পারলেন, টরাসকে আর বোঝানোর চেষ্টা বৃথা। দৌড়ে, লাফিয়ে গড়িয়ে তিনি সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে প্রাসাদের চৌহদ্দির বাইরে এসে পড়লেন।

    তারপরেই আগুন আর মৃত্যুর লুপ্ত হয়ে গেল এই গল্পের অন্যতম দুই চরিত্র, আর অন্ধকারের একঝাঁক সন্তান!

    .

    ।। ১৬।।

    ভারসাম্য

    ক্লান্ত শরীরটা আরাম কেদারায় এলিয়ে দিলেন সেবাস্টিয়ান।

    তিনি আর পারছেন না। কাজটা দিনকে দিন যেন কঠিন বেশিদিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে। অবশ্য এই পেশায় খুব কারও পক্ষেই টিকে থাকা সম্ভব নয়। এপার-ওপারের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা কোনো সাধারণ মানুষের কর্ম নয়। এতে শরীর ও মনের প্রবল ক্ষয় অবশ্যম্ভাবী।

    তবে হ্যাঁ, এই পেশার সঙ্গে জড়িত টাকার পরিমাণটাকে তো অস্বীকার করা সম্ভব নয়। কাজটা নিপুণভাবে করেন বলেই আরাম-ঐশ্বর্য আর বিলাসের রাঙতায় নিজের জীবনটাকে মুড়ে ফেলতে পেরেছেন সেবাস্টিয়ান। এই পথ থেকে সরে আসা কি অতই সহজ?

    দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে পড়লেন সেবাস্টিয়ান। মদের গ্লাসে ডুবে যাওয়ার আগে নিত্যকার কাজগুলো সেরে নিতে হবে। যতই দু’চোখের পাতা জুড়ে ক্লান্তি নেমে আসুক, এগুলো না করলেই নয়। নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্যই এগুলো করা অত্যন্ত জরুরি।

    জানলার পাল্লাগুলো বন্ধ করে দিলেন সেবাস্টিয়ান। পর্দা সরিয়ে কালো নুনের রেখা দিতে শুরু করলেন তার ফ্রেম বরাবর। দরজার নবে একটা সিলভার ক্রুশের হার ভালো করে জড়িয়ে দিলেন। দরজার মুখেও কালো নুনের প্রলেপ দিলেন। নিজের শোয়ার খাট টেনে ঘরের মাঝে নিয়ে আনলেন সেবাস্টিয়ান; তার চারপাশেও গোল করে কালো নুনের বৃত্ত আঁকলেন তিনি। ঘরের চার কোণে চারটে মোটা কালো মোমবাতি জ্বালিয়ে দিলেন তিনি— যেগুলো সারারাত ধরে জ্বলবে।

    ব্যস, আপাতত কাজ শেষ। এইবার স্নান সেরে, একটা মদের বোতল নিয়ে বিছানায় ডুবে যেতে হবে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন সেবাস্টিয়ান। কালো নুনের এই ব্যবস্থা পুরোপুরি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দেয় না। তবে একে ভেদ করার মতো ক্ষমতা যারা রাখে, তাদের সঙ্গে কারবার করেনই না তিনি।

    জামাকাপড় ছেড়ে বাথরুমের দিকে এগোলেন সেবাস্টিয়ান। কিন্তু বাথরুমের আলো জ্বালার সঙ্গে-সঙ্গে একটা কালো ছায়া ঝাঁপিয়ে পড়ল তাঁর ওপর।

    পোড়খাওয়া হলেও ঘটনার আকস্মিকতায় কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেছিলেন সেবাস্টিয়ান। তিনি নিজেকে সামলানোর আগেই তাঁকে মাটিতে আছড়ে ফেলা হল। তারপর আবার… আরও একবার!

    সেবাস্টিয়ানের মাথা ঘুরছিল। তাঁকে তুলে সোফার ওপর আছড়ে ফেলা হল— এটুকু বুঝলেও তিনি বাধা দিতে পারেননি। দ্রুত হাতে যখন তাঁর দুটো হাত পিছমোড়া করে বাঁধা হচ্ছিল, তখন তিনি বাধা দিতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু প্রতিপক্ষ একটু বেশিই শক্তিশালী বলে বিশেষ সুবিধে করতে পারেননি তিনি। তবু একটা ব্যাপারে তিনি বেশ নিশ্চিন্তই হয়েছিলেন।

    প্রতিপক্ষ কোনো অবাঞ্ছিত এন্টিটি নয়। সম্ভবত এ কোনো চোর কি ডাকাত পানশালায় তাকে দু’হাতে টাকা ওড়াতে দেখে পিছু-পিছু এখানে এসেছে দাঁও মারবে বলে।

    “আমার সব কামাই মদে-মেয়েতে উড়ে হেসে বললেন সেবাস্টিয়ান, “বোকামো করিস না। আমার হাত খুলে দে। আমি কিন্তু খুব সাধারণ লোক নই। তোর ক্ষতি হয়ে যাবে! কী হল? কথা কানে যাচ্ছে না! কী চাস তুই?”

    “উত্তর।”

    গম্ভীর গলায় কথাটা বলে অনাহূত অতিথিটি সেবাস্টিয়ানের সামনে এসে দাঁড়াল। প্রায়ান্ধকার ঘরে সেবাস্টিয়ান দেখলেন, কালো ওভারকোটে সর্বাঙ্গ ঢাকা এক দীর্ঘদেহী পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে তাঁর সামনে। মাথার চুল টানটান করে ব্যাকব্রাশ করা, ধারালো নাক। তবে গায়ের রঙ আর মুখ দেখে বিদেশি বলে মনে হচ্ছে। এ কি… ভারতীয়?

    “কে তুই? কী উত্তর চাস আমার কাছে?”

    “আমার নাম রুদ্র সোম। আমি টরাসের বন্ধু।”

    রুদ্র সোম! টরাস! চিন্তায় পড়ে গেলেন সেবাস্টিয়ান। নামগুলো যেন বড্ড চেনা-চেনা লাগছিল তাঁর। কোথায় যেন… চকিতে তাঁর মনে পড়ে গেল। টরাস রেজমন্ড— দু’মাস আগের এক ক্লায়েন্টের টার্গেট।

    “আরে বাহ্! তোমরা একদিন আসবে— এ-কথা জানতাম। কিন্তু এত জলদি আমাকে খুঁজে পেয়ে যাবে, সেটা কিন্তু আমি সত্যিই ভাবিনি, মিস্টার রুদ্র সোম।”

    “মিস্টার নয়, সেবাস্টিয়ান।” সোমের ঠোঁটের কোণ ব্যঙ্গবঙ্কিম হয়ে উঠল, “রেভারেন্ড। তবে তোমার তো বোধহয় ধার্মিক পদবির ব্যাপারে অ্যালার্জি আছে। সেক্ষেত্রে প্রফেসরই বলতে পার। আজ আমি তোমার থেকে একটা উত্তর চাইতে এসেছি। কিঞ্চিৎ শিক্ষাদানও করার ইচ্ছে আছে। তাই প্রফেসর সোম বলে আমাকে সম্বোধন করতেই পার।”

    “তুমি আমাকে শিক্ষা দেবে, সোম!” উন্মাদের মতো হেসে উঠলেন সেবাস্টিয়ান, “কেন? তুমি ধোয়া তুলসিপাতা বুঝি? এই পথে চলতে-চলতে তোমার নিজের কখনও

    পদস্খলন হয়নি? শিকারের নেশায় ভিক্টোরিয়াকে দেওয়া কথার খেলাপ কেন করেছিলে তোমরা? পদস্থলনের শাস্তি তোমরাও দাও, আমিও দিই। আমাকে শিক্ষা দেওয়ার কথা তুমি বল কোন অধিকারে?”

    “কথার খেলাপ যে করেছিল, সেই টরাস শাস্তি পেয়েছে। কিন্তু এতে টরাসের স্ত্রীর কোনো হাত ছিল কি? তা হলে সে শাস্তি পেল কেন? নরকের আগুনে কেন সেই নির্দোষ প্রাণটিকে ঠেলে দিলে?”

    “কী করব, সোম? ক্লায়েন্ট যদি জাস্টিস সেভাবেই চায়, তাহলে ভারসাম্যটা ওভাবেই আনতে হয় যে তুমিও চাইলে তোমার বন্ধুর বদলা সেভাবেই নিতে পার। কিন্তু কী করে নেবে? একজন নিরস্ত্র মানুষের ওপর জোর খাটাবে? নাকি আমার কোনো আত্মীয়কে খুঁজে বের করে তাকে শাস্তি দেবে?”

    “নিরস্ত্রের ওপরে জোর কখনও খাটাইনি, সেবাস্টিয়ান। মানুষকে শাস্তি দেওয়ার অধিকারও আমার সংগঠন বা রাষ্ট্র আমাকে দেয়নি। কিন্তু…”

    “কিন্তু?”

    নিজের কোটের পকেট থেকে একটা সিরিঞ্জ বের করলেন সোম। সেটা তিনি সজোরে গেঁথে দিলেন সেবাস্টিয়ানের উরুতে। যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলেন সেবাস্টিয়ান। “এটা তুমি কী করলে সোম? কী ছিল এই সিরিঞ্জে? আমার সারা শরীর জুড়ে এরকম জ্বালা শুরু হল কেন?”

    “জাস্টিস!” মৃদু হেসে বলে উঠলেন সোম, “এতে ভ্যাম্পায়ারের রক্ত বিশ্লেষণ করে পাওয়া সিরাম ছিল। তুমি আর মানুষ নেই সেবাস্টিয়ান। তোমার চোখ থেকে সাদা ভাব দ্রুত মুছে গিয়ে সেখানে ঘন হচ্ছে অন্ধকার। তোমার শরীরে শক্তি বাড়ছে— যা দিয়ে এই দড়ি তুমি ছিঁড়ে ফেলতে পারবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। আর মিনিটখানেকের মধ্যেই তুমি নিজে ভ্যাম্পায়ারে পরিণত হবে। তখন তোমার অনেক ক্ষমতা হবে, সেবাস্টিয়ান। শুধু…”

    সিলভার বুলেট বুকে নিয়ে অপেক্ষায় থাকা রিভলবারটা সেবাস্টিয়ানের দিকে তুলে ধরলেন সোম।

    সেবাস্টিয়ান বুঝতে পারছিলেন, তাঁর দুটো শ্ব-দন্ত ক্রমেই লম্বা হচ্ছে। হাতের তেলোর মাঝখানটা খসখসে হয়ে উঠছে। উদগ্র উত্তেজনায় তিনি অপেক্ষা করছিলেন, কখন তাঁর নতুন শক্তির চাপে ছিঁড়ে যায় দড়িটা। তারপর ওই সোমকে তিনি…

    “শুধু এবার তুমি আমার শাস্তির আওতায় এসে গেছ, সেবাস্টিয়ান। ভারসাম্য আসুক তাহলে?”

    ট্রিগার টিপলেন সোম।

    .

    ।।১৭।।

    শেষে

    “তারপর?”

    গলা শুকিয়ে এসেছিল রক্তলাল ওই নাটকের রুদ্ধশ্বাস শেষ অঙ্কের বর্ণনা শুনতে- শুনতে। প্রফেসরও অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তাও কোনোক্রমে প্রশ্নটা করলাম।

    “শিকার কোনো খেলা নয়, কৌশিক।” পাইপটা ধরালেন প্রফেসর। মিষ্টি গন্ধে আর ধোঁয়ায় ভরে উঠল চারপাশ। বইয়ে ঠাসা তাকগুলোর দিকে হাত নেড়ে বললেন প্রফেসর, “গোস্টহান্ট যাঁরা করেন, তাঁদের জীবনে অনেক কিছু ঘটে যায়। আনন্দ বা উত্তেজনার বদলে দুঃখ আর হাহাকারই সেখানে মুখ্য হয়ে ওঠে। এইসব বইপত্রের মধ্যে সেগুলো ধরা আছে আভাসে-ইঙ্গিতে। বুঝতে পারলে, তাদের মধ্যে হন্টিং আর হান্টিং নিয়ে এমন অনেক কিছুই পাওয়া যায় যা দিয়ে….”

    “যা দিয়ে?”

    “তোমার অনেকগুলো শনিবারের রসদ জুটে যাবে।” হেসে উঠলেন প্রফেসর, “সেগুলো আপাতত তোলা থাক?”

    ***

    ⤶
    1 2 3
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleধূসর আতঙ্ক – অনীশ দাস অপু সম্পাদিত
    Next Article মেলানকোলির রাত – কৌশিক সামন্ত

    Related Articles

    কৌশিক সামন্ত

    প্রফেসর সোম – কৌশিক সামন্ত

    April 25, 2026
    কৌশিক সামন্ত

    মেলানকোলির রাত – কৌশিক সামন্ত

    April 25, 2026
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026
    Our Picks

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026

    বৈদ্যুতিক চুল্লি – শঙ্কর চ্যাটার্জী

    April 27, 2026

    সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – মিহির সেনগুপ্ত

    April 27, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }